বিদেশি ফসল-ফল চাষ নিয়ে কৃষিমন্ত্রীর সতর্কতা

বিদেশি ফল ও ফসল চাষ

দেশে সম্প্রতি নানা জাতের বিদেশি ফল ও ফসল চাষ হচ্ছে। ছবি: নিউজবাংলা

‘যে যেভাবে পারছে দেশের বাইরে থেকে নতুন ধরনের ফসলের জাত নিয়ে আসছে ও চাষ করছে। এটিকে আমরা উৎসাহ দিই, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে দেখতে হবে, দেশে এসব ফসল চাষে কোনো ঝুঁকি বা স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে কি না। এসব ফসল চাষ আদৌ আমাদের প্রয়োজন আছে কি না।’

দেশে বিদেশি ফসল ও ফল চাষ নিয়ে একধরনের উচ্ছ্বাস থাকলেও কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকতে চান। তার বিবেচনায়, সব ফসল দেশের আবহাওয়া উপযোগী নয়, আবার স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

যার যেমন ইচ্ছা, তার বদলে মন্ত্রী গবেষণার ওপর ভিত্তি করে নতুন ফসলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী।

রাজধানীর ফার্মগেটে বিএআরসি মিলনায়নে বুধবার ‘ফার্ম সেক্টর অব বাংলাদেশ: প্রসপেক্টস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ, আরব, এমনকি আফ্রিকান বিভিন্ন ফল ও সবজি চাষের প্রবণতা দেখা গেছে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাষিরা লাভবান হলেও আরবের জনপ্রিয় ফল ত্বীন চাষ করে চাষিদের লোকসানে পড়ার খবরও পাওয়া গেছে। ফসল ভালো হলেও বিক্রি করতে পারছেন না চাষিরা।

বিষয়টি নিয়ে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘যে যে ভাবে পারছে দেশের বাইরে থেকে নতুন ধরনের ফসলের জাত নিয়ে আসছে ও চাষ করছে। এটিকে আমরা উৎসাহ দিই, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে দেখতে হবে, দেশে এসব ফসল চাষে কোনো ঝুঁকি বা স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে কি না। এসব ফসল চাষ আদৌ আমাদের প্রয়োজন আছে কি না।’

রেকর্ড উৎপাদনের পরও চাল আমদানির কারণ

রেকর্ড উৎপাদনের পরও কেন চাল আমদানি, তার কারণও ব্যাখ্যা করলেন মন্ত্রী। তার মতে, চালের ‘নন-হিউম্যান কনজামশন’ বেড়ে যাওয়াই এর কারণ।

এর ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, মাছ, পোলট্রি , প্রাণী খাদ্য ও স্টার্চ হিসেবে চালের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব মিলে দেশে চালের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে দেশে চালের রেকর্ড উৎপাদন হয়েছে। গড় উৎপাদনশীলতাও বেড়েছে। এখন দেশে প্রতি শতাংশ জমিতে এক মণ করে ধান উৎপাদন হয়। তারপরও চাল আমদানি করতে হচ্ছে নানা কারণে।’

তিনি বলেন, ‘দেশে জনসংখ্যা ও চালের চাহিদার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। অন্যদিকে বছর বছর জনসংখ্যা বাড়ছে, চাষের জমি কমছে। অন্যান্য ফসলের চাষেও জমি ব্যবহার হচ্ছে। দেশে বছরে এখন ৬০ লাখ টন ভুট্টা উৎপাদন হচ্ছে।

‘আগে যে ক্ষেতে ধানের চাষ হতো, সেখানেই ভুট্টা চাষ হচ্ছে। একই সঙ্গে চালের নন-হিউম্যান কনজামশন অনেক বেড়েছে।’

২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৮৭ লাখ টন। ২০৫০ সাল নাগাদ উৎপাদন ৬ কোটি ৮ লাখ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

ফোরাম ফর ইনফরমেশন ডিসেমিনেশন অন অ্যাগ্রিকালচার (ফিডা) ও সিনজেন্টা বাংলাদেশ লি. এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

আরও পড়ুন:
পানির নিচে ফসলি জমি, কৃষকের মাথায় হাত
বৃহত্তর ময়মনসিংহে ফলবে ‘উচ্চমূল্যের’ ফসল

শেয়ার করুন

মন্তব্য

মানুষ বেশি ভাত খায় বলে চালের ঘাটতি: কৃষিমন্ত্রী

মানুষ বেশি ভাত খায় বলে চালের ঘাটতি: কৃষিমন্ত্রী

‘বাংলাদেশের ৫০ বছর, কৃষি রূপান্তর অর্জন’ বিষয়ে সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক।

‘আমরা অনেক বেশি চাল খাই, ভাত খাই। এজন্য চালের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। আমরা দিনে প্রায় ৪০০ গ্রাম চাল খাই অথচ পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ ২০০ গ্রাম চালও খায় না।’

