মদের লাইসেন্সে কালব-এর ৭ কোটি টাকা ‘হাওয়া’

মদের লাইসেন্সে কালব-এর ৭ কোটি টাকা ‘হাওয়া’

কালব রিসোর্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার। ছবি: সংগৃহীত

মদ বিক্রির লাইসেন্সের জন্য ৭ কোটি টাকা খরচের অনুমোদন দিয়েছে কালব-এর পরিচালনা পর্ষদ। এরই মধ্যে পুরো অর্থ নাম সর্বস্ব মধ্যস্ততাকারী প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কালব-এর দুই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য অভিযোগ করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনে। 

শিক্ষকদের ঋণ দিয়ে স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যে ১৯৭৯ সালে যাত্রা শুরু করে দ্য কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন অফ বাংলাদেশ বা কালব। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে বেশ কয়েক বছর স্বাভাবিকভাবে চললেও পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে দুর্নীতির অভিযোগ। অর্থ তছরুপ, বিতর্কিত খাতে বিনিয়োগসহ নানা অনিয়মে বিপর্যস্ত সমবায় প্রতিষ্ঠানটি।

বেশ পুরোনো সমবায় প্রতিষ্ঠান কালবে রাখা সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ লোপাটের অভিযোগও উঠেছে। নতুন খাত তৈরি করে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে নেয়া হচ্ছে অর্থ। দিনের পর দিন এমন ঘটনা ঘটলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

সম্প্রতি মদ বিক্রির লাইসেন্স করা নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছে কালব। লাইসেন্সের জন্য সাত কোটি টাকা খরচের অনুমোদন দিয়েছে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ। এরই মধ্যে পুরো অর্থ নাম সর্বস্ব মধ্যস্ততাকারী প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কালব-এরই দুই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ করেছেন।

এর আগে নিয়ম ভেঙে কয়েক কোটি টাকার চাল কিনে মজুত করে লোকসানের মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া, গাড়ি কিনতে পরিচালকদের নামমাত্র সুদে ঋণ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর আগের পরিচালনা পর্ষদের সময়ে ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে।

মদের লাইসেন্স পেতে সাত কোটি টাকা

সংশ্লিষ্টরা জানান, ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করে গাজীপুরে রিসোর্ট তৈরি করেছে সমবায় প্রতিষ্ঠান কালব। প্রথমে ‘কালব রিসোর্ট অ্যান্ড কনভেনশন হল’ নাম দেয়া হলেও পরে তা পরিবর্তন করে নাম রাখা হয় ‘কালব রিসোর্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’।

এই বারে মদ বিক্রির লাইসেন্স পেতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘এন সরকার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’ নামের একটি কনসালট্যান্ট ফার্মের সঙ্গে সাত কোটি টাকার চুক্তি করে কালব।

১০০ টাকার স্ট্যাম্পে এই চুক্তি করার সময়েই পরিশোধ করা হয় ৫০ ভাগ অর্থ। শর্ত অনুযায়ী, অর্ধেক কাজ শেষ হলে আরও ২৫ ভাগ অর্থ দেয়ার কথা। তবে কোন কোন খাতে এই অর্থ ব্যয় হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি চুক্তিতে। চুক্তি অনুযায়ী ফি বাবদ প্রতিষ্ঠানটি নেবে আরও ১১ লাখ টাকা।

কালব-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সমিতির সদস্য এ্যানথনী ম্যানসাং দাবি করেছেন, লাইসেন্সের ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি না থাকলেও পুরো সাত কোটি টাকা অ্যাকাউন্ট থেকে তোলা হয়েছে।

কালব-এর এক সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাম প্রকাশ না করে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) পাস করে নিতে হয়। মদের লাইসেন্স করতে সাত কোটি টাকা ব্যয়ের সিদ্ধান্ত পরিচালনা পর্ষদের পাস হয়েছে; তবে এজিএমে হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘ক্রেডিট ইউনিয়নের নীতিমালা অনুযায়ী, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও সমাজের ক্ষতি করে এমন কোনো বিনিয়োগ করা যাবে না।

‘যে রিসোর্টের নামে বারের লাইসেন্স করতে চাইছে ওটার নাম ছিল কালব রিসোর্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, মদ বিক্রির জন্য সেটার নাম বদলে দিয়েছেন বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী ও সাধারণ সম্পাদক আলফ্রেড রায়সহ তিন সদস্য।’

খাত স্পষ্ট না করে টাকা তুলে নিয়ে পরিচালনা পর্ষদের কয়েক সদস্য নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

লাইসেন্স পাইয়ে দিতে চুক্তি করা ‘এন সরকার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’ রাজধানীর পুরানা পল্টনের যে ঠিকানা দিয়েছে, সেখানে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন ঠিকানায় যাওয়ার পর সেখানকার লোকজন জানান, ওই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান কখনওই ছিল না।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে এন সরকার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের আয়কর আইনজীবী ও পরামর্শক নিতিশ সরকারকে একাধিকার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

মদের লাইসেন্স ফি কত?

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মদের লাইসেন্স নেয়ার জন্য সরাসরি মহাপরিচালক বরাবর আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের প্যাডে আবেদন করতে হয়। আবেদনপত্রের সঙ্গে ১৩ ধরনের কাগজপত্র জমা দিতে হয়। এসব যাচাই-বাছাই করে মন্ত্রণালয় থেকে এনওসি (নো অবজেকশন লেটার) আসার পর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। এর জন্য অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে চুক্তির দরকার নেই।

লাইসেন্স পেতে সরকার নির্ধারিত ফি এক লাখ টাকার সঙ্গে ১৫ হাজার টাকা ভ্যাট দিতে হয়। সাধারণত পর্যটন শিল্পে উৎসাহ দিতে এ ধরনের লাইসেন্স অনুমোদন দেয়া হয়ে থাকে।

মদের লাইসেন্সে কালব-এর ৭ কোটি টাকা ‘হাওয়া’
কালব-এর নানা অনিয়ম নিয়ে দুদকে অভিযোগ জমা পড়েছে। ফাইল ছবি/নিউজবাংলা

দুদকে অভিযোগ

কালব-এর নানা অনিয়ম তুলে ধরে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিয়েছেন দি খ্রীস্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়নের সদস্য (কালবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সমিতি) এ্যানথনি ম্যানসাং।

তিনি বলেন, ‘মদের লাইসেন্স পেতে সাত কোটি টাকার চুক্তি কেন? কৌশলে এই অর্থ সমবায় থেকে বের করে নেয়া হচ্ছে।’

দুদকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ‘সমবায় আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী যেকোনো বিনিয়োগের আগে সাধারণ সভা ও সমবায় অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হবে। বর্তমান চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারি অনুমতি না নিয়ে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সমবায় অধিদপ্তর প্রতি বছর নিরীক্ষা করলেও অদৃশ্য কারণে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।’

কালব-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সমিতি তুমিলিয়া খ্রীস্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়নের সদস্য অনিল ডি. কস্তাও আলাদা অভিযোগ জমা দিয়েছেন দুদকে।

তিনি বলেন, ‘বারের লাইসেন্সের জন্য কৌশলে প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। কোনো প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে মদের বার করা যায় না। বাংলাদেশে এমন কোনো নজির নেই। অর্থ আত্মসাতের জন্য চেয়ারম্যান, সেক্রেটারি ও এক পরিচালক এটা করেছেন। এই তিনজন বারের লাইসেন্সের জন্য কাজ করছেন। অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে বোর্ডের অন্য সদস্যরা জানেন না।

তিনি দাবি করেন, ‘এমনকি বার লাইসেন্সের জন্য চূড়ান্ত খরচ বোর্ডে অনুমোদন করা হয়নি। বোর্ডে অর্থ ব্যয়ের আলোচনা না করে পরে রেজুলেশনে মিথ্যা কথা লিখেছেন। অথচ বোর্ডের বাকি ৯ সদস্য এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।’

চাল ব্যবসায় বড় লোকসান

কালব-এর পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে বেশি দামে চাল কিনে বিপুল লোকসান গোনার অভিযোগও রয়েছে। এতে বলা হয়, চাল কিনে মজুত করতে কালবের চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকীকে আহ্বায়ক, পরিচালক একরামুল হককে সদস্য সচিব এবং বাবলু কোড়াইয়াকে সদস্য করে কমিটি করা হয়।

কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী দিনাজপুরে চাল কিনে গুদামজাত করার জন্য ৫ কোটি টাকা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় পাস হয়। কমিটি চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৩ লাখ ৯০ হাজার কেজি চিনিগুঁড়া চাল কিনে দিনাজপুর শহরের পুলেরহাটে গুদাম ভাড়া করে মজুত করে। প্রতি কেজি চাল কেনা হয় ৭৭ টাকা, পরিবহন বাবদ ২ টাকা খরচ ধরে দাম দাঁড়ায় ৭৯ টাকা।

অথচ একই সময় দিনাজপুরের মিলগুলোতে রপ্তানির চিনিগুঁড়া চালের পাইকারি দর ছিল ৭৫ টাকা কেজি। সেখানে কেজিতে অন্তত ২ টাকা বেশিতে চাল কিনেছে কালব।

অভিযোগ করে বলা হয়, তিন মাসের বেশি সময় চিনিগুঁড়া চাল মজুত করলে গুণগত মান নষ্ট হতে থাকে। অথচ কালব সাত মাস ধরে চাল মজুত করে রেখেছে। বাজার দরের চেয়ে বেশি হওয়ায় এবং দীর্ঘদিন মজুত করায় এখন ৭৯ টাকা কেজি দরের চালের দাম উঠছে সর্বোচ্চ ৬০ টাকা।

৭৯ টাকা দরে ৩ লাখ ৯০ কেজি চালের দাম ৩ কোটি ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা। বিনিয়োগ টাকার সঙ্গে ১২ শতাংশ হারে ৭ মাসের সুদ ২১ লাখ ৬৬ হাজার ৭০০ টাকা যুক্ত হলে মূল্য দাঁড়াবে ৩ কোটি ২৯ লাখ ৬৬ হাজার ৭০০ টাকা।

এখন ৬০ টাকা দরে চাল বিক্রি করলে ২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা আসবে কালবের। এতে নিট লোকসান হবে ৯৫ লাখ ৬৬ হাজার ৭০০ টাকা।

তছরুপ প্রায় ২০০ কোটি টাকা

এর আগে ২০১৯ সালে কালব-এর তখনকার চেয়ারম্যান সায়মন এ. পেরেরাসহ কয়েক জনের বিরুদ্ধে ভুয়া কোম্পানি খুলে ৭৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া ওই কমিটি আরও ১০০ কোটি টাকা তছরুপ করে বলে তদন্তে প্রমাণ পায় পুলিশের বিশেষায়িত তদন্ত বিভাগ পিবিআই।

এ ঘটনায় দুদক মামলা করার পর সাইমন এ. পেরেরা যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক রতন এফ কস্তা এখন কারাগারে আছেন। মামলার অন্য আসামিরা পলাতক।

অভিযোগ ‘বিস্ময়কর’, বক্তব্য নেই অভিযুক্তদের

সমবায় বিশ্লেষক ও দি খ্রিষ্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট পঙ্কজ গিলবার্ট কস্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সমবায় প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা হবে দৃষ্টান্তমূলক। সবার জন্য তা হবে উদাহরণ। মদ বিক্রি করা হলে সেই ঐতিহ্য থাকবে না। মদ সাধারণত ফাইভ স্টার হোটেলে রাখা হয়, কারণ সেখানে বিদেশিরা আসেন।’

তিনি বলেন, ‘একটি লাইসেন্স নেবার জন্য সাত কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্য বিস্ময়কর। মদের লাইসেন্স ফি অনেক কম।’

আমানতকারীদের অর্থ এভাবে ব্যয় নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

সমবায় অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শুধু মদের লাইসেন্স নয়, কালব-এর সার্বিক অনিয়ম খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিষয়টি তদন্ত করা হবে।’

দুদকে অভিযোগের বিষয়ে কালব-এর চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকীর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দুদকের কাজটা কী? কিসের বিষয়ে দুদক অনুসন্ধান করে? এ ব্যাপারে আমি আপনাকে এমন কিছুই বলতে চাই না। কোনো স্টেটমেন্ট দেবো না।’

আরও পড়ুন:
ভাতার কার্ডের জন‍্য টাকা নিয়েছেন ‘চেয়ারম্যানের লোক’
ঘুষ নেয়ার অভিযোগে এএসআই প্রত্যাহার
এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তার ৩ ভাই ৭ দিনের রিমান্ডে
এহসান গ্রুপ যশোরে হাতিয়েছে ‘৩২২ কোটি টাকা’

