‘ক্রিস্টাল পৃথিবীতে’ ব্যাখ্যাতীত সব রহস্যের সমাধান!

‘ক্রিস্টাল পৃথিবীতে’ ব্যাখ্যাতীত সব রহস্যের সমাধান!

পেন্টাডোডেকাহেড্রন আকৃতির ক্রিস্টাল। ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর ব্যাখ্যাতীত ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যার জন্যে অদ্ভুত এক গাণিতিক তত্ত্ব উদ্ভাবন করেছেন নিউজিল্যান্ডের এক সৌখিন গণিতবিদ ব্রুস ক্যাথি। তার তত্ত্বের তিনি নাম দিয়েছেন হারমোনিক গ্রিড। তার এ তত্ত্বকে বিজ্ঞান হিসেবে মানতে অনেকে নারাজ, তবে কৌতুহলীও অনেকে।

আন-আইডেন্টিফাইড ফ্লাইং অবজেক্ট বা ইউএফও নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। নিরন্তর গবেষণা চলছে কথিত এইসব ভিনগ্রহবাসীদের বাহনগুলো নিয়ে। নিউজল্যান্ডের সাবেক এক শখের গণিতবিদ ছক কষে বের করেছিলেন ইউএফও দেখা যাওয়ার প্যাটার্ন। তার ওই তত্ত্ব টেনে এনেছে বহু প্রাচীন একটি ধারণাকে - ক্রিস্টাল পৃথিবীর ধারণা। পেন্টাডোডেকাহেড্রন ও হারমোনিক গ্রিড নিয়ে বিশেষ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স ভিত্তিক সাইট ‘ভাইস’নিউজবাংলা পাঠকদের জন্য সেটি অবলম্বনে লিখেছেন রুবাইদ ইফতেখার।

১৯৭৩ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সের ‘কেমিস্ট্রি অ্যান্ড লাইফ’ জার্নালে চমকপ্রদ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়; শিরোনাম ছিল ‘পৃথিবী কি একটি বিশাল ক্রিস্টাল (স্ফটিক)?’

প্রতিবেদনে বেশ গভীর অনুসন্ধান করা হয়। সেটা অনেকটা এমন ছিল: পিথাগোরাস পেন্টাডোডেকাহেড্রন নামের একটি মিশ্র-জ্যামিতিক আকার নিয়ে মজে ছিলেন। এ বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক একে বলতেন ‘মহাজাগতিক গোলক’। প্লেটোও এই আকৃতি নিয়ে আগ্রহী হন ও এর নাম দেন ‘আসল পৃথিবী’। মহাবিশ্ব সৃষ্টির ভিত্তি হিসেবে এ জ্যামিতিক আকারটিকে ধরে নিয়েছিলেন দুজন। পিথাগোরাস, প্লেটো ও তাদের পরবর্তী প্রজন্মের বুদ্ধিজীবীর পাশাপাশি ও অতিন্দ্রীয়বাদের (মিসটিসিজমের) অনেকগুলো ধারায় এই পেন্টাডোডেকাহেড্রনের আসল শক্তিকে গোপন রাখার বিষয়ে জোর দেয়া হয়।

রাশিয়ার প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয় যে, সৃষ্টির শুরুতে পৃথিবী ছিল পেন্টাডোডেকাহেড্রনের কৌণিক মাত্রার একটি বৃহৎ ক্রিস্টাল। কালক্রমে গ্রহটি শেষ ক্ষয়ে ক্ষয়ে একটি গোলকের আকার নেয়। প্রতিবেদনে এই তত্ত্ব দেয়া হয়, ‘পৃথিবী নিজেই একটি জ্যামিতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত দ্বৈত গ্রিড তৈরি করে।’ প্রথম গ্রিড ১২টি পঞ্চভুজাকৃতির খণ্ড দিয়ে তৈরি। দ্বিতীয়টি ২০টি সমবাহু ত্রিভুজের সমন্বয়ে তৈরি।

রাশিয়ান গবেষণায় বের করা হয় যে এই স্ফটিক গ্রিডটি পৃথিবীর সমুদ্রের তলের উঁচু-নিচু, ফাটল ও মহাসাগরের নিচে পর্বতসারির সঙ্গে কোনো কোনো জায়গায় মিলে গেছে। মজার বিষয় হলো, ত্রিভুজের একটি শীর্ষবিন্দু গিয়ে পড়েছে কুখ্যাত বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলে। কয়েকটি গেছে প্রাচীন পেরুতে, ইস্টার আইল্যান্ডে ও গিজার পিরামিডে। এই ছেদবিন্দুগুলোতে ভূমিকম্প/আগ্নেয়গিরি, আজব আজব সব জন্তুজানোয়ারের বিচরণস্থল, চরম বায়ুমণ্ডলীয় চাপ, খনিজ আকরিক ও লোহার সঞ্চয় ও স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চতর চুম্বকত্বসহ অন্যান্য অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণের দৃষ্টান্ত দেখা যায়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘পৃথিবীর জৈবমণ্ডলের অংশ হিসেবে মানুষও ক্রিস্টাল পৃথিবীর প্রভাবমুক্ত নয়’।

এ রকম একটি অদ্ভুত ধারণার ক্ষেত্রে রাশিয়ান ভূতত্ত্ববিদরা একা ছিলেন না। অর্ধেক পৃথিবী দূরত্বে থাকা ব্রুস ক্যাথি নামে নিউজিল্যান্ডের এক ব্যক্তি একই ধরণের গ্রিড তত্ত্ব নিয়ে কাজ করছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, তার এই তত্ত্ব দিয়ে প্রায় সব কিছু ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

ইউএফও দেখা যাওয়ার নির্দিষ্ট প্যাটার্ন

ক্যাথি একাধারে ছিলেন নিউজিল্যান্ডের একটি এয়ারলাইনের পাইলট, শখের গণিতবিদ ও ইউএফও তত্ত্বের একজন বিশ্বাসী। ১৯৬৮ সালে একটি অদ্ভূত পর্যবেক্ষণ হাজির করেন তিনি। বিশ্বজুড়ে ইউএফও দেখার রিপোর্ট যাচাই করার পর ক্যাথি নিশ্চিত হন যে তিনি এগুলোর দেখা যাওয়ার স্থানের একটি ভৌগোলিক প্যাটার্ন সনাক্ত করেছেন।

তার জনপ্রিয় কয়েকটি বই ‘হারমোনিক সিক্সনাইনটিফাইভ’, ‘দ্য এনার্জি গ্রিড’ ও ‘দ্য পালস অফ দ্য ইউনিভার্স’-এ তিনি লেখেন, ‘প্রথমে ইউএফওর কেসগুলো এত ছড়ানো-ছিটানো ছিল যে, তাদেরকে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটা ছকে আনা প্রায় অসম্ভব ছিল।’ তবে ক্যাথি নিশ্চিত ছিলেন যে একটা প্যাটার্ন অবশ্যই আছে। যে কারণে তিনি তার তত্ত্ব নিয়ে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আশা করছিলেন জ্যামিতিক পয়েন্টের জটলার মধ্যে ইউএফও কার্যকলাপের অন্তর্নিহিত কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে।

‘ক্রিস্টাল পৃথিবীতে’ ব্যাখ্যাতীত সব রহস্যের সমাধান!
নিউজিল্যান্ডের শখের গণিতবিদ ব্রুস ক্যাথি। ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক কম্পিউটারের সাহায্য ছাড়াই তিনি ইউএফও দেখার স্থানগুলোর প্রক্রিয়ার একটি প্যাটার্ন বের করেন। প্রথমে তিনি পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের একটি প্যাটার্ন প্রতিষ্ঠান করেন, যাকে মূল ধরে তার পক্ষে ‘অনুলিপি বা অনুমানের ভিত্তিতে বাকিগুলোকেও খুঁজে বের করা সম্ভব’ হবে। তবে কাজটি সঠিকভাবে শুরু করতে ক্যাথির দরকার পড়ে প্রচুর ডেটা।

দ্য এনার্জি গ্রিড বইতে ক্যাথি জানান, ১৯৬৫ সালের এপ্রিলে তিনি ইউএফও দেখার এক ‘স্বর্ণখনির’ সন্ধান পান। তিনি পত্রিকায় দেখতে পান, নিউজিল্যান্ড সায়েন্টিফিক অ্যান্ড স্পেস রিসার্চ নামের এক সংস্থা নতুন সদস্য খুঁজছে। তিনি ওই সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেন ও দেখেন তাদের কাছে প্রচুর পরিমাণ তথ্য অত্যন্ত চমৎকারভাবে গোছানো আছে। ক্যাথি তাদের কাছে ১২ বছর ধরে সংগ্রহ করা ২৫টি দেশের তথ্য পান। ক্যাথিকে তারা অবসর সময়ে এগুলো নিয়ে গবেষণার জন্য আমন্ত্রণ জানায়।

নিউজিল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে একই ধরনের ইউএফওর দেখা যাওয়ার বর্ণনা আছে এমন সব রিপোর্টের তালিকা নিয়ে ক্যাথি দ্রুত কাজ শুরু করেন। ইউএফওগুলো দেখা যাবার সময়কে আরও ছোট করে আনেন ক্যাথি। স্থানীয় সময় রাত পৌনে ১০টা থেকে পরের ১৫ মিনিটের তথ্য বাছাই করেন তিনি। হাতে থাকা এই ডেটা পয়েন্টগুলোর সঙ্গে ক্যাথি টানা কয়েক সপ্তাহ ইউএফও ট্র্যাক লাইন হিসেব করেন ও সারা বিশ্বে অন্যান্য গবেষণার সঙ্গে তার হিসেবকে ক্রস-রেফারেন্স করেন।

নিউজিল্যান্ডের মানচিত্রের ওপর ক্যাথি একটি গ্রিড কল্পনা করেন। গ্রিডে উত্তর দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম দিকে ৩০ মিনিটের চাপ হিসেবে করে অক্ষাংশ নেয়া হয়। এর অর্থ হচ্ছে, পৃথিবী পৃষ্ঠের বক্রতার সঙ্গে সমান্তরালে থেকে কেউ ৩০ মিনিটে নির্দিষ্ট দিকে যেটুকু দূরত্ব অতিক্রম করবেন সেইটুকু। হতবাক হয়ে তিনি লক্ষ্য করেন যে, তার ডেটা সেটের ১৬টি স্থির ও ১৭টি চলমান। ইউএফওর দেখা যাওয়ার সবগুলো স্থান তার কল্পিত গ্রিডের ছেদ বিন্দুতে নিঁখুতভাবে বসে গেছে।

