‘পদ্মা সেতুর দাবি করায় অনেকে পাগলও বলেছে’

player
‘পদ্মা সেতুর দাবি করায় অনেকে পাগলও বলেছে’

এক দিনের কষ্টের ঘটনা বর্ণনা করতে করতে খোকা সিকদার বলেন, ‘একবার লঞ্চে ফরিদপুরে বোনের বাসায় যাচ্ছি। পথে কেবিন থেকে লোকজন বলে উঠল- এই শালার পাগল পদ্মা নদীতে সেতু চায়! তারপর সবাই হো হো করে হেসে ওঠে।’

‘পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের ব্যানারে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা শহরে বিভিন্ন নেতার সঙ্গে কথা বলেছি। পদ্মার ভাঙন থেকে শুরু করে বিভিন্ন কষ্টের কথা বলেছি। সেসব কষ্ট লাঘবে পদ্মা সেতুর প্রয়োজনীয়তা তাদের কাছে তুলে ধরেছি। সবাই এই দাবির সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন করেছেন। ওয়ার্ড থেকে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে সভা-সমাবেশ করেছি। ব্যানার-পোস্টার বানিয়েছি। পত্রিকায় নিউজ পাঠিয়েছি। তবে এসব কর্মকাণ্ড চলাকালে অনেক মানুষ টিটকারী করেছে, হাসি-তামাশা করেছে। অনেকেই পাগলও বলেছে।’

১০ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বিকেলে মোবাইল ফোনে নিউজবাংলাকে এসব কথা বলেন ছাবেদুর রহমান খোকা সিকদার। পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের এই প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এখন শরীয়তপুরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

নিউজবাংলার সঙ্গে আলাপকালে পদ্মা সেতু নিয়ে নব্বই দশকের সেই আন্দোলন ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপটের বিস্তারিত জানিয়েছেন খোকা সিকদার। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের মূল প্রেরণা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তিনি নিজেই ডেকে নিয়ে আন্দোলনে উৎসাহ দিয়েছেন। তার নির্দেশনাতেই এই আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।’

‘পদ্মা সেতুর দাবি করায় অনেকে পাগলও বলেছে’

খোকা সিকদার জানান, এই আন্দোলনের কারণে চলতি পথে বিভিন্ন সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। একবার মাওয়া দিয়ে নৌকায় বাড়ি ফেরার সময় লোকজন তাকে ‘শালা পাগল হয়ে গেছে’ বলেও টিটকারী করেছিল।

তিনি জানান, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার প্রেরণায়ই ১৯৮৬ সালে তারা পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদ গঠন করেন। ২১ সদস্যের এই পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ইত্তেফাকের আব্বাস উদ্দিন আনসারী।

খোকা সিকদার বলেন, ‘হুসেইন মো. এরশাদের সময় যমুনা সেতুর কথা ওঠে। তখনই আমাদের কয়েকজনের উপলব্ধি আসে, আমরা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ এত কষ্ট করে নদী পার হই। নানা দুর্ভোগ পেরিয়ে যাতায়াত করি। এই অঞ্চলের মানুষের জন্য পদ্ম নদীর ওপর সেতু হলে এই কষ্ট দূর হতো।

‘সেই ভাবনা ও উপলব্ধি থেকেই আমি আর আব্বাস উদ্দিন আনসারী ভাইসহ কয়েকজন পদ্মা সেতুর প্রয়োজনীয়তার কথা সবার কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করি। ব্যানার-পোস্টার বানানো শুরু করি। ওয়ার্ডে-ওয়ার্ডে ঘুরে যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলি।’

পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বলেন, “পরবর্তীতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কষ্টার্জিত টাকা খরচ করে পোস্টার ছাপাই। ১৯৮৬ সালের সেই পোস্টারে লেখা ছিল, ‘২১ জেলার ৫ কোটি মানুষের প্রাণের দাবি পদ্মা সেতু চাই’।”

‘পদ্মা সেতুর দাবি করায় অনেকে পাগলও বলেছে’

তিনি জানান, ১৯৮৬ সালে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদ গঠনের পর তারা এ কার্যক্রম সবখানে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। খুলনা, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় গিয়ে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের জেলাভিত্তিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। সেসব কমিটিতে সংশ্লিষ্ট জেলার দলীয় নেতা ছাড়াও বিভিন্ন এলাকার যুব ও ছাত্রনেতারা সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

খোকা সিকদার বলেন, “‍এসব কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৮ সালে আরও একটি পোস্টার করি আমরা। সেখানে লেখা ছিল- ‘পদ্মা সেতু কেন চাই?’ পরবর্তীতে আরেকটি পোস্টার করি, তাতে লেখা ছিল- ‘পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন চাই।”

তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের এই পুরো সময়ে জাতীয় পার্টি ও বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। অনেকেই আমাদের দাবি নিয়ে হাসি-তামাশা করলেও বিভিন্ন জেলার মানুষকে এই দাবিতে একত্রিত করার কারণে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন চাই স্লোগানটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

‘আমরা খুলনা, ফরিদপুর ও ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করি। তখন অনেক সাংবাদিকও বলেন, পদ্মা নদীতে সেতু চান? সেটা তাহলে কোথায় হবে? এমন প্রশ্ন করলে আমি বলি, এটা তো সরকারের পক্ষ থেকে ফিজিবিলিটি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মাওয়া পয়েন্টেও হতে পারে। এখন সেই মাওয়া পয়েন্ট দিয়েই হচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু, সেতু দিয়ে চলবে ট্রেনও।’

এক দিনের কষ্টের ঘটনা বর্ণনা করতে করতে খোকা সিকদার বলেন, ‘একবার লঞ্চে ফরিদপুরে বোনের বাসায় যাচ্ছি। পথে কেবিন থেকে লোকজন বলে উঠল- এই শালার পাগল পদ্মা নদীতে সেতু চায়! তারপর সবাই হো হো করে হেসে ওঠে।’

তিনি বলেন, ‘আরেকবার মাওয়া থেকে নৌকায় বাড়ি যাচ্ছি। উত্তাল পদ্মার বড় বড় ঢেউ দেখে সবাই ভয় পেল। আমিও ভয় পেয়ে গেছি। একটা পর্যায়ে নদীর শান্ত এলাকায় পৌঁছালে অনেকেই টিটকারী করতে শুরু করল। বলল, এই নদীতে নাকি সেতু হবে! অনেক সময় হেঁটে যাওয়ার পথেও লোকজন হাসাহাসি করত এই দাবি নিয়ে। বলত, শালা পাগল হয়ে গেছে।’

ছাবেদুর রহমান খোকা সিকদার বলেন, ‘তাদের এমন উপহাসে আমরা দমে যাইনি। এই সেতুর দাবি নিয়ে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, খুলনা, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলার মানুষের সঙ্গে কথা বলি। মতবিনিময়, সভা-সমাবেশে পদ্মা সেতুর দাবির কথা বলতে থাকি।

‘এই সময়ে লিয়াকত নামের একজন খুব হেল্প করেছিলেন। আমি আর ইত্তেফাকের আব্বাস উদ্দিন আনসারী ভাইয়ের নেতৃত্বে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের ব্যানারে সারা দেশে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি।’

‘পদ্মা সেতুর দাবি করায় অনেকে পাগলও বলেছে’

তিনি বলেন, ‘২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর ভিত্তি স্থাপন করেন শেখ হাসিনা। তারপর বিএনপি সরকার এসে সেটা ভেঙে ফেলে। তারপরের ইতিহাস সবাই জানেন। সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে শেখ হাসিনা নিজের টাকা দিয়ে নিজেই পদ্মা সেতু করলেন।’

পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের এই প্রতিষ্ঠাতা বলেন, ‘সব শেষে একটা কথা বলতে চাই, যদি কেউ কোনো কাজ আন্তরিকভাবে করার চেষ্টা করেন, সততার সঙ্গে করার চেষ্টা করেন, সেটা সফল হবেই। আমি যদি এই আন্দোলন করার জন্য কিংবা পোস্টার-ব্যানার তৈরির জন্য চাঁদা তুলতাম, তাহলে হয়তো এই আন্দোলন করা সম্ভব হতো না। নানাজন নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতেন।

‘এখন আমার আর কোনো চাওয়া নেই। একটাই চাওয়া- ২০২২ সালের মধ্যে যেন এই পদ্মা সেতু দিয়ে যেতে পারি-আল্লাহ যেন আমাকে সে পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখেন- সবার কাছে সেই দোয়াই চাই।’

পদ্মা সেতু প্রকল্পটি ২০০৭ সালের আগস্টে অনুমোদন দেয় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। পরে সেতুর অর্থায়ন নিয়ে নানা নাটকীয়তা চলে। শেষে আওয়ামী লীগ সরকার নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তী সময়ে সেতুর সঙ্গে রেলপথও যুক্ত করা হয়। প্রকল্পটির সর্বশেষ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।

‘পদ্মা সেতুর দাবি করায় অনেকে পাগলও বলেছে’

২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মূল সেতু ও নদী শাসন কাজ উদ্বোধন করেন। এর আগে ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি শুরু হয় নকশা ও পুনর্বাসন কাজ। গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের ৮৭.৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন শুধু দৃশ্যমান বাস্তবতাই নয়, যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার অপেক্ষাও কেবল স্বল্প সময়ের।

আরও পড়ুন:
স্রোত কমলে শিমুলিয়া-বাংলাবাজারে আবার ফেরি
পদ্মা সেতুতে ফেরির ধাক্কার বিভ্রান্তি কীভাবে ছড়াল
পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কায়’ ষড়যন্ত্র দেখছেন নৌ প্রতিমন্ত্রী
পদ্মা সেতুর স্প্যানে ফেরির আঘাতের চিহ্ন নেই: কাদের
পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কা’, অস্বীকার বিআইডব্লিউটিসির

শেয়ার করুন

মন্তব্য

একযোগে পদত্যাগ করছেন ৩৪ উপাচার্য?

