20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
চাক্ষুষদের বর্ণনায় বেতাগী হামলা

চাক্ষুষদের বর্ণনায় বেতাগী হামলা

চেয়ারম্যানকে কুপিয়ে পা প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। বাম হাতের উপরিভাগে গুরুতর জখম। নির্জন রাস্তায় কয়েকটি ইটে এখনও ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। পাশের ঝোপের পাতাতেও রক্তের কালচে দাগ।

বরগুনার বেতাগী উপজেলা। এই উপজেলার প্রত্যন্ত একটি জনপদের নাম সরিষামুড়ি ইউনিয়ন। উত্তর পশ্চিমাংশে প্রমত্তা বিষাখালী নদীর তীর। এলাকার ভেতর থেকে এঁকেবেঁকে কয়েকটি খাল প্রবাহিত হয়ে বিষখালীতে মিশেছে। খালের উভয় পাড়ের বেরিবাধ ঘেঁষে ঘন জঙ্গলে ও গাছগাছালি আবৃত প্রতিটি গ্রাম।

এই ইউনিয়নের কালিকাবাড়ি বাজার থেকে ইটের সড়ক ধরে দুশ গজ সামনে নাপিত বাড়ি। ঘন জঙ্গল রাস্তার উভয় পাশে। কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। দিনের বেলাতেও গা ছমছম করে।

নির্জন রাস্তায় কয়েকটি ইটে এখনও ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। পাশের ঝোপের পাতাতেও রক্তের কালচে দাগ।

এখানেই শুক্রবার বিকেলে ইউপি চেয়ারম্যান ইমাম হোসেন শিপন দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন। কেটে ফেলা হয় তার ডান পা, বাম পায়ের দুই-তৃতীয়াংশ কেটে যায়, বাম হাতের উপরিভাগে গুরুতর জখম।

হামলা


কারা, কেন এমন নৃশংস হামলা চালালো, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ঘটনাস্থলে যাওয়া। সেখানে পৌঁছে বোঝা গেল, দূর থেকে গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন এক ব্যক্তি। মিনিট খানেকের মধ্যে প্রায় ১০/১২ জন লোক কাছে এলেন।

পরিচয় নিশ্চিত হয়ে ঘটনার বিবরণ দিলেন অনেকে। কিন্তু কারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে, কেন এমন নির্মমতা এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে নারাজ সবাই। সবার চোখেমুখে শঙ্কা আর ভীতি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই জটলার একজন প্রাথমিক কিছু তথ্য দিলেন।

ঘটনাস্থল থেকে মাত্র এক মিনিটের দূরত্বে জনৈক পনু মিয়ার বাড়িতে বিয়ে অনুষ্ঠানে পাঁচ শতাধিক লোকের দাওয়াত ছিল শুক্রবার। দাওয়াত ছিল ইউপি চেয়ারম্যান ইমাম হোসেন শিপন জোমাদ্দার ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ইউসুফ শরীফেরও। ইউসুফ শরীফ একাই এসেছিলেন বিয়েতে। তিনি প্রথম পর্বে খাওয়া শেষ করে চলে যান।

ইউপি চেয়ারম্যান শিপনও দাওয়াত খেয়ে বিয়ে বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে ফিরছিলেন। একটি বাইকে করে ফিরছিলেন তিনি। তিন জন উঠেছিলেন বাইকে। চালক ফারুক, মাঝখানে চেয়ারম্যান শিপন ও পেছনে আরও এক জন।

নাপিত বাড়ির সামনে পৌঁছতেই জঙ্গলে ওঁৎ পেতে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি বাইকের গতিরোধ করেন। মুহূর্তেই একজন শিপনের বাম হাতে ধারালো অস্ত্রের কোপ বসিয়ে দেন। এ সময় কলার ধরে টেনে শিপন চেয়ারম্যানকে রাস্তায় ফেলে দেন একজন। ইটের ওপর পা রেখে মুহূর্মুহূ কুপিয়ে জখম করা হয় শিপনের উভয় পা।

হামলা


এ সময় ঘটনাস্থলে লোকজন সেখানে আসতে শুরু করে। দু তিনজন ব্যক্তি নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিলে মুহূর্তেই তাদের দিকে তেড়ে আসতে চেষ্টা করেন হামলাকারীরা। পুলিশ সদস্যরা পিছু হটে পালিয়ে যান।

হামলাকারী কারা ছিল? এক প্রত্যক্ষদর্শী নাম-পরিচয় প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ইউসুফ শরীফ বিয়ে বাড়ি থেকে আগেই এসে তিন ছেলে জাফর, আজিম ও হাসিবসহ এখানে অবস্থান নেন। ইউসুফ রাস্তায় ছিলেন, ছেলেসহ ঘনিষ্ঠ কিছু স্বজন ও অনুসারি মোট ১০/১২ জন জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল। চেয়ারম্যান শিপন মোটরসাইকেলযোগে আসতেই তারা বেরিয়ে পথরোধ করেন।

ওই প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ইউসুফ নিজেই শিপনকে কলার ধরে টেনে রাস্তায় ফেলে দেন। এ সময় ছেলেসহ অন্যেরা এসে কুপিয়ে জখম করেন। লোকজনের আনাগোনা শুরু হলে সেখান থেকে দ্রুত সটকে পড়েন ইউসুফ ও তার তিন ছেলেসহ সহযোগীরা।

বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যানের বিরোধ কেন

এলাকাবাসী এক এক করে হামলার কারণ বর্ণনা করেন। তবে সবারই শর্ত পরিচয় গোপন রাখতে হবে। তারা জানান, ইউসুফ বহু বছর ধরে এই জনপদে আধিপত্য বিস্তার করে ছিলেন। এলাকায় তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী।

তার বিরোধিতা করে কেউ পার পায়নি কখনও। যাকে যেমন দরকার, তাকে তেমন করে শাসিয়েছেন। অনেকে নিগৃহীত হয়েছেন ইউসুফ শরীফের বাহিনীর হাতে, অনেকে হয়েছেন এলাকাছাড়া।


আরও পড়ুন: ইউপি চেয়ারম্যানকে কুপিয়ে জখম


নির্বাচনকেন্দ্রীক বিরোধিতায় ইউসুফ বাহিনীর হাতে জখম হয়েছেন অনেকে। ২০০৩ সালের ইউপি নির্বাচনে প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা মিছিলে অংশ নিলে ইউসুফ বাহিনীর হামলার শিকার হন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সালেহ ফারুক, দফতর সম্পাদক মঞ্জুর মোর্শেদ খোকন, মিলনসহ নয় জন। পোড়ানো হয় আটটি মোটরসাইকেল।

হামলা


২০১০ সালে মায়ার বাজার থেকে বিশ্বাস বাড়ির মতি বিশ্বাস নামের এক জনকে ইউসুফের ক্যাডার আলী আকবরের নেতৃত্বে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপর তার এখনও কোনো হদিস মিলেনি।

মতির গুম হওয়ার বিষয়টি ভাই এনায়েত বিশ্বাস নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমার ভাইকে গুম করেছিল আলি আকবর, এর নেপথ্য ছিল ইউসুফ শরীফ। মামলা করে বিচারও পাইনি, ভাইয়েরও সন্ধান পাইনি।’

মূলত ইউসুফ শরীফের বৃত্তের বাইরে গিয়ে কারো টিকে থাকার সুযোগ নেই ওই ইউনিয়নে। একপ্রকার জিম্মিদশায় বসবাস করতে হত বাসিন্দাদের এমনই বক্তব্য এলাকাবাসীর।

২০১৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সরিষামুড়ি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য বরগুনা বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ইমাম হোসেন শিপনের সঙ্গে বিরোধ হয় ইউসুফ শরীফের। সেখানে শিপন সমর্থকদের হামলার শিকার হন ইউসুফ শরীফসহ চার জন। জেলার শীর্ষ নেতাদের সামনে অপমানিত হন তিনি।

হামলা
হামলায় অভিযুক্ত ইউসুফ শরীফ


জেলা নেতৃবৃন্দ বিরোধের নিষ্পত্তি না করেই শিপনকে মনোনয়ন দেন। স্বতন্ত্র নির্বাচন করে শিপনের কাছে হেরে যান ইউসুফ। এরপর থেকে উভয়ের বিরোধ বাড়তেই থাকে। সবশেষ বেতাগী উপজেলা আওয়ামী লীগের এক সভায় ফের শিপনের হাতে লাঞ্চিত হন ইউসুফ শরীফ। এ নিয়ে চাপা ক্ষোভের কারণেই হামলার পরিকল্পনা করেন বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।

ইউসুফ শরীফের বক্তব্য জানতে শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এই প্রতিবেদক তার সরিষামুড়ির বাড়িতে যান। কিন্তু সেখানে কাউকেই পাওয়া যায়নি। বাসাবাড়ি ছিল তালাবদ্ধ অবস্থায়। পরে ইউসুফ শরীফ ও তার ছেলেদের মোবাইল নাম্বারে ফোন দেয়া হয়। কিন্তু সবার ফোনই বন্ধ পাওয়া যায়।

পুলিশ সদস্যরা কারা ছিল

ঘটনার সময় যে তিনজন পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন, তাদের একজন বেতাগী থানার উপপরির্দশক (এসআই) আলাউদ্দিন। তিনি মূলত অন্য একটি মামলার তদন্ত কাজে ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে তিনি ঘটনার সময় সেখানে পৌঁছান।

তিনি জানান, ঘটনার সময় না, ঘটনার পরপর তিনি সেখানে গিয়েছিলেন এবং জখম ইউপি চেয়ারম্যানকে তিনি উদ্ধার করে গাড়িতে গৌরিচন্না বাজারে পৌঁছান। পরে সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে বরগুনা আনা হয় তাকে।

বেতাগী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, হামলার শিকার চেয়ারম্যানের স্বজনরা সবাই ঢাকায় আছেন। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের কেউ মামলা করতে থানায় আসেনি। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তবে কাউকে এখনও গ্রেফতার করা হয়নি।


আরও পড়ুন: পুলিশের উপস্থিতিতেই ইউপি চেয়ারম্যানের ওপর হামলা


ফেরার পথে কথা হয় ওই এলাকার কয়েক তরুণের সঙ্গে। সভ্য যুগেও সন্ত্রাসের জনপদ সরিষামুড়ি এমন বদনামে ভারাক্রান্ত তারা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ চান ওই তরুণেরা।

শেয়ার করুন

মন্তব্য