গাইবান্ধায় আখক্ষেতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনাকে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বলছে পুলিশ। এ ঘটনায় কারও উসকানি আছে কি না তাও খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
সম্প্রতি রংপুর সুগার মিলের সামনে আন্দোলনরত শ্রমিক, কর্মচারী-কর্মকর্তা ও চাষিদের সংবাদ সম্মেলন চলাকালে নিজেদের ক্ষেতে আগুন দেন মিলটির কর্মচারী ও আখচাষি জোবায়দুর রহমান। এ ঘটনায় ধারণ করার ভিডিও ভাইরাল হয় সামাজিক মাধ্যমে। চিনিকল বন্ধের ‘প্রতিবাদে’ আখ ক্ষেত পুড়িয়ে প্রতিবাদ - এমন শিরোনামে প্রতিবেদন আসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
অথচ চাষি জোবায়দুর বলছেন, মূলত চাষিদের আন্দোলন বেগবান করতে এবং মিডিয়ায় ঘটনাটি তুলে ধরতেই সেদিন জমিতে আগুন ধরিয়ে দেন তারা দুই ভাই।
লোকসান কমাতে গত ১ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া, পাবনা, পঞ্চগড়, শ্যামপুর (রংপুর), রংপুর ও সেতাবগঞ্জ (দিনাজপুর) চিনিকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি)। এই ছয় চিনিকলে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের আখ মাড়াই বন্ধ করা হয়েছে। এসব চিনিকলের আখ আশপাশের কলের জন্য সংগ্রহ করবে সরকার। শ্রমিক-কর্মচারীদের পর্যায়ক্রমে ওইসব কলে কর্মসংস্থানেরও আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে চিনিকলগুলোর শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তারা।
কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত ১৯ ডিসেম্বর শনিবার দুপুরে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জে অবস্থিত রংপুর চিনিকলের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন শ্রমিক, কর্মচারী-কর্মকর্তা ও আখ চাষিরা। পরে সংবাদ সম্মেলন চলাকালে মিলের পশ্চিম দিকে আখের জমিতে আগুন দেন মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের কৃষক জিল্লুর রহমান ও তার ভাই মিল কর্মচারী জোবায়দুর রহমান।
পরদিন গত ২০ ডিসেম্বর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চিনিকল নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পরিবেশন থেকে বিরত থাকতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিএসএফআইসি।
শনিবারের সংবাদ সম্মেলনেই ২০-২৪ ডিসেম্বর লাগাতার বিক্ষোভ সমাবেশ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা। মিল এলাকায় ২৫ ডিসেম্বর অর্ধদিবস হরতালের ডাকও দেন তারা, যেদিন আশপাশের কলগুলোয় আখ মাড়াই শুরু হওয়ার কথা।
আখ ক্ষেতে আগুন দেয়ার ওই ঘটনার পরদিন রোববার শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করেছেন রংপুর চিনিকলের আন্দোলনকারীরা। সোম ও মঙ্গলবার চিনিকলের সামনে আন্দোলনরত কাউকে দেখা যায়নি।
সেদিন আগুনে পুড়ে যায় জিল্লুর রহমান ও তার ভাই মিল কর্মচারী জোবায়দুর রহমানের ছয় বিঘার মধ্যে তিন বিঘা জমির আখ।
তারা দুই ভাই সরকারের কাছ থেকে ‘ক্ষতিপূরণ’ আদায়ে নিজেদের ক্ষেত পুড়িয়ে মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করার কথা বললেও পুলিশ বলছে- এখানে ‘গভীর ষড়যন্ত্র’ থাকতে পারে। কেউ তাদের উসকানি দিতে পারে।
গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘উৎপাদিত সকল ফসলের মালিক রাষ্ট্র। কিন্তু আপনি তা নিজের দাবি করে আগুনে পুড়ে ক্ষতি সাধন করতে পারেন না। এটা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড।’
বিষয়টিকে তিনি সন্তানকে খুনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘কেউ যদি আদালতকে বলে আমি আমার সন্তানকে মেরেছি; আপনি বিচার করার কে? এটাও এমন ঘটনা।’
ওসি মেহেদী জানান, তাদেরকে আখের জমিতে আগুন দিতে কারা বা কীভাবে উসকানি দিয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিজ হাতে জমিতে আগুন দেয়ার পর ক্ষেতের মালিক চিনিকলের কম্পিউটার অপারেটর জোবায়দুর দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘২০২০-২১ অর্থবছরে মিল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ৯ হাজার টাকা ঋণ নেই। সেই টাকায় ক্ষেতে সার-কীটনাশক ছিটাই। যেহেতু আখ মিলে নেয়া হবে না, তাই রাগ-ক্ষোভ থেকে দুই ভাই জমিতে আগুন দিয়েছি। কাজটা দেশের জন্য খারাপ হলেও নিজেদের দুঃখ জানান দিতে পেরে সঠিক কাজই করেছি বলে মনে করছি।’
জোবায়দুর জানান, মিল কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের কোনো বকেয়া নেই। তবে তার বেতনের প্রায় ৫০ হাজার টাকা পান তিনি।
আখক্ষেতে আগুন দেয়ার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল লতিফ প্রধান বলেন, ‘আমিও কৃষকের সন্তান। আমার জমিতেও আখ আছে। এ সমস্যায় আমি নিজেও রয়েছি। তাই বলে উসকানিতে ক্ষেত জ্বালিয়ে দেব?’
