20201002104319.jpg
ঢাকায় কুকুর বেশি নাকি কম

এক বাচ্চার সঙ্গে খেলছে মা কুকুর। বাকিগুলো ব্যস্ত দুধ খাওয়ায়। ছবিটি রাজধানীর জোয়ার সাহারা থেকে তোলা। ছবি: সাইফুল ইসলাম

ঢাকায় কুকুর বেশি নাকি কম

ঢাকায় প্রতি একশজনে পথ কুকুরের সংখ্যা ০.৩, সারাবিশ্বে গড় ৫.৫

‘পুরো হাউজিং (মোহাম্মদপুরের চান মিয়া হাউজিং) এর রাস্তায় চিল্লাইয়া চিল্লাইয়া ডাকতেছিলাম। কারণ, আমি জানি আমার ডাক কানে গেলে ও আশেপাশে থাকলেও আসবে। দেখলাম একদম চিপা অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসতেছে। ওরে দেখে কান্না করে দিছি। মাথায় হাত দেয়ার সাথে সাথে হেসে দিছে।’ 

চান মিয়া হাউজিং এ থাকেন ফারিহা আজাদ বৃষ্টি। পথের ধারের এক কুকুরকে আপন করে নিয়েছেন তিনি। আদর করে নাম দিয়েছেন লাল্লু। তাকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না বলে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তবে কিছুক্ষণ পর ফিরে স্বস্তি।

‘ভাবছিলাম হয়তো সিটি করপোরেশনের লোকেরা অন্য কুকুরদের পাশাপাশি ওরেও নিয়ে গেছে। ওরে খাইয়ে দিয়ে, পাশের এক দারোয়ানকে রিকোয়েস্ট করে আসছি। কেউ ধরতে আসলে যেন বলে, তারা লাল্লুকে পালেন। ও খুবই শান্ত বাচ্চা, কারো ক্ষতি করে না।‘ 

‘জানি না কতদিন বা কতক্ষণ ওরে এমন নজরে নজরে রাখতে পারব‘-লাল্লুদের জন্য ভীষণ দুশ্চিন্তায় বৃষ্টি। 

রাজধানীতে পথ কুকুরের সংখ্যা বেড়ে গেছে – এই যুক্তিতে সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৩০ হাজার কুকুর সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় পরিচ্ছন্নকর্মীরা কুকুর ধরা শুরুও করে। তবে এখন দৃশ্যমান তৎপরতা বন্ধ।

পশুপ্রেমীরা এই সিদ্ধান্ত মানতে পারছেন না। তারা একে অমানবিক ও অযৌক্তিক বলছেন। পরিচিত কুকুরগুলোর খোঁজ নিচ্ছেন তারা হন্যে হয়ে। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছের নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কুকুর নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার অভিযোগ পাওয়ার পর জনস্বার্থে কুকুর অপসরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।‘ 

প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকায় কুকুরের সংখ্যা কি আসলেই অনেক বেড়ে গেছে? সংখ্যাটি কত হওয়া বাঞ্ছনীয়?

জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের কমিউনিকেবল ডিজিজেস কন্ট্রোল ইউনিটের (সিডিসি) একটি হিসাব বলছে, সারা দেশে জনসংখ্যার বিপরীতে কুকুরের যে গড় অনুপাত, তার তুলনায় রাজধানীতে কুকুরের সংখ্যা কম। 

জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধে সিডিসি বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দিয়ে থাকে। ফলে কুকুরের সংখ্যার হিসাব তাদের করতে হয়। এই কর্মসূচির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সারাদেশে প্রতি ১০০ জনের বিপরীতে একটি করে কুকুর আছে। এই অনুপাত বহাল থাকলে দেড় কোটি জনসংখ্যার ঢাকা শহরে কুকুর থাকার কথা দেড় লাখ। 

অথচ সিডিসির জলাতঙ্ক নির্মুল কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী ঢাকায় কুকুরের সংখ্যা ৪৮ হাজার ৫১২টি; এর মধ্যে উত্তরে ২২ হাজার ২৫৩ এবং দক্ষিণে ২৬ হাজার ২৫৯টি। অর্থাৎ ঢাকায় প্রতি ১০০ জনে কুকুরের সংখ্যা ০.৩ এর কম। 