একযোগে পদত্যাগ করছেন ৩৪ উপাচার্য?

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের একযোগে পদত্যাগের হুমকির তথ্য ছড়িয়েছে ফেসবুকে। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা

৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য একযোগে পদত্যাগের হুমকি দিয়েছেন বলে তথ্য প্রচার হচ্ছে ফেসবুকে। এই তথ্যের ভিত্তি কী, তা অনুসন্ধান করেছে নিউজবাংলা। এতে দেখা গেছে, একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের ভিত্তিতে এ-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে একটি সংবাদমাধ্যম। আর তার পরই এ ধরনের তথ্য শেয়ার শুরু করেন ফেসবুক ব্যবহারকারীরা।  

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হলে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য একযোগে পদত্যাগ করবেন বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে ফেসবুকে।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫০। এর মধ্যে ৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য একযোগে পদত্যাগের হুমকি দিয়েছেন বলে তথ্য প্রচার হচ্ছে ফেসবুকে।

এই তথ্যের ভিত্তি কী, তা অনুসন্ধান করেছে নিউজবাংলা। এতে দেখা গেছে, একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের ভিত্তিতে এ-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে একটি সংবাদমাধ্যম। আর তার পরই এ ধরনের তথ্য শেয়ার শুরু করেন ফেসবুক ব্যবহারকারীরা।

উন্নয়নকর্মী ও কলাম লেখক শরিফুল হাসান তার ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে শনিবার বিকেলে লিখেছেন, ‘৩৪ জন একযোগে পদত্যাগ করলে এই জাতি খুব খুশি হবে। কিন্তু ৩৪ জন তো দূরের কথা, একজনও পদত্যাগ করবেন না। বরং যেকোনো মূল্যে পদে থাকতে এরা কী করেন, সেটা আমরা বছরের পর বছর ধরে দেখে আসছি। এদের মতো আত্মমর্যাদাহীন খুব কম আছে। মর্যাদা থাকলে এরা নিজেরাই চলে যেতেন!’

একযোগে উপাচার্যদের পদত্যাগের হুমকির তথ্যের উৎস জানতে চাইলে শরিফুল হাসান নিউজবাংলাকে বলেন, এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন সাংবাদিক সুপন রায়। এরপর সেই স্ট্যাটাসের ভিত্তিতে আমাদের সময় ডটকম শুক্রবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সুপন রায়ের স্ট্যাটাস ও আমাদের সময় ডটকমের প্রতিবেদনের পরই এ বিষয়ে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে।

একযোগে পদত্যাগ করছেন ৩৪ উপাচার্য?
ফেসবুকে সাংবাদিক সুপন রায়ের স্ট্যাটাস

সাংবাদিক সুপন রায় ফেসবুকে এ স্ট্যাটাসটি দেন বৃহস্পতিবার রাত ৮টা ৫০ মিনিটে। এতে তিনি লেখেন, ‘৩৪ উপাচার্য এক হয়ে বললেন, দরকার হলে একযোগে পদত্যাগ করবেন! প্রচণ্ড অস্বস্তিতে আছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সভায় আজ ৩৪ উপাচার্য একত্রে বসেছেন। বক্তব্য রেখেছেন ২২ জন। সম্মানজনক সমাধান জরুরি।’

সুপন রায়ের এই স্ট্যাটাসের ভিত্তিতে কয়েক ঘণ্টা পর রাত ১২টা ২৯ মিনিটে ‘সুপন রায়: ৩৪ উপাচার্য এক হয়ে বললেন, দরকার হলে একযোগে পদত্যাগ করব!’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে আমাদের সময় ডটকম। এই প্রতিবেদনে সুপন রায়ের স্ট্যাটাস হুবহু তুলে ধরা হয়েছে, তবে সংশ্লিষ্ট কারও বক্তব্য এতে নেই।

একযোগে পদত্যাগ করছেন ৩৪ উপাচার্য?
সুপন রায়ের স্ট্যাটাসের ভিত্তিতে আমাদের সময় ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদন

এর পরই বিষয়টি ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমধ্যমে। সংবাদকর্মী মুকিমুল আহসান হিমেল ফেসবুকে স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘৩৪ জন ফরিদ নাকি এক হয়েছিলেন ভার্চুয়ালি। ঐতিহাসিক এই ফরিদ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত- পদত্যাগ করতে হলে ৩৪ জন উপাচার্য একসাথেই করবেন। সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা ফরিদের তরে!’

কাজল দাস নামে একজন লিখেছেন, ‘কত বড় কালপ্রিটরা এই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় চালায় দেখেন। ৩৪ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বলেছেন, সাস্টের ভিসির পদত্যাগের প্রয়োজন নেই। দরকার হলে তারা একযোগে পদত্যাগ করবেন। কীভাবে এরা ছাত্রদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছেন, একবার ভাবেন। দেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এখন আন্দোলনে নামা উচিত। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চাল, ডাল কিংবা গার্মেন্টস মালিকদের সিন্ডিকেইটবাজির বিষয় নয়। এইসব মাফিয়া ভিসির হাত থেকে ক্যাম্পাস সুরক্ষা করতে গণজোয়ারের বিকল্প নেই।’

রাজু নুরুল নামে একজন লিখেছেন, ‘শাহজালালের ভিসিকে পদত্যাগ করতে হলে নাকি ৩৪ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি একযোগে পদত্যাগ করবেন। এটা শোনার পর থেকে আমি শুধু নিলুফার ইয়াসমিনের গাওয়া সেই গানটাই বারবার শুনছি- এত সুখ সইবো কেমন করে...’

একযোগে পদত্যাগ করছেন ৩৪ উপাচার্য?
৩৪ উপাচার্যের একযোগে পদত্যাগের গুজব ছড়িয়েছে ফেসবুকে

তবে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের দাবি, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত বা অবস্থান তারা নেননি।

উপাচার্যদের বৈঠক সম্পর্কে জানতে চাইলে গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের নিয়ে একটি ভার্চুয়াল মিটিং হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ৩৪ জন উপাচার্য একযোগে পদত্যাগের হুমকি বা এ বিষয়ে কোনো আলাপ-আলোচনা হয়নি।’

ফেসবুকে ছড়ানো তথ্যের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এটা সম্পূর্ণ গুজব, মিথ্যা ও বানোয়াট।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. মুনাজ আহমেদ নূর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি ওই বৈঠকে ছিলাম। তবে এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা আমার জানা নেই।’

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মশিউর রহমানও ছিলেন ওই বৈঠকে। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নানা বিষয়ে আমাদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গতকাল কি পরশু বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের একটি সভা হয়েছিল। তবে আমি মিটিংয়ের একদম শেষে জয়েন করেছি।’

৩৪ উপাচার্যের পদত্যাগ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু শুনিনি। সবার শেষে জয়েন করাতে অনেকের বক্তব্যও শুনতে পাইনি।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ইমদাদুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি কোনো মিটিংয়ে ছিলাম না। এমন কোনো সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমি জানি না। বৈঠকে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত হলে তো আমাকে জানানো হতো।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সত্যপ্রসাদ মজুমদার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি সভার আমন্ত্রণ পেয়েছি। তবে অসুস্থ থাকায় উপস্থিত ছিলাম না।’

সংবাদিক সুপন রায় কোন উৎস থেকে এমন তথ্য পেলেন তা জানার চেষ্টা করেছে নিউজবাংলা। তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে। তার ফেসবুক মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

আরও পড়ুন:
স্রোত কমলে শিমুলিয়া-বাংলাবাজারে আবার ফেরি
পদ্মা সেতুতে ফেরির ধাক্কার বিভ্রান্তি কীভাবে ছড়াল
পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কায়’ ষড়যন্ত্র দেখছেন নৌ প্রতিমন্ত্রী
পদ্মা সেতুর স্প্যানে ফেরির আঘাতের চিহ্ন নেই: কাদের
পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কা’, অস্বীকার বিআইডব্লিউটিসির

শেয়ার করুন

নিরাপদ হয়নি কর্মক্ষেত্র

নিরাপদ হয়নি কর্মক্ষেত্র

নির্মাণক্ষেত্রগুলোতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন শ্রমিকরা। ফাইল ছবি/নিউজবাংলা

