× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট বাংলা কনভার্টার নামাজের সময়সূচি আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ প্রাইভেসি পলিসি

জাতীয়
আল্লামা শফীকে কি হত্যা করা হয়েছে
google_news print-icon

আল্লামা শফীকে কি মেরে ফেলা হয়েছে

আল্লামা-শফীকে-কি-মেরে-ফেলা-হয়েছে
হেফাজতের প্রয়াত আমিরের পরিবার থেকে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে গত ১৬ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাটহাজারী মাদ্রাসা এবং হাসপাতালে ঘটা ঘটনাবলী বিবৃত করা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে, শফীকে চাপ দিয়ে, হত্যার হুমকি দিয়ে অসুস্থ করা হয়েছে। তাকে চিকিৎসা করাতে বাধা দেয়া হয়েছে। এমনকি অক্সিজেনের নল খুলে দেয়া হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সে উঠতে বাধা দেয়া হয়েছে।

হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমেদ শফীর মৃত্যুকে ঘিরে বিতর্ক নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে। তার জীবনের শেষ তিনটি দিনে যা যা হয়েছিল, সেসব ঘটনা উল্লেখ করে ৩২ পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রয়াত হেফাজত নেতার নাতি মাওলানা আরশাদ ও আল্লামা শফীর দেখভালের দায়িত্বে থাকা খাদেম হোজাইফা আহমদের জবানবন্দি বিবৃত করা হয়েছে এই পুস্তিকায়।

এই দুই প্রত্যক্ষদর্শী যা বলেছেন, তাতে মনে হচ্ছে, গত ১৬ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর হেফাজতের সদর দফতর চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় যা যা ঘটেছে, তার প্রতিক্রিয়াতেই অসুস্থ হয়েছেন হেফাজতের সে সময়ের আমির।

এই দুই জনের অভিযোগ, আল্লামা শফীকে ওষুধ খেতে দেয়া হয়নি, তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হয়েছে, তার জিনিসপত্র ভাঙচুর করা হয়েছে, তাকে অ্যাম্বুলেন্সে উঠতে বাধা দেয়া হয়েছে, অক্সিজেনের নল খুলে দেয়া হয়েছে। এক পর্যায়ে নলটি ছিড়ে ফেলা হয় যেন সেটি আর ব্যবহার করা না যায়।

আল্লামা শফীকে কি মেরে ফেলা হয়েছে

এই দুই জনের অভিযোগ, ‍তিন দিনের হাঙ্গামার পরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা দেরি হয়ে গেছে বলে জানান।

আবনায়ে দারুল উলুম হাটহাজারী প্রকাশনা থেকে ‘হাটহাজারীতে জীবনের শেষ তিন দিন’ নামে পুস্তিকাটি প্রকাশিত হয়। বইয়ে আল্লামা শফীকে ‘শহীদ শাইখুল ইসলাম’ আখ্যা দেয়া হয়েছে।

যদিও হেফাজতে ইসলামের প্রচার সম্পাদক জাকারিয়া নোমান ফয়েজী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই বই ভুয়া। সব কথা মিথ্যা। শিগগিরই আমরা এই বইয়ের প্রতিক্রিয়া জানাব।’

‘আহমদ শফীর মৃত্যুর দেড় মাস পর এই পুস্তিকা প্রকাশ কেন, আর বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমকে জানাননি কেন?’

জবাবে আল্লামা শফীর নাতি মাওলানা আরশাদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা ভীত ছিলাম। কারণ দাদার সঙ্গে যা ঘটেছে, আমাদের সঙ্গে যে কোনো কিছু ঘটতে পারে। সে জন্য আমরা পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে এই পুস্তিকা করেছি।’

গত ১৫ নভেম্বর সম্মেলন করে জুনাইদ বাবুনগরীকে আমির ঘোষণা করে হেফাজত।

তার আগের দিন এই সম্মেলন না করার দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে আহমদ শফীর শ্যালক মঈন উদ্দিন ও গত কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মঈনুদ্দীন রুহী।

রুহী সেদিন মাদ্রাসার ঘটনাবলী উল্লেখ করে বলেন, ‘এতে তিনি (আল্লামা শফী) ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থ অবস্থায় হজরতের অক্সিজেন লাইন বারবার খুলে দেওয়ায় তিনি মৃত্যুর দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং কোমায় চলে যান।

‘অনেক কষ্ট করে চিকিৎসার জন্য বের করা হলেও রাস্তায় পরিকল্পিতভাবে অ্যাম্বুলেন্স আটকিয়ে সময়ক্ষেপণ করে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।’

আহমদ শফীর শ্যালক মঈন উদ্দিন বলেন, ‘আল্লামা শাহ আহমদ শফী হুজুর জামায়াত-শিবিরের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার।’

আল্লামা শফীকে কি মেরে ফেলা হয়েছে

শফীর জীবনের শেষ দুই দিন যা হয়েছিল হাটহাজারী মাদ্রাসায়

হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে শফীপুত্র আনাস মাদানীকে বহিষ্কার, হেফাজতের বর্তমান আমির জুনাইদ বাবুনগরীসহ অব্যাহতি দেয়া তিন শিক্ষককে ফিরিয়ে আনাসহ ছয় দফা দাবিতে ১৬ সেপ্টেম্বর জোহরের নামাজের পর বিক্ষোভ শুরু হয়।

পুস্তিকায় প্রথমে আন্দোলনের সূত্রপাত নিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।

সে সময় শাহ আহমদ শফী সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিলেন বলে জানানো হয় এতে।

সেদিনের ঘটনা প্রবাহ বর্ণনা করে খাদেম হোজাইফা আহমদ বলেন, ‘সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফীও সুস্থ, স্বাভাবিক ছিলেন। হজরতের ছেলে আনাস মাদানী ঢাকায় ছিলেন।

“দুপুরে হজরত (আল্লামা শফী) জোহর নামাজ পড়লেন। নামাজ পড়ে দারুল হাদিসের ক্লাসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় দাওরার কিছু ছাত্র হুজুরের কামরায় প্রবেশ করে বলল, ‘হুজুর, দুপুরের খাবার খেয়ে নিন।”

হুজুর বললেন, ‘এখন না, আমি দরস শেষ করে এসে খাব।'

হুজুরকে দারুল হাদিসে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। ঠিক ওই মুহূর্তে (জোহরের নামাজের পর) মাঠে হৈ চৈ শুনতে পেয়ে একজন শিক্ষক শফীর কামরায় এসে খবর দেন, ছাত্ররা মাঠে চিৎকার করছে, আনাস মাদানীর বহিষ্কারের দাবি জানাচ্ছে।

এসব শুনে উপস্থিত ছাত্র ও খাদেমরা শাহ আহমদ শফীর নিরাপত্তার জন্য জানালার গ্লাস, দরজা সব বন্ধ করে দেন। সব ঘটনা শুনে হেফাজত আমির বিব্রত বোধ করেন।

আল্লামা শফীকে কি মেরে ফেলা হয়েছে

কিছুক্ষণের মধ্যে আনাস মাদানীর কক্ষ ভাঙচুর করা হয়। পরে মাদরাসার মুঈনে মহতামিম শেখ আহমদের দরজা ভেঙে তাকে নিয়ে আসা হয়।

আল্লামা শফীকে কি মেরে ফেলা হয়েছে

শফীর কার্যালয়ে যা হয়

পুস্তিকা অনুযায়ী, “শেখ আহমদ সাহেবের সঙ্গে ‘উগ্রপন্থী নেতা’ হাসানুজ্জামানের নেতৃত্বে পাঁচ জনের একটি দল আল্লামা শফীর কার্যালয়ে যান। খাদেম হোজাইফা বলেন, ‘তারা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে এবং তার ছেলে আনাস মাদানীকে বহিষ্কার করার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।’ তখন শফী সাহেব হুজুর বলেন, ‘আনাসের যেসব দোষ রয়েছে, তা লিখিত আকারে অভিযোগ করে জানাও, আমি দস্তখত দিব।

“কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ উপস্থাপন করতে না পারায় আল্লামা শফী সাহেব চুপ করে থাকেন। আর শফী বারবার বলছিলেন, ‘অভিযোগ লিখিত আকারে উপস্থাপন করো, আমি দস্তখত করব। কিন্তু বাবারা তোমরা এইভাবে আমার সাথে দুর্ব্যবহার করো না।”

পুস্তিকায় আরও বলা হয়, “এরপর ‘উগ্রপন্থীদের’ ২০-২৫ জনের আরেকটি দল কার্যালয়ের সামনে উপস্থিত হয়। তারাও কক্ষে ঢুকে অশালীন বাক্য ব্যবহার ও আনাস মাদানীকে বহিষ্কারের জন্য হুমকি-ধামকি দিতে থাকে বলে জানিয়েছেন হোজাইফা।”

পুস্তিকায় উল্লেখ করা হয়, “তাদের বেশ কয়েকজন হজরতের কামরায় প্রবেশ করে চিৎকার চেচামেচি শুরু করে। তুই-তুকারি করে খাদেমদের গালিগালাজ করতে থাকে। হজরতের (আল্লামা শফী) শানে অশালীন বাক্য ব্যবহার করে। এতে হজরত খুব পেরেশান ও অস্বস্তি বোধ করতে থাকেন। তারা হজরতকে দ্রুত আনাস মাদানীকে বহিষ্কার করতে হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। এই সময় মাগরিবের আজান হয়।”

