× হোম রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া সিটিজেন জার্নালিজম বিচিত্র ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ নির্বাচন রেস অন্যান্য আফগানিস্তান ১৫ আগস্ট কী-কেন স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও যৌনতা-প্রজনন ইউরোপ অন্যান্য উদ্ভাবন প্রবাসী আফ্রিকা ক্রিকেট শারীরিক স্বাস্থ্য আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়া সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ মানসিক স্বাস্থ্য ব্লকচেইন অন্যান্য ভাষান্তর ফুটবল অন্যান্য পডকাস্ট বাংলা কনভার্টার নামাজের সময়সূচি আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ প্রাইভেসি পলিসি

জাতীয়
একাত্তরের যীশু
google_news print-icon

একাত্তরের যীশু

একাত্তরের-যীশু
আজমিরীগঞ্জ বাজারের মাঝে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে তার মরদেহ এমনভাবে রাখা হয় যাতে তার ভয়ংকর পরিণতি সবাই দেখতে পারে। বাঁধা অবস্থাতেই অস্ত্র দিয়ে খোঁচানো হয় নিথর দেহ। জগৎজ্যোতির গাঁয়ে থু থু ফেলে রাজাকাররা।

১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর দুপুর। হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার বদলপুরে যুদ্ধ শুরু হয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর মধ্যে। হঠাৎ একটি গুলি লাগল ইলিয়াস চৌধুরীর বুকে। মাথার গামছা খুলে সহযোদ্ধার বুক বেঁধে দিয়ে দাস বাহিনীর কমান্ডার জগৎজ্যোতি বললেন, ‘বাঁচবি?’ তরুণ ইলিয়াসের জবাব, ‘বাঁচতে পারি।’ এবার জগৎজ্যোতির নির্দেশ, ‘তাহলে যুদ্ধ কর।’

এই যুদ্ধে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান ইলিয়াস চৌধুরী; শহীদ হন জগৎজ্যোতি দাস।

সেই ইলিয়াস নিউজবাংলাকে শুনিয়েছেন জগৎজ্যোতি ও তার দলের বীরত্বের কাহিনী।

তিনি জানান, যুদ্ধে জগৎজ্যোতির নামে ‘দাস পার্টি’ নামে আলাদা বাহিনী গঠিত হয়। অসীম সাহসী ও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের এ বাহিনী বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে শত্রুদের কাছে ছিল আতঙ্কের নাম। যুদ্ধের সময় উত্তরপূর্ব রণাঙ্গণের মুক্তি সেনাদের কাছে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন জগৎজ্যোতি ও তার দাস পার্টি।

১৬ নভেম্বর সন্ধ্যার আগে আগে নিজ গ্রাম জলসুখার পাশেই শহিদ হন দাস পার্টির তরুণ কমান্ডার জগৎজ্যোতি দাস। এর অনেক আগেই ‘টেরর দাস’-এর মাথার দাম ঘোষণা করেছিল হানাদাররা। কাকতালীয়ভাবে মাথায়ই গুলি লাগে তার। ‘আমি যাইগ্যা’ বলে সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে বিদায় নেন তিনি।

বিলের কাদাপানিতে কমান্ডারের মরদেহ ঢেকে রেখে সেদিন কোনোমতে প্রাণ নিয়ে ফিরেছিলেন ইলিয়াস।

তিনি জানান, কিন্তু পরদিন বৃষ্টি হয়, বিলে ভেসে ওঠে জগৎজ্যোতির মরদেহ। সেই মরদেহ নিয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়ায় পাকিস্তানি হানাদাররা। তার বাবা-মাকে ঘর থেকে টেনে এনে ছেলের মরদেহ দেখানো হয়। পরে পুড়িয়ে দেয়া হয় তাদের বসতঘর।

এরপর আজমিরীগঞ্জ বাজারের মাঝে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে তার মরদেহ এমনভাবে রাখা হয় যাতে তার ভয়ংকর পরিণতি সবাই দেখতে পারে। এ ঘটনার একটি ছবি পাওয়া যায়।

শহর থেকে ফটোগ্রাফার ভাড়া করে পাকিস্তানি সেনারাই ছবিটি তুলিয়েছিল। এই ছবি দেখলে জগৎজ্যোতিকে যীশু খ্রিষ্টের মতো মনে হয়। যীশুর মতোই খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয় তার মরদেহ। বাঁধা অবস্থায়ই অস্ত্র দিয়ে খোঁচানো হয় নিথর দেহ। জগৎজ্যোতির গাঁয়ে থু থু ফেলে রাজাকাররা। পরবর্তী সময়ে মরদেহটি ভাসিয়ে দেয়া হয় ভেড়ামোহনার পানিতে।

এ ঘটনার ঠিক এক মাস পর বাংলাদেশ পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হয়।