২০১৩ সালে অক্সেফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত ‘ফ্রি রেঞ্জিং ডগস অ্যান্ড ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন’ বইতে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে কুকুরের সংখ্যা ৯০ কোটি। এর মধ্যে মালিকহীন কুকুরের সংখ্যা ৪৩ কোটির মতো। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের বিপরীতে পথ কুকুর আছে পাঁচটির বেশি।

মিডিয়াইন্ডিয়া নামে একটি সংস্থা জানাচ্ছে, ভারতে পথ কুকুরের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে প্রায় তিনটি কুকুর রয়েছে।  বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ফারিহা আজাদ বৃষ্টি মোহম্মদপুরে তার বাড়ির আশেপাশের কুকুরগুলোর নিয়মমিত যত্ন নেন। 

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হিসাবে কলকাতায় মালিকহীন কুকুরের সংখ্যা দেড় লাখের মতো।

সরকারি হিসাব ধরলে সারা বিশ্ব, এমনকি সারা দেশের অনুপাতের চেয়ে ঢাকায় কুকুরের সংখ্যা কম হওয়ার বিষয়টি জানা আছে কি না- এমন প্রশ্ন উপেক্ষা করে যান ঢাকা দক্ষিণের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছের। 

প্রাণী সংগঠন অভয়ারণ্য-এর প্রতিষ্ঠাতা রুবাইয়া আহমেদ বলেন, ‘ঢাকায় কুকুরের সংখ্যা কমে গেছে। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে লোকসমাবেশে কুকুর বেশি চোখে পড়ছে। তার মূল কারণ, পশুর প্রতি মানুষের প্রেম। মানুষ তাদের কাছে ডাকছে, খাওয়াচ্ছে, আদর করছে। কুকুররাও তাই মানুষের কাছাকাছি চলে আসছে।‘ 

কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কুকুরগুলোকে

এই প্রশ্ন নিয়েও আছে ধোঁয়াশা। নগরভবনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রাণীগুলোকে মাতুয়াইলে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, যদিও এর সত্যতার প্রমাণ মেলেনি। 

মাতু্য়াইলবাসী বলছে, গত ১৫ থেকে ২০ দিনে তারা নতুন কোনো কুকুর এলাকায় দেখতে পায়নি। মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে (ময়লা ফেলার ভাগাড়) বোতল কুড়াচ্ছিল রুহুল আমিন। সেও জানায়, নতুন কোনো কুকুর তার চোখে পড়েনি।

‘এই এলাকার সব কুত্তা আমি পালি, তাদের খাওয়াই। রাজ্জাক, টম, কিটু এরা সব আমার কুত্তা। এহানে আমি কোনো নতুন কুত্তা দেহি নাই। থাকলে আমি সবার আগে জানতাম।‘ 

স্থানীয় এক মুদি দোকানি শরিফ মিয়া বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের গাড়ি থেইকা কুকুর নামাই গেছে এমন কিছু দেহি নাই। কারো থেইকা শুনিও নাই।‘ 

মাতুয়াইলের ল্যান্ডফিল্ডের ইনচার্জ আব্দুল্লাহ হারুনও বলেছেন, ঢাকা থেকে অপসরণ করা কুকুর মাতুয়াইল নিয়ে আসার ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না। 

মাতুয়াইলে না নিলে কুকুরগুলো কোথায় নেওয়া হচ্ছে? ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছেরের জবাব নেই। বলেন, ‘অফিশিয়ালি-আন অফিশিয়ালি আমাকে যতটুকু বলার অনুমতি দেয়া আছে আমি তা জানিয়েছি। এর বাইরে আমি কিছু বলতে পারব না।’ অসুস্থ পথ কুকুরের খোঁজ পেলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন মোহাম্মদপুর এনিমেল রেসকিউ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাবিরা কিয়াফাত। 

অপসারণ বা নিধনই কি সমাধান

কুকুর শহরের বাইরে ফেলে দিয়ে আসলে এর প্রতিক্রিয়া কী হবে, সেটা নিয়েও ভাবছেন পশুপ্রেমীরা। নতুন পরিবেশে খাদ্য সংকটে প্রাণীগুলো বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে কি না, সেটা নিয়েও আছে দুশ্চিন্তা। 

অবশ্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. ইমদাদুল হক বলেন, ‘মালিকানাহীন কুকুরদের স্থানান্তর করতে আমরা একটি ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি। আমরা সেগুলোকে অন্য জেলাগুলোতে পাঠিয়ে দেব। এমন এলাকায় পাঠাব যেখান থেকে তারা খাবার সংগ্রহ করতে পারে।’  

