রাজারবাগ পির দিল্লুরের কীভাবে উত্থান

রাজারবাগ পির দিল্লুরের কীভাবে উত্থান

পির মো. দিল্লুর রহমান থাকেন রাজারবাগের এই দরবার শরিফে। ছবি: নিউজবাংলা

প্রকৌশলীর সন্তান দিল্লুর রহমান বিভিন্ন ব্যক্তির সম্পত্তি দখলের জন্য ‘মামলাবাজ সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলেন ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে। এই সিন্ডিকেটের মামলা থেকে আপন ভাইও রেহাই পাননি। পির দিল্লুরের বিরুদ্ধে ধর্মীয় উগ্রপন্থায় মদদ দেয়ার অভিযোগও পুরোনো। 

রাজারবাগ দরবার শরিফের পির মো. দিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তুলে উচ্চ আদালতে গেছেন ভুক্তভোগীরা। এই পিরের বিরুদ্ধে অন্যের সম্পত্তি দখলে গায়েবি মামলা দিয়ে হেনস্তা করার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

রাজারবাগ দরবার শরিফের সব সম্পদের বিষয়ে তদন্ত করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে তাদের কোনো জঙ্গি সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা তদন্ত করতে বলা হয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটকে।

প্রশ্ন উঠেছে, রাজধানীর বুকে প্রশাসনের অগোচরে কীভাবে এত ক্ষমতাধর হয়ে উঠলেন দিল্লুর রহমান? তিন দশক ধরে মুরিদ-ভক্তদের নিয়ে সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরিফ নামের দরবার শরিফ কীভাবে এত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে?

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকৌশলীর সন্তান দিল্লুর রহমান বিভিন্ন ব্যক্তির সম্পত্তি দখলের জন্য ‘মামলাবাজ সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলেন ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে। এই সিন্ডিকেটের মামলা থেকে আপন ভাইও রেহাই পাননি। পির দিল্লুরের বিরুদ্ধে ধর্মীয় উগ্রপন্থায় মদদ দেয়ার অভিযোগও পুরোনো।

যেভাবে পির হলেন দিল্লুর রহমান

মো. দিল্লুর রহমান ১৯৮৬ সালে রাজারবাগে তার পৈত্রিক বাড়িতে ‘দরবার শরিফ’ প্রতিষ্ঠা করেন। তার বাবার নাম মো. মোখলেসুর রহমান।

পারিবারিক কয়েকটি সূত্র জানায়, দিল্লুর রহমানের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। তরুণ বয়সে ইসলাম সম্পর্কে ভালো জ্ঞান, সেই সঙ্গে আরবি ও ফারসি ভাষায় দক্ষতার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি অনুসারীদের মাঝে জনপ্রিয়তা পান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে তার ভক্ত-মুরিদের সংখ্যা। একপর্যায়ে তিনি ঢাকার বুকে বড় মাপের একজন পির হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

পিরের পরিবারের এক সদস্য পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের পরিবারে তার (দিল্লুর রহমান) আগে কোনো পির নেই। তার বাবা ছিলেন একজন প্রকৌশলী ও ব্যবসায়ী। গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের আড়াই হাজারের প্রভাকরদীতে। নয় ভাইবোনের মধ্যে দিল্লুর রহমান তৃতীয়।’

তিনি বলেন, ‘দিল্লুরের বাবা মুক্তিযুদ্ধের আগেই রাজারবাগে বাড়ি করেন। সেখানেই স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় দিল্লুর রহমান ছিলেন উচ্চ মাধ্যমিক ছাত্র। পড়তেন লক্ষ্মীবাজারের তৎকালিন কায়েদ ই আজম কলেজে (বর্তমান সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ)। পরে এই কলেজ থেকেই তিনি ডিগ্রি পাস করেন।’

পরিবারের ওই সদস্য জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় এপ্রিল মাসে পিরের বাবা সপরিবারে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে চলে যান। সেখানে দিল্লুরের মেজ ভাই হাফিজুর রহমান হারুন ও চাচাত ভাইয়েরা যুদ্ধে যোগ দেন। কয়েক দিন পর একটি চিরকূট লিখে দিল্লুর রহমানও বাসা ছেড়ে চলে যান। চিরকূটে তিনি যুদ্ধে যাওয়ার কথা জানান। তবে একমাস পরেই বাড়ি ফিরে আসেন দিল্লুর। এরপর থেকেই তার চলাফেরায় পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি ধর্মকর্মে মনোনিবেশ করেন।

মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সময়ে ঢাকায় ফিরে কলেজে যেতে শুরু করেন দিল্লুর। সেই সঙ্গে ধর্মকর্মে বাড়তে থাকে মনোযোগ। শার্ট-প্যান্ট ছেড়ে পায়জামা-পাঞ্জাবি-টুপি পড়া শুরু করেন। সাধারণ পড়ালেখার পাশাপাশি ইসলামিক বই পড়া শুরু করেন তিনি।

পারিবারিক সূত্র জানায়, ডিগ্রি পড়ার সময় যাত্রাবাড়ীর পির আবুল খায়ের ওয়াজিউল্লাহর মুরিদ হন দিল্লুর রহমান। সেই সঙ্গে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক রোকন উদ্দীনের কাছে তিনি আরবি ও ফারসি ভাষার তালিম নেন। পরে রোকন উদ্দীনের মেয়েকেই বিয়ে করেন দিল্লুর রহমান।

পির পরিবারের কয়েক সদস্যের দাবি, ইসলামি ডিগ্রি না থাকলেও অসংখ্য ধর্মীয় বই পড়ে ও আলেমদের কাছাকাছি থেকে ব্যাপক ইসলামিক জ্ঞান অর্জন করেন দিল্লুর রহমান। এজন্য অনেক সুপরিচিত আলেমও তরুণ দিল্লুরের সঙ্গে যুক্তিতর্কে পেরে উঠতেন না। খুব অল্প সময়ে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা তৈরি হয়। আর সেই জনপ্রিয়তাকে ভিত্তি করে ১৯৮৬ সালে ঢাকার পৈত্রিক বাড়িতে দরবার শরিফ স্থাপন করে তিনি পুরোদস্তুর পির বনে যান। বাড়তে থাকে তার ভক্ত-মুরিদের সংখ্যা।

পিরের এক আত্মীয় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ইসলামজ্ঞানে তার দখলের কারণে একটা সময় পর্যন্ত তাকে নিয়ে আমরা খুব গর্ব করতাম। সম্মান দিয়ে পরিবারের সদস্যরাও তাকে হুজুর বলে সম্বোধন করত। তবে ১৯৯৮ সালে দিল্লুর রহমানের বাবা মারা যাবার পর তার কাছে ধর্মব্যবসায়ীরা ভিড়তে থাকে। তার বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। এরপর সে তার পৈত্রিক বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে নিজের ভাইদের বিরুদ্ধেই মামলা করে। সেই থেকে শুরু হয় তার মামলাবাজ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য।’

রাজারবাগ পির দিল্লুরের কীভাবে উত্থান
পির মো. দিল্লুর রহমানের গ্রামের বাড়ি

পিরের মামলায় ভাইয়েরাও জেলে

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা যায়, এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি পিরের মামলাবাজ সিন্ডিকেটের হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে পিরের আপন তিন ভাইও আছেন।

রাজারবাগের পৈত্রিক সম্পদ দখলের জন্য পির তার মুরিদদের দিয়ে তিন ভাই আনিসুর রহমান ফিরোজ, হাফিজুর রহমান হারুন ও জিল্লুর রহমান তরুণের বিরুদ্ধে মামলা করান। এসব মামলায় তারা জেলও খেটেছেন। এদের মধ্যে জিল্লুর রহমান তরুণের বিরুদ্ধে ৩০টি মামলা করেন পিরের মুরিদরা। অন্য ভাইয়েরা পরে আপসের মাধ্যমে দিল্লুরের রোষানল থেকে এখন মুক্ত হলেও সমঝোতা না করায় বাবার বাড়ি ছেড়ে ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে জিল্লুর রহমান তরুণকে।

তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, নারী নির্যাতন, মানব পাচার, মাদক, হত্যাসহ গুরুতর বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করেন দিল্লুরে মুরিদরা। এর মধ্যে ২৩টি মামলায় তরুণ খালাস পেলেও সাতটি এখনও বিচারাধীন।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে জিল্লুর রহমান তরুণ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার আপন ভাই আমার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে, এই লজ্জার কথা আমি কাউকে বলতে চাই না। আমি আমার মতো আছি, তার (দিল্লুর রহমান) সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমাদের বংশে কোনো পির ছিল না। আমরা এক সময় তাকে নিয়ে খুব গর্ব করতাম। কিন্তু কিছু খারাপ মুরিদ আর স্ত্রীর প্ররোচনায় সে অধঃপতনে গেছে।’

ভাস্কর্য ভাংচুর ও উগ্রবাদে জড়ানোর অভিযোগ

রাজারবাগ পির দিল্লুর রহমানের প্রতিষ্ঠা করা ধর্মীয় সংগঠন আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত। ২০০০ সাল থেকে এই সংগঠনের বিরুদ্ধে উগ্রবাদি তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।

জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০০৯ সালে ১২টি ধর্মভিত্তিক সংগঠনকে কালো তালিকাভুক্ত করে সরকার। এগুলোর মধ্যে অন্যতম আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত। এছাড়া, পির দিল্লুর রহমানের নিজস্ব পত্রিকা দৈনিক আল ইহসান ও মাসিক পত্রিকা আল বাইয়্যিনাতে গণতন্ত্র, নির্বাচন, জাতীয় সংগীত, বৈশাখী উৎসব, খেলাধুলা ইত্যাদি বিষয়ে নেতিবাচক মতামত প্রকাশের অভিযোগ রয়েছে।

২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর আল বাইয়্যিনাতের অনুসারীরা মতিঝিলের বলাকা ভাস্কর্য ভাংচুর করেন। এ ঘটনায় পুলিশ আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাতের আট সশস্ত্র কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছিল। তারা জিজ্ঞাসাবাদে জানান, ভাস্কর্য ভাঙার নির্দেশ দিয়েছিলেন দিল্লুর রহমান।

ওই ঘটনার কয়েক মাস পর আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাতের অনুসারীরা বিমানবন্দর গোলচত্বরে বাউলের ভাস্কর্যটিও ভেঙে ফেলেন। এছাড়া, ২০১৭ সালে হাইকোর্ট চত্বরে লেডি জাস্টিসের ভাস্কর্য স্থাপনের পরপরই আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত সেটি সরিয়ে ফেলতে উড়ো চিঠিতে হুমকি দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

পিরের পরিবারের এক সদস্য নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এসব ঘটনার পরিকল্পনা পিরের দরবার শরিফে বসেই হতো। মতিঝিলের বক (বলাকা ভাস্কর্য) ভাঙার মিটিংয়ের আলোচনার কিছুটা আমি নিজ কানে শুনেছিলাম। তার এসব অপকর্মের জন্য অন্য ভাইদেরও পুলিশ-গোয়েন্দাদের চাপে পড়তে হয়েছে। তবে তার ভাইয়েরা জড়িত ছিল না। এরপর বাধ্য হয়ে পিরের তিন ভাই মিলে সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, ঘটনার সব দায় আল বাইয়্যিনাতের।’

গ্রামের বাড়িতে যান না দিল্লুর রহমান

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার প্রভাকরদী গ্রামের মৃত মোখলেসুর রহমানের ছেলে দিল্লুর রহমান। এক সময়ের গ্রাম্য মাতবর মোখলেসুর রহমানকে গ্রামের সবাই এক নামে এখনও চেনেন। তবে তার ছেলে দিল্লুর রহমান সম্পর্কে তারা খুব একটা তথ্য দিতে পারেননি।

প্রভাকরদী গ্রামে দিল্লুরদের পৈত্রিক বাড়ির নাম ‘মিয়া বাড়ি’। সেখানে ‘মিয়া মসজিদ’ নামে একটি মসজিদও রয়েছে। ভিটায় রয়েছে তিন তলা একটি ভবন, তবে সেখানে কেউ থাকেন না।

রাজারবাগ পির দিল্লুরের কীভাবে উত্থান
গ্রামের বাড়িতে পির মো. দিল্লুর রহমানের কথিত মাদ্রাসা

