‘আমি এতিম হয়ে গেলাম’

‘আমি এতিম হয়ে গেলাম’

মগবাজার বিস্ফোরণে প্রাণ হারানো স্বপন মিয়ার বড় ছেলে বিশাল কান্নায় ভেঙে পড়েন। ছবি: নিউজবাংলা

‘কয়েকদিন আগে কত বড় রোগ থেকে আমার বাপ সেরে উঠল, কত কষ্ট করে সারাইয়া তুললাম বাপরে!  আমাকে কেউ কইব না, বাবা, আয় তুই বাসায় আয়।’

‘এটি কীভাবে হয়ে গেলো? কীভাবে হয়ে গেলো এটা!! আমাকে তো এখন আর কেউ ডাক দিয়ে বলবে না, আয়, তুই বাসায় আয়। কয়েকদিন আগে আমার দাদি গেল। আজ আমার বাপও গেল। আমার কেউ আর নেই, কেউ নেই। আমি এতিম হয়ে গেলাম।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটের ফ্লোরে চিৎকার করে কান্না করতে করতে কথাগুলো বলছেন মগবাজার বিস্ফোরণে প্রাণ হারানো স্বপন মিয়ার বড় ছেলে বিশাল।

স্বপন মিয়া কিছুদিন আগে অসুস্থতা থেকে সেরেছেন। সেই স্মৃতিও বারবার বলছিলেন তার ছেলে।

বলেন, ‘কয়েকদিন আগে কত বড় রোগ থেকে আমার বাপ সেরে উঠল, কত কষ্ট করে সারাইয়া তুললাম বাপরে! আমাকে কেউ কইব না, বাবা, আয় তুই বাসায় আয়।’

স্বপন মিয়া পেশায় গাড়ি চালক। মগবাজারের বিষ্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ অবস্থায় বার্ন ইউনিটে আনা হয় তাকে।

রাত সাড়ে দশটার সময় বার্ন ইউনিটের কর্মচারীরা হাঁক দিচ্ছিলেন ‘স্বপনের আত্মীয় কে? আছেন কেউ?’

তখন হাসপাতালের ভেতরে ছুটে যান বিশাল। চোখে মুখে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। মিনিট কয়েক পরে ভেতর থেকে বারান্দায় বের হতে হতে কান্নায় ভেঙে পড়েন বিশাল।

বার্ন ইউনিটে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়াদের মধ্যে স্বপনই সর্বশেষ। তাকে নিয়ে মগবাজারে ভয়াবহ বিস্ফোরণে মৃতের সংখ্যা বেড়ে সাতজনে দাঁড়ায়।

বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে আরও ৫০ জনেরও বেশি মানুষের।

একই ঘটনার শিকার বেঙ্গল মিটের বিক্রয়কর্মী ইমরান হোসেন। দুই বছর আগে বিয়ে করেন তামান্না নামে একজনকে।

ইমরানের দগ্ধ হওয়ার খবর তামান্না শুনেছেন আরেকজনের কাছে। শুনেই বার্ন ইউনিটে ছুটে আসেন তামান্না। সঙ্গে ইমরানের বোন আইরিন এবং মা লিজা বেগম।

অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে আইরিন বলেন, ‘আমরা কিছুই জানতাম না। এক লোক এসে বলে ইমরান তোমাদের পরিচিত? আমি তাকে বলি সে আমার ভাই। এরপর আমরা এখানে এসে ভাইকে শনাক্ত করি। ভাইয়ের পুরো শরীর রক্তাক্ত ও পোড়া। আমার ভাইকে একদমই চেনা যাচ্ছে না’- বলতে বলতে কেঁদে দেন আইরিন।

‘আমি এতিম হয়ে গেলাম’

দগ্ধ বিক্রয়কর্মী ইমরান হোসেনের স্ত্রী তামান্না, বোন আইরিন এবং মা লিজা বেগম ছুটে আসেন বার্ন ইউনিটে। ছবি: নিউজবাংলা

ইমরানের মা লিজা বেগম আধা ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে মোনাজাত ধরে বসেছিলেন বার্ন ইউনিটের বারান্দায়।

কান্না করতে করতে বলেন, ‘আপনারা সবাই দেশবাসীকে বলেন আমার ছেলের জন্য দোয়া করতে। আমার ছেলের কিচ্ছু হবে না।’

পাশেই স্ত্রী তামান্না বার বার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন । তিনি শুধু বলছেন, ‘আমার সুস্থ সবল স্বামীকে তোমরা ফিরাইয়া দাও।’

রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মগবাজার ওয়্যারলেস এলাকার আড়ংয়ের শোরুমের বিপরীতে তিনতলা একটি ভবনে বিস্ফোরণ ঘটে। এর ফলে আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে।

ঘটনাস্থলে থাকা তিনটি বাসের যাত্রীরাও আহত হন। আর স্থানীয়দের পর ঘটনাস্থলে উদ্ধার তৎপরতা চালান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তিনতলা একটি ভবনের নিচতলার শর্মা হাউস নামের রেস্টুরেন্টে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়। এর ফলে ভবনের বিদ্যুতের জেনারেটরেও বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় রাস্তায় যানজটে আটকে থাকা তিনটি বাসসহ কয়েকটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দগ্ধ হয়ে যাওয়া রোগীদের দেখে শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের এখানে ১৭ জন রোগী এসেছে। এদের মধ্যে দুই জনকে মৃত অবস্থাতেই আনা হয়েছে। বাকিদের মধ্যে তিন জন দগ্ধ রোগী। এদের দুই জনকে আইসিইউতে ও একজনকে এইচডিইউতে রাখা হয়েছে। এদের ৩ জনেরই ৯০ শতাংশ বার্ন। তাদের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক।

‘এই তিনজনের মধ্যে স্বপন মারা গেছেন। বাকিরা সবাই আহত। তাদের শরীরে ভাঙা ও কাটা ছেড়া যখম রয়েছে। তাদেরকে অবজারভেশনে রাখা হয়েছে। অবস্থা বুঝে পরে তাদেরকে ঢাকা মেডিক্যালে পাঠিয়ে দেয়া হবে।’

আরও পড়ুন:
‘যা আছিল, সব কাইপ্যা গেছে’
‘আগুনের একটা গোলা দেখছি, এরপর কিছু মনে নাই’
বিস্ফোরণ জমে থাকা গ্যাস থেকে: পুলিশ
মগবাজার বিস্ফোরণে মৃত্যু বেড়ে ৭

শেয়ার করুন

মন্তব্য