বাছাইয়ের তালিকায় আরও ৩৪ সামরিক অধ্যাদেশ

বাছাইয়ের তালিকায় আরও ৩৪ সামরিক অধ্যাদেশ

বিএনপির জিয়াউর রহমান ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। দুজনই সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় হন রাষ্ট্রপতি।

‘দ্য ডিলিমিটেশন অব কনস্টিটিউয়েন্সিজ অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬’ রূপান্তর করে ‘জাতীয় সংসদের নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইন, ২০২১’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সীমানা নির্ধারণে ১৯৭৬ সালের জারি করা আরও একটি সামরিক শাসনামলের অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে যাচ্ছে সরকার।

আরও ৩৪টি সামরিক অধ্যাদেশ এখনও যাচাই-বাছাইয়ের তালিকায় রয়েছে।

আর তাই ‘দ্য ডিলিমিটেশন অব কনস্টিটিউয়েন্সিজ অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬’ রূপান্তর করে ‘জাতীয় সংসদের নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইন, ২০২১’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

সোমবার সকালে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হয় মন্ত্রিসভা বৈঠকে। বৈঠকে সভাপতিতত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ দিন দুপুরে সচিবালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম এ কথা জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘এটা ১৯৭৬ সালের অধ্যাদেশ। সুতরাং এটাকে আইনে রূপান্তরের প্রয়োজন ছিল।’

বাছাইয়ের তালিকায় আরও ৩৪ সামরিক অধ্যাদেশ
সোমবার সকালে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সভাপতিতত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত

আইনে আগের বিধান আছে জানিয়ে সচিব বলেন, ‘এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণে নির্বাচন কমিশন সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদে উল্লেখিত সংখ্যক সংসদ সদস্য প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত করার লক্ষ্যে সমগ্র দেশকে সংখ্যক একক, আঞ্চলিক নির্বাচনি এলাকায় বিভক্ত করবে।’

সীমানা নির্ধারণ নিয়ে প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন করে আঞ্চলিক নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ করতে হলে, সেক্ষেত্রে তারা (নির্বাচন কমিশন) প্রত্যেকটা আদমশুমারির পরে করতে পারবেন। আর যদি কোনো আদশশুমারি ছাড়া বা অন্য কোনো কারণে কেউ অভিযোগ করেন, সেক্ষেত্রে পাবলিক হিয়ারিং নিয়ে বাস্তবে দেখে, সার্ভে করে, তারপর করতে পারবেন।’

দৈব, দূর্বিপাক বা অন্য কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণে কোনো নির্বাচনে আঞ্চলিক নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ করা না গেলে ওই আঞ্চলিক নির্বাচনি এলাকার সর্বশেষ যে নির্ধারিত সীমানা আছে, সেই অনুযায়ী নির্বাচন করতে হবে বলেও জানান সচিব।

তবে ১৯৭৬ সালে যে অধ্যাদেশ ছিল, তার সঙ্গে এর তেমন কোনো অমিল নেই বলে জানিয়েছেন সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম।

২০১৩ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনা বলা হয়, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট থেকে আটাত্তর পর্যন্ত এবং বিরাশি থেকে ছিয়াশির সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যে অর্ডিন্যান্সগুলো (অধ্যাদেশ) করা হয়েছিল সেগুলো বাছাই করে প্রয়োজনীয় আইন করতে হবে। আর যেগুলোর প্রয়োজন নেই সেগুলো বাদ দিতে হবে।

মুন সিনেমা হলের মালিকানা নিয়ে করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৫ সালের আগস্টে জিয়ার শাসনামলে করা পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে বলা হয়, জিয়াউর রহমানের শাসনও বৈধ নয়।

এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে খারিজ করে দেয় আপিল বিভাগ। ফলে রায় বহাল থাকে।

২০১০ সালে সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী ও সেনাশাসক এরশারদের শাসনও অবৈধ ঘোষণা করা হয়।

তবে দুটি রায়েই সামরিক সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশ বিবেচনা করে, প্রয়োজনীয়গুলো রেখে অপ্রয়োজনীয়গুলো বাদ দেয়ার কথা বলা হয়।

তারই ধারাবাহিকতায় অধ্যাদেশগুলো নিয়ে কাজ করছে সরকার। মোট ১৬৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে কাজ করছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

এগুলোর যাচাই বাছাইয়ের অগ্রগতি নিয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘গত মে মাসে বসে আমরা প্রায় ২৫টি মতো সলভড করে ফেলেছি। এখনও ৩৪টার মতো আছে।’

সামরিক শাসনামলে জারি করা অধ্যাদেশগুলো এই জুনের মধ্যে আইনে পরিণত করার নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গত ৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম নিজেই।

বিষয়টি সচিবের নজরে আনা হলে তিনি বলেন, ‘চেষ্টা করব। দেখা যাক। এগুলো অনেক কমপ্লেক্স প্রসিডিওর তো। অনেকটা আমরা কভার করে আসছি।’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর নানা ঘটনার প্রবাহে রাষ্ট্র ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে চলে আসেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। ওই বছরের ৭ নভেম্বর নানা ঘটনাপ্রবাহের পর সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্র ক্ষমতায় তার নিয়ন্ত্রণ আরও পোক্ত হয়।

এক পর্যায়ে ১৯৭৬ সালের ১৯ নভেম্বর সামরিক আইন জারি করে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন জিয়াউর রহমান।

১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল সেনাপ্রধান থাকা অবস্থাতেই জিয়া হয়ে যান রাষ্ট্রপতি। উর্দি পরা অবস্থাতেই ওই বছরের ৩০ মে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট দেন তিনি। বিস্ময়করভাবে ৯৮ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পড়ে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে।

সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ১৯৭৮ সালের ৩ জুনের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও জেতেন জিয়াউর রহমান। ওই বছরের ডিসেম্বরে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন।

এই সময়ে জিয়াউর রহমান বেশ কিছু আদেশ ও অডিন্যান্স জারি করেন।

রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন জিয়াউর রহমান।

জিয়াউর রহমানের দেখানো পথে সেনাপ্রধান থাকাকালেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াকে হত্যা করা হয়। পরে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ আবদুস সাত্তারকে পদত্যাগে বাধ্য করে রাষ্ট্রপতি হন এরশাদ। জারি করেন সামরিক আইন।

১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত দেশ চলেছে সেনা শাসকের জারি করা অর্ডিন্যান্সে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য