বাংলাদেশের মানুষ বেশি ভাত খায় বলে চালের ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে মনে করেন কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক। এ জন্য তিনি খাদ্যাভ্যাস পাল্টানোর তাগিদ দিয়েছেন।

মানুষকে ভাত কম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এই সদস্য বলেছেন, বিশ্বের মানুষ গড়ে যত চাল খায় বাংলাদেশের মানুষ খায় তার দ্বিগুণ।

রোববার রাজধানীতে এক কৃষি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এই কথা বলেন। সম্মেলনের বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশের ৫০ বছর, কৃষি রূপান্তর অর্জন।’

বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম ও বণিক বার্তা যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে।

চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে ঘাটতির তথ্য পাওয়া যায় না। তবে প্রায়ই চালের দাম বেড়ে গেলে সরকার আমদানি উন্মুক্ত করে দেয়।

সম্প্রতি চালের দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। তবে গত দুই সপ্তাহে তা কিছুটা নিম্নমুখি। তার পরেও বাজার নিয়ন্ত্রণ সরকারি সংস্থা টিসিবির হিসাবে সরু চালের দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। এটি মূল্যস্ফীতির সার্বিক হারের চেয়ে বেশি।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা অনেক বেশি চাল খাই, ভাত খাই। এজন্য চালের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। আমরা দিনে প্রায় ৪০০ গ্রাম চাল খাই অথচ পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ ২০০ গ্রাম চালও খায় না।

‘খাদ্যের অভাব নেই দেশে। নেই খাদ্যের সংকট ও খাবারের জন্য হাহাকার। কিন্তু মানুষ অধিক ভাত খায় বলে চালের ওপর বেশি চাপ পড়ছে। এতে প্রায়শ সংকট দেখা দিচ্ছে। বাড়ছে দামও।’

ধানজাতীয় দানাদার খাদ্যে বাংলাদেশকে সফল বলেও দাবি করেন মন্ত্রী। বলেন, খাদ্যেও দেশ অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ।

আগামী পাঁচ থেকে ছয় বছর পর দেশেই সারা বছর দেশে আম পাওয়া যাবে বলেও তথ্য দেন মন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘আমরা এখন কৃষিপণ্য রপ্তানিও করছি। তবে এই রপ্তানি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে। সরকারের লক্ষ্য এখন খাদ্যে পরিপূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। এর পাশাপাশি পুষ্টিজাতীয় খাদ্য নিশ্চিত করতেও উদ্যোগী হয়েছে সরকার। তবে এরজন্য কৃষির বাণিজ্যিক রূপান্তর দরকার।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যার ব্যুরোর হিসাবে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে চালের উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৪৮ লাখ টন। ২০২০ সালে উৎপাদন বেড়ে ৪ কোটি টন ছাড়িয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ইফপ্রি) গবেষণা তথ্যমতে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে মানুষের দৈনিক মাথাপিছু চাল খাওয়ার পরিমাণ ছিল ৩৯৬ দশমিক ৬ গ্রাম। সংস্থাটির ২০১৬ সালের হিসাবে ছিল ৪২৬ গ্রাম।

আরও পড়ুন:
পানির নিচে ফসলি জমি, কৃষকের মাথায় হাত
বৃহত্তর ময়মনসিংহে ফলবে ‘উচ্চমূল্যের’ ফসল

শেয়ার করুন

‘গ্রামগঞ্জে পৌঁছাবে ইলিশের স্বাদ’

‘গ্রামগঞ্জে পৌঁছাবে ইলিশের স্বাদ’

কয়েক বছর ধরে প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ, কেনা-বেচা ও বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে সরকার। ফলে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। ফাইল ছবি

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা চাইব আগামীতে ইলিশ উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে। ইলিশের উৎপাদন এমন একটা জায়গায় আসুক যাতে গ্রাম-গঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের সব মানুষ সুস্বাদু ইলিশের স্বাদ নিতে পারেন। পরিপূর্ণতার সঙ্গে পরিবার-পরিজন নিয়ে ইলিশ খেতে পারেন।’

সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উৎপাদন বাড়ায় গ্রামে-গঞ্জেও ইলিশের স্বাদ পৌঁছানোর ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।

রোববার মৎস্য ভবনে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান বাস্তবায়ন সংক্রান্ত মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যত করণীয় বিষয়ক এক কর্মশালায় তিনি এ কথা বলেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা চাইব আগামীতে ইলিশ উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে। ইলিশের উৎপাদন এমন একটা জায়গায় আসুক যাতে গ্রাম-গঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের সব মানুষ সুস্বাদু ইলিশের স্বাদ নিতে পারেন। পরিপূর্ণতার সঙ্গে পরিবার-পরিজন নিয়ে ইলিশ খেতে পারেন।’

‘সারা বিশ্বে সবচেয়ে সুস্বাদু ও সর্বোচ্চ ইলিশ মাছ আহরণে আমাদের স্বত্বাধিকার রয়েছে। সে জন্য ইলিশ রক্ষার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা কর্মসূচি গ্রহণ করি। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপক হারে যাতে ইলিশ রপ্তানি না হয় সে পদক্ষেপও আমরা নিয়েছি।’

