× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ প্রাইভেসি পলিসি

জাতীয়
এক যুগে কৌশলী ভারসাম্যের কূটনীতি
hear-news
player
google_news print-icon

এক যুগে কৌশলী ভারসাম্যের কূটনীতি

এক-যুগে-কৌশলী-ভারসাম্যের-কূটনীতি
গত এক যুগে প্রতিবেশী ও বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যের কূটনীতি সফলভাবে অনুসরণ করেছে বাংলাদেশ। এটি অর্থনৈতিক বিকাশ ও বিনিয়োগে বড় ভূমিকা রেখেছে।

গত ১২ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার তার চিরায়ত দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতি, অর্থনৈতিক ও সামরিক কূটনীতিতে দৃঢ় ও কৌশলী অবস্থান। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এটাকে বর্তমান সরকার বা রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সাফল্য হিসেবে দেখছেন।

গত এক যুগে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মাঠে ভারসাম্যের কৌশলী নীতি নিয়ে এগিয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ককে কূটনীতির সঙ্গে এমনভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে যা থেকে দেশ লাভবান হয়েছে।

এই ১২ বছরের শুরুর দুই বছর বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশকে লড়তে হয়েছে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার সঙ্গে। কূটনৈতিক সাফল্যের কারণে মন্দার প্রভাব এড়াতে সক্ষম হয় দেশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটা ছিল খুবই কৌশলী ও পরিণত কূটনীতি।’

তিনি বলেন, গত এক যুগে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, কোরিয়া, সৌদি আরব, ইরান বা তুরস্ক—সবার সঙ্গেই ভারসাম্য রক্ষায় সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিবেশী ও বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যের কূটনীতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশ ও বিনিয়োগে বড় ভূমিকা রেখেছে।

অধ্যাপক দেলোয়ার মনে করেন, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে গত ১২ বছরে। যুগের পর যুগ ঝুলে থাকা ছিটমহল বিনিময় হয়েছে, ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্তের পুরোটাই চিহ্নিত হয়েছে, বেড়েছে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক গভীর হয়েছে চীনের সঙ্গে।

অধ্যাপক দেলোয়ার বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অনেকেই চীন-আওয়ামী লীগ সম্পর্ক নিয়ে সন্দিহান ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ক্ষমতায় বসে সেসব না ভেবে নতুন সম্পর্ক তৈরি করেন চীনের সঙ্গে। ২০১০ ও ২০১৪ সালে তিনি দুই দফা চীন সফরে যান। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ বাংলাদেশ সফরে আসেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং। এই সফরে সরকারি-বেসরকারি খাতে ৩৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের চুক্তি হয়।

তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির চীনের সঙ্গে এই সম্পর্ককে এতটা উঁচু স্তরে দেখতে রাজি নন। তিনি এই সম্পর্ককে কেবলই বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে দেখতে চান।

নিউজবাংলাকে মোহাম্মদ জমির বলেন, ‘চীন বাংলাদেশের সঙ্গে যে সম্পর্কটা তৈরি করছে, সেটা আসলে তাদের বাণিজ্যের স্বার্থেই। তারা আমাদের কাছে বেশি পণ্য বিক্রি করছে। কিন্তু কিনছে কম। সে তুলনায় জাপানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা বেটার। তারা আমাদের কাছ থেকে প্রচুর পণ্য কেনে এবং সাহায্য দেয়।’

অধ্যাপক ড. দেলোয়ার মনে করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতি ড. ইউনূস ইস্যুতে কিছুটা শীতল হলেও তা কাটাতে সক্ষম হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট (টিকফা) করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সামরিক সহযোগিতা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ক্ষমতায় এসেই একাত্তরের মিত্র রাশিয়ার সঙ্গে ঝিমিয়ে পড়া সম্পর্ককে জাগ্রত করেন শেখ হাসিনা। মস্কো সফরে যান। এরপর সামরিক সহযোগিতা, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি সহায়তাসহ নানা ইস্যুতে চুক্তি ও সমঝোতা হয়।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানকেও কূটনীতিতে বাংলাদেশের বিজয় হিসেবে দেখেন বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক দেলোয়ার মনে করেন, এ ইস্যুতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিশ্বে মানবিক কূটনীতিতে বাজিমাত করেছে। ছোট দেশ হলেও বাংলাদেশ মিয়ানমারের এই নির্যাতিত মানুষকে আশ্রয় দিয়ে যে মানবিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে তা অতুলনীয়।

চীন-ভারত বা চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ‘ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি’ অনুসরণ করতে পারছে বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর।

তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের পর এটা কঠিন হয়ে যাবে। তখন আমরা উন্নয়নশীল দেশে উঠে যাব। এখন যে সুবিধা পাই তখন তা পাব না। এ জন্য আমাদের কূটনৈতিক টিমকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।’

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ভূমিকা সম্পর্ক অধ্যাপক ড. দেলোয়ার বলেন, ‘ইয়েমেনের হুতিবিরোধী সন্ত্রাসবিরোধী জোটে যোগ দিয়েছিল বাংলাদেশ। আবার ইরান, তুরস্কের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক গভীর হচ্ছে। মোট কথা বাংলাদেশ তার স্বার্থে সবকিছুতে যুক্ত হচ্ছে বা নিজেকে বিরত রাখছে।’

২০১৫ সালের ১ আগস্ট ভারত ও বাংলাদেশের স্থায়ী সীমানা নির্ধারণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ৬৮ বছরের এক অমীমাংসিত অধ্যায়ের। এর ফলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে থাকা ১৬২টি ছিটমহলের অর্ধ লক্ষাধিক ‘দেশহীন’ মানুষের অনিশ্চিত জীবনের অবসান হয়।

এক যুগে কৌশলী ভারসাম্যের কূটনীতি

বাংলাদেশের সে সময়ের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, প্রক্রিয়াগুলো ঘটেছিল খুবই পরিকল্পিতভাবে। ছিটমহল বিনিময়ের পর ছিটের মানুষের নাগরিকত্ব, ছিটের উন্নয়ন বাজেট মাথায় রেখে কাজ করতে হয়েছে। বাজেট খরচের জন্য জেলা প্রশাসকদের দায়িত্ব দেয়া হয়। দেশের মানচিত্রে যুক্ত হওয়া ভূমির নাগরিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মৌলিক সেবা দেয়ার পরিকল্পনাও মাথায় রেখে কাজ করতে হয়।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির নিউজবাংলাকে বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের পক্ষ থেকে যে বিষয় বড় করে দেখা হয়, তা হলো সে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, বিশেষ করে পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেই সে সমস্যার সমাধান করে। ফলে ভারত চাপে পড়ে ছিটমহল বিনিময় ও সীমানা চিহ্নিতকরণসহ বাংলাদেশের চাহিদা মেটাতে।

মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রজয়

আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা মীমাংসার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার দুই প্রতিবেশীর সঙ্গে সমুদ্র সংক্রান্ত বিরোধের সম্ভাবনা চিরতরে দূর করেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের সমুদ্রসীমার আয়তন বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় স্থলভাগের সমান। ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটারের এই ব-দ্বীপের সমুদ্রসীমার আয়তন এখন ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দশকের পর দশক আলোচনায় ফল না পেয়েই আন্তর্জাতিক আদালতে যায় বাংলাদেশ। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা চূড়ান্ত না থাকায় প্রায়ই দুই দেশের সঙ্গে ঝামেলা হচ্ছিল বাংলাদেশের। আদালত বিরোধপূর্ণ আনুমানিক ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা বাংলাদেশকে এবং প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ভারতকে দেয়।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সমুদ্রজয় বলতে গেলে এটাকে অন্য কারো জন্য পরাজয়ও বলতে হয়। আমি মনে করি এতে কেউ জেতেনি বা কেউ হারেওনি। আমি মনে করি বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে আদালতে যাওয়ার ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

‘এটা ছিল ম্যাচিউরড কূটনৈতিক পদক্ষেপ। এতে দুই প্রতিবেশীর সঙ্গে সীমান্ত সংঘাত যেমন এড়ানো গেছে, তেমনি সবার সঙ্গে শান্তি প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।’

অধ্যাপক দেলোয়ার বলেন, তিস্তা চুক্তি না হওয়া ও সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে না পারা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক। এই ব্যর্থতার দায়ভার বাংলাদেশের নয়, ভারতের। তাদেরই এসব বিষয়ে সমাধান খুঁজতে হবে।

মন্তব্য

আরও পড়ুন

জাতীয়
All local Dhaka city transport

‘পুরোই লোকাল’ ঢাকা নগর পরিবহন

‘পুরোই লোকাল’ ঢাকা নগর পরিবহন অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় এখন লোকাল বাসকেও যেন টেক্কা দিচ্ছে ঢাকা নগর পরিবহন। ছবি: নিউজবাংলা
ঢাকা নগর পরিবহনে এ পর্যন্ত তিনটি রুট চালু হয়েছে। কোনোটিতেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস নেই। কোনো কোনো রুটে টিকিট কাউন্টারও তুলে দেয়া হয়েছে। রুট ছেড়ে বাস চলছে বাণিজ্য মেলায়। যততত্র যাত্রী উঠা-নামা, ভাড়া নিয়ে টিকিট না দেয়া, বাসগুলোতে ধুলো-ময়লা, বাসের জন্য যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকা- এমন নানা অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা সব রুটে।

আসাদগেট, ফার্মগেট, শাহবাগ, কাকরাইল…। ভাই আসেন। ওঠেন। কই যাবেন? রাস্তায় অপেক্ষমাণ যাত্রীর উত্তর- ধানমন্ডি। হেলপার বলছেন- না ভাই, এটা ফার্মগেট রুটের বাস।