ক্যাথি তার তত্ত্ব নিয়ে আরও অনেক দূর যেতে চেয়েছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল, এই গ্রিডটিকে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়া এবং ইতিহাসের প্রতিটি ইউএফও দর্শনের ঘটনাকে ট্র্যাক করা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ও রাশিয়ান রিপোর্ট থেকে আংশিক অনুপ্রাণিত হয়ে ক্যাথি তার গ্রিডের হিসেবে মিলে যাওয়া প্রাকৃতিক ঘটনাগুলির তথ্য জোগাড় করেন। তার কাজগুলো একেবারে প্রান্তিক, এমনকি ইউএফও কমিউনিটিতেও এটি প্রান্তিক হিসেবে বিবেচিত। কীভাবে রাশিয়ান ওই গবেষণাটি বিজ্ঞানী সমাজ ও এর বাইরের গবেষকদের প্রভাবিত করেছে, সেটা বোঝা যায় ক্যাথির কাহিনী থেকে। তার কাজ থেকে এটাও প্রমাণ হয় যে অপ্রচলিত ধারার বিজ্ঞান থেকেও চমকপ্রদ সত্যের টুকরো বেরিয়ে আসতে পারে।

মহাসাগরের একটি অদ্ভূত আবিষ্কার ক্যাথিকে তার গবেষণা চালিয়ে নেয়ার এক নতুন পথের সন্ধান দেয়।

১৯৬৪ সালের ২৯ আগস্ট আমেরিকার একটি জাহাজ ‘এলটানিন’ দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলবর্তী সমুদ্র তলদেশের গবেষণা কাজে ব্যস্ত ছিল। ওই সফরে পানির নিচের বেশ কিছু ছবি নেয়া হয় ও পরে ডেভেলপ করা হয়। ওই ছবিগুলোর একটিতে অনেকগুলো ক্রসবারসহ একটি সঠিক মাপের অ্যান্টেনা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দেখা যায়।

বস্তুটির অবস্থান ছিল অক্ষাংশ 59°08' দক্ষিণ, দ্রাঘিমাংশ 105° পশ্চিমে। ক্যাথির মতে সমুদ্রপৃষ্ঠের সাড়ে ১৩ হাজার ফুট নিচে এই ‘লোহার কারিগরি’ কোনো মানুষের পক্ষে বসানো সম্ভব না। দ্য নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড পত্রিকা একে দ্য এলটানিন অ্যান্টেনা নাম দেয়। পরবর্তীতে এই নামটিই পরিচিত হয়ে ওঠে।

এটা উল্লেখ করা দরকার যে, এলটানিন অ্যান্টেনার সঙ্গে বিরল প্রজাতির এক ধরনের সামুদ্রিক মাংশাসী স্পঞ্জ ক্ল্যাডরজিয়ার (Cladorhiza concrescens) অদ্ভূত মিল রয়েছে। ক্যাথি নিজেও এই মিলের কথা স্বীকার করেছেন, তবে ২০১৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করতেন যে, আসল সত্যকে ঢাকতেই এই স্পঞ্জের কথা বারবার বলা হচ্ছে।

‘ক্রিস্টাল পৃথিবীতে’ ব্যাখ্যাতীত সব রহস্যের সমাধান!
এলটানিন জাহাজের তোলা ‘অ্যান্টেনার’ ছবি। ছবি: সংগৃহীত

দ্য এনার্জি গ্রিড বইতে ক্যাথি বলেন, এই আবিষ্কারে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি এলটানিন অ্যান্টেনার কো-অরডিনেট, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইউএফও দেখতে পাওয়া ও তার নিজের তৈরি গ্রিডের সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা শুরু করেন। তার এই গবেষণার খবর ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে সহায়তা আসতে থাকে।

সহায়তার বড় একটা অংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও নিউজিল্যান্ডের অন্য পাইলটদের কাছ থেকে। এলটানিনের মতো একই মাপের অপরিচিত কিছু রেডিও ট্র্যান্সমিটারের কথা তারা রিপোর্ট করেন। অচেনা ধরনের ট্র্যান্সমিটারগুলোতে জালের মতো কাঠামো রয়েছে ও প্রতিটা বাহুর শেষে গোলাকার বৃত্ত।

ক্যাথি তখন এই অচেনা অ্যান্টেনাগুলো তার নিউজিল্যান্ডের ইউএফও মানচিত্রে যোগ করেন। ইউএফও দেখার জায়গাগুলোর সঙ্গে যোগ হয় মানুষের তৈরি ট্র্যান্সমিটিং স্টেশন, তালিকার বাইরের স্টেশন ও আমেরিকার সায়েন্টিফিক বেজ।

বাড়তে থাকা অ্যান্টেনার রিপোর্টের নেটওয়ার্কের সঙ্গে প্রতি অঞ্চলের হ্যাম রেডিও ইয়ারবুকের মিল খুঁজে পেলেও ক্যাথি কোনোভাবেই সরকারিভাবে এই ট্র্যান্সমিটারগুলো ব্যবহার বা বসানোর উদ্দেশ্য সম্বন্ধে কিছু জানতে পারেননি। তিনি তার বইয়ে লেখেন, ‘এই মুহূর্তে আমাকে শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতেই হচ্ছে যে, একদল ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ার গ্রিড সিস্টেম সম্বন্ধে আমার চেয়ে অনেক বেশি জানে।’

ক্যাথির জন্য পুরো বিষয়টা পরিষ্কার ছিল: গোপনে একটা ছোট গ্রুপ এরই মধ্যে এই গ্রিডের খোঁজ পেয়েছে ও একে অজানা কোনো কারণে ব্যবহার করছে। তার ধারণা পুরোপুরি ভুল ছিল না।

ক্রিস্টাল পেন্টাডোডেকাহেড্রন হিসেবে পৃথিবী

পৃথিবীর ব্যাখ্যাতীত ঘটনাগুলোর জন্য দায়ী গ্রিড সিস্টেম নিয়ে গবেষণায় কোনো ত্রুটি রাখেননি ক্যাথি। তার বিশেষ আগ্রহ ছিল রাশিয়ান প্রতিবেদনটি নিয়ে, আরও নির্দিষ্ট করে ধরলে ক্রিস্টাল গ্রিডের একটি ‘সংযোগস্থলে’, যেখানে গ্যাবনের ফ্রান্সেসভিল শহরের কাছে ওকলো এলাকায় একটি ‘প্রাকৃতিক পারমাণবিক রিয়্যাক্টর’ আছে।

ফরাসি পদার্থবিদ ফ্রান্সিস পেরিঁ ১৯৭৩ সালে ভূগর্ভস্থ আইসোটোপের অনুপাতের হিসেব করে এই বিশেষ জায়গা খুঁজে বের করেন। ওকলোতে ১৬টি এমন স্থান রয়েছে, যেখানে ১৭০ কোটি বছর আগে স্বনির্ভর পারমাণবিক ফিশন ঘটেছিল এবং কয়েক লাখ বছর ধরে চলেছে এই প্রক্রিয়া। পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হওয়া পারমাণবিক রিয়্যাক্টর এটি।

ওকলোতে প্রাকৃতিক রিয়্যাকটর আবিষ্কার ও রাশিয়ান প্রতিবেদনে গ্রিড তত্ত্বের সমর্থন পাওয়ায় ক্যাথি নিজের গবেষণা আরও অপ্রচলিত ধারায় করা শুরু করেন। এবার তিনি কাজ শুরু করেন পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পূর্বাভাস দেয়া নিয়ে।

‘ক্রিস্টাল পৃথিবীতে’ ব্যাখ্যাতীত সব রহস্যের সমাধান!
নিউজিল্যান্ডের মানচিত্রের ওপর বসানো ব্রস ক্যাথির উদ্ভাবিত গ্রিড। ছবি: সংগৃহীত

ক্যাথি একটা বিষয়ে তার পুরো গবেষণায় অনড় থাকেন। তা হচ্ছে ‘পারমাণবিক কণার আপেক্ষিক গতির কারণে ভূ-পৃষ্ঠের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একটা নির্দিষ্ট জ্যামিতিক বিন্দুতে একটা নির্দিষ্ট সময়ে’ পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব। ক্যাথি আরও যোগ করেন, ‘পৃথিবী ও সূর্যের আপেক্ষিক গতি যে কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে বিস্ফোরণে ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম, প্লুটোনিয়াম, কোবাল্ট বা অন্যান্য যে কোনো পর্দার্থের অস্থায়ী কণাগুলোকে ব্যহত করবে।’

ক্যাথি তার পদ্ধতি ব্যবহার করে অনুকূল পারমাণবিক বিস্ফোরণের অবস্থা শনাক্ত করার জন্য ভবিষ্যতের পরীক্ষার স্থানগুলোকে নিয়ে বেশ কিছু পূর্বাভাস দেন, শুরুতে যার কয়েকটি মিলেও যায়। ১৯৬৮ সালের আগস্টে ইউএফও গবেষণা উপস্থাপনের জন্য তাকে অকল্যান্ডের রয়্যাল অ্যারোনটিক্যাল সোসাইটিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। উপস্থাপনার আগের দিন তিনি সোসাইটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে এক ডিনারে দেখা করেন। ওই সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ পর তারা ক্যাথির পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।

ক্যাথির সঙ্গে যারা ওই দিন ডিনারে ছিলেন, তারা এই তত্ত্বে খুব একটা বিশ্বাস করেননি। চ্যালেঞ্জ হিসেবে ক্যাথিকে তারা ফ্রান্সের পরবর্তী পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার তারিখের ভবিষ্যদ্বাণী করতে বলেন। টেবিলে বসেই ক্যাথি হিসেব করে বের করেন যে পরবর্তী পরীক্ষা করা হবে ওই মাসেরই ২৪ তারিখে। ওই মাসের ২৪ তারিখে ফ্রান্সের প্যাসিফিক ক্যারিয়ার ব্যাটল গ্রুপ অপারেশন ক্যানোপাস পরিচালনা করে। এতে ফ্রান্স থার্মোনিউক্লিয়ার ডিভাইস (হাইড্রোজেন বোমা) বিস্ফোরণ ঘটানো বিশ্বের পঞ্চম পারমাণবিক শক্তি ক্ষমতাধর দেশে পরিণত হয়।

