নর্থ সাউথে এক প্রোগ্রামের অনুমোদন নিয়ে ১২ প্রোগ্রাম

নর্থ সাউথে এক প্রোগ্রামের অনুমোদন নিয়ে ১২ প্রোগ্রাম

ইউজিসির তদন্তে এসেছে, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি প্রোগ্রামের অনুমোদন নিয়েছে, আর সেটি হলো ব্যাচেলর অফ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিবিএ)। তবে এই প্রোগ্রামের অনুমোদন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি আরও ১১টি প্রোগ্রাম পরিচালনা করেছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো প্রোগ্রামে শিক্ষার্থী ভর্তির আগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে সেই প্রোগ্রামটির অনুমোদন নিতে হয়। তবে এই নিয়মের তোয়াক্কা করছে না বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।

নর্থ সাউথ কর্তৃপক্ষ একটি প্রোগ্রামের অনুমোদন নিয়ে এর আড়ালে মোট ১২টি প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে। নিজস্ব তদন্ত চালিয়ে বিষয়টিকে অবৈধ ও আইনবহির্ভূত বলছে ইউজিসি।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গত ২৩ সেপ্টেম্বর নর্থ সাউথসহ আরও তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনহীন প্রোগ্রামের বিষয় উল্লেখ করে গণবিজ্ঞপ্তিও জারি করেছে।

ইউজিসির তদন্তে এসেছে, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি প্রোগ্রামের অনুমোদন নিয়েছে, আর সেটি হলো ব্যাচেলর অফ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিবিএ)। তবে এই প্রোগ্রামের অনুমোদন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি আরও ১১টি প্রোগ্রাম পরিচালনা করেছে। এগুলোর কোনো অনুমোদন নেই ইউজিসির।

ইউজিসির অনুসন্ধান বলছে, বিবিএ ইন জেনারেল, বিবিএ ইন ফিন্যান্স, বিবিএ ইন হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট, বিবিএ ইন ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস, বিবিএ ইন মার্কেটিং, বিবিএ ইন ম্যানেজমেন্ট, বিবিএ ইন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস, বিবিএ ইন অ্যাকাউন্টিং, বিবিএ ইন ইকোনমিকস, বিবিএ ইন এন্টারপ্রেনিউরশিপ এবং বিবিএ সাপ্লাই চেন ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামগুলোতে তাদের কোনো অনুমোদন নেই।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রোগ্রামের অনুমোদন নিয়ে একাধিক প্রোগ্রাম পরিচালনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ নীতি ও আইনবহির্ভূত। এটা কোনোভাবেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে প্রত্যাশিত নয়। এটা করার অর্থ হলো অবৈধ কাজ করা।’

অনুমোদনহীন কোর্সে ভর্তির বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘অনুমোদনহীন কোর্সে ভর্তি করা মানে হলো শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়া।

‘এসব সনদ যেকোনো সময় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তখন তারা (নর্থ সাউথ কর্তৃপক্ষ) অনুমোদনহীন কোর্সে ভর্তি করা শিক্ষার্থীদের চার বছরের শিক্ষাজীবন ফেরত দেবে কীভাবে? নর্থ সাউথের এসব সনদের কোনো বৈধতা নেই।’

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ইউজিসির অনুমোদন ছাড়া প্রোগ্রামে শিক্ষার্থী ভর্তি করা মারাত্মক অপরাধ। আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে শিগগিরই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেব।’

গণবিজ্ঞপ্তি জারির বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের পরিচালক মো. ওমর ফারুখ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে একজন শিক্ষার্থীর উচিত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া। কমিশনের ওয়েবসাইটে নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি হালনাগাদ করা হয়, এতে শিক্ষার্থীদের পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়।’

এ ব্যাপারে কথা বলতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আতিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। খুদে বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া দেননি।

আরও পড়ুন:
নর্থ সাউথের ট্রাস্টিদের রেঞ্জ রোভার নিয়ে বিস্মিত আপিল বিভাগ
নর্থ সাউথের ট্রাস্টিরা ফেরত দিচ্ছেন রেঞ্জ রোভার
কাশেম-আজিম সিন্ডিকেটের দুর্নীতি, ডুবছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
‘দুর্নীতি-জঙ্গিবাদের কবল’ থেকে নর্থ সাউথকে রক্ষার দাবি

শেয়ার করুন

মন্তব্য

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল

মণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখার পর হনুমানের গদা হাতে হেঁটে যাওয়া ইকবাল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য এবং নিজস্ব অনুসন্ধানে নিউজবাংলা নিশ্চিত হয়েছে, মণ্ডপে কোরআন রেখে গদা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাওয়া ব্যক্তির নাম ইকবাল হোসেন। ৩০ বছর বয়সী ইকবাল কুমিল্লা নগরীর ১৭ নং ওয়ার্ডের দ্বিতীয় মুরাদপুর-লস্করপুকুর এলাকার নূর আহম্মদ আলমের ছেলে। তাকে খুঁজছে পুলিশ।

কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে ইকবাল হোসেন নামের এক যুবককে। এই ইকবালকে গ্রেপ্তারে গত কয়েক দিন ধরে চলছে জোর অভিযান।

ইকবালের সহযোগী হিসেবে অন্তত চারজন এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মনে করছে, ইকবাল গ্রেপ্তার হলেই এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

দুর্গাপূজায় সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর ভোরে কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের ওই মণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা।

ওই মণ্ডপের পাশাপাশি আক্রান্ত হয় নগরীর আরও বেশ কিছু পূজামণ্ডপ। পরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়।

যেখান থেকে সাম্প্রদায়িক এই সহিংসতার শুরু, সেই নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে কীভাবে উত্তেজনার শুরু এবং মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর পবিত্র কোরআন শরিফ কী করে এলো, সে বিষয়ে মঙ্গলবার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউজবাংলা।

পূজার আয়োজক, এলাকাবাসী, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার আগের রাত আড়াইটা পর্যন্ত মন্দিরে পূজাসংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি ছিল। এরপর বুধবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে দুজন নারী ভক্ত মণ্ডপে এসে হনুমানের মূর্তিতে প্রথম কোরআন শরিফটি দেখতে পান।

রাত আড়াইটা থেকে ভোর সাড়ে ৬টার মধ্যে কোনো একসময়ে স্থানীয় এক ব্যক্তি কোরআন শরিফটি রেখে যান মণ্ডপে। এ সময় হনুমানের হাতের গদাটি সরিয়ে নেন তিনি। গদা হাতে তার চলে যাওয়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে ওই এলাকারই কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরায়।

এ ধরনেরই একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পেয়েছে নিউজবাংলা। এতে দেখা যায়, কোরআন শরিফটি রাখার পর হনুমানের মূর্তির গদা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন প্রধান অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে সময়টি রাত তখন সোয়া ৩টার মতো।

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
কুমিল্লার পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখায় প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য এবং নিজস্ব অনুসন্ধানে নিউজবাংলা নিশ্চিত হয়েছে, গদা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাওয়া ওই ব্যক্তির নাম ইকবাল হোসেন। ৩০ বছর বয়সী ইকবাল কুমিল্লা নগরীর ১৭ নং ওয়ার্ডের দ্বিতীয় মুরাদপুর-লস্করপুকুর এলাকার নূর আহম্মদ আলমের ছেলে। নূর আলম পেশায় মাছ ব্যবসায়ী।

পরিবারও চায় ইকবালের শাস্তি

ইকবালের মা আমেনা বেগম নিউজবাংলাকে জানান, তার তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে ইকবাল সবার বড়।

তিনি জানান, ইকবাল ১৫ বছর বয়স থেকেই নেশা করা শুরু করেন। ১০ বছর আগে তিনি জেলার বরুড়া উপজেলায় বিয়ে করেন। ওই ঘরে তার এক ছেলে রয়েছে। পাঁচ বছর আগে ইকবালের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।

তারপর ইকবাল চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়া বাজার এলাকার কাদৈর গ্রামে আরেকটি বিয়ে করেন। এই সংসারে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

আমেনা বেগম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ইকবাল নেশা করে পরিবারের সদস্যদের ওপর অত্যাচার করত। বিভিন্ন সময় রাস্তাঘাটেও নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াত।’

ইকবাল মাজারে মাজারে থাকতে ভালোবাসতেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সে বিভিন্ন সময় আখাউড়া মাজারে যেত। কুমিল্লার বিভিন্ন মাজারেও তার যাতায়াত ছিল।’

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
ইকবালের জাতীয় পরিচয়পত্র

পঞ্চম শ্রেণি পাস ইকবালের সঙ্গে ১০ বছর আগে বন্ধুদের মারামারি হয়। এ সময় তারা ইকবালকে পেটে ছুরিকাঘাত করেন। তখন ইকবাল অপ্রকৃতিস্থ আচরণ শুরু করেন বলে দাবি করে তার পরিবার। আমেনা বেগম জানান, তিনি স্থানীয় কাউন্সিলরের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন ইকবাল পূজামণ্ডপ থেকে হনুমানের গদা সরিয়ে সেখানে কোরআন শরিফ রেখেছেন। আমেনা বলেন, ‘ইকবাল কারও প্ররোচনায় এমন কাজ করতে পারে। তার বোধবুদ্ধি খুব একটা নেই। ছেলে সত্যিই যদি অন্যায় করে, তাহলে যেন তার শাস্তি হয়।’

ইকবালের ছোট ভাই রায়হান নিউজবাংলাকে জানান, ইকবালকে খুঁজতে পুলিশকে তারাও সহায়তা করছেন।

১৭ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সৈয়দ সোহেল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি ১০ বছর ধরে ইকবালকে চিনি। সে রঙের কাজ করত। মাঝে মাঝে নির্মাণকাজের সহযোগী হিসেবেও কাজ করত। ইকবাল ইয়াবা সেবন করায় প্রায়ই তাকে নিয়ে অনেক দেনদরবার করতে হতো।’

ইকবালের কর্মকাণ্ডে এলাকাবাসীও বিরক্ত বলে জানান তিনি। সোহেল বলেন, ‘আমার দৃঢ়বিশ্বাস ইকবালের মানসিক অসুস্থতাকে কাজে লাগিয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষ কাজটি করেছে।’

কোরআন রাখার পর যেভাবে ছড়ানো হয় উত্তেজনা

তদন্তসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে জানান, মণ্ডপে কোরআন রাখায় যে চক্রটি জড়িত, ইকবাল তাদের একজন। তিনি কোরআন রাখার পর ভোরে আরেক অভিযুক্ত ইকরাম হোসেন (৩০) ঘটনাস্থল থেকে ৯৯৯-এ কল করেন। তারপর ওসি আনওয়ারুল আজিম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি কোরআন শরিফটি উদ্ধারের পাশাপাশি ইকরামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় নিয়ে যান।

নগরীর বজ্রপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন চিনু রানী দাশ। নানুয়ার দিঘির পূর্ব পাড়ের একটি বাসায় তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তিনি মণ্ডপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখতে পান দুই নারী মণ্ডপে কোরআন শরিফ দেখে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন।

