দেশে অর্ধেকের বেশি প্রবীণ পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে

দেশে অর্ধেকের বেশি প্রবীণ পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে

দেশে প্রবীণদের মাঝে পুষ্টিহীনতা ক্রমেই বাড়ছে। ফাইল ছবি/নিউজবাংলা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, দেশে যত প্রবীণ রয়েছে তার এক-চতুর্থাংশ পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। আরও সহজভাবে বললে প্রতি ১০০ জন প্রবীণের মধ্যে পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন ২৫ জন। আর পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছেন ৬৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবীণ।

বিদেশে এক যুগের বেশি সময় কর্মজীবন কাটিয়ে অবসর নেয়া সত্তরোর্ধ্ব নাদিরা বেগমের (ছদ্মনাম) আশ্রয় এখন রাজধানীর আগারগাঁওয়ের প্রবীণ হিতৈষী সংঘের প্রবীণ নিবাস। একসময় তার আয়ে চলত গোটা ছয় সদস্যের পরিবার। এখন পরিবারের লোক যে যার মতো ব‌্যস্ত থাকায় নিঃসঙ্গ নাদিরার সময় কাটে প্রবীণ নিবাসের আবদ্ধ ঘরে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে ১৮ মাস নাদিয়ার সঙ্গে দেখা করেন না পরিবারের সদস্যরা। প্রতি মাসে বিকাশে করে নিবাসের টাকা পরিশোধ করেন তার বড় ছেলে। তবে প্রবীণ নাদিরার আক্ষেপ, শেষ বয়সে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে কোনো দিনও ভাবেননি। এই ভেবেই সারা দিন কাটে তার বিষণ্নতায়। কমে এসেছে তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা; দেখা দিয়েছে ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতা। তার অভিযোগ, সময়মতো নিবাসের খরচ পরিশোধ করলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। দেখা দিচ্ছে অপুষ্টি।

শুধু নাদিরা নন, নাদিরার মতো পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন লাখও প্রবীণ। সম্প্রতি প্রবীণদের পুষ্টিহীনতা নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) করা এক গবেষণায় এর প্রমাণও মিলছে।

গবেষণা বলছে, দেশে যত প্রবীণ রয়েছে তার এক-চতুর্থাংশ পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। আরও সহজভাবে বললে প্রতি ১০০ জন প্রবীণের মধ্যে পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন ২৫ জন। আর পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছেন অর্ধেকেরও বেশি প্রবীণ।

করোনার মধ্যে নিঃসঙ্গতা ও বিষণ্নতার কারণে প্রবীণদের মধ্যে পুষ্টিহীনতার সংখ্যা আরও বেড়েছে। পুরুষের তুলনায় অপুষ্টিতে ভোগা নারী প্রবীণের সংখ্যা বেশি। এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন বাস্তবতায় বিশ্বজুড়ে আজ, ১ অক্টোবর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২১।

চিকিৎসকরা বলছেন, বিষণ্নতা থেকে অপুষ্টিতে ভুগছেন প্রবীণরা। ফলে কমে আসছে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রমণ রোগ বেশি দেখা দিচ্ছে প্রবীণদের। এমনকি প্রবীণদের কোয়ালিটি অফ লাইফও থাকছে না। তাদের অন্যের ওপরে ভরসা করে জীবন পার করতে হচ্ছে।

দেশের প্রবীণরা কী কী কারণে অপুষ্টিতে ভোগেন তা খুঁজতেই মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাটি চালায়। ঢাকার উত্তরখান উপজেলার মুন্ডা, পোলারটেক ও ভাটুলিয়া গ্রামের ১২৫ জন প্রবীণের মাঝে এই গবেষণা চালায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ ও ইনফরমেটিক্স বিভাগ।

দেশে অর্ধেকের বেশি প্রবীণ পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে

গবেষণা বলছে, দেশে পুষ্টিহীনতার মাত্রা ক্রমেই কমছে। আর এই মাত্রা প্রবীণদের মাঝে উদ্বেগজনক। দেশে বর্তমানে এক-চতুর্থাংশ প্রবীণই ভুগছেন অপুষ্টিতে। সেই সঙ্গে পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছেন অর্ধেকের বেশি প্রবীণ জনগোষ্ঠী।

বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশ ষাটোর্ধ্ব। এর মধ্যে অপুষ্টিতে ভুগছেন ২ শতাংশ প্রবীণ। বিশ্বে অন্যদের তুলনায় প্রবীণদের (ষাটোর্ধ্ব) মধ্যে অপুষ্টি বা পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বেশি।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রবীণের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। ২০৫০ সালে যা সাড়ে ৩ কোটিতে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গবেষণায় বলা হয়, শিক্ষার অভাব, বিষণ্নতা, মুখ ও দাঁতের খারাপ স্বাস্থ্য, বিশেষ খাদ্য পরিহারের অভ্যাস এবং অসংক্রামক রোগের উপস্থিতি পুষ্টিহীনতায় ভোগার প্রধান কারণ। আর এতে পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি ভোগেন। প্রবীণ পুরুষদের অপুষ্টিতে ভোগার হার যেখানে ২২ শতাংশ, সেখানে ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ নারী ভোগেন পুষ্টিহীনতায়।

গবেষণায় এও দেখা যায়, জীবনসঙ্গীবিহীন (বিধবা, বিপত্নীক, অবিবাহিত) প্রবীণদের মাঝে অপুষ্টির হার ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ ও পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি ৬৫ দশমিক ৩ শতাংশ। বিষণ্নতায় ভোগা প্রায় ৪০ শতাংশ প্রবীণ অপুষ্টিতে ভুগছেন। স্বাভাবিকের তুলনায় বিষণ্নতায় ভোগা প্রবীণদের অপুষ্টিতে ভোগার সম্ভাবনা ১৫ দশমিক ৬ গুণ বেশি।

এমন অবস্থায় প্রবীণদের অপুষ্টি দূর করতে পুষ্টিবিষয়ক সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণের পাশাপাশি নারীদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলছেন গবেষকরা। প্রবীণদের সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে তাদের মানসিক ও মুখের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে জোর দেয়া এবং তাদের সঠিক খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিত করা জরুরি মনে করেন গবেষকরা।

গবেষণা দলের প্রধান গবেষক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় পাবলিক হেলথ ও ইনফরমেটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কে এম তৌহিদুর রহমান।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, যারা প্রবীণ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত তারা অপুষ্টিতে বেশি ভোগেন। সেই সঙ্গে যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই তারাও অপুষ্টিতে ভুগছেন বেশি। কারণ এসব শ্রেণির মানুষের পুষ্টি বিষয়ে তেমন ধারণা নেই। এ ছাড়া অনেক সচেতন থাকলেও টাকার অভাবে দেহে পুষ্টি বাড়াতে পারেন না।

দেশে অর্ধেকের বেশি প্রবীণ পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে

এ অবস্থায় করণীয় জানতে চাইলে এই গবেষক বলেন, পুষ্টিহীনতায় ভোগা প্রবীণদের অধিকাংশই প্রান্তিক অঞ্চলের। এই জনগোষ্ঠীর পুষ্টিহীনতা দূর করতে সচেতনতামূলক কর্মশালা প্রয়োজন। প্রবীণদের নারীদের অপুষ্টিতে ভোগার পরিমাণ অনেক বেশি। যে কারণে তাদের বিষয়ে এলাকা গুরুত্ব দিয়ে কর্মসূচি রাখা উচিত। সেই সঙ্গে পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয়ভাবে প্রবীণদের বিষয়ে এখনই ভাবতে হবে।

তৌহিদুর বলেন, ‘এখানে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। ওনারা আমাদের দেশে বড় একটি জনগোষ্ঠী। সমাজ গঠনে তাদের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। ওনাদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে না পারলে তাদের পুষ্টির সমস্যা সমাধান হবে না। পুষ্টিহীনতায় ভোগার কারণে তাদের দেহে অন্যান্য রোগগুলো বেশি দেখা মিলছে। এর মধ্যে কিডনি, হৃদরোগ বেশি দেখা মিলছে। তাদের সঠিক খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিত করতে হবে।’

