হলমার্ক কেলেঙ্কারির বিচার কত দূর!

হলমার্ক কেলেঙ্কারির বিচার কত দূর!

হলমার্কের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ। ফাইল ছবি

৯ বছর আগে মামলা হলেও এখনও সম্পন্ন হয়নি হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারির মামলাগুলোর বিচারকাজ। শেষ হয়নি সাক্ষ্যগ্রহণ। কেবল একটি মামলায় তিন জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

৯ বছর আগে হলমার্ক কেলেঙ্কারি দেশের সবাইকে হতবাক করে দিয়েছিল। এর মাধ্যমে দেশের আর্থিক খাতের দুর্বল কাঠামো নগ্নভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ে।

প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে লুটে নিয়েছিল প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা, যা সোনালী ব্যাংকের মোট ১০ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেক।

২০১০-১২ সালের মধ্যে ঋণের নামে এই পরিমাণ টাকা ব্যাংক থেকে বের করে নিয়ে এখন কারাগারে আছেন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ। এ ছাড়া যাবজ্জীবন সাজা পেয়ে কারাগারে আছেন হলমার্ক গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান প্যারাগন নিট কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম রাজা, পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন ও সোনালী ব্যাংকের তখনকার হোটেল রূপসী বাংলা শাখার (বর্তমানে ইন্টারকন্টিনেন্টাল) কর্মকর্তা সাইফুল হাসান।

আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ, পরস্পরের যোগসাজশ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও মুদ্রাপাচারের অভিযোগ আনা হয়।

২০১২ সালের ৪ অক্টোবর রমনা থানায় ৩ হাজার ৮৯৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১১টি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

আসামিরা হলেন, হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. তানভীর মাহমুদ, তার স্ত্রী ও গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম এবং তানভীরের ভায়রা ও গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক তুষার আহমেদ।

হলমার্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাপারেল এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. শহিদুল ইসলাম, স্টার স্পিনিং মিলসের মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম, টি অ্যান্ড ব্রাদার্সের পরিচালক তসলিম হাসান, ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের মালিক মীর জাকারিয়া, সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনালের মালিক মো. জিয়াউর রহমান, আনোয়ারা স্পিনিং মিলসের মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম, প্যারাগনের এমডি সাইফুল ইসলাম রাজা, নকশি নিটের এমডি মো. আবদুল মালেক ও সাভারের হেমায়েতপুরের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. জামাল উদ্দিন সরকার।

এ ছাড়া সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন হোটেল রূপসী বাংলা শাখার সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ব্যবস্থাপক এ কে এম আজিজুর রহমান, সহকারী উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. সাইফুল হাসান, নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল মতিন ও সোনালী ব্যাংক ধানমন্ডি শাখার বর্তমান জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুন্নেসা মেরির নামও রয়েছে।

সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের দুই জিএম ননী গোপাল নাথ ও মীর মহিদুর রহমান (দুজনই ওএসডি), প্রধান কার্যালয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবির, ডিএমডি মাইনুল হক ও আতিকুর রহমান (দুজনই ওএসডি), দুই উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) শেখ আলতাফ হোসেন (সাময়িক বরখাস্ত) ও মো. সফিজউদ্দিন আহমেদ (সাময়িক বরখাস্ত), দুই এজিএম মো. কামরুল হোসেন খান (সাময়িক বরখাস্ত) ও এজাজ আহম্মেদের নামও রয়েছে এতে।

তবে ৯ বছর চলে গেলেও আজ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি আলোচিত এই মামলাগুলোর বিচারকাজ। শেষ হয়নি সাক্ষ্যগ্রহণ। একটি মামলায় তিন জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনাগুলো কোনো ছোটখাটো কেলেঙ্কারি নয়। মামলার সংখ্যাও অনেক। এতগুলো মামলার সঙ্গে অনেক মানুষ জড়িত। অনেক সাক্ষী-সাবুদেরও প্রয়োজন হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে অর্ধেকের বেশি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ প্রায় শেষ করে এনেছি। বাকি মামলাগুলোর সাক্ষ্যগ্রহণও মাঝামাঝি পর্যায়ে। এমন অনেক মামলা আছে, যেখানে ১৫ থেকে ২০ জন সাক্ষী রয়েছে। বলা যায় অনেকগুলো মামলা শেষ পর্যায়ে, অনেকগুলো মাঝ পর্যায়ে।

‘আমরা আশাবাদী অল্প সময়ের মধ্যে মামলার বিচারকাজ শেষ হবে। এরপর হয়ত উচ্চ আদালতে আপিল হবে। তারপর আপিল বিবেচনার পর রায় কার্যকর হবে।’

ঝুলে আছে অর্থ ফেরত

লুণ্ঠনকৃত অর্থ আদায়ে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হলমার্কের সব সম্পত্তি বিক্রি করেও এ অর্থ আদায় সম্ভব হবে না। সে ক্ষেত্রে কী করা যাবে, এমন প্রশ্নের জবাবে খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘এটা রায় না হওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না। আমাদের দেখতে হবে কোর্ট কী অভজারভেশন দেয়। তার আগে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য ঠু মাচ হয়ে যাবে।’

আলোচিত এই কেলেঙ্কারির তদন্ত ও মামলায় দুদক সঠিক পথে আছে কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি আমরা সঠিক পথেই আছি। কিন্তু এটা তো আমরা মনে করলে হবে না। এটা আদালতের মনে করতে হবে। আবার আসামিপক্ষের কাছে হয়ত এটা একটা ফালতু মামলা।’

