বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ১২টি মণ্ডপে চলে হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ। ছবি: নিউজবাংলা

বিজয়া দশমীর দিন বিকেলে প্রতিমা বিসর্জনের কথা থাকলেও নোয়াখালীর পুলিশের পক্ষ থেকে বেলা ১১টার মধ্যে বিসর্জন শেষ করতে বলা হয়। শুক্রবার জুমার নামাজের পর সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই এ অনুরোধ। তবে সবগুলো অস্থায়ী মণ্ডপের প্রতিমা বেলা ১১টার মধ্যে বিসর্জন দেয়া হলেও সন্ধ্যায় আক্রান্ত হয় চৌমুহনীর ১১টি মন্দির।

কুমিল্লা, চাঁদপুরের পর বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটে নোয়াখালীতে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছয়ানী ইউনিয়নে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এবং শুক্রবার দুপুরে একই উপজেলার চৌমুহনী পৌর এলাকায় ১১টি পূজামণ্ডপে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।

হামলায় প্রাণ হারান প্রান্ত চন্দ্র দাশ নামে এক যুবক, আতঙ্কে হৃদরোগে যতন সাহা নামে আরেকজনের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে যতনের পরিবারের অভিযোগ, তিনিও হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। এ সময় লুটপাট করা হয় মন্দিরের আসবাব, স্বর্ণালংকার, ভাঙচুর করা হয় প্রতিমা।

হামলার শিকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অভিযোগ, প্রশাসনের অনুরোধে বিজয়া দশমীর দিন সকালেই অস্থায়ী সব মণ্ডপের দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়েছিল। এরপরেও হামলা হয় সন্ধ্যায়। এই সহিংসতা ঠেকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ।

হামলার ভয়াবহতা এখনও দৃশ্যমান

বেগমগঞ্জে সহিংসতা চলা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ১২টি মণ্ডপেই ভয়াবহ হামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রথম হামলা চালানো হয় উপজেলার ছয়ানী বাজার এলাকার শ্রীশ্রী সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরে। পুরো মন্দিরে অক্ষত বলে কিছুই নেই। মাটিতে পড়ে আছে গুঁড়িয়ে দেয়া প্রতিমা।

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন নিউজবাংলাকে জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সবাই ব্যস্ত ছিলেন দেবীর আরাধনায়। মাগরিবের নামাজের পর হঠাৎ করে শুরু হয় হামলা। শতাধিক মানুষের একটি মিছিল থেকে রাস্তার পাশে হিন্দুদের বাড়িতে প্রথম হামলা হয়। হামলাকারীরা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে লুটপাট চালায়। এরপর হামলা হয় মণ্ডপে।

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রথমেই হামলা হয় স্থানীয় শীল পরিবারের বাড়িতে। ইট-পাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ৫০ হাজার টাকা ও পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার লুট হওয়ার অভিযোগ করেছেন ওই পরিবারের সদস্যরা। ভাঙচুর করা হয়েছে ঘরের আসবাব ও প্রতিমা। এ সময় গুরুতর আহত সুমন চন্দ্র শীল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

পরিবারের প্রবীণ সদস্য নিমাই চন্দ্র শীল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা কল্পনাও কইরতে পারি নাই এমন হামলা হইব। মণ্ডপে মাত্র দুইজন পুলিশ আছিলো। হেতারা হামলা দেখি দৌড়াই পলাই গেছে। আমার পোলারে পিডি দিয়া পুরা শরীর ফাডাই ফালাইছে। হেতে অহন হাসপাতালো আছে। ঘরের প্রতিমাও ভাঙ্গি শেষ করি হালাইছে।’

কারা হামলা করেছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বেগ্গুইন ১৮-১৯ বছরিয়া পোলাহাইন, দুই একটার মাথায় টুপি ও গায়ে পাইঞ্জাবি আছিলো। হেতেরা কে আমরা চিনিনো। শুধু আংগর ধর্মরে লই গালাগালি কইরতে কইরতে ভাঙচুর কইচ্চে।’

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের পর হামলা হয় চৌমুহনী পৌর এলাকায় ১১টি মণ্ডপে। বাদ যায়নি নোয়াখালীর প্রধান ইসকন মন্দিরও। ওই হামলার পর শনিবার সকালে ইসকন মন্দিরের পুকুরেই পাওয়া যায় প্রান্ত চন্দ্র দাস নামে এক ভক্তের মরদেহ। মন্দিরের আর তিনজন ভক্তও গুরুতর আহত হয়েছেন।

মন্দিরের ফটক দিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়ে ধ্বংসযজ্ঞ। অফিসকক্ষ, মন্দিরের বিপণিবিতান, বেকারি, খাবার হল, ভক্তদের আশ্রম, উপাসনালয় সবখানেই হামলার চিহ্ন। আগুন দেয়া হয়েছে ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল প্রভুপাদের ভাস্কর্যে। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে দুটি রথ ও ভক্তদের মোটরসাইকেল।

ভক্তরা দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় হামলা হয়। ঘটনার তিন দিন পরও ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খাবারের পাত্র দেখা গেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, মন্দিরের উঠানে সহিংসতার শিকার হন এক ভক্ত। প্রথমে তার চুল কেটে দেয়া হয়, পরে পিটিয়ে পা ভেঙে দেয়া এবং মাথা ফাটিয়ে দেয়া হয়। মন্দিরের উঠানে দেখা গেছে রক্তের দাগ, পাশেই পড়ে ছিল কেটে ফেলা চুলের টিকি।

মন্দিরের অধ্যক্ষ রসপ্রিয় দাস নিউজবাংলাকে আক্ষেপভরা কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা কোনো রাজনীতিতে নেই, আশপাশের সব ধর্মের ভাইদের নিয়ে মিলেমিশে থাকি, কারও সঙ্গে কোনো বিভেদ নেই। আমরা কোন দোষে এমন নৃশংস হামলার শিকার হলাম? আমাদের একটাই দাবি, প্রশাসন সুষ্ঠু তদন্ত করে এর বিচার করুক।’

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

ইসকন মন্দিরের আশপাশের আরও ১০টি মন্দির ও মণ্ডপের চিত্রও একই রকম। ভাঙচুর-লুটপাট, অগ্নিসংযোগ চলেছে চৌমুহনীর রাধামাধব জিউর মন্দির, শ্রীশ্রী লোকনাথ মন্দির, শ্রীশ্রী শিব মন্দির, রাম ঠাকুর সেবাশ্রম মন্দির, শ্রীশ্রী রক্ষাকালী মন্দির, চৌমুহনী দুর্গা মন্দির, চৌমুহনী ত্রিশূল মন্দির, চৌরাস্তা মহাশ্মশান মন্দির, নব দুর্গা মন্দির ও মহামায়া মন্দিরে।

সহিংসতা পরিকল্পিত

বেগমগঞ্জে মন্দিরে হামলার পাশাপাশি চলেছে লুটপাট। প্রতিটি জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুরের সময় লুট করা হয়েছে নগদ অর্থ ও প্রতিমা সাজানোর অলংকার। সব মন্দিরেই লোহার সিন্দুক ভাঙা দেখা গেছে।

মোবাইল ফোনে ধারণ করা বেশকিছু ভিডিওতে দেখা যায়, চৌমুহনী কলেজ রোড ধরে হাজারো মানুষ মিছিল নিয়ে মন্দিরগুলোর দিকে ছুটে যাচ্ছে। মিছিলে পাঞ্জাবি পরিহিতরা নেতৃত্ব দিলেও হামলা-লুটপাটে মূলত অংশ নিয়েছে শার্ট-প্যান্ট পরা কিশোর-যুবকেরা।

নোয়াখালী হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক বিনয় কিশোর রায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই হামলার পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই করা হয়েছে। কুমিল্লার ঘটনাকে পুঁজি করে আমাদের এখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতেই বিএনপি-জামায়াত-শিবির পরিকল্পনা করে হামলা করেছে।

‘তবে জামায়াত-বিএনপি-শিবিরের মাঝে আরও একটি পক্ষ ঢুকে গিয়েছিল লুটপাট করার জন্য। তারা শুধু টাকা আর স্বর্ণ চুরি করতেই হামলাকারীদের সঙ্গে মিশে গেছে। তারা হাতুড়ি, শাবল নিয়ে এসেছিল, যা দিয়ে বড় বড় লোহার সিন্দুক ভেঙেছে।’

নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন শাহীনও দাবি করছেন, এই সহিংসতা ‘জামায়াত-শিবিরের কাজ’।

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

এই দাবির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর এই বেগমগঞ্জের রাজগঞ্জে তাকে চাঁদে দেখার গুজব ছড়িয়ে একই কায়দায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর তাণ্ডব চালানো হয়েছিল। তাছাড়া এবারের হামলার অসংখ্য ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে বিএনপি-জামায়াতের চিহ্নিত কয়েকজন কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।’

বেগমগঞ্জে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় মোট ১৮টি মামলায় হয়েছে। এসব মামলার এজাহারনামীয় আসামি ২৮৫ জন, আর অজ্ঞাতনামা আসামি প্রায় পাঁচ হাজার। নোয়াখালীর পুলিশ সুপার (এসপি) শহীদুল ইসলাম সোমবার দুপুরে নিউজবাংলাকে জানান, এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৯০ জনকে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি-জামায়াত কর্মীর সংখ্যা কত সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি পুলিশ। এ বিষয়ে বেগমগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুজ্জামান সিকদার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আসামিদের মধ্যে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছে। তদন্তাধীন বিষয়ে এ নিয়ে বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই।’

বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে’ তাদের এবং জামায়াতকে এই হামলার সঙ্গে জড়ানো হচ্ছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এগুলো স্থানীয় আওয়ামী লীগের অপরাজনীতি ও কোন্দলের ফল। স্থানীয় মেয়র ও এমপির মাঝে দলীয় কোন্দল আছে। তাদের দুই পক্ষের ঝামেলার জন্য এমনটা হয়েছে। এখানে বিএনপি-জামায়াতের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

‘তাছাড়া দেশে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা ও দেশজুড়ে ভোগান্তি থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে আওয়ামী লীগই এই হামলা চালিয়েছে। দেশে কিছু হলেই তো সব দায় বিএনপির ওপর চাপিয়ে দেয় সরকার। তারা তো শুধু সুযোগ খোঁজে কখন বিএনপির নেতা-কর্মীদের মামলায় জড়িয়ে গ্রেপ্তার করা যায়। এখন এই ইস্যু তৈরি করে আমাদের কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে।’

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা ব্যর্থ

বেগমগঞ্জের ছয়ানী ইউনিয়নে বৃহস্পতিবার মন্দির ও হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলার পরপরই সতর্ক অবস্থান নেয়ার দাবি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। পরদিন শুক্রবার বিজয়া দশমীতে বিকেলে প্রতিমা বিসর্জনের কথা থাকলেও নোয়াখালীর পুলিশের পক্ষ থেকে শুক্রবার বেলা ১১টার মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন শেষ করার অনুরোধ জানায় প্রতিটি মণ্ডপ কর্তৃপক্ষকে।

