20201002104319.jpg
আলুর সর্বোচ্চ দাম ৩০ টাকা বেঁধে দিল সরকার

বগুড়ার মহাস্থানগড়ে আলুর হাটের চিত্র। ছবি: সাইফুল ইসলাম

আলুর সর্বোচ্চ দাম ৩০ টাকা বেঁধে দিল সরকার

সিদ্ধান্ত হয়েছে, হিমাগারে দাম হবে ২৩ টাকা, পাইকারিতে ২৫ টাকা। এর চেয়ে বেশি দাম নিলে ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন।

আলুর খুচরা দাম কোনোভাবেই ৩০ টাকার বেশি হতে পারবে না। উৎপাদন খরচ, মজুদ, হিমাগারের ও পরিবহন খরচ এবং ব্যবসায়ীদের লাভ হিসাব করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বেঁধে দেয়া দামে আলু বিক্রি হচ্ছে কি না, সেটি তদারকি করতে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) চিঠিও দিয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কেউ যদি বেঁধে দেয়ার চেয়ে বেশি দামে আলু বিক্রি করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

খুচরার পাশাপাশি পাইকারি ও হিমাগারে দর সর্বোচ্চ কত হতে পারবে, সেটিও ঠিক করে দেয়া হয়েছে।কারওয়ানবাজারে আলুর দোকান

চাল ও ভোজ্যতেলের পাশাপাশি আলুর দাম বৃদ্ধি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। খুচরা পর্যায়ে কোথাও কোথাও কেজিপ্রতি ৫৫ থেকে ৬০ টাকা দর হাঁকছেন বিক্রেতারা। দামে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির পর এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থা টিসিবি জানাচ্ছে, বুধবার রাজধানীতে আলু বিক্রি হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে। ২০১৯ সালের এই দিনে দাম ছিল ২০ থেকে ২৫ টাকা। এক বছরে দাম বেড়েছে ১১১ শতাংশ।

গত এক মাসে দাম বেড়েছে ২৮ শতাংশ।

যদিও কৃষি বিপণন অধিদপ্তর খুচরা মূল্য আলুর বাজার দর ৩৮ থেকে ৪২ টাকা উল্লেখ করেছে। তবে এই দামকেও তারা ‘একেবারেই অযৌক্তিক’ বলেছে।

জেলা প্রশাসকদেরকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, হিমাগার পর্যায়ে বিক্রয় মূল্যের ওপর সাধারণত ২ থেকে ৫ শতাংশ লাভ করা উচিত।

পাইকারি পর্যায়ে ৪ থেকে ৫ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ লাভ যোগ আলুর দাম বিক্রি করা যৌক্তিক বলেও উল্লেখ করা হয় চিঠিতে।

অধিদপ্তর বলেছে, হিমাগার থেকে প্রতি কেজি আলু ২৩ টাকায় বিক্রি হলেও সংরক্ষণকারীর ২ টাকা লাভ হয়।  

অন্যদিকে আড়তদারি, খাজনা ও শ্রমিক খরচ বাবদ ৭৬ পয়সা খরচ হয়। সেই অনুযায়ী পাইকারি মূল্য (আড়ৎ পর্যায়) ২৩ টাকা ৭৭ পয়সার সঙ্গে লাভ যোগ করে সর্বোচ্চ ২৫ টাকা দেয়া যায় বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

আর পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে খরচ ধরে প্রতি কেজির দাম ৩০ টাকা হওয়া উচিত।

গত মৌসুমে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ৮ টাকা ৩২ পয়সা ছিল বলেও জানিয়েছে অধিদপ্তর।

গত মৌসুমে আলুর উৎপাদন হয়েছে ভালো
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে গত বছর চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি ছিল ৩১ লাখ মেট্রিকটন।

 

গত মৌসুমে দেশে উৎপাদন চাহিদার চেয়েও বেশি ছিল বলেও অধিদপ্তর জানিয়েছে। সরকারি হিসাব দেশে আলুর চাহিদা ৭৭ লাখ নয় হাজার টন হলেও উৎপাদন হয়েছে তার দেড় গুণ; প্রায় এক কোটি নয় লাখ টন।

