ভালো হয়ে যান মাসুদ: হাইকোর্ট

ভালো হয়ে যান মাসুদ: হাইকোর্ট

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মাসুদ রানা। প্রায় এক দশক ধরে প্র্যাকটিস করছেন তিনি। সম্প্রতি বাইকে যাত্রী টানার কথা জানিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। তবে এটি মহামারিতে আদালতে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকার প্রতিবাদ বলে জানিয়েছেন।

মাসুদ রানা দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ আদালতে প্র্যাকটিস করেন। তিনি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের জুনিয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সম্প্রতি বাইকে যাত্রী টানছেন বলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। কিন্তু তিনি অভাবী নন বলে জানাচ্ছেন আইনজীবীরা। তার দুটি মামলার শুনানিতে সেই প্রসঙ্গটি উঠে আসলে বিচারপতি তাকে সাবধান করেন।

ঢাকায় ভাড়ার বাইক চালক হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ হয়ে আলোচনায় আসা সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মাসুদ রানাকে ‘ভালো হয়ে যেতে’ পরামর্শ দিয়ে সতর্ক করেছে উচ্চ আদালত।

একজন বিচারপতি তার উদ্দেশে বলেছেন, ‘ভালো হয়ে যান মিস্টার মাসুদ রানা।’

সোমবার বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার কাজলের হাইকোর্ট বেঞ্চে মাসুদের বাইকে যাত্রী টানার বিষয়টি উঠে আসে অন্য একটি মামলার শুনানিতে।

আইনজীবী মাসুদ রানার দুটি মামলায় দুই আসামির জামিনের আবেদন ছিল এই বেঞ্চে। আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারক তাকে দেখে বলেন, ‘মিস্টার মাসুদ আপনি বিখ্যাত হয়ে গেছেন উবার চালাইয়া। এগুলো করবেন না। আপনি ভালো হয়ে যান।’

আইজীবী মাসুদ রানা সম্প্রতি বাইকে ভাড়ায় যাত্রী বহন করার কথা জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন। দাবি করেন, মহামারিতে আদালতের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ায় তার সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে।

মাসুদ রানা দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ আদালতে প্র্যাকটিস করেন। তিনি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের জুনিয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত। ছাত্র জীবনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-আইন বিষয়ক সম্পাদক, পরবর্তীকালে সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকও ছিলেন।

প্রায় এক দশক ধরে আদালতে প্র্যাকটিস করা তার মতো একজন আইনজীবীর লকডাউনের কয় দিনে এই পরিস্থিতিতে পড়াটা অস্বাভাবিক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এ নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। শেষ পর্যন্ত আদালতে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

ভালো হয়ে যান মাসুদ: হাইকোর্ট
বাইকে রাইড শেয়ারিংয়ের ছবির সঙ্গে এই লেখাও ফেসবুকে পোস্ট করেন আইনজীবী মাসুদ রানা

জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট আদালতের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মিজানুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আজকে আইনজীবী মাসুদ রানার দুটি মামলা আমাদের কোর্টের তালিকায় ছিল। শুনানির সময় আমি বলেছি, ওনার (মাসুদ রানা) আর ওকালতির দরকার নাই। উবার চালালেই আপনার সংসার চলবে। দেখেন এইগুলি করবেন না। এইগুলি ভালো না। এটা আমাদের ডিগনিটির (মর্যাদা) সঙ্গে যায় না।

‘আদালতও বলেছেন, এগুলো আর কখনই করবেন না। এটা ঠিক না।’

রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, ‘জুডিশিয়ারি, প্রধান বিচারপতিকে হিউমিলিয়েট (অপমান) করার জন্য তিনি এটা করেছেন। তিনি অভাবগ্রস্ত আইনজীবী না। তিনি সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের জুনিয়র। তার অনেক প্র্যাকটিস আছে কোর্টে। ভালো আয় আছে। এক বছরও যদি আয় না হয়, তাহলেও তার কিছু যাবে আসবে না। এটা তিনি সরকারকে হিউমিলিয়েট করার জন্য করেছেন। আমার সঙ্গে বিচারকও একমত পোষণ করেছেন।’

মিজানুর রহমান বলেন, ‘কোর্টের ড্রেস পরে তার বন্ধুকে হেলমেট দিয়ে উঠিয়ে কোর্টকে হিউমিলিয়েট করার জন্য প্রতীকী অর্থে তিনি (মাসুদ রানা) এটা করেছেন। বাস্তবেই তিনি যদি অভাবে পড়ে উবার চালাতেন তাহলে আমাদের কিছু বলার ছিল না। জুডিশিয়ারিকে ব্যঙ্গ করতে এমনটি করেছেন। এজন্য কোর্ট তাকে তিরস্কার করেছেন।’