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে রাখা হনুমানের মূর্তির গদা সরিয়ে রাখা হয় পবিত্র কোরআন শরিফ। বাঁয়ের ছবিটি মঙ্গলবারের, ডানেরটি বুধবার সকালের

চিনু রানী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ সময় এক ছেলে ছুটে এসে চিৎকার করে বলে, হনুমানের পায়ের কাছে কোরআন, কেউ এখানে থাকবেন না। আর যে কোরআন এখান থেকে সরিয়ে নেবে, তার হাত কেটে ফেলা হবে।’

এ কথা শুনে ভয় পেয়ে যান চিনু। তিনি বলেন, ‘আমি একটু সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখছিলাম। ছেলেটা কাকে যেন ফোন দিয়ে কোরআনের বিষয়টা জানায়। এর কিছুক্ষণ পর সিএনজি দিয়ে একজন লোক আসে। সে এসে কোরআন শরিফটিকে বুকের মধ্যে নেয়।’

সিএনজি অটোরিকশায় আসা ওই ব্যক্তিই হলেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনওয়ারুল আজিম। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি ৯৯৯ থেকে কল পেয়ে একটা সিএনজিতে করে দ্রুত মণ্ডপে আসি।’

পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইকরামও রাতে নেশা করেছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, ওই রাতে ৩ পিস ইয়াবা সেবন করেন। পরে মণ্ডপের পাশে অবস্থান নেন। মণ্ডপে কোরআন রাখেন ইকবাল। আর ইকরামের দায়িত্ব ছিল ভোরে বিষয়টি পুলিশকে জানানোর। সে অনুযায়ী তিনি ৯৯৯-এ ফোন করেন।

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
কুমিল্লার সেই আলোচিত ফেসবুক লাইভ। ডানে লাইভ করা ব্যক্তি ফয়েজ আহমেদ

ওসি আনওয়ারুল আজিম মণ্ডপ থেকে কোরআন উদ্ধারের সময় সেটি ফেসবুকে লাইভ করেন ফয়েজ নামের এক যুবক। সেই লাইভের পরেই উত্তেজিত মানুষ জড়ো হন ঘটনাস্থলে, শুরু হয় সহিংসতা। এই ফয়েজকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে জানান, তাদের ধারণা, দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপ থেকে যে কোরআন শরিফটি উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি আনা হয় পাশের একটি মাজার থেকে।

নানুয়ার দিঘির পাশেই শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারটির অবস্থান, মণ্ডপ থেকে হেঁটে যেতে সময় লাগে ২ থেকে ৩ মিনিট। দারোগাবাড়ী মাজার নামে কুমিল্লাবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি রয়েছে মাজারটির। এর বারান্দায় দর্শনার্থীদের তিলাওয়াতের জন্য রাখা থাকে বেশ কয়েকটি কোরআন শরিফ। রাত-দিন যেকোনো সময় যে কেউ এখানে এসে তিলাওয়াত করতে পারেন।

দারোগাবাড়ী মাজারের মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন এমন তিনজনকে ঘটনার পর থেকে দেখা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একজনের নাম হুমায়ুন কবীর (২৫), আরেকজনের বিষয়ে নিউজবাংলা তথ্য পেলেও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর চলে ভাঙচুর

দারোগাবাড়ী মাজারের খাদেম আহামুদ্দুন্নাবী মাসুক নিউজবাংলাকে জানান, হুমায়ুন মাজারে এসে নামাজ আদায় করতেন। তার বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার দেওরা এলাকায়। ঘটনার পরদিনই তাকে পুলিশ নিয়ে যায়। এ ছাড়া মাজারে আরও দুই-একজন নামাজ আদায় করতেন। তাদের এখন আর দেখা যাচ্ছে না।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মাজারে নিয়মিত যাওয়া ওই তিন যুবকই মণ্ডপে কোরআন রাখার পরিকল্পনায় জড়িত। তাদের মধ্যে দুজনকে আমরা আটক করেছি। জিজ্ঞাসাবাদে তারা অনেক তথ্য দিয়েছে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজেও ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি।

‘তবে তৃতীয় যুবক ইকবালকে আটক করতে পারলে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। কারণ তিনিই সরাসরি মণ্ডপে কোরআন রেখেছিলেন। তাকে ধরতে আমাদের অভিযান চলছে।’

আরও পড়ুন:
নর্থ সাউথের ট্রাস্টিদের রেঞ্জ রোভার নিয়ে বিস্মিত আপিল বিভাগ
নর্থ সাউথের ট্রাস্টিরা ফেরত দিচ্ছেন রেঞ্জ রোভার
কাশেম-আজিম সিন্ডিকেটের দুর্নীতি, ডুবছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
‘দুর্নীতি-জঙ্গিবাদের কবল’ থেকে নর্থ সাউথকে রক্ষার দাবি

শেয়ার করুন

হাজীগঞ্জে সহিংসতায় কিশোর গ্রুপ, সংগঠিত মেসেঞ্জারে 

হাজীগঞ্জে সহিংসতায় কিশোর গ্রুপ, সংগঠিত মেসেঞ্জারে 

১৩ অক্টোবর চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌর এলাকায় হাজারখানেক মানুষের মিছিল থেকে হামলা হয় একটি স্থানীয় মন্দিরে। ছবি: নিউজবাংলা

স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৩ অক্টোবর বহিরাগত কিছু কিশোর মিছিল সংগঠিত করে। পরে তাতে যোগ দেয় স্থানীয়দের একটি অংশও। এর আগে ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে ছড়ানো হয় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা। 

কুমিল্লায় একটি পূজা মণ্ডপে কোরআন শরিফ পাওয়ার জের ধরে গত ১৩ অক্টোবর ব্যাপক সহিংসতা হয় চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌর এলাকায়।

সেদিন সন্ধ্যায় হাজারখানেক মানুষের মিছিল থেকে হামলা হয় একটি স্থানীয় মন্দিরে। সেই হামলা প্রতিহত করতে গেলে হামলাকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি চালালে ওইদিনই মারা যান চার জন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত মঙ্গলবার দুপুরে মারা যান আরও একজন।

পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর পৌর এলাকার আরও পাঁচটি মন্দিরে হামলা ও ভাংচুর হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেদিন বহিরাগত কিছু কিশোর মিছিল সংগঠিত করে। পরে তাতে যোগ দেয় স্থানীয়দের একটি অংশও। ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে ছড়ানো হয় উত্তেজনা।

সহিংসতার জন্য হাজীগঞ্জ আওয়ামী লীগে বিভাজনকেও দায়ী করছেন স্থানীয়রা। মন্দিরে হামলার সিসিটিভি ফুটেজে পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাব্বীর উপস্থিতি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে রাব্বীর দাবি, হামলা ঠেকাতে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। মন্দিরের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রশাসনকেও দায়ী করছেন মন্দির সংশ্লিষ্টরা।

হামলা-সহিংসতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে ১৯ জন, তাদের অনেকেই জামায়াত-বিএনপির সমর্থক বলে জানিয়েছে পুলিশ।

যেভাবে ছড়ায় সহিংসতা

হাজীগঞ্জ পৌর এলাকায় উত্তেজনা ও সহিংসতার কারণ জানতে নিবিড় অনুসন্ধান করেছে নিউজবাংলা। এলাকাবাসী, রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসন ও মন্দির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বিভিন্ন তথ্য।

স্থানীয়রা জানান, কুমিল্লায় মণ্ডপে ১৩ অক্টোবর সকালে কোরআন পাওয়ার ঘটনাটি ফেইসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জেও। সন্ধ্যায় এশার নামাজের ঠিক পরপরই পৌর এলাকার হাজীগঞ্জ বাজারের মূল সড়কে ২০ থেকে ২৫ জন কিশোরের একটি মিছিল শুরু হয়। মোবাইল ফোনে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মিছিলটি একবার বাজারের মূল সড়ক ঘুরে দ্বিতীয়বার প্রদক্ষিণের সময় হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের মুসল্লিরাও তাতে যোগ দেন। তখন মিছিলে হাজারখানেক লোকের জমায়েত হয়।

মিছিলটি থেকে সাম্প্রদায়িক বিভিন্ন স্লোগান দেয়া হচ্ছিল। বাজার এলাকাতেই শ্রী শ্রী রাজা লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর আখরা মন্দিরের অবস্থান।

ভিডিওতে দেখা যায়, দ্বিতীয়বার প্রদক্ষিণের সময় মিছিল থেকে হঠাৎ মন্দিরটিতে হামলা চালায় ২০-২৫ জন কিশোর। তারা মন্দিরের ভিতরে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। ভাংচুর করা হয় পূজা উপলক্ষে তৈরি করা মন্দিরের অস্থায়ী গেট। এ সময় মিছিলে যোগ দেয়া মুসল্লিরা হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এরপর মুসল্লিরা এলাকা ত্যাগ করেন।

সহিংসতার কিছু সময় পর পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে এলে হামলাকারীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে গুলি ছোড়ে পুলিশ। সেখানে হতাহতের ঘটনার পর স্থানীয় শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম, জমিদারবাড়ি মন্দির, রামপুর চৌধুরী বাড়ি মন্দির, দশভূজা পূজামণ্ডপ ও মুকুন্দেশ্বর সূত্রধরবাড়ি পূজামণ্ডপে ভাংচুর চালায় হামলাকারীরা।

বাজার এলাকার একাধিক দোকানি নিউজবাংলাকে জানান, তারা হঠাৎ দেখেন ২০-২৫ জন কিশোর একসঙ্গে জড়ো হয়ে মিছিলটি শুরু করে। নামাজের পর সেই মিছিলে বড় মসজিদের মুসল্লিরা যোগ দেন। মিছিল শুরু করা ছেলেগুলোই পরে মন্দিরে হামলা শুরু করে। মিছিলে থাকা মুসল্লিরা বাধা দিলে তারাও ইটপাটকেলের মুখে পড়েন।

কয়েক জন প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে জানান, হামলা শুরুর ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। হামলাকারীরা তাদের লক্ষ্য করে প্রচুর ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। কিছুক্ষণ পর গুলি চালায় পুলিশ। হামলাকারীরা এতে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও পরে আরও পাঁচটি মন্দির আক্রান্ত হয়। স্থানীয়দের দাবি, পুলিশ মিছিলটি বাজারে ঢোকার আগেই থামিয়ে দিলে এমন ঘটনা ঘটত না।

মেসেঞ্জার গ্রুপে সংগঠিত কিশোর গ্রুপ

হাজীগঞ্জ পৌর এলাকায় গত ১৩ অক্টোবর মিছিলে নেতৃত্ব দেয়া কিশোর ও হামলার নেতৃত্ব দেয়া কিশোরদের পরিচয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিতে পারেননি স্থানীয়রা। তবে তাদের দাবি, ওই দলটি পৌর এলাকার পাশের কয়েকটি ইউনিয়ন ও গ্রাম থেকে এসেছিল।

