20201002104319.jpg
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘর্ষের নেপথ্যে কী

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘর্ষের নেপথ্যে কী

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় অস্ত্র নিয়ে সংঘাতে লিপ্ত কয়েকটি বাহিনী। সংঘাতের প্রধান কারণ চাঁদার টাকার ভাগাভাগি হলেও অনেকে মনে করেন এর পেছনে আছে বাইরের ইন্ধন।  

আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে ক্রমশ সংঘাত বাড়ছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয়। গত ১০ দিনে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে নয় জনে। তিন বছরে খুন হয়েছে ৮০ জনেরও বেশি।

জাতিগত নিধন ও নিপীড়নের মুখে ভিটেমাটি হারিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বাংলাদেশে এসেছিল ২০১৭ সালে।

তবে এখন আশ্রয় শিবিরগুলোয় অন্তর্কোন্দল আর খুনোখুনিতে ভীতি সঞ্চার হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। দুশ্চিন্তার ভাঁজ প্রশাসনের কপালেও।

উখিয়ার কুতুপালংয়ের রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকার কাসেমিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও ব্যবসায়ী আকবর আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, দোকানপাট, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা তোলা আর মাদক ইয়াবার অবৈধ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ক্যাম্পে সংঘাতে লিপ্ত দুটি অস্ত্রধারী গ্রুপ। এরা ক্যাম্পেরই বাসিন্দা।

টেকনাফ ও উখিয়ার ৩২টি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ক্যাম্পে বিভিন্ন মার্কেট, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা তোলে গ্রুপগুলো। ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার আবাসস্থল ক্যাম্পগুলোতে বর্তমানে ১৫ হাজারের বেশি দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, এসব সংঘাতের একদিকে রয়েছে মুন্না গ্রুপ, আরেক দিকে বেলাল-আসাদের নেতৃত্বাধীন ‘ইয়াবা ইয়াকিন’ গ্রুপ।

আকবর আহমদ জানান, প্রত্যেক দোকান থেকে মাসে ৫০০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা করে চাঁদা তোলে এই সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো। বর্তমানে এই চাঁদা তোলার প্রায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে মুন্না গ্রুপ। এ নিয়ে অন্য সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে শুরু হয়েছে মুন্নার বিরোধ।

তবে এ ঘটনাকে অন্যভাবে দেখছেন পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গফুর চৌধুরী। তিনি মনে করেন, এর পেছনে মিয়ানমারের আরাকানে থাকা কথিত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও বহুজাতিক এবং স্থানীয় কিছু এনজিও সংগঠনের ইন্ধন আছে।

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার উদ্যোগ এবং এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা বানচালের অংশ হিসেবে একটি গোষ্ঠী অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়। এরই অংশ হিসেবে মুন্না বাহিনী ও তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বাহিনীর নাম শোনা যায়। বর্তমানে এ সংঘর্ষ অনেক বেড়েছে। তারা ক্যাম্পকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে বলে রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকেই খবর পাচ্ছি।’

কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান হাফেজ জালাল আহমদও ক্যাম্পে ঘটতে থাকা চলমান ঘটনাকে কেবল আধিপত্য বিস্তারের লড়াই হিসেবে দেখতে নারাজ। তিনিও এটাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের ভিটেমাটি ছেড়ে এই দেশে এসেছি। এখানে ক্যাম্পগুলোতে মানবেতর জীবন যাপন করছি। এটা তো আমাদের দেশ নয়। যত দ্রুত আমরা আমাদের দেশে ফিরে যেতে পারি, আমাদের ওপর অন্যায়ের বিচার পেতে পারি। সে জন্য বাংলাদেশ ও বিশ্ব সম্প্রদায়কে আমাদের সহায়তা করা দরকার। কিন্তু তা না করে ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়ে আমাদের দেশে ফেরা পিছিয়েই কেবল দিচ্ছি না, স্থানীয় অধিবাসী এবং বাংলাদেশ প্রশাসনের মনেও আমাদের সম্পর্কে বাজে ধারণার জন্ম দিচ্ছি। এটা তো আত্মঘাতী ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু না।’