গ্রামবাসী জানান, দিল্লুর রহমান গ্রামে না গেলেও তার অনুসারীরা সেখানে যাতায়াত করেন। প্রতিবেশী এক নারী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই বাড়িতে কেউ থাকে না। হুজুর (দিল্লুর রহমান) এখানে আসে না, কিন্তু তার লোকজন আসে। তারা এসে কয়েক ঘণ্টা থেকে আবার চলে যায়। মাঝে মধ্যে তার বড় ভাই আসত, তবে তিনিও এখন আসেন না। তাই বাড়িটা ফাঁকাই থাকে।’

গ্রামের বাসিন্দারা জানান, কয়েক দশক আগে তারা হঠাৎ শুনতে পান, মোখলেস মাতবরের ছেলে দিল্লুর পির হয়ে গেছেন। এরপর সাদা কাপড় পরে বিশাল ভক্তদল নিয়ে তিনি প্রতি বছর একবার গ্রামে মাহফিল করতে আসতেন। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে সেই মাহফিলও বন্ধ।

পিরের অনুসারীদের কয়েক জন দাবি করেন, প্রভাকরদী গ্রামের পাশে সরাবদী গ্রামে দিল্লুর রহমানের একটি মাদ্রাসা আছে। তবে সেই ঠিকানা অনুযায়ী গিয়ে একটি টিনশেড ঘর দেখা গেছে।

ঘরের বাইরে মাটি কাটছিলেন একজন। নিজেকে মাদ্রাসার শিক্ষক পরিচয় দিয়ে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘করোনার জন্য মাদ্রাসা বন্ধ। এখানে বাংলা ও আরবি পড়ানো হয়। এটি পীর সাহেবের তৈরি কামিল মাদ্রাসা।’

মাদ্রাসায় কত জন শিক্ষার্থী শিক্ষক রয়েছে, এমন প্রশ্নের কোনো জবাব তিনি দিতে পারেননি।

গ্রামবাসীর দাবি, টিনশেড ঘরটি কোনো মাদ্রাসা নয়। আগে সেখানে এক ব্যক্তি পরিবার নিয়ে থাকতেন। তিনি চলে যাওয়ার পর এখন আরেকটি পরিবার আছে।

সরাবদী গ্রামে দিল্লুর রহমানের জমি দখলের প্রমাণ পাওয়া গেছে। মামলার ভয়ে এ বিষয়ে মুখ খুলতে চান না কেউ। গ্রামের এক জন জানান, ‘বিভিন্ন মানুষের খেতে খুঁটি গেঁথে রেখেছেন পিরের অনুসারীরা। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। এক মামলা শেষ না হতেই আরেক মামলার মুখে পড়তে হয়।

আরও পড়ুন:
সেই কাঞ্চনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পিরের মুরিদ মায়ের
রাজারবাগ পিরের সম্পত্তির হিসাব চেয়ে রিট
পির সাহেবের কাণ্ড দেখেন!
মান্নার সিনেমার স্বত্ব: হাইকোর্টে স্ত্রীর রিট

শেয়ার করুন

মন্তব্য

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস-শিক্ষার্থী কিছুই নেই, জনবল প্রায় ২০০

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস-শিক্ষার্থী কিছুই নেই, জনবল প্রায় ২০০

সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কার্যক্রম না থাকলেও তিন বছরে ১৭২ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে সবাই নিয়োগ পেয়েছেন এডহক ভিত্তিতে। অভিযোগ আছে, সরকারের নির্দেশনার পরোয়া না করে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বেশির ভাগ নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে।

দেশের চতুর্থ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২০১৮ সালে কার্যক্রম শুরু হয় সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের। প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ক্যাম্পাসের জন্য দক্ষিণ সুরমায় ১০০ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। ফলে শুরু হয়নি শিক্ষা কার্যক্রমও।

তেমন কোনো কার্যক্রম না থাকলেও তিন বছরে ১৭২ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে ফেলেছে এই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে সবাই নিয়োগ পেয়েছেন এডহক ভিত্তিতে। অভিযোগ আছে, সরকারের নির্দেশনার পরোয়া না করে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বেশির ভাগ নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে।

নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকের যোগ্যতা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দ্বিতীয় শ্রেণির এক কর্মকর্তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এডহক ভিত্তিতে এ ধরনের নিয়োগকে সম্পূর্ণ অবৈধ বলছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কর্মকর্তারা।

ইউজিসির সচিব ড. ফেরদৌস জামান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এডহক ভিত্তিতে সব ধরনের নিয়োগ বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। এ ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে তিন দফা চিঠিও দেয়া হয়েছে। ফলে এডহক নিয়োগের এখতিয়ার কারও নেই। কেউ যদি দিয়ে থাকেন সেটা সম্পূর্ণ অবৈধ।’

অবশ্য ২০১৮ সালে পাস হওয়া সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আইনে রয়েছে, ‘উপাচার্য সিন্ডিকেটের পুর্বানুমোদনক্রমে কোনো শূন্য পদে সম্পূর্ণ অস্থায়ীভাবে অনধিক (৬ মাসের) জন্য কিছু পদে নিয়োগ করিতে পারিবেন। এবং প্রয়োজনে উক্তরূপ নিয়োগের মেয়াদ ৬ মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করিতে পারবেন। ...শর্ত থাকে যে, বর্ধিত মেয়াদের মধ্যে নিয়োগ নিয়মিত করা না হলে উক্ত মেয়াদ শেষে নিয়োগ বাতিল করা হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে।’

এ আইনে সিন্ডিকেটের পুর্বানুমোদনক্রমে ও সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য অস্থায়ীভাবে নিয়োগের কথা উল্লেখ রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস-শিক্ষার্থী কিছুই নেই, জনবল প্রায় ২০০


তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের কোনো পুর্বানুমোদন নেয়া হয়নি। এই প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেট বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে সোমবার দুপুর ২টায়। এ ছাড়া গত তিন বছর ধরে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত কাউকেই স্থায়ী করা হয়নি।

এডহক ভিত্তিতে নিয়োগের কথা স্বীকার করে সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজন মেটাতে এডহক ভিত্তিতে শ’খানেক লোক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বেশির ভাগই কর্মচারী পদে নিয়োগ পেয়েছেন। যথাযথ নিয়ম মেনেই তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’

নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন

২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর ডা. মোর্শেদ আহমদ চৌধুরীকে সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হয়। এর আগে তিনি ছিলেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ।

ডা. মোর্শেদ অধ্যক্ষ থাকার সময়ে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন আব্দুস সবুর। দ্বিতীয় শ্রেণির এই কর্মকর্তাকে প্রথম শ্রেণির ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী পরিচালক (অর্থ) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া একজনের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ১.৬০, যা তৃতীয় শ্রেণির সমমর্যাদার। নিয়োগবিধি অনুসারে, কোনো পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণিপ্রাপ্ত কাউকে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেয়া যায় না।

কেবল এই দুজনই নয়, সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও অনেকের নিয়োগের ক্ষেত্রেই গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যোগ্যতা শিথিল করে নিয়োগ দেয়া হয়েছে অনেককে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীদের যোগ্যতার উল্লেখের নিয়ম থাকলেও তা অনুসরণ করেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস-শিক্ষার্থী কিছুই নেই, জনবল প্রায় ২০০

রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে নিয়োগের পাশাপাশি উপাচার্যের কয়েক স্বজনকেও নিয়োগ দেয়া হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে।

স্বজনদের নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে উপাচার্য ডা. মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দুজন স্বজন নিয়োগ পেয়েছেন। তবে তারা যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ পেয়েছেন। বাকিদেরও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।’

শিক্ষার্থী নেই, জনবল অফুরন্ত

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় ১০ হাজার। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা আছেন ২৬৪ জন। অন্যদিকে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থীর সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা আছেন ১৪৯ জন।

অথচ সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী না থাকলেও ইতোমধ্যে সেখানে শ’খানেক কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে পরিচালক পদে এক জন, উপ পরিচালক পদে এক জন, সহকারি পরিচালক পদে ছয় জন, সেকশন অফিসার পদে ৯ জন ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পেয়েছেন ৫২ জন। এছাড়া কর্মচারী পদেও শ’খানেক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এত জনবল থাকা সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ভবনের নির্মাণ কাজই এখনও শুরু হয়নি। ভবন নির্মাণের জন্য ডিপিপি পাঠানো করা হলেও তা এখনও অনুমোদন পায়নি। ভবন নির্মাণ ও শিক্ষাকার্যক্রম শুরুর চেয়ে জনবল নিয়োগেই গত তিন বছর ধরে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বর্তমানে নগরীর চৌহাট্টায় উপাচার্যের কার্যালয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই ছোট্ট কার্যালয়ে এতো বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বসার জায়গাও নেই। প্রশাসনিক বিভিন্ন পদে লোকবল নিয়োগ দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেজিস্ট্রার পদটি শূন্য রয়েছে।

তবে রেজিস্ট্রারের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) মো. নঈমুল হক চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষাকার্যক্রম শুরু না হলেও আমাদের আওতাধীন মেডিক্যাল কলেজ ও নার্সিং কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়কেই দেখভাল করতে হয়। এজন্য অনেক লোকবলের প্রয়োজন হয়।

‘আট জন ডিনের প্রত্যেকের জন্য পাঁচ জন স্টাফ প্রয়োজন। এসব জরুরি প্রয়োজন মেটাতেই যথাযথ নিয়ম মেনে লোকবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’

এডহক ভিত্তিতে নিয়োগে সরকারি নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি দাবি করেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞা পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য। নতুনদের জন্য নয়। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে উপাচার্য জরুরি প্রয়োজনে নিয়োগ দিতে পারেন।’

রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় আমাদের এখানে অনেক রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের তদবির রয়েছে। এগুলো এড়ানো যায় না। তবে এই তদবিরের মধ্যে যাদের যোগ্যতা রয়েছে এবং আমাদের চাহিদা পুরণ করতে পেরেছেন তাদেরকেই নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’

এ পর্যন্ত কতজনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১৩৫/১৩৬ জনের মতো জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যককে গত জানুয়ারিতে স্থায়ী করা হয়। বাকিদের চাকরিও স্থায়ীকরণের প্রক্রিয়া চলছে।’

সিন্ডিকেটের পুর্বানুমোদন ছাড়া কীভাবে চাকরি স্থায়ী করা হলো, এমন প্রশ্ন করতেই তিনি ‘উপাচার্য মহোদয় আমাকে কল দিয়েছেন’ বলে ফোন রেখে দেন।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস-শিক্ষার্থী কিছুই নেই, জনবল প্রায় ২০০

সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সদস্য সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিলুর রহমান।

সিন্ডিকেটের বৈঠকের আগে এত জনবল নিয়োগ পাওয়ার প্রসঙ্গে রোববার তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। সোমবার সিন্ডিকেটের বৈঠক আছে। ব্যস্ততার কারণে বৈঠকের আলোচ্যসূচিও এখন পর্যন্ত আমি দেখতে পারিনি। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।’

এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দিলে ফান্ড বন্ধ

‘স্ট্র্যাটিজিক প্ল্যান ফর হায়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ: ২০১৮-৩০’ বাস্তবায়ন মনিটরিংয়ের লক্ষ্যে ইউজিসি পর্যায়ে গঠিত কমিটির এক বৈঠক হয় গত জুনে। সেই বৈঠকে পাবলিক বিশ্বদ্যালয়গুলোতে এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ইউজিসির কর্মকর্তারা। এডহক ও মাস্টার রোলে নিয়োগ দেয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ড বন্ধের বিষয়েও আলোচনা হয় সেখানে।

ওই বৈঠকে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক দিল আফরোজা বলেন, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এডহক ও মাস্টার রোলে নিয়োগ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। যদি কেউ ইউজিসির নির্দেশনা অমান্য করে তবে তার ফান্ড বন্ধ করে দেয়া হবে।’

সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এডহক ভিত্তিতে বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের তথ্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এত বিপুলসংখ্যক লোক এডহক ভিত্তিকে নিয়োগ হয় কী করে!’