এই চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ বলছে, করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি মানসিক বিপর্যয়ে ছিলেন প্রবীণরা। এমন পরিস্থিতিতে থাকার কারণে বলাই যায়, করোনা সংক্রমণের কারণে প্রবীণদের মানসিক সমস্যার এই হার আরও বেড়েছে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

দুর্ঘটনায় কেন শুধু চালক দায়ী

দুর্ঘটনায় কেন শুধু চালক দায়ী

সড়ক দুর্ঘটনার দায় চালকের একার নয় বলে মনে করেন বুয়েটের অধ্যাপক শামসুল হক। ফাইল ছবি

বুয়েটের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, ‘চালকেরা বেশি ট্রিপে বেশি রোজগার করতে চায়, কিন্তু তারা বিরতিহীনভাবে চালিয়ে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এক পক্ষকে দায়ী করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে তাতে সিম্পটমের একটা চিকিৎসা হবে, রোগ কিন্তু থেকে যাবে।’

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যেসব ব্যবস্থা দরকার, তা নেয়া হচ্ছে না। তা ছাড়া দুর্ঘটনার জন্য পরিবহন শ্রমিকদের এককভাবে দায়ী ভাবার প্রবণতা রয়েছে। অথচ দুর্ঘটনার জন্য দুর্বল পরিকল্পনাও সমান দায়ী।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক মনে করেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না।

এমন বাস্তবতায় শুক্রবার পালন করা হচ্ছে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘গতিসীমা মেনে চলি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করি।’

এ উপলক্ষে নিরাপদ সড়ক বা সড়কে নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হতে পারে, সে বিষয়ে নিউজবাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন অধ্যাপক শামসুল হক।

প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে মহাসড়কে গাড়িচালকদের বিশ্রাম ও টানা গাড়ি চালানোর সর্বোচ্চ সময় নির্ধারণের কথা বললেও সেটির কোনো বাস্তবায়ন দেখছেন না এ পরিবহন বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলেন, ‘পুরো বিশ্বে হাইওয়েতে (মহাসড়ক) চার ঘণ্টার বেশি টানা গাড়ি চালানো নিষেধ। এতে চালকের অবসাদ চলে আসতে পারে। তার যে মনোযোগ দরকার হয় চলার জন্য, তাতে ঘাটতি পড়তে পারে।

‘চার ঘণ্টা পর ভিন্ন একজন চালক থাকবে। এটা মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরে আছে। আর পশ্চিমা দেশে তো আছেই। বাণিজ্যিক গাড়ি বিরতিহীনভাবে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি চালাতে দেয়া যাবে না।’

এ অধ্যাপক বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী এই দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তবে কাজ হয়নি। এর মানে কী? পুলিশ এখানে কাজ করছে না। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কাজ করছে না। যারা কর্তৃপক্ষ, তারা কাজ করছে না। তার মানে চালকের দায়, পুলিশের দায়, ইঞ্জিনিয়ারের দায়।’

ট্রাফিক ও ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে

সড়কের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিকল্পনা নেয়া হলেও সেটি পরিকল্পিতভাবে নেয়া হয়নি বলে মনে করেন শামসুল হক।

তিনি বলেন, ‘সড়ক ব্যবস্থাপনা ও রোড ট্রাফিক সিস্টেম সুশৃঙ্খল হতে পারত, তবে তা হয়নি। আমি যদি ঢাকার কথাই বলি, ঢাকায় গণপরিবহনের যে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি, সেটা যদি আমরা করে ফেলতে পারতাম, তবে ঠিক হয়ে যেত।’

এ অধ্যাপক বলেন, ‘কিছু কাজ করতে দরদ লাগবে। এই যে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি, এটাতে তো পয়সা লাগে না। এটা রেগুলেশন। এটা এনফোর্সমেন্ট। এখানে তো পয়সা নাই বলতে পারবে না। এখানেই আমাদের অবহেলা।’

ঢাকার রাস্তায় ফ্র্যাঞ্চাইজি বাস বা ‘এক রুটে এক বাস কোম্পানি’ পদ্ধতি চালু হলে অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি হলে বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমে যাবে। হুড়োহুড়ি করতে গিয়েই ঢাকায় অনেক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা ঘটে বলে মনে করা হয়।

মহাসড়কের পরিকল্পনা

দেশের মহাসড়কগুলোতে বিশৃঙ্খলা রয়েছে আর সেটির জন্য ছোট পরিবহন ও গাড়ির ফিটনেসকে দায়ী করেন শামসুল হক।

তিনি বলেন, ‘আমি যদি হাইওয়েতে ফিট গাড়ি না চালাই, অবৈধ গাড়ি যদি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তবে দুর্ঘটনা ঘটবে।’

দুর্ঘটনায় কেন শুধু চালক দায়ী

এ ক্ষেত্রে তিনি হাইকোর্ট ও সরকারের দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সব জায়গা থেকে দিকনির্দেশনা আছে যে, আঞ্চলিক ও মহাসড়কে কোনো নছিমন, করিমন বা ভটভটি গাড়ি চলবে না।’

এ ক্ষেত্রে গতির বিশৃঙ্খলা হয়ে থাকে জানিয়ে শামসুল হক বলেন, ‘দ্রুতগতির সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের ধীরগতির গাড়িগুলো চলাচল করে। ওই ড্রাইভারের কিন্তু রোডের কোনো সেন্স নাই। তাকে যদি রোডে এভাবে বিশৃঙ্খলা করার সুযোগ দিই, তাহলে তো দুর্ঘটনা ঘটবে। আমরা কি এত দিকনির্দেশনার পরেও কিছু করেছি? করিনি।’

বিআরটিএ তার কাজ ঠিকমতো করে না বলে মনে করেন শামসুল হক। তিনি বলেন, ‘হাইওয়েতে যাদের চলার কথা না তারা চলছে। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে। আমরা যে গাড়িগুলোকে ফিট বলব, বিআরটিএর যে ফিটনেস সনদ ব্যবস্থা, সেটি পরিহাস ছাড়া কিছুই না।

‘একটা গাড়ির ৪২টা আইটেম দেখে তাকে চলার যোগ্যতার সার্টিফিকেট দেয়া সহজ কথা নয়। তবে এত কমসংখ্যক ইন্সপেক্টরে এত বিপুলসংখ্যক গাড়ির ইন্সপেকশন সম্ভব হওয়ার কথা না, যার ফলে আনফিট গাড়ি চলছে।’

দুর্ঘটনায় কেন শুধু চালক দায়ী

চালকের প্রশিক্ষণ ঘাটতি রয়েছে বলে জানান শামসুল হক। তিনি বলেন, ‘চালক প্রশিক্ষণের যে পদ্ধতি, সেটি ঠিক নেই। একটা চালককে হাইওয়েতে নামানোর আগে তার প্র্যাকটিক্যাল (ব্যবহারিক) যে পরীক্ষা হওয়ার কথা, সেটা হচ্ছে না। সারা বিশ্বে প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ার একটা স্ট্যান্ডার্ড আছে। আমরা তার ধারেকাছে নাই।’

সরকার উন্নয়নকেন্দ্রিক চিন্তা করলেও সড়ক নিরাপত্তার ব্যাপারে পরিকল্পিত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে মনে করেন তিনি।

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমরা মৌসুমি কিছু কাজ করি। কিন্তু সিস্টেমের দিকে তাকাই না। আমাদের উন্নয়ন হচ্ছে রক্তক্ষরণের উন্নয়ন। এতে অনেক মানুষ হতাহত হচ্ছে। অনেক পরিবার একসাথে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রকল্প হবে, তবে সিস্টেমের কোনো উন্নয়ন হবে না। তাই টেকসইভাবে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে গেলে বিজ্ঞান যেটা বলছে সিস্টেমকেন্দ্রিক, সেটা করতে হবে। কিন্তু আমাদের করার মতো প্রতিষ্ঠান নেই। তাদের দায়বদ্ধ করার মতো অভিভাবক নেই। তাই আমরা এর থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছি না।’

