প্যান্ডোরা পেপার্স: মন্তব্য নেই মিন্টুর

প্যান্ডোরা পেপার্স: মন্তব্য নেই মিন্টুর

নেপালের ব্যবসায়ী বিনোদ চৌধুরীর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের জেরে আব্দুল আউয়াল মিন্টুর নাম এসেছে প্যান্ডোরা পেপার্সে। এ বিষয়ে মিন্টুর ব্যক্তিগত ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তার সহকারী হুমায়ন কবির নিউজবাংলাকে বলেন, ‘স্যার বলে দিয়েছেন, এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না।’

প্যান্ডোরা পেপার্স নামে অফশোর কোম্পানির গোপন নথি ফাঁসের পর বেরিয়ে আসছে বিশ্বের প্রভাবশালী অনেকের আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য। এই নথিতে রয়েছে নেপালের শীর্ষ ধনী বিনোদ চৌধুরীর নাম। আর বিনোদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের জেরে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল আউয়াল মিন্টুর নাম এসেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে।

ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অফ ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) রোববার রাতে প্রকাশ করে প্যান্ডোরা পেপার্স। সংস্থাটি বলছে, তাদের কাছে থাকা ১ কোটি ১৯ লাখ আর্থিক লেনদেনের নথিতে ১৪টি অফশোর সার্ভিস কোম্পানির ২.৯৪ টেরাবাইট গোপন তথ্য রয়েছে।

এই নথিতে নেপালের বিনোদ চৌধুরী পরিবারের সঙ্গে দেশটির সবচেয়ে পুরোনো ব্যবসায়িক পরিবার গোলচাসহ বেশ কয়েকজন রাজনীতিকের নামও এসেছে।

প্যান্ডোরা পেপার্সে বলা হয়েছে বিনোদ চৌধুরী তার স্ত্রী ও তিন ছেলে নিরভানা, ভারুন ও রাহুলের নামে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে কোম্পানি খুলেছেন।

এতে বলা হয়, ‘ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে সিনোভেশন ইনকরপোরেটেড, সিজি হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টস লিমিটেড, সেনসেই ক্যাপিটাল পার্টনার্স ইনকরপোরেটেড ও সিঙ্গাপুরে সিজি হসপিটালিটি হোল্ডিংস গ্লোবাল লিমিটেড কোম্পানিগুলো চৌধুরী পরিবারের নামে নিবন্ধিত।’

প্যান্ডোরা পেপার্সে কোম্পানির চিঠিপত্র, শেয়ার, অর্থ স্থানান্তর এবং চৌধুরী পরিবারের সদস্য ও অংশীদারদের মধ্যে বিভিন্ন লেনদেনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। এসব অংশীদারদের কেউ কেউ পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের নাগরিক।

এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনালের (এএনআই) প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে নিবন্ধিত বিনোদ চৌধুরীর কোম্পানি সিনোভেশনে জড়িতদের একজন হলেন ‘বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক’ আব্দুল আউয়াল মিন্টু, যার বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে ঢাকায় অর্থ পাচার ও ঋণ জালিয়াতির তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন।

তবে বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি দেশের ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মিন্টু।

এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে আবদুল আউয়াল মিন্টুর ব্যক্তিগত নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তার সহকারী হুমায়ন কবির সেটি রিসিভ করেন।

প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু জানানো হলে নিউজবাংলাকে হুমায়ন কবির বলেন, ‘স্যার বলে দিয়েছেন, এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না।

‘এর আগেও অনেকে জানতে চেয়ে ফোন দিয়েছেন। কিন্তু স্যার কোনো মন্তব্য করেননি। স্ট্রিক্ট বলে দিয়েছেন, এ বিষয়ে তিনি কথা বলবেন না, ফোনও ধরবেন না।’

এর আগে ২০১৭ সালের নভেম্বরে বহুল আলোচিত প্যারাডাইস পেপার্সে আবদুল আউয়াল মিন্টু, তার স্ত্রীসহ তিন ছেলের নাম এসেছিল।

হিমালয়ের পাদদেশের নেপালের একমাত্র বিলিওনিয়ার বিনোদ চৌধুরী দেশটির হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে কংগ্রেসের মনোনীত একজন সদস্য।

প্যান্ডোরা পেপার্সে জড়িত আরেকটি নেপালি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে গোলচা অর্গানাইজেশন। ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা যায়, তাদেরও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে অফশোর কোম্পানি রয়েছে। এর মালিক কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা লোকমান্য গোলচা। তার ভাই প্রয়াত দিবাকর গোলচা, প্রয়াত মহেন্দ্র কুমার গোলচা, চাচাতো ভাই চন্দ্র কুমার গোলচা ও দিবাকরের পুত্র হিতেশ গোলচার নামও রয়েছে মালিকানায়।

ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা গেছে, ওভারসিজ ম্যানেজমেন্ট নামে একটি জেনেভা ভিত্তিক আইন সংস্থা গোলচা পরিবারের সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত ফ্ল্যাটউড লিমিটেডের পক্ষে ২০০৮ সালে সুইজারল্যান্ডের বার্কলেজ ব্যাংকে একটি অ্যাকাউন্ট খোলেন। দিবাকর গোলচা ২০০৮ সালে ফ্ল্যাটউড লিমিটেডের মাধ্যমে নেপালে ইস্টার্ন সুগার মিলস লিমিটেডের শেয়ার কিনেছিলেন।

নেপালের অন্যতম শিল্প প্রতিষ্ঠান, গোলচা ও এর প্রতিষ্ঠাতারা প্রায় ৭০ বছর আগে বিরাটনগর জুট মিল প্রতিষ্ঠা করেন। গোলচা প্রতিষ্ঠানটি প্রথম নেপালি কোম্পানি, যারা ফ্ল্যাটউডের মাধ্যমে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস থেকে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আসে।

প্যান্ডোরা পেপার্সে নেপালের অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন রাধেশ্যাম শরাফ ও তার পরিবার, যারা কাঠমান্ডুর তারাগাঁও রিজেন্সি হোটেল ও ইয়াক অ্যান্ড ইয়েটি হোটেলের মালিক। এ ছাড়া নেপালি ব্যবসায়ী রাজেন্দ্র শাক্য, পুরুষোত্তম পৌডিয়াল, সুধীর মিত্তলসহ বেশ কয়েকজনের নাম আছে প্যান্ডোরা পেপার্সে।

আরও পড়ুন:
কী আছে প্যান্ডোরা পেপার্সে
প্যান্ডোরা পেপার্স: ফেঁসে গেলেন জ্যাকি শ্রফ
‘প্যান্ডোরা পেপার্সে’ টেন্ডুলকার, আইনজীবীর দাবি বৈধ বিনিয়োগ
প্যান্ডোরা পেপার্সে ৭০০ পাকিস্তানি, আছেন ইমরান ঘনিষ্ঠরাও
খুলল ‘প্যান্ডোরার বক্স’, বিশ্বনেতাদের গোপন লেনদেন ফাঁস

শেয়ার করুন

মন্তব্য

দ্য লাস্ট ফেরি

দ্য লাস্ট ফেরি

লেবুখালী ঘাটের শেষ ফেরির যাত্রীদের একজন ছিলেন নিপা রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিন এই রুটে ফেরিতে যাতায়াত করি। আজও ফেরিতে চড়ে কাজে গেলাম। ফিরব সেতু দিয়ে। ফেরিতে নানা দুর্ভোগ থাকলেও এই অভিজ্ঞতা মিস করব।’

১৮ বছর ধ‌রে লেবুখা‌লীতে ফে‌রি চালা‌চ্ছেন জা‌কির হাওলাদার। পায়রা সেতুতে গাড়ি চলাচল শুরু হওয়ায় রোববার এই নৌপথে শেষবারের মতো ফেরি চালিয়েছেন তিনি।

এই দক্ষ চালকের হাত ধরে শেষ হলো একটি অধ্যায়ের। এই পথে আর কখনও দেখা মিলবে না ফেরির। লেবুখালী ঘাট থেকে রোববার বেলা সোয়া ১১টার দিকে শেষ ফেরিটি নিয়ে অন্য পাড়ে রওনা দেন জাকির।

ঘাট ছাড়ার আগে ছলছল করে ওঠে জাকিরের চোখ। এক যুগের বেশি সময়ের পেশাগত জীবনের কতশত স্মৃতি মনে পড়ে তার। কথা বলতে গিয়ে শুরুতে গলাটা ধরে আসে জাকিরের। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেন তিনি। জানান, এক মিশ্র অনুভূতিতে ডুবে আছেন। এখান থেকে চলে যেতে হবে, সেই বিচ্ছেদ যেমন তাকে পোড়াচ্ছে আবার যাত্রীরা সহজেই গন্তব্যে পৌঁছাবেন, সেই আনন্দে ভাসছেন তিনি।

