বেশি দামে জমি কিনে কম দামে বেচেন যিনি

বেশি দামে জমি কিনে কম দামে বেচেন যিনি

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক প্রকল্প পরিচালক আমিরুল ইসলামের একটি জমিতে নির্মাণাধীন বহুতল ভবন। ছবি: নিউজবাংলা

মাউশির সাবেক প্রকল্প পরিচালক আমিরুল ইসলাম মাসে বেতন পান ৬১ হাজার টাকা, অথচ মোহম্মদপুরে বিপুল জমির মালিক তিনি। গত বছর তিনি শুধু উৎসবের পেছনেই ব্যয় করেছেন ২৬ লাখ ৫৪ হাজার ২৮৮ টাকা।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আমিরুল ইসলাম মোহম্মদপুরে ৯.৯ শতাংশ জমি মাত্র ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় কিনেছেন। এই জমি তিনি বিক্রি করেছেন ৮৭ হাজার ৫০০ টাকায়।

জমি কেনাবেচার এই অস্বাভাবিক হিসাব তিনি দেখিয়েছেন তার দুটি ভিন্ন অর্থবছরের আয়কর বিবরণীতে।

আমিরুল ইসলাম বছর জুড়ে আয় করেছেন ৮ লাখ ৬৯ হাজার ৪০ টাকা। অথচ তিনি বছরে ব্যয় করেছেন ৩০ লাখ ৭৫ হাজার ৫০২ টাকা। এর সিংহভাগ ২৬ লাখ ৫৪ হাজার ২৮৮ টাকা তিনি ব্যয় করেছেন উৎসবের পেছনে।

আয়-ব্যয়ের এমন অসঙ্গতিপূর্ণ খতিয়ান আমিরুল ইসলাম দিয়েছেন তার ২০২০-২১ অর্থবছরের আয়কর বিবরণীতে।

অনিয়মের কারণে প্রকল্প থেকে সরিয়ে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা এই কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাবে নিয়মিত বড় অঙ্কের লেনদেন পাওয়া গেছে। তিনি মোহম্মদপুর এলাকায় নিয়মিত জমি কেনাবেচা করেছেন। এইসব কেনাকাটায় অস্বাভাবিক মূল্য দেখানো হয়েছে।

শিক্ষা ভবন সূত্র ও আয়কর বিবরণী থেকে জানা যায়, সাবেক পিডি আমিরুল ইসলাম বর্তমানে মোট বেতন পান ৬১ হাজার ২০০ টাকা। এই বেতন ও একটি ফ্ল্যাটের ভাড়া ছাড়া তার আর কোনো বৈধ আয়ের উৎস নেই।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে, আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে বিষয়টা সঠিক না। উৎসব ব্যয় এত টাকা হয় নাকি? এসব অভিযোগ মিথ্যা।’

বেশি দামে জমি কিনে কম দামে বেচেন যিনি
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক প্রকল্প পরিচালক আমিরুল ইসলাম

কত জমির মালিক তিনি?

আমিরুল ইসলাম গত কয়েক বছরে ঢাকা জেলার মোহাম্মদপুর থানাধীন রামচন্দ্রপুর মৌজায় মোট ১৪টি প্লট ও ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন। এর মধ্যে চারটি প্লটে আবাসিক ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। নবীনগর হাউজিংয়ের ৩ নম্বর রোডের দক্ষিণ মাথায় সিটি জরিপের ৫২০১, ৫২০২, ৫২০৫ নং দাগের ২০.৩৪ শতাংশ জমির উপর চলছে ১৪ তলা একটি আবাসিক ভবন নির্মাণের কাজ। এই ভবনের ৩৩টি ২২০০ বর্গফুট ফ্ল্যাটের মধ্য ২৮টি বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে তিনি বিক্রি করেছেন এবং পাঁচটি ফ্ল্যাট এখনও অবিক্রিত আছে বলে জানা যায়।

২০১৮-১৯ অর্থবছরের আয়কর বিবরণীতে তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার রামচন্দ্রপুর মৌজায় মোট পাঁচটি জমির তফসিল দেখিয়েছিলেন। এই পাঁচটি জমির মধ্যে ৮৮০৭ ও ৮৮১৩ নং দাগে ৯.৯ শতাংশ জমির ক্রয়মূল্য উল্লেখ করেছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আয়কর রিটার্নে সম্পদ বিবরণীতে জমিটি বিক্রয় দেখিয়েছেন মাত্র ৮৭ হাজার ৫০০ টাকায়।

মোহাম্মদপুর ভূমি রাজস্ব অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ লোকমান হোসন জানান, ওই এলাকার প্রতি শতাংশ জমির বিক্রি মূল্য অন্তত ৭৫ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১ কোটি পর্যন্ত বিক্রি হয়। সে হিসেবে প্রায় ১০ শতাংশের ওই জমির সম্পদমূল্য হওয়ার কথা কমপক্ষে সাড়ে সাত কোটি টাকা।

একই মৌজার ৫২০১, ৫২০২ ও ৫২০৫ নং দাগের ২০.৩৪ শতাংশ জমির ক্রয় মূল্য দেখিয়েছেন মাত্র ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। এই জমির মূল্য হওয়ার কথা কমপক্ষে ১৫ কোটি টাকা। এই জমিতেই যে ১৪ তলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটির ব্যয় তিনি দেখিয়েছেন মাত্র ২৫ লাখ টাকা। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের মতো জায়গায় ২০.৩৪ শতাংশ জমি ও তার ওপর ১৪ তলা ভবনের মূল্য দেখিয়েছেন মাত্র ২৬ লাখ ৩৫ হাজার ৩৬০ টাকা।

ওই ভবন নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রকৌশলীরা বলছেন, এই জায়গা ও ভবনের মূল্য অন্তত ৫০ কোটি টাকা।

এ ছাড়া রামচন্দ্রপুর মৌজায় পিডি আমিরুল ইসলামের ২৪.৭৫ শতাংশ আরও একটি জমি আছে। ভূমি নিবন্ধন খরচসহ যার মূল্য তিনি উল্লেখ করেছেন মাত্র ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। জমিটির ওপর একটি ১৩ তলা ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে। স্থানীয় ভূমি রাজস্ব অফিসের ভাষ্যমতে, শুধু জমির মূল্যই কমপক্ষে ২৪ কোটি টাকা।

শিক্ষা ভবনের সাবেক পিডি আমিরুল ইসলামের নিয়োগ করা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিংয়ে আমিরুল ইসলামের নামে ছয় কাঠার একটি প্লট ফাঁকা পড়ে আছে। প্লটটির সামনের অংশে রাস্তা তৈরি না হওয়ায় নির্মাণ কাজ হাতে নেয়া যায়নি।

আমিরুল ইসলাম তার আয়কর রিটার্নে তার মোট সম্পদের পরিমাণ দেখিয়েছেন ১ কোটি ১৯ লাখ ৮৬ হাজার টাকার।

সরকারি চাকরি করে জমির ব্যবসা?

জমিগুলোর কেনার রেকর্ড ঘাটলে দেখা যায়, যে সময় আমিরুল ইসলাম শিক্ষা ভবনের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব নেন, সেই সময় থেকেই জমিগুলো কেনা হয়েছে। তিনি প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন শুরু করেন ২০১১ সালে। জমিগুলো কেনা হয় ২০১৩ সালের পর থেকে। সর্বশেষ দুই প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম প্রমাণ হওয়ায় তাকে ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।

শিক্ষা ভবনের একাধিক সূত্র বলছে, পিডি আমিরুল ইসলাম চাকুরীজীবী হিসেবে পার্টটাইম হলেও পূর্ণকালীন জমির ব্যবসায়ী। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী, তার এমন কাজ করার কোনো বিধানই নেই। তা ছাড়া তার জমি ক্রয়ের অর্থের উৎস কোথাও উল্লেখ করা নেই।

এসব সম্পত্তির ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে আমিরুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা ছোট ছোট সমবায়ের মাধ্যমে এগুলো কিনেছি।’

সমিতির মাধ্যমে কেনা জমি কিভাবে তার নামে কেনাবেচা হয়েছে, জিজ্ঞেস করা হলে তিনি কোনো জবাব দেননি।

ব্যাংকে অস্বাভাবিক লেনদেন

মহানগরীর মোহাম্মদপুর আইএফআইসি ব্যাংক লিমিটেডের ১২০১০১৬২৪৯০৩১ নম্বর হিসাব বিবরণীতে দেখা যায়, ২০১৯ সালে ওই হিসাবে মোট লেনদেন হয়েছে ১৬ লাখ ৫৬ হাজার ৩০১ টাকার, যা আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করা হয়নি। এই ব্যাংক হিসাবের হিসাবধারী আমিরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী শায়লা আক্তার। আমিরুল-শায়লা দম্পতির স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গুলশান শাখায় ০১-১৩৩৭৩৪০ নম্বর হিসাব নম্বরের আরও একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এই হিসেবে শুধু কয়েক মাসেই ২০১৯ সালে জমা হয়েছে ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

প্রকল্পে দুর্নীতি

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা ভবনের এক কর্মকর্তা জানান, আমিরুল ইসলাম মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) যোগদান ও প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তার সম্পদের পরিমাণ হুহু করে বেড়েছে।

আমিরুল ইসলাম গত ১১ বছর ধরে মাউশিতে প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ২০১৭ সালে ‘ঢাকা শহরের সন্নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প’ এবং ‘মহানগরীতে ছয়টি মহাবিদ্যালয় ও ১১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প’ নামে একসঙ্গে দুটি প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।

এর মধ্যে প্রথম প্রকল্পটিতে অতিরিক্ত ১০০ কোটি টাকা ব্যয় দেখানোর কারণে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোমিনুর রশিদ আমিনকে সভাপতি করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কমিটির অন্য দুজন সদস্য ছিলেন মাউশির পরিচালক অধ্যাপক মো. আমির হোসেন, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের অডিট অফিসার ফরিদ উদ্দিন।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ঢাকা শহরের নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পে বাস্তবে কোনো বৃহৎ গাছপালা ও অবকাঠামো না থাকা সত্ত্বেও গাছপালা ও অবকাঠামো উল্লেখ করে প্রায় ১০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বসিয়ে দেয়া হয়েছে। এটা দুরভিসন্ধিমূলক। সুতরাং বলা যায়, দুর্নীতির শুরু প্রাক্কলন থেকেই। এ কারণে আমিরুল ইসলামকে প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে প্রত্যাহার করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হলো।’

আমিরুল ইসলামের অভিযোগের ব্যাপারে শিক্ষা ভবনের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মোহাম্মদ গোলাম ফারুকের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পে কাজ করার সময় সাবেক পিডি আমিরুল ইসলামের উদ্দেশ্য খারাপ ছিল। সে জন্য তাকে ওএসডি করা হয়েছে। আমিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আরও তদন্ত চলছে, তদন্তে কোনো কিছু প্রমাণ হলে তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

আরও পড়ুন:
সাংবাদিকদের এড়িয়ে গেল ইউজিসির তদন্ত দল
গোপনে স্কুলভবন বিক্রির অভিযোগ
৩১ কোটি টাকা আত্মসাৎ: বহিষ্কৃত আ. লীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ
মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ
দুদক গঠনে বাছাই কমিটি

শেয়ার করুন

মন্তব্য

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে হুইলচেয়ার আটকে রাখা নারী কে?

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে হুইলচেয়ার আটকে রাখা নারী কে?

