লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসে আখড়াবাড়ি নিষ্প্রাণ

লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসে আখড়াবাড়ি নিষ্প্রাণ

লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসে আড়ম্বরহীন কুষ্টিয়ার আখড়াবাড়ি। ছবি: নিউজবাংলা

এবার করোনার প্রকোপ কম থাকায় বাউল মেলা হবে ধরে নিয়েই সাধু-ফকির, বাউল ভক্তরা আখড়ায় জড়ো হয়েছেন। লালন ধামে আখড়াবাড়ির ভেতরে এবং বাইরের মাঠের গাছতলায় অবস্থান নিয়েছেন তারা।

মরমী সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩১তম তিরোধান দিবস রোববার। করোনার কারণে এবারও বাউল মেলার আয়োজন বাতিল করেছে জেলা প্রশাসন। তবে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় আখড়াবাড়ি খোলা থাকায় জড়ো হয়েছেন সাধু-বাউল-ফকিররা। প্রথা অনুযায়ী তারা ভক্তি-শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন সাইঁজির চরণে।

করোনা পরিস্থিতির কারণে ১৩০ বছরের রেওয়াজ ভেঙে গত বছরই প্রথম বাতিল করা হয় লালনের এই স্মরণোৎসব। সে সময় করোনার সংক্রমণ ভয়াবহ পর্যায়ে থাকায় আখড়াবাড়ির গেটও বন্ধ রাখা হয়েছিল।

এবার করোনার প্রকোপ কম থাকায় বাউল মেলা হবে ধরে নিয়েই সাধু-ফকির, বাউল ভক্তরা আখড়ায় জড়ো হয়েছেন। লালন ধামে আখড়াবাড়ির ভেতরে এবং বাইরের মাঠের গাছতলায় অবস্থান নিয়েছেন তারা।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন অ্যাকাডেমির আহ্বায়ক সাইদুল ইসলাম গত ১২ অক্টোবার ঘোষণা দিয়েছেন, এবারও তিরোধান দিবস পালন হবে না। করোনার কারণে গণজমায়েত এড়িয়ে চলতে এ ঘোষণা দিতে হয়েছে বলে তিনি জানান।

আখড়াবাড়ির বাইরে লালন অ্যাকাডেমির মাঠে নিজস্ব রেওয়াজে ভক্তি-শ্রদ্ধা দিতে দেখা গেছে লালন অনুসারীদের।

লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসে আখড়াবাড়ি নিষ্প্রাণ

নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা ফকির বাবু বলেন, ‘এতো দূর থেকে আসলাম। টাকায় মায়া করি নাই, ত্যাগ করেছি আরাম। এসে মনটাই ভেঙে গেল। এখন সাঁইজিকে ভক্তি জানিয়ে চলে যাব। মেলা না হওয়ায় আমরা পাগলরা না খেয়ে থাকার মতো অবস্থা।’

সাধু সঙ্গ ও বাউল মেলা না হওয়ায় হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছে অনেক বাউল, ফকির এবং লালন ভক্ত।

তারপরও আখড়াবাড়ির ভেতরে ও বাইরে চলছে জাতপাতহীন-মানবতার লালন দর্শনের প্রচার। বরাবরের মতো দর্শন প্রচার হচ্ছে তারই গানের মাধ্যমে। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া এখন লালনের গানের সুরে প্রকম্পিত।

২০০ বছর আগে কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় বাউল-ফকিরদের দল গঠন করেছিলেন ফকির লালন সাঁই। অহিংস, জাতপাতহীন ও মানবতাবাদী গান বেঁধে প্রচার করতেন তারা। দিনে দিনে তার দল বড় হতে থাকে। বাড়তে থাকে অনুসারী ও ভক্তের সংখ্যা। আজ বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে লালনের গান, তার বাণী।

১২৯৭ বঙ্গাব্দের পয়লা কার্তিক দেহত্যাগ করেন ফকির লালন। এই ১৩১ বছর ধরে আখড়া বাড়িতে চলা রেওয়াজ হলো, পহেলা কার্তিক লালনের তিরোধান দিবসে তার মাজার ধুয়ে মুছে পরিস্কার করে বাউল-ফকিরদের জন্য অধিবাস, বাল্যসেবা এবং পূর্ণসেবার (খাবার) আয়োজন।

লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসে আখড়াবাড়ি নিষ্প্রাণ

তিন দিন ধরে চলে মেলাসহ সরকারি অনুষ্ঠানমালা। দিন-রাত ধরে চলত গানে গানে লালন দর্শনের প্রচার। দেশ বিদেশের লাখ লাখ মানুষ এতে অংশ নিতেন।

করোনার বাস্তবতায় দুই বছর বন্ধ এসব আয়োজন। ফকির-বাউলরা নিজেদের মতো করে সাঁইজিকে স্মরণ করতে পারছেন, তাতেই অনেকে খুশি।

আখড়ায় এসে ফকির আলম বলেন, ‘ধরা আজ জরাক্রান্ত। এটা আমাদের মেনে নিতে হবে। সাঁইজির কৃপায় এসব কেটে যাবে। আবার সব স্বাভাবিক হবে।’

আরও পড়ুন:
লালনের তিরোধান দিবসে সম্মাননা পাচ্ছেন ৭ গবেষক-সাধক
লালন তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠান এবারও হচ্ছে না
লালন হত্যা মামলার ২ আসামি গ্রেপ্তার
এবার হচ্ছে না লালন সাঁইয়ের দোল উৎসব
৭ মাস পর খুলল লালনের আখড়াবাড়ি