প‌ু‌রো যৌবনই তার এখানে কেটেছে জানিয়ে জাকির বলেন, ‘এখন বগায় ফে‌রি চালা‌তে হ‌বে। এখান থে‌কে সাত দিন পর বগা, বেকুটিয়াসহ বি‌ভিন্ন রু‌টে চ‌লে যাব। অ‌নেক স্মৃ‌তি এখা‌নে। কষ্ট লাগ‌ছে, কিন্তু ভা‌লোও লাগ‌ছে।’

‘আমা‌দের সরকা‌রি চাকরি। কো‌নো আ‌ক্ষেপ নেই, বরং খু‌শি আমরা। কেননা এই অঞ্চ‌লের সাধারণ মানু‌ষের কষ্ট শেষ হ‌চ্ছে পায়রা সেতুর মাধ‌্যমে। এর জন‌্য আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হা‌সিনার কা‌ছে কৃতজ্ঞ।’

শেষ ফেরিতে আল্লাহর দান পরিবহনের একটি বাসের যাত্রী সঞ্জিত মিত্রর সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার। তিনি জানান, শেষ ফেরির যাত্রী হতেই ঘুরতে গিয়েছেন।

দ্য লাস্ট ফেরি
শেষ ফেরির চালক জাকির হাওলাদার

ওই বাসের যাত্রীদের একজন নিপা রহমান জানান, তিনি পটুয়াখালী সদরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক; বাড়ি বরিশালের নথুল্লাবাদে। কাজে যোগ দিতে প্রতিদিনই তাকে ফেরিতে চড়ে পায়রা পাড়ি দিতে হতো।

‘আজও ফেরিতে চড়ে কাজে গেলাম। ফিরব সেতু দিয়ে। ফেরিতে নানা দুর্ভোগ থাকলেও এই অভিজ্ঞতা মিস করব।’

ফেরির আরেক বাসের যাত্রী মো. জাকির নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওষুধ কোম্পানির বিক্রিয় প্রতিনিধি হওয়ায় কাজের স্বার্থে বরিশালের বাকেরগঞ্জ থেকে পটুয়াখালী শহর ও কুয়াকাটায় দিনে দুই থেকে তিনবার যাওয়া-আসা করা লাগে।

‘ফেরিতে বেশ ভোগান্তি হতো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা লাগত। এখন সেতু চালু হওয়ায় দিনে আপ-ডাউন করতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা আমার সেভ হবে। আজ ফেরির শেষ যাত্রার সাক্ষী হলাম।’

এই রুটের আরেক ফেরির চালক মাহাবুবুর রহমান ব‌লেন, ‘চার‌টি ফে‌রি এখা‌নে নিয়মিত চলাচল ক‌রত। আ‌মি দুই বছর ধ‌রে এখা‌নে ফে‌রি চালাই। ফে‌রি এখা‌নে বন্ধ হ‌য়ে যাওয়ায় আমারও খারাপ লাগ‌ছে, ত‌বে ভা‌লো লাগাটা বে‌শি। পায়রা সেতু উদ্বোধনের ম‌ধ্য দি‌য়ে নতুন মাত্রা সৃ‌ষ্টি হ‌য়ে‌ছে এই অঞ্চ‌লে। আমার নতুন কর্মস্থল এখন বেকু‌টিয়ায়।’

দ্য লাস্ট ফেরি

লেবুখা‌লীর ফে‌রিগু‌লো‌তে চালক ও যাত্রীদের পছন্দের খাবার চিড়া ভাজা। ফেরি চলাচল বন্ধের খবরে বিক্রেতাদের চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ।

বা‌কেরগ‌ঞ্জের শাহজাহান সিকদার জানান, লেবুখালী ঘাটে দুই বছর ধরে হাশেমের চিড়া ভাজা বিক্রি করছেন তিনি। তাতে ভালোমতোই চলছিল সংসার।

শাহজাহান নামে চিড়া বিক্রেতা বলেন, ‘সেতু চালু হইয়া গে‌ল। এখন কী করমু বুঝ‌তা‌ছি না। ঢাহায় আত্মীয়স্বজন থা‌হে‌। হে‌গো ল‌গে কথা কই‌ছি কা‌মের লইগ্গা। মাথায় কাম ক‌রে না কো‌নো‌। ঘ‌রে তো সব না খাইয়া থাক‌বে‌।’

২০ বছর ধ‌রে সেখানে চিড়া বি‌ক্রি কর‌ছেন আ‌নোয়ার হাওলাদার। তি‌নি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সু‌বিদখালী বা‌ড়ি আমার। হা‌শে‌মের চিড়া ভাজা ফে‌রি‌তে বে‌চি ২০ বছর ধইরা‌। ডেই‌লি ২ হাজার টাহা বেচ‌তে পার‌লে মা‌লিক ৫০০ টাহা দেয়। ব্রিজ উ‌দ্বোধন হই‌তে আ‌ছে আইজ। এরপর যে কী করমু বু‌ঝি না। ঘ‌রে পোলাপান, বাপ-মা আ‌ছে। ক্যাম‌নে কী করমু?’

ক্রেতারাও জানালেন, এই চিড়া ভাজার কথা তাদের সব সময় মনে পড়বে।

দ্য লাস্ট ফেরি

ফেরির যাত্রী র‌হিম শেখ ব‌লেন, ‘লেবুখা‌লী ফে‌রি‌তে উঠ‌লেই হা‌শে‌মের চিড়া ভাজা কিনতাম। মূলত এই চিড়া ভাজা লেবুখা‌লী ফেরিকে কেন্দ্র করেই বি‌ক্রি হতো। শুধু আ‌মি নই, অসংখ‌্য মানুষ হা‌শে‌মের এই চিড়া ভাজা মিস কর‌বেন।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার বেলা ১১টায় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে পটুয়াখালীর লেবুখালীতে পায়রা নদীর ওপর বহুল প্রতিশ্রুত সেতুর উদ্বোধন করেছেন। এর মধ্য দিয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সড়ক যোগাযোগের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। পাশাপাশি শেষ হয়েছে বরিশাল-কুয়াকাটা রুটের ফেরির দিন।

পায়রা সেতু চালু হওয়ায় বরিশাল থেকে বাসে কুয়াকাটা যেতে এখন সময় লাগবে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার বা মোটরসাইকেলে আরও দ্রুত যাওয়া যাবে এই অঞ্চলের পর্যটন স্পটগুলোতে।

আরও পড়ুন:
কী আছে প্যান্ডোরা পেপার্সে
প্যান্ডোরা পেপার্স: ফেঁসে গেলেন জ্যাকি শ্রফ
‘প্যান্ডোরা পেপার্সে’ টেন্ডুলকার, আইনজীবীর দাবি বৈধ বিনিয়োগ
প্যান্ডোরা পেপার্সে ৭০০ পাকিস্তানি, আছেন ইমরান ঘনিষ্ঠরাও
খুলল ‘প্যান্ডোরার বক্স’, বিশ্বনেতাদের গোপন লেনদেন ফাঁস

শেয়ার করুন

৪৫ মাস ধরে ঝুলছে ষোড়শ সংশোধনী মামলার রিভিউ

৪৫ মাস ধরে ঝুলছে ষোড়শ সংশোধনী মামলার রিভিউ

এ রিভিউ নিষ্পত্তির ওপর নির্ভর করছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থা থাকা না থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশিষ্টজনরা বলছেন, রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি দ্রুত মীমাংসা হওয়া উচিত।   

দেশের সর্বোচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় প্রায় চার বছর ধরে পড়ে আছে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন। এ রিভিউ নিষ্পত্তির ওপর নির্ভর করছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থা থাকা না থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিশিষ্টজনরা বলছেন, রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি দ্রুত মীমাংসা হওয়া উচিত।

মামলাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এলে স্বাভাবিক কোর্ট চালু হলেই মামলাটি শুনানি হতে পারে।

তবে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, রিভিউ শুনানির জন্য আদালতের তালিকায় এলে শুনানি হবে। কবে নাগাদ তালিকায় আসবে সেটি দিনক্ষণ দিয়ে বলতে পারছেন না কেউই।

উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। সেই সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হলে হাইকোর্ট রুল জারি করে। এরপর রুলের চূড়ান্ত শুনানি করে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট।

এ রায়ের বিপক্ষে আপিল করা হলে আপিল বিভাগও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। এরপর রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। কিন্তু রিভিউ আবেদনের পর প্রায় চার বছর কেটে গেলেও নিষ্পত্তি হয়নি আবেদনটির।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রিভিউ নিষ্পত্তি করবেন আদালত। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আমরা আবেদন করে রেখেছি। এখন আদালত শুনানির জন্য তালিকায় আনলে অবশ্যই আমরা শুনানি করব।’