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ লেবার স্টাডিজ (বিলস) পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, দেশে সবচেয়ে বেশি শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটেছে পরিবহন, নির্মাণ ও কৃষি খাতে। ১০ বছরে শুধু নির্মাণ খাতে কাজ করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ১০২ জন শ্রমিক।

অনেক দুর্ঘটনা, মৃত্যু- তারপরও নিরাপদ হয়নি কর্মক্ষেত্র। বকেয়া বেতন কিংবা শ্রম-অধিকার প্রশ্নে এখনও বঞ্চিত শ্রমিক। নিশ্চিত হচ্ছে না ন্যূনতম জীবনমান। কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাত নির্মাণশিল্প। গত ১০ বছরে এই খাতে নিহত হয়েছে ১ হাজার ১০২ জন শ্রমিক।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ লেবার স্টাডিজ (বিলস) পরিসংখ্যানে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ২০২১ সালে ১ হাজার ৫৩ জন নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বলেছে, দেশে সবচেয়ে বেশি শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটেছে পরিবহন, নির্মাণ ও কৃষি এই তিন খাতে।

প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন নির্মাণ শ্রমিকরা। রাজধানীসহ দেশজুড়ে গড়ে উঠছে বিপুলসংখ্যক বহুতল ভবন। এসব ভবন নির্মাণে শ্রমিকদের দুর্ঘটনা এড়াতে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের কোনো ধরনের জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয় না।

বহুতল ভবনে নির্মাণ শ্রমিকরা অরক্ষিত অবস্থায় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এমনকি এসব দুর্ঘটনা থেকে পথচারীরাও রেহাই পাচ্ছেন না। ফলে নির্মাণ শ্রমিকদের পাশাপাশি আশপাশের মানুষ ও ভবনের নিচের পথচারীরা নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন। কেউ কেউ মারাত্মকভাবে আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন।

মালিকদের অবহেলা, শ্রমিকদের সচেতনতার অভাব এবং শ্রম আইনের সঠিক বাস্তবায়ন না হওয়া এবং এ আইনের দুর্বলতার কারণে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

১০ বছরে নিহত ১ হাজার ১০২ জন

২০১১ সাল থেকে ২০২১ সাল এই ১০ বছরে নির্মাণ খাতে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ১০২ জন শ্রমিক।

২০২১ সালে নির্মাণ খাতে ১৫৪ জন শ্রমিক নিহত হন।

এর আগের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নির্মাণ খাতে ২০১১ সালে ১১১ জন, ২০১২ সালে ১১৩ জন, ২০১৩ সালে ৯৫ জন, ২০১৪ সালে ১০২ জন, ২০১৫ সালে ৬১ জন, ২০১৬ সালে ৮৫ জন এবং ২০১৭ সালে ১৩৪ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন।

২০১৮ সালে সর্বোচ্চ ১৬১ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন।

২০১৯ সালে নিহত হয়েছেন ৯৪৫ জন শ্রমিক। এরপর ১৫৬ জন শ্রমিক প্রাণ হারান।

২০২০ সালে কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ৭২৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। নির্মাণ খাতে ৮৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়।

জাতীয় বিল্ডিং কোডে কর্মকালীন একজন শ্রমিকের কী কী নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে তার বিস্তারিত উল্লেখ থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা মানা হয় না। ২০১৪ সালের জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী কাজের সময় কাজের শ্রমিকের মাথায় হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করা হয়। যারা কংক্রিটের কাজে যুক্ত, তাদের হাতে গ্লাভস ও চোখের জন্য ক্ষতিকর কাজে চশমা পরিধান করতে হবে। ওয়েল্ডার ও গ্যাস কাটার ব্যবহারের সময় রক্ষামূলক সরঞ্জাম যেমন গ্লাভস, নিরাপত্তা বুট, অ্যাপ্রন ব্যবহার করতে হবে।

ভবনের ওপরে কাজ করার সময় শ্রমিকদের নিরাপত্তায় বেল্ট ব্যবহারও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে এর কোনোটিই বাস্তবে দেখা যায় না।

দুর্ঘটনার কারণ

বিলস বলছে, নির্মাণকাজে ভালো সিঁড়ির অভাব ও সিঁড়িতে পর্যাপ্ত আলোর অভাব, এলোমেলোভাবে রড, বালু ও ইট রাখা, কর্মক্ষেত্রে নেট না থাকা অথবা নাজুক নেটের ব্যবহার, কপিকলের ব্যবস্থা না থাকা, হেলমেট, গ্লাভসের ব্যবস্থা না করা, খালি পায়ে কাজ করা, অসাবধানতা ও অসচেতনভাবে আবদ্ধ স্থানে প্রবেশ, প্রচণ্ড রোদে কাজ করা, ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতির ব্যবহার, বিশ্রাম কম; দুর্বল মাচা, দেয়াল বা মাটি চাপা পড়া, ঝুলন্ত অবস্থায় কাজের সময় বেল্ট ব্যবহার না করা, ভালো জুতা বা বুট ব্যবহার না করা, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব ও ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক লাইনের কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে।

এ ছাড়া ওপর থেকে পড়ে শ্রমিকের অঙ্গহানি ও মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। মাটিচাপা পড়ে, মাটি বহনকারী গাড়ি দুর্ঘটনা, অগ্নিদগ্ধ হওয়া, বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা, চোখে আঘাত লাগা বা অন্ধ হয়ে যাওয়া, মাথায় আঘাত পাওয়া, হাত-পা কেটে বা ভেঙে যাওয়া ও আবদ্ধ গ্যাসেও মৃত্যুর হার বাড়ছে।

শ্রম আইন অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়োগকারীর। শ্রমিকের ব্যক্তিগত সুরক্ষা যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা ছাড়া নিয়োগকারী কাউকে কাজে নিয়োগ করতে পারবেন না।

আইনে এমন বাধ্যবাধকতা থাকলেও রাজধানীর একাধিক নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, গামবুট, হেলমেট, নিরাপত্তা বেল্টসহ নিরাপত্তা উপকরণ ছাড়াই কাজ করছেন শ্রমিকরা।

সংশ্লিষ্টরা যা বলেন

ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাব) সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এ নির্মাণ সেক্টরে ৩৭ লক্ষাধিক পেশাজীবী জড়িত। শ্রমিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে শ্রম আইনে মালিক, শ্রমিক ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘শিল্প স্বাস্থ্য সেফটি কমিটি’ গঠন করতে বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি কমিটি থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ে এই কমিটি নেই। ফলে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা মালিক পক্ষকে চাপ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বিলসের পরিচালক কোহিনূর মাহমুদ বলেন, নির্মাণ খাতের বড় বড় ফার্ম কিছুটা নীতিমালা মেনে চলে। কিন্তু ছোট কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবনগুলো এই নীতিমালা মানতে চায় না। এ জন্য ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। পরিদর্শনের জন্য তাদের পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিতে হবে। প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ করবে। না হলে এসব ঘটনা এড়ানো যাবে না।

আরও পড়ুন:
স্রোত কমলে শিমুলিয়া-বাংলাবাজারে আবার ফেরি
পদ্মা সেতুতে ফেরির ধাক্কার বিভ্রান্তি কীভাবে ছড়াল
পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কায়’ ষড়যন্ত্র দেখছেন নৌ প্রতিমন্ত্রী
পদ্মা সেতুর স্প্যানে ফেরির আঘাতের চিহ্ন নেই: কাদের
পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কা’, অস্বীকার বিআইডব্লিউটিসির

শেয়ার করুন

সড়কে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি এখন বাইকের কারণে

সড়কে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি এখন বাইকের কারণে

এখন সড়ক দুর্ঘটনার বেশিরভাগই ঘটে বাইকের কারণে। ফাইল ছবি

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে ১ হাজার ১৮৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৯৪৫ জন। ২০২১ সালে দুর্ঘটনা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৮টি, মৃত্যু বেড়ে হয় ২ হাজার ২১৪ জনে। এ বছর সড়কে মৃত্যুর ৪০ শতাংশই ছিলেন বাইকার।

মঙ্গলবার গভীর রাত। রাজধানীর হাতিরঝিলে মোটরসাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারানো সময়ের আলো পত্রিকার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হাবীব রহমানের আঘাত ছিল মুখমণ্ডলে। মাথায় ছিল হেলমেট, তবে মুখ ছিল খোলা।

যে হেলমেটটি হাবীব ব্যবহার করেন, সেটি পরিচিত ‘হাফ ফেস’ নামে। এর মুখের সামনে কোনো আচ্ছাদন থাকে না, থাকে একটি প্লাস্টিকের পাতলা আবরণ, যা মূলত বাতাস থেকে চোখকে রক্ষা করে।

সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা যায়, হাবীবের মুখমণ্ডল ছিল থেঁতলানো, চোয়াল বিচ্ছিন্ন, নাক ও মুখ থেকে রক্ত ঝরেছে। এ ছাড়া শরীরের বাকি অংশ স্বাভাবিক।