গত শনিবারের ওই ঘটনা নিয়ে রোববার বিকেলে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সম্মেলন কক্ষে জরুরি সভা হয়। সেখানে উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও চিনিকলের শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও আখ চাষি ফেডারেশনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সরকার তো অন্য মিলের জন্য চাষিদের আখ কিনবে। এরপরও কেন আগুন দিলেন- এমন প্রশ্নে জোবায়দুর রহমান বলেন, ‘রংপুর চিনিকলের চেয়ে ছোট জয়পুরহাট চিনিকলে আখ দিতে গেলে অনেক সময় লাগবে। এতে ক্ষেতের আখ জমিতেই শুকিয়ে যাবে। আখ তুলতে না পারলে ধান চাষও করা যাবে না।’
এসময় তিনি তার অন্য আখের জমিও পুড়িয়ে ফেলার হুমকি দেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত কারও উসকানিতে তারা নিজেদের ক্ষেতে আগুন দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ প্রসঙ্গে জোবায়দুর বলেন, ‘আমি চিনিকলের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। এ সময় সাংবাদিকদের দেখে আন্দোলনকে বেগবান করতেই আগুন দেই।’
আগুন লাগার মিনিট পাঁচেক পর সাংবাদিকরা জমিতে কীভাবে পৌঁছালেন- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সংবাদ সম্মেলনের স্থল থেকে আখের জমির দূরত্ব আধা কিলোমিটারের কম। আগুন দেয়ার পর কেউ তাদের ফোন করে।’
এ বিষয়ে চিনিকল শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান দুলাল বলেন, ‘মিল বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে শ্রমিক, কর্মচারী ও আখ চাষিদের টানা আন্দোলন কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে চলছে। কিন্তু শনিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনের সময়ে হঠাৎ মোবাইল ফোনে আখের জমিতে আগুন দেয়ার খবর আসে।’
আখের জমিতে আগুন দেয়ার ঘটনার জন্য জিল্লুর রহমান ও তার ভাই জোবায়দুরের ‘হটকারী ও জেদী মনোভাবকে’ দায়ি করেন তিনি।
চিনিকল নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পরিবেশন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বিএসএফআইসির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চলতি ২০২০-২১ মৌসুমে আখ মাড়াই স্থগিত থাকা ছয়টি চিনিকলের ক্যাচমেন্ট এলাকায় উৎপাদিত ও কৃষকের সরবরাহকৃত সমুদয় আখ ক্রয় করা হবে। এ সব চিনিকলের ক্যাচমেন্ট এলাকার আখ ক্রয় করা হবে না- মর্মে গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে।
বিএসএফআইসি জানিয়েছে, সংস্থাটির আওতাধীন চিনিকলগুলোর আধুনিকায়নের মাধ্যমে বহুমুখী খাদ্যপণ্য উৎপাদন করে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলসমূহকে লাভজনক করার লক্ষ্যে চলতি মৌসুমে ছয়টি চিনিকলে আখ মাড়াই কার্যক্রম স্থগিতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
এ সব চিনিকলে আখ মাড়াই কার্যক্রম চলতি মৌসুমের জন্য স্থগিত করা হলেও বিগত বছরগুলোর মতো এসব মিলের ক্যাচমেন্ট এলাকায় উৎপাদিত ও কৃষকের সরবরাহকৃত আখ কেনা হবে। পরবর্তীতে তা পার্শ্ববর্তী চালু মিলে মাড়াইয়ের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। চাষিদের আখের মূল্য পরিশোধে সরকার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দও দিয়েছে।
বিএসএফআইসি বলছে, চলতি মৌসুমে মিলের মাড়াই কার্যক্রম স্থগিত থাকার কারণে কোনো আখ চাষি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আখ মাড়াই স্থগিতকৃত চিনিকলগুলোতে কর্মরত কোনো শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাকে ছাঁটাই করা হবে না; যথাযথ বেতন/মজুরি দেয়া হবে।
বিএসএফআইসি জানিয়েছে, আখ মাড়াই চালু থাকা চিনিকলগুলোতে স্থগিত মিল থেকে শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পর্যায়ক্রমে বদলি বা সংযুক্তির মাধ্যমে সমন্বয় বা পদায়ন করা হবে।
ফাইল ছবি
ইউনূস আমলের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টানা টানাপড়েন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশের এই পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে নতুন সরকারের অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সংকটের নেপথ্যে অন্তর্বর্তী আমলের নীতিগত সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ: অর্থনীতিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অতীতের ঋণের দায়ই নয়, বরং অন্তর্বর্তী প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কিছু পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্তের অভাবও এই আর্থিক সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে। যেমন- ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে অতি-আগ্রাসী নীতি ও তারল্য সংকটব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেয়। তবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই বিভিন্ন ব্যবসায়িক গ্রুপ ও শিল্পোদ্যোক্তাদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ (Freeze) করা এবং ঢালাও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে বেসরকারি খাতে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়। ফলশ্রুতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়ে।
