আউশের ফলনে হতাশ কৃষক

আউশের ফলনে হতাশ কৃষক

নওগাঁয় আউশ কাটা ও মাড়াইয়ে ব্যস্ত কৃষক। ছবি: নিউজবাংলা

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খামারবাড়ী নওগাঁর উপপরিচালক শামসুল ওয়াদুদ নিউজবাংলাকে জানান, এবার আউশ ধান রোপণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। কিছুদিন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার কারণে রোদ কম হওয়ায় পাতার ক্লোরোফিল কম হয়েছে। এ জন্য কিছু এলাকার জমিগুলোতে কুশিবর্ধন ঠিকমতো হতে পারেনি। তাই ফলন কিছুটা কম হয়েছে।

উত্তরের কৃষিপ্রধান জেলা নওগাঁয় এই মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ হাজার ৮২৫ হেক্টর কম জমিতে আউশের রোপণ হয়েছে। তার ওপর ফলনও নানা কারণে কম। এতে আউশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কৃষকরা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় ও পোকার আক্রমণ হওয়ায় এই ফলন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, এখনও সময় আছে; ফলন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৭০ হাজার ৭৩৫ হেক্টর আউশ ধান রোপণের লক্ষ্য ছিল। তবে ধান রোপণ হয়েছে ৫৭ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে। আউশ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৫২০ টন। এরই মধ্যে জেলার ৫ হাজার ৮০ হেক্টর ধান কাটা শেষ হয়েছে।

জেলার বেশ কিছু ধানক্ষেত ঘুরে দেখা গেছে, আউশ কাটা ও মাড়াইয়ে ব্যস্ত কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, ফলন তো কমই, তার ওপর স্থানীয় বাজারে গত বছরের চেয়ে ধানের দামও কম।

গত বছর জেলায় ৭১ হাজার ৪১৫ হেক্টর জমিতে আউশ ধান চাষ করা হয়েছিল। সে সময় বন্যায় কিছু ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও ৬৯ হাজার ১৯৭ হেক্টর সুরক্ষিত ছিল, যা থেকে ২ লাখ ১৪ হাজার ৫৪৫ টন ধান উৎপাদিত হয়।

এ বছর আউশ ধান রোপণের শুরুতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম ছিল। ফলে চারা থেকে বাড়তে পারেনি কুশি। কৃষকরা বলছেন, গত বছরের চেয়ে বিঘাপ্রতি তিন থেকে চার মণ ধান কম উৎপাদিত হয়েছে আপৎকালীন এই ধান।

অনেকের জমিতে চারা রোপণের কিছুদিন পর রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ হয়েছে।

আউশের ফলনে হতাশ কৃষক

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার নওদুলি গ্রামের কৃষক আফাছ উদ্দিন বলেন, ‘হামি তিন বিঘা জমিত আউশ ধান রোপণ করুছনু (করেছিলাম)। রোপণের কিছুদিন পরে হঠাৎ কর‌্যা ধানের গাছগুলা লাল রং হয়া যাইয়া মরা (মারা) যাবার লাগে। তারপর আবার নতুন কর‌্যা জমিত ধান রোপণ করা লাগিছে (লেগেছে)।

‘এখন ধান কাটবার লাগিছি দুই বিঘা ধান কাটা ১২ মণের মতেআ ধান পাছি। এবার হামার লস হইয়া যাবে।’

রাণীনগর উপজেলার দেউলা গ্রামের কৃষক সুবির চন্দ্র জানান, ‘পাঁচ বিঘা জমিত আউশ ধান রোপণের পর এ্যানা (অল্প) বৃষ্টি হলেও আকাশোত মেলা দিন ধরা মেঘ ধরা আসলো (ছিল)। রোদ না হওয়ায় তখন ধানের চারার গোড়াত বৃষ্টির পানি জমা আসলো মেলাদিন ধরা। পানি শুকানের পর চারাগুলা ঠিকমতো কুশি ধরিছলো না। এল্লার (এগুলার) জন্নি (জন্য) ভালো ফলন হয়নি।’

কৃষকরা জানালেন, গত বছর স্থানীয় বাজারে প্রকারভেদে প্রতি মণ আউশ ধান ৯৫০ থেকে ১২০০ টাকায় কেনা-বেচা হয়েছিল। এবার প্রতি মণ আউশ ধান ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা দরে কেনা-বেচা হচ্ছে।

মান্দা উপজেলার দক্ষিণ মৈনম গ্রামের কৃষক তবির দেওয়ান বলেন, ‘বাজারোত প্রতি মণ ধান ৭৫০ থেকে ৮০০ টেকা (টাকা)। যেটি প্রতি বিঘাত ধান চাষ বাবদ খরচ সাড়ে ৬ হাজার টেকা। ধান পাচ্ছি বিঘাপ্রতি ৬ মণ করা। আর ছয় মণ ধানের দাম বর্তমানে চার হাজার ২০০ টেকার মতো। সে হিসাব করা বিঘাপ্রতি লোকসান হছে ২ হাজার থ্যাকা আড়াই হাজার টেকার মতন।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খামারবাড়ী নওগাঁর উপপরিচালক শামসুল ওয়াদুদ নিউজবাংলাকে জানান, এবার আউশ ধান রোপণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। কিছুদিন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার কারণে রোদ কম হওয়ায় পাতার ক্লোরোফিল কম হয়েছে। এ জন্য কিছু এলাকার জমিতে কুশিবর্ধন ঠিকমতো হতে পারেনি। তাই ফলন কিছুটা কম হয়েছে।

তবে এ বছর জেলার কোথাও রোগবালাই অথবা পোকার আক্রমণ নেই বলে দাবি এই কর্মকর্তার। ব্রি-৪৮ সহ নতুন জাতের যেসব ধান রোপণ করা হয়েছিল, সেগুলোর ফলন ভালো হয়েছে বলে জানান তিনি।