অর্থাৎ ‘ফুল ফেস’ হেলমেট থাকলে হাবীবের দুর্ঘটনাটি প্রাণঘাতী নাও হতে পারত। তার মুখের আঘাতটি হয়তো হেলমেটের সামনের অংশ প্রতিহত করতে পারত।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনের তথ্য বলছে, বাইক দুর্ঘটনায় এমন মৃত্যু হয় দিনে গড়ে ছয়টি। এখন দেশে যত মানুষ সড়কে মারা যান, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় বাইক আরোহীদেরই।

সড়কে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি এখন বাইকের কারণে
দেশের মহাসড়কগুলোতে এখন মোটরসাইকেলের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। ফাইল ছবি

কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে এই মৃত্যু। ২০১৯ সালে সারা বছরে এক হাজারের কম মৃত্যু রেকর্ড হলেও সদ্য সমাপ্ত ২০২১ সালে তা দুই হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

ভয় জাগানিয়া পরিসংখ্যান

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে ১ হাজার ১৮৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৯৪৫ জন।

পরের বছর দুর্ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৮১টি, এসব দুর্ঘটনায় নিহত হন ১ হাজার ৪৬৩ জন।

২০২১ সালে দুর্ঘটনা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৮টি, মৃত্যু বেড়ে হয় ২ হাজার ২১৪ জনের।

নিহতের মধ্যে ৭৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ ১৪ থেকে ৪৫ বছর বয়সী।

এই সংগঠনের তথ্য বলছে, অন্য কোনো বাহনের এত যাত্রী মারা যাননি।

সড়কে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি এখন বাইকের কারণে
দুর্ঘটনার পর রাস্তার পাশে পড়ে আছে বাইক। ফাইল ছবি

২০২১ সালে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৩৭১টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ২৮৪ জন।

এদের মধ্যে বাইকারদের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাণহানি হয়েছে পথচারীদের। এই সংখ্যাটি ১ হাজার ৫২৩।

পরিবহন চালক ও শ্রমিক মারা গেছেন ৭৯৮ জন, যা মোট মৃত্যুর ১২ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

বাইক দুর্ঘটনার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি (৩৪ দশমিক ৫০ শতাংশ) ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে। অর্থাৎ যেখানে দুই চাকার বাহনে চেপে মানুষের দূর যাত্রার প্রবণতা বাড়ছে।

৩১ দশমিক ৬৬ শতাংশ মৃত্যু ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে, ১৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ ঘটেছে গ্রামীণ সড়কে এবং ১৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ ঘটেছে শহরের সড়কে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মোটরসাইকেলের চালকদের বড় অংশ কিশোর ও যুবক। এদের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা প্রবল। কিশোর-যুবকরা বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালিয়ে নিজেরা দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং অন্যদেরকে আক্রান্ত করছে।’

তিনি বলেন, ‘মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার একটি বড় অংশ ঘটছে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ ও বাসের ধাক্কা, চাপা ও মুখোমুখি সংঘর্ষে। এসব দ্রুতগতির চালকদের অধিকাংশই অদক্ষ ও অসুস্থ। তাদের বেপরোয়া যানবাহন চালানোর কারণে যারা সাবধানে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন তারাও দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায় পথচারী নিহতের ঘটনাও বাড়ছে।’

কী বলছে ট্রাফিক পুলিশ

রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকায় কর্তব্যরত ট্রাফিক সার্জেন্ট দুর্জয় হাসান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকার পরেও অনেকে বাইক কিনছেন। দুই-তিন বছর বাইক চালিয়ে এর পরে লাইসেন্স করেন। এ ছাড়া তরুণ বাইকাররা সিগন্যাল মানেন না। প্রযুক্তির ঘাটতি থাকায় বাইক নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ওভার স্পিডে বাইক টেনে চলে যায়, তাই তাদের ধরা সম্ভব হয় না।’

সড়কে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি এখন বাইকের কারণে
দুর্ঘটনায় পড়ে ট্রাকের নিচে বাইক। ফাইল ছবি

এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ২০টি ছোট গাড়ি বিক্রি না করে, একটা বড় গাড়ি বিক্রি করতে হবে, যাতে বেশি মানুষ চলাচল করতে পারে। ট্রাফিক আইন জেনে সেটা মানতে হবে। সর্বোপরি মানুষ সচেতন না হলে মৃত্যু কমানো সম্ভব না।’

মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়ছে

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হঠাৎ করে বাইক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কারণ ২০২০ ও ২০২১ সালের বিভিন্ন মেয়াদে গণপরিবহন বন্ধ ছিল। তখন শুধু স্বল্প দূরত্ব না, দূরপাল্লার যাত্রায়ও মোটরসাইকেল ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু এটা কখনোই কাম্য না।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরে মোটরসাইকেল চালানো আর মহাসড়কে চালানোর মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। গণপরিবহনের বিকল্প হিসেবে দূরের যাত্রায় এই মোটরসাইকেল ব্যবহারের ফলে দুর্ঘটনা বেড়েছে।’

জাপানে মোটরসাইকেল বেড়ে যাওয়ার কারণে দুর্ঘটনাও বেড়ে যাচ্ছিল বলে জানান এই পরিবহন বিশেষজ্ঞ। বলেন, ‘জাপান গত ১০ বছরে সড়ক থেকে প্রায় ২৫ লাখ মোটরসাইকেল সরিয়ে ফেলেছে বিভিন্ন পলিসির মাধ্যমে। সংখ্যা কমানোর পর তাদের দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমে গিয়েছে। এখান থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়ার অনেক কিছু আছে।’

তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ন্ত্রণের যে পলিসি থাকার কথা, সেখানেও আমরা মনোযোগী হচ্ছি না, রাজস্ব আয়ের কথা বলে অনায়াসে অনিয়ন্ত্রিতভাবে রেজিস্ট্রেশন দিয়ে যাচ্ছি। এর ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।’

মোটরসাইকেল নিবন্ধনের আবেদনের সঙ্গে ক্রেতার ড্রাইভিং লাইসেন্স যুক্ত করার পরামর্শও দেন তিনি। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, যত বাইক সড়কে চলে, তার বেশির ভাগেরই নিবন্ধন নেই।

ওভারস্পিড আর যথাযথ হেলমেট না পরা

হাইওয়ে পুলিশের সিলেট বিভাগের পুলিশ সুপার মো. শহীদ উল্লাহ্‌ নিউজবাংলাকে বলেন, যথাযথ হেলমেট না পরা বাইক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর একটি কারণ।

তিনি বলেন, ‘হেলমেটের ব্যবহার করে না, আবার অনেকে হেলমেট ব্যবহার করলেও ফুল ফেস হেলমেট ব্যবহার করে না। কিন্তু মোটরসাইকেলের জন্য নির্ধারিত ফুলফেস হেলমেট ব্যবহার করতে হবে।’

সড়কে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি এখন বাইকের কারণে
সড়কের পাশে এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে অ্যাপে চলা বাইকগুলো। ফাইল ছবি

তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে এমনও তথ্য আছে, এসএসসি পরীক্ষা শেষ করে বাবার কাছ থেকে মোটরসাইকেলের চাবি নিয়ে রাস্তায় নেমে গেছেন। অনেকে তিনজন যাত্রী বহন করেন।

‘লং ড্রাইভে ক্লান্ত অবস্থায় বাইক চালানো দুর্ঘটনার একটা বড় কারণ। উচ্চ সিসির গাড়ির সংখ্যা দেশে বেড়ে গিয়েছে। এর ফলে অনেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।’

বাইকাররা মহাসড়কে ওভারটেক করার বিধান মানেন না বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। বলেন, ‘ওভারটেক করতে হলে ডান দিক দিয়ে ওভারটেক করতে হবে। বাইকের চালকেরা ওভারটেক করার ক্ষেত্রে ডান-বাম মানেন না। মোটরসাইকেল ছোট গাড়ি হওয়ার পরেও বড় গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওভারটেকিং ও রেসিং করে।’

হাইওয়ে পুলিশের গাজীপুর বিভাগের পুলিশ সুপার আলী আহম্মদ খান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘনবসতি বা জনবহুল এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকাতে কিন্তু হাইওয়ে থাকতে পারে না। বিশ্বে কোথাও দেখবেন না এত ঘনবসতি এলাকায় হাইওয়ে। সিটি করপোরেশন, মেট্রোপলিটনের মধ্য দিয়ে হাইওয়ে হতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশে আছে।’

‘মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তারুণ্যের একটা বিষয় আছে। এই তারুণ্যের কারণে উচ্চ গতিতে তারা মোটরসাইকেল চালান। এদের বেশির ভাগই ট্রাফিক নিয়ম জানেন না এবং ট্রাফিক ট্রেনিংটা ওভাবে হয় না। একটা লার্নার কার্ড জোগাড় করেই তারা মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।

‘পথচারীরাও ট্রাফিক নিয়ম মানেন না। মোবাইলে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হন অনেকে, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করেন না। তাছাড়া ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডার পাসও ওভাবে নাই। যে কারণে দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে।’

