শতবর্ষেও স্বাদে অটুট বিউটি লাচ্ছি

বিউটি লাচ্ছির দোকান

কারিগরদের মতে বিউটি লাচ্ছির স্বাদের কারণ এর উপকরণের বিশুদ্ধতা। ছবি: নিউজবাংলা

বিউটি লাচ্ছির মালিক জাবেদ হোসেন বলেন, ‘এখানে রাজ্জাক, শাবানা, কবরী, খলিল, এ টি এম শামসুজ্জামানসহ আরও অনেক সেলিব্রিটিরা আসত। তবে শুধু তাদের আসার জন্য নয়, আমাদের প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্যই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।’

পুরান ঢাকার রায়সাহেব মোড় থেকে জনসন রোড ধরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দিকে এগোলেই রাস্তার পশ্চিম পাশে বিউটি লাচ্ছি ও ফালুদার দোকান। যুগ যুগ ধরে মানুষের তৃষ্ণা মিটিয়ে আসছে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি। একশ বছর পূর্ণ হতে যাওয়া বিউটি লাচ্ছি এখনও তার স্বাদের সুনাম ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে পরিণত হয়েছে ঢাকাবাসীর অন্যতম ঐতিহ্যে।

১৯২২ সালের ১৫ জুন ফুটপাতে লেবুর শরবত ও লাচ্ছি দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন আব্দুল আজিজ। ষাটের দশকে এই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের আব্দুল গাফফার মিয়ার সময়ে দোকানটি বিউটি লাচ্ছি হিসেবে পরিচিতি পায়। এখন লাচ্ছির পাশপাশি ফালুদাও বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি।

ঢাকার ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে বিউটি লাচ্ছি-ফালুদা। শতবর্ষ ছুঁতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটি ঢাকার খাবারের ঐতিহ্যকেও সমৃদ্ধ করেছে।

৩৫ বছর ধরে বিউটি লাচ্ছি-ফালুদা দোকানের মালিক জাবিদ হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বিউটি নামটি আসলে শরবতের সৌন্দর্যকে ছড়িয়ে দেয়া জন্যই দেয়া হয়েছিল। সৌন্দর্য থেকেই এই নাম। সত্যি কথা বলতে কি তখন তো কোনো দোকানপাট ছিলো না আশপাশে।

‘কেউ যদি আসত তাহলে বিউটি লাচ্ছিই বলত। সেই থেকেই আসলে এই নামকরণ হয়েছিল। আর এই রাস্তাটা তো আরও অনেক ছোট ছিল, এটি আস্তে আস্তে যখন বড় হয়, তখন আমাদের দোকানটি বেড়ার ঘরে আসে৷ তারপর এটি বিল্ডিং হয়।’

লাচ্ছি ও ফালুদার অনন্য স্বাদ তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ৯৯ বছর ধরে একই স্থানে চলছে ব্যবসা। বাহাদুর শাহ্ পার্ক এলাকায় ঘোরাঘুরি অথবা আজাদ সিনেমা হলের মর্নিং শো শেষে এখানে গলা ভেজাতে আসতেন তৃষ্ণার্ত ঢাকাবাসী।

শতবর্ষেও স্বাদে অটুট বিউটি লাচ্ছি
একশ বছরের পুরোনো দোকান সামলাচ্ছেন আব্দুল আজিজের উত্তরসূরি জাবেদ হোসেন। ছবি: নিউজবাংলা

পুরান ঢাকার খাবারের সঙ্গে এ অঞ্চলের তৎকালীন শাসকদের যোগসূত্র রয়েছে। মহাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা এই শাসকরা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন বিভিন্ন ধরনের খাবার। শীতল পানীয় হিসেবে পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেই লাচ্ছির কদর রয়েছে।

পারিবারিকভাবে বিউটি লাচ্ছি ও ফালুদা তৈরির কাজ করেন তিন জন কারিগর। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৪৫ বছর ধরে সিনিয়র কারিগর হিসেবে কাজ করছেন মো. শহিদুল্লাহ।

তিনি বলেন, ‘লাচ্ছি মজা হওয়ার একমাত্র কারণ আমাদের আগের আমল থেকে সিনিয়র কারিগররা যেভাবে তৈরি করছে, আমরা চোখে দেখে দেখে মাপটা শিখছি। আগে রাজ্জাক, শাবানা এখানে আসত। এখানে আইসা বইসা লাচ্ছি খাইত।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখানে সবাই নিজেদের লোক। তাই পারিশ্রমিক নিয়ে কোনো কথা ওঠে না। বাকি কারিগর বা স্টাফরাও পারিবারিকভাবেই এখানে আছেন।’

মো. শহিদুল্লাহ জানান, লাচ্ছির স্বাদের মূল রহস্য হলো উপকরণের বিশুদ্ধতা। দইয়ের সঙ্গে চিনির শিরা, বিট লবণ ও নানা ধরনের মসলাপাতি যোগের পর ব্লেন্ড করে লাচ্ছি তৈরি করা হয়। ঐতিহ্যগতভাবে গোলাপ জল, সেমাই বা নুডলস, মিষ্টি বেসিল বীজ, জেলির টুকরো, দুধের মিশ্রণে এটি তৈরি করা হয়। পরে এর ওপরে আইসক্রিম দেয়া হয়।

তিন প্রজন্মের বিউটি লাচ্ছির দোকানটি আব্দুল আজিজের পর তার সন্তান আব্দুল গাফফার মিয়া এবং বর্তমানে তার দুই সন্তান জাবেদ হোসেন ও মানিক হোসেন দেখাশোনা করছেন।

প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান মালিক বড় ভাই জাবেদ হোসেন রায়সাহেব বাজার শাখা ও ছোট ভাই মানিক হোসেন নাজিরাবাজার শাখাটি দেখাশোনা করেন। এ ছাড়া এখন লালবাগ শাখাটি বন্ধ রয়েছে।

শতবর্ষেও স্বাদে অটুট বিউটি লাচ্ছি
পুরান ঢাকার জনসন রোডে গেলেই মিলবে বিউটি লাচ্ছির দোকান

জাবেদ হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখানে রাজ্জাক, শাবানা, কবরী, খলিল, এ টি এম শামসুজ্জামানসহ আরও অনেক সেলিব্রিটি আসত। তবে শুধু তাদের আসার জন্য নয়, আমাদের প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্যই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।’

করোনার কারণে ব্যবসায় মন্দা

মহামারির প্রভাব পড়েছে বিউটি লাচ্ছির ব্যবসাতেও। ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় মন্দায় পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

রায়সাহেব শাখার মালিক জাবেদ হোসেন জানান, করোনা মহামারির আগে গরমের সময় প্রতিদিন তাদের প্রায় ২০ হাজার টাকার বেচাবিক্রি হতো। বছরের অন্যান্য সময়ে সেটি সাধারণত ৭-৮ হাজার টাকা হয়।

মহামারির প্রকোপে ব্যবসায়িক ক্ষতির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘করোনার শুরুতেই আমাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। করোনার জন্য ঠাণ্ডা খাইতে চায় না, তাই খুলি নাই। ২০২০ সালের ২৬ মার্চ বন্ধ হয়, আবার জুনে খুলা হয়, ক্রেতা না থাকায় বন্ধ হয়ে যায়।

‘দুই-তিন মাস পর আবার খোলা হয়। এরপর থেকে টুকটাক চলতে থাকে। তবে মাত্র ১ হাজার-১২শ টাকার বেচাকেনা হয়। করোনার প্রভাবে এখনও বেচাকেনা ভালো নয়। ক্রেতার সংখ্যাও অনেক কম।’

বর্তমানে তারা তিনটি দোকান গড়ে তুললেও দুটি শাখা চালু রয়েছে। পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার, রায়সাহেব বাজারে বিউটি লাচ্ছি ও শরবতের দোকান চালু থাকলেও লালবাগের দোকানটি বন্ধ রাখা হয়েছে।

জাবেদ হোসেন জানান, পুরান ঢাকায় মানুষসহ বিভিন্ন জায়গার ভোজনরসিকেরা এখানে ছুটে আসেন। দোকানে লাচ্ছি, ফালুদাসহ লেবু পানির শরবতও পাওয়া যায়। সাধারণত সপ্তাহে সাত দিনই খোলা থাকে শাখাগুলো। তবে শুক্রবার সকাল থেকে জুমার নামাজের আগ পর্যন্ত বন্ধ থাকে।

তিনি জানান, বিউটি লাচ্ছির দাম ৪০ টাকা। ফালুদার দাম কিছুটা বেশি, ৭০ টাকা। লেবুর শরবত চিনি ছাড়া এবং চিনিসহ গ্লাসে ও পলিথিনের প্যাকেটে দুইভাবেই পাওয়া যায়। এর দাম ২০ টাকা। এ ছাড়া নাজিরাবাজার শাখায় ১০০ টাকায় কাচ্চি বিরিয়ানি পাওয়া যায়।

গাজীপুর থেকে ব্যবসার কাজে ঢাকায় এসেছেন মো. জাহাঙ্গীর বাবু।

তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে চারবার এখানকার লাচ্ছি আর ফালুদা খাওয়া হলো। এক বছর ধরে ব্যবসায়িক কাজে ঢাকায় এলেই এখানে আসতে ভুল করি না। এখানকার লেবুর শরবতটাও ভালো হয়।’

পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা জাকারিয়া ইসলাম জিকো বলেন, ‘আমি এখানকার লাচ্ছি অনেক দিন খেয়েছি। এছাড়া ফালুদা, শরবত থেকে শুরু করে প্রায় সব আইটেমই খেয়েছি। কোনো ধরনের ক্ষতিকর মেডিসিন বা অন্য কিছু ব্যবহার না করেও যে ভালো কিছু তৈরি সম্ভব, সেটির একটি উদাহরণ বিউটি লাচ্ছি।’

জাবেদ হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রথমদিকে লাচ্ছির দাম ছিল এক আনা কি দুই আনা। আমাদের ব্যবসার খাবারটি আসলে শখের খাবার। এটির স্বাদ হচ্ছে ঠাণ্ডা। করোনার কারণে মানুষ ঠাণ্ডা খায় না। এ জন্য ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে।

‘আমাদের ফুডপান্ডার ব্যবস্থা আছে। অনুষ্ঠান কিংবা পার্টি থাকলে আমরা সেখানে গিয়ে সবকিছু করে দিয়ে আসি। তাছাড়া কেউ বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইলে ফুড গ্রেডের পলিথিনে করে দিয়ে দেয়া হয়। কেউ কেউ বোতল নিয়ে আসে সেটিতে করে নিয়ে যায়। ভবিষ্যতে ধানমন্ডি, গুলশানে যাওয়ার চিন্তাভাবনা আছে।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য

সুনীল জলের হাতছানি দিচ্ছে সাবরাং

সুনীল জলের হাতছানি দিচ্ছে সাবরাং

টেকনাফের সাবরাং এক্সক্লুসিভ টুরিস্ট পার্ক। ছবি: সংগৃহীত

টেকনাফের সারবাংয়ে গড়ে তোলা হবে অত্যাধুনিক পর্যটন নগরী। এতে থাকবে স্নরকেলিং, স্কুবা ডাইভিং, প্যারাসেইলিং, জেট স্কিইং, পেডাল বোটিং, বিচ ভলিবল, বিচ বোলিংসহ পর্যটনের নানা অনুষঙ্গ যা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ পর্যটনে উন্নত বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। এ ছাড়াও পর্যটকদের সেবা দিতে গড়ে তোলা হবে একাধিক পাঁচ ও তিন তারকা মানের হোটেল ও নাইট ক্লাব।

কক্সবাজার সৈকতের ঘোলা পানি নিয়ে আক্ষেপের দিন শেষ হতে চলেছে। সমুদ্রপ্রেমীদের জন্য সুনীল জলের হাতছানি দিচ্ছে টেকনাফের সাবরাং এক্সক্লুসিভ টুরিস্ট পার্ক।

পর্যটন পার্কটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) বলছে, এটি চালু হলে কক্সবাজারের পর্যটন খাত আমূল বদলে যাবে।

বেজা জানিয়েছে, পর্যটনের জন্য বিশেষ এ অঞ্চলে বিনিয়োগকারীদের প্লট বরাদ্দ শেষ, এখন চলছে ভূমি উন্নয়নের কাজ। সেটি শেষ হলেই স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু হবে।

এই পর্যটন পার্কের পরিকল্পনা করা হয় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর। শুরুতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনকে এলাকাটি উন্নয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। পরে দায়িত্ব পায় বেজা।

২০১৪ সালে কক্সবাজারের টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নে ৯৬৭ একর জমিতে এ পর্যটন পার্ক তৈরির কাজ শুরু হয়। এটি নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করা। তবে এতে দেশি পর্যটকরাও যেতে পারবেন। সরকারি-বেসরকারি অংশিদারিত্বে নির্মাণ হচ্ছে এই পার্ক।

দেশে বিদেশি পর্যটকের কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান না থাকলেও সরকারি হিসেবে প্রতি বছর দেশে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ বিদেশি নাগরিকের আনাগোনা থাকে। এর মধ্যে পর্যটক যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন বিনিয়োগকারী বা ব্যবসায়ীরাও। সরকার আশা করছে, সাবরাং পর্যটন পার্ক যাত্রা শুরু করলে এ সংখ্যা আরও বাড়বে।

বলা হচ্ছে, এই পার্কে প্রতিদিন পায় ৩৯ হাজার পর্যটক পর্যটন সেবা নিতে পারবেন।

নির্মিতব্য এই বিশেষ পর্যটন এলাকাটির অবস্থান কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার আর টেকনাফ থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের সাথে এলাকাটির সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এর দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে অবস্থান বঙ্গোপসাগরের। কক্সবাজার বিমানবন্দরে নেমে সড়কপথে সাবরাং যেতে সময় লাগবে প্রায় দেড় ঘণ্টা।

এখন পর্যন্ত এই সাবরাং পর্যটন পার্কে বিনিয়োগ এসেছে ২৪ কোটি ডলারেরও বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে এ অঞ্চলে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এখানে গড়ে তোলা হবে অত্যাধুনিক এক পর্যটন নগরী।

এতে থাকবে স্নরকেলিং, স্কুবা ডাইভিং, প্যারাসেইলিং, জেট স্কিইং, পেডাল বোটিং, বিচ ভলিবল, বিচ বোলিংসহ পর্যটনের নানা অনুষঙ্গ যা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ পর্যটনে উন্নত বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। এ ছাড়াও পর্যটকদের সেবা দিতে গড়ে তোলা হবে একাধিক পাঁচ ও তিন তারকা মানের হোটেল ও নাইট ক্লাব।