রাস্তায় সার্বক্ষণিক নজরদারি

রাস্তায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়াতে হবে বলে জানান শামসুল হক।

তিনি বলেন, ‘চোর-পুলিশ খেলে এনফোর্সমেন্ট হবে না। ২৪ ঘণ্টা রাস্তায় থাকতে হবে। উন্নত বিশ্বে চালক নিজের গাড়ি নিজে চালাচ্ছে, তাদের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত, তারপরও তারা রাস্তা থেকে পুলিশ ছাড়িয়ে নিচ্ছে না। কারণ মানুষ জন্মগতভাবে সুযোগসন্ধানী। একজনের অপব্যবহার দেখে আর একজন করবে। আমাদের এখানে কিছুদিনের হেডলাইন তৈরি হলে বা কোনো দুর্ঘটনা হলে নড়েচড়ে বসে। এরপর আর খবর নেই।’

দুর্ঘটনায় দায় কার

দেশে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ঢালাওভাবে পরিবহন শ্রমিকদের দায়ী করা হয়। দুর্ঘটনা ঘটার পরপরই তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলে। এ নিয়ে সাধারণ পরিবহন শ্রমিকেরা বিভিন্ন সময় আন্দোলন করছে।

এ বিষয়ে শামসুল হক বলেন, ‘আমি বলব, পরিবহন এমন একটা ব্যবস্থাপনা, যেখানে পলিসি লেভেলে যারা পলিসি তৈরি করেন, যারা সড়কের পরিকল্পনা করেন, ডিজাইন যারা করেন, রক্ষণাবেক্ষণ করেন, নিয়ন্ত্রণ করেন এবং গাড়ির মালিক যারা, চালক যারা, ব্যবহারকারী যারা, সামগ্রিক যে বিন্যাস আছে, এখানে সবার দায়বদ্ধতা আছে।’

তিনি বলেন, ‘পরিকল্পনায় ঘাটতি থাকলে দুর্ঘটনা হবে। আমি সড়কের জন্য চমৎকারভাবে পরিকল্পনা করলাম, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ করলাম না। তাহলে দুর্ঘটনা ঘটে গেল।’

মালিকের দায়িত্ব সম্পর্কে এ অধ্যাপক বলেন, ‘চালক যদি টায়ার বদলাতে বলে, মালিক বলেন, এটা দিয়েই চালাতে হবে; না হলে আর একজন চালক নিয়ে আসব। এই মালিক দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিল। অথচ দুর্ঘটনা ঘটলে সব দায় চালকের ওপর চলে যায়।’

তিনি বলেন, ‘চালকেরা বেশি ট্রিপে বেশি রোজগার করতে চায়, কিন্তু তারা বিরতিহীনভাবে চালিয়ে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এক পক্ষকে দায়ী করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে তাতে সিম্পটমের একটা চিকিৎসা হবে, রোগ কিন্তু থেকে যাবে। আইন করতে হবে সর্বজনীন আইন। আমাদের আইন এখনও চালকসর্বস্ব।

‘শুধু একজনকে দায়ী করে আইন করা যাবে না। চালক দেখছে, আরও অনেকের ঘাটতি আছে, কিন্তু তাদের কোনো শাস্তি বা জবাবদিহি করা হচ্ছে না। এতে তারাও মানতে চাইবে না। আন্দোলন হবে।’

পরিকল্পনাকারীদের দায় আছে

শুধু চালক নয়, বরং পরিবহন ব্যবস্থার যারা পরিকল্পনা করেন, দুর্ঘটনার উচ্চ হারের জন্য তারাও সমান দায়ী বলে মনে করেন শামসুল হক।

তিনি বলেন, ‘আমি বলব, পরিকল্পনায় যারা আছেন, তাদের ভুলের কারণে যখন দুর্ঘটনা হয়, সেটা কিন্তু বড় একটা বিষয়। তাদের অজ্ঞতার কারণে যে দুর্ঘটনা ঘটে, তাতে চালককে তো আমি শাস্তি দিতে পারি না।

‘উন্নত বিশ্বে হলে পরিকল্পনা পর্যায়ে যাওয়া হয়। আর আমরা কিন্তু তাৎক্ষণিক বিষয়ে থাকি। এটাতে সিস্টেম ঠিক হবে না। যে দুর্ঘটনা পরিকল্পনার ঘাটতির জন্য হয়, তাকেও কিন্তু জেল-জরিমানা করতে হবে। দুর্ঘটনা হলে তারা এসি রুমে বসে থাকে। পুলিশ আর ড্রাইভার হলো ভিজিবল ফোর্স। সব রোষানল পড়ছে সেখানে।’

শেয়ার করুন

কুমিল্লার সেই মসজিদের বারান্দায় আর কোরআন রাখা হবে না

কুমিল্লার সেই মসজিদের বারান্দায় আর কোরআন রাখা হবে না

শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারের মসজিদ। ফাইল ছবি

দারোগাবাড়ী জামে মসজিদের পেশ ইমাম ইয়াছিন নূরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা তো বুঝতে পারিনি কেউ এখান থেকে কোরআন শরিফ নিয়ে এমন কাজ করবে। আগামী দিনে আমরা সতর্ক থাকব। মসজিদের বারান্দায় আর কোরআন শরিফ রাখব না।’

কুমিল্লার একটি মাজারের মসজিদ থেকে কোরআন শরিফ এনে পাশের পূজামণ্ডপে রাখার ঘটনা ধরা পড়ার পর ওই মাজারের কর্তৃপক্ষ বলছে, ভবিষ্যতে তারা আর মসজিদের বারান্দায় অরক্ষিত অবস্থায় কোরআন শরিফ রাখবে না।

কুমিল্লা নগরীর নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে গত ১৩ অক্টোবর ভোরে হনুমানের মূর্তির ওপর পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা।

ওই মণ্ডপের পাশাপাশি আক্রান্ত হয় নগরীর আরও বেশ কিছু পূজামণ্ডপ। পরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়।

যেখান থেকে সাম্প্রদায়িক এই সহিংসতার শুরু, সেই নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে কীভাবে উত্তেজনার শুরু এবং মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর পবিত্র কোরআন শরিফ কী করে এলো, সে বিষয়ে মঙ্গলবার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউজবাংলা।

আরও পড়ুন: কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন রাখল কারা

সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার জানা যায়, নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রেখেছিলেন ইকবাল হোসেন নামের স্থানীয় এক যুবক। সহিংসতার আগের রাতে তিনি কোরআনটি নিয়েছিলেন মণ্ডপের পাশের শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারের মসজিদের বারান্দা থেকে।

কুমিল্লার সেই মসজিদের বারান্দায় আর কোরআন রাখা হবে না
প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন মাজারের মসজিদ থেকে কোরআন শরিফ নিয়ে রওনা হন মণ্ডপের দিকে। সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেয়া ছবি

ইকবাল রাত ২টা ১০ মিনিটের দিকে কোরআন শরিফটি হাতে নিয়ে মণ্ডপের দিকে রওনা হন। এরপর মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর কোরআন রেখে ফিরে আসেন। এসব দৃশ্য ধরা পড়েছে ওই এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরায়।

আরও পড়ুন: মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল

নানুয়ার দিঘির পাশেই শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারটির অবস্থান। মণ্ডপ থেকে হেঁটে যেতে সময় লাগে ২ থেকে ৩ মিনিট। দারোগাবাড়ী মাজার নামে কুমিল্লাবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি রয়েছে মাজারটির। এই মসজিদের বারান্দায় তিলাওয়াতের জন্য রাখা থাকে বেশ কয়েকটি কোরআন শরিফ। রাত-দিন যেকোনো সময় যে কেউ এখানে এসে তিলাওয়াত করতে পারেন।