তার পরও এ বছর আপৎকালীন ফসল আউশ ধান উৎপাদনের লক্ষ্য ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে আশা করছেন তিনি।

আরও পড়ুন:
আউশ আবাদে ব্যাপক সাড়া

শেয়ার করুন

মন্তব্য

হাঁসে হাসি; ডিম বিক্রির টাকায় সফল সাংবাদিক

হাঁসে হাসি; ডিম বিক্রির টাকায় সফল সাংবাদিক

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে বিশাল মৎস্য ও হাঁসের খামার গড়ে তুলেছেন ইমন। ছবি: নিউজবাংলা।

ইমনের গড়ে তোলা খামার দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেও খামার তৈরির পরিকল্পনা করছেন নলডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সংরক্ষিত সদস্য লিপি বেগম। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ইমন ভাইয়ের দেখাদেখি অন্যরা খামার দেয়ার চেষ্টা করতিছে। অনেকে দেখতে এসেও বুদ্ধি নিয়ে খামার দিচ্ছে। আমিও চিন্তে-ভাবনা করতিছি; একটা হাঁসের খামার দেব।’

উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন দৈনিক ভোরের ডাকের স্টাফ রিপোর্টার ইমরুল কাওছার ইমন। ২০১৯ সালে স্বল্প পরিসরে ‘খাকি ক্যাম্পেবেল’ জাতের হাঁস পালনের পরিকল্পনা করেন। তা বাস্তবায়নে করোনা মহামারির মাঝামাঝি সময়ে গড়ে তোলেন হাঁসের খামার।

হাঁসের ডিম বিক্রির ‍‍আয়ে ৪ একর জমির তিনটি পুকুরে তিনি এখন পরিকল্পিতভাবে চাষ করছেন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। চার মাস পর পর মাছ বিক্রি থেকে আয় হচ্ছে প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক টাকা।

ইমনের বাড়ি গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা ইউনিয়নের পশ্চিম খামার দশলিয়া গ্রামে। নিজস্ব জমিসহ কয়েক বিঘা জমি বর্গা নিয়ে মাছ চাষ ও হাঁসের খামার করেছেন তিনি। খামারে এক হাজার হাঁসের মধ্যে প্রতিদিন তিনি সাত থেকে আটশ ডিম সংগ্রহ করছেন। এই ডিম বিক্রির টাকায় হাঁস ও মাছের দৈনিক ছয় হাজার টাকার খাদ্যসহ শ্রমিকদের বেতন দিয়েও মাসে তার আয় হচ্ছে প্রায় লক্ষাধিক টাকা।

রাজধানী ঢাকায় সাংবাদিকতার পাশাপাশি নিজ এলাকায় গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে বিশাল মৎস্য ও হাঁসের খামার গড়ে তুলেছেন ইমন। খামারে হাঁসের সংখ্যা হাজারেরও বেশি। সমন্বিতভাবে ১২ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন দেশি-বিদেশী মাছ। দুই খামারে প্রতিদিন গড়ে খরচ হচ্ছে প্রায় ছয় হাজার টাকা। যার বেশিরভাগই আসে ডিম বিক্রির টাকা থেকে।

ছোট বেলা থেকেই ইমনের মন টানতো কৃষিতে। ভিন্ন বিষয়ে পড়ালেখা করেও কৃষিভিত্তিক কিছু একটা করার স্বপ্ন ছিল তার। ঢাকায় চারটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক এই তরুণ উদ্যোক্তা।

হাঁসে হাসি; ডিম বিক্রির টাকায় সফল সাংবাদিক

তবে তার একটা গল্প আছে। হঠাৎ বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে তার চারটি প্রতিষ্ঠান যখন অন্ধকারে; ঠিক তখনই কৃষিতে সফলতা এসেছে তার। এই খামারই এখন তার টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন।

বাণিজ্যিকভাবে হাঁস ও মাছ চাষের পাশাপাশি ইমরুল কাওছার ইমন ২০১৫ সালে ঢাকার গুলিস্থানে নিজের জমানো টাকা দিয়ে একটি ছোট্ট শার্ট তৈরির কারখানা শুরু করেন। তিন জন কর্মচারী নিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে ৫০ জনের বেশি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে তার কারখানায়। শান্তিনগরে একটি ট্রাভেল এজেন্সিও আছে। তাছাড়া ব্যবসার লাভের টাকায় বেশ কয়েকটি মাইক্রোবাস কিনে রাজধানীতে উবারেও চালান তিনি।

একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন ক্লাব ভিত্তিক টুর্নামেন্টসহ বাংলাদেশ জাতীয় দলের খেলোয়ারদের জার্সি ও গ্যালারিতে ব্র্যান্ডিংয়ের (বিজ্ঞাপন) কাজ করেও সফলতা পেয়েছেন তিনি।

তবে চলতি বছরের মার্চে এসে তার জীবনের হিসেব এলোমেলো হয়ে যায়। বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রকোপে ক্ষতি শুরু হতে থাকে একের পর এক ব্যবসায়। লকডাউনে গার্মেন্টস-কারখানা বন্ধ। উবারের গাড়ির চাকাও ঘোরেনি। সারা বিশ্বে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ায় ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা ও ক্রিকেট ব্র্যান্ডিংও বন্ধ হয়ে যায়।


ঠিক তখনই ইমরুল উপলব্ধি করতে পারেন, কয়েক বছরের চেষ্টার ফল করোনার এক ধাক্কায় স্থবির হয়ে গেল। এই হতাশার মধ্যে কৃষি ভিত্তিক কিছু করার পরামর্শ দেন তার সহধর্মিণী।