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ‘স্পেশাল খালা’ হাজেরা বেগমের হুইলচেয়ার আটকে রাখার ভিডিও ছড়িয়েছে ফেসবুকে। ছবি: সংগৃহীত

ঘটনাটি সরাসরি ফেসবুকে লাইভের সময় হুইলচেয়ার কেড়ে নেয়া নারীর পরিচয় বেশ কয়েকবার জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। তবে নিউজবাংলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ওই নারীর নাম হাজেরা বেগম। তিনি হাসপাতালটিতে ‘স্পেশাল খালা’ হিসেবে পরিচিত।

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গত শুক্রবার গভীর রাতে অ্যাম্বুলেন্সে একজন মুমূর্ষু রোগী নিয়ে আসেন স্বজনেরা। সেই রোগীকে হাসপাতালের ভেতর নিতে প্রয়োজন হুইলচেয়ার। তবে হুইলচেয়ারের জন্য দেড়শ টাকা দাবি করে বসেন হাসপাতালের এক নারী।

এই টাকা না পেয়ে মুমূর্ষু রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে রেখেই হুইলচেয়ার কেড়ে নিয়ে ওই নারী চলে যেতে উদ্যত হন। এ সময় তার সঙ্গে একজনের বাগবিতণ্ডার ভিডিও ছড়িয়েছে ফেসবুকে। প্রায় ২৫ মিনিট পর ওই রোগীকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান স্বজনেরা।

ঘটনাটি সরাসরি ফেসবুকে লাইভের সময় হুইলচেয়ার কেড়ে নেয়া নারীর পরিচয় বেশ কয়েকবার জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। তবে নিউজবাংলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ওই নারীর নাম হাজেরা বেগম। তিনি হাসপাতালটিতে ‘স্পেশাল খালা’ হিসেবে পরিচিত।

হাসপাতালটির কর্মকর্তারা জানান, জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ট্রলি ও হুইলচেয়ার টানার নিজস্ব কর্মীর অভাবে গড়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলছে ট্রলি-হুইলচেয়ার বাণিজ্য। রোগীপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে তাদের।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে হুইলচেয়ার আটকে রাখা নারী কে?

ট্রলি বা হুইলচেয়ার টানার কাজ যারা করছেন তারা ‘স্পেশাল বয়’ বা ‘স্পেশাল খালা’ হিসেবে পরিচিত। হাজেরা বেগম এমনই একজন ‘স্পেশাল খালা’। সিন্ডিকেটের সদস্যরা ২৪ ঘণ্টাই পালাক্রমে হাসপাতালে অবস্থান করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চতুর্থ শ্রেণির বেশ কয়েকজন কর্মচারী নিয়ন্ত্রণ করেন এই সিন্ডিকেট। কমিশনের ভিত্তিতে তারা সিন্ডিকেটের সদস্যদের নিয়োগ দেন। হাসপাতালের কর্মী নন এমন অন্তত ১০০ জন ট্রলি ও হুইলচেয়ার টানার কাজ করছেন।

এই হাসপাতালে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক আনসার সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘স্পেশাল বয় ও খালাদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন জরুরি বিভাগের ওয়ার্ড সর্দার টুলু হাওলাদার, কিরণ মিয়া ও রায়হান মিয়া। তারা প্রকাশ্যে হুইলচেয়ার-ট্রলি বাণিজ্য করলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয় না।’

সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের সামনে ট্রলি আর হুইলচেয়ার নিয়ে রোগীর অপেক্ষায় আছেন অন্তত ১৫ জন স্পেশাল বয় ও খালা। অ্যাম্বুলেন্সে রোগী এলেই তার কাছে ছুটে যাচ্ছেন। স্বজনেরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা হুইলচেয়ার বা ট্রলিতে রোগী তুলে জরুরি বিভাগে নিয়ে যাচ্ছেন। সেখান থেকে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ওয়ার্ডেও রোগী নিয়ে যাচ্ছেন তারা।

এমনকি রোগীর শরীরের তাপমাত্রা কেমন সেটাও এই স্পেশাল বয় ও খালাদের কাছ থেকে চিকিৎসকেরা জেনে নিচ্ছেন। করোনা সংক্রমণের ভয়ে রোগীর কাছ থেকে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রাখছেন চিকিৎসকেরা। আর রোগীদের ‘সেবা দেয়ার বিনিময়ে’ স্বজনদের কাছ থেকে ১০০ থেকে ২০০ টাকা নিচ্ছেন স্পেশাল বয় ও খালারা।

আসিয়া বেগম নামে এক ‘স্পেশাল খালা’ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি এই হাসপাতালের কেউ না। তবে পাঁচ বছর ধরে এখানে কাজ করছি। বাসা কেরানীগঞ্জ। প্রতিদিন ভোরে হাসপাতালে আসি। বেলা ২টা পর্যন্ত কাজ করে চলে যাই। প্রতিদিন ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা আয় হয়।’

এ কাজের জন্য হাসপাতাল থেকে কোনো বেতন পান কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এক টাকাও দেয় না। বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রতিদিন বিনা বেতনে ধোয়ামোছার কাজ করি। হাসপাতাল পরিষ্কার করি। এ জন্য এক টাকাও তারা দেয় না, তাই হুইলচেয়ার থেকে টাকা নেয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।’

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে হুইলচেয়ার আটকে রাখা নারী কে?
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগী এলে এভাবেই ছুটে যান ‘স্পেশাল বয়’ বা ‘স্পেশাল খালা’

ঢাকার বাইরে থেকে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন আমিরুল ইসলাম। অ্যাম্বুলেন্সটি হাসপাতালের সামনে থামার সঙ্গে সঙ্গে ট্রলি নিয়ে হাজির হন এক যুবক। জরুরি বিভাগে রোগী নেয়ার জন্য ১৫০ টাকা দাবি করেন। আমিরুল সেই টাকা দিয়েই বাবাকে জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন।

নিউজবাংলা প্রতিবেদক সোমবার বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে স্পেশাল বয় ও খালাদের তৎপরতা দেখলেও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. খলিলুর রহমানের দাবি, হাজেরা বেগমের ঘটনাটি জানার পর চক্রের সবাইকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।

জনবল সংকটের কারণেই এমন সমস্যা তৈরি হয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘হুইলচেয়ার ও ট্রলি পরিচালনার জন্য হাসপাতালে অল্প কিছু লোক নিয়োগ দেয়া রয়েছে। এই সংখ্যা অনেক কম। এ কারণেই কিছু লোক সুযোগ নিচ্ছে। তাদের স্পেশাল বয় ও খালা বলে ডাকা হয়। হাসপাতাল থেকে তাদের কোনো বেতন দেয়া হয় না।’

রোগীর স্বজনের কাছে টাকা দাবি করা হাজেরার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘তাকে (হাজেরা) হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। উনারা আমাদের স্টাফ না, যে কারণে প্রতিনিয়ত এ ধরনের ঝামেলা করেন। এ ঘটনার পর তাদের সবাইকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।’

হাসপাতালে এখনও স্পেশাল বয় ও খালাদের উপস্থিতি দেখার তথ্য জানানো হলে পরিচালক বলেন, ‘আমরা যখন অভিযানে যাই, তখন কাউকে পাই না। মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করা হয়। আমি ইতোমধ্যে আদেশ দিয়েছি দেখামাত্র তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

স্পেশাল বয় ও খালাদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে নাম আসা জরুরি বিভাগের সর্দার রায়হান মিয়া অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘জরুরি বিভাগে তিনজন ওয়ার্ড সর্দার আছে। ট্রলি ও হুইলচেয়ার টানার জন্য যারা আছে তাদের আমরা তিন শিফটে ভাগ করে দিয়েছি। এদের দেখভাল আমাদেরই করতে হয়।’

কমিশন নেয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এমন অভিযোগ সত্যি না। কেউ আপনাকে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। আমাদের কেউ এ ধরনের ঘটনায় জড়িত নয়। আমরা হাসপাতাল থেকেই বেতন পাই।’

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে শুক্রবার রাতে নিয়ে আসা মুমূর্ষু রোগীর অবস্থা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছে নিউজবাংলা। তবে জানা গেছে, তাকে পরে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়।

হাসপাতালের নার্স রুবিনা আক্তার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘তার শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল। জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে ভর্তির পরামর্শ দেন। তবে সে সময় হাসপাতালে একটি আইসিইউও খালি ছিল না। এ কারণে রোগীর স্বজনেরা সেই রাতেই তাকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যান।’

আরও পড়ুন:
সাংবাদিকদের এড়িয়ে গেল ইউজিসির তদন্ত দল
গোপনে স্কুলভবন বিক্রির অভিযোগ
৩১ কোটি টাকা আত্মসাৎ: বহিষ্কৃত আ. লীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ
মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ
দুদক গঠনে বাছাই কমিটি

শেয়ার করুন

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের দেয়ালজুড়ে ক্ষোভ-হাহাকার লিখে রেখেছেন সেবাগ্রহীতারা। ছবি: নিউজবাংলা

অসংখ্য মানুষ তাদের হাহাকার আর ক্ষোভের কথা লিখে রেখেছেন পাসপোর্ট অফিসের দেয়ালজুড়ে। দালালের দৌরাত্ম্য, লোকবল সংকট আর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এ অফিসে আসা সেবাগ্রহীতাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

‘ফাগলা কুত্তায় কামরাইলে পাসপোর্ট অফিসে আইয়ো’- সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের ভেতর দিককার দেয়ালে লিখে রেখেছেন কেউ একজন।

‘ফাগলা কুত্তা’ মানে পাগলা কুকুর। এই আক্ষেপ কার- জানেন না কেউ। তবে আরও অনেকে তাদের নাম বা মোবাইল ফোন নম্বর উল্লেখ করেও লিখেছেন দুর্ভোগের কথা।

এই দেয়ালেই কাদির আহমদ নামের একজন নিজের মোবাইল নম্বর উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘এতো কষ্ট জানলে আগে আইতাম না।’

ওই মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে কাদির নিশ্চিত করেন তিনিই বাক্যটি লিখেছেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হারা দিন ধরি লাইনে উবাইয়া (না খেয়ে) আছলাম। কিচ্ছু খাইতে পারছি না। পানিও না। বাইর হইলেই যদি সিরিয়াল মিস করি লাই, ডরে তাই লাইন ছাড়ছি না। খুব বিরক্ত লাগছিল। একদিকে ক্ষুধা, আরেক দিকে সারা দিন উবাইয়া (না খেয়ে) থাকিয়া পাওয়ো (পায়ে) বেদনা, বিরক্তি, সব মিলিয়া কান্দতে (কাঁদতে) ইচ্ছা করছিল। এর লাগি মনের দুঃখে দেওয়ালো (দেয়ালে) ইতা লেখছি।’

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

পাসপোর্ট আবেদন জমা দেয়ার সময় নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, সকাল ৭টায় গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে রাত ৮টায় বের হয়ে আসেন। একের পর এক লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে সেদিন জীবনের সবচেয়ে বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

কাদিরের মতো অসংখ্য মানুষের হাহাকার, ক্ষোভের কথা ছড়িয়ে আছে পাসপোর্ট অফিসের ভেতর দিকের দেয়ালজুড়ে।

দালালের দৌরাত্ম্য, লোকবল সংকট আর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এ অফিসে আসা সেবাগ্রহীতাদের দুর্ভোগ আর হয়রানি চরমে পৌঁছেছে। সারা দিন পেরিয়ে রাত পর্যন্ত পাসপোর্ট আবেদনকারীদের দীর্ঘ লাইন লেগে থাকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লকডাউনের পর বিশ্ব শ্রমবাজার খুলে যাওয়া ও শিক্ষার্থী ভিসায় বিদেশ যাওয়ার হিড়িকের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে পাসপোর্ট আবেদনের হার অনেক বেড়েছে। এই চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

দেয়ালজুড়ে হাহাকার

সিলেট নগরের দক্ষিণ সুরমার আলমপুরে সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের অবস্থান। অফিসের ফটক দিয়ে ঢুকলেই পাসপোর্টের আবেদন জমা ও পাসপোর্ট গ্রহণ করার আলাদা কাউন্টার। এরপর একটি সরু গলি পেরিয়ে পাসপোর্টের জন্য ফিঙ্গার প্রিন্ট দেয়ার একাধিক কাউন্টার। ফিঙ্গার প্রিন্ট দেয়ার জন্য প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয় আবেদনকারীদের। ফলে সব সময় ভিড় লেগে থাকে।

এখানকার দেয়ালের রং হলদেটে সাদা। তবে ক্ষোভ-হাকারের অক্ষরে এই রং হারিয়ে ফেলেছে দেয়ালটি। পুরো দেয়ালজুড়ে এখন কালো ছোপ ছোপ, লালও আছে কোথাও। কলমের কালিতে দেয়ালজুড়ে নিজেদের দুর্ভোগ আর তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন পাসপোর্টগ্রহীতারা।

বেশির ভাগ লেখাই অস্পষ্ট হয়ে গেছে। তবে কিছু কিছু বেশ পরিষ্কার।

একজন লিখেছেন, ‘পাসপোর্ট তৈরি করতে আসলে কিয়ামতের ডাক এসে যাবে। তাই টিফিনসহ যাবতীয় জরুরি জিনিস সাথে আনবেন। নইলে বুঝবেন ঠেলা কাকে বলে কত প্রকার ও কী কী?’