অন্য দিকে দুদকের পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড প্রসিকিউশন) আবুল হাসনাত মো. আবদুল ওয়াদুদ নিউজবাংলাকে বলেন, হলমার্কের ১১ মামলার বিচার শেষ পর্যায়ে রয়েছে। মামলাগুলোর বিচারকাজ শেষ করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এ দিকে এই কেলেঙ্কারির অন্যতম হোতা বিদেশে পালিয়ে থাকা সোনালী ব্যাংকের সে সময়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হুমায়ুন কবিরকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার উদ্যোগ নিয়েছে দুদক।

হলমার্কের সম্পদ

হলমার্ক গোষ্ঠির প্রায় সবগুলো কারখানাই সাভার এলাকায়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ৪০টি কারখানা এখন বন্ধ। কারখানার ভঙ্গুর অবকাঠামো ছাড়া এখন আর তেমন কিছুই নেই। এ সব কারখানাসহ হলমার্কের স্থাবর সম্পদ ক্রোক না করায় তা অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।

দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম জুয়েল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যখন মামলা হয়েছে (২০১২) তখন দুদক ক্রোক প্রক্রিয়া শুরু করেনি। সে কারণে স্থাবর সম্পদ ক্রোক ও জব্দ করা হয়নি। তবে অস্থাবর সম্পদের মধ্যে ব্যাংক হিসাবসহ এ সংক্রান্ত কাগজপত্র ও দলিলাদি জব্দ করা হয়েছে।’

দুদকের পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড প্রসিকিউশন) আবুল হাসনাত মো. আবদুল ওয়াদুদ দুদকের জব্দ তালিকায় স্থাবর সম্পদ না থাকার বিষয়ে বলেন, ‘২০১২ সালে আমি দুদকে ছিলাম না। হয়ত ক্রোক প্রক্রিয়া ছিল অন্য ভাবে। তখন রিসিভার (ক্রোক কর্তৃপক্ষ) ছিল পুলিশ। তখনকার আইনে পুলিশকে ক্ষমতা দেয়া ছিল।’

মামলার বিচারের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দিক থেকে সাক্ষ্য আনতে কোনো গাফিলতি হয়নি। পেপারস অনেক। এগুলো এক্সিকিউট (নিষ্পত্তি) করতে অনেক সময় লেগেছে।’

সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন এমডি হুমায়ুন কবিরকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে পলাতক আসামি হিসেবে বিচার শুরু করেছে। ফলে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বহাল রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা তাকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করতে উদ্যোগ নিয়েছে।’

দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও সিনিয়র আইনজীবী মীর আহমেদ আলী সালাম এ বিষয়ে জানান, মামলাগুলোয় ৫০ থেকে ৬০ জনের মতো সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। সব মামলার সাক্ষী প্রায় একই ব্যক্তি। এ ছাড়া সাক্ষীর তালিকায় দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা রয়েছেন। কোনো কোনো মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তার জবানবন্দিও নেয়া হয়েছে। কিন্তু গত দেড় বছরের করোনার ধাক্কায় বিচারকাজ বিলম্বিত হয়।

তিনি বলেন, ‘হলমার্কের মামলার বিচারকাজে নিয়োজিত দুজন বিচারক ইতোমধ্যে অবসরে চলে গেছেন। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে বিচার কিছুটা প্রলম্বিত হলেও আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় স্বল্প সময়ের মধ্যে অনেকগুলো মামলার রায় হয়ে যাবে।’

যেভাবে জালিয়াতি হয়েছে

হলমার্কের ১১ মামলার বিচার শুনানিতে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য। বেরিয়ে এসেছে জালিয়াতির নীলনকশার আদ্যোপান্ত। চক্রটি ব্যাংকের ৪ হাজার কোটি টাকা লুটপাট করতে হোটেল শেরাটনের (বর্তমানে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল) পাশে সাকুরার পেছনে একটি ব্যক্তিগত বাড়ি ভাড়া নেয়। সেখানেই চলত জালজালিয়াতির কাগজপত্র তৈরিসহ সব ধরনের কারসাজির কাজ।

দুদক সূত্র জানায়, ওই বাড়িতে হলমার্কের লোকজন জালিয়াতিতে ব্যবহৃত ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দিতেন। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই ছাড়াই সেই কাগজপত্রে সই-স্বাক্ষর করে টাকা বের করে দেয়ার সুযোগ করে দেন।

সোনালী ব্যাংকের ওই শাখার ম্যানেজারসহ অন্যান্য কর্মকর্তা, প্রধান কার্যালয়ের এমডিসহ অন্যরা তাতে শুধু সই-স্বাক্ষর করতেন।

হলমার্ক গ্রুপ শুধু ঋণের নামে অর্থ আত্মসাতই করেনি, একই সঙ্গে প্রভাব খাটিয়ে তাদের কর্মচারী দিয়ে গঠিত নামসর্বস্ব পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

হলমার্কের কর্মচারীদের দিয়ে গঠিত কাগুজে প্রতিষ্ঠান টিএম ব্রাদার্সসহ পাঁচটি কোম্পানিতে ঋণের টাকা ঢুকিয়ে মালামাল না এনেই ওভার ইনভয়েসিং করে হলমার্কের ব্যাংক হিসাবে টাকা ঢোকানো হতো। এ ক্ষেত্রে জালিয়াতির মাধ্যমে হলমার্কের সঙ্গে ওই পাঁচটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের লেনদেন দেখানো হতো।