শেয়ার করুন

মন্তব্য

কোরআন রাখতে আরেকটি মন্দিরেও গিয়েছিলেন ইকবাল

কোরআন রাখতে আরেকটি মন্দিরেও গিয়েছিলেন ইকবাল

নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে কোরআন রাখায় অভিযুক্ত ইকবাল ওই রাতে কিছুটা দূরের এই গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরেও গিয়েছিলেন। ছবি: নিউজবাংলা

তদন্তসংশ্লিষ্টরা নিউজবাংলাকে নিশ্চিত করেছেন, একটি সংঘবদ্ধ চক্র মণ্ডপে কোরআন রাখতে ইকবালকে কাজে লাগিয়েছে। নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপটিতে শুরুতে ইকবাল গেলেও লোকজন দেখে ফিরে আসেন। এরপর তিনি যান কিছুটা দূরের গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরে। সেখানে গেটের তালা ভাঙতে ব্যর্থ হন ইকবাল।

কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের যে অস্থায়ী পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়া যায়, সেখানে শুরুতে প্রবেশে ব্যর্থ হয়েছিলেন প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন। এরপর তিনি গিয়েছিলেন ওই মণ্ডপ থেকে কিছুটা দূরে দিগম্বরীতলার গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরে।

মন্দিরটির গেটের তালা লাঠি দিয়ে ভাঙতে ব্যর্থ হন ইকবাল। এরপর আবার ফিরে আসেন নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে। এ সময় পূজাসংশ্লিষ্টদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে তিনি কোরআন শরিফটি হনুমানের ওপর রাখেন। মসজিদ থেকে বের হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর কোরআন রেখে হনুমানের গদা হাতে ফিরে আসেন ইকবাল।

ওই এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ এবং ইকবালের সহযোগীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এমন তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

কোরআন রাখতে আরেকটি মন্দিরেও গিয়েছিলেন ইকবাল
প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন মাজারের মসজিদ থেকে কোরআন শরিফ নিয়ে রওনা হন মণ্ডপের দিকে। সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেয়া ছবি।

নিউজবাংলার হাতে আসা সিসিটিভির নতুন ফুটেজেও বিষয়টি দেখা গেছে। এসব ফুটেজে পরিষ্কার ওই মণ্ডপের পাশের শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারের মসজিদে নিয়মিত যেতেন ইকবাল। সেখানকার অনেকে তার পরিচিত।

শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারটি থেকে আলোচিত মণ্ডপে হেঁটে যেতে সময় লাগে ২ থেকে ৩ মিনিট। দারোগাবাড়ী মাজার নামে কুমিল্লাবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি রয়েছে মাজারটির। আর এই মাজারটি থেকে দিগম্বরীতলার গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরে হেঁটে যেতে সময় লাগে প্রায় ১০ মিনিট।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কয়েকটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিউজবাংলাকে নিশ্চিত করেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র মণ্ডপে কোরআন রাখতে ইকবালকে কাজে লাগিয়েছে। নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপটিই ছিল তাদের লক্ষ্য। তবে ইকবাল যখন মসজিদ থেকে কোরআন নিয়ে সেখানে যান, তখন মণ্ডপ পুরোপুরি জনশূন্য হয়নি। এ জন্য তিনি চলে যান মণ্ডপ থেকে কিছুটা দূরের গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরে। ওই মন্দিরটির গেটের তালা ভাঙতে তিনি একটি লাঠিও জোগাড় করেন। তবে সেটি তালা ভাঙার মতো মজবুত না হওয়ায় ব্যর্থ হন ইকবাল। এরপর আবার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে যান।

নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে কীভাবে উত্তেজনার শুরু এবং মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর পবিত্র কোরআন শরিফ কী করে এলো, সে বিষয়ে মঙ্গলবার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউজবাংলা।

কোরআন রাখতে আরেকটি মন্দিরেও গিয়েছিলেন ইকবাল
এই মন্দিরের তালা ভাঙতে ব্যর্থ হন ইকবাল

পূজার আয়োজক, এলাকাবাসী, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার আগের রাত আড়াইটা পর্যন্ত মন্দিরে পূজাসংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি ছিল। এরপর বুধবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে দুজন নারী ভক্ত মণ্ডপে এসে হনুমানের মূর্তিতে প্রথম কোরআন শরিফটি দেখতে পান।

পূজার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন দিঘির পাড়ের বাসিন্দা তরুণ কান্তি মোদক। স্থানীয়রা তাকে মিথুন নামে চেনেন। মিথুন নিউজবাংলাকে জানান, রাত আড়াইটা পর্যন্ত তিনি মণ্ডপে ছিলেন। তখন পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। এরপর তিনি নৈশপ্রহরী শাহিনের কাছে মণ্ডপের নিরাপত্তার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বাসায় ফেরেন। সহিংসতার পর নৈশপ্রহরী শাহিনকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

নিউজবাংলার হাতে আসা নতুন সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, কোরআন নেয়ার আগের রাতেও মাজারের মসজিদে গিয়েছিলেন ইকবাল। তখন মধ্যরাত পেরিয়ে ক্যালেন্ডারের পাতায় ১২ অক্টোবর। রাত ৩টা ৪২ মিনিটে মসজিদে যান ইকবাল।

এই ফুটেজে মসজিদের বারান্দায় হাঁটতে দেখা যায় ইকবালকে।

কোরআন রাখতে আরেকটি মন্দিরেও গিয়েছিলেন ইকবাল
মসজিদ থেকে কোরআন নিয়ে মণ্ডপে রাখায় প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল

পরের ফুটেজটি মঙ্গলবার রাত ১০টা ৩৮ মিনিটের। মসজিদের বারান্দায় দুজনকে বসে থাকতে দেখা যায়। রাত ১০টা ৫৮ মিনিটে ইকবাল এসে ওই দুজনের সঙ্গে বসে কথা বলেন। এই দুজন হলেন মাজারের সহকারী খাদেম হিসেবে পরিচিত হুমায়ুন আহমেদ ও ফয়সাল আহমেদ।

ঠিক ১১টায় তিনজনই সেখান থেকে উঠে পড়েন। ইকবাল পলাতক থাকলেও মসজিদে তার সঙ্গে কথা বলা হুমায়ুন ও ফয়সালকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ওই রাত ২টা ১২ মিনিটের একটি ফুটেজে ইকবালকে মসজিদের বারান্দায় কোরআন শরিফ রাখার শেলফের সামনে দেখা যায়। সে সময় বারান্দায় একজন নামাজ পড়ছিলেন এবং একজন শুয়ে ছিলেন। ইকবাল একটি কোরআন শরিফ নিয়ে বারান্দায় বসেন। রাত ২টা ১৪ মিনিটে কোরআনটি বারান্দায় রেখে খালি হাতে তিনি উঠে পড়েন।

এর ৩ মিনিট পর ইকবাল আবার ফিরে এসে কোরআন তুলে নিয়ে বারান্দায় ঘোরাঘুরি করেন। এ সময় নামাজরত সেই ব্যক্তি সেখানে ছিলেন না।

এর পরের ফুটেজটি মাজারের পুকুরের পূর্ব পাড়ের একটি বাসার সিসিটিভি ক্যামেরার। উন্নত প্রযুক্তির এই সিসিটিভি ক্যামেরা ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলের। ক্যামেরাটি প্রতি ৪ মিনিট অন্তর মুভ করে।

কোরআন রাখতে আরেকটি মন্দিরেও গিয়েছিলেন ইকবাল
এই সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে মসজিদ থেকে ইকবালের কোরআন নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য

এতে দেখা যায়, ডান হাতে কোরআন নিয়ে মসজিদের পুকুরের পাড় দিয়ে ইকবাল হেঁটে বেরিয়ে যাচ্ছেন।

এর পরের আরেকটি ফুটেজে দেখা যায়, ইকবালের বাম হাতে রয়েছে কোরআনটি। এলাকার একটি রাস্তা দিয়ে তিনি হেঁটে যাচ্ছেন।

পরের ক্যামেরার ফুটেজে ইকবালকে জগন্নাথপুর মন্দির রোড ধরে হেঁটে যেতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তিনি গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরের সামনে প্রায় ২৭ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার ডান হাতে দেখা যায় ছোট একটি লাঠি এবং বাম হাতে কোরআন। তদন্তকারীরা বলছেন, এই লাঠিটি দিয়ে মন্দিরের গেটের তালা ভাঙতে ব্যর্থ হন ইকবাল।

এর পরের ফুটেজে তাকে স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকের চকবাজার শাখার দিকে যেতে এবং পরেরটিতে পূবালী ব্যাংক মোড়ের পাশের গলিতে ঢোকার মুখে দাঁড়াতে দেখা যায়। এই ফুটেজে সময় দেখা যাচ্ছিল রাত ২টা ৪২ মিনিট।

পরের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে ইকবালকে একজন নৈশপ্রহরী ও আরেক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। সে সময়ও তার হাতে কোরআন শরিফ দেখা যায়।

তারপর ইকবালকে দেখা যায় সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সামনে দিয়ে যেতে। এর পরের ক্যামেরার ফুটেজে আবারও তাকে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চকবাজার শাখার দিকে যেতে দেখা যায়। অন্য ক্যামেরায় গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরের সামনে দিয়ে যেতে দেখা যায় এই যুবককে।

ইকবালকে পরের ফুটেজে এলাকার আরেকটি রাস্তায় কোরআন হাতে হাঁটতে দেখা যায়। পরেরটি ছিল জগন্নাথ মন্দিরের সামনের রাস্তার।

এরপর কোরআন হাতে ইকবালের আর কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।

তবে মাজার কানেক্টিং রোডে ৩টা ১২ মিনিটের ফুটেজে দেখা যায়, মণ্ডপে কোরআন রেখে গদা হাতে ফিরে আসছেন ইকবাল। এই ফুটেজটি সব মিলিয়ে ২ মিনিট ২৫ সেকেন্ডের।

কোরআন রাখতে আরেকটি মন্দিরেও গিয়েছিলেন ইকবাল

মণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখার পর হনুমানের গদা হাতে হেঁটে যাওয়া ইকবাল

এরপর রাত ৩টা ১৩ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডে ওই রাস্তায় একজনকে দেখা গেছে, যাকে ইকরাম হোসেন বলে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে জানান, মণ্ডপে কোরআন রাখায় যে চক্রটি জড়িত, ইকবাল তাদের একজন। তিনি কোরআন রাখার পর ভোরে আরেক অভিযুক্ত ইকরাম হোসেন ঘটনাস্থল থেকে ৯৯৯-এ কল করেন। তারপর ওসি আনওয়ারুল আজিম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি কোরআন শরিফটি উদ্ধারের পাশাপাশি ইকরামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় নিয়ে যান।

কোরআন রাখতে আরেকটি মন্দিরেও গিয়েছিলেন ইকবাল
কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর চলে ভাঙচুর

নিউজবাংলার হাতে আসা শেষ ফুটেজটি মসজিদের বারান্দার। ইকবাল রাত ৩টা ২২ মিনিটে আবার মসজিদে ফিরে যান। তবে তখন তার হাতে গদাটি ছিল না।

এসব ফুটেজ নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম তানভীর আহমেদ নিউজবাংলাকে এর আগে আরেকটি ফুটেজের প্রসঙ্গে বলেন, ‘কুমিল্লার ঘটনাটির পেছনে কারা দায়ী, তা জানতে আমরা সবকিছু নিখুঁতভাবে মনিটর করছি। ঘটনার আগের রাতে কুমিল্লা শহরে যতগুলো সিসিটিভি ক্যামেরায় ইকবালকে দেখা গেছে, সব আমরা সংগ্রহ করেছি। আমরা সব ক্যামেরার পুরো হার্ডড্রাইভ নিয়ে এসেছি, যাতে কেউ কোনো ফুটেজ ডিলিট করে দিলেও আমরা উদ্ধার করতে পারি। আমাদের এক্সপার্ট ফরেনসিক টিম সিসিটিভি ফুটেজগুলো নিয়ে কাজ করেছে।’

আরও পড়ুন:
ভাতার কার্ডের জন‍্য টাকা নিয়েছেন ‘চেয়ারম্যানের লোক’
ঘুষ নেয়ার অভিযোগে এএসআই প্রত্যাহার
এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তার ৩ ভাই ৭ দিনের রিমান্ডে
এহসান গ্রুপ যশোরে হাতিয়েছে ‘৩২২ কোটি টাকা’

শেয়ার করুন

ইকবালের ভিডিওতে সিসিক্যাম ঘুরল কেন?

ইকবালের ভিডিওতে সিসিক্যাম ঘুরল কেন?

শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারের মসজিদ থেকে ইকবালের কোরআন নেয়ার আলোচিত ভিডিও (বাঁয়ে) এবং সেটি ধারণ করা সিসিটিভি ক্যামেরা। ছবি: নিউজবাংলা

মসজিদ থেকে কোরআন হাতে ইকবালের বেরিয়ে যাওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনার ঝড়। বিষয়টি নিয়ে সিসিটিভি ক্যামেরার আমদানিকারক, ভিডিও ফুটেজ বিশেষজ্ঞ, তদন্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা। পরিষ্কার হয়েছে, এভাবে ফুটেজ পাওয়ার কারণ।

কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত ইকবাল হোসেন কোরআনটি নিয়েছিলেন মণ্ডপের পাশের এক মাজারের মসজিদ থেকে।

মণ্ডপে সহিংসতার আগের রাতে তিনি কোরআন শরিফটি হাতে নিয়ে মণ্ডপের দিকে রওনা হন। এরপর মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর কোরআন রেখে ফিরে আসেন ইকবাল। এসব দৃশ্য ধরা পড়েছে ওই এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরায়।

তবে মসজিদ থেকে কোরআন হাতে ইকবালের বেরিয়ে যাওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনার ঝড়। ফুটেজে কখনও জুম ইন, নড়াচড়া, ঝকঝকে ছবি এবং ক্যামেরা প্যান (ঘোরানো) নিয়ে প্রশ্ন তুলে এর সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে।

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সিসিটিভি ক্যামেরার আমদানিকারক, ভিডিও ফুটেজ বিশেষজ্ঞ, তদন্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা। মসজিদের দৃশ্য ধরা পড়েছে যেসব ক্যামেরায় তার মালিকের বক্তব্যও নেয়া হয়েছে। এতে পরিষ্কার হয়েছে, এভাবে ফুটেজ পাওয়ার কারণ।

ইকবালের ভিডিওতে সিসিক্যাম ঘুরল কেন?
প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন মাজারের মসজিদ থেকে কোরআন শরিফ নিয়ে রওনা হন মণ্ডপের দিকে। এর সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা

নিউজবাংলার হাতে আসা কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল সহিংসতার আগের রাতে একটি মাজারের মসজিদ থেকে কোরআন শরিফটি নিয়ে মণ্ডপের দিকে রওনা হন। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে সময়টি তখন রাত ২টা ১০ মিনিট।

নানুয়ার দিঘির পাশেই শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারটির অবস্থান। মণ্ডপ থেকে হেঁটে যেতে সময় লাগে ২ থেকে ৩ মিনিট। দারোগাবাড়ী মাজার নামে কুমিল্লাবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি রয়েছে মাজারটির। এর মসজিদের বারান্দায় তিলাওয়াতের জন্য রাখা থাকে বেশ কয়েকটি কোরআন শরিফ। রাত-দিন যেকোনো সময় যে কেউ এখানে এসে তিলাওয়াত করতে পারেন।

মাছ পাহারার সিসিটিভি ক্যামেরায় চিহ্নিত ইকবাল

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, মসজিদ থেকে ইকবালের কোরআন শরিফ নেয়ার দৃশ্যটি ধরা পড়ে মাজারের পুকুরের পূর্বপাড়ের একটি বাসার সিসিটিভি ক্যামেরায়।

‘আশার আলো’ নামের ওই বাড়ির মালিক সাইদুর রহমান। তিনি কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার সোনালী ব্যাংক শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার। বর্তমানে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন।

ইকবালের ভিডিওতে সিসিক্যাম ঘুরল কেন?
এই সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে মসজিদ থেকে ইকবালের কোরআন নেয়ার দৃশ্য

সাইদুর নিউজবাংলাকে জানান, তিন বছর আগে আড়াই লাখ টাকায় দারোগাবাড়ী মসজিদের সামনের পুকুরটি ইজারা নেন। শখের বসে এই পুকুরে তিনি মাছ চাষ করেন।

পুকুর থেকে মাছ চুরি ঠেকাতে তিন তলা বাড়িটির বাইরের দিকের দোতলায় উন্নত প্রযুক্তির একটি সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছেন সাইদুর। ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলের এই ক্যামেরাটি প্রতি চার মিনিট অন্তর মুভ করে। মূল ক্যামেরার আশপাশে আরও চারটি ফিক্সড ক্যামেরা রয়েছে।

সাইদুর নিউজবাংলাকে জানান, তিনি মোট ৮০ হাজার টাকায় পাঁচটি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেন। তদন্তের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব ক্যামেরার ডিভিআর বক্স (যেখানে ফুটেজ সংরক্ষণ হয়) নিয়ে গেছে।

ইকবালের কোরআন নেয়ার দৃশ্য সাইদুরের বাড়ির বেশ কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। এর মধ্যে আলোচিত ফুটেজটি সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ইউএনভি ক্যামেরার।

ইকবালের ভিডিওতে সিসিক্যাম ঘুরল কেন?
মাজারের পুকুর ইজারা নেয়ার পর মাছ পাহারায় কয়েকটি সিসিটিভি বসেছে ‘আশার আলো’ নামের বাড়িটিতে

নিউজবাংলা পরীক্ষা করে দেখেছে, ইউএনভি পিটিজেড প্রাইম ক্যাটাগরির IPC6222ER-X30-B মডেলের ক্যামেরাটি বসানো হয়েছে সাইদুরের বাড়িতে। গ্লোবাল ইউনিভিউ ডটকম নামের একটি ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা গেছে, এ ধরনের সিসিটিভি ক্যামেরা সাধারণ ক্যামেরার চেয়ে ৩০ গুণ অপটিক্যাল জুম করে অবজেক্টের ছবি নিতে সক্ষম।

অপটিক্যাল জুমের কারণে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের বস্তুর ছবিও পরিষ্কারভাবে ধারণ করা সম্ভব। এ ছাড়া সিএমওএস সেন্সর থাকায় এটি দূরের চলমান বস্তুকে চিহ্নিত করে এর হাই রেজ্যুলিউশনের ছবি তুলতে সক্ষম।

সাইদুর রহমান এই ক্যামেরাটি কেনেন কুমিল্লা নগরীর মনোহরপুরের পিসি নেট কম্পিউটার্স থেকে। দোকানের মালিক জহিরুল ইসলাম নিউজবাংলাকে জানান, ইউএনভি পিটিজেড প্রাইম ক্যাটাগরির IPC6222ER-X30-B মডেলের ক্যামেরা তারা ৪৫ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন। এটি সর্বাধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তিসম্পন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা। হাই রেজ্যুলেশনের এ ক্যামেরায় ভিডিওর পাশাপাশি অডিও ধারণও সম্ভব।

ইকবালের ভিডিওতে সিসিক্যাম ঘুরল কেন?
কুমিল্লার এই দোকান থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা কিনেছেন সাইদুর রহমান

আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়ে যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও সিসিটিভি আমদানিকারকেরা বলছেন, বাজারে এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অনেক ধরনের সিসিটিভি ক্যামেরা পাওয়া যায়। এক হাজার টাকা থেকে লাখ টাকার ক্যামেরাও আছে। চাহিদা বিবেচনায় প্রতিনিয়তই এসব ক্যামেরায় নতুন নতুন ফিচার যুক্ত করছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।

বাংলাদেশে সিটিটিভি ক্যামেরা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এক্সেল টেকনোলজির সিসিটিভি ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা রাজিব বিশ্বাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখন মানুষ নিরাপত্তার জন্য অনেক ইনভেস্ট করে। তাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সিসিটিভি ক্যামেরা বাজারে আসছে। এখন ক্যামেরা দিয়ে শুধু ভিডিও ধারণ করা যায় তাই নয়, শব্দ রেকর্ড করাসহ কথাও বলা যায়।’

তিনি বলেন, ‘ভালো ক্যামেরায় প্রায় ১ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরের ফুটেজ ধারণ করা যায়। এখনকার প্রায় সব ক্যামেরার ফুটেজ জুম করেও দেখা যায়। অপটিক্যাল জুম ও ডিজিটাল জুম নামে দুটি অপশন রয়েছে। অপটিক্যাল জুম করে অনেক দূরের ছবি ফুটেজ জুম করলেও তা স্পষ্ট দেখা যায়, এতে রেজ্যুলেশনের খুব একটা পরিবর্তন ঘটে না।’

ইকবালের ভিডিওতে সিসিক্যাম ঘুরল কেন?
ইউএনভি পিটিজেড প্রাইম ক্যাটাগরির IPC6222ER-X30-B মডেলের ক্যামেরার স্পেসিফিকেশন

৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল ক্যামেরা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলোকে পিটিজেড (প্যান, টিল, জুম) ক্যামেরা বলা হয়। এই ক্যামেরা চারপাশে ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল পর্যন্ত ভিডিও ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ একটি নিদিষ্ট অ্যাঙ্গেলে কোনো ভিডিও ধারণ করা হলে এর ডান, বাম, ওপর, নিচ সব জায়গায় ৩৬০ ডিগ্রি সীমানা পর্যন্ত ছবি বা ভিডিও দেখা য়ায়। শুধু তাই নয়, ওই ক্যামেরায় ট্র্যাকিং সেন্সর থাকলে কোনো কিছুর মুভমেন্টও অটোমেটিক ধারণ করা যায়। অর্থাৎ এই প্রযুক্তির ক্যামেরার সামনে দিয়ে কিছু নড়াচড়া করলে বা কেউ হেঁটে গেলে ক্যামেরা তাকে অনুসরণ করে নিজে নিজে ঘুরবে।’

ইকবালের আলোচিত ফুটেজটি নিয়ে ভিডিও সম্পাদনা বিশেষজ্ঞদের মতামতও নিয়েছে নিউজবাংলা। ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সিনিয়র ভিডিও এডিটর রিফাত আনোয়ার লোপা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি সিসিটিভি ফুটেজটি দেখেছি। সিসিটিভির আধুনিক ফর্ম হিসেবে, বেশি জায়গাজুড়ে দেখার জন্য ফিশআই ক্যামেরা (ফিক্সড ক্যামেরা) ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া, ডোম ক্যামেরাও (মুভিং ক্যামেরা) আছে। দীর্ঘদিনের এডিটিং অভিজ্ঞতায় আমার মনে হয়েছে, এটা ডোম ক্যামেরার ফুটেজ।’

ইকবালের ফুটেজটি নিয়ে যা বলছেন তদন্তকারীরা

কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে কোনো সিসিটিভি না থাকলেও আশপাশের অনেক প্রতিষ্ঠান ও বাসায় সিসিটিভি রয়েছে। ওই মণ্ডপে ১৩ অক্টোবরের সহিংসতার পর তদন্তে নেমে আশপাশের সব ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ। এসব ফুটেজে কোরআন রাখার আগে-পরে ইকবাল কোন পথে আসা-যাওয়া করেছেন তাও ধরা পড়েছে।

পুলিশ বলছে, তদন্তের স্বার্থে সব সিসিটিভি ফুটেজ ফরেনসিক বিভাগে এনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতেই ইকবালের অপরাধের প্রমাণ ধরা পড়ে। এরপর যেসব ফুটেজে ইকবালকে দেখা গেছে, সেগুলো ঘটনার ক্রম অনুযায়ী সংরক্ষণ করেছে পুলিশের ফরেনসিক টিম।

ইকবালের ভিডিওতে সিসিক্যাম ঘুরল কেন?
মসজিদ থেকে কোরআন নিয়ে মণ্ডপে রাখায় প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল

আলোচিত ফুটেজটি পুলিশের সাইবার ফরেনসিক কম্পিউটারের মনিটর থেকে মোবাইল ফোনে ধারণ করা। ইকবালের গতিবিধির সব ফুটেজ একসঙ্গে কম্পিউটারে চালিয়ে তা পর্যালোচনা করছিলেন কয়েকজন কর্মকর্তা। এ সময় একজন মনিটর থেকে মোবাইল ফোনে ফুটেজটি ধারণ করেন।

এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রকাশ পাওয়া ফুটেজটি ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এর চারপাশে কম্পিউটার মনিটরের কালো বর্ডার দেখা যাচ্ছে। আর স্ক্রিনের নিচের দিকে ভিডিও প্লেয়ার সফটওয়্যারের মেন্যু দৃশ্যমান। ফরেনসিক ল্যাবে ফুটেজটি বিশ্লেষণের সময় এটি জুম করে প্লে করা হয়েছিল, যাতে ইকবালের গতিবিধি স্পষ্ট ধরা পড়ে। উচ্চপ্রযুক্তির সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজের কারণেই এভাবে জুম করা সম্ভব হয়েছে।’