শুরার বৈঠকে চাপ

শফীর খাদেম জানান, মাগরিবের নামাজের পর আন্দোলনকারীরা কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে শুরার বৈঠক করেন। সেখানেও আনাস মাদানীকে বহিষ্কারের চাপ দেয়া হয়। শফী রাজি না হওয়ায় তার কক্ষের গ্লাস, ফুলের টব ভাঙচুর করা হয়।

আল্লামা শফীকে কি মেরে ফেলা হয়েছে

পুস্তিকায় বলা হয়, “আল্লামা শফীকে চাপ দিতে একটি প্যাডে আনাস মাদানীর বহিষ্কারাদেশ লিখে তাতে সই দিতে তার সবচেয়ে প্রিয় নাতি দেওবন্দপড়ুয়া আসাদের গলায় গ্লাসের টুকরো ধরে বলা হয়, ‘এখন এটা দিয়ে টান মেরে ওর গলা কেটে ফেলব, জলদি দস্তখত কর এখানে। তখন আল্লামা শফীর চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল।

এতেও কাজ না হওয়ায় আল্লামা শফীর ব্যক্তিগত সহকারী (খাদেম) মাওলানা শফিউল আলমকে রড দিয়ে আঘাত করা হয়, চড়-ঘুষি মারা হয়। তখন আল্লামা শফীকে ‘সরকারের দালাল’, ‘মুনাফিক’সহ নোংরা ভাষায় গালাগাল চলছিল।

এক পর্যায়ে জবরদস্তির মাধ্যমে আহমদ শফীর সই আদায় করে মাঠে গিয়ে মাইকে আনাস মাদানীর বহিষ্কারের ঘোষণা দেয়া হয়।”

আহমদ শফীর কার্যালয় ভাঙচুর

দ্বিতীয় দিনের ঘটনার বর্ণনা করেছেন আহমদ শফীর নাতি মাওলানা আরশাদ। তিনি জানান, সকাল ১০টার দিকে মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষক আহমদ শফীর সঙ্গে দেখা করতে আসেন।

এরপর ছড়ানো হয় গুজব। পাগলা ঘণ্টি বাজিয়ে ছাত্রদের জড়ো করা হয়। বলা হয়, ‘শফী সাহেব মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য মিটিং ডেকেছেন। তিনি গতকালকের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন।’

মাওলানা আরশাদ জানান, আন্দোলনকারীরা শফীর কার্যালয়ে এসে শিক্ষকদের বের করে দেন। সেখানকার কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে শুরু হয় ভাঙচুর, লুটতরাজ। আহমদ শফীর সব টেবিলের গ্লাস, এসি, গ্লাসে বাঁধাই করা কাবা শরিফের গিলাফ একাধিক সম্মাননা পদক, কার্যালয়ের দরজা জানলাও ভাঙচুর করা হয়।

তিনি আরও জানান, কার্যালয়ের বাইরে কামরার দুই দিকের গ্লাসের দরজা, নামফলক, বারান্দায় থাকা গ্লাসের সীমানা, প্রায় ১০টি জানালার গ্লাস, ৩০টির মতো ফুলের টব, বারান্দার সোফা, টেবিল, ফ্যানসহ ছোটবড় আরও অনেক আসবাবপত্রও ভাঙা হয়।

আল্লামা শফীকে কি মেরে ফেলা হয়েছে

শফীর অক্সিজেন সাপোর্ট খুলে ফেলা

পুস্তিকার ভাষ্য অনুযায়ী, আহমদ শফীর সামনে তার খাদেমদের বেধড়ক মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে হেফাজত আমিরের অক্সিজেন সাপোর্ট খুলে নেয় আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী উল্লেখ করে মাওলানা আরশাদ বলেন, ‘তারা হজরতের অক্সিজেন সাপোর্ট খুলে ফেলে। খাদেম ও নাতিরা হজরতকে অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে গেলে তাদের বাধা দেয়া হয়।

‘বিদ্যুতের কারণে এসি বন্ধ এবং অক্সিজেন খুলে ফেলায় হুজুরের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। সন্ত্রাসীদের কাছে হজরতের নাতি ও খাদেমরা অনেক আকুতি-মিনতির পর বিদ্যুৎ সংযোগ ও অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে তারা রাজি হয়। অক্সিজেন ও নেবুলাইজারের মাধ্যমে হজরতকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে আহত খাদেমরা।’

আল্লামা শফীকে কি মেরে ফেলা হয়েছে

শফীকে সুস্থ বলতে চাপ

পুস্তিকায় বলা হয়, এত সব ঘটনার পরও আল্লামা শফী সুস্থ আছেন বলে ঘোষণা দিতে তার নাতি আশরাদকে চাপ দেয়া হয়। তাকে বলতে বলা হয়, কামরায় কোনো প্রকার হামলা হয়নি। আরশাদকে দিয়ে এই ‘মিথ্যা’ ঘোষণা দেয়ানোর পর তাকে আবার কামরায় নিয়ে আসা হয়।

আসরের নামাজের পর আরশাদকে বলা হয়, আল্লামা শফী সুস্থ আছেন জানিয়ে তাকে ভিডিওবার্তা নিতে হবে। কী বলতে হবে, সেটা লিখেও নিয়ে আসে আন্দোলনকারীরা।

আরশাদ অস্বীকার করলে তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। পরে চাপের মুখে তিনি ভিডিওবার্তা দেন।

এরপর আল্লামা শফীকে মাদ্রাসা প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগের চাপ দেয়া হয়। বলা হয়, ‘আপনি পদত্যাগ করে মাদ্রাসার উপদেষ্টা হিসাবে থাকেন।’

পুস্তিকায় বলা হয়, আন্দোলনকারীরা আল্লামা শফীকে বলেন, ‘যদি আমাদের এই কথা মেনে নেন, তাহলে আপনি আমাদের মাথার উপর থাকবেন। আর যদি না মানেন তাহলে পায়ের নিচে দিতে আমরা দ্বিধা করব না।’

আল্লামা শফীকে কি মেরে ফেলা হয়েছে

নাতি আসাদকে ‘নির্যাতন’

হাঙ্গামার সঙ্গে জড়িতরা শফীর সামনে ছোট নাতি আসাদকে নির্যাতন করে বলেও পুস্তিকায় উল্লেখ করা হয়।

খাদেম হোজাইফা বলেন, ‘হজরত তখন অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিলেন, আর চোখ বেয়ে পানি পড়ছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি কোনো কথাই বলতে পারছিলেন না। এভাবে হজরতকে মাগরিব পর্যন্ত অমানবিক ও অমানুষিক নির্যাতন করা হয়।’

শফী যখন সংকটাপন্ন

পুস্তিকায় আরশাদ বলেন, মাগরিবের পর শুরা সদস্যরা হেফাজতের সে সময়ের আমিরের কামরায় আসতে থাকেন। সন্ধ্যা সাতটার পর বৈঠক শুরু হয়। তখন অসুস্থ হয়ে পড়েন আল্লামা শফী।

পুস্তিকায় বলা হয়, “হজরতের শরীর ঠান্ডা ও নিথর হয়ে যায়। হজরতের নাতি আরশাদ ও খাদেম মাওলানা শফিউল আলম শুরা সদস্যদের কাকুতি মিনতি করে অনুরোধ করেন, ‘আপনারা তাড়াতাড়ি মিটিং শেষ করুন, হজরতের অবস্থা ভালো নয়। হজরতকে এখনই ইমার্জেন্সি হাসপাতালে নিতে হবে’।”

বারবার অনুরোধ করার পরও শুরা সদস্যরা বৈঠক চালিয়ে যান। আধা ঘণ্টা পর শফীর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।

বৈঠক শেষে নাতি ও খাদেম শফিউল শুরা সদস্যদের অনুরোধ করেন, শফীকে মাদ্রাসা থেকে বের করার ব্যবস্থা করতে। কিন্তু শুরা সদস্যরা কেউ এগিয়ে আসেনি।

আন্দোলনকারীরা আবার কামরায় ঢুকে সাদা প্যাড দিয়ে সই করতে চাপ দিয়ে বলে, ‘এই বুড়ো, এখানে দস্তখত কর, না হয় গলা চেপে এখনই মেরে ফেলব।’

মাথার উপর রড ধরে বলে, ‘এখনই কিন্তু বাড়ি দিচ্ছি, দ্রুত দস্তখত কর।’

পুস্তিকায় বলা হয়, ‘সন্ত্রাসীরা হুজুরকে সারা দিন কোনো ওষুধ বা খাবার খাওয়াতে দেয়নি। দুই দিনের মানসিক নির্যাতন, কার্যালয় ভাঙচুর, খাবার ও ওষুধ না পেয়ে হজরত পুরোপুরি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি বমি করেন। মুখ দিয়ে অনবরত ফেনা বের হচ্ছিল। একসময় চোখ বন্ধ করে ফেলেন শেষবারের মতো।’

তখন নাতি আরশাদ ও খাদেম শফিউল আলম হামলাকারীদের পায়ে ধরেন হাসপাতালে নিতে। তারা প্রথমে বলে, চিকিৎসা করালে মাদ্রাসাতেই ব্যবস্থা করবে।

