শক্তি বাড়িয়ে ছন্দে ফিরছে বাপেক্স

শক্তি বাড়িয়ে ছন্দে ফিরছে বাপেক্স

আগামী দিনের জ্বালানি সংকট সমাধানে তেল-গ্যাসের খনি অনুসন্ধান কার্যক্রমে আগের চেয়ে গতি এনেছে বাপেক্স। ছবি: সংগৃহীত

বর্তমানে আবিষ্কৃত ২৮টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে ২০টি থেকে দৈনিক কমবেশি ২ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। অনেক গ্যাসক্ষেত্রের উপরিভাগের মজুত কমে আসায় সরকার ভূগর্ভের আরও গভীরে কূপ খননের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ জন্য সাড়ে ৭ হাজার মিটার সক্ষমতার রিগ সংগ্রহ করছে বাপেক্স।

২০৪১ সাল সামনে রেখে চলতি বছর রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্স হাতে নিয়েছে ২০ বছরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

চলমান গ্যাসসংকট এবং বিশ্ববাজারে লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস বা এলএনজিসহ জ্বালানি পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বাড়ায় বাপেক্সের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গতি ফিরেছে।

বিশ্ববাজারে অব্যাহতভাবে জ্বালানি পণ্যের দর বাড়ায় এ খাতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর আগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে। দেশি কোম্পানি বাপেক্সের সেই সুযোগ লুফে নিয়ে নিজেদের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা বাড়িয়ে নেয়ার সুযোগ এসেছে।

বর্তমান সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে অনশোরে ৪১টি (প্রসপেক্ট ম্যাচিউরড সাপেক্ষে) অনুসন্ধান কূপ, ৪৫টি উন্নয়ন কূপ খনন এবং ২৯টি কূপের ওয়ার্কওভার করার পরিকল্পনা নিয়েছে।

মডেল পিএসসি-২০১২ পরিমার্জন করে আলাদাভাবে অনশোর মডেল পিএসসি-২০১৯ এবং অফশোর মডেল পিএসসি-২০১৯ প্রণয়ন করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হলে নতুন বিডিং রাউন্ড ঘোষণা করা হবে।

বর্তমানে আবিষ্কৃত ২৮টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে ২০টি থেকে দৈনিক কমবেশি ২ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে।

অনেক গ্যাসক্ষেত্রের উপরিভাগের মজুত কমে আসায় সরকার ভূগর্ভের আরও গভীরে কূপ খননের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ জন্য সাড়ে ৭ হাজার মিটার সক্ষমতার রিগ সংগ্রহ করছে বাপেক্স।

উচ্চচাপের কারণে দুর্ঘটনার ভয়ে যেসব কূপ বা ক্ষেত্র অব্যবহৃত রয়েছে, উন্নত প্রযুক্তি আবিষ্কার হওয়ায় এখন সেসব ক্ষেত্রেও কূপ খননের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আবার যেসব স্থানে জরিপ ও কূপ খননে বাপেক্সের সক্ষমতা নেই, সেসব স্থানে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের সিদ্ধান্ত এসেছে।

শ্রীকাইল নর্থ, মোবারকপুর সাউথ ইস্ট-১, সুনেত্র-২, শৈলকূপা-১ ও সাভার-সিঙ্গাইর-১-এ ৫ হাজার মিটারেরও বেশি গভীরে কূপ খননের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আবার পটিয়া, সীতাকুণ্ড, আটগ্রাম, মুলাদি, কসবা-১ ও ৩, সুন্দলপুর-১ কূপে অনুসন্ধান ও উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এগুলো শুষ্ক, পরিত্যক্ত ও স্থগিত কূপ হিসেবে পড়ে ছিল।

অন্যদিকে জলদী, সীতাপাহাড়, ওলাতাং, লাম্বাঘোনা, মাতামুহুরী, বান্দরবান ওয়েস্ট, বিলাইছড়ি, বরকল ও গোবামুড়া এলাকায় অনুসন্ধান ও কূপ খননের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই কাজে অংশীদার নেবে বাপেক্স।

৮ ও ১১ নম্বর ব্লকে (জামালপুর, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা) অনুসন্ধানে জাপানি প্রতিষ্ঠান মিতসুই ওয়েল এক্সপ্লোরেশন কোম্পানি (এমওইসিও) এবং বাপেক্সের মধ্যে সমঝোতা সই হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বিগত সরকারগুলোর সময়ে কাজ না হওয়ার কারণে আমরা কিছুটা পিছিয়ে রয়েছি। কূপ খনন করার জন্য যে টুডি-থ্রিডি সিসমিক সার্ভের প্রয়োজন হয়, সেগুলোও তারা করেনি। এগুলো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সেই ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।

‘কেবল স্থল নয়, সাগরেও মাল্ট্রিক্লেইন সার্ভে হবে। ফলে বহুজাতিক কম্পানিগুলো আগ্রহী হবে। তাদের সঙ্গে বাপেক্সকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এতে বাপেক্সের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা বাড়বে। সেই সঙ্গে বাপেক্সকে আর্থিক, যান্ত্রিক ও লোকবলে শক্তিশালী করা হচ্ছে।’

স্বাধীনতার পর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশে ৬৮টি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালের পর সরকারের আমলে ১৭ বছরেই খনন হয়েছে ৩৩টি।

তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর একই সময়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যেই কেবল খনন করা হয়েছে ১৬০টি অনুসন্ধান কূপ।

পেট্রোবাংলার দেয়া তথ্য মতে, জ্বালানি খাত সবচেয়ে অবহেলিত ছিল বিএনপি শাসনামলে। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে তিনটি সরকারের সময় আটটি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদের মধ্যে ১২ বছরে ২০টি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়। এর মধ্যে চারটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র এবং ১৬টি নতুন স্তর আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত খনন করা হয় ১৩টি অনুসন্ধান কূপ।

বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রথম কূপ খনন করা হয় ব্রিটিশ আমলে ১৯১০ সালে। এরপর ১১০ বছরে মাত্র ৯৫টি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে। এতে করে ২৮টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করা হয়েছে।

শক্তি বাড়িয়ে ছন্দে ফিরছে বাপেক্স

সিলেটের হরিপুর গ্যাসক্ষেত্র। ফাইল ছবি

এর বাইরে মোবারকপুর, কসবা ও কুতুবদিয়ার মতো কয়েকটি ফিল্ড রয়েছে, যেগুলোতে গ্যাস পেলেও বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য নয় বলে ঘোষণা করা হয়নি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ নেওয়াজ খালিস আহমেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ভূ-কাঠামো অনুযায়ী রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ এলাকায় তেল-গ্যাস পাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় হাইড্রোকার্বন স্তর দেখা যাচ্ছে। এই সীমানাটি আরও বড় হতে পারে। বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যে ধরনের স্তরে তেলের সন্ধান পেয়েছে বাংলাদেশেও এ ধরনের ৪৯টি ভূ-কাঠামো রয়েছে।’

বাপেক্সের সাবেক এমডি মুর্তজা আহমেদ ফারুক চিশতী বলেন, ‘কুচমায়, সিংড়া, মোবারকপুরে গ্যাস শো ছিল, বগুড়ায় তেলের সম্ভাবনা ছিল। অশোকনগরে তেল আবিষ্কার নর্থ পার্টে নিশ্চয়ই গুরুত্ব বাড়বে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ অনশোরে আরও বেশি বেশি কূপ খনন করা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সাকসেস রেট খুবই ভালো। তারপরও যেভাবে এক্সপ্লোরেশন হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে হয়নি।’

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব আনিছুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কভিড-১৯ শুরুর এক বছর চার মাসের মধ্যে আমরা একটি নতুন গ্যাসক্ষেত্রসহ তিনটি গ্যাসকূপ খনন করেছি এবং ওয়ার্কওভার করেছি আরও চারটি। এই সাতটিতে আমরা দৈনিক ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিতে পারছি। এটি আমাদের জন্য খুবই একটি পজিটিভ দিক। এত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও আমরা এ কাজগুলো করতে পেরেছি। আশা করছি, নভেম্বরের মধ্যে আরও চারটি নতুন কূপ খননের কাজ শুরু করতে পারব। একটি শরীয়তপুরে আর তিনটি হবে ভোলায়।’

সম্ভাবনা দেশজুড়েই

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে তেল ও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা দেশজুড়েই। এখনও অনাবিষ্কৃত অনেক সম্ভাবনার অনেক অঞ্চল জরিপের বাইরে রয়ে গেছে। এর মধ্যে আছে বিশাল সমুদ্র অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং দেশের পশ্চিমাঞ্চল।

সাগরে বাংলাদেশের সীমানার ওপার থেকে গ্যাস তুলছে মিয়ানমার। পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমানার ওপার থেকে ১১৬টি কূপ দিয়ে গ্যাস তুলছে ত্রিপুরা। পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা অশোকনগরে তেল আবিষ্কার করেছে ভারত।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, নাটোরের সিংড়ার পর কুচমায় একটি, বগুড়ায় দুটি এবং দিনাজপুরে একটি কূপ খনন করা হয়। বগুড়া ও সিংড়ার তেলের উপস্থিতি পায় খননসংশ্লিষ্টরা। বর্তমান সরকার পাবনার মোবারকপুরে কূপ খনন করেছে।

কূপটিতে গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, গ্যাসের চাপও ভালো ছিল। নিচে হাইপ্রেসার জোন থাকায় পরে আর বেশি কাজ করা হয়নি। কারণ দুর্ঘটনা এড়িয়ে চলতে চায় রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটি। এই অঞ্চলটিতে দুই থেকে তিন টিসিএফ গ্যাস মজুতের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

শক্তি বাড়িয়ে ছন্দে ফিরছে বাপেক্স

প্রস্তুত বাপেক্স

অনেক সময় প্রতিষ্ঠানটি বেশির ভাগ ক্ষেত্র আবিষ্কার করেও উত্তোলন ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ পায় না। বাপেক্সের আবিষ্কৃত ক্ষেত্রগুলোয় কূপ খনন, উত্তোলন ও ব্যবস্থাপনার কাজ দেয়া হয় বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোতে। প্রশ্ন আছে বাপেক্সের সক্ষমতারও।

তবে সংস্থাটির এমডি মোহাম্মদ আলী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বাপেক্স এখন ৫ হাজার মিটারের বেশি ৭ হাজার মিটার সক্ষমতার রিগ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া সব ধরনের বিশেষজ্ঞ নিয়োগের কাজ শেষ করেছে।

‘বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কাজ করা অভিজ্ঞ কর্মীদের নিয়োগ দিয়েছে বাপেক্স। একই সঙ্গে অবসরে চলে যাওয়া অভিজ্ঞ বাপেক্স কর্মীদেরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে ধরে রাখা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার চায় বাপেক্সকে শক্তিশালী করে দেশের গ্যাসসংকট মোকাবিলা করতে। আমরা সেই চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত।’

