ই-অরেঞ্জের প্রতারণার ফাঁদ ‘ডাবল টাকা ভাউচার’

ই-অরেঞ্জের প্রতারণার ফাঁদ ‘ডাবল টাকা ভাউচার’

‘ডাবল টাকা ভাউচার’ অফারে মোটরসাইকেল, স্কুটি, স্মার্টফোন, ফিচারফোনসহ নানা ধরনের আকর্ষণীয় পণ্যে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ৬০-৭০ শতাংশ কম দামে বিক্রির ঘোষণা আসত। আর সেই ছাড়ের সুযোগ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন গ্রাহক।

প্রতারণার দায়ে আলোচিত ই-কমার্স সাইট ই-অরেঞ্জ ডট শপ কর্তৃপক্ষ লোভনীয় অফারের টোপ ফেলেছিল গ্রাহকের সামনে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রতিষ্ঠানটি মূলত ১২ ক্যাটাগরিতে নানান পণ্য বিক্রির ব্যবসা চালাত। তবে গ্রাহকের কাছ থেকে নগদ টাকা হাতিয়ে নেয়ার মূল অস্ত্র ছিল তাদের ‘ডাবল টাকা ভাউচার’ অফার।

এর মাধ্যমে মাত্র ১৫-৩০ দিনের মধ্যে গ্রাহকের এক লাখ টাকা পরিণত হতো দুই লাখ টাকায়, তবে মেয়াদ পূর্তির পরেও গ্রাহককে সেই টাকা ভোগ করার সুযোগ দেয়া হয়নি। এর আগেই ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষ ‘লাভের ওপর লাভ’ এমন টোপ ফেলে হাজির হতো আরেকটি পণ্য বিক্রির লোভনীয় অফার নিয়ে।

এ ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল, স্কুটি, স্মার্টফোন, ফিচারফোনসহ নানা ধরনের আকর্ষণীয় পণ্য প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ৬০-৭০ শতাংশ কম দামে বিক্রির ঘোষণা আসত। আর সেই ছাড়ের সুযোগ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন গ্রাহক।

এভাবে সবশেষ চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষের কাছে খোয়া গেছে গ্রাহকের ১১০০ কোটি টাকা। ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে করা মামলার বাদী মো. তাহেরুল ইসলামসহ ভুক্তভোগী বেশ কয়েকজন গ্রাহক নিউজবাংলার কাছে এমন অভিযোগ করেছেন।

জানা গেছে, ই-অরেঞ্জ দিত ‘সামার ভাউচার’ এবং ‘স্বপ্ন ভাউচার’ অফার। এর আওতায় কেনা প্রতিটি ভাউচার ন্যূনতম একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে (৭-১৫ অথবা ১৫-৩০ দিনে) দ্বিগুণ হয়ে যেত। অর্থাৎ নগদ টাকা আগাম জমা করে যে কেউ এক লাখ টাকার (বিভিন্ন রেটের ভাউচার) কোনো একটি ভাউচার কিনলে তা দিয়ে দুই লাখ টাকার পণ্য কেনার সুবিধাভোগী হতেন।

প্রতারণার অভিযোগ করা গ্রাহকেরা বলছেন, প্রায় এক লাখ গ্রাহকের এখন যে ১১০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে, তার বেশির ভাগই ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা হয়েছে এই ভাউচার অফারের আওতায়। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন হিসাবে সারা দেশ থেকে বিভিন্ন স্তরের গ্রাহক অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে এই টাকা জমা করেছিলেন।

‘সামার’ ও ‘স্বপ্ন’ ভাউচারের বেশির ভাগ গ্রাহক মেয়াদ পূর্তির পরও তাদের পুঁজিসহ লাভের টাকা ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষের ব্যাংক হিসাব থেকে নিজেদের হিসাবে স্থানান্তর করতে পারেননি, অথবা তা দিয়ে কোনো পণ্য কিনতে পারেননি। কারণ সেই টাকা গ্রাহকের হিসাবে লাভসহ হস্তান্তরের আগেই ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষ আরেকটি টোপ ফেলেছে গ্রাহকের সামনে।

তাদের বলা হয়েছে, ‘বাইকিং অ্যান্ড রাইডিং’ নামে নতুন একটি অফার আসছে। এর আওতায় সেখানে ৬০ শতাংশ ডিসকাউন্টে থাকছে মাত্র ১০ কর্মদিবসে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল কেনার সুযোগ। এ ক্ষেত্রে নতুন করে প্রলুব্ধ হয়েছেন গ্রাহক।

এ ধরনের ব্যবসায়িক ফাঁদ নিয়ে ইলেকট্রনিক কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ তমাল নিউজবাংলাকে জানান, ‘ই-অরেঞ্জের ডাবল টাকা ভাউচারের অফার কোনো বিজনেস মডেল হতে পারে না।’

তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘এক লাখ টাকা কী করে মাত্র ১৫-৩০ দিনের ব্যবধানে দুই লাখ টাকা হয়! এ ধরনের অফার ব্যবসাবহির্ভূত এবং ই-কমার্স খাতের জন্য ক্ষতিকর। আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে গত বছরই ইভ্যালির পাশাপাশি ই-অরেঞ্জসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের অফারের বিষয়ে জানিয়েছিলাম। তার আলোকেই কিন্তু ই-কমার্স পরিচালনসংক্রান্ত একটি নির্দেশিকা জারি হয়েছে। তবে তার আগেই যা ঘটার ঘটে গেছে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষ চেয়েছিল তাদের ব্যাংক হিসাবে ভাউচার বিক্রির মাধ্যমে জমা হওয়া গ্রাহকের সব টাকা প্রতারণার মাধ্যমে ধরে রাখতে এবং পরে সময়-সুযোগ বুঝে তা উঠিয়ে নিতে।

দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ ডিসকাউন্টে মোটরসাইকেল অফার দেয়ার প্রথম ১৫ দিনেই ডাবল টাকা ভাউচারের প্রায় ৮০ শতাংশ মালিক তাদের মূল পুঁজি ও লাভের টাকা দিয়ে মোটরসাইকেল কিনতে নিজেদের নাম নিবন্ধন করিয়েছেন।

এ ছাড়া ই-অরেঞ্জে ডাবল টাকা ভাউচারে লেনদেন না করা অসংখ্য ক্রেতাও বাইকিং অ্যান্ড রাইডিং অফারের আওতায় মোটরসাইকেল, স্কুটি ও মোটর কার কেনার জন্য অনলাইনে অগ্রিম টাকা পরিশোধ করেছেন কর্তৃপক্ষের ব্যাংক হিসাবে। কেউ কেউ আবার এসব যন্ত্রযানের এক্সেসরিজ কেনার জন্যও আগাম টাকা দিয়েছেন। সব মিলিয়ে এই অফারের আওতায় আরও প্রায় ১১০ কোটি টাকা জমা হয়েছে ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে। তবে মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কেউ-ই পণ্য বুঝে পাননি।

এর ফলে প্রায় ৭৭৩ কোটি টাকার দাবি রয়েছে শুধু ডাবল টাকা ভাউচার মালিক এবং ভাউচারে লেনদেন না করে সরাসরি অগ্রিম দিয়েছেন এমন গ্রাহকের।

আকর্ষণীয় ডিসকাউন্ট মূল্যে মোবাইল অ্যান্ড গেজেট অফারের আওতায়ও স্মার্টফোন ও ফিচারফোন বিক্রির অফার দিয়েছিল ই-অরেঞ্জ। ভেন্ডর হিসেবে ছিল আইফোন, নকিয়া, শাওমি, সিম্ফনি, ম্যাক্সিমাস, হুয়াওয়ে, রিয়েলমি, ইনফিনিক্স, ব্ল্যাকবেরি, ভিভো, অপপো, ওয়ালটন, স্যামসাং, পোকো, রিডমি, ওয়ানপ্লাস ও মটরোলা। টাকা পাওয়া সাপেক্ষ এসব প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের অনুকূলে মোবাইল ফোন সরবরাহ করত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব স্মার্টফোন ও ফিচারফোন কেনারও নিবন্ধন করেছিলেন ডাবল টাকা ভাউচার অফারের বেশ কিছু গ্রাহক। পাশাপাশি ভাউচারবহির্ভূত কিছু গ্রাহকও ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষকে টাকা দিয়েছেন। সব মিলিয়ে মোবাইল অ্যান্ড গেজেট অফারের আওতায়ও জমা হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকার মতো। তবে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে কোনো গ্রাহকই টাকা দিয়ে তার পণ্য বুঝে পাননি।

১১০০ কোটি টাকার দাবিদারদের মধ্যে বাকি গ্রাহকরা লেনদেন করেছেন ইলেকট্রনিকস, হোম অ্যান্ড লিভিং, স্পোর্টস অ্যান্ড আউটডোর, ডিজিটাল সেবা, উইন্টার হান্টার, ওমেন্স ক্লাব, ওমেন্স ওয়ার্ল্ড, কিডস জোন, হেলথ অ্যান্ড বিউটি ক্যাটাগরির বিভিন্ন অফার করা পণ্যে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দেশে ডিজিটিাল ই-কমার্স সেলের প্রধান ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. হাফিজুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গ্রাহকের পাওনা কত কিংবা ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষের দায় কত সেটি এখনও সুনির্দিষ্ট নয়। পরিমাণ তো গ্রাহকের দাবির চেয়ে আরও বেশিও হতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখার বিষয় আছে।’

তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা মন্ত্রণালয়ের কাছে তাদের পাওনা ১১০০ কোটি টাকা ফেরত পেতে সহযোগিতা চেয়েছেন। তারা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সামনাসামনি বসে আলোচনা চান। একইভাবে পাওনা পরিশোধে সুনির্দিষ্ট দিন-তারিখের লিখিত প্রতিশ্রুতিও দাবি করেছেন। অভিযোগ পাওয়ার পর মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষের কাছে গ্রাহকের দায়-দেনা ও তাদের সম্পদের পরিমাণসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য মন্ত্রণালয়কে জানাতে চিঠি দেয়া হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে তার জবাব দিতে বলা হয়েছে।’

ই-ক্যাব সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ তমাল জানান, ‘আসলে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের সংখ্যা কত এবং তাদের দাবির বিপরীতে মোট টাকার পরিমাণ কত সেটি নিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কাজ করার অনেক বিষয় আছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকেও (দুদক) এ বিষয়ে তদন্ত ও অধিকতর তদন্তের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অনুরোধ করতে পারে।’

ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে ১১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গ্রাহকের মামলায় মালিক-কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়েছে। ঢাকার আজমপুরের বাসিন্দা মো. তাহেরুল ইসলাম ১৯ জুলাই রাতে ৩৭ জন গ্রাহকের পক্ষে গুলশান থানায় মামলাটি করেন।

আসামিরা হলেন, প্রতিষ্ঠানের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন ও তার স্বামী মাসুকুর রহমান, চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) আমানউল্লাহ চৌধুরী, বিথী আক্তার, কাওসার ও ই-অরেঞ্জের সব মালিক। তবে প্রতিষ্ঠানটিতে কতজন মালিক রয়েছেন তা এজাহারে উল্লেখ করা হয়নি।

তাহেরুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষের অফারের আওতায় আট লাখ টাকার ভাউচার কিনেছিলাম। সেই ভাউচার মেয়াদপূর্তির পর ১৬ লাখ টাকা হয়। আমার আইডি নম্বরের অনুকূলে প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে আরও ১ লাখ ৮০ হাজার টাকাসহ মোট ১৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা পাই। এর মধ্যে এই ভাউচারের টাকায় আমি একাধিক মোটরসাইকেল কেনার জন্য নাম এন্ট্রি করি। তবে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে মোটরসাইকেল পাওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত পাইনি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষ শুধু আমার সঙ্গে নয়, এমন প্রায় এক লাখ গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।’

রাহাত হোসেন খান নামে এক গ্রাহক জানান, ই-অরেঞ্জের অর্ডারের প্রায় ৯০ শতাংশই বাইক, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এখন বাইক সরবরাহ করছে না। নতুন করে আরও ৪৫ থেকে ৬০ দিন সময় চাচ্ছে। আর এখন মালিকও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘এপ্রিলে সামার ভাউচার কিনেছি, এখন আগস্ট চলে যাচ্ছে। তারা বলছে আরও দুই মাস সময় লাগবে, অথচ ৪৫ দিনের মধ্যেই পণ্য দেয়ার কথা ছিল।’

মো. সবুজ নামের আরেকজন বলেন, ‘শুরু থেকেই ই-অরেঞ্জ বিভিন্ন ভাউচারের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করছে। এ ক্ষেত্রে ১ লাখ টাকার ভাউচার কিনলে ২ লাখ টাকার পণ্য কেনার সুবিধা দেয়া হয়।