ব্যাংকগুলোর ওপর আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়ায় মারাত্মক তারল্য সংকট তৈরি হয়। অনেক কারখানা জনবল কমাতে বা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়, যা সামগ্রিক কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি ও এডিপি বাস্তবায়নে স্থবিরতা: ইউনূস সরকারের ‘ফেক’ বা কাল্পনিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব সংশোধন করতে গিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গতি কমিয়ে দেয়। পাইপলাইনে কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক ঋণ আটকে থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতার অভাবে প্রকৃত অর্থছাড় ১০৩ কোটি ডলার কমে যায়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সচল হওয়ার গতি হারায়।
ভুল ব্যাংক একীভূতকরণ নীতি: দুর্বল ব্যাংকগুলোকে ঢালাওভাবে একীভূত করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ও পরবর্তীতে তা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং পরিস্থিতির শিকার উদ্যোক্তাদের আলাদা করতে না পারায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। অতীতের মেগা প্রকল্পের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ সমাপ্তি ও আন্তর্জাতিক সুদের চাপ: যখন অভ্যন্তরীণ কারণে বিদেশি বিনিয়োগ কমছে, ঠিক তখনই অতীতের নেওয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্পের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ শেষ হওয়ায় আসল ও সুদ একসঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ফ্লোটিং রেট (বাজারভিত্তিক সুদ) বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণ পরিশোধের দায় ৪০০ কোটি ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে।
প্রশাসনিক শিথিলতা ও আর্থিক খাতের নতুন সিন্ডিকেট : অন্তর্বর্তী আমলের বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা। পূর্ববর্তী আমলের দুর্নীতি দমনের নামে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ যেভাবে ভেঙে পুনর্গঠন করা হয়েছে, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও নতুন এক ধরনের সুবিধাভোগী শ্রেণির (সিন্ডিকেট) উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়া ব্যাংক দখল বা পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়ায় পর্দার আড়ালে বড় ধরনের আর্থিক অনৈতিক সুবিধা ও তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
উন্নয়ন প্রকল্প ও ক্রয়ে স্বচ্ছতার অভাব : বিগত মেগা প্রকল্পগুলোর দুর্নীতি তদন্তের ধুয়া তুলে অনেক চলমান জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ স্থবির করে রাখা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে জরুরি সংস্কার বা জরুরি ক্রয়ের দোহাই দিয়ে টেন্ডার বা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়াই কিছু বিশেষ সংস্থাকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে, যা অন্তর্বর্তী প্রশাসনের স্বচ্ছতার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সুইস ব্যাংকে অর্থ বৃদ্ধি ও তদারকির ব্যর্থতা : ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ৪১শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে শুধু বৈধ প্রবাসী আয় বা ব্যাংকিং লেনদেন ছিল না; বরং ওই সময়ে দুর্বল তদারকির সুযোগ নিয়ে কতিপয় মহল দেশ থেকে নতুন করে বিপুল অর্থ পাচার করেছে। দুর্নীতি ও অর্থ পাচার রোধের জোরালো আশ্বাসের পরও মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারির অভাবে ওই সময়ে পুঁজি পাচার ঠেকানো সম্ভব হয়নি। যা প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও পরোক্ষ যোগসাজশকে নির্দেশ করে।
এদিকে, এক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে( ইউনূসের আমল) সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি।
এর আগে ২০২৪ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। প্রতি সুইস ফ্রাঁ ১৫২ টাকা ধরলে সুইস ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে সুইস ব্যাংকে ২০২৫ সালের শেষে বাংলাদেশিদের অর্থ জমার পরিমাণ ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থ জমা ছিল ২০২৫ সালে।
এদিকে, মঙ্গলবার (২৩ জুন) প্রকাশিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বিদেশি ঋণের মোট অর্থছাড় কমেছে ১০০ কোটি ডলারের (১ বিলিয়ন) বেশি।
একই সঙ্গে প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ সময়ে দেশের মোট ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ৪০০ কোটি ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে।