শক্তি বাড়িয়ে ছন্দে ফিরছে বাপেক্স

দক্ষিণে নজর

ভোলায় গ্যাস পাওয়ার পরই দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর দিকে নজর দিয়েছে বাপেক্স। বিশেষ করে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা ও বরিশালের বিস্তীর্ণ এলাকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় মাত্রার জরিপ চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রীয় কোম্পানিটি।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা মনে করছি, ওই এলাকায় আরও গ্যাস পাওয়া যেতে পারে।’

তৃতীয়মাত্রার একটি জরিপ পরিচালনার জন্য ২৩৭ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হয়েছে। নোয়াখালীর সুবর্ণচর ছাড়াও ভোলার চরফ্যাশন, লালমোহন, তজুমোদ্দিন, বোরহানউদ্দিন উপজেলাজুড়ে অনুসন্ধান চালানো হবে।

তৃতীয় মাত্রার জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে সেখানে অনুসন্ধান কূপ খনন করা হবে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ৩০ জুন এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে।

একই সময়ে একটি দ্বিতীয় মাত্রার ভূতাত্ত্বিক জরিপও চালানো হবে। তাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫৫ কোটি টাকা। অনুসন্ধান এলাকার মধ্যে আছে শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও বরিশালের কিছু এলাকা।

শরীয়তপুরেও কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে বাপেক্স। এ জন্য ৯৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ২৬ জুলাই এই প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ করতে চায় কোম্পানিটি।

এর আগে এই এলাকায় দ্বিমাত্রিক জরিপ চালিয়ে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানায় বাপেক্স। যদিও কূপ খননের আগে কোথাও গ্যাস রয়েছে এমনটা ঘোষণা করা যায় না।

দেশে শুধু সিলেট এলাকায় গ্যাসের বড় মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হতো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণের জেলাগুলোর প্রতিও বিশেষ নজর দেয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন:
ভোলায় নতুন আরও তিন গ্যাস কূপ
গ্যাস সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা
বরগুনায় সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্র থেকে নমুনা সংগ্রহ
সিএনজি স্টেশন বিকেল ৫টা-রাত ১১টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার আদেশ
ঢাকার কোন এলাকায় গ্যাস থাকছে না রোববার

শেয়ার করুন

মন্তব্য

ইউনিক আইডি করতে জন্ম নিবন্ধনের জটিলতা কেন

ইউনিক আইডি করতে জন্ম নিবন্ধনের জটিলতা কেন

প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি করা হচ্ছে স্কুলগুলোয়। এটি করতে গিয়ে অনেক অভিভাবকই ভোগান্তিতে পড়ছেন বলে জানা গেছে। মূল সমস্যাটি দেখা দিচ্ছে শিশুর অনলাইন জন্ম নিবন্ধন নিয়ে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মা-বাবার জন্ম নিবন্ধনের প্রয়োজন পড়ছে।

দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর জন্য ‘ইউনিক আইডি’ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মৌলিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত সব তথ্য থাকবে। কিন্তু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ইউনিক আইডি ফরম পূরণে পড়ছেন নানা জটিলতায়। বিশেষ করে শিশুর জন্ম নিবন্ধনের পাশাপাশি মা-বাবার জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট চাওয়া হচ্ছে।

এ অবস্থায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রশ্ন: কী হবে এই ‘ইউনিক আইডি’ দিয়ে?

প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মৌলিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য এক জায়গায় রাখার জন্য ইউনিক আইডি তৈরি করা হচ্ছে বলে জানান এ প্রকল্পের পরিচালক অধ্যাপক শামসুল আলম।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার প্রত্যেক নাগরিককে একটি আইডি দিয়ে চিহ্নিত করার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বিশ্বের ১১টি দেশের সঙ্গে সরকার এ বিষয়ে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর নাম দেয়া হয়েছে সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস (সিআরভিএস)।

শামসুল আলম জানান, এর আওতায় দেশের বেসিক স্ট্যাটিসটিকস তৈরি হবে। অফিস অফ রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয় বর্তমানে কোনো শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন করছে। আর যারা ১৮ বছরের ওপরে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) আছে। এই দুই স্তরে আইডেন্টিফিকেশন নম্বর আছে। কিন্তু মাঝখানে বাদ পড়ে যাচ্ছে প্রি-প্রাইমারি থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা, যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। এদের আইডেন্টিফিকেশনের আওতায় আনার জন্যই ইউনিক আইডি তৈরি করা হচ্ছে।

১৮ বছর পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা সব ধরনের সেবা ইউনিক আইডির মাধ্যমে পাবে জানিয়ে তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থীর সব ধরনের সেবা, যেমন বই নেয়া থেকে শুরু করে ফল প্রকাশ, রেজিস্ট্রেশন, বৃত্তি, উপবৃত্তির অর্থ নেয়া অর্থাৎ যত ধরনের নাগরিক সেবা আছে সবই দেয়া হবে এই আইডির মাধ্যমে। আর যখন শিক্ষার্থীর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হবে তখন নির্বাচন কমিশন সচিবালয় তাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে এই ইউনিক আইডিই জাতীয় পরিচয়পত্রে রূপান্তর করবে।

শামসুল আলম আরও বলেন, ‘এই ইউনিক আইডির মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীদের খুঁজে পাব, তারা কোথায় লেখাপড়া করছে, ঝরে পড়ল কি না, অথবা তারা কোন লেভেলে পড়াশোনা করছে, চাকরি পেল কি না ইত্যাদি।’

ইউনিক আইডি চালু হলে অনেক ক্ষেত্রে সরকারের অপচয়ও বন্ধ হবে বলে জানান তিনি। বলেন, ‘উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সঠিক পরিসংখ্যান না থাকায় অনেক সময় আমরা চাহিদার চেয়ে বেশি পরিমাণ বই ছাপাচ্ছি। এতে অনেক টাকা অপচয় হচ্ছে। যখন ইউনিক আইডি তৈরি হয়ে যাবে, তখন কোনো ডুপ্লিকেট শিক্ষার্থী থাকবে না। কারণ তখন শিক্ষার্থীর সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের হাতে থাকবে।

ফরমে যেসব তথ্য দিতে হয়

স্ট্যাবলিশমেন্ট অফ ইন্টিগ্রেটেড এডুকেশনাল ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আইইআইএমএস) প্রকল্পের আওতায় তৈরি করা চার পৃষ্ঠার ফরমে শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

ফরমে শিক্ষার্থীর নাম, জন্ম নিবন্ধন নম্বর, জন্মস্থান, জেন্ডার, জাতীয়তা, ধর্ম, অধ্যয়নরত শ্রেণি, রোল নম্বর, বৈবাহিক অবস্থা, প্রতিবন্ধিতা (ডিজ-অ্যাবিলিটি), রক্তের গ্রুপ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কি না, মা-বাবার নামসহ বেশ কিছু তথ্যের ঘর রয়েছে।

বৈবাহিক অবস্থার অপশন হিসেবে অবিবাহিত, বিবাহিত, বিধবা, বিপত্নীক ছাড়াও স্বামী-স্ত্রী পৃথক বসবাস, তালাকপ্রাপ্ত, বিবাহবিচ্ছেদের ঘরও রয়েছে ফরমে।

ইউনিক আইডির তথ্য ভুল হলে তা সংশোধনের কোনো সুযোগ আছে কি না- এমন প্রশ্নে প্রকল্প পরিচালক শামসুল আলম বলেন, ‘শিক্ষার্থী এবং বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন এবং জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে আমরা বেশির ভাগ তথ্য নেব। সেখানে যদি কোনো ভুল থাকে, তাহলে আমাদের কিছুই করার নেই। সংশোধন করতে হলে আগে জন্ম নিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্র ঠিক করতে হবে।

‘জন্ম নিবন্ধনে শিক্ষার্থীর নাম, বাবা-মার নাম মিল থাকার বিষয়টি সবাইকে খেয়াল করার অনুরোধ করছি। এই নির্দেশনা মানলে আর কোনো সমস্যা হবার কথা নয়।’

ইউনিক আইডির ফরমে যেসব তথ্য শিক্ষার্থীরা দিচ্ছেন, তা যেন কোনোভাবে অন্যের হাতে না যায় তা নিশ্চিতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক শামসুল আলম। বলেন, ‘শিক্ষার্থীর তথ্য সুরক্ষায় আমরা বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছি। কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে, যেন তথ্য বেহাত না হয়। এর বেশি বলা সম্ভব নয়।’

ইউনিক আইডি করতে জন্ম নিবন্ধনের জটিলতা কেন

ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর জন্য ‘ইউনিক আইডি’ তৈরি করতে তথ্য সংগ্রহের ফরম। ছবি: নিউজবাংলা

জন্ম নিবন্ধন নিয়ে ভোগান্তি

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত প্রভাতী উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর ইউনিক আইডির কাগজপত্র নিয়ে স্কুলে এসেছেন অভিভাবক রাবেয়া সুলতানা। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে জানায়, শিক্ষার্থীর ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধনের সঙ্গে অভিভাবকের ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধনও লাগবে। তা না হলে তার ইউনিক আইডির কাগজ জমা নেয়া হবে না।

একই অভিযোগ করলেন রাজধানীর একাধিক বিদ্যালয়ের অভিভাবকরা। তেমনই একজন স্বপ্না রাণী। তিনি বলেন, ‘বাচ্চার ইউনিক আইডির জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন চাওয়া হচ্ছে। আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। তাহলে কেন আবার জন্ম নিবন্ধন লাগবে?’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউনিক আইডির প্রকল্প পরিচালক শামসুল আলম বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে এখন জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। তাই আমরা ধরে নিতেই পারি, সব শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধন আছে। যারা স্কুলে ভর্তিই হয়নি, তাদের জন্ম নিবন্ধন নাও থাকতে পারে।

‘সমস্যা হলো জন্ম নিবন্ধনের কোনোটা ম্যানুয়াল, কোনোটা ডিজিটাল। যেসব শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধন ম্যানুয়াল, তাদের ডিজিটাল অর্থাৎ অনলাইনে এন্ট্রি দেয়া জন্ম নিবন্ধন লাগবে। কারণ ইউনিক আইডি দেয়ার অন্যতম শর্ত হলো শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র বা অনলাইন জন্ম নিবন্ধনের সঙ্গে মিল থাকতে হবে শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধনের।

‘যদি কোনো শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকে তাহলে সে ইউনিক আইডি পাবে না। কারণ আমরা শিক্ষার্থীদের তথ্যগুলো পাঠাব অফিস অফ রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে। তারপর সেখান থেকে যাবে নির্বাচন কমিশনে। এরপর তারা ইউনিক আইডি তৈরি করবে। এটাই সিস্টেম। এ জন্য কোনো শিক্ষার্থীর যদি অনলাইন জন্ম নিবন্ধন না থাকে তাহলে সে ইউনিক আইডি পাবে না।’

অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন করতে কিছু শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের নানা ভোগান্তিতে পড়ার কথা স্বীকার করেন শামসুল আলম। বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আসলে আমাদের কিছুই করার নেই। জন্ম নিবন্ধন অনলাইনে এন্ট্রি দেয়ার জন্য অফিস অফ রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় অনেক আগেই অফিস আদেশ জারি করেছে।’

শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধনে বাবা-মার জন্ম নিবন্ধন কেন প্রয়োজন হয়- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন করতে গেলে শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন আগে করে নিতে হবে। এটা জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন-২০১৯ অনুযায়ী করা হচ্ছে। সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সব নাগরিকের জন্ম নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। যদি কেউ তা না করে তাহলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’

যেসব শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন নেই, তাদের করণীয় কী- এমন প্রশ্নে শামসুল আলম বলেন, ‘যেসব শিক্ষার্থীর অনলাইন জন্ম নিবন্ধন ইতিমধ্যে করা আছে, তাদের বাবা-মায়ের শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেই শিক্ষার্থী ইউনিক আইডি পাবে। আর যেসব শিক্ষার্থীর অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন এখনও করা হয়নি, তাদের জন্ম নিবন্ধন করতেও বাবা-মায়ের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন লাগবে। এটা আইনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে।’

শিক্ষার্থীরা ইউনিক আইডি পাবে কবে?