উদ্বৃত্ত ৩১ লাখ ৯১ হাজার টন আলুর একটি অংশ রপ্তানি হয়েছে। তাই ঘাটতির কোনো কারণ নেই বলে মনে করছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর।

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতা মোন্তাকিম আশরাফ বলেছেন, হিমাগারে মজুদের অভাব নেই। তবে অনেক হিমাগার মালিক আলু ধরে রেখেছেন। তাই সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

নিউজবাংলাকে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘সারাদেশে ১৫০টি হিমাগারে এখনও মজুদ আছে ৪০ লক্ষ টন আলু। এর মধ্যে ১০ লক্ষ টন বীজ আর বাকি ৩০ লাখ টন খাওয়ার আলু। কাজেই বাড়ার যৌক্তিক কারণ নেই।’

‘তবে অনেকেই বাজারজাত না করার কারণে বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে।’

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন থেকে দেশের সব হিমাগার মালিকদের চিঠি দিয়ে দ্রুত আলু বাজারে ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও জানান আশরাফ।

বাজারে যে দাম, সেটাকে অযৌক্তিক বলছেন, হিমাগার মালিকদের নেতা। নি বলেন, ‘যে পরিমাণ আলু আছে তাতে প্রতি কেজি কোনোভাবেই ৩০ থেকে ৩৫ টাকার বেশি হওয়া উচিত নয়।’

ব্যবসায়ীরা যা বলছেন

রাজধানীর শান্তিনগরের ব্যবসায়ী চঞ্চল শিকদার বুধবার আলু বিক্রি করেছেন ৪৪/৪৫ টাকা কেজি দরে।

সরকার দাম ৩০ টাকা ঠিক করে দিয়েছে, এটা জানেন কি না- এমন প্রশ্নে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘সরকারের ঠিক করে দেওয়া দামে বেচলে আমরা যারা খুচরা ব্যবসায়ী, তাগো অনেক লস হয়ে যাবে।আমি আজকে ৪২ টাকা দিয়া আলু কিইনা আনছি। এখন কেমনে ৩০ টাকায় বেচব?’

এই ব্যবসায়ীর ধারণা, আলুর দাম বৃদ্ধির সঙ্গে করোনার সম্পর্ক রয়েছে। তিনি জানান, গত কয়েক মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে আলু বিক্রি হয়েছে বেশি। মানুষ বাসায় অবস্থান করায় বাড়তি কেনাকাটা করেছে এবং এটা চাহিদা ও যোগানের মধ্যে একটি ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতা মোন্তাকিম আশরাফও এই কথা বলেছেন। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আলু ব্যবসায়ীরা প্রতিবছর আগস্ট মাসে কোল্ড স্টোরেজ থেকে আলু বের করে নেন। এবার লকডাউনের কারণে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় জুন মাসেই ব্যবসায়ীরা কোল্ড স্টোরেজ থেকে আলু বের করেছেন।’

শ্যামবাজারের আলু-পেঁয়াজের আড়ৎ মেসার্স বাণিজ্য ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকারী কাজী আশরাফ চঞ্চল নিউজবাংলাকে জানান, আলুর দাম মূলত হিমাগার থেকে নির্ধারণ হয়ে আসে। তারা অল্প কমিশনে বিক্রি করেন।

‘আমরা যে দামে কিনি সেখান থেকে ৬০ পয়সা লাভ রেখে তা বিক্রি করে দিই। আজ আমরা ৩৮ টাকা করে আলু কিনেছি। আমরা মূলত কমিশন ব্যবসায়ী। দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে আমাদের কোন দায় নেই। হিমাগারে যদি দাম ঠিক থাকে তবে বাজারেও দাম ঠিক থাকবে।’

সরকারের নির্ধারিত দামে আলু বিক্রি নিশ্চিত করতে হিমাগারে নজরদারির পরামর্শ দিয়েছেন এই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘খুচরা ব্যবসায়ী এই দামে আলু বিক্রি করতে পারবে না যদি না হিমাগারে দাম ঠিক না থাকে।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য