সুনীল জলের হাতছানি দিচ্ছে সাবরাং

বেজার পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. মাহবুবুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখন মাঝ পর্যায়ের কাজগুলো চলছে। প্লট তো দেয়া হয়ে গেছে। ক্যানেলের কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে একটি প্রশাসনিক ভবন করছিলাম সেটার কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে।

‘মাটি ভরাটের টেন্ডার ইন্টারন্যাশনাল টেন্ডার, সেটার পর্যবেক্ষণ চলছে। মাটি ভরাট হলেই আসলে ডেভেলপার যারা প্লট নিয়েছে তারা কাজ শুরু করে দেবে।’

সাবরাং পর্যটন পার্কটি তৈরি হয়ে গেলে পুরো কক্সবাজারের পর্যটন খাত বদলে যাবে বলে মনে করছে বেজা। মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এর কারণ হলো এটা সমুদ্রের কাছে। তারপর এটা আমরা পুরোটাই পরিকল্পিতভাবে করছি। এতে খোলা জায়গা থাকবে, ক্যানেল থাকবে, ভেতরে এমিউজমেন্টের ব্যবস্থা থাকবে। মানে একটা অত্যাধুনিক পরিকল্পনা করে আমরা সামনে এগুচ্ছি।

‘কক্সবাজারে যেটা হয়েছে, সেটা কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে হয়েছে। যে যেভাবে পেরেছে, করেছে। এখানে কিন্তু সেটা না। প্লট দেয়া হলেও একটি স্ট্যান্ডার্ড বজায় রেখেই ভবন করতে হবে। ভেতরে সবুজ বাতাবরণ থাকবে। পরিবেশটাই হবে অন্যরকম। যখন এটা চালু হবে, আমার মনে হয় পর্যটকরা অবশ্যই এখানে আসবে।’

সাবরাং থেকে মাত্র আধাঘণ্টায় যাওয়া যায় দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনস। এর ফলে পর্যটকরা দিনে গিয়ে দিনেই সেখান থেকে ফিরে আসতে পারবেন। আর এতে ঝুঁকির মধ্যে থাকা সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ বৈচিত্রও রক্ষা পাবে।

মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এখান থেকে আবার সেন্ট মার্টিন দেখা যায়, খুব কাছেই। এ কারণে এটিই হবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান। এখানে আবার আমরা একটি ফটো কর্নার করেছি, ক্লক টাওয়ারের মতো।

‘এটা চালু হলে এই এলাকার অর্থনীতিই বদলে যাবে পাশাপাশি মানুষের রুচিতেও আমূল পরিবর্তন আসবে।’

সুনীল জলের হাতছানি দিচ্ছে সাবরাং

বিদেশি পর্যটকদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হলেও এটিতে যেতে পারবেন দেশি পর্যটকরাও। মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এটা এক্সক্লুসিভলি বিদেশি পর্যটকদের জন্য হবে না। যদিও এখন আমরা যে পলিসি তৈরি করছি তাতে বিদেশি পর্যটকই আমাদের মূল টার্গেট। বৈদেশিক মুদ্রা মূল টার্গেট। কিন্তু এর মধ্যে দেশিরা যে আসতে পারবে না তা না।

‘এখানে যে হোটেল রিসোর্টগুলো হবে, সেগুলোতে একটা স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করা হবে। যেমন, যদি ধরা যায় রয়্যাল টিউলিপ হোটেল, এটাতে তো বিদেশি ও দেশি উভয় পর্যটকই থাকতে পারে। ঠিক এ ধরনের স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করা হবে। ভেতরে যে কেউ যেতে পারবে, ঘুরতে পারবে। সুন্দর একটা গেট করছি, টেন্ডার হয়ে গেছে। যখন মূল কাজগুলো হয়ে যাবে, তখন বিনিয়োগকারীরা আসবে, কাজ করতে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই পর্যটনের বিকাশ হবে না, বরং মনোযোগ দিতে হবে ব্র্যান্ডিংয়ে।

পর্যটন বিষয়ক পত্রিকা বাংলাদেশ মনিটরের সম্পাদক কাজী ওয়াহেদুল আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ রকম একটি পার্ক বা পর্যটন অঞ্চল যদি করা যায়, এটি নিঃসন্দেহে খুব ভালো একটি উদ্যোগ। তবে যে কোনো ভাল উদ্যোগকে সমর্থনের জন্য ভাল নীতিও থাকতে হয়। আমাদের দেশের ট্যুরিজম পলিসিটাই তো এখনও ঠিক হয়নি। পর্যটনের জন্য কোনো মাস্টারপ্ল্যানও নেই।

‘এই যে একটা ভাল জিনিস আমরা করছি, এটাকে মার্কেটিং কীভাবে করব? কীভাবে বিদেশি পর্যটকদের এখানে আসতে উদ্বুদ্ধ করব? আমরা কতটুকু সুযোগ সুবিধা দিতে পারব – এই বিষয়গুলোও একই সাথে ভাবতে হবে। দেশের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। আমাদের তো অনেক প্রডাক্ট রয়েছে, যেমন সুন্দরবন বা কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত অথবা বুদ্ধিস্ট হ্যারিটেজ। কিন্তু এগুলো কি আমরা বিদেশিদের কাছে তুলে ধরতে পারছি?’

তিনি বলেন, ‘শুধু কিছু অবকাঠামো তৈরি করেই যদি আত্মতুষ্টিতে ভুগি, তাহলে কিন্তু সুফল পাওয়া যাবে না। পর্যটকবান্ধব একটি মাস্টারপ্ল্যান করতে হবে, ব্র্যান্ডিং করতে হবে। সর্বোপরি পর্যটন খাতকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।’

শেয়ার করুন

স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন নন্দিত বাস্তবতা 

স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন নন্দিত বাস্তবতা 

স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন বাস্তবতা। ছবি: নিউজবাংলা

প্রমত্তা পদ্মার ওপর প্রায় এক যুগ ধরে চলা মহাসেতু নির্মাণের মহাযজ্ঞ দেখতে গত ১ সেপ্টেম্বর বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর বাড্ডার অফিস থেকে যাত্রা শুরু করে নিউজবাংলা টিম। যাত্রাবাড়ীর পর নিউজবাংলার গাড়ি ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে ঢুকে যেন চোখের পলকেই চলে গেল পদ্মা সেতু এলাকায়। যে সেতু চালু হলে ৫৫ কিলোমিটারের এই এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে যাত্রাবাড়ীর হানিফ ফ্লাইওভার সংলগ্ন গোলচত্বর থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা মোড় যেতে সময় লাগবে মাত্র ৪০-৪৫ মিনিট।

এ যেন এক যুদ্ধ। তাদের কোনো রাত-দিন নেই। শীত-বর্ষা-গ্রীষ্ম এমনকি রোদ-বৃষ্টিকে থোড়াই কেয়ার। নেই করোনা অতিমারিতে আতঙ্কনীল হয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ। আছে শুধু কাজ শেষ করার অদম্য ক্ষুধা। স্বপ্নে সঞ্জীবিত কর্মীরা নিরলস, যেন ব্রতে ব্যাপৃত। স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণে ইতিহাসের অংশ হওয়ার অঙ্গীকার সবার।

তাদের কারো চোখে-মুখে নেই ক্লান্তির ছাপ। আছে আনন্দের ঝিলিক আর অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার বুকভরা সাহস। মেহনতি ঘাম ও নিষ্ঠার গাঁথুনি যেন বহুমুখী এই সেতুকে আরও বেশি মজবুত করে তুলছে।

প্রমত্তা পদ্মার ওপর প্রায় এক যুগ ধরে চলা মহাসেতু নির্মাণের মহাযজ্ঞ দেখতে গত ১ সেপ্টেম্বর বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর বাড্ডার অফিস থেকে যাত্রা শুরু করে নিউজবাংলা টিম।

যাত্রাবাড়ীর পর নিউজবাংলার গাড়ি ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে ঢুকে যেন চোখের পলকেই চলে গেল পদ্মা সেতু এলাকায়। যে সেতু চালু হলে ৫৫ কিলোমিটারের এই এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে যাত্রাবাড়ীর হানিফ ফ্লাইওভার সংলগ্ন গোলচত্বর থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা মোড় যেতে সময় লাগবে মাত্র ৪০-৪৫ মিনিট।

সরকারের প্রত্যাশা, এই সেতু হলে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২৩ শতাংশ বাড়বে।

সেতু বললে আসলে যে ছবি আমাদের মনে ভাসে সেই ছবি দিয়ে কোনোভাবেই মেলানো সম্ভব নয় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অবকাঠামোকে। প্রমত্তা পদ্মায় দ্বিতল এই সেতুর ওপর দিয়ে চার লেনে চলবে গাড়ি, নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। সেতুর তলদেশ দিয়ে বাংলাদেশে অনুমোদিত যেকোনো ধরনের নৌযান চলাচল করতে পারবে অনায়াসে। সেতুর নিচতলা দিয়ে যাচ্ছে গ্যাসের পাইপলাইন, যে লাইন দিয়ে গ্যাস পৌঁছাবে এই জনপদসহ আশপাশের অনেক জেলায়।

২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মূল সেতু ও নদীশাসন কাজ উদ্বোধন করেন। এর আগে ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি শুরু হয় নকশা ও পুনর্বাসন কাজ।

নিউজবাংলার চোখে পদ্মা সেতু

পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্ট দিয়ে পদ্মা নদীর দুই প্রান্তকে যুক্ত করেছে দেশের সবচেয়ে বড় এই সেতু অবকাঠামো প্রকল্প। কড়া নিরাপত্তা আর পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে দিন-রাত তিন শিফটে কাজ করছেন দেশি-বিদেশি শ্রমিক-প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টরা।

সেদিন সকাল ৯টার দিকে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তের সংযোগ সড়কের নিচে পৌঁছায় নিউজবাংলা টিম। নিরাপত্তা বলয় পেরিয়ে সেতুর নিচ দিয়ে ঢুকতেই নজরে পড়ে কর্মীদের ব্যস্ততা। দেখা যায় বড় বড় ক্রেন, নির্মাণ সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি এবং নানা আকৃতির ব্লক।

স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন নন্দিত বাস্তবতা

সামনে এগোতেই সেতু কর্তৃপক্ষের একজন প্রতিনিধি আমাদের দলের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি সেতু পরিদর্শনের নিয়ম সম্পর্কে ‘সচেতন বার্তা’ দেন।

মোহাম্মদ ইরফান নামের এই প্রতিনিধি জানান, মূল সেতুতে উঠতে হবে ১ নম্বর পিলারসংলগ্ন লোহার সিঁড়ি দিয়ে, যে সিঁড়ি প্রায় ১২ তলা সমান উঁচু। সেতুতে উঠে বাংলাদেশি শ্রমিক ছাড়া বিদেশি কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা যাবে না বলে সতর্ক করে দেন তিনি।

ইরফান বিশেষ জোর দিয়ে বলেন, ‘আমরা আর যাই করি, চীনের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মীর সঙ্গে যেন কোনো ধরনের কথা বলার চেষ্টা না করি।’ এরপর ইরফানের দেখানো সিঁড়ি বেয়ে মূল সেতুতে ওঠে নিউজবাংলা টিম।

তখন সকাল সাড়ে ১০টা। সেতুর ওপরে সূর্যের আলো ঠিকরে পড়েছে। সেতুর দুই পাশে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কাজ করছেন শ্রমিকরা। তাদের সবার মাথায় সবুজ রঙের হেলমেট, মুখে মাস্ক। কেউ কেউ সেতুর রেলিংয়ের কাজ করছেন। কেউ কেউ রড কাটছেন। আবার কেউ কেউ প্যারাপেট ওয়াল বসানোর কাজে ব্যস্ত। মাঝেমধ্যেই তাদের কর্মকাণ্ড চীনের কর্মকর্তারা তদারকি করছেন।

ব্যস্ত এই শ্রমিকদের একজন মো. শাহীন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পদ্মা সেতুর কাজের শুরু থেকেই কাজ করছি। আগে নিচে করেছি, এখন সেতুর ওপরে উঠেছি। বসেরা যখন যে কাজ দেন, তাই করি। এখন করছি রেলিংয়ের কাজ।’

স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন নন্দিত বাস্তবতা

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) কর্মকর্তারা বলছেন, সেতুর দুই পাশে রেলিং, প্যারাপেট ওয়াল ও ডিভাইডারের কাজ এগিয়ে চলছে। মাওয়া-জাজিরাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এখানে মাসিক বেতনের চুক্তিতে কাজ করছেন।

একজন শ্রমিক বলেন, এই কাজ করার সময় মাঝেমধ্যেই ভারী যন্ত্রপাতির আঘাত পান তারা। তাদের মধ্যে কারও কারও হাত, কারও কারও পা থ্যাঁতলে গেছে। তারপরও নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশায় কাজ করে যাচ্ছেন।

প্রকল্পে প্রায় ৮ বছর ধরে কাজ করছেন গাইবান্ধার মো. শরিফ। প্রথমে করেছেন ওয়েল্ডিংয়ের কাজ। এখন তিনি ফোরম্যান। তার অধীনে ছয়জন কর্মী সেতুর রড, বিদ্যুৎ, পিলার ও স্ল্যাবের যেকোনো কাজে পারদর্শী। কথা বলার সময় তিনি করছিলেন স্ল্যাবের কাজ।

নিউজবাংলাকে শরিফ বলেন, ‘প্রথম দিকে চাইনিজদের ভাষা বুঝতে কষ্ট হয়েছে। কাজেও ভুল ছিল। এখন কোনো কষ্ট নেই। ওদের ভাষা বুঝি। কাজও পারি। ওরা প্রশংসা করে।’

স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন নন্দিত বাস্তবতা

প্রকল্পে ৫ বছর ধরে কাজ করছেন মাওয়ার বাসিন্দা শান্ত মোহাম্মদ। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘চাইনিজ ছাড়াও জার্মান, মালয়েশিয়ান ও ভারতীয়রা এই সেতুর কাজ করে। এরা সবাই বস। তবে মালয়েশিয়ানদের চেয়ে জার্মানির কর্মকর্তারা বড়। যখন কোনো বড় ধরনের প্রবলেম হয় তখন ওরা খালি চেক দেয়ার জন্য আসে। ইন্ডিয়ানরা আসে ওপরের যেসব রিস্কি কাজ থাকে সেগুলা করার জন্য। যেমন টাওয়ারের কাজ।’