দুই নাতি ও খাদেম তখন বলেন, শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে।

এভাবে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা চলে যায়। তখন হামলাকারীরা বলতে থাকে, ‘চিকিৎসার দরকার নেই। হুজুর মারা গেলে এখানেই মারা যাবে।’

মাওলানা নোমান ফয়েজীর কাছে আবেদন

পুস্তিকায় বলা হয়, আহমদ শফীকে হাসপাতালে নেয়ার অনুমতি দিতে হেফাজতের সে সময়ের শুরা সদস্য ও বর্তমানে প্রচার সম্পাদক মাওলানা নোমান ফয়েজীকে অনুরোধ করেন দুই নাতি।

তখন নোমান ফয়েজী বলেন, মাদ্রাসা থেকে পদত্যাগের দস্তখত করতে হবে শফীকে। তারপর যা হবার হবে।

তখন নাতি আরশাদসহ খাদেমরা নোমান ফয়েজীকে বলেন তার পদত্যাগের ঘোষণা দিতে। আর নোমান ফয়েজীরা সে ঘোষণা দেয়।

পুস্তিকায় বলা হয়, ‘আসলে এ ব্যাপারে কিছু বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না (আল্লামা শফী)। কোনো দস্তখত করার তো প্রশ্নই উঠে না। দস্তখত করার আগেই তিনি চোখ বন্ধ করে ফেলেন।’

যদিও নোমান ফয়েজী সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তারা এর জবাব দেবেন।

অ্যাম্বুলেন্সে উঠতে ‘বাধা’

পুস্তিকায় বলা হয়, ‘অ্যাম্বুলেন্সে করে আল্লামা শফীকে হাসপাতালে নেয়ার অনুরোধ করলে হামলাকারীরা বলে, তাদের আমিরের নির্দেশ না আসা পর্যন্ত এখান থেকে বের করার কোনো অনুমতি নেই।

কিছুক্ষণ পর হামলাকারীরা বলে, আমিরের নির্দেশ এসেছে। তবে অ্যাম্বুলেন্স আসার আগে শফী সুস্থ আছেন বলে মিডিয়ায় ভিডিও প্রচার করতে হবে।

‘অ্যাম্বুলেন্স আসার পর আন্দোলনকারীদের একজন এসে বলে, হুজুরের সঙ্গে শুধুমাত্র একজন যেতে পারবে। তখন নাতি ও খাদেম শফিউল বলে, হজরতের সার্বিক দেখভাল একজন দ্বারা সম্ভব নয়। কমপক্ষে তিন জনকে যেতে দিন। আন্দোলনকারীরা বলে, আমরা আমাদের আমিরের সাথে কথা বলে জানাচ্ছি।’

পরে সেই আমিরের সঙ্গে ফোনে কথা বলে শফীর সঙ্গে দুই জনকে যেতে দেন হামলাকারীরা। পরে অবশ্য তিন জনকেই যেতে দেয়া হয়।

এই আমির কে, সেই বিষয়টি এখনও জানেন না মাওলানা আরশাদ।

আবার বাধা

পুস্তিকায় বলা হয়, অ্যাম্বুলেন্সটি মাদরাসার শাহী গেট দিয়ে ঢুকতে বাধা দিয়ে কবরস্থানের গেট সংলগ্ন বাইতুল আতিক মসজিদের সামনে রেখে দেয়া হয়। ফলে আল্লামা শফীকে অ্যাম্বুলেন্সে উঠাতে আরও দেরি হয়।

স্ট্রেচারে নিয়ে যাওয়ার সময় শফীর মুখে অক্সিজেন লাগানো ছিল। সেটি টান দিয়ে বারবার খুলে ফেলা হচ্ছিল। একপর্যায়ে ছিড়ে ফেলা হয়। পরে অক্সিজেন ছাড়াই তাকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়।

অ্যাম্বুলেন্স ছাড়ার সময় শফীর খাদেম হোজাইফাকে টেনেহিঁচড়ে মারধর করে নামিয়ে দেযা হয়। তখন নাতি আরশাদ একাকী রওনা হন। তখন হামলাকারীরা নতুন দাবি নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখে।

তারা বলতে থাকে, স্থানীয় এমপি ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে এসে সই দিতে হবে যে, ভবিষ্যতে আন্দোলনকারীদের কোনো ক্ষতি হবে না। তা না হলে অ্যাম্বুলেন্স যেতে দেয়া হবে না।

পুস্তিকায় বলা হয়, ‘এভাবে আরও ৪৫ মিনিট সময় অতিবাহিত হয়। তখনই অক্সিজেন না পাওয়ায় হুজুর একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়েন। সেখানে দায়িত্ব পালনরত ওসি সাহেবের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের মিটিং হয়। মিটিংয়ের আলোচনা অজানা। মিটিং শেষ হলে হজরতের অ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দিতে মসজিদের মাইকে কয়েকবার ঘোষণা দেয়া হয়। এরপর অ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দেয়া হয়। পুলিশি পাহারায় অ্যাম্বুলেন্স চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে।’

‘দেরি হয়ে গেছে’

পুস্তিকায় বলা হয়, ‘রাত দেড়টায় আল্লামা শফীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা বলেন দেরি হয়ে গেছে। অক্সিজেন না থাকার কারণে হুজুরের যে ক্ষতি হয়েছে, তা তাদের পক্ষে চিকিৎসা দ্বারা পূরণ করা সম্ভব নয়।

পরদিন শুক্রবার দুপুর ১২টায় ডাক্তাররা বোর্ড মিটিংয়ে বসেন। তারা নাতি আরশাদকে জানান, তাদের চেষ্টা ব্যর্থ।’

পুস্তিকার তথ্য অনুযাযী, বিকেল সোয়া চারটায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে পুরান ঢাকার আসগর আলী হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন শফীর অনুসারীরা। সন্ধ্যা ৬টার আগেই তাকে হাসপাতালে জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। কিছুক্ষণ পর তিনি মারা যান।

আরও পড়ুন:
হেফাজতে আহমদ শফীর পরে কে?

মন্তব্য

আরও পড়ুন

জাতীয়
Social pressures put an end to teenage girls dreams of becoming footballers

‘সামাজিক চাপে’ শেষ কিশোরীদের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন

‘সামাজিক চাপে’ শেষ কিশোরীদের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন বটিয়াঘাটা উপজেলার তেঁতুলতলা গ্রামে সুপার কুইন ফুটবল অ্যাকাডেমির নারী খেলোয়াড়রা অনুশিলন করছেন। ফাইল ছবি
সুপার কুইন ফুটবল অ্যাকাডেমির মূল উদ্যোক্তা দেবাশীষ মন্ডল বলেন, ‘এতগুলো ফুটবলপ্রেমী মেয়ের কথা চিন্তা করেই আমরা কয়েকজন মিলে ক্লাবটি প্রতিষ্ঠা করি, তবে এখন বন্ধ আছে আর্থিক সংকটের কারণে। যারা অর্থ প্রদান করতেন, তারা সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপে আর অর্থ দিচ্ছেন না।’

‘গ্রামের মেয়েরা হাফ প্যান্ট পরে মাঠে ফুটবল খেলে’ – এ ‘অপরাধে’ হামলা করা হয়েছিল খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার তেঁতুলতলা গ্রামে সুপার কুইন ফুটবল অ্যাকাডেমির নারী খেলোয়াড়দের ওপর। যা নিয়ে সারা দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। পরে তাদের পাশের দাঁড়িয়েছিল দেশের সরকার প্রধান থেকে শুরু করে জাতিসংঘের জরুরি শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) পর্যন্ত, তবে বছর না যেতে সেই কিশোরী ফুটবলারদের মাঠ ছাড়তে হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২২ সালে স্থানীয় কয়েকজন ক্রীড়া সংগঠক সুপার কুইন ফুটবল অ্যাকাডেমিটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে নিয়মিত স্কুল-কলেজে পড়ুয়া ৩০ থেকে ৪০ জন কিশোরী অনুশীলন করতেন। ২০২৩ সালের ২৯ জুলাই রাতে নারী ফুটবলারের ওপর হালমার ঘটনা ঘটে। যা নিয়ে পরদিন একটি হত্যা চেষ্টা মামলা দায়ের হয়েছিল।

এ হামলায় যারা আহত হয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল খেলোয়াড় মঙ্গলী বাগচী।

মঙ্গলী বলে, ‘আমাদের ওপর হামলার ঘটনায় ছয় মাস পার না হতে মাঠ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। পরিকল্পিতভাবে আমাদের কোচকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। যারা আমাদের যে আর্থিক সহায়তা করতেন, তারাও দূরে সরে যান। সামাজিক চাপ ও রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে আমাদের স্বপ্নগুলিকে শেষ করে দেয়া হয়।’

আক্ষেপ নিয়ে মঙ্গলী বলে, ‘হামলার পর আমাদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা নিয়ে জনপ্রতিনিধীরা এসেছিলেন। তারা বলেছিলেন আমাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, থাকা খাওয়া খরচ ও একটি মিনি স্টেডিয়াম তৈরি করে দেবেন প্রধানমন্ত্রী, তবে তারও মধ্যে আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেল।’