ইআরডির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত সময়ে বিদেশি ঋণের মোট প্রতিশ্রুতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২৩ কোটি ডলারে। আগের অর্থবছরের (২০২৪-২৫) একই সময়ে এই প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৫৪৯ কোটি ডলার; অর্থাৎ ঋণের প্রতিশ্রুতি প্রাপ্তিতে বড় ধরনের পতন হয়েছে।
প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বিদেশি ঋণের প্রকৃত অর্থছাড়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
রেকর্ড স্পর্শ করেছে ঋণ পরিশোধের দায়: যখন বিদেশি মুদ্রার আগমন বা সহায়তার উৎসগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে, ঠিক তখনই মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো চেপে বসেছে অতীতের নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের দায়।
ইআরডির তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের আলোচিত ১১ মাসে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ৪০০ কোটি ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে।
বিগত বছরগুলোতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল বা পদ্মা সেতুর রেল সংযোগের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য যে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর অনেকেরই ‘গ্রেস পিরিয়ড’ (ঋণ পরিশোধ শুরু করার আগের সময়কাল) শেষ হয়ে এসেছে। ফলে এখন থেকে আসল ও সুদ—উভয়ই একসঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় (বিশেষ করে ফ্লোটিং রেট বা বাজারভিত্তিক সুদের ক্ষেত্রে) ঋণ পরিশোধের খরচের খাতা দিন দিন ভারি হচ্ছে।
ইআরডির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত সময়ে বিদেশি ঋণের মোট প্রতিশ্রুতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২৩ কোটি ডলারে। আগের অর্থবছরের (২০২৪-২৫) একই সময়ে এই প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৫৪৯ কোটি ডলার; অর্থাৎ ঋণের প্রতিশ্রুতি প্রাপ্তিতে বড় ধরনের পতন হয়েছে।
ইআরডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরের এই সময়ে মোট বিদেশি সহায়তার অর্থছাড় কমে ৪৫৮ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৫৬১ কোটি ডলার। অর্থাৎ সামগ্রিক সম্পদ প্রবাহে ১০০ কোটি ডলারের বেশি ঘাটতি তৈরি হয়েছে।’
এর আগে গত ২৪ মে প্রকাশিত ইআরডির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে উন্নয়ন সহযোগীরা ৪২৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের অর্থছাড় করেছিল।
ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ: দেশের অর্থনীতিতে যখন বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ কমছে, ঠিক তখনই ঋণ পরিশোধের দায় ক্রমাগত বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই দেশের মোট ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ৪০০ কোটি ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশকে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা জোরদার করতে হবে। পাইপলাইনে আটকে থাকা কোটি কোটি ডলারের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে দ্রুত অর্থছাড়ের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে নতুন কোনো ঋণের চুক্তিতে যাওয়ার আগে তার সুদের হার, শর্ত এবং পরিশোধের সময়সীমা অত্যন্ত কঠোরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। সর্বাগ্রে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রতিটি ডলারের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে এই সংকট থেকে বাঁচার প্রধান উপায়।
ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলামের নিকট আজ মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদন প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়ক ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা গোলাম কিবরিয়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত বার্ষিক প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কার্যালয়ে এ হস্তান্তর কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময় অন্যদের মধ্যে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রশাসন) এ.কে.এ.এম ফজলুল হক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ) মিজানুল হক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (আরপিঅ্যান্ডডি) মো. আজিজুল হক, প্রধান প্রকৌশলী আলমগীর হাছিন আহমেদ ও প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সালেকুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রেসিডেন্ট ও সিইও আলোইস জভিংগি। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় চীনের দালিয়ান আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এ সাক্ষাৎ হয়। সাক্ষাৎকালে আলোইস জভিংগি সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের মতো অন্যান্য ডেল্টা রাষ্ট্র এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর সহায়তায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছরে ২৫০ মিলিয়ন বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি তিনি প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার, বন্যার ঝুঁকি হ্রাস এবং পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
