20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
থানা হাজতের করুণ চিত্র

থানা হাজতের করুণ চিত্র

হাজতে কি ফাইভ স্টার হোটেলের মতো পরিবেশ চান: গুলশানের ওসি

খাবারে সরকারি বরাদ্দ একেবারেই অপ্রতুল। খোলা টয়লেট, আবর্জনায় দুঃসহ পরিবেশ। কারাগারের পরিবেশ পাল্টালেও হাজতখানা নিয়ে নেই কোনো চিন্তা।

‘মানুষ তো দূরের কথা, কোনো জন্তু-জানোয়ারের জন্যও এমন আটকখানা হয় না। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে, পাতলা পায়খানা, বমি বা ভয়ে ও কষ্টে অনেকেরই জ্বর আসে। বড়ই বিশ্রী পরিস্থিতি।’

এক রাতে গুলশান থানা হাজতে আটকে থাকার অভিজ্ঞতা আদালতপাড়ায় এসে নিউজবাংলাকে বলছিলেন জিয়াউল হাসান।

মানবপাচার মামলায় খিলগাঁও থানা হাজতে রাত যাপনের পর রোকসানা পারভীন বলেন, ‘ভয়ানক নোংরা, ঠিকমতো পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় না। থাকা, খাওয়া, ঘুমানো ও বাথরুম একই সঙ্গে।’

চেক ডিসঅনার মামলায় গ্রেফতারের পর ঢাকার আদালতে এসে একজন আসামি বললেন, ‘খাওয়া-দাওয়ার কোনো সরকারি ব্যবস্থা নাই, স্বজনরা এসে খাবার দিতে গেলে টাকা লাগে।’

পুলিশের সাবেক একজন মহাপরিদর্শক জানালেন, আসামিদের খাওয়ানোর জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জোগাড় করেন খাবার।

যেকোনো মামলায় গ্রেফতার বা সন্দেহভাজন হিসেবে আটকের পর থানা হাজতে থাকার যে অভিজ্ঞতা তা বছরের পর বছর ধরে একই রকম। ঘুমানোর জন্য বিছানা নেই, নেই বালিশের ব্যবস্থা।

তীব্র গরমেও ভেতরে নেই বৈদ্যুতিক পাখা। নেই গোসলের ব্যবস্থা। আসামিরা সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়েন মলমূত্র ত্যাগ নিয়ে।

হাজতে যে টয়লেট আছে, সেখানে দরজা নেই। কোমর সমান উঁচু একটা দেয়াল, উপরে খোলা। আসামি ১০ জন থাকুক আর ৫০ জন থাকুক, তাতে কিছু পরিবর্তন হয় না।

হাজতের ভেতরের আবর্জনা, বন্দিদের ঘামের দুর্গন্ধ আর মলমূত্রের গন্ধ মিলে উৎকট পরিবেশে থাকাই দায়।

কারাগারের পরিবেশ নিয়ে নানা আলোচনার পর পরিবেশ পাল্টাচ্ছে ধীরে ধীরে। কারাগারে বৈদ্যুতিক পাখা, ঘুমানোর বিছানা, মানসম্মত টয়লেট, চিত্ত- বিনোদনের জন্য টেলিভিশন বসছে। তবে কোনো পরিবর্তন নেই হাজতখানায়।

২০১৫ সালে এক উপপরিদর্শকের সঙ্গে তর্কাতর্কির জেরে রাজধানীর কারওয়ানবাজার রেললাইন এলাকা থেকে ‘অ’ অদ্যাক্ষরের এক তরুণকে আটক করে তেজগাঁও থানা পুলিশ।

নিউজবাংলাকে ওই তরুণ বলেন, ‘ডিউটি অফিসারের রুমে নাম-ঠিকানা লিখে সোজা হাজতে নেয়া হয় আমায়। ভেতরে তখন আরও কমপক্ষে ৩০ জন। চারদিকে টয়লেটের দুর্গন্ধ, নোংরা, ময়লা। কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে ওখানে থাকা কষ্টের ব্যাপার।’

পরদিন সকালে ওই তরুণকে তোলা হয় আদালতে। শুনানি হয় দুপুরে। বলা হয় সন্দেহভাজন আসামি। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে সেখান থেকে ছাড়া পান সন্ধ্যা নাগাদ। তবে এক রাতে গারদখানার অভিজ্ঞতা থেকে এখন পুলিশ দেখলে দূরে দূরে থাকেন ওই তরুণ।