‘সবশেষ এই বছর করোনার কারণে দেয়া শাটডাউনের আগে সামার ভাউচারের মাধ্যমে তারা ক্যাম্পেইন চালায়। এতে অনেক গ্রাহক পণ্যের অর্ডার করেন। যার বেশির ভাগই ছিল বিভিন্ন ধরনের মোটরসাইকেল। তবে তারপর থেকেই পণ্য সরবরাহ বন্ধ।’

সবুজ বলেন, ‘ই-অরেঞ্জ বলেছিল এই অর্ডারের পণ্যগুলো ঈদের আগে যে পাঁচ কার্যদিবস শটডাউন শিথিল করা হচ্ছিল তখন সরবরাহ করবে, কিন্তু করেনি। এরপর আরও তিন দফা তারিখ দেয়া হলেও তারা পণ্য সরবরাহ করছে না। আর এখন বলছে তারা বাইক দিতে পারবে না।’

আরও পড়ুন:
ই-অরেঞ্জ গ্রাহকদের ৪৫০ কোটি টাকার হদিস নেই
ই-অরেঞ্জের মালিকসহ তিনজন রিমান্ডে
ই-অরেঞ্জের সিওও আমান কারাগারে
এবার ই-অরেঞ্জের সিওও গ্রেপ্তার
গ্রাহকের মামলায় ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া কারাগারে

শেয়ার করুন

মন্তব্য

রাজারবাগ পির দিল্লুরের কীভাবে উত্থান

রাজারবাগ পির দিল্লুরের কীভাবে উত্থান

পির মো. দিল্লুর রহমান থাকেন রাজারবাগের এই দরবার শরিফে। ছবি: নিউজবাংলা

প্রকৌশলীর সন্তান দিল্লুর রহমান বিভিন্ন ব্যক্তির সম্পত্তি দখলের জন্য ‘মামলাবাজ সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলেন ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে। এই সিন্ডিকেটের মামলা থেকে আপন ভাইও রেহাই পাননি। পির দিল্লুরের বিরুদ্ধে ধর্মীয় উগ্রপন্থায় মদদ দেয়ার অভিযোগও পুরোনো। 

রাজারবাগ দরবার শরিফের পির মো. দিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তুলে উচ্চ আদালতে গেছেন ভুক্তভোগীরা। এই পিরের বিরুদ্ধে অন্যের সম্পত্তি দখলে গায়েবি মামলা দিয়ে হেনস্তা করার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

রাজারবাগ দরবার শরিফের সব সম্পদের বিষয়ে তদন্ত করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে তাদের কোনো জঙ্গি সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা তদন্ত করতে বলা হয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটকে।

প্রশ্ন উঠেছে, রাজধানীর বুকে প্রশাসনের অগোচরে কীভাবে এত ক্ষমতাধর হয়ে উঠলেন দিল্লুর রহমান? তিন দশক ধরে মুরিদ-ভক্তদের নিয়ে সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরিফ নামের দরবার শরিফ কীভাবে এত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে?

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকৌশলীর সন্তান দিল্লুর রহমান বিভিন্ন ব্যক্তির সম্পত্তি দখলের জন্য ‘মামলাবাজ সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলেন ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে। এই সিন্ডিকেটের মামলা থেকে আপন ভাইও রেহাই পাননি। পির দিল্লুরের বিরুদ্ধে ধর্মীয় উগ্রপন্থায় মদদ দেয়ার অভিযোগও পুরোনো।

যেভাবে পির হলেন দিল্লুর রহমান

মো. দিল্লুর রহমান ১৯৮৬ সালে রাজারবাগে তার পৈত্রিক বাড়িতে ‘দরবার শরিফ’ প্রতিষ্ঠা করেন। তার বাবার নাম মো. মোখলেসুর রহমান।

পারিবারিক কয়েকটি সূত্র জানায়, দিল্লুর রহমানের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। তরুণ বয়সে ইসলাম সম্পর্কে ভালো জ্ঞান, সেই সঙ্গে আরবি ও ফারসি ভাষায় দক্ষতার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি অনুসারীদের মাঝে জনপ্রিয়তা পান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে তার ভক্ত-মুরিদের সংখ্যা। একপর্যায়ে তিনি ঢাকার বুকে বড় মাপের একজন পির হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

পিরের পরিবারের এক সদস্য পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের পরিবারে তার (দিল্লুর রহমান) আগে কোনো পির নেই। তার বাবা ছিলেন একজন প্রকৌশলী ও ব্যবসায়ী। গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের আড়াই হাজারের প্রভাকরদীতে। নয় ভাইবোনের মধ্যে দিল্লুর রহমান তৃতীয়।’

তিনি বলেন, ‘দিল্লুরের বাবা মুক্তিযুদ্ধের আগেই রাজারবাগে বাড়ি করেন। সেখানেই স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় দিল্লুর রহমান ছিলেন উচ্চ মাধ্যমিক ছাত্র। পড়তেন লক্ষ্মীবাজারের তৎকালিন কায়েদ ই আজম কলেজে (বর্তমান সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ)। পরে এই কলেজ থেকেই তিনি ডিগ্রি পাস করেন।’

পরিবারের ওই সদস্য জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় এপ্রিল মাসে পিরের বাবা সপরিবারে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে চলে যান। সেখানে দিল্লুরের মেজ ভাই হাফিজুর রহমান হারুন ও চাচাত ভাইয়েরা যুদ্ধে যোগ দেন। কয়েক দিন পর একটি চিরকূট লিখে দিল্লুর রহমানও বাসা ছেড়ে চলে যান। চিরকূটে তিনি যুদ্ধে যাওয়ার কথা জানান। তবে একমাস পরেই বাড়ি ফিরে আসেন দিল্লুর। এরপর থেকেই তার চলাফেরায় পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি ধর্মকর্মে মনোনিবেশ করেন।

মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সময়ে ঢাকায় ফিরে কলেজে যেতে শুরু করেন দিল্লুর। সেই সঙ্গে ধর্মকর্মে বাড়তে থাকে মনোযোগ। শার্ট-প্যান্ট ছেড়ে পায়জামা-পাঞ্জাবি-টুপি পড়া শুরু করেন। সাধারণ পড়ালেখার পাশাপাশি ইসলামিক বই পড়া শুরু করেন তিনি।

পারিবারিক সূত্র জানায়, ডিগ্রি পড়ার সময় যাত্রাবাড়ীর পির আবুল খায়ের ওয়াজিউল্লাহর মুরিদ হন দিল্লুর রহমান। সেই সঙ্গে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক রোকন উদ্দীনের কাছে তিনি আরবি ও ফারসি ভাষার তালিম নেন। পরে রোকন উদ্দীনের মেয়েকেই বিয়ে করেন দিল্লুর রহমান।

পির পরিবারের কয়েক সদস্যের দাবি, ইসলামি ডিগ্রি না থাকলেও অসংখ্য ধর্মীয় বই পড়ে ও আলেমদের কাছাকাছি থেকে ব্যাপক ইসলামিক জ্ঞান অর্জন করেন দিল্লুর রহমান। এজন্য অনেক সুপরিচিত আলেমও তরুণ দিল্লুরের সঙ্গে যুক্তিতর্কে পেরে উঠতেন না। খুব অল্প সময়ে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা তৈরি হয়। আর সেই জনপ্রিয়তাকে ভিত্তি করে ১৯৮৬ সালে ঢাকার পৈত্রিক বাড়িতে দরবার শরিফ স্থাপন করে তিনি পুরোদস্তুর পির বনে যান। বাড়তে থাকে তার ভক্ত-মুরিদের সংখ্যা।

পিরের এক আত্মীয় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ইসলামজ্ঞানে তার দখলের কারণে একটা সময় পর্যন্ত তাকে নিয়ে আমরা খুব গর্ব করতাম। সম্মান দিয়ে পরিবারের সদস্যরাও তাকে হুজুর বলে সম্বোধন করত। তবে ১৯৯৮ সালে দিল্লুর রহমানের বাবা মারা যাবার পর তার কাছে ধর্মব্যবসায়ীরা ভিড়তে থাকে। তার বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। এরপর সে তার পৈত্রিক বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে নিজের ভাইদের বিরুদ্ধেই মামলা করে। সেই থেকে শুরু হয় তার মামলাবাজ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য।’

রাজারবাগ পির দিল্লুরের কীভাবে উত্থান
পির মো. দিল্লুর রহমানের গ্রামের বাড়ি

পিরের মামলায় ভাইয়েরাও জেলে

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা যায়, এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি পিরের মামলাবাজ সিন্ডিকেটের হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে পিরের আপন তিন ভাইও আছেন।

রাজারবাগের পৈত্রিক সম্পদ দখলের জন্য পির তার মুরিদদের দিয়ে তিন ভাই আনিসুর রহমান ফিরোজ, হাফিজুর রহমান হারুন ও জিল্লুর রহমান তরুণের বিরুদ্ধে মামলা করান। এসব মামলায় তারা জেলও খেটেছেন। এদের মধ্যে জিল্লুর রহমান তরুণের বিরুদ্ধে ৩০টি মামলা করেন পিরের মুরিদরা। অন্য ভাইয়েরা পরে আপসের মাধ্যমে দিল্লুরের রোষানল থেকে এখন মুক্ত হলেও সমঝোতা না করায় বাবার বাড়ি ছেড়ে ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে জিল্লুর রহমান তরুণকে।

তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, নারী নির্যাতন, মানব পাচার, মাদক, হত্যাসহ গুরুতর বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করেন দিল্লুরে মুরিদরা। এর মধ্যে ২৩টি মামলায় তরুণ খালাস পেলেও সাতটি এখনও বিচারাধীন।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে জিল্লুর রহমান তরুণ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার আপন ভাই আমার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে, এই লজ্জার কথা আমি কাউকে বলতে চাই না। আমি আমার মতো আছি, তার (দিল্লুর রহমান) সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমাদের বংশে কোনো পির ছিল না। আমরা এক সময় তাকে নিয়ে খুব গর্ব করতাম। কিন্তু কিছু খারাপ মুরিদ আর স্ত্রীর প্ররোচনায় সে অধঃপতনে গেছে।’

ভাস্কর্য ভাংচুর ও উগ্রবাদে জড়ানোর অভিযোগ

রাজারবাগ পির দিল্লুর রহমানের প্রতিষ্ঠা করা ধর্মীয় সংগঠন আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত। ২০০০ সাল থেকে এই সংগঠনের বিরুদ্ধে উগ্রবাদি তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।

জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০০৯ সালে ১২টি ধর্মভিত্তিক সংগঠনকে কালো তালিকাভুক্ত করে সরকার। এগুলোর মধ্যে অন্যতম আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত। এছাড়া, পির দিল্লুর রহমানের নিজস্ব পত্রিকা দৈনিক আল ইহসান ও মাসিক পত্রিকা আল বাইয়্যিনাতে গণতন্ত্র, নির্বাচন, জাতীয় সংগীত, বৈশাখী উৎসব, খেলাধুলা ইত্যাদি বিষয়ে নেতিবাচক মতামত প্রকাশের অভিযোগ রয়েছে।

২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর আল বাইয়্যিনাতের অনুসারীরা মতিঝিলের বলাকা ভাস্কর্য ভাংচুর করেন। এ ঘটনায় পুলিশ আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাতের আট সশস্ত্র কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছিল। তারা জিজ্ঞাসাবাদে জানান, ভাস্কর্য ভাঙার নির্দেশ দিয়েছিলেন দিল্লুর রহমান।

ওই ঘটনার কয়েক মাস পর আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাতের অনুসারীরা বিমানবন্দর গোলচত্বরে বাউলের ভাস্কর্যটিও ভেঙে ফেলেন। এছাড়া, ২০১৭ সালে হাইকোর্ট চত্বরে লেডি জাস্টিসের ভাস্কর্য স্থাপনের পরপরই আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত সেটি সরিয়ে ফেলতে উড়ো চিঠিতে হুমকি দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

পিরের পরিবারের এক সদস্য নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এসব ঘটনার পরিকল্পনা পিরের দরবার শরিফে বসেই হতো। মতিঝিলের বক (বলাকা ভাস্কর্য) ভাঙার মিটিংয়ের আলোচনার কিছুটা আমি নিজ কানে শুনেছিলাম। তার এসব অপকর্মের জন্য অন্য ভাইদেরও পুলিশ-গোয়েন্দাদের চাপে পড়তে হয়েছে। তবে তার ভাইয়েরা জড়িত ছিল না। এরপর বাধ্য হয়ে পিরের তিন ভাই মিলে সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, ঘটনার সব দায় আল বাইয়্যিনাতের।’

গ্রামের বাড়িতে যান না দিল্লুর রহমান

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার প্রভাকরদী গ্রামের মৃত মোখলেসুর রহমানের ছেলে দিল্লুর রহমান। এক সময়ের গ্রাম্য মাতবর মোখলেসুর রহমানকে গ্রামের সবাই এক নামে এখনও চেনেন। তবে তার ছেলে দিল্লুর রহমান সম্পর্কে তারা খুব একটা তথ্য দিতে পারেননি।