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন রুটে চলাচল করা লোকাল বাসের কর্মীদের এমন হাঁক-ডাক বরাবরের চিত্র। যাত্রীরা রাস্তার যেকোনো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে হাত তুললেই থেমে যাবে বাস। যাত্রীর ভিড়ে পা ফেলার জায়গা না থাকলেও হেলপারের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। চিঁড়েচ্যাপ্টা করে হলেও যাত্রী তুলতে থাকেন। নারী-পুরুষ নির্বিচারে যাত্রীরাও প্রয়োজনের তাগিদে ঠ্যালা-ধাক্কা দিয়ে একটু জায়গা করে নেন।

যাত্রীদের এমন হয়রানি আর ভোগান্তি থেকে রেহাই দিতেই রাজধানীতে চালু করা হয়েছে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’। শুরুতে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেলেও অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় এখন লোকাল বাসকেও যেন টেক্কা দিচ্ছে এই বিশেষ পরিবহনের বাসগুলো। রাস্তায় আর ১০টা লোকাল বাসের মতোই যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী তোলা হচ্ছে। নামার ক্ষেত্রেও যাত্রীর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে যেখানে ইচ্ছা বাস থামিয়ে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে।

রাজধানীবাসীকে লক্কড়-ঝক্কড় পরিবহনের হয়রানি থেকে মুক্তি দিতে ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর চালু হয় ঢাকা নগর পরিবহনের ২২ নম্বর রুট। পরিকল্পনা রয়েছে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ রাজধানীকে একটা কোম্পানির আওতায় আনার।

যাত্রীরাও আশায় বুক বাঁধেন- যাক, নগরে ভালো একটা পরিবহন সেবা মিলবে। তবে দিন যত যাচ্ছে, ততই নিরাশ হতে হচ্ছে তাদেরকে।

শুধু ২২ নম্বর রুট নয়, বাকি দুই রুটেরও বেহাল দশা। শুরুতে ২১ নম্বর রুটের সমস্যাগুলোকে পাইলট প্রজেক্ট বলে অযুহাত দেখাতেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বাকি দুই রুট চালু হওয়ার পর সমস্যার সমাধান মিলবে- এমন আশ্বাসও দেন তারা। কিন্তু সমাধান তো দূরের কথা, দিনকে দিন সমস্যা আরও বেড়েছে। আর পুরো বিষয়টিতে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাও চোখে পড়ার মতো।

ঢাকা নগর পরিবহনের ২২, ২৩ ও ২৬ নম্বর রুট চালু হওয়ার কথা ছিল গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর। পরবর্তীতে সময় পিছিয়ে ২২ ও ২৬ নম্বর রুট উদ্বোধন করা হয় ২৩ অক্টোবর। ২৩ নম্বর রুটটি এখনও চালুই হয়নি।

ঢাকা নগর পরিবহনের চলমান তিনটি রুট নিয়ে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালিয়েছে নিউজবাংলা। তাতে যে চিত্র বেরিয়ে এসেছে তা কেবলই হতাশার। সর্বত্রই হ-য-ব-র-ল অবস্থা।

রুট-২১

বাস রুট রেশনালাইজেশনের আওতায় ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর ২১ নম্বর রুটে (ঘাটারচর-মোহাম্মদপুর-জিগাতলা-প্রেস ক্লাব-মতিঝিল-যাত্রাবাড়ী-কাঁচপুর) পাইলট প্রকল্প হিসেবে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ নামে বাস সেবা শুরু হয়।

বিআরটিসির ৩০টি ডাবল ডেকার এবং ট্রান্স সিলভা পরিবহনের ২০টি বাস দিয়ে এই রুট চালু হওয়ার কথা ছিল। পরে দুই মাসের মধ্যে এতে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল ১০০টি বাস। তবে এই দীর্ঘ ১৩ মাসে এই রুট ৫০টি বাসেরও মুখ দেখেনি।

শুরু থেকেই এই রুটে চলাচল করা বিআরটিসি বাসে চালকের কোনো সহকারী নেই। এটা যাত্রীদের জন্য বাড়তি বিড়ম্বনা হয়ে দেখা দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা নগর পরিবহনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২১ নম্বর রুটে বাস চলে ২৫ থেকে ৩৫টি। এর মধ্যে ট্রান্সসিলভা পরিবহনের বাস ৮টি। বাকিগুলো বিআরটিসির ডবল ডেকার।’

ট্রান্সসিলভার ২০টি বাস চলার কথা থাকলেও কেন তা হয়নি- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তাদের সঙ্গে বনিবনা হয় না। তারা বাস দিতে চায় না।’

যাত্রীদের আরেকটি বড় অভিযোগ, এই রুটে চলাচল করা বাসগুলো দেরি করে আসে। বাসের ভেতরের অবস্থা নোংরা।

তাদের একজন মো. সুমন বলেন, ‘২১ নম্বর রুটের বাসগুলো মোড়ে মোড়ে থামিয়ে যাত্রী তোলে। আর বাড়তি এই টাকাটা যায় ড্রাইভারের পকেটে। ট্রান্সসিলভার বাসেও একই অবস্থা। লোকাল বাস আর নগর পরিবহনের বাসের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। দিন যত যাচ্ছে সেবার মান ততো খারাপ হচ্ছে।’

লোকালের নামান্তর ২২ নম্বর রুট

ঢাকা নগর পরিবহনের ২২ নম্বর রুটে চলে হানিফ পরিবহনের বাস। এই রুটে তাদের ৫০টি বাস চলার কথা থাকলেও শুরু হয়েছিল ৩০টি বাস দিয়ে। তা না বেড়ে উল্টো কমে দাঁড়িয়েছে ২০টিতে। শুরুতে টিকিট কাউন্টার থাকলেও পরে তা উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বাস কমে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের।

প্রতিদিন এই রুটে চলাচল করা অন্তত ১০ জন যাত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে নিউজবাংলার। তাদের একজন মো. শাহীন বলেন, ‘শুরু থেকেই ২২ নম্বর রুটে চলাচল করা হানিফ পরিবহনের বাসগুলো শুরু থেকেই রাস্তার যেখানে সেখানে থামিয়ে যাত্রী তোলে। অন্য দুই রুটের কাউন্টার থাকলেও এই রুটের কাউন্টার উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে তারা এখন লোকাল বাসের মতো যাত্রী নিচ্ছে। অনেক কন্ড্রাক্টর টিকিটও দিচ্ছে না।

‘দীর্ঘক্ষণ বাসের অপেক্ষায় থাকতে হয়। আর বাস কম থাকায় যাত্রীর ভিড়ে গাদাগাদি করে চলতে হয়। রাজধানীর আর ১০টা পরিবহনের মতোই অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় চলছে এই রুটের বাসগুলো।’

‘পুরোই লোকাল’ ঢাকা নগর পরিবহন
অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় চলছে ২২ রুটের বাসগুলো।ছবি: নিউজবাংলা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক টিকিট বিক্রেতা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘টিকিট পদ্ধতি উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বাস এখন চলছে কন্ট্রাক্টে। এছাড়া এই রুটে চলাচল করা বাস বিভিন্ন সময় কোনো প্রোগ্রামে অন্যত্র রিজার্ভেও ভাড়া দেয়া হয়। বাস কন্ট্রাক্টে চলার কারণে যে যেমনে পারে ওঠে-নামে, ভাড়া নিচ্ছে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ২২ নম্বর রুটের ইনচার্জ মো. আরমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রথম সমস্যা হচ্ছে আমাদের গাড়ি বসে থাকে। ড্রাইভারসহ অন্যান্য স্টাফ পাই না। আমাদের লোকসান হচ্ছিল। কাউন্টারের লোকদের টাকা দিতে পারছিলাম না। তাই কাউন্টার উঠিয়ে দিয়েছি।’

বাসে যাত্রীর উপচেপড়া ভিড়, তারপরও কিভাবে লোকসান হয়- এমন প্রশ্নে আরমান বলেন, ‘ঘাটারচর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত ভিড় থাকে। তার পর আর যাত্রী তেমন একটা থাকে না।’

গাড়ির ভেতরে টিকিট কাটার ব্যবস্থা রাখার কারণে অনেক সময় কন্ডাক্টর অনিয়ম করছেন। ফলে টাকাটা কোম্পানি পায় না। এমন তথ্যের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওদের খরচ লাগে তো! এটা আপনার বুঝতে হবে। আপনি মানবিক দৃষ্টিতে চিন্তা করেন, ওদেরও একটা খরচ আছে।

‘ওরা দুই-এক টাকা সরাবে, এটা আপনাকে বুঝতে হবে। সবাইকে টিকিট দিলে তো টাকাটা জায়গামতো চলে যাবে। ওদের বেতন দেয়া হয় রাতে। সারাদিন ওরা খাবে কি?’