শেয়ার করুন

মন্তব্য

এথনোফেস্টে হাসান কায়েশের ‘হাউস অফ লাইট’

এথনোফেস্টে হাসান কায়েশের ‘হাউস অফ লাইট’

হাউস অফ লাইট তথ্যচিত্রের পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত

হাউস অফ লাইট একটি সংবেদনশীল নৃতাত্ত্বিক সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র। করোনা মহামারির সময় একটি পরিবার যখন ঢাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে বন্দি হয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে, তখন সেই পরিবারের দৈনন্দিন জীবন নিয়েই নির্মিত তথ্যটিত্রটি।

এথেন্স এথনোগ্রাফিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল বা এথনোফেস্টে নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হাউস অব লাইট। এটি পরিচালনা করেছেন নির্মাতা ও সম্পাদক মাহমুদ হাসান কায়েশ।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, হাউস অফ লাইট একটি সংবেদনশীল নৃতাত্ত্বিক সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র। করোনা মহামারির সময় একটি পরিবার যখন ঢাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে একসঙ্গে থাকতে বাধ্য হচ্ছে, তখন সেই পরিবারের দৈনন্দিন জীবন নিয়েই নির্মিত তথ্যটিত্রটি।

উৎসবের ১২ তম আসর শুরু হয়েছে ২৫ নভেম্বর, চলবে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। নৃবিজ্ঞানকে দৃশ্যের মাধ্যমে প্রচার করার জন্য ২০১১ সালে শুরু হয় এথনোফেস্ট। যার মধ‍্যদিয়ে নৃতাত্ত্বিক গবেষণা এবং শিক্ষার নানামাত্রিক দিককে তুলে আনার প্রচেষ্টা আয়োজকদের।

হাউস অব লাইট এর আগে মনোনীত হয়েছিল যুক্তরাজ‍্যের ওয়ান ওয়ার্ল্ড মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডস এবং নাহেমি ক্যানন শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে।

এথনোফেস্টে হাসান কায়েশের ‘হাউস অফ লাইট’
চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সম্পাদক মাহমুদ হাসান কায়েশ। ছবি: সংগৃহীত

চলচ্চিত্র নির্মাতা মাহমুদ হাসান কায়েশ চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপর যুক্তরাজ‍্যের ইউনিভার্সিটি অফ দ‍্যা ওয়েস্ট অফ স্কটল্যান্ড থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন।

সম্প্রতি তার সম্পাদিত শর্ট ফিল্ম ইজ ইট মি? ব্রিটিশ কাউনসিলের ডিরেক্টরিতে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এছাড়া ফিল্মটি পার্সোনাল ন্যারেটিভ এর জন্য স্কটিশ মানসিক স্বাস্থ্য আর্ট ফেস্টিভ্যালে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জিতেছে।

মাহমুদ হাসান কায়েশ এখন দেশের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণকালীন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।

আরও পড়ুন:
লালনের তিরোধান দিবসে সম্মাননা পাচ্ছেন ৭ গবেষক-সাধক
লালন তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠান এবারও হচ্ছে না
লালন হত্যা মামলার ২ আসামি গ্রেপ্তার
এবার হচ্ছে না লালন সাঁইয়ের দোল উৎসব
৭ মাস পর খুলল লালনের আখড়াবাড়ি

শেয়ার করুন

‘অনুবাদ সাহিত্য পুরস্কার’ পাচ্ছেন আলম খোরশেদ ও রওশন জামিল

‘অনুবাদ সাহিত্য পুরস্কার’ পাচ্ছেন আলম খোরশেদ ও রওশন জামিল

অনুবাদক আলম খোরশেদ ও রওশন জামিল। ছবি: সংগৃহীত

‘অনুবাদ সাহিত্য পুরস্কার: আজীবন সম্মাননা-২০২১’ বিভাগে মনোনীত হয়েছেন অনুবাদক আলম খোরশেদ। ‘বর্ষসেরা অনূদিত বই’ বিভাগে মনোনীত হয়েছেন অনুবাদক রওশন জামিল অনূদিত আলেক্সান্ডার দ্যুমার উপন্যাস ‘কালো টিউলিপ’। 

‘অনুবাদ সাহিত্য পুরস্কার-২০২১’ প্রদান করতে যাচ্ছে বাংলা ট্রান্সলেশন ফাউন্ডেশন।

এ পুরস্কারের জন্য ‘অনুবাদ সাহিত্য পুরস্কার: আজীবন সম্মাননা-২০২১’ বিভাগে মনোনীত হয়েছেন অনুবাদক আলম খোরশেদ।

‘অনুবাদ সাহিত্য পুরস্কার: বর্ষসেরা অনূদিত বই-২০২১’ বিভাগে মনোনীত হয়েছেন অনুবাদক রওশন জামিল অনূদিত আলেক্সান্ডার দ্যুমার উপন্যাস ‘কালো টিউলিপ’।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আগামী ৩০ নভেম্বর জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের হাতে এ-পুরস্কার তুলে দেয়া হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। এতে প্রধান আলোচক থাকবেন কথাসাহিত্যিক, কবি ও অনুবাদক মাসরুর আরেফিন।

অনুবাদক অধ্যাপক খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলা ট্রান্সলেশন ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক অনুবাদক আনিসুজ জামান।

পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে অনুবাদ সাহিত্য পত্রিকা ‘যুক্তস্বর’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হবে।

বাংলাদেশের অনুবাদ সাহিত্য নিয়ে কাজ করাই বাংলা ট্রান্সলেশন ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য। অনুবাদ পুরস্কার প্রবর্তন ও প্রদান এবং ‘যুক্তস্বর’ নামে অনুবাদ সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে চলতি বছর বাংলা ট্রান্সলেশন ফাউন্ডেশন যাত্রা শুরু করেছে।

