চায়ে নীরব বিপ্লব

চায়ে নীরব বিপ্লব

দেশে চা উৎপাদন দিন দিন বাড়ছে। ছবি: সংগৃহীত

এখন শুধু মৌলভীবাজার, সিলেট, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জ নয়, উত্তরাঞ্চলের অনেক জেলাতেও হচ্ছে চায়ের চাষ। সারা দেশে সুবিধাজনক মাটিতে চাষের চাষ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে চা বোর্ড। ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ কোটি কেজি; আর রপ্তানির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১ কোটি কেজি।

আগস্ট মাসে দেশে ১ কোটি ৪০ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। এক মাসে এত চা এর আগে কখনোই উৎপাদন হয়নি।

চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে পানীয়র উৎপাদন। দেশের চাহিদার পুরোটা পূরণ করে এখন রপ্তানিও হচ্ছে। মাঝে রপ্তানিতে নিম্নমুখী ধারা দেখা গেলেও এখন ফের বাড়ছে; আরও বাড়াতে ৪ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা ঘোষণা করেছে সরকার। কোনো রপ্তানিকারক ১০০ টাকার চা রপ্তানি করলে সরকারের কোষাগার থেকে তাকে ৪ টাকা দেয়া হবে।

২০২৫ সালের মধ্যে দেশে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ কোটি কেজি; আর রপ্তানির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১ কোটি কেজি।

২০২০ সালে ৮ কোটি ৬৩ লাখ ৯০ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়েছিল দেশে। এর মধ্যে রপ্তানি হয়েছিল ২১ লাখ ৭০ হাজার কেজি। চলতি ২০২১ সালের আট মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ৫ কোটি ২১ লাখ ৪০ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। রপ্তানি হয়েছে ৩ লাখ ৯০ হাজার কেজি।

২০ বছর আগে ২০০১ সালে ৫ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছিল। তখন দেশে মোট চাহিদা ছিল ৩ কোটি ৬৯ লাখ ৫০ হাজার টন। দুই দশকে চায়ের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ; চাহিদা বেড়েছে তিন গুণের মতো।

এভাবে চা উৎপাদনে বিপ্লব হয়েছে দেশে। এখন শুধু মৌলভীবাজার, সিলেট, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জ নয়, উত্তরাঞ্চলের অনেক জেলাতেও হচ্ছে চায়ের চাষ। সারা দেশে সুবিধাজনক মাটিতে চায়ের চাষ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে চা বোর্ড; গবেষণা করছে চা গবেষণা ইনস্টিটিউট।

চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. জহিরুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দেশের সব চা-বাগানের সার্বিক কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। উৎপাদনের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চা নিলাম কেন্দ্র চালু রাখা, সঠিক সময়ে ভর্তুকি মূল্যে সার বিতরণ, চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, রেশন ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করায় গত আগস্ট মাসে চা উৎপাদনে রেকর্ড হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আশা করছি, আগামী দিনগুলোতেও এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে। ২০২৫ সালের মধ্যে ১৪ কোটি কেজি চা উৎপাদনের যে লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি, তা পূরণ হবে। ১ কোটি কেজি চা রপ্তানির মাইলফলকও অর্জন করা সম্ভব হবে।’

৫৫ শতাংশই উৎপাদন হয় মৌলভীবাজারে

দেশে উৎপাদিত চায়ের বড় অংশ আসে মৌলভীবাজার জেলার বাগানগুলো থেকে। মোট উৎপাদিত চায়ের ৫৫ শতাংশ উৎপাদন হয় এই জেলায়। এরপর আছে হবিগঞ্জ জেলা, যেখানে উৎপাদিত হয় ২২ শতাংশ। এ ছাড়া উত্তরবঙ্গে ১০ শতাংশ, সিলেট জেলায় ৭ শতাংশ ও চট্টগ্রামে ৬ শতাংশ উৎপাদন হয়।

চা-বাগানমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহ আলম বলেন, ‘চায়ের উৎপাদন নির্ভর করে আবহাওয়ার ওপর। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উৎপাদন ভালো হয়; প্রতিকূল থাকলে কম হয়।

‘তবে, দেশে চায়ের উৎপাদন বাড়াতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। চা বোর্ড কাজ করছে, চা গবেষণা ইনস্টিটিউট কাজ করছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় চা উৎপাদন শুরু হয়েছে। এসব কারণে চায়ের উৎপাদন এখন বাড়তেই থাকবে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি থেকেও মোটা অঙ্কের বিদেশি মুদ্রা দেশে আসবে।’

চায়ে নীরব বিপ্লব

রপ্তানি ফের বাড়ছে

দেশে চায়ের চাহিদা বাড়তে থাকায় দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানি কমছিল। কমতে কমতে ২০১৯ সালে ৬ লাখ কেজিতে নেমে আসে। ২০২০ সালে আবার বাড়তে শুরু করে রপ্তানি। রপ্তানিকারকেরা গত বছর ২১ লাখ ৭০ হাজার কেজি চা রপ্তানি করেছে। এ থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। গত দুই দশকে চা থেকে রপ্তানি আয় সবচেয়ে বেশি ছিল ২০০৮ সালে; ৮৪ লাখ কেজি থেকে ৯৭ কোটি ৬৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা আয় হয়েছিল।

তবে, পরিমাণের দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি চা রপ্তানি হয়েছিল ২০০২ সালে। ওই বছরে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা রপ্তানি হয়। দেশে এসেছিল ৯৪ কোটি টাকা। তার আগের বছরে ২০০১ সালে ৮৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা আয় হয়েছিল ১ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার কেজি রপ্তানি করে।

আন্তর্জাতিক বাজারে চায়ের দাম এবং যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারের দামের ওপর নির্ভর করে প্রকৃত রপ্তানি আয়ের হিসাব।

সমতল জমি থেকে আসছে ১০ শতাংশ

বাংলাদেশে চায়ের অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকায় উৎপাদনও বেড়েছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। ২০০১ সালে দেশে ৫ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়েছিল; চাহিদা ছিল ৩ কোটি ৬৯ লাখ ৫০ হাজার কেজি। চাহিদা মেটানোর পর ১ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার কেজি রপ্তানি করে ৯০ কোটি টাকা আয় হয়েছিল।

