জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আগামী ১৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে ১০ দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে।
করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে এসব অনুষ্ঠানে সরাসরি যোগ দিতে আসছেন সার্কভুক্ত পাঁচটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান ৷ সেই সঙ্গে আরও পাঁচ রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান ভিডিওবার্তা দেবেন ৷
শুক্রবার বিকেলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী৷
তিনি জানান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ১৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত ‘মুজিব চিরন্তন’ প্রতিপাদ্যে ১০ দিনব্যাপী এ আয়োজনের সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
১০ দিনের এ আয়োজনে প্রতিদিন আলাদা থিমভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, অডিওভিজুয়াল প্রদর্শনী এবং অন্যান্য বিশেষ পরিবেশনার মাধ্যমে বঙ্গন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে।
থিমগুলো হবে- ‘ভেঙেছো দুয়ার এসেছো জ্যোতির্ময়’, ‘মহাকালের তর্জনী’, ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা’, ‘তারুণ্যের আলোকশিখা’, ‘ধ্বংসস্তূপে জীবনের গান’, ‘বাংলার মাটি আমার মাটি’, ‘নারীমুক্তি, সাম্য ও স্বাধীনতা’, ‘শান্তি-মুক্তি ও মানবতার অগ্রদূত’, ‘গণহত্যার কালরাত্রি ও আলোকের অভিযাত্রা’, এবং ‘স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর ও অগ্রগতির সুবর্ণরেখা’।
কামাল চৌধুরী জানান, এসব অনুষ্ঠানের মধ্যে ১৭ মার্চ মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ্, ১৯ মার্চ শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে, ২২ মার্চ নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারী, ২৪ মার্চ ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং এবং ২৬ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সশরীরে উপস্থিত থাকবেন৷
কামাল চৌধুরী বলেন, মহামারি পরিস্থিতিতে এই দিনগুলোতে অনুষ্ঠানস্থলে সর্বোচ্চ ৫০০ জন আমন্ত্রিত অতিথি উপস্থিত থাকতে পারবেন করোনা পরীক্ষার সনদ থাকা সাপেক্ষে। এ কারণে আমন্ত্রিতদের কোভিড পরীক্ষার জন্য ৫টি সেন্টারও নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১৭ মার্চ চীনের রাষ্ট্রপতি সি চিনপিং ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, ১৮ মার্চ কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন, ২০ মার্চ ওআইসির মহাসচিব ড. ইউসেফ আহমেদ আল-ওথাইমিন, ২২ মার্চ জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইউশিহিদে সুগা, ২৩ মার্চ ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকাভা, ২৪ মার্চ পোপ ফ্রান্সিস ও ২৫ মার্চ দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী চুং স্যু-কুয়েন ও মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি বন্ধু তাকাশি হাওয়াকাওয়ার ছেলে ওসামু হাওয়াকাওয়া ভিডিওবার্তা দেবেন।
কামাল চৌধুরী জানান, ১৭ মার্চ, ১৯ মার্চ, ২২ মার্চ, ২৪ মার্চ ও ২৬ মার্চের যে অনুষ্ঠানগুলোতে বিদেশি অতিথিরা সশরীরে উপস্থিত থাকবেন সেই অনুষ্ঠানগুলো শুরু হবে বিকেল সাড়ে চারটায়। শেষ হবে রাত আটটায়। এই দিনগুলোতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও উপস্থিত থাকবেন।
বাকি পাঁচ দিনের অনুষ্ঠান বিকেল সোয়া পাঁচটায় শুরু হয়ে রাত আটটায় শেষ হবে। এই দিনগুলোতে অনুষ্ঠানস্থলে কোনো দর্শক থাকবে না। তবে তা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
প্রতিদিনের অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে থাকবে থিমভিত্তিক আলোচনা। দ্বিতীয় পর্বে থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এ ছাড়া ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে উন্মোচন করা হবে সুবর্ণজয়ন্তীর বিশেষ লোগো। পরিবেশন করা হবে ‘মৈত্রী’ নামের একটা বিশেষ রাগ, যেটা তৈরি করছেন পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমসহ অনেকে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
আজ সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে শুরু হওয়া মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেটে অনুমোদন দেওয়া হয়।
এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রীতি অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের আগে মন্ত্রিপরিষদের এ বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভাতেই জাতীয় বাজেটের অনুমোদন দেওয়া হয়।
বিশেষ এ সভা শেষে আজ বিকেল ৩টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যোগ দেবেন। পরে অর্থমন্ত্রী সংসদে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন।
স্বাধীনতার পর এক ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ গত সাড়ে পাঁচ দশকে এক অসামান্য অর্থনৈতিক রূপান্তর প্রত্যক্ষ করেছে। ১৯৭১ সালে যেখানে শিল্প-কারখানা ও অবকাঠামো ছিল বিধ্বস্ত এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় শূন্য, সেখানে ৫৫ বছরের ব্যবধানে দেশটি এখন ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সক্ষমতা অর্জন করেছে। আজ ১১ জুন ২০২৬, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ৫৫তম বাজেট উপস্থাপন করছেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের মেয়াদে এটি তাঁর প্রথম বাজেট এবং স্বাধীনতার পর থেকে বাজেট পেশকারী ব্যক্তিদের তালিকায় তিনি ১৫তম ব্যক্তি হিসেবে নাম লিখিয়েছেন।
বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়নের ইতিহাস শুরু হয়েছিল মূলত মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই। ১৯৭১ সালের ১৯ জুলাই মুজিবনগর সরকার যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয় নির্বাহে তিন মাসের একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট অনুমোদন করেছিল। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, যার আকার ছিল মাত্র ৭১৯ কোটি টাকা। সেই বাজেটটি ছিল মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন, পুনর্বাসন এবং খাদ্যসংকট মোকাবিলা করে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে তোলার রূপরেখা। এরপর ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের সময়ে বাজেট পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে দেশ ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতকেন্দ্রিক শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের হাত ধরে। ১৯৯১ সালে তিনি ঐতিহাসিক ‘মূল্য সংযোজন কর’ বা ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করেন এবং বাজার অর্থনীতি ও বাণিজ্য উদারীকরণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করে দেন। এর পরবর্তী সময়ে অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার হাত ধরে ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে প্রথম সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে বয়স্ক ভাতা চালু হয়, যা আজ এক বিশাল আকার ধারণ করেছে। বাজেটের আকারের ক্রমবিকাশ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো বাজেট ১ লাখ কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করে এবং ২০২৬ সালে এসে তা ৯ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে এক অভাবনীয় মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
অতীতের সাফল্যের পাশাপাশি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জগুলোও এই বাজেটে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এবারের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার ফলে সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হবে। বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১২টি করে বাজেট দেওয়ার রেকর্ড গড়েছেন এম সাইফুর রহমান ও আবুল মাল আবদুল মুহিত। তবে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির চাপে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এই বাজেট বাস্তবায়নকে বড় এক কঠিন পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের এই ৫৫ বছরের বাজেট ইতিহাস কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং এটি একটি জাতির রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক দর্শনের প্রামাণ্য দলিল। শুরুতে যে চ্যালেঞ্জগুলো যেমন—রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং খেলাপি ঋণের সমস্যা ছিল, সেগুলো আজও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। তবুও ৭১৯ কোটি টাকা থেকে শুরু করে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানো বাংলাদেশের জন্য একটি গর্বিত অর্জন। তাজউদ্দীন আহমদের সেই পুনর্গঠনের স্বপ্ন থেকে শুরু হয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রাই এখন বাংলাদেশের সামনে বড় স্বপ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলার প্রত্যাশার মধ্যেই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন এবং ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: সবার জন্য উন্নয়ন’ দর্শনকে সামনে রেখেই সাজানো হয়েছে এই বাজেট। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত এ বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ। থাকছে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিগত সরকারের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে গতিশীল করতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর নানা কর্মপরিকল্পনা। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড়, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ কমানোর উদ্যোগের মাধ্যমে জনজীবনে স্বস্তি ফেরানোর বার্তা দিতে চায় সরকার।
অর্থনীতিকে পুনরায় উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে এনে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের আলোকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কর্মসংস্থানভিত্তিক উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলাই হতে যাচ্ছে এ বাজেটের প্রধান লক্ষ্য।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের এটিই প্রথম বাজেট। দেশের ৫৫তম এই বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। মানবসম্পদ উন্নয়ন, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা উচ্চমূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই বাজেটকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে’ বাংলাদেশের রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরছে সরকার।