প্রতিবছর প্রকাশিত অনূদিত বই থেকে একটিকে বর্ষসেরা হিসেবে পুরস্কৃত করা হবে। এর অর্থমূল্য পঞ্চাশ হাজার টাকা। আর একজন অনুবাদককে দেশের অনুবাদ-সাহিত্যে তার সামগ্রিক অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হবে। এর অর্থমূল্য এক লাখ টাকা।

আরও পড়ুন:
লালনের তিরোধান দিবসে সম্মাননা পাচ্ছেন ৭ গবেষক-সাধক
লালন তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠান এবারও হচ্ছে না
লালন হত্যা মামলার ২ আসামি গ্রেপ্তার
এবার হচ্ছে না লালন সাঁইয়ের দোল উৎসব
৭ মাস পর খুলল লালনের আখড়াবাড়ি

শেয়ার করুন

‘পেন বাংলাদেশ’ সাহিত্য পুরস্কার পেলেন ২০ তরুণ লেখক

‘পেন বাংলাদেশ’ সাহিত্য পুরস্কার পেলেন ২০ তরুণ লেখক

‘পেন বাংলাদেশ’ সাহিত্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ২০ তরুণ লেখক পেলেন পুরস্কার। ছবি: সংগৃহীত

অনুষ্ঠানে কথাসাহিত্যিক পারভেজ হোসেন বলেন, ‘শুধু লেখক কেন, সবারই কথা বলার স্বাধীনতা থাকা উচিত। ক্ষমতা আজীবন গলা টিপে ধরেছে, আগামীতেও ধরবে। তবু এর মধ্যে বলার চেষ্টার মানসিকতা রাখা জরুরি। সে কাজটাই প্রতিবছর আমাদের পেন বাংলাদেশ মনে করিয়ে দেয়। বিশ্বে এমন অনেক লেখক এখনও কারাবন্দি, আমরা তাদের মুক্তি চাই।’

অনূর্ধ্ব-৩৫ সাহিত্য প্রতিযোগিতা-২০২০-এ অংশগ্রহণকারী দেশের প্রায় ৩০০ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ২০ জন তরুণ লেখককে পুরস্কৃত করেছে ‘পেন বাংলাদেশ’।

কারাবন্দি লেখক দিবস উপলক্ষে শনিবার ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস (ইউল্যাব) মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রতিযোগীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়।

এ সাহিত্য প্রতিযোগিতার আয়োজক প্রতিষ্ঠান পেন বাংলাদেশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

গল্পের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন মনিরা মিতু, আরাফাত শাহীন, নবনীতা প্রামাণিক, আবদুল্লাহ্ আল মাসুম, মৌপিয়া তাজরিন, ওয়াহিদ মোস্তফা, যাহিদ সুবহান, রোমেল রহমান, সুলতান মাহমুদ ও মুহাম্মদ মাসুদ।

কবিতার জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন রনি বর্মণ, ইনজামুল হক, শুভ্র সাকীফ, অনুভব আহমেদ, জসিম উদ্দিন বিজয়, তামান্না পারভেজ, রফিকুজ্জামান রণি, জেলি খাতুন ও অহ নওরোজ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গল্প লেখার শুরুর দিক নিয়ে নিজের শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।

তিনি বলেন, ‘আমি কখনো ভাবিনি লেখক হব। শিক্ষক ও মা-বাবার সহযোগিতায় আমি সাহিত্যিক হয়েছি। আমি সাহিত্যিক হব তা ভেবে কখনো গল্প লিখিনি। পড়াশোনা-জীবনে সিলেট এমসি কলেজে চাকরি পাই। তবে সে চাকরি বাদ দিই। তারপর বাংলা একাডেমিতে চাকরির জন্য গেলাম এবং লেখালেখির অভ্যাস থাকায় সেখানে চাকরি হলো। এভাবে সাহিত্য আমাদের দিককে প্রসারিত করতে থাকে।’

কথাসাহিত্যিক পারভেজ হোসেন বলেন, ‘শুধু লেখক কেন, সবারই কথা বলার স্বাধীনতা থাকা উচিত। ক্ষমতা আজীবন গলা টিপে ধরেছে, আগামীতেও ধরবে। তবু এর মধ্যে বলার চেষ্টার মানসিকতা রাখা জরুরি। সে কাজটাই প্রতিবছর আমাদের পেন বাংলাদেশ মনে করিয়ে দেয়। বিশ্বে এমন অনেক লেখক এখনও কারাবন্দি, আমরা তাদের মুক্তি চাই।’

পেন বাংলাদেশ হচ্ছে ‘পেন ইন্টারন্যাশনাল’-এর ১৪৮টি কেন্দ্রসমূহের একটি শাখা। এটি বাংলাদেশের কবি, সাহিত্যিক, প্রকাশক, সম্পাদক, অনুবাদক, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদদের একটি দ্বিভাষিক সংগঠন, যা বাংলাদেশে সাহিত্যের প্রচার-প্রসার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার্থে কাজ করে।

আরও পড়ুন:
লালনের তিরোধান দিবসে সম্মাননা পাচ্ছেন ৭ গবেষক-সাধক
লালন তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠান এবারও হচ্ছে না
লালন হত্যা মামলার ২ আসামি গ্রেপ্তার
এবার হচ্ছে না লালন সাঁইয়ের দোল উৎসব
৭ মাস পর খুলল লালনের আখড়াবাড়ি

