20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
করোনার বাধায় মেট্রোরেল

রাজধানীর পল্টন এলাকায় মেট্রোরেলের পিলার হলেও বসানো হয়নি পিয়ারহেড। ছবি: সাইফুল ইসলাম

করোনার বাধায় মেট্রোরেল

২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। কোভিডের কারণে বিদেশি বিশেষজ্ঞরা সবাই যোগ দেননি কাজে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কর্মকর্তারা।

ঢাকার আগারগাঁও থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার পথে মেট্রোরেলের ভায়াডাক্টের সবগুলো বসে গেছে। এখন উপরে চলছে রেললাইন স্থাপনের কাজ।

তবে এখান থেকে কমলাপুর পর্যন্ত নয় কিলোমিটার ভায়াডাক্ট বসেছে দুই একটা মাত্র। যেগুলো পিলার তৈরি হয়েছে, সেগুলো বেশিরভাগেই পিয়ার হেড বসানো হয়নি। অথচ কাজ শেষ করতে হবে আর সোয়া এক বছরের মধ্যে।

নগরীর যানজট নিয়ন্ত্রণে আশা দেখানো প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় প্রায় চার বছর ধরে। সময় বাড়ানোর পর ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এটি উদ্বোধনের সিদ্ধান্ত আছে।

লক্ষ্য পূরণ করতে হলে তিন গুণ গতিতে কাজ শেষ করতে হবে। প্রায় চার বছরে কাজ শেষ হয়েছে অর্ধেকেরও কম। বাকি সাড়ে ১৪ মাসে শেষ করতে হবে বাকি ৪৯ দশমিক ২০ শতাংশ।

করোনা পরিস্থিতিতে কয়েক মাস কাজ বন্ধ থাকায় এই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হবে না- স্বীকার করেছেন প্রকল্প পরিচালক। শীতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে যে শঙ্কার কথা বলা হচ্ছে, সেটা আসলে কী হবে, তা নিয়েও চিন্তিত তিনি।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক সামছুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মেট্রোরেল চালু করতে সরকারের হাতে সময় আছে ১৪ মাস। কাজের অগ্রগতি ফিফটি পার্সেন্ট। সেক্ষেত্রে সময়টা কম।’

উত্তরা থেকে মিরপুর আগারগাঁও, ফার্মগেট, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে মতিঝিল ও কমলাপুর পর্যন্ত যাবে দেশের প্রথম মেট্রোরেলটি।

মেট্রোরেলের কাজ আগাচ্ছে
মিরপুরের কাজীপাড়া থেকে দুই দিকেই বসে গেছে মেট্রোরেলের ভায়াডাক্ট। ছবি: সাইফুল ইসলাম

প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত। তবে আগে সিদ্ধান্ত ছিল ২০১৯ সালে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ও বাকি অংশ পরে চলতি বছরের ডিসেম্বরে উদ্বোধন হবে। তবে পরে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে দুই ভাগে উদ্বোধনের সিদ্ধান্ত বাতিল হয়। কাজ চলছিল সেভাবেই।

তবে চলতি বছরের মার্চে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখার দেওয়ার পর লকডাউন পরিস্থিতিতে কাজ বন্ধ থাকে দুই মাসেরও বেশি। পিছিয়ে থাকে কাজ।

করোনার প্রাদুর্ভাব কিছুটা কমে আসায় কয়েক মাস পর কাজ শুরু হয়েছে বটে। কিন্তু বিদেশি বিশেষজ্ঞরা এখনও সবাই কাজে ফেরেননি। বিভিন্ন দেশ থেকে মালামাল আনার ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে বাধা।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন সিদ্দিক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা পরপর সংকটের মধ্যে পড়ছি। হলি আর্টিজানের হামলার পর প্রায় ছয় মাস কাজ বন্ধ ছিল। করোনায় আমরা কাজ বন্ধ রেখেছি দুই মাস। সামনে শীতে করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তখন আবার হতে পারে বন্ধ থাকবে। তবে আমরা সামনের বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে উত্তরা থেকে আগারগাঁও শেষ করতে পারব। আগারগাঁও থেকে মতিঝিল শেষ করতে হয়ত একটু সময় বাড়বে।’

অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, মেট্রোরেলের মতো প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি সময় লাগে মাটির নিচের কাজে। তিনি বলেন, ‘সাধারণত এ ধরনের কাজে শুরুর দিকের থেকে শেষের দিকেই অগ্রগতি বেশি দেখা যায়। তবে সেটা নির্ভর করছে দুটি বিষয়ের উপর। একটি ঠিকাদারের কর্মততপরতা, অপরটি বাস্তবায়নকারী সংস্থার তদারকি।

‘তবে একটি অংশের কাজ শেষ হলেও, কারিগরি নানা বিষয় থাকে। তাই সম্পূর্ণ অংশ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো অংশই চালু হবে না। পুরোটা একসঙ্গেই চালু করতে হবে।’

এ বিষয়ে এম এন সিদ্দিক বলেন, মেট্রোরেল প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বাস্তবায়নের লক্ষ্য ২০২১ সালে নামিয়ে আনা হয়েছে। তাই নতুন করে কর্মপরিকল্পনা করতে হয়েছে নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবায়নের জন্য। সেই নতুন কর্মপরিকল্পনা ধরেই সকল কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।

মেট্রোরেলের দিয়াবাড়ির অংশ
উত্তরার দিয়াবাড়ী এলাকায় মেট্রোরেলের স্টেশনের কাজ চলছে। ছবি: সাইফুল ইসলাম