এবারের বাজাটে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যমান ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ ও ১ শতাংশ হারে আরোপিত উৎসে কর কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি ও ভোগ্যপণ্য এই সুবিধার আওতায় আসবে। এর মধ্যে রয়েছে ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পণ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বাজারে সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা এবং ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যচাপ কমানোর লক্ষ্যেই উৎসে কর কমানোর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত বাজেটের একটি অংশে বলা হয়েছে, দেশের প্রতিটি ব্যক্তি ও পরিবারের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার এই জনমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপণ্যের বাজারকে আরও সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসাই এর উদ্দেশ্য।
ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর ভরসা: বিশাল অঙ্কের এই বাজেটের খরচ সামলাতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রধান অংশ (৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা) আদায় করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজস্ব আয়ের পরও বাজেটে ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত থেকেই সোয়া লাখ কোটি টাকার (১ লাখ ১২ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা) বেশি ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। বাকি অর্থ বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা থেকে সংগ্রহ করা হবে।
মানবসম্পদ ও সামাজিক সুরক্ষায় সর্বোচ্চ জোর: প্রস্তাবিত বাজেটে প্রথাগত বড় অবকাঠামো উন্নয়নের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে কার্ডভিত্তিক বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির সম্প্রসারণসহ ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর ঘোষণা আসতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে এই বাজেটে।
ফ্রিল্যান্সার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য মেগা ধামাকা: নতুন বাজেটে প্রযুক্তিবান্ধব ফ্রিল্যান্সার এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ধরনের সুখবর ও বিশেষ প্রণোদনার প্রস্তাব থাকছে। তরুণ ও যুবসমাজকে সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য থাকছে ২ হাজার কোটি টাকার বিশাল তহবিল।
কর কাঠামো ও শুল্কে বড় পরিবর্তনের আভাস: সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে আগামী বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানোর ঘোষণা দিতে পারেন অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া জ্বালানি তেল ও ভোজ্যতেলের উৎসে কর কমানোসহ বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব আসতে পারে। তবে, ধনিক শ্রেণির ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা বা সারচার্জ বাড়তে পারে।
ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করতে ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত ‘নবম পে-স্কেল’ বা নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই বড় চ্যালেঞ্জ: চলতি বছরের মে মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি যেখানে ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছেছে; সেখানে আগামী অর্থবছরে তা ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, এই বিশাল অঙ্কের বাজেট বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। তাই কঠোর বাজার মনিটরিং এবং সঠিক মুদ্রানীতির সুষম সমন্বয় ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে।
তবে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে শতভাগ সামঞ্জস্য রেখে এই কল্যাণমুখী বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে, যা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তুলতে নতুন গতি সঞ্চার করবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের দেওয়া শোকজের জবাবে সন্তুষ্ট নন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যায় প্রয়োজনীয় তথ্যের চেয়ে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় বেশি রয়েছে। বুধবার (১০ জুন) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতাল যে জবাব দিয়েছে, সেটি আমি পড়েছি। প্রয়োজনীয় তথ্যের বাইরে অনেক গল্প-কাহিনি তারা লিখেছে, যা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ব্যাখ্যা নিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘তারা চার থেকে পাঁচ পৃষ্ঠার জবাব দিয়েছে, কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় তথ্যের চেয়ে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় বেশি। এটি অনেকটা ভেগ (অস্পষ্ট) রিপ্লাই। আমি এতে সন্তুষ্ট নই। বিষয়টি পর্যালোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।’
ছবি: দৈনিক বাংলা
দেশের অর্থনীতি প্রথমবারের মতো ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা (৪৫৬ বিলিয়ন ডলার)। বুধবার (১০ জুন) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত সাময়িক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিবিএসের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাময়িকভাবে ৪.১৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৩.৪৯ শতাংশের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে প্রবৃদ্ধির এই ইতিবাচক হারের বিপরীতে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে নিম্নমুখী প্রবণতা।
