বাসে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই, গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া

বাসে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই, গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া

আলিফ বা বৈশাখীর মতো বাসগুলোতে এমন ভিড় রোজকার চিত্র। ছবি: নিউজবাংলা

‘যা পারেন করেন গা। যারে পারেন কল দেন। আমগো কাছে কয় টাকা থাহে? সব মালিক নিয়া যায়।’ ঢাকার বাস কেমনে চলে সবাই জানে, কারও কাছে বইলা কোনো কাম হইব না।’

সোমবার দুপুর আড়াইটা। রাজধানীর আগারগাঁও থেকে ২৬ জন যাত্রী নিয়ে বাড্ডার উদ্দেশে ছেড়ে যায় বৈশাখী পরিবহনের একাটি বাস। মহাখালী পর্যন্ত মাত্র ৫ কিলোমিটারের যাত্রী প্রতি ভাড়া রাখা হয় ৩০ টাকা করে। কিলোমিটার ৬ টাকা। যদিও সরকার নির্ধারিত বাড়তি ভাড়াসহ সর্বোচ্চ ভাড়া হওয়ার কথা ছিল ১৩ টাকা ৬০ পয়সা।

করোনার কারণে গত ৩০ মার্চ বিআরটিএর যে বাসভাড়া নির্ধারণ করেছে, তাতে প্রতি দুই আসনে একজন যাত্রী বসলে মিনিবাসে ঢাকায় ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৭২ পয়সা করা হয়। আগে যা ছিল, তাতে নগর পরিবহনে ঢাকায় প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ৭০ পয়সা।

সাধারণ সময়েও আগারগাঁও থেকে মহাখালী পর্যন্ত দূরত্বের ভাড়া ছিল ২০ টাকা, প্রতি কিলোমিটার ৪ টাকা করে। যদিও ভাড়া হওয়ার কথা ৮ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু করোনার কারণে বৈশাখী, আলিফ, ভুঁইয়া, রইছসহ সব পরিবহনই ভাড়া বাড়িয়েছে। তবে ভাড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে আগের ভাড়ার চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি ধরে হিসাব করে সবাই। কিন্তু কিলোমিটারে নির্ধারিত ২.৭২ টাকার হিসাব করা হয় না।

আবারও শুরুর সেই বৈশাখীর বাসের প্রসঙ্গ, ২৬ জন যাত্রাীর মধ্যে ৪ জন নামবে বিজয় সরণি। মাত্র দুই কিলোমিটারের জন্য তাদের পুরো ৩০ টাকাই ভাড়া দিতে হয়েছে। ৪১ আসনের বাসে অর্ধেক যাত্রী হিসাবে আসন ফাঁকা নেই।

কিন্তু যাত্রীদের চেঁচামেচি উপেক্ষা করেই বিজয়সরণির পৌঁছার পর আর আরও ৯ জন যাত্রী তোলেন চালক ও তার সহকারী। যাত্রী সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১ জনে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে চালক বাস একটু ধীরে চালান, ওঠেন আরও তিনজন যাত্রী। এরা বসেন বাসের পাশে ইঞ্জিন কাভারের ওপর, যেখানে আগে থেকেই একজন ছিলেন। এ পর্যন্ত বাসের দরজা বন্ধ না হলেও জাহাঙ্গীর গেটের আগে বন্ধ হয়ে যায় দরজা। তবে জাহাঙ্গীর গেটে একজন যাত্রী নামেন, কিন্তু ওঠেন আরও পাঁচজন। এর মধ্যে দুই পুলিশ সদস্যও চড়েন বাসে। যাত্রী হয় ৩৯ জন।

এর মধ্যে মহাখালী-আমতলিতে নামে সাত থেকে আটজন। মহাখালী থেকে বাসে ওঠেন তিনজন। এ ক্ষেত্রে বিজয় সরণি থেকে মহাখালী পর্যন্ত তিন কিলোমিটারের জন্যও দাঁড়ানো বা বসা প্রত্যেক যাত্রীকে দিতে হয়েছে ১৫ টাকা করে।