প্রভাকরদী গ্রামে দিল্লুরদের পৈত্রিক বাড়ির নাম ‘মিয়া বাড়ি’। সেখানে ‘মিয়া মসজিদ’ নামে একটি মসজিদও রয়েছে। ভিটায় রয়েছে তিন তলা একটি ভবন, তবে সেখানে কেউ থাকেন না।

রাজারবাগ পির দিল্লুরের কীভাবে উত্থান
গ্রামের বাড়িতে পির মো. দিল্লুর রহমানের কথিত মাদ্রাসা

গ্রামবাসী জানান, দিল্লুর রহমান গ্রামে না গেলেও তার অনুসারীরা সেখানে যাতায়াত করেন। প্রতিবেশী এক নারী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই বাড়িতে কেউ থাকে না। হুজুর (দিল্লুর রহমান) এখানে আসে না, কিন্তু তার লোকজন আসে। তারা এসে কয়েক ঘণ্টা থেকে আবার চলে যায়। মাঝে মধ্যে তার বড় ভাই আসত, তবে তিনিও এখন আসেন না। তাই বাড়িটা ফাঁকাই থাকে।’

গ্রামের বাসিন্দারা জানান, কয়েক দশক আগে তারা হঠাৎ শুনতে পান, মোখলেস মাতবরের ছেলে দিল্লুর পির হয়ে গেছেন। এরপর সাদা কাপড় পরে বিশাল ভক্তদল নিয়ে তিনি প্রতি বছর একবার গ্রামে মাহফিল করতে আসতেন। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে সেই মাহফিলও বন্ধ।

পিরের অনুসারীদের কয়েক জন দাবি করেন, প্রভাকরদী গ্রামের পাশে সরাবদী গ্রামে দিল্লুর রহমানের একটি মাদ্রাসা আছে। তবে সেই ঠিকানা অনুযায়ী গিয়ে একটি টিনশেড ঘর দেখা গেছে।

ঘরের বাইরে মাটি কাটছিলেন একজন। নিজেকে মাদ্রাসার শিক্ষক পরিচয় দিয়ে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘করোনার জন্য মাদ্রাসা বন্ধ। এখানে বাংলা ও আরবি পড়ানো হয়। এটি পীর সাহেবের তৈরি কামিল মাদ্রাসা।’

মাদ্রাসায় কত জন শিক্ষার্থী শিক্ষক রয়েছে, এমন প্রশ্নের কোনো জবাব তিনি দিতে পারেননি।

গ্রামবাসীর দাবি, টিনশেড ঘরটি কোনো মাদ্রাসা নয়। আগে সেখানে এক ব্যক্তি পরিবার নিয়ে থাকতেন। তিনি চলে যাওয়ার পর এখন আরেকটি পরিবার আছে।

সরাবদী গ্রামে দিল্লুর রহমানের জমি দখলের প্রমাণ পাওয়া গেছে। মামলার ভয়ে এ বিষয়ে মুখ খুলতে চান না কেউ। গ্রামের এক জন জানান, ‘বিভিন্ন মানুষের খেতে খুঁটি গেঁথে রেখেছেন পিরের অনুসারীরা। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। এক মামলা শেষ না হতেই আরেক মামলার মুখে পড়তে হয়।

আরও পড়ুন:
ই-অরেঞ্জ গ্রাহকদের ৪৫০ কোটি টাকার হদিস নেই
ই-অরেঞ্জের মালিকসহ তিনজন রিমান্ডে
ই-অরেঞ্জের সিওও আমান কারাগারে
এবার ই-অরেঞ্জের সিওও গ্রেপ্তার
গ্রাহকের মামলায় ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া কারাগারে

শেয়ার করুন

মদের লাইসেন্সে কালব-এর ৭ কোটি টাকা ‘হাওয়া’

মদের লাইসেন্সে কালব-এর ৭ কোটি টাকা ‘হাওয়া’

কালব রিসোর্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার। ছবি: সংগৃহীত

মদ বিক্রির লাইসেন্সের জন্য ৭ কোটি টাকা খরচের অনুমোদন দিয়েছে কালব-এর পরিচালনা পর্ষদ। এরই মধ্যে পুরো অর্থ নাম সর্বস্ব মধ্যস্ততাকারী প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কালব-এর দুই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য অভিযোগ করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনে। 

শিক্ষকদের ঋণ দিয়ে স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যে ১৯৭৯ সালে যাত্রা শুরু করে দ্য কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন অফ বাংলাদেশ বা কালব। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে বেশ কয়েক বছর স্বাভাবিকভাবে চললেও পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে দুর্নীতির অভিযোগ। অর্থ তছরুপ, বিতর্কিত খাতে বিনিয়োগসহ নানা অনিয়মে বিপর্যস্ত সমবায় প্রতিষ্ঠানটি।

বেশ পুরোনো সমবায় প্রতিষ্ঠান কালবে রাখা সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ লোপাটের অভিযোগও উঠেছে। নতুন খাত তৈরি করে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে নেয়া হচ্ছে অর্থ। দিনের পর দিন এমন ঘটনা ঘটলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

সম্প্রতি মদ বিক্রির লাইসেন্স করা নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছে কালব। লাইসেন্সের জন্য সাত কোটি টাকা খরচের অনুমোদন দিয়েছে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ। এরই মধ্যে পুরো অর্থ নাম সর্বস্ব মধ্যস্ততাকারী প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কালব-এরই দুই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ করেছেন।

এর আগে নিয়ম ভেঙে কয়েক কোটি টাকার চাল কিনে মজুত করে লোকসানের মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া, গাড়ি কিনতে পরিচালকদের নামমাত্র সুদে ঋণ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর আগের পরিচালনা পর্ষদের সময়ে ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে।

মদের লাইসেন্স পেতে সাত কোটি টাকা

সংশ্লিষ্টরা জানান, ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করে গাজীপুরে রিসোর্ট তৈরি করেছে সমবায় প্রতিষ্ঠান কালব। প্রথমে ‘কালব রিসোর্ট অ্যান্ড কনভেনশন হল’ নাম দেয়া হলেও পরে তা পরিবর্তন করে নাম রাখা হয় ‘কালব রিসোর্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’।

এই বারে মদ বিক্রির লাইসেন্স পেতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘এন সরকার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’ নামের একটি কনসালট্যান্ট ফার্মের সঙ্গে সাত কোটি টাকার চুক্তি করে কালব।

১০০ টাকার স্ট্যাম্পে এই চুক্তি করার সময়েই পরিশোধ করা হয় ৫০ ভাগ অর্থ। শর্ত অনুযায়ী, অর্ধেক কাজ শেষ হলে আরও ২৫ ভাগ অর্থ দেয়ার কথা। তবে কোন কোন খাতে এই অর্থ ব্যয় হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি চুক্তিতে। চুক্তি অনুযায়ী ফি বাবদ প্রতিষ্ঠানটি নেবে আরও ১১ লাখ টাকা।

কালব-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সমিতির সদস্য এ্যানথনী ম্যানসাং দাবি করেছেন, লাইসেন্সের ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি না থাকলেও পুরো সাত কোটি টাকা অ্যাকাউন্ট থেকে তোলা হয়েছে।

কালব-এর এক সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাম প্রকাশ না করে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) পাস করে নিতে হয়। মদের লাইসেন্স করতে সাত কোটি টাকা ব্যয়ের সিদ্ধান্ত পরিচালনা পর্ষদের পাস হয়েছে; তবে এজিএমে হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘ক্রেডিট ইউনিয়নের নীতিমালা অনুযায়ী, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও সমাজের ক্ষতি করে এমন কোনো বিনিয়োগ করা যাবে না।

‘যে রিসোর্টের নামে বারের লাইসেন্স করতে চাইছে ওটার নাম ছিল কালব রিসোর্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, মদ বিক্রির জন্য সেটার নাম বদলে দিয়েছেন বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী ও সাধারণ সম্পাদক আলফ্রেড রায়সহ তিন সদস্য।’

খাত স্পষ্ট না করে টাকা তুলে নিয়ে পরিচালনা পর্ষদের কয়েক সদস্য নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

লাইসেন্স পাইয়ে দিতে চুক্তি করা ‘এন সরকার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’ রাজধানীর পুরানা পল্টনের যে ঠিকানা দিয়েছে, সেখানে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ৫৫/এ, এইচ এম সিদ্দিক ম্যানশন ঠিকানায় যাওয়ার পর সেখানকার লোকজন জানান, ওই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান কখনওই ছিল না।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে এন সরকার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের আয়কর আইনজীবী ও পরামর্শক নিতিশ সরকারকে একাধিকার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

মদের লাইসেন্স ফি কত?

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মদের লাইসেন্স নেয়ার জন্য সরাসরি মহাপরিচালক বরাবর আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের প্যাডে আবেদন করতে হয়। আবেদনপত্রের সঙ্গে ১৩ ধরনের কাগজপত্র জমা দিতে হয়। এসব যাচাই-বাছাই করে মন্ত্রণালয় থেকে এনওসি (নো অবজেকশন লেটার) আসার পর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। এর জন্য অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে চুক্তির দরকার নেই।

লাইসেন্স পেতে সরকার নির্ধারিত ফি এক লাখ টাকার সঙ্গে ১৫ হাজার টাকা ভ্যাট দিতে হয়। সাধারণত পর্যটন শিল্পে উৎসাহ দিতে এ ধরনের লাইসেন্স অনুমোদন দেয়া হয়ে থাকে।

মদের লাইসেন্সে কালব-এর ৭ কোটি টাকা ‘হাওয়া’
কালব-এর নানা অনিয়ম নিয়ে দুদকে অভিযোগ জমা পড়েছে। ফাইল ছবি/নিউজবাংলা

দুদকে অভিযোগ

কালব-এর নানা অনিয়ম তুলে ধরে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিয়েছেন দি খ্রীস্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়নের সদস্য (কালবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সমিতি) এ্যানথনি ম্যানসাং।

তিনি বলেন, ‘মদের লাইসেন্স পেতে সাত কোটি টাকার চুক্তি কেন? কৌশলে এই অর্থ সমবায় থেকে বের করে নেয়া হচ্ছে।’

দুদকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ‘সমবায় আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী যেকোনো বিনিয়োগের আগে সাধারণ সভা ও সমবায় অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হবে। বর্তমান চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারি অনুমতি না নিয়ে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সমবায় অধিদপ্তর প্রতি বছর নিরীক্ষা করলেও অদৃশ্য কারণে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।’

কালব-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সমিতি তুমিলিয়া খ্রীস্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়নের সদস্য অনিল ডি. কস্তাও আলাদা অভিযোগ জমা দিয়েছেন দুদকে।

তিনি বলেন, ‘বারের লাইসেন্সের জন্য কৌশলে প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। কোনো প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে মদের বার করা যায় না। বাংলাদেশে এমন কোনো নজির নেই। অর্থ আত্মসাতের জন্য চেয়ারম্যান, সেক্রেটারি ও এক পরিচালক এটা করেছেন। এই তিনজন বারের লাইসেন্সের জন্য কাজ করছেন। অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে বোর্ডের অন্য সদস্যরা জানেন না।

তিনি দাবি করেন, ‘এমনকি বার লাইসেন্সের জন্য চূড়ান্ত খরচ বোর্ডে অনুমোদন করা হয়নি। বোর্ডে অর্থ ব্যয়ের আলোচনা না করে পরে রেজুলেশনে মিথ্যা কথা লিখেছেন। অথচ বোর্ডের বাকি ৯ সদস্য এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।’

চাল ব্যবসায় বড় লোকসান

কালব-এর পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে বেশি দামে চাল কিনে বিপুল লোকসান গোনার অভিযোগও রয়েছে। এতে বলা হয়, চাল কিনে মজুত করতে কালবের চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকীকে আহ্বায়ক, পরিচালক একরামুল হককে সদস্য সচিব এবং বাবলু কোড়াইয়াকে সদস্য করে কমিটি করা হয়।

কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী দিনাজপুরে চাল কিনে গুদামজাত করার জন্য ৫ কোটি টাকা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় পাস হয়। কমিটি চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৩ লাখ ৯০ হাজার কেজি চিনিগুঁড়া চাল কিনে দিনাজপুর শহরের পুলেরহাটে গুদাম ভাড়া করে মজুত করে। প্রতি কেজি চাল কেনা হয় ৭৭ টাকা, পরিবহন বাবদ ২ টাকা খরচ ধরে দাম দাঁড়ায় ৭৯ টাকা।

অথচ একই সময় দিনাজপুরের মিলগুলোতে রপ্তানির চিনিগুঁড়া চালের পাইকারি দর ছিল ৭৫ টাকা কেজি। সেখানে কেজিতে অন্তত ২ টাকা বেশিতে চাল কিনেছে কালব।