জগৎজ্যোতিকে সর্বোচ্চ সম্মাননা দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে। কিন্তু স্বাধীনতার পর তার ভাগ্যে সর্বোচ্চ সম্মান মেলেনি, মিলেছে ‘বীর উত্তম’ খেতাব।

জগৎজ্যোতি যেখানে শহিদ হয়েছেন, সেখানে নেই কোনো স্মৃতিস্তম্ভ। তার গ্রামেও নেই এই বীর মুক্তিযোদ্ধার কোনো স্মৃতিচিহ্ন। তার পরিবারও পায়নি কোনো রাষ্ট্রীয় সুবিধা। এক খণ্ড জমির আশ্বাস দেয়া হলেও তা আশ্বাসই রয়ে গেছে। বেঁচে থাকা জগৎজ্যোতির একমাত্র ভাতৃবধূ থাকেন নিজের মেয়ের বাড়িতে।

‘ভাটির বীরশ্রেষ্ঠ’

হবিগঞ্জের হাওরবেষ্টিত আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে ১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল জন্ম নেন জগৎজ্যোতি দাস। বাবা জীতেন্দ্র চন্দ্র দাস ও মা হরিমতি দাসের ছোট সন্তান তিনি। তার বাবা ও বড় ভাই রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন।

১৯৬৮ সালে দ্বিতীয় বিভাগে মেট্রিক পাস করেন জগৎজ্যোতি। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য ভারতের অসমে কাকার বাড়ি যান। এর আগে স্থানীয় বীরচরণ হাইস্কুলে পড়ার সময়ই ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হন তিনি, জড়িয়ে পড়েন বামধারার রাজনীতিতে।

একাত্তরের যীশু

অসমে জগৎজ্যোতির উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর মারা যান তার কাকা ননীগোপাল দাস। হুমকিতে পড়ে তার শিক্ষাজীবন। চাচাতো ভাই তাকে ভর্তি করিয়ে দেন সেখানকার সেনাবাহিনীতে। প্রশিক্ষণ শেষে চাকরিতে ঢোকার দুদিন আগে বাংলাদেশে ফিরে আসেন জ্যোতি।

এরপর নিজ গ্রাম জলসুখার কৃষ্ণগোবিন্দ পাবলিক হাইস্কুলে ৭৫ টাকা বেতনের শিক্ষকতার চাকরি নেন। পরে চাকরি ছেড়ে সুনামগঞ্জ কলেজে গিয়ে স্নাতকে ভর্তি হন।

১৯৭১ সালে জগৎজ্যোতি ছিলেন সুনামগঞ্জ ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সারির কর্মী। যুদ্ধের শুরুতে সুনামগঞ্জ সীমান্তের ওপারে মেঘালয় রাজ্যের বালাটে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন তিনি। সেখানেই পরিচয় ইলিয়াস চৌধুরীর সঙ্গে।

ইলিয়াস বলেন, ‘শরণার্থী শিবিরে স্থানীয় কিছু খাসিয়া অনেক জ্বালাতন করত। মারধর করে টাকা-পয়সা নিয়ে যেত। জগৎজ্যোতি এসবের প্রতিবাদ করেন। শরণার্থী কয়েকজন তরুণকে নিয়ে একটা দল গঠন করেন। একদিন খাসিয়ারা আক্রমণ করতে এলে পাল্টা আক্রমণ করে জগৎজ্যোতির দল।’

এ ঘটনার পর থেকে ইলিয়াস ছিলেন ‘প্রিয় দাদার’ দোসর। টেকেরঘাটের আরেকটি ঘটনা শুনিয়েছেন ইলিয়াস চৌধুরী।

তিনি বলেন, ‘‘টেকেরঘাট শরণার্থী শিবিরে আয়োজন করা হয়েছিল দুর্গাপূজার। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় জওয়ানরা অংশ নিয়েছিলেন। পূজামণ্ডপে হিন্দিভাষী এক জওয়ান বাঙালি এক মেয়েকে উত্ত্যক্ত করায় জ্যোতিদা তার মাথা ফাটিয়ে দেন। এ ঘটনায় জ্যোতি ও তার দলের কয়েক জনকে আটক করে নেয়া হয় মেজর ভাটের দপ্তরে।

“সেখানে জ্যোতি বলেন, ‘পাকিস্তান আর্মির যে আচরণের জন্য আমরা অস্ত্র হাতে নিয়েছি, সেই আচরণ ভারতীয় বাহিনীর কাছ থেকে পেয়েছি বলেই আঘাত করতে বাধ্য হয়েছি। আমাদের গুলি করতে হলে করুন, কিন্তু হাত বাঁধা অবস্থায় না। আমরা মুক্তিযোদ্ধা, ক্রিমিনাল না।’ জ্যোতির এমন সাহসী উচ্চারণে মন গলে ভারতীয় মেজরের। কয়েকটা বাংকার খোড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে তাদের শাস্তি।’’