তবে আসল খেলা শুরু আমতলি থেকে। অবাধে যাত্রী উঠাতে থাকেন হেলপার ও ড্রাইভার।

আমতলি থেকে শুরু করে ওয়্যারলেস, টিভি গেট, গুলশান পর্যন্ত তখন কোনো সিট তো খালি নেই-ই। দাঁড়ানো যাত্রী ছিলেন আরও ৯ জন। এমনকি ইঞ্জিন কাভারের ওপরও পাঁচজন বসা। বেশি যাত্রী কারণে গুলশানে আর ওয়েবিলও সাইন করা হয়নি। গুলশান পার হয়ে যখন সোয়া তিনটার দিকে গুদারাঘাট অতিক্রম করে বাসে তখন কমপক্ষে ৪৮ জন যাত্রী। একজনের গায়ের ওপর আরেকজন দাঁড়ানো।

কয়েকবারের জিজ্ঞাসায় নাম না বললেও এবার চালকের সহকারী উল্টো রাগতস্বরে বলে ওঠেন, ‘লেখেন লেখেন নাম আসলাম, যা পারেন করেন গা। যারে পারেন কল দেন। আমগো কাছে কয় টাকা থাহে? সব মালিক নিয়া যায়।’ ঢাকার বাস কেমনে চলে সবাই জানে, কারো কাছে বইলা কোনো কাম হইব না।’

শুধু এই রুটেই নয় ঢাকার প্রতিটি রুটের এখন বাস ভর্তি যাত্রী চলাচল করলেও ভাড়া দিতে হচ্ছে, কোম্পানিগুলোর নির্ধারিত বাড়তি টাকায়।

সময় বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট। গন্তব্য রাজধানীর হাতিরঝিলের মগবাজার অংশ থেকে মেরুল বাড্ডা। এই রুটের জন্য নির্ধারিত হাতিরঝিল চক্রাকার বাস সার্ভিস। বাসে উঠেই যাত্রীদের প্রচণ্ড ভিড় দেখা যায়। আগের চেয়ে টিকিট প্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা ভাড়া বাড়ানো হলেও যাত্রী ওঠানোর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না।

বাসচালক জব্বার বলেন, ‘আসলে যাত্রীরা স্বাস্থ্যবিধি মানতে চায় না। যাত্রী-গো না করলেও তারা ধাক্কা দিয়ে উঠতে চায়। আমি যদি যাত্রী থাকি আমিও ধাক্কাইয়া উঠি। ওই যে দেখেন একটা লোক দৌড়াইয়া আসতাছে। গাড়ির মধ্যে জায়গা আছে কি না নাই সে কিন্তু এটা বুঝে না।

তিনি আরও বলেন, গাড়ির সিট হইলো ৪৫টা। কিন্তু অফিস টাইমেই বেশি ঝামেলা হয়। তখন যাত্রীর বেশি থাকে, আর গাড়িও কম।’

একই দিন সকাল ১১ টায় শেওড়াপাড়া থেকে কমলাপুর রুটের আয়াত পরিবহনে দেখা গেছে প্রায় প্রতিটি আসনেই যাত্রী বসানো হয়েছে। এর পাশাপাশি দাঁড়িয়েও লোক নেয়া হচ্ছে। যাত্রীদের সঙ্গে এ বিষয়ে বাসের কন্ট্রাকটারের বাকবিতণ্ডাও হয়েছে। তারা বলছে, সবারই তো যাওয়া লাগে। তারা কী করবো? স্টপেজে থামার সঙ্গে সঙ্গে সবাই ধাক্কাধাক্কি করে উঠছে।

মিরপুর থেকে কমলাপুর ভাড়া নেয়া হয়েছে ৪০ টাকা। আগে যেটা ছিল ২৫ টাকা। যাত্রীদের কথা, ‘তাহলে ভাড়া আগেরটা নিতে হবে। টাকা তো আমাদের পকেট থেকে যায়, তাদের তো দিতে হয় না’। এমন কথা শুনে বাসের হেলপার বলেন, ‘তাহলে টাকা তো তাদের পকেট থেকে দিতে হবে। কারণ, ওয়েবিলে কতজন সেটা লিখে দিয়েছে’। শুধু আয়াত নয়, মিরপুর থেকে মতিঝিল, গুলিস্থান যাওয়া শেকড়, বিকল্প অটো, বিহঙ্গ সব গাড়ির চিত্র একই।

কী বলছে মালিক পক্ষ

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ নিউজবাংলাকে বলেন, মালিক সমিতির পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন টিমকে সহায়তা করা হচ্ছে। গতকালও টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও আরিচাসহ কিছু রুটে মোবইল কোর্ট চালানো হয়েছে। এতে বাস ছাড়াও মাইক্রোবাস এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে অনিয়মের জন্য দায়ীদের জরিমানা ও শাস্তি দেয়া হয়েছে।