তিনি বলেন, ‘এডহক ভিত্তিতে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে সবখানেই প্রশ্ন আছে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এত লোকবল এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে পারে না। আমরা বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।’

আরও পড়ুন:
সেই কাঞ্চনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পিরের মুরিদ মায়ের
রাজারবাগ পিরের সম্পত্তির হিসাব চেয়ে রিট
পির সাহেবের কাণ্ড দেখেন!
মান্নার সিনেমার স্বত্ব: হাইকোর্টে স্ত্রীর রিট

শেয়ার করুন

কুমিল্লায় ‘প্রতিমা ভাঙা বাবু’র বাসায় ৩ তালা

কুমিল্লায় ‘প্রতিমা ভাঙা বাবু’র বাসায় ৩ তালা

নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে প্রথম প্রতিমা ভাঙার অভিযোগ উঠেছে মঈনুদ্দীন আহমেদ বাবুর বিরুদ্ধে, বাঁয়ে তার তালাবদ্ধ বাসা। ছবি: নিউজবাংলা।

মঈনুদ্দীন আহমেদ বাবু সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর পিএস হিসেবে পরিচিত। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাক্কু ১৩ অক্টোবর সকালে মণ্ডপে হামলার সময় ঘটনাস্থলেই ছিলেন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। হামলার সময় পুলিশ বাবুকে গ্রেপ্তার করতে গেলে সাক্কু তাকে নিজের পিএস পরিচয় দিয়ে ছাড়িয়ে নেন।

কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ পাওয়ার পর সহিংসতা শুরুর জন্য মঈনুদ্দীন আহমেদ বাবু নামের এক ব্যক্তিকে দায়ী করছেন এলাকাবাসী ও মণ্ডপসংশ্লিষ্টরা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক বাহিনীর কর্মকর্তারাও বলছেন, মণ্ডপে কোরআন রাখায় ইকবাল হোসেন প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি হলেও ১৩ অক্টোবর সকালে সহিংসতা ছড়িয়ে দিতে তৎপর ছিলেন বেশ কয়েকজন। তাদের মধ্যে মঈনুদ্দীন আহমেদ বাবু অন্যতম।

বাবু সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর পিএস হিসেবে পরিচিত। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাক্কু ১৩ অক্টোবর সকালে মণ্ডপে হামলার সময় ঘটনাস্থলেই ছিলেন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। হামলার সময় পুলিশ বাবুকে গ্রেপ্তার করতে গেলে সাক্কু তাকে নিজের পিএস পরিচয় দিয়ে ছাড়িয়ে নেন। বাবু সহিংসতায় উসকানি দিচ্ছেন এমন একটি ভিডিও পেয়েছে নিউজবাংলা।

অভিযুক্ত বাবুকে দুদিন ধরে তার এলাকায় দেখা যাচ্ছে না। নগরীর ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের মৌলভীপাড়ায় তার পৈত্রিক বাড়িতে গিয়ে গেটে তিনটি তালা ঝুলতে দেখা গেছে।

প্রতিবেশীরা জানান, বাবু তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে রোববার ভোরে বাসা থেকে বের হয়ে যান। এরপর থেকেই তালা ঝুলছে তার বাসায়। বাবুর এক আত্মীয় নিউজবাংলার কাছে দাবি করেন, রোববার সন্ধ্যায় তাকে আটক করে নিয়ে গেছে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কুমিল্লায় ‘প্রতিমা ভাঙা বাবু’র বাসায় ৩ তালা
কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর চলে ভাঙচুর

মণ্ডপে সহিংসতার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন নিউজবাংলার কাছে অভিযোগ করেন, কোরআন পাওয়া নিয়ে উত্তেজনা শুরুর পর বাবু প্রথম একটি প্রতিমা ভাঙচুর করেন। এরপরেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় পরিস্থিতি।

নানুয়ার দিঘির পাড়ের ওই মণ্ডপে চলে ব্যাপক ভাঙচুর, আক্রান্ত হয় নগরীর আরও বেশকিছু পূজামণ্ডপ। পরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়।

ইতোমধ্যে মণ্ডপে কোরআন রাখার দায় স্বীকার করেছেন প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন। একই ঘটনায় জড়িত অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন মণ্ডপ থেকে ৯৯৯-এ ফোন করা রেজাউল হোসেন ইকরাম, হুমায়ুন কবির ও ফয়সাল হোসেন নামের তিনজন। এদের মধ্যে হুমায়ুন ও ফয়সাল স্থানীয় দারোগাবাড়ী মাজার মসজিদের সহকারী খাদেম। ওই মসজিদ থেকেই কোরআন নিয়ে পাশের পূজামণ্ডপে রাখা হয়ে। এই চারজনকেই সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।

কুমিল্লায় ‘প্রতিমা ভাঙা বাবু’র বাসায় ৩ তালা
মণ্ডপ থেকে ৯৯৯-এ ফোন করা রেজাউল হোসেন ইকরাম

এ ছাড়া ঘটনার দিন সকালে মণ্ডপ থেকে ফেসবুকে লাইভ করা ফয়েজকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা নিউজবাংলাকে বলেন, তারা মনে করছেন, একটি চক্র মণ্ডপে কোরআন রাখতে ইকবালকে এবং সেটি প্রশাসনকে জানাতে ইকরামকে সরাসরি ব্যবহার করেছিল। তবে ১৩ অক্টোবর সহিংসতার পেছনে আরও অনেকের ভূমিকা আছে। তাদের সঙ্গে ইকবাল ও ইকরামকে ব্যবহার করা চক্রের সম্পর্ক আছে কি না, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

কুমিল্লা শহরজুড়ে সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলেও মনে করছেন তদন্তকারীরা।

সহিংসতায় রাজনীতিসংশ্লিষ্টদের উপস্থিতির তথ্য দিয়েছেন এলাকাবাসী ও পূজামণ্ডপসংশ্লিষ্টরাও।

কুমিল্লা জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্মল পাল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনার দিন সকালে ওই মণ্ডপে কোরআন পাওয়ার পর প্রথমেই পূজা বন্ধ করে দেয়া ও মণ্ডপ সরিয়ে দেয়ার দাবি তোলেন মঈনুদ্দীন আহমেদ বাবু নামের একজন। তার এই দাবিতে সমর্থন জানান উপস্থিত উত্তেজিত জনতা। একপর্যায়ে বাবু নিজে পূজায় ব্যবহৃত একটি ডাব ছুড়ে মণ্ডপের একটি প্রতিমার মাথা ভেঙে ফেলেন। এরপরেই শুরু হয় সহিংসতা।’

স্থানীয় বাসিন্দা ও মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অচিন্ত্য দাস টিটুও নিউজবাংলাকে একই তথ্য দেন।

স্থানীয় বেশ কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, উত্তেজনা শুরুর পর ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন বিএনপি থেকে সিটি মেয়র নির্বাচিত মনিরুল হক সাক্কু। অভিযুক্ত বাবু তার পিএস হিসেবে পরিচিত। হামলা শুরুর পর পুলিশ বাবুকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করলেও সাক্কু তাকে ছাড়িয়ে নেন।

কুমিল্লায় ‘প্রতিমা ভাঙা বাবু’র বাসায় ৩ তালা
নগরীর ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের মৌলভীপাড়ায় বাবুর পৈত্রিক বাড়িতে ঝুলছে তালা

এলাকাবাসী জানান, নানুয়ার দিঘির পাড়েই মেয়র সাক্কুর বাসা। তিনি ঘটনাস্থলে এলেও বিএনপি সমর্থকেরা দিঘির দুই প্রান্তে জড়ো হয়ে উত্তেজনা ছড়াতে থাকেন। এ সময় যুবলীগের আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ সহিদ মেয়র সাক্কুকে তার সমর্থকদের শান্ত করার অনুরোধ জানান। এরপর সাক্কু তার একজন কর্মীকে ফোন করে বিক্ষুব্ধদের শান্ত করতে বলেছিলেন, তবে মাঠে এর কোনো প্রভাব দেখা যায়নি।

মেয়র সাক্কুর নির্দেশের পরও দলের কর্মীরা কেন উত্তেজনা কমাতে তৎপর হলেন না- জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক কর্মী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটা আমরা কেন সামাল দেব, সরকারি দলের লোকেরা কী করে? তাছাড়া এসব ঝামেলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তো পুলিশের।’

বাবুকে নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর সঙ্গে সরাসরি এবং ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে নিউজবাংলা। তবে তাকে পাওয়া যায়নি, জানা গেছে তিনি এখন কুমিল্লায় নেই। সাক্কুর অনুসারীরা জানান, তিনি ওমরাহ পালনে সৌদি আরব গেছেন।

কুমিল্লায় ‘প্রতিমা ভাঙা বাবু’র বাসায় ৩ তালা
কুমিল্লা সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কু

মণ্ডপে সহিংসতা ঠেকাতে আওয়ামী লীগ জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেনি বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বেশ কয়েকজন নিউজবাংলাকে জানান, সেদিন সকালে মণ্ডপ এলাকায় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত ও মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ সহিদ ছাড়া আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল আর কোনো নেতার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহিদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি সকালে ঘটনা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার সব কর্মীদের ফোন করেছি। অনেক কর্মী রাত করে ঘুমায় তাই তাদের কাউকে কাউকে ফোনে পাওয়া যায়নি। যারা ফোন ধরেছে তারা সবাই ছুটে এসেছিল, তাদের নিয়েই সংসদ সদস্য বাহাউদ্দীন বাহারের নির্দেশে আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে সাহায্য করেছি। তখন এমপি সাহেব ওমরায় থেকেও পুরো সময় আমাদের সঙ্গে টেলিফোনে যুক্ত ছিলেন।’

কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে রয়েছে দুটি পক্ষ। স্থানীয়রা জানান, কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও কুমিল্লা মহানগর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বাহাউদ্দীন বাহার এবং সংরক্ষিত ১০ নং মহিলা আসনের সংসদ সদস্য আঞ্জুম সুলতানা সীমার মধ্যে দলীয় কোন্দল বহু পুরোনো। ঘটনার দিন সীমা সমর্থক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মাঠে দেখা যায়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মণ্ডপে কোরআন রাখার মামলায় রিমান্ডে থাকা ইকরামকে বিভিন্ন সময়ে বিএনপির মিটিং-মিছিলে দেখা যেত। ইকরাম তার নিজ ওয়ার্ডের বিতর্কিত কাউন্সিলর সাইফুল বিন জলিলের একনিষ্ঠ কর্মী। ইকরামের বাসা আবার বাবুর বাসার পাশের গলিতে।

সাইফুল বিন জলিল একসময় মেয়র সাক্কুর অনুসারী হিসেবে বিএনপির রাজনীতি করলেও এক বছর আগে তিনি সংসদ সদস্য আঞ্জুম সুলতানা সীমার অনুসারী হিসেবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য সম্প্রতি সাইফুলের কাউন্সিলর পদ স্থগিত করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

ইকরামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ নিয়ে বক্তব্য জানতে সাইফুলকে একাধিবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

কুমিল্লায় ‘প্রতিমা ভাঙা বাবু’র বাসায় ৩ তালা
সংসদ সদস্য আঞ্জুম সুলতানা সীমা

অন্যদিকে, সংসদ সদস্য আঞ্জুম সুলতানা সীমা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি যখন কাউন্সিলর ছিলাম তখন সাইফুলও একজন কাউন্সিলর হিসেবে আমার কলিগ ছিল। আমি তাকে আমাদের কর্মী হিসেবেই জানি। সে আগে বিএনপি করত কি না সেটা মেয়র সাক্কু সাহেবের উত্তর দেয়া উচিত।’

সহিংসতা ঠেকাতে নিজের অনুসারীদের মাঠে না থাকার অভিযোগের বিষয়ে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি সেদিন ঢাকায় ছিলাম। ঘটনা শোনার সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনে প্রশাসনের সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে কি না তার খোঁজ রেখেছি। আমাদের কিছু কর্মীও সেখানে গিয়েছিল।’

এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সংসদ সদস্য বাহাউদ্দীন বাহার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটা খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা, আমি দেশে থাকলে এমনটা হতো না। তারপরেও প্রশাসনের সহায়তায় খুব শর্ট টাইমের মধ্যে আমরা এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। এখন কোনো সমস্যা নেই।’

