তরুণদের জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছিলেন গুনবী: র‌্যাব

তরুণদের জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছিলেন গুনবী: র‌্যাব

কওমিপন্থি ধর্মীয় নেতা মাহমুদ হাসান গুনবী। ফাইল ছবি।

‘দাওয়াতে ইসলামসহ বেশ কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এসব সংগঠনের আড়ালে তরুণদের টার্গেট করতেন তিনি (গুনবী)। এরপর তাদের পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে পরিবার, স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হতো। এবং এই সময়ে ধর্মীয় অপব্যাখ্যা, স্বাভাবিক জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করে এসব তরুণদের জঙ্গিতে পরিণত করতেন।’

সশস্ত্র জিহাদ, ইসলামি শাসনকে অপছন্দকারীদের জবাই করার আহ্বান আর তালেবানের শাসনের পক্ষে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখা ধর্মীয় বক্তা মাহমুদ হাসান গুনবী তরুণদেরকে জঙ্গি তৎপরতায় জড়াতেন বলে দাবি করেছে র‌্যাব।

১০ দিন আগে নোয়াখালী থেকে তুলে আনার অভিযোগ থাকা এই ধর্মীয় বক্তাকে শুক্রবার গ্রেপ্তার দেখায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীটি। তারা জানায়, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১ টার দিকে রাজধানীর মিরপুরের বেড়িবাঁধ থেকে সদরদপ্তর ও র‌্যাব-৪ এর একটি দলের হাতে আটক হন তিনি।

বিকালে সংবাদ সম্মেলনে আসেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, ‘দাওয়াতে ইসলামসহ বেশ কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এসব সংগঠনের আড়ালে তরুণদের টার্গেট করতেন তিনি (গুনবী)। এরপর তাদের পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে পরিবার, স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হতো। এবং এই সময়ে ধর্মীয় অপব্যাখ্যা, স্বাভাবিক জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করে এসব তরুণদের জঙ্গিতে পরিণত করতেন।’

বিভিন্ন ওয়াজে বক্তব্যের মাধ্যমে গুনবী তরুণদের উগ্রবাদে আকৃষ্ট করতেন বলেও জানান র‌্যাব কর্মকর্তা। বলেন, তার মতো যারা মানুষকে আকৃষ্ট করে আসছিল তারা নিজেদের ‘মানহাজী’ বলে পরিচয় দিত।

গুনবীকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানতে পারার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তরুণদের জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছিলেন গুনবী: র‌্যাব
গুনবীকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানাতে ও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরছেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক

র‌্যাব জানিয়েছে, গুনবী পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে পড়াশোনার পর মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ২০০৮ সালে মোহাম্মদপুরের জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া থেকে তাইসির দাওরায়ে হাদিস শেষ করেন। এরপর ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সজারের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। পাশাপাশি ধর্মীয় মতাদর্শের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হন।

২০১০ সাল থেকে তিনি ওয়াজ মাহফিল শুরু করেন। ২০১৪ সাল থেকে ধর্মীয় বক্তব্যে উগ্রবাদ প্রচার শুরু করেন। তিনি ধর্মীয় পুস্তকের ব্যবসাতেও জড়িত ছিলেন।

জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদে যোগ

র‌্যাব জানায়, গুনবী প্রথমে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশে যুক্ত ছিলেন। পরে আধ্যাত্মিক জঙ্গি নেতা জসিম উদ্দিন রহমানীর সঙ্গে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। এরপর আনসার আল বাংলা টিম বা আনসার আল ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তিনি।

রাহমানী গ্রেপ্তারের পর উগ্রবাদের প্রচার শুরু করেন গুনবী। তিনি আনসার আল ইসলামের দাওয়াত ও প্রশিক্ষণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কয়েকটি মাদ্রাসায় খণ্ডকালীন বা অতিথি বক্তা হিসেবে দীর্ঘ মেয়াদী শিক্ষকতা ও মাদ্রাসা পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। এসব মাদ্রাসায় সম্পৃক্ত হয়ে তিনি জঙ্গিবাদের বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন।