শুক্রবার জুমার নামাজের পর সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই এ অনুরোধ করা হয়। সে অনুযায়ী, সব অস্থায়ী মণ্ডপের প্রতিমা শুক্রবার বেলা ১১টার মধ্যেই বিসর্জন হয়ে যায়। এই সময়ের পর যেসব স্থায়ী মণ্ডপ ও মন্দিরে প্রতিমা ছিল, সেগুলো বিসর্জনের কথা আগামী দুর্গা পূজার আগে।

হামলার শিকার মন্দিরসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব ধরনের নির্দেশনা মেনে চলার পরেও হামলার ঘটনায় প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ব্যর্থতা প্রমাণিত হয়েছে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কাছ থেকে সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তারা বলছেন, বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে সহিংসতা চললেও তা ঠেকাতে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এগিয়ে আসেনি।

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

নোয়াখালী হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক বিনয় কিশোর রায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কুমিল্লা, চাঁদপুরের পর বেগমগঞ্জের ছয়ানীতে হামলার পর আমরা পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাদের পরামর্শে আমরা বিকেলের পরিবর্তে সকালেই প্রতিমা বিসর্জন দিয়েছি। এরপরেও যখন হামলা হলো তখন আমরা পুলিশ ও এমপি সাহেবকে টেলিফোন করে সহযোগিতা চেয়েছি। তারা আসছেন আসছেন করে তিন ঘণ্টা পার হলো। এর মধ্যে আমাদের মন্দিরগুলোতে তিন দফা হামলা লুটপাট হলো। যখন সব শেষ তখন পুলিশ এসেছে। এটা জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বড় ধরনের ব্যর্থতা।’

এ অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নোয়াখালী ৩ আসনের সংসদ সদস্য মামুনুর রশীদ কিরনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি। তবে হামলা প্রতিহত করতে না পারাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে রাজি নন নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শিহাব উদ্দিন শাহীন।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা আসলে বুঝতে পারিনি এত বড় ঘটনা ঘটে যাবে। আগের দিন ছয়ানীতে মন্দিরে হামলার পরই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, পরদিন সকালেই প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হবে, যেন জুমার নামাজের পর মুসল্লিরা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ না পায়। সকালে ঠিকঠাক বিসর্জন হয়ে যাওয়ার পর আমরা সবাই মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম- আর কোনো অঘটন ঘটবে না। হঠাৎই শুনি হামলার ঘটনা। এটা আমাদের জন্য বড় একটা শিক্ষা হয়েছে।’

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

মন্দিরে হামলার সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের এগিয়ে না আসার অভিযোগ অস্বীকার করে শাহীন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা খবর পেয়েও আসেননি এ কথা ভুল। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের যারাই কাছাকাছি ছিলেন ছুটে গিয়েছিলেন। এমনকি স্থানীয় এমপির ছেলে নিজে সেখানে ছুটে গিয়েছিল, কিন্তু তারা সংখ্যায় কম ছিল বলে উল্টো হামলার শিকার হয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।’

চৌমুহনীর প্রতিটি মন্দিরে দুইজন করে পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। হামলা শুরু হলে তারা পালিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার শহীদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ব্যস্ততার কথা বলে তিনি এড়িয়ে যান।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সকালে প্রতিমা বিসর্জন হয়ে যাওয়ায় আর হামলা হতে পারে বলে আমাদের মনে হয়নি। তাছাড়া পুলিশে লোকবল সংকট রয়েছে।

‘হামলা শুরুর খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম, টিয়ার শেলও ছোড়া হয়েছে কয়েক রাউন্ড, কিন্তু ওইসব সামাল দিতে গুলি চালাতে হতো। তখন এতটাই টাফ সিচুয়েশন ছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় পুলিশও ছিল নিরুপায়।’

আরও পড়ুন:
‘আমরা কোথাও যাব না, পালাব না’
পীরগঞ্জের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৪৫
বিচারের দাবি নিয়ে একাই দাঁড়ালেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
সহিংসতা: কুমিল্লায় ৮ মামলায় ৩ কাউন্সিলরসহ ১০৫৫ আসামি
প্রধানমন্ত্রীর আসন বেছেই পীরগঞ্জে হামলা: তথ্যমন্ত্রী

শেয়ার করুন

মন্তব্য

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খাতা মূল্যায়নে ‘একগুচ্ছ’ ভুল

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খাতা মূল্যায়নে ‘একগুচ্ছ’ ভুল

সাতটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে ভুলের অভিযোগ উঠেছে। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা

সাতটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষার ১০০টি প্রশ্নের মধ্যে অন্তত ৯টিতে ভুল উত্তরকে সঠিক ধরে নিয়ে নম্বর দেয়া হয়েছে। ফলে সঠিক উত্তর দিয়েও বাদ পড়েছেন অনেকে। এ কারণে খাতা পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন করে ফল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন পরীক্ষার্থীরা।

দেশের সাতটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে বড় ধরনের ভুল হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন পরীক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, বেশ কয়েকটি প্রশ্ন ভুল উত্তরের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার কারণে মেধাতালিকা থেকে বাদ পড়েছেন অনেকে।

পরীক্ষা আয়োজনের দায়িত্বে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও ভুল স্বীকার করেছে। তবে তারা বলছে, হাতে গোনা কিছু প্রশ্ন মূল্যায়নে ভুল হয়েছে। এগুলো সংশোধন করে শিগগিরই নতুন করে ফল প্রকাশ হবে।

সাতটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা হয় গত ২৭ নভেম্বর। এদিন সাতটি কেন্দ্রে ৩ হাজার ৪১৯টি আসনের বিপরীতে ৩৪ হাজার ৮৪৬ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেন।

এই পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয় ১ ডিসেম্বর। তবে প্রকাশিত ফল নিয়ে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ। তাদের অভিযোগ, ১০০টি প্রশ্নের মধ্যে অন্তত ৯টি প্রশ্নের ভুল উত্তরকে সঠিক ধরে নিয়ে নম্বর দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ফলে সঠিক উত্তর দিয়েও মেধাতালিকা থেকে বাদ পড়েছেন অনেকে। এ কারণে খাতা পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন করে ফল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন পরীক্ষার্থীরা।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খাতা মূল্যায়নে ‘একগুচ্ছ’ ভুল
গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

যেসব প্রশ্নের উত্তরে ভুল

সাতটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুচ্ছ পরীক্ষায় ইংরেজিতে ১০, প্রাণিবিজ্ঞানে ১৫, উদ্ভিদবিজ্ঞানে ১৫, পদার্থবিজ্ঞানে ২০, রসায়নে ২০ এবং গণিতে ২০ নম্বরের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে পরীক্ষার্থীদের।

প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য ০.২৫ নম্বর কাটার বিধান ছিল। মেধাতালিকায় থাকতে পরীক্ষার্থীকে সর্বনিম্ন ৫২ নম্বর পেতে হবে।

এই পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয় ১ ডিসেম্বর। এতে অনেকে কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে খাতা চ্যালেঞ্জ করেন। এক হাজার টাকা ফি জমা দিয়ে অনেক শিক্ষার্থী উত্তরপত্র যাচাইও করেছেন। আর তখন ভুল উত্তরে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের বিষয়টি বেরিয়ে আসে।

খাতা যাচাই করে অন্তত ৯টি প্রশ্নের উত্তরে ভুল পাওয়ার দাবি করছেন শিক্ষার্থীরা। এই ৯টি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়েও শিক্ষার্থীরা কোনো নম্বর পাননি, উল্টো প্রতিটি উত্তরের জন্য নেগেটিভ মার্কিং করা হয়েছে। অন্তত ২৫ শিক্ষার্থী এ বিষয়টি জানিয়েছেন নিউজবাংলাকে।

এ ঘটনার অনুসন্ধানে জানা গেছে, একজন পরীক্ষার্থী ৩ ডিসেম্বর নিজের উত্তরপত্র যাচাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি সেকশনে যান। তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারে সংরক্ষিত স্ক্যান করা উত্তরপত্র দেখতে দেয়া হয়, এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত উত্তরের নমুনাও দেখানো হয়।

ওই পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরপত্রের নমুনা সংগ্রহ করেছে নিউজবাংলা। এ ছাড়া ২৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত পরীক্ষার একটি প্রশ্নও সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো যাচাই করে দেখা যায় অন্তত ৯টি প্রশ্নের ভুল উত্তরকে সঠিক বলে চিহ্নিত করে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

পরীক্ষায় ১০০টি প্রশ্ন দুই সেটের প্রশ্নপত্রে আলাদা ধারাবাহিকতায় সাজানো হয়েছে। এর মধ্যে A সেট-এর প্রশ্নপত্রের ২ নম্বর প্রশ্নটি ছিল, ‘How can you do this?’ Make it passive.

উত্তরের অপশন ছিল, (A) How could this done by you? (B) How can this has done by you? (C) How can this be done by you? (D) How this can be done by you?

এর মধ্যে (D) কে উত্তর হিসেবে মূল্যায়ন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে এর সঠিক উত্তর হবে (C)।

৯ নম্বর প্রশ্নটি ছিল, Which of the following is phrasal verb- ‘to submit a document’?

উত্তরের অপশন ছিল, (A) hand in. (B) Put in. (C) Bring in. (D) Set in.

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়নে উত্তর (D) হলেও শিক্ষার্থীদের দাবি সঠিক উত্তর হবে (A)।

১৭ নম্বর প্রশ্নে বলা হয়, বাংলাদেশের পানিতে আর্সেনিকের সহনীয় মাত্রা কত?

উত্তরের অপশনে দেয়া হয়, (A) 0.01 mg\L. (B) 0.05 mg\L. (C) 1.00 mg\L. (D) 1.50 mg\L.

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়নে উত্তর (A) হলেও সঠিক উত্তর হবে অপশন (B)।

১৮ নম্বর প্রশ্ন ছিল, বর্ষবলয় উৎপন্ন হয় কোন কারণে?

উত্তরের অপশনে দেয়া হয়, (A) উদ্ভিদের গৌণ বৃদ্ধির জন্য (B) কর্ক ক্যাম্বিয়ার সৃষ্টির জন্য (C) ল্যান্টিসেল তৈরির জন্য (D) কর্টেক্স বৃদ্ধির জন্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়নে উত্তরের অপশন (B)। তবে রাজধানীর নটর ডেম কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক নাজমুল হাসান নিউজবাংলাকে বলেন, এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর হবে অপশন (A)।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খাতা মূল্যায়নে ‘একগুচ্ছ’ ভুল
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বেশ কয়েকটি প্রশ্ন ভুল উত্তরের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে

১৯ নম্বর প্রশ্নটি ছিল, কোনটি নিউক্লিয়াসবিহীন জীবিত কোষ?

উত্তরের অপশনে দেয়া হয়, (A) সঙ্গী কোষ (B) সীভ কোষ (C) ফ্লোয়েম প্যারেনকাইমা (D) জাইলেম প্যারেনকাইমা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়নে উত্তর (A) ধরা হলেও নাজমুল হাসান বলছেন, সঠিক উত্তরটি হবে (B)।

৫৩ নম্বর প্রশ্ন ছিল, দুটি বলের লব্ধির মান 40N। বল দুটির মধ্যে ছোট বলটির মান 30N এবং এটি লব্ধি বলের লম্ব বরাবর ক্রিয়া করে। বড় বলটির মান কত?