বালাটের শরণার্থী শিবির থেকে যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য সদলবলে শিলংয়ে ট্রেনিংয়ে যান জ্যোতি। নেতৃত্বগুণ, সাহসিকতা, কঠোর পরিশ্রম এবং ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার দক্ষতার জন্য সহজেই সবার দৃষ্টি কাড়েন তিনি। জ্যোতির নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে ‘দাস পার্টি’।

মুক্তিযুদ্ধে টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের ভাটি অঞ্চল শত্রুমুক্ত রাখার দায়িত্ব পড়ে দাস পার্টির ওপর। দিরাই, শাল্লা, ছাতক, আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণার নৌপথ পাকিস্তানি দখলমুক্ত রাখতে যুদ্ধ করে তারা। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর রসদবাহী জাহাজ ডোবানো, অস্ত্রবাহী লঞ্চ দখল, রাজাকারদের নৌকা উড়িয়ে দেয়ার কাজ সাফল্যের সঙ্গে করতে থাকে এ বাহিনী।

দাস পার্টির আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পাকিস্তান সরকার রেডিওতে ঘোষণা দেয়, ওই নৌপথ দিয়ে চলাচলকারীদের জানমালের দায়িত্ব সরকার নেবে না।

বানিয়াচংয়ে হানাদারদের প্রায় ২৫০ সদস্য ও তাদের দোসরদের পিছু হটতে বাধ্য করেন জ্যোতি। এ যুদ্ধে শত্রুপক্ষের ৩৫ জন মারা যায়। ১৭ আগস্ট পাহাড়পুড়ে তার বুদ্ধি ও বীরত্বে রক্ষা পায় অসংখ্য বাঙালির প্রাণ। এ যুদ্ধে মারা যায় শতাধিক রাজাকার। ভেড়ামাড়ায় শত্রুদের কার্গো কনভয় ধ্বংস করে দেয়া হয়। জগন্নাথপুরের রানীগঞ্জে রাজাকারদের ঘাঁটি গুড়িয়ে দেয় দাস পার্টি। মার্কুলিতে দুই শতাধিক রাজাকারের আস্তানা দখল করা হয়। সদরপুর ব্রিজ উড়িয়ে ঠেকিয়ে দেয়া হয় পাকিস্তানিদের।

জামালগঞ্জ থানা ভবন দখলের মধ্য দিয়ে জামালগঞ্জ মুক্ত করার যুদ্ধ শুরু। এ যুদ্ধে শহিদ হন দাস পার্টির সিরাজুল ইসলাম। পরবর্তী সময়ে সিরাজুলকে বীর বিক্রম খেতাব দেয়া হয়। এরপর শ্রীপুর শত্রুমুক্ত করেন জগৎজ্যোতি।

আগস্ট মাসে দিরাই-শাল্লায় অভিযান চালিয়ে কোনো গুলি ব্যয় না করেই কৌশলে আটক করা হয় ১০ জন রাজাকারের একটি দলকে। রানীগঞ্জ ও কাদিরীগঞ্জে অভিযান চালিয়েও দাস পার্টি আটক করে রাজাকারদের।

‘চক্রব্যুহে অভিমন্যু’

১৬ নভেম্বর ভোরে দাস পার্টির ৪২ জনকে নিয়ে নৌকায় হবিগঞ্জের বাহুবলের দিকে রওনা দেন জগৎজ্যোতি। পথে বদলপুর ইউনিয়ন অফিসের সামনে রাজাকারদের পাতা ফাঁদে পড়ে যান তারা। তিন-চার জন রাজাকার ব্যবসায়ীদের নৌকা আটকে চাঁদা আদায় করছিল। ক্ষুব্ধ জ্যোতি রাজাকারদের ধরে আনার নির্দেশ দেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেই পিছু হঠতে থাকে রাজাকাররা।

১০-১২ জন মুক্তিযোদ্ধা সামান্য গোলাবারুদ নিয়ে তাড়া করেন রাজাকারদের। এদিকে পাকিস্তানি সেনারা বিশাল বহর আর প্রচুর গোলাবারুদ নিয়ে দুই দিকে ঘাপটি মেরে ছিল। সেই চক্রব্যুহে ঢুকে পড়ে দাস পার্টি। শুরু হয় যুদ্ধ। ফুরিয়ে আসতে থাকে গোলাবরুদ। হতাহত হন অনেকে।

বিকেল পৌনে ৫টা। জ্যোতির অস্ত্রভান্ডার প্রায় শূন্য। সহযোদ্ধা বলতে কেবল গুলিবিদ্ধ ইলিয়াস। তবু পিছু ফিরছেন না তিনি। আচমকা একটা বুলেট এসে লাগে জ্যোতির মাথায়। জগৎজ্যোতি শেষবারের মতো চিৎকার করে বলেন ‘আমি যাইগ্যা’।