কুমিল্লায় ‘প্রতিমা ভাঙা বাবু’র বাসায় ৩ তালা
সংসদ সদস্য বাহাউদ্দীন বাহার

বাবুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি নিজে মেয়রকে ফোন করে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছি, সেও গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। সেখানে তার লোক যদি ঝামেলা করে, এমনকি আমাদের কোনো লোকও যদি কোনোভাবে জড়িত থাকে তাহলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। এ ঘটনায় কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।’

কাউন্সিলর সাইফুলের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের রাজনীতির জন্য একটা লজ্জা। একজন মহিলা এমপি এই বাজে কাজটা করেছেন। আমাদের আওয়ামী লীগে যেকোনো পেশার লোক যোগ দিতে পারে, কিন্তু তার মানে এই না যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিতর্কিত কাউকে আওয়ামী লীগে জায়গা দেয়া যায়। তাছাড়া আমি হলাম কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, কাউকে আওয়ামী লীগে ঢোকাতে হলে আমার কমিটির মধ্য দিয়ে আসতে হবে। উনি কীভাবে বিতর্কিত একজনকে আওয়ামী লীগের ব্যানারে সমর্থন করতে পারেন তা আমার মাথায় আসে না।’

আরও পড়ুন:
সেই কাঞ্চনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পিরের মুরিদ মায়ের
রাজারবাগ পিরের সম্পত্তির হিসাব চেয়ে রিট
পির সাহেবের কাণ্ড দেখেন!
মান্নার সিনেমার স্বত্ব: হাইকোর্টে স্ত্রীর রিট

শেয়ার করুন

পীরগঞ্জে সহিংসতার ‘হোতা’ সৈকত ছাত্রলীগ নেতা

পীরগঞ্জে সহিংসতার ‘হোতা’ সৈকত ছাত্রলীগ নেতা

পীরগঞ্জে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় অভিযুক্ত সৈকত মণ্ডল রংপুর কারমাইকেল কলেজের ছাত্রলীগ নেতা। সহিংসতার পর তাকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ছবি: নিউজবাংলা

সৈকত রংপুরের কারমাইকেল কলেজের দর্শন বিভাগের যে কমিটিতে ছিলেন, সেটি ২০১৭ সালের ৮ আগস্ট অনুমোদন দেন কারমাইকেল কলেজ শাখার সভাপতি সাইদুজ্জামান সিজার ও সাধারণ সম্পাদক জাবেদ আহমেদ। এ-সংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পেয়েছে নিউজবাংলা। সাইদুজ্জামান সিজারও বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

রংপুরের পীরগঞ্জে হিন্দুপল্লিতে সহিংসতার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে র‍্যাব যাকে আটকের কথা জানিয়েছে, সেই মো. সৈকত মণ্ডল ছাত্রলীগ নেতা বলে নিশ্চিত হয়েছে নিউজবাংলা।

তিনি রংপুরের কারমাইকেল কলেজে সংগঠনটির দর্শন বিভাগের কমিটির ১ নম্বর সহসভাপতি। তবে পীরগঞ্জ সহিংসতার পর তাকে অব্যাহতি দেয়ার কথা জানায় কলেজ ছাত্রলীগ।

সৈকত দর্শন বিভাগের যে কমিটিতে ছিলেন, সেটি ২০১৭ সালের ৮ আগস্ট অনুমোদন দেন কারমাইকেল কলেজ শাখার সভাপতি সাইদুজ্জামান সিজার ও সাধারণ সম্পাদক জাবেদ আহমেদ। এ-সংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পেয়েছে নিউজবাংলা।

সাইদুজ্জামান সিজারও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সৈকত মণ্ডল দর্শন বিভাগের কমিটিতে ছিলেন। ফেসবুকে কমেন্ট করার কারণে রোববার তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।’

পীরগঞ্জে সহিংসতার ‘হোতা’ সৈকত ছাত্রলীগ নেতা


রাজধানীর কারওয়ান বাজার মিডিয়া সেন্টারে শনিবার দুপুরে পীরগঞ্জে হিন্দুপল্লিতে হামলার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। এ সময় তিনি বলেন, ‘সৈকত মণ্ডলই এ ঘটনার হোতা। শুক্রবার রাতে টঙ্গী থেকে সৈকত ও তার সহযোগী রবিউল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।’

খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অরাজকতা তৈরি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের লক্ষ্যে হামলা-অগ্নিসংযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং মাইকিং করে হামলাকারীদের জড়ো করেন বলে জানিয়েছেন। গ্রেপ্তার সৈকত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক, বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যাচারের মাধ্যমে স্থানীয় জনসাধারণকে উত্তেজিত করে তোলেন। এ ছাড়া তিনি ওই হামলা ও অগ্নিসংযোগে অংশগ্রহণে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করেন।’

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, সৈকতের বাবা রাশেদুল ইসলাম রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় না থাকলেও দাদা আবুল হোসেন মণ্ডল রামনাথপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং তার চাচা রেজাউল করিম রামনাথপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৬ নম্বর ইউনিটের সভাপতি।

নিউজবাংলার প্রতিনিধি শনিবার বিকেলে সৈকত মণ্ডলের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় সৈকতকে নির্দোষ দাবি করেন তারা।

সৈকতের চাচা রেজাউল করিম বলেন, ‘আমার ভাতিজা সৈকত মণ্ডল ঘটনার দিন দক্ষিণ পাড়ায় হিন্দুপল্লিতে অবস্থান করছিল। ওই সময় পুলিশ ও রামনাথপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাদেকুল ইসলাম ছিলেন।

‘পুলিশ যখন বলছিল পরিতোষকে (ফেসবুকে যার একটি কমেন্ট নিয়ে উত্তেজনার শুরু) গ্রেপ্তার করা হবে, তখন সৈকত প্রশ্ন করেছিল কতক্ষণের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হবে। পুলিশ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিলে সৈকত হাত উঁচিয়ে সবাইকে বাড়ি যেতে বলে এবং এ নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে অনুরোধ করে।’

পীরগঞ্জে সহিংসতার ‘হোতা’ সৈকত ছাত্রলীগ নেতা
রাজধানীর কারওয়ান বাজার মিডিয়া সেন্টারে সৈকত ও তার সহযোগী

রেজাউল দাবি করেন, সৈকত যখন পীরগঞ্জের রামনাথপুর ইউনিয়নের বড় করিমপুর গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় পুলিশের সঙ্গে ছিলেন, তখন উত্তর পাড়ায় আগুন লাগে। তিনি নির্দোষ ও নিরপরাধ। তার পুরো বংশ আওয়ামী লীগ করে।

সৈকতের মা আঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ‘চেয়ারম্যান সাদেকুল পরে আমাদের কইছে বাড়ি থাকি সরি যাও। আমি আমার স্বামী আর সৈকতকে নিয়ে পলাশবাড়ি যাই। সেখান থেকে তিন বাড়ি চেঞ্জ করি। তারপর বোনের বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে আসি। সেখানে র‍্যাব আমাদের ধরে ফেলে। তখন সৈকতের ঠিকানা বলি। তারা সৈকতকে ধরে।’

নির্দোষ হলে বাড়ি থেকে পালালেন কেন, জানতে চাইলে সৈকতের মা আঞ্জুয়ারা বলেন, ‘চেয়ারম্যান আমাদের সরতে কইছে। রেকর্ড করার ফোন থাকলে রেকর্ড করলেম হয়।’

সৈকত মণ্ডলের দাদা আবুল হোসেন মণ্ডল বলেন, ‘আমি বঙ্গবন্ধুর আমল থেকে আওয়মী লীগ করি। যখন এলাকায় কেউ আওয়ামী লীগ করার সাহস পায় নাই, তখন আমরাই আওয়ামী লীগ করেছি। আমরা কেমন করি জামায়াত শিবির হই।’

এ ঘটনায় যারা জড়িত তদন্ত করে তাদের গ্রেপ্তার এবং সৈকতের মুক্তি দাবি করেন তিনি।

ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে গত রোববার রাতে পীরগঞ্জের রামনাথপুর ইউনিয়নের উত্তর পাড়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত ২৩টি বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬০টি পরিবার।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার সকালে দুটি মামলা করেন পীরগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ইসমাইল হোসেন। ৪১ জনের নামসহ অজ্ঞাতপরিচয় অনেককে আসামি করে হিন্দুদের বাড়িঘরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটের ঘটনায় একটি মামলা করেন। আরেকটি মামলা করেছেন একজনকে আসামি করে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে।

এরপর বুধবার রাতে পীরগঞ্জ থানার আরেক এসআই সুপথ হালদার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দুজনকে আসামি করে তৃতীয় মামলাটি করেন।

পীরগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহবুবুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত তিন মামলায় ৫৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আরও পড়ুন:
সেই কাঞ্চনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পিরের মুরিদ মায়ের
রাজারবাগ পিরের সম্পত্তির হিসাব চেয়ে রিট
পির সাহেবের কাণ্ড দেখেন!
মান্নার সিনেমার স্বত্ব: হাইকোর্টে স্ত্রীর রিট

শেয়ার করুন

কোরআন রাখতে আরেকটি মন্দিরেও গিয়েছিলেন ইকবাল

কোরআন রাখতে আরেকটি মন্দিরেও গিয়েছিলেন ইকবাল

নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে কোরআন রাখায় অভিযুক্ত ইকবাল ওই রাতে কিছুটা দূরের এই গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরেও গিয়েছিলেন। ছবি: নিউজবাংলা

তদন্তসংশ্লিষ্টরা নিউজবাংলাকে নিশ্চিত করেছেন, একটি সংঘবদ্ধ চক্র মণ্ডপে কোরআন রাখতে ইকবালকে কাজে লাগিয়েছে। নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপটিতে শুরুতে ইকবাল গেলেও লোকজন দেখে ফিরে আসেন। এরপর তিনি যান কিছুটা দূরের গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরে। সেখানে গেটের তালা ভাঙতে ব্যর্থ হন ইকবাল।

কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের যে অস্থায়ী পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়া যায়, সেখানে শুরুতে প্রবেশে ব্যর্থ হয়েছিলেন প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন। এরপর তিনি গিয়েছিলেন ওই মণ্ডপ থেকে কিছুটা দূরে দিগম্বরীতলার গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরে।

মন্দিরটির গেটের তালা লাঠি দিয়ে ভাঙতে ব্যর্থ হন ইকবাল। এরপর আবার ফিরে আসেন নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে। এ সময় পূজাসংশ্লিষ্টদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে তিনি কোরআন শরিফটি হনুমানের ওপর রাখেন। মসজিদ থেকে বের হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর কোরআন রেখে হনুমানের গদা হাতে ফিরে আসেন ইকবাল।

ওই এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ এবং ইকবালের সহযোগীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এমন তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

কোরআন রাখতে আরেকটি মন্দিরেও গিয়েছিলেন ইকবাল
প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন মাজারের মসজিদ থেকে কোরআন শরিফ নিয়ে রওনা হন মণ্ডপের দিকে। সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেয়া ছবি।

নিউজবাংলার হাতে আসা সিসিটিভির নতুন ফুটেজেও বিষয়টি দেখা গেছে। এসব ফুটেজে পরিষ্কার ওই মণ্ডপের পাশের শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারের মসজিদে নিয়মিত যেতেন ইকবাল। সেখানকার অনেকে তার পরিচিত।

শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারটি থেকে আলোচিত মণ্ডপে হেঁটে যেতে সময় লাগে ২ থেকে ৩ মিনিট। দারোগাবাড়ী মাজার নামে কুমিল্লাবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি রয়েছে মাজারটির। আর এই মাজারটি থেকে দিগম্বরীতলার গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরে হেঁটে যেতে সময় লাগে প্রায় ১০ মিনিট।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কয়েকটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিউজবাংলাকে নিশ্চিত করেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র মণ্ডপে কোরআন রাখতে ইকবালকে কাজে লাগিয়েছে। নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপটিই ছিল তাদের লক্ষ্য। তবে ইকবাল যখন মসজিদ থেকে কোরআন নিয়ে সেখানে যান, তখন মণ্ডপ পুরোপুরি জনশূন্য হয়নি। এ জন্য তিনি চলে যান মণ্ডপ থেকে কিছুটা দূরের গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরে। ওই মন্দিরটির গেটের তালা ভাঙতে তিনি একটি লাঠিও জোগাড় করেন। তবে সেটি তালা ভাঙার মতো মজবুত না হওয়ায় ব্যর্থ হন ইকবাল। এরপর আবার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে যান।

নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে কীভাবে উত্তেজনার শুরু এবং মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর পবিত্র কোরআন শরিফ কী করে এলো, সে বিষয়ে মঙ্গলবার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউজবাংলা।

কোরআন রাখতে আরেকটি মন্দিরেও গিয়েছিলেন ইকবাল
এই মন্দিরের তালা ভাঙতে ব্যর্থ হন ইকবাল

পূজার আয়োজক, এলাকাবাসী, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার আগের রাত আড়াইটা পর্যন্ত মন্দিরে পূজাসংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি ছিল। এরপর বুধবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে দুজন নারী ভক্ত মণ্ডপে এসে হনুমানের মূর্তিতে প্রথম কোরআন শরিফটি দেখতে পান।

পূজার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন দিঘির পাড়ের বাসিন্দা তরুণ কান্তি মোদক। স্থানীয়রা তাকে মিথুন নামে চেনেন। মিথুন নিউজবাংলাকে জানান, রাত আড়াইটা পর্যন্ত তিনি মণ্ডপে ছিলেন। তখন পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। এরপর তিনি নৈশপ্রহরী শাহিনের কাছে মণ্ডপের নিরাপত্তার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বাসায় ফেরেন। সহিংসতার পর নৈশপ্রহরী শাহিনকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

নিউজবাংলার হাতে আসা নতুন সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, কোরআন নেয়ার আগের রাতেও মাজারের মসজিদে গিয়েছিলেন ইকবাল। তখন মধ্যরাত পেরিয়ে ক্যালেন্ডারের পাতায় ১২ অক্টোবর। রাত ৩টা ৪২ মিনিটে মসজিদে যান ইকবাল।

এই ফুটেজে মসজিদের বারান্দায় হাঁটতে দেখা যায় ইকবালকে।

কোরআন রাখতে আরেকটি মন্দিরেও গিয়েছিলেন ইকবাল
মসজিদ থেকে কোরআন নিয়ে মণ্ডপে রাখায় প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল

পরের ফুটেজটি মঙ্গলবার রাত ১০টা ৩৮ মিনিটের। মসজিদের বারান্দায় দুজনকে বসে থাকতে দেখা যায়। রাত ১০টা ৫৮ মিনিটে ইকবাল এসে ওই দুজনের সঙ্গে বসে কথা বলেন। এই দুজন হলেন মাজারের সহকারী খাদেম হিসেবে পরিচিত হুমায়ুন আহমেদ ও ফয়সাল আহমেদ।

ঠিক ১১টায় তিনজনই সেখান থেকে উঠে পড়েন। ইকবাল পলাতক থাকলেও মসজিদে তার সঙ্গে কথা বলা হুমায়ুন ও ফয়সালকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ওই রাত ২টা ১২ মিনিটের একটি ফুটেজে ইকবালকে মসজিদের বারান্দায় কোরআন শরিফ রাখার শেলফের সামনে দেখা যায়। সে সময় বারান্দায় একজন নামাজ পড়ছিলেন এবং একজন শুয়ে ছিলেন। ইকবাল একটি কোরআন শরিফ নিয়ে বারান্দায় বসেন। রাত ২টা ১৪ মিনিটে কোরআনটি বারান্দায় রেখে খালি হাতে তিনি উঠে পড়েন।

এর ৩ মিনিট পর ইকবাল আবার ফিরে এসে কোরআন তুলে নিয়ে বারান্দায় ঘোরাঘুরি করেন। এ সময় নামাজরত সেই ব্যক্তি সেখানে ছিলেন না।

এর পরের ফুটেজটি মাজারের পুকুরের পূর্ব পাড়ের একটি বাসার সিসিটিভি ক্যামেরার। উন্নত প্রযুক্তির এই সিসিটিভি ক্যামেরা ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলের। ক্যামেরাটি প্রতি ৪ মিনিট অন্তর মুভ করে।

কোরআন রাখতে আরেকটি মন্দিরেও গিয়েছিলেন ইকবাল
এই সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে মসজিদ থেকে ইকবালের কোরআন নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য

এতে দেখা যায়, ডান হাতে কোরআন নিয়ে মসজিদের পুকুরের পাড় দিয়ে ইকবাল হেঁটে বেরিয়ে যাচ্ছেন।

এর পরের আরেকটি ফুটেজে দেখা যায়, ইকবালের বাম হাতে রয়েছে কোরআনটি। এলাকার একটি রাস্তা দিয়ে তিনি হেঁটে যাচ্ছেন।

পরের ক্যামেরার ফুটেজে ইকবালকে জগন্নাথপুর মন্দির রোড ধরে হেঁটে যেতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তিনি গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরের সামনে প্রায় ২৭ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার ডান হাতে দেখা যায় ছোট একটি লাঠি এবং বাম হাতে কোরআন। তদন্তকারীরা বলছেন, এই লাঠিটি দিয়ে মন্দিরের গেটের তালা ভাঙতে ব্যর্থ হন ইকবাল।

এর পরের ফুটেজে তাকে স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকের চকবাজার শাখার দিকে যেতে এবং পরেরটিতে পূবালী ব্যাংক মোড়ের পাশের গলিতে ঢোকার মুখে দাঁড়াতে দেখা যায়। এই ফুটেজে সময় দেখা যাচ্ছিল রাত ২টা ৪২ মিনিট।

পরের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে ইকবালকে একজন নৈশপ্রহরী ও আরেক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। সে সময়ও তার হাতে কোরআন শরিফ দেখা যায়।

তারপর ইকবালকে দেখা যায় সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সামনে দিয়ে যেতে। এর পরের ক্যামেরার ফুটেজে আবারও তাকে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চকবাজার শাখার দিকে যেতে দেখা যায়। অন্য ক্যামেরায় গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরের সামনে দিয়ে যেতে দেখা যায় এই যুবককে।

ইকবালকে পরের ফুটেজে এলাকার আরেকটি রাস্তায় কোরআন হাতে হাঁটতে দেখা যায়। পরেরটি ছিল জগন্নাথ মন্দিরের সামনের রাস্তার।

এরপর কোরআন হাতে ইকবালের আর কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।

তবে মাজার কানেক্টিং রোডে ৩টা ১২ মিনিটের ফুটেজে দেখা যায়, মণ্ডপে কোরআন রেখে গদা হাতে ফিরে আসছেন ইকবাল। এই ফুটেজটি সব মিলিয়ে ২ মিনিট ২৫ সেকেন্ডের।

কোরআন রাখতে আরেকটি মন্দিরেও গিয়েছিলেন ইকবাল

মণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখার পর হনুমানের গদা হাতে হেঁটে যাওয়া ইকবাল

এরপর রাত ৩টা ১৩ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডে ওই রাস্তায় একজনকে দেখা গেছে, যাকে ইকরাম হোসেন বলে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে জানান, মণ্ডপে কোরআন রাখায় যে চক্রটি জড়িত, ইকবাল তাদের একজন। তিনি কোরআন রাখার পর ভোরে আরেক অভিযুক্ত ইকরাম হোসেন ঘটনাস্থল থেকে ৯৯৯-এ কল করেন। তারপর ওসি আনওয়ারুল আজিম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি কোরআন শরিফটি উদ্ধারের পাশাপাশি ইকরামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় নিয়ে যান।

কোরআন রাখতে আরেকটি মন্দিরেও গিয়েছিলেন ইকবাল
কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর চলে ভাঙচুর

নিউজবাংলার হাতে আসা শেষ ফুটেজটি মসজিদের বারান্দার। ইকবাল রাত ৩টা ২২ মিনিটে আবার মসজিদে ফিরে যান। তবে তখন তার হাতে গদাটি ছিল না।

এসব ফুটেজ নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম তানভীর আহমেদ নিউজবাংলাকে এর আগে আরেকটি ফুটেজের প্রসঙ্গে বলেন, ‘কুমিল্লার ঘটনাটির পেছনে কারা দায়ী, তা জানতে আমরা সবকিছু নিখুঁতভাবে মনিটর করছি। ঘটনার আগের রাতে কুমিল্লা শহরে যতগুলো সিসিটিভি ক্যামেরায় ইকবালকে দেখা গেছে, সব আমরা সংগ্রহ করেছি। আমরা সব ক্যামেরার পুরো হার্ডড্রাইভ নিয়ে এসেছি, যাতে কেউ কোনো ফুটেজ ডিলিট করে দিলেও আমরা উদ্ধার করতে পারি। আমাদের এক্সপার্ট ফরেনসিক টিম সিসিটিভি ফুটেজগুলো নিয়ে কাজ করেছে।’

আরও পড়ুন:
সেই কাঞ্চনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পিরের মুরিদ মায়ের
রাজারবাগ পিরের সম্পত্তির হিসাব চেয়ে রিট
পির সাহেবের কাণ্ড দেখেন!
মান্নার সিনেমার স্বত্ব: হাইকোর্টে স্ত্রীর রিট

শেয়ার করুন

ইকবালের ভিডিওতে সিসিক্যাম ঘুরল কেন?

ইকবালের ভিডিওতে সিসিক্যাম ঘুরল কেন?

শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারের মসজিদ থেকে ইকবালের কোরআন নেয়ার আলোচিত ভিডিও (বাঁয়ে) এবং সেটি ধারণ করা সিসিটিভি ক্যামেরা। ছবি: নিউজবাংলা

মসজিদ থেকে কোরআন হাতে ইকবালের বেরিয়ে যাওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনার ঝড়। বিষয়টি নিয়ে সিসিটিভি ক্যামেরার আমদানিকারক, ভিডিও ফুটেজ বিশেষজ্ঞ, তদন্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা। পরিষ্কার হয়েছে, এভাবে ফুটেজ পাওয়ার কারণ।

কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত ইকবাল হোসেন কোরআনটি নিয়েছিলেন মণ্ডপের পাশের এক মাজারের মসজিদ থেকে।

মণ্ডপে সহিংসতার আগের রাতে তিনি কোরআন শরিফটি হাতে নিয়ে মণ্ডপের দিকে রওনা হন। এরপর মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর কোরআন রেখে ফিরে আসেন ইকবাল। এসব দৃশ্য ধরা পড়েছে ওই এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরায়।

তবে মসজিদ থেকে কোরআন হাতে ইকবালের বেরিয়ে যাওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনার ঝড়। ফুটেজে কখনও জুম ইন, নড়াচড়া, ঝকঝকে ছবি এবং ক্যামেরা প্যান (ঘোরানো) নিয়ে প্রশ্ন তুলে এর সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে।

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সিসিটিভি ক্যামেরার আমদানিকারক, ভিডিও ফুটেজ বিশেষজ্ঞ, তদন্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা। মসজিদের দৃশ্য ধরা পড়েছে যেসব ক্যামেরায় তার মালিকের বক্তব্যও নেয়া হয়েছে। এতে পরিষ্কার হয়েছে, এভাবে ফুটেজ পাওয়ার কারণ।

ইকবালের ভিডিওতে সিসিক্যাম ঘুরল কেন?
প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন মাজারের মসজিদ থেকে কোরআন শরিফ নিয়ে রওনা হন মণ্ডপের দিকে। এর সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা

নিউজবাংলার হাতে আসা কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল সহিংসতার আগের রাতে একটি মাজারের মসজিদ থেকে কোরআন শরিফটি নিয়ে মণ্ডপের দিকে রওনা হন। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে সময়টি তখন রাত ২টা ১০ মিনিট।

নানুয়ার দিঘির পাশেই শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারটির অবস্থান। মণ্ডপ থেকে হেঁটে যেতে সময় লাগে ২ থেকে ৩ মিনিট। দারোগাবাড়ী মাজার নামে কুমিল্লাবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি রয়েছে মাজারটির। এর মসজিদের বারান্দায় তিলাওয়াতের জন্য রাখা থাকে বেশ কয়েকটি কোরআন শরিফ। রাত-দিন যেকোনো সময় যে কেউ এখানে এসে তিলাওয়াত করতে পারেন।

মাছ পাহারার সিসিটিভি ক্যামেরায় চিহ্নিত ইকবাল

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, মসজিদ থেকে ইকবালের কোরআন শরিফ নেয়ার দৃশ্যটি ধরা পড়ে মাজারের পুকুরের পূর্বপাড়ের একটি বাসার সিসিটিভি ক্যামেরায়।