উত্তরের অপশনে দেয়া হয়, (A) 40 N. (B) 45 N. (C) 50 N. (D) 60 N.

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়নে উত্তর (D) ধরা হলেও সঠিক উত্তর হবে অপশন (C)।

৬৯ নম্বর প্রশ্ন ছিল, sinx+cosx = 2 হলে sinnX+cosecnX এর মান কত?

উত্তরের অপশনে দেয়া হয়, (A) -2 (B) -1 (C)1 (D) 2.

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়নে উত্তর (D) ধরা হলেও সঠিক উত্তর চারটি অপশনের কোনোটিই নয়।

৭৮ নম্বর প্রশ্নে বলা হয়, যদি tan -12 + tan -13 + tan -14= θ হয়, তবে tanθ =?

উত্তরের অপশনে দেয়া হয়, (A)9 (B)7/2 (C)3/5 (D)4/5

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়নে এর উত্তর (B) ধরা হলেও সঠিক উত্তরটি অপশন (C)।

৭৯ নম্বর প্রশ্নে বলা হয়, 10, 8, 11, 9, 12, 29, 27 সংখ্যাগুলোর ভেদাঙ্ক কত?

উত্তরের অপশনে দেয়া হয়, (A) 10 (B) 2 (C) √2 (D)√10

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়নে উত্তর (B) ধরা হলেও সঠিক উত্তর এর কোনোটিই নয়।

ওএমআর মেশিনের মাধ্যমে সব খাতা মূল্যায়ন করা হয়েছে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারণ করে দেয়া ১০টি ভুল উত্তরকে মেশিন সঠিক ধরে নিয়েছে। এর ফলে ওই ১০টি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়েও নেগেটিভ নম্বর পেয়েছেন অনেকে। আবার অনেকে ভুল উত্তর দিয়েও নম্বর পেয়েছেন।

এভাবে ভুল মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রকাশিত ফলে মেধাতালিকায় ৩১০০ জনকে এবং ওয়েটিং লিস্টে ৩১০০ জনকে রাখা হয়েছে।

পরীক্ষার্থী মির্জা দিদারুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার প্রাপ্ত নম্বর দেখা যায় ৪৬, কিন্তু আমার হিসাবে নম্বর আসার কথা ৫৪। আর সর্বনিম্ন ৫২ নম্বর পর্যন্ত পাওয়া শিক্ষার্থীদের মেধাতালিকায় রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ভুল না করলে আমিও মেধাতালিকায় থাকতে পারতাম।’

আরেক পরীক্ষার্থী তালহা জুবায়ের বলেন, ‘আমি আর আমার এক বন্ধু একসঙ্গে পরীক্ষা দিয়েছি। নিজেরা হিসাব করে দেখেছিলাম আমার ৫৮ আসার কথা, আর আমার বন্ধুর আসে ৪৯। তবে ফল প্রকাশের পর হলো উল্টো। আমার বন্ধুর নাম এলো কিন্তু আমার এলো না।’

এই পরীক্ষায় খাতা বাতিল এবং পরীক্ষায় অনুপস্থিত হিসেবে ১২০ জনের তালিকা দেখিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়টি নিয়েও আছে অভিযোগ।

পরীক্ষার্থী মনিরুজ্জামান মমিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছিল। তবে খাতা বাতিল হওয়া পরীক্ষার্থীদের তালিকায় আমার নাম এসেছে। পরে খাতা যাচাই করে দেখি আমার রোল নম্বরের একটি সংখ্যার বৃত্ত সামান্য ভরাট হয়নি। এতেই খাতা বাতিল করা হয়েছে।’

রংপুরের পরীক্ষার্থী ফারিয়া আলম নিউজবাংলাকে জানান, তিনি গাজীপুরে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিলেও ফলাফলে অনুপস্থিত দেখানো হয়েছে। আক্ষেপ করে ফারিয়া বলেন, ‘মাকে নিয়ে এত কষ্ট করে পরীক্ষা দিয়ে এলাম, কিন্তু দেখা যাচ্ছে আমি অনুপস্থিত। এটা কীভাবে সম্ভব!’

এসব অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. গিয়াস উদ্দীন মিয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পরীক্ষায় দুই-একটা প্রশ্নে একটু সমস্যা হয়েছে। আমরা সেটা নিয়ে কাজ করছি, দুই-এক দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। আমরা খাতাগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন করে রেজাল্ট দিয়ে দেব।’

অন্তত ৯টি প্রশ্ন ভুল উত্তরের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার অভিযোগ তুলে ধরলে তিনি বলেন, ‘এতগুলো হবে না, তিন-চারটা প্রশ্নের ক্ষেত্রে এমনটা হতে পারে। এটা যেহেতু সমাধান হয়ে যাচ্ছে তাই আর কোনো জটিলতা হবে না।’

তিনি দাবি করেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ওএমআর শিটের উত্তরপত্রের বৃত্ত ভরাট করতে গিয়ে হয়তো কারও ভুল হয়েছে। সেটা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।’

১২০ জনের খাতা বাতিল ও অনুপস্থিত দেখানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা তাদের বৃত্ত ভরাটের সময় রোল নম্বর, মোবাইল নম্বর, পিন নম্বর সবই ভুল করেছিল। তাই খাতা বাতিল করা হয়েছে।’

আরও পড়ুন:
‘আমরা কোথাও যাব না, পালাব না’
পীরগঞ্জের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৪৫
বিচারের দাবি নিয়ে একাই দাঁড়ালেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
সহিংসতা: কুমিল্লায় ৮ মামলায় ৩ কাউন্সিলরসহ ১০৫৫ আসামি
প্রধানমন্ত্রীর আসন বেছেই পীরগঞ্জে হামলা: তথ্যমন্ত্রী

শেয়ার করুন

সেই জেব্রা ক্রসিংয়ের মালিকানা কার

সেই জেব্রা ক্রসিংয়ের মালিকানা কার

জেব্রা ক্রসিং দেখা গেলেও রাস্তা পার হওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। ছবি: নিউজবাংলা

আশরাফুল ইসলাম নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী বলেন, ‘এখানে ক্রসিং দিয়ে চালকদের ধোঁকা দেয়া হয়েছে। কারণ এই চিহ্ন দেখলে যানবাহনের গতি কমিয়ে দেয়ার কথা। তবে রাস্তা পার হওয়ার তো ব্যবস্থা নেই। আমার মনে হয়, এটির কোনো প্রয়োজনই নেই। আবার যদি ক্রসিং দেয়াই হলো, তবে সেখানে পকেট গেট কেন রাখা হলো না।’

রাজশাহীর রেলস্টেশন থেকে ভদ্রা মোড় পর্যন্ত রাস্তায় আছে বেশ কয়েকটি জেব্রা ক্রসিং। কিছুদূর পরপর রাস্তা পার হতে রাখা হয়েছে পকেট গেট।

ছোট এসব গেট জেব্রা ক্রসিংয়ের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে শুভ পেট্রল পাম্পের পাশে একটি জেব্রা ক্রসিং দেখা গেলেও রাস্তা পার হওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। বিভাজক অংশে লোহার পাত, রড বসানো হয়েছে। মাঝখানে লাগানো হয়েছে গাছ। সম্প্রতি এই ক্রসিংয়ের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

রাজশাহী সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, কীভাবে এই জেব্রা ক্রসিংটি এলো সেটি তাদের অজানা।

সরেজমিন দেখা গেছে, জেব্রা ক্রসিংয়ের এক পাশে কোনো স্থাপনা নেই। অন্য পাশে রয়েছে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগ। রাস্তায় সাদা প্রলেপ দেয়া জায়গাটি থেকে এক পাশে প্রায় ২০ গজ দূরে আছে ছোট পকেট গেট। আরেক পাশে প্রায় ৫০ গজ দূরে আছে ইউটার্ন নেয়ার মতো রাস্তা। এ অবস্থায় সেখানে এই জেব্রা ক্রসিংয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আশরাফুল ইসলাম নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী বলেন, ‘এখানে ক্রসিং দিয়ে চালকদের ধোঁকা দেয়া হয়েছে। কারণ এই চিহ্ন দেখলে যানবাহনের গতি কমিয়ে দেয়ার কথা। তবে রাস্তা পার হওয়ার তো ব্যবস্থা নেই। আমার মনে হয়, এটির কোনো প্রয়োজনই নেই। আবার যদি ক্রসিং দেয়াই হলো, তবে সেখানে পকেট গেট কেন রাখা হলো না।’

পথচারী ষাটোর্ধ্ব আবুল কাশেমকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রথমে তিনি হাসতে শুরু করেন। তিনি বলেন, এই পথ দিয়ে তিনি মাঝেমধ্যে যাওয়া-আসা করেন। তবে এভাবে তার নজরে আসেনি। এটি বড় কোনো ঘটনা না হলেও একটা ভুল। কর্তৃপক্ষের এটি নজরে নেয়া বা ভাবনা থাকা উচিত ছিল।’

৫০ সেকেন্ডের ওই ভিডিওটি শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে নিজের ফ্যান পেজে পোস্ট করেন মাহফুজ আরেফিন নামে এক কৌতুকশিল্পী। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ভিডিওটি দেখা হয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার বার। এতে ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দিয়েছেন প্রায় তিন হাজার মানুষ।

রহমান শিশির নামে একজন কমেন্টে লিখেছেন, ‘হাইজাম্প শেখার প্রয়োজনীয়তা থেকেই যে এটা করা হয়েছে তা কে বোঝাবে!’