পরবর্তীতে সমন্বিতভাবে হাঁস ও মাছ চাষের পরিকল্পনা করেন ইমন। গুগল ও ইউটউব দেখে ও স্থানীয় খামারিদের কাছে পরামর্শ নিয়ে ‘হামিদা ডাক এন্ড ফিস ফার্ম’ গড়ে তোলেন। খামার দেখভাল করেন ছোট ভাই নাহিদ আনছারী।

হাঁসে হাসি; ডিম বিক্রির টাকায় সফল সাংবাদিক

তিনি বলেন, ‘আমরা এই খামারটি তৈরি করেছি মূলত আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে। তাছাড়া এই খামার করে আমরা লাভবানও হচ্ছি।’

স্থানীয়রা জানায়, ইমরুল কাওছার ইমনের খামারে চার-পাঁচ জন শ্রমিক রয়েছে। একটি পুকুরে এক পাশে চাষ করছেন তেলাপিয়া ও আরেক পাশে থাই জাতের পাংগাস। তার পাশে পানির উপরে বাঁশ ও টিন দিয়ে মাচা বানিয়ে হাঁসের খামার করেছেন।

এছাড়া আরেকটি পুকুরে চাষ হচ্ছে ভিয়েতনামী কই, হাইব্রিড সিং, বিদেশি মৃগেল, কালিবাউশ, মিরকার্প ও সরপুঁটি। অপরটিতে চাষ হচ্ছে দেশী মাছ। এর সবগুলোই বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে এই খামারে।

এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে স্থানীয় সংবাদকর্মী শাহিন মিয়া বলেন, ‘ইমন ঢাকায় সাংবাদিকতা করলেও এলাকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেন। মূলত বেকারদের কর্মমূখী করার চিন্তা থেকেই তার এই হাঁস ও মাছের খামার করা। এরই মধ্যে তার সফলতা দেখে আশেপাশে প্রায় ১০-১৫টি নতুন খামার সৃষ্টি হয়েছে।’

ইমনের গড়ে তোলা খামার দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেও খামার তৈরির পরিকল্পনা করছেন নলডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সংরক্ষিত সদস্য লিপি বেগম। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ইমন ভাইয়ের দেখাদেখি অন্যরা খামার দেয়ার চেষ্টা করতিছে। অনেকে দেখতে এসেও বুদ্ধি নিয়ে খামার দিচ্ছে। আমিও চিন্তে-ভাবনা করতিছি; একটা হাঁসের খামার দেব।’

এ বিষয়ে খামারি ইমরুল কাওছার ইমন বলেন, ‘করোনা মহামারিতে সব ব্যবসায় বিশাল ক্ষতির মুখে পড়ি। এরপর গ্রামে কিছু করার চিন্তা থেকেই খামারের পরিকল্পনা করি।

সম্প্রতি খামারটি পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও গাইবান্ধা-৩ আসনের সংসদ সদস্য উম্মে কুলসুম স্মৃতি। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রজেক্টটি দেখে আমি অভিভূত। যুবকরা যে পারে, এটা তার দৃষ্টান্ত উদাহরণ।’

আরও পড়ুন:
আউশ আবাদে ব্যাপক সাড়া

শেয়ার করুন

শাপলা তুলে চলে হাজারো সংসার

শাপলা তুলে চলে হাজারো সংসার

সিরাজদিখানের শাপলা সংগ্রহকারী দনিয়া গ্রামের আফজাল মিয়া জানান, তিনি ১০ বছর ধরে শাপলা উঠিয়ে বিক্রি করে সংসার চালান। শাপলায় তার জীবন চলে। আগে বাজারে শাপলা বিক্রি করতেন। এখন গাড়ি এসে শাপলা নিয়ে যায়। শাপলা বিক্রির টাকায় সংসার চালাচ্ছেন, ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পড়াচ্ছেন।

শাপলা ফুল দেখতে যেমন সুন্দর, তরকারি হিসেবে খেতেও সুস্বাদু। দাম কম হওয়ায় নিম্নবিত্তদের কাছে এর চাহিদা অনেক। সুস্বাদু হওয়ায় ধনীরাও খায়।

বর্ষা মৌসুমে আগে গ্রামাঞ্চলের নিম্নবিত্তরা শাপলা তুলে তা দিয়ে ভাজি ও ভর্তা করে খেত। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির কারণে এখন শহরের বাজারেও সহজলভ্য শাপলা। সুস্বাদু হওয়ায় শহরেও তাই চাহিদা বাড়ছে।

খাবার হিসেবে যেমনই হোক বর্ষা মৌসুমে মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার হাজারো পরিবারের জীবিকার প্রধান মাধ্যম এই শাপলা। বিল থেকে শাপলা তুলে এসব পরিবার সংসারের নিত্য খরচ মিটিয়ে কিছু সঞ্চয়ও করে। বছরে দুই থেকে তিন মাস শাপলা বিক্রি করেই চলে এসব পরিবার।

জেলার সিরাজদিখান, শ্রীনগর (আড়িয়াল বিল) হাসারা, টঙ্গিবাড়ী ও সদরের চরাঞ্চলের কৃষক ও দিনমজুররা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত খাল-বিল ও বিস্তীর্ণ জমিতে জন্মানো শাপলা তুলে নৌকায় করে নিয়ে আসে। এরপর বিভিন্ন বাজারে গিয়ে বিক্রি করেন।

শাপলা তুলে চলে হাজারো সংসার

আরেকটি দল সিরাজদিখান উপজেলার রশুনিয়া, ইমামগঞ্জ, চোরমর্দন, লতব্দীসহ সিরাজদিখান-নিমতলা সড়কের বিভিন্ন স্থানে রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখেন তুলে আনা শাপলা। বিকেলের দিকে পাইকাররা গিয়ে সেগুলো কিনে রাজধানীর বিভিন্ন হাট-বাজারে নিয়ে যান।