তিনি আরও জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে উৎসাহ প্রদানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কর-সুবিধা প্রদান করেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
আলোইস জভিংগি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগকে বৈশ্বিক পরিসরে কাজে লাগানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
আলোইস জভিংগি বলেন, বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ সৃষ্টি করবে।
তিনি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।
আলোইস জভিংগি প্রধানমন্ত্রীকে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান।
এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।
নবম জাতীয় পে-স্কেলের নানা বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সভা ডেকেছে পে-স্কেল নিয়ে গঠিত সচিব কমিটি। এই সভায় চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি, গেজেট প্রকাশ, কয় ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়ন হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, সচিব কমিটির প্রাথমিক প্রস্তাবনা অনুযায়ী তিন ধাপে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা হলেও এটি দুই ধাপে করা যায় কিনা সে বিষয়ে আলোচনা করা হবে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এমন আলোচনা এসেছে। দুই ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে আগামী ১ জুলাই থেকে শতভাগ বেসিক বৃদ্ধি পাবে।
সূত্রের তথ্য বলছে, শুধু বেসিকের বিষয়টিই নয়; সচিব কমিটির সভায় পে-কমিশনের সুপারিশের কতটুকু কার্যকর করা হবে অর্থা পে-কমিশন বেতন বৃদ্ধির যে সুপারিশ করেছিল তার কতটুকু বাস্তবায়ন করা হবে সে বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা কত টাকা বৃদ্ধি করা হবে সেটিও আলোচনা করা হবে।
এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, সচিব কমিটির সভা রয়েছে। সভায় নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর হবে। তবে বেসিকের ৫০ শতাংশ নাকি শতভাগ বৃদ্ধি পাবে সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। জুলাই থেকে পে-স্কেল কার্যকর হলেও টাকা পেতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে। সচিব কমিটির সভায় অনেক কিছুই চূড়ান্ত হবে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।’
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের ওপর বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই (জুলাই-মে) বিদেশি ঋণদাতাদের অতীতের ঋণের সুদ ও আসল বাবদ ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে। এর বড় অংশই গেছে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপানের কাছে। অন্যদিকে প্রতিবেদন সূত্রে দেখো গেছে বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতিও কমেছে। মঙ্গলবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জুলাই-মে মাসের বিদেশি ঋণ পরিস্থিতির হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ওই ১১ মাসে আগের নেয়া ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশকে বিভিন্ন ঋণ দাতাসংস্থা ও দেশকে ৪১৩ কোটি ২৩ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে, যা বিদেশি ঋণ শোধে নতুন রেকর্ড। এ ছাড়া টাকার হিসাবে ওই সময়ে ৫০ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা অর্থাৎ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি শোধ করতে হয়েছে। জুলাই-মে সময়ে বিদেশি ঋণ ও অনুদান এসেছে প্রায় ৪৫৮ কোটি ডলার।
গত কয়েক বছর ধরে বিদেশি ঋণ পরিশোধে চাপ বেড়েছে। গত অর্থবছরে প্রথমবারের মতো চার বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। গত অর্থবছরের বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল মিলিয়ে ৪০৯ কোটি ডলার শোধ করেছে বাংলাদেশ। এবার ১১ মাসেই এর চেয়ে বেশি শোধ করল বাংলাদেশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঋণ শোধের পরিমাণ ছিল ৩৩৭ কোটি ডলার।
ইআরডির প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) বিদেশি ঋণের আসল ২৬৮ কোটি ৪৩ লাখ ডলার ও সুদ ১৪৫ কোটি ডলার শোধ করেছে সরকার। অন্যদিকে ৪১৪ কোটি ডলার ঋণ হিসেবে এবং ৪৩ কোটি ডলার অনুদান হিসেবে পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতিও কমেছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ৪২২ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে সাড়ে ৫০০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছিল।