খেলোয়াড় মঙ্গলী বাগচীর মা সুচিত্রা বাগচী বলেন, ‘স্বপ্ন নিয়ে তো মেয়েকে মাঠে পাঠিয়েছিলাম। মার খাওয়ার পরেও তারা ফুটবল ছাড়েনি। এখন তো তাদের কৌশলে মাঠের বাইরে পাঠানো হল। মেয়েটা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।

‘প্রতিবেশীরা তাকে এখন হেয় প্রতিপন্ন করছে। আমাদের মেয়েরা ফুটবলের যে সুনাম এনেছিল, তার ধারাবাহিকতা আমরা ধরে রাখতে পারলাম না।’

মঙ্গলী বাগচী ও তার খেলার সাথীরা এখনও সবাই মাঠের বাইরে। ইতোমধ্যে তাদের চারজন খেলোয়াড়ের বিয়ে হয়ে গেছে। কেউ কেউ দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে মাঠে কাজ করছে। বাকিরা বাড়িতে অলস সময় কাটাচ্ছে বলে জানায় সে।

মঙ্গলী বাগচী জানায়, এই ক্লাবের কিশোরীদের উপর নির্ভর করে খুলনা জেলা ও বিভাগীয় নারী ফুটবল দল গঠন করা হতো। তাদের পারফরমেন্সের ওপর নির্ভর করতো খুলনার দল বিজয়ী হবে কি না।

শুধু খুলনা জেলা নয় দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের অন্যান্য জেলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও কিশোরীরা প্রশিক্ষণ নিত ক্লাব থেকে। ক্লাবের খেলোয়াড় স্বর্ণা, পূজা রায়, জ্যোতি, ঋতু, প্রীতি, তারা, দেবী, সীমা ও সাদিয়া নাসরিন অনূর্ধ্ব ১৯ বিভাগীয় দলের নিয়মিত খেলোয়াড় ছিল। যারা সবাই এখন মাঠের বাইরে।

ক্লাবটি গঠনও করা হয়েছিল খুলনার নারী ফুটবলারদের অগ্রগতির জন্য। স্থানীয় তেঁতুলতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা বঙ্গমাতা প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে জেলা পর্যায়ে ২০১২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত

১০ বছর ও বিভাগীয় পর্যায়ে ৫ বার তারা বিজয়ী বা রানার্সআপ হওয়ার সাফল্য রেখেছিল, তবে তারা যখন প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিকে অধ্যয়ন শুরু করতো, তখন আর ফুটবলের প্রশিক্ষণ পেত না। এই কিশোরীদের ফুটবল খেলার সাথে ধরে রাখতে তেঁতুলতলা সুপার কুইন ফুটবল অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন ওই বিদ্যালয়েরই শিক্ষক দেবাশীষ মন্ডল।

তিনি বলেন, ‘এতগুলো ফুটবলপ্রেমী মেয়ের কথা চিন্তা করেই আমরা কয়েকজন মিলে ক্লাবটি প্রতিষ্ঠা করি। তবে এখন বন্ধ আছে আর্থিক সংকটের কারণে। যারা অর্থ প্রদান করতেন, তারা সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপে আর অর্থ দিচ্ছেন না।’

তিনি আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘এদের মাঠে টিকিয়ে রাখতে এখনও উদ্যোগ না নিলে মেয়েরা খেলা থেকে বের হয়ে যাবে। আর এরা মাঠে না থাকলে খুলনা বিভাগীয় নারী টিমে দুর্বল হয়ে যাবে।’

সুপার কুইন ফুটবল অ্যাকাডেমির কোচ মো. মোস্তাকুজ্জামান বলেন, ‘জেলা ও বিভাগীয় দলে যে নারী খেলোয়াড়রা খেলতেন, তারা প্রায় সবাই আমাদের শিক্ষার্থী। ক্লাবটির সাংগঠনিক দুর্বলতা ও আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে গেল। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার উচিত এ ক্লাবটাকে আবার সচল করা। মেয়েদেরকে মাঠে ফিরিয়ে আনা, কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।’

তবে ক্লাবটির এই দুরবস্থা সম্পর্কে জানে না বলে জানান খুলনা জেলা ফুটবলের অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘এই সম্পর্কে আসলে আমার জানা ছিল না। তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা এই নারী খেলোয়াড়রা আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পদ। আমি অতি দ্রুত ক্লাবটাকে সচল করে নারী খেলোয়াড়দেরকে মাঠে ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করব।’

আরও পড়ুন:
পঞ্চম শিরোপা ছুঁতে চলেছে বসুন্ধরা কিংস
ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন গাজার নারীরা: ইউএনআরডব্লিউএ
ফুটবলের প্রসারে মাধবপুর ব্যারিস্টার সুমন একাডেমির যাত্রা শুরু
চেলসিকে হারিয়ে এফএ কাপের ফাইনালে ম্যানসিটি
নারী ক্রিকেটারদের উপহার দিলেন প্রধানমন্ত্রী

মন্তব্য

জাতীয়
Damage to agriculture due to floods in Kurigram

কুড়িগ্রামে বন্যায় কৃষিতে ক্ষতি

কুড়িগ্রামে বন্যায় কৃষিতে ক্ষতি বৌমারীতে পাহাড়ি ঢলে পাকা ধানের ক্ষেত প্লাবিত। ছবি: নিউজবাংলা
কুড়িগ্রাম কৃষি বিভাগের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, চলতি বন্যায় জেলায় এক হাজার ৩২০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বন্যা শেষে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হবে।

চলতি বন্যায় কুড়িগ্রামে এক হাজার ৩২০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। এসব ফসলের মধ্যে রয়েছে পাট, আউশ ধান, চিনা, কাউন, আমনের বীজতলা, বাদামসহ বিভিন্ন প্রকার শাকসবজি। পানি দ্রুত নেমে না গেলেও এসব ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন কৃষকরা।

তবে শুক্রবার থেকে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় দ্রুত কমছে নদ-নদীর পানি। এতে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার বিকেল ৩টায় তিস্তা নদীর পানি কমে কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার মাত্র ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্রসহ অন্য নদ-নদীর পানি উল্লেখযোগ্যহারে কমে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পানি কমলেও নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের পানি এখনও নামেনি। এসব এলাকার বাড়ির পাশ দিয়ে পানি অবস্থান করছে। ফলে এসব এলাকার মানুষ পানি বন্দি রয়েছে। তারা নৌকা এবং ভেলা দিয়ে যোগাযোগ করছে। এসব চরাঞ্চলের ফসল এক সপ্তাহ থেকে পানিতে ডুবে রয়েছে। ফলে এসব ফসলের নষ্ট হয়ে যাবে বলে মনে করছেন কৃষকরা।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বল্লভের খাষ ইউনিয়নের ফান্দের চরের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বানের পানিতে পাট এবং সবজিসহ আমনের বীজতলা তলিয়ে গেছে। এসব ফসল নষ্ট হয়ে যাবে। বিশেষ করে আমনের বীজতলা নষ্ট হলে আমন চাষ নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে।’

একই এলাকার দুলু মিয়া জানান, বাড়ি নিচু এলাকায় হওয়ায় পাঁচ দিন হলো পানি উঠেছে। এ কয়দিন থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে কোনো মতে রাত-দিন কাটাচ্ছেন। এ ছাড়া বাড়ির আশপাশে লাগানো সব সবজির গাছ মরে গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, রৌমারী উপজেলার রৌমারী সদর, যাদুরচর, দাঁতভাঙ্গা, শৌলমারী ও চরশৌলমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ধান ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। টানা ভারি বর্ষণ ও ভারতীয় পাহাড়ি ঢলের কারণে ৫টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে প্রায় ১০ হেক্টর পাকা ধান ক্ষেত তলিয়ে গেছে।

বকবান্দা গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমার পাকা ধানক্ষেত বৃষ্টির পানতি থলাইয়া (ডুব) গেছে। ধান কাটার কামলা পাওয়া যায় না। এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকাতে কাজ করছে না তারা। আমরা গরীব কৃষক এত টাকা পামু কই। সারা বছর এই আবাদ দিয়ে চলে আমাগো।’

কুড়িগ্রাম কৃষি বিভাগের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, চলতি বন্যায় জেলায় এক হাজার ৩২০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বন্যা শেষে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হবে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, সব নদ-নদীর পানি কমছে। দুই-এক দিনের মধ্যে পানি কমে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। এ ছাড়াও জেলার ৫ থেকে ৬টি পয়েন্টে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ জানান, বন্যা কবলিত মানুষের জন্য ১৪৪ টন জিআর চাল ও নগদ ১০ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ত্রাণ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এগুলো বন্যা কবলিতদের মাঝে বিতরণ শুরু হয়েছে।

আরও পড়ুন:
সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি, তবে পানি নামছে ধীরে
কুড়িগ্রামে বন্যার অবনতি, বিপৎসীমার উপরে তিস্তা ও ধরলা
সিলেটে নদীর পানি কমছে, বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি
সিলেটে বন্যার জন্য অলওয়েদার সড়ক কতটা দায়ী?
চীনে বন্যায় ৯ মৃত্যু, সতর্কতা জারি

মন্তব্য

জাতীয়
How much is responsible for floods in Sylhet All weather road?

সিলেটে বন্যার জন্য অলওয়েদার সড়ক কতটা দায়ী?