বঞ্চনার শুরু যুদ্ধের পরই

জগৎজ্যোতি দাসকে নিয়ে ‘সিলেটের যুদ্ধকথা’ বইয়ে তাজুল মোহাম্মদ লিখেছেন, ‘সে সময় (শহিদ হওয়ার পর) স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা দেয়া হয় যে, জগৎজ্যোতি দাসকে সর্বোচ্চ খেতাব প্রদান করা হবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর তার বাস্তবায়ন হয়নি।’

মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী ‘একাত্তরের দিরাই-শাল্লা’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘জগৎজ্যোতির প্রতি বাংলাদেশ সরকার তার প্রতিশ্রুতি রাখেনি। ... সর্বোচ্চ খেতাব মুক্তিযুদ্ধের একটি বিশেষ অংশের জন্য সীমাবদ্ধ রয়ে গেল। সরাসরি সশস্ত্র বাহিনীর না হলে সর্বোচ্চ খেতাব দেয়া যাবে না। অতএব জগৎজ্যোতিও বাদ। ওতে কিছু যায় আসেনি। জ্যোতিরও কোনো ক্ষতি হয়নি। স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী জগৎজ্যোতিরা অমর। তাদের কীর্তি অক্ষয় অবিস্মরণীয়।’

মুক্তিযুদ্ধের ৪ নম্বর সেক্টরের সাব কমান্ডার মাহবুবুর রব সাদীকে ১৯৭২ সালে ‘বীর প্রতীক’ খেতাব প্রদান করা হলে তিনি তা বর্জন করেন। ২৩তম স্বাধীনতা দিবসের আগে আবার তা দিতে চাইলে আবারও বর্জন করেন সাদী।

এ প্রসঙ্গে দৈনিক আজকের কাগজে এক সাক্ষাৎকারে সাদী বলেন, ‘আমি নিজে অন্তত তিন জনকে জানি, যাদের বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব পাওয়া উচিত ছিল। এদের এক জন জগৎজ্যোতি। মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসী বীরত্ব প্রদর্শন করেও যারা যথাযথ মূল্যায়ন ও খেতাব পাননি তাদের আত্মার প্রতি সম্মান দেখাতেই আমি খেতাব ও সম্মান বর্জন করেছি।’

একাত্তরের যীশু

স্বাধীনতার পর আজমিরীগঞ্জ উপজেলার নাম জগৎজ্যোতিগঞ্জ করার প্রস্তাব দেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের বিরোধিতায় তা সম্ভব হয়নি।

সুনামগঞ্জের পৌর পাঠাগারের নাম রাখা হয় জগৎজ্যোতি পৌর পাঠাগার নামে। তবে জগৎজ্যোতির নিজ জেলা হবিগঞ্জে জগৎজ্যোতির স্মৃতিরক্ষায় নেই তেমন কোনো উদ্যোগ।

দেশ মিলেছে, দিন ফেরেনি

জলসুখা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশীদ জগৎজ্যোতির বাল্যবন্ধু। তিনি নিজেও দাস পার্টির সদস্য ছিলেন।

তিনি জানান, গ্রামেও জগৎজ্যোতির কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা স্মৃতিরক্ষার কোনো উদ্যোগ নেই।

জগৎজ্যোতিদের প্রাণের বিনিময়ে মানচিত্র আর লাল সবুজের পতাকার মালিকানা মিললেও দিন ফিরেনি তাদের পরিবারের। এখনও দরিদ্র্যই সঙ্গী তাদের।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জগৎজ্যোতির বাবা, মা ও ভাই অনেক আগেই মারা গেছেন। আছেন বৌদি, বোন ও ভাতিজা। বৌদি ফনিবালা দাস নবীগঞ্জের ইনাতগঞ্জে মেয়ের বাড়িতে থাকেন। তার ছেলে দুলালচন্দ্র দাস হবিগঞ্জে এক দোকানে চাকরি করেন। আর জ্যোতির বোন থাকেন দিরাইয়ে স্বামীর বাড়িতে।

জগৎজ্যোতির ভাতিজা দুলালচন্দ্র দাস জানান, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হবিগঞ্জে বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গায় তাদের পরিবারের বসবাসের জন্য এক খণ্ড জমি দেয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।

‘কিন্তু আজও সে জায়গা আমরা পাইনি’, আক্ষেপের সুরে বলেন জগৎজ্যোতির ভাতিজা।

জ্যোতির সহযোদ্ধা ইলিয়াস চৌধুরী বলেন, ‘জগৎজ্যোতিকে যে স্থানে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল সেখানে একটি স্মৃতিসৌধ করার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমি একা চাইলে তো হবে না। সবাই মিলে চাইলে সম্ভব হবে।’

তিনি বলেন, ‘তার (জগৎজ্যোতি) পরিবারের কেউ মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান কি না, আমার জানা নেই।’

আজমিরীগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা উত্তম কুমার দাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘জগৎজ্যোতির পরিবার এখানে থাকেন না। তারা কোথায় আছেন, তাও জানি না। তার পরিবারের কেউ মুক্তিযোদ্ধা ভাতাও নেন না।’