হলমার্কের এমডি তানভীর ও তার শ্যালক তুষার প্রতিনিয়ত সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও শেরাটন শাখায় যাতায়াত করে একটি চক্র গড়ে তুলে বিপুল ওই অর্থ হাতিয়ে নেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে হলমার্কের এই ঋণকে ‘হাই রিস্ক’ বা ‘উচ্চঝুঁকির’ ঋণ উল্লেখ করে তা থামানোর জন্য সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দেয়া হয়।

মামলার সাক্ষ্যে আরও বেরিয়ে এসেছে, ব্যাংকের এমডি, ডিএমডি, শাখা ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘হাই রিস্ক’ বা ‘উচ্চঝুঁকির’ ঋণের ব্যাখ্যায় ‘নো রিস্ক’ কথাটি উল্লেখ করে ব্যাখ্যা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককেও প্রতারিত করেন। হলমার্কের কাছে জালিয়াতির শিকার হয় জনতা ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি তফসিলি ব্যাংকও।

হলমার্ক সোনালী ব্যাংকের গ্রাহক (ক্লায়েন্ট) হলেও জনতা ব্যাংকের গ্রাহক ছিল হলমার্কের কর্মচারীদের দিয়ে গঠিত ওই পাঁচটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানগুলো এলসির বিপরীতে জনতা ব্যাংক থেকে এলসির নিয়ম দেখিয়ে ৮০ পার্সেন্ট টাকা নিয়ে নেয়। এই টাকা সোনালী ব্যাংক থেকে জনতা ব্যাংকের পাওয়ার কথা থাকলেও গ্রাহক ভুয়া হওয়ায় হলমার্ক বা তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সোনালী ব্যাংক টাকা পায়নি। সে কারণে জনতা ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যাংকে থাকা দায় এটি শোধ করতে পারেনি।

নয় বছরে আদায় হয়নি এক টাকাও

২০১০-২০১২ সালের মার্চের মধ্যে সোনালী ব্যাংকসহ দেশি-বিদেশি ৪১টি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে হলমার্ক ৩ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা তুলে নেয়। এর মধ্যে জালিয়াতির খবর প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পর (মালিকের গ্রেপ্তারের আগে) মাত্র ৫৬৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আদায় হয়।

এরপর গত ৯ বছরে একটি টাকাও আদায় হয়নি। প্রতি মাসে ১০০ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধের শর্তে ২০১৩ সালের আগস্টে জামিন পান মামলার অন্যতম আসামি হলমার্কের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম। কিন্তু তিনি ছয় বছর জামিনে বাইরে থাকলেও এক টাকাও পরিশোধ করেননি। ফলে জামিন বাতিল করে ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই তাকে ফের কারাগারে পাঠায় আদালত।

বন্ধক রাখা সম্পত্তি আদালতের মাধ্যমে বিক্রির অনুমতি পেলেও ক্রেতার অভাবে তা বিক্রি হয়নি বলে জানিয়েছে দুদক সূত্র। বর্তমান বাজার দরে বিক্রি হলেও সোনালী ব্যাংক তা থেকে সর্বচ্চ দেড় হাজার কোটি টাকা পেতে পারে। ফলে ২ হাজার কোটি টাকার কোনো হিসাব মিলছে না ব্যাংকটির।

এসব ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালত ও সাধারণ আদালতে মামলা হয়েছে। এ বিষয়ে দুদক অনুসন্ধান শেষে পৃথক ৪০টি মামলা করে। এর মধ্যে ফান্ডেড ৩৮টি, আর নন-ফান্ডেড দুটি মামলা দায়ের করা হয়।

২০১২ সালে ফান্ডেড (সোনালী ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ) ১ হাজার ৫৬৮ কোটি ৪৯ লাখ ৩৪ হাজার ৮৭৭ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২৭ জনকে আসামি করে ১১টি মামলা এবং ২০১৩ সালে ফান্ডেড মামলায় প্রায় ৩৭২ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আরও ২৭টি মামলা দায়ের করে দুদক।

পরবর্তী সময়ে ফান্ডেড মামলায় মোট ১ হাজার ৯৫৪ কোটি ৮৩ লাখ ৭১ হাজার ৭৮৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৪ সালের বিভিন্ন সময়ে ৩৮টি মামলার চার্জশিট দেয় সংস্থাটি। এতে হলমার্ক গ্রুপের এমডি তানভীর মাহমুদ, তার স্ত্রী ও গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম, তানভীরের ভায়রা ও গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক তুষার আহমেদ এবং হলমার্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে আসামি করা হয়।

অভিযোগ দাখিলের পর দীর্ঘ ৭ বছরে ৩৮ মামলার মধ্যে বিচারিক রায় এসেছে মাত্র একটি মামলায়। ২০১৬ সালে ঢাকার পাঁচ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের রায়ে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাসহ তিন জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

মামলার জট কমাবে ‘মেডিয়েশন’

মামলার জট কমাবে ‘মেডিয়েশন’

প্রতীকী ছবি

মেডিয়েশন হল মামলা নিষ্পত্তির বিকল্প একটি পন্থা। এই পদ্মতিতে আদালতের বাইরে বাদী-বিবাদীগণের বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করেন একজন মেডিয়েটর বা মধ্যস্থতাকারী।

মামলা নিষ্পত্তির বিকল্প পন্থা হিসেবে মেডিয়েশন ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন।

শনিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে মামলা মেডিয়েশন বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সারাদেশের ২৮০ জন বিচারককে সনদ প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল মেডিয়েশন সোসাইটি (বিমস) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘মূলত মেডিয়েশন হলো বিরোধ নিষ্পত্তির বিকল্প একটি পদ্ধতি। যে পদ্ধতি আদালত-ট্রাইব্যুনালের প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে থেকে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে ভারতীয় উপমহাদেশে মেডিয়েশন পদ্ধতি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করা হচ্ছে। যার মধ্যে পঞ্চায়েত অন্যতম। পঞ্চায়তের সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগ দ্বারাও সমাদৃত হয়ে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘মেডিয়েশন পদ্ধতিতে একজন মেডিয়েটরের মাধ্যমেই অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়। যেখানে উভয়পক্ষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা হয়। ফলে উভয়পক্ষের সর্বসম্মতিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়।’

এই পদ্মতি বিচার বিভাগের ওপর থেকে মামলার চাপ কমানোর পাশাপাশি বিচারে সমতা নির্ণয়ে কাজ করে বলেও মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি।

তিনি বলেন, ‘মূলত মেডিয়েশন পদ্ধতি চালু হয় পক্ষগণের মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে আদালতে মামলার চাপ ও খরচ কমিয়ে আনা এবং দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য।’

মামলার জট কমাবে ‘মেডিয়েশন’
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে মেডিয়েশন সনদ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন

প্রধান বিচারপতি জানান, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রেও সফলভাবে দেওয়ানী-ফৌজদারী মামলায় মেডিয়েশনের প্রয়োগ হচ্ছে। বর্তমানে নিউইয়র্কে ১০ শতাংশ দেওয়ানী মামলা বিচারের বিভিন্ন পর্যায়ে থেকেও মেডিয়েশনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হচ্ছে। কানাডায় প্রায় ৮০ শতাংশ মামলা এভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়াতেও মেডিয়েশনের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তিতে জোড় দেয়া হয়েছে।

আইনজীবী, বিচারক ও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলকে মেডিয়েশনের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তিতে আগ্রহী হয়ে এগিয়ে আসারও আহ্বান জানান তিনি। কেননা, মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হলে তা বিচারের ব্যাপ্তিকে ক্ষুন্ন করে। এতে মামলার পক্ষসমূহের খরচ বেড়ে যায় এবং আদালতে মামলার জট বৃদ্ধি পেতে থাকে। মামলা জট বিচার বিভাগের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে মামলা নিষ্পত্তিতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পন্থা হিসেবে মেডিয়েশন ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করেন প্রধান বিচারপতি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আন্তর্জাতিক মেডিয়েশন অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল মেডিয়েশন সোসাইটির (বিমস) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস এন গোস্বামী।

আরও বক্তব্য রাখেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি কুরিয়ান জোসেফ, জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক প্রধান বিচারপতি গীতা মিতাল, জাতিসংঘের অম্বুডসম্যান ড. কেভিন বেরি ব্রাউন, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ মফিজুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফজলে খোদা মোহাম্মদ নাজির, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ জয়শ্রী সমাদ্দার ও বাংলাদেশ ইন্ডিয়া মেডিয়েটর্স ফোরামের চেয়ারম্যান জর্জ যিশু ফিদা ভিক্টর।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক মো. মজিবুর রহমান মিয়া, বিচারক জাফর আহমেদ ও আহমেদ সোহেল।

এবার বিমস-এর সহযোগিতায় কয়েক ধাপে অধস্তন আদালতের বিচারকদের মেডিয়েশন বিষয়ে প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সারাদেশের বাছাই করা মোট ২৮০ জন বিচারক এ প্রশিক্ষণে অংশ নেন।

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িত সবাই চিহ্নিত: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িত সবাই চিহ্নিত: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

শনিবার সন্ধ্যায় তেজগাঁও কলেজের মিলনায়তনে ঢাকা পশ্চিম অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। ছবি: নিউজবাংলা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। সেটাই আমরা অনুসরণ করে যাচ্ছি। এবারই প্রথম একটু ব্যতিক্রম দেখলাম। এবার দুর্গাপূজার ওপরে আক্রমণের এমন দৃশ্য দেখলাম। আমরা সবকিছু বের করে ফেলেছি। সবগুলোকে চিহ্নিত করে ফেলেছি। এরা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে।’

সাম্প্রদায়িক হামলার সঙ্গে জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

তিনি বলেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। সেটাই আমরা অনুসরণ করে যাচ্ছি। এবারই প্রথম একটু ব্যতিক্রম দেখলাম। এবার দুর্গাপূজার ওপরে আক্রমণের এমন দৃশ্য দেখলাম। আমরা সবকিছু বের করে ফেলেছি। সবগুলোকে চিহ্নিত করে ফেলেছি। এরা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে। কেন এই কাণ্ড ঘটিয়েছে সবকিছু আপনাদের জানাতে সক্ষম হব, ইনশাআল্লাহ।’

শনিবার সন্ধ্যায় তেজগাঁও কলেজের মিলনায়তনে ঢাকা পশ্চিম অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল, সবার জন্য চিকিৎসা, সবার জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা। তার চিন্তা ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক দেশের ব্যবস্থা করা, যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই বাংলাদেশের, সবাই বাঙালি, আমরা একত্রিত। যুদ্ধের সময় অনেক হিন্দু ভাই আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। আমরা যুদ্ধের পরে সে কথা কেন ভুলে যাব? সবাই মিলেই আমরা বাংলাদেশ। সবাই মিলে এগিয়ে যাচ্ছি বলেই আমরা এই জায়গায় আছি।’