মেরাজ মুহাম্মদ মেসবাহ নামে একজন লিখেছেন, ‘কাজলা এবং মেইন গেটে স্পিড ব্রেকারের ওপর দিয়ে জেব্রা ক্রসিং দেয়া। মানে কী বলব বুঝতে পারছি না।’

নবিউল ইসলাম নামে একজন লিখেছেন, ‘মুরগি দিয়ে হাল চাষ করলে এমনই হয়।’

পোস্টদাতা কৌতুকশিল্পী মাহফুজ আরেফিন বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের কমেডি রিয়েলিটি শো ‘হা-শোর’ সিজন পাঁচে অংশ নিয়েছিলেন।

সেই জেব্রা ক্রসিংয়ের মালিকানা কার


নিউজবাংলাকে মাহফুজ আরেফিন বলেন, ‘আমি ওই রাস্তা দিয়েই নিয়মিত যাওয়া-আসা করতাম। দেখতাম জেব্রা ক্রসিং দিয়ে কেউ পার হচ্ছে না। সেখান থেকে ১০-১২ হাত দূর দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। সেটি দেখতে গিয়ে দেখি জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। সেখান থেকে ১০-১২ হাত দূরে পকেট গেট আছে।

‘আমার মনে হয়, সেখানে লোহার রড দিয়ে যে ডিভাইডার দেয়া হয়েছে, ভুলটা সেখানেই হয়েছে। যে গেটটি ১০ হাত দূরে করেছে, সেটি ক্রসিং চিহ্নর সামনে করলে এটা নিয়ে কথা উঠত না।’

ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি নজরে এসেছে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগেরও। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নূর ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ক্রসিংয়ের বিষয়টি আমাদেরও নজরে এসেছে। এটি সিটি করপোরেশনের দেয়া জেব্রা ক্রসিং কিনা এটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যতটুকু মনে হচ্ছে, এটি আমাদের করা নয়। এটি কে করেছে, কখন করেছে, কেন করেছে এসব আমরা খতিয়ে দেখছি।’

যে কেউ যে কোনো স্থানে ইচ্ছে হলেই জেব্রা ক্রসিং দিতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ জন্য প্রশাসন রয়েছে। এসব দেয়ার ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে আলোচনা হয়। তারপর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা জানার চেষ্টা করছি আদৌ সেখানে কোনো ক্রসিং দরকার আছে কি না। যদি থাকে তবে পকেট গেট করে দেব। আর না থাকলে ক্রসিং মুছে দেয়ার ব্যবস্থা করব।’

আরও পড়ুন:
‘আমরা কোথাও যাব না, পালাব না’
পীরগঞ্জের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৪৫
বিচারের দাবি নিয়ে একাই দাঁড়ালেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
সহিংসতা: কুমিল্লায় ৮ মামলায় ৩ কাউন্সিলরসহ ১০৫৫ আসামি
প্রধানমন্ত্রীর আসন বেছেই পীরগঞ্জে হামলা: তথ্যমন্ত্রী

শেয়ার করুন

প্রকল্পের মেয়াদের চেয়ে পরামর্শকের মেয়াদ বেশি

প্রকল্পের মেয়াদের চেয়ে পরামর্শকের মেয়াদ বেশি

বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত রেল প্রকল্পে বাড়তি আড়াই বছরের জন্য পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। ছবি: সংগৃহীত

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ সরাসরি রেলপথ নির্মাণ হলে ঢাকার সঙ্গে বগুড়ার রেলপথের দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারের বেশি কমে যাবে। এ-সংক্রান্ত প্রকল্পটি শেষ হয়ে যাবে আর দুই বছরের মধ্যে। তবে যে পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাদের মেয়াদ থাকবে বাড়তি আড়াই বছর। এটিকে নিয়মের ব্যত্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ৮৬ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। তবে তিন বছরে এ প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি বলতে সামান্যই। এতে পরামর্শক নিয়োগ হয়েছে মাত্র কিছু দিন আগে।

প্রকল্পের মেয়াদ আর দুই বছরের কম থাকলেও মেয়াদের পরও বাড়তি আড়াই বছরের জন্য পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়, যা উন্নয়ন শৃঙ্খলার পরিপন্থি বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

রেলপথ মন্ত্রণালয় জানায়, বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জে শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত নতুন ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটিতে ব্যয় হবে ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এতে ভারতীয় ঋণ পাওয়া যাবে ৩ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। বাকি ২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা জোগান দেবে বাংলাদেশ সরকার। ২০১৮ সালের জুলাইতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পাওয়া এ প্রকল্পের কাজ হয়েছে মাত্র ১৩ শতাংশের মতো।

প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে আর মাত্র দেড় বছরের কিছু বেশি, ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। তবে গত সেপ্টেম্বরে এ প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। দেড় বছর মেয়াদ থাকলেও পরামর্শক নিয়োগ পেয়েছে ২০২৫ সাল পর্যন্ত।

দুই ভাগে এ কাজ করবে ভারতের দুটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রাইটস লিমিটেড ও আরভি অ্যাসোসিয়েটস আর্কিটেক্টস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনসালট্যান্ট প্রাইভেট লিমিটেড।

প্রথম ধাপে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হালনাগাদ করা, বিস্তারিত নকশা তৈরির জন্য প্রতিষ্ঠান দুটিকে সময় দেয়া হয়েছে ১৩ মাস। দ্বিতীয় ধাপে ৩০ মাসের জন্য নির্মাণকাজ তদারক করবে প্রতিষ্ঠান দুটি। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিবেদন জমা দিলে রেললাইন নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করাসহ অন্যান্য কাজ শুরু হবে।

চুক্তি হয়েছে গত ২৭ সেপ্টেম্বর। চুক্তিমূল্য ৯৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ের জন্য পরামর্শকের সঙ্গে চুক্তি করার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ ক্ষেত্রে কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে তা করা যেতে পারে। তবে সে রকম নজির নেই বললেই চলে।

প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লেও তা কত সময়ের জন্য বাড়বে তাও আগে থেকে বলা যায় না। এ ক্ষেত্রে আগে থেকে নিশ্চয়তার কোনো সুযোগ নেই। প্রকল্প সংশোধনের পরই কেবল বাড়তি মেয়াদের জন্য পরামর্শক নিয়োগ পেতে পারে। ঠিকাদার নিয়োগ বা পণ্য কেনার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এমনটি করা হলে তা অবশ্যই উন্নয়ন প্রকল্পের শৃঙ্খলার ব্যত্যয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মামুন-আল-রশীদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কোনো প্রকল্পেই মেয়াদের পর বাড়তি সময়ে কোনো কাজ করার সুযোগ নেই। কারণ প্রকল্পের যেখানে মেয়াদই নেই, সেখানে পরামর্শক নিয়োগ পাবে কীভাবে? পরামর্শকের ফি-ই বা আসবে কোথা থেকে? এ ক্ষেত্রে হয়তো মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য প্রস্তাব পাঠানোর কথা। প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে মেয়াদ বাড়লেই সেই মেয়াদের জন্য পরামর্শক বা অন্য কোনো পক্ষের চুক্তি করা যাবে।

‘অথবা বিশেষ বিবেচনায় পরিকল্পনা কমিশনের সম্মতি নিয়ে মেয়াদ পরে বাড়তে পারে এমন কারণ দেখিয়ে সম্মতিপত্র চাইলে তা বিবেচনায় নেয়া হয়। কিন্তু রেলের কোনো প্রকল্পের বিষয়ে এমন কোনো চিঠি আসেনি।’

মেয়াদের পরও পরামর্শক নিয়োগ বিষয়ে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. কামরুল আহসান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রকল্পটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ, জটিলতা কাটিয়ে এটির কাজ আবার শুরু হচ্ছে। মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে থাকলেও প্রকল্পটি সংশোধন করা হবে, এ জন্য বাড়তি সময়ের জন্য পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই সংশোধনী প্রস্তাব পাঠানো হবে।’

প্রকল্প পরিচালক আবু জাফর মিয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ জুন পর্যন্ত, তবে আমাদের কনসালট্যান্ট নিয়োগের মেয়াদ ২০২৫ পর্যন্ত। এ প্রকল্প রিভাইজ করতে হবে। তাই পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’

প্রকল্পের মেয়াদ কম কিন্তু পরামর্শক নিয়োগ বেশি সময়ের জন্য, এটা আইন মেনে হয়েছে কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘এখন কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তারা স্টাডি করবে। তারপর কাজ শুরু হবে। তবে করোনার কারণে কাজে অনেক বিলম্ব হয়েছে। তা ছাড়া কনসালট্যান্ট প্রথম ১৩ মাস ডিটেইল ডিজাইন করবে। তারপর ৩০ মাস সুপারভিশন করবে।’

প্রকল্পের মেয়াদসংক্রান্ত কোনো সংশোধনী প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে কি না প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এখনও প্রস্তাব পাঠানো হয়নি। এখনই পাঠাব না। আগে ডিটেইল স্টাডি হবে, তার উপর ভিত্তি করে যদি ব্যয় কম বা বেশি প্রাক্কলন করা হয়, তার ভিত্তিতে সংশোধনী প্রস্তাব পাঠানো হবে। আসলে বাংলাদেশে তো অনেক প্রকল্প পাস হয়, কিন্তু একদম ডিউ টাইমে তো আর কোনো প্রজেক্ট শেষ হয় না। এ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়বেই।’

তিন বছরে কাজ শুরু হয়নি কেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘গত তিন বছরে টেন্ডারিং হলো, কনসালট্যান্ট নিয়োগ হয়েছে, এটা তো প্রকল্পের কাজ।’

কী থাকবে প্রকল্পে

রেলপথ মন্ত্রণালয় বলছে, বর্তমানে ঢাকা থেকে রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে ট্রেন যায় পাবনার ঈশ্বরদী ঘুরে বগুড়ার সান্তাহার হয়ে। এ কারণে শত কিলোমিটার বাড়তি পথ পাড়ি দিতে হয় উত্তরের যাত্রীদের। রেলের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা থেকে বগুড়ার বর্তমান দূরত্ব ৩২৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে কাহালু সান্তাহার-আব্দুলপুর-ঈশ্বরদী বাইপাস-জামতৈল-শহীদ এম মনসুর আলী (বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়) রুটই প্রায় ১৮৭ কিমি দীর্ঘ।

তাই ঢাকা থেকে সরাসরি বগুড়ার রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ বহুদিনের। ২০০৫ সালে এই রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে তখন প্রাক-সমীক্ষাও হয়েছিল। কিন্তু অর্থায়ন না হওয়ায় প্রকল্পটি এগোয়নি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের নভেম্বরে বগুড়া সফরে গিয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে বগুড়া হয়ে রংপুর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের নির্দেশ দেন। ২০১৭ সালে ভারতের তৃতীয় লাইন অফ ক্রেডিটের (এলওসি) ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়।

এতে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন থেকে বগুড়া রায়পুর-রায়গঞ্জ-শেরপুর-রানিরহাট রুটে সরাসরি রেল সংযোগ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বগুড়া স্টেশন থেকে শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশনের মধ্যকার রুটের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। এ ছাড়া রানিরহাট স্টেশন থেকে কাহালু স্টেশনের মধ্যে রুটে ১১ দশমিক ৫ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ হবে। এ জন্য ৯৬০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে।

বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের মধ্যে সরাসরি এ রেল যোগাযোগের ফলে প্রায় ১১২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পথ এবং প্রায় তিন ঘণ্টা ভ্রমণের সময় কমবে। নতুন রেলপথ নির্মাণ হলে ঢাকা-বগুড়ার দূরত্ব কমে হবে ২১২ কিলোমিটার। এ রুটের মাধ্যমে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকাসহ অন্যান্য এলাকার সরাসরি রেল যোগাযোগ নিশ্চিত হবে।

আরও পড়ুন:
‘আমরা কোথাও যাব না, পালাব না’
পীরগঞ্জের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৪৫
বিচারের দাবি নিয়ে একাই দাঁড়ালেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
সহিংসতা: কুমিল্লায় ৮ মামলায় ৩ কাউন্সিলরসহ ১০৫৫ আসামি
প্রধানমন্ত্রীর আসন বেছেই পীরগঞ্জে হামলা: তথ্যমন্ত্রী

শেয়ার করুন

মেয়র আব্বাসের উত্থান যেভাবে

মেয়র আব্বাসের উত্থান যেভাবে

রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলী। ছবি: সংগৃহীত

আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা জানান, ২০০২ সালের পর আব্বাস আলী যুবলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ওঠাবসা শুরু করেন। এর তিন বছরের মাথায় তিনি মহানগর যুবলীগের সহসভাপতি পদ পেয়ে যান। এর পর থেকে তিনি রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে থাকেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তিনি উপরে উঠে আসেন।

বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল বসানোয় আপত্তি তোলা রাজশাহীর কাটাখালীর নৌকার মেয়র আব্বাস আলীকে দলে অনুপ্রবেশকারী বলেছেন মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা। তার রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের ভূমিকা আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশে আব্বাসকে নৌকা প্রতীক দিতে সুপারিশ করেছিলেন তারা।

বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ইস্যু নিয়ে সমালোচনা শুরু হওয়ার পর ওই সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিন এখন আব্বাসের শাস্তি দাবি করছেন। আর আব্বাস বলছেন, তিনি বিপদে পড়েছেন, এ জন্য তাকে ঘিরে অপপ্রচার চলছে। তিনি দলে সব সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতিই করেছেন।

আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ২০০২ সালের পর আব্বাস আলী যুবলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ওঠাবসা শুরু করেন। এর তিন বছরের মাথায় তিনি মহানগর যুবলীগের সহসভাপতি পদ পেয়ে যান। এর পর থেকে তিনি রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে থাকেন। দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বিরোধে। এরই জেরে ২০০৭ সালে তিনি যুবলীগের সহসভাপতি পদ থেকে বহিষ্কৃত হন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মেরাজউদ্দিন মোল্লা। আব্বাস তার সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করেন এবং কাটাখালী এলাকায় নিজের আধিপত্য পাকাপোক্ত করেন। গড়ে তোলেন নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী। পশুর হাটের ইজারাসহ শ্যামপুর বালু মহাল দখলের অভিযোগ ওঠে তার বিরদ্ধে।

২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান আয়েন উদ্দিন। তখন মেরাজ উদ্দিন মোল্লা হন বিদ্রোহী প্রার্থী। নৌকার প্রার্থী আয়েন উদ্দিনের বিপক্ষে মাঠে ছিলেন আব্বাস ও তার সমর্থকরা। নির্বাচনের সময় বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়ায় আব্বাস বাহিনী।

নির্বাচনে আয়েন উদ্দিন বিজয়ী হলে আব্বাস আবার তার অবস্থান পাল্টান। এমপি আয়েনও তাকে কাছে টেনে নেন নিজের অবস্থান শক্ত করার আশায়। ফলে এমপি বদল হলেও আব্বাসের আধিপত্য থেকেই যায়। এর সুবাদে দলে কোনো পদে না থাকলেও ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর কাটাখালী পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে যান আব্বাস আলী। মেয়র হওয়ার পর তার প্রতাপ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয় আব্বাসের। এই সময়ে তার বেপরোয়া আচরণে ক্ষুব্ধ হলেও ত্যাগী নেতা-কর্মীরা হয়ে যান নিরুপায়।

মেয়র নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পর ২০১৮ সালে কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটি (আহ্বায়ক কমিটি) দেয়া হয়। এই কমিটির আহ্বায়ক হন আব্বাস।

২০২০ সালের পৌরসভা নির্বাচনে একটি বড় অংশ তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। মেয়র আব্বাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। কিন্তু সুবিধা করতে পারেননি তারা। সেবারও আওয়ামী লীগের টিকিট পান মেয়র আব্বাস। দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হয়ে আব্বাস হয়ে যান লাগামহীন। নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও তিনি থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

পৌরসভা ভবনে শুক্রবার প্রতিবাদ সভায় কাউন্সিলররা মেয়র আব্বাসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন। ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মঞ্জুর রহমান বলেন, ‘রাজস্ব আদায় বাবদ পৌরসভার ফান্ডে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা ছিল। অথচ এখন চা খাওয়ার টাকাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ করে পৌর ফান্ডের টাকা গায়েব হয়ে গেছে। বিষয়টি আমি দ্রুত তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘করোনাকালীন অনুদান দেয়ার জন্য কাটাখালী বাজারের কাপড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৮০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করেন মেয়র আব্বাস। কিন্তু সে টাকা কাউকে দেয়া হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।

‘কারোনাকালে চা দোকানদারদের অনুদান দেয়ার নামে কয়েক লাখ টাকা পৌরসভার ফান্ড থেকে হাতিয়ে নেন মেয়র। কিন্তু কোনো চায়ের দোকানদার করোনাকালে অনুদান পাননি।’

৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল মজিদ জানান, পৌরসভার কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৩৬ মাসের বেতন-ভাতা বকেয়া আছে। ফান্ডে টাকা থাকার পরও মেয়র আব্বাস এই বেতন-ভাতা দেননি। তিনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জোর করে বিভিন্ন কাগজে সই করতে বাধ্য করেন। কেউ সই না করলে তাকে চাকরিচ্যুতিসহ নানা হুমকি দেন।

তিনি বলেন, ‘প্রতিবাদ করলে কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গালিগালাজ করতেন মেয়র। আত্মীয়-স্বজনদের নামে ঠিকাদারী লাইসেন্স করে নগর অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ মেয়র নিজে করতেন। আত্মীয়-স্বজনদের নামে হাট-ঘাট ও যানবাহনের টোল আদায়ের ইজারা নিয়েছেন। এসব টোল আদায়ের নামে নিজের লোকজন দিয়ে চাঁদাবাজি করেন।’

পবা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন বলেন, ‘মেয়র ভোটের পর থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের কারও সঙ্গে চলেন না। তার সঙ্গে থাকেন বিএনপি নেতারা। কৃষি প্রণোদনাও পায় বিএনপি নেতারা। তার আপন ভাই বিএনপি করে। অন্য এক পক্ষের ভাই করে জাতীয় পার্টি।’

কাঁটাখালি পৌরসভার যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক জনি ইসলাম বলেন, ‘মেয়র বিভিন্ন জায়গা দখল করেছেন। স্কুলের জমি দখল করে তার বাড়ি যাওয়ার রাস্তা তৈরি করছেন। জমি দখল করে তার বাবার নামে স্কুল করেছেন। পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার দোকানদারদের হয়রানি করে চাঁদাবজি করেছেন। সরকারি খাল দখল করে মার্কেট নির্মাণ করেছেন।’

মেয়র আব্বাসের উত্থান যেভাবে
শুক্রবার ফেসবুক লাইভে এসে কাঁদেন রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলী

কাটাখালি পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোত্তালেব বলেন, ‘মেয়রের অপকর্মের শেষ নেই। একেবারে জিরো থেকে হিরো। প্রথম মেয়র হওয়ার সময় তেমন টাকা ছিল না, অথচ এখন এখন তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক।’

তিনি বলেন, ‘৯০ সালের দিকে তিনি (আব্বাস) জাতীয়তাবাদী তরুণ দল করতেন। তারপর তিনি জাতীয় পার্টি করতেন। গোপনে গোপনে জামায়াতের সঙ্গে তার আঁতাত ছিল। তার প্রমাণ হচ্ছে ২০১১ সালের নির্বাচনে দলীয় নির্দেশ উপেক্ষা করে বিদ্রোহী হওয়া। ওই নির্বাচনে তিনি নিজেও হারেন, দলীয় প্রার্থীকেও হারান। জিতে যান জামায়াতের নেতা।’

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারের কাছে বৃহস্পতিবার আব্বাসের উত্থান প্রসঙ্গে জানতে চান সংবাদ কর্মীরা। এ সময় তিনি জানান, তাকে নৌকা প্রতীকে মনোনয়নপত্র দেয়ার দায়িত্ব আসলে মহানগর আওয়ামী লীগের নয়। এটি কেন্দ্রীয় কমিটি যাচাই-বাছাই করে দেয়। এখানে জেলা আওয়ামী লীগের হয়তো সুপারিশ থাকে। এভাবে হয়তো সুপারিশের ভিত্তিতে নৌকা পেয়ে থাকতে পারেন।

ডাবলু সরকার বলেন, ‘আমরা জানি, আব্বাসের পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার এক ভাই হত্যা মামলার আসামি। তার ভাই যুবদল করে। আমাদের বুঝতে দেরি হয়েছে, তিনি একজন অনুপ্রবেশকারী।’

কার ছত্রছায়ায় তিনি আওয়ামী লীগে প্রবেশ করলেন, দলীয় মনোনয়ন পেলেন, সে বিষয়ে তদন্ত হবে বলেও জানান ডাবলু সরকার।

জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অনিল কুমার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিউজবাংলাকে জানান, ওই সময় কে বা কারা তাকে দলে ঢোকাল, কার সুপারিশে আব্বাস আলী নৌকার মনোনয়ন পেল, এটা তারও প্রশ্ন। তিনি নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন।

রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের ওই সময়ের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওই সময়ে পৌর আওয়ামী লীগ এবং থানা আওয়ামী লীগের রেজুলেশনে মনোনয়নের জন্য চার জনের নামের তালিকা দেয়া হয়েছিল। তার মধ্যে আব্বাসের নাম এক নম্বরে দিয়েছিল তারা। আমি আর জেলা সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সম্পাদক, কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়ক বসেছিলাম।

‘তখন এমপি আয়েন উদ্দিন বলল, আব্বাসকে দিলে আমরা জিততে পারব। প্রস্তাবিত চার জনের নামই আমরা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। সেখান থেকেই তাকে মনোনয়োন দেয়া হয়েছে। কেন্দ্র থেকেই তাকে দেয়া হয়েছে। আমাদের কাছে যে প্রস্তাব এসেছিল সেই প্রস্তাবগুলো আমার শুধু বাহক হিসেবে পৌঁছে দিয়েছি কেন্দ্রে।’

মেয়র আব্বাস আলীর উত্থানের জন্য অনেকে দায়ী করেন রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আয়েন উদ্দিনের ভূমিকার। তবে আব্বাসের অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সংবাদ সম্মেলন করে তার শাস্তির দাবি করেন এমপি আয়েন।

দলে তার অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা তো অনেক সময় বুঝতে পারি না। যদি বুঝতেই পারতাম...তাহলে জাতির পিতাকে হারাইতাম না। খন্দকার মোশতাকের অনুসারীরা অনেক সময় অনেক ঘটনা ঘটায়। সেটি শুধু দলের নয়, দেশের জন্য অত্যন্ত লজ্জা ও দুঃখজনক ঘটনা।’

আয়েন বলেন, ‘এটাও সত্য তার (আব্বাস) ভাই যুবদল করত। সে অন্য দলের সঙ্গে জড়িত ছিল। আপনারা নিশ্চই জানেন, এক ভাই বিএনপি করে, এক ভাই আওয়ামী লীগ করে - এটি দেশের অনেক জায়গাতেই আছে। সংসদ সদস্য নির্বাচনে রহিম ভরসা, করিম ভরসার মতো দুই ভাই দু দলের হিসেবে কাজ করেন। আমাদের দলের নেতাকর্মীরা হয়তো সেটি মনে করেছে।’

অভিযোগের বিষয়ে মেয়র আব্বাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পৌরসভার ফান্ড থেকে টাকা নেয়ার প্রশ্নই আসে না। অনুপ্রবেশকারী নয়, আমি শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছি। এখন আমাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে।’