‘গ্রামগঞ্জে পৌঁছাবে ইলিশের স্বাদ’

রোববার মৎস্য ভবনে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান বাস্তবায়ন সংক্রান্ত মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যত করণীয় বিষয়ক এক কর্মশালায় বক্তব্য দেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। ছবি: নিউজবাংলা

মা ইলিশ রক্ষায় গত ৪ অক্টোবর থেকে ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ, কেনা-বেচা ও বিনিময় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার। এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইলিশ ধরতে গিয়ে আটক হয়েছেন শতাধিক জেলে, গুনেছেন জরিমানাও।

কয়েক বছর ধরে প্রজনন মৌসুমে এই নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে সরকার। আর এর ফলে ইলিশের উৎপাদনও বেড়েছে বহুগুণ।

মন্ত্রী বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে কিছু প্রতিকূলতা লক্ষ্য করেছি। কিছু দুষ্ট লোক তাদের অসাধু পরিকল্পনা ও চিন্তাচেতনা বাস্তবায়ন করার জন্য দরিদ্র-অসহায় জেলেদের নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে নামাচ্ছে। যারা নিষেধাজ্ঞার সময় মৎস্য আহরণে যায় তাদের বড় অংশ অন্যের মাধ্যমে ব্যবহৃত হয়।’

‘মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান শতভাগ সফল করতে নতুন নতুন সৃজনশীল কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মৎস্যজীবী বিভিন্ন সংগঠনের ভূমিকা আরও বেশি কীভাবে রাখা যায়, সে জন্য নীতিনির্ধারণ করতে হবে। মা ইলিশ সংরক্ষণে এবারের অভিযানের সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে আরও ভালোভাবে ভবিষ্যতে অভিযান পরিচালনা করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে সুস্বাদু ও ভালো মাছ হচ্ছে ইলিশ। ইলিশ মাছ সংরক্ষণ, উৎপাদন বৃদ্ধি, এর নিরাপদ আশ্রয় ও নিরাপদ প্রজননের জন্য সরকার নানা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। মা ইলিশ রক্ষা, ইলিশের অভয়াশ্রম সৃষ্টি করা, ইলিশ গবেষণা, জাটকা সংরক্ষণসহ বিভিন্নভাবে আমরা কাজ করছি।

‘ইলিশের পরিসর বৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সব ধরনের আগ্রহ রয়েছে, পরিকল্পনা রয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দপ্তরের কর্মকর্তারা সকলে মিলে ভূমিকা পালন করতে হবে।’

কর্মশালায় দেশের ৮ বিভাগের বিভাগীয় মৎস্য দপ্তরের উপপরিচালকরা নিজ বিভাগের মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানের কার্যক্রম তুলে ধরেন। এতে জানানো হয়, এ বছর মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানের ১ হাজার ৮৯২টি মোবাইল কোর্ট ও ১৫ হাজার ৩৮৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। আটক করা হয় ৮৮৪ লাখ মিটার অবৈধ জাল।

আরও পড়ুন:
পানির নিচে ফসলি জমি, কৃষকের মাথায় হাত
বৃহত্তর ময়মনসিংহে ফলবে ‘উচ্চমূল্যের’ ফসল

শেয়ার করুন

কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য হচ্ছে মন্ত্রণালয়ের পৃথক সেল

কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য হচ্ছে মন্ত্রণালয়ের পৃথক সেল

কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে এখন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি ও তাদের উৎসাহিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সারা দেশে কৃষি উদ্যোক্তারা কে কী ফসল চাষ করবে, কোন ধরনের কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করবে, তাদের কী সহযোগিতা দরকার- এসব বিষয়ে দেখভাল, সহযোগিতা এবং যোগাযোগ রক্ষা করবে এই সেল।’

কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে একটি পৃথক সেল গঠন করছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে শনিবার কৃষি উদ্যোক্তা সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা জানান কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক।

তিনি বলেন, ‘দেশে এখন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি ও তাদের উৎসাহিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সারা দেশে কৃষি উদ্যোক্তারা কে কী ফসল চাষ করবে, কোন ধরনের কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করবে, তাদের কী সহযোগিতা দরকার- এসব বিষয়ে দেখভাল, সহযোগিতা এবং যোগাযোগ রক্ষা করবে এই সেল।’

কৃষিমন্ত্রী জানান, এ বছরের মধ্যে সারা দেশে ২৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি কৃষি ঋণ বিতরণের খোঁজ খবর রাখতে মাঠ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘কৃষকেরা সঠিকভাবে ঋণ পাচ্ছে কিনা, ঋণ পেতে কি কি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন এবং অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে কিনা, কোন জেলায় কী পরিমাণ ঋণ বিতরণ হচ্ছে-এসব বিষয়ে খোঁজখবর রাখতে ইতোমধ্যে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’