তিনি জানান, জগৎজ্যোতির স্মৃতিরক্ষায় ভেড়ামোহনা নদীর পারে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হচ্ছে। আজমিরীগঞ্জে ‘বীর উত্তম জগৎজ্যোতি দাস’ নামে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র: হাসান মোরশেদের দাস পার্টির খোঁজে এবং অপূর্ব শর্মার অনন্য মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি

মন্তব্য

আরও পড়ুন

জাতীয়
Governments multifaceted initiative to expand solar power continues Chief Whip

সৌরবিদ্যুতের বিস্তারে সরকারের বহুমুখী উদ্যোগ অব্যাহত: চিফ হুইপ

সৌরবিদ্যুতের বিস্তারে সরকারের বহুমুখী উদ্যোগ অব্যাহত: চিফ হুইপ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি- এমপি বলেছেন, আধুনিক সভ্যতায় বিদ্যুৎ ছাড়া উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি কল্পনা করা যায় না। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সারাদেশে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুতের প্রসারে বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

আজ (মঙ্গলবার) রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত “Solar Revolution : Lessons for Bangladesh from National Budget Perspective” শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

চিফ হুইপ বলেন, বর্তমান বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। সরকার সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে মালয়েশিয়া ও চীন সফরে রয়েছেন। এ সফর দু’টি বাংলাদেশের জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে নতুন বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ইতিবাচক অগ্রগতির বিষয়ে দেশবাসী শিগগিরই সুখবর পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মোঃ নূরুল ইসলাম মনি আরও বলেন, জাতীয় সংসদ ভবনসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত লাভজনক। সাধারণত চার বছরের মধ্যেই বিনিয়োগের অর্থ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় এবং পরবর্তী দীর্ঘ সময় ধরে এসব প্রকল্প থেকে আর্থিক ও পরিবেশগত সুফল পাওয়া যায়।

তিনি দেশের জ্বালানি খাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে নবায়নযোগ্য জ্বালানী বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ, সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ গণসমাধ্যমকর্মীগণ উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য

জাতীয়
Current budget aimed at overcoming fragile economic situation Chief Whip

ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যেই বর্তমান বাজেট: চিফ হুইপ

ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যেই বর্তমান বাজেট: চিফ হুইপ ছবি: নিউজ বাংলা

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ মোঃ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, দেশের বিদ্যমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার একটি মানবিক, জনকল্যাণমুখী ও সাশ্রয়ী বাজেট প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।

আজ (মঙ্গলবার) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এমবিএ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমএবি) আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটবিষয়ক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ব্যাংকিং খাতের অনিশ্চয়তা ও আমানতকারীদের নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে চীফ হুইপ বলেন, বিগত সরকারের সময় এমন একটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল, যার ফলে কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেলে আমানতকারী তাঁর জমার পরিমাণ যাই হোক না কেন, সর্বোচ্চ এক লাখ টাকাই ফেরত পেতেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, “কেন এ ধরনের আইন করা হয়েছিল এবং কেন জনগণকে তা মেনে নিতে বাধ্য করা হয়েছিল?” তাঁর মতে, তৎকালীন সরকার ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তিনি বলেন, “ব্যাংকিং খাতকে কার্যত ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।” এ খাতের টেকসই সংস্কারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর আলোচনা প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অর্থ পাচার ও মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে চীফ হুইপ তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশ থেকে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। পাচার হওয়া অর্থের চাপ সামাল দিতে ডলারের মূল্য ৮২ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকায় উন্নীত করা হয়। তিনি উল্লেখ করেন, একদিনেই ডলারের দাম ৭ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এর ফলে সৃষ্ট উচ্চ মূল্যস্ফীতির বোঝা সাধারণ মানুষের পক্ষে বহন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও গণতন্ত্রের গুরুত্ব তুলে ধরে চীফ হুইপ অতীতের বাকশাল শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “বাকশালের মাধ্যমে দেশের মৌলিক অধিকার ও বিচারব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।” একই সঙ্গে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, “জিয়াউর রহমান অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে নিয়েছিলেন এবং কৃষি উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন।” তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান।

বাজেটকে কেবল সংখ্যার হিসাব হিসেবে না দেখে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়ে চীফ হুইপ বলেন, “বাজেট নিয়ে আমরা অনেক তাত্ত্বিক আলোচনা করি; কিন্তু সাধারণ মানুষের কান্না থামানো এবং তাদের জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বাজেট প্রণয়ন করেছে। এ সময় তিনি সমাজের অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষের কষ্ট লাঘব এবং লুণ্ঠিত সম্পদ পুনরুদ্ধারে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করতে গঠনমূলক সমালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুযোগ উন্মুক্ত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে চীফ হুইপ দেশের স্বার্থে সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