তিনি জানান, ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল পজিশনের ধারণ করা ফুটেজটি ফরেনসিক ল্যাবের কম্পিউটারে ইচ্ছেমতো জুম ইন ও জুম আউট করে নানা অ্যাঙ্গেল থেকে যাচাই করা হচ্ছিল। এ সময়েই একজন মোবাইল ফোনে সেটি ধারণ করেন। এই ফুটেজের বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম তানভীর আহমেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কুমিল্লার ঘটনাটির পিছনে কারা দায়ী তা জানতে আমরা সবকিছু নিখুঁতভাবে মনিটর করছি। ঘটনার আগের রাতে কুমিল্লা শহরে যতগুলো সিসিটিভি ক্যামেরায় ইকবালকে দেখা গেছে, সব আমরা সংগ্রহ করেছি। আমরা সব ক্যামেরার পুরো হার্ডড্রাইভ নিয়ে এসেছি, যাতে কেউ কোনো ফুটেজ ডিলিট করে দিলেও আমরা উদ্ধার করতে পারি।

‘আমাদের এক্সপার্ট ফরেনসিক টিম সিসিটিভি ফুটেজগুলো নিয়ে কাজ করেছে। এই ফুটেজ আমাদের ফরেনসিক ল্যাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলের ক্যামেরার ফুটেজ হওয়ায় সেটি জুম করে দেখা যায় এবং পজিশনও পরিবর্তন করা যায়। এখানে ভিডিও এডিট করার কোনো কারণ নেই।’

আরও পড়ুন:
ভাতার কার্ডের জন‍্য টাকা নিয়েছেন ‘চেয়ারম্যানের লোক’
ঘুষ নেয়ার অভিযোগে এএসআই প্রত্যাহার
এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তার ৩ ভাই ৭ দিনের রিমান্ডে
এহসান গ্রুপ যশোরে হাতিয়েছে ‘৩২২ কোটি টাকা’

শেয়ার করুন

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল

মণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখার পর হনুমানের গদা হাতে হেঁটে যাওয়া ইকবাল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য এবং নিজস্ব অনুসন্ধানে নিউজবাংলা নিশ্চিত হয়েছে, মণ্ডপে কোরআন রেখে গদা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাওয়া ব্যক্তির নাম ইকবাল হোসেন। ৩০ বছর বয়সী ইকবাল কুমিল্লা নগরীর ১৭ নং ওয়ার্ডের দ্বিতীয় মুরাদপুর-লস্করপুকুর এলাকার নূর আহম্মদ আলমের ছেলে। তাকে খুঁজছে পুলিশ।

কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে ইকবাল হোসেন নামের এক যুবককে। এই ইকবালকে গ্রেপ্তারে গত কয়েক দিন ধরে চলছে জোর অভিযান।

ইকবালের সহযোগী হিসেবে অন্তত চারজন এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মনে করছে, ইকবাল গ্রেপ্তার হলেই এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

দুর্গাপূজায় সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর ভোরে কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের ওই মণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা।

ওই মণ্ডপের পাশাপাশি আক্রান্ত হয় নগরীর আরও বেশ কিছু পূজামণ্ডপ। পরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়।

যেখান থেকে সাম্প্রদায়িক এই সহিংসতার শুরু, সেই নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে কীভাবে উত্তেজনার শুরু এবং মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর পবিত্র কোরআন শরিফ কী করে এলো, সে বিষয়ে মঙ্গলবার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউজবাংলা।

পূজার আয়োজক, এলাকাবাসী, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার আগের রাত আড়াইটা পর্যন্ত মন্দিরে পূজাসংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি ছিল। এরপর বুধবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে দুজন নারী ভক্ত মণ্ডপে এসে হনুমানের মূর্তিতে প্রথম কোরআন শরিফটি দেখতে পান।

রাত আড়াইটা থেকে ভোর সাড়ে ৬টার মধ্যে কোনো একসময়ে স্থানীয় এক ব্যক্তি কোরআন শরিফটি রেখে যান মণ্ডপে। এ সময় হনুমানের হাতের গদাটি সরিয়ে নেন তিনি। গদা হাতে তার চলে যাওয়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে ওই এলাকারই কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরায়।

এ ধরনেরই একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পেয়েছে নিউজবাংলা। এতে দেখা যায়, কোরআন শরিফটি রাখার পর হনুমানের মূর্তির গদা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন প্রধান অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে সময়টি রাত তখন সোয়া ৩টার মতো।

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
কুমিল্লার পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখায় প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য এবং নিজস্ব অনুসন্ধানে নিউজবাংলা নিশ্চিত হয়েছে, গদা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাওয়া ওই ব্যক্তির নাম ইকবাল হোসেন। ৩০ বছর বয়সী ইকবাল কুমিল্লা নগরীর ১৭ নং ওয়ার্ডের দ্বিতীয় মুরাদপুর-লস্করপুকুর এলাকার নূর আহম্মদ আলমের ছেলে। নূর আলম পেশায় মাছ ব্যবসায়ী।

পরিবারও চায় ইকবালের শাস্তি

ইকবালের মা আমেনা বেগম নিউজবাংলাকে জানান, তার তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে ইকবাল সবার বড়।

তিনি জানান, ইকবাল ১৫ বছর বয়স থেকেই নেশা করা শুরু করেন। ১০ বছর আগে তিনি জেলার বরুড়া উপজেলায় বিয়ে করেন। ওই ঘরে তার এক ছেলে রয়েছে। পাঁচ বছর আগে ইকবালের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।

তারপর ইকবাল চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়া বাজার এলাকার কাদৈর গ্রামে আরেকটি বিয়ে করেন। এই সংসারে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

আমেনা বেগম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ইকবাল নেশা করে পরিবারের সদস্যদের ওপর অত্যাচার করত। বিভিন্ন সময় রাস্তাঘাটেও নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াত।’

ইকবাল মাজারে মাজারে থাকতে ভালোবাসতেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সে বিভিন্ন সময় আখাউড়া মাজারে যেত। কুমিল্লার বিভিন্ন মাজারেও তার যাতায়াত ছিল।’

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
ইকবালের জাতীয় পরিচয়পত্র

পঞ্চম শ্রেণি পাস ইকবালের সঙ্গে ১০ বছর আগে বন্ধুদের মারামারি হয়। এ সময় তারা ইকবালকে পেটে ছুরিকাঘাত করেন। তখন ইকবাল অপ্রকৃতিস্থ আচরণ শুরু করেন বলে দাবি করে তার পরিবার। আমেনা বেগম জানান, তিনি স্থানীয় কাউন্সিলরের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন ইকবাল পূজামণ্ডপ থেকে হনুমানের গদা সরিয়ে সেখানে কোরআন শরিফ রেখেছেন। আমেনা বলেন, ‘ইকবাল কারও প্ররোচনায় এমন কাজ করতে পারে। তার বোধবুদ্ধি খুব একটা নেই। ছেলে সত্যিই যদি অন্যায় করে, তাহলে যেন তার শাস্তি হয়।’

ইকবালের ছোট ভাই রায়হান নিউজবাংলাকে জানান, ইকবালকে খুঁজতে পুলিশকে তারাও সহায়তা করছেন।

১৭ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সৈয়দ সোহেল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি ১০ বছর ধরে ইকবালকে চিনি। সে রঙের কাজ করত। মাঝে মাঝে নির্মাণকাজের সহযোগী হিসেবেও কাজ করত। ইকবাল ইয়াবা সেবন করায় প্রায়ই তাকে নিয়ে অনেক দেনদরবার করতে হতো।’

ইকবালের কর্মকাণ্ডে এলাকাবাসীও বিরক্ত বলে জানান তিনি। সোহেল বলেন, ‘আমার দৃঢ়বিশ্বাস ইকবালের মানসিক অসুস্থতাকে কাজে লাগিয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষ কাজটি করেছে।’

কোরআন রাখার পর যেভাবে ছড়ানো হয় উত্তেজনা

তদন্তসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে জানান, মণ্ডপে কোরআন রাখায় যে চক্রটি জড়িত, ইকবাল তাদের একজন। তিনি কোরআন রাখার পর ভোরে আরেক অভিযুক্ত ইকরাম হোসেন (৩০) ঘটনাস্থল থেকে ৯৯৯-এ কল করেন। তারপর ওসি আনওয়ারুল আজিম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি কোরআন শরিফটি উদ্ধারের পাশাপাশি ইকরামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় নিয়ে যান।

নগরীর বজ্রপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন চিনু রানী দাশ। নানুয়ার দিঘির পূর্ব পাড়ের একটি বাসায় তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তিনি মণ্ডপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখতে পান দুই নারী মণ্ডপে কোরআন শরিফ দেখে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন।

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে রাখা হনুমানের মূর্তির গদা সরিয়ে রাখা হয় পবিত্র কোরআন শরিফ। বাঁয়ের ছবিটি মঙ্গলবারের, ডানেরটি বুধবার সকালের

চিনু রানী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ সময় এক ছেলে ছুটে এসে চিৎকার করে বলে, হনুমানের পায়ের কাছে কোরআন, কেউ এখানে থাকবেন না। আর যে কোরআন এখান থেকে সরিয়ে নেবে, তার হাত কেটে ফেলা হবে।’

এ কথা শুনে ভয় পেয়ে যান চিনু। তিনি বলেন, ‘আমি একটু সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখছিলাম। ছেলেটা কাকে যেন ফোন দিয়ে কোরআনের বিষয়টা জানায়। এর কিছুক্ষণ পর সিএনজি দিয়ে একজন লোক আসে। সে এসে কোরআন শরিফটিকে বুকের মধ্যে নেয়।’

সিএনজি অটোরিকশায় আসা ওই ব্যক্তিই হলেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনওয়ারুল আজিম। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি ৯৯৯ থেকে কল পেয়ে একটা সিএনজিতে করে দ্রুত মণ্ডপে আসি।’

পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইকরামও রাতে নেশা করেছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, ওই রাতে ৩ পিস ইয়াবা সেবন করেন। পরে মণ্ডপের পাশে অবস্থান নেন। মণ্ডপে কোরআন রাখেন ইকবাল। আর ইকরামের দায়িত্ব ছিল ভোরে বিষয়টি পুলিশকে জানানোর। সে অনুযায়ী তিনি ৯৯৯-এ ফোন করেন।

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
কুমিল্লার সেই আলোচিত ফেসবুক লাইভ। ডানে লাইভ করা ব্যক্তি ফয়েজ আহমেদ

ওসি আনওয়ারুল আজিম মণ্ডপ থেকে কোরআন উদ্ধারের সময় সেটি ফেসবুকে লাইভ করেন ফয়েজ নামের এক যুবক। সেই লাইভের পরেই উত্তেজিত মানুষ জড়ো হন ঘটনাস্থলে, শুরু হয় সহিংসতা। এই ফয়েজকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে জানান, তাদের ধারণা, দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপ থেকে যে কোরআন শরিফটি উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি আনা হয় পাশের একটি মাজার থেকে।

নানুয়ার দিঘির পাশেই শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারটির অবস্থান, মণ্ডপ থেকে হেঁটে যেতে সময় লাগে ২ থেকে ৩ মিনিট। দারোগাবাড়ী মাজার নামে কুমিল্লাবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি রয়েছে মাজারটির। এর বারান্দায় দর্শনার্থীদের তিলাওয়াতের জন্য রাখা থাকে বেশ কয়েকটি কোরআন শরিফ। রাত-দিন যেকোনো সময় যে কেউ এখানে এসে তিলাওয়াত করতে পারেন।

দারোগাবাড়ী মাজারের মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন এমন তিনজনকে ঘটনার পর থেকে দেখা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একজনের নাম হুমায়ুন কবীর (২৫), আরেকজনের বিষয়ে নিউজবাংলা তথ্য পেলেও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মণ্ডপে কোরআন রাখায় প্রধান সন্দেহভাজন যুবক ইকবাল
কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর চলে ভাঙচুর

দারোগাবাড়ী মাজারের খাদেম আহামুদ্দুন্নাবী মাসুক নিউজবাংলাকে জানান, হুমায়ুন মাজারে এসে নামাজ আদায় করতেন। তার বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার দেওরা এলাকায়। ঘটনার পরদিনই তাকে পুলিশ নিয়ে যায়। এ ছাড়া মাজারে আরও দুই-একজন নামাজ আদায় করতেন। তাদের এখন আর দেখা যাচ্ছে না।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মাজারে নিয়মিত যাওয়া ওই তিন যুবকই মণ্ডপে কোরআন রাখার পরিকল্পনায় জড়িত। তাদের মধ্যে দুজনকে আমরা আটক করেছি। জিজ্ঞাসাবাদে তারা অনেক তথ্য দিয়েছে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজেও ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি।

‘তবে তৃতীয় যুবক ইকবালকে আটক করতে পারলে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। কারণ তিনিই সরাসরি মণ্ডপে কোরআন রেখেছিলেন। তাকে ধরতে আমাদের অভিযান চলছে।’

আরও পড়ুন:
ভাতার কার্ডের জন‍্য টাকা নিয়েছেন ‘চেয়ারম্যানের লোক’
ঘুষ নেয়ার অভিযোগে এএসআই প্রত্যাহার
এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তার ৩ ভাই ৭ দিনের রিমান্ডে
এহসান গ্রুপ যশোরে হাতিয়েছে ‘৩২২ কোটি টাকা’