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের আশা, আগামী বছরের শুরুতে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ১ কোটি ৬০ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেয়া সম্ভব হবে ইউনিক আইডি।

জানতে চাইলে মাধ্যমিক পর্যায়ের ইউনিক আইডির প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক মো. শামসুল আলম বলেন, ‘আগামী ৩০ নভেম্বর শেষ হবে ইউনিক আইডির ফরম পূরণের কার্যক্রম। এরপর ডাটা এন্ট্রি দেয়া হবে। আশা করছি, আগামী বছরের শুরুতেই পর্যায়ক্রমে ১ কোটি ৬০ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে ইউনিক আইডি তুলে দেয়া সম্ভব হবে। তবে এর আগে মুজিববর্ষ উপলক্ষে ডিসেম্বরে আমরা কিছু উপজেলায় ইউনিক আইডি বিতরণের পরিকল্পনা করছি।’

জানা গেছে, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিক আইডির ডাটা এন্ট্রির সফটওয়্যার তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। আশা করা হচ্ছে, আগামী মাস থেকে ডাটা এন্ট্রি দেয়া শুরু হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে তৈরি হবে ২ কোটির বেশি ইউনিক আইডি।

প্রাথমিকের ইউনিক আইডির প্রকল্প পরিচালক মো. মঞ্জুরুল আলম প্রধান বলেন, ‘প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরির জন্য বিদ্যালয় পর্যায়ে আগামী মাস থেকে সফটওয়্যারে ডাটা এন্ট্রি শুরু হবে। এ জন্য সফটওয়্যার তৈরির কাজ শেষপর্যায়ে। এরপর পাইলটিং হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানের ৮০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরি করা হবে। এরপর সেটি সফল হলে পুরোদমে শুরু হবে কাজ।’

আরও পড়ুন:
ভোলায় নতুন আরও তিন গ্যাস কূপ
গ্যাস সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা
বরগুনায় সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্র থেকে নমুনা সংগ্রহ
সিএনজি স্টেশন বিকেল ৫টা-রাত ১১টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার আদেশ
ঢাকার কোন এলাকায় গ্যাস থাকছে না রোববার

শেয়ার করুন

সাকির ‘পর্যবেক্ষণে থাকা’ নুর ছাড়ছেন না জোটের আশা

সাকির ‘পর্যবেক্ষণে থাকা’ নুর ছাড়ছেন না জোটের আশা

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি (বাঁয়ে) এবং ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর।

নুরুল হক নুরের অনুসারীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। এমন প্রেক্ষাপটে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলছেন, তারা এই অভিযোগের ভিত্তিতে নুরের সংগঠনের পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। অন্যদিকে নুর বলছেন, সাকি তার ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে টকশোতে বক্তব্য দিয়েছেন। এর প্রভাব জোট গঠন প্রক্রিয়ায় পড়বে না।

দুর্গাপূজায় চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িত অভিযোগে ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন ছাত্র, যুব, শ্রমিক ও পেশাজীবী অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের নাম এসেছে। এছাড়া বিভিন্ন সভা-সমাবেশে নুরের বক্তব্যও তৈরি করেছে সমালোচনা।

এমন পরিস্থিতিতে নুরুল হক নুরের বক্তব্যের দায় নিতে অস্বীকার করছেন তার সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি। সাম্প্রদায়িক হামলার অভিযোগ দূর করতে নুরের সংগঠন কী সিদ্ধান্ত নেয়- তা দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়ার কথাও জানিয়েছেন সাকি। সম্প্রতি একটি সংবাদ মাধ্যমের টকশোতে এ বিষয়ে বক্তব্য দেন সাকি।

তবে জোনায়েদ সাকির এমন বক্তব্য রাজনৈতিক জোট প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলেনি বলে দাবি করেছেন ছাত্র, যুব, শ্রমিক ও পেশাজীবী অধিকার পরিষদের সমন্বয়ক নুরুল হক নুর। সাম্প্রদায়িক হামলায় নিজের সংগঠনের নেতাকর্মীদের দোষ খুঁজে না পাওয়ার দাবিও করেছেন তিনি।

সাকির বক্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে নুরুল হক নুর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি শুনেছি। প্রোগ্রামটা আমি দেখছি। এটা ঠিক আছে। আসলে, যার যার স্ট্যান্ড থেকে, আপনি ধরেন যেকোনো দলের ক্ষেত্রেও কোনো নেতা বক্তব্য দিলেও তাহলে বলে এটা তার ব্যক্তিগত অবস্থান।’

নুর বলেন, ‘সাকি ভাই যেহেতু বাম রাজনীতির মধ্যে, ইয়াং লিডারদের মধ্যে একজন রাইজিং এই সময়ে। সেলিম ভাই, মেনন ভাই, ইনু ভাইরা তো সেই আমলের। কিন্তু বাংলাদেশের বাম রাজনীতিতে দেখতে গেলে সাকি ভাই একটা ফিগার। সেই জায়গা থেকে উনাকে নানাভাবে বিতর্কিত করার একটা প্রচেষ্টা থাকে। উনি অ্যাজ ইউজুয়ালি কথা বলেছেন। আমরা ফ্রেন্ডলি বা জয়েন্টলি কাজ করতে পারি।’

নুর দেশের বাম নেতাদের মধ্যে গণসংহতির জোনায়েদ সাকিকে এগিয়ে রাখলেও গত ১ আগস্ট সাকি নিউজবাংলাকে জানিয়েছিলেন, তিনি নিজেকে বামপন্থি মনে করেন না।

আফগানিস্তানের তালেবানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে জোনায়েদ সাকির মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি তখন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কী বলবো বলেন। আমি বামপন্থি না। এটা নিয়ে সিপিবিকে জিজ্ঞেস করেন অথবা বাম জোটের সমন্বয়কে জিজ্ঞেস করেন। আমরা তো গণ মানুষের রাজনীতি করি। আমরা মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক ধারায় গণ মানুষের রাজনীতি করি।’

আরও পড়ুন: চীন-তালেবান বন্ধুত্ব: বাংলাদেশের বামপন্থিদের কী অবস্থান?

সাম্প্রতিক টকশোতে জোনায়েদ সাকির মন্তব্যের পরেও জোটগত রাজনীতি প্রশ্নে এখনও নিজের অবস্থান ‘পজিটিভ’ বলে দাবি করেন নুর।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হ্যাঁ, জোট প্রসঙ্গে তো পজিটিভ। আমাদের আলোচনা ছিল, আমরা একটা পার্টি করতে পারি কিনা। তাদের একটা পার্টি, আমাদের একটা পার্টি, জয়েন্টলি আরও ছোট ছোট পার্টি, ওই আলোচনা আছে এখনও।’

গত বছরের নভেম্বরে মাওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী একসঙ্গে পালনের মধ্য দিয়ে জোটগতভাবে এগিয়ে চলার ঘোষণা দেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি এবং ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর।

তাদের সঙ্গে আরও ছিলেন ভাসানী অনুসারী পরিষদের মহাসচিব শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু এবং রাষ্ট্রচিন্তার হাসনাত কাইয়ুম। এরপর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এই চারটি সংগঠন তাদের যৌথ কর্মসূচি ঘোষণা করে।

এ প্রসঙ্গে নুর বলেন, ‘মাওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী পালনের মধ্য দিয়ে চারটা সংগঠন জাতীয় ইস্যুতে কিছু কিছু কর্মসূচি পালন করেছিলাম এবং এখনও করছি, নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন আলাপ আলোচনা করে। একটা ঐক্যমতে পৌঁছানো এবং কমন কিছু রাজনৈতিক ইস্যুকে সামনে রেখে, আমরা এই মুহূর্তে একটা পার্টি বা একটা জোট আকারে কাজ করেত পারি কি-না, এই আলোচনাটা আমাদের এখনও চলছে।’

বিষয়টি নিয়ে নিউজবাংলা জোনায়েদ সাকির সঙ্গেও কথা বলেছে। তিনি বলেন, ‘নুরের দল বলে কিছু আমি জানি না। ছাত্র, যুব, শ্রমিক ও পেশাজীবী অধিকার পরিষদ নামে যে দল আছে সেখানে নুর একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, তাকে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।’

নুরের সঙ্গে রাজনৈতিকে জোটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমরা একদিকে আমাদের জাতীয় দিবসগুলো পালন করব, তার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের মধ্যে আমাদের আলাপ আলোচনাগুলো করব- কোথায় মিল আছে, কোথায় আরও বেশি আলাপ আলোচনার প্রয়োজন আছে।’

লেখক মোশতাক আহমেদের কারাগারে মৃত্যুর পরপর ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নাগরিক আন্দোলনেও নুর যুক্ত হয়েছেন বলে জানান জোনায়েদ সাকি।

তিনি বলেন, ‘নুরুল হক নুর এবং তার নেতৃত্বে তাদের ছাত্র যুব অধিকার পরিষদ সেই সংগঠনটা যুক্ত আছে। সে কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কখনও কখনও একসঙ্গে প্রোগ্রাম করলে তাদের সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমাদের দেখা হচ্ছে, আমাদের কোনো কর্মসূচিতে তারা এসেছেন, আমরাও তাদের ডাকে কোনো কোনো কর্মসূচিতে গিয়েছি।’

চট্টগ্রামে গণসংহতির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে ছাত্র, যুব, শ্রমিক ও পেশাজীবী পরিষদের নেতারা অংশ নেন। দুর্গাপূজা ও পূজা পরবর্তী সাম্প্রদায়িক হামলার সঙ্গে তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক বলেন, ‘আমি সংবাদ মাধ্যমে দেখেছি, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখতে পাচ্ছি যে, তাদের মধ্যে একজন অভিযুক্ত হয়েছেন। তিনি এমন একটা মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যে মিছিল থেকে পরবর্তীকালে জেএম সেন হলের পূজামণ্ডপে হামলা করা হয়।’

জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘আমরা তো নিঃসন্দেহে এ ধরনের ঘটনার তদন্ত চাইব এবং আমাদের অবস্থান খুব পরিষ্কার। অন্য দলের তো বটেই, আমাদের দলেরও যদি কেউ কখনও কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়, বিশেষ ভাবে মন্দিরে হামলার মতো অপরাধ, তার বিচার এবং শাস্তি আমরা নিশ্চিতভাবেই চাইব।’

তবে কয়েক জন ব্যক্তির অপরাধের জন্য পুরো দলকে দায়ী করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন সাকি। তিনি বলেন, ‘একজন ব্যক্তি বা কতিপয় ব্যক্তির জন্য পুরো দল তো আর দায়ী হয় না। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে সেটাই হচ্ছে সেই দলের দিক থেকে... এখন আমরা দেখছি, ছাত্র যুব অধিকার পরিষদের কর্মীদের ব্যাপারে যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে সে অভিযোগের ভিত্তিতে তারা কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।’

জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘এটা আমাদেরও যেমন পর্যবেক্ষণে আছে, আমাদের অন্যান্য শরিক দলগুলো, যারা আমরা একসঙ্গে কাজ করি, সবারই পর্যবেক্ষণে আছে। আমরা আশা করব, এই বিষয়ে তাদের যে সাংগাঠনিক তদন্ত ও ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে নিশ্চিত হয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন অথবা তাদের অবস্থান স্পষ্ট করবেন।’

এরপরই জোট নিয়ে গণসংহতি সিদ্ধান্ত নেবে জানিয়ে সাকি বলেন, ‘তা তো বটেই, সেটা তো একটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ব্যাপার।’

আরও পড়ুন:
ভোলায় নতুন আরও তিন গ্যাস কূপ
গ্যাস সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা
বরগুনায় সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্র থেকে নমুনা সংগ্রহ
সিএনজি স্টেশন বিকেল ৫টা-রাত ১১টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার আদেশ
ঢাকার কোন এলাকায় গ্যাস থাকছে না রোববার

শেয়ার করুন

দ্য লাস্ট ফেরি

দ্য লাস্ট ফেরি

লেবুখালী ঘাটের শেষ ফেরির যাত্রীদের একজন ছিলেন নিপা রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিন এই রুটে ফেরিতে যাতায়াত করি। আজও ফেরিতে চড়ে কাজে গেলাম। ফিরব সেতু দিয়ে। ফেরিতে নানা দুর্ভোগ থাকলেও এই অভিজ্ঞতা মিস করব।’

১৮ বছর ধ‌রে লেবুখা‌লীতে ফে‌রি চালা‌চ্ছেন জা‌কির হাওলাদার। পায়রা সেতুতে গাড়ি চলাচল শুরু হওয়ায় রোববার এই নৌপথে শেষবারের মতো ফেরি চালিয়েছেন তিনি।

এই দক্ষ চালকের হাত ধরে শেষ হলো একটি অধ্যায়ের। এই পথে আর কখনও দেখা মিলবে না ফেরির। লেবুখালী ঘাট থেকে রোববার বেলা সোয়া ১১টার দিকে শেষ ফেরিটি নিয়ে অন্য পাড়ে রওনা দেন জাকির।

ঘাট ছাড়ার আগে ছলছল করে ওঠে জাকিরের চোখ। এক যুগের বেশি সময়ের পেশাগত জীবনের কতশত স্মৃতি মনে পড়ে তার। কথা বলতে গিয়ে শুরুতে গলাটা ধরে আসে জাকিরের। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেন তিনি। জানান, এক মিশ্র অনুভূতিতে ডুবে আছেন। এখান থেকে চলে যেতে হবে, সেই বিচ্ছেদ যেমন তাকে পোড়াচ্ছে আবার যাত্রীরা সহজেই গন্তব্যে পৌঁছাবেন, সেই আনন্দে ভাসছেন তিনি।

প‌ু‌রো যৌবনই তার এখানে কেটেছে জানিয়ে জাকির বলেন, ‘এখন বগায় ফে‌রি চালা‌তে হ‌বে। এখান থে‌কে সাত দিন পর বগা, বেকুটিয়াসহ বি‌ভিন্ন রু‌টে চ‌লে যাব। অ‌নেক স্মৃ‌তি এখা‌নে। কষ্ট লাগ‌ছে, কিন্তু ভা‌লোও লাগ‌ছে।’

‘আমা‌দের সরকা‌রি চাকরি। কো‌নো আ‌ক্ষেপ নেই, বরং খু‌শি আমরা। কেননা এই অঞ্চ‌লের সাধারণ মানু‌ষের কষ্ট শেষ হ‌চ্ছে পায়রা সেতুর মাধ‌্যমে। এর জন‌্য আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হা‌সিনার কা‌ছে কৃতজ্ঞ।’

শেষ ফেরিতে আল্লাহর দান পরিবহনের একটি বাসের যাত্রী সঞ্জিত মিত্রর সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার। তিনি জানান, শেষ ফেরির যাত্রী হতেই ঘুরতে গিয়েছেন।

দ্য লাস্ট ফেরি
শেষ ফেরির চালক জাকির হাওলাদার

ওই বাসের যাত্রীদের একজন নিপা রহমান জানান, তিনি পটুয়াখালী সদরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক; বাড়ি বরিশালের নথুল্লাবাদে। কাজে যোগ দিতে প্রতিদিনই তাকে ফেরিতে চড়ে পায়রা পাড়ি দিতে হতো।

‘আজও ফেরিতে চড়ে কাজে গেলাম। ফিরব সেতু দিয়ে। ফেরিতে নানা দুর্ভোগ থাকলেও এই অভিজ্ঞতা মিস করব।’

ফেরির আরেক বাসের যাত্রী মো. জাকির নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওষুধ কোম্পানির বিক্রিয় প্রতিনিধি হওয়ায় কাজের স্বার্থে বরিশালের বাকেরগঞ্জ থেকে পটুয়াখালী শহর ও কুয়াকাটায় দিনে দুই থেকে তিনবার যাওয়া-আসা করা লাগে।

‘ফেরিতে বেশ ভোগান্তি হতো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা লাগত। এখন সেতু চালু হওয়ায় দিনে আপ-ডাউন করতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা আমার সেভ হবে। আজ ফেরির শেষ যাত্রার সাক্ষী হলাম।’

এই রুটের আরেক ফেরির চালক মাহাবুবুর রহমান ব‌লেন, ‘চার‌টি ফে‌রি এখা‌নে নিয়মিত চলাচল ক‌রত। আ‌মি দুই বছর ধ‌রে এখা‌নে ফে‌রি চালাই। ফে‌রি এখা‌নে বন্ধ হ‌য়ে যাওয়ায় আমারও খারাপ লাগ‌ছে, ত‌বে ভা‌লো লাগাটা বে‌শি। পায়রা সেতু উদ্বোধনের ম‌ধ্য দি‌য়ে নতুন মাত্রা সৃ‌ষ্টি হ‌য়ে‌ছে এই অঞ্চ‌লে। আমার নতুন কর্মস্থল এখন বেকু‌টিয়ায়।’

দ্য লাস্ট ফেরি

লেবুখা‌লীর ফে‌রিগু‌লো‌তে চালক ও যাত্রীদের পছন্দের খাবার চিড়া ভাজা। ফেরি চলাচল বন্ধের খবরে বিক্রেতাদের চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ।

বা‌কেরগ‌ঞ্জের শাহজাহান সিকদার জানান, লেবুখালী ঘাটে দুই বছর ধরে হাশেমের চিড়া ভাজা বিক্রি করছেন তিনি। তাতে ভালোমতোই চলছিল সংসার।

শাহজাহান নামে চিড়া বিক্রেতা বলেন, ‘সেতু চালু হইয়া গে‌ল। এখন কী করমু বুঝ‌তা‌ছি না। ঢাহায় আত্মীয়স্বজন থা‌হে‌। হে‌গো ল‌গে কথা কই‌ছি কা‌মের লইগ্গা। মাথায় কাম ক‌রে না কো‌নো‌। ঘ‌রে তো সব না খাইয়া থাক‌বে‌।’

২০ বছর ধ‌রে সেখানে চিড়া বি‌ক্রি কর‌ছেন আ‌নোয়ার হাওলাদার। তি‌নি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সু‌বিদখালী বা‌ড়ি আমার। হা‌শে‌মের চিড়া ভাজা ফে‌রি‌তে বে‌চি ২০ বছর ধইরা‌। ডেই‌লি ২ হাজার টাহা বেচ‌তে পার‌লে মা‌লিক ৫০০ টাহা দেয়। ব্রিজ উ‌দ্বোধন হই‌তে আ‌ছে আইজ। এরপর যে কী করমু বু‌ঝি না। ঘ‌রে পোলাপান, বাপ-মা আ‌ছে। ক্যাম‌নে কী করমু?’

ক্রেতারাও জানালেন, এই চিড়া ভাজার কথা তাদের সব সময় মনে পড়বে।

দ্য লাস্ট ফেরি

ফেরির যাত্রী র‌হিম শেখ ব‌লেন, ‘লেবুখা‌লী ফে‌রি‌তে উঠ‌লেই হা‌শে‌মের চিড়া ভাজা কিনতাম। মূলত এই চিড়া ভাজা লেবুখা‌লী ফেরিকে কেন্দ্র করেই বি‌ক্রি হতো। শুধু আ‌মি নই, অসংখ‌্য মানুষ হা‌শে‌মের এই চিড়া ভাজা মিস কর‌বেন।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার বেলা ১১টায় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে পটুয়াখালীর লেবুখালীতে পায়রা নদীর ওপর বহুল প্রতিশ্রুত সেতুর উদ্বোধন করেছেন। এর মধ্য দিয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সড়ক যোগাযোগের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। পাশাপাশি শেষ হয়েছে বরিশাল-কুয়াকাটা রুটের ফেরির দিন।

পায়রা সেতু চালু হওয়ায় বরিশাল থেকে বাসে কুয়াকাটা যেতে এখন সময় লাগবে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার বা মোটরসাইকেলে আরও দ্রুত যাওয়া যাবে এই অঞ্চলের পর্যটন স্পটগুলোতে।

আরও পড়ুন:
ভোলায় নতুন আরও তিন গ্যাস কূপ
গ্যাস সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা
বরগুনায় সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্র থেকে নমুনা সংগ্রহ
সিএনজি স্টেশন বিকেল ৫টা-রাত ১১টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার আদেশ
ঢাকার কোন এলাকায় গ্যাস থাকছে না রোববার

শেয়ার করুন

৪৫ মাস ধরে ঝুলছে ষোড়শ সংশোধনী মামলার রিভিউ

৪৫ মাস ধরে ঝুলছে ষোড়শ সংশোধনী মামলার রিভিউ

এ রিভিউ নিষ্পত্তির ওপর নির্ভর করছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থা থাকা না থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশিষ্টজনরা বলছেন, রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি দ্রুত মীমাংসা হওয়া উচিত।   