আরও পড়ুন:
‘আমরা কোথাও যাব না, পালাব না’
পীরগঞ্জের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৪৫
বিচারের দাবি নিয়ে একাই দাঁড়ালেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
সহিংসতা: কুমিল্লায় ৮ মামলায় ৩ কাউন্সিলরসহ ১০৫৫ আসামি
প্রধানমন্ত্রীর আসন বেছেই পীরগঞ্জে হামলা: তথ্যমন্ত্রী

শেয়ার করুন

লঞ্চে ‘দূরত্বের প্রতারণা’

লঞ্চে ‘দূরত্বের প্রতারণা’

নৌরুটের দূরত্ব বাড়িয়ে নতুন ভাড়ার পার্সেন্টেজ যোগ করে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। ফাইল ছবি/নিউজবাংলা

নৌরুটের দূরত্ব নির্ণয় করে এমন সংস্থা বিআইডব্লিউটিএর হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের পরিচালক বেগম সামসুন নাহার বলেন, ‘আমাদের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ দূরত্ব নিয়ে কাজ করে। আমাদের সঙ্গে লঞ্চ মালিকদের কোনো সম্পর্ক নেই। মালিকরা বাড়তি সুবিধা নিতে দূরত্ব বাড়িয়ে বলতে পারে, এটা তো আমরা জানি না। আমাদের কাছে যে জরিপ আছে, এর বাইরে দিয়ে লঞ্চ যদি ঘুরে ঘুরে যায় তাহলে দূরত্ব বাড়তেও পারে।’

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে নৌপথে লঞ্চভাড়া প্রতি কিলোমিটারে আগের চেয়ে ৬০ পয়সা করে বেড়েছে। এ হিসাবে কম দূরত্বে লঞ্চের ভাড়া ৩৫ দশমিক ২৯ শতাংশ ও বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে ৪২ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।

ভাড়া বাড়ানোর আগেই অনেক লঞ্চ বেশি ভাড়া নিত। এবার বেশি ভাড়া আদায়ের জন্য নতুন ফন্দি এঁটেছে ঢাকা থেকে বিভিন্ন রুটে চলা লঞ্চগুলো। নৌরুটের দূরত্ব বাড়িয়ে নতুন ভাড়ার পার্সেন্টেজ যোগ করে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে বাড়তি ভাড়া।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ২০১৩ সালের ভাড়ার তালিকায় উল্লেখ আছে ঢাকা টু হাতিয়া নৌরুটের দূরত্ব ২০৩ কিলোমিটার।

তবে ৮ নভেম্বর বিআইডব্লিউটিএ প্রকাশিত ভাড়ার তালিকায় ঢাকা টু হাতিয়া রুটের দূরত্ব ২৩৩ কিলোমিটার হিসাব করে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।

হাতিয়াগামী ফারহান-৪ লঞ্চের চালক হারুনুর রহমান মাস্টার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত এই রুটে লঞ্চ চালাই। জিপিএস ব্যবহার করি, কতটুকু যাই আসি তা আমাদের জানা। ঢাকা টু হাতিয়ার দূরত্ব ১০৫ নটিকাল মাইল (১৯৪ কিলোমিটার)। এখন আরও শর্টকাটে যাওয়া যায়, তাই দূরত্ব আরও কম লাগে। দূরত্ব বাড়ার প্রশ্নই আসে না।’

ডিজেলের দাম বাড়ায় লঞ্চে প্রথম ১০০ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য প্রতি কিলোমিটারে জনপ্রতি ১ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৩০ পয়সা করা হয়েছে। প্রথম ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের জন্য প্রতি কিলোমিটারে জনপ্রতি ১ টাকা ৪০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এতে জনপ্রতি সর্বনিম্ন ভাড়া ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএর ২০১৩ সালের ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী ২০৩ কিলোমিটারে আগের ভাড়া ৩১৪ টাকা। বাড়ানোর পরে বর্তমান ভাড়া আসে ৪৩৬ টাকা। নতুন তালিকা অনুযায়ী ২৩৩ কিলোমিটারে আগের ভাড়া ৩৫৬ টাকা, এখনকার ভাড়া ৪৯৬ টাকা।

যাত্রীরা জানালেন, ঢাকা-হাতিয়ায় আগে নিত ৩০০, এখন নিচ্ছে ৫০০ টাকা। চালকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪ কিলোমিটার হিসাবে আগের ভাড়া আসে ৩০১ টাকা।

ঢাকা থেকে ভোলার চরফ্যাশনের বেতুয়া ঘাটে বিআইডব্লিউটিএর ২০১৩ সালের ভাড়ার তালিকায় উল্লেখ আছে এ রুটের দূরত্ব ২০৩ কিলোমিটার।

৮ নভেম্বর বিআইডব্লিউটিএ প্রকাশিত তালিকায় ঢাকা-বেতুয়ার দূরত্ব ২৪৬ কিলোমিটার দেখিয়ে নতুনভাবে ভাড়া ঠিক করা হয়েছে।

এই রুটে চলা ফারহান-৫ লঞ্চের ইনচার্জ রিয়াদ বলেন, ‘বেতুয়ার দূরত্ব আমি জানি না। বাইরে বিআইডব্লিউটিএর সাইনবোর্ড টানানো আছে, ওখানে যা আছে তাই।’

যাত্রীরা জানালেন, ঢাকা-বেতুয়ায় আগে ৩০০-৩৫০ টাকা নেয়া হতো, এখন ৫০০ টাকা নেয়া হচ্ছে।

বেতুয়াগামী যাত্রী মেহেদী আরিফ বলেন, ‘ভোলার লঞ্চ মালিকরা অনেক প্রভাবশালী ও বিত্তশালী। ওরা যা ইচ্ছা তা করতে পারেন। সরকারের যেসব সংস্থা নৌপথের দূরত্ব নির্ণয় করে, তারা যেন নতুনভাবে সঠিক দূরত্ব নির্ণয় করে বিআইডব্লিউটিএ এবং লঞ্চ কর্তৃপক্ষ নোটিশ দিয়ে জানিয়ে দেয়, এই অনুরোধ করব। এটি হলে যাত্রীরা সঠিক দূরত্বের ভাড়া দিতে পারবে।’

লঞ্চে ‘দূরত্বের প্রতারণা’
বিআইডব্লিউটিএর বেঁধে দেয়া ভাড়ার তালিকা

বাড়তি দূরত্বের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘এখন নদীর বিভিন্ন স্থানে চর পরে, লঞ্চ ঘুরে যেতে হয়, তাই হয়তো বা দূরত্ব বেড়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘কোনো লঞ্চে যাতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করে সে জন্য আমাদের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে লঞ্চে মনিটর করছি। সোমবার থেকে বিআইডব্লিউটিএ এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা অতিরিক্ত ভাড়া না নিতে মোবাইল কোর্ট বসাবেন। বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পেলে ওই লঞ্চের যাত্রা বাতিল করব।’

নৌরুটের দূরত্ব নির্ণয় করে এমন সংস্থা বিআইডব্লিউটিএর হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের পরিচালক বেগম সামসুন নাহার বলেন, ‘আমাদের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ দূরত্ব নিয়ে কাজ করে। আমাদের সঙ্গে লঞ্চ মালিকদের কোনো সম্পর্ক নেই। মালিকরা বাড়তি সুবিধা নিতে দূরত্ব বাড়িয়ে বলতে পারে, এটা তো আমরা জানি না। আমাদের কাছে যে জরিপ আছে, এর বাইরে দিয়ে লঞ্চ যদি ঘুরে ঘুরে যায়, তাহলে দূরত্ব বাড়তেও পারে।’

অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল (জাপ) সংস্থার সভাপতি মাহবুব উদ্দিন বলেন, ‘যাত্রীরা কোভিডের সময় ৬০ ভাগ বাড়তি ভাড়া দিয়ে অভ্যস্ত। তাই এখন ভাড়া নিয়ে কথা বলার প্রশ্ন আসে না।’

আরও পড়ুন:
‘আমরা কোথাও যাব না, পালাব না’
পীরগঞ্জের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৪৫
বিচারের দাবি নিয়ে একাই দাঁড়ালেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
সহিংসতা: কুমিল্লায় ৮ মামলায় ৩ কাউন্সিলরসহ ১০৫৫ আসামি
প্রধানমন্ত্রীর আসন বেছেই পীরগঞ্জে হামলা: তথ্যমন্ত্রী

শেয়ার করুন

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে হুইলচেয়ার আটকে রাখা নারী কে?

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে হুইলচেয়ার আটকে রাখা নারী কে?

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ‘স্পেশাল খালা’ হাজেরা বেগমের হুইলচেয়ার আটকে রাখার ভিডিও ছড়িয়েছে ফেসবুকে। ছবি: সংগৃহীত

ঘটনাটি সরাসরি ফেসবুকে লাইভের সময় হুইলচেয়ার কেড়ে নেয়া নারীর পরিচয় বেশ কয়েকবার জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। তবে নিউজবাংলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ওই নারীর নাম হাজেরা বেগম। তিনি হাসপাতালটিতে ‘স্পেশাল খালা’ হিসেবে পরিচিত।

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গত শুক্রবার গভীর রাতে অ্যাম্বুলেন্সে একজন মুমূর্ষু রোগী নিয়ে আসেন স্বজনেরা। সেই রোগীকে হাসপাতালের ভেতর নিতে প্রয়োজন হুইলচেয়ার। তবে হুইলচেয়ারের জন্য দেড়শ টাকা দাবি করে বসেন হাসপাতালের এক নারী।

এই টাকা না পেয়ে মুমূর্ষু রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে রেখেই হুইলচেয়ার কেড়ে নিয়ে ওই নারী চলে যেতে উদ্যত হন। এ সময় তার সঙ্গে একজনের বাগবিতণ্ডার ভিডিও ছড়িয়েছে ফেসবুকে। প্রায় ২৫ মিনিট পর ওই রোগীকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান স্বজনেরা।

ঘটনাটি সরাসরি ফেসবুকে লাইভের সময় হুইলচেয়ার কেড়ে নেয়া নারীর পরিচয় বেশ কয়েকবার জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। তবে নিউজবাংলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ওই নারীর নাম হাজেরা বেগম। তিনি হাসপাতালটিতে ‘স্পেশাল খালা’ হিসেবে পরিচিত।

হাসপাতালটির কর্মকর্তারা জানান, জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ট্রলি ও হুইলচেয়ার টানার নিজস্ব কর্মীর অভাবে গড়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলছে ট্রলি-হুইলচেয়ার বাণিজ্য। রোগীপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে তাদের।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে হুইলচেয়ার আটকে রাখা নারী কে?