২০১৯ সালে সেই চায়ের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ৯ কোটি ৬০ লাখ ৭০ হাজার কেজি হয়। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়ে হয় ৯ কোটি ৫২ লাখ ডলার। ওই বছরে ৬ লাখ কেজি চা রপ্তানি করে আয় হয় ১৯ কোটি ৪২ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ২০২০ সালে উৎপাদন খানিকটা কমে ৮ কোটি ৬৩ লাখ ৯০ হাজার কেজিতে নেমে আসে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা কত ছিল, তার হিসাব এখনও প্রকাশ করেনি চা বোর্ড। তবে, রপ্তানি এক লাফে সাড়ে তিন গুণ বেড়ে ২১ লাখ ৭০ হাজার কেজি ওঠে; আয় বেড়ে হয় ৩৪ কোটি ৭১ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

চলতি ২০২১ সালের আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ৫ কোটি ২১ লাখ ৪০ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়েছে দেশে। এর মধ্যে আগস্ট মাসেই হয়েছে ১ কোটি ৪০ লাখ কেজি। রপ্তানি হয়েছে ৩ লাখ ৯০ লাখ কেজি; আয় হয়েছে ১০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানি বাড়াতে ২০২৫ সাল নাগাদ চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ কোটি কেজি নির্ধারণ করেছে সরকার।

সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ও চাহিদা মেটাতে পাহাড়ি উঁচু জমির পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর সমতল জমিতেও চা চাষ হচ্ছে; যা চায়ের মোট চাহিদার ১০ শতাংশের বেশি পূরণ করছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ চা বোর্ড।

উত্তরাঞ্চলে পঞ্চগড় জেলায় ১৯৯৬ সালে প্রথম চা চাষের বিষয়ে গবেষণা শুরু হয়। এরপর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা চাষ শুরু হয় ২০০০ সাল থেকে। তার ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাট এবং ২০১৪ সালে দিনাজপুর ও নীলফামারী জেলায় বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয়।

শুরু ১৮৫৪ সালে

ব্রিটিশ ভারতের বাংলাদেশ অংশে প্রথম বাণিজ্যিকভিত্তিতে চা চাষ শুরু হয় সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগানে ১৮৫৪ সালে। সেই সময় থেকে চায়ের রপ্তানি হতো।

বর্তমানে বাংলাদেশে ১৬৭টি নিবন্ধিত চা-বাগান ও টি এস্টেট রয়েছে বলে জানিয়েছে চা বোর্ড। এর মধ্যে সিলেট বিভাগেই রয়েছে ১২৯টি বাগান ও টি এস্টেট।

চা-বাগান করতে গেলে ন্যূনতম ২৫ একর জমি লাগে। অন্য দিকে এস্টেট হলো চা পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ ও শ্রমিক-কর্মচারীর মৌলিক সুযোগ সুবিধাসহ চা-বাগান।

সে হিসাবে বাংলাদেশে ২ লাখ ৮০ হাজার একর জমিতে নিবন্ধিত বাগানে চা চাষ হচ্ছে। তবে অনিবন্ধিত, ক্ষুদ্র পরিসরের বাগান এর দ্বিগুণ বলে জানিয়েছেন চা সংশ্লিষ্টরা।

চায়ে নীরব বিপ্লব

সমতল ভূমিতে চা চাষ

পাহাড়ি এলাকায় এত বছর চা চাষ হয়ে এলেও ২০০০ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, লালমনিরহাটসহ কয়েকটি জেলায় ছোট ছোট বাগানে সেরা মানের চা চাষ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।

সমতল ভূমিতে উৎপাদিত এই চা বাংলাদেশে চায়ের মোট চাহিদা পূরণে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে বলে জানান চা বোর্ডের চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘চায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য আমরা সমতলকে বেছে নিয়েছি। এ জন্য আমরা ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় চা চাষের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছি। এ ছাড়া বেসরকারি পর্যায়েও কেউ ক্ষুদ্র পরিসরে চা চাষ করতে চাইলে আমরা উদ্বুদ্ধ করছি। সারা দেশে চা চাষ ছড়িয়ে দেয়ার জন্য কাজ করছি আমরা।’

চাষিদের চা চাষের প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার মাটি পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে সেগুলো চা চাষের উপযোগী কি না। যেসব ভূমি উপযুক্ত নয়, সেগুলো উপযোগী করে তুলতে কাজ করা হচ্ছে বলে জানান জহিরুল ইসলাম।

উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই

বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) আটটি গবেষণা বিভাগ এবং তিনটি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে গবেষণা এবং প্রযুক্তির উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে। পাঁচটি কর্মসূচির মাধ্যমে বিটিআরআইর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। প্রতিটি কর্মসূচি এলাকায় এক বা তারও অধিক গবেষণা বিভাগ কর্মসূচি সম্পাদন করে থাকে।

অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে এবং রপ্তানি বাড়াতে উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করেন চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোহাম্মদ আলী।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘উচ্চ ফলনশীল জাতের মাধ্যমে প্রতি হেক্টরে চায়ের উৎপাদন বাড়তে হবে। আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করছি; গবেষণা করছি।’

সত্তরের দশকে বাংলাদেশে প্রতি হেক্টরে ৭৩৫ কেজি চা উৎপাদন হতো। সেই উৎপাদন বেড়ে এখন জমিভেদে প্রতি একরে ১৫০০ থেকে ৩৫০০ কেজিতে দাঁড়িয়েছে।

এ ধরনের উচ্চফলনশীল জাত বের করে উপযুক্ত মাটিতে চাষাবাদ শুরু করা প্রয়োজন বলে জানান মোহাম্মদ আলী। এ ছাড়া পোকামাকড়, আগাছা দমন, সেই সঙ্গে অতিবৃষ্টির মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা উন্নত করার তাগিদ দেন তিনি।

নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত যে পাঁচ মাস শুষ্ক মৌসুম, এই সময়ে চায়ের ফলন ঠিক রাখতে খরাসহিষ্ণু চায়ের দুটি জাত উদ্ভাবন করেছে চা গবেষণা ইনস্টিটিউট। এই উচ্চফলনশীল ও খরাসহিষ্ণু জাতগুলো চাষিদের কাছে দ্রুত বিতরণ করা গেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব বলে জানান তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অতিবৃষ্টি সহনশীল জাত উদ্ভাবনের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানান মোহাম্মদ আলী।