অভিযোগ করে বলা হয়, তিন মাসের বেশি সময় চিনিগুঁড়া চাল মজুত করলে গুণগত মান নষ্ট হতে থাকে। অথচ কালব সাত মাস ধরে চাল মজুত করে রেখেছে। বাজার দরের চেয়ে বেশি হওয়ায় এবং দীর্ঘদিন মজুত করায় এখন ৭৯ টাকা কেজি দরের চালের দাম উঠছে সর্বোচ্চ ৬০ টাকা।

৭৯ টাকা দরে ৩ লাখ ৯০ কেজি চালের দাম ৩ কোটি ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা। বিনিয়োগ টাকার সঙ্গে ১২ শতাংশ হারে ৭ মাসের সুদ ২১ লাখ ৬৬ হাজার ৭০০ টাকা যুক্ত হলে মূল্য দাঁড়াবে ৩ কোটি ২৯ লাখ ৬৬ হাজার ৭০০ টাকা।

এখন ৬০ টাকা দরে চাল বিক্রি করলে ২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা আসবে কালবের। এতে নিট লোকসান হবে ৯৫ লাখ ৬৬ হাজার ৭০০ টাকা।

তছরুপ প্রায় ২০০ কোটি টাকা

এর আগে ২০১৯ সালে কালব-এর তখনকার চেয়ারম্যান সায়মন এ. পেরেরাসহ কয়েক জনের বিরুদ্ধে ভুয়া কোম্পানি খুলে ৭৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া ওই কমিটি আরও ১০০ কোটি টাকা তছরুপ করে বলে তদন্তে প্রমাণ পায় পুলিশের বিশেষায়িত তদন্ত বিভাগ পিবিআই।

এ ঘটনায় দুদক মামলা করার পর সাইমন এ. পেরেরা যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক রতন এফ কস্তা এখন কারাগারে আছেন। মামলার অন্য আসামিরা পলাতক।

অভিযোগ ‘বিস্ময়কর’, বক্তব্য নেই অভিযুক্তদের

সমবায় বিশ্লেষক ও দি খ্রিষ্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট পঙ্কজ গিলবার্ট কস্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সমবায় প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা হবে দৃষ্টান্তমূলক। সবার জন্য তা হবে উদাহরণ। মদ বিক্রি করা হলে সেই ঐতিহ্য থাকবে না। মদ সাধারণত ফাইভ স্টার হোটেলে রাখা হয়, কারণ সেখানে বিদেশিরা আসেন।’

তিনি বলেন, ‘একটি লাইসেন্স নেবার জন্য সাত কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্য বিস্ময়কর। মদের লাইসেন্স ফি অনেক কম।’

আমানতকারীদের অর্থ এভাবে ব্যয় নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

সমবায় অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শুধু মদের লাইসেন্স নয়, কালব-এর সার্বিক অনিয়ম খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিষয়টি তদন্ত করা হবে।’

দুদকে অভিযোগের বিষয়ে কালব-এর চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকীর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দুদকের কাজটা কী? কিসের বিষয়ে দুদক অনুসন্ধান করে? এ ব্যাপারে আমি আপনাকে এমন কিছুই বলতে চাই না। কোনো স্টেটমেন্ট দেবো না।’

আরও পড়ুন:
ই-অরেঞ্জ গ্রাহকদের ৪৫০ কোটি টাকার হদিস নেই
ই-অরেঞ্জের মালিকসহ তিনজন রিমান্ডে
ই-অরেঞ্জের সিওও আমান কারাগারে
এবার ই-অরেঞ্জের সিওও গ্রেপ্তার
গ্রাহকের মামলায় ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া কারাগারে

শেয়ার করুন

অন্যের সম্পত্তি দখলে ‘দুর্নিবার’ রাজারবাগ পির

অন্যের সম্পত্তি দখলে ‘দুর্নিবার’ রাজারবাগ পির

রাজারবাগ দরবার শরিফে থাকেন জায়গা-জমি দখলে সিদ্ধহস্ত পীর দিল্লুর রহমান। ছবি: নিউজবাংলা

পিরের মেয়ের বিয়েতে ১২০ ভরি ওজনের স্বর্ণের মুকুট দিয়েছেন কোমরের নেহার। পারিবারিক সম্পত্তির একটি বড় অংশও তিনি লিখে দেন। বড় ছেলেকে বানিয়েছেন পিরের মুরিদ। অন্য দুই ছেলে মুরিদ না হওয়ায় নেমে আসে দুর্ভোগ। তাদের সম্পত্তি হাতাতে একের পর এক দেয়া হয়েছে মামলা।

ঢাকার শান্তিবাগের বাসিন্দা একরামুল আহসান কাঞ্চন। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের পর দেশে ফেরেন ১৯৯৫ সালে। নারায়ণগঞ্জের পৈতৃক জায়গায় শুরু করেন ক্ষুদ্র ব্যবসা।

তবে ২০১০ সাল থেকে তার জীবন আটকে যায় জেলখানায়। ১১ বছরে ৪৯টি মামলায় সাড়ে আট বছর বিভিন্ন মেয়াদে জেল খাটেন। এর মধ্যে বিভিন্ন জেলায় হওয়া ৩৫টি মামলায় খালাস পেয়েছেন। এখনও চলছে ১৪টি।

বিনা দোষে মামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে হাইকোর্টে রিট করেন কাঞ্চন। তার আবেদনের শুনানি নিয়ে সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। এরপর সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন পেয়ে বিস্মিত আদালত।

সিআইডির তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, জায়গা-জমি দখলের জন্য রাজারবাগ দরবার শরিফের পির দিল্লুর রহমান মুরিদদের দিয়ে নিরীহ কাঞ্চনের বিরুদ্ধে ৪৯টি মামলা দিয়েছেন। এই প্রতিবেদন দেখে বিস্মিত আদালত রোববার মন্তব্য করে, ‘পির সাহেবের কাণ্ড দেখেন। জায়গা-জমি দখলের জন্য পির সাহেবরা তাদের অনুসারী-মুরিদ দিয়ে কী করে দেখেন। যেখানে একটা মামলা দিলেই একজন মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায়, সেখানে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এত মামলা! এটা তো সিরিয়াস ব্যাপার।’

বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান করেছে নিউজবাংলা। ঘটনার শিকার ব্যক্তি, তদন্ত সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজারবাগ দরবার শরিফের পির দিল্লুর রহমানের জালিয়াতি ও প্রতিহিংসার ভয়াবহ তথ্য।

যেভাবে দুর্গতির শুরু

একরামুল আহসান কাঞ্চন নিউজবাংলাকে জানান, তার বাবা মারা যাওয়ার পর মা, বড় ভাই ও ছোট বোন রাজারবাগের পির দিল্লুর রহমানের মুরিদ হন। তখন থেকেই তারা পিরের কথা মতো চলতেন। আর কাঞ্চনের দুর্গতির শুরু সেখান থেকেই।

কাঞ্চন তখন ছিলেন জাপানে। সেখান থেকে পরিবারের জন্য একটি গাড়ি পাঠিয়েছিলেন। তবে মা সেটি পির দিল্লুরকে দিয়ে দেন।

কাঞ্চন বলেন, ‘১৯৯৫ সালে দেশে ফিরে ব্যবসা শুরু করি। দেশে আসার পর আমাকে ও আমার ছোট ভাইকেও পিরের মুরিদ হওয়ার জন্য মা ও বড় ভাই চাপ দিতেন।’

তবে পির-মুরিদের বিষয়গুলো পছন্দ করতেন না কাঞ্চন ও তার ছোট ভাই কামরুল আহসান বাদল। কামরুল পেশায় চিকিৎসক।

এর মধ্যে স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারা করতে পিরকে দায়িত্ব দেন কাঞ্চনের মা। তার ধারণা ছিল, পিরের হাতে বাটোয়ারা করলে ‘বরকত’ হবে।

তবে দলিলের ফটোকপি পেয়ে সম্পত্তির পরিমাণ জেনে যান পির দিল্লুর রহমান। শুরু করেন কৌশলে সেগুলো দখলের চেষ্টা।

কাঞ্চন নিউজবাংলাকে জানান, পির কথার ফাঁদে ফেলেন তার মাকে। তাকে এমনভাবে প্রভাবিত করা হয় যে, পিরের মেয়ের বিয়ের সময় জমি বিক্রি করে ১২০ ভরি স্বর্ণের মুকুট উপহার দেন তিনি। এরপর কাঞ্চনের মায়ের কাছ থেকে মাদ্রাসার জন্য জমি লিখিয়ে নেন পির।

অন্যের সম্পত্তি দখলে ‘দুর্নিবার’ রাজারবাগ পির
পির দিল্লুর রহমানের কারণে ভুক্তভোগী একরামুল আহসান কাঞ্চন। ছবি: সংগৃহীত

কাঞ্চন ও তার ছোট ভাই কামরুল এসবে বাধা দিতে শুরু করলে তাদের ওপর নেমে আসে একের পর এক মামলার খড়্গ।

কাঞ্চন বলেন, ‘মাকে আবার ব্রেইন ওয়াশ করে আমাদের বাড়ি থেকে পিরের দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন থেকে আমার মা সেখানেই থাকেন। শান্তিবাগের তিনতলা বাড়ির একতলা-দোতলায় আমি আর আমার ছোট ভাই থাকতাম, তিন তলায় আমার বড় ভাই থাকত। এরপর ২০১০ সাল থেকে আমাকে ৪৯টি ও আমার ছোট ভাইকে ২২টি মামলা দিয়ে ধারাবাহিকভাবে জেলে রাখা হয়।’

তিনি বলেন, ‘এমন কোনো ধারা নেই যাতে আমার বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়নি। মাদক, মানব পাচার, হত্যা, ধর্ষণ, জমিসংক্রান্ত মামলা, ডাকাতি, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন- এসব ধারায় আমার বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়।’

ঢাকাসহ সাত থেকে আটটি জেলায় মামলা হয়েছে দুজনের বিরুদ্ধে। এক মামলায় জামিন পেলে আরেক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। এভাবে চলে ১১ বছর।

একপর্যায়ে হয়রানি থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় নিজের জমি ও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ডায়িং কারখানা পিরের মাদ্রাসার নামে লিখে দেন কাঞ্চন। এতেও শেষ হয়নি হয়রানি। এখন পির চাইছেন তার ৪০০ শতাংশ জমি। এরপর বাধ্য হয়ে কাঞ্চন হাইকোর্টে যান।

পিরের মুরিদ বড় ভাইয়ের উল্টো অভিযোগ

কাঞ্চনের মা পিরের দরবার শরিফে থাকায় তার সঙ্গে যোগযোগ করা যায়নি। তবে কথা হয় কাঞ্চনের বড় ভাই আকতার-ই-কামালের সঙ্গে।

তিনি পিরের বিরুদ্ধে কাঞ্চনের সব অভিযোগ নাকচ করে বলেন, ‘ওরে (কাঞ্চনকে) বলেন পির যে আমাদের জায়গা নিয়েছে তার প্রমাণ দিতে। তিনি অত্যন্ত ভালো মানুষ। আমার মা আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে মাদ্রাসার নামে একটু জমি দান করেছে। সেটা ও ভালোভাবে নিতে পারেনি। ও লোভে পড়ে গেছে। ও আমাদের সব সম্পদ চায়। সম্পদের লোভে পিরের সাহেবের নামে উল্টাপাল্টা কথা বলছে।’

আকতার বলেন, ‘সে (কাঞ্চন) আমার নামে আমার মায়ের নামে মামলা দিয়েছে। অন্য একজন মহিলাকে মা বানিয়ে জাল সই দিয়ে মায়ের সব জমির হেবা দলিল করেছে। সেটা নিয়ে আমার মা পাল্টা মামলা করেছে। আমিও ওর নামে মামলা করেছি। কারণ, সম্পদের জন্য কাঞ্চন সন্ত্রাসী দিয়ে আমার ছেলেকে ছুরিকাঘাত করিয়েছে। ও আমাদের পরিবারকে শেষ করে দিয়েছে।

‘ও অনেক আগে থেকেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত। ও মার্ডার কেস ও মেয়েলি মামলার আসামি। লোভ তাকে শেষ করে দিয়েছে।’

কিছুই বলবেন না পির

অভিযোগের বিষয়ে রাজারবাগ দরবার শরিফের পির দিল্লুর রহমানের বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন না বলে জানানো হয় দরবার শরিফ থেকে।

অন্যদিকে পিরের মুখপাত্র মাহবুব আলম আরিফ সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এগুলো পির সাহেবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। তিনি কোনোভাবেই কোনো মামলার সঙ্গে জড়িত নন। কোনো মামলার বাদী পির সাহেব নন। তাহলে এখানে তার নাম কেন আসবে?