আরেকজন লিখেছেন, ‘পাসপোর্ট অফিস আমারে দেশ ছাড়ার শিক্ষা দিল!’

এই লেখার নিচে ইংরেজি হরফে লেখা জুবায়ের আহমদ।

এর পাশেই লেখা, ‘ভাইরে সারা জীবন মনো থাকবো’, ‘যত জীবন বাচমু মনো থাকবো রে ... (গালি)’, ‘সকাল ৬টা থেকে অপেক্ষা করতেছি। উৎসাহ পেলে সারাজীবন করবো। হাহা খুব মজা লাগতেছেরে ভাই।’

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

একজন লিখেছেন, ‘কারো মরার ইচ্ছে হইলে পাসপোর্ট অফিসে আসুন’, একটি বাক্য এমন- ‘জীবনে যা গুণাহ করছি তার প্রায়শ্চিত্ত।’

দেয়ালে আরও লেখা আছে, ‘বাংলাদেশে যত দুর্নীতি আছে, তার বেশিরভাগই পাসপোর্ট অফিসে হয়’, ‘আমি নিজ ইচ্ছায় স্বীকার করছি, স্কুলে এসএমব্লি (এসেম্বলি) ভাগার জন্য এই শাস্তি’, ‘জীবনে যা পাপ করেছি তার ফল।’

সৌরভ নামে একজন লিখেছেন, ‘সকাল ৮টা থাকি রাইত ৯টা পর্যন্ত উবা (না খাওয়া)। মাদার বোর্ড হকল।’

সেবাগ্রহীতাদের এ রকম অসংখ্য অভিযোগ আর হাহাকার ধারণ করে আছে এই দেয়াল।

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

দেয়ালের এই লেখাগুলো চোখ এড়ায়নি সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের পরিচালক একেএম মাজহারুল ইসলামের।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। সেই দুর্ভোগের কথা তারা দেয়ালে লিখে রাখছে। তবে আবেদনকারীদের তো একদিন দুর্ভোগ পোহাতে হয়, কিন্তু আমাদের প্রতিদিন এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা। কিন্তু অতিরিক্ত আবেদনের চাপে আমাদের সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত অফিস করতে হয়। তখন পর্যন্ত ভিড় থাকে। আমাদের এই দুর্ভোগের কথা আমরা কোথায় লিখব!’

পাসপোর্ট অফিসে এক ঘণ্টা

পাসপোর্ট অফিসে দুপুর ১২টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে ও বাইরে চারটি লাইন। চারটি লাইনের প্রতিটিতেই দাঁড়িয়ে আছেন শতাধিক মানুষ। একটি লাইন আবেদন জমা দেয়ার, একটি রোহিঙ্গা পরীক্ষা আর অপর দুটি ফিঙ্গার প্রিন্টের।

আবেদন জমা দেয়া আর রোহিঙ্গা পরীক্ষার লাইনগুলো অফিস ভবনের বাইরে। খোলা আকাশের নিচে রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন গ্রহীতারা।

শোয়েব আহমদ নামে এক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা সকাল থেকে রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। অথচ হঠাৎ করে লাইনের বাইরে থেকে আসা একজনের আবেদন পরীক্ষা করা হচ্ছে। এভাবে মাঝে মাঝেই লাইন ভেঙে আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে।’

তবে রোহিঙ্গা পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মী এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন, যদিও তিনি তার নাম প্রকাশ করতে চাননি।

ফিঙ্গার প্রিন্টের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সজল মালাকার বলেন, ‘সকাল ৮টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু সামনে এগোচ্ছেই না। খুব মন্থর গতিতে কাজ চলছে। এভাবে চলতে থাকলে সারা দিনেও এই লাইন শেষ হবে না।’

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

দোতলায় পরিচালকের কার্যালয়ের সামনে গিয়েও দেখা যায় দীর্ঘ লাইন। এই লাইনে দাঁড়ানো সবাই নানা অভিযোগ নিয়ে এসেছেন।

তাদের একজন সালেহ আহমদ। মাস দেড়েক আগে পাসপোর্টের আবেদন জমা দিয়েছিলেন। নির্ধারিত তারিখ পেরিয়ে গেলেও তার পাসপোর্ট আসেনি। পাসপোর্ট বিতরণ কাউন্টারের লোকজন কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এরপর পরিচালকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন সালেহ।

সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক মাজহারুল ইসলামের কক্ষে ঢুকে সালেহ আহমদের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি সালেহকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে আসেন।

এরপর তার আবেদনপত্রের স্লিপ কম্পিউটারে পরীক্ষা করে বলেন, ‘সালেহ আহমদ পাসপোর্টের আবেদনে নিজের নামের যে বানান লিখেছেন, তার সঙ্গে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের নামের বানানের মিল নেই। এক জায়গায় ‘ই’ এর বদলে ‘এ’ লিখেছেন তিনি। ই-পাসপোর্টের ক্ষেত্রে সামান্যতম ভুল থাকলেও পাসপোর্ট দেয়া হয় না। ঢাকা থেকেই এটি করা হয়। এতে আমাদের কিছু করার থাকে না।’

সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এখানে এ ধরনের সমস্যাই বেশি। মানুষজন আবেদনে ভুল করেন। এরপর আমাদের দোষারোপ করেন।’

ই-পাসপোর্ট আবেদনকারীদের সব তথ্য সঠিকভাবে দেয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

আবেদনের এই ভুল প্রসঙ্গে সালেহ আহমদ বলেন, ‘আমি তেমন লেখাপড়া জানি না। ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে আবেদন করেছিলাম। আবেদন জমা দেয়ার সময় পাসপোর্ট অফিসের কর্মীরাও ভুল থাকার কথা বলেননি। এখন বলা হচ্ছে ভুল ছিল।’

পরিচালকের কার্যালয় থেকে বেরিয়ে কথা হয় আশরাফ আলী মণ্ডল নামে আরেক আবেদনকারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবার নাম আনসার আলী মণ্ডল। আমার সব সার্টিফিকেটে এমনটিই লেখা রয়েছে। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে আমার বাবার নামের শেষাংশের ‘মণ্ডল’ যুক্ত করা হয়নি। আমি আমার পাসপোর্টের আবেদনে বাবার পুরো নামটাই লিখেছিলাম। এখন পাসপোর্ট আটকে দেয়া হয়েছে।’

আবেদনকারী আনসার আলী বলেন, ‘আমি উচ্চ শিক্ষা নিতে যুক্তরাজ্যে যাব। আগামী মাসেই আমার সেখানে পৌঁছানোর কথা। এখন পাসপোর্ট না পেলে আমি যাব কীভাবে?’

হাহাকার-ক্ষোভের ‘দেয়ালিকা’ সিলেট পাসপোর্ট অফিসে

অভিযোগের অন্ত নেই

সিলেট পাসপোর্ট অফিস নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই গ্রাহকদের। অনিয়ম, দুর্নীতি আর মানুষজনকে অহেতুক হয়রানির অভিযোগ এই অফিসের কর্মরতদের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, পাসপোর্ট অফিস ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি দালাল সিন্ডিকেট। এই দালালদের মাধ্যমে আবেদন এলে আর লাইনে দাঁড়াতে হয় না। দ্রুতই সব কাজ হয়ে যায়। আর দালালদের মাধ্যমে না এলে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাকিল আহমদ চৌধুরী বলেন, “আমি অনলাইনে আবেদন করি। কিন্তু ‘গিভেন নেম’ না লেখার কারণ দেখিয়ে আমার আবেদন বাতিল করা হয়। কিন্তু অনলাইনে সংশোধন করার ব্যবস্থা নেই। পাসপোর্ট অফিসের লোকজন এটি সংশোধন করতে পারেন, তবে তারা করেননি। অথচ দালালদের মাধ্যমে যারা আবেদন করেন তাদের এ রকম ভুল থাকলেও কোনো সমস্যা হয় না।”

একাধিক পাসপোর্টগ্রহীতার অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে পাসপোর্টের আবেদন করলে আবেদনের ফরমে তারা একটি চিহ্ন দিয়ে দেয়। এই চিহ্ন থাকলে আর লাইনে দাঁড়াতে হয় না। আবেদনে ছোটখাটো ভুল থাকলেও সমস্যা হয় না, কিন্তু দালাল ছাড়া এলেই দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আবেদনকারী জানান, একটি ট্রাভেল এজেন্সিকে বাড়তি এক হাজার টাকা দিয়ে পাসপোর্টের আবেদন করেন তিনি। আবেদন ফরম পূরণ করাসহ বাকি সব প্রক্রিয়া ওই ট্রাভেল এজেন্সিই করবে।

অ্যাসোসিয়েশন অফ ট্রাভেল এজেন্ট অফ বাংলাদেশের (আটাব) সিলেট অঞ্চলের সাবেক সভাপতি আব্দুল জব্বার জলিল বলেন, ‘পাসপোর্ট অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য হয়রানি নিয়ে অনেকেই আমার কাছে অভিযোগ করেছেন। দালালদের মাধ্যমে পাসপোর্ট জমা না দিলে হয়রানির শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। মানুষজনের এমন হয়রানি দূর করতে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদেরই উদ্যোগী হতে হবে।’

তবে দালালদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ অস্বীকার করে পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘এখন তাদের একেবারে উৎপাত নেই। আমি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সব মনিটর করি। এখন কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। তবে আবেদনের চাপ বাড়ায় মানুষজনকে কিছু দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’

লোকবল সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি

পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন তরুণ চিত্রশিল্পী দ্বীপ দাস। সেই আবেদন জমা দিতেই দুদিন লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে তাকে।

দীপ দাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি আগের দিন সকাল থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সারা দিন পর বলা হয়, সার্ভার নষ্ট। পরদিন সকাল ৭টা থেকে আবার লাইনে দাঁড়াই। এরপর দুপুরের দিকে আমার ছবি তোলা ও ফিঙ্গার প্রিন্ট নেয়া হয়।’

এমন দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন আরও অনেক পাসপোর্টগ্রহীতা। লোকবল সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন পাসপোর্ট অফিসের সংশ্লিষ্টরা।

পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক একেএম মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘এই অফিসে ৩২টি পদ থাকলেও কর্মরত আছেন ১৯ জন। ডিএডি, অ্যাকাউন্টেন্ট ও কয়েকটি অপারেটরের পদ খালি রয়েছে।

যান্ত্রিক ত্রুটি এখানে সব সময় লেগে থাকে। সার্ভার বিকল হয়ে যায়। নেটওয়ার্কের সমস্যা থাকে। আজকেও জাতীয় পরিচয়পত্র পরীক্ষার সার্ভার নষ্ট। এগুলো ঢাকা থেকে ঠিক না করলে আমাদের কিছুই করার থাকে না। এ কারণে মানুষজনকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’

মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘লকডাউনের পর থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ আবেদন গ্রহণ করতে হচ্ছে। আমার ২০ বছরের চাকরিজীবনে এ রকম চাপ কোনো দিন দেখিনি। অথচ এই চাপ সামলানোর মতো লোকবল ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি আমার নেই। ফলে এখানে সব সময়ই ভিড় থাকে। মানুষ এসব সমস্যা বুঝতে চায় না। তাদের দুর্ভোগের পাশপাশি আমাদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’

আরও পড়ুন:
সাংবাদিকদের এড়িয়ে গেল ইউজিসির তদন্ত দল
গোপনে স্কুলভবন বিক্রির অভিযোগ
৩১ কোটি টাকা আত্মসাৎ: বহিষ্কৃত আ. লীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ
মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ
দুদক গঠনে বাছাই কমিটি

শেয়ার করুন

ঢাকায় সিএনজিচালিত বাস আসলে কত?