চায়ে নীরব বিপ্লব

এখন আর আমদানি করতে হয় না

এক দশক আগেও ছিল শঙ্কা। রপ্তানি তো হবেই না, উল্টো চায়ের বড় আমদানিকারক দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তাতে প্রতিবছর হাতছাড়া হবে বৈদেশিক মুদ্রা।

এখন সেই শঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন উদ্যোক্তারা। বড় আমদানিকারক দেশ তো হয়নি, উল্টো রপ্তানিতে দিচ্ছে সুখবর।

উৎপাদন দিয়ে চাহিদা না মেটায় ২০০৯ সালে চা আমদানি শুরু হয়। সর্বোচ্চ আমদানির রেকর্ড ছিল ২০১৫ সালে; মোট ৯৩ লাখ কেজি।

চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘এখন চা আমদানি হয় না বললেই চলে। খুবই ভালো মানের বেশি দামি কিছু আমদানি হয়; যেগুলো অভিজাত লোকজন কিনে থাকেন।’

চায়ে এই সুদিনের নেপথ্যে আছে এক দশক ধরে চা বোর্ড ও উদ্যোক্তাদের নানা উদ্যোগ। এক দশক আগে চা বোর্ড উৎপাদন বাড়ানোর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে। উদ্যোক্তারা শত বছরের পুরোনো বাগানগুলো সংস্কার করেন। পুরোনো-পরিত্যক্ত বাগান চা চাষের আওতায় আনা হয়। সমতল ভূমিতে চা চাষ সম্প্রসারণ হয় এ সময়। বাজারে ভালো দাম থাকায় চা চাষে মনোযোগী হন উদ্যোক্তারা। তাতেই এই সুফল এসেছে বলে মনে করেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।

চা উৎপাদন ও রপ্তানিতে অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ফিনলের পরিচালক এ কিউ আই চৌধুরী বলেন, ‘চা এখন আর আমদানিনির্ভর নয়। দেশীয় উৎপাদন দিয়ে চাহিদা পূরণ হচ্ছে। চাহিদার চেয়ে উৎপাদন যত বেশি বাড়বে, রপ্তানির সম্ভাবনাও তত বাড়বে।’

প্রায় ৫২ বছর ধরে চা-শিল্পের সঙ্গে জড়িত এ কিউ আই চৌধুরীর বলেন, ‘উৎপাদনের মতো রপ্তানিতেও ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। সরকার চা রপ্তানিতে ৪ শতাংশ হারে নগদ সহায়তার যে ঘোষণা দিয়েছে, তাতে রপ্তানি বাড়বে। এটি খুবই ভালো একটি সিদ্ধান্ত।’

চায়ে নীরব বিপ্লব

সুদিন ফিরেছে

বাংলাদেশে চায়ের সুদিন ধরা হয় নব্বই দশককে। লন্ডনভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল টি কমিটি’র ১৯৮৩ সালের বার্ষিক বুলেটিনে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে চা রপ্তানির প্রথম বছরেই বিশ্ববাজারে এ দেশের অবস্থান ছিল নবম অবস্থানে। রপ্তানি আয়ের হিসাবে ১৯৮১ ও ১৯৮২ সালে ষষ্ঠ অবস্থানে উন্নীত হয়। এখন পঞ্চম অবস্থানে থাকা ভিয়েতনাম তখন ছিল ১৮তম।

রপ্তানির পরিমাণের হিসাবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি চা রপ্তানি হয় ১৯৮২ সালে। সে বছর ৩ কোটি ৪৪ লাখ কেজি চা রপ্তানি করে ৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয় হয়। তখন দেশে চা উৎপাদন হয় ৪ কোটি ৯ লাখ কেজি। এখন উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে। দেশে চাহিদা বেশি বাড়ায় অবশ্য তখনকার মতো রপ্তানি হচ্ছে না।

সে সময় এক কোটি কেজি উৎপাদন বাড়াতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১১-১২ বছর। এখন এক বছরেই কোটি কেজি উৎপাদন বাড়ে।

বাংলাদেশ চা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শাহ মঈনুদ্দীন হাসান বলেন, ‘উদ্যোক্তা ও চা বোর্ডের সম্মিলিত চেষ্টার সুফল এখন দ্রুত পাওয়া যাচ্ছে চা খাতে। একসময় মনে হচ্ছিল, অন্যান্য পণ্যের মতো চা আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হবে। কিন্তু এখন সুদিন ফিরেছে। উৎপাদন বাড়ছে; রপ্তানি বাড়ছে।’

চায়ে নীরব বিপ্লব

বেশি দামের চা

উৎপাদনে রেকর্ড হচ্ছে, রপ্তানি বাড়ছে। এতেই থেমে থাকতে চান না উদ্যোক্তারা। কালো চায়ের বাইরে সবুজ চা উৎপাদন বাড়িয়েছেন তারা। আবার হোয়াইট টি বা সাদা চা, মসলা চায়ের মতো বহুমুখী পণ্য এনেছেন উদ্যোক্তারা।

ফিনলে, পেডরোলো, কাজী অ্যান্ড কাজীর মতো গ্রুপ নতুন নতুন চা উৎপাদনে নজর দিয়েছে। হালদা ভ্যালির মতো একসময় পরিত্যক্ত বাগানে এখন উৎপাদন হচ্ছে হোয়াইট টি, যেটি সাধারণ চায়ের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি দামি।

হালদা ভ্যালির মালিকানায় থাকা পেডরোলো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাদের খান বলেন, সাধারণ মানের চায়ের চেয়ে সবুজ চা, সাদা চায়ের মূল্য অনেক বেশি। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদাও ভালো। সে জন্য হালদা ভ্যালি বাগানে উচ্চ মূল্যের চা তৈরির আওতা বাড়ানো হচ্ছে।

বিশ্ববাজার

২০১৮ সালে বিশ্বে চায়ের বাজারের আকার ছিল ২৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সারা বিশ্বে রপ্তানি হয়েছে ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের চা। রপ্তানির বাজারের দুই-তৃতীয়াংশ চীন, ভারত, কেনিয়া ও শ্রীলঙ্কার দখলে। পঞ্চম অবস্থানে আছে ভিয়েতনাম। বিশ্বের ৩৫টি দেশে চা উৎপাদন হয়। এ তথ্য গবেষণা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ইনডেক্সবক্সের।