কুমিল্লার সেই মসজিদের বারান্দায় আর কোরআন রাখা হবে না
প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন

ইকবালের বিষয়ে জানতে বুধবার রাতে দারোগাবাড়ী জামে মসজিদের পেশ ইমাম ইয়াছিন নূরীকে ফোন করা হলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। তবে সিসিটিভি ফুটেজ দেখিনি।’

আরও পড়ুন: পাশের মসজিদ থেকে কোরআন এনে মণ্ডপে রাখেন ইকবাল

মসজিদের বারান্দায় পবিত্র কোরআন শরিফ রাখার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেকেই মাজারে এসে কোরআন শরিফ দিয়ে যান। এসব কোরআন শরিফে মসজিদের ভেতরের সেলফ পূর্ণ হয়ে গেছে। তাই কিছু কোরআন শরিফ বারান্দায় রাখা হয়েছিল। তাছাড়া বারান্দায় রাখলে যেকোনো সময় যে কারও জন্য তিলাওয়াতেরও সুবিধা হয়।

‘আমরা তো বুঝতে পারিনি কেউ এখান থেকে কোরআন শরিফ নিয়ে গিয়ে এমন কাজ করবে। আগামী দিনে আমরা সতর্ক থাকব। মসজিদের বারান্দায় আর কোরআন শরিফ রাখব না।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, প্রধান অভিযুক্ত ইকবালের সহযোগী অন্তত চারজন এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তদন্তকারীরা মনে করছেন, ইকবাল গ্রেপ্তার হলেই এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

শেয়ার করুন

বাবার আগেই জন্ম ছেলের

বাবার আগেই জন্ম ছেলের

জামাত আলী ও তার ছেলে মনিরুল ইসলামের জাতীয় পরিচয়পত্র। ছবি: নিউজবাংলা

জামাত আলী বলেন, ‘আমার প্রকৃত জন্মতারিখ ৪ আগস্ট ১৯৫৭। জাতীয় পরিচয়পত্রে যে জন্মতারিখ আছে সে হিসাবে আমার বয়স মাত্র ৪৪ বছর। ছেলের থেকে আমার বয়স ৬ বছর কম।’

জাতীয় পরিচয়পত্রে লেখা জামাত আলীর জন্ম ১৯৭৭ সালের ৪ আগস্ট। আর তার ছেলের জন্ম ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর।

বাবা-ছেলের জাতীয় পরিচয়পত্রের এই তথ্য বলছে, বাবার চেয়ে ছেলে ৬ বছরের বড়। তথ্য ভুল হওয়ায় কোনো কাজেই এই পরিচয়পত্র ব্যবহার করতে পারছেন না জামাত আলী।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনেক আগে যারা ভোটার হয়েছেন তাদের তথ্যগত ত্রুটির কারণে এমন হতে পারে।

জামাতের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের শ্রীরামপুর গ্রামে।

তিনি বলেন, ‘আমার প্রকৃত জন্মতারিখ ১৯৫৭ সালের ৪ আগস্ট। জাতীয় পরিচয়পত্রে যে জন্মতারিখ আছে সে হিসেবে আমার বয়স মাত্র ৪৪ বছর। ছেলের থেকে আমার বয়স ৬ বছর কম।

‘বয়স কম হওয়ায় খুব সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। ওই জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে কোনো কাজ করতে পারছি না। বয়স্ক ভাতার কার্ডসহ সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি না।’

জামাত আলী বলেন, ‘আমার প্রকৃত জন্মতারিখ ৪ আগস্ট ১৯৫৭। জাতীয় পরিচয়পত্রে যে জন্মতারিখ আছে সে হিসাবে আমার বয়স মাত্র ৪৪ বছর। ছেলের থেকে আমার বয়স ৬ বছর কম।

বাবার আগেই জন্ম ছেলের

তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের জন্য জীবননগর উপজেলা নির্বাচন অফিসে গিয়েছি। সংশোধন করতে সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন তারা।’

এ বিষয়ে জীবননগর উপজেলা নিবার্চন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) কামরুল হাসান বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো আবেদন করেননি জামাত। আবেদন করলে অবশ্যই সংশোধন করে দেয়া হবে।’

এমন ভুল কী করে হলো জানতে চাইলে তিনি বলে, ‘মূলত ২০০৯ সালের আগে যারা ভোটার হয়েছেন তাদের তথ্যগত ত্রুটির জন্য সমস্যা হতে পারে। তবে আমরা চেষ্টা করছি সমস্যার সমাধান করার।’

শেয়ার করুন

জনসংখ্যা ১৭ কোটি, জন্মনিবন্ধন সাড়ে ১৮ কোটি

জনসংখ্যা ১৭ কোটি, জন্মনিবন্ধন সাড়ে ১৮ কোটি

পরিকল্পিত অর্থনীতির জন্য সঠিক জনসংখ্যা হিসাব অপরিহার্য। ছবি: সাইফুল ইসলাম/নিউজবাংলা

নিবন্ধকের কার্যালয় বলছে, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কার্যক্রমের দুর্বলতা এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। এ ছাড়া দ্বৈত নিবন্ধন, মৃত ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন বাতিল না করাসহ বিভিন্ন কারণে হিসাবে গড়মিল হয়।

দেশে এ পর্যন্ত জন্মনিবন্ধন হয়েছে সাড়ে ১৮ কোটির বেশি। আবার সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটির কম। এ হিসাবে দেশে জনসংখ্যার চেয়ে জন্মনিবন্ধনকারীর সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি বেশি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিকল্পিত অর্থনীতির জন্য সঠিক পরিসংখ্যান অপরিহার্য। সঠিক, সময়োপযোগী এবং মানসম্মত পরিসংখ্যান দেশের পরিকল্পনা প্রণয়ন, উন্নয়ন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে বড় ভূমিকা রাখে।

জনশুমারি, কৃষিশুমারি, অর্থনৈতিক শুমারিসহ নানা জরিপে উঠে আসে বিভিন্ন পরিসংখ্যান। হালনাগাদ পরিসংখ্যানের জন্য সরকারের অন্যতম ভরসার জায়গা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এসডিজির ২৩১টি সূচকের মধ্যে ১০৫টির উপাত্তেই ভরসা বিবিএস।

এ পরিস্থিতিতে বুধবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস।

বিবিএসের ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্টাটিস্টিকস ২০২০’-এর তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের সর্বশেষ হিসাবে দেশে জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ৯১ লাখ ১ হাজার।

এদিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন’ বলছে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট জন্মনিবন্ধনের সংখ্যা ১৮ কোটি ৫৯ লাখ ৩৯ হাজার ৪০০। আর মৃত্যুনিবন্ধনের সংখ্যা মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার।

কেন এ পার্থক্য

নিবন্ধকের কার্যালয় বলছে, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কার্যক্রমের দুর্বলতা এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। এ ছাড়া দ্বৈত নিবন্ধন, মৃত ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন বাতিল না করাসহ বিভিন্ন কারণে হিসাবে গড়মিল হয়। সংকট সমাধানে নতুন সফটওয়্যারে পুরোনো তথ্য স্থানান্তর হচ্ছে। এতে আবার অনেকেরই পূর্বের নিবন্ধন তথ্য হারিয়ে যাচ্ছে।

সাধারণত জন্মনিবন্ধনের সংখ্যা থেকে মৃত্যুনিবন্ধনের সংখ্যা বাদ দিলে দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা বের হওয়ার কথা। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই তথ্যের দুর্বলতায় এখন প্রকৃত সংখ্যা জানা যাবে না।

বর্তমানে জরুরি ১৮টি সেবা পেতে জন্মনিবন্ধন সনদ প্রয়োজন। দেশে ২০১০ সালে অনলাইনে জন্মনিবন্ধন শুরু হয়। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন অনুযায়ী জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করার বাধ্যবাধকতা আছে, কিন্তু এ হার খুবই কম।

