ভোটার তালিকায় ৩৮৭৯ রোহিঙ্গা

ভোটার তালিকায় ৩৮৭৯ রোহিঙ্গা

ভোটার করার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়েছে জয়নাল সিন্ডিকেট। তবে ঠিক কী পরিমাণ অর্থ নিয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একটি সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি জয়নাল সিন্ডিকেটের আটজন সদস্যের ব্যাংক হিসাবে ৬৭ লাখ টাকার লেনদেনের তথ্য তারা পেয়েছেন।

জালিয়াতির মাধ্যমে ৩ হাজার ৮৭৯ জন রোহিঙ্গাকে চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিসের পিয়ন জয়নাল আবেদীনের সিন্ডিকেট বাংলাদেশি ভোটার করেছে বলে দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে।

নির্বাচন কমিশনের চুরি হওয়া ল্যাপটপ ব্যবহার করে কাজটি করেছে সিন্ডিকেট। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

দুদক জেলা কার্যালয়-২-এর উপসহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিন নিউজবাংলাকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি।

দুদকের এই তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ইসি নির্ধারিত দুটি আইডি ব্যবহার করে এই জালিয়াতি করেছে জয়নাল সিন্ডিকেট। এসব আইডি ব্যবহার করে মোট ৩ হাজার ৮৭৯ জন রোহিঙ্গা নাগরিককে অবৈধভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

দুদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা নির্বাচন অফিসে কর্মরত আইটি বিশেষজ্ঞ সত্য সুন্দরের কাছে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় সার্ভারের পাসওয়ার্ড ছিল। জয়নাল আবেদীন টাকার বিনিময়ে সত্য সুন্দর ও বিভিন্ন উপজেলার অপারেটরদের কাছ থেকে পাসওয়ার্ড সংগ্রহ করেন। সেই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ঘরে বসেই দেশের বিভিন্ন নির্বাচন কার্যালয়ের ঠিকানায় ভোটার অন্তর্ভুক্ত করা যায়। জয়নাল এভাবে রোহিঙ্গা নাগরিকদের ভোটার করেছেন।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জয়নাল আবেদীন নির্বাচন কমিশনের চুরি যাওয়া একটি ল্যাপটপ সংগ্রহ করেন; যে ল্যাপটপ শুধু নির্বাচন কমিশনের কাজে ব্যবহার করা হতো। এই ল্যাপটপের আইডি থেকে নির্বাচন কমিশনের যেকোনো কাজ করা যায়। একটি ল্যাপটপে দুটি আইডি ব্যবহার করত জয়নাল সিন্ডিকেট।

এর মধ্যে একটি আইডি থেকে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলার নির্বাচন কার্যালয়ের ঠিকানায় ১ হাজার ৯৩৭ জন রোহিঙ্গাকে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার নির্বাচন কার্যালয়ের ঠিকানায় ১ হাজার ১৮ জন রোহিঙ্গাকে, বান্দরবানের ঠিকানায় ২৬২ জনকে, নোয়াখালীর ঠিকানায় ৩৫ জনকে, কুমিল্লায় ২৫ জনকে, ফেনীতে ২৪ জনকে, রাঙ্গামাটি জেলায় ৮ জনকে, নারায়ণগঞ্জ জেলায় ৪ জনকে, খাগড়াছড়ি জেলায় ৩ জনকে এবং ঝিনাইদহ জেলায় ২ জন রোহিঙ্গাকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে জয়নাল সিন্ডিকেট। এ ছাড়া সিন্ডিকেট অন্য একটি আইডি ব্যবহার করে আরও ৫৬১ জন রোহিঙ্গাকে ভোটার করে।