রাষ্ট্রপক্ষ দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রিভিউ শুনানির জন্য আমরা তো প্রস্তুত আছি। এখন আদালত যখন শুনানির জন্য তালিকা দেবেন, তখন শুনানি হবে। আদালত না দিলে আমরা তো আর তালিকায় আনতে পারি না।’

তিনি বলেন, ‘অন্য একটি মামলার রিভিউ শুনানির জন্য আমি আদালতকে বলেছিলাম। আদালত বলেছে, রিভিউগুলো একসঙ্গে শুনানি করবে। সপ্তাহে এক দিন আদালত রিভিউগুলো শুনবে। এখন আদালতের তালিকায় এলেই শুনানি হবে।’

এ মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নিয়মিত আদালত ছাড়া এ মামলার শুনানি সম্ভব নয়। এখন তো আপিল বিভাগ ভার্চুয়ালি চলছে। ভার্চুয়াল কোর্টে এ মামলার শুনানি করা কষ্টসাধ্য হবে। তার কারণ এটি দীর্ঘদিন শুনানি হবে, অনেক ডকুমেন্ট, পেপারস লাগে, অনেক রেফারেন্স লাগে। কাজেই ভার্চুয়াল কোর্টে এ মামলার শুনানি প্রায় অসম্ভব হবে। তবে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে শুনানির উদ্যোগ নেয়া হলে আমাদের কোনো অসুবিধা নাই। আমরাও চাই এটাকে পেন্ডিং না রেখে যত দ্রুত সম্ভব শেষ করা হোক।’

বহুল আলোচিত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে আপিল বিভাগের দেওয়া রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) জন্য সর্বোচ্চ আদালতে ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর আপিল বিভাগে আবেদনটি করে রাষ্ট্রপক্ষ। ৯৪টি সুনির্দিষ্ট যুক্তি তুলে ধরে ৯০৮ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদনে রাষ্ট্রপক্ষ পুরো রায় বাতিল চায়।

রিভিউয়ে যুক্তি তুলে ধরে প্রয়াত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সে সময়ে জানিয়েছিলেন, “সংবিধানের তফসিলে সন্নিবেশিত ১৯৭১-এর ১০ এপ্রিল প্রণীত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ উল্লেখ করে রিভিউ আবেদনে বলা হয়েছে, একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই বাংলাদেশের ফাউন্ডিং ফাদার রূপে স্বীকৃত। আপিল বিভাগ ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ বহুবচন শব্দ ব্যবহার করে ভুল করেছেন। তাই এর পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। রায়ের একটি অংশে পর্যবেক্ষণে ‘আমিত্ব’ ধারণা থেকে মুক্তি পেতে হবে বলে যা উল্লেখ আছে, সে প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষ রিভিউ আবেদনে যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, ‘আদালতের এই পর্যবেক্ষণ ভিত্তিহীন ও অপ্রত্যাশিত, যা আমাদের এই মামলার বিবেচ্য বিষয় নয়। এটি সংশোধনযোগ্য'।”

ষোড়শ সংশোধনীর আপিলের রায়ের আরেকটি পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘১. আমাদের নির্বাচনপ্রক্রিয়া ও সংসদ এখনও শিশুসুলভ; ২. এখনও এই দুটি প্রতিষ্ঠান মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি।’

এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি হচ্ছে, এই পর্যবেক্ষণ আদালতের বিচার্য বিষয় নয়। বিচারিক শিষ্টাচারের বাইরে গিয়ে এই পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়েছে, যা সংশোধনযোগ্য।

ষোড়শ সংশোধনীর আপিলের রায়ের আরেকটি পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘সংসদীয় গণতন্ত্র অপরিপক্ব। যদি সংসদের হাতে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা দেয়া হয়, তবে তা হবে আত্মঘাতী।’

এর সুরাহা চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, আদালতের এই পর্যবেক্ষণ শুধু অবমাননাকরই নয়, বরং ভিন্ন রাজনৈতিক প্রশ্ন। আদালতের বিচারিক এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে এই মন্তব্য করা হয়েছে। রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ অন্য একটি অঙ্গের বিরুদ্ধে এরূপ মন্তব্য করতে পারে না। এটা বিচারিক মন্তব্য নয়, এ মন্তব্য করে আদালত ভুল করেছেন, যা সংশোধনযোগ্য ও বাতিলযোগ্য।

রাষ্ট্রপক্ষ তাদের রিভিউ আবেদনে আরও যুক্তি দেখিয়ে বলেছে, আপিলের রায় প্রদানকারী আদালত মার্শাল ল জারির মাধ্যমে প্রণীত কোনো আইনকে বৈধ হিসেবে বিবেচনা করেনি; অথচ বিপরীতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান গ্রহণ করে ভুল করেছেন, যা সংশোধনযোগ্য।

রাষ্ট্রপক্ষ তাদের রিভিউ আবেদনে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য বিবেচনা না করে আদালত ভুল করেছে বলে উল্লেখ করে আদালতের এ ধরনের পর্যবেক্ষণ অপ্রত্যাশিত ও বাতিলযোগ্য অভিহিত করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষ পাকিস্তান আমলে মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশটি তৎকালীন রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ দ্বারা গঠিত এবং মার্শাল ল-এর অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি উল্লেখ করে যুক্তি দেখিয়েছে যে, এ কারণে এই অধ্যাদেশটি দেশে বর্তমানে আইন হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এ কারণে মার্শাল ল অধ্যাদেশটি ষোড়শ সংশোধনীর সঙ্গে তুলনা করা যাবে না, যা আদালত তুলনা করে ভুল করেছেন এবং তা সংশোধনযোগ্য।

রিভিউ আবেদনে আরও বলা হয়, সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদকে কার্যকর ও অর্থপূর্ণ করার জন্য সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করার মাধ্যমে সরকার কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অসদাচরণ প্রমাণিত হলে আইন অনুসারে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংবিধানে সংশোধনী আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু আপিল বিভাগ সেই সংশোধনীকে একটি ‘কালারেবল অ্যামেন্ডমেন্ট’ মন্তব্য করেন এবং প্রেক্ষাপট বিবেচনায় না নিয়ে এই সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করার মাধ্যমে ভুল করেছেন, যা সংশোধন হওয়া প্রয়োজন।

উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। ২২ সেপ্টেম্বর তার গেজেট হয়।

এরপর ষোড়শ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ৯ আইনজীবী হাইকোর্টে একটি রিট করেন। পরে ৯ নভেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ওই রিটে রুল জারি করেন। এরপর ২০১৬ সালের ৫ মে তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ, বাতিল ও সংবিধানপরিপন্থি বলে রায় ঘোষণা করেন।

একই বছরের ১১ আগস্ট পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের শুনানি নিয়ে ২০১৭ সালের ৩ জুলাই ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ।

এরপর ওই বছরের ১ আগস্ট ৭৯৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। যেখানে মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র, সংসদসহ বিভিন্ন ইস্যুতে পর্যবেক্ষণ রাখা হয়। রায়ের পর্যবেক্ষণে ‘বঙ্গবন্ধুকে খাটো করা হয়েছে’ অভিযোগ তুলে বিচারপতি সিনহার পদত্যাগের দাবিতে সরব হয়ে ওঠে সরকারদলীয় আইনজীবীসহ নেতারা।

জাতীয় সংসদেও এ রায় ও প্রধান বিচারপতির অনেক সমালোচনা করা হয়। এরপর ওই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর সংসদে রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আইনি পদক্ষেপ নেয়ার প্রস্তাব গৃহীত হয়। তারই প্রেক্ষাপটে রিভিউ আবেদন দায়ের করা হয়। এ রায় নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ২০১৭ সালের ৩ অক্টোবর ছুটিতে যান তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। পরে ১৩ অক্টোবর তিনি বিদেশে চলে যান। ১০ নভেম্বর তিনি সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনারের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবর নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন।

আপিল বিভাগের যে সাত বিচারপতি ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা পদত্যাগ করেন। বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার স্বাভাবিকভাবে অবসরে যান এবং বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্‌হাব মিঞা পদত্যাগ করেন।

বাকি তিন বিচারপতি বর্তমানে আপিল বিভাগে আছেন। তারা হলেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন (বর্তমান প্রধান বিচারপতি), বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

সম্প্রতি কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ তোলেন দেশের ৪২ জন নাগরিক। তারা ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের’ মাধ্যমে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে দুই দফায় রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন। এরপর আবার সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ও ষোড়শ সংশোধনীর বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।