দুর্বল সফটওয়্যার, দক্ষ লোকবলের অভাবসহ নানা সংকটে একই ব্যক্তির একাধিকবার নিবন্ধনের সুযোগ তৈরি হয়। এসব বিষয়ে অসংগতি দূর করতে পুনরায় অনলাইনে জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যাদের নিবন্ধন অনলাইনে হয়নি, তাদের আবারও নিবন্ধন করতে হচ্ছে।

রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয় বলছে, বর্তমানে দেশ ও দেশের বাইরে মিলিয়ে ৫ হাজারের বেশি জায়গা থেকে জন্মনিবন্ধন করা হচ্ছে। এর মধ্যে দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের পাশাপাশি বিদেশের বাংলাদেশি মিশনও রয়েছে।

এসব সংস্থার মধ্যে এতদিন কোনো সমন্বয় ছিল না। এক স্থানের তথ্য অন্য স্থানে যাচাই করার উপায় ছিল না। এ জন্য অনেক দ্বৈত নিবন্ধন রয়ে গেছে। কোনো সমস্যায় পড়লে বা কোনো তথ্য সংশোধন করতে হলেও অনেকে ঝামেলা এড়াতে নতুন করে নিবন্ধন করেছেন। আবার অনেক সময় অপারেটর নিজেও ঝামেলায় না গিয়ে গ্রাহককে নতুন করে নিবন্ধন করিয়ে দিয়েছেন। অনেকে জানেন না তাদের নামে কতটি নিবন্ধন রয়েছে।

অপর দিকে মৃত্যুনিবন্ধনের ক্ষেত্রে মানুষের কোনো আগ্রহ নেই। একান্ত প্রয়োজন না হলে সবাই তা এড়িয়ে যায়। একমাত্র ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারসংক্রান্ত কোনো সমস্যায় পড়লেই কারও ওয়ারিশানরা মৃত্যুনিবন্ধন করিয়ে নিচ্ছেন। যেসব জায়গা থেকে নিবন্ধন করা হয় সেসব স্থান থেকেই এগুলোর দ্বৈততা পরিহার করতে হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে সেগুলো যাচাইয়ের তেমন সুযোগ নেই। কেবল কেউ নতুন করে নিবন্ধন করতে গেলেই তার ক্ষেত্রে দ্বৈততা যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে।

‘রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন’-এর ডেপুটি রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. ওসমান ভূইয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘অনেকের একাধিক জন্ম নিবন্ধনও রয়েছে। এমনকি তিনটাও আছে কারও কারও। এতে প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে নিবন্ধন বেশি দেখাতে পারে।

‘তবে নতুন অনলাইন নিবন্ধন চালুর পর থেকে দ্বৈত নিবন্ধনের সুযোগ নেই বললেই চলে। একই ধরনের তথ্য দিয়ে নিবন্ধন করতে চাইলে সার্ভারে আগের নিবন্ধনের তথ্য ভেসে উঠছে।

‘জন্মনিবন্ধনের জন্য অনেক জায়গায় আটকে যেতে হচ্ছে। কিন্তু মৃত্যুনিবন্ধনের জন্য তা হচ্ছে না। এ জন্য মৃত্যুনিবন্ধন একেবারেই কম হচ্ছে। তাই সঠিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘দ্বৈত নিবন্ধন যাচাইয়ে আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি। যেসব প্রান্ত থেকে নিবন্ধন করা হয়, সেসব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ছাড়া একাধিক নিবন্ধনের তথ্য খুঁজে বের করার পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে। পরে যেকোনো একটি রেখে অন্যগুলো বাতিল করা হবে।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. এম নুরুল ইসলাম নিউজবাংলা বলেন, ‘পরিসংখ্যান বা তথ্যের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বিবিএস। সঠিক পরিসংখ্যান অর্থনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে দক্ষ পরিকল্পনাসহ নানা পদক্ষেপের জন্য একান্ত অপরিহার্য।

‘আমাদের কিছু ক্ষেত্রে তথ্যের অভাব রয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তবে কিছুটা পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কারণ একেক সংস্থার হিসাবের ধরন একেক রকম। তবে আগের চেয়ে আমাদের পরিসংখ্যান আরও উন্নত হয়েছে। আর জনসংখ্যার প্রকৃত তথ্য জানার একমাত্র উপায় জনশুমারি, কিন্তু এটি প্রতি দশ বছর পরপর করা হয়। অন্যান্য সময় এ তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই প্রাক্কলন করা হয়। এ জন্য তথ্যের কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে। তবে পরিসংখ্যান যত সঠিক হবে, পরিকল্পনা তত ফলপ্রসূ হবে।’

শেয়ার করুন

শিক্ষার্থীরা ইউনিক আইডি পাবে কবে?

শিক্ষার্থীরা ইউনিক আইডি পাবে কবে?

প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মৌলিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য এক জায়গায় রাখার জন্য তৈরি করা হচ্ছে ইউনিক আইডি। শিক্ষার্থীর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হলে এই আইডি জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) রূপান্তরিত হবে।

দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর জন্য একটি ‘ইউনিক আইডি’ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মৌলিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত সব তথ্য থাকবে। কিন্তু করোনা মহামারিতে দীর্ঘদিন স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকা এবং কিছু আইনি জটিলতায় স্থবির হয়ে পড়ে এ কার্যক্রম।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবার পুরোদমে শুরু হয়েছে শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরির কার্যক্রম। তাদের আশা, আগামী বছরের শুরুতে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ১ কোটি ৬০ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেয়া সম্ভব হবে ইউনিক আইডি।

প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরির জন্য বিদ্যালয় পর্যায়ে ডাটা এন্ট্রি দেয়া শুরু হবে আগামী মাসে। প্রথম ধাপে পাইলটিং হিসেবে ৮০টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরি করা হবে। সেটি সফল হলে ধাপে ধাপে সব শিক্ষার্থীকে এর আওতায় আনা হবে।

জানতে চাইলে মাধ্যমিক পর্যায়ের ইউনিক আইডির প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক মো. শামসুল আলম বলেন, ‘ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি প্রদানের কার্যক্রম করোনা পরিস্থিতি ও কিছু আইনি জটিলতায় আটকে ছিল। এখন সব ধরনের সমস্যার সমাধান হয়েছে। আশা করছি, আগামী বছরের শুরুতেই পর্যায়ক্রমে ১ কোটি ৬০ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে ইউনিক আইডি তুলে দেয়া সম্ভব হবে।’

ইউনিক আইডি তৈরি কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহের কাজ শেষ পর্যায়ে। খুব শিগগির শুরু হবে ডাটা এন্ট্রির কাজ। এরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হতে থাকবে ইউনিক আইডি। তখন সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেখতে পাবে, তাদের কত শিক্ষার্থীর ইউনিক আইডি তৈরি হলো। এরপর আমরা পর্যায়ক্রমে ইউনিক আইডি ছাপিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করব।’

জন্মনিবন্ধন সনদ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করতে পারছে না, এ ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে শামসুল আলম বলেন, ‘যেসব শিক্ষার্থীর ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন আছে, তাদের অভিভাবকদের শুধু এনআইডি (জাতীয় পরিচয়পত্র) থাকলেই হবে। তবে যেসব শিক্ষার্থীর ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন নেই, তাদের অভিভাবকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও জন্মনিবন্ধন দুটিই লাগবে। আইনগত কারণে এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া সম্ভব নয়।’

প্রাথমিকের ডাটা এন্ট্রি শুরু আগামী মাসে

প্রাথমিকের ২ কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীর ইউনিক আইডি তৈরির কাজ করছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এ জন্য ডাটা এন্ট্রির সফটওয়্যার তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। আশা করা হচ্ছে, আগামী মাস থেকে ডাটা এন্ট্রি দেয়া শুরু হবে।

জানতে চাইলে প্রাথমিকের ইউনিক আইডির প্রকল্প পরিচালক মো. মঞ্জুরুল আলম প্রধান বলেন, ‘প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরির জন্য বিদ্যালয় পর্যায়ে আগামী মাস থেকে সফটওয়্যারে ডাটা এন্ট্রি শুরু হবে। এ জন্য সফটওয়্যার তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। এরপর পাইলটিং হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানের ৮০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরি করা হবে। এরপর সেটি সফল হলে পুরোদমে শুরু হবে কাজ।’

কবে নাগাদ পাইলটিং শুরু হবে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট করে সময় বলা সম্ভব নয়। আশা করছি, আগামী মাসে ডাটা এন্ট্রি শুরু হলে খুব শিগগির পাইলটিং শুরু হবে।’

ইউনিক আইডি কেন?