শেয়ার করুন

হাজীগঞ্জে সহিংসতায় কিশোর গ্রুপ, সংগঠিত মেসেঞ্জারে 

হাজীগঞ্জে সহিংসতায় কিশোর গ্রুপ, সংগঠিত মেসেঞ্জারে 

১৩ অক্টোবর চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌর এলাকায় হাজারখানেক মানুষের মিছিল থেকে হামলা হয় একটি স্থানীয় মন্দিরে। ছবি: নিউজবাংলা

স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৩ অক্টোবর বহিরাগত কিছু কিশোর মিছিল সংগঠিত করে। পরে তাতে যোগ দেয় স্থানীয়দের একটি অংশও। এর আগে ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে ছড়ানো হয় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা। 

কুমিল্লায় একটি পূজা মণ্ডপে কোরআন শরিফ পাওয়ার জের ধরে গত ১৩ অক্টোবর ব্যাপক সহিংসতা হয় চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌর এলাকায়।

সেদিন সন্ধ্যায় হাজারখানেক মানুষের মিছিল থেকে হামলা হয় একটি স্থানীয় মন্দিরে। সেই হামলা প্রতিহত করতে গেলে হামলাকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি চালালে ওইদিনই মারা যান চার জন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত মঙ্গলবার দুপুরে মারা যান আরও একজন।

পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর পৌর এলাকার আরও পাঁচটি মন্দিরে হামলা ও ভাংচুর হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেদিন বহিরাগত কিছু কিশোর মিছিল সংগঠিত করে। পরে তাতে যোগ দেয় স্থানীয়দের একটি অংশও। ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে ছড়ানো হয় উত্তেজনা।

সহিংসতার জন্য হাজীগঞ্জ আওয়ামী লীগে বিভাজনকেও দায়ী করছেন স্থানীয়রা। মন্দিরে হামলার সিসিটিভি ফুটেজে পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাব্বীর উপস্থিতি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে রাব্বীর দাবি, হামলা ঠেকাতে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। মন্দিরের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রশাসনকেও দায়ী করছেন মন্দির সংশ্লিষ্টরা।

হামলা-সহিংসতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে ১৯ জন, তাদের অনেকেই জামায়াত-বিএনপির সমর্থক বলে জানিয়েছে পুলিশ।

যেভাবে ছড়ায় সহিংসতা

হাজীগঞ্জ পৌর এলাকায় উত্তেজনা ও সহিংসতার কারণ জানতে নিবিড় অনুসন্ধান করেছে নিউজবাংলা। এলাকাবাসী, রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসন ও মন্দির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বিভিন্ন তথ্য।

স্থানীয়রা জানান, কুমিল্লায় মণ্ডপে ১৩ অক্টোবর সকালে কোরআন পাওয়ার ঘটনাটি ফেইসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জেও। সন্ধ্যায় এশার নামাজের ঠিক পরপরই পৌর এলাকার হাজীগঞ্জ বাজারের মূল সড়কে ২০ থেকে ২৫ জন কিশোরের একটি মিছিল শুরু হয়। মোবাইল ফোনে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মিছিলটি একবার বাজারের মূল সড়ক ঘুরে দ্বিতীয়বার প্রদক্ষিণের সময় হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের মুসল্লিরাও তাতে যোগ দেন। তখন মিছিলে হাজারখানেক লোকের জমায়েত হয়।

মিছিলটি থেকে সাম্প্রদায়িক বিভিন্ন স্লোগান দেয়া হচ্ছিল। বাজার এলাকাতেই শ্রী শ্রী রাজা লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর আখরা মন্দিরের অবস্থান।

ভিডিওতে দেখা যায়, দ্বিতীয়বার প্রদক্ষিণের সময় মিছিল থেকে হঠাৎ মন্দিরটিতে হামলা চালায় ২০-২৫ জন কিশোর। তারা মন্দিরের ভিতরে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। ভাংচুর করা হয় পূজা উপলক্ষে তৈরি করা মন্দিরের অস্থায়ী গেট। এ সময় মিছিলে যোগ দেয়া মুসল্লিরা হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এরপর মুসল্লিরা এলাকা ত্যাগ করেন।

সহিংসতার কিছু সময় পর পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে এলে হামলাকারীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে গুলি ছোড়ে পুলিশ। সেখানে হতাহতের ঘটনার পর স্থানীয় শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম, জমিদারবাড়ি মন্দির, রামপুর চৌধুরী বাড়ি মন্দির, দশভূজা পূজামণ্ডপ ও মুকুন্দেশ্বর সূত্রধরবাড়ি পূজামণ্ডপে ভাংচুর চালায় হামলাকারীরা।

বাজার এলাকার একাধিক দোকানি নিউজবাংলাকে জানান, তারা হঠাৎ দেখেন ২০-২৫ জন কিশোর একসঙ্গে জড়ো হয়ে মিছিলটি শুরু করে। নামাজের পর সেই মিছিলে বড় মসজিদের মুসল্লিরা যোগ দেন। মিছিল শুরু করা ছেলেগুলোই পরে মন্দিরে হামলা শুরু করে। মিছিলে থাকা মুসল্লিরা বাধা দিলে তারাও ইটপাটকেলের মুখে পড়েন।

কয়েক জন প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে জানান, হামলা শুরুর ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। হামলাকারীরা তাদের লক্ষ্য করে প্রচুর ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। কিছুক্ষণ পর গুলি চালায় পুলিশ। হামলাকারীরা এতে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও পরে আরও পাঁচটি মন্দির আক্রান্ত হয়। স্থানীয়দের দাবি, পুলিশ মিছিলটি বাজারে ঢোকার আগেই থামিয়ে দিলে এমন ঘটনা ঘটত না।

মেসেঞ্জার গ্রুপে সংগঠিত কিশোর গ্রুপ

হাজীগঞ্জ পৌর এলাকায় গত ১৩ অক্টোবর মিছিলে নেতৃত্ব দেয়া কিশোর ও হামলার নেতৃত্ব দেয়া কিশোরদের পরিচয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিতে পারেননি স্থানীয়রা। তবে তাদের দাবি, ওই দলটি পৌর এলাকার পাশের কয়েকটি ইউনিয়ন ও গ্রাম থেকে এসেছিল।

অনুসন্ধানে জানা যায়, স্থানীয় রায়চোঁ, রান্ধুনীমুড়া গ্রাম থেকে সংগঠিত হয়ে মিছিল ও হামলা করার উদ্দেশ্যে পৌরসভায় আসে কিশোর গ্রুপটি। রায়চোঁ গ্রামের কয়েক জন বাসিন্দা নিউজবাংলাকে জানান, সেদিন মাগরিবের নামাজের সময় গ্রামের মসজিদে কিছু কিশোর একত্রিত হয়। নামাজের পর তারা একসঙ্গে গ্রাম থেকে বেরিয়ে যায়। সেসময় তারা নিজেদের মধ্যে হিন্দুদের ‘সমুচিত জবাব’ দেয়ার কথা আলোচনা করছিল।

জানা গেছে, রায়চোঁ গ্রাম থেকে যাওয়া দলটি রামগঞ্জ-হাজীগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে উঠলে তাদের সঙ্গে পাশের রান্ধুনীমুড়ার গ্রামের কিছু কিশোরও যোগ দেয়। ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তারা সংগঠিত হয়।

সহিংসতার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় রান্ধুনীমুড়া এলাকার ১৪ বছরের কিশোর ইয়াসিন হোসেন হৃদয়। স্থানীয় একটি পলিটেকনিক স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিল সে। হৃদয়ের বাবা ফজলুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হৃদয় বলছিল মিছিল হবে, সে ফেসবুকে দেখেছে। সঙ্গে এলাকার আরও ছেলেও যাবে। এরপর হৃদয় বাসা থেকে বের হয়ে যায়। তাকে ঘরে দেখতে না পেয়ে আমি হাজীগঞ্জ বাজারের দিকে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি গণ্ডগোল। পরে হাসপাতালে গিয়ে ছেলের লাশ পাই।’

রায়চোঁ গ্রামের চাঁদপুর সরকারি পলিটেকনিকের এসএসসি পরীক্ষার্থী আল আমিনও গুলিতে মারা গেছে। তার বাবা রুহুল আমিন জানান, অ্যাসাইমেন্টের কাগজ আনতে বাজারে গিয়েছিল আল আমিন। মাগরিবের পর সে বাসা থেকে বের হয়। সংঘর্ষের কিছুক্ষণ আগেও বোনের সঙ্গে তার মোবাইলে কথা হয়েছে। এরপর খবর আসে পুলিশের গুলিতে সে মারা গেছে।

আল আমিনের পরিবারের দাবি, রাস্তা পার হতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয় সে। তবে সংঘর্ষের সময়কার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দের পর হামলাকারীদের মাঝখানে লুটিয়ে পড়ে এই কিশোর।

নিহত আরেকজনও ১৬ বছরের মো. শামীম। তার বাড়িও একই এলাকায়। শামীম হাজীগঞ্জ বাজারে কলা বিক্রি করত। তার বাবা মো. আব্বাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সেদিন দুই বড় ভাইয়ের সঙ্গে শামীম বাজারে কলা বিক্রি করছিল। সংঘর্ষের পর দুই ভাই ফিরে এলেও শামীম ফেরেনি। পরদিন কুমিল্লা সদর হাসপাতালে তার মরদেহ পাওয়া যায়।’

নিহত আরেক জন ২৮ বছরের নির্মাণ শ্রমিক বাবলু। বাজারের একটি নির্মাণাধীন আটতলা ভবনের উপরে কাজ করার সময়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। বাবলুর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। এছাড়া পিকআপ চালক সাগর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কুমিল্লা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মঙ্গলবার সকালে তিনি মারা যান।

হাজীগঞ্জের ইতিহাসে ন্যাক্কারজনক হামলা

শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম মন্দিরের পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিহার রঞ্জন হালদার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হাজীগঞ্জের ইতিহাসে এমন ন্যাক্কারজনক হামলা এই প্রথম। আমরা এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না।’

হামলার পিছনের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারব না। পুরো ঘটনার অনেক সিসিটিভি ফুটেজ আছে, সেগুলো দেখলেই আপনারা বুঝে যাবেন। আমরা শুধু এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’

শ্রী শ্রী লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর আখড়া মন্দিরের পরিচালনা কমিটি ও হাজীগঞ্জ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সত্য ব্রত ভদ্র মিঠুন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখানে আমরা জন্মের পর থেকে দেখে আসছি রাজনৈতিক বিভেদ থাকলেও আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতা-কর্মীরা সব সময় আমাদের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন। তারা আমাদের পূজায় আসেন, আমরা তাদের অনুষ্ঠানে যেতাম। তাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল সারা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলেও হাজীগঞ্জে এমন কিছু হবে না।’

হাজীগঞ্জে আওয়ামী লীগে বিভক্তির কারণে সহিংসতার সময়ে দলটির নেতাকর্মীরা দৃঢ় ভূমিকা নিতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। মন্দির সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হামলার সময় আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল কোনো নেতার সাড়া পাওয়া যায়নি।

হাজীগঞ্জ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সত্য ব্রত ভদ্র মিঠুন বলেন, ‘হাজীগঞ্জের রাজনীতি বলতে গেলে এখন অভিভাবকহীন। সুবিধাভোগী একটি তৃতীয় পক্ষ এর সুযোগ নিয়েছে। ওই তৃতীয় পক্ষে আওয়ামী লীগ- বিএনপি-জামায়াতের সমর্থক রয়েছে। তারা কুমিল্লার ঘটনাকে পুঁজি করে পরিকল্পিতভাবে হামলা করেছে।’

মন্দিরে হামলার সময়কার একটি সিসিটিভি ফুটেজে পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাব্বীর উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় তানভীর আহমেদ শাওন নামে রাব্বীর একজন সমর্থক আহত হন বলেও দাবি করেছেন তার প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতারা।

এ অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মেহেদী হাসান রাব্বী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ সবই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার। সব ভিত্তিহীন অভিযোগ। আমি বরং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সব মন্দিরে হামলাকারীদের প্রতিহত করেছি। উপজেলা আওয়ামী লীগের কেউ এ সময় মাঠে ছিল না।’

তানভীর আহমেদ শাওনের বিষয়ে জানতে চাইলে রাব্বী বলেন, ‘ও শুধুই আমাদের একজন সমর্থক। কমিটিতে ওর কোনো পদ নেই। সেদিন আমার মতো শাওনও পুলিশের পাশাপাশি হামলাকারীদের প্রতিহত করতে গিয়ে ইটের আঘাতে সামান্য আহত হয়। সে এখন ভালো আছে, বাসায় আছে।’