আরও পড়ুন:
কী আছে প্যান্ডোরা পেপার্সে
প্যান্ডোরা পেপার্স: ফেঁসে গেলেন জ্যাকি শ্রফ
‘প্যান্ডোরা পেপার্সে’ টেন্ডুলকার, আইনজীবীর দাবি বৈধ বিনিয়োগ
প্যান্ডোরা পেপার্সে ৭০০ পাকিস্তানি, আছেন ইমরান ঘনিষ্ঠরাও
খুলল ‘প্যান্ডোরার বক্স’, বিশ্বনেতাদের গোপন লেনদেন ফাঁস

শেয়ার করুন

দেড় শ বছরের সম্প্রীতিতে আঁচড়

দেড় শ বছরের সম্প্রীতিতে আঁচড়

ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্রে কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদ ও ফেনীর কেন্দ্রীয় কালিমন্দির পাশাপাশি। ছবি: নিউজবাংলা

ফেনীতে মসজিদ-মন্দির পাশাপাশি। দেড় শ বছর ধরে সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে উপাসনা করছিলেন দুই সম্প্রদায়ের লোক। ১৬ অক্টোবর সংঘাতে সেই সম্প্রীতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, কিছু বহিরাগত যুবক ও কিশোর হামলায় অংশ নেয়।   

ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্রে কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদ ও কেন্দ্রীয় কালীমন্দির পাশাপাশি। একই ব্যক্তি এ দুটি ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ করেছেন। উদ্যোক্তা ত্রিপুরার মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য বাহাদুর।

হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির জন্য তাদের উপাসনার এ জায়গা তৈরি করে দিয়েছেন মহারাজা। দেড় শ বছর ধরে সে সম্প্রীতি বজায় রেখে দুই ধর্মের লোকেরা যার যার ধর্মীয় উপাসনা পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

গত ১৬ অক্টোবর সে সম্প্রীতি ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। দফায় দফায় হিন্দু-মুসলিম ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়েছে। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন অগণিত। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মসজিদ-মন্দির। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কয়েক শ ফাঁকা গুলি ছোড়েন।


দেড় শ বছরের সম্প্রীতিতে আঁচড়


কীভাবে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত, তার সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য মতে, ওই দিন (১৬ অক্টোবর) আসরের নামাজ শেষে ফেনী বড় জামে মসজিদের সামনে অবস্থান করছিলেন মুসল্লিরা। একই সময়ে কালীবাড়ি মন্দিরের সামনে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির আলোকে প্রতিবাদ সভা ও শহীদ মিনারে মানববন্ধনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ফেনী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ নেতারা। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

মুসল্লিদের দাবি, আসরের নামাজের সময় মসজিদের সামনে হিন্দুরা উলুধ্বনি দেয়ার পর মুসল্লিরা ক্ষেপে যান। তারা প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। মাগরিবের নামাজের পর ছাত্রলীগ-যুবলীগ মুসল্লিদের বিক্ষোভে অতর্কিতে হামলা করলে পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে যায়।

হিন্দু সম্প্রদায়ের দাবি, প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে বের হতে চাইলে কিছু দুর্বৃত্ত পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে টেনে নেয়ার চেষ্টা করে। পরে পুলিশের অনুরোধে তারা কালীবাড়ি মন্দিরের ভেতরে চলে আসেন।

পুলিশ সেখানে উপস্থিত মুসলমানদের সরাতে চাইলেও তারা জায়গা ছাড়তে রাজি হননি। মুসল্লিদের মধ্যে দুর্বৃত্তরা অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। এরপর মসজিদের সামনে অবস্থানরত দুর্বৃত্তরা উসকানিমূলক স্লোগান দিয়ে জিরো পয়েন্টের দিকে আসতে থাকে।

দেড় শ বছরের সম্প্রীতিতে আঁচড়


মসজিদের ব্যবস্থাপনা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আশ্রাফুল আলম গিটার জানান, ‘মসজিদ ও মন্দিরের ইতিহাস প্রায় ১৪৫ বছরের পুরোনো। ১৮৭৬ সালে ত্রিপুরার রাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য বাহাদুর ফেনী শহরে মন্দির ও মসজিদের জন্য ৫০ শতাংশ করে জমি বরাদ্দ দেন। সে সময়ের টিনের ছাউনি থেকে আজকের কংক্রিটের ধর্মীয় উপাসনালয় দুটি গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধর্মীয় সম্প্রীতির উদাহরণ হয়ে।

‘মাত্র কয়েক গজের ব্যবধানে একদিকে আজানের ধ্বনি, অন্যদিকে পূজা-অর্চনা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যকার বন্ধনকে দৃঢ় করেছে প্রায় দেড় শ বছর ধরে। তবে গত শনিবারের ঘটনার পর কিছুটা হলেও আঁচড় লেগেছে এই সম্প্রীতি ও বন্ধনে।’

আশ্রাফুল আলম গিটার বলেন, ‘প্রকৃত মুসলমানরা এই হামলায় অংশ নেয়নি। কিছু বহিরাগত ও উচ্ছৃঙ্খল জনতা মন্দির ও আশপাশের এলাকায় দোকানে হামলা করে। সাময়িকভাবে কিছুটা প্রভাব পড়লেও দীর্ঘদিনের সম্প্রীতি নষ্ট হবার নয়।’

ফেনী হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি শুকদেব নাথ তপন বলেন, ‘শায়েস্তা খাঁর আমল থেকে প্রতিষ্ঠিত মন্দির-মসজিদের সম্প্রীতি নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও গত শনিবারের হামলায় সেই প্রশ্ন উঠেছে, যেটা আমি ইতিবাচকভাবে দেখছি না। ১৬ অক্টোবর ফেনীর কেন্দ্রীয় জয়কালী মন্দিরে ব্যাপক ভাঙচুর হয়েছে। এ ছাড়া ফেনী শহরের ১৫টি হিন্দু দোকানেও লুটপাট চালানো হয়েছে। যারা হামলা-ভাঙচুর করেছে, সবাই বহিরাগত। তারা ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে এই নাশকতা চালিয়েছে।’

দেড় শ বছরের সম্প্রীতিতে আঁচড়


ফেনী কেন্দ্রীয় বড় মসজিদ লাগোয়া তাকিয়া রোডে ১৯৭৩ সালের আগে থেকে ব্যবসা করছে রেনু ট্রেডার্সের মালিক নয়ন পালের পরিবার। নয়ন পাল বলেন, ‘গত শনিবারের আগেও এখানে মনে হয় হিন্দু-মুসলিমে কোনো তফাৎ ছিল না। মসজিদে নামাজ শেষে অনেক মুসলিমও আমাদের দোকানে কেনাকাটা করতেন, হিন্দুরা তো আসতেনই। তবে শনিবার যে আক্রমণ করা হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর, তাতে করে সম্পর্কে তো একটু হলেও চিড় ধরবে। অথচ শত বছরের ইতিহাসে ফেনীতে এমনটা হয়নি।’

মসজিদ মার্কেটের পাটোয়ারী ফ্যাশনের মালিক নুরুল হুদা জানান, তিনি এখানে কখনও হিন্দু-মুসলমানে ভেদাভেদ দেখেননি। হিন্দুরাও তার দোকানে আসতেন নিয়মিতই। শনিবারের ঘটনা কিছুটা হলেও মনে দাগ কেটেছে। এ ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা তার কাছেও নেই।

জেলা প্রশাসক ও মসজিদ কমিটির সভাপতি আবু সেলিম মাহমুদ উল হাসান বলেন, ‘যারা এ কাজ করেছে তারা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে করেনি। একটি পক্ষ দেশকে অস্থিতিশীল করতে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। এটা কোনো ধর্মীয় বিরোধ নয়। একটি দুষ্কৃতকারীচক্র ঘটনার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে এই সম্প্রীতি ছিল, আছে, থাকবে। এই ঘটনা বেদনার।’

জয়কালী মন্দির কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শিল্পকলা একাডেমির সদস্য সমরজিৎ দাস টুটুল বলেন, ‘কয়েক ঘণ্টার হামলায় শত বছরের ঐতিহ্যের বন্ধন যেন ম্লান হয়ে গেছে। এখানে মন্দিরে প্রতিবছর পূজার সময় মসজিদ থেকে নামাজের সময়সূচি নিয়ে আসা হতো। নামাজ ও আজানের সময় পূজার কার্যক্রম বন্ধ রাখা হতো। একই রকম সহাবস্থান ছিল মসজিদের দিক থেকেও। অথচ এক দিনের ঘটনায় মনে যে দাগ কেটেছে, সেটা কীভাবে মুছবেন?’