মূল সেতুর এক নম্বর পিলারের পাশেই কাজ করছিলেন শাহীন নামের আরেক শ্রমিক। নিউজবাংলাকে তিনি জানান, প্রত্যেক পিলারকে কেন্দ্র করে একেকজন ফোরম্যানের অধীনে ভিন্ন ভিন্ন দল সেতুর ভিন্ন ভিন্ন কাজে যুক্ত। পি ওয়ান পিলারের কাছে পাঁচজন ফোরম্যান কাজ করছেন। তাদের অধীনে ১১০-১২০ জন কর্মী রয়েছেন।

সেতুর ওপরের শ্রমিকদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা বলতে বলতে নিউজবাংলা টিম হাঁটতে থাকে জাজিরা প্রান্তের দিকে। কাজের প্রায় একই দৃশ্য দেখতে দেখতে ৮ নম্বর পিলারের কাছাকাছি গিয়ে ফিরে আসে ১ নম্বর পিলারে। এরপর নিউজবাংলা টিম নিচে নামে, সিঁড়ি বেয়ে উঠে রেল সেতুর কাজ দেখতে। সেখানেও দলে দলে ভাগ হয়ে অনেক শ্রমিককে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যায়।

সেতুতে ‘ফেরির ধাক্কা’ নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে কর্তৃপক্ষ সব ধরনের ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় নিউজবাংলা টিম মাওয়া প্রান্তের মাছবাজার ঘাট থেকে ট্রলারে চড়ে কাঁঠালবাড়ী ঘাটে যায়। দুপুর ২টার দিকে কাঁঠালবাড়ী পৌঁছে দেখা যায় প্রাণহীন ঘাট। ঘাটের বেশিরভাগ হোটেল খোলা থাকলেও কোনো মানুষ কিংবা যাত্রী দেখা যায়নি।

কাঁঠালবাড়ী থেকে অটোরিকশায় চড়ে পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তের উদ্দেশে রওনা দেয় নিউজবাংলা টিম। ১৫ থেকে ২০ মিনিট যাওয়ার পর দূর থেকেই পদ্মা সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক, সংযোগ সেতু দেখা যায়। সেনাবাহিনীর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেডের অনুমতি নিয়ে মেঠোপথ ধরে ৪২ নম্বর পিলার পর্যন্ত যায় নিউজবাংলা টিম। মাওয়া প্রান্তের ১ নম্বর পিলার থেকে জাজিরা প্রান্তের এই ৪২ নম্বর পিলার পর্যন্তই মূল সেতু।

৪২ নম্বর পিলার এলাকায় যেতে যেতে দেখা যায়, সেতুর নিচ দিয়ে বড় বড় ব্লক নিয়ে নদী শাসনের কাজের ব্যস্ততা। এ সময় সেতুর ওপর থেকে ভেসে আসছিল টুং-টাং শব্দ। ৪২ নম্বর পিলারের গোড়ায়ও আছে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি দিয়ে শ্রমিকরা ওঠানামা করছেন। চাইনিজ সিকিউরিটিজ সার্ভিসের সদস্যরা পিলারের ওপরে ওঠার সিঁড়ির নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। নদীর তীর ঘেঁষে টহল দিচ্ছেন সেনা সদস্যরা।

কয়েকজন শ্রমিক জানান, ওপরে রেল ও সড়ক সেতুর কাজ চলছে। রোডওয়ে স্ল্যাব ও রেল স্ল্যাব বসানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রেলিং ও প্যারাপেট ওয়াল তৈরিসহ পিচ ঢালাইয়ের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।

৪২ নম্বর পিলারের নিচে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলার পর নিউজবাংলা টিম এগিয়ে যায় পদ্মা নদীর পাড়ে। সেখান দেখা যায়, দুই চরের মাঝ দিয়ে মাওয়ার দিকে চলে গেছে পদ্মা সেতু। সেতুর নিচ দিয়ে চলাচল করছে নানা ধরনের নৌযান। পার ধরে টহল দিচ্ছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা।

সূর্য ডোবার পর নিউজবাংলার টিম প্রকল্প এলাকা থেকে বেরিয়ে যায়। গনির মোড় এলাকায় কথা হয় বেশ কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে, যারা চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন।

স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন নন্দিত বাস্তবতা

নিউজবাংলাকে তারা বলেন, স্বপ্নের এই সেতুর জন্য জমি দিয়েছেন। কিন্তু সেতুর সঙ্গে শরীয়তপুরের কোনো সংযোগ সড়ক নেই। সেতু ঘিরে যেসব উন্নয়ন প্রকল্প হচ্ছে তার সবই হচ্ছে মাদারীপুরকে কেন্দ্র করে, বিশেষ করে মাদারীপুরের শিবচরকে কেন্দ্র করে। বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের অসন্তোষ, ক্ষোভও আছে তাদের মধ্যে।

কাছাকাছি প্রতিক্রিয়া জানান সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) শরীয়তপুরের সভাপতি আহসান উল্লাহ ইসমাইলী ও আইনজীবী আজিজুর রহমান রোকন। তাদের কথার সূত্র ধরে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা। তারা শুনিয়েছেন পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে শরীয়তপুরের ব্যাপক সম্ভাবনার কথা।

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মো. পারভেজ হাসান মনে করেন, এই সেতুর কারণে শরীয়তপুরের বাসিন্দাদের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মনোজাগতিক উন্নয়ন হবে। কোনোটা খুব দ্রুত, কোনোটা ধীরে ধীরে। সবমিলে হংকং বা সিঙ্গাপুরের মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ার সম্ভাবনা আছে শরীয়তপুরে।

উপহাস আর ষড়যন্ত্রের কথা

দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বাঙালি জাতির স্বপ্ন এখন বাস্তব। পদ্মা সেতু যাতে না হয় সে জন্য ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল এ দেশের কয়েকটি সংবাদপত্র, যেগুলো দিনের পর দিন পদ্মা সেতুর কল্পিত দুর্নীতি নিয়ে মনগড়া গল্প চালিয়ে গেছে। শতসহস্র এসব গল্প উড়িয়ে দিয়ে পাঁচ বছরের বেশি সময়ের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে কানাডার আদালত বলেছে, এই মামলায় যেসব তথ্য দেয়া হয়েছে, তা অনুমানভিত্তিক, গালগল্প এবং গুজবের বেশি কিছু নয়।

দুর্নীতির এই অভিযোগ নিয়েই টানাপোড়েনের জের ধরে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ায় বিশ্বব্যাংক। পরে নিজস্ব অর্থায়নেই বাংলাদেশ পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করে।

পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছাবেদুর রহমান খোকা সিকদার নিউজবাংলাকে জানিয়েছেন, এই সেতু নিয়ে ৯০ দশকের আন্দোলন এবং আন্দোলনের কারণে অনেক মানুষের টিটকারী, হাসি-তামাশার শিকার হওয়ার কথা। অনেকেই তাকে পাগলও বলেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন নন্দিত বাস্তবতা

বর্তমানে শরীয়তপুরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বে থাকা খোকা শিকদার জানিয়েছেন, আন্দোলনের এই পুরো সময়ে ক্ষমতায় ছিল জাতীয় পার্টি ও বিএনপি। তিনি বলেন, ‘২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর ভিত্তি স্থাপন করেন শেখ হাসিনা। তারপর বিএনপি সরকার এসে সেটা ভেঙে ফেলে। তারপরের ইতিহাস সবাই জানেন। সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে শেখ হাসিনা নিজেদের টাকা দিয়ে নিজেই পদ্মা সেতু করলেন।’

নিউজবাংলার সঙ্গে কথা বলার সময় পদ্মা সেতুর সম্ভাবনা তুলে ধরার পাশাপাশি পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন কমিটির বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি, নানা ধরনের উপহাস আর ষড়যন্ত্রের প্রসঙ্গ তোলেন শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম।

উপমন্ত্রী বলেন, ‘আমি তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা। যুক্ত হই ছাবেদুর রহমান খোকা শিকদারের নেতৃত্বাধীন পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন কমিটিতে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নির্দেশনায় এই সেতুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচিতে অংশ নেই। সে সময় এই সেতুর কথা বলে আজকের বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা পর্যন্ত উপহাস করেছিলেন।

‘নানা ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিলেন পদ্মা সেতু ঠেকাতে। কিন্তু দেশপ্রেমে বলীয়ান শেখ হাসিনাকে কেউ দমাতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নদী পার হয়ে জাজিরায় গেছেন। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অধিকার আদয়ের জন্য চষে বেরিয়েছেন এই জনপদ। আজ সেই নদীর বুক চিরে পদ্মা সেতু দাঁড়িয়ে যেন বঙ্গবন্ধুকেই কুর্নিশ করছে। এই সেতুর ফলে এখানকার জনপদে উন্নয়নের আলো ছড়িয়ে পড়েছে।’

প্রকল্পের কর্মীদের তথ্য

সে এক মহাযজ্ঞ। ২২ বছর ধরে ২০ হাজার শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি হয়েছিল ঐতিহাসিক তাজমহল। তাহলে পদ্মা সেতুর বিশাল কর্মযজ্ঞে কত শ্রমঘণ্টা যুক্ত হয়েছে তা জানার কৌতূহল আমাদের। কিন্তু সেতু কর্তৃপক্ষ এমন সুনির্দিষ্ট হিসাব দিতে পারেনি। তবে কত শ্রমিক কাজ করছে তার একটি হিসাব পাওয়া গেল।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা নিউজবাংলাকে জানান, ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি নকশা ও পুনর্বাসনের কাজ শুরুর সময়ই ৫০০ কর্মী ছিলেন। এরপর কাজের সঙ্গে বাড়তে থাকে কর্মী। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রকল্পের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের সময় ১২০০ থেকে ২০০০ কর্মী ছিলেন।

স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন নন্দিত বাস্তবতা

২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে ২০ হাজার কর্মী কাজ করেছেন। এরপর কাজের চাপ কমে যাওয়ায় কর্মীর সংখ্যাও কমতে থাকে। ২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মাসে সাড়ে ৪ হাজার কর্মী কাজ করছেন। তাদের মধ্যে ৪ হাজার জনই বাংলাদেশি। বাকি ৫০০ কর্মী ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ বিশ্বের ২২টি দেশের নাগরিক।

দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, কলম্বিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নেপাল এবং আফ্রিকার দেশ তানজানিয়া। বিদেশি কর্মী-কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে চীনের।

বিদেশিদের মাসিক বেতন সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা থেকে সর্বনিম্ন ৮০ হাজার। বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে শ্রমিক থেকে ফোরম্যান পর্যন্ত বেতন ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার পর্যন্ত।

দেশি-বিদেশি উপকরণ

বিবিএ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পদ্মা সেতুর পিলার ও স্ল্যাব তৈরির জন্য স্টোন চিপ আনা হয়েছে দুবাই ও ভারত থেকে। যে রড সিমেন্ট বালু লেগেছে তার সবই দেশি। প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানান, সেতু তৈরির প্রধান প্রধান উপকরণের মধ্যে বাংলাদেশের এমএস রড, বালু ও সিমেন্টই ব্যবহার হয়েছে। অন্যান্য প্রধান সব উপকরণই বিদেশ থেকে আনা হয়। সেতুর আলোকস্জ্জার কাজ দেশি বা বিদেশি যেকোনো কোম্পানিই পেতে পারে বলেও জানান প্রকল্প পরিচালক।

৬ থেকে ৩৮ নম্বর পিলারের মধ্য দিয়ে চলবে নৌযান

বিবিএ কর্মকর্তারা জানান, মূল সেতুর ৬ নম্বর থেকে ৩৮ নম্বর পিলারগুলোর যেকোনো ফাঁকা জায়গা দিয়ে নৌযান চলাচল করতে পারবে। এর প্রত্যেকটি পিলারের পাইল ক্যাপ থেকে সেতু পর্যন্ত উচ্চতা ১৮ দশমিক ৩ মিটার। দুই পিলারের মাঝের দূরত্ব ১৩১ মিটার। বর্ষা মৌসুমে পানির স্তর পাইল ক্যাপের নিচেই থাকে। আর ১৮ দশমিক ৩ মিটার উচ্চতার বেশি কোনো নৌযান নেই বাংলাদেশে।

প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ও মেয়াদ

২০০৭ সালের আগস্টে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। সর্বশেষ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।

পদ্মায় মূল সেতু নির্মাণের কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। ২০১৫ সালে ৭ নম্বর পিলার বসানোর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হয়। এই জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই সেতুর কাজ। তবে করোনা মহামারি ও প্রবল বন্যায় কাজের ব্যাঘাত হওয়ায় আরও দুই বছর বেড়েছে প্রকল্পের মেয়াদ।

প্রকল্প পরিচালক জানান, ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৮৭.৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে মূল সেতুর অগ্রগতি হয়েছে ৯৪.৫০ শতাংশ। নদী শাসনের কাজ হয়েছে ৮৪.৭৫ শতাংশ।

কবে নাগাদ সেতু যান চলাচলের উপযোগী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ হচ্ছে ২০২২ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করা। এর মধ্যেই যান চলাচলের উপযোগী করা। কবে কোন গাড়ি দিয়ে উদ্বোধন করা হবে, তা ঠিক করবে সরকার।’

সেতুর টোল ও নিরাপত্তা

বিবিএ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশন কোম্পানি (কেইসি) সেতুর ওপর চলাচলকারী যানবাহনের টোল আদায়ের কাজ পেতে পারে। আনুষ্ঠানিক চুক্তি না হলেও দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিটির সঙ্গে আলোচনা অনেকটাই এগিয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘আমি শুনেছি, সেতু কর্তৃপক্ষ কেইসির সঙ্গে আলোচনা করছে। এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’

প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘সেতুর নিরাপত্তা দেখভাল করবে সেতু কর্তৃপক্ষই। সেনাবাহিনী সামগ্রিক নিরাপত্তার বিষয়টি তদারকি করবে। দূর থেকে তারা পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকবেন।’

অর্থনৈতিক প্রভাব

বিবিএ বলছে, সেতুটি দক্ষিণের ১৯ জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকাসহ পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন নিশ্চিত করবে। দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দরটি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে বেনাপোল স্থলবন্দরেরও। পদ্মা সেতু এশিয়ান হাইওয়ে রুট অঐ-১ এর অংশ হওয়ায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

এসব যোগাযোগের ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২৩ শতাংশ বাড়ার যে আশা করা হচ্ছে সে প্রসঙ্গে কথা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের সঙ্গে।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমরা সম্ভাব্যতার বড় জায়গাটায় না গেলাম, সর্বনিম্ন সমীক্ষাটিও যদি গ্রহণ করি, তাহলেও দক্ষিণ বাংলার যে ২১ জেলা আছে সেখানে ২ শতাংশ জিডিপি বাড়বে। আর পুরো দেশের জিডিপি কম করে হলেও ১ শতাংশ বাড়বে, এর বেশিও বাড়তে পারে।’