দেশের সর্বোচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় প্রায় চার বছর ধরে পড়ে আছে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন। এ রিভিউ নিষ্পত্তির ওপর নির্ভর করছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থা থাকা না থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিশিষ্টজনরা বলছেন, রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি দ্রুত মীমাংসা হওয়া উচিত।

মামলাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এলে স্বাভাবিক কোর্ট চালু হলেই মামলাটি শুনানি হতে পারে।

তবে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, রিভিউ শুনানির জন্য আদালতের তালিকায় এলে শুনানি হবে। কবে নাগাদ তালিকায় আসবে সেটি দিনক্ষণ দিয়ে বলতে পারছেন না কেউই।

উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। সেই সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হলে হাইকোর্ট রুল জারি করে। এরপর রুলের চূড়ান্ত শুনানি করে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট।

এ রায়ের বিপক্ষে আপিল করা হলে আপিল বিভাগও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। এরপর রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। কিন্তু রিভিউ আবেদনের পর প্রায় চার বছর কেটে গেলেও নিষ্পত্তি হয়নি আবেদনটির।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রিভিউ নিষ্পত্তি করবেন আদালত। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আমরা আবেদন করে রেখেছি। এখন আদালত শুনানির জন্য তালিকায় আনলে অবশ্যই আমরা শুনানি করব।’

রাষ্ট্রপক্ষ দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রিভিউ শুনানির জন্য আমরা তো প্রস্তুত আছি। এখন আদালত যখন শুনানির জন্য তালিকা দেবেন, তখন শুনানি হবে। আদালত না দিলে আমরা তো আর তালিকায় আনতে পারি না।’

তিনি বলেন, ‘অন্য একটি মামলার রিভিউ শুনানির জন্য আমি আদালতকে বলেছিলাম। আদালত বলেছে, রিভিউগুলো একসঙ্গে শুনানি করবে। সপ্তাহে এক দিন আদালত রিভিউগুলো শুনবে। এখন আদালতের তালিকায় এলেই শুনানি হবে।’

এ মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নিয়মিত আদালত ছাড়া এ মামলার শুনানি সম্ভব নয়। এখন তো আপিল বিভাগ ভার্চুয়ালি চলছে। ভার্চুয়াল কোর্টে এ মামলার শুনানি করা কষ্টসাধ্য হবে। তার কারণ এটি দীর্ঘদিন শুনানি হবে, অনেক ডকুমেন্ট, পেপারস লাগে, অনেক রেফারেন্স লাগে। কাজেই ভার্চুয়াল কোর্টে এ মামলার শুনানি প্রায় অসম্ভব হবে। তবে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে শুনানির উদ্যোগ নেয়া হলে আমাদের কোনো অসুবিধা নাই। আমরাও চাই এটাকে পেন্ডিং না রেখে যত দ্রুত সম্ভব শেষ করা হোক।’

বহুল আলোচিত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে আপিল বিভাগের দেওয়া রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) জন্য সর্বোচ্চ আদালতে ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর আপিল বিভাগে আবেদনটি করে রাষ্ট্রপক্ষ। ৯৪টি সুনির্দিষ্ট যুক্তি তুলে ধরে ৯০৮ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদনে রাষ্ট্রপক্ষ পুরো রায় বাতিল চায়।

রিভিউয়ে যুক্তি তুলে ধরে প্রয়াত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সে সময়ে জানিয়েছিলেন, “সংবিধানের তফসিলে সন্নিবেশিত ১৯৭১-এর ১০ এপ্রিল প্রণীত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ উল্লেখ করে রিভিউ আবেদনে বলা হয়েছে, একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই বাংলাদেশের ফাউন্ডিং ফাদার রূপে স্বীকৃত। আপিল বিভাগ ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ বহুবচন শব্দ ব্যবহার করে ভুল করেছেন। তাই এর পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। রায়ের একটি অংশে পর্যবেক্ষণে ‘আমিত্ব’ ধারণা থেকে মুক্তি পেতে হবে বলে যা উল্লেখ আছে, সে প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষ রিভিউ আবেদনে যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, ‘আদালতের এই পর্যবেক্ষণ ভিত্তিহীন ও অপ্রত্যাশিত, যা আমাদের এই মামলার বিবেচ্য বিষয় নয়। এটি সংশোধনযোগ্য'।”

ষোড়শ সংশোধনীর আপিলের রায়ের আরেকটি পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘১. আমাদের নির্বাচনপ্রক্রিয়া ও সংসদ এখনও শিশুসুলভ; ২. এখনও এই দুটি প্রতিষ্ঠান মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি।’

এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি হচ্ছে, এই পর্যবেক্ষণ আদালতের বিচার্য বিষয় নয়। বিচারিক শিষ্টাচারের বাইরে গিয়ে এই পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়েছে, যা সংশোধনযোগ্য।

ষোড়শ সংশোধনীর আপিলের রায়ের আরেকটি পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘সংসদীয় গণতন্ত্র অপরিপক্ব। যদি সংসদের হাতে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা দেয়া হয়, তবে তা হবে আত্মঘাতী।’

এর সুরাহা চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, আদালতের এই পর্যবেক্ষণ শুধু অবমাননাকরই নয়, বরং ভিন্ন রাজনৈতিক প্রশ্ন। আদালতের বিচারিক এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে এই মন্তব্য করা হয়েছে। রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ অন্য একটি অঙ্গের বিরুদ্ধে এরূপ মন্তব্য করতে পারে না। এটা বিচারিক মন্তব্য নয়, এ মন্তব্য করে আদালত ভুল করেছেন, যা সংশোধনযোগ্য ও বাতিলযোগ্য।

রাষ্ট্রপক্ষ তাদের রিভিউ আবেদনে আরও যুক্তি দেখিয়ে বলেছে, আপিলের রায় প্রদানকারী আদালত মার্শাল ল জারির মাধ্যমে প্রণীত কোনো আইনকে বৈধ হিসেবে বিবেচনা করেনি; অথচ বিপরীতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান গ্রহণ করে ভুল করেছেন, যা সংশোধনযোগ্য।

রাষ্ট্রপক্ষ তাদের রিভিউ আবেদনে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য বিবেচনা না করে আদালত ভুল করেছে বলে উল্লেখ করে আদালতের এ ধরনের পর্যবেক্ষণ অপ্রত্যাশিত ও বাতিলযোগ্য অভিহিত করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষ পাকিস্তান আমলে মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশটি তৎকালীন রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ দ্বারা গঠিত এবং মার্শাল ল-এর অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি উল্লেখ করে যুক্তি দেখিয়েছে যে, এ কারণে এই অধ্যাদেশটি দেশে বর্তমানে আইন হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এ কারণে মার্শাল ল অধ্যাদেশটি ষোড়শ সংশোধনীর সঙ্গে তুলনা করা যাবে না, যা আদালত তুলনা করে ভুল করেছেন এবং তা সংশোধনযোগ্য।

রিভিউ আবেদনে আরও বলা হয়, সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদকে কার্যকর ও অর্থপূর্ণ করার জন্য সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করার মাধ্যমে সরকার কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অসদাচরণ প্রমাণিত হলে আইন অনুসারে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংবিধানে সংশোধনী আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু আপিল বিভাগ সেই সংশোধনীকে একটি ‘কালারেবল অ্যামেন্ডমেন্ট’ মন্তব্য করেন এবং প্রেক্ষাপট বিবেচনায় না নিয়ে এই সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করার মাধ্যমে ভুল করেছেন, যা সংশোধন হওয়া প্রয়োজন।

উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। ২২ সেপ্টেম্বর তার গেজেট হয়।

এরপর ষোড়শ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ৯ আইনজীবী হাইকোর্টে একটি রিট করেন। পরে ৯ নভেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ওই রিটে রুল জারি করেন। এরপর ২০১৬ সালের ৫ মে তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ, বাতিল ও সংবিধানপরিপন্থি বলে রায় ঘোষণা করেন।

একই বছরের ১১ আগস্ট পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের শুনানি নিয়ে ২০১৭ সালের ৩ জুলাই ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ।

এরপর ওই বছরের ১ আগস্ট ৭৯৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। যেখানে মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র, সংসদসহ বিভিন্ন ইস্যুতে পর্যবেক্ষণ রাখা হয়। রায়ের পর্যবেক্ষণে ‘বঙ্গবন্ধুকে খাটো করা হয়েছে’ অভিযোগ তুলে বিচারপতি সিনহার পদত্যাগের দাবিতে সরব হয়ে ওঠে সরকারদলীয় আইনজীবীসহ নেতারা।

জাতীয় সংসদেও এ রায় ও প্রধান বিচারপতির অনেক সমালোচনা করা হয়। এরপর ওই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর সংসদে রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আইনি পদক্ষেপ নেয়ার প্রস্তাব গৃহীত হয়। তারই প্রেক্ষাপটে রিভিউ আবেদন দায়ের করা হয়। এ রায় নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ২০১৭ সালের ৩ অক্টোবর ছুটিতে যান তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। পরে ১৩ অক্টোবর তিনি বিদেশে চলে যান। ১০ নভেম্বর তিনি সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনারের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবর নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন।

আপিল বিভাগের যে সাত বিচারপতি ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা পদত্যাগ করেন। বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার স্বাভাবিকভাবে অবসরে যান এবং বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্‌হাব মিঞা পদত্যাগ করেন।

বাকি তিন বিচারপতি বর্তমানে আপিল বিভাগে আছেন। তারা হলেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন (বর্তমান প্রধান বিচারপতি), বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

সম্প্রতি কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ তোলেন দেশের ৪২ জন নাগরিক। তারা ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের’ মাধ্যমে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে দুই দফায় রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন। এরপর আবার সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ও ষোড়শ সংশোধনীর বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।

আরও পড়ুন:
ভোলায় নতুন আরও তিন গ্যাস কূপ
গ্যাস সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা
বরগুনায় সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্র থেকে নমুনা সংগ্রহ
সিএনজি স্টেশন বিকেল ৫টা-রাত ১১টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার আদেশ
ঢাকার কোন এলাকায় গ্যাস থাকছে না রোববার

শেয়ার করুন

দেড় শ বছরের সম্প্রীতিতে আঁচড়

দেড় শ বছরের সম্প্রীতিতে আঁচড়

ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্রে কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদ ও ফেনীর কেন্দ্রীয় কালিমন্দির পাশাপাশি। ছবি: নিউজবাংলা

ফেনীতে মসজিদ-মন্দির পাশাপাশি। দেড় শ বছর ধরে সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে উপাসনা করছিলেন দুই সম্প্রদায়ের লোক। ১৬ অক্টোবর সংঘাতে সেই সম্প্রীতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, কিছু বহিরাগত যুবক ও কিশোর হামলায় অংশ নেয়।   

ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্রে কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদ ও কেন্দ্রীয় কালীমন্দির পাশাপাশি। একই ব্যক্তি এ দুটি ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ করেছেন। উদ্যোক্তা ত্রিপুরার মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য বাহাদুর।

হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির জন্য তাদের উপাসনার এ জায়গা তৈরি করে দিয়েছেন মহারাজা। দেড় শ বছর ধরে সে সম্প্রীতি বজায় রেখে দুই ধর্মের লোকেরা যার যার ধর্মীয় উপাসনা পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

গত ১৬ অক্টোবর সে সম্প্রীতি ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। দফায় দফায় হিন্দু-মুসলিম ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়েছে। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন অগণিত। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মসজিদ-মন্দির। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কয়েক শ ফাঁকা গুলি ছোড়েন।


দেড় শ বছরের সম্প্রীতিতে আঁচড়


কীভাবে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত, তার সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য মতে, ওই দিন (১৬ অক্টোবর) আসরের নামাজ শেষে ফেনী বড় জামে মসজিদের সামনে অবস্থান করছিলেন মুসল্লিরা। একই সময়ে কালীবাড়ি মন্দিরের সামনে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির আলোকে প্রতিবাদ সভা ও শহীদ মিনারে মানববন্ধনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ফেনী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ নেতারা। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

মুসল্লিদের দাবি, আসরের নামাজের সময় মসজিদের সামনে হিন্দুরা উলুধ্বনি দেয়ার পর মুসল্লিরা ক্ষেপে যান। তারা প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। মাগরিবের নামাজের পর ছাত্রলীগ-যুবলীগ মুসল্লিদের বিক্ষোভে অতর্কিতে হামলা করলে পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে যায়।

হিন্দু সম্প্রদায়ের দাবি, প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে বের হতে চাইলে কিছু দুর্বৃত্ত পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে টেনে নেয়ার চেষ্টা করে। পরে পুলিশের অনুরোধে তারা কালীবাড়ি মন্দিরের ভেতরে চলে আসেন।

পুলিশ সেখানে উপস্থিত মুসলমানদের সরাতে চাইলেও তারা জায়গা ছাড়তে রাজি হননি। মুসল্লিদের মধ্যে দুর্বৃত্তরা অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। এরপর মসজিদের সামনে অবস্থানরত দুর্বৃত্তরা উসকানিমূলক স্লোগান দিয়ে জিরো পয়েন্টের দিকে আসতে থাকে।

দেড় শ বছরের সম্প্রীতিতে আঁচড়


মসজিদের ব্যবস্থাপনা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আশ্রাফুল আলম গিটার জানান, ‘মসজিদ ও মন্দিরের ইতিহাস প্রায় ১৪৫ বছরের পুরোনো। ১৮৭৬ সালে ত্রিপুরার রাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য বাহাদুর ফেনী শহরে মন্দির ও মসজিদের জন্য ৫০ শতাংশ করে জমি বরাদ্দ দেন। সে সময়ের টিনের ছাউনি থেকে আজকের কংক্রিটের ধর্মীয় উপাসনালয় দুটি গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধর্মীয় সম্প্রীতির উদাহরণ হয়ে।

‘মাত্র কয়েক গজের ব্যবধানে একদিকে আজানের ধ্বনি, অন্যদিকে পূজা-অর্চনা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যকার বন্ধনকে দৃঢ় করেছে প্রায় দেড় শ বছর ধরে। তবে গত শনিবারের ঘটনার পর কিছুটা হলেও আঁচড় লেগেছে এই সম্প্রীতি ও বন্ধনে।’

আশ্রাফুল আলম গিটার বলেন, ‘প্রকৃত মুসলমানরা এই হামলায় অংশ নেয়নি। কিছু বহিরাগত ও উচ্ছৃঙ্খল জনতা মন্দির ও আশপাশের এলাকায় দোকানে হামলা করে। সাময়িকভাবে কিছুটা প্রভাব পড়লেও দীর্ঘদিনের সম্প্রীতি নষ্ট হবার নয়।’

ফেনী হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি শুকদেব নাথ তপন বলেন, ‘শায়েস্তা খাঁর আমল থেকে প্রতিষ্ঠিত মন্দির-মসজিদের সম্প্রীতি নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও গত শনিবারের হামলায় সেই প্রশ্ন উঠেছে, যেটা আমি ইতিবাচকভাবে দেখছি না। ১৬ অক্টোবর ফেনীর কেন্দ্রীয় জয়কালী মন্দিরে ব্যাপক ভাঙচুর হয়েছে। এ ছাড়া ফেনী শহরের ১৫টি হিন্দু দোকানেও লুটপাট চালানো হয়েছে। যারা হামলা-ভাঙচুর করেছে, সবাই বহিরাগত। তারা ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে এই নাশকতা চালিয়েছে।’

দেড় শ বছরের সম্প্রীতিতে আঁচড়


ফেনী কেন্দ্রীয় বড় মসজিদ লাগোয়া তাকিয়া রোডে ১৯৭৩ সালের আগে থেকে ব্যবসা করছে রেনু ট্রেডার্সের মালিক নয়ন পালের পরিবার। নয়ন পাল বলেন, ‘গত শনিবারের আগেও এখানে মনে হয় হিন্দু-মুসলিমে কোনো তফাৎ ছিল না। মসজিদে নামাজ শেষে অনেক মুসলিমও আমাদের দোকানে কেনাকাটা করতেন, হিন্দুরা তো আসতেনই। তবে শনিবার যে আক্রমণ করা হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর, তাতে করে সম্পর্কে তো একটু হলেও চিড় ধরবে। অথচ শত বছরের ইতিহাসে ফেনীতে এমনটা হয়নি।’

মসজিদ মার্কেটের পাটোয়ারী ফ্যাশনের মালিক নুরুল হুদা জানান, তিনি এখানে কখনও হিন্দু-মুসলমানে ভেদাভেদ দেখেননি। হিন্দুরাও তার দোকানে আসতেন নিয়মিতই। শনিবারের ঘটনা কিছুটা হলেও মনে দাগ কেটেছে। এ ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা তার কাছেও নেই।

জেলা প্রশাসক ও মসজিদ কমিটির সভাপতি আবু সেলিম মাহমুদ উল হাসান বলেন, ‘যারা এ কাজ করেছে তারা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে করেনি। একটি পক্ষ দেশকে অস্থিতিশীল করতে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। এটা কোনো ধর্মীয় বিরোধ নয়। একটি দুষ্কৃতকারীচক্র ঘটনার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে এই সম্প্রীতি ছিল, আছে, থাকবে। এই ঘটনা বেদনার।’

জয়কালী মন্দির কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শিল্পকলা একাডেমির সদস্য সমরজিৎ দাস টুটুল বলেন, ‘কয়েক ঘণ্টার হামলায় শত বছরের ঐতিহ্যের বন্ধন যেন ম্লান হয়ে গেছে। এখানে মন্দিরে প্রতিবছর পূজার সময় মসজিদ থেকে নামাজের সময়সূচি নিয়ে আসা হতো। নামাজ ও আজানের সময় পূজার কার্যক্রম বন্ধ রাখা হতো। একই রকম সহাবস্থান ছিল মসজিদের দিক থেকেও। অথচ এক দিনের ঘটনায় মনে যে দাগ কেটেছে, সেটা কীভাবে মুছবেন?’

টুটুল আরও বলেন, ‘বলা হচ্ছে এখন পরিস্থিতি শান্ত। আদতে শান্ত হলেও মন কি আর শান্ত হয়েছে? হিন্দুরা তো ভালো নেই, মুসলমানদের মনেও এই ঘটনা দাগ কেটে গেছে। তারাও তো আমাদেরই ভাই। দশমীর বিসর্জন কোনোভাবে পার করলেও বুধবারের লক্ষ্মীপূজায় তাদের কোনো আনন্দ নেই। হারিয়ে ফেলেছেন প্রাণচাঞ্চল্য।

‘মন্দির পূজা-অর্চনার জায়গা, অথচ সেখানে পুলিশ বসে পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে। এটিও কি সম্ভব? তবে এই সম্প্রীতি আবারও ফিরে আসবে বলে আমি আশা করি।’

দেড় শ বছরের সম্প্রীতিতে আঁচড়


সমরজিৎ দাস শনিবার রাতের ঘটনার সাক্ষী। এশার নামাজের পর থেকে শুরু হওয়া হামলা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত ছিলেন মন্দিরের ভেতরেই।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা মাত্র ৮ জন মানুষ ছিলাম ভেতরে। মসজিদের সামনে বিকেলের পর থেকে থমথমে পরিবেশ ঘোলাটে হতে থাকে। এশার নামাজের পর মসজিদের ছাদ ও মিনারের ওপর থেকে ইট-পাটকেল ছুড়ে মারা হয়। একপর্যায়ে কলাপসিবল গেটের নিচ দিয়ে পেপার ছড়িয়ে দিয়ে ওপর থেকে প্লাস্টিক বোতলের মধ্যে আগুন দিয়ে পেট্রল ছুড়ে মারা হয়। কোনো রকমে পানি দিয়ে আগুন নিভিয়েছি। পরে ইট-পাটকেলের আক্রমণের চোটে মন্দির অফিসের দেয়ালের পেছনে আশ্রয় নিই।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের গর্বের মসজিদ-মন্দিরের সহাবস্থান এক দিনেই প্রশ্নের মুখে পড়ল। আমাদের পুরোহিত বিষ্ণুপদ চক্রবর্তীকে যেরকমভাবে ধুতি খুলে, কালেমা পড়তে বাধ্য করা হলো, তা তো একাত্তরকেও হার মানায়। সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত এই হামলায় আমাদের নিয়ে খেলাধুলা হচ্ছে, আমরা এখন দাবার ঘুঁটি।’

তাকিয়া সড়কের আরেক দোকানদার বিষংকর পাল। তার পরিবার প্রায় ৫৮ বছর ধরে ব্যবসা করছে। তিনি জানান, শুধু মন্দিরেই হামলা হয়নি, মসজিদের পাশের তাকিয়া রোডে বেছে বেছে প্রায় ১৬টি হিন্দু দোকান ভেঙে মালপত্র লুটপাট করা হয়েছে। তার দোকানের নগদ ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকাসহ লুট হয়েছে ৫ লাখ টাকার পণ্য।

ওই দোকানের কর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শী শিমুল দাস জানান, রাত সাড়ে ৮টার দিকে হঠাৎ পাশের শুঁটকির দোকানে হামলা দেখে দোকান বন্ধ করে কাছেই আশ্রয় নেন তিনি। দূর থেকে শস্যপণ্য ও মালপত্র লুট করে নিয়ে যাওয়া দেখেন, প্রাণের ভয়ে বাধা দেয়ার সাহস করেননি। এদের প্রত্যেকেই ১৮-২১ বছর বয়সী যুবক। এদের কেউই পরিচিত নয়। তারা শুধু হিন্দু দোকানেই আক্রমণ করেছে।