প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মৌলিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য এক জায়গায় রাখার জন্য তৈরি করা হচ্ছে ইউনিক আইডি। শিক্ষার্থীর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হলে এই আইডি জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) রূপান্তরিত হবে।

ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরির দায়িত্বে আছে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইজ)। আর প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরি করছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

কেন শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিক আইডি তৈরি করা হচ্ছে, এমন প্রশ্নে প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করলেই সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগের অফিস অফ রেজিস্ট্রার জেনারেলের আওতায় তার জন্মনিবন্ধন হয়। আর ১৮ বছর পূর্ণ হওয়া সবার জন্য আছে জাতীয় পরিচয়পত্র। কিন্তু যারা প্রাইমারি, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী, অর্থাৎ যাদের বয়স ১৮-এর নিচে তারা এই সিস্টেমের বাইরে। এ জন্য তাদের সিস্টেমের মধ্যে আনতেই ইউনিক আইডি তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’

ফরমে যেসব তথ্য দিতে হয়

স্ট্যাবলিশমেন্ট অফ ইন্টিগ্রেটেড এডুকেশনাল ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আইইআইএমএস) প্রকল্পের আওতায় তৈরি করা চার পৃষ্ঠার ফরমে শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

ফরমে শিক্ষার্থীর নাম, জন্মনিবন্ধন নম্বর, জন্মস্থান, জেন্ডার, জাতীয়তা, ধর্ম, অধ্যয়নরত শ্রেণি, রোল নম্বর, বৈবাহিক অবস্থা, প্রতিবন্ধিতা (ডিজঅ্যাবিলিটি), রক্তের গ্রুপ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কি না, মা-বাবার নামসহ বেশ কিছু তথ্যের ঘর রয়েছে।

বৈবাহিক অবস্থার অপশন হিসেবে অবিবাহিত, বিবাহিত, বিধবা, বিপত্নীক ছাড়াও স্বামী-স্ত্রী পৃথক বসবাস, তালাকপ্রাপ্ত, বিবাহবিচ্ছেদের ঘরও রয়েছে ফরমে।

শেয়ার করুন

গ্রামের নারীরা শহরমুখী কেন

গ্রামের নারীরা শহরমুখী কেন

গ্রামের নারীদের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা বেড়েই চলছে। ছবি: সংগৃহীত

গ্রামীণ নারীদের শহরমুখী হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এর মধ্যে নারীর কাজের মূল্যায়ন না করাটাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন তারা।

মোহাম্মদপুর কাদেরাবাদ হাউজিংয়ের ৫ নম্বর রোডের মুখে শীতকালীন পিঠা বিক্রি করেন রেজিয়া সুলতানা। বিকেল ৫টা থেকে বিক্রি শুরু হয়ে চলে রাত ১১টা; আবার কখনও তার থেকেও বেশি। হাউজিংয়ের সবাই রেজিয়ার কাছ থেকে পিঠা নেন। প্রতিদিনে তার বিক্রি বেশ ভালোই।

বগুড়ার তারাকান্দির মেয়ে রেজিয়া। স্বামী শহরে রিকশা চালাতেন। তিনি গ্রামে শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে থাকতেন। কৃষিকাজে দেবরকে সহযোগিতা করতেন। মাস ছয় হলো তিনি স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় চলে এসেছেন।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘গেরামে ধরেন, ভোর রাইত্তে ধইরা মাঝ রাইত পর্যন্ত কাম করতাম। এত জনের রান্ধা-বান্ধা, হাঁস-মুরগি। আবার মাঠের কাম। এত কিছু কইরাও অশান্তির শেষ আছিল না। জামাই যাইত মাসখানেক পরে পরে।

‘আমগোর গেরামের তানিয়া ঢাকায় থাকে। হের কথা হুইনা ঢাকাত আইছি জোর কইরা। এইহানে আমি অনেক বাসায় কাম করি। এই যে পিঠা বেচি। আল্লাহর রহমতে রাকিবের আব্বার থিকা বেশি আয় আমার মাসে। আমার টেকা এখন শ্বশুরবাড়িতেও যায়। এহন বুঝি যে নিজের একটা দাম আছে।'

রেজিয়া সুলতানার মতো এমন অনেক গ্রামীণ নারী শহরের দিকে ঝুঁকছেন। দিন দিন এর পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এই গ্রামীণ নারীদের শহরমুখী হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এর মধ্যে নারীর কাজের মূল্যায়ন না করাটাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন তারা।

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী; আর তার ৮৬ শতাংশের বাস গ্রামে। গবেষণায় দেখা যায়, গ্রামীণ নারীরা দিনের মোট সময়ের ৫৩ শতাংশ ব্যয় করে কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প ক্ষেত্রে, যেখানে পুরুষরা ব্যয় করে ৪৭ শতাংশ সময়।

‘গ্রামীণ জীবনযাত্রায় স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচার অভিযান’-এর ২০১২ সালের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের মোট নারী শ্রমশক্তির পরিমাণ ১ কোটি ৬২ লাখ। এর মধ্যে ৭৭ শতাংশ গ্রামীণ নারী। এর ৬৮ শতাংশ কৃষি, পোলট্রি, বনায়ন ও মৎস্য খাতের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রামীণ ৪১ শতাংশ নারী আলু চাষের সঙ্গে জড়িত। ৪৮ শতাংশ জড়িত মাছ চাষের সঙ্গে।

কৃষি খাতেই নারীর অংশগ্রহণ এখনও বেশি। বীজ সংরক্ষণ থেকে শুরু করে ফসল উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং বিপণন পর্যন্ত বিভিন্ন কাজেই নারী অংশগ্রহণ করছে।

তারপরও তাদের এই অংশগ্রহণকে ‘পারিবারিক সহযোগিতা’ হিসেবে দেখা হয়ে থাকে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যথাযথ মূল্যায়নের অভাবে গ্রামীণ নারীরা শহরমুখী হচ্ছে। কৃষিতে নারীরা অধিক হারে অংশগ্রহণ করলেও কৃষক হিসেবে পরিবারে তাদের মূল্যায়ন করা হয় না এবং সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয় না। তাদের অংশগ্রহণকে ধরা হয় পারিবারিক সহযোগিতা হিসেবে। কৃষি থেকে পারিবারিক আয়ে নারীদের ভাগ থাকে না। কৃষিতে নারীর কাজ হচ্ছে অবৈতনিক, কারণ এটিকে পারিবারিক শ্রম গণ্য করা হয়।’

নারীর শহরমুখী হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি আরও বলেন, ‘কৃষিঋণসহ সব সরকারি সুযোগ-সুবিধা নারী কৃষকরা পান না। তা ছাড়া ভূমিতে নারীর সম-অধিকার নেই। বাজারে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও নারীরা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। তাদের জন্য বাজারে আলাদাভাবে কোনো জায়গা নির্দিষ্ট করে রাখলে তাদের পণ্য বাজারজাতের সুবিধা বাড়বে। তাদের এখনও নিজেদের পণ্য বিক্রির জন্য স্বামীর নামে দোকান বরাদ্দ করতে হচ্ছে।