রেল সংযোগ প্রকল্পে ইলেকট্রিক ট্রেন

পদ্মা সেতু প্রকল্পের অধীনে যান চলাচল ও ট্রেনের লাইন হচ্ছে। দুই পারের সঙ্গে রেল সংযোগ করছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এ প্রকল্পের নাম দেয়া হয়েছে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প (পিবিআরএলপি)।

বাংলাদেশ রেলওয়ের বৃহত্তম এই প্রকল্পের অধীনে রাজধানী ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার রেললাইন হচ্ছে। প্রকল্পটির সর্বশেষ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ কোটি ২৪৬ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের সময় দুই বছর বাড়িয়ে করা হয়েছে ২০২৪ সাল পর্যন্ত।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চীন সরকারের ঋণের অর্থে এই প্রকল্প জি টু জি পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করছে চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড (সিআরইসি)। প্রকল্পে ঢাকার মেট্রোরেলের মতো ইলেকট্রিক ট্রেনের প্রযুক্তি থাকবে।

এই রেললাইনের মাধ্যমে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে জাতীয় ও আন্ত দেশীয় রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। রেলপথটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২৩টি জেলায় প্রথম রেলসংযোগ স্থাপন করবে। ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত সার্বিক অগ্রগতি ৪৩ দশমিক ৫০ শতাংশ।

স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন নন্দিত বাস্তবতা

রেল প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের নিয়ে গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যান রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। রেলমন্ত্রীর এই সফরের সঙ্গী ছিল নিউজবাংলাও।

রেলমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, আগামী বছরের জুনে পদ্মা সেতু দিয়ে একসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও ট্রেন চলাচল শুরু করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সেতু কর্তৃপক্ষ পদ্মা সেতুতে রেলপথ স্থাপনের অংশ রেলওয়েকে বুঝিয়ে না দিলে এ কাজ যথাসময়ে অর্থাৎ জুনের মধ্যে শেষ হবে না। এতে করে জুনে পদ্মা সেতু দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু করা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

নদী শাসন ৮৫% শেষ

পদ্মা সেতুর জন্য নদী শাসন বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। এ কাজ পেয়েছে চীনের আরেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন। চুক্তি হয় ২০১৪ সালের নভেম্বরে। এ পর্যন্ত ৮৫ শতাংশ কাজ হয়েছে বলে জানিয়েছেন পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী (নদী শাসন) মো. শরফুল ইসলাম সরকার।

আগামী জুনে পদ্মা সেতু উদ্বোধন হওয়ার কথা। তার আগে স্বাধীনতা দিবস বা অন্য কোনো জাতীয় দিবসে এই সেতু উদ্বোধন হতে পারে, এমন জল্পনা-কল্পনা আছে। তবে মার্চ বা জুন যখনই হোক স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন নন্দিত বাস্তবতা।

সেতুমন্ত্রীর আশা

সরকার আশা করছে, ২০২১ সালের মধ্যেই দেশে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। অর্থনীতি আগের অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করবে। স্বস্তির মধ্য দিয়ে শুরু হবে ২০২২ সাল। তারপর জুন থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করছি, আগামী বছর ইনশাল্লাহ তিনটি মেগা প্রজেক্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন। এর মধ্যে আগামী বছরের জুনে পদ্মা সেতু, এরপর কর্ণফুলী নদীর নিচ দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল এবং ডিসেম্বরে এমআরটি-৬ প্রকল্পের আওতায় মেট্রোরেল উদ্বোধন করা হবে।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, ‘সমালোচকরা সমালোচনা করবে, অপপ্রচার করবে, কিন্তু আমরা জবাব দেবো কাজ দিয়ে। আমরা মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে এবং কর্ণফুলী টানেল দিয়ে জবাব দেবো।’

শেয়ার করুন

মহাযজ্ঞ বদলে দিচ্ছে চার জেলা

মহাযজ্ঞ বদলে দিচ্ছে চার জেলা

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিতল এই সেতুর ওপর দিয়ে চার লেন দিয়ে চলবে গাড়ি, নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। সেতুর তলদেশ দিয়ে যেকোনো ধরনের নৌযান চলাচল করতে পারবে অনায়াসে। সেতুর নিচতলা দিয়ে যাচ্ছে গ্যাসের পাইপলাইন, যে লাইন দিয়ে গ্যাস পৌঁছাবে এই জনপদসহ আশপাশের অনেক জেলায়। তাই পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনেক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চলছে মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুর।

মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্ট দিয়ে পদ্মা নদীর দুই প্রান্তকে যুক্ত করছে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প। ইতিমধ্যে প্রকল্পের ৮৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আগামী জুন মাসেই সেতু দিয়ে যান চলাচল শুরুর আশা করা হচ্ছে। তখন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা মোড় যেতে সময় লাগবে মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিতল এই সেতুর ওপর দিয়ে চার লেন দিয়ে চলবে গাড়ি, নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। সেতুর তলদেশ দিয়ে যেকোনো ধরনের নৌযান চলাচল করতে পারবে অনায়াসে। সেতুর নিচতলা দিয়ে যাচ্ছে গ্যাসের পাইপলাইন, যে লাইন দিয়ে গ্যাস পৌঁছাবে এই জনপদসহ আশপাশের অনেক জেলায়।

তাই পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনেক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চলছে মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুর। এই প্রকল্পের কাজ ও প্রকল্প ঘিরে যেসব উন্নয়নমূলক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে সম্প্রতি তা ঘুরে দেখেছে নিউজবাংলা। কথা বলেছে এসব জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে।

সেতুকে কেন্দ্র করে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে যেসব প্রকল্পের কাজের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা দেখে জীবনমান উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছেন একসময়কার অবহেলিত এই জনপদের মানুষ। তাই পদ্মার এপার-ওপার দুই পারের মানুষেরই এখন আগ্রহ-উচ্ছ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু কবে যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে পদ্মা সেতু।

শেখ হাসিনা তাঁত পল্লী

পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা এবং মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার কুতুবপুর মৌজার ১২০ একর জমিতে হচ্ছে শেখ হাসিনা তাঁত পল্লী। প্রকল্পের পাশেই পদ্মা সেতুর শরীয়তপুর প্রান্তের রেল স্টেশন। এই স্টেশনের কারণে এখানকার তাঁতিরা কাঁচামাল সংগ্রহ ও উৎপাদিত পণ্য সহজে আনা-নেয়া করতে পারেন। স্থানীয় লোকজন মনে করছেন, শেখ হাসিনা তাঁত পল্লী প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড। বর্তমানে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ চলছে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এর পুরোটাই সরকারি তহবিল থেকে দেয়া হবে। প্রথম পর্যায়ের এই কাজের মেয়াদ ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত।

মহাযজ্ঞ বদলে দিচ্ছে চার জেলা

প্রকল্প এলাকা ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণ শেষে ভরাটের মাধ্যমে চলছে ভূমি উন্নয়নকাজ। এরপর শুরু হবে অবকাঠামো উন্নয়নকাজ। কর্মসংস্থানের পাশাপাশি তাঁতিদের দক্ষতা বৃদ্ধি, পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন, বাজারজাতকরণ, পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে তাঁতবস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে তাঁতিদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়েই তাঁত পল্লী গড়ে উঠছে।

তাঁত বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রকল্পটির আওতায় তাঁতিদের কাপড় বোনার আগে ও পরে বিভিন্ন সুবিধা দেয়া হবে। সেখানে তাঁতিদের জন্য থাকবে আবাসিক ভবন, তাঁত শেড, ডরমেটরি, রেস্ট হাউস, সাইবার ক্যাফে ও বিদ্যুতের উপকেন্দ্র। সপ্তাহে এক বা দুই দিন তাঁতপণ্যের হাট বসানোর চিন্তা রয়েছে। যে হাটে সুতাসহ বিভিন্ন কাঁচামাল বিক্রয় ও প্রদর্শনী হবে। মূলত তাঁতের কাপড় বোনা থেকে শুরু করে পোশাক তৈরি ও বিক্রি পর্যন্ত সব ব্যবস্থাই করা হবে পুরো প্রকল্পের আওতায়।

শেখ হাসিনা তাঁত পল্লীর (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মাদ জাহাঙ্গীর আলী খান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রথম পর্যায়ে আমরা শুধু ভূমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন আর সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করব। এরই মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ হয়ে গেছে। এখন বালু ভরাট করে ভূমি উন্নয়ন করছি। বালু ভরাটের কাজ ৬০ শতাংশ হয়ে গেছে। করোনার কারণে আমাদের কাজ একটু পিছিয়ে পড়েছে। তারপরও আশা রাখি, আগামী বছরের জুনের মধ্যেই প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করতে পরব।’

তিনি জানান, প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে মূলত তাঁত পল্লীর অবকাঠামো তৈরির যাবতীয় কাজ হবে। একটি আদর্শ তাঁত পল্লীতে যা যা থাকা উচিত তার সবই থাকবে সেখানে।

শেখ হাসিনা তাঁত পল্লী প্রকল্পের আওতায় কী কী হবে, তার একটা খসড়া করা হয়েছে জানিয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষে আমরা তাঁত পল্লী উন্নয়নের এই খসড়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে দিব। তারা এগুলো দেখে প্রয়োজনে নতুন কিছু যোগ করতে পারে, নাও পারে। সবমিলে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান শেখ হাসিনা তাঁত পল্লীর একটা মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করবে। পরে সেটা একনেকে পাস হলেই দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হবে।’

জাহাঙ্গীর আলী খান বলেন, ‘আমরা আশা করছি, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আমাদের তাঁতশিল্প অনেক দূর এগিয়ে যাবে। কারণ পদ্মার ওই এলাকা হবে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় জায়গা। মানুষ সেখানে ঘুরতে গিয়ে এই তাঁত পল্লীর সঙ্গে পরিচিত হবে। তারা তাঁতের বিভিন্ন সামগ্রী কেনাকাটা করবে।’

নিউজবাংলার সঙ্গে কথা হয় পশ্চিম নাওডোবা ইউনিয়নের জমাদ্দারকান্দি গ্রামের মহসীন জমাদ্দারের, যার বাড়ি তাঁত পল্লীর পাশেই। পদ্মা সেতু আর এই তাঁত পল্লী তাকে নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

মহসীন জমাদ্দার বলেন, ‘রাস্তার পাশেই আমার মুদি দোকান, দই-মিষ্টিও বেচি। এখানে তাঁত পল্লী হলে অনেক মানুষ আসবে, বেচা-বিক্রি বাড়বে। তাই চিন্তা করছি, ডেইরি খামার দেব। খামারের দুধ দিয়ে উন্নতমানের মিষ্টি বানাব।

‘আশা করছি, সেই মিষ্টির জন্য এখানে যারা আসবে, তারা খেতে পারবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোক কিনেও নিয়ে যেতে পারবে। তাঁত পল্লীতে যেমন এলাকার লোকের কাজ হবে। আমরা যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ব, সেখানেও এলাকার মানুষ কাজ পাবে।’

আলতাফ হোসেন নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের এলাকাটি ছিল খুব অনুন্নত। এখন পদ্মা সেতু হচ্ছে, তাঁত পল্লী হচ্ছে। এই এলাকা এখন শহরের মতো হয়ে যাবে। আলো ঝলমল করবে। দেশি-বিদেশি মানুষ আসবে। আমাদের এলাকাটি হবে পর্যটন এলাকা। এ কথা ভাবতেই আনন্দ লাগছে।’

এই তাঁত পল্লী হওয়ার খবর শুনে পাবনা থেকে ব্যবসা করতে এখানে এসে থাকছেন বিল্লাল হোসেন। এখন ভাঙারির ব্যবসা করছেন। প্রকল্পের পাশেই জমি কেনার চিন্তা তার।

নিউজবাংলাকে বিল্লাল বলেন, ‘আমি এই এলাকার না, ব্যবসা করতে আসছি। এখানে তাঁত পল্লী হলে বিভিন্ন জায়গার লোকজন আসা-যাওয়া করবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের মান বাড়বে। এলাকাটি গ্রাম থেকে শহরে পরিণত হবে। তাই আমি পাবনা থেকে এসেছি। অনেক দিন ধরেই ভাঙারির ব্যবসা করছি।

‘এখন তাঁত পল্লী ঘিরে নতুন ব্যবসার চিন্তা করছি। এখানে বিনিয়োগ হবে বুদ্ধিমানের। আমার মতো অনেকেই আসছেন, ঘুরে ঘুরে দেখছেন। এভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিনিয়োগকারীরা আসবেন। এলাকাটি হবে দর্শনীয় ও বাণিজ্যিক এলাকা।’

প্রকল্প সম্পর্কে জানতে চাইলে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মো. পারভেজ হাসান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শেখ হাসিনা তাঁত পল্লী দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখার প্রয়াস। ফলে উন্নত হবে দেশের তাঁতশিল্প। জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে তাঁতিদের। ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে তাঁতিদের। একই সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটবে। স্থানীয় মানুষের জন্য সৃষ্টি হবে নতুন নতুন কর্মসংস্থান।’

পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে পদ্মার এই পারে শুধু এই তাঁত পল্লীই নয়, হবে আইটি পার্কও। ইতিমধ্যে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় আইটি পার্কটি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই পদ্মাতীরবর্তী শিবচরে এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এর বাইরে আরও অনেক ছোট-বড় প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, শেখ রাসেল শিশু পার্ক, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিব নার্সিং ইনস্টিটিউট অ্যান্ড কলেজ, আইএইচটি ভবন, ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, শিল্পকলা একাডেমি ভবন, মুক্তমঞ্চ ও অলিম্পিক ভিলেজ। সিঙ্গাপুরের আদলে গড়ে তোলা হবে বিসিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক ও আইকন টাওয়ার।

আইটি পার্ক

ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের পাশে শিবচরের কুতুবপুরের কেশবপুরে শেখ হাসিনা ইনস্টিটিউট অফ ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি অ্যান্ড হাইটেক পার্ক নির্মাণে ৭০ দশমিক ৩৪ একর জায়গা নির্ধারণ করেছে আইসিটি মন্ত্রণালয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক অথরিটির অ্যাডমিন ও ফিন্যান্স বিভাগের পরিচালক এ এন এম শফিকুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটার প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হয়েছে। প্রস্তাবটা এখন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আছে। আশা করছি, দু- এক মাসের মধ্যেই এটা একনেকে উঠবে। একনেকে প্রকল্পটা পাস হয়ে গেলেই আমরা কাজ শুরু করতে পারব।