শেয়ার করুন

শিল্পী হামিদুজ্জামানের ৪৩তম একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী শুরু

শিল্পী হামিদুজ্জামানের ৪৩তম একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী শুরু

প্রদর্শনীতে অতিথিদের শিল্পকর্ম দেখাচ্ছেন শিল্পী হামিদুজ্জামান। ছবি: সংগৃহীত

নানা মাপের ক্যানভাসে সেসব চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্যে কখনও মূর্ত, কখনও বিমূর্ততায় যেন ধরা দিয়েছে শিল্পীর ‘সৃষ্টির অন্বেষণে’ সব শিল্পকর্ম। যেসব শিল্পকর্ম সাম্প্রতিক সময়েই সৃষ্টি করেছেন শিল্পী।

বরেণ্য ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী হামিদুজ্জামানের শতাধিক শিল্পকর্ম নিয়ে গ্যালারি চিত্রকে শুরু হলো ৪৩তম একক প্রদর্শনী।

‘সৃষ্টির অন্বেষণে’ শিরোনামে এ প্রদর্শনী শুক্রবার বিকেল ৫টায় উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বে করেন খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী।

শিল্পী হামিদুজ্জামানের ৪৩তম একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী শুরু
শিল্পীর সঙ্গে প্রদর্শনী ঘুরে দেখছেন অতিথিরা। ছবি: সংগৃহীত

জলরং, অ্যাক্রিলিক ও কালি-কলমে আঁকা শতাধিক চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য স্থান পেয়েছে এই প্রদর্শনীতে।

নানা মাপের ক্যানভাসে সেসব চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্যে কখনও মূর্ত, কখনও বিমূর্ততায় যেন ধরা দিয়েছে শিল্পীর ‘সৃষ্টির অন্বেষণে’ সব শিল্পকর্ম। যেসব শিল্পকর্ম সাম্প্রতিক সময়েই সৃষ্টি করেছেন শিল্পী।

শিল্পী হামিদুজ্জামানের ৪৩তম একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী শুরু
প্রদর্শনী ঘুরে দেখছেন দর্শনার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত

চিত্র সমালোচকের ভাষায় হামিদুজ্জামানের এই প্রদর্শনীটি শিল্পরসিকদের কাছে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করবে বলে বিশ্বাস, শিল্পীর নিজের অভিমতও তাই।

৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত (গ্যালারি চিত্রক, রোড-৪, বাড়ি-২১/এ, ধানমন্ডি) চলবে এই প্রদর্শনী। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

আরও পড়ুন:
লালনের তিরোধান দিবসে সম্মাননা পাচ্ছেন ৭ গবেষক-সাধক
লালন তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠান এবারও হচ্ছে না
লালন হত্যা মামলার ২ আসামি গ্রেপ্তার
এবার হচ্ছে না লালন সাঁইয়ের দোল উৎসব
৭ মাস পর খুলল লালনের আখড়াবাড়ি

শেয়ার করুন

সঞ্জীবের চলে যাওয়ার ১৪

সঞ্জীবের চলে যাওয়ার ১৪

সঞ্জীব চৌধুরী। ছবি: নিউজবাংলা

১৯৯৬ সালে বাপ্পা মজুমদারসহ কয়েকজনকে নিয়ে সঞ্জীব তৈরি করেন গানের দল ‘দলছুট’, যা তাকে এনে দেয় খ্যাতি। তবে মিছিলে মিছিলে মুক্তির গান গাওয়া সঞ্জীব প্রায় অজানা এক মানুষ, কিন্তু তার ‘রাশপ্রিন্ট’- এ খুঁজে পাওয়া যায় সেই সঞ্জীবকে। তবে তিনি বেশি সাধারণের হয়ে উঠেছিলেন তার গানের মাধ্যমে।

‘গাড়ি চলে না’, ‘বায়োস্কোপ’, ‘কোন মেস্তরি নাও বানাইছে’র মতো লোকগানগুলোকে নাগরিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছেন তিনি। নব্বইয়ের দশক থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে টগবগে এ যুবক গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে রাজপথে গানে গানে বলে গেছেন গণমানুষের কথা।

তার গানে গানে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে প্রেম, বিরহ, সমাজ, রাজনীতি, বিদ্রোহ ও প্রতিবাদের কথা, তিনি সঞ্জীব চৌধুরী।

আজ সব্যসাচী সেই মানুষটির চলে যাওয়ার দিন। যিনি একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার, গায়ক, সাংবাদিক, নাট্যকার ও সংগঠক।

১৯৯০ সালে প্রকাশিত সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিস্পর্ধী গদ্য ‘রাশপ্রিন্ট’। বলা উত্ত্যুক্তি হবে না যে বইটি সে সময়ের নথীকৃত দৃশ্যগাথা।

আশির দশকের স্বৈরাচারী সরকার রাষ্ট্র-ক্ষমতা দখল করে আমাদের সমাজ আর মগজে যে পৈশাচিক দখলদারত্ব কায়েম করেছিল ‘রাশপ্রিন্ট’ তারই গদ্য-কল্প।

১৯৯৬ সালে বাপ্পা মজুমদারসহ কয়েকজনকে নিয়ে সঞ্জীব তৈরি করেন গানের দল ‘দলছুট’, যা তাকে এনে দেয় খ্যাতি।

তবে মিছিলে মিছিলে মুক্তির গান গাওয়া সঞ্জীব প্রায় অজানা এক মানুষ, কিন্তু তার ‘রাশপ্রিন্ট’-এ খুঁজে পাওয়া যায় সেই সঞ্জীবকে।