তিনি বলেন, ‘একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই, এই দেশ একটি অসম্প্রদায়িক চেতনার দেশ। আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ এটা ঠিক। প্রিয়নবী বলে গেছেন, সংখ্যালঘুদের দেখে রাখার জন্য। তারা যেন অনিশ্চয়তায় না ভোগে। যারা এই ষড়যন্ত্র করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। আইন অনুযায়ী যারা চিহ্নিত হয়েছেন, তাদের ব্যবস্থা হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ না করে, সেই ব্যবস্থা করা হবে।’

অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। আপনারা যে যেখানেই থাকেন সব সময় মাথা উঁচু করে বাঁচবেন। কারণ আমরা মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান।’

শেয়ার করুন

বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে শাহবাগে অবরোধ প্রত্যাহার

বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে শাহবাগে অবরোধ প্রত্যাহার

আট দফা দাবি জানিয়ে শনিবার দুপুরে শাহবাগ ছাড়ে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ। ছবি: নিউজবাংলা

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের আট দফার অন্যতম হলো শারদীয় দুর্গোৎসবের মধ্যে ও পরবর্তী সময়ে সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন।

কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখার জেরে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের ওপর সহিংসতার বিচার বিভাগীয় তদন্তসহ আট দফা দাবি জানিয়ে শাহবাগে অবস্থান ছেড়েছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ।

সংগঠনটি একই সঙ্গে তিন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে।

শাহবাগ মোড় ছেড়ে শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের দিকে যায় হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতা-কর্মীরা।

এর আগে সকাল ছয়টায় শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘গনঅনশন ও গণঅবস্থান’ করে সংগঠনটি।

গণঅবস্থান চলাকালে শাহবাগ মোড় অবরোধ করে সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের একটি অংশ।

দুপুর সাড়ে ১২টার আগে মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির পানি পান করিয়ে আন্দোলনকারীদের অনশন ভাঙ্গান।

আট দফা

গণঅনশন ও গণঅবস্থানে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ সংগঠনের পক্ষে আট দফা দাবি উত্থাপন করেন।

১. শারদীয় দুর্গোৎসবের মধ্যে ও পরবর্তী সময়ে সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন।

২. সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সব মন্দির, বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ, গৃহহীনদের পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়া ছাড়াও আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। স্বজন হারানো প্রতিটি পরিবারকে কমপক্ষে ২০ লাখ টাকা দেয়া অথবা প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের একজনকে যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরিতে নিয়োগ দেয়া।

৩. নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক হামলাকারী ও তাদের পেছনে থাকা চক্রান্তকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে শাস্তি নিশ্চিত করা।

৪. হামলা রোধে প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে দায়িত্ব পালনে গাফিলতি ও অবহেলা প্রদর্শনকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া।

৫. বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছাড়াও সাম্প্রদায়িক উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

৬. প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের মোকাবিলায় যেসব জনপ্রতিনিধি এগিয়ে আসেনি, তাদেরও চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়া।

৭. ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত সংগঠিত সাম্প্রদায়িক ঘটনাগুলো তদন্তে হাইকোর্টের নির্দেশনায় গঠিত সাহাবুদ্দিন কমিশনের সুপারিশ সংবলিত রিপোর্ট অনতিবিলম্বে জনসমক্ষে প্রকাশ এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া।

৮. ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে সরকারি দলের নির্বাচনি ইশতেহারে প্রতিশ্রুত সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের দ্রুত বাস্তবায়নসহ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের কাছে দেয়া অঙ্গীকার দ্রুত বাস্তবায়ন।

তিন কর্মসূচি

মনীন্দ্র কুমার নাথ তিনটি কর্মসূচির ঘোষণা দেন।

১. আট দফার সমর্থনে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ‘চল চল ঢাকায় চল’ স্লোগানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা।

২. আটটি দাবি বাস্তবায়নে ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিটি সংগঠন আলাদা ও যৌথভাবে জনসংযোগ ও প্রতিবাদী কর্মসূচি এগিয়ে নেবে।

৩. আগামী ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় শ্যামাপূজায় দীপাবলী উৎসব বর্জন, সন্ধ্যা ৬টা থেকে সোয়া ৬টা পর্যন্ত কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে মন্দিরে নীরবতা পালন এবং মন্দির/মণ্ডপের ফটকে কালো কাপড়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বিরোধী স্লোগান সংবলিত ব্যানার টাঙানো হবে।

শেয়ার করুন

পীরগঞ্জে হামলা: ফেসবুকে পোস্টের পর মাইকিং

পীরগঞ্জে হামলা: ফেসবুকে পোস্টের পর মাইকিং

পীরগঞ্জের করিমপুরে হিন্দুপল্লিতে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাড়ি। ছবি: নিউজবাংলা

এ ঘটনার জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার সৈকত মন্ডল ও তার সহযোগী রবিউল ইসলামকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়েছে র‌্যাব। বাহিনীটি বলছে, পীরগঞ্জে হিন্দুদের বাড়িতে হামলার হোতা সৈকত।