দুদকের আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ভোটার করার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়েছে জয়নাল সিন্ডিকেট। তবে ঠিক কী পরিমাণ অর্থ নিয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সূত্রটি জানিয়েছে, সম্প্রতি জয়নাল সিন্ডিকেটের আটজন সদস্যের ব্যাংক হিসাবে ৬৭ লাখ টাকার লেনদেনের তথ্য তারা পেয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জয়নালের ঘরে থাকতেন ভোটার হালনাগাদের কাজ করা অপারেটর বয়ান উদ্দিন। তিনি নগরীর কাজীর দেউরি ভিআইপি টাওয়ারে অবস্থিত আল ওয়াফা নামক ট্রাভেল এজেন্সিতে রোহিঙ্গাদের নিয়ে গিয়ে ছবি, ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করতেন। এ কাজে সহযোগিতা করতেন দালাল নুরুল আফছার। এই সিন্ডিকেটের সদস্য জনপ্রিয় বড়ুয়া কাজ করতেন পটিয়া ও সাতকানিয়া এলাকায়। রোহিঙ্গা নাগরিকদের চট্টগ্রাম শহরে আসা-যাওয়া করতে সমস্যার মুখোমুখি হতো, তাই তাদের সাতকানিয়া ও পটিয়ায় বাসাবাড়িতে রেখে ডাটা সংগ্রহ করা হতো। এসব ডাটা পাঠানো হতো জয়নালের কাছে। আর জয়নাল নিমেষেই তাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সশরীরে কক্সবাজার গিয়ে বিভিন্ন হোটেলের রুমে বসে দালালদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা রোহিঙ্গাদের তথ্য, ছবি ও আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করতেন জয়নালের স্ত্রী আনিছুর নাহার বেগম। তিনি সিন্ডিকেটের একজন হিসেবে এ কাজ করতেন।

চট্টগ্রামের হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া, রাউজান ও ফটিকছড়ির সব রোহিঙ্গা ভোটারের এন্ট্রি দেয়া হতো হাটহাজারী উপজেলা নির্বাচন অফিসের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর সাইফুদ্দিনের মাধ্যমে।

দুদক জেলা কার্যালয়-২-এর উপ সহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিন বলেন, অনুসন্ধানের কাজ শেষ। রিপোর্ট জমা দেয়া হয়েছে। কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

২০১৯ সালের ২২ আগস্ট লাকী নামের এক নারী চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে এনআইডির স্মার্টকার্ড তুলতে গেলে কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে, ওই নারী রোহিঙ্গা এবং টাকা দিয়ে এনআইডি করিয়েছেন। ওই ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় হওয়া মামলাটি পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট তদন্ত শুরু করে। এরপর একে একে বেরিয়ে আসে রোহিঙ্গাদের ভোটার করার চাঞ্চল্যকর তথ্য।

এনআইডি জালিয়াতির মামলায় গ্রেপ্তার ১৫ জনের মধ্যে ১১ জন ইসির কর্মী, যাদের চারজন স্থায়ী ও সাতজন অস্থায়ী। বাকিরা তাদের সহযোগী। পাঁচজন আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

তারা হলেন ইসির চট্টগ্রাম কার্যালয়ের অফিস সহায়ক নাজিম উদ্দিন, অফিস সহকারী আনোয়ার হোসেন, জয়নাল আবেদীন, অস্থায়ী ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মোস্তফা ফারুক ও ইসি ঢাকা কার্যালয়ের অস্থায়ী কর্মচারী শাহনুর মিয়া। তাদের জবানবন্দিতে ইসির ল্যাপটপসহ অন্যান্য সরঞ্জাম বাসায় নিয়ে রোহিঙ্গাদের ভোটার করা এবং কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তা ইসির সার্ভারে আপলোড করার বর্ণনা উঠে আসে।

আরও পড়ুন:
রোহিঙ্গাদের ফেরা নিয়ে সন্দেহে মিয়ানমারের জান্তা
ভাসানচর থেকে পালিয়ে ক্যাম্পে তিন রোহিঙ্গা
আরও সাত রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ
টিকার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আশ্বাস চীনের
৩৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৭ দিনের লকডাউন

শেয়ার করুন

মন্তব্য