‘আশার আলো’ নামের ওই বাড়ির মালিক সাইদুর রহমান। তিনি কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার সোনালী ব্যাংক শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার। বর্তমানে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন।

ইকবালের ভিডিওতে সিসিক্যাম ঘুরল কেন?
এই সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে মসজিদ থেকে ইকবালের কোরআন নেয়ার দৃশ্য

সাইদুর নিউজবাংলাকে জানান, তিন বছর আগে আড়াই লাখ টাকায় দারোগাবাড়ী মসজিদের সামনের পুকুরটি ইজারা নেন। শখের বসে এই পুকুরে তিনি মাছ চাষ করেন।

পুকুর থেকে মাছ চুরি ঠেকাতে তিন তলা বাড়িটির বাইরের দিকের দোতলায় উন্নত প্রযুক্তির একটি সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছেন সাইদুর। ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলের এই ক্যামেরাটি প্রতি চার মিনিট অন্তর মুভ করে। মূল ক্যামেরার আশপাশে আরও চারটি ফিক্সড ক্যামেরা রয়েছে।

সাইদুর নিউজবাংলাকে জানান, তিনি মোট ৮০ হাজার টাকায় পাঁচটি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেন। তদন্তের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব ক্যামেরার ডিভিআর বক্স (যেখানে ফুটেজ সংরক্ষণ হয়) নিয়ে গেছে।

ইকবালের কোরআন নেয়ার দৃশ্য সাইদুরের বাড়ির বেশ কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। এর মধ্যে আলোচিত ফুটেজটি সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ইউএনভি ক্যামেরার।

ইকবালের ভিডিওতে সিসিক্যাম ঘুরল কেন?
মাজারের পুকুর ইজারা নেয়ার পর মাছ পাহারায় কয়েকটি সিসিটিভি বসেছে ‘আশার আলো’ নামের বাড়িটিতে

নিউজবাংলা পরীক্ষা করে দেখেছে, ইউএনভি পিটিজেড প্রাইম ক্যাটাগরির IPC6222ER-X30-B মডেলের ক্যামেরাটি বসানো হয়েছে সাইদুরের বাড়িতে। গ্লোবাল ইউনিভিউ ডটকম নামের একটি ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা গেছে, এ ধরনের সিসিটিভি ক্যামেরা সাধারণ ক্যামেরার চেয়ে ৩০ গুণ অপটিক্যাল জুম করে অবজেক্টের ছবি নিতে সক্ষম।

অপটিক্যাল জুমের কারণে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের বস্তুর ছবিও পরিষ্কারভাবে ধারণ করা সম্ভব। এ ছাড়া সিএমওএস সেন্সর থাকায় এটি দূরের চলমান বস্তুকে চিহ্নিত করে এর হাই রেজ্যুলিউশনের ছবি তুলতে সক্ষম।

সাইদুর রহমান এই ক্যামেরাটি কেনেন কুমিল্লা নগরীর মনোহরপুরের পিসি নেট কম্পিউটার্স থেকে। দোকানের মালিক জহিরুল ইসলাম নিউজবাংলাকে জানান, ইউএনভি পিটিজেড প্রাইম ক্যাটাগরির IPC6222ER-X30-B মডেলের ক্যামেরা তারা ৪৫ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন। এটি সর্বাধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তিসম্পন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা। হাই রেজ্যুলেশনের এ ক্যামেরায় ভিডিওর পাশাপাশি অডিও ধারণও সম্ভব।

ইকবালের ভিডিওতে সিসিক্যাম ঘুরল কেন?
কুমিল্লার এই দোকান থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা কিনেছেন সাইদুর রহমান

আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়ে যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও সিসিটিভি আমদানিকারকেরা বলছেন, বাজারে এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অনেক ধরনের সিসিটিভি ক্যামেরা পাওয়া যায়। এক হাজার টাকা থেকে লাখ টাকার ক্যামেরাও আছে। চাহিদা বিবেচনায় প্রতিনিয়তই এসব ক্যামেরায় নতুন নতুন ফিচার যুক্ত করছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।

বাংলাদেশে সিটিটিভি ক্যামেরা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এক্সেল টেকনোলজির সিসিটিভি ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা রাজিব বিশ্বাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখন মানুষ নিরাপত্তার জন্য অনেক ইনভেস্ট করে। তাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সিসিটিভি ক্যামেরা বাজারে আসছে। এখন ক্যামেরা দিয়ে শুধু ভিডিও ধারণ করা যায় তাই নয়, শব্দ রেকর্ড করাসহ কথাও বলা যায়।’

তিনি বলেন, ‘ভালো ক্যামেরায় প্রায় ১ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরের ফুটেজ ধারণ করা যায়। এখনকার প্রায় সব ক্যামেরার ফুটেজ জুম করেও দেখা যায়। অপটিক্যাল জুম ও ডিজিটাল জুম নামে দুটি অপশন রয়েছে। অপটিক্যাল জুম করে অনেক দূরের ছবি ফুটেজ জুম করলেও তা স্পষ্ট দেখা যায়, এতে রেজ্যুলেশনের খুব একটা পরিবর্তন ঘটে না।’

ইকবালের ভিডিওতে সিসিক্যাম ঘুরল কেন?
ইউএনভি পিটিজেড প্রাইম ক্যাটাগরির IPC6222ER-X30-B মডেলের ক্যামেরার স্পেসিফিকেশন

৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল ক্যামেরা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলোকে পিটিজেড (প্যান, টিল, জুম) ক্যামেরা বলা হয়। এই ক্যামেরা চারপাশে ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল পর্যন্ত ভিডিও ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ একটি নিদিষ্ট অ্যাঙ্গেলে কোনো ভিডিও ধারণ করা হলে এর ডান, বাম, ওপর, নিচ সব জায়গায় ৩৬০ ডিগ্রি সীমানা পর্যন্ত ছবি বা ভিডিও দেখা য়ায়। শুধু তাই নয়, ওই ক্যামেরায় ট্র্যাকিং সেন্সর থাকলে কোনো কিছুর মুভমেন্টও অটোমেটিক ধারণ করা যায়। অর্থাৎ এই প্রযুক্তির ক্যামেরার সামনে দিয়ে কিছু নড়াচড়া করলে বা কেউ হেঁটে গেলে ক্যামেরা তাকে অনুসরণ করে নিজে নিজে ঘুরবে।’

ইকবালের আলোচিত ফুটেজটি নিয়ে ভিডিও সম্পাদনা বিশেষজ্ঞদের মতামতও নিয়েছে নিউজবাংলা। ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সিনিয়র ভিডিও এডিটর রিফাত আনোয়ার লোপা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি সিসিটিভি ফুটেজটি দেখেছি। সিসিটিভির আধুনিক ফর্ম হিসেবে, বেশি জায়গাজুড়ে দেখার জন্য ফিশআই ক্যামেরা (ফিক্সড ক্যামেরা) ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া, ডোম ক্যামেরাও (মুভিং ক্যামেরা) আছে। দীর্ঘদিনের এডিটিং অভিজ্ঞতায় আমার মনে হয়েছে, এটা ডোম ক্যামেরার ফুটেজ।’

ইকবালের ফুটেজটি নিয়ে যা বলছেন তদন্তকারীরা

কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে কোনো সিসিটিভি না থাকলেও আশপাশের অনেক প্রতিষ্ঠান ও বাসায় সিসিটিভি রয়েছে। ওই মণ্ডপে ১৩ অক্টোবরের সহিংসতার পর তদন্তে নেমে আশপাশের সব ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ। এসব ফুটেজে কোরআন রাখার আগে-পরে ইকবাল কোন পথে আসা-যাওয়া করেছেন তাও ধরা পড়েছে।

পুলিশ বলছে, তদন্তের স্বার্থে সব সিসিটিভি ফুটেজ ফরেনসিক বিভাগে এনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতেই ইকবালের অপরাধের প্রমাণ ধরা পড়ে। এরপর যেসব ফুটেজে ইকবালকে দেখা গেছে, সেগুলো ঘটনার ক্রম অনুযায়ী সংরক্ষণ করেছে পুলিশের ফরেনসিক টিম।

ইকবালের ভিডিওতে সিসিক্যাম ঘুরল কেন?
মসজিদ থেকে কোরআন নিয়ে মণ্ডপে রাখায় প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল

আলোচিত ফুটেজটি পুলিশের সাইবার ফরেনসিক কম্পিউটারের মনিটর থেকে মোবাইল ফোনে ধারণ করা। ইকবালের গতিবিধির সব ফুটেজ একসঙ্গে কম্পিউটারে চালিয়ে তা পর্যালোচনা করছিলেন কয়েকজন কর্মকর্তা। এ সময় একজন মনিটর থেকে মোবাইল ফোনে ফুটেজটি ধারণ করেন।

এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রকাশ পাওয়া ফুটেজটি ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এর চারপাশে কম্পিউটার মনিটরের কালো বর্ডার দেখা যাচ্ছে। আর স্ক্রিনের নিচের দিকে ভিডিও প্লেয়ার সফটওয়্যারের মেন্যু দৃশ্যমান। ফরেনসিক ল্যাবে ফুটেজটি বিশ্লেষণের সময় এটি জুম করে প্লে করা হয়েছিল, যাতে ইকবালের গতিবিধি স্পষ্ট ধরা পড়ে। উচ্চপ্রযুক্তির সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজের কারণেই এভাবে জুম করা সম্ভব হয়েছে।’

তিনি জানান, ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল পজিশনের ধারণ করা ফুটেজটি ফরেনসিক ল্যাবের কম্পিউটারে ইচ্ছেমতো জুম ইন ও জুম আউট করে নানা অ্যাঙ্গেল থেকে যাচাই করা হচ্ছিল। এ সময়েই একজন মোবাইল ফোনে সেটি ধারণ করেন। এই ফুটেজের বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম তানভীর আহমেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কুমিল্লার ঘটনাটির পিছনে কারা দায়ী তা জানতে আমরা সবকিছু নিখুঁতভাবে মনিটর করছি। ঘটনার আগের রাতে কুমিল্লা শহরে যতগুলো সিসিটিভি ক্যামেরায় ইকবালকে দেখা গেছে, সব আমরা সংগ্রহ করেছি। আমরা সব ক্যামেরার পুরো হার্ডড্রাইভ নিয়ে এসেছি, যাতে কেউ কোনো ফুটেজ ডিলিট করে দিলেও আমরা উদ্ধার করতে পারি।

‘আমাদের এক্সপার্ট ফরেনসিক টিম সিসিটিভি ফুটেজগুলো নিয়ে কাজ করেছে। এই ফুটেজ আমাদের ফরেনসিক ল্যাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলের ক্যামেরার ফুটেজ হওয়ায় সেটি জুম করে দেখা যায় এবং পজিশনও পরিবর্তন করা যায়। এখানে ভিডিও এডিট করার কোনো কারণ নেই।’

আরও পড়ুন:
সেই কাঞ্চনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পিরের মুরিদ মায়ের
রাজারবাগ পিরের সম্পত্তির হিসাব চেয়ে রিট
পির সাহেবের কাণ্ড দেখেন!
মান্নার সিনেমার স্বত্ব: হাইকোর্টে স্ত্রীর রিট

শেয়ার করুন

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল

মণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখার পর হনুমানের গদা হাতে হেঁটে যাওয়া ইকবাল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য এবং নিজস্ব অনুসন্ধানে নিউজবাংলা নিশ্চিত হয়েছে, মণ্ডপে কোরআন রেখে গদা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাওয়া ব্যক্তির নাম ইকবাল হোসেন। ৩০ বছর বয়সী ইকবাল কুমিল্লা নগরীর ১৭ নং ওয়ার্ডের দ্বিতীয় মুরাদপুর-লস্করপুকুর এলাকার নূর আহম্মদ আলমের ছেলে। তাকে খুঁজছে পুলিশ।

কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে ইকবাল হোসেন নামের এক যুবককে। এই ইকবালকে গ্রেপ্তারে গত কয়েক দিন ধরে চলছে জোর অভিযান।

ইকবালের সহযোগী হিসেবে অন্তত চারজন এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মনে করছে, ইকবাল গ্রেপ্তার হলেই এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