ঢাকায় সিএনজিচালিত বাস আসলে কত?

ডিজেল ও সিএনজিচালিত বাসের সংখ্যা নিয়ে চলছে বিতর্ক। ছবি: সংগৃহীত

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিআরটিএ থেকে শুরু করে পরিবহন খাত নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন পক্ষ, এমনকি বাস মালিক সমিতি কারও কাছেই এ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান নেই। রাজধানীর যেসব পেট্রল পাম্প বা সিএনজি স্টেশন থেকে বাসের জ্বালানি সরবরাহ করা হয়, সেখান থেকেও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অনেকটা ধারণার ভিত্তিতে প্রচার হচ্ছে সিএনজিতে ৯৫ শতাংশ বাস চলার তথ্য।    

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরই বাসের ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনে নামেন মালিকেরা। তাদের আকস্মিক ধর্মঘটের মুখে সরকার বাস ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।

সরকারের সঙ্গে মালিকপক্ষের সমঝোতা অনুযায়ী, দূরপাল্লার বাস ভাড়া ২৭ শতাংশ এবং মহানগরে ২৬ দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এই বাড়তি ভাড়া কার্যকর হয়েছে শুধু ডিজেলচালিত বাসের ক্ষেত্রে, সিএনজিচালিত পরিবহনের ভাড়া আছে আগের মতোই। তবে সিএনজিচালিত বাসেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে প্রথম দিনেই।

সিএনজিচালিত বাসেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, রাজধানীসহ সারা দেশে চলা বাসের কত শতাংশ ডিজেল ও সিএনজিচালিত? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।

কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ঢাকায় বর্তমানে যত বাস চলাচল করে তার ৯৫ শতাংশই জ্বালানি হিসেবে সিএনজি ব্যবহার করে। ডিজেলে চলে মাত্র পাঁচ শতাংশ বাস। সারা দেশেও শতাংশের এই হারটি প্রায় একই।

তবে এই তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিউজবাংলার অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। দেখা গেছে, বিআরটিএ থেকে শুরু করে পরিবহন খাত নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন পক্ষ, এমনকি মালিক সমিতি কারও কাছেই এ সংক্রান্ত কোনো পরিসংখ্যান নেই। রাজধানীর যেসব পেট্রল পাম্প বা সিএনজি স্টেশন থেকে বাসের জ্বালানি সরবরাহ করা হয় সেখান থেকেও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এসব পেট্রল পাম্প বা সিএনজি স্টেশনসংশ্লিষ্টদের ধারণা, ঢাকায় অর্ধেকের বেশি বাস এখন ডিজেলচালিত। কোনো কোনো বাসে ব্যবহার করা হচ্ছে দুই ধরনের জ্বালানি।

ঢাকায় সিএনজিচালিত বাস আসলে কত?

জার্মানভিত্তিক একটি সংবাদমাধ্যমের বাংলা সংস্করণের প্রতিবেদনে বিআরটিএর বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, ঢাকায় ৯৫ শতাংশ বাসই এখন সিএনজিচালিত৷ এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার ভেতরে মোট বাস ১২ হাজার ৫২৬টি৷ তার মধ্যে গ্যাসে চলে ১১ হজার ৯০০টি৷ ডিজেলে চলে ৬২৬টি৷ ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বাস মোট ১৬ হাজার৷ তার মধ্যে গ্যাসে চলে ১১ হাজার ২০০৷ ডিজেলে চলে চার হাজার ৮০০৷ সারা দেশে মোট বাস ৭৮ হাজার৷ তার মধ্যে গ্যাসে চলে ৪৬ হাজার ৮০০টি৷ ডিজেলে চলে ৩১ হাজার ২০০টি৷’

তবে বিআরটিএর কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকাসহ সারা দেশে এখন ডিজেল ও সিএনজিতে কত বাস চলছে, সে বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। ২০০৮ সালে এ বিষয়ে পরিসংখ্যান তৈরির একটি উদ্যোগ নেয়া হলেও সেটি বাস্তবায়ন করা যায়নি।

বিআরটিএ-এর পরিচালক (সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি) মাহবুব ই রাব্বানী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের ডেটাবেজে এ তথ্যগুলো নেই। কোন কোন কোম্পানির বাস গ্যাসে চলে সেই ডেটাবেজও নেই। ফুয়েলের ওপর নির্ভর করে আমাদের কোনো ডেটাবেজ এখন পর্যন্ত তৈরি করা হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘২০০৮-২০০৯ সালের দিকে যখন ডেটাবেজ তৈরির কাজ শুরু হয়, তখন বেশির ভাগ বাস সিএনজিতে রূপান্তর করা হয়েছিল। পরে রূপান্তরিত গাড়ির সমস্যার কারণে অনেকে আবার তেলে ফিরে আসে। এর পরে আর গ্যাসের বাস নামেনি।’

বিআরটিএর বরাতে ঢাকার ৯৫ শতাংশ গাড়ি গ্যাসে চলার তথ্য নাকচ করে মাহবুব ই রাব্বানী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গ্যাসের বাস পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশের বেশি আছে বলে আমার মনে হয় না। এখন সিএনজিচালিত বাস কেউ নামায় না, বেশির ভাগই ডিজেলচালিত।’

ডিজেলে বাস বেশি চলার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগে যখন গ্যাসের দাম কম ছিল তখন গাড়ি গ্যাসে চলে গিয়েছিল। পরে গ্যাসের দাম বাড়া এবং ইঞ্জিন না টেকার কারণে গাড়িগুলো তেলে চলতে শুরু করে। আর এখন তো গ্যাসের দাম অনেক বেশি। গ্যাসে আগের সুবিধা পায় না বলেই মালিকেরা তেলে ফিরেছে।’

ঢাকায় সিএনজিচালিত বাস আসলে কত?

ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিকে, ‘৯৫ শতাংশ বাস সিএনজিতে চলার’ তথ্য দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর বরাতে। এই তথ্যের উৎস জানতে চাইলে মোজাম্মেল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা এই তথ্য বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট ও গণমাধ্যমের কাছ থেকে পেয়েছি।’

তবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘উনাকে (মোজাম্মেল হক চৌধুরী) এমন কোনো তথ্য দেয়া হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে ভুল-বোঝাবুঝির কয়েকটি কারণ আছে। আমি মনে করি, ২০১৫ সালের দিকে সিএনজির দাম যখন বাড়ানো হয়, তখন বাস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বা শ্রমিক ফেডারেশন অনেকটা জোর গলায় বলেছিল, তাদের অধিকাংশ বাস সিএনজিতে চলে। সিএনজির দাম বেড়েছে, ফলে ভাড়া বাড়াতে হবে। আমার মনে হয়, ওটা ধরেই তিনি (মোজাম্মেল) কথাটা বলেছেন।’

ঢাকা শহরে মাত্র ৫ শতাংশ গাড়ি সিএনজিতে চলে, এমন দাবিকে একেবারেই ভিত্তিহীন বলে মনে করছেন অধ্যাপক হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, ‘এটা আমার কাছে একেবারেই অসম্ভব মনে হয়।’

বুয়েটের এআরআই ২০১৯ সালে খুব স্বল্প পরিসরে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের জন্য একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল বলে জানান অধ্যাপক হাদিউজ্জামান। ওই প্রকল্পকেন্দ্রিক গণপরিবহনের মাত্র ২৫ মালিকের সঙ্গে কথা বলে সমীক্ষাটি করা হয়। এতে দেখা যায়, সুনির্দিষ্টভাবে ওই রুটের ২৫ জন মালিকের ৮০ ভাগ গাড়ি চলে সিএনজিতে, আর ২০ ভাগ গাড়ি চলে ডিজেলে।

ঢাকায় সিএনজিচালিত বাস আসলে কত?

হাদিউজ্জামান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা সে সময় কিন্তু একটি ছোট স্যাম্পল নিয়ে কাজ করেছি। এতে বাসমালিকদের বাসের সংখ্যা বিবেচনা করা হয়নি। এই স্যাম্পল থেকে আমরা দেখতে পেয়েছি, ৮০ ভাগ মালিক বলছেন তারা সিএনজি দিয়ে গাড়ি চালান।

‘পুরো ঢাকা শহরের যত বাস চলে সবগুলোর ওপর জরিপ করা হলে যেটা আমি বলছি ৮০ ভাগ, সেটা ৫০ ভাগেও নামতে পারে।’

এর আগে ২০১০ সালে বুয়েট আরেকটি গবেষণা করেছিল, সেখানে দেখা গেছে ৭০ শতাংশ গাড়ি সিএনজিতে চলে। অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, ‘২০১০ সালে ঢাকা শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে সার্ভে করা দেখা হয়েছিল। তখন ৭০ শতাংশ গাড়ি সিএনজিচালিত তথ্য পাওয়া গেছে।’

তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালের যে গবেষণা, সেখানে আমরা অল্প স্যাম্পল নিয়েছিলাম। সেটাকেই অনেকে ভুল করে ৮০ ভাগ মনে করছে। প্রাইভেট গাড়ির ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে। ২০১০ সালে দেখেছি ৮২ ভাগ, ২০১৬ সালে এসে সেটা ৯০ ভাগে উন্নীত হয়েছে। তার মানে সবকিছুই বাড়তির দিকে। সেই হিসাবে তারা অনুমান করে নিচ্ছে এটাও (সিএনজিচালিত গণপরিবহন) ৯০ ভাগের বেশি।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরে এখন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বাস ও মিনিবাস চলাচল করে। সাড়ে ১২ হাজারের মতো অনুমোদিত বাস আছে, যা ঢাকা শহরে চলতে পারবে। এর মধ্যে সাড়ে ৫ হাজার চলছে।’

ঢাকায় সিএনজিচালিত বাস আসলে কত?

পেট্রল পাম্প ও সিএনজি স্টেশনের চিত্র কী

ঢাকায় সিএনজি ও ডিজেলচালিত বাসের সংখ্যা কেমন, সে বিষয়ে ধারণা পেতে নগরীর মিরপুর ও গাবতলী এলাকার ১৯টি পেট্রল পাম্প ও সিএনজি স্টেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা।

এর মধ্যে গাবতলী এলাকায় গ্যাস ও তেলের পাম্প ছিল আটটি ও মিরপুর এলাকার ১১টি।

গাবতলী এলাকার মোহনা ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার ইউনুস আলী নিউজবাংলাকে জানান, তাদের পাম্প থেকে প্রতিদিন গড়ে ঢাকা সিটির ১২০টি বাস তেল নেয়। একই পাম্প থেকে কোনো বাস গ্যাস নেয় না।

শাহানাজ ফিলিং স্টেশনের হেড অফ অ্যাকাউন্টস সুমন খন্দকার জানান, তাদের পাম্প থেকে প্রতিদিন আনুমানিক ১৫০ বাস তেল নেয়। এসপি ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার মাধব কর্মকার জানান, তারা প্রতিদিন আনুমানিক ১০০ বাসে তেল সরবরাহ করেন। এই ফিলিং স্টেশন থেকেও কোনো বাস গ্যাস নয় না।

যমুনা ফিলিং স্টেশন শুধু জ্বালানি তেল বিক্রি করে। এখানকার কর্মী সহিদুল জানান, তারা কোনো বাসে তেল বিক্রি করেন না। অন্যদিকে নাভানা সিএনজি স্টেশনের শিফট ইনচার্জ ইমাম হোসেন জানান, তারা সাধারণত বাসে গ্যাস সরবরাহ করেন না।

ডেনসো সিএনজি পাম্প থেকে দিশারি পরিবহনের একটি বাস গ্যাস নেয় বলে জানান ক্যাশিয়ার আকবর হোসেন। আর পূর্বাচল গ্যাস ফিলিং স্টেশনের ইঞ্জেক্টর বশির আহমেদ নিউজবাংলাকে জানান, তারা আশীর্বাদ পরিবহনের দুটি বাসে গ্যাসের জোগান দেন।

মিরপুর-১২ থেকে তালতলা পর্যন্ত আটটি গ্যাস স্টেশন ও তিনটি পেট্রল পাম্প রয়েছে।

এই এলাকার রিফুয়েলিং অ্যান্ড কনভার্সন সেন্টার থেকে শিকড়, বিহঙ্গ, আশীর্বাদ ও বিআরটিসি পরিবহনের ৫০ বাস প্রতিদিন গ্যাস নেয় বলে জানান স্টাফ মো. রুবেল। ইন্ট্রাকো সিএনজি অ্যান্ড এলপিজি থেকে সেফটি, মিরপুর লিংক, আশীর্বাদ ও বিহঙ্গ পরিবহনের ৪০টি বাস গড়ে প্রতিদিন গ্যাস নেয় বলে জানান ম্যানেজার মাসুদ।

স্ক্যামকো সিএনজি স্টেশনের সুপারভাইজার আলাউদ্দিন জানান, সেফটি, বিকল্প ও মিরপুর লিংকের তিনটি বাসে তারা গ্যাস দেন। মিনারভা সিএনজি স্টেশনের আপারেটর নজরুল ইসলাম জানান, তাদের পাম্প থেকে কোনো বাস গ্যাস নেয় না। আর ঢাকা সিএনজি লিমিটেডের ইঞ্জিনিয়ার মোক্তার হোসেন জানান, বিহঙ্গ পরিবহনের পাঁচটি বাসে তারা গ্যাস সরবরাহ করেন।

শাহজালাল সিএনজি স্টেশনের ম্যানেজার সারোয়ার হোসেন জানান, তারা পাঁচটি বাসে গ্যাস দেন। নাম প্রকাশ না করে মনি সিএনজি স্টেশনের এক কর্মী জানান, তিনটি বাস গ্যাস নেয় তাদের স্টেশন থেকে।

ঢাকায় সিএনজিচালিত বাস আসলে কত?