‘ইতিমধ্যে ওই এলাকায় জায়গা নির্ধারণ হয়ে গেছে। প্রকল্প পাস হলেই ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হবে। এই প্রকল্প বস্তবায়নের জন্য ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার মতো খরচ হবে বলে আমরা অনুমান করেছি। একনেকে পাস হওয়ার পর খরচের মূল হিসাবটা পাওয়া যাবে।’

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই প্রকল্পটা বাস্তবায়ন হলে, ওই এলাকায় বিরাট পরিবর্তন আসবে। শুধু ওই এলাকায়ই না, পুরো দেশটাকে টার্গেট করে এই প্রকল্পটা বাস্তবায়ন করা হবে। মেধাবী সমাজ গঠনের যে কথা বলা হচ্ছে, এখানে সেই মেধাবী তৈরির কাজ হবে।

‘প্রযুক্তি নিয়ে রিসার্চ হবে। বিকেএসপি যেমন খেলোয়াড় তৈরি করে, তেমনি এখানে আগামী দিনের আইটি বিশেষজ্ঞ তৈরি হবে। এখানে হয়তো ১-২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু সেটা গুরুত্বপূর্ণ না, গুরুত্বপূর্ণ হলো এখান থেকে অসংখ্য আইটি বিশেষজ্ঞ বের হবে, তারা সারা দেশে ভূমিকা রাখবে।’

মহাযজ্ঞ বদলে দিচ্ছে চার জেলা

মাদারীপুর জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে জেলার বিভিন্ন এলাকায় আরও অনেক উন্নয়নমূলক কাজ হচ্ছে।

সেগুলোর মধ্যে রয়েছে রেজাউল করিম তালুকদার টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ন্যাশনাল জুডিশিয়াল একাডেমি এবং সার্কেল এএসপি অফিস-কাম-বাসভবন, বেগম রোকেয়া কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলসহ ট্রেনিং সেন্টার ও ডে-কেয়ার সেন্টার, শিবচর পৌর বাস টার্মিনাল, ট্রমা সেন্টার, শিবচর হাইওয়ে থানা, হাজি আবুল কাসেম উকিল ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, চৌধুরী ফাতেমা বেগম ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র এবং উপজেলা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের সম্ভাব্য স্থানের তালিকায় এখনও শীর্ষস্থানে আছে শিবচরের নাম।

ইলিয়াস আহম্মেদ চৌধুরীর (দাদা ভাই) নামে শিবচর উপজেলায় ‘দাদা ভাই উপশহর’ হাউজিং প্রকল্পে ৮৭৮টি প্লট প্রস্তুতির কাজ ও বরাদ্দ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ইতিমধ্যে কিছু বহুতল ভবন হয়েছে এবং সেগুলোতে মানুষ বসবাস করা শুরু করেছে। প্রায় ১০৫ একর জমিতে গড়ে ওঠা এই প্রকল্পে ১ লাখের বেশি মানুষের আবাসন হবে।

মাদারীপুর সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি খান মো. শহীদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করে দেবে। পদ্মায় ধরা মাছ যেমন সহজেই কারওয়ান বাজারে যাবে, তেমনি যেকোনো কৃষিপণ্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা যাবে। ফলে কৃষক, জেলেসহ সব পেশার মানুষ সরাসরি লাভবান হবেন।’

তিনি বলেন, ‘তাঁত পল্লী ও আইটি পার্কের মতো প্রকল্প এই জনপদের জন্য আশীর্বাদ। এসব প্রকল্পে যাতে অনিয়ম-দুর্নীতি না হয়, সেদিকে সরকারের কড়া নজরদারি থাকা উচিত। অন্যথায় এসব প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।’

সাজছে মুন্সিগঞ্জ

এই জেলার ওপর দিয়েই নান্দনিক ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে গেছে। অল্প সময়েই এখানকার মানুষ রাজধানী ঢাকায় যেতে পারছেন। বাড়িতে থেকেও অনেকে রাজধানীতে গিয়ে অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন।

এই এক্সপ্রেসওয়ে আর পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে সাজছে মুন্সিগঞ্জ। বেড়েছে এখানকার জমির দাম। হচ্ছে নতুন নতুন আধুনিক আবাসিক এলাকা। গড়ে উঠছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ নানা অবকাঠামো। এই এলাকার অনেক লোকেরই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে পদ্মা সেতুতে।

মহাযজ্ঞ বদলে দিচ্ছে চার জেলা

দৃষ্টি কেড়েছে ভাঙ্গা মোড়

পদ্মা সেতুর মতোই আরেক বিস্ময় হয়ে দেখা দিয়েছে ফরিদপুরের ভাঙ্গা গোলচত্বর। এখানকার বর্তমান দৃশ্য দেখলে মনে হয়, এটি উন্নত কোনো দেশের সড়ক জংশন, যা আসলে ভাঙ্গা উপজেলার গোলচত্বর।

এই গোলচত্বরের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই অনেক মানুষ ভিড় করছেন।

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন মুন্সিগঞ্জের মঈনউদ্দিন সুমন ও শরীয়তপুরের কাজী মনিরুজ্জামান]

শেয়ার করুন

‘পদ্মা সেতুর দাবি করায় অনেকে পাগলও বলেছে’

‘পদ্মা সেতুর দাবি করায় অনেকে পাগলও বলেছে’

এক দিনের কষ্টের ঘটনা বর্ণনা করতে করতে খোকা সিকদার বলেন, ‘একবার লঞ্চে ফরিদপুরে বোনের বাসায় যাচ্ছি। পথে কেবিন থেকে লোকজন বলে উঠল- এই শালার পাগল পদ্মা নদীতে সেতু চায়! তারপর সবাই হো হো করে হেসে ওঠে।’

‘পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের ব্যানারে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা শহরে বিভিন্ন নেতার সঙ্গে কথা বলেছি। পদ্মার ভাঙন থেকে শুরু করে বিভিন্ন কষ্টের কথা বলেছি। সেসব কষ্ট লাঘবে পদ্মা সেতুর প্রয়োজনীয়তা তাদের কাছে তুলে ধরেছি। সবাই এই দাবির সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন করেছেন। ওয়ার্ড থেকে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে সভা-সমাবেশ করেছি। ব্যানার-পোস্টার বানিয়েছি। পত্রিকায় নিউজ পাঠিয়েছি। তবে এসব কর্মকাণ্ড চলাকালে অনেক মানুষ টিটকারী করেছে, হাসি-তামাশা করেছে। অনেকেই পাগলও বলেছে।’

১০ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বিকেলে মোবাইল ফোনে নিউজবাংলাকে এসব কথা বলেন ছাবেদুর রহমান খোকা সিকদার। পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের এই প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এখন শরীয়তপুরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

নিউজবাংলার সঙ্গে আলাপকালে পদ্মা সেতু নিয়ে নব্বই দশকের সেই আন্দোলন ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপটের বিস্তারিত জানিয়েছেন খোকা সিকদার। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের মূল প্রেরণা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তিনি নিজেই ডেকে নিয়ে আন্দোলনে উৎসাহ দিয়েছেন। তার নির্দেশনাতেই এই আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।’

‘পদ্মা সেতুর দাবি করায় অনেকে পাগলও বলেছে’

খোকা সিকদার জানান, এই আন্দোলনের কারণে চলতি পথে বিভিন্ন সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। একবার মাওয়া দিয়ে নৌকায় বাড়ি ফেরার সময় লোকজন তাকে ‘শালা পাগল হয়ে গেছে’ বলেও টিটকারী করেছিল।

তিনি জানান, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার প্রেরণায়ই ১৯৮৬ সালে তারা পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদ গঠন করেন। ২১ সদস্যের এই পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ইত্তেফাকের আব্বাস উদ্দিন আনসারী।

খোকা সিকদার বলেন, ‘হুসেইন মো. এরশাদের সময় যমুনা সেতুর কথা ওঠে। তখনই আমাদের কয়েকজনের উপলব্ধি আসে, আমরা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ এত কষ্ট করে নদী পার হই। নানা দুর্ভোগ পেরিয়ে যাতায়াত করি। এই অঞ্চলের মানুষের জন্য পদ্ম নদীর ওপর সেতু হলে এই কষ্ট দূর হতো।

‘সেই ভাবনা ও উপলব্ধি থেকেই আমি আর আব্বাস উদ্দিন আনসারী ভাইসহ কয়েকজন পদ্মা সেতুর প্রয়োজনীয়তার কথা সবার কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করি। ব্যানার-পোস্টার বানানো শুরু করি। ওয়ার্ডে-ওয়ার্ডে ঘুরে যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলি।’

পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বলেন, “পরবর্তীতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কষ্টার্জিত টাকা খরচ করে পোস্টার ছাপাই। ১৯৮৬ সালের সেই পোস্টারে লেখা ছিল, ‘২১ জেলার ৫ কোটি মানুষের প্রাণের দাবি পদ্মা সেতু চাই’।”

‘পদ্মা সেতুর দাবি করায় অনেকে পাগলও বলেছে’

তিনি জানান, ১৯৮৬ সালে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদ গঠনের পর তারা এ কার্যক্রম সবখানে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। খুলনা, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় গিয়ে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের জেলাভিত্তিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। সেসব কমিটিতে সংশ্লিষ্ট জেলার দলীয় নেতা ছাড়াও বিভিন্ন এলাকার যুব ও ছাত্রনেতারা সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

খোকা সিকদার বলেন, “‍এসব কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৮ সালে আরও একটি পোস্টার করি আমরা। সেখানে লেখা ছিল- ‘পদ্মা সেতু কেন চাই?’ পরবর্তীতে আরেকটি পোস্টার করি, তাতে লেখা ছিল- ‘পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন চাই।”

তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের এই পুরো সময়ে জাতীয় পার্টি ও বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। অনেকেই আমাদের দাবি নিয়ে হাসি-তামাশা করলেও বিভিন্ন জেলার মানুষকে এই দাবিতে একত্রিত করার কারণে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন চাই স্লোগানটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

‘আমরা খুলনা, ফরিদপুর ও ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করি। তখন অনেক সাংবাদিকও বলেন, পদ্মা নদীতে সেতু চান? সেটা তাহলে কোথায় হবে? এমন প্রশ্ন করলে আমি বলি, এটা তো সরকারের পক্ষ থেকে ফিজিবিলিটি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মাওয়া পয়েন্টেও হতে পারে। এখন সেই মাওয়া পয়েন্ট দিয়েই হচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু, সেতু দিয়ে চলবে ট্রেনও।’

এক দিনের কষ্টের ঘটনা বর্ণনা করতে করতে খোকা সিকদার বলেন, ‘একবার লঞ্চে ফরিদপুরে বোনের বাসায় যাচ্ছি। পথে কেবিন থেকে লোকজন বলে উঠল- এই শালার পাগল পদ্মা নদীতে সেতু চায়! তারপর সবাই হো হো করে হেসে ওঠে।’

তিনি বলেন, ‘আরেকবার মাওয়া থেকে নৌকায় বাড়ি যাচ্ছি। উত্তাল পদ্মার বড় বড় ঢেউ দেখে সবাই ভয় পেল। আমিও ভয় পেয়ে গেছি। একটা পর্যায়ে নদীর শান্ত এলাকায় পৌঁছালে অনেকেই টিটকারী করতে শুরু করল। বলল, এই নদীতে নাকি সেতু হবে! অনেক সময় হেঁটে যাওয়ার পথেও লোকজন হাসাহাসি করত এই দাবি নিয়ে। বলত, শালা পাগল হয়ে গেছে।’

ছাবেদুর রহমান খোকা সিকদার বলেন, ‘তাদের এমন উপহাসে আমরা দমে যাইনি। এই সেতুর দাবি নিয়ে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, খুলনা, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলার মানুষের সঙ্গে কথা বলি। মতবিনিময়, সভা-সমাবেশে পদ্মা সেতুর দাবির কথা বলতে থাকি।

‘এই সময়ে লিয়াকত নামের একজন খুব হেল্প করেছিলেন। আমি আর ইত্তেফাকের আব্বাস উদ্দিন আনসারী ভাইয়ের নেতৃত্বে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের ব্যানারে সারা দেশে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি।’

‘পদ্মা সেতুর দাবি করায় অনেকে পাগলও বলেছে’

তিনি বলেন, ‘২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর ভিত্তি স্থাপন করেন শেখ হাসিনা। তারপর বিএনপি সরকার এসে সেটা ভেঙে ফেলে। তারপরের ইতিহাস সবাই জানেন। সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে শেখ হাসিনা নিজের টাকা দিয়ে নিজেই পদ্মা সেতু করলেন।’

পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের এই প্রতিষ্ঠাতা বলেন, ‘সব শেষে একটা কথা বলতে চাই, যদি কেউ কোনো কাজ আন্তরিকভাবে করার চেষ্টা করেন, সততার সঙ্গে করার চেষ্টা করেন, সেটা সফল হবেই। আমি যদি এই আন্দোলন করার জন্য কিংবা পোস্টার-ব্যানার তৈরির জন্য চাঁদা তুলতাম, তাহলে হয়তো এই আন্দোলন করা সম্ভব হতো না। নানাজন নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতেন।

‘এখন আমার আর কোনো চাওয়া নেই। একটাই চাওয়া- ২০২২ সালের মধ্যে যেন এই পদ্মা সেতু দিয়ে যেতে পারি-আল্লাহ যেন আমাকে সে পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখেন- সবার কাছে সেই দোয়াই চাই।’

পদ্মা সেতু প্রকল্পটি ২০০৭ সালের আগস্টে অনুমোদন দেয় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। পরে সেতুর অর্থায়ন নিয়ে নানা নাটকীয়তা চলে। শেষে আওয়ামী লীগ সরকার নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তী সময়ে সেতুর সঙ্গে রেলপথও যুক্ত করা হয়। প্রকল্পটির সর্বশেষ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।

‘পদ্মা সেতুর দাবি করায় অনেকে পাগলও বলেছে’

২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মূল সেতু ও নদী শাসন কাজ উদ্বোধন করেন। এর আগে ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি শুরু হয় নকশা ও পুনর্বাসন কাজ। গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের ৮৭.৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন শুধু দৃশ্যমান বাস্তবতাই নয়, যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার অপেক্ষাও কেবল স্বল্প সময়ের।