শাপলা ফুল সাধারণত জ্যৈষ্ঠ থেকে শুরু করে কার্তিক মাস পর্যন্ত পাওয়া যায়। বহু বছর ধরে জেলার প্রতিটি উপজেলায় এ পেশাটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এখন অনেকেই শাপলা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

সিরাজদিখানের শাপলা সংগ্রহকারী দনিয়া গ্রামের আফজাল মিয়া জানান, তিনি ১০ বছর ধরে শাপলা উঠিয়ে বিক্রি করে সংসার চালান। শাপলায় তার জীবন চলে। আগে বাজারে শাপলা বিক্রি করতেন। এখন গাড়ি এসে শাপলা নিয়ে যায়। শাপলা বিক্রির টাকায় সংসার চালাচ্ছেন, ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পড়াচ্ছেন।

নিয়ামত হোসেন জানান, প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০ আঁটি শাপলা সংগ্রহ করেন। এবার বর্ষাকালে বৃষ্টি কম হওয়ায় শাপলা উৎপাদন কম হয়েছে। যত পানি বেশি হবে শাপলাও বেশি হবে।

শাপলা তুলে চলে হাজারো সংসার

তিনি আরও জানান, পাইকাররা তাদের কাছ থেকে এসব শাপলা সংগ্রহ করে এক জায়গায় করেন। রাতে রওনা দিয়ে সকালে ঢাকার পাইকারি বাজারে এগুলো বিক্রি করেন।

শ্রীনগর উপজেলার রয়েছে আড়িয়াল বিল। বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে থাকে দেশের মধ্যাঞ্চলের সবচেয়ে বড় বিলটি। এ বিলে কয়েক শ পরিবার শাপলা কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করে।

আড়িয়াল বিল মূলত কয়েকটি উপজেলাজুড়ে রয়েছে। এর মধ্যে শ্রীনগর, সিরাজদিখান, ঢাকার দোহার ও নবাবগঞ্জ অন্যতম। আড়িয়াল বিলের গাদিঘাট, হাঁসাড়া ইউনিয়নের আশলিয়া, আলমপুরসহ অনেক স্থান থেকে নিয়মিত শাপলা তোলা হয়।

বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে জানা গেছে, ভোর ৫টা থেকে দুপুর পর্যন্ত বিলে শাপলা তোলা হয়। প্রায় ৬০-৭০টি শাপলায় করা হয় একটি আঁটি। এসব আঁটি পাইকাররা কেনেন ৫০-৬০ টাকায়।

২০টি শাপলার আঁটিও বিক্রি করা হয়। এগুলো মূলত স্থানীয় লোকজন কেনেন ১২ টাকায়। দৈনিক একজন কমপক্ষে ৫০ আঁটি শাপলা তুলতে পারেন।

শাপলা তুলে চলে হাজারো সংসার

শ্রীনগর থেকে প্রতিদিন শাপলা সংগ্রহ করে ৮-১০টি পিকআপ ভ্যান রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি বাজারে যায়।

শ্রীনগর উপজেলার হাঁসাড়া ইউনিয়নের তাজুল ইসলাম জানান, তারা দলবেঁধে ডিঙি নৌকায় শাপলা তোলেন প্রতিদিন। একটি ডিঙিতে দুই বা তিনজন থাকেন। দুপুরের দিকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাইকারদের কাছে শাপলা বিক্রি করেন।

সোনারগাঁও গ্রামের শরীফ জানান, পাঁচটি শাপলা দিয়ে ছোট একটি মুঠা করা হয়। ছোট চারটি মুঠা দিয়ে বড় একটি মুঠা তৈরি হয়। প্রতিটি বড় মুঠা বিক্রি হয় ১২ টাকায়।

হাঁসাড়া ইউনিয়নের আলামপুরের রুমান জানান, লকডাউনে তেমন কোনো খাদ্য সহায়তা পাননি তারা। অনেকটা বাধ্য হয়েই শাপলা কুড়াতে হচ্ছে। এখানে ৩০-৪০টি পরিবারের সংসার চলছে শাপলা বিক্রি করে।

শাপলা তুলে চলে হাজারো সংসার

উপজেলার সদরে ডাকবাংলাে মার্কেটের সামনে শাপলা বিক্রি করেন আবুল হোসেন। তিনি জানান, অন্য সময় দিনমজুরের কাজ করেন। বর্ষায় শাপলা তুলছেন প্রায় ২০ বছর ধরে। লকডাউনের মধ্যে বেকার হয়ে পড়েছিলেন। এখন কামারখোলা বিল থেকে শাপলা তুলে প্রতিদিন ডাকবাংলাে মার্কেটের সামনে বিক্রি করছেন।

ঢাকার পাইকারি ক্রেতা জামাল শেখ জানান, তারা মূলত গদিঘাট, আলমপুর ও আশলিয়া থেকে শাপলা কিনে রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও যাত্রাবাড়ী নিয়ে বিক্রি করেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খুরশীদ আলম জানান, বর্ষায় প্রাকৃতিকভাবেই শাপলা ফোটে। যেহেতু বর্ষায় জেলার অধিকাংশ জমিতেই পানি থাকে, এ জন্য প্রচুর শাপলা হয়। বহু কৃষক এসব শাপলা তুলে জীবিকা নির্বাহ করেন। যদি ঠিকমতো সংগ্রহ করে বাজারজাত করা যায়, তবে এটিও আয়ের ভালো উৎস হতে পারে।

আরও পড়ুন:
আউশ আবাদে ব্যাপক সাড়া

শেয়ার করুন

শখের মাল্টায় ইউনুসের আয় লাখ টাকা 

শখের মাল্টায় ইউনুসের আয় লাখ টাকা 

শখের মাল্টা বাগানে পেকুয়ার ইউনুস। ছবি: নিউজবাংলা।

পেকুয়া উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোকাদ্দেস মোহাম্মদ রাসেল বলেন, ‘ইউনুস আহমদই পেকুয়ায় একমাত্র মাল্টা চাষি। ফলন হবে না ভেবে স্থানীয় কৃষক ধান বা মৌসুমি শাক-সবজি চাষাবাদের বাইরে যান না।’