পিছিয়ে পড়ার কারণ

২০১৬ সালের হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর কাজ বন্ধ ছিল প্রায় ছয় মাস। তারপরে আবার করোনার সময় বন্ধ ছিল দুই মাস। দুই মাস পর কাজ শুরু হলেও বিদেশি নাগরিকদের সবাই না আসার কারণে পুরোদমে কাজ হচ্ছে না।

করোনা মহামারির আগে প্রকল্পে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজারের মতো লোক কাজ করত। তার মধ্যে এক হাজারেরও বেশি বিদেশি নাগরিক আছেন। বর্তমানে ৬০০ জনের মতো কাজে এসেছেন। বাকিরা জানিয়ে দিয়েছেন, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে তারা আসবেন না।

সরকারের স্বাস্থ্যবিধি মেনে দেশি শ্রমিকরা কাজ করতে আগ্রহী হলেও বিদেশিরা অনুৎসাহী। কেউ কেউ আবার কঠিন শর্ত বেধে দিয়েছিল কাজে ফেরার ক্ষেত্রে।

ডিএমটিসিএল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্য অধিদফতরকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছি বিদেশিদের শর্ত।’

অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদফতরের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। প্রকল্পের টাকায় নিজেদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করে নিতে হবে। পদ্মা সেতু প্রকল্পে নিজস্ব ক্লিনিক, সুরক্ষাব্যবস্থা, কর্মীদের বিচ্ছিন্ন রেখে সংক্রমণ ঠেকানোসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষকেও একই পথে হাঁটতে হবে। এতে খরচ বাড়লেও তা মেনে নিতে হবে।’

এখন কাজ চলছে যেভাবে

সাধারণ ছুটি ‍তুলে নেয়ার পর উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ও রেললাইন স্থাপনসংক্রান্ত কাজ সীমিতভাবে শুরু হয়।

১০ জনের একেকটা দল গঠন করে ৫০ থেকে ১০০ গজ দূরে দূরে কাজের ক্ষেত্রে প্রস্তুত করা হয়েছে। থাকার জায়গাতেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য কোথাও দেয়াল, কোথাও দূরে দূরে বিছানা বসানো হচ্ছে।

উত্তরার ডিপো এলাকার ভেতরে ভবন হবে ৫২ টি। কিছু ভবন পুরোপুরি প্রস্তুত, দেয়ালে দেয়া হয়েছে লাল টাইলস। কোনোটার আবার কাজ হচ্ছে।

উত্তরায় রয়েছে তিনটি স্টেশন। প্রথম স্টেশনে সিঁড়ি না বসলেও, অস্থায়ী সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে দেখা যায়, বিশাল এক হল রুম। এই হল রুমকে বলে কনকোর্স হল, যাত্রীরা এখান থেকে টিকিট কিনবে।

পল্লবী থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চলছে আরও ছয়টি স্টেশনের কাজ। আগারগাঁও থেকে মতিঝিলের দিকে চলছে ভায়াডাক্ট বসানোর কাজ।

মেট্রোরেলের মিরপুরের কাজীপাড়া অংশ
মেট্রোরেলের মিরপুরের কাজীপাড়া অংশ। ছবি: সাইফুল ইসলাম

সার্বিক অগ্রগতি

উত্তরা থেকে মিরপুর আগারগাঁও, ফার্মগেট, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে মতিঝিল ও কমলাপুর পর্যন্ত যাবে দেশের প্রথম মেট্রোরেলটি।

আগারগাঁও থেকে উত্তরার পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার পথে মেট্রোরেলের ভায়াডাক্টের সবগুলো বসে গেছে। তবে এখান থেকে কমলাপুর পর্যন্ত নয় কিলোমিটার পর্যন্ত ভায়াডাক্ট বসেছে দুই একটা মাত্র।

এই নয় কিলোমিটারে ভায়াডাক্ট বসবে যে সব পিলারের ওপর তার সবগুলো এখনও শেষ হয়নি। যেগুলো পিলার তৈরি হয়েছে, সেগুলো বেশিরভাগেই পিয়ার হেড বসানো হয়নি।

প্যাকেজ ৩ ও ৪-এর আওতায় উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার উড়ালপথ ও নয়টি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। পরে এই উড়ালপথের ওপরই ট্রেনের জন্য লাইন বসানো হবে। এ প্যাকেজের মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। অথচ কাজের অগ্রগতি ৭৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

আগারগাঁও থেকে উত্তরার মধ্যে মেট্রোরেলের মূল ডেকের ৯৩ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক সিস্টেম, রোলিং স্টক (রেল কোচ) আর ডিপো সরঞ্জামসহ সমন্বিত অগ্রগতি ২৯ দশমিক ৮০ শতাংশ।

ডিএমটিসিএল ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিক বলেন, উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে ৭৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটারের মধ্যে ১০ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার দৃশ্যমান হয়েছে।

আগারগাঁওয়ের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র এলাকায় চলছে মেট্রোরেল প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজ। এখানে মেট্রোলাইনের পিয়ার হেড বসানো হচ্ছে। আগারগাঁও থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত ৯০টি খুঁটির ওপর বসবে পিয়ারহেড। সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত যার ৩৭টি বসানো হয়েছে।

আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্মাণের অগ্রগতি হয়েছে ৪৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে জাইকা দেবে ১৬ হাজার ৫৯৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

প্রধানমন্ত্রী মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৬ বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন। ফলে বর্ধিত ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটারের সামাজিক জরিপ চলছে।

প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে জাইকা দেবে ১৬ হাজার ৫৯৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

প্রধানমন্ত্রী মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৬ বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন। বর্ধিত ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার নিয়ে জরিপ চলছে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য