সিলেটে বন্যার জন্য অলওয়েদার সড়ক কতটা দায়ী? কিশোরগঞ্জে হাওরের বুকে নির্মিত ইটনা-মিঠামইন সড়ক (বাঁয়ে); বন্যার পানিতে ভাসছে সিলেট। কোলাজ: নিউজবাংলা
ভারতের মেঘালয় ও আসাম থেকে নেমে আসা ঢলের পানি সিলেট অঞ্চলের নদী ও হাওর হয়ে কিশোরগঞ্জে মেঘনা নদীতে গিয়ে মেশে। অলওয়েদার সড়কের অবস্থানও কিশোরগঞ্জে। এই সড়কের কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কী না তা খতিয়ে দেখতে বড় ধরনের সমীক্ষার দাবি উঠেছে।

চলতি বছরে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বন্যায় আক্রান্ত সিলেট। বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই দুবার বন্যার আঘাতে সিলেটজুড়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এর আগে ২০২২ সালে সিলেট স্মরণকালের ভয়াবহতম বন্যার কবলে পড়ে। সে সময় পুরো বিভাগের প্রায় ৭০ শতাংশ বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়।

সিলেটে সাম্প্রতিক ঘন ঘন বন্যার জন্য কিশোরগঞ্জের হাওরের বুকে নির্মিত ইটনা-মিঠামইন সড়ককে দায়ী করছেন অনেকে। সড়কটি ‘অলওয়েদার সড়ক’ নামে পরিচিত। বিশেষত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই সিলেটের বন্যার জন্য এই সড়ককে দায়ী করছেন। তাদের দাবি, সিলেটে আগেও এরকম প্রচুর বৃষ্টি হতো। কিন্তু এমন বন্যা হতো না। এখন কিশোরগঞ্জের এই সড়কটির কারণে সিলেটের বৃষ্টি ও ঢলের পানি হাওর দিয়ে নদীতে নামতে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। ফলে পানি আটকে বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে।

সিলেটে বন্যার জন্য অলওয়েদার সড়ক কতটা দায়ী?
কিশোরগঞ্জে হাওরের বুক চিরে নির্মাণ করা হয়েছে অলওয়েদার সড়ক। ছবি: নিউজবাংলা

হাওরের বিশাল জলরাশির বুক চিরে ৮৭৪.০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ আলোচিত এই সড়কটি নির্মিত হয় ২০২০ সালে। হাওরের তিন উপজেলার যোগাযোগ সহজতর করার পাশাপাশি এই সড়কটি পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

সিলেটে ২০২২ সালে বন্যার পরও আলোচনায় উঠে আসে এই সড়ক। সেই আলোচনা তখন মন্ত্রিসভা পর্যন্ত গড়ায়। হাওরাঞ্চলে বন্যায় এই সড়কের কোনো প্রভাব রয়েছে কী না তা খতিয়ে দেখতে বলা হয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে।

এরপর পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাতের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। এ ব্যাপারে ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘কিশোরগঞ্জের এই সড়কটি সিলেটে বন্যা সৃষ্টির কারণ বলে মনে হয় না। এখনও সেই সড়কের প্রভাব তেমন পড়েনি। তবে হাওরে এ ধরনের সড়ক নির্মাণের ক্ষতিকর প্রভাব তো আছেই। ভবিষ্যতে এর প্রভাব পড়তে পারে।’

তিনি বলেন, ‘এই সড়কের কারণে কয়েক বছর পর ওই এলাকার হাওর ও বিল ভরাট হয়ে যেতে পারে। তখন সিলেট অঞ্চলে প্রভাব পড়বে। সিলেট শহর রক্ষার জন্য নদীর তীরে বাঁধ প্রয়োজন।’

হাওরে সড়ক নির্মাণ প্রকৃতিবিরুদ্ধ উল্লেখ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, ‘হাওরে সড়ক হলে সেখানকার পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবেই। শুধু কিশোরগঞ্জের সড়কই নয়, হাওর এলাকায় যত্রতত্রভাবে সড়ক নির্মাণের ফলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। হাওরের জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘হাওরে সড়ক হবে কেন? সড়ক পথের চেয়ে ওই এলাকায় নৌ চলাচলকে আধুনিক ও উন্নত করা প্রয়োজন।’

সিলেটে বন্যার জন্য অলওয়েদার সড়ক কতটা দায়ী?
চলতি বছরের দুমাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে সিলেট। ছবি: নিউজবাংলা

ভারতের মেঘালয় ও আসাম থেকে নেমে আসা ঢলের পানি সিলেট অঞ্চলের নদী ও হাওর হয়ে কিশোরগঞ্জে মেঘনা নদীতে গিয়ে মেশে। অলওয়েদার সড়কের অবস্থানও কিশোরগঞ্জে। এই সড়কের কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কী না তা খতিয়ে দেখতে বড় ধরনের সমীক্ষার দাবি উঠেছে।

কিশোরগঞ্জের সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্যমতে, ২৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অলওয়েদার সড়কে ৫৯০ দশমিক ৪৭ মিটার দীর্ঘ তিনটি পিসিগার্ডার, ১৯০ মিটার দীর্ঘ ৬২টি আরসিসি বক্স কালভার্ট, ২৬৯ দশমিক ৬৮ মিটার দীর্ঘ ১১টি আরসিসি গার্ডার ব্রিজ রয়েছে।

সওজের প্রকৌশলীরা জানান, সিলেটের পানি দুই-তিনটি নদী দিয়ে নামে। একটি প্রবাহ সুরমা ও পুরাতন সুরমা হয়ে নামে ধনু নদী দিয়ে। সুনামগঞ্জের পানিও এই নদী দিয়ে নামে। নদীটির অবস্থান অলওয়েদার সড়কের সমান্তরালে। সিলেট অঞ্চলের আরেক নদী কুশিয়ারা হাওরে এসে হয়েছে কালিনী নদী। এটি সড়কের আরেক পাশ দিয়ে নামে। ফলে অল ওয়েদার সড়ক পানি নামতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী নিতেশ বড়ুয়া বলেন, ‘পানিপ্রবাহের জন্য সড়কে অনেক সেতু আছে। তাছাড়া এই সড়কের কারণে পানি আটকে থাকলে তো সড়কের আশপাশ এখন পানিতে টুইটম্বুর থাকতো। এমনটিও নেই।’

পরিবেশ বিজ্ঞানী ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. মো. খালেকুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের লক হ্যাভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। কিশোরগঞ্জের এই সড়ক নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক নির্মাণের আগে যথাযথ পরিবেশগত সমীক্ষা চালানো হয়নি। সড়কটি নির্মাণের আগেই আমি এর বিরোধিতা করেছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘হাওরের বৈশিষ্ট্য হলো জলের অবাধ প্রবাহ। আমি প্রস্তাব করেছিলাম, সড়ক যদি নির্মাণ করতেই হয় তাহলে যেন ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের অন্তত ৩০ ভাগ জায়গা উঁচু সেতু বা উড়াল সড়ক আকারে বানিয়ে পানিপ্রবাহের সুযোগ রাখা হয়। এ বিষয়ে তখন একটি লিখিত প্রস্তাবও দিয়েছিলাম।

‘এছাড়া এই সড়কের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এটি একা দাঁড়িয়ে থাকা এক সড়ক, এই সড়ক ব্যাপক অর্থে কোনো কানেক্টিভিটি তৈরি করছে না। তাই এই সড়ক নির্মাণের আবশ্যকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।’

২০২৩ সালে পরিকল্পনামন্ত্রী থাকাকালে এক অনুষ্ঠানে সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য এমএ মান্নান হাওরের এসব সড়ক নর্মাণ ভুল ছিলো বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘হাওরের মাঝখানে সড়ক নির্মাণ করা ঠিক হয়নি। এখন টের পাচ্ছি, হাওরে সড়ক নির্মাণ করে নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছি। হাওরে সড়ক বানিয়ে উপকারের চেয়ে অপকারই হয়েছে।’

এ ব্যাপারে বৃহস্পতিবার এম এ মান্নান বলেন, ‘সিলেটে বন্যার জন্য এই সড়কই দায়ী- এমনটি বললে সরলীকরণ হয়ে যাবে। হাওরে এমন অসংখ্য স্থাপনা হয়েছে। তাছাড়া মিঠামইন সড়কের অবস্থান সিলেট ও সুনামগঞ্জ থেকে অনেক দূরে।

‘তবে এখন থেকে হাওরে আর কোনো সড়ক নির্মাণ করা হবে না। শুধু উড়াল সেতু নির্মাণ করা হবে।

বৃহস্পতিবার (২০ জুন) সিলেটের বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনকালে এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বলেন, ‘কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের সড়ক দিয়ে পানি পারাপারের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করছে সরকার। এই বন্যার মধ্যে আমরা ওই সড়ক পরিদর্শন করব। সড়কটি পানিপ্রবাহে বাধার সৃষ্টি করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

আরও পড়ুন:
সুনামগঞ্জে আট লাখ মানুষ পানিবন্দি
আশ্রয়কেন্দ্রে খাদ্য সংকটে সুনামগঞ্জের বানভাসী মানুষ
সিলেটে বিস্তৃত হচ্ছে বন্যা, পানিবন্দি প্রায় ১০ লাখ মানুষ
মৌলভীবাজারে বন্যায় পানিবন্দি ২ লাখ মানুষ
হাওরে বাড়ছে পানি, সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