ক্যাথি তার নিজস্ব ধাঁচে পূর্বাভাসগুলো শঙ্কা ও আশ্বাসের মিশ্রণ হিসেবে প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বোমা বিস্ফোরণের জন্য প্রয়োজনীয় সৌর জ্যামিতি নির্দিষ্ট সময় না থাকলে রাশিয়ার কোনো টার্গেটে মিসাইল ছোড়া সফল করতে বহু ঘণ্টা, দিন ও সপ্তাহ লেগে যাবে।’

ক্যাথির জন্য পারমাণবিক বোমা আসলে একটি ‘স্পেসটাইম নির্ভর জ্যামিতিক ডিভাইস’। এর সফল বিস্ফোরণের জন্য প্রয়োজন মানচিত্র, পদার্থবিজ্ঞান ও ত্রিকোনোমিতি নির্ভর হিসেব।

বিশেষ করে ক্যাথি সব কিছুকে এক সুরে গাঁথার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিয়েছেন, প্রক্রিয়াটিকে ক্যাথি বলছেন হারমোনিক্স। কোনো জায়গার ‘হারমোনিক ভ্যালু’ সেখানে পারমাণবিক বিস্ফোরণ সম্ভব করে তোলে। শুধু পারমাণবিক বিস্ফোরণও নয়, এই তত্ত্ব দিয়ে ক্যাথির মতে পৃথিবীর সব ব্যাখ্যাতীত ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা যাবে।

হারমোনিক গ্রিড

ক্যাথির মতে ইউএফওর দেখা যাওয়া ও প্রতিটা সফল পারমাণবিক বিস্ফোরণ আসলে কতগুলো ফ্রিকোয়েন্সির কারণে হয়, যেটার নাম তিনি দিয়েছেন হারমোনিক গ্রিড। এই ফ্রিকোয়েন্সিগুলো স্পেসটাইমের নির্দিষ্ট কোনো বিন্দুর আলো, অভিকর্ষ ও ভরের বৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল, যে কারণে পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় নির্দিষ্ট সময়ে একেবারে অনন্য একটি কম্পণের স্বাক্ষর সৃষ্টি হয়, যাকে বলা হয় হারমোনিক।

ক্যাথি শত শত পৃষ্ঠা খরচ করেছেন এই হারমোনিক গ্রিডের মান বের করার জন্যে। তার গাণিতিক হিসাব নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে নানা তর্ক-বিতর্ক হলেও তার চিন্তার উৎস নিয়ে সবাই মোটামুটি পরিষ্কার। ক্যাথি মূলত অনুমান, হার, দূরত্ব এ রকম ভিন্ন ধরনের পরিমাপের ওপর নির্ভর ফরমুলাগুলো থেকে হিসেব করে একটা একক সংখ্যার ফল বের করতে চাচ্ছিলেন। আলোর গতি, অভিকর্ষের শক্তি ও ভর পরিমাপ করে কোনো একক পরিমাপে নিয়ে আসা ছোটখাট কোনো বিষয় নয়। এই সব বিচ্ছিন্ন ও ভিন্ন মানগুলিকে গড়ের মধ্যে নিয়ে আসার সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায় হচ্ছে হারমোনিক মিন ব্যবহার করা। একে সহজভাবে বোঝাতে গেলে বলতে হবে, হারমোনিক মিন হচ্ছে সম্পূরকের গড়ের সম্পূরক।

ক্যাথির হিসেবে লাইটের হারমোনিক ১৪,৩৯৯; পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের হারমোনিক ২,৫৪৫.৫ ও পৃথিবীর ভরের হারমোনিক ১৭,০২৫।

মূল বিষয়গুলো ঘটে হারমোনিকের ছেদবিন্দুগুলোতে। ওই বিন্দুগুলোতে:

১। স্পেস-টাইমের ভেতর এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দুতে ভর স্থানান্তর করতে পারে।

২। ভর বেশি থেকে হ্রাসকৃত অবস্থায় পরিবর্তিত হতে পারে

৩। সঠিক প্রযুক্তি পেলে সময়ের সংকোচন ও প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব

ঋণাত্মক বাস্তবতা

ক্যাথির দাবি, এই হারমোনিক পয়েন্টগুলো আসলে ঋণাত্মক বাস্তবতার একেকটি উৎসবিন্দু। বিষয়টা বুঝতে হলে ক্যাথির অ্যান্টি-ম্যাটার নিয়ে ভাবনাটা বুঝতে হবে। মহাশূন্যে একই ইলেকট্রনের ধনাত্মক ও ঋণাত্মক পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে ম্যাটার ও অ্যান্টি-ম্যাটার সৃষ্টি হয়। মহাশূন্যে তরঙ্গ সর্পিলাকার গতিতে ঋণাত্মক ও ধণাত্মক পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যায়। ধনাত্মক পর্যায় যেটি পালস হিসেবে পরিচিত, সেখানে ম্যাটার তৈরি হয়। আর ঋণাত্মক পালসের ক্ষেত্রে তৈরি হয় অ্যান্টি-ম্যাটার।

আমাদের চেতনার সঙ্গে ম্যাটার ও অ্যান্টি-ম্যাটারের সম্পর্ক বোঝানোর জন্য সিনেমার তুলনা দিয়েছেন ক্যাথি। সিনেমার ফিল্মে প্রতিটি স্থির চিত্রকে তিনি বলছেন আমাদের শারীরিক অস্তিত্বের একক পালস। দুটি ফ্রেমের মাঝের পার্থক্যকে তিনি বলছেন অ্যান্টি-ম্যাটারের পালস। ফিল্মটিকে কোন প্রজেক্টর দিয়ে চালালে আমদের জন্য গতি ও সময় প্রক্ষেপণের বিভ্রম তৈরি হয়।

সিনেমা পর্দায় প্রজেকশনের কম্পাঙ্কের কারণে আমরা দুটি স্থিরচিত্রের মধ্যে পার্থক্য দেখতে পাই না। তবে প্রজেক্টরের গতি বাড়িয়ে কমিয়ে আমরা সিনেমার প্রদর্শিত ঘটনার সময় বাড়াতে বা কমাতে পারি। এই রূপকে আমাদের চেতনা হচ্ছে ফিল্ম প্রজেক্টর। ক্যাথির দাবি, মানুষ আসলে ‘দ্বৈত ধারার চেতনা’র অধিকারী।

ক্যাথির হিসেবে হারমোনিক গ্রিডের ছেদবিন্দুর বৈদ্যুতিক পালসের কম্পাঙ্ক বদলাতে থাকে। এটি আমাদের স্পেস-টাইমের অভিজ্ঞতায় প্রভাব ফেলার জন্য যথেষ্ট। আমাদের বাস্তবতার ধারণা এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দুতে স্থানান্তর হয়। ক্যাথির মতে, ‘আমরা স্পেসে এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দুতে স্থানান্তরিত হই, কিন্তু আমরা সেটা শারীরিকভাবে বুঝতে পারি না।’

বিতর্ক

ক্যাথির তত্ত্বকে প্রত্যাখানকারীদের সংখ্যা কম নয়, বরং সময়ের সঙ্গে সে সংখ্যা বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করেন গণিত সমাজ। যারা ক্যাথির কাজকে পদার্থবিজ্ঞান কম ও ‘অদ্ভুতূড়ে গণিত’ বলে উড়িয়ে দেন। ক্যাথির কাজ নিয়ে আরেকটি সমালোচনা হচ্ছে যে তার গবেষণায়, ‘বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের চেয়ে দাবি বেশি’।

ইউএফওনেট ডটআইটি তার হারমোনিক্স তত্ত্বকে বলেছে ‘তুচ্ছ কিছু সংখ্যাভিত্তিক খেলা, যেটার কোনো তাৎপর্য নেই।’ সফল পারমাণবিক বিস্ফোরণের জন্য ক্যাথির স্পেস-টাইমের শর্তগুলি সম্পূর্ণরূপে এখন অপ্রাসঙ্গিক। এই মুহূর্তে এটা বলা নিরাপদ যে, পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে ভূগোল কোনো নির্ধারক ভূমিকা পালন করে না।

আরও পড়ুন:
খুদে জ্যোতির্বিজ্ঞানী অলিভেইরা
পদার্থবিজ্ঞানী হারুন-অর-রশীদের জীবনাবসান
আলো থেকে তৈরি হলো পদার্থ!