অনুসন্ধানে জানা যায়, স্থানীয় রায়চোঁ, রান্ধুনীমুড়া গ্রাম থেকে সংগঠিত হয়ে মিছিল ও হামলা করার উদ্দেশ্যে পৌরসভায় আসে কিশোর গ্রুপটি। রায়চোঁ গ্রামের কয়েক জন বাসিন্দা নিউজবাংলাকে জানান, সেদিন মাগরিবের নামাজের সময় গ্রামের মসজিদে কিছু কিশোর একত্রিত হয়। নামাজের পর তারা একসঙ্গে গ্রাম থেকে বেরিয়ে যায়। সেসময় তারা নিজেদের মধ্যে হিন্দুদের ‘সমুচিত জবাব’ দেয়ার কথা আলোচনা করছিল।

জানা গেছে, রায়চোঁ গ্রাম থেকে যাওয়া দলটি রামগঞ্জ-হাজীগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে উঠলে তাদের সঙ্গে পাশের রান্ধুনীমুড়ার গ্রামের কিছু কিশোরও যোগ দেয়। ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তারা সংগঠিত হয়।

সহিংসতার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় রান্ধুনীমুড়া এলাকার ১৪ বছরের কিশোর ইয়াসিন হোসেন হৃদয়। স্থানীয় একটি পলিটেকনিক স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিল সে। হৃদয়ের বাবা ফজলুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হৃদয় বলছিল মিছিল হবে, সে ফেসবুকে দেখেছে। সঙ্গে এলাকার আরও ছেলেও যাবে। এরপর হৃদয় বাসা থেকে বের হয়ে যায়। তাকে ঘরে দেখতে না পেয়ে আমি হাজীগঞ্জ বাজারের দিকে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি গণ্ডগোল। পরে হাসপাতালে গিয়ে ছেলের লাশ পাই।’

রায়চোঁ গ্রামের চাঁদপুর সরকারি পলিটেকনিকের এসএসসি পরীক্ষার্থী আল আমিনও গুলিতে মারা গেছে। তার বাবা রুহুল আমিন জানান, অ্যাসাইমেন্টের কাগজ আনতে বাজারে গিয়েছিল আল আমিন। মাগরিবের পর সে বাসা থেকে বের হয়। সংঘর্ষের কিছুক্ষণ আগেও বোনের সঙ্গে তার মোবাইলে কথা হয়েছে। এরপর খবর আসে পুলিশের গুলিতে সে মারা গেছে।

আল আমিনের পরিবারের দাবি, রাস্তা পার হতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয় সে। তবে সংঘর্ষের সময়কার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দের পর হামলাকারীদের মাঝখানে লুটিয়ে পড়ে এই কিশোর।

নিহত আরেকজনও ১৬ বছরের মো. শামীম। তার বাড়িও একই এলাকায়। শামীম হাজীগঞ্জ বাজারে কলা বিক্রি করত। তার বাবা মো. আব্বাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সেদিন দুই বড় ভাইয়ের সঙ্গে শামীম বাজারে কলা বিক্রি করছিল। সংঘর্ষের পর দুই ভাই ফিরে এলেও শামীম ফেরেনি। পরদিন কুমিল্লা সদর হাসপাতালে তার মরদেহ পাওয়া যায়।’

নিহত আরেক জন ২৮ বছরের নির্মাণ শ্রমিক বাবলু। বাজারের একটি নির্মাণাধীন আটতলা ভবনের উপরে কাজ করার সময়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। বাবলুর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। এছাড়া পিকআপ চালক সাগর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কুমিল্লা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মঙ্গলবার সকালে তিনি মারা যান।

হাজীগঞ্জের ইতিহাসে ন্যাক্কারজনক হামলা

শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম মন্দিরের পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিহার রঞ্জন হালদার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হাজীগঞ্জের ইতিহাসে এমন ন্যাক্কারজনক হামলা এই প্রথম। আমরা এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না।’

হামলার পিছনের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারব না। পুরো ঘটনার অনেক সিসিটিভি ফুটেজ আছে, সেগুলো দেখলেই আপনারা বুঝে যাবেন। আমরা শুধু এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’

শ্রী শ্রী লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর আখড়া মন্দিরের পরিচালনা কমিটি ও হাজীগঞ্জ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সত্য ব্রত ভদ্র মিঠুন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখানে আমরা জন্মের পর থেকে দেখে আসছি রাজনৈতিক বিভেদ থাকলেও আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতা-কর্মীরা সব সময় আমাদের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন। তারা আমাদের পূজায় আসেন, আমরা তাদের অনুষ্ঠানে যেতাম। তাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল সারা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলেও হাজীগঞ্জে এমন কিছু হবে না।’

হাজীগঞ্জে আওয়ামী লীগে বিভক্তির কারণে সহিংসতার সময়ে দলটির নেতাকর্মীরা দৃঢ় ভূমিকা নিতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। মন্দির সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হামলার সময় আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল কোনো নেতার সাড়া পাওয়া যায়নি।

হাজীগঞ্জ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সত্য ব্রত ভদ্র মিঠুন বলেন, ‘হাজীগঞ্জের রাজনীতি বলতে গেলে এখন অভিভাবকহীন। সুবিধাভোগী একটি তৃতীয় পক্ষ এর সুযোগ নিয়েছে। ওই তৃতীয় পক্ষে আওয়ামী লীগ- বিএনপি-জামায়াতের সমর্থক রয়েছে। তারা কুমিল্লার ঘটনাকে পুঁজি করে পরিকল্পিতভাবে হামলা করেছে।’

মন্দিরে হামলার সময়কার একটি সিসিটিভি ফুটেজে পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাব্বীর উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় তানভীর আহমেদ শাওন নামে রাব্বীর একজন সমর্থক আহত হন বলেও দাবি করেছেন তার প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতারা।

এ অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মেহেদী হাসান রাব্বী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ সবই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার। সব ভিত্তিহীন অভিযোগ। আমি বরং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সব মন্দিরে হামলাকারীদের প্রতিহত করেছি। উপজেলা আওয়ামী লীগের কেউ এ সময় মাঠে ছিল না।’

তানভীর আহমেদ শাওনের বিষয়ে জানতে চাইলে রাব্বী বলেন, ‘ও শুধুই আমাদের একজন সমর্থক। কমিটিতে ওর কোনো পদ নেই। সেদিন আমার মতো শাওনও পুলিশের পাশাপাশি হামলাকারীদের প্রতিহত করতে গিয়ে ইটের আঘাতে সামান্য আহত হয়। সে এখন ভালো আছে, বাসায় আছে।’

রাব্বি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ‘শাওন যদি হামলায় অংশ নিত তাহলে পুলিশের মামলায় তার নাম থাকত। বরং পুলিশের মামলায় উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এবায়দুর রহমান খোকনের ভাইদের নাম রয়েছে।’

হামলাকারী ঠেকাতে গুলি চালানোর প্রয়োজন কেন পড়ল, জানতে চাইলে চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘তখন গুলি না চালালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত, হিন্দু সম্প্রদায় ও হাজীগঞ্জ বাজারের সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতেই গুলি চালাতে পুলিশ বাধ্য হয়েছে।’

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার ১৯ জনের বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, ‘এদের মধ্যে সাত জন ছয়টি মামলার এজাহারনামীয় আসামি। বাকিদের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

গ্রেপ্তারকৃতদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত জামায়াত-বিএনপির কয়েকজন সমর্থক পাওয়া গেছে।’

এ বিষয়ে জানতে হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তির বিএনপির সমন্বয়ক ও চাঁদপুর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মমিনুল হককে টেলিফোন করা হলে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চান না বলে সংযোগ কেটে দেন।

আরও পড়ুন:
নর্থ সাউথের ট্রাস্টিদের রেঞ্জ রোভার নিয়ে বিস্মিত আপিল বিভাগ
নর্থ সাউথের ট্রাস্টিরা ফেরত দিচ্ছেন রেঞ্জ রোভার
কাশেম-আজিম সিন্ডিকেটের দুর্নীতি, ডুবছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
‘দুর্নীতি-জঙ্গিবাদের কবল’ থেকে নর্থ সাউথকে রক্ষার দাবি

শেয়ার করুন

কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন রাখল কারা

কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন রাখল কারা

কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর চলে ভাঙচুর। ফাইল ছবি

নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে কীভাবে উত্তেজনার শুরু এবং মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর পবিত্র কোরআন শরিফ কী করে এলো, সে বিষয়ে টানা অনুসন্ধান চালিয়েছে নিউজবাংলা। পূজার আয়োজক, এলাকাবাসী, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

দুর্গাপূজায় সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যে গত বুধবার ভোরে কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা।

নানুয়ার দিঘির পাড়ের ওই মণ্ডপে চলে ব্যাপক ভাঙচুর, আক্রান্ত হয় নগরীর আরও বেশকিছু পূজামণ্ডপ। পরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়।

যেখান থেকে সাম্প্রদায়িক এই সহিংসতার শুরু সেই নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে কীভাবে উত্তেজনার শুরু এবং মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর পবিত্র কোরআন শরিফ কী করে এলো, সে বিষয়ে টানা অনুসন্ধান চালিয়েছে নিউজবাংলা। পূজার আয়োজক, এলাকাবাসী, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা সৃষ্টির পরিকল্পনায় সরাসরি যুক্ত অন্তত তিনজনকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মণ্ডপে যিনি ভোররাতের দিকে কোরআন শরিফ রেখেছেন, তাকেও চিহ্নিত করা গেছে। মণ্ডপটিতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকলেও আশপাশের কয়েকটি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে মূল অভিযুক্তের ছবি। যেকোনো সময়ে তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে আশাবাদী পুলিশ কর্মকর্তারা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালও মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কুমিল্লায় সহিংসতার মূল অভিযুক্ত পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। শিগগিরই তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কুমিল্লার ঘটনা যে ঘটিয়েছে সে বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে, স্থান পরিবর্তন করছে। আমরা তাকে ধরব। কেন এই কাজ করেছে, তার জবাব দিতে হবে। আপনাদের জানাব।’

আরও পড়ুন: কুমিল্লার মূল অভিযুক্ত পালিয়ে বেড়াচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপটিতে বুধবার ভোরে কোরআন শরিফ পাওয়ার আগের কয়েক ঘণ্টায় কী ঘটেছিল, তার একটি সময়ক্রম (টাইমলাইন) তৈরি করেছে নিউজবাংলা। মন্দিরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, এলাকাবাসী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে এবং বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আগের রাত আড়াইটা পর্যন্ত মন্দিরে পূজাসংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি ছিল। এরপর বুধবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে দুজন নারী ভক্ত মণ্ডপে এসে হনুমানের মূর্তিতে প্রথম কোরআন শরিফটি দেখতে পান।

কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন রাখল কারা
নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে রাখা হনুমানের মূর্তির গদা সরিয়ে রাখা হয় পবিত্র কোরআন শরিফ। বাঁয়ের ছবিটি মঙ্গলবারের, ডানেরটি বুধবার সকালের

রাত আড়াইটা থেকে ভোর সাড়ে ৬টার মধ্যে স্থানীয় এক ব্যক্তি কোরআন শরিফটি রেখে যান মণ্ডপে। এ সময় হনুমানের হাতের গদাটি সরিয়ে নেন তিনি। গদা হাতে তার চলে যাওয়ার দৃশ্যও ধরা পড়েছে ওই এলাকারই কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরায়।