তিন থেকে চার ফুট উচ্চতার একেকটি গাছে ঝুলছে ৫০ থেকে ৮০টি ফল। গাঢ় সবুজ রঙের ফলগুলোর কোনো কোনোটিতে হলুদাভ ভাব।

ছিমছাম ও পরিপাটি মাল্টা বাগানটির মালিক ইউনুস আহমদ। কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়নের বাসিন্দা তিনি।

আড়াই বছর আগে শখের বশে শুরু করা বাগানটিই এখন তার আয়ের প্রধান উৎস। ৪০ শতক জমির বাগান পরিচর্যার কাজ করছিলেন ইউনুস। এ সময় কথা হয় তার সঙ্গে।

তিনি নিউজবাংলাকে জানান, বাগানের জন্য আমের চারা কিনতে সাতক্ষীরা গিয়ে মাল্টার চারা কিনে বাড়ি ফেরেন তিনি। সৌখিন কিছু মানুষ তার কাছ থেকে এসব চারা কিনে লাগিয়েছিলেন। তবে চারা বাঁচাতে পারেননি কেউ।

ইউনুস আরও জানান, শুরুতে ইউনিয়নের ঝিরি এলাকায় দুই একর জমিতে মাল্টার ৪০০ চারা লাগিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সবগুলো মারা যায়। তখন কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েন। তবে ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেন তিনি।

শখের মাল্টায় ইউনুসের আয় লাখ টাকা

এরপর টইটংয়ের জুম পাড়া এলাকার বর্তমান জমিতে চারা রোপণ করেন। পরিচর্যার মাধ্যমে ১০০ চারা বড় করতে সক্ষম হন। বাকি ৬টি চারা কলমের মাধ্যমে তৈরি করেন। চলতি মৌসুমে ১০৬টি গাছের মধ্যে ১০০টি গাছে মাল্টা ধরেছে।

তিনি আরও জানান, এরই মধ্যে দেড় লাখ টাকার বেশি মাল্টা বিক্রি করেছেন৷ আরও অন্তত ৫০ হাজার টাকার মাল্টা বিক্রি করা যাবে। পাইকারি দরে ৮০ টাকা কেজিতে বাগান থেকে তার মাল্টা কিনে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

বাগানের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন জানিয়ে ইউনুস বলেন, ‘বাগানটি প্রস্তুতে আমার তিন-চার লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। আগামী বছরের ফলনের মাধ্যমে মূলধন তুলে আমি লাভের মুখ দেখব বলে আশা করছি। গাছগুলো অন্তত ১০-১২ বছর ফলন দেবে। এতে প্রতি বছর দেড়-দুই লাখ টাকা আয় করা যাবে।’

শখের মাল্টায় ইউনুসের আয় লাখ টাকা

পেকুয়া উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোকাদ্দেস মোহাম্মদ রাসেল বলেন, ‘ইউনুসই পেকুয়ায় একমাত্র মাল্টা চাষি। ফলন হবে না ভেবে স্থানীয় কৃষক ধান বা মৌসুমি শাক-সবজি চাষাবাদের বাইরে যান না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সঠিক পরিচর্যা পেলে মাল্টা গাছ ২০-৩০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। এই পর্যন্ত তিনি দুইবার ফলন পেয়েছেন। প্রথমবার এক-তৃতীয়াংশ গাছে ফল এসেছিল। এবার প্রায় প্রতিটি গাছে ফল এসেছে।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তপন কুমার রায় নিউজবাংলাকে বলেন বলেন, ‘মাল্টা বাংলাদেশের বাজারে বেশ জনপ্রিয় ফল। পাহাড়ি ঢালু জমিতে মাল্টা চাষ ভালো হয়।

‘এক মৌসুমে প্রতি গাছে ৮০-১০০ কেজি ফলন হয়। মাল্টা গাছ খুবই স্পর্শকাতর। সার-কীটনাশক দেয়ায় তারতম্য হলে গাছে নানা সমস্যা দেখা দেয়। অনেক সময় গাছ মারা যায়।’

আরও পড়ুন:
আউশ আবাদে ব্যাপক সাড়া

শেয়ার করুন

মৎস্যজীবীদের স্বার্থেই ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা

মৎস্যজীবীদের স্বার্থেই ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা

ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটির সভায় বক্তব্য দেন মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। ছবি: সংগৃহীত

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, মৎস্যজীবীদের স্বার্থেই মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও অভিযান পরিচালনা করা হয়। জাতীয় স্বার্থ যারা ধ্বংস করতে চাইবে, তাদের বিষয়ে কোনো ধরনের বিবেচনা বা অনুকম্পা দেখানোর সুযোগ নেই।

মৎস্যজীবীদের স্বার্থেই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।

মৎস্য অধিদপ্তরে বুধবার ইলিশসম্পদ উন্নয়নসংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটির সভায় এ কথা বলেন তিনি।

শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘মৎস্যজীবীদের স্বার্থেই মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও অভিযান পরিচালনা করা হয়। জাতীয় স্বার্থ যারা ধ্বংস করতে চাইবে, তাদের বিষয়ে কোনো ধরনের বিবেচনা বা অনুকম্পা দেখানোর সুযোগ নেই।

‘এ ক্ষেত্রে কঠিন থেকে কঠিনতর পদক্ষেপ নিতে আমরা কুণ্ঠাবোধ করব না। দেশের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় যত কঠিন হওয়া লাগে, তত কঠিন হতে হবে। কাউকে এ বিষয়ে ছাড় দেয়ার অবকাশ নেই।’