শেয়ার করুন

শরীয়তপুরের সম্ভাবনা হংকং সিঙ্গাপুরের মতো

শরীয়তপুরের সম্ভাবনা হংকং সিঙ্গাপুরের মতো

পদ্মা সেতুর কাঠামোর পুরোটাই এখন দৃশ্যমান। অপেক্ষা শুধু উদ্বোধনের। ছবি: নিউজবাংলা

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান মনে করেন, পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে পদ্মার দুই পাশেই চীনের হংকং-সাংহাইয়ের মতো শহর গড়ে উঠবে। তিনি বলেন, ‘সব মিলিয়ে আমার মনে হয়, পদ্মার দুই পাশেই হংকং-সাংহাইয়ের মতো শহর গড়ে উঠবে। সেখানে বড় বড় শহর হবে, বড় বড় রিসোর্ট হবে। এখানে যদি আমরা প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করি, তাহলে ঢাকার যে ডিমান্ড, সেটা ওই খানেই পূরণ করা যাবে। সেজন্য আমাদের একটা মেগা পরিকল্পনা থাকা উচিত, যে আমরা কীভাবে ওই এলাকা সাজাব।’

এশিয়ার অন্যতম দুই বাণিজ্যিক কেন্দ্র হংকং ও সিঙ্গাপুরের মতো হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে বাংলাদেশের শরীয়তপুরের। মূলত পদ্মা বহুমুখী সেতুকে কেন্দ্র করে এই সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে, যা কাজে লাগানোর পরিকল্পনার কথা সেতুর কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর আগেই জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

নিউজবাংলা টিম সম্প্রতি পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্প ও আশপাশের এলাকা ঘুরে, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে শরীয়তপুরের সম্ভাবনার বিষয়টি দেখেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঠিক মাঝখানে অবিস্থত হওয়ায় দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুর আশপাশের দেশগুলোর অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এটি এখন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। আর চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকং এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র।

আয়তনের দিক দিয়ে হংকং ও সিঙ্গাপুরের চেয়ে বড় পদ্মা-মেঘনার মিলিত স্রোতধারায় সিক্ত শরীয়তপুর জেলা। হংকংয়ের আয়তন ১১০৭ বর্গকিলোমিটার এবং সিঙ্গাপুরের আয়তন প্রায় ৭২৩ বর্গকিলোমিটার। যেখানে শরীয়তপুরের আয়তন ১১৮১ বর্গকিলোমিটার। এই জেলার উত্তরে মুন্সিগঞ্জ, দক্ষিণে বরিশাল, পূর্বে চাঁদপুর এবং পশ্চিমে মাদারীপুর জেলা অবস্থিত।

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অংশ হওয়ায় শরীয়তপুর এখন বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশীদারে পরিণত হয়েছে। এই সেতু ও রেল প্রকল্প এশিয়ান হাইওয়ে রুটের অংশ হওয়ায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. পারভেজ হাসান নিউজবাংলাকে জানান, পদ্মা সেতুর কারণে এই জেলার আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মনোজাগতিক, শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন হবে। কোনোটা খুব দ্রুত, কোনোটা ধীরে ধীরে।

তিনি জানান, মাদারীপুরের মতো শরীয়তপুরেও চার লেনের রাস্তা হবে। এই চার লেন আর পদ্মা ও মেঘনা সেতু হয়ে গেলে এই অঞ্চলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে শরীয়তপুর। তখন ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ধরনের ওয়্যার হাউস বানাবেন। বিশ্রামাগার হবে, কিছু থ্রি স্টার ও ফাইভ স্টার হোটেল হবে। সব মিলে শরীয়তপুরের অনেকটাই হংকং বা সিঙ্গাপুরের মতো হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘শরীয়তপুর এখন চাঁদপুরের সঙ্গে কানেক্টেড নরসিংহপুর যে ফেরিঘাট আছে তার মাধ্যমে। নরসিংহপুর ঘাট থেকে ফেরিতে করে চাঁদপুর দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে চট্টগ্রাম। চাঁদপুর প্রান্তেও চার লেনের রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে।‘

তিনি বলেন, ‘আরেকটি সুখবর হচ্ছে মেঘনায় আরেকটি সেতু করার জন্য একনেক সভায় আড়াই শ কোটি টাকার অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পদ্মা সেতু, মেঘনা সেতু আর মাঝখানে চার লেনের রাস্তা হলে বাংলাদেশের যেকোনো বন্দরেই যাওয়া যাবে শরীয়তপুরের ওপর দিয়ে।

‘বিশেষ করে বেনাপোল, মোংলা ও চিটাগাং- এই তিন পোর্টের কানেক্টিং রাস্তা হবে শরীয়তপুরের বুকের ওপর দিয়ে। তখন কেউই কিন্তু ঢাকা ঘুরে চিটাগাং যাবে না। তখন শরীয়তপুরকে দেখতে হংকং বা সিঙ্গাপুরের মতো মনে হবে। এটা হলে শরীয়তপুরের রাস্তা ও ভূমি অটোমেটিক্যালি ডেভেলপ হবে।’

শরীয়তপুরের সম্ভাবনা হংকং সিঙ্গাপুরের মতো

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান মনে করেন, পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে পদ্মার দুই পাশেই চীনের হংকং-সাংহাইয়ের মতো শহর গড়ে উঠবে।

তিনি বলেন, ‘সব মিলিয়ে আমার মনে হয়, পদ্মার দুই পাশেই হংকং-সাংহাইয়ের মতো শহর গড়ে উঠবে। সেখানে বড় বড় শহর হবে, বড় বড় রিসোর্ট হবে। এখানে যদি আমরা প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করি, তাহলে ঢাকার যে ডিমান্ড, সেটা ওই খানেই পূরণ করা যাবে। সেজন্য আমাদের একটা মেগা পরিকল্পনা থাকা উচিত, যে আমরা কীভাবে ওই এলাকা সাজাব।’

বহুমুখী এই সেতু প্রকল্পের কাজ গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ৮৭.৭৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী জুনের মধ্যেই সেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা। এই সেতু হলে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২৩ শতাংশ বাড়বে।

এ প্রসঙ্গে ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘আমরা সম্ভাব্যতার বড় জায়গাটায় না গেলাম, সর্বনিম্ন সমীক্ষাটিও যদি গ্রহণ করি তাহলেও দক্ষিণ বাংলার যে ২১টি জেলা আছে সেখানে ২ শতাংশ জিডিপি বাড়বে। আর পুরো দেশের জিডিপি কম করে হলেও ১ শতাংশ বাড়বে, এর বেশিও বাড়তে পারে।’

‘এটাই হলো আমাদের পদ্মা সেতু, যা বাংলাদেশের সক্ষমতা, সমৃদ্ধি, অহংকার ও সাহসের প্রতীক, যার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই গভর্নর মনে করেন, যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতু হওয়ার পর দেশের অর্থনীতিতে ‘যে বিস্ফোরণ’ ঘটেছিল তার চেয়েও ‘বড় বিস্ফোরণ’ ঘটাবে পদ্মা সেতু।

তিনি বলেন, ‘যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ার পর দেশের অর্থনীতিতে বিপুল বিস্ফোরণ ঘটেছিল, যার ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে। পদ্মা সেতু চালুর পর অর্থনীতিতে তার চেয়েও বড় বিস্ফোরণ ঘটবে।’

ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘পদ্মা সেতুর কারণে সারা দেশের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার কানেকটিভিটি বেড়ে যাবে, যার কারণে সেখানকার কৃষি খাত বেগবান হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাতে বিপ্লব ঘটবে। দ্রুত পণ্য আনা-নেয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় সারা দেশে বাণিজ্য নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে শিক্ষাব্যবস্থায়।

‘এ ছাড়া কুয়াকাটা, সুন্দরবন ও বঙ্গবন্ধুর সমাধি ঘিরে পর্যটন খাত বিকশিত হবে। অল্প সময়ের মধ্যে মানুষ তখন টুঙ্গিপাড়া, ষাটগম্ভুজ মসজিদ, কুয়াকাটাসহ নদীর ওই পারে যেতে পারবে। হোটেল-মোটেল-রেস্তোরাঁ গড়ে ওঠবে। মোংলা বন্দর, পায়রা বন্দরেও এনার্জি হাব হবে। ওই এলাকায় অনেক শিপ বিল্ডিং প্রতিষ্ঠান হবে। এসব শিল্পের জন্য যদি আমরা আলাদা করে প্রণোদনা দিই, তাহলে সার্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে উল্লম্ফন ঘটবে।’

ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘এখন জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের যেসব মানুষ জীবিকার তাগিদে ঢাকামুখী হয়েছে, তারা এলাকায় ফিরে যাবে এবং সেখানেই উৎপাদন, সেবা ও বাণিজ্যমুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবে। এসবের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে জিডিপিতে।’

পদ্মা সেতুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ও প্রকৌশলী ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। মৃত্যুর কিছুদিন আগে পদ্মা সেতুর সম্ভাবনা ও বাস্তবতা নিয়ে লিখেছিলেন তিনি।

তিনি লিখেছেন, ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু চালু হলে বাংলাদেশজুড়ে একটি সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। তখন পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দর, বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে শুধু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নয়, পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতিই আমূল বদলে যাবে। এই সেতু দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ, বাণিজ্য, পর্যটনসহ সবক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী লিখেছেন, ‘এই পথটি ট্রান্স-এশীয় রেলপথের অংশ হবে। তখন যাত্রীবাহী ট্রেন যত চলবে, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি চলবে মালবোঝাই ট্রেন। ডাবল কনটেইনার নিয়েও ছুটবে ট্রেন। তখন পুরো দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে।’

ড. জামিলুর রেজা বলেছিলেন, ‘কোনো বিনিয়োগের ১২ শতাংশ রেট অফ রিটার্ন হলে প্রকল্পটিকে আদর্শ বিবেচনা করা হয়। পদ্মা বহুমুখী সেতু চালু হলে বছরে ১৯ শতাংশ করে বিনিয়োগ উঠে আসবে।’

‘পদ্মা সেতু বাঙালির স্পর্ধার সমান’

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান মনে করেন, পদ্মা সেতু বাঙালির স্পর্ধার সমান, সাহসের সমান একটি স্থাপনা।

নিউজবাংলার কাছে এ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে শরীয়তপুর জেলার যে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে, সেটি হচ্ছে সোনালি সেতুর শ্যামলভূমি শরীয়তপুর। সেতুর কারণে শরীয়তপুরে সোনা ফলবে- সেই প্রত্যাশাই আমাদের।’

শরীয়তপুরের সম্ভাবনা হংকং সিঙ্গাপুরের মতো

তাঁর মতে, পদ্মা সেতু হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর দেশপ্রেম সর্বোচ্চ শিখরে উত্তীর্ণ হওয়ার কারণেই। শুধু দেশের প্রয়োজনেই তিনি তার স্পর্ধিত পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাই পদ্মা সেতু আজ পদ্মা নদীর বুক চিড়ে দাঁড়িয়ে।’

জাজিরার গনির মোড় এলাকার বেশ কয়েকজন বাসিন্দা নিউজবাংলা টিমের কাছে আক্ষেপ করে বলেন, স্বপ্নের এই সেতুর জন্য জমি দিয়েছেন। কিন্তু সেতুর সঙ্গে শরীয়তপুরের কোনো সংযোগ সড়ক নেই। সেতু ঘিরে যেসব উন্নয়ন প্রকল্প হচ্ছে তার সবই হচ্ছে মাদারীপুরকে কেন্দ্র করে, বিশেষ করে মাদারীপুরের শিবচরকে কেন্দ্র করে। বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের ক্ষোভও আছে তাদের মধ্যে।

তাদের একজন বলেন, ‘কই এখনও তো কিছু হলো না। দোকানের বেচাবিক্রি আগে যেমন ছিল, এখনও তাই আছে। আমাদের এলাকায় তো বড় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানও চালু হয়নি।’

নিউজবাংলাকে কাছাকাছি প্রতিক্রিয়া জানান সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) শরীয়তপুরের সভাপতি আহসান উল্লাহ ইসমাইলী, আইনজীবী আজিজুর রহমান রোকন। ইসমাইলী বলেন, ‘শরীয়তপুর থেকে পদ্মা সেতুতে ওঠার জন্য কোনো লিঙ্ক রোড রাখা হয়নি। এতে আমাদের এলাকার পণ্যবাহী ট্রাক ও যানবাহনকে মাদারীপুর দিয়ে যেতে হবে। এ কারণে যানজট ও হয়রানির শঙ্কা রয়েছে।’

রোকন বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালু হলেও আমাদের শরীয়তপুরের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান কিংবা আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কতটা হবে, তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। কারণ এই জেলার সঙ্গে পদ্মা সেতুর সরাসরি কোনো লিংক নেই। এশিয়ান হাইওয়ে থেকেও আমরা বঞ্চিত। পদ্মা সেতু ঘিরে যেসব উন্নয়ন প্রকল্প-অর্থনৈতিক জোন, যা কিছু হচ্ছে সবই মাদারীপুর ও শিবচরকে কেন্দ্র করে হচ্ছে। এতে শরীয়তপুরের বৃহৎ অংশ এসব উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’

তবে জাজিরার নাওডোবা এলাকার বেশ কয়েকজন জানান, তারা সেতু উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছেন। আশা করছেন, এই সেতু তাদের জীবনমানের উন্নয়ন করবে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে।

জাজিরার বাসিন্দা দৈনিক সংবাদের শরীয়তপুর প্রতিনিধি পলাশ খান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-চিকিৎসা সবক্ষেত্রেই এখানকার মানুষকে ঢাকা যেতে হয়। অনেক সময় চিকিৎসা নিতে ঢাকা যেতে যেতেই রোগী মারা যান। সবজি পচে যায় নদীর তীরেই। কখনও কখনও চাঁদপুর বা চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকা যেতে হয়। এতে যাতায়াত ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পদ্মা সেতু চালু হলে এসব সমস্যা সমাধান হবে।’

জাজিরার কাজিরহাট বন্দরের ব্যবসায়ী বরকত মোল্লা বলেন, এ বন্দরে দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার ব্যবসায়ীরা আসেন। তারা সব ধরনের পণ্য এখান থেকেই নেন। এসব পণ্য ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আনা হয়। নদীপথে পণ্য আমদানির যেমন বাড়তি খরচ, তেমনি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সেতু হলে কম মূল্যে আনা-নেয়া করা সম্ভব হবে। তাতে সরাসরি উপকৃত হবেন প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহকরা।’

‘আমরা কী পাইলাম প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক’