আরও পড়ুন: কুমিল্লার ঘটনায় কয়েকজন চিহ্নিত: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আগের রাতে কখন কী হয়েছিল মণ্ডপে

বেশ কয়েক বছর ধরে নানুয়ার দিঘির পাড়ের এই অস্থায়ী পূজামণ্ডপে পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেন শিমুল গোস্বামী ও তার ভগ্নিপতি রাজিব চক্রবর্তী। রাত ১০টায় পূজা শেষে বাসায় ফেরেন শিমুল ও রাজিব। তখনও ভক্ত-দর্শনার্থীর ভিড় ছিল। শিমুল গোস্বামী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বাসায় ফিরে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে যাই। কারণ সকালেই আবার পূজা শুরু করতে হয়।’

পরদিন কখন মণ্ডপে গিয়েছিলেন, জানতে চাইলে শিমুল নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘তিথি অনুসারে বুধবার সকাল ৮টায় পূজা শুরু হওয়ার কথা ছিল। সে অনুযায়ী আমি ও আমার ভগ্নিপতি রাজিব চক্রবর্তী সকালে ঘুম থেকে উঠে মণ্ডপে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তখনই জানতে পারি মণ্ডপে গন্ডগোল চলছে। তাই আর বাসা থেকে আর বের হইনি।’

আরও পড়ুন: কুমিল্লার ঘটনায় অপশক্তি, কাউকে ছাড় নয়: কাদের

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু পোস্টে দাবি করা হয়েছে, মণ্ডপে কোরআন শরিফ পাওয়ার সময় সেখানে পুরোহিত উপস্থিত ছিলেন। তারা কোরআন সরাতে অস্বীকৃতি জানান। তবে এ অভিযোগ নাকচ করে শিমুল গোস্বামী বলেন, তারা হাঙ্গামার খবর পেয়ে সেদিন সকালে মণ্ডপেই যাননি। এলাকাবাসী ও মণ্ডপসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেও এর সত্যতা নিশ্চিত হয়েছে নিউজবাংলা।

নানুয়া দিঘির পাড়ে এই পূজা উদযাপন হয় দর্পণ সংঘের ব্যানারে। পূজা কমিটির সভাপতি সুবোধ রায় কর্মকার নিউজবাংলাকে জানান, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টায় তিনি নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে মণ্ডপে আসেন। কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে নগরীর কান্দিরপাড়ে যান। রাত সাড়ে ১২টায় আড্ডা শেষে বাসায় ফেরার পথে সুবোধ আবার মণ্ডপের পাশে দাঁড়ান। তখন ভক্ত-দর্শনার্থী বেশ কম ছিল। এরপর বাসায় এসে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে যান। সকালে মানুষজনের চিৎকার শুনে উঠে গিয়ে দেখেন মণ্ডপজুড়ে মানুষের ভিড়।

আরও পড়ুন: কুমিল্লার ঘটনার তদন্ত হচ্ছে, বিশৃঙ্খলা না করার আহ্বান

পূজার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন দিঘির পাড়ের বাসিন্দা তরুণ কান্তি মোদক। স্থানীয়রা তাকে মিথুন নামে চেনেন। মিথুন নিউজবাংলাকে জানান, রাত আড়াইটা পর্যন্ত তিনি মণ্ডপে ছিলেন। তখন পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। এরপর তিনি নৈশপ্রহরী শাহিনের কাছে মণ্ডপের নিরাপত্তার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বাসায় ফেরেন।

মিথুন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রাত আড়াইটা থেকে ভোর পর্যন্ত কী হইছে, তা ভালো বলতে পারবে নৈশপ্রহরী শাহিন। সে এখন পুলিশের হেফাজতে আছে।’

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মঙ্গলবার রাত আড়াইটা থেকে পরের চার ঘণ্টায় মণ্ডপ ছিল জনশূন্য। সে সময় এর পাহারায় ছিলেন মো. শাহিন মিয়া।

নৈশপ্রহরী শাহিনকে নিয়োগ দেয়া হয় আগের বৃহস্পতিবার থেকে। মণ্ডপে তখন থেকেই প্রতিমা ছিল।

শাহিন অ্যালার্ট সিকিউরিটিজ অ্যান্ড অ্যাটেনডেন্ট সার্ভিসেস নামের নিরাপত্তাসেবা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ৪৫ বছর বয়স্ক শাহিনের বাসা নগরীর সংরাইশ এলাকায়।

অ্যালার্ট সিকিউরিটিজ অ্যান্ড অ্যাটেনডেন্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপক শাহাজাদা ইকরাম রিপন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বছর দুয়েক আগে শাহিন আমাদের কোম্পানিতে চাকরি নেয়। পরে আবার চাকরি ছেড়ে দেয়। তবে মাস দেড়েক আগে সে আবার আমাদের কোম্পানিতে যোগ দেয়। মাঝে সে কোথায় ছিল আমরা জানি না।’

শাহিন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিএনপির মিছিল মিটিংয়ে দেখা যেত তাকে। এর বেশি কিছু আমি জানি না।’

কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন রাখল কারা
কুমিল্লা নগরীর সেই মণ্ডপ পরিদর্শনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ছবি: নিউজবাংলা

পূজামণ্ডপের পাশেই পরিবার নিয়ে থাকেন মনিরুজ্জামান। তিনি জানান, রাত প্রায় ৩টার দিকে হঠাৎ দমকা বাতাস বইতে থাকে। এ সময় বিদ্যুৎ চলে যায়। এর পরেই নানুয়ার দিঘির পাড় এলাকা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। পরে সকালে তিনি মানুষের শোরগোল শুনতে পান।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হয়েছে, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পরপরই সেখানে একটি পুলিশের গাড়ি গিয়েছিল। পুলিশ কয়েক যুবককে ঘোরাঘুরি করতে দেখে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়। গাড়িটি এর পরপরই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনওয়ারুল আজিম নিউজবাংলাকে জানান, তাদের একটি টহল দল মণ্ডপ এলাকায় গিয়েছিল, তবে সেটি রাত ২টার দিকে। নিয়মিত টহলের অংশ হিসেবেই দলটি সেখানে যায়। তবে তখন সন্দেহজনক কিছু দেখা যায়নি।

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, বুধবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে নানুয়ার দিঘির পাড়ে পূজা দিতে আসা দুজন নারী ভক্ত প্রথম কোরআন শরিফটি দেখতে পান। এ নিয়ে তারা বিস্ময় প্রকাশের সময় ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন ইকরাম হোসেন (৩০) নামে একজন।

ইকরাম নগরীর কাশারিপট্টির রিকশাচালক বিল্লাল হোসেনের ছেলে। ইকরাম বিবাহিত হলেও স্ত্রীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। মাদকাসক্ত হওয়ায় তিনি পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন। ইকরাম পাইপ মিস্ত্রির কাজ করেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে জানান, মণ্ডপে কোরআন রাখায় যে চক্রটি জড়িত, ইকরাম তাদের একজন। তিনিই বুধবার সকালে ঘটনাস্থল থেকে ৯৯৯-এ কল করেন। তারপর ওসি আনওয়ারুল আজিম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি কোরআন শরিফটি উদ্ধারের পাশাপাশি ইকরামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় নিয়ে যান।

নগরীর বজ্রপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন চিনু রানী দাশ। নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূর্ব পাড়ের একটি বাসায় তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তিনি মণ্ডপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখতে পান দুই নারী মণ্ডপে কোরআন শরিফ দেখে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন।

চিনু রানী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ সময় এক ছেলে ছুটে এসে চিৎকার করে বলে, হনুমানের পায়ের কাছে কোরআন, কেউ এখানে থাকবেন না। আর যে কোরআন এখান থেকে সরিয়ে নেবে তার হাত কেটে ফেলা হবে।’

এ কথা শুনে ভয় পেয়ে যান চিনু। তিনি বলেন, ‘আমি একটু সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখছিলাম। ছেলেটা কাকে যেন ফোন দিয়ে কোরআনের বিষয়টা জানায়। এর কিছুক্ষণ পর সিএনজি দিয়ে একজন লোক আসে। সে এসে কোরআন শরিফটিকে বুকের মধ্যে নেয়।’

সিএনজি অটোরিকশায় আসা ওই ব্যক্তিই হলেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনওয়ারুল আজিম। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি ৯৯৯ থেকে কল পেয়ে একটা সিএনজিতে করে দ্রুত মণ্ডপে আসি।’

পুলিশের গাড়ির পরিবর্তে অটোরিকশা বেছে নেয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছি। তখন থানার গাড়ির ড্রাইভার ছিলেন না। তাই দেরি না করেই সিএনজি নিয়ে ঘটনাস্থলে যাই। পবিত্র কোরআন শরিফটি আমার হেফাজতে নেই।’

পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইকরাম রাতে নেশা করেছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন ওই রাতে ৩ পিস ইয়াবা সেবন করেন। পরে মণ্ডপের পাশে অবস্থান নেন। মণ্ডপে কোরআন রাখেন একজন। আর ইকরামের দায়িত্ব ছিল, ভোরে বিষয়টি পুলিশকে জানানোর। সে অনুযায়ী তিনি ৯৯৯-এ ফোন করেন।

ওসি আনওয়ারুল আজিম মণ্ডপ থেকে কোরআন উদ্ধারের সময় সেটি ফেসবুকে লাইভ করেন ফয়েজ নামের এক যুবক। সেই লাইভের পরেই উত্তেজিত মানুষ জড়ো হন ঘটনাস্থলে, শুরু হয় সহিংসতা। এই ফয়েজকেও আটক করেছে পুলিশ।

আরও পড়ুন: কুমিল্লায় ফেসবুক লাইভে উত্তেজনা ছড়ানো ফয়েজ আটক

স্পর্শকাতর ইস্যুতে ফয়েজ ফেসবুক লাইভের সুযোগ কীভাবে পেলেন, জানতে চাইলে ওসি আনওয়ারুল আজিম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি তখন মোবাইল ফোনে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাতে ব্যস্ত ছিলাম। এ সময় ৩০-৪০ জন ঘটনাস্থলে ছিল, তাই কে লাইভ করছে খেয়াল করতে পারিনি।’

কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন রাখল কারা
কুমিল্লার সেই আলোচিত ফেসবুক লাইভ। ডানে লাইভ করা ব্যক্তি ফয়েজ আহমেদ। ছবি: নিউজবাংলা

লাইভে আপনি নিজেকে কোতোয়ালির ওসি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন- এমন তথ্য তুলে ধরলে তিনি বলেন, ‘তখন আমি বুঝতে পারিনি লাইভ হচ্ছে।’

আরও পড়ুন: ফেসবুকে লাইভ করা সেই ফয়েজ কে?

মাজারের কোরআন শরিফ মণ্ডপে?