ট্রলি বা হুইলচেয়ার টানার কাজ যারা করছেন তারা ‘স্পেশাল বয়’ বা ‘স্পেশাল খালা’ হিসেবে পরিচিত। হাজেরা বেগম এমনই একজন ‘স্পেশাল খালা’। সিন্ডিকেটের সদস্যরা ২৪ ঘণ্টাই পালাক্রমে হাসপাতালে অবস্থান করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চতুর্থ শ্রেণির বেশ কয়েকজন কর্মচারী নিয়ন্ত্রণ করেন এই সিন্ডিকেট। কমিশনের ভিত্তিতে তারা সিন্ডিকেটের সদস্যদের নিয়োগ দেন। হাসপাতালের কর্মী নন এমন অন্তত ১০০ জন ট্রলি ও হুইলচেয়ার টানার কাজ করছেন।

এই হাসপাতালে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক আনসার সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘স্পেশাল বয় ও খালাদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন জরুরি বিভাগের ওয়ার্ড সর্দার টুলু হাওলাদার, কিরণ মিয়া ও রায়হান মিয়া। তারা প্রকাশ্যে হুইলচেয়ার-ট্রলি বাণিজ্য করলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয় না।’

সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের সামনে ট্রলি আর হুইলচেয়ার নিয়ে রোগীর অপেক্ষায় আছেন অন্তত ১৫ জন স্পেশাল বয় ও খালা। অ্যাম্বুলেন্সে রোগী এলেই তার কাছে ছুটে যাচ্ছেন। স্বজনেরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা হুইলচেয়ার বা ট্রলিতে রোগী তুলে জরুরি বিভাগে নিয়ে যাচ্ছেন। সেখান থেকে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ওয়ার্ডেও রোগী নিয়ে যাচ্ছেন তারা।

এমনকি রোগীর শরীরের তাপমাত্রা কেমন সেটাও এই স্পেশাল বয় ও খালাদের কাছ থেকে চিকিৎসকেরা জেনে নিচ্ছেন। করোনা সংক্রমণের ভয়ে রোগীর কাছ থেকে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রাখছেন চিকিৎসকেরা। আর রোগীদের ‘সেবা দেয়ার বিনিময়ে’ স্বজনদের কাছ থেকে ১০০ থেকে ২০০ টাকা নিচ্ছেন স্পেশাল বয় ও খালারা।

আসিয়া বেগম নামে এক ‘স্পেশাল খালা’ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি এই হাসপাতালের কেউ না। তবে পাঁচ বছর ধরে এখানে কাজ করছি। বাসা কেরানীগঞ্জ। প্রতিদিন ভোরে হাসপাতালে আসি। বেলা ২টা পর্যন্ত কাজ করে চলে যাই। প্রতিদিন ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা আয় হয়।’

এ কাজের জন্য হাসপাতাল থেকে কোনো বেতন পান কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এক টাকাও দেয় না। বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রতিদিন বিনা বেতনে ধোয়ামোছার কাজ করি। হাসপাতাল পরিষ্কার করি। এ জন্য এক টাকাও তারা দেয় না, তাই হুইলচেয়ার থেকে টাকা নেয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।’

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে হুইলচেয়ার আটকে রাখা নারী কে?
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগী এলে এভাবেই ছুটে যান ‘স্পেশাল বয়’ বা ‘স্পেশাল খালা’

ঢাকার বাইরে থেকে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন আমিরুল ইসলাম। অ্যাম্বুলেন্সটি হাসপাতালের সামনে থামার সঙ্গে সঙ্গে ট্রলি নিয়ে হাজির হন এক যুবক। জরুরি বিভাগে রোগী নেয়ার জন্য ১৫০ টাকা দাবি করেন। আমিরুল সেই টাকা দিয়েই বাবাকে জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন।

নিউজবাংলা প্রতিবেদক সোমবার বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে স্পেশাল বয় ও খালাদের তৎপরতা দেখলেও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. খলিলুর রহমানের দাবি, হাজেরা বেগমের ঘটনাটি জানার পর চক্রের সবাইকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।

জনবল সংকটের কারণেই এমন সমস্যা তৈরি হয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘হুইলচেয়ার ও ট্রলি পরিচালনার জন্য হাসপাতালে অল্প কিছু লোক নিয়োগ দেয়া রয়েছে। এই সংখ্যা অনেক কম। এ কারণেই কিছু লোক সুযোগ নিচ্ছে। তাদের স্পেশাল বয় ও খালা বলে ডাকা হয়। হাসপাতাল থেকে তাদের কোনো বেতন দেয়া হয় না।’

রোগীর স্বজনের কাছে টাকা দাবি করা হাজেরার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘তাকে (হাজেরা) হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। উনারা আমাদের স্টাফ না, যে কারণে প্রতিনিয়ত এ ধরনের ঝামেলা করেন। এ ঘটনার পর তাদের সবাইকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।’

হাসপাতালে এখনও স্পেশাল বয় ও খালাদের উপস্থিতি দেখার তথ্য জানানো হলে পরিচালক বলেন, ‘আমরা যখন অভিযানে যাই, তখন কাউকে পাই না। মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করা হয়। আমি ইতোমধ্যে আদেশ দিয়েছি দেখামাত্র তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

স্পেশাল বয় ও খালাদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে নাম আসা জরুরি বিভাগের সর্দার রায়হান মিয়া অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘জরুরি বিভাগে তিনজন ওয়ার্ড সর্দার আছে। ট্রলি ও হুইলচেয়ার টানার জন্য যারা আছে তাদের আমরা তিন শিফটে ভাগ করে দিয়েছি। এদের দেখভাল আমাদেরই করতে হয়।’

কমিশন নেয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এমন অভিযোগ সত্যি না। কেউ আপনাকে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। আমাদের কেউ এ ধরনের ঘটনায় জড়িত নয়। আমরা হাসপাতাল থেকেই বেতন পাই।’

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে শুক্রবার রাতে নিয়ে আসা মুমূর্ষু রোগীর অবস্থা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছে নিউজবাংলা। তবে জানা গেছে, তাকে পরে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়।

হাসপাতালের নার্স রুবিনা আক্তার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘তার শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল। জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে ভর্তির পরামর্শ দেন। তবে সে সময় হাসপাতালে একটি আইসিইউও খালি ছিল না। এ কারণে রোগীর স্বজনেরা সেই রাতেই তাকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যান।’

আরও পড়ুন:
‘আমরা কোথাও যাব না, পালাব না’
পীরগঞ্জের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৪৫
বিচারের দাবি নিয়ে একাই দাঁড়ালেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
সহিংসতা: কুমিল্লায় ৮ মামলায় ৩ কাউন্সিলরসহ ১০৫৫ আসামি
প্রধানমন্ত্রীর আসন বেছেই পীরগঞ্জে হামলা: তথ্যমন্ত্রী

শেয়ার করুন

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের দেয়ালজুড়ে ক্ষোভ-হাহাকার লিখে রেখেছেন সেবাগ্রহীতারা। ছবি: নিউজবাংলা

অসংখ্য মানুষ তাদের হাহাকার আর ক্ষোভের কথা লিখে রেখেছেন পাসপোর্ট অফিসের দেয়ালজুড়ে। দালালের দৌরাত্ম্য, লোকবল সংকট আর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এ অফিসে আসা সেবাগ্রহীতাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

‘ফাগলা কুত্তায় কামরাইলে পাসপোর্ট অফিসে আইয়ো’- সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের ভেতর দিককার দেয়ালে লিখে রেখেছেন কেউ একজন।

‘ফাগলা কুত্তা’ মানে পাগলা কুকুর। এই আক্ষেপ কার- জানেন না কেউ। তবে আরও অনেকে তাদের নাম বা মোবাইল ফোন নম্বর উল্লেখ করেও লিখেছেন দুর্ভোগের কথা।

এই দেয়ালেই কাদির আহমদ নামের একজন নিজের মোবাইল নম্বর উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘এতো কষ্ট জানলে আগে আইতাম না।’

ওই মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে কাদির নিশ্চিত করেন তিনিই বাক্যটি লিখেছেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হারা দিন ধরি লাইনে উবাইয়া (না খেয়ে) আছলাম। কিচ্ছু খাইতে পারছি না। পানিও না। বাইর হইলেই যদি সিরিয়াল মিস করি লাই, ডরে তাই লাইন ছাড়ছি না। খুব বিরক্ত লাগছিল। একদিকে ক্ষুধা, আরেক দিকে সারা দিন উবাইয়া (না খেয়ে) থাকিয়া পাওয়ো (পায়ে) বেদনা, বিরক্তি, সব মিলিয়া কান্দতে (কাঁদতে) ইচ্ছা করছিল। এর লাগি মনের দুঃখে দেওয়ালো (দেয়ালে) ইতা লেখছি।’

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

পাসপোর্ট আবেদন জমা দেয়ার সময় নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, সকাল ৭টায় গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে রাত ৮টায় বের হয়ে আসেন। একের পর এক লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে সেদিন জীবনের সবচেয়ে বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

কাদিরের মতো অসংখ্য মানুষের হাহাকার, ক্ষোভের কথা ছড়িয়ে আছে পাসপোর্ট অফিসের ভেতর দিকের দেয়ালজুড়ে।

দালালের দৌরাত্ম্য, লোকবল সংকট আর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এ অফিসে আসা সেবাগ্রহীতাদের দুর্ভোগ আর হয়রানি চরমে পৌঁছেছে। সারা দিন পেরিয়ে রাত পর্যন্ত পাসপোর্ট আবেদনকারীদের দীর্ঘ লাইন লেগে থাকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লকডাউনের পর বিশ্ব শ্রমবাজার খুলে যাওয়া ও শিক্ষার্থী ভিসায় বিদেশ যাওয়ার হিড়িকের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে পাসপোর্ট আবেদনের হার অনেক বেড়েছে। এই চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

দেয়ালজুড়ে হাহাকার

সিলেট নগরের দক্ষিণ সুরমার আলমপুরে সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের অবস্থান। অফিসের ফটক দিয়ে ঢুকলেই পাসপোর্টের আবেদন জমা ও পাসপোর্ট গ্রহণ করার আলাদা কাউন্টার। এরপর একটি সরু গলি পেরিয়ে পাসপোর্টের জন্য ফিঙ্গার প্রিন্ট দেয়ার একাধিক কাউন্টার। ফিঙ্গার প্রিন্ট দেয়ার জন্য প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয় আবেদনকারীদের। ফলে সব সময় ভিড় লেগে থাকে।

এখানকার দেয়ালের রং হলদেটে সাদা। তবে ক্ষোভ-হাকারের অক্ষরে এই রং হারিয়ে ফেলেছে দেয়ালটি। পুরো দেয়ালজুড়ে এখন কালো ছোপ ছোপ, লালও আছে কোথাও। কলমের কালিতে দেয়ালজুড়ে নিজেদের দুর্ভোগ আর তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন পাসপোর্টগ্রহীতারা।

বেশির ভাগ লেখাই অস্পষ্ট হয়ে গেছে। তবে কিছু কিছু বেশ পরিষ্কার।

একজন লিখেছেন, ‘পাসপোর্ট তৈরি করতে আসলে কিয়ামতের ডাক এসে যাবে। তাই টিফিনসহ যাবতীয় জরুরি জিনিস সাথে আনবেন। নইলে বুঝবেন ঠেলা কাকে বলে কত প্রকার ও কী কী?’

আরেকজন লিখেছেন, ‘পাসপোর্ট অফিস আমারে দেশ ছাড়ার শিক্ষা দিল!’