বাংলাদেশে চা রপ্তানি থেকে আয় এখনও খুবই কম। রপ্তানি আয় বাড়াতে চায়ের পণ্যে বহুমুখীকরণের (সুগন্ধি ও ওষুধশিল্পে ব্যবহার) ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ফিনলের পরিচালক এ কিউ আই চৌধুরী বলেন, ‘চায়ের বৈচিত্র্য বাড়ানো গেলে রপ্তানি বাজার আরও ভালোভাবে দখল করা সম্ভব।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য

হিন্দু ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠানে হামলার নিন্দা এফবিসিসিআই-এর

হিন্দু ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠানে হামলার নিন্দা এফবিসিসিআই-এর

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন হিসেবে এফবিসিসিআই সাম্প্রদায়িক হামলার নিন্দা জানিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সহ প্রশাসন ও আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হিন্দু ব্যবসায়ীদের জানমাল রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানায়।

হিন্দু ব্যবসায়ীদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও হামলার নিন্দা জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রি (এফবিসিসিআই)।

রোববার এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই নিন্দা জানানো হয়।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, কুমিল্লায় গত বুধবার সকালে পবিত্র কোরআন অবমাননার খবরের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ও সংঘর্ষ হয়। ওই ঘটনায় বেশ কয়েকটি জেলার হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার তথ্য জানিয়েছে এফবিসিসিআইকে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন হিসেবে এফবিসিসিআই এ হামলার নিন্দা জানিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সহ প্রশাসন ও আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হিন্দু ব্যবসায়ীদের জানমাল রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানায়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, জন্মলগ্ন থেকেই অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী বাংলাদেশ। এ দেশে সব সময়ই মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ সব ধর্মের মানুষের সহাবস্থান ও সুসম্পর্ক বিদ্যমান। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত উদ্যোগেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মহাসড়কে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। এফবিসিসিআই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ভর করেই সব ধর্মের মানুষের যৌথ অবদানে অর্থনৈতিকভাবে আরও সুদৃঢ় অবস্থানে যাবে বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন

আবার বাড়ছে সয়াবিন তেলের দাম

আবার বাড়ছে সয়াবিন তেলের দাম

এক বছরেরও বেশি সময় ধরেই ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা চলছে বিশ্বে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। ছবি: নিউজবাংলা

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ভোজ্যতেল ও চিনি ব্যবসায়ীদের এক বৈঠকে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, লিটারে বাড়বে ৭ টাকা। তবে বাণিজ্যমন্ত্রী পরে এই বিষয়টি চূড়ান্ত করবেন। তেলের পাশাপাশি চিনির দামও বাড়বে বলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

করোনা নিয়ন্ত্রণে আসার পর বেড়ে চলা পণ্যমূল্যের কারণে বিপাকে পড়া মানুষকে আরও বেশি খরচ করতে হবে খাদ্য তৈরিতে। কারণ, খুচরা বাজারে ভোজ্যতেলের দাম আরেক দফা বাড়তে যাচ্ছে।

খোলা ও বোতলজাত উভয় ধরনের সয়াবিনের দাম লিটার প্রতি ৭ টাকা বাড়ানোর একটি প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কত বাড়বে, তার চাবি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির হাতে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে মন্ত্রণালয় যে প্রস্তাব তৈরি করেছে, তাতে এক লিটার খোলা সয়াবিন বাজারে বিক্রি হবে ১৩৬ টাকা। অনুরূপভাবে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি হবে ১৬০ টাকা এবং পাঁচ লিটারের দাম পড়বে ৭৬০ টাকা।

রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ভোজ্যতেল ও চিনি ব্যবসায়ীদের এক বৈঠকে প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব তৈরি করা হয়। তবে গত ১৪ অক্টোর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক ১০ শতাংশ শুল্ক কমানোর ঘোষণায় চিনির দাম বাড়ানোর বিষয়ে বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।

চিনির ওপর আরোপিত শুল্ক ১০ শতাংশ কমানোয় কেজিপ্রতি দাম কমবে সাড়ে তিন টাকা। কিন্তু শুল্ক প্রত্যহারের সুবিধা বাজারে সহসাই পড়বে না। কারণ শুল্ক সুবিধায় যে চিনি আমদানি হবে সে চিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে সময় লাগে আরও দেড় থেকে দুই মাস।

অন্যদিকে বিশ্ববাজারে পণ্যটির কাঁচামালের অব্যাহত দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে দেশে যে চিনি বিক্রি হচ্ছে তার ক্রয়মূল্যও বেশি। ফলে নতুন করে দাম পুনঃনির্ধারণ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সাড়ে তিন টাকা শুল্ক কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া সত্ত্বেও নতুনভাবে চিনির দাম পুনঃনির্ধারণের ক্ষেত্রে সেটি ৮০ টাকার কম হবে না।

এর আগে গত ৬ সেপ্টেম্বর লিটারে তেলে দাম বাড়ানো হয় ৪ টাকা। ওই দাম বাজারে কার্যকর হওয়ার পর বর্তমানে বোতলজাত সয়াবিনের দাম নির্ধারিত আছে লিটারপ্রতি ১৫৩ টাকা এবং পাঁচ লিটারের দাম ৭২৮ টাকা। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছিল ১২৯ টাকা।

মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও আমদানি) এএইচএম সফিকুজ্জামান বৈঠকে সভাপত্বি করেন। এতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন ছাড়াও মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন এর সদস্য প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন এর উত্থাপিত দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে প্রাথমিক সম্মতি দেয়া হয়েছে। তবে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।

মন্ত্রী বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দাম বাড়ানোয় সম্মতিও দিতে পারেন কিংবা সুপারিশকৃত বর্ধিত দাম আরও কিছু সংশোধন করতে পারেন অথবা সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে আরও কিছু দিন বর্তমান নির্ধারিত দামেই সয়াবিন তেল বিক্রি করতে ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করতে পারেন।

তবে সেটি কতটা ফলপ্রসূ হবে সেটি নিয়ে যেমন সংশয় রয়েছে। একইভাবে ভোজ্যতেলে শুল্ক না কমালে এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির অবনতি না হলে দাম বাড়ানো ছাড়াও বিকল্প কোনো পথ খোলা থাকবে না। সব কিছু কাল সোমবার পরিষ্কার হতে পারে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রাথমিক বৈঠকের পর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এখন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বৈঠকে বসেছেন।