তবে তিনি বেশি সাধারণের হয়ে উঠেছিলেন তার গানের মাধ্যমে। ৪৩ বছর বেঁচেছেন তিনি। কাজের হিসেবে এই সময়েই তার অর্জন বিশাল। যেখানে সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই কাজ করেছেন এ ক্ষণজন্মা। সংগীতে নানাভাবে পাওয়া গেছে তাকে।

‘আমি ঘুরিয়া ফিরিয়া সন্ধান করিয়া, স্বপ্নের অই পাখি ধরতে চাই’ গানটিতে কোনো এক স্বপ্নবাজ সঞ্জীবকে খুঁজে পাওয়া যায়।

আবার ভালোবাসার মধুর স্মৃতি মনে করে তিনি গেয়ে ওঠেন ‘তোমার বাড়ির রঙের মেলায়’।

একজন প্রেমিক সঞ্জীবের দেখা বেশ ভালোভাবেই পাওয়া গেছে তার সৃষ্টিকর্মে। ‘সাদা ময়লা রঙ্গিলা পালে’, ‘হাতের উপর হাতের পরশ’, ‘চোখটা এত পোড়ায় কেন’, ‘তোমার ভাঁজ খোলো আনন্দ দেখাও’, ‘হৃদয়ের দাবি’, ‘আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ’সহ আরও বেশ কিছু জনপ্রিয় গান রয়েছে সঞ্জীবের।

এসব গানের মাধ্যমেই সঞ্জীবের বিভিন্ন স্বপ্ন ও কথা বয়ে বেড়ায় এ প্রজন্মের তরুণেরা। তাই তো এখনও কোনো তরুণ প্রাণের আড্ডায় বা মাঝরাতে ফাঁকা রাস্তায় কেউ গেয়ে ওঠে ‘আমি তোমাকেই বলে দেব/কী যে একা দীর্ঘ রাত আমি হেঁটে গেছি বিরাণ পথে/ছুঁয়ে কান্নার রং, ছুঁয়ে জ্যোছনার ছায়া’।

১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার মাকালকান্দি গ্রামে জন্ম এই শিল্পীর। ২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর বাই লেটারেল সেরিব্রাল স্কিমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আরও পড়ুন:
লালনের তিরোধান দিবসে সম্মাননা পাচ্ছেন ৭ গবেষক-সাধক
লালন তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠান এবারও হচ্ছে না
লালন হত্যা মামলার ২ আসামি গ্রেপ্তার
এবার হচ্ছে না লালন সাঁইয়ের দোল উৎসব
৭ মাস পর খুলল লালনের আখড়াবাড়ি

শেয়ার করুন

হাসান আজিজুল ‘উন্নত চিন্তার যুগের প্রতিনিধি’

হাসান আজিজুল ‘উন্নত চিন্তার যুগের প্রতিনিধি’

কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। ছবি: সংগৃহীত

আনিসুল হক বলেন, ‘আমাদের পঞ্চাশের দশকের প্রধান লেখকরা সবাই চলে গেলেন। ষাটের দশকের প্রধান লেখকরাও চলে যাওয়া শুরু করেছেন। তারপর কিন্তু ৭০ দশক থেকে আমাদের আমি মনে করব, সাহিত্যের মানটা নিম্নগামী হয়েছিল। মানে আমাদের শ্রেষ্ঠ লেখকরা চলে গেছেন।

রাজশাহীতে নিজ বাসায় ১৫ নভেম্বর মৃত্যু হয় দুই বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের। তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে একটা যুগের অবসান হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

কেউ কেউ আবার বলছেন, হাসান আজিজুল বাংলা সাহিত্যে ক্লাসিক্যাল বা ধ্রুপদি যুগের সর্বশেষ সাহিত্যিক। এ নিয়ে সমকালীন লেখক-সাহিত্যিকদের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা।

তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির, সৈয়দ শামসুল হক এবং সবশেষ হাসান আজিজুল হকের বিদায়ে একটা যুগের অবসান হয়েছে কি না। এই শূন্যতাকে কীভাবে দেখছেন?’

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

কথাসাহিত্যিক ও সাহিত্য সমালোচক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘নাহ ক্ল্যাসিক যুগ বলা যাবে না। এটা তিনি (হাসান আজিজুল হক) কখনো বলেনও নাই। এগুলো আমরা মনগড়া কিছু শ্রেণীকরণ করে ফেলি। এটা তো ঠিক না। যেটা উনি করতেন সেটা জীবনঘনিষ্ঠ, জীবননিষ্ঠ সাহিত্যের চর্চা করতেন এবং যে সমস্ত মানুষ, যাদেরকে আমরা নিচুতলার বলি, তাদেরকে তাদের সম্পর্কে তার গভীর একটা মমত্ববোধ ছিল।

‘এ দেশের সংস্কৃতি, এ দেশের ভাষা, এ দেশের ইতিহাস, যদিও তিনি জন্মগতভাবে পশ্চিমবঙ্গের, তার ভাষার ভেতরে সেই টান রয়ে গিয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশকে তিনি অসম্ভব ভালোবাসতেন। মানুষের প্রতি তার একটা ভালোবাসা ছিল এবং তার সাহিত্যে তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন, কিন্তু সাহিত্যে তিনি কোনো শ্রেণিবিভাগ করেননি। কারণ যে মুহূর্তে আমি বলছি ক্ল্যাসিক, তখন একটা মনগড়া শ্রেণি আমি গড়ে ফেলছি। তার সঙ্গে শ্রেণি, শিক্ষা এসবই জড়িত হয়ে যায়। এগুলো তিনি কখনো আমলে নিতেন না।’

হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে অন্য লেখকদের রচনাশৈলীর পার্থক্য তুলে ধরে মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি যেটা বলতে পারি যে, শহীদুল জহির একদমই আলাদা সাহিত্য লিখতেন। তারা প্রত্যেকে আলাদা লিখতেন। আবদুল মান্নান সৈয়দ আলাদা লিখতেন। তাকেও মনে করা উচিত আমাদের। হাসান আজিজুল হক যেটা লিখতেন সেটা হচ্ছে, তিনি ইতিহাসকে নিয়ে খুব ভাবতেন, বিশেষ করে দেশ বিভাগের পর যে গভীর কিছু বিষাদ মানুষকে স্পর্শ করেছিল, যেটাকে আমরা বলি ট্র্যাজেডি, বিচ্ছিন্নতা, মানুষে মানুষে হানাহানি, মানে এক ধরনের সমাজের দুষ্টু ক্ষতটা বেরিয়ে এসেছিল। যেটা পরে আমাদের দেশের সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি আরও বেশি উসকে দিয়েছিল।

‘এ বিষয়গুলো তাকে খুব পীড়িত করত। তো তিনি খোলা মনে লিখতেন, মানুষের নৈতিক-নান্দনিক অবস্থা পরিবর্তনের তাগিদ দিতেন। ব্যক্তির মূল্য, তা তিনি তার লেখালেখিতে তুলে ধরতেন। আর ইতিহাসের ক্ষতগুলো সারিয়ে তুলে মানুষ যেন ইতিহাস থেকে একটা শিক্ষা নেয়। আর সংস্কৃতি হচ্ছে মানুষের পুনরুজ্জীবনের জন্য মানুষকে সঞ্জীবিত রাখার জন্য একটা অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, সক্রিয়তার ক্ষেত্র। সেটা যেন কখনো অপসংস্কৃতি হয়ে না দাঁড়ায়, সেই বিষয়গুলো উনি অনেক যত্ন নিয়ে লিখতেন। সে জন্য তার মতো লেখক খুব প্রয়োজন। এ জন্য যে সমাজটা খুবই জটিল হচ্ছে।’

হাসান আজিজুল হকের চিন্তা টিকিয়ে রাখতে সমকালীন লেখক-সাহিত্যিকদের কিছু করণীয় আছে বলে মনে করেন সৈয়দ মনজুরুল।

তিনি বলেন, ‘হানাহানি বাড়ছে, মতবাদ উগ্র থেকে উগ্রতর হচ্ছে আর সংস্কৃতির ক্ষেত্রটা ক্রমশই সংকুচিত হচ্ছে। এই বিষয়গুলো যদি আমরা হতে দিই, তাহলে তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা, সেটা আর দেখানো হবে না। তাকে কোনো বিশেষ শ্রেণিতে না রেখে আমরা বলি তিনি মানুষের জন্য লিখতেন। খুব উন্নত জীবনের আশা করতেন মানুষের। উন্নত জীবন মানে বৈষয়িক দৃষ্টিতে না, উন্নত জীবন মানে সাংস্কৃতিক এবং চিন্তাচেতনাগত, সেটা তিনি চাইতেন।

‘এটা যদি আমরা করতে দিই, হতে দিই, সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখি, সংস্কৃতি থেকে প্রেরণা নিই এবং নিম্নবর্গীয় বলে যারা অবহেলিত, তাদের জীবনের দিকে দৃষ্টি দিই, সাহিত্যকে জীবনের অংশ করে ফেলি, বই পড়ার চর্চাটা বাড়াই, তাহলে তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানানো হবে। এগুলোই তিনি বলতেন। এগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। সে অর্থে তিনি সেই যুগের প্রতিনিধি হিসেবে যুক্ত ছিলেন উন্নত চিন্তার, পরিশ্রমের, সহমর্মিতার, সহনশীলতার। এটাই ক্রমাগত হারিয়ে যাচ্ছে।’

আনিসুল হক

কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বলেন, ‘৫০-৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন, তারা একই সঙ্গে এর জনক ও সন্তান। যেমন: কবি শামসুর রাহমান। উনি বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন, আবার বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনের ফলে পূর্ববঙ্গে যে নতুন একটা আধুনিকতা তৈরি হলো সেটার সন্তানও কিন্তু। তারা সেই সুফলটা ভোগও করলেন। ৫২ সাল তৈরিও করেছেন এরা, এর মধ্য দিয়ে যে একটা লেখকশ্রেণি তৈরি হলো, এরা হলেন তারা।

‘সেই ব্যাচটা পুরোটা চলে গেছে। সেটা ধরেন সৈয়দ শামসুল হকই বলেন, শহীদ কাদরী, শামসুর রাহমান, আল-মাহমুদ ওই একটা ব্যাচ যেটা ৫২ সালের ফসল যারা ছিলেন, তারা চলে গেছেন। পরের ব্যাচ হচ্ছে ষাটের দশক। হাসান আজিজুল হক অনেক সিনিয়র, উনি পঞ্চাশের দশকেরই।’

তিনি বলেন, ‘ষাটের দশকের হচ্ছেন নির্মলেন্দু গুণ। এটা হচ্ছে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের নেতৃত্বে একটা আন্দোলন হয়েছিল। সেখানে ছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। শহীদুল জহির আরও অনেক পরে। শহীদুল জহির মোটামুটি স্বাধীনতার পরবর্তীকালে বাংলা ভাষায় নতুন সাহিত্যিক হয় নাই বললেই চলে, সেখানে আমাদের একজন পাওয়া গিয়েছিল, সেটা হচ্ছে শহীদুল জহির।