মামলার বাদী ও সাক্ষীদের সঙ্গে পিরের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সিআইডির প্রতিবেদনে অনেক ভুল আছে। পিরের মুরিদদের সঙ্গে কাঞ্চন শত্রুতা করত, তাদের ওপর হামলা-মারধর করত। তাই তারা মামলা করেছে। এখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে পিরকে জড়ানো হচ্ছে।’

অন্যের সম্পত্তি দখলে ‘দুর্নিবার’ রাজারবাগ পির
একরামুল আহসান কাঞ্চনদের বাড়ি

যা আছে সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে

মামলার জাল থেকে মুক্তি পেতে উচ্চ আদালতে রিট করেন একরামুল আহসান কাঞ্চন। তখন আদালত কাঞ্চনের বিরুদ্ধে ৪৯টি মামলা তদন্ত করে সিআইডিকে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দেয়। সেই প্রতিবেদনের অনুলিপি পেয়েছে নিউজবাংলা।

সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ সুপার রতন কৃষ্ণ নাথের করা তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘একরামুল আহসান কাঞ্চনের তিন ভাই এবং এক বোন। ১৯৯৫ সালে তার বাবা ডা. আনোয়ারুল্লাহ মারা যান। রাজারবাগ দরবার শরিফের পেছনে ৩ শতাংশ জমির ওপর তিনতলা পৈতৃক বাড়ি তাদের। বাবার মৃত্যুর পর কাঞ্চনের বড় ভাই আক্তার-ই-কামাল, মা কোমরের নেহার ও বোন ফাতেমা আক্তার পির দিল্লুর রহমানের মুরিদ হন। তবে রিট আবেদনকারী ও তার অপর ভাই ডা. কামরুল আহসান বাদলকে বিভিন্নভাবে প্ররোচিত করেও ওই পিরের মুরিদ করা যায়নি।

‘এরই মধ্যে একরামুল আহসান কাঞ্চনের মা, ভাই ও বোনের কাছ থেকে তাদের পৈতৃক জমির অধিকাংশই পিরের দরবার শরিফের নামে হস্তান্তর করা হয়। আর একরামুল আহসান কাঞ্চন ও তার ভাইয়ের অংশটুকু পির এবং তার দরবার শরিফের নামে হস্তান্তর করার জন্য পির দিল্লুর এবং তার অনুসারীরা বিভিন্নভাবে চাপ দেন।’

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সম্পত্তি হস্তান্তর না করায় পির দিল্লুর রহমান ও তার অনুসারীদের সঙ্গে একরামুল আহসান কাঞ্চনের শত্রুতা সৃষ্টি হয়। সে শত্রুতার কারণেই একরামুল আহসান কাঞ্চনের বিরুদ্ধে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় হয়রানিমূলক মামলা করা হয়। পির দিল্লুর রহমান ও তার অনুসারীরা হীনস্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টা করেছেন মর্মে তদন্তকালে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একরামুল আহসান কাঞ্চনের বিরুদ্ধে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় মোট ৪৯টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে ৩৫টিতে তিনি খালাস পেয়েছেন। বর্তমানে ১৪টি মামলা আদালতে বিচারাধীন।

এসব মামলার বাদী ও সাক্ষীদের বিষয়েও তদন্ত করে সিআইডি। হয়রানিমূলক মামলাগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষ তিনজন ব্যক্তির নাম ও ভূমিকা সিআইডি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তারা হলেন রাজারবাগ দরবার শরিফের পিরের মোহাম্মদীয়া ট্রি প্লানটেশন প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা শাখারুল কবির, পিরের আবাসন কোম্পানি সাইয়্যেদুল কাওমাইন প্রোপার্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুকুর রহমান, পিরের মোহাম্মদীয়া জামিয়া শরিফ মাদ্রাসার সভাপতি মো. মফিজুর রহমান।

সিআইডির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, অধিকাংশ মামলার বাদী, সাক্ষী ও ভুক্তভোগী কোনো না কোনোভাবে রাজারবাগ দরবার শরিফ ও পিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

মানবাধিকার কমিশনের তদন্তেও উঠে এসেছে পিরের মামলার বিষয়

পিরের মামলাবাজ সিন্ডিকেট নিয়ে গত বছর তদন্ত কমিশন করেছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। তাদের ২৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার তথ্য রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজারবাগ দরবার শরিফের পির দিল্লুর রহমান এবং তার অনুসারীরা দরবার শরিফের নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের জন্য নিরীহ জনসাধারণের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করছে।

প্রতিবেদনে কেস স্টাডি হিসেবে একরামুল আহসান কাঞ্চনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

আরও পড়ুন:
ই-অরেঞ্জ গ্রাহকদের ৪৫০ কোটি টাকার হদিস নেই
ই-অরেঞ্জের মালিকসহ তিনজন রিমান্ডে
ই-অরেঞ্জের সিওও আমান কারাগারে
এবার ই-অরেঞ্জের সিওও গ্রেপ্তার
গ্রাহকের মামলায় ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া কারাগারে

শেয়ার করুন

অনলাইন ক্যাসিনোর লাগামহীন বিজ্ঞাপন ফেসবুক, গুগলে 

অনলাইন ক্যাসিনোর লাগামহীন বিজ্ঞাপন ফেসবুক, গুগলে 

এসব অনলাইন ক্যাসিনোর বিজ্ঞাপন শুধু ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ নয়। গুগলে অনুসন্ধান করলে অনলাইন ক্যাসিনোর ওয়েবসাইট বাংলাতেও পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া ক্যাসিনো নিয়ে ইউটিউবে নিয়মিত আপলোড হচ্ছে বাংলা ভিডিও কন্টেন্ট।

দেশে দুই বছর আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অভিযানের মুখে অবৈধ ক্যাসিনো বন্ধ হলেও অনলাইনে জুয়া খেলা থেমে নেই। বিদেশ থেকে পরিচালিত বিভিন্ন সাইটে বিপুল সংখ্যায় আকৃষ্ট হচ্ছে কিশোর-তরুণরা।

ফেসবুক ব্যবহারকারীদের টার্গেট করে এসব সাইটের বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে বাংলায়। অনলাইন ক্যাসিনোর অ্যাপ ইনস্টলের জন্যও দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন অফার। এমনকি বিজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংকের লোগোও ব্যবহার করা হচ্ছে।

এসব অ্যাপের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কারিগরি সক্ষমতার অভাব রয়েছে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের। তারা বলছে, বিদেশ থেকে অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালিত হওয়ায় এগুলো ঠেকানো সহজ নয়।

ফেসবুকে বুস্ট করা বেশ কয়েকটি অনলাইন ক্যাসিনোর বিজ্ঞাপন পেয়েছে নিউজবাংলা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে এই অনলাইন ক্যাসিনো। তবে এসব ক্যাসিনোর মালিক কারা বা কোথা থেকে পরিচালিত হচ্ছে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে কোনো তথ্য নেই।

কয়েকটি ক্যাসিনোর ফেসবুক পেজে দেয়া রয়েছে ওয়াটসঅ্যাপ নম্বর। এগুলোতে যোগাযোগ করেও তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং টাকার বিনিময়ে গ্রুপের সদস্য হওয়ার শর্ত দেয়া হয়েছে। চাওয়া হয়েছে ভোটার আইডি কার্ড, নাম, বয়স, জন্মতারিখ, মোবাইল ফোন নম্বর। এসব তথ্য দিলেই মেলে গ্রুপের সদস্য হওয়ার অনুমতি।

অনলাইন ক্যাসিনোর লাগামহীন বিজ্ঞাপন ফেসবুক, গুগলে

কীভাবে চলছে জুয়া

অনলাইনে জুয়া খেলেন বা বাজি ধরেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, দেশে এই মুহূর্তে সবচেয়ে জনপ্রিয় অনলাইন জুয়ার সাইট ১এক্সবেট। এ ছাড়া বেট৩৬৫ সাইটটিও বেশ জনপ্রিয়। এগুলোর বিজ্ঞাপন নিয়মিত দেয়া হয় ফেসবুকে। দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত এই সাইটগুলোতে ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলা নিয়ে বাজি ধরা যায়।

এসব সাইট বিদেশ থেকে পরিচালিত হলেও দেশে রয়েছে তাদের এজেন্ট, আর জুয়ার টাকা লেনদেন হয় বিকাশ অথবা নগদে।

অনলাইনে নিয়মিত জুয়া খেলেন এমন একজন নিউজবাংলাকে জানান, এসব সাইট মূলত রাশিয়াকেন্দ্রিক। তবে ভারত ও পাকিস্তান থেকেও এগুলো নিয়ন্ত্রিত হয়।

তিনি বলেন, ‘এগুলোর অ্যাপ প্লে-স্টোরে সার্চ দিলেই পাওয়া যায়। ইনস্টল করার পর অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। টাকা ঢুকাতে হয় বিকাশ অথবা নগদে। অ্যাপে বিভিন্ন খেলায় জয়-পরাজয় নিয়ে বাজি ধরা যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন গেম আছে, তবে সেটা কম মানুষ খেলে।’

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ-নিউজল্যান্ডের ক্রিকেট খেলা ছিল। অ্যাপে বাংলাদেশ উইন ওয়ান ও নিউজিল্যান্ড উইন টু অপশন থাকে। বাজিতে অংশ নিতে অ্যাকাউন্টে এক হাজার টাকা জমা রাখতে হয়। খেলায় বাংলাদেশের রেটিং ছিল ১.৪৪। অর্থাৎ, বাংলাদেশের হয়ে খেললে এক হাজার টাকায় ৪৪০ টাকা পাওয়া যাবে। জমা রাখা এক হাজার টাকা বাদ দিয়ে পাওয়া যায় ৪৪০ টাকা। অন্যদিকে নিউজল্যান্ডের রেটিং ছিল ২.৪৭। অর্থাৎ নিউজিল্যান্ড জিতলে দলটির পক্ষে বাজি ধরা ব্যক্তি পাবেন ২ হাজার ৪৭০ টাকা। জমা রাখা এক হাজার টাকা বাদ দিয়ে হাতে আসবে এক হাজার ৪৭০ টাকা।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব অনলাইন ক্যাসিনো দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হলেও সমন্বয়ের জন্য দেশীয় সিন্ডিকেট রয়েছে। তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ফেসবুক গ্রুপ বা পেজ খুলে প্রচার চালানো হচ্ছে।

এসব অনলাইন ক্যাসিনোর বিজ্ঞাপন শুধু ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ নয়। গুগলে অনুসন্ধান করলে অনলাইন ক্যাসিনোর ওয়েবসাইট বাংলাতেও পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া ক্যাসিনো নিয়ে ইউটিউবে নিয়মিত আপলোড হচ্ছে বাংলা ভিডিও কন্টেন্ট।

অনলাইন ক্যাসিনোর লাগামহীন বিজ্ঞাপন ফেসবুক, গুগলে

বন্ধের কারিগরি সক্ষমতা নেই কর্তৃপক্ষের

সরকার বেশ কিছু সাইট ব্লক করলেও ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করে অনলাইনে চলছে জুয়া খেলা। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্র নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা আমাদের পক্ষ থেকে যেগুলো বন্ধ করা যায় সেগুলো বন্ধ করেছি। তবে ভিপিএন ব্যবহার করে প্লে-স্টোর থেকে ডাউনলোড করে যেগুলো চালাচ্ছে সেগুলো সব বন্ধ করতে পারছি না।’

কারিগরি সক্ষমতার অভাবের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এটা বাস্তবে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না। তবে কীভাবে কাস্টমাইজ বা ফিল্টারিং করা যায় সেই চিন্তাভাবনা আমরা করছি।’

ভিপিএন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয় জানিয়ে বলেন, ‘এটা যদি বন্ধ করে দিই, তাহলে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষতি হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ইউটিউব, ফেসবুক বা গুগলের সঙ্গে কথা বলি। সবই যে তারা বন্ধ করে তা না। কিছু করে, কিছু করে না। সব ক্ষেত্রে কারিগরি সক্ষমতা তো আমাদের বিটিআরসির নাই। তাহলে টোটাল ভিপিএন অ্যাপসই বন্ধ করে দিতে হবে।

আগের চেয়ে অবস্থার উন্নতি হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘এখন আর আগের মতো চাইলেই বন্ধ করা অ্যাপ্লিকেশনে ঢোকা যাচ্ছে না। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

এ বিষয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার ক্রাইম ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার রেজাউল মাসুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের একটা মনিটরিং টিম রয়েছে, যারা এ বিষয়ে কাজ করছে। যারা অ্যাপ ও জুয়াভিত্তিক বিষয় নিয়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করে থাকে।

‘যে ধরনের পেজের মধ্যে এগুলো আসে, আমাদের যে আইন ও নীতিমালা রয়েছে এবং তার সঙ্গে যেগুলো মেলে না, তা আমরা বন্ধ করার জন্য বিটিআরসিকে বলছি; আবার অভিযানও পরিচালনা করছি। অনেককেই ধরেছি এবং মামলাও হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এসব সাইট ও অ্যাপের সঙ্গে বিদেশি চক্র জড়িত। এরা বাংলাদেশে কিছু এজেন্ট নিয়োগ করে, তারা ডিজিটাল কারেন্সি ট্রান্সজেকশন করে থাকে।এভাবে অনলাইনভিত্তিক অ্যাপস এবং ওয়ান টু ওয়ান ইভেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা বা নির্মূল করা কঠিন।’