শেয়ার করুন

মন্তব্য

রোবট মাছে কেমো হবে নির্ভুল, থাকবে না পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

রোবট মাছে কেমো হবে নির্ভুল, 
থাকবে না পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

চীনা বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত রোবট মাছ। ছবি: ডেইলি মেইল

বর্তমানে ক্যানসার চিকিৎসায় কেমোর ওষুধ রক্তের মাধ্যমে শরীরে ছড়িয়ে ক্যানসার কোষের সঙ্গে যুদ্ধ করে। এই যুদ্ধে অসংখ্য সুস্থ কোষও মারা যায়। এর প্রভাবে রোগীর শরীরে বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

অতি ক্ষুদ্র রোবটটি দেখতে ঠিক মাছের মতো। ক্যানসার প্রতিরোধে এবার এই রোবট মাছকেই কাজে লাগাতে চাইছেন বিজ্ঞানীরা। কেমোথেরাপির সঙ্গে এই বস্তুটিকে সরাসরি টিউমারে পাঠানো হবে। কেমোথেরাপিতে শরীরে যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, এই পদ্ধতিতে তা থেকে মুক্তি পাবেন রোগীরা।

ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতি ক্ষুদ্র রোবট মাছগুলো আয়তনে এক মিলিমিটারের ১০০ ভাগের এক ভাগের সমান। বিশেষ থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে একটি জেল থেকে এগুলো সৃষ্টি করেছেন এক দল চীনা বিজ্ঞানী। ভিন্ন পিএইচ মাত্রায় গেলে এরা আকৃতি পরিবর্তন করে।

আবিষ্কারের পর রোবট মাছটিগুলোকে আয়রন অক্সাইড সল্যুশনে চুবিয়ে রেখে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, এগুলোর মধ্যে চৌম্বক শক্তির সৃষ্টি হয়েছে। কেমো চিকিৎসায় এই চৌম্বক শক্তিকেই কাজে লাগানো হবে।

ক্যানসার চিকিৎসায় এই মাছগুলোকে প্রথমে রক্তনালীতে ইনজেকশনের মাধ্যমে ছেড়ে দেয়া হবে। পরে চৌম্বক শক্তি এদের নিয়ে যাবে টিউমারের কাছে।

ক্যানসার কোষগুলো টিউমারের চারপাশের রক্তরসে থাকা পিএইচ লেভেলকে আরও অম্লীয় করে তোলে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই কেমোর ওষুধ নিয়ে সেখানে হাজির হবে রোবট মাছ। পরে ভিন্ন পিএইচ মাত্রার সংস্পর্শে যাওয়ায় এগুলোর আকৃতির পরিবর্তন ঘটবে। এক পর্যায়ে এরা সঙ্গে নিয়ে যাওয়া কেমোর ওষুধ মুখ হা করে ছেড়ে দেবে।

প্রাথমিকভাবে মাছগুলোর এমন আচরণ কাচের পাত্রে পরীক্ষা করে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে এগুলোর আকৃতি আরও ছোট করার চিন্তা করা হচ্ছে।

বর্তমানে ক্যানসার চিকিৎসায় কেমোর ওষুধ রক্তের মাধ্যমে শরীরে ছড়িয়ে ক্যানসার কোষের সঙ্গে যুদ্ধ করে। এই যুদ্ধে অসংখ্য সুস্থ কোষও মারা যায়। এর প্রভাবে রোগীর শরীরে বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়। শারীরিক অস্বস্তি ও চুল পড়ে যাওয়া এর অন্যতম।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, রোবট মাছ শুধু ক্যানসার কোষগুলোকেই নিশানা করবে, এতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মুক্ত থাকবেন রোগীরা।

আরও পড়ুন:
খুদে জ্যোতির্বিজ্ঞানী অলিভেইরা
পদার্থবিজ্ঞানী হারুন-অর-রশীদের জীবনাবসান
আলো থেকে তৈরি হলো পদার্থ!

শেয়ার করুন

বিবাহিত নারী-পুরুষের ১৮ মাসেই ‘নিরানন্দ জীবন’

বিবাহিত নারী-পুরুষের ১৮ মাসেই ‘নিরানন্দ জীবন’

দাম্পত্য জীবন মানেই প্রতিনিয়ত অসংখ্য বোঝাপড়া, আর খুঁটিনাটি হিসাব-নিকাশ। ছবি: নিউজবাংলা

গবেষণায় দেখা গেছে, বিবাহিত জীবনে মানুষ অনেক ভাবে বদলে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই বদল মানুষের আগের চরিত্রের একদম বিপরীত। কারণ হিসেবে গবেষকেরা বলছেন, দম্পতিরা এক সঙ্গে থাকতে প্রতিদিন বহুমুখী লড়াইয়ের মুখোমুখি হন। অংশীদারি জীবনে খাপ খাইয়ে চলার এই নিরন্তর সংগ্রামে নিজেদের খাঁটি ব্যক্তিত্ব আর টিকে থাকে না।

বিয়ের আগে যেকোনো প্রেমময় সম্পর্ক ঘিরে থাকে সীমাহীন ভালোবাসা ও উত্তেজনার গভীর অধ্যায়। সঙ্গীর ভুলগুলোও তখন মনে হয় অত্যন্ত মধুর, প্রতিশ্রুতি থাকে আজীবন সেই ভুলগুলো মাথায় তুলে রাখার।

তবে বিয়ের পরেই ঘটে ছন্দপতন। দাম্পত্য জীবন মানেই প্রতিনিয়ত অসংখ্য বোঝাপড়া, আর খুঁটিনাটি হিসাব-নিকাশ। অনেকেই বলেন, মধুচন্দ্রিমা পার হলেই শুরু হয় আসল ‘বিবাহিত জীবন’। সঙ্গীর যেসব ‘মধুর ভুল’-এ মুগ্ধ হয়ে প্রেমের শুরু, বিবাহিত জীবনে সেগুলোই হয়ে ওঠে ‘গলার কাঁটা’। অনেকে এমনও বলেন, বেশির ভাগ দাম্পত্য জীবনে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে সমঝোতা ও দায়িত্বের বোঝা, আর ‘গভীর প্রেম’ পালিয়ে যায় জানালা দিয়ে।

দাম্পত্য জীবন কি সত্যিই এতটা ফ্যাকাশে? আমরা চাইলেও কি বিয়ের আগে যেভাবে কেটেছে, সেভাবেই দাম্পত্যকে আমৃত্যু মধুরতম রাখতে পারি? বিয়ের পরেও কি থাকা যায় আগের মতোই প্রাণচঞ্চল?

এসব প্রশ্নের খুব বেশি স্বস্তিকর জবাব নেই মনোবিজ্ঞানীদের কাছে। উল্টো তারা বলছেন, বিয়ের মাত্র দেড় বছরের মধ্যেই বদলে যায় মানুষ। এই বদলে যাওয়া ঠেকানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়, এমনকি জিনগত বৈশিষ্ট্যও আটকে রাখতে পারে না ব্যক্তিত্বের রূপান্তর।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ জর্জিয়ার ক্লিনিক্যাল সাইকোলোজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জাস্টিন ল্যাভনারের নেতৃত্বে এক দল গবেষক দাবি করছেন, বিয়ে মানুষের আচরণ ও ব্যক্তিত্বকে প্রচণ্ড বদলে দেয়।

কিছু কিছু মনোবিদ মনে করেন, মানুষের বৈশিষ্ট্য ও আচরণ মূলত জিনগত ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। এর সঙ্গে শৈশবের পরিবেশেরও বড় প্রভাব রয়েছে। তাদের ধারণা, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর মানুষের আচরণ ও বৈশিষ্ট্যে বড় ধরনের আর কোনো পরিবর্তন ঘটে না।

তবে ল্যাভনারের দলের গবেষণায় দেখা গেছে, বিবাহিত জীবনে মানুষ অনেক ভাবে বদলে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই বদল মানুষের আগের চরিত্রের একদম বিপরীত। কারণ হিসেবে গবেষকেরা বলছেন, দম্পতিরা এক সঙ্গে থাকতে প্রতিদিন বহুমুখী লড়াইয়ের মুখোমুখি হন। অংশীদারি জীবনে খাপ খাইয়ে চলার এই নিরন্তর সংগ্রামে নিজেদের খাঁটি ব্যক্তিত্ব আর টিকে থাকে না।

গবেষণায় ১৬৯ দম্পতিকে বেছে নিয়ে তাদের বিবাহিত জীবনের তিনটি পর্যায়ে কিছু প্রশ্নের জবাব নেয়া হয়েছে। বিয়ের ছয় মাস, ১২ মাস এবং ১৮ মাসে এসব প্রশ্নের জবাব থেকে বৈবাহিক জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি এবং ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনের মাত্রা পরিমাপ করেছেন গবেষকেরা।

একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব যাচাইয়ে ‘বিগ ফাইভ’ তত্ত্ব বেশ জনপ্রিয়। এই তত্ত্বে ব্যক্তিত্বের পাঁচটি মৌলিক দিক পর্যালোচনা করা হয়। এগুলো হচ্ছে- অকপটতা (ওপেননেস), সুবিবেচনা (কনসিয়েনসেচনেস), বহির্মুখীনতা (এক্সট্রাভার্সন), অন্যের মতকে গ্রহণের ক্ষমতা (এগ্রিয়েবলনেস) এবং মানসিক অস্থিরতা (নিউরটিকিজম)। সহজে মনে রাখার জন্য বিগ ফাইভকে ইরেজিতে বলা হয় ওশান (OCEAN)।

ল্যাভনারের দলের গবেষণায় বিয়ের আগে-পরে নারী-পুরুষের ব্যক্তিত্বে বিগ ফাইভের ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। সবচেয়ে খারাপ খবর হলো, প্রেম উপচে পড়া স্বামী-স্ত্রীকে বিয়ের মাত্র দেড় বছর বা ১৮ মাস মধ্যেই দেখা গেছে উল্টো চেহারায়।

অকপটতা: ১৮ মাসে স্ত্রীদের অকপট চরিত্রে রীতিমতো ধস নামতে দেখেছেন গবেষকেরা। তারা বলছেন, বিয়ে পরবর্তী একঘেয়ে জীবন পরিচালনার প্রয়োজনেই সম্ভবত নারীর জীবনে এমন পরিবর্তন।

সুবিবেচনা: বিবাহিত জীবনে স্বামীদের আগের চেয়ে ‘বিবেচক’ হয়ে উঠতে দেখেছেন গবেষকেরা, তবে এক্ষেত্রে স্ত্রীদের অগ্রগতি বলতে গেলে শূন্য। গবেষকদের ধারণা, সংসার জীবনে নির্ভরতা ও দায়িত্বশীলতার চাপ থেকেই হয়ত পুরুষ ‘সুবিবেচক’ হয়ে উঠতে বাধ্য হয়।

বহির্মুখীনতা: গবেষণায় দেখা গেছে বিয়ের প্রথম দেড় বছরে স্বামীরা লাগামছাড়া জীবনের পরিবর্তে অনেক বেশি অন্তর্মুখী হয়ে ওঠেন। আরও কয়েকটি গবেষণাতেও এসেছে, বিবাহিত দম্পতিদের সামাজিক নেটওয়ার্ক অনেক সীমাবদ্ধ হয়ে আসে।