মন্তব্য

জাতীয়
Effect of rain and flood on Moulvibazar tourism

মৌলভীবাজারের পর্যটনে বৃষ্টি-বন্যার প্রভাব

মৌলভীবাজারের পর্যটনে বৃষ্টি-বন্যার প্রভাব টানা বৃষ্টি ও সিলেটের বন্যা পরিস্থিতির কারণে এবার মৌলভীবাজারের পর্যটনকেন্দ্রগুলো ফাঁকা। ছবি: নিউজবাংলা
কমলগঞ্জ অরণ্য নিবাস রিসোর্টের পরিচালক এহসান কবির সবুজ জানান, ঈদুল আজহা উপলক্ষে এমনিতেই পর্যটন অনেক কম। আমাদের রিসোর্টসহ বেশিরভাগ রিসোর্টে প্রায় ৫০ শতাংশের কম রুম বুকিং হয়েছে। তার ওপরে ঈদের দিন থেকে বৃষ্টি হওয়ায় পর্যটকরা রিসোর্ট থেকে বের হচ্ছেন না। রিসোর্টেই সময় কাটাচ্ছেন তারা।

‘চায়ের রাজধানী’ খ্যাত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে ঈদের দিন থেকে টানা বৃষ্টি ও নদ-নদীর পানি বেড়ে সৃষ্ট বন্যার কারণে গত কয়েকদিন ধরে চা বাগানসহ পর্যটন স্থানগুলো একপ্রকার ফাঁকাই রয়েছে। প্রতিবার ঈদে পর্যটক ও স্থানীয়দের ভিড় লেগে থাকে যেসব স্থানে, সেকানে এবারের চিত্র পুরোপুরি উল্টো

টানা ৩ দিনের বৃষ্টিতে প্রায় ফাঁকা হয়ে রয়েছে এসব দর্শনীয় স্থানগুলো। এমনিতেই এবার পর্যটক কম এসেছে। তার ওপরে সারা দিন বৃষ্টি হওয়ায় পর্যটকরা হোটেল রিসোর্ট থেকেও বের হতে পারছেন না।

সোমবার (ঈদের দিন) সকাল থেকে বুধবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত এ রিপোর্ট লেখা অবধি টানা বৃষ্টি হচ্ছে চায়ের রাজ্যে।

এদিকে, কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলে সিলেটের বন্যার প্রভাব পড়েছে। আগাম বুকিং দেয়া অনেকেই সিলেটের বন্যার সঙ্গে শ্রীমঙ্গলকে মিলিয়ে সেসব বুকিং বাতিল করে দিচ্ছেন।

শ্রীমঙ্গলের কোথাও বন্যা নেই বলে জানিয়েছেন পর্যটন-সংশ্লিষ্টরা। তবে কমলগঞ্জে বন্যা দেখা দিলেও হোটেল-রিসোর্টে এর কোনো প্রভাব পড়েনি।

চারদিকে সবুজের সমারোহে সজ্জিত সারি সারি চা বাগানের নয়নাভিরাম দৃশ্য মুগ্ধ করে কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলে পর্যটকদের। চা বাগান ছাড়াও বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই), টি মিউজিয়াম, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, হাইল হাওর, মৎস্য অভয়াশ্রম বাইক্কা বিল, নীলকণ্ঠ সাত রঙের চা কেবিন, বধ্যভূমি ৭১, চা-কন্যা ভাস্কর্যসহ নানা স্থান ঘুরে দেখেন দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা। শহর থেকে একটু দূরে লাল পাহাড়, শঙ্কর টিলা, গরম টিলা, ভাড়াউড়া লেক, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী পল্লী, সুদৃশ্য জান্নাতুল ফেরদৌস মসজিদ ও হরিণছড়া গলফ মাঠ ঘুরে আনন্দ উপভোগ করেন তারা।

এ ছাড়াও কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, পদ্মা লেক, পাত্রখলা লেক, ক্যামেলীয়া লেক, বীরশ্রেষ্ট হামিদুর রহমান, মনিপুরী পল্লী, খাসিয়া পল্লী পর্যটকদের আকর্ষণ করে। প্রকৃতির টানে তাই পর্যটকরা ছুটে আসেন চায়ের রাজ্যে। তবে এবার কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গলে ঘুরতে এলেও এসব পর্যটন স্থানগুলোতে যেতে পারেননি বেশিরভাগ পর্যটকরা।

মৌলভীবাজারের পর্যটনে বৃষ্টি-বন্যার প্রভাব

ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে এসেছেন আকাশ জামান। তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে, একবারও থামেনি। রিসোর্ট থেকেও বের হতে পারলাম না। রিসোর্টেই কাটতে হচ্ছে সময়। বৃষ্টি উপভোগ করলেও ভালো করে ঘুরতে পারিনি। বৃহস্পতিবার সকালে পরিবার নিয়ে চলে যাব। আবার ছুটি পেলে ঘুরতে আসব।’

শারমিন আনাম তান্নী নামের এক পর্যটক বলেন, ‘বুধবার সকালে সাতক্ষীরা থেকে কমলগঞ্জে এসেছি। নিজস্ব গাড়ি থাকায় ঘুরতে বেরিয়েছিলাম, কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে গাড়ি থেকেই নামতে পারিনি। গাড়ি থেকে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখলাম। প্রায় দুই ঘণ্টার মতো গাড়ি নিয়ে ঘুরে আবার রিসোর্টের দিকে এখন যাচ্ছি। এমন বৃষ্টি জানলে আসতাম না। হোটেল দুই দিন বুকিং দিয়েছিলাম। বৃহস্পতিবার সকালে চলে যাব।’

কমলগঞ্জ অরণ্য নিবাস রিসোর্টের পরিচালক এহসান কবির সবুজ জানান, ঈদুল আজহা উপলক্ষে এমনিতেই পর্যটন অনেক কম। আমাদের রিসোর্টসহ বেশিরভাগ রিসোর্টে প্রায় ৫০ শতাংশের কম রুম বুকিং হয়েছে। তার ওপরে ঈদের দিন থেকে বৃষ্টি হওয়ায় পর্যটকরা রিসোর্ট থেকে বের হচ্ছেন না। রিসোর্টেই সময় কাটাচ্ছেন তারা।

শ্রীমঙ্গল শহরের গ্রীনলিফ গেস্ট হাউজের মালিক এস কে দাশ সুমন বলেন, ‌‘দিন দিন পর্যটকরা দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ট্যুর কোম্পানিগুলো ঈদ কিংবা অন্যান্য ছুটির সময় ভারত, থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশে যাওয়ার অফার দেয়। এখন বেশিরভাগ পর্যটকই বিদেশমুখি হয়ে যাচ্ছেন।

‘এবার ঈদুল আযহা উপলক্ষে আমরা হোটেল রিসোর্ট মালিকরা খুব কম আগাম বুকিং পাচ্ছি। মুলত যারা শ্রীমঙ্গলে রাত্রিযাপন করেন, তাদের ৮০ ভাগই আগাম বুকিং দিয়ে আসেন।’

তিনি বলেন, ‘সিলেটে বৃষ্টির কারণে এবার বন্যা হচ্ছে। অনেক পর্যটক ধারণা করছেন, শ্রীমঙ্গলেও বন্যা, কিন্তু শ্রীমঙ্গলে কখনোই বন্যা হয় না। অনেকে সিলেটের সঙ্গে সেটা গুলিয়ে ফেলছেন। এখন শ্রীমঙ্গলের প্রকৃতি অপরূপ সাজে সজ্জিত। সবুজে ভরে আছে সবকিছু।’

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম আহমেদ বলেন, ‘সাধারণত ঈদের আগের দিন থেকে সপ্তাহব্যাপী পর্যটক শ্রীমঙ্গলসহ পুরো জেলায় ঘুরে বেড়ান। তাদের জন্য প্রতিটি হোটেল-রিসোর্টকে নতুন সাজে সজ্জিত করে রাখা হয়। পর্যটকদের জায়গা দিতে হিমশিম খেতে হয় প্রতিবার। বেশিরভাগ হোটেল-রিসোর্ট হাউসফুল থাকে, কিন্তু এ বছর ঈদের আগের দিন থেকে আজ অবধি খুবই কম বুকিং হয়েছে। বৃষ্টির কারণে পর্যটকরা এখানে এসেও ঘুরতে পারছেন না। এ কারণে এবার পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’

মৌলভীবাজার সহকারী পুলিশ সুপার (শ্রীমঙ্গল সার্কেল) আনিসুর রহমান বলেন, ‘পর্যটক ও স্থানীয়দের নিরাপত্তার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। ঈদের ছুটিতে ঘুরতে আসা পর্যটকদের জন্য ট্যুরিস্ট পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিটি পর্যটন স্পটগুলোতে আমাদের পুলিশ ছিল। পর্যটকরা যেন ঈদের ছুটি কাটিয়ে নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পারে, সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।’

আরও পড়ুন:
ঈদে আগাম বুকিং কম শ্রীমঙ্গলে, বললেন রিসোর্ট মালিকরা
পর্যটক-শূন্যতায় রুমা ও থানচির হোটেল রিসোর্ট ফাঁকা
ঈদ উপলক্ষে চাঙা সিলেটের পর্যটন খাত
ভরা মৌসুমে পর্যটকখরা শেরপুরে