ফেসবুকে পোস্টের পর মাইকিংয়ের মাধ্যমে লোক জড়ো করে রংপুরের পীরগঞ্জের জেলে পাড়ায় হিন্দুদের বাড়িতে হামলা করা হয়। আর গ্রেপ্তার সৈকত মন্ডলই এ ঘটনার হোতা বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে শুক্রবার রাতে টঙ্গী থেকে সৈকত মন্ডল ও তার সহযোগী রবিউল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে শনিবার দুপুরে কারওয়ান বাজার মিডিয়া সেন্টারে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন বাহিনীটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অরাজকতা তৈরি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের লক্ষ্যে হামলা-অগ্নিসংযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং মাইকিং করে হামলাকারীদের জড়ো করেন বলে জানিয়েছেন। গ্রেপ্তার সৈকত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক, বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যাচারের মাধ্যমে স্থানীয় জনসাধারণকে উত্তেজিত করে তোলেন। এ ছাড়া, তিনি উক্ত হামলা ও অগ্নিসংযোগে অংশগ্রহণে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করেন।’

র‌্যাব বলছে, সৈকতের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন হামলায় সরাসরি অংশগ্রহণ করে বাড়িঘর, দোকানপাট ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেন। সৈকত রবিউলকে মাইকিং করে লোকজন জড়ো করতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ঘটনার পর সৈকত আত্মগোপনে চলে যান।

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, সৈকত মন্ডল রংপুরের একটি কলেজের স্নাতকে অধ্যয়নরত। তিনি রংপুর পীরগঞ্জের হামলা এবং অগ্নিসংযোগের অন্যতম হোতা। বিভিন্ন সময়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন উসকানিমূলক ও বিভ্রান্তিকর পোস্ট এবং শেয়ার করতেন তিনি।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃত রবিউল রংপুরের পীরগঞ্জের হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অন্যতম উসকানিদাতা। তিনি উক্ত হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার আগে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মাইকিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে, মিথ্যাচার করে গ্রামবাসীকে উত্তেজিত করে তোলেন এবং ওই হামলায় অংশগ্রহণের জন্য জড়ো হতে বলেন।

‘এরপর তিনি মাইকিংয়ের দায়িত্ব তার আস্থাভাজনকে দিয়ে নিজে সশরীরে অংশগ্রহণ করেন এবং নির্দেশনা দেন। গ্রেপ্তার রবিউল জানায়, সৈকতের নির্দেশনায় এবং প্ররোচনায় তিনি মাইকিং করাসহ হামলায় অংশগ্রহণ করেন। ঘটনা পরবর্তীতে তিনিও আত্মগোপনে চলে যান।’

র‌্যাব জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টায় কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, ফেনী এবং রংপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় স্বার্থন্বেষী মহলের অপতৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। এ ছাড়া, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের লক্ষ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক, বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির অপচেষ্টা করছে চক্রান্তকারীরা।

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, এসব সহিংসতায় জড়িত থাকার সন্দেহে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখা ও বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের অভিযানে প্রায় ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।

র‌্যাব জানায়, সৈকত যে ফেসবুক পেজটি ব্যবহার করেছে সেখানে ৩ হাজারের বেশি ফলোয়ার। দুর্গাপূজার সময় কুমিল্লার একটি মণ্ডপে কোরআর রাখার ঘটনার পরপরই তিনি ফেসবুকে পোস্ট দেন। পোস্টে লেখেন, ‘আমাদের এক হতে হবে…।’

সৈকত একটি দুর্বল সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

সৈকত মন্ডল ছাত্রলীগের কোনো পদে ছিলেন কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘সৈকত রংপুরের একটি ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী। রংপুরে ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে নিজে প্রচার করতে পারে, কিন্তু তার কোনো রাজনৈতিক পদ ছিল না। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার কোনো সম্পৃক্ততাও আমরা পাইনি।’

সৈকত ফেসবুকে কী ধরনের পোস্ট করতো, এমন প্রশ্নের জবাবে র‌্যাবের এই মুখপাত্র বলেন, ‘সৈকত তার ফেসবুকে পেজে বিভিন্ন ছোট-বড় ইস্যুতে বিভিন্ন উসকানিমূলক পোস্ট দিত। মূলত কুমিল্লার ইস্যুর পর থেকেই তার ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট দিয়ে আসছিল। এরপর রংপুরের পীরগঞ্জে যখন একটি ঘটনা ঘটে। এরপর সৈকত একের পর এক উসকানিমূলক পোস্ট দিতে থাকে। মূলত তার এসব পোস্ট দেখেই পীরগঞ্জে শত শত লোক জড়ো হয়েছিল।’

সৈকতের সহযোগী রবিউলের বিষয়ে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্রেপ্তার রবিউল প্রথমে পাশের মসজিদ থেকে মাইকিং করা শুরু করেন। এরপর তিনি মাইকিংয়ের দায়িত্ব তার সম্পর্কে এক কাজিনের কাছে দেন। মাইকিংয়ের ভাষা ছিল এমন- পরিতোষ নামের যে ছেলেটি ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছে, এটি কাবাঘর অবমাননা। এলাকাবাসী ও তৌহিদি জনতা একত্রিত হোন।’

শেয়ার করুন

সহিংসতার প্রতিবাদে শাহবাগ অবরোধ, বিশিষ্টজনদের সংহতি

সহিংসতার প্রতিবাদে শাহবাগ অবরোধ, বিশিষ্টজনদের সংহতি

সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিবাদে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের আয়োজনে সকাল থেকে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণঅনশন, গণঅবস্থান ও বিক্ষোভ মিছিল হয়। ছবি: নিউজবাংলা

বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতা-কর্মীরা শনিবার বেলা ১১টার দিকে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন। এর আগে সকাল ছয়টা থেকে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণঅনশন, গণঅবস্থান ও বিক্ষোভ মিছিল হয়।

কুমিল্লায় মণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার প্রতিবাদে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেছে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ।