অন্যের মতকে গ্রহণের ক্ষমতা: বিয়ের পর ধীরে ধীরে দম্পতিদের মধ্যে মতবিরোধ প্রকট হতে দেখা গেছে গবেষণায়। সামান্য বিষয় নিয়েও বিবাদে জড়িয়েছেন স্বামী-স্ত্রী। এ ক্ষেত্রে স্বামীর তুলনায় স্ত্রীর দ্বিমত করার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। বিয়ের পর সময় যত গড়িয়েছে স্ত্রীরা তত বেশি নিজেদের মতকে জাহির করতে চেয়েছেন।

মানসিক অস্থিরতা: বিয়ের পর মানসিক স্থিতি পেতে স্বামীদের তুলনায় স্ত্রীদের অনেক এগিয়ে থাকতে দেখা গেছে। সাধারণ ভাবে পুরুষের তুলনায় নারীর মানসিক অস্থিরতা বেশি লক্ষ করা গেলেও বিবাহিত জীবনে এর উল্টো ঘটতে দেখা গেছে।

ল্যাভনারের দলের গবেষণায় বিবাহিত জীবন নিয়ে তৃপ্তিও ধীরে ধীরে কমতে দেখা গেছে। এক কথায় মধুচন্দ্রিমার সময়টিই বিবাহিত জীবনের একমাত্র ‘সুখকর অধ্যায়’ বলে চিহ্নিত হয়েছে গবেষণায়।

একটাই শুধু আশার কথা, বিয়ের শুরুতে যে স্বামীরা প্রচণ্ড খোলামেলা মানসিকতার ছিলেন, তাদের দাম্পত্য জীবন ফ্যাকাশে হতে কিছুটা বেশি সময় লেগেছে। আর যারা শুরুতেই ছিলেন গোটানো, তাদের সংসার রং হারিয়েছে কয়েক মাসের মধ্যে।

অন্যদিকে, স্থির মানসিকতার নারীদের সংসার সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে, বিপরীতে ১৮ মাসের মধ্যে সংসারে আকর্ষণ অনেকটাই হারিয়েছেন অস্থির মানসিকতার নারীরা। গবেষকদের ধারণা, স্ত্রীর মানসিক স্থিরতা স্বামীর ওপরেও প্রভাব ফেলে, আর তাই দাম্পত্য তৃপ্তি কিছুটা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

গবেষণায় বেরিয়ে আসা সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো, বিয়ের মাধ্যমে ব্যক্তিত্বের যে পরিবর্তন ঘটে তাকে কোনো উপায়েই ঠেকানো সম্ভব নয়। গবেষকেরা বলছেন, বেশি বা কম বয়সে বিয়ে করা দম্পতিদের ক্ষেত্রেও গবেষণার ফলাফল একই এসেছে। এমনকি বিয়ের আগেই শারীরিক সম্পর্কে জড়ানো নারী-পুরুষও বিয়ের পর দীর্ঘমেয়াদে সুখী দাম্পত্য সম্পর্ক গড়তে খুব একটা সফল হননি।

এই গবেষণা চলার সময়ে কয়েক দম্পতির ঘরে এসেছে সন্তান। তবে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তাদের জীবনেও ১৮ মাসের মধ্যেই ভর করেছে হতাশা ও অতৃপ্তি।

আরও পড়ুন:
খুদে জ্যোতির্বিজ্ঞানী অলিভেইরা
পদার্থবিজ্ঞানী হারুন-অর-রশীদের জীবনাবসান
আলো থেকে তৈরি হলো পদার্থ!

শেয়ার করুন

মধু ছেড়ে মাংস খাওয়া শিখছে মৌমাছি!

মধু ছেড়ে মাংস খাওয়া শিখছে মৌমাছি!

মাংস খেতে শকুনি মৌমাছির মুখে গজিয়েছে দাঁত। ছবি: সংগৃহীত

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে সম্পূর্ণ মাংসাশী মৌমাছির খোঁজ পেয়ে রীতিমতো বিস্মিত বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, মধু সংগ্রহের প্রবল প্রতিযোগিতা এড়াতেই সম্ভবত এমন বিবর্তন। এ ধরনের মৌমাছির মুখে মধু শুষে নেয়ার ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে গজিয়েছে তীক্ষ্ণ দাঁত।

ফুলের সঙ্গে মৌমাছির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা সবাই আমরা জানি। ফুল মধুর বিনিময়ে মৌমাছির গায়ে জড়িয়ে দেয় রেণু, সেই রেণু ছড়িয়ে যায় দূরের কোনো ফুলে, এভাবেই ঘটে পরাগায়ন।

তবে হাজারো বছরের এমন স্বাভাবিকতার মাঝে সবার অগোচরেই ঘটছে ছন্দপতন। গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, ফুলের ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে উঠছে মৌমাছির কিছু প্রজাতি। এরা নিরামিষ জীবন ছেড়ে পুরোপুরি মাংসাশী প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। আবার নিরামিষ-আমিষ দুই খাবারে আসক্ত মৌমাছিও পাওয়া গেছে।

পঁচা মাংস ছিড়ে খেতে কিছু মৌমাছির মুখে গজিয়েছে দাঁত, এমনকি হজমে গণ্ডগোল এড়াতে এদের পরিপাকতন্ত্রও প্রস্তুত।

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে সম্পূর্ণ মাংসাশী মৌমাছির খোঁজ পেয়ে রীতিমতো বিস্মিত বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, মধু সংগ্রহের প্রবল প্রতিযোগিতা এড়াতেই সম্ভবত এমন বিবর্তন। এ ধরনের মৌমাছির মুখে মধু শুষে নেয়ার ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে গজিয়েছে তীক্ষ্ণ দাঁত।

প্রাণিবিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণায়, কর্মী মৌমাছি ফুলে ফুলে ঘুরে ঘুরে ‌মৌ-রস সংগ্রহ করে। এই মৌ-রসকে ইংরেজিতে বলে নেকটার। নেকটার হলো ফুলের রেণুতে থাকা মিষ্টি তরল। মৌমাছির শরীরে দুটি পাকস্থলি রয়েছে। একটিতে সে মৌ রস জমা করে, আর অন্যটিতে স্বাভাবিক ভাবে খাবার পরিপাক হয়।

কর্মী মৌমাছি পেটে মৌ-রস নিয়ে এসে মৌচাকে জমা করে। মৌচাকের প্রকোষ্ঠে মধু ঢালার আগে এরা পেট থেকে মধু মুখে নিয়ে আসে। মধু প্রকোষ্ঠে ভরার পর ডানা ঝাপটে বাড়তি পানি বাষ্পীভূত করে দেয়া হয়। এরপর দীর্ঘদিন মধু ভালো রাখার জন্য মৌমাছি নিজের পেট থেকে মোম বের করে প্রকোষ্ঠের মুখ বাতাসরোধী করে আটকে দেয়।

তবে মাংসাশী মৌমাছির বেলায় এই রুটিনের কোনো বালাই নেই। এরা মাংস চিবিয়ে খেতে দক্ষ প্রাণীতে পরিণত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড (ইউসিআর) এর কীটতত্ত্ববিদ ডগ ইয়ানেগা বলছেন, ‘এরা এমন ধরনের মৌমাছি যারা উদ্ভিদজাত খাদ্য উৎসের বাইরে সম্পূর্ণ আলাদা উৎস ব্যবহারের জন্য বিবর্তিত হয়েছে। এটি মৌমাছির খাদ্যাভাসের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।’

দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলে পাওয়া মাংসাশী মৌমাছির পরিপাক তন্ত্রে মাংস হজমের উপযোগী রূপান্তরও লক্ষ্য করেছেন বিজ্ঞানীরা।

খাবার হজমে সহায়তার জন্য প্রতিটি প্রাণীর পরিপাকতন্ত্রে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও অণুজীব। প্রাণিবিজ্ঞানীরা বলছেন, মধু জাতীয় খাদ্য পরিপাকে মৌমাছির পরিপাকতন্ত্রে মূলত পাঁচটি অণুজীব সক্রিয়। প্রায় আট কোটি বছর ধরে এগুলোই প্রায় সব প্রজাতির মৌমাছির পরিপাকতন্ত্রে আধিপত্য বজায় রেখেছে। তবে মাংসাশী মৌমাছির পরিপাকতন্ত্রে পাওয়া গেছে একদম আলাদা ধরনের অণুজীব।

ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড এর গবেষক দলটির গবেষণাটি সম্প্রতি আমেরিকান সোসাইটি অফ মাইক্রোবায়োলজিতে প্রকাশিত হয়েছে। মাংস খেতে সক্ষম মৌমাছিরা ‘ভালচার বি’ বা শুকুনি মৌমাছি নামে পরিচিতি পেয়েছে।

শকুনি মৌমাছির দেখা মিলেছে কোস্টারিকার বনে-জঙ্গলে। এদের আচরণ ও খ্যাদ্যাভাস পর্যবেক্ষণে ইউসিআর গবেষক দলটি গাছে ঝুলিয়ে রেখেছিল মুরগির কাঁচা মাংসের টুকরো। দেখা গেছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে শুকুনি মৌমাছিরা। মাংস ও মধু- দুটিই খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে এমন প্রজাতিও পাওয়া গেছে সেখানে।

গবেষক দলটি বলছে, মাংসাশী, সর্বভুক এবং কেবল মধু খাওয়া মৌমাছিদের পরিপাক তন্ত্রের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।

ইউসিআর-এর কীটতত্ত্ববিদ কুইন ম্যাকফ্রেডরিক বলেন, ‘শকুনি মৌমাছির অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম অ্যাসিড সম্মৃদ্ধ ব্যাকটেরিয়ায় পরিপূর্ণ, সাধারণভাবে অন্যান্য মৌমাছিতে যা একেবারেই দেখা যায় না। শকুন, হায়েনার মতো প্রাণীর পরিপাকতন্ত্রেও এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া দেখা যায়। এসব ব্যাকটেরিয়া পঁচা মাংসের রোগজীবাণু থেকে খাদ্য গ্রহণকারী প্রাণীকে রক্ষা করে।’

শকুনি মৌমাছির অন্ত্রে পাওয়া ব্যাকটেরিয়ার একটি হল ল্যাকটোব্যাসিলাস, যা দই জাতীয় খাবারে পাওয়া যায়। এই ব্যাকটেরিয়া শক্ত খাবার হজমে সাহায্য করে।

গবেষক দলের সদস্য জেসিকা ম্যাকারো বলছিলেন, ‘মৌমাছি কোনো প্রাণীর মৃতদেহ ছিড়ে খাচ্ছে, এটা ছিল ভয়ঙ্কর দৃশ্য। মৃতদেহের পঁচা মাংসে ক্ষতিকর অনেক জীবাণু থাকে, তবে এসব জীবাণুকে প্রতিরোধের ক্ষমতা শকুনি মৌমাছি অর্জন করেছে।’

কোস্টারিকায় পাওয়া শকুনি মৌমাছির বেশিরভাগ প্রজাতির হুল নেই। তবে আক্রমণ ঠেকাতে এদের প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। কয়েকটি প্রজাতি কামড়ানোর শক্তি রাখে, আর সেই কামড়ে ত্বকে ফোস্কা পড়াসহ, ঘা তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন:
খুদে জ্যোতির্বিজ্ঞানী অলিভেইরা
পদার্থবিজ্ঞানী হারুন-অর-রশীদের জীবনাবসান
আলো থেকে তৈরি হলো পদার্থ!

