20201002104319.jpg
মিন্নির খালাস চাওয়ার যেসব যুক্তি

বিচারিক আদালতে ফাঁসির রায়ের পর মিন্নিকে কারাগারে নেয়া হচ্ছে। ফাইল ফটো

মিন্নির খালাস চাওয়ার যেসব যুক্তি

বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে। আবেদনে ২১ দফা যুক্তি দিয়ে মিন্নির খালাস চাওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় মিন্নির পক্ষে আইনজীবী মাক্কিয়া ফাতেমা ইসলাম আপিল করেন। আলোচিত এ মামলায় তার আবেদনের পক্ষে শুনানি করবেন আইনজীবী জেড আই খান পান্না।

আবেদনের ২১ দফা যুক্তিতে বলা হয়েছে, এক. মিন্নির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি।

দুই. সাজাপ্রাপ্ত আপিলকারী (মিন্নি) এ মামলার গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষী ছিলেন। কিন্তু পরে তাকে এ মামলায় আসামি করা হয়। এরপর তাকে সাজা প্রদান করা হয়, যা বাতিলযোগ্য।

তিন. মিন্নিকে সাজা দিয়ে বরগুনার দায়রা আদালতের রায় আইন, ঘটনা এবং পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় একটি খারাপ নজির তৈরি করেছে।

চার. প্রাথমিকভাবে আপিলকারী (মিন্নি) এই মামলায় সাক্ষী ছিলেন। পরে তাকে মামলার আসামি করা হয়েছে। তাকে পাঁচদিন পুলিশ রিমান্ডে রাখা হয়েছিল। ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রিমান্ডের মধ্যবর্তী সময়ে ফিল্মি স্টাইলে আইন বহির্ভূতভাবে তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করে, যে কারণে রায়টি বাতিলযোগ্য।

পাচঁ. মামলার চার্জশিটে ৭৫ জন সাক্ষী রাখা হয়েছিল। তার মধ্যে ৭, ১৩, ১৪ ও ১৭ নম্বর সাক্ষী নিজেদের চাক্ষুস সাক্ষী দাবি করা সত্ত্বেও তাদের তথ্যপ্রমাণ ছিল পক্ষপাতদুষ্ট। এ কারণেও রায়টি বাতিল হওয়ার যোগ্য।

ছয়. তদন্ত কর্মকর্তা অস্বচ্ছতার সঙ্গে মামলা তদন্ত করেছেন এবং কোনোরকম আইনি ভিত্তি ছাড়া চার্জশিট দাখিল করেন, যা মোটেই নির্ভরযোগ্য নয়।

সাত. মিন্নির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আমলে না নিয়েই বরগুনার দায়রা জজ আদালত তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন। এখানে ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৪২ ধারা সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এটি মিন্নিকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

আট. আইনের সঠিক অনুসরণের অভাবে মামলায় মিন্নি নিজেকে রক্ষায় উপযুক্ত সুযোগ পায়নি।

নয়. মামলাটি করার সময় বাদী (রিফাতের বাবা) জানান, ঘটনাস্থল থেকে মিন্নি রিফাতকে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে রিকশাযোগে এনে ভর্তি করেন এবং মিন্নিকে একমাত্র সাক্ষী করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে মামলার তদন্ত শেষে মিন্নিকে আসামি করে দণ্ড দেওয়া হয়। এতে করে মিন্নি পরিস্থিতির শিকার হয়েছে।

দশ. বিচারিক আদালত সন্দেহপূর্ণ, মৌখিক সাক্ষ্য এবং ধারণানির্ভর অন্যান্য পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় রায় দিয়েছেন, যা বাতিলযোগ্য।

এগারো. ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে, মিন্নি বারবার তার স্বামী রিফাতকে আক্রমণকারীদের থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু আদালত তার রায়ে মিন্নি রিফাতকে বাঁচানোর চেষ্টা করেনি বলে উল্লেখ করেছে।

বারো. মিন্নিকে সাজা দেওয়ার ঘটনা ছিল অনুমান ও ধারণানির্ভর। মামলায় সাক্ষীদের জেরাও বিবেচনা করা হয়নি। ফলে মিন্নিকে অপরাধী সাব্যস্ত করে সাজা সংক্রান্ত আদালতের রায়টি ভুল সিদ্ধান্ত।

তেরো. যেকোনো দৃষ্টিকোণ থেকে বিচারিক আদালত কর্তৃক মিন্নিকে সাজা প্রদানের বিষয়টি নির্ভরযোগ্য না হওয়ায় তার সাজা প্রদানের রায় বাতিলযোগ্য।

চৌদ্দ. আপিলকারীকে প্রহসনমূলক ও অযৌক্তিকভাবে সাজা প্রদান করা হয়েছে।

পনের. রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা রাষ্ট্রপক্ষের স্বার্থ হাসিলের জন্য ঘটনা অতিরঞ্জিত করেছে।

ষোল. আপিলকারীকে দোষী সাব্যস্ত করা ব্যতীত বিচারক এই মামলায় অন্য আর কিছুই বিবেচনা করেননি।

সতেরো. দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় আপিলকারী এ মামলায় খালাস পাবেন।

আঠার. সময়ে সময়ে মামলায় যুক্ত হওয়া সাক্ষীদের ওপর নির্ভর করে সাজা দেওয়া হয়েছে। সেসব সাক্ষী বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন না।

উনিশ. পুলিশের কাছে বা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সাক্ষীরা বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়ায় সেসব সাক্ষীরা মোটেও নির্ভরযোগ্য ছিলেন না।

বিশ. অগ্রণযোগ্য পদ্ধতি অনুসরণ করে মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে।

একুশ. যে কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে মামলার অভিযোগ পারিপার্শ্বিক অবস্থা, তথ্যপ্রমানের ভিত্তিতে সন্দেহতাতীভাবে প্রমাণিত হয়নি।

গত বছরের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে কুপিয়ে জখম করা হয় রিফাত শরীফকে। পরে হাসপাতালে মারা যান তিনি।

ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। তখন দেখা যায়, মিন্নি তার স্বামীকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।

মামলায় বিচারিক আদালত গত ৩০ সেপ্টেম্বর মিন্নিসহ ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ওই রায়ের পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স রোববার হাইকোর্টে পৌছায়। এরপর মঙ্গলবার মিন্নি খালাস চেয়ে আপিলে আবেদন করেন।

আবেদনের পর মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ হাইকোর্টে আমরা ন্যায় বিচার পাব। উপরওয়ালার পরে হাইকোর্টের ওপর ভরসা। আমরা আশা করছি ন্যায়বিচার পাব।’

মিন্নির আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, ‘আমরা আশাবাদী যত দ্রুত সম্ভব এ মামলার শুনানি হবে। আইনের আলোকে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মিন্নি বেকসুর খালাস পাবে।

শেয়ার করুন