অন্যদিকে, সোবহান ফিলিং অ্যান্ড সারভিসিং স্টেশন থেকে প্রতিদিন ১৫টি বাসে তেল নেয় বলে জানান সুপারভাইজার মাসুদ ইসলাম। এনার্জি প্লাসের ইঞ্জিনিয়ার তাপস রায় জানান, তাদের কাছ থেকে কোনো বাস গ্যাস নেয় না। এএস ফিলিং স্টেশনের কর্মী লুৎফর রহমান জানান, তারা প্রতিদিন গড়ে চারটি বাসে তেল সরবরাহ করেন। আর তালতলা এলাকার ফাসান ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার সুজন মিয়ার হিসাবে, তাদের কাছ থেকে তেল নেয় প্রতিদিন গড়ে ১৩০টি বাস।

নিউজবাংলা যে ১৯টি পেট্রল পাম্প ও সিএনজি স্টেশনের তথ্য পেয়েছে, সেটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দুই এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৬২৮টি গাড়ি তেল ও গ্যাস নিচ্ছে। এর মধ্যে ৫১৯টি গাড়ি তেল নিচ্ছে, আর ১০৯টি নিচ্ছে সিএনজি। এই হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডিজেলচালিত গাড়ি ৮২.৬৪ শতাংশ এবং গ্যাসে চলছে ১৭.৩৬ শতাংশ বাস। তবে অনেক বাস মিশ্র জ্বালানি ব্যবহার করায় শতাংশের প্রকৃত হিসাব বের করা কঠিন।

কী বলছেন বাসমালিক-শ্রমিকেরা

ঢাকা শহরে ‘৯৫ শতাংশ বাস গ্যাসচালিত’ এমন তথ্য মানছেন না ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এনায়েত উল্লাহ।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটি একটা কাল্পনিক নিউজ। কিসের ভিত্তিতে এই নিউজ করেছে জানি না। ঢাকা শহরে গ্যাসচালিত ম্যাক্সিমাম ৫০০ গাড়ি থাকতে পারে। ঢাকায় ৯৫ শতাংশ গাড়ি ডিজেলে চলে।’

তিনি বলেন, ‘আজ থেকে ৮-১০ বছর আগে বিআরটিএর কাছে গ্যাসের গাড়ির তথ্য ছিল, পরে বেশির ভাগ বাস ডিজেলে চলে আসে। এর পরে তাদের কাছে আর তথ্য নেই। যারা ৯৫ শতাংশের কথা বলছে তারা পুরোনো রেকর্ড নিয়ে কথা বলছে।’

বাস কেন সিএনজি থেকে ডিজেলে আসে-যায়, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আট থেকে ১০ বছর আগে মানুষ গ্যাসের গাড়ির ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তখন তেলের থেকে গ্যাস বেশি সাশ্রয়ী ছিল। পরে দেখা গেল, গ্যাসের গাড়ি ছয় মাসও টেকে না, ছয় মাস পরে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। তখন অনেকেই গ্যাসের গাড়ি বিক্রি করে দিয়েছে, অনেকে গ্যাস থেকে তেলে চলে এসেছে।’

ডিজেল ও সিএনজিচালিত বাসের সংখ্যার তথ্য মালিক সমিতির কাছে আছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা সরেজমিনে চেক করা শুরু করেছি। এ বিষয়ে গতকালও (সোমবার) মিটিং ডাকা হয়েছিল। ঢাকা শহর এবং শহরতলিত ছয় হাজার বাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫০০ বাস গ্যাসে থাকতে পারে। এর বেশ কিছু ঢাকা হয়ে ঢাকার আশপাশে যায়।

‘শুধু ঢাকার ভেতরে সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার বাস হতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনও নাই। এই কাজ চলছে। ৯০ শতাংশ কাজ এগিয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার পরে সঠিক সংখ্যা জানা যাবে।’

তেলের ও গ্যাসের গাড়ির সুবিধা-অসুবিধা জানতে চাইলে শিকড় পরিবহনের চালক আফির উদ্দিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গ্যাসে বাস চালালে ছয় মাস পরপর ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। গ্যাস তো শুকনা জিনিস, তাই ইঞ্জিন ডাউন হয়। গ্যাসের গাড়ি বন্ধ হয়ে গেলে সহজে স্টার্ট করা যায় না। তেলের গাড়ি সহজে স্টার্ট করা যায়। এ ছাড়া হঠাৎ করে গ্যাস ফুরিয়ে গেলে ওই গাড়ি গ্যারেজে আনা যায় না। সব জায়গায় গ্যাসও পাওয়া যায় না, ফলে গাড়ি টেনে আনতে হয়।’

প্রজাপতি পরিবহনের চালক, মো. আজিজ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গাড়ির জন্মই তেলে চলার জন্য। আমরা তারে মডিফাই করে গ্যাসের গাড়ি বানাই। ১৫ সালের পরের মডেলের বাস সব তেলের। এর আগে গ্যাসের কম দাম ছিল তাই মানুষ গ্যাসে গাড়ি চালাইছে। গ্যাস শুকনা বলে গাড়ির ক্ষতি হয়। যখন মানুষ বুঝতে পারছে গ্যাসে চালালে গাড়ির ইঞ্জিন দুই দিন পরপর নষ্ট হয়, তখন আবার তেলে চলে আসছে। এখন ঢাকার প্রায় সব গাড়ি তেলে চলে। ঢাকার বাইরে কিছু গাড়ি গ্যাসে চলে।’

রজনীগন্ধা বাসের চালক বাকের মিয়া বলেন, ‘ইঞ্জিন ভালো থাকে তেলে। তা ছাড়া মাইলের হিসাব করলে তেল আর গ্যাসের দামে আহামরি তেমন পার্থক্য হয় না। তাই সেধে কেউ আর গাড়ির ইঞ্জিন নষ্ট করে না।’

আরও পড়ুন:
সাংবাদিকদের এড়িয়ে গেল ইউজিসির তদন্ত দল
গোপনে স্কুলভবন বিক্রির অভিযোগ
৩১ কোটি টাকা আত্মসাৎ: বহিষ্কৃত আ. লীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ
মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ
দুদক গঠনে বাছাই কমিটি

শেয়ার করুন

চোর সন্দেহে আটক ইকবালকে পাগল ভেবে ছেড়ে দেয় পুলিশ

চোর সন্দেহে আটক ইকবালকে পাগল ভেবে ছেড়ে দেয় পুলিশ

কক্সবাজারের চকরিয়ায় চোর সন্দেহে আটক ইকবাল (বামে)। ছবি: নিউজবাংলা

চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) জুয়েল ইসলাম বলেন, ১৭ অক্টোবর রাতে চকরিয়া থেকে রমজান নামে এক ব্যক্তি ৯৯৯ ফোন দেন। ফোনে ওই ব্যক্তি জানান, চোর সন্দেহে একজনকে আটক করেছেন তারা। পুলিশ সেখানে গিয়ে তার নাম জানতে চাইলে তিনি জানান ইকবাল হোসেন, বাড়ি কুমিল্লা। পাগল ভেবে রাত ১১টার দিকে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।’

কুমিল্লা নগরের নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন কক্সবাজারে গ্রেপ্তার হন ২১ অক্টোবর। কিন্তু এর চার দিন আগে চকরিয়ায় চোর সন্দেহে তাকে আটক করেন স্থানীয়রা। পরে পাগল ভেবে তাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

অভিযুক্ত ইকবাল হোসেনের নতুন একটি ভিডিও সম্প্রতি নিউজবাংলার হাতে আসে। সেই ভিডিওর সূত্র ধরে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এসব তথ্য।

প্রায় ৩০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, চকরিয়ার একটি এলাকায় হাঁটুর ওপর হাত রেখে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছেন ইকবাল। তাকে ঘিরে কয়েকজন কথা বলছেন।

ভিডিওতে ইকবালের পরিচয় জানতে চান এলাকাবাসী। ইকবাল তাদের নিজের নাম ও একটি মোবাইল ফোন নম্বর দেন।

এ সময় তার পরনে ছিল জলপাই রঙের টি-শার্ট ও ছাই রঙের প্যান্ট। ডান কাঁধের ওপর ছিল ভাঁজ করে রাখা একটি চেক গামছা।

ভিডিওটি কবে, কে কোথায় করেছেন তা জানার চেষ্টা করেছে নিউজবাংলা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লায় সহিংসতার ঠিক চার দিন পর অর্থাৎ ১৭ অক্টোবর কক্সবাজারের চকরিয়ায় একজনের মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয় ভিডিওটি।

চকরিয়ায় ইকবালকে যারা আটক করেছিলেন তাদের একজন মো. রমজান। তিনি নিউজবাংলাকে জানান, ১৭ অক্টোবর রাতে চকরিয়া শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে খুটাখালীর একটি বাড়িতে ঢোকেন এক যুবক। ওই বাড়ির লোকজন ও স্থানীয়রা তাকে চোর ভেবে আটকে রাখেন। তখন তার হাতে গামছা পেঁচানো একটি কোরআন শরিফ ছিল।

যাচাই করে তারা নিশ্চিত হন কোরআন শরিফটি তাদের নয়। তখন প্রশ্ন করা হয়, এটি তিনি কোথায় পেয়েছেন। জবাবে যুবক জানান, তার নানা এটি তাকে পড়তে দিয়েছেন।

রমজান দাবি করেন, কুমিল্লায় সহিংসতার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ইকবালের ছবি তখনও ফেসবুকে ভাইরাল হয়নি। ফলে তারা জানাতে পারেননি এই যুবকই সেই ইকবাল।

ইকবালকে চাচাতো ভাইয়ের বাড়িতে আটকে রাখেন রমজান। সেখানে কেউ একজন ওই ভিডিওটি ধারণ করেন বলে জানান তিনি। রমজান বলেন, ‘আটক ইকবালের তথ্য দিতে আমি জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করি। তখন আমার সঙ্গে কথা হয় চকরিয়া থানার ডিউটি অফিসার মঈন উদ্দিনের।’

চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) জুয়েল ইসলাম নিউজবাংলাকে এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ১৭ অক্টোবর রাতে চকরিয়া থেকে রমজান নামে এক ব্যক্তি ৯৯৯ ফোন দেন। ফোনে ওই ব্যক্তি জানান, চোর সন্দেহে একজনকে আটক করেছেন তারা। পুলিশ সেখানে গিয়ে তার নাম জানতে চাইলে তিনি জানান ইকবাল হোসেন, বাড়ি কুমিল্লা।