শেয়ার করুন

সন্তান জন্ম দিতে পারা রোবট উদ্ভাবন

সন্তান জন্ম দিতে পারা রোবট উদ্ভাবন

কম্পিউটার ডিজাইন মেনে বিশেষ এক ধরনের ব্যাঙের কোষ নতুন ধরনের প্রাণ তৈরি করেছে। অতি ক্ষুদ্র এই জীবসত্তা (অর্গানিজম) ক্ষুদ্র থালায় সাঁতার কাটতে পারে, নতুন একক কোষ খুঁজে বের করতে পারে ও এক সঙ্গে শত শত একত্রিত হতে সক্ষম।

টিকে থাকার প্রয়োজনে জীবের বংশবৃদ্ধি আবশ্যিক প্রাকৃতিক ঘটনা। তবে এই প্রথম জৈবিক প্রজননে সক্ষম রোবট উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, এই জীবন্ত রোবট ক্রমাগত তৈরি করতে পারে নিজের প্রতিলিপি।

যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিজ্ঞানীর তৈরি রোবট এক ধরনের জেনোবট (জীবন্ত রোবট) । তবে রোবট বলতে প্রচলিত অর্থে আমরা যা বুঝি এই জেনোবট ঠিক তেমন নয়। সুপার কম্পিউটারের ডিজাইন অনুসারে জৈবিক বংশবিস্তারের এক নতুন কৌশল কাজে লাগানো হয়েছে এ ক্ষেত্রে।

গবেষণাগারে এই ডিজাইন মেনে বিশেষ এক ধরনের ব্যাঙের কোষ নতুন ধরনের প্রাণ তৈরি করেছে। অতি ক্ষুদ্র এই জীবসত্তা (অর্গানিজম) ক্ষুদ্র থালায় সাঁতার কাটতে পারে, নতুন একক কোষ খুঁজে বের করতে পারে ও এক সঙ্গে শত শত একত্রিত হতে সক্ষম।

এক মিলিমিটারের চেয়েও ছোট (০.০৪ ইঞ্চি) জেনোবটগুলো শিশু জেনোবট তৈরি করতে পারে। এসব শিশু জেনোবট এরপর আবার নতুন কোষ খুঁজে বের করে নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করতে সক্ষম। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই জেনোবট সনাতনি ধরনের রোবট যেমন নয়, তেমনি আবার কোনো প্রচলিত প্রাণীও নয়। কম্পিউটারে তৈরি ডিজাইন অনুসারে এটি কাজ করে এবং অতিক্ষুদ্র এই জীবসত্তার মাধ্যমে আগামীতে মানবদেহের অভ্যন্তরে ওষুধ পরিবহন সম্ভব।

গবেষণা দলের সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ভারমন্টের (ইউভিএম) কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও রোবটিকস বিশেষজ্ঞ জশুয়া বোনগার্ড বলেন, ‘সঠিক ডিজাইন করা গেলে জেনোবটগুলো নিজে থেকেই নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করবে।’

তাদের গবেষণার ফল গত ২৯ নভেম্বর প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে।

জেনোবট তৈরিতে বেছে নেয়া হয়েছে আফ্রিকান ব্যাঙের প্রজাতি জেনোপাস লিভিসের বিশেষ ধরনের কোষ। এই ভ্রূণ কোষগুলো পরে ব্যাঙের ত্বকে পরিণত হয়।

গবেষণা দলের আরেক সদস্য ম্যাসাচুসেটসের টাফটস ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক মাইকেল লেভিন বলেন, ‘বিশেষ ভ্রূণকোষগুলো ব্যাঙাচি জন্মের ত্বক আবরণ তৈরি করে। এই কোষ শ্লেষাজাতীয় পদার্থের নিঃসরণ ঘটিয়ে ব্যাঙকে রোগজীবাণুর হাত থেকে সুরক্ষিত রাখে। তবে ল্যাবরেটরিতে আমরা এদের নতুন একটি পরিস্থিতিতে রেখেছি। এগুলোর বহুকোষী বৈশিষ্ট্যকে নতুন ভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করেছি। এর ফলে কোষগুলো নতুন যা তৈরি করছে তা ত্বক থেকে একেবারে আলাদা।’

গবেষক দলের সদস্য টাফটস ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী ডগলাস ব্ল্যাকিস্টন বলেন, ‘এতদিন মানুষের ধারণা ছিল, জীবনের বিস্তার বা বংশবৃদ্ধি কীভাবে ঘটে সে বিষয়ক সব রহস্য ভেদ করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের এই পরীক্ষা এমন কিছু পাওয়া গেছে যা আগে কখনও দেখা যায়নি।’

বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে গবেষক দলটি। অধ্যাপক মাইকেল লেভিন বলেন, ‘এই কোষগুলোতে ব্যাঙের জিনোম রয়েছে, কিন্তু এরা ব্যাঙাচিতে পরিণতা হওয়ার দায়িত্ব থেকে মুক্ত। ফলে এরা যৌথ বুদ্ধিমত্তা, নমনীয়তা প্রয়োগ করে অবাক করার মতো অনেক কিছু ঘটাতে সক্ষম।’
গবেষণায় দেখা গেছে, কম্পিউটারে ডিজাইন করা কোষগুলো নিজে থেকেই নিজের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে।

গবেষণা দলের প্রধান স্যাম ক্রিগম্যান বলেন, ‘ব্যাঙের এই কোষগুলো নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করছে এক দম আলাদা পদ্ধতিতে। ব্যাঙের দেহে সাধারণভাবে প্রতিলিপি তৈরির চেয়ে এই প্রক্রিয়া একেবারে ভিন্ন।’

জেনোবটের জনক কোষ নিজে থেকেই ৩ হাজার কোষের সমন্বয় ঘটিয়ে একটি বৃত্ত তৈরি করে।

ক্রিগম্যান বলেন, ‘এগুলো সন্তান তৈরি করতে পারে, কিন্তু এর পরই প্রক্রিয়াটির অবসান ঘটে। এই প্রক্রিয়াটি অব্যাহত রাখার পদ্ধতিটি খুবই জটিল।’

জেনোবটের আকৃতি তৈরির জন্য গবেষণায় ডিপ গ্রিন সুপার কম্পিউটারে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রোগ্রামের নতুন ধরনের এলগরিদম ব্যবহার করা হয়েছে। কোন আকৃতি বংশবিস্তারের জন্য উপযোগী সেটি জানতে ত্রিভূজ, চতুষ্কোণ, পিরামিড বা তারকাকৃতি তৈরি করা হয়েছে।

ক্রিগম্যান বলেন, ‘আমরা কম্পিউটারকে বলেছিলাম, জনকের আকৃতি ঠিক করতে। এআই কয়েক মাস চেষ্টার পর কয়েকটি অদ্ভূত ধরনের আকৃতি তৈরি করে, যার একটি দেখতে প্যাক-ম্যানের (ভিডিও গেইম চরিত্র) মতো। এটা সে সজ্ঞানে করেনি। এরপর ওই জনক থেকে সন্তান তৈরি হলো। তাদের থেকে আবার সন্তান ও তাদের থেকে আবারও। এক কথায় সঠিক ডিজাইনের কারণে বংশবিস্তার কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত চলেছে।’

বোনগার্ড বলেন, ‘আমরা আবিষ্কার করেছিম অর্গানিজম বা কোনো কোষীয় জীবন ব্যবস্থার মধ্যে এমন সব জায়গা রয়েছে যার সম্বন্ধে আমরা জানতাম না। এর আগে আমরা হাঁটতে পারে এমন রোবট পেয়েছি। সাঁতরাতে পারে এমন রোবট পেয়েছি। আর এই গবেষণায় পেলাম এমন কিছু জেনোবট যারা নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে।’

নতুন জেনোবটের সম্ভাবনা নিয়ে বোনগার্ড বলেন, ‘নতুন ওষুধ তৈরি করা বা পানি থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিষ্কার করার কাজে এ যন্ত্রগুলোকে ব্যবহার করা যাবে। আমরা চাই যে হারে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, ঠিক একই হারে প্রযুক্তিগত সমাধান খুঁজে বের করতে।’

আরও পড়ুন:
খুদে জ্যোতির্বিজ্ঞানী অলিভেইরা
পদার্থবিজ্ঞানী হারুন-অর-রশীদের জীবনাবসান
আলো থেকে তৈরি হলো পদার্থ!

শেয়ার করুন

‘শি’-কে ভয়, তাই এলো ‘ওমিক্রন’!

‘শি’-কে ভয়, তাই এলো ‘ওমিক্রন’!