তিনি বলেন, ‘মৎস্য খাতকে কোনোভাবেই ধ্বংস হতে দেয়া হবে না। শেখ হাসিনার নির্দেশনা, নজরদারি ও পৃষ্ঠপোষকতায় মাছে-ভাতে বাঙালির বাংলাদেশ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।

‘মৎস্যসম্পদ রক্ষার মাধ্যমে খাদ্যের চাহিদা পূরণ হচ্ছে, বেকারত্ব দূর হচ্ছে, উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে, গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হচ্ছে এবং দেশের রপ্তানি আয় বাড়ছে।’

টাস্কফোর্সের সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, চলতি বছর প্রধান প্রজনন মৌসুমে ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ শিকার বন্ধ থাকবে। এ সময় সারা দেশে ইলিশ আহরণ, বিপণন, ক্রয়-বিক্রয়, পরিবহন, মজুত ও বিনিময়ও নিষিদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

পাশাপাশি ইলিশের প্রজননক্ষেত্রে সব ধরনের মৎস্য শিকার নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ইলিশের নিরাপদ প্রজননের স্বার্থে ও মা-ইলিশ সংরক্ষণে এ কার্যক্রম নেয়া হয়েছে বলে জানায় টাস্কফোর্স।

সাধারণত আশ্বিনের ভরা পূর্ণিমার আগে-পরে প্রায় ১৫ থেকে ১৭ দিনের মধ্যে ইলিশ মাছ ডিম ছাড়ে। তাই এই সময়ে সাগরের নোনা জল ছেড়ে নদীমুখে ছুটে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ।

মা-ইলিশ রক্ষার অংশ হিসেবে প্রতিবছর এ সময়টাতে বেশ কয়েক বছর ধরেই ইলিশ ধরা বন্ধ রেখে আসছে সরকার। মূলত মা-ইলিশ যেন নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ পায়, সেটি নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ। এর ফলে দেশে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ।

আরও পড়ুন:
আউশ আবাদে ব্যাপক সাড়া

শেয়ার করুন

৩ মাস সবজি চারা বেচে আয় ‘৩ লাখ’

৩ মাস সবজি চারা বেচে আয় ‘৩ লাখ’

সবজির চারা বিক্রি করেই সংসার চলে এ গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের। ছবি: নিউজবাংলা

বুড়িচং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আফরিনা আক্তার বলেন, ‘গড়ে প্রতিবছর এখানে ৪ হেক্টর জমিতে রবিশস্যের চারা উৎপাদন হয়। প্রতি মৌসুমে গড়ে ৩ কোটি টাকার চারা বিক্রি হয়।’

কুমিল্লার বুড়িচংয়ে গোমতী নদীর পাড়ে সমেষপুর গ্রামটি চারা গ্রাম নামে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। কারণ এ গ্রামের মানুষের উপার্জনের প্রধান মাধ্যম গাছের চারা বিক্রি।

গ্রাম ঘুরে জানা গেছে, এখানকার কৃষকদের ব্যস্ততা থাকে মূলত প্রতিবছরের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চারা গ্রাম থেকে প্রতিবছর এই তিন মাসে গড়ে ৩ কোটি টাকার চারা বিক্রি হয়।

এ বছরও চারা বিক্রির এই আনুমানিক লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখতে এখন বেশ ব্যস্ত সমেষপুরের কৃষকরা।

শীত আসার অনেক আগেই তৈরি করা হয়েছে সেখানকার বীজতলা। এখন জমিগুলোতে শোভা পাচ্ছে টম্যাটো, মরিচ, বেগুন, ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা।

চারার পরিচর্যায় ব্যস্ততার ফাঁকে কৃষক মনির হোসেন নিউজবাংলাকে জানান, ৮ শতক জমিতে বীজতলা তৈরি করেছেন। আশ্বিন থেকে অগ্রহায়ণ পর্যন্ত অন্তত তিনবার চারা উৎপাদন হবে তার বীজতলায়।

তিনি আরও জানান, প্রতিবার চারা উৎপাদনে খরচ হবে ৮০ হাজার টাকা করে মোট ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। খরচের মধ্যে আছে বীজতলা তৈরির জন্য বাঁশ, পলিথিন, কীটনাশক, সার ও শ্রমিকের মজুরি।

৩ মাস সবজি চারা বেচে আয় ‘৩ লাখ’

আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চারা বিক্রি করে সাড়ে ৩ লাখ টাকা উঠবে বলে আশা করছেন তিনি।

মনিরের মতো চারা উৎপাদনে জড়িত সমেষপুর গ্রামের শতাধিক পরিবার।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে চারা গ্রামে চারা কিনতে প্রতিদিনই কৃষকরা আসেন। তাদেরই একজন চট্টগ্রামের ফয়সাল হোসেন।

তিনি বলেন, ‘সমেষপুরের চারা নিঃসন্দেহে অনেক ভালো। এক দশক ধরে আমি সমেষপুর থেকে চারা নিয়ে নিয়ে জমিতে রোপণ করি।

‘ফুলকপির এক হাজার চারার দাম ৮০০ টাকা, বাঁধাকপি ও ফুলকপি প্রতি হাজার ৬০০ টাকা করে। এ ছাড়াও তাল বেগুন যেগুলো প্রতিটি এক কেজি করে হয়, ওই বেগুনের প্রতি হাজার চারা ১ হাজার টাকায় কিনেছি। আঁটি বেঁধে গাড়িতে তুলেছি। পরদিন বিকেলে গিয়ে জমিতে রোপণ করব।’

৩ মাস সবজি চারা বেচে আয় ‘৩ লাখ’

বুড়িচং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আফরিনা আক্তার বলেন, ‘গড়ে প্রতিবছর এখানে ৪ হেক্টর জমিতে রবিশস্যের চারা উৎপাদন হয়। প্রতি মৌসুমে গড়ে ৩ কোটি টাকার চারা বিক্রি হয়।’