‘গ্রামীণ অগ্রগতিকে আরও এগিয়ে নিতে হলে তাদের জন্য একদিকে দরকার উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। তাদের সঠিক মূল্যায়ন করা হলে তারা শহরমুখী না হয়েই নিজ নিজ গ্রামেই কর্মসংস্থানের সুযোগ নিজেরাই গড়ে তুলবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ফাতেমা রৌসন জাহান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গ্রামীণ নারীদের শহরমুখী হওয়াটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। গ্রামে নারীদের হাড়ভাঙা শ্রমকে শুধু পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ফেলে রাখা হয়। এটা আসলে নারীর অগ্রগতির ক্ষেত্রে অনেক বড় একটা বাধা। যেকোনো শ্রমকে মূল্যায়ন করা উচিত। তা ছাড়া কাজের সেই সুযোগ বা জায়গা সেটিও নারীর জন্য স্পেসিফাইড না। আরও নানা কারণ রয়েছে, তবে এই যে অবমূল্যায়ন করার যে ব্যাপারটা, সেটাই আসলে মুখ্য কারণ নারীদের শহরমুখী হওয়ার।

আজ বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য: ‘সবার জন্য ভালো খাদ্য চাষ করেন গ্রামীণ নারী’। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালনে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও উন্নয়ন সংস্থা।

পরিবার ও সমাজে গ্রামীণ নারীর অবস্থানের মূল্যায়ন করার লক্ষ্যে ২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভায় ১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

এর আগে ১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের চতুর্থ নারী সম্মেলনে ১৫ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৯৭ সাল থেকে জেনেভাভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা উইমেনস ওয়ার্ল্ড সামিট ফাউন্ডেশন দিবসটি পালনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি পালন করে।

শেয়ার করুন

মুসা বিন শমসেরের সম্পদ ‘কেবল পৈতৃক ভিটা’

মুসা বিন শমসেরের সম্পদ ‘কেবল পৈতৃক ভিটা’

সম্প্রতি ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন মুসা বিন শমসের। ছবি: নিউজবাংলা

দুদকের কাছে মুসা যেসব সম্পদের তালিকা দিয়েছিলেন, তার কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেবল ফরিদপুরে তার বাবার করা বাড়িতে তার অংশ পাওয়া গেছে। তিনি বনানী ও গুলশানের যে বাড়ির কথা উল্লেখ করেছেন, তার একটি ভাড়া করা, আরেকটি স্ত্রীর। সুইস ব্যাংকে কথিত অর্থের খোঁজ করার চেষ্টা করে এমন কোনো তথ্য পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।

ফরিদপুরে পৈতৃক ভিটা ছাড়া আলোচিত চরিত্র মুসা বিন শমসেরের কোনো সম্পদের খোঁজ পায়নি দুর্নীতি দমন কমিশন। ‘মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতারণা ও হয়রানির’ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করতে যাচ্ছে সংস্থাটি।

দুদকের মহাপরিচালক সাঈদ মাহবুব খান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মুসা বিন শমসেরের বিরুদ্ধে আমাদের তদন্ত চলছে। শিগগিরই তদন্ত শেষ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

দুদকের এই অনুসন্ধান আর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদের বক্তব্য একই ধরনের।

যুগ্ম সচিব পরিচয় দিয়ে প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার কাদের মাঝির সঙ্গে সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখতে গত ১২ অক্টোবর মুসাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গোয়েন্দা পুলিশ।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ডিবির যুগ্ম কমিশনারের বক্তব্য ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। তিনি সেদিন বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে উনি (মুসা) অন্তঃসারশূন্য। একটা ভুয়া লোক মনে হয়েছে। ওনার কিচ্ছু নাই। তার একটা বাড়ি রয়েছে গুলশানে। সেটাও স্ত্রীর নামে। বাংলাদেশে তার নামে আর কিছু পাই নাই। তবে উনি মুখরোচক গল্প বলেন।’

মুসা বিন শমসের গত কয়েক দশক ধরেই বাংলাদেশে আলোচিত চরিত্র। বাংলাদেশে কারও সম্পদ নিয়ে প্রচার করার প্রবণতা না থাকলেও ব্যতিক্রম মুসা। তিনি বরাবর তার বিপুল পরিমাণ টাকার গল্প বলে বেড়ান।

তার দাবি, তিনি আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ী, সুইস ব্যাংকে তার বিপুল পরিমাণ টাকা আছে। দেশেও বিভিন্ন এলাকায় এক হাজার একরের বেশি জমি আছে।

ডিবিতে গিয়েও দাবি করেন, সুইস ব্যাংকে তার ৮২ বিলিয়ন ডলার আটকে আছে। বাংলাদেশি টাকায় এটি প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা। এই টাকা আনতে পারলে তিনি পুলিশকে দেবেন ৫০০ কোটি টাকা। দুদককে ২০০ কোটি টাকা দিয়ে বিল্ডিং করে দেবেন, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু করে দেবেন।

তবে দুদক যখন তার সম্পদের হিসাব চেয়েছে, তখন তিনি দাবির পক্ষে কোনো নথিপত্র দিতে পারেননি।

দুদকের মহাপরিচালক সাঈদ মাহবুব খান বলেন, ‘মুসা বিন শমসের অসৎ উদ্দেশ্যে দুদকে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে ঢাকার সাভার ও গাজীপুরে ১ হাজার ২০০ বিঘা জমি এবং সুইস ব্যাংকের ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের) থাকার কথা বলেছেন। সেই সম্পদ অর্জনের উৎসের সমর্থনে কোনো রেকর্ডপত্র দাখিল করতে ব্যর্থ হন তিনি।’

অর্থাৎ দুদক ডিবির কাছে সম্পদের পরিমাণ নিয়ে দুই ধরনের তথ্য দিয়েছেন মুসা। দুদকের জমা দেয়া হিসাবের তুলনায় সুইস ব্যাংকে প্রায় সাত গুণ টাকা থাকার দাবি করেছেন ডিবির কাছে।

সুইস ব্যাংকে আদৌ কোনো টাকা আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন বড় হয়েছে।

দুদকের মহাপরিচালক সাঈদ মাহবুব খান বলেন, ‘সুইজারল্যান্ডে ৮৮টি ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো ব্যাংকে তার টাকা জমা আছে, তার কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। দুদক টিম তদন্তের স্বার্থে বারবার চিঠি দিচ্ছে। চিঠির জবাব পাওয়া গেলেও টাকা জমা বা জব্দ থাকার তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে না।’

তবে গাজীপুর ও সাভারের জমির তথ্য অসত্য, এ বিষয়ে নিশ্চিত তিনি। বলেন, ‘ঢাকা ও গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের রেকর্ডপত্র তল্লাশি করেও মুসা বিন শমসের ও তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা চৌধুরীর কোনো প্রকার জমি ক্রয়-বিক্রয় করার তথ্য পাওয়া যায়নি।’

মুসা বিন শমসেরের সম্পদ ‘কেবল পৈতৃক ভিটা’

পৈতৃক ভিটা ফরিদপুরে

মুসার নামে একমাত্র যে স্থাপনাটি দুদক পেয়েছে, সেটি ফরিদপুরে। তবে সেই সম্পদ তিনি নিজে করেননি। ব্রিটিশ আমলে কৃষি দপ্তরে কাজ করা বাবা শমসের আলী মোল্লা যে বাড়ি করেছিলেন, সেখানে ভাগ আছে মুসার।

ফরিদপুরে মুসার জন্ম ১৯৫০ সালের ১৫ অক্টোবর। চার ভাই এবং দুই বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়।

মুসার কথিত সম্পদের হিসাব খুঁজে বের করতে দুদকের পাশাপাশি কাজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউও)। দুটি সংস্থাই জানায়, তারা দেশে মুসার কোনো ব্যাংক হিসাবই খুঁজে পায়নি।

বিএফআইইউএর প্রতিবেদনে বলা হয়, মেসার্স ডেটকো লিমিটেড নামে জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মুসা বিন শমসের। এর অংশীদারত্বে আরও কয়েকজন রয়েছেন। এ প্রতিষ্ঠানের নামে ঢাকায় দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে।