অনলাইন ক্যাসিনোর বিজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংকের লোগো ব্যবহারের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘এটা কারা করছে আমরা বের করার চেষ্টা করছি। এ ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় সেটি নিয়েও চিন্তাভাবনা করছি।’

আরও পড়ুন:
ই-অরেঞ্জ গ্রাহকদের ৪৫০ কোটি টাকার হদিস নেই
ই-অরেঞ্জের মালিকসহ তিনজন রিমান্ডে
ই-অরেঞ্জের সিওও আমান কারাগারে
এবার ই-অরেঞ্জের সিওও গ্রেপ্তার
গ্রাহকের মামলায় ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া কারাগারে

শেয়ার করুন

শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ছাড়াই শিক্ষক তারা

শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ছাড়াই শিক্ষক তারা

রাজধানীর লালমাটিয়া মহিলা কলেজ। ছবি: সংগৃহীত

এনটিআরসিএ ও মাউশি বলছে, লালমাটিয়া মহিলা কলেজ এমপিওভুক্ত হওয়ায় শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ছাড়া তারা কোনো শিক্ষকই নিয়োগ দিতে পারে না। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, নিয়ম মেনেই তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

রাজধানীর লালমাটিয়া মহিলা কলেজে এনটিআরসিএর শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ছাড়াই চারজনকে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। যারা ২০১৮ সালের মে মাস থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ ২০০৫ সালেই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএর শিক্ষক নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কলেজটির গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগে তাদের প্রভাষক পদে নিয়োগ দেয়া হয়, সেই বিজ্ঞপ্তি নিয়েও রয়েছে বিতর্ক।

বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) বলছে, এমপিওভুক্ত হওয়ায় কলেজটি এনটিআরসিএর সনদ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারে না। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, নিয়ম মেনেই তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

নিউজবাংলার অনুসন্ধান বলছে, রাজধানীর সুপরিচিত এই কলেজে গত কয়েক বছরে এই চারজনসহ অন্তত ৬০ জন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে, যাদের অনেকেরই নেই শিক্ষক নিবন্ধন সনদ।

অভিযোগ উঠেছে, শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ছাড়া নিয়োগ পাওয়া এই চারজনও সরকারি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন- এমন আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

লালমাটিয়া মহিলা কলেজ কর্তৃপক্ষ ২০১৭ সালে জাতীয় দৈনিকে এক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগে পাঁচজনকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেয় ২০১৮ সালে। তবে তাদের মধ্যে শেখ রুবাইত-ই নাহার, নুসরাত রহমান, জান্নাতুল ফেরদৌস ও ওয়াহিদা পারভীনকে নিয়োগ দেয়া হয় এনটিআরসিএর শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ছাড়াই। তাদের সঙ্গে একই সময়ে নিয়োগ পাওয়া পারমিতা সরকারেরই শুধু এনটিআরসিএর এই সনদ ছিল।

বিতর্কিতভাবে নিয়োগ পাওয়া ওই চারজনের মধ্যে শেখ রুবাইত-ই নাহার এখন গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন বলে নিউজবাংলাকে জানিয়েছেন কলেজটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক।

এই শিক্ষকদের অভিযোগ, অধ্যক্ষ ড. রফিকুল ইসলামই তাদের নিয়োগ দিয়েছেন ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে, যাদের প্রত্যেকের মাসিক বেতন ৩২ হাজার টাকা।

লালমাটিয়া মহিলা কলেজ কর্তৃপক্ষ ২০১৭ সালের ২৭ জুন একটি জাতীয় দৈনিকে গণিত, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, গার্হস্থ্য অর্থনীতি, ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন টেকনোলজি এবং আইন বিষয়ে সাতজন করে প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়।

অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা আছে, এনটিআরসিএর অনুমোদন ছাড়া কোনো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর বা তৎপরবর্তী সময়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে কোনো পদে নিয়োগ দিলে তা অবৈধ নিয়োগ বলে বিবেচিত হবে।

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, লালমাটিয়া মহিলা কলেজের ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সবকিছু উল্লেখ থাকলেও শিক্ষক নিবন্ধন সনদের কথা ছিল না, যা পূর্বপরিকল্পিত এবং নিয়োগবিধি পরিপন্থি বলে মনে করছেন কলেজসংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজটির এক শিক্ষক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘লালমাটিয়া মহিলা কলেজটি সরকারীকরণের প্রক্রিয়ায় আসায় অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম নিয়মবহির্ভূতভাবে তাদের নিয়োগ দিয়েছেন, যা কলেজটির জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।’

আরেক শিক্ষক বলেন, ‘অধ্যক্ষ ড. রফিকুল ইসলাম ১৩তম বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা। হিসাব বিজ্ঞানের এই অধ্যাপকের সরকারি কলেজেই চাকরি করার কথা। কিন্তু তিনি ২০১২ সাল থেকেই চাকরি করছেন লালমাটিয়া মহিলা কলেজে।

‘যার মধ্যে প্রথম চার বছর প্রেষণে, তার পরের চার বছর লিয়েনে এবং বর্তমানে সংযুক্ত ওএসডি থেকে লালমাটিয়া মহিলা কলেজে চাকরি করছেন, যা বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (বিএসআর) পার্ট-১-এর ৩৪ বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’

আলোচিত ওই নিয়োগে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে প্রভাষক পদে নিয়োগ পাওয়া নুসরাত রহমানের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা।

তিনি বলেন, ‘আমার এনটিআরসিএ সার্টিফিকেট নেই। কর্তৃপক্ষ বলেছে, আমাকে দুই-তিন বছরের মধ্যে সার্টিফিকেট জমা দিতে হবে। আমরা এখানে এমপিওভুক্ত নিয়োগ না। আমাদের নিয়োগ হয়েছে অনার্সের জন্য। স্থায়ী নিয়োগ হয়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ বলেছে, এটা সরকারি হলে আমরা সরকারি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।’

নুসরাত রহমানের সঙ্গে প্রভাষক পদে নিয়োগ পাওয়া জান্নাতুল ফেরদৌসও শিক্ষক নিবন্ধন সনদ না থাকার কথা স্বীকার করে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কারণ কলেজ কর্তৃপক্ষ যখন সার্কুলার দেয়, সেই সার্কুলারের শর্তের মধ্যে এনটিআরসিএ সার্টিফিকেটের কথা উল্লেখ ছিল না। তাই আমার লাগে নাই।’

এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিউজবাংলা। তার দাবি, নিয়োগ নিয়ে কোনো অনিয়ম হয়নি।

অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ওই নিয়োগে অনেকের এনটিআরসিএ সার্টিফিকেট নাও থাকতে পারে। হয়তো কারও আছে, কারও নেই। তবে এভাবে নিয়োগ দেয়ার নিয়ম আছে।

‘স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এনটিআরসিএ সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক হলেও কলেজে বাধ্যতামূলক না। আমার মতে এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি। তাছাড়া ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরাও ছিলেন।’

লালমাটিয়া মহিলা কলেজের এসব নিয়োগ নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এনটিআরসিএ চেয়ারম্যান মো. এনামুল কাদের খান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রভাষক পদে শিক্ষক নিবন্ধন সার্টিফিকেট ছাড়া নিয়োগ হবে না। পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে একজনের নিবন্ধন সার্টিফিকেট আছে, চারজনের নেই। নিবন্ধন সার্টিফিকেট ছাড়া এই চারজনের নিয়োগ ঠিক হয়নি।’

তিনি জানান, এনটিআরসিএর আইনে বলা আছে, এনটিআরসিএ সার্টিফিকেট ছাড়া বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারবে না।

মাউশির তৎকালীন সহকারী পরিচালক (কলেজ শাখা-১) এ কে এম মাসুদসহ কয়েকজন কর্মকর্তা কলেজটি পরিদর্শন করেছিলেন।

নিউজবাংলা কলেজটিতে তার পরিদর্শনের বিষয়টি জানার পর অনিয়মের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এ কে এম মাসুদ বলেন, ‘এনটিআরসিএ সার্টিফিকেট ছাড়া নিয়োগ হতে পারে না। স্থায়ী নিয়োগ হলো কী করে? এটা সম্ভব না। এনটিআরসিএ সনদ বাধ্যতামূলক। সে ক্ষেত্রে এই নিয়োগটা বৈধ না। ২০০৬ সাল থেকে এই নিয়ম চালু হয়েছে। শিক্ষক নিবন্ধন সার্টিফিকেট ছাড়া স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ হওয়াটা বৈধ না।’

মাউশির আইন শাখার প্রধান সিদ্দিকুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান সরকারি সুযোগ-সুবিধা নেয়, সেসব প্রতিষ্ঠান সরকারি নিয়ম মানতে বাধ্য। লালমাটিয়া মহিলা কলেজ এমপিওভুক্ত। তারা এনটিআরসিএর সার্টিফিকেট ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারে না।’

কলেজ ফান্ড থেকে যেসব শিক্ষক বেতন পান তাদের শিক্ষক নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২০০৫ সালের পর থেকে এমপিওভুক্ত কলেজে যাদের নিয়োগ হবে, হোক তারা কলেজ ফান্ড থেকে বেতন পাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রেও এনটিআরসিএ সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক।

‘কারণ ওই কলেজটা তো এমপিওভুক্ত। কলেজটির অন্য অনেকে সরকারি বেতন পাচ্ছেন। কলেজটি এমপিওভুক্ত হওয়ায় তারা সরকারি সুবিধা পাচ্ছেন। সুতরাং তাদের সরকারি নিয়ম মানতে হবে। এ ছাড়া নিয়োগ বৈধ হবে না। এখানে এনটিআরসিএ সার্টিফিকেট ছাড়া নিয়োগই বৈধ হবে না।’

স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সাজু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘স্বচ্ছতা সবখানেই থাকা দরকার। কলেজটির প্রিন্সিপালও সরকারি চাকরিজীবী, বিসিএস ক্যাডার। এখন তিনি ডেপুটেশনে আছেন। একজন সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে সরকারি আইন-কানুন তার অবশ্যই মানা উচিত ছিল। নিয়োগে অনিয়ম হয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত।’

আরও পড়ুন:
ই-অরেঞ্জ গ্রাহকদের ৪৫০ কোটি টাকার হদিস নেই
ই-অরেঞ্জের মালিকসহ তিনজন রিমান্ডে
ই-অরেঞ্জের সিওও আমান কারাগারে
এবার ই-অরেঞ্জের সিওও গ্রেপ্তার
গ্রাহকের মামলায় ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া কারাগারে

শেয়ার করুন

ই-অরেঞ্জের প্রতারণা ঢাকতে সিওও আমানের নিয়োগ

ই-অরেঞ্জের প্রতারণা ঢাকতে সিওও আমানের নিয়োগ

ই-অরেঞ্জের সিওও আমান উল্লাহ চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত

ই-কমার্স খাতসংশ্লিষ্টদের কাছে আমানউল্লাহ চৌধুরী চতুর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। ই-অরেঞ্জের সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্ত হয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স সাইট আমাজনের ভুয়া বাংলাদেশ সংস্করণ চালু এবং এর মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে আমানের বিরুদ্ধে। 

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গ্রাহকদের মামলা করার পর বেরিয়ে আসছে অনিয়মের নানান তথ্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রাহক ক্ষোভ দানা বাঁধতেই হঠাৎ করে নাজমুল আলম রাসেলকে সরিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) পদে বসানো হয় আমানউল্লাহ চৌধুরীকে ।

মূলত গ্রাহকদের ১১০০ কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা আড়াল করতে পরিকল্পিতভাবে আমান উল্লাহকে এ পদে বসানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। আমান দায়িত্ব নেয়ার পরপরই গ্রাহকদের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতে সাবেক সিওও রাসেলের বিরুদ্ধে ৬৬৩ কোটি আত্মসাতের প্রচার চালায় মালিকপক্ষ।

আমান উল্লাহ চৌধুরীকে আলোচিত এই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেয়ার চিঠির একটি অনুলিপি পেয়েছে নিউজবাংলা। এতে দেখা যায়, ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন গত ৩০ জুন নিয়োগপত্রে সই করেন। পরদিন ১ জুলাই ই-অরেঞ্জের সিওও হিসেবে যোগ দেন আমান।

প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলেও গ্রেপ্তার হওয়ার আগে পর্যন্ত তেমন কেউ চিনতেন না আমান উল্লাহ চৌধুরীকে। জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য দেয়া তথ্য ফরমে আমান উল্লাহ চৌধুরীর (৪৩) শিক্ষাগত যোগ্যতার জায়গায় লেখা রয়েছে কারিগরি শিক্ষা গ্রহণকারী। এর বাইরে পরিচয় তুলে ধরার মতো কিছুই নেই আমানের।

