সিনহার বিরুদ্ধে এবার ভাতিজার জবানবন্দি

সিনহার বিরুদ্ধে এবার ভাতিজার জবানবন্দি

জবানবন্দিতে শঙ্খজিৎবলেন, চাচা-এসকে সিনহার নির্দেশে উত্তরার শাহজালাল ব্যাংকে তিনি ও তার বাবা একটি যৌথ হিসাব খোলেন। সেই হিসাবে পরে দুই কোটি ২৩ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়। এই অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে তার কিছু জানা ছিল না।

ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) থেকে চার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলেন ভাতিজা শঙ্খজিৎ কুমার সিনহা।

তার জবানবন্দি গ্রহণ করে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি সাক্ষীর জন্য পরবর্তী তারিখ দিয়েছে আদালত।

শঙ্খজিৎ সিনহা বিচারপতি সিনহার মামাতো ভাইয়ের ছেলে। এর আগে গত ২৮ ডিসেম্বর এই মামলায় জবানবন্দি দেন সিনহার ভাই নরেন্দ্র কুমার সিনহা।

বুধবার ঢাকার ৪ নম্বর বিশেষ বিচারক শেখ নাজমুল আলমের আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার সময় আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহিনুল ইসলাম, রেজাউল করিম ও ফারুক আহম্মেদ হাজির ছিলেন। তবে তারা কোনো জেরা করেননি।

জবানবন্দিতে শঙ্খজিৎবলেন, চাচা-এসকে সিনহার নির্দেশে উত্তরার শাহজালাল ব্যাংকে তিনি ও তার বাবা একটি যৌথ হিসাব খোলেন। সেই হিসাবে পরে দুই কোটি ২৩ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়। এই অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে তার কিছু জানা ছিল না।

এই টাকার মধ্য থেকে ঢাকা ব্যাংক সাভারের ইপিজেড শাখায় শঙ্খজিতের ব্যক্তিগত হিসাবে ৭৮ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা ব্যাংক ইপিজেড শাখায় দুটি সঞ্চয়পত্রে যথাক্রমে ৫০ ও ১০ লাখ টাকা জমা রাখা হয়। আর বাকি ১৮ লাখ টাকা একই ব্যাংকে জমা রাখা হয়। আর এই পুরো কাজটি তিনি এসকে সিনহার নির্দেশেই করেছেন বলে আদালতকে জানান শঙ্খজিৎ।

গত ২৮ ডিসেম্বরেই শঙ্খজিতের জবানবন্দি দেয়ার কথা ছিল। তবে এক আসামি সেদিন মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ায় আর তার জবানবন্দি নেয়া হয়নি।

মামলার বাদী দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষে আদালতে ছিলেন আইনজীবী মীর আহমেদ আলী সালাম।

এই মামলার অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয়েছে মোট ১৮ জনকে। এদের মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণই শেষ হলো।

আসামিদের মধ্যে ফারমার্স ব্যাংকের অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী (বাবুল চিশতী) কারাগারে, ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক এমডি এ কে এম শামীম, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়, ভাইস প্রেসিডেন্ট লুৎফুল হক, সাবেক এসইভিপি গাজী সালাহউদ্দিন, টাঙ্গাইলের বাসিন্দা মো. শাহজাহান এবং একই এলাকার বাসিন্দা নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা জামিনে।

সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, ফারমার্স ব্যাংকের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সাফিউদ্দিন আসকারী, রণজিৎ চন্দ্র সাহা ও তার স্ত্রী সান্ত্রী রায় পলাতক রয়েছেন।

গত ১৩ আগস্ট একই আদালত ১১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।

২০১৯ সালের ১০ জুলাই দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন মামলাটি করেন। একই বছরের ৯ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন দুদক পরিচালক বেনজীর আহমেদ।

মামলায় বলা হয়, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর আসামি শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখায় দুইটি অ্যাকাউন্ট খোলেন। তারা চার কোটি টাকা ঋণের আবেদন করেন তারা।

আবেদনে উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডের ৫১ নম্বর বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়, যার মালিক ছিলেন সিনহা।

ঋণের জামানত হিসেবে রনজিৎ চন্দ্রের স্ত্রী সান্ত্রী রায়ের নামে সাভারের ৩২ শতাংশ জমির কথা উল্লেখ করা হয়। ওই দম্পতি সিনহার পূর্ব পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ বলে উল্লেখ করা হয় মামলার এজাহারে।

দুদক বলছে, ব্যাংকটির তৎকালীন এমডি এ কে এম শামীম যাচাই-বাছাই ছাড়া ব্যাংকের নিয়ম-নীতি না মেনে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঋণ দুটি অনুমোদন করেন।

এজাহারে বলা হয়, অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে ঋণের আবেদন অনুমোদন করা হয়। পরদিন চার কোটি টাকার দুটি পে-অর্ডার ইস্যু করা হয় সিনহার নামে। ৯ নভেম্বর সোনালী ব্যাংকের সুপ্রিম কোর্ট শাখায় তার হিসাবে এই টাকা জমা হয়।

পরে বিভিন্ন সময়ে ক্যাশ, চেক ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে ওই টাকা তোলা হয়। এর মধ্যে সিনহার ভাইয়ের নামে শাহজালাল ব্যাংকের উত্তরা শাখার হিসাবে দুটি চেকে দুই কোটি ২৩ লাখ ৫৯ হাজার টাকা স্থানান্তর করা হয়।

এজাহারে বলা হয়, রনজিৎ চন্দ্র ঋণ দ্রুত অনুমোদনে সে সময়ের প্রধান বিচারপতির প্রভাব ব্যবহার করেন।

সিনহা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। ২০১৭ সালের অক্টোবরের শুরুতে এক মাসের ছুটি নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন। সে সময় তিনি ফিরে আসার ঘোষণা দিলেও এক মাস পর সিঙ্গাপুর দূতাবাসের মাধ্যমে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন।

আদালতে জমা দেয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ফারমার্স ব্যাংকে ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে সেই টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে স্থানান্তর, উত্তোলন ও পাচার করেছেন আসামিরা। এটি দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২)(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

যে ধারায় মামলা করা হয়েছে, তাতে অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণ হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।

আরও পড়ুন:
বিচারপতি সিনহার বিরুদ্ধে ভাই-ভাতিজার সাক্ষ্য

শেয়ার করুন

মন্তব্য