এমএবির সভাপতি সৈয়দ আলমগীরের সভাপতিত্বে এবং ড. মোঃ শামসুজ্জামানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. এ. কে. এম. ওয়ারেছুল করিম। অনুষ্ঠানে সিনিয়র সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, জুবায়ের আহমেদ বাবুসহ বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ বক্তব্য রাখেন।

মন্তব্য

জাতীয়
17 Simultaneous resignation of Deputy and Assistant Attorney General

১৭ ডেপুটি ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের একযোগে পদত্যাগ

১৭ ডেপুটি ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের একযোগে পদত্যাগ ছবি: সংগৃহীত

অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে কর্মরত জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত ১৭ জন আইন কর্মকর্তা একযোগে পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগকারীদের মধ্যে ৭ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১০ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল রয়েছেন। সোমবার (২২ জুন) বিকেলে তারা সম্মিলিতভাবে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে তাঁদের পদত্যাগপত্র জমা দেন। মঙ্গলবার (২৩ জুন) পদত্যাগকারী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তারিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পদত্যাগকারী ৭ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হলেন— ইউসুফ আলী, শফিকুর রহমান, আবদুল করিম, ফরিদ উদ্দিন খান, গোলাম রহমান ভুঁইয়া, আসাদ উদ্দিন এবং তারিকুল ইসলাম। এছাড়া পদত্যাগকারী ১০ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের তালিকায় রয়েছেন— ইমরুল কায়েছ রানা, হুমায়ুন কবির তানিম, আবদুল কাইয়ুম ভুঁইয়া, আবদুল্লাহিল মারফ ফাহিম, জোয়াদুর রহমান, শামসিল আরেফিন, মাহাবুবা আক্তার রলি, নূর নবী উজ্জ্বল, আল রেজা আমির এবং রেজাউল ইসলাম।

মন্তব্য

জাতীয়
The court will decide whether Awami League will be banned Information Advisor Dr Zaheed

আদালতে নির্ধারিত হবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে কিনা: তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ

আদালতে নির্ধারিত হবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে কিনা: তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ ছবি: সংগৃহীত

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং তাদের কৃতকর্মের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার (২৩ জুন) তথ্য অধিদফতরে আয়োজিত এক সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

ডা. জাহেদ উর রহমান দলটির আইনি অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, “আওয়ামী লীগ দলটা নিষিদ্ধ হবে কি হবে না—সেটা নির্ধারিত হবে আদালতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। তারা মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত ছিল কি ছিল না, সেটা বিচারের পর নির্ধারিত হবে।” তবে তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, বর্তমান আইন অনুযায়ী তাদের সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে নিষিদ্ধ থাকবে। যদি এই দল মাঠে কোনো কর্মসূচি পালন করার চেষ্টা করে, তবে সেটি আইন ভঙ্গ হিসেবে গণ্য হবে এবং সরকার কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে।

তথ্য উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন যে, আওয়ামী লীগের রাজপথে নামার মতো কোনো নৈতিক সাহস অবশিষ্ট নেই। তাঁর মতে, কোনো বড় রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হলে যে ধরনের নৈতিক শক্তির প্রয়োজন হয়, তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে দলটির নেই। তিনি রসিকতা করে বলেন, “আমরা বলি না ‘চোরের মায়ের বড় গলা’, সবার ডিমেনশিয়া হবে, মানে সবাই সবকিছু ভুলে যাবে আর কি! তারপর আওয়ামী লীগ বড় গলায় কথা বলতে পারবে, এর আগে আমার মনে হয় না।” রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে থাকলেও সরকারই প্রশাসনিকভাবে এই নিষিদ্ধ সংগঠনের অপতৎপরতা রুখে দেবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

জাতীয়
Law and order forces are on maximum alert around the founding anniversary of banned activities

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সর্বোচ্চ সতর্কতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সর্বোচ্চ সতর্কতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছবি: সংগৃহীত

কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যেকোনো ধরনের নাশকতা, বিশৃঙ্খলা ও অপ্রীতিকর ঘটনা মোকাবিলায় পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনী সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছে। মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকাল থেকেই রাজধানীর কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা লক্ষ্য করা গেছে।

নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর মহানগরসহ নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলায় সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২২ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর অধীনে সেনাসদস্যরা মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যেখানে নিষিদ্ধ দলটির ‘অপতৎপরতা’ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে, সেখানেই বিশেষ এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে ডিএমপির প্রায় ১৮ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং নগরজুড়ে ২০০টির বেশি চেকপোস্ট ও পিকেট বসানো হয়েছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী জানান, গুলিস্তান, প্রেসক্লাব, শাহবাগ, মতিঝিল, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ যেসব এলাকায় জনসমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকা পরিদর্শনে এসে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, “একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং পবিত্র মহরম মাসকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের নাশকতা যাতে না ঘটে, সেজন্য পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।” ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে কঠোর তল্লাশি কার্যক্রম চলছে এবং সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হচ্ছে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যরা সক্রিয় রয়েছেন। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ১৫টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ডিএমপি জানিয়েছে, রাজধানীর চারটি প্রধান কন্ট্রোলরুমে পর্যাপ্ত রিজার্ভ ফোর্স রাখা হয়েছে যাতে তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। জননিরাপত্তা ও জানমালের সুরক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই বিশেষ তৎপরতা পুরো মাসজুড়েই অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