টুটুল আরও বলেন, ‘বলা হচ্ছে এখন পরিস্থিতি শান্ত। আদতে শান্ত হলেও মন কি আর শান্ত হয়েছে? হিন্দুরা তো ভালো নেই, মুসলমানদের মনেও এই ঘটনা দাগ কেটে গেছে। তারাও তো আমাদেরই ভাই। দশমীর বিসর্জন কোনোভাবে পার করলেও বুধবারের লক্ষ্মীপূজায় তাদের কোনো আনন্দ নেই। হারিয়ে ফেলেছেন প্রাণচাঞ্চল্য।

‘মন্দির পূজা-অর্চনার জায়গা, অথচ সেখানে পুলিশ বসে পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে। এটিও কি সম্ভব? তবে এই সম্প্রীতি আবারও ফিরে আসবে বলে আমি আশা করি।’

দেড় শ বছরের সম্প্রীতিতে আঁচড়


সমরজিৎ দাস শনিবার রাতের ঘটনার সাক্ষী। এশার নামাজের পর থেকে শুরু হওয়া হামলা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত ছিলেন মন্দিরের ভেতরেই।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা মাত্র ৮ জন মানুষ ছিলাম ভেতরে। মসজিদের সামনে বিকেলের পর থেকে থমথমে পরিবেশ ঘোলাটে হতে থাকে। এশার নামাজের পর মসজিদের ছাদ ও মিনারের ওপর থেকে ইট-পাটকেল ছুড়ে মারা হয়। একপর্যায়ে কলাপসিবল গেটের নিচ দিয়ে পেপার ছড়িয়ে দিয়ে ওপর থেকে প্লাস্টিক বোতলের মধ্যে আগুন দিয়ে পেট্রল ছুড়ে মারা হয়। কোনো রকমে পানি দিয়ে আগুন নিভিয়েছি। পরে ইট-পাটকেলের আক্রমণের চোটে মন্দির অফিসের দেয়ালের পেছনে আশ্রয় নিই।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের গর্বের মসজিদ-মন্দিরের সহাবস্থান এক দিনেই প্রশ্নের মুখে পড়ল। আমাদের পুরোহিত বিষ্ণুপদ চক্রবর্তীকে যেরকমভাবে ধুতি খুলে, কালেমা পড়তে বাধ্য করা হলো, তা তো একাত্তরকেও হার মানায়। সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত এই হামলায় আমাদের নিয়ে খেলাধুলা হচ্ছে, আমরা এখন দাবার ঘুঁটি।’

তাকিয়া সড়কের আরেক দোকানদার বিষংকর পাল। তার পরিবার প্রায় ৫৮ বছর ধরে ব্যবসা করছে। তিনি জানান, শুধু মন্দিরেই হামলা হয়নি, মসজিদের পাশের তাকিয়া রোডে বেছে বেছে প্রায় ১৬টি হিন্দু দোকান ভেঙে মালপত্র লুটপাট করা হয়েছে। তার দোকানের নগদ ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকাসহ লুট হয়েছে ৫ লাখ টাকার পণ্য।

ওই দোকানের কর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শী শিমুল দাস জানান, রাত সাড়ে ৮টার দিকে হঠাৎ পাশের শুঁটকির দোকানে হামলা দেখে দোকান বন্ধ করে কাছেই আশ্রয় নেন তিনি। দূর থেকে শস্যপণ্য ও মালপত্র লুট করে নিয়ে যাওয়া দেখেন, প্রাণের ভয়ে বাধা দেয়ার সাহস করেননি। এদের প্রত্যেকেই ১৮-২১ বছর বয়সী যুবক। এদের কেউই পরিচিত নয়। তারা শুধু হিন্দু দোকানেই আক্রমণ করেছে।

ট্রাংক রোডের মোড়ে পুলিশ থাকলেও অনেকবার ৯৯৯-এ কল করার পরও পুলিশের কোনো সদস্য দোকানে হামলার সময় তাকিয়া সড়কের দিকে আসেনি। অনেকে বাসার সিসিটিভির ফুটেজে নিরুপায় বসে দোকান লুট, ভাঙচুর দেখেছেন।

বাঁশপাড়া দুর্গাপূজা মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ দে জানান, শুধু প্রথম দুই দিন ঠিকমতো পূজা করেছেন তারা। বাকিটা সময় কাটিয়েছেন আতঙ্কে। বাড়ির নারী সদস্যদের বাইরে না যেতে বলেছেন।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সভাপতি এবং সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শুসেন চন্দ্র শীল জানান, শনিবার আসরের নামাজের পর কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদের পাশের জয়কালী মন্দির থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি প্রতিবাদ মিছিল করার কথা ছিল। একই সময়ে আসরের নামাজ হওয়ায় অনেক দেরিতেই মিছিলের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ওদিকে মসজিদের সামনে সাধারণ মুসল্লিদের ব্যানারে জড়ো হয় দুই শতাধিক তরুণ-যুবক। এদের বেশির ভাগই এখানে নিয়মিত নামাজ পড়ে না।

তিনি বলেন, পরে পুলিশের অনুরোধে প্রতিবাদ মিছিল সরিয়ে নেওয়া হলেও এই তরুণ-যুবকরা না সরায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। একই সময়ে আওয়ামী যুবলীগের একটি মিছিল এসে মুসল্লিদের বাধা দিতে চাইলে ইট-পাটকেল নিক্ষেপে দুই পক্ষের সংঘর্ষ বেধে যায়। তবে এতে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-যুবলীগ বেশি আহত হয়।

শুসেন চন্দ্র শীল বলেন, এশার নামাজের পরপরই এসব তরুণ-যুবক দলে দলে মসজিদের ছাদে উঠে পাশের মন্দিরে হামলা করে। কিছু লোক পাশের দোকান ও মন্দিরগুলোতে হামলা চালায়। মসজিদের ছাদ থেকে আক্রমণ করায় বেশি ক্ষতি হয়েছে।

আরও পড়ুন:
কী আছে প্যান্ডোরা পেপার্সে
প্যান্ডোরা পেপার্স: ফেঁসে গেলেন জ্যাকি শ্রফ
‘প্যান্ডোরা পেপার্সে’ টেন্ডুলকার, আইনজীবীর দাবি বৈধ বিনিয়োগ
প্যান্ডোরা পেপার্সে ৭০০ পাকিস্তানি, আছেন ইমরান ঘনিষ্ঠরাও
খুলল ‘প্যান্ডোরার বক্স’, বিশ্বনেতাদের গোপন লেনদেন ফাঁস

শেয়ার করুন

শাঁখা ভেঙে সিঁদুর মুছে সাদা শাড়িতে দিলীপের স্ত্রী

শাঁখা ভেঙে সিঁদুর মুছে সাদা শাড়িতে দিলীপের স্ত্রী

কুমিল্লায় সাম্প্রদায়িক হামলায় দিলীপ দাশের মৃত্যুর পর মুছে গেছে তার স্ত্রী রুপা দাশের সিঁথির সিঁদুর, পরেছেন সাদা শাড়ি। ছবি: নিউজবাংলা

দিলীপের মরদেহ শুক্রবার সন্ধ্যায় টিক্কার চর শ্মশানে দাহ করার আগে মুছে দেয়া হয় রুপার মাথার সিঁদুর, ভাঙা হয় হাতের শাঁখা। রঙিন শাড়ির পরিবর্তে তিনি এখন পরছেন বিধবার সাদা কাপড়।

দুই দিন আগেই পরনে ছিল রঙিন শাড়ি, মাথায় সিঁদুর আর হাতে শাঁখা। আর এখন সব রং মুছে দিয়ে সাদা শাড়িতে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছেন রুপা দাশ। স্বামীকে চিতার আগুনে পোড়ানোর আগে তার পায়ের বুড়ো আঙুলে মুছে দেয়া হয়েছে রুপার সিঁথির সিঁদুর।

কুমিল্লায় গত ১৩ অক্টোবর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সময় গুরুতর আহত হন দিলীপ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় শুক্রবার ভোরে তার মৃত্যু হয়।

দিলীপের মরদেহ শুক্রবার সন্ধ্যায় টিক্কার চর শ্মশানে দাহ করার আগে মুছে দেয়া হয় রুপার মাথার সিঁদুর, ভাঙা হয় হাতের শাঁখা। রঙিন শাড়ির পরিবর্তে তিনি এখন পরছেন বিধবার সাদা কাপড়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, সহিংসতার দিন সকালে বাসায় নাশতা সেরে কুমিল্লা নগরীর মনোহরপুর রাজ রাজেশ্বরী কালীমন্দিরে পূজা দিতে গিয়েছিলেন দিলীপ দাশ।

নানুয়ার দিঘির পাড়ের একটি মণ্ডপে কোরআন পাওয়ার পর তখন সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে নগরীজুড়ে। রাজ রাজেশ্বরী কালীমন্দিরেও চলে হামলা।

সংঘাত দেখে বাসায় ফিরতে চেয়েছিলেন দিলীপ। তবে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মন্দিদের গেটের পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় হামলার শিকার হন, লুটিয়ে পড়েন মাটিতে।