৫০টি বাস চলার কথা ছিল। তা থেকে এখন চলছে ২০টি। এর কারণ জানতে চাইলে আরমান বলেন, ‘সেটা আমি বলতে পারব না। ৩০টা চলত, এখন চলে ২০টা। ড্রাইভারের সংকটে আমরা বাস চালাতে পারছি না।’

২৬ নম্বর রুটের বাস চলে বাণিজ্য মেলায়

২৬ নম্বর রুটে বিআরটিসির ৫০টি ডবল ডেকার বাস দেয়ার কথা ছিল এই রুটে। তবে এখন পর্যন্ত বাস চলেছে সর্বোচ্চ ২৫টি।

এদিকে বাণিজ্য মেলা শুরু হওয়ার পর এখন ১৭ থেকে ১৮টি বাস চলছে। বাকি বাসগুলো বাণিজ্য মেলা রুটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাস কমে যাওয়ায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

এই রুটের বাসে চালকের কোনো সহকারী নেই। যত্রতত্র বাস থামিয়ে তোলা হয় টিকিট ছাড়া যাত্রী।

এই রুটে নিয়মিত চলাচল করা মো. মহসিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা লাগে। বাসের পরিবেশ নোংরা। সিটগুলোতে ধুলা পড়ে থাকে। চালক মোড়ে মোড়ে বাস থামিয়ে যাত্রী তোলে। মানা করলেও শোনে না।

‘বসিলা থেকে শুরু হয় টিকিট ছাড়া যাত্রী তোলা। সারা পথেই চালক সামনের দরজা খোলা রেখে যাত্রী তোলেন। টিকিট ছাড়া যাত্রীরা নামার সময় চালকের হাতে টাকা দিয়ে যান।’

এই রুটের এক চালককে যাত্রীর কাছ থেকে টাকা নেয়ার সময় অনিয়ম করার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি কোন উত্তর দেননি। বলেন, ‘মাফ করে দেন, আর হবে না।’

পরে তার নাম জিজ্ঞাসা করলেও একই কথা বলেন, ‘মাফ করে দেন।’

তিনি কিছুই জানেন না

নগর পরিবহনে কম বাস চলার কারণ জানতে চাওয়া হয়েছিল ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক ও বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির সদস্য সচিব সাবিহা রহমানের কাছে। মোবাইল ফোনে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২১ নম্বর রুটে ৩০টি বিআরটিসির বাস ও ২০টি ট্রান্সসিলভার বাস চলার কথা। তবে তাদের কিছু অসুবিধা আছে, যে কারনে ৫০টি বাস দেখছেন না আপনারা।’

কখনোই ৫০টি বাস চলেনি- এমন তথ্যের ভিত্তিতে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

২২ নম্বর রুটে বর্তমানে ২০টি বাস চলে- এমন তথ্যের ভিত্তিতে সাবিহা রহমান বলেন, ‘এটা আমার জানা নেই। আমার একটি পরিদর্শন টিম আছে। তারা আমায় জানিয়েছে যে, বাস রাস্তার মাঝে থামে। ড্রাইভারও টাকা আদায় করছে। কিন্তু বাস কম চলার বিষয় আমার নলেজে নেই। আগামী মিটিংয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব।’

‘পুরোই লোকাল’ ঢাকা নগর পরিবহন
লোকাল বাসের মতো দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছে যাত্রীরা। ছবি: নিউজবাংলা

টিকিট কাউন্টার উঠিয়ে বাসের ভেতরে টিকিট কাটা হচ্ছে। এছাড়া লোকাল বাসের মতো যত্রতত্র যাত্রী উঠানো ও নামানো হচ্ছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে তিনি বলেন, ‘যাত্রীদের সচেতন হতে হবে। জনগণেরও দায়িত্ব আছে। জনগণও যেখানে সেখানে নামতে চায়। আমি আজ জানলাম। এটা আমার জানার বাইরে ছিল। বিষয়টি খোঁজ নেব।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পরিদর্শন টিম আমাকে রিপোর্ট দিয়েছে। ওরা তো আর সব সময় বসে থাকে না।’

২৬ নম্বর রুটের বাস বাণিজ্য মেলার যাত্রী টানছে তা-ও জানেন না এই কর্মকর্তা। বলেন, ‘আগামী ৭ তারিখ মিটিং আছে। তখন এটা আলোচনা করব। আর আমি এখনই বিআরটিসির চেয়ারম্যানকে ফোন করব।’

বিআরটিসির বক্তব্য

নিউজবাংলার পক্ষ থেকে এর আগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। বিআরটিসির বাস কম চলা ও চালকদের দুর্নীতির বিষয়ে জানানো হলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি নিজেই আজ থেকে নগর পরিবহনের তদারকি করব। আশা করছি আর কোনো সমস্যা থাকবে না। বাস চালকের সহকারীও দেয়া হবে।’

তার ওই আশ্বাসের পর কয়েক মাস কেটে গেছে। কিন্তু সমস্যা কমেনি, বরং বেড়েছে।

মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানানোর পর তাজুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২১ নম্বর রুটে আমার ৩০টি গাড়ি চলে। আপনার কোনো কথা থাকলে আমার অফিসে এসে বলুন। আমার ২০০ রুটে বাস চলে; আমি কি সব রুটের খবর রাখি?’

বাণিজ্য মেলায় নগর পরিবহনের বাস চলছে জানালে তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য মেলায় চলবে কেন? বাণিজ্য মেলার যাত্রীদের নির্বিঘ্নে পৌঁছে দেয়া সরকারের এজেন্ডা এবং আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সিনিয়র ডিরেক্টর, জিএমরা রাস্তায় তদারকি করছেন। আর কী করতাম বলেন? আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’

‘পুরোই লোকাল’ ঢাকা নগর পরিবহন
বিআরটিসির ড্রাইভার যাত্রীর কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে। ছবি: নিউজবাংলা

বিআরটিসির চালকেরা মোড়ে মোড়ে বাস থামিয়ে টিকিট ছাড়া যাত্রী তুলছেন। এ তথ্য জানানোর পর বিআরটিসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘পুরো বিষয়টি দেখার জন্য আমাদের সিনিয়র লেভেলের কর্মকর্তাদের কমিটি করে পাঠাচ্ছি। এক সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট সামারাইজ করে আমরা বুঝতে পারব কোথায় কোথায় আমাদের গ্যাপ আছে। আপনার তথ্য পজিটিভলি আমলে নিচ্ছি।’

‘এখানে হরিলুট চলছে’

ঢাকা নগর পরিবহনের কার্যকলাপে ক্ষুব্ধ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমি নগর পরিবহন পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, টিকিটের টাকাটাই শুধু কোম্পানি পায়। এর বাইরে টিকিটবিহীন যাত্রী তুলে অনেক বড় অংকের টাকা চালক এবং সহযোগী ভাগাভাগি করে নিয়ে নেয়। ইতোমধ্যে আমি বিআরটিসির চেয়ারম্যানকেও এ বিষয়ে অভিযোগ করেছি।

‘এমনকি আমি যে গাড়িগুলোতে ভ্রমণ করেছি, তার পাঁচটা ভিডিও চেয়ারম্যানকে আমার মোবাইল থেকে করে পাঠিয়েছি। তিনি আমাকে বলেন- ভিডিও দেখে কিছু বুঝতেছেন না। এখানে একটা হরিলুট চলছে। প্রকল্পটি ধ্বংস করার জন্য যা যা করা দরকার তাই করা হচ্ছে।’

মোজাম্মেল বলেন, ‘নগর পরিবহনের পরিণতি হবে- তারা বলবে যে আমরা চেষ্টা করেছি। এই নগরীতে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে না। আর এমনটা বলে কোনো একদিন তারা এই প্রকল্প বন্ধ করে দেবে।

‘যাত্রীদের কাছ থেকে এখনও যে পরিমাণ টাকা কালেকশন হয় তাতে লোকসান হওয়ার কথা না। যেখানে মালিক সমিতির একটা ভয়ঙ্কর ঐক্য গড়ে উঠেছে সেখানে নগর পরিবহন টেকা দায়।’

আরও পড়ুন:
নাইকো মামলা: খালেদার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি ১৭ জানুয়ারি
৬ মাস ধরে পার্কে ঝড়ে ভাঙা গাছ
ঋণ নিতে ‘বাড়তি খরচ দিতে হয় তাকে’
সোনালী ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ: ৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা চলবে
গরিবের ভাতার ৫০০ টাকা ‘চেয়ারম্যানের পকেটে’

মন্তব্য

জাতীয়
Kamrans alternative to Anwaruzzaman in Sylhet?

সিলেটে কামরানের বিকল্প কি আনোয়ারুজ্জামান

সিলেটে কামরানের বিকল্প কি আনোয়ারুজ্জামান বদরউদ্দিন আহমদ কামরান ও আনোয়ারুজ্জমান চৌধুরী। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বড় দল। দলের অনেক নেতাই মনোনয়ন চাচ্ছেন। এ ব্যাপারে দলীয় প্রধান ও মনোনয়ন বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবেন। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে কে প্রার্থী হবেন, এ ব্যাপারে কিছু বলা যাবে না।’

সিলেট সিটি করপোরেশনের এ পর্যন্ত সবগুলো নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২০২০ সালের ১৫ জুন মৃত্যু হয় সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক এ সভাপতির। এমন বাস্তবতায় এবারের নির্বাচনে তার বিকল্প কে হচ্ছেন, তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা দলটির ভেতরে।

চলতি বছরের মাঝমাঝিতে সিলেট সিটি নির্বাচন হওয়ার কথা। আওয়ামী লীগের অন্তত অর্ধডজন নেতা এ নির্বাচনের মেয়র পদে দলীয় মনোয়ন পেতে তৎপরতা চালাচ্ছিলেন, তবে হঠাৎ করেই আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছেন প্রবাসী এক নেতা।

যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগে যুক্ত সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীই সিলেটে কামরানের বিকল্প হচ্ছেন বলে গুঞ্জন চলছে। দলের হাইকমান্ড থেকে তাকে ‘সবুজ সংকেত’ দেয়া হয়েছে বলেও প্রচার চালাচ্ছেন আনোয়ারুজ্জামান অনুসারীরা। এমন ‘সংকেত’ পেয়ে সম্প্রতি দেশেও এসেছেন আনোয়ারুজ্জামান। যদিও এই প্রচারের সত্যতা নেই বলে দাবি করেছেন অন্য মনোয়নপ্রত্যাশীরা।

কে এই আনোয়ারুজ্জামান

সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার বাসিন্দা আনোয়ারুজ্জমান চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাজ্যপ্রবাসী। দেশে থাকার সময় থেকেই তিনি আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বর্তমানে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়। সেই ঘনিষ্টতার সূত্রে প্রবাসে অবস্থান করেও সিলেটের রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন আনোয়ারুজ্জামান। সিলেটে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন কমিটি গঠন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে আড়ালে থেকেও অন্যতম কুশীলব হয়ে ওঠেন তিনি।

গত দুটি সংসদ নির্বাচনে সিলেট-২ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন পেতে তৎপরতা শুরু করেন প্রবাসী এই নেতা। যদিও দল মনোনয়ন দেয়নি তাকে।