শেয়ার করুন

বিল গেটস-ওয়ারেন বাফেটের সমান সম্পত্তি ইলন মাস্কের

বিল গেটস-ওয়ারেন বাফেটের সমান সম্পত্তি ইলন মাস্কের

চলতি বছরের জানুয়ারিতে জেফ বেজোসকে ছাড়িয়ে শীর্ষ ধনী হন ইলন মাস্ক। ছবি: সিএনবিসি

সম্পত্তির দিক থেকে মাস্কের ধারেকাছেও নেই বেজোস, গেটস বা বাফেট। তবে ধারণা করা হয়, মানবকল্যাণে বিপুল পরিমাণ অর্থ দান না করছে সম্পত্তির দিক থেকে মাস্কের অনেক কাছাকাছি থাকতেন গেটস ও বাফেট। অনেক বছর ধরে বিভিন্ন দাতব্য কাজে কয়েক হাজার কোটি ডলারের সহায়তা দিয়েছেন এই দুই ধনকুবের। অন্যদিকে নিজের বিশাল সম্পত্তির ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও দাতব্য কাজে অর্থ ব্যয় করেন না বলে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত মাস্ক।

বিশ্বের শীর্ষ ধনী হয়েই থেমে নেই ইলন মাস্ক; শীর্ষ ১০ ধনকুবেরের তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য দুই ব্যক্তি বিল গেটস ও ওয়ারেন বাফেটের সম্পত্তির সমপরিমাণের মালিক মাস্ক একাই।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়, টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ৫০ বছর বয়সী ইলন মাস্কের সম্পত্তির মূল্য বর্তমানে ২৩ হাজার কোটি ডলার।

বিশ্বের এক সময়ের শীর্ষ দুই ধনী বিল গেটস ও ওয়ারেন বাফেটের সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্যের যোগফল ২৩ হাজার কোটি ডলার।

বিশ্বের শীর্ষ ধনীর তালিকায় বর্তমানে চতুর্থ অবস্থানে বিল গেটস ও দশম অবস্থানে ওয়ারেন বাফেট আছেন। মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা গেটসের সম্পত্তির পরিমাণ ১৩ হাজার কোটি ডলার। বার্কশায়ার হ্যাথওয়ের প্রধান নির্বাহী বাফেটের আছে ১০ হাজার কোটি ডলারের সম্পত্তি।

২০১৭ সাল থেকে বিশ্বের শীর্ষ ধনীর অবস্থানটি ধরে রেখেছিলেন সর্ববৃহৎ অনলাইন মার্কেটপ্লেস অ্যামাজনের প্রধান নির্বাহী জেফ বেজোস। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বেজোসকে ছাড়িয়ে শীর্ষ ধনী হন মাস্ক।

বর্তমানে শীর্ষ ধনীর তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বেজোসের সম্পত্তির পরিমাণ ১৯ হাজার কোটি ডলারের বেশি। অর্থাৎ সম্পত্তির দিক থেকে মাস্কের ধারেকাছেও নেই বেজোস, গেটস বা বাফেট।

তবে ধারণা করা হয়, মানবকল্যাণে বিপুল পরিমাণ অর্থ দান না করছে সম্পত্তির দিক থেকে মাস্কের অনেক কাছাকাছি থাকতেন গেটস ও বাফেট। অনেক বছর ধরে বিভিন্ন দাতব্য কাজে কয়েক হাজার কোটি ডলারের সহায়তা দিয়েছেন এই দুই ধনকুবের।

অন্যদিকে নিজের বিশাল সম্পত্তির ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও দাতব্য কাজে অর্থ ব্যয় করেন না বলে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত মাস্ক। যদিও তার দাবি, দানের বিষয়ে নিজের পরিচয় গোপন রাখতে চান তিনি।

অবশ্য চলতি বছর কার্বণবিরোধী একটি প্রতিযোগিতায় পুরস্কার হিসেবে ১৫ কোটি ডলার দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মাস্ক। তার প্রকাশ্য দাতব্য কর্মসূচির মধ্যে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অংকের অর্থ।

পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও বিদ্যুৎচালিত গাড়িনির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা পুঁজিবাজারে আগের চেয়েও বেশি শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে যাওয়ায় চলতি বছর মাস্কের ঝুলিতে যোগ হয়েছে ছয় হাজার কোটি ডলারের বেশি সম্পত্তি।

এ ছাড়া পুঁজিবাজারে মাস্কের মালিকানাধীন আরেকটি প্রতিষ্ঠান- মহাকাশযান প্রস্তুতকারক ও মহাকাশযাত্রা সেবাদানকারী স্পেসএক্স সম্প্রতি কিছু শেয়ার বিক্রি করে, যার মূল্য ১০ হাজার কোটি ডলার।

ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার সঙ্গে সাম্প্রতিক চুক্তির মাধ্যমে আরও এক হাজার ১০০ কোটি ডলার যুক্ত হয়েছে স্পেসএক্সের ঝুলিতে।

শেয়ার করুন

পেঁয়াজের বাজারে কারসাজি, নিশ্চিত এফবিসিসিআই

পেঁয়াজের বাজারে কারসাজি, নিশ্চিত এফবিসিসিআই

সরকার আমদানি শুল্ক কমানোর ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেঁয়াজের দাম কমেছে। ফাইল ছবি

পেঁয়াজের দাম কমাতে সরকার দ্রুত আমদানি শুল্ক কমিয়েছে। এমন সিদ্ধান্তের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিত্যপণ্যটির দাম কমেছে। হ্রাসকৃত হারে শুল্ক পরিশোধ করা পেঁয়াজ বাজারে আসার আগে দাম কমে যাওয়া স্বাভাবিক নয়। এই ঘটনাই বলে দেয় পেঁয়াজের বাজারে অস্বাভাবিক কোনো বিষয় রয়েছে বলে জানান এফবিসিসিআই সভাপতি।

নিত্যপণ্যের যে ঊর্ধ্বগতি, তার পেছনে কারসাজি রয়েছে বলে মনে করে খোদ ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই।

বিশেষ করে পেঁয়াজের দাম নিয়ে যা ঘটেছে, তার উল্লেখ করে সংগঠনের সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, সরকার আমদানি শুল্ক কমানোর ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে যাওয়াই প্রমাণ করে যে, এই পণ্যের যে বাজারদর ছিল সেটি স্বাভাবিক ছিল না।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, নিত্যপণ্যের বাজারে কারসাজিতে জড়িত অল্প কয়েকজন ব্যবসায়ী। অর্থনীতি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য দূরীকরণে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখার পরেও, কয়েকজনের জন্য পুরো ব্যবসায়ী সমাজের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে।