তরুণদের জঙ্গিদে জড়াতেন যেভাবে

র‌্যাব বলছে, সাধারণ জঙ্গিদের তিনি আত্মঘাতী হতে উদ্বুদ্ধ করতে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনে ভূমিকা পালন রাখতেন। আনসার আল ইসলামের (এবিটি) অন্যতম একজন দর্শন পরিবর্তনকারীও তিনি।

দর্শন পরিবর্তনের কৌশল সম্পর্কে গুনবী র‌্যাবকে জানিয়েছেন, গোপন আস্থানায় বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মঘাতী হিসেবে তিনি এই কৌশল কাজে লাগাতেন। যেখানে প্রশিক্ষণার্থীদের আত্মীয়-স্বজন, পরিবার বন্ধু-বান্ধব থেকে বিচ্ছিন্নের পাশাপাশি বাইরের জীবন, সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান থেকে দূরে রাখতেন।

এরপরই প্রশিক্ষণার্থীদের মস্তিস্কে ধর্মীয় অপব্যাখ্যার মাধ্যমে ভয়ভীতি তৈরি ও স্বাভাবিক জীবন সম্পর্কে বিতৃষ্ণা জাগ্রত করা হতো। এভাবে তাদের নৃশংস জঙ্গি হিসেবে গড়ে তুলতেন।

‘গুনবীর কথা শুনে আত্মঘাতী’

গত ৫ মে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসা সন্দেহভাজন জঙ্গি আল সাকিব গ্রেপ্তার হন। তিনি সংসদ ভবনে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সাকিব গুনবীর মাধ্যমে আত্মঘাতী হয়েছিলেন বলে দাবি করেছে র‌্যাব।

মানহাজীরা যা করছিল

র‌্যাব জানায়, সংগঠনের অভ্যন্তরে উগ্রবাদী মতাদর্শদের প্রচারে তিনি ‘ছায়া সংগঠন’ পরিচালনা করতেন। যাদেরকে ‘মানহাজী’ সদস্য বলা হয়।

তরুণদের জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছিলেন গুনবী: র‌্যাব
র‌্যাবের ব্রিফিংয়ের সময় হাজির করা হয় গুনবীকেও, যাকে ১০ দিনে আগে তুলে নেয়ার অভিযোগ করেছেন স্বজনরা

এসব সদস্যরা সংগঠনের ভেতরে জঙ্গি সদস্য তৈরি করতেন। এছাড়া বিভিন্ন ইস্যুতে উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসবাদকে উসকে দিতেন।

গুনবী ‘দাওয়াতে ইসলাম’-এর ব্যানারে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করে জঙ্গিবাদে অন্তর্ভুক্তির বিশেষ উদ্যেগ গ্রহণ করেন বলেও জানিয়েছে র‌্যাব।

গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপন, দেশ ত্যাগের পরিকল্পনা

মে মাসের প্রথম দিকে গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে চলে গিয়েছিল গুনবী। কুমিল্লা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়িতে গিয়ে দুগর্ম এলাকায় আত্মগোপন করেন। জুনের শেষের দিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর তিনি বান্দরবান চলে যান। সেখানে দুই-তিনদিন অবস্থান করেন।

পরে লক্ষ্মীপুরের চর গজারিয়া ও চর রমিজে যান। সেখানেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা টের পেয়ে তিনি স্থান ত্যাগ করেন। এরপর উত্তরবঙ্গে আত্মগোপন এবং দেশ ত্যাগের পরিকল্পনা করেন বলে ব্রিফিংয়ে জানায় র‌্যাব।

আরও পড়ুন:
তালেবানি শাসন চাওয়া গুনবীকে গ্রেপ্তার র‌্যাবের

শেয়ার করুন

মন্তব্য