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে জানান, তাদের ধারণা দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপ থেকে যে কোরআন শরিফটি উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি আনা হয় পাশের একটি মাজার থেকে।

নানুয়া দিঘির পাশেই শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারটির অবস্থান, মণ্ডপ থেকে হেঁটে যেতে সময় লাগে ২ থেকে ৩ মিনিট। দারোগাবাড়ী মাজার নামে কুমিল্লাবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি রয়েছে মাজারটির। এর বারান্দায় দর্শনার্থীদের তিলাওয়াতের জন্য রাখা থাকে বেশ কয়েকটি কোরআন শরিফ। রাত-দিন যেকোনো সময় যে কেউ এখানে এসে তিলাওয়াত করতে পারেন।

আরও পড়ুন:‘সরকারকে বিপদগ্রস্ত করতে পূজামণ্ডপে কোরআন রাখা হয়েছে’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওই কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, মণ্ডপে রাখার জন্য এই মাজার থেকেই নিয়ে যাওয়া হয় একটি কোরআন শরিফ।

মণ্ডপে কোরআন রাখা যুবক কোথায়?

দারোগাবাড়ী মাজারের মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন এমন তিনজনকে ঘটনার পর থেকে দেখা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একজনের নাম হুমায়ুন কবীর (২৫), আরেকজনের বিষয়ে নিউজবাংলা তথ্য পেলেও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দারোগাবাড়ী মাজারের খাদেম আহামুদ্দুন্নাবী মাসুক নিউজবাংলাকে জানান, হুমায়ুন মাজারে এসে নামাজ আদায় করতেন। তার বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার দেওরা এলাকায়। ঘটনার পরদিনই তাকে পুলিশ নিয়ে যায়। এ ছাড়া মাজারে আরও দুই-একজন নামাজ আদায় করতেন। তাদের এখন আর দেখা যাচ্ছে না।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মাজারে নিয়মিত যাওয়া ওই তিন যুবকই মণ্ডপে কোরআন রাখার পরিকল্পনায় জড়িত। তাদের মধ্যে দুজনকে আমরা আটক করেছি। জিজ্ঞাসাবাদে তারা অনেক তথ্য দিয়েছে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজেও ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি।

‘তবে তৃতীয় যুবককে আটক করতে পারলে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। কারণ তিনিই সরাসরি মণ্ডপে কোরআন রেখেছিলেন। তাকে ধরতে আমাদের অভিযান চলছে।’

কেন এমন পরিকল্পনা, জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, পূজার বিষয়টি ওই চক্রটি পছন্দ করছিল না। সে জন্যই পরিকল্পনাটি করা হয়। তবে এর পেছনে আরও বড় কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেটি তদন্ত শেষে বলা যাবে।’

আরও পড়ুন:
নর্থ সাউথের ট্রাস্টিদের রেঞ্জ রোভার নিয়ে বিস্মিত আপিল বিভাগ
নর্থ সাউথের ট্রাস্টিরা ফেরত দিচ্ছেন রেঞ্জ রোভার
কাশেম-আজিম সিন্ডিকেটের দুর্নীতি, ডুবছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
‘দুর্নীতি-জঙ্গিবাদের কবল’ থেকে নর্থ সাউথকে রক্ষার দাবি

শেয়ার করুন

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ১২টি মণ্ডপে চলে হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ। ছবি: নিউজবাংলা

বিজয়া দশমীর দিন বিকেলে প্রতিমা বিসর্জনের কথা থাকলেও নোয়াখালীর পুলিশের পক্ষ থেকে বেলা ১১টার মধ্যে বিসর্জন শেষ করতে বলা হয়। শুক্রবার জুমার নামাজের পর সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই এ অনুরোধ। তবে সবগুলো অস্থায়ী মণ্ডপের প্রতিমা বেলা ১১টার মধ্যে বিসর্জন দেয়া হলেও সন্ধ্যায় আক্রান্ত হয় চৌমুহনীর ১১টি মন্দির।

কুমিল্লা, চাঁদপুরের পর বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটে নোয়াখালীতে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছয়ানী ইউনিয়নে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এবং শুক্রবার দুপুরে একই উপজেলার চৌমুহনী পৌর এলাকায় ১১টি পূজামণ্ডপে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।

হামলায় প্রাণ হারান প্রান্ত চন্দ্র দাশ নামে এক যুবক, আতঙ্কে হৃদরোগে যতন সাহা নামে আরেকজনের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে যতনের পরিবারের অভিযোগ, তিনিও হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। এ সময় লুটপাট করা হয় মন্দিরের আসবাব, স্বর্ণালংকার, ভাঙচুর করা হয় প্রতিমা।

হামলার শিকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অভিযোগ, প্রশাসনের অনুরোধে বিজয়া দশমীর দিন সকালেই অস্থায়ী সব মণ্ডপের দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়েছিল। এরপরেও হামলা হয় সন্ধ্যায়। এই সহিংসতা ঠেকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ।

হামলার ভয়াবহতা এখনও দৃশ্যমান

বেগমগঞ্জে সহিংসতা চলা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ১২টি মণ্ডপেই ভয়াবহ হামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রথম হামলা চালানো হয় উপজেলার ছয়ানী বাজার এলাকার শ্রীশ্রী সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরে। পুরো মন্দিরে অক্ষত বলে কিছুই নেই। মাটিতে পড়ে আছে গুঁড়িয়ে দেয়া প্রতিমা।

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন নিউজবাংলাকে জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সবাই ব্যস্ত ছিলেন দেবীর আরাধনায়। মাগরিবের নামাজের পর হঠাৎ করে শুরু হয় হামলা। শতাধিক মানুষের একটি মিছিল থেকে রাস্তার পাশে হিন্দুদের বাড়িতে প্রথম হামলা হয়। হামলাকারীরা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে লুটপাট চালায়। এরপর হামলা হয় মণ্ডপে।

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রথমেই হামলা হয় স্থানীয় শীল পরিবারের বাড়িতে। ইট-পাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ৫০ হাজার টাকা ও পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার লুট হওয়ার অভিযোগ করেছেন ওই পরিবারের সদস্যরা। ভাঙচুর করা হয়েছে ঘরের আসবাব ও প্রতিমা। এ সময় গুরুতর আহত সুমন চন্দ্র শীল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

পরিবারের প্রবীণ সদস্য নিমাই চন্দ্র শীল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা কল্পনাও কইরতে পারি নাই এমন হামলা হইব। মণ্ডপে মাত্র দুইজন পুলিশ আছিলো। হেতারা হামলা দেখি দৌড়াই পলাই গেছে। আমার পোলারে পিডি দিয়া পুরা শরীর ফাডাই ফালাইছে। হেতে অহন হাসপাতালো আছে। ঘরের প্রতিমাও ভাঙ্গি শেষ করি হালাইছে।’

কারা হামলা করেছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বেগ্গুইন ১৮-১৯ বছরিয়া পোলাহাইন, দুই একটার মাথায় টুপি ও গায়ে পাইঞ্জাবি আছিলো। হেতেরা কে আমরা চিনিনো। শুধু আংগর ধর্মরে লই গালাগালি কইরতে কইরতে ভাঙচুর কইচ্চে।’

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের পর হামলা হয় চৌমুহনী পৌর এলাকায় ১১টি মণ্ডপে। বাদ যায়নি নোয়াখালীর প্রধান ইসকন মন্দিরও। ওই হামলার পর শনিবার সকালে ইসকন মন্দিরের পুকুরেই পাওয়া যায় প্রান্ত চন্দ্র দাস নামে এক ভক্তের মরদেহ। মন্দিরের আর তিনজন ভক্তও গুরুতর আহত হয়েছেন।

মন্দিরের ফটক দিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়ে ধ্বংসযজ্ঞ। অফিসকক্ষ, মন্দিরের বিপণিবিতান, বেকারি, খাবার হল, ভক্তদের আশ্রম, উপাসনালয় সবখানেই হামলার চিহ্ন। আগুন দেয়া হয়েছে ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল প্রভুপাদের ভাস্কর্যে। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে দুটি রথ ও ভক্তদের মোটরসাইকেল।

ভক্তরা দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় হামলা হয়। ঘটনার তিন দিন পরও ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খাবারের পাত্র দেখা গেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, মন্দিরের উঠানে সহিংসতার শিকার হন এক ভক্ত। প্রথমে তার চুল কেটে দেয়া হয়, পরে পিটিয়ে পা ভেঙে দেয়া এবং মাথা ফাটিয়ে দেয়া হয়। মন্দিরের উঠানে দেখা গেছে রক্তের দাগ, পাশেই পড়ে ছিল কেটে ফেলা চুলের টিকি।

মন্দিরের অধ্যক্ষ রসপ্রিয় দাস নিউজবাংলাকে আক্ষেপভরা কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা কোনো রাজনীতিতে নেই, আশপাশের সব ধর্মের ভাইদের নিয়ে মিলেমিশে থাকি, কারও সঙ্গে কোনো বিভেদ নেই। আমরা কোন দোষে এমন নৃশংস হামলার শিকার হলাম? আমাদের একটাই দাবি, প্রশাসন সুষ্ঠু তদন্ত করে এর বিচার করুক।’

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

ইসকন মন্দিরের আশপাশের আরও ১০টি মন্দির ও মণ্ডপের চিত্রও একই রকম। ভাঙচুর-লুটপাট, অগ্নিসংযোগ চলেছে চৌমুহনীর রাধামাধব জিউর মন্দির, শ্রীশ্রী লোকনাথ মন্দির, শ্রীশ্রী শিব মন্দির, রাম ঠাকুর সেবাশ্রম মন্দির, শ্রীশ্রী রক্ষাকালী মন্দির, চৌমুহনী দুর্গা মন্দির, চৌমুহনী ত্রিশূল মন্দির, চৌরাস্তা মহাশ্মশান মন্দির, নব দুর্গা মন্দির ও মহামায়া মন্দিরে।

সহিংসতা পরিকল্পিত

বেগমগঞ্জে মন্দিরে হামলার পাশাপাশি চলেছে লুটপাট। প্রতিটি জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুরের সময় লুট করা হয়েছে নগদ অর্থ ও প্রতিমা সাজানোর অলংকার। সব মন্দিরেই লোহার সিন্দুক ভাঙা দেখা গেছে।

মোবাইল ফোনে ধারণ করা বেশকিছু ভিডিওতে দেখা যায়, চৌমুহনী কলেজ রোড ধরে হাজারো মানুষ মিছিল নিয়ে মন্দিরগুলোর দিকে ছুটে যাচ্ছে। মিছিলে পাঞ্জাবি পরিহিতরা নেতৃত্ব দিলেও হামলা-লুটপাটে মূলত অংশ নিয়েছে শার্ট-প্যান্ট পরা কিশোর-যুবকেরা।

নোয়াখালী হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক বিনয় কিশোর রায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই হামলার পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই করা হয়েছে। কুমিল্লার ঘটনাকে পুঁজি করে আমাদের এখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতেই বিএনপি-জামায়াত-শিবির পরিকল্পনা করে হামলা করেছে।

‘তবে জামায়াত-বিএনপি-শিবিরের মাঝে আরও একটি পক্ষ ঢুকে গিয়েছিল লুটপাট করার জন্য। তারা শুধু টাকা আর স্বর্ণ চুরি করতেই হামলাকারীদের সঙ্গে মিশে গেছে। তারা হাতুড়ি, শাবল নিয়ে এসেছিল, যা দিয়ে বড় বড় লোহার সিন্দুক ভেঙেছে।’

নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন শাহীনও দাবি করছেন, এই সহিংসতা ‘জামায়াত-শিবিরের কাজ’।

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

এই দাবির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর এই বেগমগঞ্জের রাজগঞ্জে তাকে চাঁদে দেখার গুজব ছড়িয়ে একই কায়দায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর তাণ্ডব চালানো হয়েছিল। তাছাড়া এবারের হামলার অসংখ্য ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে বিএনপি-জামায়াতের চিহ্নিত কয়েকজন কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।’

বেগমগঞ্জে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় মোট ১৮টি মামলায় হয়েছে। এসব মামলার এজাহারনামীয় আসামি ২৮৫ জন, আর অজ্ঞাতনামা আসামি প্রায় পাঁচ হাজার। নোয়াখালীর পুলিশ সুপার (এসপি) শহীদুল ইসলাম সোমবার দুপুরে নিউজবাংলাকে জানান, এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৯০ জনকে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি-জামায়াত কর্মীর সংখ্যা কত সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি পুলিশ। এ বিষয়ে বেগমগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুজ্জামান সিকদার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আসামিদের মধ্যে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছে। তদন্তাধীন বিষয়ে এ নিয়ে বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই।’

বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে’ তাদের এবং জামায়াতকে এই হামলার সঙ্গে জড়ানো হচ্ছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এগুলো স্থানীয় আওয়ামী লীগের অপরাজনীতি ও কোন্দলের ফল। স্থানীয় মেয়র ও এমপির মাঝে দলীয় কোন্দল আছে। তাদের দুই পক্ষের ঝামেলার জন্য এমনটা হয়েছে। এখানে বিএনপি-জামায়াতের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

‘তাছাড়া দেশে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা ও দেশজুড়ে ভোগান্তি থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে আওয়ামী লীগই এই হামলা চালিয়েছে। দেশে কিছু হলেই তো সব দায় বিএনপির ওপর চাপিয়ে দেয় সরকার। তারা তো শুধু সুযোগ খোঁজে কখন বিএনপির নেতা-কর্মীদের মামলায় জড়িয়ে গ্রেপ্তার করা যায়। এখন এই ইস্যু তৈরি করে আমাদের কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে।’

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা ব্যর্থ

বেগমগঞ্জের ছয়ানী ইউনিয়নে বৃহস্পতিবার মন্দির ও হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলার পরপরই সতর্ক অবস্থান নেয়ার দাবি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। পরদিন শুক্রবার বিজয়া দশমীতে বিকেলে প্রতিমা বিসর্জনের কথা থাকলেও নোয়াখালীর পুলিশের পক্ষ থেকে শুক্রবার বেলা ১১টার মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন শেষ করার অনুরোধ জানায় প্রতিটি মণ্ডপ কর্তৃপক্ষকে।

শুক্রবার জুমার নামাজের পর সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই এ অনুরোধ করা হয়। সে অনুযায়ী, সব অস্থায়ী মণ্ডপের প্রতিমা শুক্রবার বেলা ১১টার মধ্যেই বিসর্জন হয়ে যায়। এই সময়ের পর যেসব স্থায়ী মণ্ডপ ও মন্দিরে প্রতিমা ছিল, সেগুলো বিসর্জনের কথা আগামী দুর্গা পূজার আগে।

হামলার শিকার মন্দিরসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব ধরনের নির্দেশনা মেনে চলার পরেও হামলার ঘটনায় প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ব্যর্থতা প্রমাণিত হয়েছে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কাছ থেকে সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তারা বলছেন, বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে সহিংসতা চললেও তা ঠেকাতে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এগিয়ে আসেনি।

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

নোয়াখালী হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক বিনয় কিশোর রায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কুমিল্লা, চাঁদপুরের পর বেগমগঞ্জের ছয়ানীতে হামলার পর আমরা পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাদের পরামর্শে আমরা বিকেলের পরিবর্তে সকালেই প্রতিমা বিসর্জন দিয়েছি। এরপরেও যখন হামলা হলো তখন আমরা পুলিশ ও এমপি সাহেবকে টেলিফোন করে সহযোগিতা চেয়েছি। তারা আসছেন আসছেন করে তিন ঘণ্টা পার হলো। এর মধ্যে আমাদের মন্দিরগুলোতে তিন দফা হামলা লুটপাট হলো। যখন সব শেষ তখন পুলিশ এসেছে। এটা জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বড় ধরনের ব্যর্থতা।’

এ অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নোয়াখালী ৩ আসনের সংসদ সদস্য মামুনুর রশীদ কিরনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি। তবে হামলা প্রতিহত করতে না পারাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে রাজি নন নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শিহাব উদ্দিন শাহীন।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা আসলে বুঝতে পারিনি এত বড় ঘটনা ঘটে যাবে। আগের দিন ছয়ানীতে মন্দিরে হামলার পরই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, পরদিন সকালেই প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হবে, যেন জুমার নামাজের পর মুসল্লিরা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ না পায়। সকালে ঠিকঠাক বিসর্জন হয়ে যাওয়ার পর আমরা সবাই মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম- আর কোনো অঘটন ঘটবে না। হঠাৎই শুনি হামলার ঘটনা। এটা আমাদের জন্য বড় একটা শিক্ষা হয়েছে।’

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

মন্দিরে হামলার সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের এগিয়ে না আসার অভিযোগ অস্বীকার করে শাহীন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা খবর পেয়েও আসেননি এ কথা ভুল। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের যারাই কাছাকাছি ছিলেন ছুটে গিয়েছিলেন। এমনকি স্থানীয় এমপির ছেলে নিজে সেখানে ছুটে গিয়েছিল, কিন্তু তারা সংখ্যায় কম ছিল বলে উল্টো হামলার শিকার হয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।’

চৌমুহনীর প্রতিটি মন্দিরে দুইজন করে পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। হামলা শুরু হলে তারা পালিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার শহীদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ব্যস্ততার কথা বলে তিনি এড়িয়ে যান।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সকালে প্রতিমা বিসর্জন হয়ে যাওয়ায় আর হামলা হতে পারে বলে আমাদের মনে হয়নি। তাছাড়া পুলিশে লোকবল সংকট রয়েছে।

‘হামলা শুরুর খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম, টিয়ার শেলও ছোড়া হয়েছে কয়েক রাউন্ড, কিন্তু ওইসব সামাল দিতে গুলি চালাতে হতো। তখন এতটাই টাফ সিচুয়েশন ছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় পুলিশও ছিল নিরুপায়।’

আরও পড়ুন:
নর্থ সাউথের ট্রাস্টিদের রেঞ্জ রোভার নিয়ে বিস্মিত আপিল বিভাগ
নর্থ সাউথের ট্রাস্টিরা ফেরত দিচ্ছেন রেঞ্জ রোভার
কাশেম-আজিম সিন্ডিকেটের দুর্নীতি, ডুবছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
‘দুর্নীতি-জঙ্গিবাদের কবল’ থেকে নর্থ সাউথকে রক্ষার দাবি

শেয়ার করুন

শিশুসহ ৩ নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের তথ্য ‘ভুয়া’

শিশুসহ ৩ নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের তথ্য ‘ভুয়া’

ফেসবুকে বিভিন্ন আইডি থেকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগটি ছড়িয়ে দেয়া হয়। এতে দাবি করা হয়, ১০ বছরের এক শিশু, তার বোন ও মাসি ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তবে এ তথ্য গুজব বলে দাবি করেছেন প্রশাসন, পুলিশ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা।

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে সনাতন ধর্মাবলম্বী একই পরিবারের তিন নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ গুজব বলে দাবি করেছেন প্রশাসন, পুলিশ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা।

সনাতন ধর্মের নেতারা বলছেন, একটি মহল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ফেসবুকে এমন গুজব ছড়াচ্ছে। এর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বুধবার রাতে ফেসবুকে বিভিন্ন আইডি থেকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ওই অভিযোগটি ছড়িয়ে পড়ে। এতে দাবি করা হয়, ১০ বছরের এক শিশু, তার বোন ও মাসি ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

শনিবার কয়েকটি পোস্টে বলা হয়, ‘ধর্ষণের শিকার ১০ বছরের শিশুটি মারা গেছে। মৃত্যুর মুখে রয়েছে তার মাসি (খালা) ও বোন।’

তবে কোনো পোস্টেই ঘটনার জায়গা বা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র উদ্ধৃত করা হয়নি। নিউজবাংলার পক্ষ থেকে হাজীগঞ্জ উপজেলার হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বরং সবাই দাবি করছেন, উপজেলায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটলেও তিন জনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

ধর্ষণের তথ্য সম্পূর্ণ গুজব বলে দাবি করেছেন হাজীগঞ্জ উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মিঠুন ভদ্র।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করি। তার আগে ৯ বছর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলাম। আগে থেকেই আমাদের সম্প্রদায়ের লোকজনের ভালোমন্দ দেখছি। যার কারণে যেকোনো বিষয়ে মানুষ আমাকে জানায়। তবে মন্দিরে হামলা ছাড়া এ ধরনের কোনো ঘটনার খবর আমার কাছে নেই। কোনো মানুষ এমন কোনো খবর আমাদের জানায়নি। এগুলো সম্পূর্ণ গুজব।’

হাজীগঞ্জ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি রুহিদাস বণিক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সংঘবদ্ধ ধর্ষণের খবরটি ভুয়া। এ ধরনের কোনো তথ্য আমাদের পূজা উদযাপন পরিষদ, জাতীয় হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বা বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের কোনো নেতার কাছে নেই। কেউ যদি এমন কোনো খবর ফেসবুকে পোস্ট দেয়, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। যারা এই ধরনের গুজব ছড়ায় তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই। সবাইকে এ ধরনের গুজব এড়ানোর অনুরোধ জানাচ্ছি।’

হাজীগঞ্জ রামকৃষ্ণ সভা আশ্রমের সাধারণ সম্পাদক নিহা রঞ্জন হালদার মিলন বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ গুজব। যারা এ ধরনের ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছে তাদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানাই।’

‘আমাদের এলাকায় এই ধরনের কোনো ঘটনার খবর পাইনি। এগুলো গুজব রটানো হচ্ছে’, বলেন হাজীগঞ্জ পৌর এলাকার ত্রিনয়নী সংঘ মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক গোপাল সাহা।

হাজীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো খবর আমরা পাইনি। আমাদের কাছে কেউ অভিযোগও করেনি। এটা সম্পূর্ণ গুজব। এভাবে একজন মানুষ মারা যাবে আর পুলিশ বসে থাকবে, তা কখনও হয়? যারা এ ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সারা হাজীগঞ্জ খুঁজেও আমরা এ ধরনের কোনো সংবাদ পাইনি। এগুলো সম্পূর্ণ গুজব। এসব গুজব যারা ছড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ বলেন, ‘ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং নেতারা নিশ্চিত করেছেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ গুজব।

গুজবে কান না দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো কিছু শুনলেই বিশ্বাস না করে আগে তার সত্যতা যাচাই করার চেষ্টা করুন।’