এই লেখার নিচে ইংরেজি হরফে লেখা জুবায়ের আহমদ।

এর পাশেই লেখা, ‘ভাইরে সারা জীবন মনো থাকবো’, ‘যত জীবন বাচমু মনো থাকবো রে ... (গালি)’, ‘সকাল ৬টা থেকে অপেক্ষা করতেছি। উৎসাহ পেলে সারাজীবন করবো। হাহা খুব মজা লাগতেছেরে ভাই।’

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

একজন লিখেছেন, ‘কারো মরার ইচ্ছে হইলে পাসপোর্ট অফিসে আসুন’, একটি বাক্য এমন- ‘জীবনে যা গুণাহ করছি তার প্রায়শ্চিত্ত।’

দেয়ালে আরও লেখা আছে, ‘বাংলাদেশে যত দুর্নীতি আছে, তার বেশিরভাগই পাসপোর্ট অফিসে হয়’, ‘আমি নিজ ইচ্ছায় স্বীকার করছি, স্কুলে এসএমব্লি (এসেম্বলি) ভাগার জন্য এই শাস্তি’, ‘জীবনে যা পাপ করেছি তার ফল।’

সৌরভ নামে একজন লিখেছেন, ‘সকাল ৮টা থাকি রাইত ৯টা পর্যন্ত উবা (না খাওয়া)। মাদার বোর্ড হকল।’

সেবাগ্রহীতাদের এ রকম অসংখ্য অভিযোগ আর হাহাকার ধারণ করে আছে এই দেয়াল।

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

দেয়ালের এই লেখাগুলো চোখ এড়ায়নি সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের পরিচালক একেএম মাজহারুল ইসলামের।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। সেই দুর্ভোগের কথা তারা দেয়ালে লিখে রাখছে। তবে আবেদনকারীদের তো একদিন দুর্ভোগ পোহাতে হয়, কিন্তু আমাদের প্রতিদিন এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা। কিন্তু অতিরিক্ত আবেদনের চাপে আমাদের সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত অফিস করতে হয়। তখন পর্যন্ত ভিড় থাকে। আমাদের এই দুর্ভোগের কথা আমরা কোথায় লিখব!’

পাসপোর্ট অফিসে এক ঘণ্টা

পাসপোর্ট অফিসে দুপুর ১২টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে ও বাইরে চারটি লাইন। চারটি লাইনের প্রতিটিতেই দাঁড়িয়ে আছেন শতাধিক মানুষ। একটি লাইন আবেদন জমা দেয়ার, একটি রোহিঙ্গা পরীক্ষা আর অপর দুটি ফিঙ্গার প্রিন্টের।

আবেদন জমা দেয়া আর রোহিঙ্গা পরীক্ষার লাইনগুলো অফিস ভবনের বাইরে। খোলা আকাশের নিচে রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন গ্রহীতারা।

শোয়েব আহমদ নামে এক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা সকাল থেকে রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। অথচ হঠাৎ করে লাইনের বাইরে থেকে আসা একজনের আবেদন পরীক্ষা করা হচ্ছে। এভাবে মাঝে মাঝেই লাইন ভেঙে আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে।’

তবে রোহিঙ্গা পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মী এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন, যদিও তিনি তার নাম প্রকাশ করতে চাননি।

ফিঙ্গার প্রিন্টের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সজল মালাকার বলেন, ‘সকাল ৮টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু সামনে এগোচ্ছেই না। খুব মন্থর গতিতে কাজ চলছে। এভাবে চলতে থাকলে সারা দিনেও এই লাইন শেষ হবে না।’

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

দোতলায় পরিচালকের কার্যালয়ের সামনে গিয়েও দেখা যায় দীর্ঘ লাইন। এই লাইনে দাঁড়ানো সবাই নানা অভিযোগ নিয়ে এসেছেন।

তাদের একজন সালেহ আহমদ। মাস দেড়েক আগে পাসপোর্টের আবেদন জমা দিয়েছিলেন। নির্ধারিত তারিখ পেরিয়ে গেলেও তার পাসপোর্ট আসেনি। পাসপোর্ট বিতরণ কাউন্টারের লোকজন কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এরপর পরিচালকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন সালেহ।

সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক মাজহারুল ইসলামের কক্ষে ঢুকে সালেহ আহমদের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি সালেহকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে আসেন।

এরপর তার আবেদনপত্রের স্লিপ কম্পিউটারে পরীক্ষা করে বলেন, ‘সালেহ আহমদ পাসপোর্টের আবেদনে নিজের নামের যে বানান লিখেছেন, তার সঙ্গে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের নামের বানানের মিল নেই। এক জায়গায় ‘ই’ এর বদলে ‘এ’ লিখেছেন তিনি। ই-পাসপোর্টের ক্ষেত্রে সামান্যতম ভুল থাকলেও পাসপোর্ট দেয়া হয় না। ঢাকা থেকেই এটি করা হয়। এতে আমাদের কিছু করার থাকে না।’

সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এখানে এ ধরনের সমস্যাই বেশি। মানুষজন আবেদনে ভুল করেন। এরপর আমাদের দোষারোপ করেন।’

ই-পাসপোর্ট আবেদনকারীদের সব তথ্য সঠিকভাবে দেয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

আবেদনের এই ভুল প্রসঙ্গে সালেহ আহমদ বলেন, ‘আমি তেমন লেখাপড়া জানি না। ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে আবেদন করেছিলাম। আবেদন জমা দেয়ার সময় পাসপোর্ট অফিসের কর্মীরাও ভুল থাকার কথা বলেননি। এখন বলা হচ্ছে ভুল ছিল।’

পরিচালকের কার্যালয় থেকে বেরিয়ে কথা হয় আশরাফ আলী মণ্ডল নামে আরেক আবেদনকারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবার নাম আনসার আলী মণ্ডল। আমার সব সার্টিফিকেটে এমনটিই লেখা রয়েছে। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে আমার বাবার নামের শেষাংশের ‘মণ্ডল’ যুক্ত করা হয়নি। আমি আমার পাসপোর্টের আবেদনে বাবার পুরো নামটাই লিখেছিলাম। এখন পাসপোর্ট আটকে দেয়া হয়েছে।’

আবেদনকারী আনসার আলী বলেন, ‘আমি উচ্চ শিক্ষা নিতে যুক্তরাজ্যে যাব। আগামী মাসেই আমার সেখানে পৌঁছানোর কথা। এখন পাসপোর্ট না পেলে আমি যাব কীভাবে?’

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

অভিযোগের অন্ত নেই

সিলেট পাসপোর্ট অফিস নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই গ্রাহকদের। অনিয়ম, দুর্নীতি আর মানুষজনকে অহেতুক হয়রানির অভিযোগ এই অফিসের কর্মরতদের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, পাসপোর্ট অফিস ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি দালাল সিন্ডিকেট। এই দালালদের মাধ্যমে আবেদন এলে আর লাইনে দাঁড়াতে হয় না। দ্রুতই সব কাজ হয়ে যায়। আর দালালদের মাধ্যমে না এলে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাকিল আহমদ চৌধুরী বলেন, “আমি অনলাইনে আবেদন করি। কিন্তু ‘গিভেন নেম’ না লেখার কারণ দেখিয়ে আমার আবেদন বাতিল করা হয়। কিন্তু অনলাইনে সংশোধন করার ব্যবস্থা নেই। পাসপোর্ট অফিসের লোকজন এটি সংশোধন করতে পারেন, তবে তারা করেননি। অথচ দালালদের মাধ্যমে যারা আবেদন করেন তাদের এ রকম ভুল থাকলেও কোনো সমস্যা হয় না।”

একাধিক পাসপোর্টগ্রহীতার অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে পাসপোর্টের আবেদন করলে আবেদনের ফরমে তারা একটি চিহ্ন দিয়ে দেয়। এই চিহ্ন থাকলে আর লাইনে দাঁড়াতে হয় না। আবেদনে ছোটখাটো ভুল থাকলেও সমস্যা হয় না, কিন্তু দালাল ছাড়া এলেই দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আবেদনকারী জানান, একটি ট্রাভেল এজেন্সিকে বাড়তি এক হাজার টাকা দিয়ে পাসপোর্টের আবেদন করেন তিনি। আবেদন ফরম পূরণ করাসহ বাকি সব প্রক্রিয়া ওই ট্রাভেল এজেন্সিই করবে।

অ্যাসোসিয়েশন অফ ট্রাভেল এজেন্ট অফ বাংলাদেশের (আটাব) সিলেট অঞ্চলের সাবেক সভাপতি আব্দুল জব্বার জলিল বলেন, ‘পাসপোর্ট অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য হয়রানি নিয়ে অনেকেই আমার কাছে অভিযোগ করেছেন। দালালদের মাধ্যমে পাসপোর্ট জমা না দিলে হয়রানির শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। মানুষজনের এমন হয়রানি দূর করতে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদেরই উদ্যোগী হতে হবে।’

তবে দালালদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ অস্বীকার করে পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘এখন তাদের একেবারে উৎপাত নেই। আমি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সব মনিটর করি। এখন কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। তবে আবেদনের চাপ বাড়ায় মানুষজনকে কিছু দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’

লোকবল সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি

পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন তরুণ চিত্রশিল্পী দ্বীপ দাস। সেই আবেদন জমা দিতেই দুদিন লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে তাকে।

দীপ দাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি আগের দিন সকাল থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সারা দিন পর বলা হয়, সার্ভার নষ্ট। পরদিন সকাল ৭টা থেকে আবার লাইনে দাঁড়াই। এরপর দুপুরের দিকে আমার ছবি তোলা ও ফিঙ্গার প্রিন্ট নেয়া হয়।’

এমন দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন আরও অনেক পাসপোর্টগ্রহীতা। লোকবল সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন পাসপোর্ট অফিসের সংশ্লিষ্টরা।

পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক একেএম মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘এই অফিসে ৩২টি পদ থাকলেও কর্মরত আছেন ১৯ জন। ডিএডি, অ্যাকাউন্টেন্ট ও কয়েকটি অপারেটরের পদ খালি রয়েছে।

যান্ত্রিক ত্রুটি এখানে সব সময় লেগে থাকে। সার্ভার বিকল হয়ে যায়। নেটওয়ার্কের সমস্যা থাকে। আজকেও জাতীয় পরিচয়পত্র পরীক্ষার সার্ভার নষ্ট। এগুলো ঢাকা থেকে ঠিক না করলে আমাদের কিছুই করার থাকে না। এ কারণে মানুষজনকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’

মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘লকডাউনের পর থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ আবেদন গ্রহণ করতে হচ্ছে। আমার ২০ বছরের চাকরিজীবনে এ রকম চাপ কোনো দিন দেখিনি। অথচ এই চাপ সামলানোর মতো লোকবল ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি আমার নেই। ফলে এখানে সব সময়ই ভিড় থাকে। মানুষ এসব সমস্যা বুঝতে চায় না। তাদের দুর্ভোগের পাশপাশি আমাদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’

আরও পড়ুন:
‘আমরা কোথাও যাব না, পালাব না’
পীরগঞ্জের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৪৫
বিচারের দাবি নিয়ে একাই দাঁড়ালেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
সহিংসতা: কুমিল্লায় ৮ মামলায় ৩ কাউন্সিলরসহ ১০৫৫ আসামি
প্রধানমন্ত্রীর আসন বেছেই পীরগঞ্জে হামলা: তথ্যমন্ত্রী

শেয়ার করুন