আরও পড়ুন:
স্রোত কমলে শিমুলিয়া-বাংলাবাজারে আবার ফেরি
পদ্মা সেতুতে ফেরির ধাক্কার বিভ্রান্তি কীভাবে ছড়াল
পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কায়’ ষড়যন্ত্র দেখছেন নৌ প্রতিমন্ত্রী
পদ্মা সেতুর স্প্যানে ফেরির আঘাতের চিহ্ন নেই: কাদের
পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কা’, অস্বীকার বিআইডব্লিউটিসির

শেয়ার করুন

ওমিক্রনের বিস্তার নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য কেন

ওমিক্রনের বিস্তার নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য কেন

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে জোর দিতে বলেছে সরকার। ফাইল ছবি

দেশে ওমিক্রন ছড়াচ্ছে, কিন্তু এটি কতটা বিস্তার লাভ করেছে? এ নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী যে তথ্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে মিল নেই বিএসএমএমইউ-এর গবেষণার। এদিকে আইইডিসিআরও এ বিষয়ে কোনো পরিষ্কার চিত্র দিচ্ছে না। 

দেশে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনের সামাজিক সংক্রমণ (কমিউনিটি ট্রান্সমিশন) ছড়িয়ে পড়েছে। বিদেশ ভ্রমণ কিংবা যাতায়াত করেননি এমন ব্যক্তির দেহে এ ধরন শনাক্ত হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ওমিক্রন শনাক্ত ৭১ রোগীর নমুনা জার্মানির গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জায় (জিআইএসএআইডি) জমা পড়েছে। এদের অর্ধেকের বেশির দেশের বাইরে যাওয়ার ইতিহাস নেই।

পাশাপাশি সংক্রমণ ঢাকার বাইরেও ছড়িয়েছে। সর্বশেষ শনাক্ত হওয়া আট রোগী চট্টগ্রামের। এর আগে রোববার যশোরে তিনজনের শরীরে ওমিক্রন শনাক্ত হয়েছে।

তবে ওমিক্রন বিস্তার নিয়ে সরকারের কোনো সংস্থা এখনও পরিষ্কার কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। গতবার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে একাধিক গবেষণা প্রকাশ করে সরকারের সংস্থা রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট। এবার এই সংস্থাটিও অনেকটা নীরব।

এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) ওমিক্রন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে।

ওমিক্রন ছড়ানো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গত সোমবার বলেন, ‘জিনোম সিকোয়েন্সে দেখা গেছে, রাজধানীতে বর্তমানে করোনা আক্রান্তের ৬৯ শতাংশের শরীরে ওমিক্রনের উপস্থিতি রয়েছে। এটা শুধু ঢাকায় করা হয়েছে। তবে ঢাকার বাইরেও আমরা মনে করি একই হাল হবে। এ কারণেই করোনা সংক্রমণ বেড়েছে।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওমিক্রন বিস্তার নিয়ে যে তথ্য দিয়েছেন, সেটির উৎস কী, জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আমল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যমন্ত্রী যে তথ্য দিয়েছেন, সেটা রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের। আমাদের হাতে এই তথ্য এসেছে। তবে এখনই বিস্তারিত বলতে পারব না।’

‍তিনি বলেন, এখনও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের প্রাধান্য রয়েছে। এ ছাড়া ওমিক্রন ২০ শতাংশ ছড়িয়েছে। গ্রামে এই ধরনের তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি।

গবেষণাটির বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে আইইডিসিআর-এর পরিচালক ডা. তাহমিনা শিরিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওমিক্রনে দৈনিক কতজন আক্রান্ত, কতজন মারা গেলেন, সেটা এই মুহূর্তে বলতে পারব না। পুরুষ ও নারী কতজন সে তথ্য দেয়াও সম্ভব নয়। একটা কথা মনে রাখতে হবে, এই মুহূর্তে ওমিক্রন নিয়ে না ভেবে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে।

‘কারণ সংক্রমণ আজ ১০ শতাংশ, কাল বেড়ে ১৫ শতাংশ আবার পরশু তা কমে ৫ শতাংশে আসতে পারে। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। ডেল্টার ক্ষেত্রেও তাই। এভাবে আলফা, বিটা ধরন এসেছিল, সেটা চলে গেছে, আবার আসতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘ধরনটি দ্রুত পরিবর্তনশীল। সুতরাং এই বিষয়গুলোকে এত বেশি গুরুত্ব না দিয়ে ওমিক্রনের উপস্থিতি যে বাংলাদেশে আছে, সে ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। ধরনটি তাড়াতাড়ি ছড়ায়। যত বেশি ছড়াবে, তত বেশি মানুষ আক্রান্ত হবে। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে রোগী বাড়তে পারে। আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুও বাড়তে পারে।

‘আরেকটি বিষয় হলো, ডেল্টার চেয়ে ওমিক্রনে মৃত্যুহার কম। কিন্তু যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, যাদের কো-মরবিডিটি আছে, তাদের ক্ষেত্রে জটিল হতে পারে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে যাতায়াতের ইতিহাস না থাকা এবং ঢাকার বাইরে রোগী শনাক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়, ওমিক্রনের সামাজিক সংক্রমণ শুরু হয়েছে। ওমিক্রনের প্রভাবে দৈনিক সংক্রমণ ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। তাই এ বিষয়ে এখনই সর্তক হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

এদিকে মঙ্গলবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ওমিক্রনের বিস্তার নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশ করে, সেখানে দেখা গেছে দেশে শনাক্ত হওয়া ২০ শতাংশ রোগীই বর্তমানে করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনে আক্রান্ত।

প্রকাশিত গবষণার প্রধান গবেষক ডা. লায়লা আনজুমান বানু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এক মাসে ৯৬টি নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং করা হয়েছে। এখানে ২০ শতাংশ করোনা রোগীর দেহে ওমিক্রনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এই গবেষণাটি ৮ জানুয়ারি শেষ হয়। যেহেতু সংক্রমণ বাড়ছে, ওমিক্রনের বিস্তার বাড়তে পারে, এটা স্বাভাবিক। তবে এ বিষয়ে সরকারের কাছে স্পষ্ট তথ্য থাকা ভালো। ৮ ডিসেম্বর ২০২১ থেকে ৮ জানুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত সংগৃহীত নমুনার ২০ শতাংশই ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট ও ৮০ শতাংশ ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া যায়। পরবর্তী মাসে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট গুণিতক হারে বৃদ্ধির আশঙ্কা করা যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, জিনোম সিকোয়েন্স অনেক ব্যয়বহুল। একটি জিনোম সিকোয়েন্স করতে এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগে। যে কারণে সব রোগীর জিনোম সিকোয়েন্স করা সম্ভব হয় না। অনেক প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে এই জিনোম সিকোয়েন্স করতে হয়। ভিন্ন ভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন ফল আসতে পারে। এ ছাড়া সময় ও দিনের ব্যবধানে চিত্রের পরিবর্তন হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির বলেন, ‘স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়তো আইইডিসিআরের একটা সোর্স থেকে এ কথা বলেছেন। এগুলো অনুমাননির্ভর জিনিস। ওমিক্রনে বেশির ভাগ আক্রান্ত ব্যক্তির মৃদু উপসর্গ বা আপার রেসপেরিটরি ইনফেকশন দেখা দেয়। ফলে বেশিসংখ্যক নমুনা নিয়ে কাজ না করলে সঠিকভাবে বলা কঠিন কোন ধরণটি বেশি সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। তা ছাড়া জিনোম সিকোয়েন্সিং সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এটা নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। তবে রোগী শনাক্তে দৈনিক কতটি নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে, কতজনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়, সে ব্যাপারে আইইডিসিআর ভালো বলতে পারবে। তবে আইইডিসিআরের বরাত দিয়ে যেহেতু স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, এটাকে আপাতত ধরে নিতে হবে।’

আরও পড়ুন:
স্রোত কমলে শিমুলিয়া-বাংলাবাজারে আবার ফেরি
পদ্মা সেতুতে ফেরির ধাক্কার বিভ্রান্তি কীভাবে ছড়াল
পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কায়’ ষড়যন্ত্র দেখছেন নৌ প্রতিমন্ত্রী
পদ্মা সেতুর স্প্যানে ফেরির আঘাতের চিহ্ন নেই: কাদের
পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কা’, অস্বীকার বিআইডব্লিউটিসির

শেয়ার করুন

গণমাধ্যম আইনের কিছু দিক নিয়ে সংবাদকর্মীদের আপত্তি

গণমাধ্যম আইনের কিছু দিক নিয়ে সংবাদকর্মীদের আপত্তি

‘গণমাধ্যমকর্মী (চাকরির শর্তাবলি) আইন, ২০১৮’ আইনটি সংসদের চলতি অধিবেশনে পাসের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর কিছু দিক নিয়ে আপত্তি তুলছেন সংবাদমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ‘কলাকুশলী’র সংজ্ঞা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। এছাড়া, সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের অভিযোগ, আইনটি সম্পর্কে তাদের ভালোভাবে জানানো হয়নি।