‘তবে ঢাকা শহরে সকাল-বিকাল অফিসের দুই সময় একটু সমস্যা হয়ে যায়। যাত্রাদের কন্ট্রোল করা যায় না, তারা মানতে চায় না। জোর করে উঠে যায়। তবে এসব ঘটনা দেখার জন্য বিআরটিএর-র আটজন ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করছে। আমরা চাই বিআরটিএ ও ডিএমপির ম্যাজিস্ট্রেটরা যেন ভ্রাম্যমাণ আদালাত পরিচালনা করে, দোষীদের আইনের আওতায় আনা হয়। আমরা মালিকদের চিঠি দিয়ে সচেতন করছি। তাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। তবে অনেক সময় স্টাফরা মালিকদের কথা না শুনে নিজেদের বাড়তি আয়ের জন্য বেশি যাত্রী উঠিয়ে থাকে।’

ফাঁদ যখন ওয়েবিল

ঢাকার বাসে ওয়েবিলের নামে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া রাখা হচ্ছে। বেশিরভাগ সময় গুরুত্বপূর্ণ জায়গার আগেই থাকে এসব ওয়েবিলের জায়গা। এমন জায়গায় বসানো হয়েছে, যেখানে বেশিরভাগ মানুষ নামে না। যেমন বাংলামোটরের বদলে সোনারগাঁও হোটেল, মগবাজারের বদলে সাতরাস্তায়, আগারগাঁওয়ের আগে বিজয় সরণী। আর এক ওয়েবিল থেকে অপর ওয়েবিলে সই করার জায়গায় ভাড়ার পার্থক্য অনেক। ওয়েবিল সইয়ের দোহাই দিয়ে বাড়তি ভাড়া নেয়া হলেও এর আগে পরে যাত্রী উঠানামা চলে ইচ্ছা মতো। যেমন মিরপুর থেকে মহাখালির পথে ওয়েবিল সই করা হয় আগারগাঁওয়ে। তাই আগারগাঁওয়ের পর যাত্রীরা যেখানেই নামেন মহাখালির ভাড়াই দিতে হয়। কিন্তু মিরপুর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত কত যাত্রী উঠল তার হিসাব নেই।

আবার মহাখালি থেকে মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও গাবতলীর বাসগুলোর ওয়েবিল বিজয় সরণীর পশ্চিম মাথায়। এ পথে কোনো যাত্রী বিজয় সরণী থেকে আগারগাঁও এক কিরোমিটার যেতে চাইলে ৩০ টাকা গুণতে হবে। আবার ফার্মগেট থেকে মিরপুর যাওয়ার পথে ওয়েবিল সই হয় শেরে বাংলানগর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে। তা অতিক্রম করলেই মিরপুরের ভাড়া দিতে হবে। আগে ১৫ টাকা থালেও এখন তা ২৫ টাকা। মিরপুর থেকে মতিঝিলে পথে ওয়েবিল কারওয়ান বাজার ও বাংলামটরের মাঝ পথে। তাই কেউ শাহবাগ যেতে চাইলেও তাকে ভাড়া দিতে হবে মতিঝিলের। আগে ২৫ টাকা থাকলেও এখন ভাড়া ৪০ টাকা। কিন্তু ওয়েবিলের বাংলামটর থেকে গণহারে যাত্রী উঠানো হয়। তাদের কাছ থেকেও নেয়া হয় একই হারে ভাড়া। একই ভাবে নিউমার্কেট থেকে উত্তরার পথে প্রথম ওয়েবিল আসাদ গেটের আগে। আসাদ গেট অতিক্রম করলেই বনানী পর্যন্ত ৪০ টাকা গুণতে হবে।

‘যত সিট তত যাত্রী’ ও আগের ভাড়া চায় যাত্রী কল্যাণ সমিতি

৬০ শতাংশ বর্ধিত ভাড়া আদায়ের সিদ্ধান্ত বাতিল করে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে ‘যত সিট তত যাত্রী’ পদ্ধতি চায় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী নিউজ বাংলাকে বলেন, করোনা সংকটের সময়ও বাড়তি ভাড়াও নেয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধিও মানা হচ্ছে না আবার পুরনো কায়দায় গাদাগাদি করে যাত্রী বহন করা হচ্ছে। এতে শ্রমজীবি ও নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ সেবা না পেয়েও বেশি টাকা দিতে হচ্ছে। তাই ‘যত সিট তত যাত্রী’ করা উচিত।

শেয়ার করুন

মন্তব্য