২০১৫ সালে এই তরুণ এবং ২০২০ সালে এসে তিন জনের অভিজ্ঞতায় এতটুকু পার্থক্য নেই।

গ্রেফতার হলে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা থানায় রাখার বিধান আছে। প্রতিটা থানায় সাধারণত দুইটা হাজতখানা থাকে। একটা পুরুষদের জন্য, অপরটি নারীদের জন্য। প্রতিবন্ধী বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য আলাদা কক্ষ নেই। ফলে শিশুরা থাকে যৌন নির্যাতনের ঝুঁকিতে।

আসামি অনেক, তাদের জিনিসপত্রে হাজতখানাগুলো হয়ে উঠে ময়লার ভাগাড়ের মতো।

গুলশান থানায় গিয়ে হাজতখানা ঘুরে দেখার অনুমতি মেলেনি। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল হাসান বলেন, ‘হাজতে কি ফাইভ স্টার হোটেলের মতো পরিবেশ চান? যতটুকু সম্ভব পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করি।’

ভেতরে উন্মুক্ত টয়লেট থাকার কারণ কী, এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, ‘দরজা বন্ধ বাথরুম করলে আসামি আত্মহত্যা করতে পারে। তাই বাথরুমে ছোট একটা দেয়াল দেয়া থাকে।’

হাজতে নেয়ার আগে বেল্ট, শরীরের যেকোনো ধরনের সুতা খুলে রাখা হয়। মানিব্যাগ, মোবাইলও দেয়া হয় না। তাহলে আত্মহত্যা করবে কী দিয়ে প্রশ্নে গুলশানের ওসি বলেন, ‌এ বিষয়ে আমি আর কোনো মন্তব্য করতে পারব না। কিছু জানতে হলে পুলিশ সদর দফতরের স্টেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট শাখায় যোগাযোগ করুন।’

তবে ওই শাখায় ফোন করা হলে একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা কোনো কথা বলব না।’

হাজতখানার খাবারের মানও ভালো না। একাধিক বন্দি বলেছেন, ‘মুখে তোলার মতো না।’

সম্প্রতি মোহাম্মদপুর থানায় গিয়ে পুরুষদের হাজতখানা ফাঁকা দেখা যায়। কেউ না থাকলেও ভেতরে খাবারের উচ্ছিষ্ট, ছড়িয়ে থাকা ময়লা, আবর্জনা দেখা যায়। টয়লেট থেকে দুর্গন্ধ আসছিল। কোন তোশক বা চাটাই ছিল না সেখানে।

একই চিত্র দেখা যায় নিউমার্কেট থানায়। হাজতখানার পুরুষ কক্ষের এক কোনায় ময়লা জড়ো করা। একটি পুরনো নোংরা কম্বল চোখে পড়ে। সেখানেও ফাঁকা হাজত থেকে দুর্গন্ধ আসছিল।

হাজতখানার পরিবেশ কেমন হওয়া উচিত

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আইনুন নাহার সিদ্দিকা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হাজতখানার নোংরা পরিবেশে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়। যেখানে ১০ জন লোক থাকতে পারে, সেখানে তার কয়েক গুণ লোক রাখা হয়; তার উপরে নোংরা পরিবেশ। ফলে এই মানুষগুলোর অনেক কষ্ট করে থাকতে হয়।’

‘হাজতে যে টয়লেট, সেটা ব্যক্তির জন্য অনিরাপদ। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও রয়েছে। এককথায় নাগরিক সুবিধা দিতে হবে।’

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যিনি হাজতখানায় থাকেন তিনিও তো মানুষ। তার বসবাস উপযোগী পরিবেশ রাখতে হবে। গারদে টাইলস লাগাতে হবে এমন কথা নয়, তবে যে অবস্থায় আছে সেটা পরিষ্কার রাখতে হবে।’

‘থানা হাজতখানা পরিষ্কার না রাখলে ওসিকে জবাবদিহি করতে হবে এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। যেহেতু এখানে রাতে মানুষ থাকেন সেহেতু তাদের তোশক-বালিশের ব্যবস্থা থাকতে হবে।’

হাজতখানার এমন পরিবেশ বন্দির মানসিক পীড়নের কারণ হতে পারে বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন কাউসার বিপ্লব। তিনি বলেন, যারা অপরাধে জড়িত, তাদের তাও এক ধরনের কঠিন মানসিকতা থাকে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যারা ঘটনাচক্রে বন্দি হয়, তার জন্য পরিস্থিতি খুবই কষ্টকর হয়ে যায়।

‘এই নোংরা পরিবেশ এই ধরনের মানুষের জন্য এক ধরনের অপমান। বারবার এই বাজে স্মৃতি মনে পড়ে মন খারাপ হবে।’

শেয়ার করুন