কৃষি খাতে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা আগের বছরের ২ দশমিক ৪২ শতাংশের তুলনায় দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। তবে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। সাময়িক হিসাবে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। এ তুলনায় এবার দশমিক ৮৫ শতাংশ কম।
সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ থেকে দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে জিডিপির সঙ্গে বিনিয়োগের অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। একইভাবে দেশজ সঞ্চয় কমে ২১ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং জাতীয় সঞ্চয় কমে ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
ছবি: সংগৃহীত
নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য শারীরিক ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হলে তাদের অনুদান দেবে নির্বাচন কমিশন ইসি।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
ইসি জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে জারি করা এই নীতিমালার আওতায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে দুর্বৃত্তদের হামলা বা দুর্ঘটনায় কেউ প্রাণ হারালে তার পরিবারকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং আকস্মিক অসুস্থতা বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনে ও ভোটার তালিকা প্রণয়নসংক্রান্ত কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনকালে অসুস্থ, গুরুতর অসুস্থ, আহত, গুরুতর আহত কর্মকর্তা, কর্মচারী ও মৃত ব্যক্তির পরিবারকে আর্থিক সহায়তা অনুদান প্রদান নীতিমালায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ নির্বাচনে নিয়োজিত সব কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আর্থিক সুবিধার সুবিধাভোগী হবেন।
এই নীতিমালার অধীনে অনুদানের হারকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমত, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি দুর্বৃত্তদের হামলা অথবা কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার পরিবারকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে। একই কারণে কেউ গুরুতর আহত বা স্থায়ীভাবে অক্ষম হলে সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা, গুরুতর আহত বা সাময়িকভাবে অক্ষম হলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা এবং সাধারণ আহতের ক্ষেত্রে আঘাতের ধরন বিবেচনা করে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হবে।
দ্বিতীয়ত, দায়িত্ব পালনকালে কেউ যদি আকস্মিকভাবে অসুস্থ বা মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার পরিবার সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা অনুদান পাবেন। এ ছাড়া আকস্মিক গুরুতর অসুস্থতা বা স্থায়ী অক্ষমতার জন্য সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা, সাময়িক অসুস্থতার জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা, হাসপাতালে ভর্তির পর ব্যয়বহুল চিকিৎসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা এবং সাধারণ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, নীতিমালায় অনুদান প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পরিবারের উত্তরাধিকার নির্ধারণের জন্য অর্থ বিভাগের সর্বশেষ সরকারি কর্মচারী পেনশন সহজীকরণ আদেশ অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। যদি মৃত ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী থাকে তবে অনুদানের টাকা তাদের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করা হবে এবং এ ক্ষেত্রে স্ত্রীদের যৌথভাবে আবেদন করতে হবে। তবে অনুদান পাওয়ার আগে স্বামী বা স্ত্রী পুনরায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে এই সুবিধা পাবেন না। মৃত ব্যক্তির কোনো স্বামী বা স্ত্রী জীবিত না থাকলে তার অনূর্ধ্ব ২৫ বছর বয়সি ছেলে বা অবিবাহিত মেয়ে এবং সন্তান না থাকলে বাবা-মা এই অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন। নাবালক সন্তান থাকলে অভিভাবক নির্ধারণের ক্ষেত্রে পারিবারিক আদালত অর্ডিন্যান্স ১৯৮৫ প্রযোজ্য হবে। এ ছাড়া অবিবাহিতদের ক্ষেত্রে বাবা-মা বা ভাই-বোন এবং কোনো সন্তান না থাকলে স্বামী বা স্ত্রী অর্ধেক এবং বাকি অর্ধেক বাবা-মা বা অবিবাহিত ভাই-বোন সমহারে পাবেন। কোনো উপযুক্ত উত্তরাধিকারী না থাকলে বিবাহিত মেয়েরাও প্রয়োজনীয় প্রমাণসহ আবেদন করতে পারবেন।
এ ছাড়া আর্থিক সহায়তার জন্য যেকোনো দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার সর্বোচ্চ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্ধারিত ছকে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার বা অফিস প্রধানের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব বা সচিব বরাবর আবেদনপত্র পাঠাতে হবে। আবেদনের সঙ্গে নির্ধারিত আবেদন ফরম, আবেদনকারীর সত্যায়িত ছবি, উত্তরাধিকার সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এবং সিভিল সার্জন বা সরকারি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রদত্ত চিকিৎসাজনিত বা মৃত্যুর সনদ সংযুক্ত করতে হবে।