পাগল ভেবে রাত ১১টার দিকে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এর আগে তার কাছ থেকে নেয়া হয় কোরআন শরিফ ও গামছা। যাওয়ার আগে ইকবালকে দেয়া হয় একটি শার্ট।

ইকবালকে ২১ অক্টোবর যখন সুগন্ধা বিচ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়, তখন তার পরনে ওই চেকশার্ট ছিল। গ্রেপ্তারের পর ইকবালকে নেয়া হয় কুমিল্লায়।

কুমিল্লায় সহিংসতার ঘটনা তদন্ত করছেন এমন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ১৩ অক্টোবর বেলা সাড়ে ৩টায় কর্ণফুলী ট্রেনে কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামে যান ইকবাল। সারা রাত চট্টগ্রাম স্টেশন ও আশপাশের এলাকায় কাটিয়ে দেন। পরদিন একটি ট্রাকে উঠে চকরিয়ায় নামেন।

সেখানে একটি মাদ্রাসা থেকে কোরআন শরিফ নেন। সন্ধ্যার দিকে কোরআন বের করে একটি বাড়ির সামনে পড়ছিলেন। চারপাশে মানুষের ভিড় জমে। তবে তখন ইকবালের ছবি ভাইরাল হয়নি। ফলে লোকজন জানতে পারেনি এই ব্যক্তিকে।

দুর্গাপূজায় সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর ভোরে কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা।

নানুয়ার দিঘির পাড়ের ওই মণ্ডপে চলে ব্যাপক ভাঙচুর, আক্রান্ত হয় নগরীর আরও বেশ কিছু পূজামণ্ডপ। পরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়।

যেখান থেকে সাম্প্রদায়িক এই সহিংসতার শুরু, সেই নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে কীভাবে উত্তেজনার শুরু এবং মূল মণ্ডপের বাইরে পূজার থিম হিসেবে রাখা হনুমানের মূর্তির ওপর পবিত্র কোরআন শরিফ কী করে এলো, সে বিষয়ে টানা অনুসন্ধান চালায় নিউজবাংলা।


পূজার আয়োজক, এলাকাবাসী, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার আগের রাত আড়াইটা পর্যন্ত মন্দিরে পূজাসংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি ছিল। এরপর ১৩ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৬টার দিকে দুজন নারী ভক্ত মণ্ডপে এসে হনুমানের মূর্তিতে প্রথম কোরআন শরিফটি দেখতে পান।

পূজার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন দিঘির পাড়ের বাসিন্দা তরুণ কান্তি মোদক। স্থানীয়রা তাকে মিথুন নামে চেনেন। মিথুন নিউজবাংলাকে জানান, রাত আড়াইটা পর্যন্ত তিনি মণ্ডপে ছিলেন। তখন পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। এরপর তিনি নৈশপ্রহরী শাহিনের কাছে মণ্ডপের নিরাপত্তার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বাসায় ফেরেন। সহিংসতার পর নৈশপ্রহরী শাহিনকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

নিউজবাংলার হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সহিংসতার আগের রাতে শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরি (রা.)-এর মাজারের মসজিদ থেকে একটি কোরআন শরিফ নিয়ে পাশের নানুয়ার দিঘির পাড়ের মণ্ডপে উদ্দেশে রওনা হন ইকবাল।

এর প্রায় এক ঘণ্টা পরের আরেকটি ফুটেজে মণ্ডপে রোরআন রেখে হনুমানের গদা হাতে ইকবালকে ফিরতে দেখা যায়।


তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের যে অস্থায়ী পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়া যায়, সেখানে শুরুতে প্রবেশে ব্যর্থ হয়েছিলেন প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন। এরপর তিনি গিয়েছিলেন ওই মণ্ডপ থেকে কিছুটা দূরে দিগম্বরীতলার গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরে।

মন্দিরটির গেটের তালা লাঠি দিয়ে ভাঙতে ব্যর্থ হন ইকবাল। এরপর আবার ফিরে আসেন নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে। এ সময় পূজাসংশ্লিষ্টদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে তিনি কোরআন শরিফটি হনুমানের ওপর রাখেন। মসজিদ থেকে বের হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর কোরআন রেখে হনুমানের গদা হাতে ফিরে আসেন ইকবাল।

৩০ বছর বয়সী ইকবাল হোসেন কুমিল্লা নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের দ্বিতীয় মুরাদপুর-লস্করপুকুর এলাকার নূর আহম্মদ আলমের ছেলে। নূর আলম পেশায় মাছ ব্যবসায়ী। ইকবালকে ২১ অক্টোবর কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

আরও পড়ুন:
সাংবাদিকদের এড়িয়ে গেল ইউজিসির তদন্ত দল
গোপনে স্কুলভবন বিক্রির অভিযোগ
৩১ কোটি টাকা আত্মসাৎ: বহিষ্কৃত আ. লীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ
মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ
দুদক গঠনে বাছাই কমিটি

শেয়ার করুন

কারমাইকেলে না পড়েও ছাত্রলীগ কমিটিতে সৈকত

কারমাইকেলে না পড়েও ছাত্রলীগ কমিটিতে সৈকত

পীরগঞ্জে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় অভিযুক্ত সৈকত মণ্ডল রংপুর কারমাইকেল কলেজের ছাত্রলীগ নেতা। সহিংসতার পর তাকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ছবি: নিউজবাংলা

পরে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে এখন বলা হচ্ছে, কারমাইকেল কলেজের দর্শন বিভাগের কমিটিতে পদ পেতে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন সৈকত মণ্ডল। রংপুর মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আসিফ হোসেন নিউজবাংলার কাছে স্বীকার করেছেন, সৈকত রংপুর সরকারি কলেজের ছাত্র। তিনি সংগঠনে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলেও দাবি করেছেন আসিফ।

রংপুরের পীরগঞ্জে হিন্দু অধ্যুষিত একটি গ্রামে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ‘হোতা’ হিসেবে রংপুরের কারমাইকেল কলেজের সদ্য সাবেক যে ছাত্রলীগ নেতার নাম এসেছে, তিনি ওই কলেজের ছাত্রই ছিলেন না।

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে অভিযুক্ত সৈকত মণ্ডল কারমাইকেল কলেজে সংগঠনটির দর্শন বিভাগের কমিটির ১ নম্বর সহসভাপতির দায়িত্বে থাকলেও তিনি আসলে রংপুর সরকারি কলেজের ছাত্র।

বিষয়টি ধরা পড়ার পর ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে এখন বলা হচ্ছে, কারমাইকেল কলেজের দর্শন বিভাগের কমিটিতে পদ পেতে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন সৈকত মণ্ডল।

রংপুর মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আসিফ হোসেন নিউজবাংলার কাছে স্বীকার করেছেন, সৈকত রংপুর সরকারি কলেজের ছাত্র। তিনি সংগঠনে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলেও দাবি করেছেন আসিফ।

কারমাইকেলে না পড়েও ছাত্রলীগ কমিটিতে সৈকত
সৈকতকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ দাবি করে রংপুর মহানগর ছাত্রলীগের দেয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

সৈকত দর্শন বিভাগের যে কমিটিতে ছিলেন, সেটি ২০১৭ সালের ৮ আগস্ট অনুমোদন দেন কারমাইকেল কলেজ শাখার সভাপতি সাইদুজ্জামান সিজার ও সাধারণ সম্পাদক জাবেদ আহমেদ। এ সংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তির অনুলিপি পেয়েছে নিউজবাংলা।

কারমাইকেল কলেজ ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সভাপতি সাইদুজ্জামান সিজারের দাবি, সৈকত নিয়মিত কারমাইকেল কলেজে আসতেন এবং ক্লাস করতেন। তাই দর্শন বিভাগের কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন।

তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখে যায়, সৈকত রংপুর সরকারি কলেজের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের দর্শন বিভাগের ছাত্র। তার রোল নম্বর-৯১০২৪০৯ ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর-১৫২১৭১১২৩৯২। কলেজ কোড-৩২০৭। ২০১৯ সালের চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় তিনি জিপিএ ৩ দশমিক ১ শূন্য পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন।

কারমাইকেল কলেজের দর্শন বিভাগের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করে নিউজবাংলাকে বলেন, কারমাইকেল কলেজে সৈকতের সরব উপস্থিতি ছিল। যেকোনো কাজে সবার আগে উপস্থিত থাকতেন তিনি। তার দাপটে অন্যরা ছিলেন কোণঠাসা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর চূড়ান্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রে এক কলেজের শিক্ষার্থীদের সিট সাধারণত অন্য কলেজে পড়ে। এই হিসেবে রংপুর সরকারি কলেজের পরীক্ষার্থীদের সিট পড়ে থাকে কারমাইকেল কলেজে।

২০১৭ সালে স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষার সময় কারমাইকেল কলেজের তৃতীয় ভবনের ২০৮ নম্বর কক্ষে রংপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষা দেন সৈকত। তখন প্রথমবারের মতো কারমাইকেল কলেজের শিক্ষক-কর্মকর্তার কাছে সৈকতের প্রকৃত পরিচয় ধরা পড়ে। তবে ছাত্রলীগ নেতা হওয়ায় বিষয়টি সবাই চেপে যান।

কারমাইকেল কলেজের দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান বশিরুল হাসান সরকার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘তিনি (সৈকত) এখানকার ছাত্র না। কখনও ক্লাসে দেখিনি। তবে তিনি এখানে খুব ঘোরাঘুরি করতেন। তার রেজাল্ট শিটে দেখেছি তিনি রংপুর সরকারি কলেজের ছাত্র।’

রপুরের পীরগঞ্জে হিন্দুপল্লিতে গত ১৭ অক্টোবরের হামলার পর র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন সৈকত মণ্ডল। এরপর সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘সৈকত মণ্ডলই এ ঘটনার হোতা। টঙ্গী থেকে শুক্রবার রাতে সৈকত ও তার সহযোগী রবিউল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অরাজকতা তৈরি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের লক্ষ্যে হামলা-অগ্নিসংযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং মাইকিং করে হামলাকারীদের জড়ো করেন বলে জানিয়েছেন। সৈকত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক, বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যাচারের মাধ্যমে স্থানীয় জনসাধারণকে উত্তেজিত করে তোলেন। এ ছাড়া তিনি ওই হামলা ও অগ্নিসংযোগে অংশ নিতে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করেন।’

গ্রেপ্তার হওয়ার পর সৈকত ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ স্বীকার করেছেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত।

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, সৈকতের বাবা রাশেদুল ইসলাম রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় না থাকলেও দাদা আবুল হোসেন মণ্ডল রামনাথপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং তার চাচা রেজাউল করিম রামনাথপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৬ নম্বর ইউনিটের সভাপতি।

রংপুর মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি শফিউর রহমান স্বাধীন ও শেখ আসিফ হোসেনের সই করা একটি বিজ্ঞপ্তি পেয়েছে নিউজবাংলা। এতেও উল্লেখ করা হয়, সৈকত মণ্ডল রংপুর সরকারি কলেজের ছাত্র।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘একটি কুচক্রী মহল উক্ত ব্যক্তিকে (সৈকত) বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে গুজব ও অপপ্রচার করার চেষ্টা করছে। মূলত সে তার ছাত্রত্ব পরিচয় গোপন রেখে ছাত্রলীগ কারমাইকেল কলেজ শাখার আওতাভুক্ত দর্শন বিভাগ শাখার সহসভাপতি পদে কৌশলে অনুপ্রবেশ করে। কারমাইকেল কলেজ শাখার তৎকালীন সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক অনেক আগেই তথ্য গোপন ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে।

‘বিভিন্ন রকম বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সংগঠনে অনুপ্রবেশ করে ষড়যন্ত্র করাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। এমন অনুপ্রবেশকারী অপরাধীর দায় সংগঠনের হতে পারে না।’

কারমাইকেলে না পড়েও ছাত্রলীগ কমিটিতে সৈকত
সৈকতকে কারমাইকেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে

রংপুর মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আসিফ হোসেন বিজ্ঞপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রেসরিলিজ আমরা দিয়েছি। সৈকত কারমাইকেলে কলেজের ছাত্র নন। তিনি কৌশলে ভুল তথ্য দিয়ে প্রবেশ করেছেন। তিনি অনুপ্রবেশকারী। কলেজ কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় আমরা কমিটির বিলুপ্ত করেছি। সৈকত রংপুর সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের ছাত্র, কিন্তু রংপুর কলেজ ছাত্রলীগে তার কোনো নাম নেই।’

কারমাইকেলে না পড়েও ছাত্রলীগ কমিটিতে সৈকত
সৈকতকে নিয়ে বিতর্কের পর বিলুপ্ত করা হয়েছে কারমাইকেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের কমিটি

কারমাইকেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের (সদ্য বিলুপ্ত) সভাপতি সাইদুজ্জামান সিজার জানান, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে সৈকতকে ১৮ অক্টোবর সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

কীভাবে সৈকত পদ পেল, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সে (সৈকত) তো নিয়মিত কলেজে ক্লাস করেছিল। কলেজেই থাকত। তাই সে কমিটিতে স্থান পেয়েছে।’

আরও পড়ুন:
সাংবাদিকদের এড়িয়ে গেল ইউজিসির তদন্ত দল
গোপনে স্কুলভবন বিক্রির অভিযোগ
৩১ কোটি টাকা আত্মসাৎ: বহিষ্কৃত আ. লীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ
মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ
দুদক গঠনে বাছাই কমিটি

শেয়ার করুন

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস-শিক্ষার্থী কিছুই নেই, জনবল প্রায় ২০০

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস-শিক্ষার্থী কিছুই নেই, জনবল প্রায় ২০০

সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কার্যক্রম না থাকলেও তিন বছরে ১৭২ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে সবাই নিয়োগ পেয়েছেন এডহক ভিত্তিতে। অভিযোগ আছে, সরকারের নির্দেশনার পরোয়া না করে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বেশির ভাগ নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে।

দেশের চতুর্থ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২০১৮ সালে কার্যক্রম শুরু হয় সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের। প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ক্যাম্পাসের জন্য দক্ষিণ সুরমায় ১০০ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। ফলে শুরু হয়নি শিক্ষা কার্যক্রমও।

তেমন কোনো কার্যক্রম না থাকলেও তিন বছরে ১৭২ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে ফেলেছে এই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে সবাই নিয়োগ পেয়েছেন এডহক ভিত্তিতে। অভিযোগ আছে, সরকারের নির্দেশনার পরোয়া না করে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বেশির ভাগ নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে।

নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকের যোগ্যতা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দ্বিতীয় শ্রেণির এক কর্মকর্তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এডহক ভিত্তিতে এ ধরনের নিয়োগকে সম্পূর্ণ অবৈধ বলছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কর্মকর্তারা।

ইউজিসির সচিব ড. ফেরদৌস জামান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এডহক ভিত্তিতে সব ধরনের নিয়োগ বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। এ ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে তিন দফা চিঠিও দেয়া হয়েছে। ফলে এডহক নিয়োগের এখতিয়ার কারও নেই। কেউ যদি দিয়ে থাকেন সেটা সম্পূর্ণ অবৈধ।’

অবশ্য ২০১৮ সালে পাস হওয়া সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আইনে রয়েছে, ‘উপাচার্য সিন্ডিকেটের পুর্বানুমোদনক্রমে কোনো শূন্য পদে সম্পূর্ণ অস্থায়ীভাবে অনধিক (৬ মাসের) জন্য কিছু পদে নিয়োগ করিতে পারিবেন। এবং প্রয়োজনে উক্তরূপ নিয়োগের মেয়াদ ৬ মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করিতে পারবেন। ...শর্ত থাকে যে, বর্ধিত মেয়াদের মধ্যে নিয়োগ নিয়মিত করা না হলে উক্ত মেয়াদ শেষে নিয়োগ বাতিল করা হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে।’

এ আইনে সিন্ডিকেটের পুর্বানুমোদনক্রমে ও সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য অস্থায়ীভাবে নিয়োগের কথা উল্লেখ রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস-শিক্ষার্থী কিছুই নেই, জনবল প্রায় ২০০


তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের কোনো পুর্বানুমোদন নেয়া হয়নি। এই প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেট বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে সোমবার দুপুর ২টায়। এ ছাড়া গত তিন বছর ধরে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত কাউকেই স্থায়ী করা হয়নি।

এডহক ভিত্তিতে নিয়োগের কথা স্বীকার করে সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজন মেটাতে এডহক ভিত্তিতে শ’খানেক লোক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বেশির ভাগই কর্মচারী পদে নিয়োগ পেয়েছেন। যথাযথ নিয়ম মেনেই তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’

নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন

২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর ডা. মোর্শেদ আহমদ চৌধুরীকে সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হয়। এর আগে তিনি ছিলেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ।

ডা. মোর্শেদ অধ্যক্ষ থাকার সময়ে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন আব্দুস সবুর। দ্বিতীয় শ্রেণির এই কর্মকর্তাকে প্রথম শ্রেণির ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী পরিচালক (অর্থ) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া একজনের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ১.৬০, যা তৃতীয় শ্রেণির সমমর্যাদার। নিয়োগবিধি অনুসারে, কোনো পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণিপ্রাপ্ত কাউকে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেয়া যায় না।

কেবল এই দুজনই নয়, সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও অনেকের নিয়োগের ক্ষেত্রেই গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যোগ্যতা শিথিল করে নিয়োগ দেয়া হয়েছে অনেককে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীদের যোগ্যতার উল্লেখের নিয়ম থাকলেও তা অনুসরণ করেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস-শিক্ষার্থী কিছুই নেই, জনবল প্রায় ২০০

রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে নিয়োগের পাশাপাশি উপাচার্যের কয়েক স্বজনকেও নিয়োগ দেয়া হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে।

স্বজনদের নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে উপাচার্য ডা. মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দুজন স্বজন নিয়োগ পেয়েছেন। তবে তারা যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ পেয়েছেন। বাকিদেরও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।’

শিক্ষার্থী নেই, জনবল অফুরন্ত

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় ১০ হাজার। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা আছেন ২৬৪ জন। অন্যদিকে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থীর সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা আছেন ১৪৯ জন।

অথচ সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী না থাকলেও ইতোমধ্যে সেখানে শ’খানেক কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে পরিচালক পদে এক জন, উপ পরিচালক পদে এক জন, সহকারি পরিচালক পদে ছয় জন, সেকশন অফিসার পদে ৯ জন ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পেয়েছেন ৫২ জন। এছাড়া কর্মচারী পদেও শ’খানেক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এত জনবল থাকা সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ভবনের নির্মাণ কাজই এখনও শুরু হয়নি। ভবন নির্মাণের জন্য ডিপিপি পাঠানো করা হলেও তা এখনও অনুমোদন পায়নি। ভবন নির্মাণ ও শিক্ষাকার্যক্রম শুরুর চেয়ে জনবল নিয়োগেই গত তিন বছর ধরে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বর্তমানে নগরীর চৌহাট্টায় উপাচার্যের কার্যালয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই ছোট্ট কার্যালয়ে এতো বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বসার জায়গাও নেই। প্রশাসনিক বিভিন্ন পদে লোকবল নিয়োগ দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেজিস্ট্রার পদটি শূন্য রয়েছে।

তবে রেজিস্ট্রারের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) মো. নঈমুল হক চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষাকার্যক্রম শুরু না হলেও আমাদের আওতাধীন মেডিক্যাল কলেজ ও নার্সিং কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়কেই দেখভাল করতে হয়। এজন্য অনেক লোকবলের প্রয়োজন হয়।

‘আট জন ডিনের প্রত্যেকের জন্য পাঁচ জন স্টাফ প্রয়োজন। এসব জরুরি প্রয়োজন মেটাতেই যথাযথ নিয়ম মেনে লোকবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’

এডহক ভিত্তিতে নিয়োগে সরকারি নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি দাবি করেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞা পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য। নতুনদের জন্য নয়। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে উপাচার্য জরুরি প্রয়োজনে নিয়োগ দিতে পারেন।’

রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় আমাদের এখানে অনেক রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের তদবির রয়েছে। এগুলো এড়ানো যায় না। তবে এই তদবিরের মধ্যে যাদের যোগ্যতা রয়েছে এবং আমাদের চাহিদা পুরণ করতে পেরেছেন তাদেরকেই নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’

এ পর্যন্ত কতজনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১৩৫/১৩৬ জনের মতো জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যককে গত জানুয়ারিতে স্থায়ী করা হয়। বাকিদের চাকরিও স্থায়ীকরণের প্রক্রিয়া চলছে।’

সিন্ডিকেটের পুর্বানুমোদন ছাড়া কীভাবে চাকরি স্থায়ী করা হলো, এমন প্রশ্ন করতেই তিনি ‘উপাচার্য মহোদয় আমাকে কল দিয়েছেন’ বলে ফোন রেখে দেন।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস-শিক্ষার্থী কিছুই নেই, জনবল প্রায় ২০০

সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সদস্য সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিলুর রহমান।

সিন্ডিকেটের বৈঠকের আগে এত জনবল নিয়োগ পাওয়ার প্রসঙ্গে রোববার তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। সোমবার সিন্ডিকেটের বৈঠক আছে। ব্যস্ততার কারণে বৈঠকের আলোচ্যসূচিও এখন পর্যন্ত আমি দেখতে পারিনি। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।’

এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দিলে ফান্ড বন্ধ

‘স্ট্র্যাটিজিক প্ল্যান ফর হায়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ: ২০১৮-৩০’ বাস্তবায়ন মনিটরিংয়ের লক্ষ্যে ইউজিসি পর্যায়ে গঠিত কমিটির এক বৈঠক হয় গত জুনে। সেই বৈঠকে পাবলিক বিশ্বদ্যালয়গুলোতে এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ইউজিসির কর্মকর্তারা। এডহক ও মাস্টার রোলে নিয়োগ দেয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ড বন্ধের বিষয়েও আলোচনা হয় সেখানে।

ওই বৈঠকে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক দিল আফরোজা বলেন, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এডহক ও মাস্টার রোলে নিয়োগ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। যদি কেউ ইউজিসির নির্দেশনা অমান্য করে তবে তার ফান্ড বন্ধ করে দেয়া হবে।’

সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এডহক ভিত্তিতে বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের তথ্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এত বিপুলসংখ্যক লোক এডহক ভিত্তিকে নিয়োগ হয় কী করে!’