এতে সংহতি জানিয়েছেন রাজনীতিক, শিক্ষক, অধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

ঐক্য পরিষদের নেতা-কর্মীরা শনিবার বেলা ১১টার দিকে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন। এর আগে সকাল ছয়টা থেকে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণঅনশন, গণঅবস্থান ও বিক্ষোভ মিছিল হয়।

কী বলছেন অংশগ্রহণকারীরা

সকাল ৭টার দিকে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের জন্য উপস্থিত হন সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু।

সংহতি জানিয়ে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘এই হামলা শুধু হিন্দুদের ওপর হামলা নয়; গোটা বাঙালির ওপর হামলা। প্রশাসনের গাফিলতির কারণে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়েছে। হামলা ঠেকাতে না পারার জন্য দায়ী প্রশাসনের একটি অংশ।

‘এই হামলার প্রতিবেদন দেখে আমার মনে হয়েছে, হামলা ঠেকাতে কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থতা আছে, কিছু ক্ষেত্রে অদক্ষতা আছে, কিছু ক্ষেত্রে গাফিলতি আছে। নোয়াখালীসহ বেশ কয়েক জায়গায় আমি দেখেছি প্রশাসনের উদ্দেশ্যমূলক নিষ্ক্রিয়তা। এটা খুবই ভয়াবহ ঘটনা। এই ধরনের হামলা ঠেকাতে সাম্প্রদায়িক জঙ্গি গোষ্ঠীকে আর ছাড় দেয়া যায় না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘কোরআন অবমাননার জন্য হিন্দুদের ওপর হামলা চালানো হয়নি; বরং তাদের ওপর হামলা চালানোর উদ্দেশ্যেই কোরআনকে তাদের মন্দিরে রেখে আসা হয়।

‘হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারের জন্য রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা রাখতে হবে। এবারের এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, শুধু প্রতিবাদ করলে হবে না; প্রতিরোধও গড়ে তুলতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রঞ্জন কর্মকার বলেন, ‘এ দেশের হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানদের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এটি করা না হলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।’

মহিলা ঐক্য পরিষদের সভাপতি সুপ্রিয়া ভট্টাচার্য বলেন, ‘সারা দেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর যে হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা চলছে, তার সুষ্ঠু বিচার চাই।’

এ কর্মসূচির সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক নিমচন্দ্র ভৌমিক।

শারদীয় দুর্গোৎসব চলাকালে কুমিল্লা শহরে একটি মণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখাকে কেন্দ্র করে হিন্দুদের ওপর হামলা হয়। এর রেশ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলা করে দুর্বৃত্তরা।

এসব ঘটনার প্রতিবাদে রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিবাদ জানাচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

শেয়ার করুন

নিষেধাজ্ঞায়ও থেমে নেই ইলিশ ধরা

নিষেধাজ্ঞায়ও থেমে নেই ইলিশ ধরা

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই চাঁদপুরে চলছে ইলিশ ধরার মহোৎসব। ছবি: নিউজবাংলা

চাঁদপুরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন জেলে জানান, অভাবের তাড়নায় অনেক জেলে জেল-জরিমানার ঝুঁকি নিয়েও নদীতে নামছে ইলিশ ধরতে। এ কাজে অভিযানে জড়িত কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। তা ছাড়া নিষেধাজ্ঞার সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের ২০ কেজি করে চাল দেয়ার কথা থাকলেও দেয়া হয়েছে ১৪-১৫ কেজি করে।

মা ইলিশ রক্ষায় গত ৪ অক্টোবর থেকে ২২ দিন সরকার সারা দেশে ইলিশ মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ করলেও তা খুব একটা মানছেন না অনেক জেলে।

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চাঁদপুরে দিন-দুপুরে চলছে ইলিশ ধরা এবং কেনা-বেচা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে ইলিশ ধরা হচ্ছে ভোলা, বরগুনা ও ঝালকাঠিতেও।

নিষেধাজ্ঞার মধ্যে চাঁদপুরে পদ্মা-মেঘনায় জেলেদের ইলিশ ধরার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে নিয়মিত। মা ইলিশ রক্ষায় প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করলেও তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলছে ইলিশ ধরার মহোৎসব। নিষেধাজ্ঞায় দাম কম থাকায় ইলিশ কিনতে নদীতীরে প্রতিদিনই ভিড় করেন ক্রেতারা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ইলিশ রক্ষায় তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দিন-রাত অভিযান চালানো হচ্ছে নদীতে। আর সচেতন জেলেরা বলছেন, এভাবে মা ইলিশ নিধন করা হলে ভবিষ্যতে ইলিশ সংকট আরও প্রকট হবে।

চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান জানান, আশ্বিন মাসের অমাবস্যা ও ভরা পূর্ণিমায় মা ইলিশ ডিম ছাড়তে সমুদ্র ছেড়ে নদীর মিঠা পানিতে ছুটে আসে। ইলিশের ডিমের পরিপক্বতা ও প্রাপ্যতার ভিত্তিতে এবং আগের গবেষণার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মা ইলিশ রক্ষা কার্যক্রম কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়।

তিনি বলেন, এ বছর ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীর ৭০ কিলোমিটারসহ দেশের উপকূলীয় জেলার নদ-নদীতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সময়ে যদি মা ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়তে দেয়া যায়, তবে আগামী বছর ইলিশের উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে।