মন্তব্য

জাতীয়
Verbose Kamarpara in last minute preparations
কোরবানির সরঞ্জাম তৈরি

শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে শব্দমুখর কামার পল্লী

শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে শব্দমুখর কামার পল্লী মৌলভীবাজার (বাঁয়ে) ও মাদারীপুরে ব্যস্ত সময় পার করছেন কামাররা। কোলাজ: নিউজবাংলা
কামার শিল্পী নগেন দাস বলেন, ‘সারা বছর এ কোরবানির ঈদের জন্য অপেক্ষায় থাকি আমরা। এ সময়টিতে যারা কোরবানির পশু জবাই করেন তারা প্রত্যেকে চাপাতি, দা, বটি, ছুরি তৈরি করেন। বছরের অন্য সময়ের চেয়ে এ সময়টিতে কাজ বেশি হওয়ার কারণে লাভও বেশি হয়।’

ঈদুল আজহার আর মাত্র এক দিন। এই শেষ মুহূর্তে দিন-রাত এক করে কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কামাররা। পশু জবাই, ব্যবচ্ছেদ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম তৈরি হচ্ছে এসব কামারপাড়ায়। এর মধ্যে রয়েছে দা, ছুরি, চাকু, কুড়াল ইত্যাদি। সারা বছর তেমন কাজ না থাকায় বছর ঘুরে কোরবানির ঈদের অপেক্ষায় থাকেন তারা।

মৌলভীবাজারের ভানুগাছ, আদমপুর ও শমশেরনগর বাজারে রোববার সকালে গেলে দেখা যায়, লোহার খণ্ডকে শরীরের সবটুকু শক্তি একত্র করে হাতুড়ি দিয়ে একের পর এক আঘাত করছেন কামাররা। সবারই হাত, পা, মুখ কালিতে ভরা। অসহনীয় উত্তাপে তাদের শরীরে দরদর করে বইছে ঘাম।

শ্রীমঙ্গল কামার পল্লির শ্যামল দেব, অপূর্ব দেব, সুধাংশু কর্মকার জানান, বাপ-দাদার ঐতিহ্য এ কামার শিল্প। বিগত দিন এ পেশা খুবই লাভজনক ছিল। এসব সরঞ্জামের চাহিদা ছিল অনেক বেশি। বর্তমানে চাহিদা কমে যাওয়ায় এ কাজ ছেড়ে দিয়েছেন অনেকেই। তাই দক্ষ কারিগরের অভাব দেখা দিয়েছে।

তারা জানান, কামার শিল্পের কাঁচামাল যেমন- কাঠকয়লা, লোহা, ইস্পাত ইত্যাদির দাম আগের তুলনায় অনেক বেশি। তাই মানুষ বিকল্প চিন্তা করে অটোমেশিনের তৈরি জিনিস ও বিদেশ থেকে চায়না মাল আমদানি হওয়ায় তাদের ব্যবসায় অনেকটা ভাটা পড়েছে।

কমলগঞ্জ উপজেলার ভানগাছ বাজারের রসু কর্মকার বলেন, ‘কামাররা পূর্বে কৃষি যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন ধরনের দেশীয় লোহার হাতিয়ার তৈরি ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কালের পরিক্রমায় বর্তমানে এ পেশা থেকে অনেকে মুখ ফিরিয়ে চাকরি অথবা অন্য ব্যবসায় দিকে ঝুঁকছেন। এখন হাতে গোনা কিছু লোক এ ব্যবসায় জড়িত।’

তিনি বলেন, ‘বছর ঘুরে ঈদুল আজহার অপেক্ষায় থাকি, খুশি হই। কারণ এ সময় যন্ত্রপাতির চাহিদা বেশি থাকে। আমরাও ব্যস্ত থাকি। নতুন দা তৈরি করতে এক হাজার ৫০০, চাকু ভালো মানের এক হাজার, চা-পতি ভালো মানের এক হাজার ৫০০ টাকা করে নেই। এ ছাড়াও পুরোনো দা, চা-পাতি ও চাকুগুলো শাণ দিতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা নেই।’

এ ছাড়াও যন্ত্রপাতি শাণ দেয়ার জন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে কাজ করছেন কামাররা।

এদিকে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে শব্দমুখর মাদারীপুরের কামারপাড়া। টুংটাং শব্দই বলছে ঈদ চলে এসেছে। দিন রাত চলছে চাপাতি, দা, বটি, ছুরি তৈরি ও শাণের কাজ। নাওয়া খাওয়া ভুলে নির্ঘুম রাত কাটছে তাদের।

কামাররা জানান, বছরে এ কয়টা দিন মাত্র ব্যস্ততা, কোরবানি ঈদের পর তো আর তেমন কোনো কাজ থাকে না। তাই তো এই সময়টাকে বেশ উপভোগ করেন কামার শিল্পীরা।

শহরের বিভিন্ন বাজার ও কামারপাড়া ঘুরে কথা হয় কর্মকারদের সঙ্গে।

কামার শিল্পী নগেন দাস বলেন, ‘সারা বছর এই কোরবানির ঈদের জন্য অপেক্ষায় থাকি আমরা। এ সময়টিতে যারা কোরবানির পশু জবাই করেন তারা প্রত্যেকে চাপাতি, দা, বটি, ছুরি তৈরি করেন। বছরের অন্য সময়ের চেয়ে এ সময়টিতে কাজ বেশি হওয়ার কারণে লাভও বেশি হয়, কিন্তু লোহার দাম কিছুটা কম থাকলেও কয়লার দাম বেশি থাকায় মজুরি একটু বেশি নিতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমাদের পরিচিত কিছু গ্রাহক দা, বটি, ছুরি বানানোর অর্ডার দিয়ে গেছে এবং শাণ দিতে অর্ডার পেয়েছি। পাশাপাশি নতুন বটি, ছুরি তৈরি করছি।’

চরমুগুরিয়া বাজারের কামার নৃপেন বাড়ৈ জানান, এই এক মাসের কাজের ওপর তাদের পরিবারের ছেলে-মেয়েদেরও লেখাপড়া জামা-কাপড়সহ বছরের খরচের বেশির ভাগটা নির্ভর করে।’

কামার শিল্পের আনুষঙ্গিক কয়লা ও লোহার দাম লাগামহীনভাবে ওঠানামা করতে থাকে বলে জানান কর্মকাররা। তাই এ পেশাকে ধরে রাখতে কয়লা ও লোহার দাম নিয়ন্ত্রণ ও সহজ শর্তে ঋণের দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে।

সদর উপজেলার পুরানবাজার, চরমুগুরিয়া বাজার, মস্তফাপুর বাজার, কালিরবাজারসহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন কামারের দোকানে গ্রাহকের আনাগোনা এখন বেড়েছে। কামাররাও দা, বটি, ছুরি, শাণ দিতে ব্যস্ত। দোকানের সামনে বিক্রির জন্য সাজিয়ে রেখেছেন নতুন দা, ছুরি, বটি।

মানভেদে নতুন দা ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা, ছুরি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, বটি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায়, এবং ধামা ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কামাররা জানান, পেশার ভবিষ্যৎ নিয়েও তারা এখন চিন্তিত, কারণ এ কাজের সময় আওয়াজ হয় বলে শহরে তেমন কেউ তাদের দোকান ভাড়াও দিতে চায় না। সীমিত আয় দিয়েই চলে তাদের সংসার।

মন্তব্য

জাতীয়
This years Eid joy is buried under the broken house

‘এবারের ঈদের আনন্দ চাপা পড়েছে ভাঙা ঘরের নিচে’

‘এবারের ঈদের আনন্দ চাপা পড়েছে ভাঙা ঘরের নিচে’ ঘূর্ণিঝড় রিমালে গাছ পড়ে মাটির সঙ্গে মিশে যায় মিনারার দোকানঘরটি। ছবি: নিউজবাংলা
মিনারা বলেন, ‘দোকানঘরটিতে চা নাস্তা বিক্রি করতাম, সেখানেও লোনের কিস্তি দিতাম।ঘরটি নতুন করে তুলব সেই পয়সাও নেই। ঈদ আসবে ঈদ যাবে, ওসব ভেবে কী করব। এবারের ঈদ আনন্দ ভাঙা ঘরের নিচেই চাপা পড়ে আছে।’

এবারের ঈদে আনন্দ নেই ঝালকাঠি সদরের আগলপাশা গ্রামের দম্পতি জামাল-মিনারার পরিবারে। একটি গাছ তাদের ঈদ আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। ঝালকাঠি পৌর এলাকার ডিসি পার্ক সংলগ্ন সুগন্ধার তীরে একটি টিনশেড ঘরে চায়ের দোকান ছিল মিনারার একমাত্র আয়ের সম্বল। ঘূর্ণিঝড় রিমালে গাছ পড়ে মাটির সঙ্গে মিশে যায় মিনারার দোকানঘরটি।