রোববার রাজধানীর এফবিসিসিআই কার্যালয়ে ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর মজুদ, আমদানি, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি’ বিষয়ে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন ব্যবসায়ী নেতারা।

পেঁয়াজের বাজারে কারসাজি, নিশ্চিত এফবিসিসিআই

এফবিসিসিআই কার্যালয়ে ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর মজুদ, আমদানি, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি’ বিষয়ে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন ব্যবসায়ী নেতারা। ছবি: নিউজবাংলা

গত দুই বছর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পর বাংলাদেশে পণ্যটির দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। ২০১৯ সালে কেজি প্রতি পেঁয়াজ বিক্রি হয় দুইশ থেকে আড়াইশ টাকায়। ২০২০ সালে দাম অতটা না বাড়লেও কেজিতে ১২০ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

এবারও অক্টোবরের শুরুতে এক সপ্তাহের মধ্যে পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। ভারত আবার রপ্তানি বন্ধ করে দেবে, এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার পর এই ঘটনা ঘটে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে পরে নিশ্চিত করা হয় এবার নিষেধাজ্ঞা আসছে না আর এরপর পণ্যটির দাম কমতে শুরু করে।

পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ওপর আলোচনা করতে গিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম কমাতে সরকার দ্রুত আমদানি শুল্ক কমিয়েছে। এমন সিদ্ধান্তের কয়েক ঘন্টার মধ্যে পণ্যটির দাম কমেছে। হ্রাসকৃত হারে শুল্ক পরিশোধ করা পেঁয়াজ বাজারে আসার আগে দাম কমে যাওয়া স্বাভাবিক নয়। এই ঘটনাই বলে দেয় পেঁয়াজের বাজারে অস্বাভাবিক কোনো বিষয় রয়েছে।’

নিত্যপণ্য বিক্রিতে অস্বাভাবিক মুনাফা হচ্ছে-এই অভিযোগও করেন জসিম উদ্দিন। বলেন, ‘শ্যামবাজারে এক আড়ত থেকে আরেক আড়তে ভিন্ন ভিন্ন দামে পেঁয়াজ পাইকারি বিক্রি হয়। আবার খুচরা বাজারেও এক বাজার থেকে আরেক বাজারে দামের পার্থক্য কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা। এই অবস্থা অস্বাভাবিক।’

তিনি বলেন, ‘আমরা অবশ্যই ব্যবসা করব, কিন্তু এমন কিছু করব না, যাতে পুরো ব্যবসায়ী সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

আলোচনায় পেঁয়াজের আড়তদার ও আমদানিকারকরা দাম বৃদ্ধি ও কমার পেছনে নানা যুক্তি দেন। পেঁয়াজ পরিবহনে চাঁদাবাজি, ভারতে বৃষ্টি এবং সরকারের বেঁধে দেয়া দামের চেয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল দেয়ার কারণে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যটির দাম বেড়েছে।

এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, ‘দোকানিদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিল নেয়ার কাজ মালিক সমিতির নয়। এ দায়িত্ব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির।’

এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দেন এফবিসিসিআই সভাপতি। ব্যবসায়ীদের এমন আরও কোনো সমস্যা থাকলে তা এফবিসিসিআইকে জানানোর আহ্বানও জানান।

এক সপ্তাহের মধ্যে এফবিসিসিআই'র স্ট্যান্ডিং কমিটির কার্যক্রম শুরু হবে জানিয়ে সভাপতি বলেন, ‘কমিটিগুলো ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানে নিরলসভাবে কাজ করবে।’

সংগঠনের সহ-সভাপতি এম এ মোমেন, আমিনুল হক শামীম, হাবিব উল্লাহ ডন, পরিচালক ও সাবেক সহ-সভাপতি রেজাউল করিম রেজনুসহ অন্যান্য পরিচালক এবং এফবিসিসিআইয়ের প্রধান নির্বার্হী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহফুজুল হকও এতে বক্তব্য রাখেন।

চাল ও পেঁয়াজের আমদানিকারক, আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিনিধি ও রাজধানীর বিভিন্ন বাজার সমিতির ব্যবসায়ী নেতারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন

ই-কমার্স: গেটওয়েতে আটকা টাকা ফেরত দিতে আইনি নোটিশ

ই-কমার্স: গেটওয়েতে আটকা টাকা ফেরত দিতে আইনি নোটিশ

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ‘কনশাস কনজ্যুমার্স সোসাইটি’ (সিসিএস)। ছবি: সংগৃহীত

কনশাস কনজ্যুমার্স সোসাইটির নোটিশে ই-কমার্সে অর্ডার করেছেন কিন্তু পণ্য পাননি এমন গ্রাহকদের অর্থ কেন ফেরত দেয়া হবে না তা আগামী সাত দিনের মধ্যে জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ই-কমার্সে পেমেন্টের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত নিয়ম (এস্ক্রো সিস্টেম) সংশোধন করে গ্রাহকের টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত পাওয়ার স্থায়ী পদ্ধতি কেন চালু করা হবে না তা বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে পণ্য কিনতে গিয়ে পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে থাকা টাকা গ্রাহকদের ফেরত দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সাত প্রতিষ্ঠানের দশ কর্তাব্যক্তিকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ‘কনশাস কনজ্যুমার্স সোসাইটি’ (সিসিএস)।

শনিবার সিসিএস এর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সাবরিনা জারিন ডাকযোগে এ নোটিশ পাঠান।

নোটিশে ই-কমার্সে অর্ডার করেছেন কিন্তু পণ্য পাননি এমন গ্রাহকদের অর্থ কেন ফেরত দেয়া হবে না তা আগামী সাত দিনের মধ্যে জানতে চাওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে ই-কমার্সে পেমেন্টের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত নিয়ম (এস্ক্রো সিস্টেম) সংশোধন করে গ্রাহকের টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত পাওয়ার স্থায়ী পদ্ধতি কেন চালু করা হবে না তা বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে।

এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও ব্যাংকটির পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের মহাব্যবস্থাপক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ও একই মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের মহাপরিচালক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বিকাশ ও নগদ, পেমেন্ট গেটওয়ে এসএসএল ওয়্যারলেস, ফোস্টার পে এবং সূর্য পে- এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের এ নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে সিসিএস এর আইনজীবী ব্যারিস্টার সাবরিনা জারিন বলেন, ‘আমরা সিসিএস থেকে প্রায় সাড়ে তিন’শ ভুক্তভোগীর সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছি। এস্ক্রোতে টাকা আটকে থাকা নিয়ে বেশ জটিলতা হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। লিগ্যাল নোটিশের পর আদালতে যাওয়া হবে।

সিসিএস এর নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ বলেন, ‘এস্ক্রো সিস্টেমে গ্রাহকের টাকা আটকে আছে। এখন গেটওয়েগুলো বলছে, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বা সরকারের অনুমতি লাগবে। কিন্তু আমার টাকা আমি ফেরত পেতে কেন ই-কমার্সের অনুমতির জন্য আটকে থাকতে হবে? হাজার হাজার ভোক্তার কোটি কোটি টাকা আটকে থাকছে। এটা নিয়ে একটু সুষ্ঠু সমাধান হওয়া দরকার। এজন্য আইনি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ই-কমার্সে কোনো গ্রাহক পণ্যের অর্ডার দিলে তার টাকা বর্তমানে পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে থাকে। পণ্য ডেলিভারি হওয়ার পর প্রমাণ জমা দিয়ে সেই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান টাকা ছাড় পান। গত ৩০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগ থেকে এক নির্দেশনায় এ পদ্ধতি চালু করা হয়। কিন্তু গ্রাহক পণ্য না পেলেও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের অনুমতি ছাড়া টাকা ফেরত পান না। ফলে গ্রাহকের টাকা আটকে থাকছে। এ পদ্ধতি চালু হওয়ার পর থেকে ইতিমধ্যে গ্রাহকের কয়েক’শ কোটি টাকা গেটওয়েগুলোতে আটকে আছে।

শেয়ার করুন

ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে প্রস্তাব বাতিল

ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে প্রস্তাব বাতিল

সন্ধ্যা নামতেই আলো ঝলমলে দৃষ্টিনন্দন ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে। ছবিটি মাওয়া অংশ থেকে তুলেছেন সাইফুল ইসলাম।

এক্সপ্রেসওয়ের বদলে এখন ঢাকা–চট্টগ্রাম বিদ্যমান ৪ লেন মহাসড়ক আরও প্রশস্তকরণ এবং সড়কের উভয় পাশে পৃথক সার্ভিস লেন নির্মাণ করা হবে।

সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা ঢাকা–চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প থেকে সরে এল সরকার। প্রকল্পটি আর পিপিপিতে হচ্ছে না।

তার বদলে সরকারি অর্থায়নে এখন ঢাকা–চট্টগ্রাম বিদ্যমান ৪ লেন মহাসড়ক আরও প্রশস্তকরণ এবং সড়কের উভয় পাশে পৃথক সার্ভিস লেন নির্মাণ করা হবে।

অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভায় কমিটির (একনেক) বৈঠকে রোববার এ সংক্রান্ত প্রকল্প প্রস্তাব বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শামসুল আরেফিন ভার্চুয়াল সভায় সাংবাদিকদের এ কথা জানান।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সভায় সভাপতিত্ব করেন।

মন্ত্রিপরিষদের অতিরিক্ত সচিব জানান, আলোচ্য প্রকল্পটি পিপিপিতে হবে না। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব বৈঠকে উপস্থাপন করা হলে নীতিগতভাবে তা বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়।

এক্সপ্রেসওয়ের পরিবর্তে বিদ্যমান চার লেন মহাসড়ককে প্রশস্ত করা হবে বলে জানান তিনি।

ঢাকা–চট্টগ্রাম চার লেন মহসড়কটি–ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয় অনেক আগেই। এর মধ্যে দুটি হওয়ার কথা ছিল এক্সপ্রেসওয়ে। ২১৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নতুন এক্সপ্রেসওয়েটি বর্তমানে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশেই নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়।

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ এ এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৩৭ হাজার কোটি টাকা।

বর্তমানে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত আট লেন রয়েছে। যে কারণে কাঁচপুর থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে করার পরিকল্পানা নেয়া হয়েছিল।

শেয়ার করুন

দারিদ্র্য বিমোচনে ঈর্ষণীয় সাফল্য, করোনায় কিছুটা ম্লান

দারিদ্র্য বিমোচনে ঈর্ষণীয় সাফল্য, করোনায় কিছুটা ম্লান

দারিদ্র্য বিমোচনে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে বাংলাদেশ। ফাইল ছবি/নিউজবাংলা

খোদ বিশ্বব্যাংক বলছে, দারিদ্র্য বিমোচনে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এই দেশের দারিদ্র্য জয়ের গল্প এখন অনেক দেশেই শোনানো হয়। তবে করোনা মহামারির কারণে বাংলাদেশের দারিদ্র্য জয় করার গতি অনেকটা ধীর হয়ে পড়েছে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ পরিণত হতে চলছে উন্নয়নশীল দেশে। ব্যাপকহারে কমে এসেছে দারিদ্র্যহার। যদিও করোনাভাইরাস মহামারির কারণে অনেকটা থমকে গেছে এই ধারা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ‘বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে যে তকমা লাগিয়েছিলেন, কয়েক দশকের মধ্যে সেই অপবাদ দূর করে সারা বিশ্বে বাংলাদেশ এখন পরিচিতি লাভ করেছে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে।

তবে এটা ঠিক, তখন এ দেশে দারিদ্র্য ভয়াবহ মাত্রায় ছিল। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৯০ শতাংশ। সেই বাংলাদেশে ২০১৯ সালে দারিদ্র্য কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে। আর চরম দারিদ্র্যের হার নেমেছে সাড়ে ১০ শতাংশে।

খোদ বিশ্বব্যাংক বলছে, দারিদ্র্য বিমোচনে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এই দেশের দারিদ্র্য জয়ের গল্প এখন অনেক দেশেই শোনানো হয়।

বর্তমান সরকারের অধীনে দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়নও হচ্ছে অনেক। উন্নত হয়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। পুরোদমে এগিয়ে চলছে পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ও কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল।