সাংবাদিকদের জন্য ‘গণমাধ্যমকর্মী (চাকরির শর্তাবলি) আইন, ২০১৮’ প্রণয়নের উদ্যোগ চূড়ান্ত করেছে সরকার। জাতীয় সংসদের চলতি শীতকালীন অধিবেশনেই এটি বিল আকারে উত্থাপন করতে পারেন তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ।

তবে প্রস্তাবিত আইনটির কিছু দিক নিয়ে অসন্তোষ জানাচ্ছেন সংবাদকর্মীরা। অন্যদিকে, সাংবাদিক নেতারা বলছেন, এ আইনের খসড়া সাংবাদিকদের দেখানো হয়নি। সরকারের একক সিদ্ধান্তেই আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

২০১৭ সালের অক্টোবরে আইনটির খসড়া প্রকাশ করে তথ্য মন্ত্রণালয়। পরের বছরের ১৫ অক্টোবর আইনের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এরপর সেটি ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয় আইন মন্ত্রণালয়ে। এর তিন বছরেরও বেশি সময় পর আইনটি পাশের জন্য সংসদে তোলা হচ্ছে।

আইনটিতে সাংবাদিকদের বেতন, ভাতা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ছুটিসহ বেশকিছু সুযোগ-সুবিধা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। তথ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আইনটি পাস হলে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, রেডিও এবং অনলাইন মিডিয়ায় যারা কাজ করেন তাদের সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হবে।’

খসড়া অনুযায়ী, আইনটি পাস হলে সংবাদকর্মীরা আর শ্রম আইনের অধীনে থাকবেন না। আইনি কাঠামোতে সাংবাদিকরা ‘গণমাধ্যমকর্মী’ হিসেবে পরিচিত হবেন।

২০১৮ সালের ১৫ অক্টোবর মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে আইনটি নিয়ে ব্রিফ করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম।

সেদিন তিনি খসড়া আইনের বিভিন্ন দিক তুলে বলেন, ‘গণমাধ্যমকর্মীর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, গণমাধ্যমে কর্মরত পূর্ণকালীন সাংবাদিক, কলাকুশলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কর্মচারী বা নিবন্ধিত সংবাদপত্রের মালিকাধীন ছাপাখানা এবং বিভিন্ন বিভাগে নিয়োজিতরা হলেন গণমাধ্যমকর্মী। সম্প্রচারকর্মী হলেন, সম্প্রচার কাজে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত গণমাধ্যমের কর্মী।’

তিনি বলেন, ‘প্রযোজক, পাণ্ডুলিপি লেখক, শিল্পী, ডিজাইনার, কার্টুনিস্ট, ক্যামেরাম্যান, অডিও ও ভিডিও এডিটর, চিত্র সম্পাদক, শব্দ ধারণকারী, ক্যামেরা সহকারী, গ্রাফিক্স ডিজাইনারসহ পেশাজীবীরা যারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত তাদের কলাকুশলী বলা হবে।’

তবে ‘কলাকুশলী’র সংজ্ঞা নিয়ে আপত্তি রয়েছে সংবাদ মাধ্যমে কর্মরতদের। ক্যামেরাপারসনদের সাংবাদিক না বলে ‘কলাকুশলী’ বলার প্রতিবাদে তথ্য ও আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দিয়েছে টিভি ক্যামেরা জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (টিসিএ)।

সংগঠনটির সভাপতি শেখ মাহবুব আলম নিউজবাংলাকে বলেন, “আমাদের দাবি, আমাদের ‘চিত্রসাংবাদিক’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হোক। সেজন্য আমরা চিঠি দিয়েছি।”

সংসদে খসড়া আইনটি বিল আকারে উত্থাপনের আগেই এটি সংশোধনের দাবি জানান টিসিএ সভাপতি মাহবুব।

নিউজ টোয়েন্টিফোর টেলিভিশনের ক্যামেরাপারসন ও ভিডিও জার্নালিস্টদের সংগঠন টিসিএর সাবেক নেতা আহসান সুমন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সাংবাদিকতায় রিপোর্টারদের পাশাপাশি চিত্রগ্রাহকদেরও সাংবাদিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। কিন্তু খসড়া আইনে কলাকুশলী বলে আমাদের বিচ্ছিন্ন করাটা দুঃখজনক।’

ভিডিও চিত্র সম্পাদনকারীদের সাংবাদিক না বলে কলাকুশলী বলায় ক্ষোভ জানান ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সিনিয়র ভিডিও এডিটর রিফাত আনোয়ার লোপা।

তিনি বলেন, ‘টেলিভিশন সাংবাদিকতায় ভিডিও এডিটিং ছাড়া রিপোর্ট তৈরি করা সম্ভব নয়। একটি রিপোর্টে সিকোয়েন্স অনুযায়ী কোন ছবিটির পর কোন ছবি বসবে সেই সিদ্ধান্ত বেশিরভাগ সময় ভিডিও এডিটরদের নিতে হয়। ফলে এডিটরদের সেখানে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।’

টেলিভিশন সাংবাদিকতা শুধু তথ্য ও ছবি যোগাড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সেখানে চিত্র সম্পাদনা অনেক গুরুত্বপূর্ণ, তাই ভিডিও এডিটরদের অবশ্যই সাংবাদিক বলা উচিত।’

সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের অভিযোগ, আইনটি সম্পর্কে তাদের ভালোভাবে জানানো হয়নি, মতামতও নেয়া হয়নি।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গণমাধ্যম আইনের যে খসড়া করা হয়েছে আমরা সেটা সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত নই।

‘সাংবাদিক সমাজে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার সমুন্নত রাখার যে দাবি আমাদের রয়েছে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকদের পেনশনের আওতায় আনা জরুরি।’

সাংবাদিকদের জন্য বছরে দুটি গ্র্যাচুইটির বদলে এখন চারটি করার দাবি উঠেছে বলেও জানান তিনি। সাজ্জাদ আলম খান তপু বলেন, ‘প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে প্রত্যেক সংবাদ কর্মী যেন বেতন পান সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

আইনটি প্রণয়নের আগে সাংবাদিকদের সব ধরনের ন্যায্য দাবি বিবেচনায় নেয়ার আহ্বান জানান এই সাংবাদিক নেতা।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি ও সাংবাদিক নেতা মনজুরুল আহসান বুলবুল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য আইন করা হচ্ছে, কিন্তু তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি।’

আইনটি সংসদে পাসের আগে সংসদীয় কমিটি যেন অংশীজনের বিভিন্ন মতামত বিবেচনা নেয় সেই আহ্বানও জানান মনজুরুল আহসান বুলবুল।

গণমাধ্যম আইনে সংবাদকর্মীদের অধিকার নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান।

তিনি বলেন, ‘ইতোপূর্বে আমাদের অভিজ্ঞতা খুব খারাপ। যেমন, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট। সেখানেও গণমাধ্যমে যারা নেতৃত্বে আছেন, তাদের মতামত নেয়া হয়েছিল, কিন্তু সে মতামতগুলো রাখা হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘বিশেষ কোনো দলের সমর্থক গণমাধ্যম নেতাদের মতামত নিলে হবে না। সব পক্ষের লোকজনের মতামত নিতে হবে।’

সংবাদমাধ্যমের সবার সঙ্গে আলোচনা করে আইন করার পক্ষে মত দিচ্ছেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম হাসিব।

তিনি বলেন, ‘যাদের জন্য আইনটা করা তাদের নিয়ে তাদের মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়ে এটা করতে হবে। তা না হলে আইনটা সফল হবে না।’

অর্থনৈতিক সংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি শারমীন রিনভী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গণমাধ্যম আইন নিয়ে অনেক দিন ধরে কথা হচ্ছে। কিন্তু আইনটি পুরোপুরি পাস করার আগে সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। কোনো ধরনের আলোচনা না করে আইনটি সংসদে পাস হলে এটা সাংবাদিকদের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না।’

সংসদে কবে উঠছে

জাতীয় সংসদের শীতকালিন অধিবেশন শুরু হয়েছে রোববার। দুই কর্মদিবসের পর রোববার পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।

সংসদ সচিবালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে নিশ্চিত করেন, বুধবার পর্যন্ত ‘গণমাধ্যমকর্মী (চাকরির শর্তাবলি) আইন, ২০১৮’-এর খসড়া বিল আকারে সংসদ সচিবালয়ের আইন শাখায় জমা হয়নি।

তবে চলমান অধিবেশনে এটি বিল আকারে উত্থাপনের সম্ভাবনা এখনও রয়েছে। আর সেটি হলে যে কোনো সময় এটি আইন শাখায় জমা পড়তে পারে বলেও জানান সংসদ সচিবালয়ের ওই কর্মকর্তা।

যা থাকছে গণমাধ্যমকর্মী আইনে

চাকরির এক বছর পর প্রভিডেন্ট ফান্ড

আইনের খসড়া অনুযায়ী, সংবাদমাধ্যমকর্মীদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড গঠন করতে হবে। বর্তমানে নিয়োগের দুই বছর পর ভবিষ্যৎ তহবিলে মাসিক চাঁদা দেয়ার সুযোগ থাকলেও, নতুন আইনে তা এক বছর পরেই করার বিধান রাখা হচ্ছে।