অনুষ্ঠানে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নিয়েও কথা বলেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এবারের দুর্গাপূজায় যে সহিংসতা হয়েছে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর যে আক্রমণ হয়েছে তা জাতির জন্য লজ্জাজনক। এটি আমাদের গায়ে কালিমা লেপন করেছে। এ ধরনের ঘটনা কোনোক্রমেই কাম্য নয়।

‘ধর্মের নামে অপপ্রচার চালিয়ে যারা রংপুরের জেলেপল্লিতে মানুষের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করেছে, আগুনে পুড়িয়েছে তারা অমানুষ, পশুতুল্য এবং বর্বর। এ ধর্মান্ধ বর্বরদের শিকড় সমূলে উৎপাটন করতে হবে।’

আরও পড়ুন:
পানির নিচে ফসলি জমি, কৃষকের মাথায় হাত
বৃহত্তর ময়মনসিংহে ফলবে ‘উচ্চমূল্যের’ ফসল

শেয়ার করুন

কম বৃষ্টিতে ব্যাহত শীতের সবজি চাষ

কম বৃষ্টিতে ব্যাহত শীতের সবজি চাষ

পঞ্চগড়ে এবার দেরিতে বাজারে আসা শুরু করেছে শীতকালীন সবজি। ছবি: নিউজবাংলা

পঞ্চগড়ের কৃষকরা বলছেন, এ বছর জেলায় বৃষ্টি কম হওয়ায় শীতকালীন সবজির আবাদ ব্যাহত হয়েছে। আগাম সবজি উঠতে দেরি হওয়ায় পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলা থেকে সবজি আসছে, এ কারণে দাম বেশি।

পঞ্চগড় জেলায় এ বছর একটু দেরিতে বাজারে আসা শুরু করেছে শীতকালীন সবজি। বাজারে মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, গাজর, শিমসহ নানা ধরনের শীতের সবজি পাওয়া গেলেও চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।

অধিকাংশ সবজিই বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে তার বেশি দামে। কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, শিম বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৮০ টাকা থেকে ১০০ টাকায়, ফুলকপি ১০০, বাঁধাকপি ৮০, গাজর ২০০, শসা ৬০ ও টমেটো ২০০ টাকা কেজি দরে।

কৃষকরা বলছেন, এ বছর জেলায় বৃষ্টি কম হওয়ায় শীতকালীন সবজির আবাদ ব্যাহত হয়েছে। আগাম সবজি উঠতে দেরি হওয়ায় পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলা থেকে সবজি আসছে, এ কারণে দাম বেশি।

এ ছাড়া বৃষ্টির অভাবে বাঁধাকপি, ব্রকলি, ফুলকপি ও শিমে বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়ায় এসব ফসলের উৎপাদন কম হবার আশঙ্কা তাদের। সেটিও দামে প্রভাব ফেলছে।

কম বৃষ্টিতে ব্যাহত শীতের সবজি চাষ

পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলার চাকলাহাট, হাড়িভাসা, রতনিবাড়ী, বোদা উপজেলার পাঁচপীর, মড়েয়া বড়শষি আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর, আলোয়া খাওয়া, সর্দারপাড়া, দেবীগজ্ঞ উপজেলার তিস্তাপাড়া, ফুলবাড়ি, কালিগঞ্জ এবং তেঁতুলিয়া উপজেলার শড়িয়ালজোত, বিল্লাভিটা ও শালবাহানহাট এলাকায় প্রচুর পরিমাণ সবজি চাষ হয়। এসব এলাকায় আগাম উৎপাদিত শীতকালীন সবজি স্থানীয় বাজারে বিক্রির পর চলে যায় রাজধানী ঢাকায়।

বোদা উপজেলার মাড়েয়া এলাকার সবজি চাষি রফিকুল ইসলাম জানান, প্রতি বছর শীতের সবজি চাষ করে তার প্রায় ২০ লাখ টাকা লাভ থাকে। এ বছর তিনি শিম, ঝিঙ্গা, শসা, বরবটি, লাউ ও কচুর লতির আবাদ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘চলতি বছর বৃষ্টি আশাতীতভাবে না হওয়ায় সবজির ফলন ভালো হয়নি। সবজি ক্ষেতে পোকার আক্রমণ দেখা দেয়ায় উৎপাদন কিছুটা হলেও কম হবে। আর প্রতি বছর আগাম সবজি বাজারজাত করতে পারলেও এ বছর একটু দেরি হবে।’

কম বৃষ্টিতে ব্যাহত শীতের সবজি চাষ

তবে সবজির চাহিদা বেশি থাকায় ভালো দাম পাবেন বলে আশা করছেন বলে জানান তিনি।

সদর উপজেলার ভাবরঙ্গি গ্রামের মিজানুর রহমান জানান, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি ও বেগুনের আবাদ ভালো হয়েছে। তবে আগে বাজারজাত করতে না পারায় লাভ কিছুটা কম হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মিজানুর রহমান জানান, অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় সবজি চাষে ব্যাঘাত হয়েছে। শেষ সময়ের বৃষ্টিপাতে চাষিরা তা পূরণ করার চেষ্টা করছেন।