গুঞ্জন রয়েছে, তার আপত্তির কারণেই এই আসনে মনোনয়ন বঞ্চিত থাকতে হয় সাবেক সংসদ সদস্য ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরীকে। দলের দুই প্রভাবশালী নেতার বিভক্তির কারণে দুইবারই এ আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ।

মেয়র পদে যেভাবে আলোচনায় আনোয়ারুজ্জামান

এতদিন সিলেট-২ আসনে মনোনয়ন পেতে তৎপরতা চালালেও চলতি মাসে হঠাৎ করেই সিলেট সিটি নির্বাচনের মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে উঠে আসে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর নাম।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, সাবেক সংসদ সদস্য ও সিলেটের প্রবীণ নেত্রী সৈয়দা জেবুন্নেছা হককে সম্প্রতি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য করা হয়। এরপর তিনি দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে যান। ওই সাক্ষাতেই সিলেট সিটি নির্বাচন প্রসঙ্গ উঠে আসে। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী সিলেট সিটি নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে আনোয়ারুজ্জামানের নাম বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে জানান জেবুন্নেসা হক। এরপর থেকেই মেয়র পদে আলোচনায় ওঠে আসে আনোয়ারুজ্জামানের নাম। এখন নগর ছেঁয়ে গেছে তার ছবি সংবলিত পোস্টার-ফেস্টুনে।

এ বিষয়ে সৈয়দা জেবুন্নেছা হকের সঙ্গে সম্প্রতি মোবাইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

জেবুন্নেছা হকের বরাত দিয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম নাদেল বলেন, ‘সিটি নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে আনোরুজ্জামানের কথা বিবেচনা করার কথা প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এমনটি জেবুন্নেছা হক আমাকেও বলেছেন। আরও অনেককেই এ কথা বলেছেন তিনি।’

নাদেল আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ আরও কিছু শীর্ষ নেতার কাছ থেকেও এ ব্যাপারে আমি ইতিবাচক ইঙ্গিত পেয়েছি।’

এদিকে মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে আলোচনা শুরুর পর ২২ জানুয়ারি দেশে আসেন আনোয়ারুজ্জান চৌধুরী। তাকে সংবর্ধনা জানাতে ওই দিন বিমানবন্দরে দলীয় নেতা-কর্মীদের ঢল নামে। শোভাযাত্রার মাধ্যমে বিমানবন্দর থেকে তাকে নগরে নিয়ে আসেন নেতা-কর্মীরা।

এরপর ২৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন আনোয়ারুজ্জামান। সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তাকে সবুজ সংকেত দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী।

মহানগর আওয়ামী লীগে ক্ষোভ

মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে আনোয়ারুজ্জামানকে ‘সবুজ সংকেত’ দেয়া হয়েছে, এমন খবর চাউর হওয়ার পর থেকেই ক্ষোভ বিরাজ করছে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে। বিশেষত মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্য নেতারা এ নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। যদিও দলীয় প্রধানের বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে এ নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ কোনো মন্তব্য করতে চাননি, তবে এই আলোচনা শুরুর পর থেকেই উল্লসিত আনোয়ারুজ্জামান অনুসারীরা।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, সিলেট সিটিতে আগামী নির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়ন পেতে অর্ধডজন নেতা তৎপরতা চালাচ্ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আসাদ উদ্দিন আহমদ, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এটিএম হাসান জেবুল, কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ এবং বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের ছেলে আরমান আহমদ শিপলু।

কামরানের মৃত্যুর পর থেকেই মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। শেষ সময় এসে প্রবাসী এক নেতার নাম আলোচনার শীর্ষে উঠে আসায় হতাশ তাদের সবাই।

মনোনয়নপ্রত্যাশীদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্ত বলেন, ‘যারা দেশে থেকে দীর্ঘদিন ধরে দলের রাজনীতি করছেন, বিপদে-আপদে মানুষের পাশে রয়েছেন, তাদের বাদ দিয়ে প্রবাসে বিলাসী জীবন কাটানো কাউকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেয়াটা আওয়ামী লীগের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে।’

ওই নেতা আরও বলেন, ‘সিলেট নগরবাসীর জন্য আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর কোনো অবদান নাই। গত ভয়াবহ বন্যায়ও তাকে পাশে পায়নি নগরবাসী। তিনি নগরের বাসিন্দাও নন।’

মেয়র পদে আনোয়ারুজ্জামানকে দলীয় প্রধানের বিবেচনায় রাখার প্রচার সত্য নাও হতে পারে উল্লেখ করে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া এত সহজ না। এমন প্রচারণা মিথ্যে হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সভার আগে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।’

এ প্রসঙ্গে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘আমি তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক কর্মী। গত সংসদ ও সিটি নির্বাচন সিলেটে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে আমি নিরলসভাবে কাজ করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি এই শহরেই বড় হয়েছি, পড়ালেখা করেছি। তাই সিলেট নগরের মানুষ আমার আপনজন।’

প্রধানমন্ত্রী সবুজ সংকেত দিয়েছেন জানিয়ে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘গত বহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। সিটি নির্বাচনের জন্য তিনি আমাকে কাজ করার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।’

এ প্রসঙ্গে সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বড় দল। দলের অনেক নেতাই মনোনয়ন চাচ্ছেন। এ ব্যাপারে দলীয় প্রধান ও মনোনয়ন বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবেন। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে কে প্রার্থী হবেন, এ ব্যাপারে কিছু বলা যাবে না।’

আরও পড়ুন:
রাষ্ট্রপতি হতে চান জগদীশ, ইসির ‘‌বাধা’
সাত্তার চমকের শেষটা দেখার অপেক্ষা
ফোনালাপ ফাঁস: আসিফ স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে?
ডিসির নম্বর ক্লোন করে নির্বাচনী প্রার্থীর কাছে অর্থ দাবি
ডিসিদের বলেছি দেশবাসী সুষ্ঠু নির্বাচন চাইছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মন্তব্য

জাতীয়
Poison free cucumber village

বিষমুক্ত শসার গ্রাম

বিষমুক্ত শসার গ্রাম কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার মুগুজি গ্রামে বিষমুক্ত শসা চাষ হচ্ছে। ছবি: কোলাজ নিউজবাংলা
মুগুজি ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এই এলাকার ৩৫ হেক্টর জমিতে শসা উৎপাদন হবে। প্রতি হেক্টরে ৯০০ মণ শসা হবে ৷ অন্তত ৩১ হাজার ৫০০ মণ শসা উৎপাদন হবে। গড়ে প্রতি কেজি ৫০ টাকা বিক্রি হলে ৬ কোটি টাকার বেশি শসা বিক্রি হবে।’

কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার মুগুজি গ্রামে ৬ কোটি টাকার বিষমুক্ত শসা বিক্রির আশা করছে কৃষি কর্মকর্তারা। গত বছর এই গ্রামে সাড়ে চার কোটি টাকার শসা বিক্রি হয়। এবার কীটনাশকমুক্ত পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে চাষ করায় বেড়েছে শসার চাহিদা। কৃষকদের আশা তারা বেশি দাম পাবেন। আগামী দিন পনেরর মধ্যে এই গ্রামের শসা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে মধ্য প্রাচ্যের দেশ দুবাইতে যাবে জানান কৃষি কর্মকর্তারা।

মুগুজি গ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশের ৩৫ হেক্টর জমিতে শসার চাষ হয়েছে। যেদিকে চোখ যায় সেখানে সবুজ আর সবুজ। কোথাও শসার হলুদ ফুল মাথা উঁকি দিয়ে আগমনী বার্তা জানান দিচ্ছে। কোথাও বাতাসে দুলছে কচি শসা। পোকা দমনে ব্যবহার করা হয় পাতা-লতার রস।

মুগুজি গ্রামে বিষমুক্ত শসা ও সবজি চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে কৃষক সমাবেশ ও মাঠ পরিদর্শন করেন কৃষি কর্মকর্তারা।

স্থানীয় কৃষক আমীর হোসেন বলেন, শসা চাষে ১০ গন্ডায় (২০ শতাংশ) এক লাখ টাকা খরচ হয়েছে ৩ লাখ টাকা বিক্রি হবে। বিষমুক্ত উপায়ে চাষ করায় ক্রেতাদের চাহিদা বেড়ে গেছে।’

মনির হোসেন, সাহাব উদ্দিন ও সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘৬ গন্ডায় (১২ শতাংশ) খরচ হয়েছে ৭০ হাজার বিক্রি হবে দেড় লাখ টাকা। সরাসরি বিদেশে রপ্তানি করতে পারলে আমাদের আয়ও বাড়বে। বিষমুক্ত শসার উৎপাদনে কৃষি অফিস উদ্বুদ্ধ করেছে। আশা করছি ভালো ফলন হবে।’

মুগুজি ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এই এলাকার ৩৫ হেক্টর জমিতে শসা উৎপাদন হবে। প্রতি হেক্টরে ৯০০ মণ শসা হবে ৷ অন্তত ৩১ হাজার ৫০০ মণ শসা উৎপাদন হবে। গড়ে প্রতি কেজি ৫০ টাকা বিক্রি হলে ৬ কোটি টাকার বেশি শসা বিক্রি হবে।’

কুমিল্লা জেলার উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা এইখানে নিরাপদ শসা উৎপাদনে উদ্যোগ নিয়েছি। এখানের শসা স্থানীয় চাহিদা মেটানোর সঙ্গে বিদেশে রপ্তানি করা যাবে।’

কুমিল্লা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোহিত কুমার দে বলেন, ‘নিরাপদ সবজি চাষ বিষয়টি এখানে কৃষকরা প্রশংসনীয়ভাবে আত্মস্ত করেছেন। আমরা এই অগ্রগতি ধরে রাখবো। এটি আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি।’

পরিচালক (সরেজমিন উইং) মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এ রকম দেশের ২০টি ইউনিয়নে এই বিষমুক্ত শসা চাষের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। তার একটি বরুড়ার খোশবাস দক্ষিণ ইউনিয়ন। কৃষি পণ্য বিদেশে রপ্তানির জন্য তাদের কিছু শর্ত থাকে। আমরা তা পূরণের চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে রপ্তানিকারকরা আসা শুরু করেছেন।’

আরও পড়ুন:
দাম কমেছে তরমুজের, শঙ্কায় চাষিরা
ঝড়ের শঙ্কায় বাজার ভরেছে কাঁচা আমে
শসার কেজি শহরে ৪০ টাকা, গ্রামে ৪
দাকোপে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে চাষির মৃত্যু
দাবদাহে ঝরছে আমের গুটি, শঙ্কায় চাষি

মন্তব্য

জাতীয়
Bag did not catch the porter wages why?