রাজ রাজেশ্বরী কালীমন্দিরের পুরোহিত দুলাল চক্রবর্তী নিউজবাংলাকে জানান, ১৩ অক্টোবর ওই সহিংসতার সময় মন্দির থেকে বাড়িতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেন দিলীপ। তবে বাইরে প্রচণ্ড গন্ডগোল শুরু হওয়ায় তিনি মন্দিরের গেটের ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একপর্যায়ে মন্দিরের ভেতরে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে হামলাকারীরা। এ সময় গুরুতর আহত হলে পূজারীরা আহত দিলীপকে গামছা দিয়ে মাথা বেঁধে বসিয়ে রাখেন। পরে তাকে কুমিল্লা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

দিলীপের স্ত্রী রুপা দাশ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওই দিন দেড়টায় কুমিল্লা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে ফোন পাই। এ সময় আমাদের বাসার সামনে পুলিশ ও হামলাকারীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলছিল। পুলিশ আমাদের বাইরে যেতে নিষেধ করে। এর মধ্যেই আমি এক আত্মীয়কে নিয়ে হাসপাতালে যাই।’

তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে আমার স্বামীর অবস্থার অবনতি হয়। পরে বেলা ২টার দিকে চিকিৎসক তাকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন। আমরা তাকে সেখানে নিলে চিকিৎসক সিটিস্ক্যান করাতে বলেন।’

রুপা দাশ অভিযোগ করে বলেন, ‘এ সময় হাসপাতালে বিদ্যুৎ না থাকায় সিটিস্ক্যান করাতে আমাদের অন্তত আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। পরে রিপোর্ট দেখে চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ১৫ তারিখে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় শুক্রবার ভোর ৪টার দিকে তার মৃত্যু হয়।’

শাঁখা ভেঙে সিঁদুর মুছে সাদা শাড়িতে দিলীপের স্ত্রী
পরিবারের কাছে দিলীপ দাশ এখন কেবলই ছবি

দিলীপ দাশ ধোপার কাজ করে সংসার চালাতেন। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বড় মেয়ে প্রিয়া রানী দাশ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন। আর ছেলে রাহুল দাশ ঢাকায় লেখাপড়া করেন।

দিলীপের মেয়ে প্রিয়া বলেন, ‘বাবার মাথায় যে আঘাত দেখেছি তাতে স্পষ্ট যে হামলাকারীরা আমার বাবাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। তার মাথার খুলি ভেঙে যায়। রক্তক্ষরণ ও তাৎক্ষণিক সঠিক চিকিৎসার অভাবে আমার বাবা মারা গেছেন।’

প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি এখন দিশেহারা। দিলীপ দাশের মেয়ে প্রিয়া জানান, তার বাবার মৃত্যুর পর তেমন কেউ খোঁজখবর নিতে আসেনি।

প্রিয়া নিউজবাংলাকে জানান, তিনি দৃষ্টিপাত নাট্যদলের সদস্য। তার বাবা হামলায় আহত হওয়ার পর ওই নাট্য সংগঠন চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছে। এ ছাড়া কেউ এগিয়ে আসেনি।

শাঁখা ভেঙে সিঁদুর মুছে সাদা শাড়িতে দিলীপের স্ত্রী
ছেলে মেয়েকে নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন দিলীপের স্ত্রী


দিলীপের স্ত্রী জানান, তাদের পরিবারের মূল নির্ভরশীলতা ছিল স্বামীর আয়ের ওপর। পাশাপাশি একটি ছোট দোকান ভাড়া দিয়ে মাসে পাঁচ হাজার টাকা পাওয়া যায়।

রুপা দাশ বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর আমরা বড় সমস্যায় পড়েছি। দোকান ভাড়ার মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় কীভাবে সংসার চলবে, দুই ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালাব তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

দুর্গাপূজায় সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর ভোরে কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের ওই মণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা।

ওই মণ্ডপের পাশাপাশি আক্রান্ত হয় নগরীর আরও বেশ কিছু পূজামণ্ডপ। পরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

আরও পড়ুন:
কী আছে প্যান্ডোরা পেপার্সে
প্যান্ডোরা পেপার্স: ফেঁসে গেলেন জ্যাকি শ্রফ
‘প্যান্ডোরা পেপার্সে’ টেন্ডুলকার, আইনজীবীর দাবি বৈধ বিনিয়োগ
প্যান্ডোরা পেপার্সে ৭০০ পাকিস্তানি, আছেন ইমরান ঘনিষ্ঠরাও
খুলল ‘প্যান্ডোরার বক্স’, বিশ্বনেতাদের গোপন লেনদেন ফাঁস

শেয়ার করুন

দুর্ঘটনায় কেন শুধু চালক দায়ী

দুর্ঘটনায় কেন শুধু চালক দায়ী

সড়ক দুর্ঘটনার দায় চালকের একার নয় বলে মনে করেন বুয়েটের অধ্যাপক শামসুল হক। ফাইল ছবি

বুয়েটের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, ‘চালকেরা বেশি ট্রিপে বেশি রোজগার করতে চায়, কিন্তু তারা বিরতিহীনভাবে চালিয়ে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এক পক্ষকে দায়ী করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে তাতে সিম্পটমের একটা চিকিৎসা হবে, রোগ কিন্তু থেকে যাবে।’

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যেসব ব্যবস্থা দরকার, তা নেয়া হচ্ছে না। তা ছাড়া দুর্ঘটনার জন্য পরিবহন শ্রমিকদের এককভাবে দায়ী ভাবার প্রবণতা রয়েছে। অথচ দুর্ঘটনার জন্য দুর্বল পরিকল্পনাও সমান দায়ী।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক মনে করেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না।

এমন বাস্তবতায় শুক্রবার পালন করা হচ্ছে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘গতিসীমা মেনে চলি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করি।’

এ উপলক্ষে নিরাপদ সড়ক বা সড়কে নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হতে পারে, সে বিষয়ে নিউজবাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন অধ্যাপক শামসুল হক।

প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে মহাসড়কে গাড়িচালকদের বিশ্রাম ও টানা গাড়ি চালানোর সর্বোচ্চ সময় নির্ধারণের কথা বললেও সেটির কোনো বাস্তবায়ন দেখছেন না এ পরিবহন বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলেন, ‘পুরো বিশ্বে হাইওয়েতে (মহাসড়ক) চার ঘণ্টার বেশি টানা গাড়ি চালানো নিষেধ। এতে চালকের অবসাদ চলে আসতে পারে। তার যে মনোযোগ দরকার হয় চলার জন্য, তাতে ঘাটতি পড়তে পারে।

‘চার ঘণ্টা পর ভিন্ন একজন চালক থাকবে। এটা মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরে আছে। আর পশ্চিমা দেশে তো আছেই। বাণিজ্যিক গাড়ি বিরতিহীনভাবে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি চালাতে দেয়া যাবে না।’

এ অধ্যাপক বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী এই দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তবে কাজ হয়নি। এর মানে কী? পুলিশ এখানে কাজ করছে না। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কাজ করছে না। যারা কর্তৃপক্ষ, তারা কাজ করছে না। তার মানে চালকের দায়, পুলিশের দায়, ইঞ্জিনিয়ারের দায়।’

ট্রাফিক ও ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে

সড়কের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিকল্পনা নেয়া হলেও সেটি পরিকল্পিতভাবে নেয়া হয়নি বলে মনে করেন শামসুল হক।

তিনি বলেন, ‘সড়ক ব্যবস্থাপনা ও রোড ট্রাফিক সিস্টেম সুশৃঙ্খল হতে পারত, তবে তা হয়নি। আমি যদি ঢাকার কথাই বলি, ঢাকায় গণপরিবহনের যে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি, সেটা যদি আমরা করে ফেলতে পারতাম, তবে ঠিক হয়ে যেত।’

এ অধ্যাপক বলেন, ‘কিছু কাজ করতে দরদ লাগবে। এই যে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি, এটাতে তো পয়সা লাগে না। এটা রেগুলেশন। এটা এনফোর্সমেন্ট। এখানে তো পয়সা নাই বলতে পারবে না। এখানেই আমাদের অবহেলা।’

ঢাকার রাস্তায় ফ্র্যাঞ্চাইজি বাস বা ‘এক রুটে এক বাস কোম্পানি’ পদ্ধতি চালু হলে অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি হলে বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমে যাবে। হুড়োহুড়ি করতে গিয়েই ঢাকায় অনেক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা ঘটে বলে মনে করা হয়।

মহাসড়কের পরিকল্পনা

দেশের মহাসড়কগুলোতে বিশৃঙ্খলা রয়েছে আর সেটির জন্য ছোট পরিবহন ও গাড়ির ফিটনেসকে দায়ী করেন শামসুল হক।