দুর্গাপূজায় সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর ভোরে কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের ওই মণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা।

ওই মণ্ডপের পাশাপাশি আক্রান্ত হয় নগরীর আরও বেশ কিছু পূজামণ্ডপ। পরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়।

যেখান থেকে সাম্প্রদায়িক এই সহিংসতার শুরু, সেই নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে কীভাবে উত্তেজনার শুরু এবং মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর পবিত্র কোরআন শরিফ কী করে এলো, সে বিষয়ে মঙ্গলবার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউজবাংলা।

পূজার আয়োজক, এলাকাবাসী, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার আগের রাত আড়াইটা পর্যন্ত মন্দিরে পূজাসংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি ছিল। এরপর বুধবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে দুজন নারী ভক্ত মণ্ডপে এসে হনুমানের মূর্তিতে প্রথম কোরআন শরিফটি দেখতে পান।

রাত আড়াইটা থেকে ভোর সাড়ে ৬টার মধ্যে কোনো একসময়ে স্থানীয় এক ব্যক্তি কোরআন শরিফটি রেখে যান মণ্ডপে। এ সময় হনুমানের হাতের গদাটি সরিয়ে নেন তিনি। গদা হাতে তার চলে যাওয়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে ওই এলাকারই কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরায়।

এ ধরনেরই একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পেয়েছে নিউজবাংলা। এতে দেখা যায়, কোরআন শরিফটি রাখার পর হনুমানের মূর্তির গদা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন প্রধান অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে সময়টি রাত তখন সোয়া ৩টার মতো।

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
কুমিল্লার পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখায় প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য এবং নিজস্ব অনুসন্ধানে নিউজবাংলা নিশ্চিত হয়েছে, গদা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাওয়া ওই ব্যক্তির নাম ইকবাল হোসেন। ৩০ বছর বয়সী ইকবাল কুমিল্লা নগরীর ১৭ নং ওয়ার্ডের দ্বিতীয় মুরাদপুর-লস্করপুকুর এলাকার নূর আহম্মদ আলমের ছেলে। নূর আলম পেশায় মাছ ব্যবসায়ী।

পরিবারও চায় ইকবালের শাস্তি

ইকবালের মা আমেনা বেগম নিউজবাংলাকে জানান, তার তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে ইকবাল সবার বড়।

তিনি জানান, ইকবাল ১৫ বছর বয়স থেকেই নেশা করা শুরু করেন। ১০ বছর আগে তিনি জেলার বরুড়া উপজেলায় বিয়ে করেন। ওই ঘরে তার এক ছেলে রয়েছে। পাঁচ বছর আগে ইকবালের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।

তারপর ইকবাল চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়া বাজার এলাকার কাদৈর গ্রামে আরেকটি বিয়ে করেন। এই সংসারে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

আমেনা বেগম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ইকবাল নেশা করে পরিবারের সদস্যদের ওপর অত্যাচার করত। বিভিন্ন সময় রাস্তাঘাটেও নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াত।’

ইকবাল মাজারে মাজারে থাকতে ভালোবাসতেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সে বিভিন্ন সময় আখাউড়া মাজারে যেত। কুমিল্লার বিভিন্ন মাজারেও তার যাতায়াত ছিল।’

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
ইকবালের জাতীয় পরিচয়পত্র

পঞ্চম শ্রেণি পাস ইকবালের সঙ্গে ১০ বছর আগে বন্ধুদের মারামারি হয়। এ সময় তারা ইকবালকে পেটে ছুরিকাঘাত করেন। তখন ইকবাল অপ্রকৃতিস্থ আচরণ শুরু করেন বলে দাবি করে তার পরিবার। আমেনা বেগম জানান, তিনি স্থানীয় কাউন্সিলরের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন ইকবাল পূজামণ্ডপ থেকে হনুমানের গদা সরিয়ে সেখানে কোরআন শরিফ রেখেছেন। আমেনা বলেন, ‘ইকবাল কারও প্ররোচনায় এমন কাজ করতে পারে। তার বোধবুদ্ধি খুব একটা নেই। ছেলে সত্যিই যদি অন্যায় করে, তাহলে যেন তার শাস্তি হয়।’

ইকবালের ছোট ভাই রায়হান নিউজবাংলাকে জানান, ইকবালকে খুঁজতে পুলিশকে তারাও সহায়তা করছেন।

১৭ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সৈয়দ সোহেল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি ১০ বছর ধরে ইকবালকে চিনি। সে রঙের কাজ করত। মাঝে মাঝে নির্মাণকাজের সহযোগী হিসেবেও কাজ করত। ইকবাল ইয়াবা সেবন করায় প্রায়ই তাকে নিয়ে অনেক দেনদরবার করতে হতো।’

ইকবালের কর্মকাণ্ডে এলাকাবাসীও বিরক্ত বলে জানান তিনি। সোহেল বলেন, ‘আমার দৃঢ়বিশ্বাস ইকবালের মানসিক অসুস্থতাকে কাজে লাগিয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষ কাজটি করেছে।’

কোরআন রাখার পর যেভাবে ছড়ানো হয় উত্তেজনা

তদন্তসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে জানান, মণ্ডপে কোরআন রাখায় যে চক্রটি জড়িত, ইকবাল তাদের একজন। তিনি কোরআন রাখার পর ভোরে আরেক অভিযুক্ত ইকরাম হোসেন (৩০) ঘটনাস্থল থেকে ৯৯৯-এ কল করেন। তারপর ওসি আনওয়ারুল আজিম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি কোরআন শরিফটি উদ্ধারের পাশাপাশি ইকরামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় নিয়ে যান।

নগরীর বজ্রপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন চিনু রানী দাশ। নানুয়ার দিঘির পূর্ব পাড়ের একটি বাসায় তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তিনি মণ্ডপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখতে পান দুই নারী মণ্ডপে কোরআন শরিফ দেখে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন।

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে রাখা হনুমানের মূর্তির গদা সরিয়ে রাখা হয় পবিত্র কোরআন শরিফ। বাঁয়ের ছবিটি মঙ্গলবারের, ডানেরটি বুধবার সকালের

চিনু রানী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ সময় এক ছেলে ছুটে এসে চিৎকার করে বলে, হনুমানের পায়ের কাছে কোরআন, কেউ এখানে থাকবেন না। আর যে কোরআন এখান থেকে সরিয়ে নেবে, তার হাত কেটে ফেলা হবে।’

এ কথা শুনে ভয় পেয়ে যান চিনু। তিনি বলেন, ‘আমি একটু সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখছিলাম। ছেলেটা কাকে যেন ফোন দিয়ে কোরআনের বিষয়টা জানায়। এর কিছুক্ষণ পর সিএনজি দিয়ে একজন লোক আসে। সে এসে কোরআন শরিফটিকে বুকের মধ্যে নেয়।’

সিএনজি অটোরিকশায় আসা ওই ব্যক্তিই হলেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনওয়ারুল আজিম। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি ৯৯৯ থেকে কল পেয়ে একটা সিএনজিতে করে দ্রুত মণ্ডপে আসি।’

পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইকরামও রাতে নেশা করেছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, ওই রাতে ৩ পিস ইয়াবা সেবন করেন। পরে মণ্ডপের পাশে অবস্থান নেন। মণ্ডপে কোরআন রাখেন ইকবাল। আর ইকরামের দায়িত্ব ছিল ভোরে বিষয়টি পুলিশকে জানানোর। সে অনুযায়ী তিনি ৯৯৯-এ ফোন করেন।

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
কুমিল্লার সেই আলোচিত ফেসবুক লাইভ। ডানে লাইভ করা ব্যক্তি ফয়েজ আহমেদ

ওসি আনওয়ারুল আজিম মণ্ডপ থেকে কোরআন উদ্ধারের সময় সেটি ফেসবুকে লাইভ করেন ফয়েজ নামের এক যুবক। সেই লাইভের পরেই উত্তেজিত মানুষ জড়ো হন ঘটনাস্থলে, শুরু হয় সহিংসতা। এই ফয়েজকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে জানান, তাদের ধারণা, দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপ থেকে যে কোরআন শরিফটি উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি আনা হয় পাশের একটি মাজার থেকে।

নানুয়ার দিঘির পাশেই শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারটির অবস্থান, মণ্ডপ থেকে হেঁটে যেতে সময় লাগে ২ থেকে ৩ মিনিট। দারোগাবাড়ী মাজার নামে কুমিল্লাবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি রয়েছে মাজারটির। এর বারান্দায় দর্শনার্থীদের তিলাওয়াতের জন্য রাখা থাকে বেশ কয়েকটি কোরআন শরিফ। রাত-দিন যেকোনো সময় যে কেউ এখানে এসে তিলাওয়াত করতে পারেন।

দারোগাবাড়ী মাজারের মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন এমন তিনজনকে ঘটনার পর থেকে দেখা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একজনের নাম হুমায়ুন কবীর (২৫), আরেকজনের বিষয়ে নিউজবাংলা তথ্য পেলেও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর চলে ভাঙচুর

দারোগাবাড়ী মাজারের খাদেম আহামুদ্দুন্নাবী মাসুক নিউজবাংলাকে জানান, হুমায়ুন মাজারে এসে নামাজ আদায় করতেন। তার বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার দেওরা এলাকায়। ঘটনার পরদিনই তাকে পুলিশ নিয়ে যায়। এ ছাড়া মাজারে আরও দুই-একজন নামাজ আদায় করতেন। তাদের এখন আর দেখা যাচ্ছে না।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মাজারে নিয়মিত যাওয়া ওই তিন যুবকই মণ্ডপে কোরআন রাখার পরিকল্পনায় জড়িত। তাদের মধ্যে দুজনকে আমরা আটক করেছি। জিজ্ঞাসাবাদে তারা অনেক তথ্য দিয়েছে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজেও ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি।

‘তবে তৃতীয় যুবক ইকবালকে আটক করতে পারলে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। কারণ তিনিই সরাসরি মণ্ডপে কোরআন রেখেছিলেন। তাকে ধরতে আমাদের অভিযান চলছে।’

আরও পড়ুন:
সেই কাঞ্চনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পিরের মুরিদ মায়ের
রাজারবাগ পিরের সম্পত্তির হিসাব চেয়ে রিট
পির সাহেবের কাণ্ড দেখেন!
মান্নার সিনেমার স্বত্ব: হাইকোর্টে স্ত্রীর রিট

শেয়ার করুন

হাজীগঞ্জে সহিংসতায় কিশোর গ্রুপ, সংগঠিত মেসেঞ্জারে 

হাজীগঞ্জে সহিংসতায় কিশোর গ্রুপ, সংগঠিত মেসেঞ্জারে 

১৩ অক্টোবর চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌর এলাকায় হাজারখানেক মানুষের মিছিল থেকে হামলা হয় একটি স্থানীয় মন্দিরে। ছবি: নিউজবাংলা

স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৩ অক্টোবর বহিরাগত কিছু কিশোর মিছিল সংগঠিত করে। পরে তাতে যোগ দেয় স্থানীয়দের একটি অংশও। এর আগে ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে ছড়ানো হয় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা। 

কুমিল্লায় একটি পূজা মণ্ডপে কোরআন শরিফ পাওয়ার জের ধরে গত ১৩ অক্টোবর ব্যাপক সহিংসতা হয় চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌর এলাকায়।

সেদিন সন্ধ্যায় হাজারখানেক মানুষের মিছিল থেকে হামলা হয় একটি স্থানীয় মন্দিরে। সেই হামলা প্রতিহত করতে গেলে হামলাকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি চালালে ওইদিনই মারা যান চার জন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত মঙ্গলবার দুপুরে মারা যান আরও একজন।

পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর পৌর এলাকার আরও পাঁচটি মন্দিরে হামলা ও ভাংচুর হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেদিন বহিরাগত কিছু কিশোর মিছিল সংগঠিত করে। পরে তাতে যোগ দেয় স্থানীয়দের একটি অংশও। ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে ছড়ানো হয় উত্তেজনা।

সহিংসতার জন্য হাজীগঞ্জ আওয়ামী লীগে বিভাজনকেও দায়ী করছেন স্থানীয়রা। মন্দিরে হামলার সিসিটিভি ফুটেজে পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাব্বীর উপস্থিতি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে রাব্বীর দাবি, হামলা ঠেকাতে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। মন্দিরের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রশাসনকেও দায়ী করছেন মন্দির সংশ্লিষ্টরা।