সর্বনিম্ন ৮ ও সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ অর্থ এই তহবিলে জমা রাখা যাবে। আগে ৭ শতাংশ অর্থ জমা রাখা যেত। মালিককে সমহারে টাকা রাখতে হবে।

সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা ৩৬

নতুন আইনে সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা ৪৮ থেকে কমিয়ে ৩৬ ঘণ্টা করা হচ্ছে। এর চেয়ে বেশি কাজ করালে ওভারটাইম পাবেন সাংবাদিকরা।

ছুটিতে যত সুবিধা

১০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি বাড়িয়ে ১৫ দিন করা হচ্ছে। অর্জিত ছুটি ৬০ দিনের বদলে ১০০ দিন। ১১ দিনে একদিন করে জমা হবে।

প্রত্যেক সংবাদকর্মী চাকরির ১৮ ভাগের এক ভাগ সময় অসুস্থতাজনিত ছুটি পাবেন। এ ক্ষেত্রে নিবন্ধিত রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র থাকতে হবে।

সংবাদকর্মীরা এককালীন বা একাধিকবার সর্বোচ্চ ১০ দিন উৎসব ছুটি ভোগ করতে পারবেন। নারীরা সরকারি বিধি অনুযায়ী অর্থাৎ ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন। বর্তমানে আট সপ্তাহ মাতৃত্বকালীন ছুটি পান নারী কর্মীরা।

খসড়া আইন অনুযায়ী সংবাদকর্মীরা তিন বছর পরপর পূর্ণ বেতনসহ শ্রান্তি বিনোদন ছুটি পাবেন। তারা বিধিমালা অনুযায়ী স্বাস্থ্য বীমা সুবিধা পাবেন।

পাওনা আদায়ে করা যাবে মামলা

সংবাদ প্রতিষ্ঠান থেকে বকেয়া পাওনা আদায়ে কর্মী বা তার লিখিত ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি, মৃত কর্মীর ক্ষেত্রে তার পরিবারের কোনো সদস্য যথোপযুক্ত আদালতে মামলা করতে পারবেন।

খসড়ায় আইনে সংবাদকর্মীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। তবে এটি বিধি দিয়ে নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম।

আইন ভাঙলে জরিমানা পাঁচ লাখ টাকা

এই আইনের কোনো ধারা বা আইনের অধীনে প্রণীত বিধি লঙ্ঘন করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এর জন্য প্রতিষ্ঠান মালিককে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা ও সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা যাবে। জরিমানা আদায় না হলে জেল দিতে পারবে আদালত।

এ ছাড়া আইন লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়াসহ যে কোনো পর্যায়ে সরকারের দেয়া যে কোনো সুযোগ-সুবিধা স্থগিত বা বন্ধ করে দিতে পারবে সরকার।

চাকরিবিধি পরিদর্শনে কমিটি

আইনে পরিদর্শন কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। পরিদর্শন কমিটির সদস্যরা পরিদর্শক হিসেবে গণ্য হবেন। পরিদর্শন কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে, প্রত্যেক সংবাদ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চাকরিবিধি থাকবে, যা এই আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সংবাদ প্রতিষ্ঠানে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে প্রচলতি আইন অনুসরণ করে নীতিমালা প্রণয়ন করে অভিযোগ নিরসন পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে।

সংবাদকর্মীদের জন্য প্রজ্ঞাপন দিয়ে সরকার ওয়েজবোর্ড গঠন করবে। ওয়েজবোর্ডের সিদ্ধান্ত সব সংবাদমাধ্যম মালিককে পালন করতে হবে।

আরও পড়ুন:
স্রোত কমলে শিমুলিয়া-বাংলাবাজারে আবার ফেরি
পদ্মা সেতুতে ফেরির ধাক্কার বিভ্রান্তি কীভাবে ছড়াল
পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কায়’ ষড়যন্ত্র দেখছেন নৌ প্রতিমন্ত্রী
পদ্মা সেতুর স্প্যানে ফেরির আঘাতের চিহ্ন নেই: কাদের
পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কা’, অস্বীকার বিআইডব্লিউটিসির

শেয়ার করুন

রামপালে সরঞ্জাম পড়ে আছে, লোক নেই সংযোজনের

রামপালে সরঞ্জাম পড়ে আছে, লোক নেই সংযোজনের

সরঞ্জাম সংযোজন না করতে পারায় চালু করা যাচ্ছে না রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ফাইল ছবি

বারবার বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারায় হতাশা প্রকাশ করেছেন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এ জন্য তিনি চলমান করোনা মহামারির পরিস্থিতিকে দায়ী করেছেন। বলেছেন, বিদেশি কর্মীরা করোনার কারণে আসতে পারছেন না।

বারবার উৎপাদনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েও তা রাখতে পারছে না বহুল আলোচিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বা বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেড।

প্রথম দফায় উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় প্রথম ইউনিটের কমিশনিং তারিখ ঠিক হয় ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় ইউনিটের কমিশনিং চূড়ান্ত করা হয় ২৬ মার্চ। কিন্তু এ দফায়ও সেই লক্ষ্যের কাছে পৌঁছাতে পারেনি দুই দেশের এই যৌথ কোম্পানি।

এখন প্রকল্পের মূল ঠিকাদার ভারতীয় কোম্পানি ভেল আগামী ২৬ মার্চ প্রথম ইউনিটের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এদিকে বারবার বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারায় হতাশা প্রকাশ করেছেন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এ জন্য তিনি চলমান করোনা মহামারির পরিস্থিতিকে দায়ী করেছেন।

প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী কাজী আফসার উদ্দীন আহমেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সংকট হয়ে গেছে কোভিড-১৯ পরিস্থিতির জন্য। লোক ঠিকমতো আসতে পারছে না বা লোক যখন যাচ্ছে তখন তাদের নিজস্ব শিডিউল মতো আসতে দেয়া হচ্ছে না। তারা যখন আসতে চাচ্ছে, তখন তাদের সময়মতো ভারত থেকে আসতে দেয়া হচ্ছে না। শুধু ভারত নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশও এর সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে আছে স্পেন, পোল্যান্ড, জার্মানি। সেখান থেকেও বিশেষজ্ঞরা সময়মতো আসছেন না। জার্মানি থেকে লোকবল যা আসার কথা ছিল, তা আসছে না।’

ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, গত ১৬ ডিসেম্বর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট কমিশনিংয়ের তারিখ নির্ধারিত ছিল। এ জন্য গত আগস্ট থেকে প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু লোকবল ঠিকমতো আসতে পারেনি। বাংলাদেশ ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রেখেছিল। কিন্তু বিভিন্ন দেশ তাদের কর্মীদের ভ্রমণের অনুমতি দেয়নি।

তিনি বলেন, ‘এগুলো তো বিশেষজ্ঞদের কাজ। এগুলো আমাদের স্থানীয় লোক দিয়ে করা যায় না। আমাদের লোক হয়তো তাদের হেল্পার হিসেবে কাজ করতে পারবে। কিন্তু কাজের সময় বিদেশি এই বিশেষজ্ঞদের সশরীরে উপস্থিত থাকতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘সরঞ্জাম আসছে। কিন্তু তা লোকবলের অভাবে সংযোজন করা যাচ্ছে না। এর মূল কারণ হলো কোভিড-১৯। এখন যখন আমরা সব গুছিয়ে নিয়েছি, তখন আবার এই ওমিক্রন ঝামেলাটা শুরু হলো।

‘ভারতীয়দের ক্ষেত্রে আমরা যখনই আমাদের হাইকশিনকে বলেছি, তখনই তারা ভিসা করে রেখেছে। কিন্তু ওদের ওখানে এন্ট্রি হচ্ছে না। আমরা চিঠি লিখেছি। তারা আমাদের জানিয়েছে, ভারতের সাব কোম্পানিগুলো তাদের মূল কোম্পানি ভেলকে সহায়তা করছে না। এই নিয়ে ভেলের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব লেগে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আবার দেখা যাচ্ছে, আমরা আসতে বলছি ১৮ জনকে। তারা আসছে চারজন। আমরা বললাম, বাকিরা কোথায়? তারা বলল, আসবে। পরের সপ্তাহে এলো আরও পাঁচজন। পরের সপ্তাহে হয়তো এলো আরও চারজন। বাকিরা এলো না। এই যে আসা-না আসা, এটাই হলো মহাসংকট।’

তিনি বলেন, ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি ভালো। ফলে এখানে বিশেষজ্ঞ কর্মীদের আসতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উপকরণ, যেমন- এফজিডি ও চিমনি এবং কোল লোডার ও শিপ আনলোডার এসে পৌঁছেছে। তেল সরবরাহকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান যমুনার সঙ্গে চুক্তি করে তেল এনে মজুদ করা হয়েছে। কেননা কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র কমিশনিং করতে তেল ও কয়লা দুটিই লাগে। এসব উপকরণ বসিয়ে রাখা হয়েছে।

দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সুন্দরবনসংলগ্ন বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সাপমারি-কাটাখালী ও কৈর্গদাশকাঠী এলাকায় ১ হাজার ৮৩৪ একর জমির ওপরে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের মধ্যে এটি একটি। ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি এই প্রকল্প যৌথভাবে বাস্তবায়নের জন্য চুক্তি করে বাংলাদেশ ও ভারত।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে এই কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি সমঝোতাও সই হয়। দুই দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বিপিডিবি ও এনটিপিসি যৌথ কোম্পানি গঠন করে। ২০১৩ সালের ১ আগস্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পায়।

২০১৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দরপত্র আহ্বান করে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয় ২০১৬ সালের ১২ জুলাই। ইক্যুইটি বিনিয়োগ সমানভাগে ধরে মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট রামপাল বাস্তবায়নে গঠন করা হয় বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল)।

১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইউনিট নিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল। বাস্তবায়নকারী কোম্পানি বিআইএফপিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, কাজ শুরুর তারিখ থেকে ৪১ মাসের মধ্যে প্রকল্প শেষ করতে হবে। সে হিসাবে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরেই রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষম হয়ে ওঠার কথা ছিল।

বিদ্যুৎ খাতের সরকারি নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও রামপাল প্রকল্পের তত্ত্বাবধানকারী সংস্থা পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রামপালের কাজ চলছে। তবে কয়লার বিষয়টি এখনও সুরাহা ওভাবে হয়নি। আশা করছি, ওটা হয়ে যাবে। আমরা আগেই ঠিক করে রেখেছি ইন্দোনেশিয়া কিংবা অস্ট্রেলিয়া থেকে আমরা কয়লা নেব। আমাদের লক্ষ্য ডিসেম্বরে প্রথম ইউনিট শুরু করা। সে লক্ষ্যে কাজ চলছে।’

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, মূল কাজ শেষ করতে দেরি হলেও ভূমি উন্নয়নকাজ, সীমানা প্রাচীর ও স্লোপ প্রোটেকশন কাজ, মূল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফেসিং কাজ, নির্মাণকাজের বিদ্যুৎলাইন, নির্মাণকাজের পানিসহ বেশ কিছু কাজের পুরোটাই শেষ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুটি ইউনিট মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ৬৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে একটি ইউনিটের কাজ ৮০ শতাংশ শেষ।

বাংলাদেশ ও ভারত সরকারে যৌথ বিনিয়োগে রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) যৌথ কোম্পানি গঠন করে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

আরও পড়ুন:
স্রোত কমলে শিমুলিয়া-বাংলাবাজারে আবার ফেরি
পদ্মা সেতুতে ফেরির ধাক্কার বিভ্রান্তি কীভাবে ছড়াল
পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কায়’ ষড়যন্ত্র দেখছেন নৌ প্রতিমন্ত্রী
পদ্মা সেতুর স্প্যানে ফেরির আঘাতের চিহ্ন নেই: কাদের
পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কা’, অস্বীকার বিআইডব্লিউটিসির

শেয়ার করুন

রাজশাহী মেডিক্যালে তেলাপোকার ‘রাজত্ব’

রাজশাহী মেডিক্যালে তেলাপোকার 
‘রাজত্ব’

তেলাপোকার উৎপাতে অতিষ্ঠ রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ড। ছবি: সংগৃহীত

এই সমস্যার কথা স্বীকার করে হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, ‘তেলাপোকা নিয়ে আমরা বেকায়দায় আছি। বলতে পারেন ব্যর্থই হয়েছি।’

সব জায়গায় তেলাপোকার দৌড়াদৌড়ি। প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীটি এমন রাজত্ব গেড়ে বসেছে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ডে; কাজে আসছে না তেলাপোকা তাড়ানোর কোনো উপায়। অসহায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

বেডে বেডে ঘুরছে তেলাপোকা, কখনও কখনও উঠে যাচ্ছে রোগীর গায়েও। হেঁটে বেড়াচ্ছে খাবারের মধ্যেও। তিতিবিরক্ত রোগী ও তাদের স্বজনরা। কোনোভাবেই ভাঙা যাচ্ছে না তেলাপোকার ঘরবসতি।

তেলাপোকা তাড়ানো নিয়ে ব্যর্থতার সুর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কণ্ঠে। তারা বলছে, তেলাপোকা তাড়ানোর সব উপায় ব্যর্থ হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে বেকায়দায়ই আছেন তারা।

এমনিতেই নানা সমস্যায় জর্জরিত উত্তরাঞ্চলের সব থেকে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এর মধ্যে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তেলাপোকার উৎপাত। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ছড়িয়ে পড়েছে এগুলো। তেলাপোকা নিয়েই থাকতে হচ্ছে রোগী, স্বজন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের।

রাজশাহী মেডিক্যালে তেলাপোকার 
‘রাজত্ব’
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ডে তেলাপোকার এমন উৎপাত নিত্য দিনের চিত্র

এখানকার কয়েকটি ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, রোগীর বিছানার নিচের দিকে বাসা বেঁধেছে অগণিত তেলাপোকা। কোনোটি বড়, কোনোটি সদ্য ফোটা বাচ্চা। এগুলো বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাসপাতালজুড়ে।

১০ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেল রোগীর বেশ কয়েকজন স্বজন তেলাপোকা তাড়াতে ব্যস্ত। এগুলো এখানকার মেঝে ও দেয়ালে দৌড়ে বেড়াচ্ছে, খাবার রাখার র‌্যাকে খেলে বেড়াচ্ছে, রোগীর খাবারের বাটি, থালাতেও হেঁটে বেড়াচ্ছে। রোগী ও তাদের স্বজনরা বলছেন, ভয়ংকর এক পরিস্থিতি এখানে। তেলাপোকা যেন আতঙ্ক তৈরি করে দিয়েছে রোগীদের মধ্যে।

ঐ ওয়ার্ডে জসিম উদ্দিন নামের এক রোগীর স্বজন বললেন, ‘আমরা পোকার দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ। রোগী ও রোগীর স্বজন সবাই ভয়ের মধ্যে আছি। কোনো খাবার রাখা যাচ্ছে না। রোগীর শরীরের ওপরেও হেঁটে বেড়াচ্ছে। পা বেয়ে শরীরে উঠে যাচ্ছে।

‘ছোট ছোট বাচ্চা এখানকার রোগী। তাদের কানে বা নাকে ঢুকে যায় কি না- এটা নিয়ে সব সময়ই ভয়ের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। শত শত বাচ্চা রোগী আছে, তাদের কানে বা নাকে-মুখে প্রবেশ করলে কী বিপদ হতে পারে একবার ভেবে দেখেন।’

মেডিসিন ওয়ার্ডের এক রোগীর স্বজন আলমগীর হোসেন বলেন, ‘এমনিতেই এই হাসপাতালের সেবা নিয়ে মানুষের মুখে নানা অভিযোগ শুনি। এখানে এসে তেলাপোকার উৎপাত দেখতে পাচ্ছি। চরম বিরক্তিকর। কোনো খাবার রাখা যাচ্ছে না। অনেকটা অরুচিকর বিষয়। সব থেকে ভয়ের বিষয় এগুলো যেকোনো সময় নাকে-মুখে ঢুকে যেতে পারে।’

রাজশাহী মেডিক্যালে তেলাপোকার 
‘রাজত্ব’

এই সমস্যার কথা স্বীকার করে হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, ‘তেলাপোকা নিয়ে আমরা বেকায়দায় আছি। বলতে পারেন ব্যর্থই হয়েছি।’

তেলাপোকার উৎপাত নিয়ে তিনি জানান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না রাখতে পারার কারণেই এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালে রোগীর যে চাপ, ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকেন রোগী বা তাদের স্বজনরা। ওয়ার্ডগুলো ঠিকভাবে পরিষ্কার করাও যায় না। এসব কারণেই এই সমস্যাটা বেশি হয়েছে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, ‘যারা তেলাপোকা মারে আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। তারা এসে দেখে গেছেন। তারা এক একটি ওয়ার্ড ঠিক করতে ৬-৭ লাখ টাকা করে চেয়েছিল। আমরা সেটাও দিতে চেয়েছি।

‘তারা বলছেন, যেদিন যে ওয়ার্ডে কাজ করবেন সেদিন ওই ওয়ার্ড ফাঁকা রাখতে হবে। এটা আসলে আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। কারণ আমাদের এখানে এমনিতেই জায়গার অভাব। ওয়ার্ড বন্ধ করে কাজ করানো যাবে না। আবার রোগী রেখেও এগুলো মারার ওষুধ দেয়া যাবে না। এখন দেখি বিকল্প কিছু করা যায় কি না।’

আরও পড়ুন:
স্রোত কমলে শিমুলিয়া-বাংলাবাজারে আবার ফেরি
পদ্মা সেতুতে ফেরির ধাক্কার বিভ্রান্তি কীভাবে ছড়াল
পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কায়’ ষড়যন্ত্র দেখছেন নৌ প্রতিমন্ত্রী
পদ্মা সেতুর স্প্যানে ফেরির আঘাতের চিহ্ন নেই: কাদের
পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কা’, অস্বীকার বিআইডব্লিউটিসির

শেয়ার করুন