গ্রিক বর্ণমালার অক্ষরগুলো দিয়ে করোনাভাইরাসের নতুন ধরনের নামকরণ করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

গ্রিক বর্ণমালার ক্রমানুসারে ১২টি অক্ষরের নামে করোনার ১২টি ভ্যারিয়েন্টের নামকরণের পর হঠাৎ করেই দুটি অক্ষর বাদ দিয়ে পঞ্চদশ অক্ষর ‘ওমিক্রন’ বেছে নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। আর এতেই তৈরি হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

কোভিড ১৯ এর জন্য দায়ী করোনাভাইরাসের সবশেষ ধরন ‘ওমিক্রন’ নিয়ে উদ্বেগ এখন সারা বিশ্বে।

আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণের দেশ বতসোয়ানায় প্রথম শনাক্ত হওয়া এই ভ্যারিয়েন্টের শুরুতে নাম ছিল ‘বি.১.১.৫২৯’, তবে শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর নাম দেয় ‘ওমিক্রন’।

ভাইরাসটির গতি-প্রকৃতি এবং এটি কতটুকু ক্ষতির কারণ হতে পারে- তা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি নতুন ধরনটির নাম নিয়েও চলছে হৈ চৈ।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনে করোনাভাইরাসটি শনাক্ত হওয়ার প্রথম দিকে এটি ‘২০১৯ নভেল করোনাভাইরাস’ হিসেবে পরিচিতি পায়। মানবদেহে সংক্রমিত যে কোনো নতুন করোনাভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নামকরণের আগে ‘নভেল (নতুন) করোনাভাইরাস’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভাইরাসটির নাম দেয় সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম করোনাভাইরাস টু (সার্স-কভ-২)। এর পর একের পর এক ভাইরাসটির নতুন ধরন তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর নতুন বৈজ্ঞানিক নামও দিতে থাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

তবে এসব নাম বেশ জটিল হওয়ায় ভাইরাসের পরবর্তী ধরনগুলো এদের পরিচিতি পেতে থাকে প্রথম শনাক্ত হওয়া দেশের নামে। যেমন বি.১.৬১৭.২ ভ্যারিয়েন্টটি ভারতীয় ধরন হিসেবে সংবাদ মাধ্যমে পরিচিত পায়। এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষের জন্য বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্টের সহজ নামকরণের উদ্যোগ নেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এই নামকরণে একটি পদ্ধতিও ঠিক করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এক্ষেত্রে গ্রিক বর্ণমালার অক্ষরগুলো দিয়ে শুরু হয় নামকরণ।

২৪ অক্ষরের গ্রিক বর্ণমালার প্রথম অক্ষর ‘আলফা’। সে অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাজ্যে শনাক্ত হওয়া একাধিক মিউটেশনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া করোনার ‘বি.১.১.৭’ ধরনটির নাম দেয়া হয় ‘আলফা’। এরপরে ২০২০ সালেই সাউথ আফ্রিকায় শনাক্ত হওয়া আরেকটি উচ্চ মিউটেশনের ধরনের (বি.১.৩৫১) নামকরণ হয় গ্রিক বর্ণমালার দ্বিতীয় অক্ষর ‘বেটা’ নামে।

ব্রাজিলে প্রথমবার শনাক্ত হওয়া আরেকটি ধরনের (পি.১) নাম রাখা হয় ‘গামা’। এটি গ্রিক বর্ণমালার তৃতীয় অক্ষর। চতুর্থ অক্ষর ‘ডেল্টা’ নামকরণ করা হয় ভারতে শনাক্ত হওয়া ধরনটির (বি.১.৬১৭.২)।

এভাবে ধারাবাহিকভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে শনাক্ত হওয়া ধরনগুলোর নাম রাখা হয়েছে- এপসাইলন, জেটা, এটা, থেটা, আইওটা, কাপা, ল্যাম্বডা, মিউ। এগুলোর মধ্যে ল্যাম্বডা ছাড়া বাকিগুলোর সংক্রমণ ক্ষমতা কম হওয়ায় খুব বেশি আলোচনায় আসেনি।

এভাবে গ্রিক বর্ণমালার ক্রমানুসারে ১২টি অক্ষরের নামে করোনার ১২টি ভ্যারিয়েন্টের নামকরণের পর হঠাৎ করেই দুটি অক্ষর বাদ দিয়ে পঞ্চদশ অক্ষর ‘ওমিক্রন’ বেছে নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। আর এতেই তৈরি হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

ওমিক্রনের আগে পাশ কাটিয়ে যাওয়া গ্রিক অক্ষর দুটি হলো- নু এবং শি।

অনেকের অভিযোগ, চীনা প্রেসিডেন্ট চিনপিং-এর পারিবারিক উপাধি শি হওয়ার কারণেই এই অক্ষরটিকে এড়িয়ে গেছে সংস্থাটি।

এক বিবৃতিতে বিষয়টি স্বীকারও করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাদের বক্তব্য হলো, ‘শি’ শব্দটি পারিবারিক উপাধি হিসেবে অনেকেই ব্যবহার করেন, তাই এটি বাদ দেয়া হয়েছে। আর ‘নু’ এর উচ্চারণ ইংরেজি শব্দ ‘নিউ’ এর সঙ্গে মিলে যায় বলে, বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য অক্ষরটি বাদ দেয়া হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তাদের দাবি, যে কোনো নতুন রোগের নাম নির্ধারণে তারা খুবই সতর্ক থাকেন, যাতে এই নাম কোনো সংস্কৃতি, সমাজ, জাতি, অঞ্চল বা গোষ্ঠীর জন্য বিব্রতকর না হয়।

তবে ‘শি’ এড়িয়ে যাওয়ার পেছনে রাজনীতি রয়েছে বলে তীর্যক মন্তব্য ছুড়ছেন অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর এক টুইটে লিখেছেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনের কম্যুনিস্ট পার্টিকে এতটাই ভয় পেলে তারা পরে কীভাবে বিশ্বাস করবে যে, দেশটি একটি মহামারিকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে।’

আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছেলে ট্রাম্প জুনিয়র টুইটে লিখেছেন, ‘আমি যতদূর জানি, শি ভ্যারিয়েন্টই হলো করোনার আসল ভ্যারিয়েন্ট।’

প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেণী নামে এক ভারতীয় রাজনীতিক লিখেছেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনের নাম নিতে ভয় পায়। কিন্তু তারা ভারত আর সাউথ আফ্রিকাকে দোষারোপ করতে এক পা সবসময় বাড়িয়ে রাখে।’

আরও পড়ুন:
খুদে জ্যোতির্বিজ্ঞানী অলিভেইরা
পদার্থবিজ্ঞানী হারুন-অর-রশীদের জীবনাবসান
আলো থেকে তৈরি হলো পদার্থ!

শেয়ার করুন

ভাঙা প্রেমে কেন ভেঙে যায় বুক?

ভাঙা প্রেমে কেন ভেঙে যায় বুক?

ভেঙে যাওয়া প্রেমকে ভুলে যাওয়া কারও কারও জন্য সত্যিই খুব কঠিন। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস/নিউজবাংলা

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভেঙে যাওয়া প্রেমকে ভুলে যাওয়া কারও কারও জন্য সত্যিই খুব কঠিন। বিরহ এমন এক আসক্তি জন্ম দিতে পারে, যার মাত্রা কোকেইনে আসক্তির মতোই।  

প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার দুদিনের মাথায় নতুন প্রেমে জড়ানোর উদাহরণ আজকাল অফুরন্ত।

বিচ্ছেদের পর অনেকে খুব সহজে সব ভুলে যেতে পারেন। কেউ কেউ আবার নিয়মিত বিরতিতে সঙ্গী বদলকে গৌরবজনকও মনে করেন।

তবে সবাই তো আর এমন ‘পেশাদার’ প্রেমিক বা প্রেমিকা নন, কেউ কেউ এখনও আছেন ভীষণ আটপৌঢ়ে। তাদের কাছে প্রেম ভেঙে যাওয়া মানে সব কিছু ‘শেষ হয়ে’ যাওয়া।

শুধু পুরোনো দিনের ঢাকাই সিনেমার বিবাগি প্রেমিক নয়, বাস্তব জীবনেও ব্যর্থ প্রেমের হাহাকারের নজির অসংখ্য।

ভালোবাসা হারানোকে সহজে মেনে নিতে পারেন না অনেকেই। বুকে একরাশ ব্যথা নিয়ে বিষাদে কাতর কেউ কেউ বুক পকেটে আগলে রাখেন প্রাক্তনের ছবি। কেউ কেউ নানান উপলক্ষ্য ধরে যোগাযোগের ব্যর্থ চেষ্টা করেন। আবার কারও কাছে একেবারেই তুচ্ছ মনে হয় জীবন।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভেঙে যাওয়া প্রেমকে ভুলে যাওয়া কারও কারও জন্য সত্যিই খুব কঠিন। বিরহ এমন এক আসক্তি জন্ম দিতে পারে, যার মাত্রা কোকেইনে আসক্তির মতোই।

বিচ্ছেদের পরেও প্রাক্তন প্রেমিক/প্রেমিকার প্রতি কেনো মানুষের তীব্র আকর্ষণ- সেটি জানতে গবেষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের রুটগার্স ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অফ অ্যানথ্রপলজির অধ্যাপক হেলেন ই. ফিশার ও তার কয়েক সহকর্মী।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারী সবারই ছিল ব্রেক আপের অভিজ্ঞতা। তাদের একটি লিফলেট দেয়া হয়, যেখানে প্রশ্ন ছিল, ‘প্রেমে বিচ্ছেদের পর কি প্রাক্তনকে ভুলতে পারছেন?’