এই আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়নের জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্বাচন ব্যবস্থাপনা-১ উইংয়ের যুগ্ম সচিবকে সভাপতি এবং বাজেট ও অর্থ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিবকে সদস্য সচিব করে ৫ সদস্যের একটি যাচাই-বাছাই ও সুপারিশ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই কমিটি প্রতি অর্থবছরে অন্তত দুইবার প্রাপ্ত আবেদনগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে অনুদানের পরিমাণ নির্ধারণপূর্বক সচিবের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবে। পরে এই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত অনুমোদনসাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাবে এককালীন এই অনুদানের অর্থ সরাসরি দেওয়া হবে। প্রতি অর্থবছরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নিজস্ব বাজেট থেকে এই কল্যাণমূলক অনুদানের অর্থ সংস্থান করা হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, বর্তমান খসড়ার ভিত্তিতে কমিশন গঠিত হলে তা একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। বুধবার (১০ জুন) এক বিবৃতিতে নিজেদের উদ্বেগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় সংস্থাটি।
টিআইবির মতে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের সঙ্গে তুলনা করলে নতুন খসড়া আইনে এমন কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে, যা একটি স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের জন-আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘প্যারিস নীতিমালা’র মানদণ্ডের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘২০২৫ সালের অধ্যাদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে কমিশন একটি স্বাধীন সংস্থা হবে এবং এটি সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীনে থাকবে না। তবে নতুন খসড়া আইন থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটি বাদ দেওয়া হয়েছে। টিআইবির আশঙ্কা, এর ফলে কমিশনের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রত্যক্ষ প্রভাব বৃদ্ধি পাবে এবং এটি স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা হারাবে।’
কমিশনার নিয়োগের জন্য প্রস্তাবিত বাছাই কমিটির কাঠামো নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। খসড়া আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী গঠিত এই বাছাই কমিটিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার, দুজন মন্ত্রী, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
টিআইবি বলছে, ‘এই কাঠামোর কারণে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণভাবে সরকারি দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে কমিশনের নিরপেক্ষতা যেমন ক্ষুণ্ণ হবে, তেমনি স্বার্থের দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে।’ এর বদলে বাছাই প্রক্রিয়াকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরপেক্ষ করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
কমিশনের কার্যপরিধি ও ক্ষমতার বিষয়ে টিআইবি জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সম্ভাব্য আটককেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত অনুসন্ধান ও পরিদর্শনের অবাধ ক্ষমতা কমিশনকে দিতে হবে। গুম, নির্যাতন ও বেআইনি আটকের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্ত করার বিধান আইনে স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্ত সরকারি কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে এ ধরনের ক্ষেত্রে সরকারের আগাম অনুমতির যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা বাতিল করে আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কমিশনের অনুমতিকেই যথেষ্ট হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছে টিআইবি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, কমিশনে অন্তত একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং কমপক্ষে দুজন নারী কমিশনার রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে; কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের ছুটি নিয়ে কমিশনার হওয়ার সুযোগ বাতিল করে দলনিরপেক্ষতা, সততা ও মানবাধিকার বিষয়ে সুস্পষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে; সরকারি কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগের সীমা বিদ্যমান ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে; কমিশনের বাজেট যাতে সম্পূর্ণরূপে সরকারি নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল না থাকে, সে জন্য আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আইনি বিধান থাকতে হবে।
একটি কার্যকর ও স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের গুরুত্ব তুলে ধরে টিআইবি সতর্ক করেছে, কমিশন যদি তার স্বাধীনতা হারায় তবে তার নেতিবাচক প্রভাব কেবল মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপরই পড়বে না, বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সংকটে ফেলবে। এর ভুক্তভোগী ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক—সব পক্ষই হতে পারে।
সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর সুরক্ষায় টিআইবিসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে খসড়া আইনটি সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
মন্তব্য