মন্তব্য

জাতীয়
After 4 months of anxiety the victory of Bengal crossed the Strait of Hormuz

দীর্ঘ ৪ মাসের উৎকণ্ঠা শেষে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’

দীর্ঘ ৪ মাসের উৎকণ্ঠা শেষে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’ ছবি: সংগৃহীত

প্রায় চার মাস ধরে চলা গভীর অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ কাটিয়ে অবশেষে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। মঙ্গলবার (২৩ জুন) বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টার দিকে জাহাজটি সফলভাবে এই নৌপথ পাড়ি দিতে সক্ষম হয়। বিএসসি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, জাহাজটি বর্তমানে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জাহাজে অবস্থানরত ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রু সদস্য সবাই সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং সুস্থ রয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

‘বাংলার জয়যাত্রা’র এই সংকটময় পরিস্থিতির সূত্রপাত হয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। গত ২ ফেব্রুয়ারি ভারত থেকে পণ্য নিয়ে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে জাহাজটি। এরপর কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল নিয়ে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করলে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জাহাজটির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এটি কার্যত পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে জাহাজটির পূর্বনির্ধারিত কুয়েত সফরের পরিকল্পনা বাতিল করে বিএসসি কর্তৃপক্ষ। সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে জাহাজটিকে সরিয়ে নিতে সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে প্রায় ৩৭ হাজার টন সার বোঝাই করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা থাকলেও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জাহাজটি দীর্ঘ সময় সৌদি আরবের বন্দরেই অবস্থান করতে বাধ্য হয়। অবশেষে নৌপথটি উন্মুক্ত হওয়ায় দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশি এই জাহাজটি।

মন্তব্য

জাতীয়
Dhaka Kuala Lumpur relations at a new height

সম্পর্কের নতুন উচ্চতায় ঢাকা-কুয়ালালামপুর

সম্পর্কের নতুন উচ্চতায় ঢাকা-কুয়ালালামপুর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক মালয়েশিয়া সফর। ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক মালয়েশিয়া সফর দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্রে এক সোনালী অধ্যায়ের সূচনা হলো। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই সফর মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ভাগ্যদ্বার উন্মোচনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সোমবার (২২ জুন) কুয়ালালামপুরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং শ্রমবাজারের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটানোর মহাপরিকল্পনা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সোমবার (২২ জুন) স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় পুত্রজায়ায় দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। বৈঠক শেষে দুই দেশের সরকারপ্রধান এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য দেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ায় তিনি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং তার এই দায়িত্ব গ্রহণকে বাংলাদেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির পথে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলে অভিহিত করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বিস্তারিত বিষয়বস্তু তুলে ধরে বক্তব্য দেন।

শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার আহ্বান: যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ এবং দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ করেছি। পাশাপাশি অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটকে পড়া বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও উত্থাপন করেছি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা একমত হয়েছি যে শ্রমিক নিয়োগপ্রক্রিয়া হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী; যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা দূর হয় এবং শ্রমিকদের অভিবাসন ব্যয় হ্রাস পায়।’

শুভেচ্ছা ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের স্মরণ: সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারিতে আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রথম যে শুভেচ্ছাবার্তা পেয়েছিলাম, তা ছিল প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের। তিনি আমাকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই আন্তরিক আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পেরে তিনি সম্মানিত বোধ করছেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম বিদেশ সফরে সহধর্মিণীকে সঙ্গে নিয়ে মালয়েশিয়ায় আসতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত।

এ সময় তিনি তার পিতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক মালয়েশিয়া সফরের কথা স্মরণ করে বলেন, সেই সফর দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করার পাশাপাশি শ্রমবিষয়ক সহযোগিতার মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেছিল। একই সঙ্গে তিনি তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯৩ সালের মালয়েশিয়া সফরের কথা উল্লেখ করে বলেন, সেই সফর দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরও গভীর এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করেছিল।

মালয়েশিয়াকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক আস্থা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং জনগণের মধ্যকার দৃঢ় সম্পর্কের ভিত্তিতে এই বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। মালয়েশিয়ায় উষ্ণ অভ্যর্থনা ও চমৎকার আতিথেয়তার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, দেশটির সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, আমরা মধুর স্মৃতি নিয়ে দেশে ফিরছি।

দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর জোরদার ও ২০২৭ সালের মধ্যে এফটিএ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটিকে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আখ্যা দিয়ে বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার ব্যাপক ও অর্থপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। আমরা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মতবিনিময় করেছি। আজ আমরা বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছি। যৌথ কমিশন বৈঠক এবং দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় পরামর্শপ্রক্রিয়াসহ বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি।

বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়েছি এবং বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (FTA) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতি রেখে একটি ‘পারস্পরিক কল্যাণকর, ব্যাপক ও দূরদর্শী’ চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে ২০২৭ সালের মধ্যে এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে দুই দেশ। উভয় নেতাই স্বীকার করেন যে, দক্ষিণ এশিয়ায় মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হলো বাংলাদেশ।

বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের আহ্বান: বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জনগণের কাছ থেকে শক্তিশালী জনসমর্থন ও বিপুল ম্যান্ডেট পেয়েছে। জনগণের এই বিপুল সমর্থনের ভিত্তিতে আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছি। আমাদের বর্তমান অগ্রাধিকার হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। আমরা একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলছি এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছি। তিনি দৃঢ় আস্থা ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে এবং মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের এই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য তিনি আন্তরিক আমন্ত্রণ জানান।

বহুমুখী খাতে কৌশলগত অংশীদারিত্ব: দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও আঞ্চলিক বিষয়ে সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ দিতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। আলোচনার প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে ছিল-উচ্চ মূল্য সংযোজন ও প্রযুক্তি খাত: তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (ICT), ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার।

অবকাঠামো ও লজিস্টিকস: সড়ক, সেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বন্দর এবং লজিস্টিকস খাত।

শিল্প ও কৃষি: হালাল শিল্প এবং কৃষিভিত্তিক পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ।

উভয় নেতা সরকারি সংস্থা, বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা এবং দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন; যার মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ জনবল উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে অংশগ্রহণ জোরদার করা সম্ভব হবে। এই লক্ষ্যে ‘মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল (JBC)’ প্রতিষ্ঠার অগ্রগতিকে দুই প্রধানমন্ত্রী স্বাগত জানান, যা বেসরকারি খাতের সহযোগিতার প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।

জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি: জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) সরবরাহ, এলএনজি অবকাঠামো এবং পেট্রোলিয়াম পণ্যবিষয়ক বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সম্মত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলোকে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা ও চুনাপাথরসহ অনাবিষ্কৃত খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

শিক্ষা, পর্যটন ও সংস্কৃতি: মালয়েশিয়ায় বর্তমানে অধ্যয়নরত প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর অবদান উল্লেখ করে দুই প্রধানমন্ত্রী উচ্চশিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অংশীদারিত্ব, যৌথ গবেষণা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (TVET) খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে একমত হন। একই সঙ্গে যোগ্যতার/সনদের পারস্পরিক recognition (স্বীকৃতি), যৌথ ডিগ্রি কর্মসূচি এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাক্রমের সামঞ্জস্য জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এছাড়া, মালয়েশিয়া ইয়ার অব মেডিকেল ট্যুরিজম ২০২৬’ কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে দুই দেশ পর্যটন প্রচার ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিক, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও উদ্যোক্তারা দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করছেন বলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেন।

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা: দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষা সম্পর্কের প্রশংসা করে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সমঝোতা স্মারক (MoU) পুরোপুরি কার্যকর করার অঙ্গীকার করা হয়। সামরিক বিজ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা ও প্রতিরক্ষা শিল্প অংশীদারিত্বে সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি কাঠামোগত রূপরেখা তৈরির জন্য 'প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক যৌথ কমিটি (JCDC)’ বৈঠক আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। এছাড়া, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যৌথ প্রশিক্ষণ, কৌশলগত মহড়া ও জ্ঞান বিনিময় অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ, সহিংস উগ্রবাদ, মানবপাচার ও আন্তঃদেশীয় crime (অপরাধ) মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদারের ঘোষণা দেওয়া হয়।

রোহিঙ্গা সংকট ও বৈশ্বিক ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থান: বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মালয়েশিয়ার ধারাবাহিক সমর্থনের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়াও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানবিক উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে সংহতি পুনর্ব্যক্ত করে।

বৈশ্বিক ইস্যুতে দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করেন এবং সংলাপ ও কূটনৈতিক প্রচেস্থার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য ন্যায়সম্মত ও স্থায়ী শান্তির পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অন্যান্য প্রচলিত ও অপ্রচলিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘ ও ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের অঙ্গীকার করা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন করায় মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।

বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল ও আমন্ত্রণ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং তার সহধর্মিণীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের উদাত্ত আমন্ত্রণ জানান।

উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর এটিই ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর। এই সফরে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, শিক্ষা ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম।

মন্তব্য

p
উপরে