আরও পড়ুন:
নর্থ সাউথের ট্রাস্টিদের রেঞ্জ রোভার নিয়ে বিস্মিত আপিল বিভাগ
নর্থ সাউথের ট্রাস্টিরা ফেরত দিচ্ছেন রেঞ্জ রোভার
কাশেম-আজিম সিন্ডিকেটের দুর্নীতি, ডুবছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
‘দুর্নীতি-জঙ্গিবাদের কবল’ থেকে নর্থ সাউথকে রক্ষার দাবি

শেয়ার করুন

অটোরিকশা থেকে মাসে কোটি টাকার চাঁদাবাজি

অটোরিকশা থেকে মাসে কোটি টাকার চাঁদাবাজি

নোয়াখালীর প্রতিটি উপজেলার স্ট্যান্ডে শ্রমিক-মালিক নেতারা চাঁদা আদায় করেন বলে অভিযোগ চালকদের। ছবি: নিউজবাংলা

অটোরিকশা ও চাঁদা আদায়ের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ২৮ হাজার ৪৩৮টি অটোরিকশা থেকে প্রতি মাসে চাঁদা আদায় হয় ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকার বেশি। আর দৈনিক গড়ে ১০০ টাকা হিসাবে বিভিন্ন সড়কে চাঁদা বাবদ মাসে আদায় করা হয় ৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকার বেশি।

নোয়াখালী জেলার প্রধান সড়কগুলোতে অনেক আগে থেকেই তিন চাকার যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে জেলা শহরের প্রধান সড়ক, ৯টি উপজেলার উপপ্রধান সড়ক এবং শাখা সড়কগুলোতে নিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশার পাশাপাশি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অনিবন্ধিত আরও প্রায় ১৫ হাজার অটোরিকশা।

জেলায় প্রায় আড়াই বছর ধরে সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে রাস্তায় নামা বন্ধ হয়নি নিত্যনতুন অটোরিকশার। বিভিন্ন স্থানে চাঁদা দিয়ে সড়কে চলছে এসব যান।

শুধু অনিবন্ধিত নয়, নিবন্ধিত অটোরিকশাগুলো চাঁদা দিয়ে অবাধে চলছে মূল সড়কে। অভিযোগ, জেলায় পরিবহন খাতের শুধু সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকেই মাসে চাঁদাবাজি হয় ১০ কোটি টাকার বেশি।

নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় গত আড়াই বছরে একদিকে যেমন শতকোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারিয়েছে সরকার, আবার জেলার প্রতিটি মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড।

এসব স্ট্যান্ড থেকেই শ্রমিক-মালিক নেতারা সমিতির নামে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে প্রতিদিন ও মাসিক হিসেবে আদায় করছেন চাঁদা। সমিতির চাঁদা হিসেবে পরিচিত ‘জিবি’ নেয়ার পাশাপাশি লাইনম্যান, পৌর টোল ও পুলিশের নামেও মাসিক চাঁদা তোলেন এসব পরিবহন নেতারা।

অটোরিকশাচালক কামরুল ইসলাম, আলা উদ্দিন, নুরুল আমিন অভিযোগ করেন, তারা যা আয় করেন তার বেশির ভাগই চলে যায় রাস্তায়।

তারা জানান, জেলা সদরের সোনাপুর জিরো পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন ভোর থেকে কয়েক হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা জেলার বিভিন্ন সড়কে চলাচল করে। প্রতিদিন সোনাপুর জিরো পয়েন্টে এসেই প্রতিটি অটোরিকশাচালককে শ্রমিক-মালিক সংগঠনকে জিবি হিসেবে দিতে হয় ৪০ টাকা।

এ ছাড়া জিরো পয়েন্টের লাইনম্যানকে ১০ টাকা, পৌর টোল ১০ টাকা, সোনাপুর থেকে মাইজদী যাওয়ার পর লাইনম্যানকে ১০ টাকা, বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায় টোল হিসেবে ১৫ টাকা এবং লাইনম্যানকে দিতে হয় ২০ টাকা।

প্রধান সড়ক থেকে শাখা সড়কে ঢুকলেও দিতে হয় চাঁদা। এভাবে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটি অটোরিকশাকে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা চাঁদা দিতে হয়।

এটা হলো দৈনিক হিসাব। মাস হিসাবেও চাঁদা দিতে হয় চালকদের।

অটোরিকশাচালকরা জানান, প্রতি মাসে পুলিশের নাম ভাঙিয়ে অটোরিকশা সংগঠনের নেতারা সোনাপুরের প্রতিটি অনিবন্ধিত সিএনজি থেকে ৩০০ টাকা ও নিবন্ধিত সিএনজি থেকে ২০০ টাকা, মাইজদীতে ২০০ টাকা ও বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায় ২০০ টাকা চাঁদা আদায় করেন।

এই চাঁদা শুধু সোনাপুর-মাইজদী কিংবা চৌরাস্তায় নয়, জেলার প্রতিটি উপজেলা স্ট্যান্ডের শ্রমিক-মালিক নেতারা এই চাঁদা আদায় করেন অভিযোগ করে চালকরা বলেন, ব্যক্তিগত খরচ, গ্যাস বিল ও চাঁদার টাকা উপার্জনে হিমশিম খেতে হয় তাদের। তাই বাধ্য হয়েই যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেন তারা।

অটোরিকশা থেকে মাসে কোটি টাকার চাঁদাবাজি

চাঁদা আদায়ের জায়গাগুলোর একটি হিসাব দিয়েছেন অটোরিকশাচালক ইব্রাহিম, আমির হোসেন, আবদুল হক ও কামাল হোসেন।

তারা জানান, মাইজদী আর চৌরাস্তা ছাড়াও জেলা শহরের কিরণ হোটেল মোড়, মাইজদী বাজার, নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল চত্বর, জজ কোর্ট সড়ক, সুপারমার্কেট সড়ক, খলিফারহাট, উদয়সাধুর হাট, বেগমগঞ্জ চৌরাস্তা, বাংলাবাজার, সোনাইমুড়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিস চত্বর, বজরা বাজার, দিঘিরজান, আমিশাপাড়া বাজার, চাটখিল দক্ষিণ বাজার খিলপাড়া রোড, চাটখিল উপজেলা গেট, চাটখিল বানসা-পাওড়া সড়কে চাঁদা দিতে হয় তাদের।

বদলকোট সড়ক, চাটখিল শাহাপুর-স্যামপাড়া সড়ক, কবিরহাট, চাপরাশিরহাট, নলুয়া-ভূঁইয়ারহাট, সেনবাগ বাজার, ডমুরুয়া চৌ মোড়, কানকিরহাট, চাতারপাইয়া বাজার, সেবারহাট, সুবর্ণচরের হারিছ চৌধুরী বাজার, খাসেরহাট, ভূঁইয়ারহাট, কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট, চাপরাশিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অটোরিকশা স্ট্যান্ডে প্রতিদিনই চাঁদা দেন হাজার হাজার অটোরিকশাচালক।

নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত দুই ধরনের অটোরিকশা থেকেই তোলা হয় এসব চাঁদা। নিবন্ধিত হলে শুধু কিছু ক্ষেত্রে চাঁদার পরিমাণ কমে।

চালকরা জানান, জেলায় কমপক্ষে ২৮ থেকে ৩০ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। এসব অটোরিকশার চালকদের কাছ থেকে সমিতিতে ভর্তি নামে চাঁদা আদায় থেকে শুরু করে সড়কে প্রতিদিন এবং মাসিক হিসাবে চাঁদা আদায়ে কারা জড়িত বা নিয়ন্ত্রণ করছে, প্রশাসন সবই জানে। তারা নাম বলতে পারবে না। কারণ নাম বললে পরদিন থেকে আর সড়কে উঠতে পারবে না।

অটোরিকশা ও চাঁদা আদায়ের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ২৮ হাজার ৪৩৮টি অটোরিকশা থেকে প্রতি মাসে চাঁদা আদায় হয় ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকার বেশি। আর দৈনিক গড়ে ১০০ টাকা হিসাবে বিভিন্ন সড়কে চাঁদা বাবদ মাসে আদায় করা হয় ৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকার বেশি।

আড়াই বছর ধরে বন্ধ অটোরিকশা নিবন্ধন

দুই বছরের বেশি সময় ধরে নিবন্ধন বন্ধ থাকায় এখন অটোরিকশার সংখ্যা মাত্রা ছাড়িয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সোনাপুর, মাইজদী, চৌরাস্তাসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো থাকে অটোরিকশার দখলে। এতে এসব সড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খায় ট্রাফিক পুলিশ।

যানজট নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে গত মঙ্গলবার সকাল থেকে এসব অবৈধ যানবাহন প্রধান সড়কে চলতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে শহরে মাইকিংও করছে ট্রাফিক বিভাগ। তবে কাজের কাজ খুব একটা হচ্ছে না।

অনিবন্ধিত অটোরিকশার মালিক এমরান হোসেন, আবু নাছের ও নাহিদ জানান, আড়াই বছর সিএনজি রেজিস্ট্রেশন বন্ধ রয়েছে। তাই চেষ্টা করেও রেজিস্ট্রেশন করাতে পারিনি।

অটোরিকশার মালিক আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘চার বছর আগে একটি সিএনজি কিনছি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে রেজিস্ট্রেশনের জন্য বিআরটিএ নোয়াখালী অফিসে যোগাযোগ করলে জানায়, সিএনজি রেজিস্ট্রেশন বন্ধ। তাই আর রেজিস্ট্রেশন করি নাই।’

সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে সোনাপুর সিএনজি মালিক সমিতিতে ভর্তির পর সড়কে চলছে তার অটোরিকশাটি।

তিনি বলেন, ‘মাঝেমধ্যে পুলিশ ধরলে টাকা দিয়ে বা তদবির করে ছাড়িয়ে আনি। রেজিস্ট্রেশন করেও লাভ কি? রাস্তায় চলতে সব সিএনজির খরচ একই। মাসের শেষে সময়মতো চাঁদা দিয়ে দিলে আর সমস্যা হয় না।’

‘পুলিশও নিচ্ছে টাকা’

সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের কাছ থেকে তোলা চাঁদার একটি অংশ পুলিশ নেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার নিবন্ধন না থাকায় প্রধান সড়কে অটোরিকশা থামিয়ে নানা অনিয়ম দেখিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজিও করে পুলিশ।

গত ৬ অক্টোবর শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ট্রাফিক সার্জেন্ট আনোয়ারকে একটি অটোরিকশা আটকে চাঁদা আদায় করতে দেখা যায়। তিনি ওই চালকের কাছে ৫০০ টাকা ঘুষ দাবি করেন। পরে ৩০০ টাকা দিয়ে রক্ষা পান চালক।

এর আগে ২৮ জুলাই সোনাপুর জিরো পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশ সদস্য দিলিপ ফল বহন করায় একটি অটোরিকশা থামিয়ে ৫০০ টাকা ঘুষ নেন। ওই ঘটনার দুই দিন পর একই স্থানে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আটকে তাকে ১০০ টাকা ঘুষ নিতে দেখা যায়।

হিসাব নেই বিআরটিএ ও ট্রাফিক বিভাগের কাছেও

নিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশার হিসাব থাকলেও অনিবন্ধিত অটোরিকশার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান দিতে পারেনি বিআরটিএ নোয়াখালী অফিস ও জেলা ট্রাফিক বিভাগ।