ট্রাংক রোডের মোড়ে পুলিশ থাকলেও অনেকবার ৯৯৯-এ কল করার পরও পুলিশের কোনো সদস্য দোকানে হামলার সময় তাকিয়া সড়কের দিকে আসেনি। অনেকে বাসার সিসিটিভির ফুটেজে নিরুপায় বসে দোকান লুট, ভাঙচুর দেখেছেন।

বাঁশপাড়া দুর্গাপূজা মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ দে জানান, শুধু প্রথম দুই দিন ঠিকমতো পূজা করেছেন তারা। বাকিটা সময় কাটিয়েছেন আতঙ্কে। বাড়ির নারী সদস্যদের বাইরে না যেতে বলেছেন।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সভাপতি এবং সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শুসেন চন্দ্র শীল জানান, শনিবার আসরের নামাজের পর কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদের পাশের জয়কালী মন্দির থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি প্রতিবাদ মিছিল করার কথা ছিল। একই সময়ে আসরের নামাজ হওয়ায় অনেক দেরিতেই মিছিলের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ওদিকে মসজিদের সামনে সাধারণ মুসল্লিদের ব্যানারে জড়ো হয় দুই শতাধিক তরুণ-যুবক। এদের বেশির ভাগই এখানে নিয়মিত নামাজ পড়ে না।

তিনি বলেন, পরে পুলিশের অনুরোধে প্রতিবাদ মিছিল সরিয়ে নেওয়া হলেও এই তরুণ-যুবকরা না সরায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। একই সময়ে আওয়ামী যুবলীগের একটি মিছিল এসে মুসল্লিদের বাধা দিতে চাইলে ইট-পাটকেল নিক্ষেপে দুই পক্ষের সংঘর্ষ বেধে যায়। তবে এতে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-যুবলীগ বেশি আহত হয়।

শুসেন চন্দ্র শীল বলেন, এশার নামাজের পরপরই এসব তরুণ-যুবক দলে দলে মসজিদের ছাদে উঠে পাশের মন্দিরে হামলা করে। কিছু লোক পাশের দোকান ও মন্দিরগুলোতে হামলা চালায়। মসজিদের ছাদ থেকে আক্রমণ করায় বেশি ক্ষতি হয়েছে।

আরও পড়ুন:
ভোলায় নতুন আরও তিন গ্যাস কূপ
গ্যাস সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা
বরগুনায় সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্র থেকে নমুনা সংগ্রহ
সিএনজি স্টেশন বিকেল ৫টা-রাত ১১টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার আদেশ
ঢাকার কোন এলাকায় গ্যাস থাকছে না রোববার

শেয়ার করুন

শাঁখা ভেঙে সিঁদুর মুছে সাদা শাড়িতে দিলীপের স্ত্রী

শাঁখা ভেঙে সিঁদুর মুছে সাদা শাড়িতে দিলীপের স্ত্রী

কুমিল্লায় সাম্প্রদায়িক হামলায় দিলীপ দাশের মৃত্যুর পর মুছে গেছে তার স্ত্রী রুপা দাশের সিঁথির সিঁদুর, পরেছেন সাদা শাড়ি। ছবি: নিউজবাংলা

দিলীপের মরদেহ শুক্রবার সন্ধ্যায় টিক্কার চর শ্মশানে দাহ করার আগে মুছে দেয়া হয় রুপার মাথার সিঁদুর, ভাঙা হয় হাতের শাঁখা। রঙিন শাড়ির পরিবর্তে তিনি এখন পরছেন বিধবার সাদা কাপড়।

দুই দিন আগেই পরনে ছিল রঙিন শাড়ি, মাথায় সিঁদুর আর হাতে শাঁখা। আর এখন সব রং মুছে দিয়ে সাদা শাড়িতে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছেন রুপা দাশ। স্বামীকে চিতার আগুনে পোড়ানোর আগে তার পায়ের বুড়ো আঙুলে মুছে দেয়া হয়েছে রুপার সিঁথির সিঁদুর।

কুমিল্লায় গত ১৩ অক্টোবর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সময় গুরুতর আহত হন দিলীপ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় শুক্রবার ভোরে তার মৃত্যু হয়।

দিলীপের মরদেহ শুক্রবার সন্ধ্যায় টিক্কার চর শ্মশানে দাহ করার আগে মুছে দেয়া হয় রুপার মাথার সিঁদুর, ভাঙা হয় হাতের শাঁখা। রঙিন শাড়ির পরিবর্তে তিনি এখন পরছেন বিধবার সাদা কাপড়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, সহিংসতার দিন সকালে বাসায় নাশতা সেরে কুমিল্লা নগরীর মনোহরপুর রাজ রাজেশ্বরী কালীমন্দিরে পূজা দিতে গিয়েছিলেন দিলীপ দাশ।

নানুয়ার দিঘির পাড়ের একটি মণ্ডপে কোরআন পাওয়ার পর তখন সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে নগরীজুড়ে। রাজ রাজেশ্বরী কালীমন্দিরেও চলে হামলা।

সংঘাত দেখে বাসায় ফিরতে চেয়েছিলেন দিলীপ। তবে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মন্দিদের গেটের পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় হামলার শিকার হন, লুটিয়ে পড়েন মাটিতে।

রাজ রাজেশ্বরী কালীমন্দিরের পুরোহিত দুলাল চক্রবর্তী নিউজবাংলাকে জানান, ১৩ অক্টোবর ওই সহিংসতার সময় মন্দির থেকে বাড়িতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেন দিলীপ। তবে বাইরে প্রচণ্ড গন্ডগোল শুরু হওয়ায় তিনি মন্দিরের গেটের ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একপর্যায়ে মন্দিরের ভেতরে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে হামলাকারীরা। এ সময় গুরুতর আহত হলে পূজারীরা আহত দিলীপকে গামছা দিয়ে মাথা বেঁধে বসিয়ে রাখেন। পরে তাকে কুমিল্লা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

দিলীপের স্ত্রী রুপা দাশ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওই দিন দেড়টায় কুমিল্লা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে ফোন পাই। এ সময় আমাদের বাসার সামনে পুলিশ ও হামলাকারীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলছিল। পুলিশ আমাদের বাইরে যেতে নিষেধ করে। এর মধ্যেই আমি এক আত্মীয়কে নিয়ে হাসপাতালে যাই।’

তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে আমার স্বামীর অবস্থার অবনতি হয়। পরে বেলা ২টার দিকে চিকিৎসক তাকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন। আমরা তাকে সেখানে নিলে চিকিৎসক সিটিস্ক্যান করাতে বলেন।’

রুপা দাশ অভিযোগ করে বলেন, ‘এ সময় হাসপাতালে বিদ্যুৎ না থাকায় সিটিস্ক্যান করাতে আমাদের অন্তত আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। পরে রিপোর্ট দেখে চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ১৫ তারিখে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় শুক্রবার ভোর ৪টার দিকে তার মৃত্যু হয়।’

শাঁখা ভেঙে সিঁদুর মুছে সাদা শাড়িতে দিলীপের স্ত্রী
পরিবারের কাছে দিলীপ দাশ এখন কেবলই ছবি

দিলীপ দাশ ধোপার কাজ করে সংসার চালাতেন। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বড় মেয়ে প্রিয়া রানী দাশ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন। আর ছেলে রাহুল দাশ ঢাকায় লেখাপড়া করেন।

দিলীপের মেয়ে প্রিয়া বলেন, ‘বাবার মাথায় যে আঘাত দেখেছি তাতে স্পষ্ট যে হামলাকারীরা আমার বাবাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। তার মাথার খুলি ভেঙে যায়। রক্তক্ষরণ ও তাৎক্ষণিক সঠিক চিকিৎসার অভাবে আমার বাবা মারা গেছেন।’

প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি এখন দিশেহারা। দিলীপ দাশের মেয়ে প্রিয়া জানান, তার বাবার মৃত্যুর পর তেমন কেউ খোঁজখবর নিতে আসেনি।

প্রিয়া নিউজবাংলাকে জানান, তিনি দৃষ্টিপাত নাট্যদলের সদস্য। তার বাবা হামলায় আহত হওয়ার পর ওই নাট্য সংগঠন চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছে। এ ছাড়া কেউ এগিয়ে আসেনি।

শাঁখা ভেঙে সিঁদুর মুছে সাদা শাড়িতে দিলীপের স্ত্রী
ছেলে মেয়েকে নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন দিলীপের স্ত্রী


দিলীপের স্ত্রী জানান, তাদের পরিবারের মূল নির্ভরশীলতা ছিল স্বামীর আয়ের ওপর। পাশাপাশি একটি ছোট দোকান ভাড়া দিয়ে মাসে পাঁচ হাজার টাকা পাওয়া যায়।

রুপা দাশ বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর আমরা বড় সমস্যায় পড়েছি। দোকান ভাড়ার মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় কীভাবে সংসার চলবে, দুই ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালাব তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

দুর্গাপূজায় সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর ভোরে কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের ওই মণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা।

ওই মণ্ডপের পাশাপাশি আক্রান্ত হয় নগরীর আরও বেশ কিছু পূজামণ্ডপ। পরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

আরও পড়ুন:
ভোলায় নতুন আরও তিন গ্যাস কূপ
গ্যাস সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা
বরগুনায় সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্র থেকে নমুনা সংগ্রহ
সিএনজি স্টেশন বিকেল ৫টা-রাত ১১টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার আদেশ
ঢাকার কোন এলাকায় গ্যাস থাকছে না রোববার

শেয়ার করুন

দুর্ঘটনায় কেন শুধু চালক দায়ী

দুর্ঘটনায় কেন শুধু চালক দায়ী

সড়ক দুর্ঘটনার দায় চালকের একার নয় বলে মনে করেন বুয়েটের অধ্যাপক শামসুল হক। ফাইল ছবি

বুয়েটের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, ‘চালকেরা বেশি ট্রিপে বেশি রোজগার করতে চায়, কিন্তু তারা বিরতিহীনভাবে চালিয়ে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এক পক্ষকে দায়ী করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে তাতে সিম্পটমের একটা চিকিৎসা হবে, রোগ কিন্তু থেকে যাবে।’

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যেসব ব্যবস্থা দরকার, তা নেয়া হচ্ছে না। তা ছাড়া দুর্ঘটনার জন্য পরিবহন শ্রমিকদের এককভাবে দায়ী ভাবার প্রবণতা রয়েছে। অথচ দুর্ঘটনার জন্য দুর্বল পরিকল্পনাও সমান দায়ী।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক মনে করেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না।

এমন বাস্তবতায় শুক্রবার পালন করা হচ্ছে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘গতিসীমা মেনে চলি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করি।’

এ উপলক্ষে নিরাপদ সড়ক বা সড়কে নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হতে পারে, সে বিষয়ে নিউজবাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন অধ্যাপক শামসুল হক।