তিনি বলেন, ‘আমি যদি হাইওয়েতে ফিট গাড়ি না চালাই, অবৈধ গাড়ি যদি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তবে দুর্ঘটনা ঘটবে।’

দুর্ঘটনায় কেন শুধু চালক দায়ী

এ ক্ষেত্রে তিনি হাইকোর্ট ও সরকারের দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সব জায়গা থেকে দিকনির্দেশনা আছে যে, আঞ্চলিক ও মহাসড়কে কোনো নছিমন, করিমন বা ভটভটি গাড়ি চলবে না।’

এ ক্ষেত্রে গতির বিশৃঙ্খলা হয়ে থাকে জানিয়ে শামসুল হক বলেন, ‘দ্রুতগতির সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের ধীরগতির গাড়িগুলো চলাচল করে। ওই ড্রাইভারের কিন্তু রোডের কোনো সেন্স নাই। তাকে যদি রোডে এভাবে বিশৃঙ্খলা করার সুযোগ দিই, তাহলে তো দুর্ঘটনা ঘটবে। আমরা কি এত দিকনির্দেশনার পরেও কিছু করেছি? করিনি।’

বিআরটিএ তার কাজ ঠিকমতো করে না বলে মনে করেন শামসুল হক। তিনি বলেন, ‘হাইওয়েতে যাদের চলার কথা না তারা চলছে। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে। আমরা যে গাড়িগুলোকে ফিট বলব, বিআরটিএর যে ফিটনেস সনদ ব্যবস্থা, সেটি পরিহাস ছাড়া কিছুই না।

‘একটা গাড়ির ৪২টা আইটেম দেখে তাকে চলার যোগ্যতার সার্টিফিকেট দেয়া সহজ কথা নয়। তবে এত কমসংখ্যক ইন্সপেক্টরে এত বিপুলসংখ্যক গাড়ির ইন্সপেকশন সম্ভব হওয়ার কথা না, যার ফলে আনফিট গাড়ি চলছে।’

দুর্ঘটনায় কেন শুধু চালক দায়ী

চালকের প্রশিক্ষণ ঘাটতি রয়েছে বলে জানান শামসুল হক। তিনি বলেন, ‘চালক প্রশিক্ষণের যে পদ্ধতি, সেটি ঠিক নেই। একটা চালককে হাইওয়েতে নামানোর আগে তার প্র্যাকটিক্যাল (ব্যবহারিক) যে পরীক্ষা হওয়ার কথা, সেটা হচ্ছে না। সারা বিশ্বে প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ার একটা স্ট্যান্ডার্ড আছে। আমরা তার ধারেকাছে নাই।’

সরকার উন্নয়নকেন্দ্রিক চিন্তা করলেও সড়ক নিরাপত্তার ব্যাপারে পরিকল্পিত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে মনে করেন তিনি।

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমরা মৌসুমি কিছু কাজ করি। কিন্তু সিস্টেমের দিকে তাকাই না। আমাদের উন্নয়ন হচ্ছে রক্তক্ষরণের উন্নয়ন। এতে অনেক মানুষ হতাহত হচ্ছে। অনেক পরিবার একসাথে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রকল্প হবে, তবে সিস্টেমের কোনো উন্নয়ন হবে না। তাই টেকসইভাবে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে গেলে বিজ্ঞান যেটা বলছে সিস্টেমকেন্দ্রিক, সেটা করতে হবে। কিন্তু আমাদের করার মতো প্রতিষ্ঠান নেই। তাদের দায়বদ্ধ করার মতো অভিভাবক নেই। তাই আমরা এর থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছি না।’

রাস্তায় সার্বক্ষণিক নজরদারি

রাস্তায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়াতে হবে বলে জানান শামসুল হক।

তিনি বলেন, ‘চোর-পুলিশ খেলে এনফোর্সমেন্ট হবে না। ২৪ ঘণ্টা রাস্তায় থাকতে হবে। উন্নত বিশ্বে চালক নিজের গাড়ি নিজে চালাচ্ছে, তাদের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত, তারপরও তারা রাস্তা থেকে পুলিশ ছাড়িয়ে নিচ্ছে না। কারণ মানুষ জন্মগতভাবে সুযোগসন্ধানী। একজনের অপব্যবহার দেখে আর একজন করবে। আমাদের এখানে কিছুদিনের হেডলাইন তৈরি হলে বা কোনো দুর্ঘটনা হলে নড়েচড়ে বসে। এরপর আর খবর নেই।’

দুর্ঘটনায় দায় কার

দেশে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ঢালাওভাবে পরিবহন শ্রমিকদের দায়ী করা হয়। দুর্ঘটনা ঘটার পরপরই তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলে। এ নিয়ে সাধারণ পরিবহন শ্রমিকেরা বিভিন্ন সময় আন্দোলন করছে।

এ বিষয়ে শামসুল হক বলেন, ‘আমি বলব, পরিবহন এমন একটা ব্যবস্থাপনা, যেখানে পলিসি লেভেলে যারা পলিসি তৈরি করেন, যারা সড়কের পরিকল্পনা করেন, ডিজাইন যারা করেন, রক্ষণাবেক্ষণ করেন, নিয়ন্ত্রণ করেন এবং গাড়ির মালিক যারা, চালক যারা, ব্যবহারকারী যারা, সামগ্রিক যে বিন্যাস আছে, এখানে সবার দায়বদ্ধতা আছে।’

তিনি বলেন, ‘পরিকল্পনায় ঘাটতি থাকলে দুর্ঘটনা হবে। আমি সড়কের জন্য চমৎকারভাবে পরিকল্পনা করলাম, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ করলাম না। তাহলে দুর্ঘটনা ঘটে গেল।’

মালিকের দায়িত্ব সম্পর্কে এ অধ্যাপক বলেন, ‘চালক যদি টায়ার বদলাতে বলে, মালিক বলেন, এটা দিয়েই চালাতে হবে; না হলে আর একজন চালক নিয়ে আসব। এই মালিক দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিল। অথচ দুর্ঘটনা ঘটলে সব দায় চালকের ওপর চলে যায়।’

তিনি বলেন, ‘চালকেরা বেশি ট্রিপে বেশি রোজগার করতে চায়, কিন্তু তারা বিরতিহীনভাবে চালিয়ে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এক পক্ষকে দায়ী করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে তাতে সিম্পটমের একটা চিকিৎসা হবে, রোগ কিন্তু থেকে যাবে। আইন করতে হবে সর্বজনীন আইন। আমাদের আইন এখনও চালকসর্বস্ব।

‘শুধু একজনকে দায়ী করে আইন করা যাবে না। চালক দেখছে, আরও অনেকের ঘাটতি আছে, কিন্তু তাদের কোনো শাস্তি বা জবাবদিহি করা হচ্ছে না। এতে তারাও মানতে চাইবে না। আন্দোলন হবে।’

পরিকল্পনাকারীদের দায় আছে

শুধু চালক নয়, বরং পরিবহন ব্যবস্থার যারা পরিকল্পনা করেন, দুর্ঘটনার উচ্চ হারের জন্য তারাও সমান দায়ী বলে মনে করেন শামসুল হক।

তিনি বলেন, ‘আমি বলব, পরিকল্পনায় যারা আছেন, তাদের ভুলের কারণে যখন দুর্ঘটনা হয়, সেটা কিন্তু বড় একটা বিষয়। তাদের অজ্ঞতার কারণে যে দুর্ঘটনা ঘটে, তাতে চালককে তো আমি শাস্তি দিতে পারি না।

‘উন্নত বিশ্বে হলে পরিকল্পনা পর্যায়ে যাওয়া হয়। আর আমরা কিন্তু তাৎক্ষণিক বিষয়ে থাকি। এটাতে সিস্টেম ঠিক হবে না। যে দুর্ঘটনা পরিকল্পনার ঘাটতির জন্য হয়, তাকেও কিন্তু জেল-জরিমানা করতে হবে। দুর্ঘটনা হলে তারা এসি রুমে বসে থাকে। পুলিশ আর ড্রাইভার হলো ভিজিবল ফোর্স। সব রোষানল পড়ছে সেখানে।’

আরও পড়ুন:
কী আছে প্যান্ডোরা পেপার্সে
প্যান্ডোরা পেপার্স: ফেঁসে গেলেন জ্যাকি শ্রফ
‘প্যান্ডোরা পেপার্সে’ টেন্ডুলকার, আইনজীবীর দাবি বৈধ বিনিয়োগ
প্যান্ডোরা পেপার্সে ৭০০ পাকিস্তানি, আছেন ইমরান ঘনিষ্ঠরাও
খুলল ‘প্যান্ডোরার বক্স’, বিশ্বনেতাদের গোপন লেনদেন ফাঁস