হাফেজ জালাল জানান, সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো সাধারণ রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে যেতে নিরুৎসাহিত করছে। তারা নানা পরিস্থিতি তৈরি করে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।

হঠাৎ করে এই সংঘাত বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উখিয়া কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক শহিদুল ইসলাম বলছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের কাছে মুরুব্বি ‍হিসেবে ছিলেন মৌলভী বখতিয়ার বা বখতিয়ার মেম্বার। স্থানীয় পালংখালী ইউনিয়নের কুতুপালং এলাকার ইউপি সদস্য ছিলেন তিনি।

পুরনো রোহিঙ্গাসহ ২০১৭ সালে আসা রোহিঙ্গারাও তাকে মান্য করত। তিনি রোহিঙ্গাদের এক ধরনের অভিভাবক ছিলেন। ক্যাম্পে সংঘাত হলে বিচার-সালিশ করতেন। গত ২৪ জুলাই ভোরে ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন। এরপর থেকে রোহিঙ্গারা অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে এবং যে যার মতো করে চলতে থাকে। এতে সংঘর্ষের প্রবণতা বেড়েছে।

কুতুপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর চৌধুরী বলেন, ‘পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালীর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম শরণার্থী শিবির বলে শুনেছি। এখানে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করে মাত্র কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকায়। এর বাইরে আগে আসা রোহিঙ্গা আছে আরও চার লাখ। টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসনের জনসংখ্যা সাত লাখের মতো। ক্যাম্পে সংঘাত, গোলাগুলি, হত্যাকাণ্ডে স্থানীয়রা দুশ্চিন্তায় আছে। কেননা আদতেই তারা (রোহিঙ্গারা) ফিরবে কিনা সেটাই বড় দুশ্চিন্তা। বর্তমানে মুন্না বাহিনীর কর্মকাণ্ড সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে।’

বিভিন্ন ক্যাম্পের একাধিক মাঝির (কমিউনিটি নেতা) সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুন্না বাহিনীর প্রধান মাস্টার মুন্না মিয়ানমারের মংডু জেলার উত্তর নাগপুর এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ঢলের সঙ্গে তিনি সপরিবারে বাংলাদেশে আসেন। মিয়ানমারে থাকতেই তিনি বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারের কারবারে জড়িত ছিলেন।

মুন্না বাহিনীর সঙ্গে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বেলাল-আসাদ–মাহাদ-সেলিম-আলম বাহিনীর। এদের সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা না গেলেও তারা আরাকানে থাকা রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের মদদপুষ্ট বলে সাধারণ রোহিঙ্গারা মনে করে।

নিয়মিত সংঘর্ষের ঘটনায় ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গাদের মাঝে ভীতি দেখা দিয়েছে। দিনের বেলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার থাকায় সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর তৎপরতা কম দেখা গেলেও রাতের বেলায় তাদের সশস্ত্র মহড়া চলে বলে জানান রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ।

উখিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, এত অল্প জায়গায় এত বিপুলসংখ্যক ভিনদেশি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। এরই মধ্যে দেশি-বিদেশি সংস্থার কারসাজিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে এমনিতেই উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে স্থানীয়রা।

রোহিঙ্গা ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন কার্যালয়ের (আরআরআরসি) অতিরিক্ত কমিশনার শামসুদ দৌজা নিউজবাংলাকে জানান, ক্যাম্পের প্রতিপক্ষ বাহিনীগুলোর মধ্যে চলা সংঘর্ষ এখন নিয়ন্ত্রণে। পুলিশ-র‌্যাব টহল দিচ্ছে।

এ ব্যাপারে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আহমেদ মঞ্জুর মোরশেদ বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচটি মামলা হয়েছে। ক্যাম্পের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।

কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ খলিলুর রহমান খান বলেন, ক্যাম্পের পরিস্থিতি এখন শান্ত। রাতের বেলায় কিছুটা ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে কিছুদিনের মধ্যে সার্বিক অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য