জানতে চাইলে আইনজীবী মাসুদ রানা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হ্যাঁ আদালত বলেছেন, মিস্টার মাসুদ রানা আপনি তো ভাইরাল হয়ে গেছেন।’

আপনি কি সত্যিকার অর্থেই রাইড শেয়ারিং করেছেন নাকি প্রতীকী অর্থে করেছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রাইড শেয়ারিং আমি আগে করি নাই। কোর্ট খোলার জন্য প্রতীকী অর্থেই করেছি। কাজটাকে ভালোবেসে করেছি।’

এ পর্যন্ত সাত থেকে আটটি রাইড শেয়ার করেছেন বলেও জানান তিনি।

এটিকে প্রতিবাদ স্বরূপ করেছেন উল্লেখ করে মাসুদ রানা বলেন, ‘আমি কোট গায়ে দিয়ে করেছি। প্রফেশনালি করলে তো আর কোট গায়ে দিয়ে করতাম না। তাহলে তো এটা বলারও দরকার ছিল না। আমি যে স্ট্যাটাস দিয়েছি সেখানে দেখবেন সকল আইনজীবীদের কথা বলেছি। অনেকেই হয়ত লজ্জায় বলবে না বা প্রকাশ করতে পারবে না। আমি কোর্ট খোলার জন্য প্রতিনিয়ত আন্দোলন করে যাচ্ছি।’

গত বছরে ভারতে একজন আইনজীবী সবজি বিক্রি করে প্রতিবাদ করেছিলেন বলেও তিনি জানান।

ভালো হয়ে যান মাসুদ: হাইকোর্ট
মাসুদ রানা কাজ করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের সঙ্গে। তিনি আইনপেশায় বেশ ব্যস্ত থাকেন

গত ১৬ জুলাই বাইক নিয়ে রাইড শেয়ারিং করছেন বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি পোস্ট করেন মাসুদ রানা। সেখানে তিনি লেখেন- ‘মাননীয় প্রধান বিচারপতি: আপনার কোর্ট অফিসার এখন বাইক রাইডার। আইনপেশা লকডাউনে সম্পূর্ণ বন্ধ! লকডাউন ব্যতীত সময়ে সীমিত পরিসরে ভার্চুয়াল কোর্ট ছিল। কিন্তু এখন লকডাউন স্থগিত হলেও কোর্ট বন্ধ! সকল পেশার মানুষ কাজ করতে পারছে শুধু আইনজীবীরাই কর্মহীন।

‘দীর্ঘ এক বছর চারমাস উপার্জনহীন থাকলেও বাড়ি ভাড়া, চেম্বার ভাড়া, বার কাউন্সিল, বার অ্যাসোসিয়েশনসহ জীবনযাপন ব্যয় থেমে নেই। কোর্ট অফিসারদের চরম দুর্দিন চলছে।

‘আইনজীবীদের চিফ অথরিটি মাননীয় প্রধান বিচারপতি। কিন্তু তাকে কিছু বলা যাবে না পাছে আদালত অবমাননায় সনদ চলে যায়। অনেকেই আপদকালীন ভিন্ন পেশা গ্রহণ করলেও সংখ্যাগরিষ্ঠরা কোর্ট খোলার আশায় আছেন।

‘কিন্তু আমি অতি সাধারণ। তাই এত কিছু না ভেবে কর্ম এবং উপার্জনের লক্ষ্যে আপদকালীন এই বাইক রাইডিং পেশা শুরু করলাম। সকলের নিকট দোয়া চাই। সবাই ভালো থাকবেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন।’

মাসুদ রানার এই স্ট্যাটাসের পর সেটি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। তারপরই বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।

তিনি ২০১০ সালে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। এরপর ২০১২ সালে তিনি হাইকোর্টে তালিকাভুক্ত হন। তার স্ত্রীও ঢাকা জজ কোর্টের একজন আইনজীবী।

আরও পড়ুন:
ছাত্রলীগ নেতা রাসেল হত্যায় এক আসামির জামিন
শিশু ধর্ষণ-হত্যা: দুই আসামির খালাস চেম্বারে স্থগিত
জলাভূমি রক্ষায় ‘জলাভূমি মন্ত্রণালয়’ গঠনের নির্দেশ
স্ত্রী হত্যায় ফাঁসির দণ্ড থেকে আপিলে খালাস
বাঁচার আকুতি নিয়ে কারাগার থেকে চিঠি, ফাঁসি থেকে রক্ষা

শেয়ার করুন

মন্তব্য