হামলা-সহিংসতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে ১৯ জন, তাদের অনেকেই জামায়াত-বিএনপির সমর্থক বলে জানিয়েছে পুলিশ।

যেভাবে ছড়ায় সহিংসতা

হাজীগঞ্জ পৌর এলাকায় উত্তেজনা ও সহিংসতার কারণ জানতে নিবিড় অনুসন্ধান করেছে নিউজবাংলা। এলাকাবাসী, রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসন ও মন্দির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বিভিন্ন তথ্য।

স্থানীয়রা জানান, কুমিল্লায় মণ্ডপে ১৩ অক্টোবর সকালে কোরআন পাওয়ার ঘটনাটি ফেইসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জেও। সন্ধ্যায় এশার নামাজের ঠিক পরপরই পৌর এলাকার হাজীগঞ্জ বাজারের মূল সড়কে ২০ থেকে ২৫ জন কিশোরের একটি মিছিল শুরু হয়। মোবাইল ফোনে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মিছিলটি একবার বাজারের মূল সড়ক ঘুরে দ্বিতীয়বার প্রদক্ষিণের সময় হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের মুসল্লিরাও তাতে যোগ দেন। তখন মিছিলে হাজারখানেক লোকের জমায়েত হয়।

মিছিলটি থেকে সাম্প্রদায়িক বিভিন্ন স্লোগান দেয়া হচ্ছিল। বাজার এলাকাতেই শ্রী শ্রী রাজা লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর আখরা মন্দিরের অবস্থান।

ভিডিওতে দেখা যায়, দ্বিতীয়বার প্রদক্ষিণের সময় মিছিল থেকে হঠাৎ মন্দিরটিতে হামলা চালায় ২০-২৫ জন কিশোর। তারা মন্দিরের ভিতরে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। ভাংচুর করা হয় পূজা উপলক্ষে তৈরি করা মন্দিরের অস্থায়ী গেট। এ সময় মিছিলে যোগ দেয়া মুসল্লিরা হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এরপর মুসল্লিরা এলাকা ত্যাগ করেন।

সহিংসতার কিছু সময় পর পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে এলে হামলাকারীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে গুলি ছোড়ে পুলিশ। সেখানে হতাহতের ঘটনার পর স্থানীয় শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম, জমিদারবাড়ি মন্দির, রামপুর চৌধুরী বাড়ি মন্দির, দশভূজা পূজামণ্ডপ ও মুকুন্দেশ্বর সূত্রধরবাড়ি পূজামণ্ডপে ভাংচুর চালায় হামলাকারীরা।

বাজার এলাকার একাধিক দোকানি নিউজবাংলাকে জানান, তারা হঠাৎ দেখেন ২০-২৫ জন কিশোর একসঙ্গে জড়ো হয়ে মিছিলটি শুরু করে। নামাজের পর সেই মিছিলে বড় মসজিদের মুসল্লিরা যোগ দেন। মিছিল শুরু করা ছেলেগুলোই পরে মন্দিরে হামলা শুরু করে। মিছিলে থাকা মুসল্লিরা বাধা দিলে তারাও ইটপাটকেলের মুখে পড়েন।

কয়েক জন প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে জানান, হামলা শুরুর ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। হামলাকারীরা তাদের লক্ষ্য করে প্রচুর ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। কিছুক্ষণ পর গুলি চালায় পুলিশ। হামলাকারীরা এতে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও পরে আরও পাঁচটি মন্দির আক্রান্ত হয়। স্থানীয়দের দাবি, পুলিশ মিছিলটি বাজারে ঢোকার আগেই থামিয়ে দিলে এমন ঘটনা ঘটত না।

মেসেঞ্জার গ্রুপে সংগঠিত কিশোর গ্রুপ

হাজীগঞ্জ পৌর এলাকায় গত ১৩ অক্টোবর মিছিলে নেতৃত্ব দেয়া কিশোর ও হামলার নেতৃত্ব দেয়া কিশোরদের পরিচয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিতে পারেননি স্থানীয়রা। তবে তাদের দাবি, ওই দলটি পৌর এলাকার পাশের কয়েকটি ইউনিয়ন ও গ্রাম থেকে এসেছিল।

অনুসন্ধানে জানা যায়, স্থানীয় রায়চোঁ, রান্ধুনীমুড়া গ্রাম থেকে সংগঠিত হয়ে মিছিল ও হামলা করার উদ্দেশ্যে পৌরসভায় আসে কিশোর গ্রুপটি। রায়চোঁ গ্রামের কয়েক জন বাসিন্দা নিউজবাংলাকে জানান, সেদিন মাগরিবের নামাজের সময় গ্রামের মসজিদে কিছু কিশোর একত্রিত হয়। নামাজের পর তারা একসঙ্গে গ্রাম থেকে বেরিয়ে যায়। সেসময় তারা নিজেদের মধ্যে হিন্দুদের ‘সমুচিত জবাব’ দেয়ার কথা আলোচনা করছিল।

জানা গেছে, রায়চোঁ গ্রাম থেকে যাওয়া দলটি রামগঞ্জ-হাজীগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে উঠলে তাদের সঙ্গে পাশের রান্ধুনীমুড়ার গ্রামের কিছু কিশোরও যোগ দেয়। ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তারা সংগঠিত হয়।

সহিংসতার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় রান্ধুনীমুড়া এলাকার ১৪ বছরের কিশোর ইয়াসিন হোসেন হৃদয়। স্থানীয় একটি পলিটেকনিক স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিল সে। হৃদয়ের বাবা ফজলুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হৃদয় বলছিল মিছিল হবে, সে ফেসবুকে দেখেছে। সঙ্গে এলাকার আরও ছেলেও যাবে। এরপর হৃদয় বাসা থেকে বের হয়ে যায়। তাকে ঘরে দেখতে না পেয়ে আমি হাজীগঞ্জ বাজারের দিকে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি গণ্ডগোল। পরে হাসপাতালে গিয়ে ছেলের লাশ পাই।’

রায়চোঁ গ্রামের চাঁদপুর সরকারি পলিটেকনিকের এসএসসি পরীক্ষার্থী আল আমিনও গুলিতে মারা গেছে। তার বাবা রুহুল আমিন জানান, অ্যাসাইমেন্টের কাগজ আনতে বাজারে গিয়েছিল আল আমিন। মাগরিবের পর সে বাসা থেকে বের হয়। সংঘর্ষের কিছুক্ষণ আগেও বোনের সঙ্গে তার মোবাইলে কথা হয়েছে। এরপর খবর আসে পুলিশের গুলিতে সে মারা গেছে।

আল আমিনের পরিবারের দাবি, রাস্তা পার হতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয় সে। তবে সংঘর্ষের সময়কার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দের পর হামলাকারীদের মাঝখানে লুটিয়ে পড়ে এই কিশোর।

নিহত আরেকজনও ১৬ বছরের মো. শামীম। তার বাড়িও একই এলাকায়। শামীম হাজীগঞ্জ বাজারে কলা বিক্রি করত। তার বাবা মো. আব্বাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সেদিন দুই বড় ভাইয়ের সঙ্গে শামীম বাজারে কলা বিক্রি করছিল। সংঘর্ষের পর দুই ভাই ফিরে এলেও শামীম ফেরেনি। পরদিন কুমিল্লা সদর হাসপাতালে তার মরদেহ পাওয়া যায়।’

নিহত আরেক জন ২৮ বছরের নির্মাণ শ্রমিক বাবলু। বাজারের একটি নির্মাণাধীন আটতলা ভবনের উপরে কাজ করার সময়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। বাবলুর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। এছাড়া পিকআপ চালক সাগর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কুমিল্লা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মঙ্গলবার সকালে তিনি মারা যান।

হাজীগঞ্জের ইতিহাসে ন্যাক্কারজনক হামলা

শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম মন্দিরের পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিহার রঞ্জন হালদার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হাজীগঞ্জের ইতিহাসে এমন ন্যাক্কারজনক হামলা এই প্রথম। আমরা এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না।’

হামলার পিছনের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারব না। পুরো ঘটনার অনেক সিসিটিভি ফুটেজ আছে, সেগুলো দেখলেই আপনারা বুঝে যাবেন। আমরা শুধু এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’

শ্রী শ্রী লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর আখড়া মন্দিরের পরিচালনা কমিটি ও হাজীগঞ্জ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সত্য ব্রত ভদ্র মিঠুন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখানে আমরা জন্মের পর থেকে দেখে আসছি রাজনৈতিক বিভেদ থাকলেও আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতা-কর্মীরা সব সময় আমাদের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন। তারা আমাদের পূজায় আসেন, আমরা তাদের অনুষ্ঠানে যেতাম। তাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল সারা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলেও হাজীগঞ্জে এমন কিছু হবে না।’

হাজীগঞ্জে আওয়ামী লীগে বিভক্তির কারণে সহিংসতার সময়ে দলটির নেতাকর্মীরা দৃঢ় ভূমিকা নিতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। মন্দির সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হামলার সময় আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল কোনো নেতার সাড়া পাওয়া যায়নি।

হাজীগঞ্জ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সত্য ব্রত ভদ্র মিঠুন বলেন, ‘হাজীগঞ্জের রাজনীতি বলতে গেলে এখন অভিভাবকহীন। সুবিধাভোগী একটি তৃতীয় পক্ষ এর সুযোগ নিয়েছে। ওই তৃতীয় পক্ষে আওয়ামী লীগ- বিএনপি-জামায়াতের সমর্থক রয়েছে। তারা কুমিল্লার ঘটনাকে পুঁজি করে পরিকল্পিতভাবে হামলা করেছে।’

মন্দিরে হামলার সময়কার একটি সিসিটিভি ফুটেজে পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাব্বীর উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় তানভীর আহমেদ শাওন নামে রাব্বীর একজন সমর্থক আহত হন বলেও দাবি করেছেন তার প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতারা।

এ অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মেহেদী হাসান রাব্বী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ সবই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার। সব ভিত্তিহীন অভিযোগ। আমি বরং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সব মন্দিরে হামলাকারীদের প্রতিহত করেছি। উপজেলা আওয়ামী লীগের কেউ এ সময় মাঠে ছিল না।’

তানভীর আহমেদ শাওনের বিষয়ে জানতে চাইলে রাব্বী বলেন, ‘ও শুধুই আমাদের একজন সমর্থক। কমিটিতে ওর কোনো পদ নেই। সেদিন আমার মতো শাওনও পুলিশের পাশাপাশি হামলাকারীদের প্রতিহত করতে গিয়ে ইটের আঘাতে সামান্য আহত হয়। সে এখন ভালো আছে, বাসায় আছে।’

রাব্বি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ‘শাওন যদি হামলায় অংশ নিত তাহলে পুলিশের মামলায় তার নাম থাকত। বরং পুলিশের মামলায় উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এবায়দুর রহমান খোকনের ভাইদের নাম রয়েছে।’

হামলাকারী ঠেকাতে গুলি চালানোর প্রয়োজন কেন পড়ল, জানতে চাইলে চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘তখন গুলি না চালালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত, হিন্দু সম্প্রদায় ও হাজীগঞ্জ বাজারের সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতেই গুলি চালাতে পুলিশ বাধ্য হয়েছে।’

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার ১৯ জনের বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, ‘এদের মধ্যে সাত জন ছয়টি মামলার এজাহারনামীয় আসামি। বাকিদের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

গ্রেপ্তারকৃতদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত জামায়াত-বিএনপির কয়েকজন সমর্থক পাওয়া গেছে।’

এ বিষয়ে জানতে হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তির বিএনপির সমন্বয়ক ও চাঁদপুর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মমিনুল হককে টেলিফোন করা হলে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চান না বলে সংযোগ কেটে দেন।

আরও পড়ুন:
সেই কাঞ্চনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পিরের মুরিদ মায়ের
রাজারবাগ পিরের সম্পত্তির হিসাব চেয়ে রিট
পির সাহেবের কাণ্ড দেখেন!
মান্নার সিনেমার স্বত্ব: হাইকোর্টে স্ত্রীর রিট

শেয়ার করুন