বৃষ্টি কম হওয়ায় এবার আগাম সবজি সেভাবে বাজারে ওঠেনি। তবে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সবজি সরবরাহ বাড়বে।

আরও পড়ুন:
পানির নিচে ফসলি জমি, কৃষকের মাথায় হাত
বৃহত্তর ময়মনসিংহে ফলবে ‘উচ্চমূল্যের’ ফসল

শেয়ার করুন

বিনা-১৭ ধানে কৃষকের হাসি

বিনা-১৭ ধানে কৃষকের হাসি

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিনা-১৭ ধানের প্রতি বিঘায় প্রায় ২৬ থেকে ২৭ মণ ফলন হয়ে থাকে। অন্যান্য জাতের ধানের তুলনায় বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ দুই থেকে তিন হাজার টাকা কম হয়।

কম সময়ে, কম খরচে উৎপাদন বেশি হওয়ায় বিনা-১৭ ধান চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন নওগাঁর কৃষকরা। তারা বলছেন, সার-পানি সাশ্রয়ী, আলোক সংবেদনশীল ও খরাসহিষ্ণু এই ধান। অন্য জাতের ধানের চেয়ে এক মাস আগেই বিনা-১৭ কাটার উপযোগী হয়।

এ জাতের ধানের আবাদে কৃষককে উদ্বুদ্ধ ও সহায়তা করে যাচ্ছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) উপকেন্দ্র ও নওগাঁর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, নওগাঁয় চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৯৭ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বিনা-১৭ জাতের ধান ১ হাজার ৩০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে।

এই ধান রাণীনগরে ৫২০ হেক্টর, ধামইরহাটে ১২৫ হেক্টর, নিয়ামতপুরে ৫ হেক্টর ও মান্দা উপজেলায় ২০ হেক্টরসহ অন্যান্য উপজেলায় আংশিক আবাদ হয়েছে।

বিনা-১৭ জাতের ধানে পানি কম লাগার কারণে একে গ্রিন সুপার রাইস নামেও অভিহিত করেছেন অনেকে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ জাতের ধানে ইউরিয়া সার এক-তৃতীয়াংশ ও সেচ ৫০ শতাংশ কম লাগে। ধানের জীবনকাল ১১০ থেকে ১১৫ দিন। এর প্রতি শিষে ২০০ থেকে ২৫০ দানা থাকে।

প্রতি বিঘায় বিনা-১৭ প্রায় ২৬ থেকে ২৭ মণ ফলন হয়ে থাকে। অন্যান্য জাতের ধানের তুলনায় বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ দুই থেকে তিন হাজার টাকা কম হয়।

নিয়ামতপুর উপজেলার শালবাড়ি গ্রামের কৃষক ইব্রাহিম খলিল এই প্রথম তার চার বিঘা জমিতে বিনা-১৭ জাতের ধানের আবাদ করেছেন।

বিনা-১৭ ধানে কৃষকের হাসি

তিনি বলেন, ‘আমি কয়েক মাস আগে ইউটিউবে বিনা-১৭ জাতের ধানের সুফল দেখার পর এর উপকেন্দ্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও জেলার কৃষি অফিসে যোগাযোগ করি। সেখানকার কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও সহায়তা নিয়ে আমার চার বিঘা জমিতে বিনা-১৭ জাতের ধান রোপণ করেছিলাম।

‘বর্তমানে ধান কাটার উপযোগী হয়েছে। আমার জমিগুলোর পাশেই স্বর্ণা-৫, তেজ ধানি গোল্ড, বিনা-৭ জাতের ধানের আবাদ করেছে এখানকার কৃষকরা। তবে তাদের ধান এখনও কাঁচা রয়েছে। আরও প্রায় এক মাসের মতো সময় লাগবে এসব ধান কাটার উপযোগী হতে।’

এই ধান চাষে খরচ কেমন লেগেছে জানতে চাইলে ইব্রাহিম বলেন, ‘সেচ, সার, ওষুধ ও পানির খরচ অনেকটাই কম। অন্য জাতের ধানে বিঘাপ্রতি সব মিলিয়ে খরচ হয় প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার মতো, কিন্তু বিনা-১৭ জাতের ধানে বিঘাপ্রতি দুই থেকে তিন হাজার টাকা কম খরচ হচ্ছে।’

ইব্রাহিম জানান, এরই মধ্যে এক বিঘা জমির ধান কাটা হয়েছে। সেখান থেকে ২৭ মণ ধান পাওয়া গেছে। ঝড়-বৃষ্টিতে এই ধানের শিষ তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।