তবে কৃষকদের অভিযোগ, চারা বিক্রির ওপর চলছে যে গ্রাম, কৃষি বিভাগের নজর নেই সে গ্রামের দিকে।

আবু আওয়াল নামের এক চাষি জানান, তিনি এ বছর ২০ শতক জমিতে বীজতলা তৈরি করেছেন। বীজ, সার কিংবা পরামর্শসংক্রান্ত কোনো সহযোগিতা কৃষি বিভাগ থেকে পাননি। কোনো সমস্যা হলে কৃষক নিজেরাই আলাপ করে সমাধান খুঁজে নেন।

কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মিজানুর রহমান জানান, ‘যদি সমেষপুরের কৃষক কৃষি বিভাগের কোনো সাপোর্ট না পান সেটা অবশ্যই দুঃখজনক। আমি ওই কৃষকদের জন্য করণীয় সবকিছু করার ব্যবস্থা শুরু করব।’

আরও পড়ুন:
আউশ আবাদে ব্যাপক সাড়া

শেয়ার করুন

পাটকাঠিতে লাভবান কৃষক

পাটকাঠিতে লাভবান কৃষক

পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটকাঠিরও ভালো দাম পাচ্ছেন রাজবাড়ীর কৃষক। ছবি: নিউজবাংলা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির কল্যাণে পাটকাঠির আর্থিক উপযোগিতা বেড়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন পার্টিকেল বোর্ড ও চারকোল কারখানায় রয়েছে এর ব্যাপক চাহিদা।

রাজবাড়ীর পাটের সুনাম দীর্ঘদিনের। দাম ভালো পাওয়ায় প্রতিবছর বাড়ছে পাটের আবাদ, সোনালি আঁশের পাশাপাশি পাটকাঠি বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন চাষিরা।

এক সময় ঘরের ছাউনি,বাড়ির চারপাশে বেড়া,পানের বরজ এমনকি রান্নার কাজে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হতো পাটকাঠি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর আর্থিক উপযোগিতা বেড়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন পার্টিকেল বোর্ড ও চারকোল কারখানায় পাটকাঠির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে ।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, গ্রামীণ সড়কের পাশে পাটকাঠি শুকানোর কাজ চলছে। অনেকেই বাড়ির পাশে উঁচু মাচা বানিয়ে গাদা করে রাখছে পাটকাঠি।

সদর উপজেলার রামকান্তপুরের কৃষক আবু বক্কার শেখ বলেন, ‘আগে পাটখড়ি (পাটকাঠি) ঘরের বেড়া, পানের বরজের ছাউনি আর রান্নার সময় পোড়ানো ছাড়া কোনো কাজে লাগত না। এখন পাটের পাশাপাশি পাটকাঠিও বিক্রি করতে পারছি। দামও ভালো। ভেজা পাটকাঠি প্রতি এক শ আঁটি বিক্রি হয় তিন শ-চার শ টাকায়। আর শুকনোটা বিক্রি করতে পারি পাঁচ শ থেকে সাত শ টাকায়।‘

আরেক কৃষক সালাম মোল্লা বলেন, ‘পাটের আঁশের চেয়ে পাটকাঠি বিক্রি করেই আমাদের ভালো টাকা আসে।‘

পাটকাঠি বিশেষ চুল্লিতে পুড়িয়ে তৈরি কার্বন বা চারকোল চীনসহ কয়েকটি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। কার্বন পেপার, ফটোকপির কালি, আতশবাজি, ফেসওয়াশ, প্রসাধনী পণ্য, মোবাইলের ব্যাটারি, দাঁত মাজার ওষুধ, খেতের সারসহ নানা পণ্য তৈরিতে ব্যবহার হয় এই কার্বন।

রাজবাড়ীর উপসহকারী পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা সোহান হোসেন জানান, উন্নত মানের কারণে এ জেলার পাটকাঠি দেশের বিভিন্ন জায়গার কারখানায় যাচ্ছে। এতে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন কৃষক।

আরও পড়ুন:
আউশ আবাদে ব্যাপক সাড়া

শেয়ার করুন

চাহিদার সময়ই বাড়ল ইউরিয়া সারের দাম

চাহিদার সময়ই বাড়ল ইউরিয়া সারের দাম

নওগাঁয় ইউরিয়া সারের দাম বাড়ায় বিপাকে কৃষক। ছবি: নিউজবাংলা।

কৃষকরা জানিয়েছেন, আমন মৌসুমের শুরুতে ৮১০ থেকে ৮২০ টাকায় ৫০ কেজির প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার বিক্রি হয়েছে। তবে গত ১০-১৫ দিন ধরে প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৮৮০ থেকে ৯২০ টাকায়।

আমন চাষের মধ্যবর্তী সময়ে হঠাৎ নওগাঁয় বেড়েছে ইউরিয়া সারের দাম। ধান চাষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সারটির প্রতি বস্তায় ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন জেলার প্রায় ৬৬ হাজার প্রান্তিক কৃষক।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এই মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের সবজি ও কৃষিশস্য রয়েছে আরও ২৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে।

ভরা মৌসুমে জেলায় ইউরিয়া সারের আনুমানিক চাহিদা ৩৩ হাজার টন। এসব সার সরবরাহে জেলায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) নিবন্ধিত সার ডিলার রয়েছেন ১২৭ জন।

প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে নওগাঁর ১১টি উপজেলায় ৬৬ হাজার পরিবার কৃষির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমন মৌসুমের শুরুতে ৮১০ থেকে ৮২০ টাকায় ৫০ কেজির প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার বিক্রি হয়েছে।

তবে গত ১০-১৫ দিন আগে নানা অজুহাতে সার ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দেন। বর্তমানে প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৮৮০ থেকে ৯২০ টাকায়।

এ বিষয়ে সঠিক তদারকি ও বাজার পর্যবেক্ষণ না থাকায় ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার সুযোগ নিচ্ছেন বলে জানান কৃষকরা।