অংশগ্রহণকারীদের প্রায় সবাই জানান, তারা প্রাক্তনের কাছে ফিরে যেতে চান এবং ব্রেক আপের চাপ সামাল দিতে পারছেন না। এদের অনেকেই মানসিক বিষাদের মাত্রা সামলাতে না পেরে মদ্যপান বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, মন খারাপ এবং ডুকরে কান্না ছিল নিয়মিত ঘটনা। অনেকে প্রাক্তনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন ছলচাতুরির আশ্রয় নিচ্ছিলেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রেমে প্রত্যাখ্যানের ঘটনা কোনো কিছু হারিয়ে ফেলার মতো গভীর আবেগ জন্ম দিতে পারে মনের মাঝে। অনেক ক্ষেত্রে এটি তীব্র মানসিক হতাশার জন্ম দেয়, যেটি হত্যা বা আত্মহত্যার মতো ঘটনাতেও গড়াতে পারে।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের তাদের প্রাক্তন প্রেমিক বা প্রেমিকার ছবি দেখানো হয়। পাশাপাশি দেখানো হয়েছে, তাদের পরিচিত কোনো মানুষের ছবি।

দেখা গেছে, দুই ধরনের ছবি দেখার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের মনোসংযোগের মাত্রা ছিল আলাদা।

অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা প্রেমকে একটি ‘লক্ষ্য অর্জনভিত্তিক আবেগ’ হিসেবে দেখছেন। তাদের বাকি সব আবেগের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক এতটা নিবিষ্টভাবে কাজ করে না।

ফিশার ও তার সহকর্মীরা দেখেছেন, সাবেক প্রেমিক/প্রেমিকার দিকে তাকিয়ে থাকা এবং কোকেইন সেবনের তীব্র ইচ্ছার মধ্যে একটি স্নায়বিক সম্পর্ক রয়েছে। এ বিষয়ে একটি হাইপোথিসিস হলো, প্রেমে প্রত্যাখ্যানও এক ধরনের প্রবল আসক্তির জন্ম দিয়ে থাকে।

তীব্র আসক্তি কি ‘অসুস্থতা’?

প্রেমের ক্ষত কী করে দূর করা হয়, সে বিষয়ে গবেষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ ডাকোটা স্কুল অফ মেডিসিনের ডিপার্টমেন্ট অফ সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড বিহেভিয়রাল সায়েন্সের অধ্যাপক এম. সানচেস। তার সঙ্গে ছিলেন ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস হেলথ সায়েন্স সেন্টারের ডিপার্টমেন্ট অফ সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড বিহেভিয়রাল সায়েন্সের অধ্যাপক ভি.পি জন।

‘ট্রিটমেন্ট অফ লাভ অ্যাডিকশন: কারেন্ট স্ট্যাটাস অ্যান্ড পারসপেক্টিভ’ শিরোনামে ২০১৯ সালে প্রকাশিত তাদের গবেষণাপত্রে প্রাক্তনের প্রতি মাত্রাছাড়া আসক্তিকে এক ধরনের ‘মানসিক ব্যাধি’ বলা হয়েছে।

সানচেস ও জন ‘অসুস্থ ভালোবাসা’র ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন, এ ধরনের ক্ষেত্রে মানুষের আচরণের একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন থাকে, যেখানে সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট, মাত্রাছাড়া ও তীব্র আগ্রহ দেখা যায়। এর ফলে মানুষ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান এবং অন্য আর সব কিছুতে তার আগ্রহ শূন্যে নেমে আসে। আচরণগত বিভিন্ন পরিবর্তনও আসে অতি বিরহীর জীবনে।

এই গবেষকেরা বলছেন, অনেকেই বিচ্ছেদ পরবর্তী জীবন ও মানসিক তীব্র দহনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন না।

বিচ্ছেদ ব্যথা সামলাবেন কী করে

ভালোবাসার বন্ধন ছিন্ন করা যখন এত কঠিন তখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগতে পারে, হৃদয়ে ক্ষত সারানোর উপায় কী?

মন গবেষকদের মতে, বিচ্ছেদ যন্ত্রণাদায়ক হলেও এটি হৃদয়কে অন্যান্য সম্পর্ককে বিবেচনায় নেয়ার পথ খুলে দিতে পারে। ফলে বিচ্ছেদ শুধু হতাশাই তৈরি করে না, উন্মোচন করে সম্ভাবনার নতুন অধ্যায়।

তাই প্রাক্তনের পেছনে অযথা ঘুরঘুর না করে নিজেকে সামলাতে শিখুন। এছাড়া অন্য উপায়ের মধ্যে রয়েছে ব্যস্ত থাকা, বন্ধু- পরিবার-পরিজনের সঙ্গে বেশি সময় কাটানো এবং সারাক্ষণ দুঃখের গান না শুনে মন চনমনে রাখা কাজে নিজেকে জড়িত করা।

সবচেয়ে ভালো ওষুধ হচ্ছে সময়। সময়ের সঙ্গে মানুষের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়, ধারণা বদলায় এবং আবেগের মাত্রা হালকা হতে থাকে। সেই সময়কে আসতে দিন, নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবুন এবং নতুন কোনো সম্পর্কের জন্য তৈরি করে নিন।

আরও পড়ুন:
খুদে জ্যোতির্বিজ্ঞানী অলিভেইরা
পদার্থবিজ্ঞানী হারুন-অর-রশীদের জীবনাবসান
আলো থেকে তৈরি হলো পদার্থ!

শেয়ার করুন

চুমু খেলে কমে কোলেস্টেরল

চুমু খেলে কমে কোলেস্টেরল

গবেষণায় দেখা গেছে, ভালো মানের চুমু মানুষের দেহে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয়। কোনো যুগল ডিনারে প্রচুর পরিমাণে হাই-কোলেস্টেরল খাবার খেলেও উদ্বেগের খুব একটি কারণ নেই। ডিনার শেষে একান্তে দীর্ঘক্ষণ পরস্পরকে চুম্বনে আবদ্ধ রাখলে সেই হাই-কোলেস্টেরল হৃদযন্ত্রের বারোটা নাও বাজাতে পারে।

ভালোবাসার বন্ধন দৃঢ় করতে চুমুর বিকল্প নেই। শিল্প, চলচ্চিত্র বা সাহিত্যে তাই বারবারই এসেছে চুমুর জয়গান।

বিভিন্ন গবেষণাতেও এসেছে, সুখী জুটির পেছনে চুমুর সঙ্গোপন ভূমিকা। বলা হয়ে থাকে, দাম্পত্য সম্পর্ক ফিকে হয়ে যাওয়া ঠেকাতে চাইলে নিয়মিত চুমু খাওয়া ভুলে গেলে চলবে না।

এটা তো গেল সম্পর্কের আকর্ষণ ধরে রাখতে চুমুর টোটকা; বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্যও দীর্ঘ ও নিয়মিত চুমু খাওয়া প্রয়োজন। এটি সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা বজায় রাখার পাশাপাশি আপনাকে সুস্থ রাখতেও সাহায্য করে।

বিষয়টি ঘেঁটে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোন স্টেট ইউনিভার্সিটির কমিউনিকেশনসের অধ্যাপক কোরি ফ্লয়েড ও তার সহকর্মীরা একটি গবেষণা চালিয়েছেন। ৫২ জোড়া বিবাহিত ও অবিবাহিত জুটিকে বেছে নিয়ে তারা যাচাই করেছেন চুমু খাওয়ার দৃশ্যমান বা পরিমাপযোগ্য কোনো সুবিধা আছে কিনা।

ফ্লয়েডের দল আগে থেকেই জানতেন, ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে চুমুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ফলে তারা সম্পর্ক জোরদারে চুমুর প্রয়োজনীতা নিয়ে মাথা ঘামাননি; গবেষণায় দেখা হয়েছে, সুস্বাস্থ্যের উন্নতিতে চুমুর অবদান কী।

বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, চুমুর সময়ে লালা বা থুতু বিনিময়ে মনোনিউক্লিওসিস (কিসিং ডিজিজ) ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। তবে ফ্লয়েড ও তার সহকর্মীরা চুম্বনের এই ঝুঁকির বাইরে উপকারিতাই বেশি খুঁজে পেয়েছেন।

তারা দেখেছেন, নিয়মিত চুমু খাওয়ার অভ্যাস অ্যালার্জির বিরুদ্ধে দেহের ইমিউন সিস্টেমকে তাতিয়ে তোলে। তার চেয়েও বড় কথা, মানসিক চাপ এক নিমিষে কমিয়ে দেয় গভীর ও দীর্ঘ চুমু।

স্নায়ুতন্ত্রের প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেমকেও চাঙা করে তোলে চুম্বন। সহজ কথায় প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেম হলো স্নায়ুতন্ত্রের এমন কার্যকলাপ, যা আরামদায়ী বা নিশ্চিন্ত থাকার সময়ে দেহের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ফলে প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেম সক্রিয় থাকা মানেই হলো বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর বাড়তি চাপ কমে যাওয়া।

গবেষণায় দেখা গেছে, ত্বকে বিদ্যমান সিবাম নামের বিশেষ একটি পদার্থ চুমু খাওয়ার সময় সঙ্গীর দেহে পরিবাহিত হতে পারে। আর এই সিবাম মস্তিষ্ককে বন্ধন ও ভালোবাসার সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষ রাসায়নিক সিগন্যাল দেয়।

চুমুর আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বেরিয়ে এসেছে গবেষণায়। দেখা গেছে, ভালো মানের চুমু মানুষের দেহে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয়। কোনো যুগল ডিনারে প্রচুর পরিমাণে হাই-কোলেস্টেরল খাবার খেলেও উদ্বেগের খুব একটি কারণ নেই। ডিনার শেষে একান্তে দীর্ঘক্ষণ পরস্পরকে চুম্বনে আবদ্ধ রাখলে সেই হাই-কোলেস্টেরল হৃদযন্ত্রের বারোটা নাও বাজাতে পারে।

গবেষণার সময় চুমু খাওয়ার অনুমতি পাওয়া যুগলেরা জানিয়েছেন তারা কম চাপ অনুভব করছেন ও নিজেদের শরীরও বেশ ঝরঝরে লাগছে। এমনকি পরিমাপ করে দেখা গেছে তাদের দেহে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রাও কমেছে।
চুমু খেতে পারা গ্রুপের যুগলেরা গবেষণা চলার সময়ে বেশি ব্যায়াম করেছেন, কম ঝগড়া করেছেন, তর্ক করে সময় অপচয়ের আগ্রহও ছিল কম। একে অপরকে আরও ভালো বুঝতে পেরেছেন এই যুগলেরা।

আর বলাই বাহুল্য, চুমুবঞ্চিত যুগলদের ক্ষেত্রে ফলাফল ছিল একদম উল্টো।

আরও পড়ুন:
খুদে জ্যোতির্বিজ্ঞানী অলিভেইরা
পদার্থবিজ্ঞানী হারুন-অর-রশীদের জীবনাবসান
আলো থেকে তৈরি হলো পদার্থ!

শেয়ার করুন