অটোরিকশা থেকে মাসে কোটি টাকার চাঁদাবাজি

কর্মকর্তারা জানান, সর্বশেষ ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন হয়েছে। এরপর জেলা পরিবহন কমিটির সিদ্ধান্ত না থাকায় গত আড়াই বছর নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এই সময়ে নিবন্ধনের চেয়ে অটোরিকশার সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে বলে ধারণা তাদের।

নোয়াখালী ট্রাফিক বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক (টিআই) মো. বখতিয়ার উদ্দীন বলেন, ‘বর্তমানে সড়কে ধারণ ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা। সঠিক সংখ্যা জানা না থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে, জেলায় ২০ থেকে ২৫ হাজার অটোরিকশা রয়েছে। যার কারণে যানজট নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

সড়কে চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের ২০ মে আমি এই জেলায় যোগদানের পর সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে সমিতিতে ভর্তি বাণিজ্য, মাসিক চাঁদাসহ সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করে দিয়েছি। অনিবন্ধিত ও নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হওয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে এবং মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।’

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) নোয়াখালীর সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. নাজমুল হাসান বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে নিয়মিত আমরা অভিযান চালিয়ে আসছি।

‘সড়কের অবস্থানের দিক বিবেচনায় জেলা পরিবহন কমিটির সিদ্ধান্ত না হওয়ায় ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে বৈধ অটোরিকশার ক্ষেত্রে অন্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

আরও পড়ুন:
নর্থ সাউথের ট্রাস্টিদের রেঞ্জ রোভার নিয়ে বিস্মিত আপিল বিভাগ
নর্থ সাউথের ট্রাস্টিরা ফেরত দিচ্ছেন রেঞ্জ রোভার
কাশেম-আজিম সিন্ডিকেটের দুর্নীতি, ডুবছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
‘দুর্নীতি-জঙ্গিবাদের কবল’ থেকে নর্থ সাউথকে রক্ষার দাবি

শেয়ার করুন

কোথায় গেল দেশি ল্যাপটপ

কোথায় গেল দেশি ল্যাপটপ

যাত্রার ১০ বছরেও সাড়া ফেলতে পারেনি দেশীয় ল্যাপটপ দোয়েল। ছবি: সংগৃহীত

মাত্র ১০ হাজার টাকায় দোয়েল নামে দেশি ল্যাপটপ বিক্রি শুরু করেছিল টেলিফোন শিল্প সংস্থা। সে উদ্যোগের ১০ বছর হয়ে গেল, কিন্তু বাজারে জনপ্রিয়তা পায়নি এ ল্যাপটপ। নিভুনিভু হয়ে এখনও চলছে এ প্রকল্প।

জাতীয় পাখির নামে দেশের নিজস্ব ব্র্যান্ডের ল্যাপটপের নাম রাখা হয় দোয়েল। শুরুতে বাজারে বেশ সাড়াও পড়ে, কিন্তু তা কমতেও সময় নেয়নি। অপ্রতুল সার্ভিস সেন্টার, দক্ষ কর্মীর অভাব, সরাসরি যন্ত্রাংশ আমদানি করতে না পারা, আমদানিতে উচ্চ শুল্ক এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা না থাকা, নতুন প্রকল্প না নেয়াসহ নানা সমস্যায় গত এক দশকেও আর ডানা মেলা হয়নি দোয়েলের।

২০১১ সালের অক্টোবরে দোয়েল ল্যাপটপের উদ্বোধন হয়। বাজারে বৈশ্বিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ল্যাপটপের চেয়ে দোয়েলের দাম কম হলেও তা জনপ্রিয়তা পায়নি। শুরু থেকেই এ ল্যাপটপে নানা সমস্যা দেখা দেয়, যেমন অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া, চার্জ না থাকা, স্পিড কম, হ্যাং হওয়া, অপারেটিং সিস্টেম ঠিকমতো কাজ না করা ইত্যাদি। আবার এসব সমস্যা সমাধানে কোনো সার্ভিসও পাননি গ্রাহকরা। এতে একপর্যায়ে উৎপাদক প্রতিষ্ঠান টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস) উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।

পরবর্তী সময়ে আবার চালু হয় দোয়েলের উৎপাদন, কিন্তু তত দিনে ক্রেতারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। প্রচারের অভাবসহ নানা সমস্যার কারণে এটি আড়ালেই থেকে যায়।

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) থেকে ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দে ল্যাপটপ উৎপাদন শুরু করা হয়। যন্ত্রাংশের প্রায় সবই বিদেশ থেকে এনে দেশে অ্যাসেমব্লি (সংযোজন) করা হয়। ধীরে ধীরে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত যন্ত্রাংশ দেশে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও নেয়া হয়। সেটাও আর হয়ে ওঠেনি।

টেশিস এখনও শুধু বাইরে থেকে পার্টস এনে দেশে সেগুলো জোড়া দেয়ার কাজ করছে। বিভিন্ন কোম্পানি এরই মধ্যে ল্যাপটপের বিভিন্ন পার্টস দেশেই উৎপাদন শুরু করেছে। টেশিস এক যুগেও সে পথে হাঁটতে পারেনি। তা ছাড়া এত দিনেও কোনো বড় ধরনের পরিকল্পনা নেয়া হয়নি দোয়েলকে ঘিরে।

টেশিস নিজেরা যন্ত্রাংশ আমদানিও করে না। তৃতীয় পক্ষের আমদানি করা যন্ত্রাংশ নিজেরা সংযোজনের কাজ করছে। এতে উৎপাদন খরচও বেশি পড়ে যায়। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ল্যাপটপ যন্ত্রাংশের সংকট তৈরি হয়। ফলে যারা খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী তারা ঠিকমতো সাপ্লাই দিতে পারে না। ফলে দামও বেড়ে যায়।

সম্প্রতি টেশিস যন্ত্রাংশ আমদানির উদ্যোগ নিলেও দেশীয় শিল্প সুরক্ষা দিতে কম্পিউটার যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হওয়ায় এ আমদানিও আটকে আছে।

জানতে চাইলে দোয়েলের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টেশিসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফখরুল হায়দার চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২০১১ সালে আমরা অনেক কম দামে ল্যাপটপ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তখন মালয়েশিয়া থেকে অ্যাসেমব্লিং করে নিয়ে আসা হতো। ১০ হাজার টাকায় ল্যাপটপ দিয়েছে, অথচ তখনকার সময় মাইক্রোপ্রসেসর কিনতেই ১০ হাজার টাকা লাগত। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, কম দামে ল্যাপটপ দিতে, কিন্তু এত কম দামে তো না। যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের এটা বোঝা উচিত ছিল। মানুষের উৎসাহ কমে গিয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘কমোডিটি বাজারে ছাড়লেই হবে না। আপনাকে সার্ভিস দেয়ার জন্য নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। আপনি নতুন একটা ল্যাপটপ কিনে নিয়ে আসলেন, এটির যেকোনো সমস্যা হতে পারে। তখন আপনি কোথায় নিয়ে যাবেন। এমন হয়েছে, অনেকের একটু প্রবলেম হলে সেটা আর তিনি রিকভারি করতে পারেননি। এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

‘আমরা নিজস্ব কোনো পরিকল্পনা বা বড় প্রজেক্ট পাইনি। এখনও শুধু অ্যাসেমব্লিং হয়। কিছু পার্টস উৎপাদনের জন্য কোনো প্ল্যান্ট নেই। কোনো প্রকল্পও নেই। সে ক্ষেত্রে সরকারি প্রকল্প বা প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপ পেলেও ভালো। এমন বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে আগানো হয়ে ওঠেনি। তবে এখন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’

কোথায় গেল দেশি ল্যাপটপ

১০ বছরের টেশিস

নিজেদের প্ল্যান্টে গড়ে দিনে ১০০০ ল্যাপটপ সংযোজনেরর সক্ষমতা থাকলেও গত ১০ বছরে এই ব্র্যান্ডটি ৮০ হাজারের কিছু বেশি ল্যাপটপ বিক্রি বা সরবরাহ করেছে, যার বেশির ভাগই বিভিন্ন প্রকল্পে জোগান দেয়া হয়েছে। মাত্র ২০ হাজারের মতো ল্যাপটপ গেছে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে।

অথচ ২০১৯ সালে এক অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেছিলেন, দেশে পাঁচ কোটি ল্যাপটপের চাহিদা রয়েছে। দোয়েল পর্যন্ত ১১টি মডেলের ল্যাপটপ উৎপাদন করেছে। এখন বাজারে দোয়েলের ১৫ হাজার টাকা থেকে ৭৫ হাজার টাকা দামের ল্যাপটপ পাওয়া যায়।

এত বছরেও সার্ভিস সেন্টার বা বিক্রয় কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি দোয়েলের। দোয়েল ল্যাপটপ কিনতে হলে, বিটিসিএলের টেলিফোন বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে যেতে হয়, তাও মাত্র সাতটি বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে। দোয়েলের কোনো প্রচারও নেই।

রাজধানীর রমনা ও নীলক্ষেতে বিটিসিএল অফিসে দোয়েল বিক্রি করা হয়। শেরেবাংলা নগরে বিক্রয়কেন্দ্র করা হলেও সেখানে বিক্রি শুরু হয়নি। আগারগাঁওয়ের আইডিবি ভবনে একটি বিক্রয়কেন্দ্র আছে। ঢাকার বাইরে আছে টঙ্গী, খুলনা ও রাজশাহীতে। ফলে দেশের প্রান্তিক এলাকায় একজন ক্রেতা ল্যাপটপ কিনলে স্থানীয়ভাবে সার্ভিস পান না।

টেশিস বলছে, দোয়েল থেকে প্রায় ১৬ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে। এক দশকে ৩৪১ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৩২৫ কোটি টাকা।

টেশিসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফখরুল হায়দর চৌধুরী বলেন, ‘আমরা এখন সরাসরি যন্ত্রাংশ আনার উদ্যোগ নিয়েছি; কিন্তু টেশিসকে এসব পণ্য আনার ক্ষেত্রে উচ্চহারে শুল্ক দিতে হয়। এত শুল্ক দিয়ে তো ব্যবসা করা সম্ভব নয়। তাই আমরা শুল্ক ছাড় পাওয়ার চেষ্টা করছি।

‘আমরা যখন সরাসরি আনা শুরু করব, তখন আমাদের উৎপাদন ও পণ্যের বাজার বাড়বে। শুরুতেই যে একটা ধাক্কা খেল, তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে টেশিস।’

আরও পড়ুন:
নর্থ সাউথের ট্রাস্টিদের রেঞ্জ রোভার নিয়ে বিস্মিত আপিল বিভাগ
নর্থ সাউথের ট্রাস্টিরা ফেরত দিচ্ছেন রেঞ্জ রোভার
কাশেম-আজিম সিন্ডিকেটের দুর্নীতি, ডুবছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
‘দুর্নীতি-জঙ্গিবাদের কবল’ থেকে নর্থ সাউথকে রক্ষার দাবি

শেয়ার করুন