শেয়ার করুন

কুমিল্লার সেই মসজিদের বারান্দায় আর কোরআন রাখা হবে না

কুমিল্লার সেই মসজিদের বারান্দায় আর কোরআন রাখা হবে না

শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারের মসজিদ। ফাইল ছবি

দারোগাবাড়ী জামে মসজিদের পেশ ইমাম ইয়াছিন নূরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা তো বুঝতে পারিনি কেউ এখান থেকে কোরআন শরিফ নিয়ে এমন কাজ করবে। আগামী দিনে আমরা সতর্ক থাকব। মসজিদের বারান্দায় আর কোরআন শরিফ রাখব না।’

কুমিল্লার একটি মাজারের মসজিদ থেকে কোরআন শরিফ এনে পাশের পূজামণ্ডপে রাখার ঘটনা ধরা পড়ার পর ওই মাজারের কর্তৃপক্ষ বলছে, ভবিষ্যতে তারা আর মসজিদের বারান্দায় অরক্ষিত অবস্থায় কোরআন শরিফ রাখবে না।

কুমিল্লা নগরীর নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে গত ১৩ অক্টোবর ভোরে হনুমানের মূর্তির ওপর পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা।

ওই মণ্ডপের পাশাপাশি আক্রান্ত হয় নগরীর আরও বেশ কিছু পূজামণ্ডপ। পরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়।

যেখান থেকে সাম্প্রদায়িক এই সহিংসতার শুরু, সেই নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে কীভাবে উত্তেজনার শুরু এবং মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর পবিত্র কোরআন শরিফ কী করে এলো, সে বিষয়ে মঙ্গলবার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউজবাংলা।

আরও পড়ুন: কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন রাখল কারা

সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার জানা যায়, নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রেখেছিলেন ইকবাল হোসেন নামের স্থানীয় এক যুবক। সহিংসতার আগের রাতে তিনি কোরআনটি নিয়েছিলেন মণ্ডপের পাশের শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারের মসজিদের বারান্দা থেকে।

কুমিল্লার সেই মসজিদের বারান্দায় আর কোরআন রাখা হবে না
প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন মাজারের মসজিদ থেকে কোরআন শরিফ নিয়ে রওনা হন মণ্ডপের দিকে। সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেয়া ছবি

ইকবাল রাত ২টা ১০ মিনিটের দিকে কোরআন শরিফটি হাতে নিয়ে মণ্ডপের দিকে রওনা হন। এরপর মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর কোরআন রেখে ফিরে আসেন। এসব দৃশ্য ধরা পড়েছে ওই এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরায়।

আরও পড়ুন: মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল

নানুয়ার দিঘির পাশেই শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারটির অবস্থান। মণ্ডপ থেকে হেঁটে যেতে সময় লাগে ২ থেকে ৩ মিনিট। দারোগাবাড়ী মাজার নামে কুমিল্লাবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি রয়েছে মাজারটির। এই মসজিদের বারান্দায় তিলাওয়াতের জন্য রাখা থাকে বেশ কয়েকটি কোরআন শরিফ। রাত-দিন যেকোনো সময় যে কেউ এখানে এসে তিলাওয়াত করতে পারেন।

কুমিল্লার সেই মসজিদের বারান্দায় আর কোরআন রাখা হবে না
প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন

ইকবালের বিষয়ে জানতে বুধবার রাতে দারোগাবাড়ী জামে মসজিদের পেশ ইমাম ইয়াছিন নূরীকে ফোন করা হলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। তবে সিসিটিভি ফুটেজ দেখিনি।’

আরও পড়ুন: পাশের মসজিদ থেকে কোরআন এনে মণ্ডপে রাখেন ইকবাল

মসজিদের বারান্দায় পবিত্র কোরআন শরিফ রাখার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেকেই মাজারে এসে কোরআন শরিফ দিয়ে যান। এসব কোরআন শরিফে মসজিদের ভেতরের সেলফ পূর্ণ হয়ে গেছে। তাই কিছু কোরআন শরিফ বারান্দায় রাখা হয়েছিল। তাছাড়া বারান্দায় রাখলে যেকোনো সময় যে কারও জন্য তিলাওয়াতেরও সুবিধা হয়।

‘আমরা তো বুঝতে পারিনি কেউ এখান থেকে কোরআন শরিফ নিয়ে গিয়ে এমন কাজ করবে। আগামী দিনে আমরা সতর্ক থাকব। মসজিদের বারান্দায় আর কোরআন শরিফ রাখব না।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, প্রধান অভিযুক্ত ইকবালের সহযোগী অন্তত চারজন এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তদন্তকারীরা মনে করছেন, ইকবাল গ্রেপ্তার হলেই এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন:
কী আছে প্যান্ডোরা পেপার্সে
প্যান্ডোরা পেপার্স: ফেঁসে গেলেন জ্যাকি শ্রফ
‘প্যান্ডোরা পেপার্সে’ টেন্ডুলকার, আইনজীবীর দাবি বৈধ বিনিয়োগ
প্যান্ডোরা পেপার্সে ৭০০ পাকিস্তানি, আছেন ইমরান ঘনিষ্ঠরাও
খুলল ‘প্যান্ডোরার বক্স’, বিশ্বনেতাদের গোপন লেনদেন ফাঁস

শেয়ার করুন

বাবার আগেই জন্ম ছেলের

বাবার আগেই জন্ম ছেলের

জামাত আলী ও তার ছেলে মনিরুল ইসলামের জাতীয় পরিচয়পত্র। ছবি: নিউজবাংলা

জামাত আলী বলেন, ‘আমার প্রকৃত জন্মতারিখ ৪ আগস্ট ১৯৫৭। জাতীয় পরিচয়পত্রে যে জন্মতারিখ আছে সে হিসাবে আমার বয়স মাত্র ৪৪ বছর। ছেলের থেকে আমার বয়স ৬ বছর কম।’

জাতীয় পরিচয়পত্রে লেখা জামাত আলীর জন্ম ১৯৭৭ সালের ৪ আগস্ট। আর তার ছেলের জন্ম ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর।

বাবা-ছেলের জাতীয় পরিচয়পত্রের এই তথ্য বলছে, বাবার চেয়ে ছেলে ৬ বছরের বড়। তথ্য ভুল হওয়ায় কোনো কাজেই এই পরিচয়পত্র ব্যবহার করতে পারছেন না জামাত আলী।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনেক আগে যারা ভোটার হয়েছেন তাদের তথ্যগত ত্রুটির কারণে এমন হতে পারে।

জামাতের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের শ্রীরামপুর গ্রামে।

তিনি বলেন, ‘আমার প্রকৃত জন্মতারিখ ১৯৫৭ সালের ৪ আগস্ট। জাতীয় পরিচয়পত্রে যে জন্মতারিখ আছে সে হিসেবে আমার বয়স মাত্র ৪৪ বছর। ছেলের থেকে আমার বয়স ৬ বছর কম।

‘বয়স কম হওয়ায় খুব সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। ওই জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে কোনো কাজ করতে পারছি না। বয়স্ক ভাতার কার্ডসহ সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি না।’

জামাত আলী বলেন, ‘আমার প্রকৃত জন্মতারিখ ৪ আগস্ট ১৯৫৭। জাতীয় পরিচয়পত্রে যে জন্মতারিখ আছে সে হিসাবে আমার বয়স মাত্র ৪৪ বছর। ছেলের থেকে আমার বয়স ৬ বছর কম।

বাবার আগেই জন্ম ছেলের

তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের জন্য জীবননগর উপজেলা নির্বাচন অফিসে গিয়েছি। সংশোধন করতে সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন তারা।’

এ বিষয়ে জীবননগর উপজেলা নিবার্চন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) কামরুল হাসান বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো আবেদন করেননি জামাত। আবেদন করলে অবশ্যই সংশোধন করে দেয়া হবে।’

এমন ভুল কী করে হলো জানতে চাইলে তিনি বলে, ‘মূলত ২০০৯ সালের আগে যারা ভোটার হয়েছেন তাদের তথ্যগত ত্রুটির জন্য সমস্যা হতে পারে। তবে আমরা চেষ্টা করছি সমস্যার সমাধান করার।’

আরও পড়ুন:
কী আছে প্যান্ডোরা পেপার্সে
প্যান্ডোরা পেপার্স: ফেঁসে গেলেন জ্যাকি শ্রফ
‘প্যান্ডোরা পেপার্সে’ টেন্ডুলকার, আইনজীবীর দাবি বৈধ বিনিয়োগ
প্যান্ডোরা পেপার্সে ৭০০ পাকিস্তানি, আছেন ইমরান ঘনিষ্ঠরাও
খুলল ‘প্যান্ডোরার বক্স’, বিশ্বনেতাদের গোপন লেনদেন ফাঁস

শেয়ার করুন