স্থানীয়দের অসন্তোষের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জেলা প্রশাসক পারভেজ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পদ্মা সেতুর টোল প্লাজা জাজিরায়। কিছু দূর যাওয়ার পর সুন্দর রাস্তাটা চলে যাচ্ছে মাদারীপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, খুলনা, বাগেরহাট ও যশোরের দিকে। আর এই পাশের রাস্তাটা ভালো না, যেটি ট্রেন লাইনের নিচ দিয়ে শরীয়তপুরের দিকে গেছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মাঝে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে- আমরা কী পাইলাম? কিন্তু বিষয়টা তা না। এই সেতু শরীয়তপুরকে রেললাইনের মাধ্যমে সংযুক্ত করবে মোংলা, বেনাপোল ও সাতক্ষীরার ভোমরা বন্দরকে।’

তিনি জানান, পদ্মা সেতুর মূল প্রজেক্টে শরীয়তপুরের সঙ্গে সংযোগ সড়ক ছিল না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীকে বলার পর সংযোগ সড়কের অনুমোদন পাওয়া গেছে।

এগিয়ে নেবে মৃৎশিল্প ও পিতল শিল্পকে

স্থানীয় কয়েকজন নিউজবাংলা টিমকে জানান, শরীয়তপুর অনেক আগে থেকেই মৃৎশিল্প ও পিতলের জিনিসপত্রের জন্য বিখ্যাত। এখানকার টেরাকোটা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের পটারি ইউরোপসহ বিশ্বের ২০টি দেশে যায়।

শরীয়তপুরের সম্ভাবনা হংকং সিঙ্গাপুরের মতো

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মনে করেন, পদ্মা সেতু এই দুই শিল্পকে আরও এগিয়ে নেবে। এর বাইরে ব্যাপক সম্ভাবনা আছে কৃষি খাতে, বিশেষ করে কালো জিরা, ধনিয়া ও কাঁচা মরিচের।

পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে দক্ষিণে নড়িয়া উপজেলা ও চাঁদপুর পর্যন্ত পদ্মা নদী, নদীর পাড় ও চরগুলো পর্যটন শিল্পের জন্য খুবই সম্ভাবনাময় বলে মনে করেন শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘দুর্দান্ত সম্ভাবনা আছে আমাদের পর্যটনের ক্ষেত্রে। পদ্মা সেতু দেখার জন্য প্রচুর মানুষ আসবে। শরীয়তপুর থেকে জাজিরার দিকে যেতে ডান পাশে রূপবাবুর হাট বলে চমৎকার একটি জায়গা আছে, যেটি জলমহাল হিসেবে ইজারা দেয়া হয়। এ বছর ইজারা শেষ হবে। এটি মূলত পদ্মার একটি চ্যানেল, যেটি মারা গেছে।

‘আমাদের পরিকল্পনা আছে এটির দুই পাড় বাঁধাই করে একটি ফাইভ স্টার হোটেল করার। সেখানে গলফ খেলার মাঠ হতে পারে। এত সুন্দর একটি তট তৈরি হয়েছে, যেখানে ওয়াচ টাওয়ারও করা যেতে পারে সেতু দেখার জন্য। ওখান থেকে মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর জেলার কানেক্টিভিটি রয়েছে। এই অঞ্চল চর ট্যুরিজমের জন্য খুবই উপযোগী। নদীপথে যদি আমরা রিভারক্রুজের ব্যবস্থা করতে পারি, তাহলে দর্শনীয় একটি পর্যটন স্পট হতে পারে।’

শরীয়তপুরের সম্ভাবনা হংকং সিঙ্গাপুরের মতো

জেলা প্রশাসক জানান, জাজিরা প্রান্তে একটি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম হতে পারে। কারণ ঢাকা থেকে বিকেএসপি যেতে যে সময় লাগে, তার চেয়ে জাজিরায় আসতে কম সময় লাগবে। শরীয়তপুর জেলা স্টেডিয়াম আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। এটিও আন্তর্জাতিক মানের ম্যাচের জন্য অনুশীলন ভেন্যু হতে পারে। এটা করা গেলে এখানে হোটেল-মোটেল তৈরির সম্ভাবনা জেগে উঠবে। পদ্মা সেতুর সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে শরীয়তপুরে অর্থনৈতিক অঞ্চল করা যায় কিনা সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা চলছে।

শরীয়তপুরে শেখ হাসিনা কৃষি ইউনিভার্সিটি হচ্ছে। বেসরকারি পর্যায়ে বেশকছিু হিমাগার হচ্ছে জাজিরা রোডে। পদ্মা সেতুর সুবিধা কাজে লাগিয়ে বেসরকারি পর্যায়ে যারা শিল্প-কারখানা করতে চান, তাদের সব ধরনের সহায়তা করতে প্রস্তুত জেলা প্রশাসন।

পদ্মা পাড় দিয়ে রিভার ড্রাইভ

জেলা প্রশাসক পারভেজ নিউজবাংলাকে আরও জানান, গোসাইরহাট থেকে শুরু করে জাজিরা পর্যন্ত পদ্মা নদীর পাশ দিয়ে রিভার ড্রাইভ হবে। ইতিমধ্যে নড়িয়ার অংশে হয়ে গেছে। নড়িয়ার যে রাস্তাটা করা হয়েছে সেটাকে জাজিরা পর্যন্ত নিয়ে আসার চিন্তা-ভাবনা চলছে। মোটরসাইকেল নিয়ে যে ছেলেটি পদ্মা সেতু পার হলো সে আর শরীয়তপুরে না গিয়ে রিভার ড্রাইভ দিয়ে সরাসরি গোসাইরহাটে চলে যেতে পারবে।

জমির দাম বেড়েছে ১০ গুণ

শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম, পদ্মা সেতুর কাজ এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই এলাকার স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিদ্যুৎ খাতে নজিরবিহীন উন্নয়ন হয়েছে। শেখ হাসিনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে। সখিপুর থানা উপজেলা হচ্ছে। এই জনপদের চরাঞ্চলেও বিদ্যুতের আলো ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। শরীয়তপুরের উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ মুন্সিগঞ্জ পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। কার্তিকপুর, ব্রজেশ্বর ও চরসেনসাসে হচ্ছে বিদ্যুতের সাবস্টেশন।

তিনি জানান, মেঘনা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কাজও শুরু হয়েছে। চার লেনের রাস্তা হচ্ছে। এসব উন্নয়নের কারণে এই এলাকার জমি আগের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। এখন এক শতাংশ জমির দাম উঠেছে ৩-৪ লাখ টাকা, যেখানে আগে কেউ এখানে জমি কিনত না। পদ্মা সেতু দাঁড়িয়ে যেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেই কুর্নিশ করছে বলে মন্তব্য করেন এনামুল হক শামীম।

স্বপ্ন দেখছে নিম্ন আয়ের মানুষ

পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে শরীয়তপুর, মাদারীপুরসহ এই এলাকার নিম্ন আয়ের মানুষ দিন বদলের স্বপ্ন দেখছেন।

নড়িয়ার কেদারপুরের কালাচান ব্যাপারী পেশায় কাঠমিস্ত্রি। নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পদ্মার দক্ষিণ পার থেকে ঢাকা আসা-যাওয়া অনেক সহজ হবে। আগে ৫ ঘণ্টা লাগছে। সেতু চালু হইলে কম লাগব। মিল-কারখানা হইলে আমাগো তো সুবিধা হবেই।’

শরীয়তপুরের সম্ভাবনা হংকং সিঙ্গাপুরের মতো

মুলফতগঞ্জের বাবুল খাঁ প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পদ্মায় ডিঙি নৌকায় করে মাছ ধরেন। সেই মাছ বিক্রির টাকায়ই চলে সংসার। তিনি মনে করছেন, পদ্মা সেতু হলে ঢাকার মানুষ আসবে মাছ কিনতে। তাদের কাছে বেশি দাম পাবেন।

শেয়ার করুন

শহর জীবনে বঞ্চনা বেশি, ৫ জনের ১ জনই দরিদ্র

শহর জীবনে বঞ্চনা বেশি, ৫ জনের ১ জনই দরিদ্র

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, শহরে ১৯ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে থাকলেও তাদের মধ্যে ১১ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষার আওতায় রয়েছে। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে ২৬ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে থাকলেও সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আছে ৩৬ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ গ্রামে দারিদ্র্য হারের চেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন।

বাংলাদেশে শহর এলাকায় পাঁচ জনের মধ্যে এক জনই দরিদ্র। শহরে মোট জনসংখ্যার ১৯ শতাংশ মানুষ দরিদ্র; এর মধ্যে ১১ শতাংশ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধা পেয়ে থাকেন।

অন্যদিকে গ্রামে ২৬ শতাংশ মানুষ গরীব হলেও সেখানে ৩৬ শতাংশ মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছেন।

বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য এসেছে।

‘বাংলাদেশ সোশ্যাল প্রটেকশন পাবলিক এক্সপেনডিচার রিভিউ’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় বৃহস্পতিবার।

এতে বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ বাংলাদেশে দারিদ্র্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে। এই সুরক্ষা কর্মসূচি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন নীতির কেন্দ্রে রয়েছে এবং ক্রমাগত দরিদ্র পরিবারের উপকার করছে। সুরক্ষা কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা যথাযথভাবে গ্রহণ করা হলে এবং তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ৩৬ শতাংশ ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক। তবে শহুরে জনসংখ্যার ৫ জনের মধ্যে ১ জন দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে এবং শহরের অর্ধেক পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

গ্রামীণ এবং শহর এলাকায় সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো পুনর্বিন্যাসের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, শহরে ১৯ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে থাকলেও তাদের মধ্যে ১১ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষার আওতায় রয়েছে। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে ২৬ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে থাকলেও সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আছে ৩৬ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ গ্রামে দারিদ্র্য হারের চেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন।

শহর জীবনে বঞ্চনা বেশি, ৫ জনের ১ জনই দরিদ্র


একটি স্বচ্ছ জরিপ করে ‘ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ডেটাবেস’ তৈরির মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রকৃত উপকারভোগীর তালিকা করতে পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

প্রতিবেদনটিতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বাংলাদেশের অব্যাহত বিনিয়োগ এবং প্রকল্প পরিকল্পনা, নকশা ও বিভিন্ন কর্মসূচির ভাতা বিতরণসহ বিদ্যমান কাঠামো কীভাবে উন্নত করা যায় সে বিষয়েও পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও ভুটানে বিশ্বব্যাংকের অপারেশন ম্যানেজার ডানডান চেন বলেন, ‘গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়িয়ে চলেছে। এখন এটি দেশের প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে তিনটিতে পৌঁছেছে। কোভিড-১৯ মহামারি আরও জোরদার, দক্ষ এবং অভিযোজিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকে জোরালো করেছে। যথাযথ লক্ষ্য ঠিক করে এই কর্মসূচিগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলে দেশটিতে দারিদ্র্যের হার কমাতে সফল হবে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ২ দশমিক ৬ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা বা সুরক্ষা কর্মসূচিতে ব্যয় হয়েছে; যা এই ধরনের আয়ের দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে, কিছু ঝুঁকি-গোষ্ঠী এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই কর্মসূচিগুলোতে দরিদ্র তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রতি আট জন দরিদ্র ব্যক্তির মধ্যে একজন শিশু রয়েছে। এরপরেও, দরিদ্র শিশুরা সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ পায়।

‘এই ব্যয় আরও কার্যকর হবে, যদি বরাদ্দগুলো বিভিন্ন স্তরের দরিদ্রদের মাঝে ভাগ করে দেয়া যায় এবং সেভাবেই কর্মসূচিগুলো হাতে নিতে হবে।’

শহর জীবনে বঞ্চনা বেশি, ৫ জনের ১ জনই দরিদ্র


বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালাইন কদুয়েল বলেন, ‘শৈশবে বিনিয়োগ একটি শিশুকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে আরও উৎপাদনশীল হতে সাহায্য করে। এভাবে প্রজন্ম ধরে দারিদ্র্যের চক্র ভেঙে দেয়া সম্ভব। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই কর্মসূচি নিতে হবে।’

সুবিধাভোগীরা যাতে সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা দ্রুত পায় সে ব্যবস্থা নিশ্চিতের পরামর্শ রয়েছে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, গভর্নমেন্ট টু পারসন (জিটুপি) ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) বাড়াতে হবে। সরকারের কোষাগার থেকে তহবিল সুবিধাভোগীর কাছে স্থানান্তরে প্রায় দুই মাস সময় লাগে, জিটুপি পদ্ধতিতে এটি ১০ দিনে নামিয়ে আনতে হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী, তখন দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৯ সাল শেষে অনুমিত হিসাবে তা নেমে আসে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে। এর পর দারিদ্র্যের হার নিয়ে আর কোনো নতুন তথ্য প্রকাশ করেনি বিবিএস।

তবে গত ২৩ জুন ‘দারিদ্র্য ও জীবিকার ওপর করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব’ শীর্ষক এক গবেষণা তথ্য প্রকাশ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) বলেছে, ‘করোনাভাইরাস মহামারির অর্থনৈতিক প্রতিঘাতে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার দ্বিগুণ বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে।’

তার আগে ১০ জুন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছিল, ‘করোনার কারণে আয় কমে যাওয়ায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে সার্বিকভাবে দারিদ্র্যের হার ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।’

তবে, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম সিপিডি, সানেমসহ অন্য বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর দারিদ্র্যের হার নিয়ে দেয়া তথ্য প্রত্যাখ্যান করেছেন।

শেয়ার করুন

‘ঘরের লগে ডাক্তার নার্স ওষুধ, টাউনের মতোই লাগে’

‘ঘরের লগে ডাক্তার নার্স ওষুধ, টাউনের মতোই লাগে’

কুমারভোগ পুনর্বাসন কেন্দ্রের ৫ শতাংশের প্লটে বসবাস করছেন মো. মনির হোসেন। তিনি জানান, তার সাড়ে ১৩ শতাংশ জায়গা ছিল। সেই জমি পদ্মা সেতুর জন্য সরকার নিয়েছে। টাকা দিয়েছে ৩৪ লাখ। কেমন আছেন জানতে চাইলে মনির হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এক কথায় ভালো আছি। পানি, বিদ্যুৎসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাই আছে এখানে। পদ্মা সেতু দিয়ে গ্যাসের সংযোগ যাচ্ছে, সেখান থেকে সংযোগ পেলে আমরা আরও ভালো থাকব।’