‘কাজেই তিনজন তিন জেনারেশন একচুয়ালি। কাজেই আপনি যে মিলটা পাচ্ছেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আর হাসান আজিজুল হকের, তাদের সঙ্গে ছিলেন শওকত আলী। তারা লেখক শিবির… বাংলাদেশে যারা বামপন্থি কথাসাহিত্যিক ছিলেন, সেই ঘরানার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আর হাসান আজিজুল হক। সে জন্য এই নাম দুটো একসঙ্গে উচ্চারণ করা হয়। যাই হোক, আমাদের যুগাবসানটা… আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বেশ আগেই মারা গেছেন, খুব অল্প বয়সে মারা গেছেন। তার অল্প বয়সে মারা যাওয়াটা গ্রেট লস। কারণ উনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বড় একটা উপন্যাসের কাজ শুরু করেছিলেন। ওটা তিনি শেষ করতে পারলেন না, সেটা গ্রেট লস।

‘শহীদুল জহিরও খুবই অল্প বয়সে মারা গেছেন এবং বাংলাদেশে উত্তরাধুনিক যেটা একটু জাদুবাস্তবতা মেলানো লেখা, নতুন ধারার প্রবর্তন করতে আরম্ভ করেছিল, ওটাও একটা গ্রেট লস। যেকোনো চলে যাওয়াও লস, কিন্তু এদের মধ্যে আমার মনে হয় হাসান আজিজুল হক আবার খুব শিল্প। ওনার মধ্যে শিল্পিতা ছিল, উনি যদিও বামপন্থি, যদিও লেখক শিবির, কিন্তু ওনার লেখার মধ্যে সৌন্দর্য এবং মানুষের কথা…ফর্মুলার লেখক না। আমার মনে হয় যে, আমাদের বড় প্রধান লেখক ছিলেন। সবাই শেষ হয়ে গেলেন। আনিসুজ্জামান স্যার মারা গেলেন। এখন আমি চোখের সামনে দেখি নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার। অল্প কজন বেঁচে আছেন।’

লেখকদের প্রয়াণ নিয়ে আনিসুল বলেন, ‘আমাদের পঞ্চাশের দশকের প্রধান লেখকরা সবাই চলে গেলেন। ষাটের দশকের প্রধান লেখকরাও চলে যাওয়া শুরু করেছেন। তারপর কিন্তু ৭০ দশক থেকে আমাদের আমি মনে করব, সাহিত্যের মানটা নিম্নগামী হয়েছিল। মানে আমাদের শ্রেষ্ঠ লেখকরা চলে গেছেন।

‘ফলে একটা বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে তাই। ওই আগের জমানার আরেকজন আছেন, সেটা সেলিনা আপা, সেলিনা হোসেন। ভাষা আন্দোলনের জনক এবং সন্তান যারা ছিলেন, যারা আমাদের সাহিত্যের উজ্জ্বল প্রতিনিধি ছিলেন, তারা সবাই চলে গেলেন।’

শাহীন আখতার

কথাসাহিত্যিক শাহীন আখতার বলেন, ‘লেখকের মৃত্যু মানে মুছে যাওয়া নয়। তার সৃষ্টিকর্ম পেছনে রয়ে যায়, পরবর্তী লেখকের জন্য পাঠকের জন্য। সে অর্থে শূন্যতা তৈরি হয়, তা বলা যাবে না, তবে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির অসময়ে চলে গেছেন। অপার সম্ভাবনাময়, অতুলনীয় দুজন সাহিত্যিক। আরও অসংখ্য ভালো লেখা আমরা তাদের কাছ থেকে পেতে পারতাম। তাদের প্রস্থান সত্যিই অপূরণীয় ক্ষতি।

‘শ্রদ্ধেয় হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক যথেষ্ট সাহিত্যকর্ম রেখে গেছেন। হাসান স্যারের ছোটগল্পগুলো তো ম্যাজিক মনে হয়। এমন গল্প কমই লেখা হয়েছে। সৈয়দ হক তো সব্যসাচী, সর্বত্রগামী। যে বয়সের মৃত্যুই হোক, তা বেদনার, কষ্টের। সে শূন্যতা আরেকজন এসে ভরতে পারবে না। আমি মনে করি, লেখকের লেখা পড়াই তার প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা প্রকাশের উপায়। সাড়ম্বরে শোক প্রকাশের চেয়ে বই পড়াটা আমি নিশ্চিত যে, প্রয়াত লেখকেরা তা চাইতেন।’

শাহনাজ মুন্নী

লেখক শাহনাজ মুন্নী বলেন, ‘আমরা তো হারাবই, কেউ তো সারা জীবন থাকবে না। এটা গ্রহণ করতেই হবে। সব সময় একটা যুগ শেষ হয়; আরেকটা যুগ আসে। সেটা সাহিত্য কেন, সব ক্ষেত্রেই সত্য। ওনারা যখন শুরু করেছিলেন সেই পঞ্চাশ-চল্লিশের দশকে, তার পর থেকে দীর্ঘ সময় ওনারা বাংলা সাহিত্যকে, বাংলা ভাষাকে অনেক সমৃদ্ধ করেছেন। এখন নতুন প্রজন্ম, তার পরের প্রজন্ম সেই দায়িত্ব নেবে।