কুকুর অপসারণের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করা সংগঠন ‘অভয়ারণ্য’ এর প্রতিষ্ঠাতা রুবাইয়া আহমেদ বলেন, ‘কুকু্রের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখার মূল উপায় হলো বন্ধ্যাত্বকরণ। আমরা যখন এই প্রস্তাব দেই তখন উত্তর সিটি সাড়া দিলেও, দক্ষিণ সিটি আগ্রহ দেখায়নি।

‘সেটা না করে এভাবে অপসরণ করে হিতে বিপরীত হবে। অপসরণকৃত কুকুরগুলো ট্রমাটাইজ হয়ে থাকবে। সেক্ষেত্রে মানুষের ক্ষতি বরঞ্চ বেশিই হবে।’

রিট করা আরেক সংগঠন পিপল ফর এনিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান রাকিবুল হক এমিল বলেন, ‘অপসরণ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তাছাড়া কুকুরদের তার পূর্ব অবস্থানে ফিরে আসার চান্স থাকে। নতুন পরিবেশে অনেক সময় স্থানীয় কুকুরেরা অভিযোজন করতে পারে না। তাই অপসরণকৃত কুকুরগুলো আক্রমণাত্মক আচরণ করবে।’ 

শহরে কুকুরের সঙ্গে সহাবস্থানের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার প্রচারণা চালানো যেতে পারে বলেও মনে করেন এমিল। বলেন, ‘মানুষ এখনও ভাবে, কুকুর কামড়ালে পেটে বাচ্চা হয়, নাভিতে ১৫-২০টা ইনজেশকন দেয়। এই ধারণাগুলো যে ভুল, সে তথ্য সঠিকভাবে জানালে অর্ধেক মানুষের কুকুরভীতি চলে যাবে।'

মোহাম্মদপুর এনিমেল রেসকিউ গ্রুপের সভাপতি সাবিরা কেয়াফাত বলেন, ‘মাথা ব্যথা হলেই মাথা কেটে ফেলেন আপনারা? তাহলে, কুকুর নিধনকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে কেন দেখছেন?   ‘কুকুরের ক্ষতি করতে না চাইলে তারা কখনো কাউকে আক্রমণ করে না। তারা নিজেরাই অসহায়।‘ 

অবশ্য কুকুর অপসারণের দাবিতেও সোচ্চার বেশ কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন। ঢাকায় বছরে ৭০ হাজারের বেশি মানুষকে কুকুর কামড়াচ্ছে- এই যুক্তি তুলে বেওয়ারিশ কুকুর অপরারণের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন হয়েছে।

কুকুর নিধনের পক্ষে দফায় দফায় মানববন্ধন করছেন ‘আমরা সচেতন ঢাকাবাসী’ নামে একটি সংগঠন। দ্রুত কুকুর নিধনের ব্যবস্থা না নিলে জানুয়ারিতে বৃহত্তর আন্দোলনে করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তারা।

একটি মানববন্ধনে রাকিব হাসান নামে একজন বলেন, ‘অনেকেই এই বেওয়ারিশ কুকুরের জন্য মায়া কান্না কাঁদছেন। এগুলো লোক-দেখানো। কারণ কুকুর তাদের উত্যক্ত করে না। তারা জার্মান শেফার্ড নিয়ে গাড়িতে ঘোরেন। আমরা যারা জনসাধারণ, কুকুরের যন্ত্রণায় বাসা থেকে বের হতে পারি না, বাচ্চাদের খেলতে পাঠাতে পারি না, আমরা এর থেকে মুক্তি চাই।’

রিটের পর কুকুর ধরা বন্ধ

কুকুর অপসারণ বন্ধের আবেদন জানিয়ে হাইকোর্টে একটি রিট হয়েছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর অভিনেত্রী জয়া আহসান এবং দুই প্রাণী কল্যাণ সংগঠন ‘অভয়ারণ্য‘ ও ’পিপল ফর অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার’ যৌথভাবে আবেদনটি করেছে। আবেদনের ওপর শুনানি শুরু না হলেও এরপর থেকে কুকুর ধরা বন্ধ আছে।

আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী সাকিব মাহবুব বলেন, প্রাণীকল্যাণ আইন-২০১৯ এর ধারা ৭ অনুযায়ী, বেওয়ারিশ কুকুরসহ কোনো প্রাণীকে অপসারণ, স্থানান্তর ও ফেলে দেওয়া যাবে না। 

শেয়ার করুন