গত ১১ মাসে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংক দিয়েছে প্রায় ৯৬ কোটি ডলার। এরপর আছে রাশিয়া। রাশিয়া ৯৩ কোটি ডলার। আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দিয়েছে ৭৮ কোটি ডলার। চীন ও ভারত ছাড় করেছে যথাক্রমে ৫৩ কোটি ডলার ও ২৫ কোটি ডলার। জাপান দিয়েছে ৪৩ কোটি ডলার।
সরকার বাজেটের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ ও অনুদান নেয়। এ ছাড়া বাজেট সহায়তা হিসেবেও অর্থ নেয়। এ ছাড়া বেসরকারি খাতকেও উন্নয়ন সহযোগীরা ঋণ দেয়।
জুলাই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের হুমকি দেওয়াসহ নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গত সোমবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় উপস্থিত থাকা একাধিক সিন্ডিকেট সদস্য এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সাময়িকভাবে বরখাস্ত হওয়া শিক্ষকরা হলেন- ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দীন, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজমল হোসেন ভূঁইয়া। এ ছাড়া একই অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা লাভলু মোল্লা শিশিরকেও (মুহাম্মদ লাভলু মোল্লা) সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবকে বিভাগের একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ অনুয়ায়ী একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান গেয়ে ব্যাপক পরিমাণ ভাইরাল হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছিল।
ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানের ছবি ব্যবহার করে ফেসবুকে প্রতারণার অভিযোগে করা মামলায় শফিক নজরুল নামের এক আইনজীবীকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। শেরেবাংলা নগর থানায় সাইবার নিরাপত্তা আইনে করা এই মামলার পাশাপাশি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের দায়ের করা পৃথক আরেকটি প্রতারণা মামলাতেও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
মঙ্গলবার শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালত এই আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, শেরেবাংলা নগর থানার সাইবার নিরাপত্তা আইনের মামলায় আসামিকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে বার কাউন্সিলের প্রতারণা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনও মঞ্জুর করেন আদালত।
শুনানিতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে বলেন, ‘ফেসবুকভিত্তিক প্রতারণা চক্রের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা, অর্থ লেনদেন এবং ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উদঘাটনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।’
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান ও অ্যাটর্নি জেনারেলের মেয়ে আদিবার ছবি ব্যবহার করে ফেসবুকে বার কাউন্সিল পরীক্ষার চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে তিনি প্রতারণা করে আসছিলেন। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী প্রতারণার শিকার হয়ে আদালত মামলা দায়ের করেন। আমরা আসামি সর্বোচ্চ রিমান্ড আবেদন করি, আদালত আসামির ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।’
মামলার এজাহার অনুযায়ী, অভিযুক্ত শফিক নজরুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘LAW DOCTOR’ নামে একটি পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজে জাইমা রহমানের ছবি ব্যবহার করে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পরীক্ষায় শতভাগ কমন, পরীক্ষায় পাস করানোর নিশ্চয়তা এবং বিশেষ কোচিং সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হতো।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চটকদার এই বিজ্ঞাপন দেখে অনেক পরীক্ষার্থী যোগাযোগ করলে তিনি বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের নামে অর্থ হাতিয়ে নেন। পরবর্তীতে পরীক্ষার্থীদের বার কাউন্সিল পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেন। কিন্তু টাকা নেওয়ার পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোনো সুবিধা না দিয়ে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তি বার কাউন্সিলের সনদ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। একাধিক ভুক্তভোগী এ বিষয়ে অভিযোগ করার পর বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নামে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে প্রতারণার সত্যতা মেলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মন্তব্য