‘ব্যাগ ধরেইনি, কুলি মজুরি কেন?’

‘ব্যাগ ধরেইনি, কুলি মজুরি কেন?’ গাবতলী বাস টার্মিনালের ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের চাঁদাবাজির রসিদ। ছবি: নিউজবাংলা
মেহেরপুর থেকে আসা বাসযাত্রী সনু বিশ্বাস বলেন, ‘আমি টাকা দেব না বললে আমার ব্যাগ আমাকেই নিতে দিচ্ছে না। এমনকি আমি যেসব সিএনজি অটোরিকশ ডাকছি সে প্রতিটিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এটা তো ওপেন চাঁদাবাজি ভাই। যে আমার ব্যাগ ধরেইনি, আমি কেন তাকে কুলি মজুরি দেব?’

‘বাসের বাঙ্কার থেকে ব্যাগটা নামিয়ে পাশের ফুটপাতে রাখার সঙ্গে সঙ্গে এই লোক কোথা থেকে এসে একটা রসিদ ধরিয়ে বলে ৪০ টাকা দেন। কাগজটা পড়ে দেখি এটা কুলি মজুরির রসিদ। অথচ আমি কোনো কুলি ডাকিনি এবং আমার ব্যাগ অন্য কেউ বহনও করেনি।’

রাজধানীর মিরপুর মাজার রোড এলাকায় পূর্বাশা বাস কাউন্টারের সামনে কথাগুলো বলছিলেন মেহেরপুর থেকে আসা বাসযাত্রী সনু বিশ্বাস।

এই প্রতিবেদক তার আগে দেখতে পান যে রাফি ট্রেডার্স লেখা অ্যাপ্রন পরিহিত এক যুবক বাস যাত্রী সনু বিশ্বাসের সঙ্গে কী একটি বিষয় নিয়ে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়েছেন।

এগিয়ে গিয়ে কারণ জানতে চাইলে ওই যাত্রী বলেন, ‘আমি এসেছি মেহেরপুর থেকে। আমার ব্যাগ ছিল বাসের বাঙ্কারে। তেমন ভারি ব্যাগ নয় যে কুলি ডাকতে হবে। আমি নিজে বাঙ্কার থেকে ব্যাগ নামিয়েছি। এখন একটা সিএনটি অটোরিকশা ডেকে বাসায় চলে যাব। এর মাঝে তারা কোনো কারণ ছাড়াই এসে টাকা দাবি করছে।

‘আমি টাকা দেব না বললে সে আমার ব্যাগ আমাকেই নিতে দিচ্ছে না। এমনকি আমি যাওয়ার জন্য যেসব সিএনজি অটোরিকশ ডাকছি সে প্রতিটিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এটা তো ওপেন চাঁদাবাজি ভাই। যে আমার ব্যাগ ধরেইনি, আমি কেন তাকে কুলি মজুরি দেব?’

এ বিষয়ে সোহেল নামে রাফি ট্রেডার্সের ওই কর্মীকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে আমরা এই এলাকা ইজারা নিয়েছি। এই এলাকার ফুটপাত আর রাস্তায় ব্যাগ রাখলে আমাদের টাকা দিতে হবে।’

এই ঘটনা রোববার দুপুরের। এর ঘণ্টাখানেক আগে একই স্থানে এমন চাঁদাবাজির শিকার হন খন্দকার বশির উদ্দিন মিলন নামে এক ব্যক্তি। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার বাড়ি ঝিনাইদহ। সেখান থেকে পূর্বাশা পরিবহনের বাসে আমার পরিবার দুটি ব্যাগ পাঠিয়েছে। আমি সেই ব্যাগ নিতে এসেছি। বাস থেকে ব্যাগ নামিয়ে আমি সিএনজিতে উঠাতে গেলে এক লোক এসে হাতে রসিদ ধরিয়ে দিয়ে দুই ব্যাগ বাবদ ৮০ টাকা দাবি করে বসে।

‘আমি কোনো কুলিকে ডাকিনি। এমনকি আমার ব্যাগ তুলতে কেউ সাহায্যও করেনি। অথচ এই রাফি ট্রের্ডাসের লোক আমার কাছ থেকে জোর করে ৮০ টাকা নিয়ে গেল। প্রথমে আমি টাকা দেব না বললে সে আশপাশ থেকে আরও ৩-৪ জনকে ডেকে আমাকে মারতে আসে। পরে নিরুপায় হয়ে তাদের টাকা দিয়ে দিলাম।’

আরেক ভুক্তভোগী ইসহাক আলী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন, ‘মেয়রের নামে চাঁদাবাজি! ঢাকা শহরে ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে মেয়রকে চাঁদা না দিয়ে শহরে ঢোকা যাবে না। আমি তাদেরকে চাঁদা না দিয়ে গাড়ি ভাড়া করার যতবার চেষ্টা করেছি ততবার সেই গাড়ি তারা ভাঙতে গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ব্যাগ প্রতি ৪০ টাকা হিসাবে দুইটা ব্যাগে ৮০ টাকা দিয়ে মাজার রোড থেকে বাসায় ফিরতে পেরেছি।’

রোববার ও আগের কয়েকদিন সরেজমিনে গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে এমন আরও অনেক যাত্রীর কাছ অভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা এসব বিষয়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি বলে জানান।

আবার কুলি মজুরির নামে এই চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে জানালেন টার্মিনালের বিভিন্ন কাউন্টারে দায়িত্বরত কর্মীরা। তারা বলেন, ইজারা নেয়া প্রতিষ্ঠান রাফি ট্রেডার্সের কাছ আমরাও জিম্মি। আমাদেরও সব পরিষেবা বিল তাদের কাছেই জমা দিতে হয়।

ইজারাদাতা প্রতিষ্ঠান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে কর্তৃপক্ষও কুলি মজুরির নামে রাফি ট্রেডার্সের এই চাঁদাবাজি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। জানে পুলিশ প্রশাসনও। তবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।

আরও পড়ুন:
চাঁদাবাজি মামলায় চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার
অপহরণ-চাঁদাবাজি: সাঁথিয়া ছাত্রলীগ সেক্রেটারিসহ গ্রেপ্তার ৫
হাইওয়ে পুলিশের ‘চাঁদাবাজি’, চালকদের মহাসড়ক অবরোধ
সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে পিটুনি
বরিশালের অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ

মন্তব্য

জাতীয়
Extortion if you have a bag with you at Gabtali terminal

গাবতলী টার্মিনালে ব্যাগ দেখলেই হাজির ‘চাঁদাবাজ’

গাবতলী টার্মিনালে ব্যাগ দেখলেই হাজির ‘চাঁদাবাজ’ রাজধানীর গাবতলী টার্মিনাল এলাকায় বাস থেকে ব্যাগ নিয়ে নামলেই চাঁদার রসিদ নিয়ে হাজির ইজারাদার রাফি ট্রেডার্সের লোকজন। ছবি: নিউজবাংলা
রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাস থেকে ব্যাগ হাতে নামলেই হাতে কুলি মজুরির রসিদ নিয়ে সামনে হাজির হয় ইজারাদার প্রতিষ্ঠান রাফি ট্রেডার্সের অ্যাপ্রন পরা কর্মীরা। নিজের ব্যাগ নিজে বহন করলেও চাঁদা না দিয়ে উপায় নেই। পুলিশ, ইজারাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিএনসিসি কাউকেই পরোয়া করে না ওরা।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ট্রেন ও বাস স্টপেজগুলোতে যাত্রীর ব্যাগ-বোচকা নিয়ে কুলি-মজুরদের টানাটানি নতুন কিছু নয়। গাড়ি থেকে ব্যাগ নামিয়ে দেয়ার বিনিময়ে জবরদস্তি অতিরিক্ত টাকা আদায়ও গা-সওয়া হয়ে গেছে। তাই বলে বাস থেকে নিজের ব্যাগটা নামিয়ে রাস্তায় রাখলেই চাঁদা দিতে হবে!

রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় প্রকাশ্যে এবং দোর্দণ্ড প্রতাপে এমন চাঁদাবাজি চলছে। গাবতলী টার্মিনাল হয়ে বাসে কোনো গন্তব্যে যেতে বা আসতে হাতে ব্যাগ থাকলেই চাঁদা না দিয়ে নিস্তার নেই।

রাজধানীর অন্যতম প্রবেশদ্বার গাবতলী হয়ে দেশের উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে আসা-যাওয়া করা যাত্রীদের কাছ থেকে কুলি মজুরির নামে এই চাঁদাবাজি করে এই বাস টার্মিনালের ইজারাদার রাফি ট্রেডার্স।

বাড়তি ভাড়া আদায়, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, সময়ক্ষেপণ, পরিবহনকর্মীদের আপত্তিকর আচরণে এমনিতেই দিশেহারা বাসযাত্রীরা। এবার তাতে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে এই চাঁদাবাজি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গাবতলী এলাকায় বাসে উঠা-নামার পর যাত্রীদের ব্যাগ না ধরেই তাদের কাছ থেকে জোরজবস্তি ব্যাগ প্রতি ৪০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে রাফি ট্রেডার্সের কর্মীরা। এ নিয়ে প্রতিদিনই যাত্রীদের সঙ্গে রাফি ট্রেডার্সের কর্মীদের বাকবিতণ্ডা হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে তা হাতাহাতিতেও গড়াচ্ছে।

গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় নিউজবাংলার সরেজমিন অনুসন্ধানে এই চাঁদাবাজির সত্যতা মিলেছে। ইজারাদার রাফি ট্রেডার্সের এক কর্মকর্তা প্রথমে এমন চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে এর সত্যতা স্বীকার করে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন।

তবে বাস্তবতা হলো, এই চাঁদাবাজদের কাছে পুলিশও যেন অসহায়। ওদের সঙ্গে পেরে না উঠে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা তাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে প্রতিকার চেয়েছেন।

রোববার দুপুরে মিরপুর মাজার রোড এলাকায় পূর্বাশা বাস কাউন্টারের সামনে গিয়ে চোখে পড়ল এক যাত্রীর সঙ্গে ইজারাদার রাফি ট্রেডার্সের অ্যাপ্রন পরা এক কর্মী তর্ক করছেন।

জানা গেল, সনু বিশ্বাস নামে ওই যাত্রী মেহেরপুর থেকে এসেছেন। তার কাছ থেকে জোর করে কুলি মজুরি বাবদ ৪০ টাকা আদায় করাকে কেন্দ্র করে এই বিতণ্ডা।

গাবতলী টার্মিনালে ব্যাগ দেখলেই হাজির ‘চাঁদাবাজ’
গাবতলী বাস টার্মিনালে ইজারাদার প্রতিষ্ঠান রাফি ট্রেডার্সের কার্যালয়। ছবি: নিউজবাংলা

সনু বিশ্বাস বলেন, ‘আমি বাসের বাঙ্কার থেকে ব্যাগ নামানোর সঙ্গে সঙ্গে এই লোক কোথা থেকে এসে একটা রসিদ ধরিয়ে বলে, ৪০ টাকা দেন। পরে কাগজটা পড়ে দেখি এটা কুলি মজুরির রসিদ। অথচ আমি কোনো কুলি ডাকিনি এবং আমার ব্যাগ অন্য কেউ বহনও করেনি।’

এ বিষয়ে সোহেল নামে রাফি ট্রেডার্সের ওই কর্মীকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে আমরা এই এলাকা ইজারা নিয়েছি। এই এলাকার ফুটপাত আর রাস্তায় ব্যাগ রাখলে আমাদের টাকা দিতে হবে। আর আপনি ঝামেলা করতাছেন ক্যান? আপনি এইখান থ্যইক্যা যান।’

আপনার বস কে- এমন প্রশ্নের জবাবে সোহেল একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সুজন নামে একজনকে দেখিয়ে দেন। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এই চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে সুজন বলে ওঠেন, ‘এসব রিপোর্ট করে আপনি আমাদের কিছুই করতে পারবেন না। ওই যে নাবিল বাস কাউন্টারের পাশে একটা চায়ের দোকান আছে। আপনার যা জানার সেটা আপনি ওই চায়ের দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে জেনে নিন।’

এরপর ওই চায়ের দোকানদারের সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার এই প্রতিবেদকের। তিনি নিজেকে শাহীন নামে পরিচয় দেন। চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। গাবতলী বাস টার্মিনালের দ্বিতীয় তলায় আমাদের অফিস আছে। আপনি সেখানে গিয়ে কথা বলেন।’ গাবতলী বাস টার্মিনালের দ্বিতীয় তলায় রাফি ট্রেডার্সের অফিসে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি।

সনু বিশ্বাসের মতো আরও বেশ কয়েকজন বাস যাত্রী কুলি মজুরির নামে এভাবে গাবতলী বাস টার্মিনালে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন।

তাদের একজন খন্দকার বশির উদ্দিন মিলন নিউজবাংলাকে বলেন, পূর্বাশা পরিবহনের বাস থেকে ব্যাগ নামিয়ে সিএনজিতে উঠাতে গেলে এক লোক এসে রসিদ ধরিয়ে দিয়ে দুই ব্যাগ বাবদ ৮০ টাকা দাবি করে। অথচ আমি কোনো কুলিকে ডাকিনি। আমার ব্যাগ তুলতে কেউ সাহায্যও করেনি। অথচ এই রাফি ট্রের্ডাসের লোক আমার কাছ থেকে জোর করে ৮০ টাকা নিয়ে গেল।

ইসহাক আলী নামে আরেক ভুক্তভোগী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন, ‘মেয়রের নামে চাঁদাবাজি! শেষ পর্যন্ত ব্যাগ প্রতি ৪০ টাকা হিসাবে দুইটা ব্যাগে ৮০ টাকা দিয়ে মাজার রোড থেকে বাসায় ফিরতে পেরেছি।’

প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি

গাবতলী বাস টার্মিনালে এক কাউন্টারের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এরা মাফিয়া কায়দায় এই বাস টার্মিনাল চালায়। কেউ এদের কিছু বলে না। বাস টার্মিনালসহ পর্বত সিনেমা হল থেকে মাজার রোড পর্যন্ত পুরা এলাকা এই রাফি ট্রেডার্সের লোকজনের নিয়ন্ত্রণে। এই এলাকায় কোনো যাত্রী ফুটপাত অথবা ফুটপাতের পাশে রাস্তায় কোনো ব্যাগ রাখলেই ওদেরকে টাকা দিতে হয়।

‘আমরা আমাদের কাউন্টারের ঘর ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, পরিচ্ছন্ন বিলসহ এ বাবদ সে বাবাদ সব টাকাই এদের হাতে দিই। অথচ এরা এই বাস টার্মিনাল পরিষ্কার কী করে সেটা আপনারাই দেখেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই টার্মিনালসহ সামনের রাস্তায় এদের একশ’র বেশি কর্মী থাকে সব সময়। এর মধ্যে রাফি ট্রের্ডাসের নাম লেখা ড্রেস পরে থাকে ৩০-৪০ জন। বাকিরা সাধারণ মানুষের মতো থাকে। এই ড্রেস পরা কর্মীরা যাত্রীদের কুলি মজুরি রসিদ ধরিয়ে দিয়ে চাঁদাবাজি করে। এরা যাত্রীদের ছোট ব্যাগে ৪০ টাকা আর বিদেশ থেকে আসা যাত্রীর ব্যাগ প্রতি নেয় ১২০ টাকা।

‘এরা লক্ষ্য রাখে যে যাত্রীদের ব্যাগে বিমানবন্দরের কোনো ট্যাগ লাগানো আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে সেই যাত্রীর আর রক্ষা নেই। ব্যাগ প্রতি ১২০ টাকা আদায় করে ছাড়ে। কোনো যাত্রী টাকা দিতে না চাইলে সাধারণ মানুষের বেশে থাকা ওদের বাকি সদস্যরা গিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে ঝামেলা বাধিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে গায়ে হাত তুলে বসে।

‘অনেক সময় যাত্রীরা আমাদের কাছে অভিযোগ করে। কিন্তু আমাদের তো কিছু করার নেই। কিছু বললে তো আমরাই এখানে থাকতে পারব না।

আরেক কাউন্টারের এক কর্মীর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনিও পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, ‘রাফি ট্রেডার্সের ড্রেস পরা কর্মীরা নামে কুলি হলেও এদের কাউকে দিয়ে আপনি কোনো মালামাল উঠাতে পারবেন না। এই ৩০-৪০ জনের একেক জন ১০ হাজার টাকার উপরে চাঁদাবাজির করে আয় করে।

‘সব মিলিয়ে দিনে তারা ৩-৪ লাখ টাকার চাঁদাবাজি করে। এদের কাউকেই রাফি ট্রেডার্সের পক্ষ থেকে বেতন দেয়া হয় না। এরা চাঁদাবাজির কমিশন পায়। তাছাড়া এই টাকা পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে উপর মহলেও যায় বলে শুনেছি। তাই তারাও সব কিছু দেখে না দেখার ভান করে।’

রাফি ট্রেডার্সের এই চাঁদাবাজি নিয়ে মাজার রোড়ে কর্তব্যরত পুলিশ সার্জেন্ট রাফিউল ইসলাম রাফির সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার। তিনি বলেন, ‘এই রাফি ট্রেডার্স ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসি) কাছ থেকে পুরো গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকা ইজারা নিয়েছে। আমরাও যাত্রীদের ব্যাগ বহন না করে জোর করে টাকা নেয়ার অভিযোগ পাই। এ বিষয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সব জানিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘যাত্রীরা এভাবে একের পর এক হয়রানির শিকার হলেও কেউ এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ করে না। তাই আমরা কিছু করতে পারি না। এরা টাকা দাবি করলে সাধারণ মানুষ ঝামেলা এড়াতে টাকা দিয়ে চলে যায়। আমাদেরও কিছু জানায় না।’

সাধারণ মানুষ মামলা না করলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে আপনারা কেন এই চাঁদাবাজি বন্ধ করছেন না?- এমন প্রশ্নে তিনি কোনও উত্তর দেননি।

গাবতলী টার্মিনালে ব্যাগ দেখলেই হাজির ‘চাঁদাবাজ’
ইজারাদার রাফি ট্রেডার্সের চাঁদাবাজির উল্লেখ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লেখা সহকারী ব্যবস্থাপকের চিঠির অনুলিপি।

গাবতলী বাস টার্মিনালের প্রধান কর্তৃপক্ষ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক (গাবতলী বাস টার্মিনাল) মোহাম্মাদ জাহিদ হাসান। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি যাত্রীদের কাছ থেকে ইজারাদারদের বিরুদ্ধে অসংখ্য চাঁদাবাজির অভিযোগ পাই। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে গত বছরের ২০ ডিসেম্বর চিঠি দিয়ে সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এখন দেখি স্যারেরা কী সিদ্ধান্ত নেন।’

ডিএনসিসির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে রাফি ট্রেডার্সকে ইজারা দেয়ার সময় বেশকিছু শর্ত দেয়া হয়। তার মধ্যে ২২ নম্বর শর্ত- কোনো যাত্রী সামান্য মালামাল উঠানো বা নামানোর জন্য কুলির সাহায্য না চাইলে কোনো কুলি ওই মালামাল স্পর্শ করা বা মজুরি দাবি করতে পারবে না। ওরা এই শর্ত ভঙ্গ করেছে।’

ডিএনসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মাদ সেলিম রেজা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রাফি ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে আমরাও এই অভিযোগ পেয়েছি। এর আগেও আমরা তাদের সতর্ক করেছি। এখন আমরা তাদের পর্যবেক্ষণে রেখেছি।

‘এখনও যদি তারা এই কাজ করে তাহলে সিরিয়াসলি তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় এ ধরনের কুলি মজুরির রসিদ দিয়ে চাঁদাবাজি করার কোনো সুযোগ নেই।’

ইজারাদার রাফি ট্রেডার্স যা বলছে

রাফি ট্রের্ডাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) লিয়াকত হোসেন সবুজ নামে এক ব্যক্তি। নিউজবাংলার পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে রাফি ট্রেডার্সের প্রজেক্ট ডিরেক্টর সাইফুল ইসলাম শ্রাবণ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এমন চাঁদাবাজি হাওয়ার তো কথা না। আমাদের এখানকার কর্মীরা কোনো যাত্রীর মালামাল বহন করা নিয়ে জোরজবরদস্তি করে না। এরকম করার নিয়মও এখানে নেই। যাদের কুলির প্রয়োজন হয় শুধু তাদের কাছ থেকেই আমাদের কর্মীরা টাকা নেয়।’

যাত্রীদের অভিযোগ, উত্তর সিটি করপোরেশনের চিঠিসহ নিউজবাংলার কাছে এই চাঁদাবাজি চলার বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ আছে জানালে শ্রাবণ বলেন, ‘আসলে কি, এরকম দুই/একটা ঘটনা হয়তো ঘটতে পারে। ওরা লেবার মানুষ তো। অনেক কিছুই হয়তো ওরা করে ফেলে। এর আগেও আমরা ওদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা সব সময়ই ওদের মনিটরিংয়ে রাখি। তারপরও আমি খোঁজ নিচ্ছি, যদি এমন ঘটনা ঘটে তাহলে ব্যবস্থা নেব।’

আরও পড়ুন:
চাঁদাবাজি মামলায় চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার
অপহরণ-চাঁদাবাজি: সাঁথিয়া ছাত্রলীগ সেক্রেটারিসহ গ্রেপ্তার ৫
হাইওয়ে পুলিশের ‘চাঁদাবাজি’, চালকদের মহাসড়ক অবরোধ
সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে পিটুনি
বরিশালের অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ

মন্তব্য

জাতীয়
Leaked phone conversation Asif voluntarily hiding?

ফোনালাপ ফাঁস: আসিফ স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে?

ফোনালাপ ফাঁস: আসিফ স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে? ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু আসিফ। ছবি: সংগৃহীত
‘ইউসুফ, স্যারের কতগুলো জামাকাপড়, গেঞ্জি, প্যান্ট, শীতের কাপড়, জুতা-মোজা ব্যাগে ভরে দিয়ে দে তাড়াতাড়ি। কেউ যেন না জানে যে স্যার কই গেছে। ক্যামেরার লাইন বন্ধ কর বাসার। স্যার গেলে আরও ১০ মিনিট পর ক্যামেরার লাইন অন করবি।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ হবে বুধবার। এর চারদিন আগে হঠাৎ নিখোঁজ স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা আবু আসিফ। ঘটনা তদন্তে নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে একটি কমিটিও গঠন করেছে।

এমন পরিস্থিতিতে আবু আসিফের স্ত্রী ও বাসার কেয়ারটেকারের মধ্যকার একটি ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন-তাহলে কি ভোটের আগে এই স্বতন্ত্র প্রার্থী স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করেছেন?

ওই ফোনালাপে উঠে এসেছে আসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগের ঘটনা। স্বেচ্ছায় আত্মগোপনের জন্য জিনিসপত্র গুছিয়ে দেয়া ও সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ রাখার কৌশলের বিষয়ও রয়েছে ওই টেলি কথোপকথনে।

শুক্রবার রাত থেকে আসিফের খোঁজ মিলছে না। তার পরিবার মৌখিকভাবে জানায়, আসিফ নিখোঁজ রয়েছেন। এ ঘটনার দুদিন পেরিয়ে গেলেও আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তার পরিবার।

কল রেকর্ডের কথোপকথনে আসিফের স্ত্রী মেহেরুননিছা মেহেরীন কেয়ারটেকারকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘ইউসুফ (কেয়ারটেকার), স্যারের (আসিফ) কতগুলো জামাকাপড়, গেঞ্জি, প্যান্ট, শীতের কাপড়, জুতা-মোজা ব্যাগে ভরে দিয়ে দে তাড়াতাড়ি। আরে তাড়াতাড়ি দে। কেউ যেন না জানে যে স্যার কই গেছে। ক্যামেরা বন্ধ করে দে। ক্যামেরার লাইন বন্ধ কর বাসার। স্যার গেলে আরও ১০ মিনিট পর ক্যামেরার লাইন অন করবি।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নিউজবাংলার পক্ষ থেকে আসিফের স্ত্রী মেহেরুননিছা মেহরীনের মোবাইল ফোনে একাধিক বার কল করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

এর আগে রোববার বেলা সাড়ে ৩টায় মেহেরুননিছা মোবাইল ফোনে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে আসিফকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমনটি তার মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে। তিনি কোথায় এবং কী অবস্থায় আছেন সেটিও জানি না।

‘প্রতিনিয়ত আমাদের হুমকি-ধমকি দেয়া হচ্ছে। বাড়িতে পুলিশ এসে অযথা তল্লাশি করে হয়রানি করছে। বাড়ির সামনেও কিছু পুলিশ আসা-যাওয়া করছে। এতে আমি অনেকটাই আতঙ্কিত!’

আসিফের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ করা না হলেও তার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা ওনার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তদন্ত করছি। তবে আসিফ সাহেবের পরিবার থেকে এখনও কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি।’

সামাজিক যোগাাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অফিসে স্ত্রী ও কেয়ারটেকারের মধ্যে কথোপকথনটি পুলিশের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে পুলিশ সুপার শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা অডিও রেকর্ডটি শুনেছি। প্রাথমিকভাবে অডিওতে নারী কণ্ঠ আসিফ সাহেবের স্ত্রীর বলেই মনে হচ্ছে। তবে যাচাই না করে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

‘ওনাকে কেউ অপহরণ করেছে না নিজে আত্মগোপনে গেছেন তা আমরা তদন্ত করছি। আগে ওনাকে খুঁজে পাওয়াটা জরুরি।’

এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু আসিফ আহমেদ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা নির্বাচন অফিসারকে নিয়ে গঠিত কমিটিকে দ্রুত তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার রাশেদা সুলতানা সোমবার সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে ইসি রাশেদা বলেন, ‘তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। রিপোর্ট আসুক। তারপর কী হয় দেখা যাবে। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা নির্বাচন অফিসারকে বলেছি তদন্ত করে রিপোর্ট দিতে। ঘটনাটা আসলে কী, এর সত্যতা কতটুকু। রিপোর্ট পাওয়ার পর সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে।’

তিনি জানান, ‘কমিশন ওখানকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে- যেভাবে যেখান থেকে পারো ওনাকে উদ্ধার করো। ওনাকে তারা উদ্ধার করতে পারবে না এটা আমরা বিশ্বাস করি না। নির্বাচনের আগেই যদি (উদ্ধার) হয় তাহলে ভালো হয়। কমিশন নিজে গিয়ে তো তাকে ধরে আনতে পারবে না।’

আবু আসিফ আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন। সম্প্রতি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা ও এই আসন থেকে পাঁচবার নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য উকিল আব্দুস সাত্তার ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হন আসিফ। তার প্রতীক মোটরগাড়ি।

গত ১১ ডিসেম্বর উকিল আব্দুস সাত্তার বিএনপির অন্য সংসদ সদস্যদের সঙ্গে জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। এতে আসনটি শূন্য হয়। পরে আসনটিতে উপনির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। ভোটে আওয়ামী লীগ দলীয় কোনো প্রার্থী দেয়নি। এই আসনে ভোট হবে বুধবার।

আরও পড়ুন:
‘বিএনপি সাত্তারকে ডাস্টবিনে ছুড়েছে’
আওয়ামী লীগের ৩ সমর্থকের মনোনয়ন প্রত্যাহারে কপাল খুলছে সাত্তারের
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে সাত্তার-চমকের কী প্রভাব

মন্তব্য

জাতীয়
Banned steroids in bodybuilding are increasing health risks

বডি বিল্ডিংয়ে নিষিদ্ধ স্টেরয়েড, বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি

বডি বিল্ডিংয়ে নিষিদ্ধ স্টেরয়েড, বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি রাজধানীসহ সারা দেশে গজিয়ে ওঠা জিমগুলোতে মাসল বানাতে স্টেরয়েডের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীসহ দেশের বিভাগ, জেলা এমনকি উপজেলা সদর পর্যায়েও গজিয়ে উঠেছে জিম। প্রশিক্ষক ছাড়া পরিচালিত এসব জিমে যথেচ্ছ মাত্রায় ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ স্টেরয়েড। মাসলম্যান হতে গিয়ে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তরুণ-যুবকরা। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পুরোপুরি অন্ধকারে।

নিয়মিত জিমে যাওয়া ও পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণসহ স্বাস্থ্য রক্ষার সব নিয়ম মানার পরও শুকিয়ে যাচ্ছিলেন আবিদ ও সেজান (ছদ্মনাম)। অথচ তাদের বয়স যথাক্রমে ২২ ও ২৫ বছর। এক পর্যায়ে চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হয়ে তারা জানতে পারলেন কারণটা।