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার কাশিয়ারা গ্রামের কৃষক আব্দুল মমিন জানান, ‘হামি পাঁচ বিঘা জমিত আমনের আবাদ করিছি। ধান লাগানার শুরুত ইউরিয়া সারের দাম আছিল বস্তাপ্রতি ৮১০-৮২০ টেকা করা। বর্তমানে প্রতি বস্তা দাম ৮৮০ থ্যাকা ৯২০ টেকা পর্যন্ত বাড়া গেছে।

‘প্রতি বস্তায় যদি কয়েক দিনের মধ্যে ৮০ থ্যাকা ১০০ টেকা পর্যন্ত বাড়া যায় তালে হামরা কীভাবে আবাদ করা পোষামু। বেশি মুনাফার আশায় ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াছে ইচ্ছা করা।’

রাণীনগর উপজেলার তিলাবদুর গ্রামের কৃষক সুবল দাস বলেন, ‘হামি ১০ বিঘা জমিত আমন ধানের আবাদ করিছি। প্রতি বিঘাত জমি হালচাষ, নিড়ানি, সার, সেচ, শ্রমিক খরচ দিয়া মোট সাড়ে ৭ হাজার থ্যাকা ৮ হাজারের মতো খরচ হয়। আর ফলন ভালো হলে সর্বোচ্চ ৮ থ্যাকা ১০ মণের মতো ধান পাওয়া যায় প্রতি বিঘাত।

চাহিদার সময়ই বাড়ল ইউরিয়া সারের দাম

‘এখন আমনের ভরা মৌসুম, তাই এখন ইউরিয়া সার জমিত দেওয়া লাগে। তবে বাজারোত প্রতি বস্তাত প্রায় ৮০-১০০ টেকার মতো বেশি দাম বাড়া গেছে। দোকানদাররা কচ্ছে, সারের নাকি সাল্পাই কম, তাই দাম বেশি। এত দাম যদি সারোত বাড়া যায়, জমির অন্য খরচ তো আছেই, সব মিলা তো কুলা উঠা পারমু না হামরা।’

সদর উপজেলার ফতেপুর গ্রামের কৃষক সুজন হোসেন বলেন, ‘হামাকেরে এটি ইউরিয়া সার বস্তাপ্রতি কেনা লাগিচ্ছে ৮৮০ থ্যাকা ৯২০ টাকা দরে। কয়েক দিন আগেই ৮১০ থ্যাকা ৮২০ টেকা বস্তা দাম আছল। হঠাৎ দাম বাড়া গেল। কৃষকরা ধান উৎপাদন করে সবার চাহিদা মিটায়, কিন্তু কৃষকদের সুযোগ-সুবিধা সেভাবে কেউ দেখে না।’

নওগাঁ সদর উপজেলার পাহাড়পুর বাজারের খুচরা সার বিক্রেতা জাহিদুর রহমান জানান, ডিলারদের কাছ থেকে তাদের বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। আমন মৌসুমের শুরুতে ৮০০ টাকায় এক বস্তা ইউরিয়া সার কিনে খুচরায় বিক্রি করেছেন ৮২০ থেকে ৮৩০ টাকা দরে।

এখন ডিলারদের কাছ থেকেই তাদের ৮৬০ থেকে ৮৭০ টাকায় প্রতি বস্তা ইউরিয়া কিনতে হচ্ছে। পরিবহন খরচ যোগ করে খুচরা পর্যায়ে সেই সার তারা কৃষকের কাছে ৮৯০ কেউ ৯২০ টাকা বস্তা হিসেবে বিক্রি করছেন।

নিয়ামতপুর উপজেলার স্থানীয় ছাতড়া বাজারের সার ডিলার আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ইউরিয়া সারের চাহিদা অনুযায়ী আমরা পাচ্ছি না। এ ছাড়া গাড়ি ভাড়াও বৃদ্ধি হয়েছে। এসব কারণে খুচরা পর্যায়ে সার কিছুটা বেশি দামে বিক্রি হতে পারে। তবে আমরা ডিলাররা সরকার নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি করছি। অতিরিক্ত দামে বিক্রি তো করছি না।’

জেলায় ইউরিয়া সারের কোনো সংকট নেই এবং নির্ধারিত দামে ডিলাররা সার বিক্রি করছেন বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) নওগাঁ জেলা শাখার সভাপতি রেজাউল করিম।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘চলতি ভরা মৌসুমে ইউরিয়া ও অন্যান্য সারের কোনো সংকট হয়নি। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ইউরিয়া সারের বরাদ্দ রয়েছে ৩ হাজার ৮০০ টন। ইতিমধ্যে বিসিআইসি ডিলাররা বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারে বাফার গুদাম থেকে বরাদ্দ অনুযায়ী তাদের সার উত্তোলন করেছেন।

‘এখন পর্যন্ত ডিলাররা বেশি দামে সার বিক্রি করছেন এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। কোনোভাবেই যাতে সরকার নির্ধারিত দামের চাইতে বেশি না নেয়া হয় সেটা ডিলারদের নির্দেশনা দেয়া আছে। তবে অভিযোগ পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে কর্তৃপক্ষ।’

নওগাঁর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ শামসুল ওয়াদুদ জানান, ইউরিয়া সারের দাম বেশি নেয়া হচ্ছে কৃষকদের কাছ থেকে এমন অভিযোগ এখন পর্যন্ত পাননি। তবে কৃষকরা যদি সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করেন তাহলে ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি বলেন, ‘আপনি যেহেতু ইউরিয়া সারের দাম বেশি নেয়ার কথা বললেন, সে ক্ষেত্রে আমরা কৃষি বিভাগ থেকে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।’

আরও পড়ুন:
আউশ আবাদে ব্যাপক সাড়া

শেয়ার করুন