ওই দোকানটা দিয়ে অসুস্থ স্বামী জামাল মিয়াসহ চার সন্তানের জন্য আহার যোগাতেন মিনারা বেগম। বাসন্ডা ইউনিয়নের আগলপাশা গ্রামে সরকারের দেয়া মুজিব বর্ষের উপহারের ঘরে থাকেন পরিবারটি, কিন্তু ঝড়ের পর থেকে ঠিকমতো দুই বেলা খাবার জুটছে না তাদের। এ বছর তাদের ঈদ আনন্দ ভাঙা দোকানঘরের নিচেই চাপা পড়ে আছে।

বুকে কষ্ট নিয়ে এসব কথা এ প্রতিবেদককে বললেন মিনারা বেগম।

মিনারা বলেন, ‘দোকানঘরটিতে চা নাস্তা বিক্রি করতাম, সেখানেও লোনের কিস্তি দিতাম। তারপর ঘরে বাজার করতাম। বর্তমানে ঘরে নেই ভাতের চাল, আবার কিস্তির চাপ। দোকানঘরটি নতুন করে তুলব সেই পয়সাও নেই। ঈদ আসবে ঈদ যাবে, ওসব ভেবে কী করব। এবারের ঈদ আনন্দ ভাঙা ঘরের নিচেই চাপা পড়ে আছে।’

মিনারার স্বামী অসুস্থ জামাল হাওলাদার বলেন, ‘সরকার বাহাদুরের দিকে চাইয়া রইছি। মোগো থাহার জন্য সরকার যেহেতু একখান ঘর দেছে, রোজগারের ব্যবস্থাও করবে। দোকানঘরটা যদি আবার করতে পারতাম তয় আবার বাজার কইররা কয়টা ডাইল ভাত খাইতে পারতাম।’

জামাল মিনারা দম্পত্তির মেয়ে ফাতিহা আক্তার স্কুলে পড়াশোনা করেছে। মা বাবার সঙ্গেই সংসারের কাজ করে সে।

ফাতিহা বলে, ‘আত্মীয়দের কাছ থেকে টাকা ধার করে গত মাসে কিস্তি দিছি। এ মাসে হয়তো ঘরের কিছু বিক্রি করে দিতে হবে। এই ঈদে আমাদের কেউ এক কেজি চাউলও দেয় নাই। আমার ছোট দুইটা ভাই বেকার বসে আছে। ঈদে আমরা কোথাও যাব না, আমরা ঘরেই থাকব। টাকা রোজগার হলে ঈদের আনন্দ আগামী বছর করব।’

এ বিষয়ে কথা হয় ঝালকাঠি পৌর সভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হুমায়ুন কবির সাগরের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘রেমালের পর বরাদ্দ আসেনি। কোরবানি ঈদে অসহায় পরিবারপ্রতি ১০ কেজি করে চাল দেয়ার স্লিপ আমি পেয়েছি। ব্যস্ততার কারণে মিনারাকে দেয়া হয়নি। তার স্লিপ আমি আমার কাছে রেখে দিয়েছি।’

বাসন্ডা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাবের হোসেন বলেন, ‘জামল-মিনারার পরিবারের ভোট পৌরসভা এলাকায়, তাই হয়তো রাতুল মেম্বার তাদের স্লিপ দেয়নি। তবে আমার কাছে আসলে আমি দিয়ে দেব।’

আরও পড়ুন:
যানবাহনের চাপ নেই বঙ্গবন্ধু এক্সপ্রেসওয়ে ও পদ্মা সেতুতে
ছুটি শুরুর দিনেই সদরঘাটে যাত্রীর চাপ
রাতে গাড়ির চাপ বেড়ে যানজট সাভারে
কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে সিন্ডিকেট বরদাশত নয়: র‍্যাব
এক্সপ্রেসওয়েতে বেড়েছে চাপ, পদ্মা সেতুর টোল প্লাজায় জট

মন্তব্য

জাতীয়
In Kurigram blacksmiths say that the business has increased in Kamarpara and the profit is less

কুড়িগ্রামে কামারপাড়ায় বেড়েছে ব্যস্ততা, লাভ কম বলছেন কামাররা

কুড়িগ্রামে কামারপাড়ায় বেড়েছে ব্যস্ততা, লাভ কম বলছেন কামাররা কুড়িগ্রামে ঈদকে ঘিরে বেড়েছে কামারদের ব্যস্ততা। ছবি: নিউজবাংলা
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী বাজারের সবচেয়ে পুরোনো কর্মকার মোজাম্মেল হক জানান, প্রায় ৩৬ বছর ধরে এ পেশায় আছেন তিনি। পেশাটার প্রতি মায়া পড়ে গেছে। এখন ১২ থেকে ১৩ টাকার কয়লা ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজিতে কিনতে হচ্ছে। ৩০ টাকা কেজির লোহা কিনতে হচ্ছে ১০০ টাকার উপরে। ফলে অল্প লাভেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে কামারদের।

কুড়িগ্রামে ঈদকে ঘিরে বেড়েছে কামারদের ব্যস্ততা। ক্রেতারা খুঁজছেন শাণ দেয়া ঝকঝকে দা ও ছুরি। কেউ কেউ পরখ করে নিচ্ছেন ঠিকমতো হাড় কাটবে কি না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কামারপাড়ায় ঝনঝন শব্দ জানান দিচ্ছে তাদের কাজের ব্যস্ততা, তবে স্থানীয় প্রশাসন ও কর্মকাররা ক্ষতিকর যন্ত্রপাতির অপব্যবহার করতে দেন না বলে জানিয়েছেন।

এক সময় কৃষিকাজ, বাড়িঘর মেরামত ও গৃহস্থালি কাজের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল কামারদের। ব্যবসাটা তখন ছিল জমজমাট। হাল আমলে প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় সেই পেশা এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও গ্রামে গ্রামে ছিল কামারদের অবস্থান। এখন কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় লোকসানের কারণে শত শত মানুষ এই পেশা পরিবর্তন করেছেন, তবে কামারদের দক্ষ হাতের কাজের এখনও জনপ্রিয়তা রয়েছে।

কোরবানি এলেই আবার লোকজন ছুটে আসেন কামারদের কাছেই।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী বাজারের সবচেয়ে পুরোনো কর্মকার মোজাম্মেল হক জানান, প্রায় ৩৬ বছর ধরে এ পেশায় আছেন তিনি। পেশাটার প্রতি মায়া পড়ে গেছে। এখন ১২ থেকে ১৩ টাকার কয়লা ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজিতে কিনতে হচ্ছে। ৩০ টাকা কেজির লোহা কিনতে হচ্ছে ১০০ টাকার উপরে। ফলে অল্প লাভেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে কামারদের।

পার্শ্ববর্তী ছিনাই ইউনিয়নের বাসিন্দা ভবেন ও খগেন দুই ভাই প্রায় ৩৪ বছর ধরে কাজ করছেন। পাশেই কাজ করছেন তাদের গ্রামের কৃষ্ণ মোহন। তারা জানান, এক সময় ছিনাইতে ২৫ ঘর লোক কামারের পেশায় নিয়োজিত ছিল। এখন ৮ থেকে ১০ জন এই পেশায় আছেন। বাকিরা অন্য পেশায় চলে গেছেন।

এসব যন্ত্রপাতি তৈরি করতে প্রশাসনের কোনো অনুমতি নেয়া লাগে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তারা জানান, এসব যন্ত্রাদি তৈরি করতে তাদেরকে কারো কাছ থেকে কোনো অনুমতি নিতে হয় না। কিন্তু সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হয় এমন যন্ত্রপাতি তারা কখনও তৈরি করেন না। শুধু সাংসারিক ও মাঠের কাজে ব্যবহার করা যায় এমন জিনিসই তৈরি করে আসছেন তারা যুগের পর যুগ ধরে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা সমাজসেবা অফিসার হাবিবুর রহমান জানান, আর্থিক সংকট এবং র-ম্যাটেরিয়ালসর উচ্চমূল্য এবং সামাজিকভাবে মর্যাদা না পাওয়ায় অনেকে পেশা পরিবর্তন করছেন। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এ পেশার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের পাশে দাঁড়ানো।

তিনি জানান, কুড়িগ্রাম সদরে প্রায় ৮০ জন কামার রয়েছেন। পুরো জেলাজুড়ে কামার রয়েছে প্রায় চার শতাধিক।

এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুশফিকুল আলম হালিম বলেন, ‘যেহেতু ইক্যুইপমেন্টগুলো ধারালো, সেগুলো যেন খারাপ মানুষের হাতে না পড়ে এ জন্য মোটিভেশনাল কথাবার্তার পাশাপাশি আমাদের নজরদারিও থাকে কামারদের কার্যক্রমের প্রতি। এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো খারাপ সংবাদ আসেনি। তারপরও আমরা সতর্ক অবস্থানে থাকি যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহৃত জিনিসগুলো খারাপ কাজে ব্যবহার করা না হয়।’

আরও পড়ুন:
কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে সিন্ডিকেট বরদাশত নয়: র‍্যাব
এক্সপ্রেসওয়েতে বেড়েছে চাপ, পদ্মা সেতুর টোল প্লাজায় জট
বাড়ির পথে ছুটছে মানুষ
ঈদযাত্রার প্রভাব নেই সদরঘাটে, গার্মেন্টস ছুটির অপেক্ষা
বাজার কাঁপাতে আসছে বিগবস, বাদশা, টাইগার, বুলেট ও রক

মন্তব্য

p
উপরে