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের জন্য যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, তাদের সবাইকেই জমি ও অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ বাবদ কয়েক গুণ টাকা দিয়েছে সরকার। আর স্বপ্নের এই সেতুর জন্য যারা বাপ-দাদার ভিটেমাটি পুরোটাই হারিয়েছেন, তাদের এই ক্ষতিপূরণের টাকার পাশাপাশি বসবাসের জন্য প্লটও করে দিয়েছে সরকার। ৫টি পুনর্বাসন কেন্দ্রে নামমাত্র মূল্যে আড়াই, ৫ ও ৭ শতাংশের প্লট দেয়া হয়েছে তাদের। প্রায় সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে সবুজে ঘেরা নান্দনিক এসব পুনর্বাসন কেন্দ্রে।

সেখানে বসবাসরতরা কেমন আছেন তা জানতে নিউজবাংলা সম্প্রতি পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখেছে, কথা বলেছে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে।

পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলো হলো মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কুমারভোগ ও যশোলদিয়া পুনর্বাসন কেন্দ্র, শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা পুনর্বাসন ও পশ্চিম নাওডোবা পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং মাদারীপুরের শিবচরের বাখরেরকান্দি পুনর্বাসন কেন্দ্র।

মুন্সিগঞ্জের দুই কেন্দ্র

লৌহজং উপজেলার মাওয়া চৌরাস্তাসংলগ্ন কুমারভোগ ও যশোলদিয়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে ৭৮০টি প্লট রয়েছে। সেখানকার বাসিন্দারা জীবন যাপন করছেন গ্রাম্য পরিবেশে শহুরে প্রায় সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে। নানা রকম ফলদ ও ঔষধি গাছের পাশাপাশি ফুলগাছ রয়েছে পুনর্বাসন কেন্দ্রের রাস্তার পাশ দিয়ে।

কুমারভোগ পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রবেশমুখেই রয়েছে মসজিদ। ভেতরে রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাঠাগার, খেলার মাঠ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পানির ট্যাংকি ও কবরস্থান। স্যানিটেশন, বিদ্যুৎসুবিধাসহ প্রতিটি প্লটের সঙ্গেই রয়েছে পিচঢালাই রাস্তা।

‘ঘরের লগে ডাক্তার নার্স ওষুধ, টাউনের মতোই লাগে’

বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পদ্মা সেতুর ভূমি অধিগ্রহণে জমি, ঘর ও গাছপালা বাবদ যথাসময়েই টাকা পেয়েছেন তারা। যশোলদিয়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে ৪৫১টি প্লট রয়েছে, কুমারভোগে রয়েছে ৩৩৯টি। এগুলোর মধ্যে কিছু আড়াই শতাংশের প্লট, কিছু ৫ শতাংশের এবং বাকিগুলো ৭ শতাংশের প্লট।

যশোলদিয়া কেন্দ্র

যশোলদিয়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্লট পাওয়া মায়া বেগম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার হাজব্যান্ড আব্দুল করিম ৫ শতকের প্লট পান ৭ বছর আগে। তিনি মারা গেছেন। এখানে পানি, বিদ্যুৎ, ড্রেনেজ-ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট সবই ভালো। কিন্তু বহিরাগতদের অত্যাচার রয়েছে। বাইরের ছেলেরা, স্থানীয় ছেলেপেলেরা এসে আমাদের গালাগালি করে, উঠিয়ে দেবে বলে হুমকি-ধমকি দেয়।’

তবে এই পুনর্বাসন কেন্দ্রের আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইমন জানালেন, মাঝেমধ্যেই পানির লাইন নষ্ট হয়ে যায়। নিজেরা টাকা তুলে তা ঠিক করেন। এ ছাড়া এখানে তেমন কোনো অসুবিধা নেই।

যশোলদিয়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে আড়াই শতাংশের প্লটে ঘর তুলে সপরিবারে বসবাস করছেন মো. আরমান। তিনি জানান, প্রথম থেকেই এখানে আছেন তারা। চার সদস্যের পরিবার নিয়ে ভালোই আছেন।

যশোলদিয়া পুনর্বাসন কেন্দ্র ঘুরতে ঘুরতে কথা হয় কেন্দ্রের সভাপতি সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘মাওয়া চৌরাস্তা এলাকায় আমার ২২ শতক জায়গা ছিল। পদ্মা সেতু প্রকল্পে ওই জায়গা সরকার অধিগ্রহণ করেছে। আমি আড়াই শতকের একটি প্লট পেয়েছি। আমার ভাইয়েরাও পেয়েছে। এখানে আধুনিক অনেক সুযোগ-সুবিধাই আছে। তবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকলেও বেশির ভাগ সময় পর্যাপ্ত সুবিধা পাওয়া যায় না।’

আগে কেমন ছিলেন, এখন কেমন আছেন- জানতে চাইলে সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘মাওয়া চৌরাস্তায় আগে আমাদের ব্যবসা ছিল, আয়-রোজগার ছিল ভালোই। এখন দোকান না থাকায় রানিং আয়টা কমে গেছে। তবে সব মিলে আমরা ভালোই আছি।’

প্লট পাওয়া অনেকেই ঘরবাড়ি করে ভাড়া দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

কুমারভোগ কেন্দ্র

কুমারভোগ পুনর্বাসন কেন্দ্রের ৫ শতাংশের প্লটে বসবাস করছেন মো. মনির হোসেন। তিনি জানান, তার সাড়ে ১৩ শতাংশ জায়গা ছিল। সেই জমি পদ্মা সেতুর জন্য সরকার নিয়েছে। টাকা দিয়েছে ৩৪ লাখ।

কেমন আছেন জানতে চাইলে মনির হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এক কথায় ভালো আছি। পানি, বিদ্যুৎসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাই আছে এখানে। পদ্মা সেতু দিয়ে গ্যাসের সংযোগ যাচ্ছে, সেখান থেকে সংযোগ পেলে আমরা আরও ভালো থাকব।’

এই কেন্দ্রে ৫ শতাংশের প্লট পেয়েছেন জামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘এখানে প্রাথমিক স্কুল থাকলেও মাধ্যমিক স্কুল নেই। একটা মাধ্যমিক স্কুল হলে ছেলে-মেয়েদের দূরে যাওয়া লাগত না।’

কুমারভোগ পুনর্বাসন কেন্দ্রের সভাপতি আলতাফ হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখানে অনেক ধরনের সুযোগ-সুবিধাই আছে। দুই হাজারের বেশি মানুষ থাকে। তবে গোরস্থান ও খেলার মাঠ নেই। ময়লা ফেলানোরও নির্দিষ্ট জায়গা নেই। অনেকেই যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলায় গন্ধ ছড়ায়।’

এই কেন্দ্রেও অনেকে ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

মুন্সিগঞ্জের এই দুই পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাসিন্দাদের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রজ্জব আলী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কেন্দ্র থেকে কোনো সমস্যার কথা আসে না। সে ক্ষেত্রে বলা যায়, তারা ভালো আছেন। তারা যা চেয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব দেয়া হয়েছে। কবরস্থান, খেলার মাঠের চাহিদার কথা বলা হচ্ছে, সেসব দেয়ার মতো ফান্ড এখন নেই।’

শরীয়তপুরের দুই কেন্দ্র

পদ্মা সেতু প্রকল্পের সংযোগ সড়ক, নদীশাসন, সার্ভিস এরিয়া-২ ও সেনাবাহিনীর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগ্রেডের জন্য সেতুর জাজিরা প্রান্তের নাওডোবা এলাকার জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এতে অনেকেই বাপ-দাদার ভিটামাটি হারান।

‘ঘরের লগে ডাক্তার নার্স ওষুধ, টাউনের মতোই লাগে’

ভূমিহীন এসব পরিবারকে আশ্রয় দেয়ার জন্য পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়ন ও পশ্চিম নাওডোবা ইউনিয়নে পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়, যেখানে ১ হাজার ১৬৪টি পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে পূর্ব নাওডোবায় থাকে ৬৫০টি পরিবার আর পশ্চিম নাওডোবায় ৫১৪টি। পশ্চিম নাওডোবা কেন্দ্রে প্রায় সব ধরনের নাগরিক সুবিধাই নিশ্চিত করা হয়েছে। পূর্ব নাওডোবার অবকাঠামো নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি।

পশ্চিম নাওডোবা কেন্দ্র

এই কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, পাকা রাস্তার দুই পাশে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি। এখানকার বাসিন্দাদের একজন রাজিয়া বেগম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘১০ বছর ধইরা এইহানে থাহি। আমার সাড়ে ৮ শতাংশ জমি গ্যাছে পদ্মা সেতুর কামে। জমির টাহাও পাইছি। আবার এইহানে আইয়্যা ৫ শতক জমিও পাইছি। ঘরের লগে হাসপাতাল, ডাক্তার, নার্স, ওষুধ সবই আছে। টাউনের মতোই লাগে।’

রাজিয়া বেগমের মতো এই পুনর্বাসন কেন্দ্রে ৫ শতাংশের প্লট পেয়েছেন শাহজাহান হাওলাদার।

নিউজবাংলাকে তিনি জানান, তার ২৫ শতাংশের বাড়িসহ ২ বিঘা জমি। সেতুর জন্য সবই নিয়েছে সরকার, দিয়েছে ক্ষতিপূরণের টাকাও। পুনর্বাসন কেন্দ্রে আধাপাকা ঘর তুলে পরিবার নিয়ে থাকছেন তিনি।

কেমন আছেন- জানতে চাইলে শাহজাহান হাওলাদার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এক জায়গাই সব কিছু আছে। শান্তিতেই আছি। আমার ছেলেডা এইহান তোন গাড়ি চালানোর টেনিং লইতাছে। এরপর বড় গাড়ি চালাইব। অহন আর দুশ্চিন্তা নাই।’

এই পুনর্বাসন কেন্দ্রের নাওডোবা পদ্মা সেতু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘স্কুলটি হওয়ার কারণে ছেলে-মেয়েরা শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। ৭ জন শিক্ষক ও ৫ জন স্টাফের কর্মসংস্থানও হয়েছে। শিক্ষার সহায়ক পরিবেশ ও উপকরণ সবই এখানে রয়েছে। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য বিশাল মাঠও আছে।’

পূর্ব নাওডোবা কেন্দ্র

সেনাবাহিনীর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড-ঘেঁষা পূর্ব নাওডোবা পুনর্বাসন কেন্দ্রে ৬৫০ পরিবারের বসবাস। এই কেন্দ্রে এখনও অবকাঠামো উন্নয়নকাজ চলছে।

নিউজবাংলা কথা বলেছে পুনর্বাসন প্রকল্প কমিটির সভাপতি লতিফ ফকিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাগো এইড্যা তো পোথ্যোম অধিগ্রহণ কইরা নেয় নাই। এই জন্যই পোথ্যোম থিক্যা কাজ শুরু হয় নাই। পরে যখন অধিগ্রহণ করল, ওইয়ার পর থিকাই আমাগো পারমান্যান্ট করছে। এই জন্যই উন্নয়নকাজ দেরি অইছে। অহন সব কিছুই দ্রুত চলতাছে। আমরা ২৫ সদস্যের কমিটি এখানকার সব কিছু ভালো-মন্দ দেহি। পরিবারগুলোর সুবিধা-অসুবিধা আমরা সেতু কর্তৃপক্ষকে জানাই।’

‘ঘরের লগে ডাক্তার নার্স ওষুধ, টাউনের মতোই লাগে’

মাদারীপুরে একটি কেন্দ্র

মাদারীপুরের শিবচরের বাখরেরকান্দি পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্লট রয়েছে ৬১১টি। এখানে বসবাসে ‘কিছুটা সমস্যায়’ পড়লেও স্বপ্নের পদ্মা সেতুর জন্য জমি দিয়ে খুশি বাসিন্দারা।

কেন্দ্রে ৫ শতাংশের প্লট পেয়েছেন আব্দুর ছাত্তার মাতুব্বর। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে পদ্মা সেতুর বেড়িবাঁধের জন্যে আমার ৯৮ শতাংশ জমি ও ১৬ শতাংশ বাড়ির জায়গা নিয়েছে সরকার। এ জন্য টাকাও দিয়েছে। পরে বাখরেরকান্দি এলাকায় পুনর্বাসন কেন্দ্রে ৫ শতাংশ জমি পাই ১ লাখ ১০ হাজার টাকায়। এই ৫ জায়গায় আমার ৪ ছেলে ও তাদের পরিবার নিয়ে বসবাস করছি।’

এই পুনর্বাসন কেন্দ্রে সম্প্রতি ঘর তুলেছেন শাহজাহান খান।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আড়াই শতাংশ জায়গা পাইছি পুনর্বাসন কেন্দ্রে। পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে থাকা লাগবে। এত দিন কাগজপত্রে ঝামেলা থাকায় ঘর করা হয়নি। তাই এখন কোনো রকমে টিনের ঘরটা করলাম। এখানে পাকা রাস্তা আর বিদ্যুতের লাইন আছে। ড্রেনও আছে, তবে পরিষ্কার করা হয় না। আমরা চাঁদা তুলে মাঝেমধ্যে পরিষ্কার করি।’

পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পের পুনর্বাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) হিসাবে, এই পুনর্বাসন কেন্দ্রে আড়াই শতাংশের প্লটের জন্য ৫০ হাজার টাকা, ৫ শতাংশের প্লটের জন্য এক লাখ টাকা এবং সাড়ে ৭ শতাংশের প্লটের জন্য দেড় লাখ টাকা লেগেছে। প্লট রয়েছে ৬১১টি। বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৬০৩টি।

বাখরেরকান্দি পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্বাস্থ্য কেন্দ্র থাকলেও প্রায়ই চিকিৎসক থাকেন না বলে নিউজবাংলার কাছে অভিযোগ করেন বেশ কয়েকজন বাসিন্দা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাখরেরকান্দি পুনর্বাসন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপ-মেডিক্যাল অফিসার ডা. প্রতাপ চন্দ্র দাস বলেন, ‘এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নয়। এখান থেকে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য সচেতনামূলক পরামর্শ ও কার্যক্রম, টিকাদান কর্মসূচি ও রেফারেল সার্ভিস দেয়া হয়।

‘রোগীদের বড় কোনো সমস্যা থাকলে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা ঢাকা নেয়ার পরামর্শ দেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক। বলতে গেলে একেবারে ঘরের মধ্যে স্বাস্থ্য কেন্দ্র।’

বাখরেরকান্দি পুনর্বাসন কেন্দ্রের দায়িত্বে রয়েছেন পদ্মা বহুমুখী প্রকল্পের সেতু বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারফুল ইসলাম সরকার।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতুর জন্য যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, তাদের পুনর্বাসনের জন্য কেন্দ্রে জায়গার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। ওখানে রাস্তা-সুপেয় পানির ব্যবস্থা আছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করে দিয়েছি। এসব রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বসবাসকারীদের। আমরা তাদের সব করে দেব, এমনটা নয়।’

শেয়ার করুন