চাঁদপুর সদরের পুরানবাজার থেকে হরিণা পর্যন্ত, রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের পুরো এলাকা, সদর উপজেলার আনন্দ বাজার, মতলব উত্তরের মোহনপুর এখলাসপুর, ষাটনল এলাকায় এবং হাইমচর উপজেলার কাটাখালী, গাজীনগর এবং চরভৈরবী এলাকায় বিকেল থেকে ভোর পর্যন্ত মা ইলিশ ধরার মহোৎসব চলে। মা ইলিশ রক্ষায় প্রতিদিন প্রশাসন, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ ও মৎস্য বিভাগের লোকজন অভিযান চালাচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই নিভৃত করা যাচ্ছে না অসাধু জেলেদের।

নিউজবাংলার প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ইলিশ ধরা চলছে ভোলা, বরগুনা ও ঝালকাঠিতেও। ভোলার মনপুরা, মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে রাতের আঁধারে ইলিশ ধরছেন অনেক জেলে। লুকিয়ে লুকিয়ে ইলিশ শিকার চলছে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদী, বিষখালী নদী এবং বরগুনার নদীগুলোতেও।

কোথাও কোথাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে জেলেদের সংঘর্ষেরও খবর পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি মুন্সিগঞ্জ সদরের মেঘনায় মা ইলিশ রক্ষা অভিযানে গিয়ে জেলে ও এলাকাবাসীর হামলায় আহত হয়েছেন নৌপুলিশের পাঁচ সদস্য।

তবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে বেশি ইলিশ ধরা হচ্ছে চাঁদপুরে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন জেলে জানান, অভাবের তাড়নায় অনেক জেলে জেল-জরিমানার ঝুঁকি নিয়েও নদীতে নামছে ইলিশ ধরতে। এ কাজে অভিযানে জড়িত কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। তা ছাড়া নিষেধাজ্ঞার সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের ২০ কেজি করে চাল দেয়ার কথা থাকলেও দেয়া হয়েছে ১৪-১৫ কেজি করে।

এভাবে চলতে থাকলে অভিযানে সফলতা আসবে না বলেও মনে করছেন অনেকে।

সদর উপজেলার হরিণা ফেরিঘাট এলাকার জেলে মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘আমরা যারা প্রকৃত জেলে রয়েছি, তারা ইলিশ না ধরলেও অনেকেই পেটের দায়ে মাছ ধরতে যায়। তাদের অনেকে আবার ধরাও পড়েছে। জেলেদের চাল দেয়ার পাশাপাশি নগদ অর্থ সহায়তা দেয়া হলে তারা মাছ ধরতে যেত না। অভিযান সফল করতে জেলেদের সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে। তাহলেই অভিযানের সময়ে জেলেরা নদীতে মাছ ধরতে নামবে না।’

নিষেধাজ্ঞায়ও থেমে নেই ইলিশ ধরা

চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা গোলাম মেহেদী হাসান বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেরা যাতে ইলিশ শিকার করতে না পারে, সে জন্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা পুলিশ, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে দিন-রাত অভিযান পরিচালনা করছি। আমরা ইলিশ রক্ষায় সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

জেলা মৎস্য থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন ৪৪ হাজার ৩৫ জেলেকে ২০ কেজি করে চাল দেয়া হচ্ছে। তা ছাড়া নিষেধাজ্ঞার পর থেকে এ পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল ও ইলিশ জব্দ করা হয়েছে। দুই শতাধিক জেলেকে অর্থদণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

চাঁদপুর অঞ্চরের নৌপুলিশ সুপার মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘মা ইলিশ রক্ষায় আমরা নিয়মিতভাবে নদীতে টহল দিয়ে যাচ্ছি। কোনো অবস্থায় যেন জেলেরা ইলিশ নিধন করতে না পারে সে ব্যাপারে কঠোর নজরদারি করছি। তার পরও অনেক সময় কিছু অসাধু জেলে নদীতে নেমে মাছ ধরার চেষ্টা করে। তাদের বিরত রাখতেও আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

শেয়ার করুন

পীরগঞ্জ হামলার অন্যতম হোতা গ্রেপ্তার: র‍্যাব

পীরগঞ্জ হামলার অন্যতম হোতা গ্রেপ্তার: র‍্যাব

রংপুরের পীরগঞ্জের রামনাথপুরে সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাড়ি। ছবি: নিউজবাংলা

গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম পরিচয় জানানো হয়নি। র‍্যাব দাবি করছে, তিনি হামলার অন্যতম হোতা। শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।

রংপুরের পীরগঞ্জে হিন্দু পল্লীতে সাম্প্রদায়িক হামলা ও আগুন দেয়ার ঘটনায় আরও একজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব।

তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম পরিচয় জানানো হয়নি। বাহিনীটি দাবি করছে, তিনি হামলার অন্যতম হোতা।

শুক্রবার রাতে এ তথ্য জানিয়েছেন র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার সহকারী পরিচালক আ ন ম ইমরান খান।

র‍্যাব বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য শনিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হবে। সংবাদ সম্মেলনটি কারওয়ান বাজরে র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে অনুষ্ঠিত হবে।

১৭ অক্টোবর রাতে পীরগঞ্জের রামনাথপুরের উত্তরপাড়ায় হিন্দু পল্লীতে হামলার ঘটনায় হওয়া তিন মামলায় এখন পর্যন্ত ৫৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মামলায় ৩৭ আসামিকে বৃহস্পতিবার তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

বাহিনীটির একটি সূত্র জানিয়েছে, রিমান্ডে থাকা অনেকেই হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

শেয়ার করুন