রাণীনগর উপজেলার জলকৈ গ্রামের কৃষক রবিউল হোসেন বলেন, ‘হামার সাত বিঘা জমিত এবার বিনা-১৭ জাতের ধানের আবাদ করিছি। পাঁচ থেকে ছয় দিনের মধ্যেই হামি জমির ধানগুলা কাটমু। ১১০ থ্যাকা ১১৫ দিনের মধ্যেই ধান পাকা গেছে। ফলনও ভাল হচে। তাই সব মিলা এই জাতের ধান আবাদ লাভজনক।’

বিনা-১৭ ধানে কৃষকের হাসি

নওগাঁ জেলা কৃষি প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা কে এম মঞ্জুরে মওলা নিউজবাংলাকে জানান, বিনা-১৭ চাষে কৃষকদের প্রয়োজনীয় বীজ ও সার সহায়তা দেয়া হচ্ছে। প্রতিটি উপজেলায় কৃষকদের নিয়ে মাঠ দিবসও পালন করা হচ্ছে।

নিয়ামতপুরে কৃষক ইব্রাহিমের জমির ধান পরিদর্শনে গিয়েছেন বিনা চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উপকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. মো. হাসানুজ্জামান।

তিনি বলেন, ‘বিনা-১৭ একটি স্বল্পমেয়াদি জাতের ধান। এটি খরাসহিষ্ণু, ৩০ শতাংশ পানি কম প্রয়োজন হয় এর চাষে। যে জমিতে দুটি ফসল হতো, সেখানে এ জাতের ধান চাষে এখন তিনটি ফসল করা সম্ভব। বিনা ধান-১৭ স্বল্প জীবনকালীন হওয়ায় ধান কাটার পর ওই একই জমিতে কৃষক সরিষা, মসুর বা আলু চাষ করতে পারবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরে জমি তৈরি করে বোরো ধান লাগানো যাবে। আমরা নওগাঁ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলার কৃষকদের এই ধান চাষে উদ্বুদ্ধ করতে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছি।’

আরও পড়ুন:
পানির নিচে ফসলি জমি, কৃষকের মাথায় হাত
বৃহত্তর ময়মনসিংহে ফলবে ‘উচ্চমূল্যের’ ফসল

শেয়ার করুন

বিজ্ঞানীদের গবেষণা: পাতে ফিরছে দেশীয় মাছ

বিজ্ঞানীদের গবেষণা: পাতে ফিরছে দেশীয় মাছ

বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেশি মাছের পোনা উৎপাদন করা হচ্ছে। ছবি: নিউজবাংলা

দেশে স্বাদু পানির ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ১৪৩ প্রজাতির ছোট মাছ রয়েছে। এর মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় মাছের সংখ্যা ৬৪টি। ইতোমধ্যে ৩১টি দেশীয় মাছের পোনা কৃত্রিম প্রজননে উৎপাদন করেছেন বিজ্ঞানীরা। বাকিগুলোও উৎপাদন করতে গবেষণা চলছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) বিজ্ঞানীরা বিলুপ্তপ্রায় সকল দেশীয় মাছ খাবার টেবিলে আনতে ক্লান্তিহীন গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৩১ প্রজাতির দেশীয় মাছের পোনা উৎপাদনে সফল হয়েছেন তারা। এর মধ্যে ১৯ প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় মাছ সারা দেশে চাষ হচ্ছে।

এসব দেশীয় মাছ উৎপাদনে বিপ্লব ঘটাচ্ছেন চাষিরা।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, দেশে স্বাদু পানির ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ১৪৩ প্রজাতির ছোট মাছ রয়েছে। এর মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় মাছের সংখ্যা ৬৪টি। ইতোমধ্যে ৩১টি দেশীয় মাছের পোনা কৃত্রিম প্রজননে উৎপাদন করেছেন বিজ্ঞানীরা। বাকিগুলোও উৎপাদন করতে গবেষণা চলছে। উৎপাদিত দেশীয় মাছের পোনা চাষিদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে।

২০০৮-২০০৯ সালে চাষের মাধ্যমে দেশি মাছের উৎপাদন ছিল ৬৭ হাজার টন। ২০১৯-২০২০ সাল নাগাদ তা প্রায় চার গুণ বেড়ে ২ লাখ ৫০ হাজার টন হয়েছে। ফলে বাজারে এখন দেশি মাছের ছড়াছড়ি।

বিজ্ঞানীদের গবেষণা: পাতে ফিরছে দেশীয় মাছ

গবেষণায় উৎপাদিত মাছগুলোর মধ্যে রয়েছে পাবদা, গুলশা, ট্যাংরা, শিং, মাগুর, গুজি আইড়, চিতল, ফলি, মহাশোল, বৈরালী, রাজপুঁটি, মেনি, বালাচাটা, গুতুম, কুঁচিয়া, ভাগনা, খলিশা, বাটা, দেশি সরপুঁটি, কালবাউশ, কই, গজার, গনিয়া, পিয়ালি, ঢেলা, রানি, বাতাসি ও কাকিলা। এ ছাড়া বিলুপ্তির আশঙ্কায় থাকা বাকি মাছগুলো নিয়েও গবেষণা চলছে।