রাব্বি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ‘শাওন যদি হামলায় অংশ নিত তাহলে পুলিশের মামলায় তার নাম থাকত। বরং পুলিশের মামলায় উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এবায়দুর রহমান খোকনের ভাইদের নাম রয়েছে।’

হামলাকারী ঠেকাতে গুলি চালানোর প্রয়োজন কেন পড়ল, জানতে চাইলে চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘তখন গুলি না চালালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত, হিন্দু সম্প্রদায় ও হাজীগঞ্জ বাজারের সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতেই গুলি চালাতে পুলিশ বাধ্য হয়েছে।’

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার ১৯ জনের বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, ‘এদের মধ্যে সাত জন ছয়টি মামলার এজাহারনামীয় আসামি। বাকিদের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

গ্রেপ্তারকৃতদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত জামায়াত-বিএনপির কয়েকজন সমর্থক পাওয়া গেছে।’

এ বিষয়ে জানতে হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তির বিএনপির সমন্বয়ক ও চাঁদপুর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মমিনুল হককে টেলিফোন করা হলে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চান না বলে সংযোগ কেটে দেন।

আরও পড়ুন:
ভাতার কার্ডের জন‍্য টাকা নিয়েছেন ‘চেয়ারম্যানের লোক’
ঘুষ নেয়ার অভিযোগে এএসআই প্রত্যাহার
এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তার ৩ ভাই ৭ দিনের রিমান্ডে
এহসান গ্রুপ যশোরে হাতিয়েছে ‘৩২২ কোটি টাকা’

শেয়ার করুন

কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন রাখল কারা

কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন রাখল কারা

কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর চলে ভাঙচুর। ফাইল ছবি

নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে কীভাবে উত্তেজনার শুরু এবং মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর পবিত্র কোরআন শরিফ কী করে এলো, সে বিষয়ে টানা অনুসন্ধান চালিয়েছে নিউজবাংলা। পূজার আয়োজক, এলাকাবাসী, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

দুর্গাপূজায় সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যে গত বুধবার ভোরে কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা।

নানুয়ার দিঘির পাড়ের ওই মণ্ডপে চলে ব্যাপক ভাঙচুর, আক্রান্ত হয় নগরীর আরও বেশকিছু পূজামণ্ডপ। পরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়।

যেখান থেকে সাম্প্রদায়িক এই সহিংসতার শুরু সেই নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে কীভাবে উত্তেজনার শুরু এবং মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর পবিত্র কোরআন শরিফ কী করে এলো, সে বিষয়ে টানা অনুসন্ধান চালিয়েছে নিউজবাংলা। পূজার আয়োজক, এলাকাবাসী, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা সৃষ্টির পরিকল্পনায় সরাসরি যুক্ত অন্তত তিনজনকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মণ্ডপে যিনি ভোররাতের দিকে কোরআন শরিফ রেখেছেন, তাকেও চিহ্নিত করা গেছে। মণ্ডপটিতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকলেও আশপাশের কয়েকটি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে মূল অভিযুক্তের ছবি। যেকোনো সময়ে তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে আশাবাদী পুলিশ কর্মকর্তারা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালও মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কুমিল্লায় সহিংসতার মূল অভিযুক্ত পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। শিগগিরই তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কুমিল্লার ঘটনা যে ঘটিয়েছে সে বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে, স্থান পরিবর্তন করছে। আমরা তাকে ধরব। কেন এই কাজ করেছে, তার জবাব দিতে হবে। আপনাদের জানাব।’

আরও পড়ুন: কুমিল্লার মূল অভিযুক্ত পালিয়ে বেড়াচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপটিতে বুধবার ভোরে কোরআন শরিফ পাওয়ার আগের কয়েক ঘণ্টায় কী ঘটেছিল, তার একটি সময়ক্রম (টাইমলাইন) তৈরি করেছে নিউজবাংলা। মন্দিরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, এলাকাবাসী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে এবং বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আগের রাত আড়াইটা পর্যন্ত মন্দিরে পূজাসংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি ছিল। এরপর বুধবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে দুজন নারী ভক্ত মণ্ডপে এসে হনুমানের মূর্তিতে প্রথম কোরআন শরিফটি দেখতে পান।

কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন রাখল কারা
নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে রাখা হনুমানের মূর্তির গদা সরিয়ে রাখা হয় পবিত্র কোরআন শরিফ। বাঁয়ের ছবিটি মঙ্গলবারের, ডানেরটি বুধবার সকালের

রাত আড়াইটা থেকে ভোর সাড়ে ৬টার মধ্যে স্থানীয় এক ব্যক্তি কোরআন শরিফটি রেখে যান মণ্ডপে। এ সময় হনুমানের হাতের গদাটি সরিয়ে নেন তিনি। গদা হাতে তার চলে যাওয়ার দৃশ্যও ধরা পড়েছে ওই এলাকারই কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরায়।

আরও পড়ুন: কুমিল্লার ঘটনায় কয়েকজন চিহ্নিত: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আগের রাতে কখন কী হয়েছিল মণ্ডপে

বেশ কয়েক বছর ধরে নানুয়ার দিঘির পাড়ের এই অস্থায়ী পূজামণ্ডপে পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেন শিমুল গোস্বামী ও তার ভগ্নিপতি রাজিব চক্রবর্তী। রাত ১০টায় পূজা শেষে বাসায় ফেরেন শিমুল ও রাজিব। তখনও ভক্ত-দর্শনার্থীর ভিড় ছিল। শিমুল গোস্বামী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বাসায় ফিরে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে যাই। কারণ সকালেই আবার পূজা শুরু করতে হয়।’

পরদিন কখন মণ্ডপে গিয়েছিলেন, জানতে চাইলে শিমুল নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘তিথি অনুসারে বুধবার সকাল ৮টায় পূজা শুরু হওয়ার কথা ছিল। সে অনুযায়ী আমি ও আমার ভগ্নিপতি রাজিব চক্রবর্তী সকালে ঘুম থেকে উঠে মণ্ডপে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তখনই জানতে পারি মণ্ডপে গন্ডগোল চলছে। তাই আর বাসা থেকে আর বের হইনি।’

আরও পড়ুন: কুমিল্লার ঘটনায় অপশক্তি, কাউকে ছাড় নয়: কাদের

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু পোস্টে দাবি করা হয়েছে, মণ্ডপে কোরআন শরিফ পাওয়ার সময় সেখানে পুরোহিত উপস্থিত ছিলেন। তারা কোরআন সরাতে অস্বীকৃতি জানান। তবে এ অভিযোগ নাকচ করে শিমুল গোস্বামী বলেন, তারা হাঙ্গামার খবর পেয়ে সেদিন সকালে মণ্ডপেই যাননি। এলাকাবাসী ও মণ্ডপসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেও এর সত্যতা নিশ্চিত হয়েছে নিউজবাংলা।

নানুয়া দিঘির পাড়ে এই পূজা উদযাপন হয় দর্পণ সংঘের ব্যানারে। পূজা কমিটির সভাপতি সুবোধ রায় কর্মকার নিউজবাংলাকে জানান, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টায় তিনি নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে মণ্ডপে আসেন। কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে নগরীর কান্দিরপাড়ে যান। রাত সাড়ে ১২টায় আড্ডা শেষে বাসায় ফেরার পথে সুবোধ আবার মণ্ডপের পাশে দাঁড়ান। তখন ভক্ত-দর্শনার্থী বেশ কম ছিল। এরপর বাসায় এসে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে যান। সকালে মানুষজনের চিৎকার শুনে উঠে গিয়ে দেখেন মণ্ডপজুড়ে মানুষের ভিড়।

আরও পড়ুন: কুমিল্লার ঘটনার তদন্ত হচ্ছে, বিশৃঙ্খলা না করার আহ্বান

পূজার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন দিঘির পাড়ের বাসিন্দা তরুণ কান্তি মোদক। স্থানীয়রা তাকে মিথুন নামে চেনেন। মিথুন নিউজবাংলাকে জানান, রাত আড়াইটা পর্যন্ত তিনি মণ্ডপে ছিলেন। তখন পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। এরপর তিনি নৈশপ্রহরী শাহিনের কাছে মণ্ডপের নিরাপত্তার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বাসায় ফেরেন।

মিথুন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রাত আড়াইটা থেকে ভোর পর্যন্ত কী হইছে, তা ভালো বলতে পারবে নৈশপ্রহরী শাহিন। সে এখন পুলিশের হেফাজতে আছে।’

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মঙ্গলবার রাত আড়াইটা থেকে পরের চার ঘণ্টায় মণ্ডপ ছিল জনশূন্য। সে সময় এর পাহারায় ছিলেন মো. শাহিন মিয়া।

নৈশপ্রহরী শাহিনকে নিয়োগ দেয়া হয় আগের বৃহস্পতিবার থেকে। মণ্ডপে তখন থেকেই প্রতিমা ছিল।

শাহিন অ্যালার্ট সিকিউরিটিজ অ্যান্ড অ্যাটেনডেন্ট সার্ভিসেস নামের নিরাপত্তাসেবা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ৪৫ বছর বয়স্ক শাহিনের বাসা নগরীর সংরাইশ এলাকায়।

অ্যালার্ট সিকিউরিটিজ অ্যান্ড অ্যাটেনডেন্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপক শাহাজাদা ইকরাম রিপন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বছর দুয়েক আগে শাহিন আমাদের কোম্পানিতে চাকরি নেয়। পরে আবার চাকরি ছেড়ে দেয়। তবে মাস দেড়েক আগে সে আবার আমাদের কোম্পানিতে যোগ দেয়। মাঝে সে কোথায় ছিল আমরা জানি না।’

শাহিন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিএনপির মিছিল মিটিংয়ে দেখা যেত তাকে। এর বেশি কিছু আমি জানি না।’

কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন রাখল কারা
কুমিল্লা নগরীর সেই মণ্ডপ পরিদর্শনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ছবি: নিউজবাংলা

পূজামণ্ডপের পাশেই পরিবার নিয়ে থাকেন মনিরুজ্জামান। তিনি জানান, রাত প্রায় ৩টার দিকে হঠাৎ দমকা বাতাস বইতে থাকে। এ সময় বিদ্যুৎ চলে যায়। এর পরেই নানুয়ার দিঘির পাড় এলাকা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। পরে সকালে তিনি মানুষের শোরগোল শুনতে পান।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হয়েছে, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পরপরই সেখানে একটি পুলিশের গাড়ি গিয়েছিল। পুলিশ কয়েক যুবককে ঘোরাঘুরি করতে দেখে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়। গাড়িটি এর পরপরই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনওয়ারুল আজিম নিউজবাংলাকে জানান, তাদের একটি টহল দল মণ্ডপ এলাকায় গিয়েছিল, তবে সেটি রাত ২টার দিকে। নিয়মিত টহলের অংশ হিসেবেই দলটি সেখানে যায়। তবে তখন সন্দেহজনক কিছু দেখা যায়নি।

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, বুধবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে নানুয়ার দিঘির পাড়ে পূজা দিতে আসা দুজন নারী ভক্ত প্রথম কোরআন শরিফটি দেখতে পান। এ নিয়ে তারা বিস্ময় প্রকাশের সময় ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন ইকরাম হোসেন (৩০) নামে একজন।

ইকরাম নগরীর কাশারিপট্টির রিকশাচালক বিল্লাল হোসেনের ছেলে। ইকরাম বিবাহিত হলেও স্ত্রীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। মাদকাসক্ত হওয়ায় তিনি পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন। ইকরাম পাইপ মিস্ত্রির কাজ করেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে জানান, মণ্ডপে কোরআন রাখায় যে চক্রটি জড়িত, ইকরাম তাদের একজন। তিনিই বুধবার সকালে ঘটনাস্থল থেকে ৯৯৯-এ কল করেন। তারপর ওসি আনওয়ারুল আজিম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি কোরআন শরিফটি উদ্ধারের পাশাপাশি ইকরামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় নিয়ে যান।

নগরীর বজ্রপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন চিনু রানী দাশ। নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূর্ব পাড়ের একটি বাসায় তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তিনি মণ্ডপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখতে পান দুই নারী মণ্ডপে কোরআন শরিফ দেখে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন।

চিনু রানী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ সময় এক ছেলে ছুটে এসে চিৎকার করে বলে, হনুমানের পায়ের কাছে কোরআন, কেউ এখানে থাকবেন না। আর যে কোরআন এখান থেকে সরিয়ে নেবে তার হাত কেটে ফেলা হবে।’

এ কথা শুনে ভয় পেয়ে যান চিনু। তিনি বলেন, ‘আমি একটু সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখছিলাম। ছেলেটা কাকে যেন ফোন দিয়ে কোরআনের বিষয়টা জানায়। এর কিছুক্ষণ পর সিএনজি দিয়ে একজন লোক আসে। সে এসে কোরআন শরিফটিকে বুকের মধ্যে নেয়।’