তবে ই-কমার্স খাতসংশ্লিষ্টদের কাছে আমান চতুর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। ই-অরেঞ্জের সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্ত হয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স সাইট আমাজনের ভুয়া বাংলাদেশ সংস্করণ চালু এবং এর মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে আমান উল্লাহর বিরুদ্ধে।

ই-অরেঞ্জের প্রতারণা ঢাকতে সিওও আমানের নিয়োগ
ই-অরেঞ্জে আমান উল্লাহ চৌধুরীর নিয়োগপত্র

গুলশান এলাকা থেকে ১৯ আগস্ট আমান উল্লাহকে গ্রেপ্তার করে গুলশান থানা পুলিশ। এ সময় তার কাছ থেকে ২৬টি ক্রেডিট কার্ড, নগদ ১৬ লাখ টাকা এবং একটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করা হয়।

জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ফরমে আমান উল্লাহর জন্মতারিখ উল্লেখ রয়েছে ১৯৭৮ সালের ৮ মে। বাবা মো. মোসাদ্দেক চৌধুরী, মা শেফালী চৌধুরী এবং স্ত্রীর নাম মাহমুদা আফরোজ লাকী।

স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে বাড়ি- ৪/৩, ফ্ল্যাট ডি-১, রোড-১৩, গুলশান উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার এজাহারে তার বর্তমান ঠিকানা দেখানো হয়েছে কুনিপাড়া, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল। তবে ই-অরেঞ্জের সিওও পদে ইস্যু করা নিয়োগপত্রে ঠিকানা রয়েছে প্লট-১২০৯, রোড-৮, এভিনিউ ৯/এ, মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা-১২১৯।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ই-অরেঞ্জে আমান উল্লাহর মাসিক বেতন ধরা হয় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার আওতায় তাকে দেয়া হতো মাসভিত্তিক অতিরিক্ত সাড়ে তিন হাজার টাকা মোবাইল ফোনের বিল এবং প্রতিদিন দুপুরে বিনা মূল্যে খাবার। ছিল বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহারের সুবিধা।

ই-অরেঞ্জে সিওও পদে আমান উল্লাহ যোগ দেয়ার পর একে একে ঘটতে থাকে নাটকীয় ঘটনা। প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের ৬৬৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলে সাবেক সিওও নাজমুল আলম রাসেলসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা হয় ১১ আগস্ট। এ মামলার বাদী হন নতুন সিওও আমান উল্লাহ চৌধুরী। আর মালিকানা বদলের নাটক সাজানো হয় ১৯ জুলাই।

তার আগেই এক লাখ গ্রাহকের প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার সিংহভাগ ধাপে ধাপে তুলে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেন আমান।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলার তদন্তে যুক্ত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে জানান, গত ৩০ জুন পর্যন্ত একটি ব্যাংক হিসাবে জমা পড়া প্রায় ৩৯২ কোটি টাকার মধ্যে ৩৮৯ কোটি টাকা তুলে নেয়া হয়। অন্য একটি ব্যাংক হিসাবে জমা প্রায় ৬২১ কোটি টাকার মধ্যে ৬২০ কোটি টাকাও তুলে নেয়া হয়।

এভাবে ই-অরেঞ্জের ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা লোপাট হতে থাকে আমান উল্লাহ চৌধুরী সিওও পদে যোগ দেয়ার পর। তবে এর সমস্ত দায় চাপানো হয় সাবেক সিওও নাজমুল আলম রাসেলসহ আরও কয়েকজনের ওপর।

ই-অরেঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের পক্ষে গুলশান থানায় করা মামলার বাদী মো. তাহেরুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মূলত আমান উল্লাহ চৌধুরীকে ই-অরেঞ্জের সিওও পদে বসানো হয়েছে মালিকপক্ষের টাকা হাতানোর ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য।

‘আমান সিওও পদে যোগ দেয়ার পরপরই ই-অরেঞ্জের গ্রাহকদের আস্থার জায়গাটি ধূলিসাৎ হতে থাকে। একদিকে তিনি মালিকপক্ষের হয়ে গ্রাহকদের পণ্য বা রিফান্ড দেয়ার আশ্বাস দিয়ে সময়ক্ষেপণ করেছেন, অন্যদিকে এই সময়ক্ষেপণের সুযোগ নিয়ে ই-অরেঞ্জের লেনদেন বন্ধ করাসহ মালিকপক্ষকে টাকা লোপাট এবং তাদের কাউকে কাউকে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছেন।’

তাহেরুল ইসলাম বলেন, ‘সংক্ষুব্ধ কোনো গ্রাহক পাওনা টাকা ফেরত চাইলে তিনি (আমান) হুমকিধমকি দিতেন। বলতেন, তোরা এক টাকাও পাবি না। পারলে কিছু করিস। তার এ ধরনের আচরণে গ্রাহকের অসন্তুষ্টি চরমে উঠে গিয়েছিল।’

ই-অরেঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত এক গ্রাহক জামান উদ্দিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমান উল্লাহ চৌধুরী ই-অরেঞ্জে যোগ দিয়েছিলেন মালিকপক্ষকে বাঁচাতে এবং সাবেক সিওও নাজমুলকে ফাঁসাতে। তিনি যোগ দিয়েই একের পর এক নাটক সৃষ্টি করেন। ওয়েবসাইটে গ্রাহকদের উদ্দেশে একের পর এক নোটিশ দিতে থাকেন। টাকা আত্মসাতের অভিযোগের মামলা করেন। আসলে এর সবই ছিল নাটক।’

ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের কয়েকজন জানান, আমান উল্লাহ চৌধুরী নিজেকে বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স সাইট আমাজন-এর বাংলাদেশ সংস্করণের পরিচালক হিসেবে পরিচয় দিতেন। তিনি একটি ‘ডোমেইন’ কিনে আমাজন বাংলাদেশ লিমিটেড নাম জুড়ে দেন।

চতুর আমান উল্লাহ চৌধুরী রেজিস্ট্রার অফ জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি) এর কয়েকজন কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে সেই নামটির নিবন্ধনও নিয়েছেন। তবে তাকে নিয়ে দেশে-বিদেশে সমালোচনার মুখে সাইটটির বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধ ছিল।

পরে আমান উল্লাহ চৌধুরী নজর দেন ই-কমার্স সাইট খোলার দিকে। ই-অরেঞ্জে যোগ দেয়ার আগে তিনি ‘নগদহাট ডটকম’ নামে ফেসবুকভিত্তিক নামসর্বস্ব একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রোপাইটর হিসেবে কাজ করতেন।

ইলেকট্রনিক কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. সাহাব উদ্দিন শিপন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ লোকটিকে (আমান উল্লাহ চৌধুরী) ই-অরেঞ্জে যোগ দেয়ার আগে আমি চিনতাম না। তার নগদহাট ও আমাজন বাংলাদেশ লিমিটেড ই-ক্যাবের মেম্বারও না। আবার ই-অরেঞ্জ মেম্বার হলেও এর মালিকপক্ষ ছাড়া সিওও আমান উল্লাহ চৌধুরীর কোনো বায়োডাটা বা বায়োগ্রাফি আমাদের কাছে নেই।’

আমাজন বাংলাদেশ লিমিটেড সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কপিরাইট আইনে একটি প্রতিষ্ঠানের সেইম লোগো ও সেইম নাম অন্য কারও ব্যবহারের সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অজান্তে কেউ এটা করে থাকলেও যে প্রতিষ্ঠানের গুডউইল ব্যবহার করা হয়, তারা জানতে পারলে এবং অভিযোগ পেলে তা হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’

আমাজন বাংলাদেশ লিমিটেডের নাম কীভাবে নিবন্ধন হলো জানতে চাইলে আরজেএসসির অতিরিক্ত নিবন্ধক (যুগ্ম সচিব) সন্তোষ কুমার পণ্ডিত নিউজবাংলাকে জানান, ‘আইনে বলা আছে, সিমিলার নামে হবে না। যদি একই রকম হয় বা কাছাকাছি নামের হয় কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠান হয় তাহলে আরজেএসসি থেকে নিবন্ধন করা যাবে না। সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের নামেও কেউ কোনো প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন করতে পারবে না। এটা করা হয়েছে যাতে কোনো একজন আরেকজনকে প্রতারিত করতে না পারে। তবে কেউ করলে তার আগে-পরে কিছু যোগ করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমান উল্লাহ চৌধুরীর ক্ষেত্রে কী হয়েছে- আসলে ভেতরের খবরটা আমি জানি না। তবে নিবন্ধনের যেটা নিয়ম সেটা হলো- কেউ যদি এ ধরনের প্রতিষ্ঠিত কোনো কোম্পানি বা গ্রুপের নাম ব্যবহার করতে চায় সেখানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনাপত্তি ছাড়া করা যাবে না। এটা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে তারা অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে।’

আরও পড়ুন:
ই-অরেঞ্জ গ্রাহকদের ৪৫০ কোটি টাকার হদিস নেই
ই-অরেঞ্জের মালিকসহ তিনজন রিমান্ডে
ই-অরেঞ্জের সিওও আমান কারাগারে
এবার ই-অরেঞ্জের সিওও গ্রেপ্তার
গ্রাহকের মামলায় ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া কারাগারে

শেয়ার করুন

সাক্ষী বানাতে সিআইডির কাণ্ড

সাক্ষী বানাতে সিআইডির কাণ্ড

প্রায় ছয় মাস তদন্তের পর থানা থেকে মামলাটির তদন্তভার সিআইডিকে দেয়া হয়। সিআইডি নাদিমের মেয়ে ও স্ত্রীকে ‍সিআইডি কার্যালয়ে দুই দিন আটকে রাখে। তাদের সেখানে নির্যাতন করে নাদিম ও তার পরিচিত ইয়াকুব আলী নামে এক ব্যবসায়ীকে জড়িয়ে জবানবন্দি দিতে চাপ দেয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন নাদিমের মেয়ে ও স্ত্রী।

রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় খায়রুল ইসলাম নামে এক তরুণ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এ ঘটনায় হত্যা মামলা হয়। আসামি করা হয় নাদিম আহম্মেদ নামে একজনকে। অভিযোগ করা হয়, বাসার ছাদে খায়রুলকে মারধর করে নিচে ফেলে দেন নাদিমসহ অজ্ঞাত কয়েকজন। নিচে পড়ে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান খায়রুল।

খায়রুলের বাবার করা মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে আসামি নাদিম আহম্মেদের মেয়ে এবং তার স্ত্রীকে। অভিযোগ, নাদিমের মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল খায়রুলের। ঘটনার দিন রাতে দেখা করতে নাদিমের বাসার পাশের একটি বাসার ছাদে গিয়েছিলেন খায়রুল। মেয়ের সঙ্গে খায়রুল দেখা করেছে দেখতে পেরে খায়রুলকে মারধর করে ছাদ থেকে ফেলে দেন নাদিমসহ কয়েকজন। এরপরই নিচে পড়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন খায়রুল।

মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে বাড্ডা থানা পুলিশ। সেখানে জবানবন্দি দেন নাদিমের মেয়ে। কিন্তু এতে খায়রুলকে মারধরের বিষয়টি জবানবন্দিতে আসেনি।

প্রায় ছয় মাস তদন্তের পর থানা থেকে মামলাটির তদন্তভার সিআইডিকে দেয়া হয়। সিআইডি নাদিমের মেয়ে ও স্ত্রীকে ‍সিআইডি কার্যালয়ে দুই দিন আটকে রাখে। তাদের সেখানে নির্যাতন করে নাদিম ও তার পরিচিত ইয়াকুব আলী নামে এক ব্যবসায়ীকে জড়িয়ে জবানবন্দি দিতে চাপ দেয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন নাদিমের মেয়ে ও স্ত্রী।

এসব বিষয় উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপিসহ সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে চলতি মাসের ১০ আগস্ট একটি অভিযোগ করেছেন ইয়াকুব আলী। এই অভিযোগে সাক্ষীদের দুদিন আটকে রেখে তাদের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দেয়ার জন্য নির্যাতনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। ইয়াকুব আলী রিমান্ডে থাকাকালে তার পরিবারের কাছ থেকে সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্টরা ২ লাখ টাকা আদায় করেছেন বলেও অভিযোগ জানিয়েছেন ইয়াকুব।

সিআইডির ঢাকা মেট্রো (উত্তর বিভাগ) এই মামলাটি তদন্ত করছিল। এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওই বিভাগের দায়িত্বশীলরা। তবে অভিযোগ ওঠার পর চলতি মাসেই মামলাটি ওই বিভাগ থেকে সরিয়ে সিআইডির সিরিয়াস ক্রাইম বিভাগে স্থানান্তর করা হয়েছে।

২০২০ সালের ২০ জুন বাড্ডার রসুলবাগের ৪১০ নম্বর বাড়ির চালে খায়রুল ইসলাম দগ্ধ হন। পরবর্তীতে তাকে উদ্ধার করে শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৪ জুন মারা যান খায়রুল।