‘তাদের যে ক্ষমতা, তাদের যে নিষ্ঠা, তাদের যে সাধনা, সেটা দিয়ে সেই জায়গাটা নিতে হবে। এখন ভাবতে পারি যে, যে মানের সাহিত্যকর্ম তারা করে গেছেন…তারা তো আসলে ক্ল্যাসিক যুগের লোক ছিলেন, একেবারেই ধ্রুপদি যুগের। সেই মানের সাহিত্যচর্চা আমরা করছি কি না বা আমাদের যারা আছেন বেঁচে, তারা সেই জায়গাটা দখল করতে পারবে কি না বা সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে কি না, সে রকম একটা প্রশ্ন হতে পারে।’

পরবর্তী প্রজন্মের দায়িত্ব নিয়ে শাহনাজ মুন্নি বলেন, ‘আমি বলব যে, তারপরের প্রজন্মের যারা আছেন, তারা তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন এবং ওই রিলে রেসের মতো একজনের হাত থেকে মশালটা আরেকজনের হাতে যাচ্ছে। এখন কে কতখানি অন্ধকার দূর করতে পারছেন, সেটা হয়তো সময়ই বলে দেবে।

‘কারণ যে সময়ে ওনারা লিখেছেন সেই সময় তো আর নাই, অনেক পালটে গেছে। এখন মানুষের জীবনে যোগাযোগ বেড়েছে, মানুষের বিনোদনের হাজারটা মাধ্যম বেড়েছে, যেগুলো আগের দিনে ছিল না। তার মধ্যে সাহিত্য টিকে আছে তার মতো করে।’

এ প্রজন্মের প্রবণতা নিয়ে শাহনাজ মুন্নি বলেন, ‘এখন হয়তো কাগজের বই ছেড়ে মানুষ ডিজিটাল বুক পড়ার দিকে যাচ্ছে। তারপর মানুষের জীবন অনেক ব্যস্ত হয়ে গেছে। তারা লম্বা উপন্যাস পড়ে কি না, তারা কাগজের বই পড়ে কি না, এ রকম অনেক প্রশ্ন আসছে। আসলে আমি যেটা করি যে, মানবজীবনটাই এ রকম। মানবসভ্যতাটাই এ রকম। এক অবস্থা থেকে আমরা আরেক অবস্থার দিকে যাচ্ছি।’

সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে এ লেখক বলেন, ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দিকে যাচ্ছি। আমরা সমাজের একটা র‍্যাডিক্যাল পরিবর্তন, একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। তার মধ্যেও সাহিত্য আছে। সাহিত্য একটা চিরন্তন জিনিস।

‘সেটি থাকবে, যুগ পরম্পরাই থাকবে এবং যারা এর মধ্যে ভালো লিখবেন, তারা টিকবেন। যারা সাধনা করে যাবেন, তারা হয়তো পূর্বসূরিদের পথ ধরে এগিয়ে যাবেন এবং এটি চলমান থাকবে।’

আরও পড়ুন:
লালনের তিরোধান দিবসে সম্মাননা পাচ্ছেন ৭ গবেষক-সাধক
লালন তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠান এবারও হচ্ছে না
লালন হত্যা মামলার ২ আসামি গ্রেপ্তার
এবার হচ্ছে না লালন সাঁইয়ের দোল উৎসব
৭ মাস পর খুলল লালনের আখড়াবাড়ি

শেয়ার করুন

জাদুঘরের নিদর্শন সুরক্ষায় বিল

জাদুঘরের নিদর্শন সুরক্ষায় বিল

বিলে জাদুঘরের নিদর্শনের ওপর খোদাই করলে বা লিখলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

বিলে বলা হয়, জাদুঘরের স্থাবর নিদর্শন কেউ ধ্বংস বা ক্ষতি করলে ১০ বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর অস্থাবর নিদর্শন চুরি, পাচার, ধ্বংস, নষ্ট, পরিবর্তন বা ক্ষতি করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের জেল বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

জাদুঘরে সংরক্ষিত নিদর্শন ধ্বংস বা ক্ষতি করলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রেখে ‘জাতীয় জাদুঘর বিল, ২০২১’ নামে সংসদে একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে।

একাদশ জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশনের পঞ্চম দিন বৃহস্পতিবার বিলটি উত্থাপন করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ।

পরে বিলটি পরীক্ষা করে রিপোর্ট দিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।

বিলে বলা হয়, জাদুঘরের স্থাবর নিদর্শন কেউ ধ্বংস বা ক্ষতি করলে ১০ বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর অস্থাবর নিদর্শন চুরি, পাচার, ধ্বংস, নষ্ট, পরিবর্তন বা ক্ষতি করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের জেল বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

এ ছাড়া কেউ জাদুঘরের নিদর্শনের ওপর খোদাই করলে বা কিছু লিখলে সর্বোচ্চ এক বছরের জেল ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা হবে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী সামরিক শাসনামলে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিলের ধারাবাহিকতায় এই বিলটি আনা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ রহিত করে নতুন আইনটি প্রণয়ন করা হচ্ছে।

বিলে বলা আছে, জাদুঘরের পরিচালনায় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী। আর জাদুঘরের মহাপরিচালক সরকার নিয়োগ করবে।

আগের আইনে জাদুঘরের কিউরেটর পদ ছিল না, তবে সংসদে আনা বিলে কিউরেটরের পাশাপাশি সহকারী কিউরেটর পদও রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন:
লালনের তিরোধান দিবসে সম্মাননা পাচ্ছেন ৭ গবেষক-সাধক
লালন তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠান এবারও হচ্ছে না
লালন হত্যা মামলার ২ আসামি গ্রেপ্তার
এবার হচ্ছে না লালন সাঁইয়ের দোল উৎসব
৭ মাস পর খুলল লালনের আখড়াবাড়ি

শেয়ার করুন