বিজ্ঞানীরা জানান, বাংলাদেশে মিঠাপানির হ্যাচারি রয়েছে ৯৩০টি। বিলুপ্তপ্রায় মাছের পোনা সারা দেশে ব্যাপক হারে উৎপাদনের জন্য ইনস্টিটিউটে হ্যাচারি মালিক ও চাষিদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। উৎপাদিত পোনাগুলোও স্বল্পমূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে।

ইনস্টিটিউটের প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা উৎপাদন করছে হ্যাচারিমালিকরা। পরে ব্যবহার করা হচ্ছে চাষাবাদে। কর্মসংস্থান হয়েছে লক্ষাধিক লোকের। দেশীয় মাছের জিন সংরক্ষণ, প্রজননের কৌশল উদ্ভাবন এবং চাষাবাদ পদ্ধতির কারণে সফলতা এসেছে।

বিজ্ঞানীদের গবেষণা: পাতে ফিরছে দেশীয় মাছ

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. জুলফিকার আলী বলেন, দেশীয় প্রজাতির মাছগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ ও আয়োডিনের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ রয়েছে। এগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে এবং রক্তশূন্যতা, গলগণ্ড, অন্ধত্ব প্রভৃতি রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।

গবেষণায় উৎপাদিত মাছের পোনা মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারিত হওয়ায় বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মাছের প্রাপ্যতা সাম্প্রতিককালে বেড়েছে এবং মাছের দাম সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এসেছে।

ময়মনসিংহে ইনস্টিটিউটের স্বাদুপানি কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শাহা আলী বলেন, ‘পাবদা মাছ দুই বছর আগেও ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বাজারে বিক্রি হয়েছে। কিন্তু এখন ৫০০ টাকার কমেই পাওয়া যায়। বাজারে এখন শিং মাছের দাম ৪০০ টাকা, ট্যাংরা মাছের দামও ৪০০ টাকা।

বিজ্ঞানীদের গবেষণা: পাতে ফিরছে দেশীয় মাছ

‘এসব মাছ ছাড়াও সাম্প্রতিককালে বাজারে বিপন্ন প্রজাতির মেনি, চিতল, ফলি, কই ইত্যাদি মাছের প্রাপ্যতা যেমন বেড়েছে, দামও নেমে এসেছে সহনশীল পর্যায়ে। এ ছাড়া গবেষণায় উৎপাদিত মাছের পোনা চাষে হ্যাচারিমালিকসহ চাষিরাও লাভবান হচ্ছেন।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ নিউজবাংলাকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় দেশীয় মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র ইতোমধ্যে অনেক বিনষ্ট হয়েছে। প্রাকৃতিক জলাধার যেমন হাওড়, খাল-বিল ও নদনদীতে এসব মাছের প্রাপ্যতা হ্রাস পেয়েছে। ফলে দেশীয় মাছ সংরক্ষণের জন্য ময়মনসিংহে ইনস্টিটিউটের সদরদপ্তরে লাইভ জিন ব্যাংক স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সারা দেশে যত ছোট মাছ আছে, সেগুলো সংগ্রহ করে এই লাইভ জিন ব্যাংকে রাখা হচ্ছে। যদি প্রকৃতি থেকে কোনো মাছ হারিয়ে যায়, তাহলে সংরক্ষণে থাকা মাছটিকে গবেষণা করে আবারও ওই মাছের পোনা উৎপাদন করা হবে। ফলে বিলুপ্ত হওয়া মাছ সারা দেশে চাষের মাধ্যমে ছড়িয়ে যাবে।

বিজ্ঞানীদের গবেষণা: পাতে ফিরছে দেশীয় মাছ

তিনি আরও বলেন, চাষের আওতায় আসা বিলুপ্তপ্রায় ১৯ প্রজাতির দেশীয় মাছ ছাড়া উৎপাদিত আরও ১২টি মাছের পোনা নিয়ে গবেষণা চলছে। দ্রুত সেই মাছগুলোকেও চাষের আওতায় আনা হবে।

মহাপরিচালক বলেন, একটি মাছ নিয়ে ১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সময় ধরে গবেষণা করতে হয়। মোটা বাইন নামে একটি পিচ্ছিল দেশীয় মাছ নিয়ে প্রায় তিন বছর যাবৎ গবেষণা চলছে। হরমোন প্রয়োগ করে পোনা উৎপাদনে সফলতা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে গবেষণা চলছে। আগামী বছরের জুন-জুলাইয়ের মধ্যে বিলুপ্তির আশঙ্কায় থাকা দেশীয় আট থেকে ১০ প্রজাতির মাছের পোনা উৎপাদনে সফলতার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিজ্ঞানীদের গবেষণা: পাতে ফিরছে দেশীয় মাছ