সিএনজি অটোরিকশায় আসা ওই ব্যক্তিই হলেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনওয়ারুল আজিম। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি ৯৯৯ থেকে কল পেয়ে একটা সিএনজিতে করে দ্রুত মণ্ডপে আসি।’

পুলিশের গাড়ির পরিবর্তে অটোরিকশা বেছে নেয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছি। তখন থানার গাড়ির ড্রাইভার ছিলেন না। তাই দেরি না করেই সিএনজি নিয়ে ঘটনাস্থলে যাই। পবিত্র কোরআন শরিফটি আমার হেফাজতে নেই।’

পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইকরাম রাতে নেশা করেছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন ওই রাতে ৩ পিস ইয়াবা সেবন করেন। পরে মণ্ডপের পাশে অবস্থান নেন। মণ্ডপে কোরআন রাখেন একজন। আর ইকরামের দায়িত্ব ছিল, ভোরে বিষয়টি পুলিশকে জানানোর। সে অনুযায়ী তিনি ৯৯৯-এ ফোন করেন।

ওসি আনওয়ারুল আজিম মণ্ডপ থেকে কোরআন উদ্ধারের সময় সেটি ফেসবুকে লাইভ করেন ফয়েজ নামের এক যুবক। সেই লাইভের পরেই উত্তেজিত মানুষ জড়ো হন ঘটনাস্থলে, শুরু হয় সহিংসতা। এই ফয়েজকেও আটক করেছে পুলিশ।

আরও পড়ুন: কুমিল্লায় ফেসবুক লাইভে উত্তেজনা ছড়ানো ফয়েজ আটক

স্পর্শকাতর ইস্যুতে ফয়েজ ফেসবুক লাইভের সুযোগ কীভাবে পেলেন, জানতে চাইলে ওসি আনওয়ারুল আজিম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি তখন মোবাইল ফোনে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাতে ব্যস্ত ছিলাম। এ সময় ৩০-৪০ জন ঘটনাস্থলে ছিল, তাই কে লাইভ করছে খেয়াল করতে পারিনি।’

কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন রাখল কারা
কুমিল্লার সেই আলোচিত ফেসবুক লাইভ। ডানে লাইভ করা ব্যক্তি ফয়েজ আহমেদ। ছবি: নিউজবাংলা

লাইভে আপনি নিজেকে কোতোয়ালির ওসি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন- এমন তথ্য তুলে ধরলে তিনি বলেন, ‘তখন আমি বুঝতে পারিনি লাইভ হচ্ছে।’

আরও পড়ুন: ফেসবুকে লাইভ করা সেই ফয়েজ কে?

মাজারের কোরআন শরিফ মণ্ডপে?

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে জানান, তাদের ধারণা দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপ থেকে যে কোরআন শরিফটি উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি আনা হয় পাশের একটি মাজার থেকে।

নানুয়া দিঘির পাশেই শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারটির অবস্থান, মণ্ডপ থেকে হেঁটে যেতে সময় লাগে ২ থেকে ৩ মিনিট। দারোগাবাড়ী মাজার নামে কুমিল্লাবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি রয়েছে মাজারটির। এর বারান্দায় দর্শনার্থীদের তিলাওয়াতের জন্য রাখা থাকে বেশ কয়েকটি কোরআন শরিফ। রাত-দিন যেকোনো সময় যে কেউ এখানে এসে তিলাওয়াত করতে পারেন।

আরও পড়ুন:‘সরকারকে বিপদগ্রস্ত করতে পূজামণ্ডপে কোরআন রাখা হয়েছে’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওই কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, মণ্ডপে রাখার জন্য এই মাজার থেকেই নিয়ে যাওয়া হয় একটি কোরআন শরিফ।

মণ্ডপে কোরআন রাখা যুবক কোথায়?

দারোগাবাড়ী মাজারের মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন এমন তিনজনকে ঘটনার পর থেকে দেখা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একজনের নাম হুমায়ুন কবীর (২৫), আরেকজনের বিষয়ে নিউজবাংলা তথ্য পেলেও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দারোগাবাড়ী মাজারের খাদেম আহামুদ্দুন্নাবী মাসুক নিউজবাংলাকে জানান, হুমায়ুন মাজারে এসে নামাজ আদায় করতেন। তার বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার দেওরা এলাকায়। ঘটনার পরদিনই তাকে পুলিশ নিয়ে যায়। এ ছাড়া মাজারে আরও দুই-একজন নামাজ আদায় করতেন। তাদের এখন আর দেখা যাচ্ছে না।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মাজারে নিয়মিত যাওয়া ওই তিন যুবকই মণ্ডপে কোরআন রাখার পরিকল্পনায় জড়িত। তাদের মধ্যে দুজনকে আমরা আটক করেছি। জিজ্ঞাসাবাদে তারা অনেক তথ্য দিয়েছে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজেও ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি।

‘তবে তৃতীয় যুবককে আটক করতে পারলে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। কারণ তিনিই সরাসরি মণ্ডপে কোরআন রেখেছিলেন। তাকে ধরতে আমাদের অভিযান চলছে।’

কেন এমন পরিকল্পনা, জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, পূজার বিষয়টি ওই চক্রটি পছন্দ করছিল না। সে জন্যই পরিকল্পনাটি করা হয়। তবে এর পেছনে আরও বড় কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেটি তদন্ত শেষে বলা যাবে।’

আরও পড়ুন:
ভাতার কার্ডের জন‍্য টাকা নিয়েছেন ‘চেয়ারম্যানের লোক’
ঘুষ নেয়ার অভিযোগে এএসআই প্রত্যাহার
এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তার ৩ ভাই ৭ দিনের রিমান্ডে
এহসান গ্রুপ যশোরে হাতিয়েছে ‘৩২২ কোটি টাকা’

শেয়ার করুন

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ১২টি মণ্ডপে চলে হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ। ছবি: নিউজবাংলা

বিজয়া দশমীর দিন বিকেলে প্রতিমা বিসর্জনের কথা থাকলেও নোয়াখালীর পুলিশের পক্ষ থেকে বেলা ১১টার মধ্যে বিসর্জন শেষ করতে বলা হয়। শুক্রবার জুমার নামাজের পর সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই এ অনুরোধ। তবে সবগুলো অস্থায়ী মণ্ডপের প্রতিমা বেলা ১১টার মধ্যে বিসর্জন দেয়া হলেও সন্ধ্যায় আক্রান্ত হয় চৌমুহনীর ১১টি মন্দির।

কুমিল্লা, চাঁদপুরের পর বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটে নোয়াখালীতে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছয়ানী ইউনিয়নে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এবং শুক্রবার দুপুরে একই উপজেলার চৌমুহনী পৌর এলাকায় ১১টি পূজামণ্ডপে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।

হামলায় প্রাণ হারান প্রান্ত চন্দ্র দাশ নামে এক যুবক, আতঙ্কে হৃদরোগে যতন সাহা নামে আরেকজনের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে যতনের পরিবারের অভিযোগ, তিনিও হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। এ সময় লুটপাট করা হয় মন্দিরের আসবাব, স্বর্ণালংকার, ভাঙচুর করা হয় প্রতিমা।

হামলার শিকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অভিযোগ, প্রশাসনের অনুরোধে বিজয়া দশমীর দিন সকালেই অস্থায়ী সব মণ্ডপের দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়েছিল। এরপরেও হামলা হয় সন্ধ্যায়। এই সহিংসতা ঠেকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ।

হামলার ভয়াবহতা এখনও দৃশ্যমান

বেগমগঞ্জে সহিংসতা চলা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ১২টি মণ্ডপেই ভয়াবহ হামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রথম হামলা চালানো হয় উপজেলার ছয়ানী বাজার এলাকার শ্রীশ্রী সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরে। পুরো মন্দিরে অক্ষত বলে কিছুই নেই। মাটিতে পড়ে আছে গুঁড়িয়ে দেয়া প্রতিমা।

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন নিউজবাংলাকে জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সবাই ব্যস্ত ছিলেন দেবীর আরাধনায়। মাগরিবের নামাজের পর হঠাৎ করে শুরু হয় হামলা। শতাধিক মানুষের একটি মিছিল থেকে রাস্তার পাশে হিন্দুদের বাড়িতে প্রথম হামলা হয়। হামলাকারীরা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে লুটপাট চালায়। এরপর হামলা হয় মণ্ডপে।

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রথমেই হামলা হয় স্থানীয় শীল পরিবারের বাড়িতে। ইট-পাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ৫০ হাজার টাকা ও পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার লুট হওয়ার অভিযোগ করেছেন ওই পরিবারের সদস্যরা। ভাঙচুর করা হয়েছে ঘরের আসবাব ও প্রতিমা। এ সময় গুরুতর আহত সুমন চন্দ্র শীল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

পরিবারের প্রবীণ সদস্য নিমাই চন্দ্র শীল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা কল্পনাও কইরতে পারি নাই এমন হামলা হইব। মণ্ডপে মাত্র দুইজন পুলিশ আছিলো। হেতারা হামলা দেখি দৌড়াই পলাই গেছে। আমার পোলারে পিডি দিয়া পুরা শরীর ফাডাই ফালাইছে। হেতে অহন হাসপাতালো আছে। ঘরের প্রতিমাও ভাঙ্গি শেষ করি হালাইছে।’

কারা হামলা করেছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বেগ্গুইন ১৮-১৯ বছরিয়া পোলাহাইন, দুই একটার মাথায় টুপি ও গায়ে পাইঞ্জাবি আছিলো। হেতেরা কে আমরা চিনিনো। শুধু আংগর ধর্মরে লই গালাগালি কইরতে কইরতে ভাঙচুর কইচ্চে।’

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের পর হামলা হয় চৌমুহনী পৌর এলাকায় ১১টি মণ্ডপে। বাদ যায়নি নোয়াখালীর প্রধান ইসকন মন্দিরও। ওই হামলার পর শনিবার সকালে ইসকন মন্দিরের পুকুরেই পাওয়া যায় প্রান্ত চন্দ্র দাস নামে এক ভক্তের মরদেহ। মন্দিরের আর তিনজন ভক্তও গুরুতর আহত হয়েছেন।

মন্দিরের ফটক দিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়ে ধ্বংসযজ্ঞ। অফিসকক্ষ, মন্দিরের বিপণিবিতান, বেকারি, খাবার হল, ভক্তদের আশ্রম, উপাসনালয় সবখানেই হামলার চিহ্ন। আগুন দেয়া হয়েছে ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল প্রভুপাদের ভাস্কর্যে। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে দুটি রথ ও ভক্তদের মোটরসাইকেল।

ভক্তরা দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় হামলা হয়। ঘটনার তিন দিন পরও ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খাবারের পাত্র দেখা গেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, মন্দিরের উঠানে সহিংসতার শিকার হন এক ভক্ত। প্রথমে তার চুল কেটে দেয়া হয়, পরে পিটিয়ে পা ভেঙে দেয়া এবং মাথা ফাটিয়ে দেয়া হয়। মন্দিরের উঠানে দেখা গেছে রক্তের দাগ, পাশেই পড়ে ছিল কেটে ফেলা চুলের টিকি।

মন্দিরের অধ্যক্ষ রসপ্রিয় দাস নিউজবাংলাকে আক্ষেপভরা কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা কোনো রাজনীতিতে নেই, আশপাশের সব ধর্মের ভাইদের নিয়ে মিলেমিশে থাকি, কারও সঙ্গে কোনো বিভেদ নেই। আমরা কোন দোষে এমন নৃশংস হামলার শিকার হলাম? আমাদের একটাই দাবি, প্রশাসন সুষ্ঠু তদন্ত করে এর বিচার করুক।’

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

ইসকন মন্দিরের আশপাশের আরও ১০টি মন্দির ও মণ্ডপের চিত্রও একই রকম। ভাঙচুর-লুটপাট, অগ্নিসংযোগ চলেছে চৌমুহনীর রাধামাধব জিউর মন্দির, শ্রীশ্রী লোকনাথ মন্দির, শ্রীশ্রী শিব মন্দির, রাম ঠাকুর সেবাশ্রম মন্দির, শ্রীশ্রী রক্ষাকালী মন্দির, চৌমুহনী দুর্গা মন্দির, চৌমুহনী ত্রিশূল মন্দির, চৌরাস্তা মহাশ্মশান মন্দির, নব দুর্গা মন্দির ও মহামায়া মন্দিরে।

সহিংসতা পরিকল্পিত

বেগমগঞ্জে মন্দিরে হামলার পাশাপাশি চলেছে লুটপাট। প্রতিটি জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুরের সময় লুট করা হয়েছে নগদ অর্থ ও প্রতিমা সাজানোর অলংকার। সব মন্দিরেই লোহার সিন্দুক ভাঙা দেখা গেছে।