তিনি বলেন, ‘এডহক ভিত্তিতে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে সবখানেই প্রশ্ন আছে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এত লোকবল এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে পারে না। আমরা বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।’

আরও পড়ুন:
সাংবাদিকদের এড়িয়ে গেল ইউজিসির তদন্ত দল
গোপনে স্কুলভবন বিক্রির অভিযোগ
৩১ কোটি টাকা আত্মসাৎ: বহিষ্কৃত আ. লীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ
মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ
দুদক গঠনে বাছাই কমিটি

শেয়ার করুন

কুমিল্লায় ‘প্রতিমা ভাঙা বাবু’র বাসায় ৩ তালা

কুমিল্লায় ‘প্রতিমা ভাঙা বাবু’র বাসায় ৩ তালা

নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে প্রথম প্রতিমা ভাঙার অভিযোগ উঠেছে মঈনুদ্দীন আহমেদ বাবুর বিরুদ্ধে, বাঁয়ে তার তালাবদ্ধ বাসা। ছবি: নিউজবাংলা।

মঈনুদ্দীন আহমেদ বাবু সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর পিএস হিসেবে পরিচিত। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাক্কু ১৩ অক্টোবর সকালে মণ্ডপে হামলার সময় ঘটনাস্থলেই ছিলেন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। হামলার সময় পুলিশ বাবুকে গ্রেপ্তার করতে গেলে সাক্কু তাকে নিজের পিএস পরিচয় দিয়ে ছাড়িয়ে নেন।

কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ পাওয়ার পর সহিংসতা শুরুর জন্য মঈনুদ্দীন আহমেদ বাবু নামের এক ব্যক্তিকে দায়ী করছেন এলাকাবাসী ও মণ্ডপসংশ্লিষ্টরা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক বাহিনীর কর্মকর্তারাও বলছেন, মণ্ডপে কোরআন রাখায় ইকবাল হোসেন প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি হলেও ১৩ অক্টোবর সকালে সহিংসতা ছড়িয়ে দিতে তৎপর ছিলেন বেশ কয়েকজন। তাদের মধ্যে মঈনুদ্দীন আহমেদ বাবু অন্যতম।

বাবু সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর পিএস হিসেবে পরিচিত। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাক্কু ১৩ অক্টোবর সকালে মণ্ডপে হামলার সময় ঘটনাস্থলেই ছিলেন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। হামলার সময় পুলিশ বাবুকে গ্রেপ্তার করতে গেলে সাক্কু তাকে নিজের পিএস পরিচয় দিয়ে ছাড়িয়ে নেন। বাবু সহিংসতায় উসকানি দিচ্ছেন এমন একটি ভিডিও পেয়েছে নিউজবাংলা।

অভিযুক্ত বাবুকে দুদিন ধরে তার এলাকায় দেখা যাচ্ছে না। নগরীর ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের মৌলভীপাড়ায় তার পৈত্রিক বাড়িতে গিয়ে গেটে তিনটি তালা ঝুলতে দেখা গেছে।

প্রতিবেশীরা জানান, বাবু তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে রোববার ভোরে বাসা থেকে বের হয়ে যান। এরপর থেকেই তালা ঝুলছে তার বাসায়। বাবুর এক আত্মীয় নিউজবাংলার কাছে দাবি করেন, রোববার সন্ধ্যায় তাকে আটক করে নিয়ে গেছে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কুমিল্লায় ‘প্রতিমা ভাঙা বাবু’র বাসায় ৩ তালা
কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার পর চলে ভাঙচুর

মণ্ডপে সহিংসতার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন নিউজবাংলার কাছে অভিযোগ করেন, কোরআন পাওয়া নিয়ে উত্তেজনা শুরুর পর বাবু প্রথম একটি প্রতিমা ভাঙচুর করেন। এরপরেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় পরিস্থিতি।

নানুয়ার দিঘির পাড়ের ওই মণ্ডপে চলে ব্যাপক ভাঙচুর, আক্রান্ত হয় নগরীর আরও বেশকিছু পূজামণ্ডপ। পরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়।

ইতোমধ্যে মণ্ডপে কোরআন রাখার দায় স্বীকার করেছেন প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন। একই ঘটনায় জড়িত অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন মণ্ডপ থেকে ৯৯৯-এ ফোন করা রেজাউল হোসেন ইকরাম, হুমায়ুন কবির ও ফয়সাল হোসেন নামের তিনজন। এদের মধ্যে হুমায়ুন ও ফয়সাল স্থানীয় দারোগাবাড়ী মাজার মসজিদের সহকারী খাদেম। ওই মসজিদ থেকেই কোরআন নিয়ে পাশের পূজামণ্ডপে রাখা হয়ে। এই চারজনকেই সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।

কুমিল্লায় ‘প্রতিমা ভাঙা বাবু’র বাসায় ৩ তালা
মণ্ডপ থেকে ৯৯৯-এ ফোন করা রেজাউল হোসেন ইকরাম

এ ছাড়া ঘটনার দিন সকালে মণ্ডপ থেকে ফেসবুকে লাইভ করা ফয়েজকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা নিউজবাংলাকে বলেন, তারা মনে করছেন, একটি চক্র মণ্ডপে কোরআন রাখতে ইকবালকে এবং সেটি প্রশাসনকে জানাতে ইকরামকে সরাসরি ব্যবহার করেছিল। তবে ১৩ অক্টোবর সহিংসতার পেছনে আরও অনেকের ভূমিকা আছে। তাদের সঙ্গে ইকবাল ও ইকরামকে ব্যবহার করা চক্রের সম্পর্ক আছে কি না, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

কুমিল্লা শহরজুড়ে সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলেও মনে করছেন তদন্তকারীরা।

সহিংসতায় রাজনীতিসংশ্লিষ্টদের উপস্থিতির তথ্য দিয়েছেন এলাকাবাসী ও পূজামণ্ডপসংশ্লিষ্টরাও।

কুমিল্লা জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্মল পাল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনার দিন সকালে ওই মণ্ডপে কোরআন পাওয়ার পর প্রথমেই পূজা বন্ধ করে দেয়া ও মণ্ডপ সরিয়ে দেয়ার দাবি তোলেন মঈনুদ্দীন আহমেদ বাবু নামের একজন। তার এই দাবিতে সমর্থন জানান উপস্থিত উত্তেজিত জনতা। একপর্যায়ে বাবু নিজে পূজায় ব্যবহৃত একটি ডাব ছুড়ে মণ্ডপের একটি প্রতিমার মাথা ভেঙে ফেলেন। এরপরেই শুরু হয় সহিংসতা।’

স্থানীয় বাসিন্দা ও মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অচিন্ত্য দাস টিটুও নিউজবাংলাকে একই তথ্য দেন।

স্থানীয় বেশ কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, উত্তেজনা শুরুর পর ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন বিএনপি থেকে সিটি মেয়র নির্বাচিত মনিরুল হক সাক্কু। অভিযুক্ত বাবু তার পিএস হিসেবে পরিচিত। হামলা শুরুর পর পুলিশ বাবুকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করলেও সাক্কু তাকে ছাড়িয়ে নেন।

কুমিল্লায় ‘প্রতিমা ভাঙা বাবু’র বাসায় ৩ তালা
নগরীর ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের মৌলভীপাড়ায় বাবুর পৈত্রিক বাড়িতে ঝুলছে তালা

এলাকাবাসী জানান, নানুয়ার দিঘির পাড়েই মেয়র সাক্কুর বাসা। তিনি ঘটনাস্থলে এলেও বিএনপি সমর্থকেরা দিঘির দুই প্রান্তে জড়ো হয়ে উত্তেজনা ছড়াতে থাকেন। এ সময় যুবলীগের আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ সহিদ মেয়র সাক্কুকে তার সমর্থকদের শান্ত করার অনুরোধ জানান। এরপর সাক্কু তার একজন কর্মীকে ফোন করে বিক্ষুব্ধদের শান্ত করতে বলেছিলেন, তবে মাঠে এর কোনো প্রভাব দেখা যায়নি।

মেয়র সাক্কুর নির্দেশের পরও দলের কর্মীরা কেন উত্তেজনা কমাতে তৎপর হলেন না- জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক কর্মী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটা আমরা কেন সামাল দেব, সরকারি দলের লোকেরা কী করে? তাছাড়া এসব ঝামেলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তো পুলিশের।’

বাবুকে নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর সঙ্গে সরাসরি এবং ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে নিউজবাংলা। তবে তাকে পাওয়া যায়নি, জানা গেছে তিনি এখন কুমিল্লায় নেই। সাক্কুর অনুসারীরা জানান, তিনি ওমরাহ পালনে সৌদি আরব গেছেন।

কুমিল্লায় ‘প্রতিমা ভাঙা বাবু’র বাসায় ৩ তালা
কুমিল্লা সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কু

মণ্ডপে সহিংসতা ঠেকাতে আওয়ামী লীগ জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেনি বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বেশ কয়েকজন নিউজবাংলাকে জানান, সেদিন সকালে মণ্ডপ এলাকায় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত ও মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ সহিদ ছাড়া আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল আর কোনো নেতার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহিদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি সকালে ঘটনা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার সব কর্মীদের ফোন করেছি। অনেক কর্মী রাত করে ঘুমায় তাই তাদের কাউকে কাউকে ফোনে পাওয়া যায়নি। যারা ফোন ধরেছে তারা সবাই ছুটে এসেছিল, তাদের নিয়েই সংসদ সদস্য বাহাউদ্দীন বাহারের নির্দেশে আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে সাহায্য করেছি। তখন এমপি সাহেব ওমরায় থেকেও পুরো সময় আমাদের সঙ্গে টেলিফোনে যুক্ত ছিলেন।’

কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে রয়েছে দুটি পক্ষ। স্থানীয়রা জানান, কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও কুমিল্লা মহানগর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বাহাউদ্দীন বাহার এবং সংরক্ষিত ১০ নং মহিলা আসনের সংসদ সদস্য আঞ্জুম সুলতানা সীমার মধ্যে দলীয় কোন্দল বহু পুরোনো। ঘটনার দিন সীমা সমর্থক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মাঠে দেখা যায়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মণ্ডপে কোরআন রাখার মামলায় রিমান্ডে থাকা ইকরামকে বিভিন্ন সময়ে বিএনপির মিটিং-মিছিলে দেখা যেত। ইকরাম তার নিজ ওয়ার্ডের বিতর্কিত কাউন্সিলর সাইফুল বিন জলিলের একনিষ্ঠ কর্মী। ইকরামের বাসা আবার বাবুর বাসার পাশের গলিতে।

সাইফুল বিন জলিল একসময় মেয়র সাক্কুর অনুসারী হিসেবে বিএনপির রাজনীতি করলেও এক বছর আগে তিনি সংসদ সদস্য আঞ্জুম সুলতানা সীমার অনুসারী হিসেবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য সম্প্রতি সাইফুলের কাউন্সিলর পদ স্থগিত করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

ইকরামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ নিয়ে বক্তব্য জানতে সাইফুলকে একাধিবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

কুমিল্লায় ‘প্রতিমা ভাঙা বাবু’র বাসায় ৩ তালা
সংসদ সদস্য আঞ্জুম সুলতানা সীমা

অন্যদিকে, সংসদ সদস্য আঞ্জুম সুলতানা সীমা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি যখন কাউন্সিলর ছিলাম তখন সাইফুলও একজন কাউন্সিলর হিসেবে আমার কলিগ ছিল। আমি তাকে আমাদের কর্মী হিসেবেই জানি। সে আগে বিএনপি করত কি না সেটা মেয়র সাক্কু সাহেবের উত্তর দেয়া উচিত।’

সহিংসতা ঠেকাতে নিজের অনুসারীদের মাঠে না থাকার অভিযোগের বিষয়ে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি সেদিন ঢাকায় ছিলাম। ঘটনা শোনার সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনে প্রশাসনের সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে কি না তার খোঁজ রেখেছি। আমাদের কিছু কর্মীও সেখানে গিয়েছিল।’

এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সংসদ সদস্য বাহাউদ্দীন বাহার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটা খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা, আমি দেশে থাকলে এমনটা হতো না। তারপরেও প্রশাসনের সহায়তায় খুব শর্ট টাইমের মধ্যে আমরা এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। এখন কোনো সমস্যা নেই।’

কুমিল্লায় ‘প্রতিমা ভাঙা বাবু’র বাসায় ৩ তালা
সংসদ সদস্য বাহাউদ্দীন বাহার

বাবুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি নিজে মেয়রকে ফোন করে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছি, সেও গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। সেখানে তার লোক যদি ঝামেলা করে, এমনকি আমাদের কোনো লোকও যদি কোনোভাবে জড়িত থাকে তাহলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। এ ঘটনায় কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।’

কাউন্সিলর সাইফুলের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের রাজনীতির জন্য একটা লজ্জা। একজন মহিলা এমপি এই বাজে কাজটা করেছেন। আমাদের আওয়ামী লীগে যেকোনো পেশার লোক যোগ দিতে পারে, কিন্তু তার মানে এই না যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিতর্কিত কাউকে আওয়ামী লীগে জায়গা দেয়া যায়। তাছাড়া আমি হলাম কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, কাউকে আওয়ামী লীগে ঢোকাতে হলে আমার কমিটির মধ্য দিয়ে আসতে হবে। উনি কীভাবে বিতর্কিত একজনকে আওয়ামী লীগের ব্যানারে সমর্থন করতে পারেন তা আমার মাথায় আসে না।’

আরও পড়ুন:
সাংবাদিকদের এড়িয়ে গেল ইউজিসির তদন্ত দল
গোপনে স্কুলভবন বিক্রির অভিযোগ
৩১ কোটি টাকা আত্মসাৎ: বহিষ্কৃত আ. লীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ
মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ
দুদক গঠনে বাছাই কমিটি

শেয়ার করুন