বর্তমানে ময়মনসিংহ স্বাদুপানি কেন্দ্র ছাড়াও বগুড়ার সান্তাহার, নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর ও যশোর উপকেন্দ্রে বিলুপ্তপ্রায় মাছ সংরক্ষণে গবেষণা চলছে। দেশীয় মাছ সংরক্ষণ গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্যে ২০২০ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট একুশে পদক অর্জন করে।

আরও পড়ুন:
পানির নিচে ফসলি জমি, কৃষকের মাথায় হাত
বৃহত্তর ময়মনসিংহে ফলবে ‘উচ্চমূল্যের’ ফসল

শেয়ার করুন

বেডে বেডে ভাসছে সবজি

বেডে বেডে ভাসছে সবজি

ঝালকাঠিতে ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদ দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। ছবি: নিউজবাংলা

উপকূলীয় হওয়ায় ঝালকাঠিতে কৃষকদের চাষাবাদ নিয়ে সমস্যা লেগেই থাকত। সেই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ দিয়েছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। ভাসমান বেডে নানান সবজি, মসলা রোপণ করছেন প্রান্তিক কৃষকরা।

ঝালকাঠিতে দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে ভাসমান বেডে সবজি ও মসলার চাষ। এতে ঘুচছে বেকারত্ব; কৃষকদের সংসারে ফিরছে সচ্ছলতা।

উপকূলীয় হওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকদের চাষাবাদ নিয়ে সমস্যা লেগেই থাকত। সেই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ দিয়েছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। ভাসমান বেডে নানান সবজি, মসলা রোপণ করছেন প্রান্তিক কৃষকরা।

বেড পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা কৃষকরা বলছেন, এক-একটি বেডে বছরে ৭ থেকে ৮ বার সবজি চাষ করা যায়। সেই সঙ্গে বেডের জলে মাছ চাষও করা যায়।

কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঝালকাঠি নিম্নাঞ্চল হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে যেত কৃষকের তৈরি বীজতলা। কৃষি বিভাগ নিজেদের উদ্যোগে কৃষকদের কলাগাছের ভেলা ও কচুরিপানা দিয়ে বেড তৈরি করে দিচ্ছে।

জেলায় বর্তমানে প্রায় ৭ হেক্টর জমিতে ভাসমান বেড রয়েছে। ভাসমান এসব বেডে চাষ করা হচ্ছে লালশাক, মুলাশাক, লাউ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ঢ্যাঁড়শ, ধনিয়াসহ বিভিন্ন প্রকার সবজি ও মসলা।

বেডে বেডে ভাসছে সবজি

বেড পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে লাভবান কৃষক সালেহ আহম্মেদ জানান, কৃষি অফিসের সহযোগিতায় গত দুই বছর ধরে ভাসমান বেডে সবজি চাষ করছেন তিনি। লালশাক, মুলাশাক, ঢ্যাঁড়শসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি ও মসলা চাষ করেছেন।

বেড পদ্ধতির চাষে তেমন কোনো খরচ না থাকায় লাভবান হয়েছেন বলেও জানান সালেহ।

বেড তৈরির কৌশল কী তা জানতে চাইলে কৃষক মোকসেদ আলী জানান, প্রথমে পানির ওপরে কলাগাছ অথবা বাঁশ বিছিয়ে বেড বা মাচা তৈরি করতে হয়। তার ওপর কচুরিপানা তুলে বেড প্রস্তুত করা হয়। আর কচুরিপানা পচিয়ে তার ওপরেই বিভিন্ন সবজি চাষ করা হয়।

তিনি বলেন, বর্ষা বা বন্যার পানি যতই হোক বেডের ওপরে রোপণ করা চারার কোনো ক্ষতি হয় না। বেড পদ্ধতির আরেকটি গুণ হচ্ছে এতে কোনো ধরনের সার-কীটনাশকও দিতে হয় না।

বেডে বেডে ভাসছে সবজি

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফজলুল হক নিউজবাংলাকে জানান, ঝালকাঠি জেলায় চাষাবাদের জমি অন্য জমির তুলনায় বেশ নিচু হওয়ায় বর্ষার পানিতে ডুবে যায়। তাই বেড পদ্ধতির চাষাবাদে আগ্রহী হচ্ছেন কৃষকরা।

তিনি বলেন, ‘এতে কৃষিকাজে লাভের মুখ দেখবেন চাষিরা। জলাবদ্ধ ও বন্যাদুর্গত এলাকার কৃষকরা এ ধরনের ভাসমান বেডে সারা বছরই সবজি চাষ করতে পারেন। এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ লাভজনক হওয়ায় কৃষকদের মাঝে আগ্রহ বাড়ছে। বর্তমানে অনেকেই বেড পদ্ধতিতে চাষ করতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।’

আরও পড়ুন:
পানির নিচে ফসলি জমি, কৃষকের মাথায় হাত
বৃহত্তর ময়মনসিংহে ফলবে ‘উচ্চমূল্যের’ ফসল

শেয়ার করুন