মোবাইল ফোনে ধারণ করা বেশকিছু ভিডিওতে দেখা যায়, চৌমুহনী কলেজ রোড ধরে হাজারো মানুষ মিছিল নিয়ে মন্দিরগুলোর দিকে ছুটে যাচ্ছে। মিছিলে পাঞ্জাবি পরিহিতরা নেতৃত্ব দিলেও হামলা-লুটপাটে মূলত অংশ নিয়েছে শার্ট-প্যান্ট পরা কিশোর-যুবকেরা।

নোয়াখালী হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক বিনয় কিশোর রায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই হামলার পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই করা হয়েছে। কুমিল্লার ঘটনাকে পুঁজি করে আমাদের এখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতেই বিএনপি-জামায়াত-শিবির পরিকল্পনা করে হামলা করেছে।

‘তবে জামায়াত-বিএনপি-শিবিরের মাঝে আরও একটি পক্ষ ঢুকে গিয়েছিল লুটপাট করার জন্য। তারা শুধু টাকা আর স্বর্ণ চুরি করতেই হামলাকারীদের সঙ্গে মিশে গেছে। তারা হাতুড়ি, শাবল নিয়ে এসেছিল, যা দিয়ে বড় বড় লোহার সিন্দুক ভেঙেছে।’

নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন শাহীনও দাবি করছেন, এই সহিংসতা ‘জামায়াত-শিবিরের কাজ’।

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

এই দাবির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর এই বেগমগঞ্জের রাজগঞ্জে তাকে চাঁদে দেখার গুজব ছড়িয়ে একই কায়দায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর তাণ্ডব চালানো হয়েছিল। তাছাড়া এবারের হামলার অসংখ্য ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে বিএনপি-জামায়াতের চিহ্নিত কয়েকজন কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।’

বেগমগঞ্জে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় মোট ১৮টি মামলায় হয়েছে। এসব মামলার এজাহারনামীয় আসামি ২৮৫ জন, আর অজ্ঞাতনামা আসামি প্রায় পাঁচ হাজার। নোয়াখালীর পুলিশ সুপার (এসপি) শহীদুল ইসলাম সোমবার দুপুরে নিউজবাংলাকে জানান, এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৯০ জনকে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি-জামায়াত কর্মীর সংখ্যা কত সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি পুলিশ। এ বিষয়ে বেগমগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুজ্জামান সিকদার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আসামিদের মধ্যে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছে। তদন্তাধীন বিষয়ে এ নিয়ে বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই।’

বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে’ তাদের এবং জামায়াতকে এই হামলার সঙ্গে জড়ানো হচ্ছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এগুলো স্থানীয় আওয়ামী লীগের অপরাজনীতি ও কোন্দলের ফল। স্থানীয় মেয়র ও এমপির মাঝে দলীয় কোন্দল আছে। তাদের দুই পক্ষের ঝামেলার জন্য এমনটা হয়েছে। এখানে বিএনপি-জামায়াতের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

‘তাছাড়া দেশে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা ও দেশজুড়ে ভোগান্তি থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে আওয়ামী লীগই এই হামলা চালিয়েছে। দেশে কিছু হলেই তো সব দায় বিএনপির ওপর চাপিয়ে দেয় সরকার। তারা তো শুধু সুযোগ খোঁজে কখন বিএনপির নেতা-কর্মীদের মামলায় জড়িয়ে গ্রেপ্তার করা যায়। এখন এই ইস্যু তৈরি করে আমাদের কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে।’

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা ব্যর্থ

বেগমগঞ্জের ছয়ানী ইউনিয়নে বৃহস্পতিবার মন্দির ও হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলার পরপরই সতর্ক অবস্থান নেয়ার দাবি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। পরদিন শুক্রবার বিজয়া দশমীতে বিকেলে প্রতিমা বিসর্জনের কথা থাকলেও নোয়াখালীর পুলিশের পক্ষ থেকে শুক্রবার বেলা ১১টার মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন শেষ করার অনুরোধ জানায় প্রতিটি মণ্ডপ কর্তৃপক্ষকে।

শুক্রবার জুমার নামাজের পর সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই এ অনুরোধ করা হয়। সে অনুযায়ী, সব অস্থায়ী মণ্ডপের প্রতিমা শুক্রবার বেলা ১১টার মধ্যেই বিসর্জন হয়ে যায়। এই সময়ের পর যেসব স্থায়ী মণ্ডপ ও মন্দিরে প্রতিমা ছিল, সেগুলো বিসর্জনের কথা আগামী দুর্গা পূজার আগে।

হামলার শিকার মন্দিরসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব ধরনের নির্দেশনা মেনে চলার পরেও হামলার ঘটনায় প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ব্যর্থতা প্রমাণিত হয়েছে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কাছ থেকে সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তারা বলছেন, বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে সহিংসতা চললেও তা ঠেকাতে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এগিয়ে আসেনি।

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

নোয়াখালী হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক বিনয় কিশোর রায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কুমিল্লা, চাঁদপুরের পর বেগমগঞ্জের ছয়ানীতে হামলার পর আমরা পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাদের পরামর্শে আমরা বিকেলের পরিবর্তে সকালেই প্রতিমা বিসর্জন দিয়েছি। এরপরেও যখন হামলা হলো তখন আমরা পুলিশ ও এমপি সাহেবকে টেলিফোন করে সহযোগিতা চেয়েছি। তারা আসছেন আসছেন করে তিন ঘণ্টা পার হলো। এর মধ্যে আমাদের মন্দিরগুলোতে তিন দফা হামলা লুটপাট হলো। যখন সব শেষ তখন পুলিশ এসেছে। এটা জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বড় ধরনের ব্যর্থতা।’

এ অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নোয়াখালী ৩ আসনের সংসদ সদস্য মামুনুর রশীদ কিরনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি। তবে হামলা প্রতিহত করতে না পারাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে রাজি নন নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শিহাব উদ্দিন শাহীন।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা আসলে বুঝতে পারিনি এত বড় ঘটনা ঘটে যাবে। আগের দিন ছয়ানীতে মন্দিরে হামলার পরই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, পরদিন সকালেই প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হবে, যেন জুমার নামাজের পর মুসল্লিরা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ না পায়। সকালে ঠিকঠাক বিসর্জন হয়ে যাওয়ার পর আমরা সবাই মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম- আর কোনো অঘটন ঘটবে না। হঠাৎই শুনি হামলার ঘটনা। এটা আমাদের জন্য বড় একটা শিক্ষা হয়েছে।’

বেগমগঞ্জে আগে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েও ঠেকানো যায়নি হামলা

মন্দিরে হামলার সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের এগিয়ে না আসার অভিযোগ অস্বীকার করে শাহীন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা খবর পেয়েও আসেননি এ কথা ভুল। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের যারাই কাছাকাছি ছিলেন ছুটে গিয়েছিলেন। এমনকি স্থানীয় এমপির ছেলে নিজে সেখানে ছুটে গিয়েছিল, কিন্তু তারা সংখ্যায় কম ছিল বলে উল্টো হামলার শিকার হয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।’

চৌমুহনীর প্রতিটি মন্দিরে দুইজন করে পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। হামলা শুরু হলে তারা পালিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার শহীদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ব্যস্ততার কথা বলে তিনি এড়িয়ে যান।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সকালে প্রতিমা বিসর্জন হয়ে যাওয়ায় আর হামলা হতে পারে বলে আমাদের মনে হয়নি। তাছাড়া পুলিশে লোকবল সংকট রয়েছে।

‘হামলা শুরুর খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম, টিয়ার শেলও ছোড়া হয়েছে কয়েক রাউন্ড, কিন্তু ওইসব সামাল দিতে গুলি চালাতে হতো। তখন এতটাই টাফ সিচুয়েশন ছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় পুলিশও ছিল নিরুপায়।’

আরও পড়ুন:
ভাতার কার্ডের জন‍্য টাকা নিয়েছেন ‘চেয়ারম্যানের লোক’
ঘুষ নেয়ার অভিযোগে এএসআই প্রত্যাহার
এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তার ৩ ভাই ৭ দিনের রিমান্ডে
এহসান গ্রুপ যশোরে হাতিয়েছে ‘৩২২ কোটি টাকা’

শেয়ার করুন

শিশুসহ ৩ নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের তথ্য ‘ভুয়া’

শিশুসহ ৩ নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের তথ্য ‘ভুয়া’

ফেসবুকে বিভিন্ন আইডি থেকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগটি ছড়িয়ে দেয়া হয়। এতে দাবি করা হয়, ১০ বছরের এক শিশু, তার বোন ও মাসি ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তবে এ তথ্য গুজব বলে দাবি করেছেন প্রশাসন, পুলিশ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা।

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে সনাতন ধর্মাবলম্বী একই পরিবারের তিন নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ গুজব বলে দাবি করেছেন প্রশাসন, পুলিশ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা।

সনাতন ধর্মের নেতারা বলছেন, একটি মহল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ফেসবুকে এমন গুজব ছড়াচ্ছে। এর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বুধবার রাতে ফেসবুকে বিভিন্ন আইডি থেকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ওই অভিযোগটি ছড়িয়ে পড়ে। এতে দাবি করা হয়, ১০ বছরের এক শিশু, তার বোন ও মাসি ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

শনিবার কয়েকটি পোস্টে বলা হয়, ‘ধর্ষণের শিকার ১০ বছরের শিশুটি মারা গেছে। মৃত্যুর মুখে রয়েছে তার মাসি (খালা) ও বোন।’

তবে কোনো পোস্টেই ঘটনার জায়গা বা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র উদ্ধৃত করা হয়নি। নিউজবাংলার পক্ষ থেকে হাজীগঞ্জ উপজেলার হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বরং সবাই দাবি করছেন, উপজেলায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটলেও তিন জনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

ধর্ষণের তথ্য সম্পূর্ণ গুজব বলে দাবি করেছেন হাজীগঞ্জ উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মিঠুন ভদ্র।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করি। তার আগে ৯ বছর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলাম। আগে থেকেই আমাদের সম্প্রদায়ের লোকজনের ভালোমন্দ দেখছি। যার কারণে যেকোনো বিষয়ে মানুষ আমাকে জানায়। তবে মন্দিরে হামলা ছাড়া এ ধরনের কোনো ঘটনার খবর আমার কাছে নেই। কোনো মানুষ এমন কোনো খবর আমাদের জানায়নি। এগুলো সম্পূর্ণ গুজব।’

হাজীগঞ্জ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি রুহিদাস বণিক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সংঘবদ্ধ ধর্ষণের খবরটি ভুয়া। এ ধরনের কোনো তথ্য আমাদের পূজা উদযাপন পরিষদ, জাতীয় হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বা বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের কোনো নেতার কাছে নেই। কেউ যদি এমন কোনো খবর ফেসবুকে পোস্ট দেয়, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। যারা এই ধরনের গুজব ছড়ায় তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই। সবাইকে এ ধরনের গুজব এড়ানোর অনুরোধ জানাচ্ছি।’

হাজীগঞ্জ রামকৃষ্ণ সভা আশ্রমের সাধারণ সম্পাদক নিহা রঞ্জন হালদার মিলন বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ গুজব। যারা এ ধরনের ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছে তাদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানাই।’

‘আমাদের এলাকায় এই ধরনের কোনো ঘটনার খবর পাইনি। এগুলো গুজব রটানো হচ্ছে’, বলেন হাজীগঞ্জ পৌর এলাকার ত্রিনয়নী সংঘ মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক গোপাল সাহা।

হাজীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো খবর আমরা পাইনি। আমাদের কাছে কেউ অভিযোগও করেনি। এটা সম্পূর্ণ গুজব। এভাবে একজন মানুষ মারা যাবে আর পুলিশ বসে থাকবে, তা কখনও হয়? যারা এ ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সারা হাজীগঞ্জ খুঁজেও আমরা এ ধরনের কোনো সংবাদ পাইনি। এগুলো সম্পূর্ণ গুজব। এসব গুজব যারা ছড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ বলেন, ‘ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং নেতারা নিশ্চিত করেছেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ গুজব।

গুজবে কান না দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো কিছু শুনলেই বিশ্বাস না করে আগে তার সত্যতা যাচাই করার চেষ্টা করুন।’

আরও পড়ুন:
ভাতার কার্ডের জন‍্য টাকা নিয়েছেন ‘চেয়ারম্যানের লোক’
ঘুষ নেয়ার অভিযোগে এএসআই প্রত্যাহার
এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তার ৩ ভাই ৭ দিনের রিমান্ডে
এহসান গ্রুপ যশোরে হাতিয়েছে ‘৩২২ কোটি টাকা’

শেয়ার করুন