এ ঘটনায় নিহতের বাবা আব্দুল কুদ্দুস সিকদার ১ জুলাই বাড্ডা থানায় নাদিম আহম্মেদকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। নাদিম আহম্মেদ রসুলবাগের ৪১০ নম্বর তিনতলা বাড়ির মালিক। মামলার পর থেকেই তিনি পলাতক।

মামলায় যে অভিযোগ

নিহত খায়রুলের বাবা আব্দুল কুদ্দুস সিকদার মামলায় নাদিম আহম্মেদসহ চার-পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছেন। মামলার এজহারে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘নাদিম আহম্মেদের বড় মেয়ে নাজনীন আহম্মেদ নীথির সঙ্গে আমার ছেলে খায়রুল ইসলামের প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক। নীথির সঙ্গে খায়রুল বিভিন্ন জায়গায় দেখাসাক্ষাৎ করত। গত বছরের ২০ জুন রাত সাড়ে ৮টার দিকে উত্তর বাড্ডায় ৪১০ নম্বর বাড়ির ছাদে নীথির সঙ্গে দেখা করতে যায়। তারা কথা বলার সময় নাদিম আহম্মেদ দেখে ফেলেন। নাদিম ও অন্য আসামিরা খায়রুল ইসলামকে মারধর করে পাশের বাড়ির টিনের চালে ফেলে দেন। ফেলার সময় বিদ্যুতের তারের সঙ্গে স্পৃষ্ট হয়ে খায়রুল গুরুতর আহত হয়। তাকে উদ্ধার করে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৪ জুন রাত ১২টা ৫০ মিনিটে (খায়রুল) মারা যায়।’

এজাহারে বলা হয়েছে, আসামি নাদিম আহম্মেদ মারপিট করে ওই বাসার ছাদ থেকে ফেলে দেয়ার কারণেই খায়রুলের মৃত্যু হয়েছে।

জবানবন্দিতে যা বলেছেন আসামি নাদিমের মেয়ে

বাড্ডা থানা পুলিশ তদন্তকালে নাদিম আহম্মেদের মেয়ে নাজনীন আহম্মেদ নীথি সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। গত বছরের ২৭ জুলাই এই মামলায় সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দেন নীথি। তবে এই জবানবন্দিতে খায়রুলকে মারধর করে নিচে ফেলে দেয়ার কোনো তথ্য ছিল না বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

জবানবন্দিতে নীথি বলেন, ঘটনার দিন তিনি তাদের নিজেদের ভবনের ছাদে উঠেছিলেন। খায়রুল পাশের একটি দোতলা ভবনের ছাদে উঠেছিলেন। দুজনে কথা বলছিলেন। এ সময় পাশের ছাদে কেউ ওঠার পদশব্দ পাওয়া গেলে লুকাতে গিয়ে খায়রুল ওই ছাদ থেকে পড়ে যান। বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে খায়রুল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। নীথি নিজে চিৎকার করে এলাকার লোকজন জড়ো করেন। পরবর্তীতে খায়রুলকে অনেকেই ধরে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চার দিন পর তার মৃত্যু হয়।

পরবর্তীতে নিথী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার ধারণা, আমি যখন সিঁড়ি দিয়ে কেউ আসছে কি না তা দেখার জন্য যখন গেছি, তখন খায়রুল হয়তো দ্রুত নিচে নামতে চেয়েছিল, সে সময়ই বিদ্যুতের তারে লেগে যায়। আমি শুধু শব্দ শুনে দেখি, নিচে ও জ্বলতেছে।’

সাক্ষ্য দিতে সিআইডি কার্যালয়ে আটক

পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে বাড্ডা থানা থেকে মামলাটির তদন্ত সিআইডিতে আসে ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর। সিআইডির ঢাকা মেট্রো উত্তর বিভাগ মামলাটি তদন্তের দায়িত্বভার পায়।

মামলাটির তদারকি করেন ঢাকা মেট্রো উত্তরের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. খালিদুল হক হাওলাদার। প্রথমে মামলাটি তদন্ত করেন ইন্সপেক্টর হারুন অর রশীদ। কিছু দিন পর তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়। দায়িত্ব দেয়া হয় উপপরিদর্শক (এসআই) দোলন মজুমদারকে।

মামলার নথি অনুযায়ী, তদন্তভার পেয়ে গত ৮ জুন আসামি নাদিম আহম্মেদের বাসায় যান এসআই দোলন মজুমদার ও তার টিম। তিনি নাদিম আহম্মেদ, তার স্ত্রী, মেয়ে ও শ্যালককে ৯ জুন সিআইডি কার্যালয়ে যেতে বলেন। কিন্তু পরবর্তীতে ৯ জুন তাদেরকে যেতে নিষেধ করেন দোলন। ১০ জুন যেতে বলেন।

১০ জুন সকালে নীথি, তার মা সাহিলী বানু, মামা টনিক আহম্মেদ, বিপুল ও তার বোনের স্বামী ইসমাইল সিআইডি কার্যালয়ে যান। মামলার পর থেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন নাদিম আহম্মেদ। ফলে তিনি যাননি। সিআইডি নীথিসহ সবার কাছ থেকে ঘটনার বিষয়ে লিখিত নেয়। এরপর তাদের নেয়া হয় ঢাকা মেট্রো উত্তরের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. খালিদুল হক হাওলাদারের কক্ষে।

নীথি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সেখানে খালিদুল আমাদেরকে হুমকি দেন। এসআই দোলনকে নির্দেশ দেন, আমাদের মারধর করার। আমাকে ও মাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়।’

নীথি বলেন, ‘তারা আমাদের কোনো কথা না শুনে শুধু তাদের শেখানো কথামতো লিখতে চাপ দিতে থাকেন। তারা লিখতে বলেন যে, “আমার আব্বু খায়রুলকে মারধর করেছেন, আমার আব্বুর বন্ধু ইয়াকুব আলীকে দিয়ে কেরোসিন আনিয়ে খায়রুলের গায়ে আগুন দিয়েছেন, এতে তার মৃত্যু হয়েছে।”

‘আমার মাকেও তা বলতে বলল সিআইডি। আমাদের দুদিন সিআইডি কার্যালয়ে আটকে রাখা হলো। নির্যাতন করা হলো। মাকে ভয় দেখানো হলো। দুদিন পর প্রথমে আমাকে আদালতে নিল। আমি আগে একবার জবানবন্দি দেয়ায় আবার জবানবন্দি নেয়নি আদালত। তবে আমার মাকে দিয়ে বাবা ও ইয়াকুব আলীর নামে জোর করে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি নেয়াল।’

সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্টরা জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছিলেন এবং মিথ্যা জবানবন্দি দিতে দফায় দফায় নির্যাতন করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন নাদিম আহম্মেদের স্ত্রী সাহিলী বানু।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি ও আমার স্বামী বাসায় ছিলাম। আমার মেয়ের চিৎকার শুনে আমরা ওপরে গেছি। ভেবেছি, আমার মেয়ের কিছু হয়েছে। আমার স্বামী খায়রুলকে মারছে, নিচে ফেলে দিছে– এগুলো মিথ্যা কথা। এই মিথ্যা কথাগুলো আমাকে দিয়ে জোর করে বলানো হয়েছে। আমি ভয়ে বলতে বাধ্য হয়েছি।’

নির্যাতন না করার বিনিময়ে ২ লাখ টাকা আদায়

সিআইডি মামলা তদন্ত করতে গিয়ে উত্তর বাড্ডার বেকারি ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী ইয়াকুব আলী নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। সিআইডি দাবি করেছে, ইয়াকুব আলী নীথির বাবা নাদিম আহম্মেদের বন্ধু। নীথির মা যে জবানবন্দি দিয়েছেন, সেখানে নাদিম আহম্মেদের যে বন্ধুর কথা বলা হয়েছে, সেই ব্যক্তি এই ইয়াকুব আলী। এরপর ইয়াকুব আলীকে তার উত্তর বাড্ডার স্বাধীনতা সরণির বেকারির দোকান থেকে গত ১০ জুন রাত ৩টার দিকে সিআইডির একটি টিম আটক করে।

ইয়াকুব নিউজবাংলাকে বলেন, সিআইডি কার্যালয়ে নিয়ে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ১২ জুন অ্যাম্বুলেন্সে করে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে সিআইডি কার্যালয় দুদিন রাখা হয়। রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয় ইয়াকুব আলীকে।

দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর চলতি বছরের ২৮ জুলাই জামিন পান ইয়াকুব। জামিনে বের হয়ে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ ও রিমান্ডে থাকাকালে তার পরিবার থেকে ২ লাখ টাকা নেয়ার অভিযোগ করেন তিনি। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপিসহ বিভিন্ন কর্মকর্তাদের লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

ইয়াকুব আলী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সিআইডির এসআই ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দোলন মজুমদার আমার কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। তা না হলে আরও নির্যাতন করা হবে এবং মামলায় ফাঁসানো হবে বলে হুমকি দেন এসআই দোলন।’

গত বছরের ১০ জুন তাকে আটক করে আনা হলেও পরদিন আদালতে তাকে উপস্থাপন করা হয়নি। ১৩ জুন ইয়াকুব আলীকে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠায় সিআইডি। আদালত এক দিনের রিমান্ডে পাঠায়।

ইয়াকুব আলী অভিযোগে জানান, ওই দিন পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার মোড়ে এসআই দোলন ইয়াকুব আলীর ছোট ভাই রাজুর সঙ্গে কথা বলেন। রাজুকে এসআই দোলন বলেন, ‘তোমার ভাইকে আমাকে ১০ লাখ টাকা দিতে বলেছিলাম, আমার কথামতো টাকা দিলে তোমার ভাইয়ের এই পরিণতি হতো না। এখনও সময় আছে, ভেবে দেখ।’

এ সময় ইয়াকুব আলীর ছোট ভাই রাজু এসআই দোলনকে অনুরোধ করেন, তার ভাইকে যেন মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো না হয়। সে জন্য তিনি পরবর্তীতে এসআই দোলনকে নগদ ২ লাখ টাকা দেন। রায়সাহেব বাজারে বসেই দোলনকে টাকা দেন রাজু।

ইয়াকুব আলী বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আমি নাকি নাদিমকে কেরোসিন এনে দিয়েছি, যা দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছে খায়রুল ইসলামকে। সব মিথ্যা কথা। কোনো প্রমাণ ছাড়া আমার কাছ থেকে টাকা নেয়ার জন্য এই মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। আমার সঙ্গে এই এলাকায় সবার ভালো সম্পর্ক। নাদিমকে আমি চিনতাম। কিন্তু তার সঙ্গে এ ঘটনার পর কোনো কথা হয়নি বা সে আমাকে কেরোসিন আনতেও বলেনি। এগুলো সব বানানো কথা।’

তবে টাকা নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এসআই দোলন মজুমদার। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আসামিরা অনেক কিছুই বলে। মামলার তদন্ত এখন আমার কাছে নেই। তদন্তাধীন বিষয়ে আমি কথা বলতে চাই না। সকল বিষয়ে ঊর্ধ্বতন স্যাররা জানেন।’

ঢাকা মেট্রো উত্তরের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. খালিদুল হক হাওলাদার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নাদিম শুরু থেকেই পলাতক। নাদিমের স্ত্রীর জবানবন্দিতে আরেকজনের নাম এসেছে। যাকে দিয়ে কেরোসিন কিনিয়ে এনেছিলেন নাদিম। তার নাম ইয়াকুব। তাকে আমরা গ্রেপ্তার করি। একদিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদও করেছি। জামিনে ছাড়া পেয়ে এখন তারা নানা কিছু বলছে। তদন্তাধীন বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না। তাদের সঙ্গে অন্যায় হয়ে থাকলে তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।’

মামলাটি হঠাৎ ঢাকা মেট্রো উত্তর থেকে সিরিয়াস ক্রাইম বিভাগে স্থানান্তরের বিষয়ে সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘মামলাটি থানা থেকে যে প্রক্রিয়ায় সিআইডিতে এসেছে, সেভাবেই আমাদের কাছ থেকে সিরিয়াস ক্রাইমে গেছে।’

খায়রুলের ময়নাতদন্ত রিপোর্টে নেই কেরোসিনের অস্তিত্ব

খায়রুলের মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত করেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ময়নাতদন্তের রিপোর্ট দেয়া হয়। এতে মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ‘বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু’। মৃত্যুর আগে তাকে মারধর বা শরীরে কেরোসিনের কোনো অস্তিত্ব পায়নি ফরেনসিক বিভাগ।

আরও পড়ুন:
ই-অরেঞ্জ গ্রাহকদের ৪৫০ কোটি টাকার হদিস নেই
ই-অরেঞ্জের মালিকসহ তিনজন রিমান্ডে
ই-অরেঞ্জের সিওও আমান কারাগারে
এবার ই-অরেঞ্জের সিওও গ্রেপ্তার
গ্রাহকের মামলায় ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া কারাগারে

শেয়ার করুন