স্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি মাসলম্যান হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নিয়মিত জিমে যাওয়াটাই তাদের জন্য কাল হয়েছে। জিমে অতিরিক্ত স্টেরয়েড ব্যবহারের কারণে তারা লিভার এনজাইম ও হরমোনাল ইমব্যালেন্স-এর মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

তাদের একজনের লিভার এনজাইমের মাত্রা অস্বাভাবিক পর্যায়ে চলে গেছে। আরেকজনের টেস্টোস্টেরন হরমোন উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। সাধারণত এই বয়সে এমন শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার কথা নয়।

জিমে গিয়ে স্টেরয়েড সঠিক মাত্রায় এবং সঠিক বয়সে না নেয়ায় তাদের আচরণে অস্বাভাবিকতা চলে আসে। পরিবারের সদস্যরাও বিষয়টি ধরতে পারেন। কারণ জিম করেও তারা শুকিয়ে যাচ্ছিলেন। অবশেষে চিকিৎসার জন্য এই দুই তরুণকে ঢাকায় আনা হয়।

রাজধানীর গ্রীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক ডা. রায়হান শহীদুল্লাহ বলেন, এই দুই তরুণ এখনও পুরোপুরি রিকভার করে উঠতে পারেনি। আর এই শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল।

ডা. রায়হান বলেন, ‘স্টেরয়েড সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি হলো চিকিৎসকরা বিভিন্ন রোগ বুঝে প্রেসক্রাইব করেন। আর জিমে যে স্টেরয়েড ব্যবহার করা হয় তা আর্টিফিসিয়াল বডি বিল্ডিংয়ের জন্য।

‘বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো এই স্টেরয়েড উৎপাদন করে না। এগুলোর বেশিরভাগই চীন থেকে আনা হয়। প্রতিবেশী ভারত থেকেও নিয়ে আসা হয়।’

তিনি বলেন, ‘এই স্টেরয়েড প্রেসক্রাইব করার কোনো অথেনটিসিটি নেই। সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে জিমে সাপ্লিমেন্ট দেয়া যায়। তবে কোনো চিকিৎসকই বডি বিল্ডিংয়ের জন্য স্টেরয়েড প্রেসক্রাইব করেন না। কারণ এর কোনো অনুমোদন নেই। এগুলোর বেশিরভাগই আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রাগ।

‘কোনো ফার্মেসিতেও এটা পাবেন না। দুই-একটা পাওয়া গেলেও সেটা নির্দিষ্ট কোনো রোগ যেমন ব্রেইন ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার- এসব ক্ষেত্রে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আর এগুলো খুবই ব্যয়বহুল। আবার চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র কোনো ফার্মেসি বিক্রিও করবে না।’

বডি বিল্ডিংয়ে নিষিদ্ধ স্টেরয়েড, বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি
জিমগুলো অবৈধভাবে সংগ্রহ করে স্টেরয়েড। ছবি: সংগৃহীত

পার্শপ্রতিক্রিয়া

স্টেরয়েডের প্রধান কাজ হলো মাসল বৃদ্ধি। জিমে নিয়মিত ব্যায়াম করে এক বছরে যেটুকু মাসল বাড়ানো যায় সেটা স্টেরয়েড ব্যবহার করে দুই বা তিন মাসেই করা সম্ভব। এর বড় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো, শরীরে প্রাকৃতিকভাবে যে হরমোন তৈরি হয় সেটা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ছেলেদের ক্ষেত্রে দেখা গেল, টেস্টোস্টেরন হরমোন তৈরিই বন্ধ হয়ে গেল। তখন নানাভাবে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে শরীরে। যদি মেইল হরমোন অর্থাৎ ছেলেদের হরমোনই তৈরি না হয় সে ক্ষেত্রে তো ওই মানুষটি পুরুষের মতো আচরণই করবে না। তখন প্রজনন ক্ষমতার ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এছাড়া পরিমাণ না বুঝে স্টেরয়েড ব্যবহারে লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হার্ট ফেইলিউরও হতে পারে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে দেখা যায়, অনেক বডি বিল্ডার কম বয়সে হার্ট অ্যাটাকে মারা যাচ্ছে। স্টেরয়েডের অস্বাভাবিক ব্যবহার এর অন্যতম একটি কারণ।

তাহলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না জেনেই কি জিমে স্টেরয়েডের ব্যবহার হচ্ছে- এমন প্রশ্নে ডা. রায়হান শহীদুল্লাহ বলেন, ‘বছর দশেক আগেও মানুষ এ বিষয়ে তেমন একটা জানত না। অনেকে এগুলোকে সাপ্লিমেন্ট মনে করত। তিন/চার বছর ধরে মানুষ কিছুটা হলেও জানতে পারছে।

‘সঠিক নিয়মে জিম না করলে জয়েন্টে ইফেক্ট পড়তে পারে। লিগামেন্ট ছিঁড়ে যেতে পারে। এমনকি অপারেশন পর্যন্ত করতে হতে পারে।

‘তাই স্টেরয়েড নিলেও চার সপ্তাহ পর তা বন্ধ করে দিতে হবে। হরমোনাল ব্যালান্স আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য ‘Post Cycle Therapy’ দিতে হয়।

অলি-গলিতে জিম, নেই প্রশিক্ষক

রাজধানী ঢাকা তো বটেই, দেশের বিভাগ, জেলা এমনকি উপজেলা সদর পর্যায়েও গড়িয়ে উঠেছে জিম। এর সঠিক পরিসংখ্যান স্বাস্থ্য খাত-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও জানে না।

ফিটনেস সেন্টার হিসেবে পরিচালিত এসব জিমে নেই সার্টিফিকেটধারী কোনো প্রশিক্ষক। ফলে এসব জায়গায় স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য গিয়ে অনেকেই কাঙ্ক্ষিত সেবাটা পাচ্ছেন না। উপরন্তু মাত্রাজ্ঞান ছাড়া স্টেরয়েডের ব্যবহারে তারা আক্রান্ত হচ্ছেন জটিল রোগে।

ট্রেনিং-এর বিষয়ে মিস্টার বাংলাদেশ এবং ফিটনেস কোচ সাকিব নাজমুস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি মালয়েশিয়া থেকে ছয় মাসের একটি ট্রেনিং নিয়েছি। সব জিমে ট্রেনার নেই, আবার জিম করতে করতে অভিজ্ঞতা হয়ে গেলে ট্রেনার হয়ে যায়। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা তাদের নেই। এর অবশ্য একটি বড় কারণ, জিমে ট্রেনিং দেয়ার মতো কোনো প্রতিষ্ঠানই দেশে নেই।’

তিনি বলেন, ‘স্টেরয়েড ব্যবহারে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া অবশ্যই থাকে। তবে সমস্যাটা হয় এটা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার করলে। স্টেরয়েড ব্যবহার করতে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য। সর্বোচ্চ ৫ মাস এর ব্যবহার করা যেতে পারে। আর মঞ্চে পারফর্ম করার মতো কোনো বিষয় যদি না থাকে তাহলে আমি সাজেস্ট করব স্টেরয়েড ব্যবহার থেকে দূরে থাকা। এর ব্যবহারকে আমি নিরুৎসাহিত করতে চাই।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি কখনোই স্টেরয়েড ব্যবহারের সাজেস্ট করি না, যদি না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি প্রতিযোগিতায় যায়।

‘এটি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য নিলে আবার রিমুভ করা যায়। এর জন্য কিছু মেডিসিন ও ইনজেকশন আছে। তবে সেটারও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। ওজন কমানো বা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হলেও স্টেরয়েড আসলে কোনোভাবেই অনুমোদিত নয়।’

প্রতিরোধ

ডা. রায়হান বলেন ‘প্রতিটি জিমে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা যেতে পারে। বাংলাদেশে বডি বিল্ডিংয়ের প্রচলন বেড়েছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যগত সচেতনতা সৃষ্টিতে মিডিয়ারও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা দরকার। কারণ হুজুগে গা ভাসালে হবে না। এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কেও সবার জানা থাকা দরকার।

সবচেয়ে বড় কথা, যেহেতু স্টেরয়েডের ব্যবহার শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, তাই জেনেশুনে কারও এটা ব্যবহার করা উচিত নয়। জিম চলবে শারীরিক সুস্থতার জন্য। মাসলম্যান বানানোটা এর উদ্দেশ্য হতে পারে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ, মিডিয়া, অভিভাবক- সবাইকে বুঝতে হবে স্টেরয়েড ব্যবহার করলেই স্বাস্থ্যবান থাকা যাবে না। বাহ্যিক দৃষ্টিতে হেলদি মনে হবে এটুকুই। তাই এটার ব্যবহার থেকে দূরে থাকাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।’

যা বলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

দেশজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জিমগুলোতে যথেচ্ছ ব্যবহার ও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে দেশের স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কোনো খোঁজখবর রাখে না।

নিউজবাংলার পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এমনটা জানা গেছে। একইসঙ্গে তারা বলেছেন, এখন থেকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।

স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব আনোয়ার হোসেন হাওলাদার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘জিমে স্টেরয়েডের ব্যবহার হয় এটি আমি ভাবতেই পারি না। স্টেরয়েড সাধারণত চিকিৎসকরা বিশেষ কিছু রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করেন। মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য চিকিৎসককে যখন কোনো জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয় তখন রোগীকে বাঁচানোর জন্য স্টেরয়েড দেয়া হয়।

বিষয়টি জানানোর জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে স্বাস্থ্য সচিব বলেন, ‘আমি জিমে খোঁজ নেব। এটি তো হতে পারে না। বডি বিল্ড ন্যাচারালি হয়। মাসল বিল্ড একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সেটি তো হবেই, আর সেজন্য একটা নির্দিষ্ট টাইম লাগবে। তাড়াহুড়া করে বডি বিল্ড করার নামে ব্যবসা করবে, এটা তো মেনে নেয়া যাবে না। প্রপার চ্যানেলের মাধ্যমে আমি বিষয়টি দেখব।’

মন্তব্য

p
উপরে