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছেও চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। চিঠির উত্তরে সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, সেখানে মুসার নামে কোনো অ্যাকাউন্ট নেই। ফলে ওই ব্যক্তির নামে কোনো সম্পদও নেই।

দুদক জানায়, ইউটিউবে গুলশান প্যালেস নামে ঢাকার যে বাড়িটি দেখান, তার মালিক আসলে মুসার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা চৌধুরী।

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, একসময়ে জনশক্তি রপ্তানিতে আলোচনায় থাকলেও এখন ডেটকো নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানেই পরিণত হয়েছে।

বনানীতে যে বাড়িতে এই প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে, সেটিও ভাড়া করা।

যেভাবে আলোচনায় মুসা

১৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থী টনি ব্লেয়ারের নির্বাচনি প্রচারের জন্য ৫০ লাখ পাউন্ড অনুদান দেয়ার প্রস্তাব দিয়ে দেশে প্রথম আলোচনায় আসেন মুসা বিন শমসের। তিনি জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসা করলেও সে সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তাকে অস্ত্র ব্যবসায়ী হিসেবে তুলে ধরে।

২০১০ সালে সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মুসার ৭ বিলিয়ন ডলার জব্দ করেছে বলে আরেক দফায় ঝড় তোলে পশ্চিমা গণমাধ্যম। অনিয়মিত লেনদেনের কারণে তার অর্থ জব্দ করা হয় বলে সে সময় গণমাধ্যমে দাবি করেন তিনি।

আয়ারল্যান্ডে একটি দুর্গ কিনে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর বানানোর প্রস্তাব দিয়েও আলোচনায় এসেছিলেন মুসা।

তিনি প্রচার করে বেড়ান, সাউথ আফ্রিকার বিশ্বনন্দিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ বইটি উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন মুসা বিন শমসেরকে।

এর পরই ২০১১ সালের এপ্রিলে একবার তার সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দুদক, কিন্তু সেই অনুসন্ধান-প্রক্রিয়া বেশি দূর আগায়নি।

২০১৪ সালে বিজনেস এশিয়া ম্যাগাজিন মুসা বিন শমসেরকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশি অস্ত্র ব্যবসায়ীর ৭ বিলিয়ন ডলার আটকে আছে সুইস ব্যাংকে।

ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৪ সালের ৩ নভেম্বর কমিশনের নিয়মিত বৈঠকে মুসা বিন শমসেরের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়। দুদকের পরিচালক মীর জয়নুল আবেদিন শিবলীকে এ বিষয়ে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয় কমিশন।

মুসা বিন শমসেরের সম্পদ ‘কেবল পৈতৃক ভিটা’

দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে ‘দেহরক্ষী নাটক’

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এক দফা গোপনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় মুসাকে।

২০১৫ সালের ১৯ মে তাকে আবার সম্পদ বিবরণী জমা দিতে নোটিশ দেয় দুদক। ৭ জুন আইনজীবীর মাধ্যমে সম্পদ বিবরণী জমা দেন তিনি।

এরপর ১৮ ডিসেম্বর মুসা বিন শমসের আলোচনায় আসেন দুদকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়ে। চার নারী নিরাপত্তাকর্মীসহ ৪০ জনের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর বহর নিয়ে সেদিন তিনি দুদকের ফটকে গাড়ি থেকে নামেন।

সে মুহূর্তে তার ডান হাতে শুভ্র আলোর দ্যুতি, হীরকখচিত বিশ্বখ্যাত রোলেক্স ব্র্যান্ডের অতি দামি ঘড়ি। হিরা বসানো চশমা, কলম ও জুতা পরা ছিল।

তবে পরে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে, এরা কেউ তার দেহরক্ষী ছিল না। তার জনশক্তি রপ্তানির কোম্পানির সাধারণ কর্মী তারা।

২০১৬ জানুয়ারি আবার তাকে দুদকে তলব করা হয় এবং ২৮ জানুয়ারি তাকে দুই ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

২০১৭ সালের ৭ মে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মুসার বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকি, মানি লন্ডারিং ও দুর্নীতির তিনটি অপরাধের প্রমাণ পাওয়ায় তিনটি মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

‘স্বাধীনতাবিরোধী পরিচয়’ও সামনে

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক এম এ হাসানের ‘পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী’ বইয়ে ১৯৭১ সালে সে সময়ের তরুণ মুসা বিন শমসেরকে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

ওই গ্রন্থের তথ্য-প্রমাণ অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুসা ছিলেন পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের ঘনিষ্ঠজন আর মুক্তিকামী বাঙালির আতঙ্ক।

তবে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুদক কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একাত্তরের ২৫ মার্চ আমি বঙ্গবন্ধুর বাসায় ছিলাম। পরদিন তিনি আমাদের যার যার এলাকায় যাওয়ার নির্দেশ দেন। আমি নদী পার হয়ে হেঁটে ফরিদপুর যাই। ২২ এপ্রিল পাকিস্তানি আর্মির হাতে ধরা পড়ি। আমি তাদের হাতে বন্দি ছিলাম। একাত্তর সালের ৯ ডিসেম্বর অর্ধমৃত অবস্থায় মুক্তি পাই।’

দুদকে জমা দেয়া সম্পদের হিসাব

২০১৫ সালের ৭ জুন দুদকে সম্পদ বিবরণী জমা দেন মুসা বিন শমসের। তার জমা দেয়া হিসাব অনুযায়ী সুইস ব্যাংকে ১২ বিলিয়ন ডলার জমা রয়েছে, যা বাংলাদেশি টাকায় এক লাখ কোটি টাকার বেশি।

এ ছাড়া সুইস ব্যাংকের ভল্টে ৯০ মিলিয়ন ডলার দামের (বাংলাদেশি প্রায় সাড়ে সাত শ কোটি টাকা) অলংকার জমা থাকার দাবি করেছেন মুসা।

সে সময় দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সুইস ব্যাংকে জব্দ অর্থ অবমুক্ত হলে এসব অর্থ পদ্মা সেতু নির্মাণসহ মানবকল্যাণে ব্যয় করবেন তিনি।

সেদিন দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে মুসা দাবি করেন, বাংলাদেশ থেকে তার কোনো অর্থই সুইস ব্যাংকে জমা হয়নি। ৪২ বছর বিদেশে বৈধভাবে ব্যবসার মাধ্যমেই তিনি ১২ বিলিয়ন ডলার উপার্জন করেছেন, যা সুইস ব্যাংকে তার নিজস্ব অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, মিসর, সিরিয়া, পাকিস্তানসহ অনেক দেশের সরকারি প্রতিরক্ষা ক্রয়সংক্রান্ত পাওনা পরিশোধের অর্থ ওই সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সুইস ব্যাংকে তার অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে।

দুদকে জমা দেয়া হিসাব বিবরণীতে মুসা দুদককে জানান, ঢাকার সাভার ও গাজীপুরে তার ১ হাজার ২০০ বিঘা জমি আছে। দেশে রয়েছে বিপুল পরিমাণ সম্পদ। এর মধ্যে গুলশান ও বনানীতে বাড়ির তথ্য দেন।

পরে দুদকের প্রতিবেদনে সবকিছু ‘ভুয়া’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘ধনকুবের’ মুসার জালিয়াতি গাড়ি নিবন্ধনেও

যুক্তরাজ্য থেকে আনা একটি গাড়ি জালিয়াতির মাধ্যমে নিবন্ধন করে বিক্রির অপরাধে মুসা বিন শমসেরসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।

সংস্থাটির পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলীর করা মামলায় ২ কোটি ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮৩৩ টাকা শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়।

এতে বিআরটিএর সহকারী পরিচালক আইয়ুব আনসারী, ফারিদ নাবীর, মুসা বিন শমসের, তার শ্যালক ফারুক উজ জামান ও মেসার্স অটো ডিফাইনের মালিক ওয়াহিদুর রহমানকে আসামি করা হয়। মামলাটি তদন্ত করছেন দুদকের সহকারী পরিচালক সিরাজুল হক।

শেয়ার করুন