প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে মহাসড়কে গাড়িচালকদের বিশ্রাম ও টানা গাড়ি চালানোর সর্বোচ্চ সময় নির্ধারণের কথা বললেও সেটির কোনো বাস্তবায়ন দেখছেন না এ পরিবহন বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলেন, ‘পুরো বিশ্বে হাইওয়েতে (মহাসড়ক) চার ঘণ্টার বেশি টানা গাড়ি চালানো নিষেধ। এতে চালকের অবসাদ চলে আসতে পারে। তার যে মনোযোগ দরকার হয় চলার জন্য, তাতে ঘাটতি পড়তে পারে।

‘চার ঘণ্টা পর ভিন্ন একজন চালক থাকবে। এটা মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরে আছে। আর পশ্চিমা দেশে তো আছেই। বাণিজ্যিক গাড়ি বিরতিহীনভাবে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি চালাতে দেয়া যাবে না।’

এ অধ্যাপক বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী এই দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তবে কাজ হয়নি। এর মানে কী? পুলিশ এখানে কাজ করছে না। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কাজ করছে না। যারা কর্তৃপক্ষ, তারা কাজ করছে না। তার মানে চালকের দায়, পুলিশের দায়, ইঞ্জিনিয়ারের দায়।’

ট্রাফিক ও ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে

সড়কের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিকল্পনা নেয়া হলেও সেটি পরিকল্পিতভাবে নেয়া হয়নি বলে মনে করেন শামসুল হক।

তিনি বলেন, ‘সড়ক ব্যবস্থাপনা ও রোড ট্রাফিক সিস্টেম সুশৃঙ্খল হতে পারত, তবে তা হয়নি। আমি যদি ঢাকার কথাই বলি, ঢাকায় গণপরিবহনের যে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি, সেটা যদি আমরা করে ফেলতে পারতাম, তবে ঠিক হয়ে যেত।’

এ অধ্যাপক বলেন, ‘কিছু কাজ করতে দরদ লাগবে। এই যে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি, এটাতে তো পয়সা লাগে না। এটা রেগুলেশন। এটা এনফোর্সমেন্ট। এখানে তো পয়সা নাই বলতে পারবে না। এখানেই আমাদের অবহেলা।’

ঢাকার রাস্তায় ফ্র্যাঞ্চাইজি বাস বা ‘এক রুটে এক বাস কোম্পানি’ পদ্ধতি চালু হলে অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি হলে বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমে যাবে। হুড়োহুড়ি করতে গিয়েই ঢাকায় অনেক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা ঘটে বলে মনে করা হয়।

মহাসড়কের পরিকল্পনা

দেশের মহাসড়কগুলোতে বিশৃঙ্খলা রয়েছে আর সেটির জন্য ছোট পরিবহন ও গাড়ির ফিটনেসকে দায়ী করেন শামসুল হক।

তিনি বলেন, ‘আমি যদি হাইওয়েতে ফিট গাড়ি না চালাই, অবৈধ গাড়ি যদি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তবে দুর্ঘটনা ঘটবে।’

দুর্ঘটনায় কেন শুধু চালক দায়ী

এ ক্ষেত্রে তিনি হাইকোর্ট ও সরকারের দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সব জায়গা থেকে দিকনির্দেশনা আছে যে, আঞ্চলিক ও মহাসড়কে কোনো নছিমন, করিমন বা ভটভটি গাড়ি চলবে না।’

এ ক্ষেত্রে গতির বিশৃঙ্খলা হয়ে থাকে জানিয়ে শামসুল হক বলেন, ‘দ্রুতগতির সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের ধীরগতির গাড়িগুলো চলাচল করে। ওই ড্রাইভারের কিন্তু রোডের কোনো সেন্স নাই। তাকে যদি রোডে এভাবে বিশৃঙ্খলা করার সুযোগ দিই, তাহলে তো দুর্ঘটনা ঘটবে। আমরা কি এত দিকনির্দেশনার পরেও কিছু করেছি? করিনি।’

বিআরটিএ তার কাজ ঠিকমতো করে না বলে মনে করেন শামসুল হক। তিনি বলেন, ‘হাইওয়েতে যাদের চলার কথা না তারা চলছে। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে। আমরা যে গাড়িগুলোকে ফিট বলব, বিআরটিএর যে ফিটনেস সনদ ব্যবস্থা, সেটি পরিহাস ছাড়া কিছুই না।

‘একটা গাড়ির ৪২টা আইটেম দেখে তাকে চলার যোগ্যতার সার্টিফিকেট দেয়া সহজ কথা নয়। তবে এত কমসংখ্যক ইন্সপেক্টরে এত বিপুলসংখ্যক গাড়ির ইন্সপেকশন সম্ভব হওয়ার কথা না, যার ফলে আনফিট গাড়ি চলছে।’

দুর্ঘটনায় কেন শুধু চালক দায়ী

চালকের প্রশিক্ষণ ঘাটতি রয়েছে বলে জানান শামসুল হক। তিনি বলেন, ‘চালক প্রশিক্ষণের যে পদ্ধতি, সেটি ঠিক নেই। একটা চালককে হাইওয়েতে নামানোর আগে তার প্র্যাকটিক্যাল (ব্যবহারিক) যে পরীক্ষা হওয়ার কথা, সেটা হচ্ছে না। সারা বিশ্বে প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ার একটা স্ট্যান্ডার্ড আছে। আমরা তার ধারেকাছে নাই।’

সরকার উন্নয়নকেন্দ্রিক চিন্তা করলেও সড়ক নিরাপত্তার ব্যাপারে পরিকল্পিত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে মনে করেন তিনি।

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমরা মৌসুমি কিছু কাজ করি। কিন্তু সিস্টেমের দিকে তাকাই না। আমাদের উন্নয়ন হচ্ছে রক্তক্ষরণের উন্নয়ন। এতে অনেক মানুষ হতাহত হচ্ছে। অনেক পরিবার একসাথে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রকল্প হবে, তবে সিস্টেমের কোনো উন্নয়ন হবে না। তাই টেকসইভাবে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে গেলে বিজ্ঞান যেটা বলছে সিস্টেমকেন্দ্রিক, সেটা করতে হবে। কিন্তু আমাদের করার মতো প্রতিষ্ঠান নেই। তাদের দায়বদ্ধ করার মতো অভিভাবক নেই। তাই আমরা এর থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছি না।’

রাস্তায় সার্বক্ষণিক নজরদারি

রাস্তায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়াতে হবে বলে জানান শামসুল হক।

তিনি বলেন, ‘চোর-পুলিশ খেলে এনফোর্সমেন্ট হবে না। ২৪ ঘণ্টা রাস্তায় থাকতে হবে। উন্নত বিশ্বে চালক নিজের গাড়ি নিজে চালাচ্ছে, তাদের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত, তারপরও তারা রাস্তা থেকে পুলিশ ছাড়িয়ে নিচ্ছে না। কারণ মানুষ জন্মগতভাবে সুযোগসন্ধানী। একজনের অপব্যবহার দেখে আর একজন করবে। আমাদের এখানে কিছুদিনের হেডলাইন তৈরি হলে বা কোনো দুর্ঘটনা হলে নড়েচড়ে বসে। এরপর আর খবর নেই।’

দুর্ঘটনায় দায় কার

দেশে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ঢালাওভাবে পরিবহন শ্রমিকদের দায়ী করা হয়। দুর্ঘটনা ঘটার পরপরই তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলে। এ নিয়ে সাধারণ পরিবহন শ্রমিকেরা বিভিন্ন সময় আন্দোলন করছে।

এ বিষয়ে শামসুল হক বলেন, ‘আমি বলব, পরিবহন এমন একটা ব্যবস্থাপনা, যেখানে পলিসি লেভেলে যারা পলিসি তৈরি করেন, যারা সড়কের পরিকল্পনা করেন, ডিজাইন যারা করেন, রক্ষণাবেক্ষণ করেন, নিয়ন্ত্রণ করেন এবং গাড়ির মালিক যারা, চালক যারা, ব্যবহারকারী যারা, সামগ্রিক যে বিন্যাস আছে, এখানে সবার দায়বদ্ধতা আছে।’

তিনি বলেন, ‘পরিকল্পনায় ঘাটতি থাকলে দুর্ঘটনা হবে। আমি সড়কের জন্য চমৎকারভাবে পরিকল্পনা করলাম, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ করলাম না। তাহলে দুর্ঘটনা ঘটে গেল।’

মালিকের দায়িত্ব সম্পর্কে এ অধ্যাপক বলেন, ‘চালক যদি টায়ার বদলাতে বলে, মালিক বলেন, এটা দিয়েই চালাতে হবে; না হলে আর একজন চালক নিয়ে আসব। এই মালিক দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিল। অথচ দুর্ঘটনা ঘটলে সব দায় চালকের ওপর চলে যায়।’

তিনি বলেন, ‘চালকেরা বেশি ট্রিপে বেশি রোজগার করতে চায়, কিন্তু তারা বিরতিহীনভাবে চালিয়ে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এক পক্ষকে দায়ী করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে তাতে সিম্পটমের একটা চিকিৎসা হবে, রোগ কিন্তু থেকে যাবে। আইন করতে হবে সর্বজনীন আইন। আমাদের আইন এখনও চালকসর্বস্ব।

‘শুধু একজনকে দায়ী করে আইন করা যাবে না। চালক দেখছে, আরও অনেকের ঘাটতি আছে, কিন্তু তাদের কোনো শাস্তি বা জবাবদিহি করা হচ্ছে না। এতে তারাও মানতে চাইবে না। আন্দোলন হবে।’

পরিকল্পনাকারীদের দায় আছে

শুধু চালক নয়, বরং পরিবহন ব্যবস্থার যারা পরিকল্পনা করেন, দুর্ঘটনার উচ্চ হারের জন্য তারাও সমান দায়ী বলে মনে করেন শামসুল হক।

তিনি বলেন, ‘আমি বলব, পরিকল্পনায় যারা আছেন, তাদের ভুলের কারণে যখন দুর্ঘটনা হয়, সেটা কিন্তু বড় একটা বিষয়। তাদের অজ্ঞতার কারণে যে দুর্ঘটনা ঘটে, তাতে চালককে তো আমি শাস্তি দিতে পারি না।

‘উন্নত বিশ্বে হলে পরিকল্পনা পর্যায়ে যাওয়া হয়। আর আমরা কিন্তু তাৎক্ষণিক বিষয়ে থাকি। এটাতে সিস্টেম ঠিক হবে না। যে দুর্ঘটনা পরিকল্পনার ঘাটতির জন্য হয়, তাকেও কিন্তু জেল-জরিমানা করতে হবে। দুর্ঘটনা হলে তারা এসি রুমে বসে থাকে। পুলিশ আর ড্রাইভার হলো ভিজিবল ফোর্স। সব রোষানল পড়ছে সেখানে।’

আরও পড়ুন:
ভোলায় নতুন আরও তিন গ্যাস কূপ
গ্যাস সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা
বরগুনায় সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্র থেকে নমুনা সংগ্রহ
সিএনজি স্টেশন বিকেল ৫টা-রাত ১১টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার আদেশ
ঢাকার কোন এলাকায় গ্যাস থাকছে না রোববার

শেয়ার করুন