যোগাযোগব্যবস্থা অনেক সহজ হয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থার কল্যাণে আয়-উপার্জনের নানা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে জেলা শহর কুমিল্লা যাওয়াটা ঘণ্টা দুয়েকের ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। অথচ একসময় কুমিল্লা থেকে ঢাকা আসতে প্রায় সারা দিন লেগে যেত।

একসময় শুধু শহর এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল। গ্রামে বিদ্যুতের কথা চিন্তাই করা যেত না। এখন ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ। গ্রামে কাঁচা সড়ক পাকা হয়েছে। বিদ্যুতের কল্যাণে ঘরে ঘরে এসেছে টিভি-ফ্রিজ। গ্রামেগঞ্জে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়েছে। বেড়েছে শিক্ষার হার ও নারীর ক্ষমতায়ন।

গ্রামে অকৃষি খাতের বিকাশ ঘটেছে। গড়ে উঠেছে সেবা খাত। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে বদলে গেছে মানুষের জীবনধারা। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে।

মাথাপিছু আয়সহ অর্থনীতির অনেক সূচকে বাংলাদেশ এখন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতকে টপকে গেছে। আর এসব সম্ভব হয়েছে দারিদ্র্যকে জয় করার কারণে।

চাদঁপুরের হাজীগঞ্জ থানার জেলে পরিবারের মেয়ে মাধবী একসময় গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। শারীরিক অক্ষমতার কারণে তেমন কাজকর্ম করতে পারতেন না তার বাবা।

জীবিকার তাগিদে মাধবীদের তিন বোনই চাঁদপুর শহরে বিভিন্ন বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করেছিলেন। তবে ২০ বছর পর এখন তারা সেই অবস্থানে নেই। দিন বদলেছে, ভাগ্য ফিরেছে। তিন বোনই এখন পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। স্বামী-সন্তান নিয়ে তারা ভালোই আছেন।

তৈরি পোশাক খাতে বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে, যার বড় অংশ হচ্ছে নারী। পোশাক কারখানায় কাজ করে অনেকে দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছেন।

এ ছাড়া ধান, সবজি, ফল, মাছ উৎপাদনে অভাবনীয় উন্নতির কারণেও দারিদ্র্য বিমোচনে সফলতা এসেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। মোবাইল সেবা এবং মোবাইল ব্যাংকিংও নতুন নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

তবে বর্তমানে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বাংলাদেশের দারিদ্র্য জয় করার গতি অনেকটা ধীর হয়ে পড়েছে। করোনার সময়ে বেকারত্ব বেড়েছে। কর্মহীন হয়েছেন প্রান্তিক মানুষ।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যই বলেছে, করোনার কারণে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৪০ কোটি লোক নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে এসেছে।

সিপিডি, সানেমসহ বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা বলেছে, করোনার প্রাদুর্ভাবে নতুন করে প্রায় ৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমায় চলে এসেছে এবং এই হার ৪০ শতাংশের ওপরে।

যদিও এই পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্ক আছে। সরকারি পক্ষ থেকে এই তথ্য গ্রহণ করা হয়নি। সম্প্রতি এক সেমিনারে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) বলেছে, করোনায় নতুন দারিদ্র্য বেড়েছিল সত্য, তবে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর ফলে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশে।

দারিদ্র্য দূরীকরণে দেড় দশকে যা কিছু অর্জন, করোনার কারণে তা কিছুটা ম্লান হয়ে যেতে বসেছে। এমন বাস্তবতায় আজ রোববার পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস’।

জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালন করা হয়। দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও অসমতা দূর করাই দিবসটির মূল লক্ষ্য।

১৯৯৫ সালকে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য দূরীকরণ বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে জাতিসংঘ। এরপর থেকেই দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা দেশগুলোতে দারিদ্র্য ও বঞ্চনা দূরীকরণ বিষয়টি গুরুত্ব পেতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় গত কয়েক দশক ধরেই দারিদ্র্য মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ।

এর মধ্যে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। এই বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য দিবসটি আলাদা তাৎপর্য বহন করে।

দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য সারা বিশ্বের জন্যই উদাহরণ দাবি করে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনে সাফল্যের মূল কারণ প্রধানত প্রবৃদ্ধি। উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কাজের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় দ্রুত দারিদ্র্য কমেছে।’

তিনি জানান, গ্রামে যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হয়েছে। বিদ্যুৎব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে। এ ছাড়া কৃষি উৎপাদন বেড়েছে যে কারণে ক্ষুধার্থ মানুষের সংখ্যা কমেছে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কেবল আমরাই এই সাফল্যের কথা বলছি না। বিশ্বব্যাংকও এরই মধ্যে বাংলাদেশকে দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে রোল মডেল হিসেবে ঘোষণা করেছে।’

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭২ সাল থেকে দেশে দারিদ্র্যের হার ক্রমে কমছে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৭৮ শতাংশ। সবশেষ ২০১৯ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। দারিদ্র্য জয়ে বাংলাদেশ মাইলফলক স্থাপন করেছে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়।

বাংলাদেশের এই অর্জন টেকসই ও পরিকল্পিত উন্নয়নের ফল বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়।

শুধু দারিদ্র্য নয়, অতি দারিদ্র্যের হার কমার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। ১৯৭২ সালে দেশে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠী ছিল মোট জনসংখ্যার ৪৪ শতাংশ। সবশেষ ২০১৯ সালে অতিদরিদ্র বা চরম দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১০ শতাংশে।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশে ভালো করেছে। তবে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে: কোভিডের কারণে সারা বিশ্বে নতুন দারিদ্র্য সৃষ্টি হয়েছে। এদের কীভাবে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা যায়, সে বিষয়ে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্যানিটেশন-ব্যবস্থায় নজর দিতে হবে। নতুন নতুন কাজের সযোগ সৃষ্টি করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি হলে চলবে না। প্রবৃদ্ধির সুফল সবাই যাতে সমানভাবে পায়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। নজর দিতে হবে টেকসই উন্নয়নে।’

এমডিজি বা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ যথেষ্টই সফল। তবে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, কোভিড-১৯-এর আগে বাংলাদেশ যে গতিতে এগোচ্ছিল, তাতে এসডিজি অনুযায়ী ২০৩০ সালে দারিদ্র্যমুক্ত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা অনায়াসে অর্জন করে ফেলত। কিন্তু এখন সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শেয়ার করুন