20201002104319.jpg
যে কারণে মিন্নির ফাঁসি

যে কারণে মিন্নির ফাঁসি

স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকেই বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী বলেছেন বিচারক। তিনি বলেছেন, তার (মিন্নি) এবং সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে যুব সমাজ ধ্বংস হবে। এ কারণেই তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এই হত্যার ভিডিও প্রকাশের পর দেশজুড়ে তোলপাড় করা এই মামলার রায় প্রকাশ করে বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আসাদুজজ্জামান বলেন, ‘রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড (মূল পরিকল্পনাকারী) ছিলেন মিন্নি। তারই পরিকল্পনায় রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।’

মিন্নি ছাড়াও আরও পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন বিচারক।

বিচারক বলেন, `আসামি রিফাত ফরাজী, রাব্বি আকন, সিফাত, টিকটক হৃদয়, মোহাম্মদ হাসান ও মিন্নি পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ভিকটিম রিফাত শরীফকে হত্যার অভিন্ন উদ্দেশ্য পূরণকল্পে এই মামলার ঘটনা ঘটাইয়া তাকে খুন করিয়া পেনাল কোডের ৩০২ ও ৩৪ ধারার অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করিয়াছে বলে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হইয়াছে।'

`কতিপয় ব্যক্তি মিলিয়া তাহাদের অভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কোনো অপরাধজনক কাজ করিলে যেভাবে দায় ঠিক হইত, ঠিক সেইভাবেই দায়ী হইবে। তদানুসারে এই মামলার ভিকটিম রিফাত শরীফকে খুন করিবার দায়ে উক্ত আসামিগণ সমভাবে দায়ী।'

বিচারিক আদালতের এই রায় কার্যকরের আগে মিন্নির সামনে নিজেকে রক্ষার সুযোগ আছে। উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স শুনানি, রিভিও এবং সবশেষে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ রয়েছে।

প্রায় দেড় বছর আগে বরগুনা শহরের রাজপথে ঘিরে ধরে প্রকাশ্যে কোপানো হয় রিফাত শরীফকে। এই হত্যার ভিডিও চলে আসে ফেসবুকে। খুনিদের আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখে স্তম্ভিত হয় মানুষ।

২০১৯ সালের ২৬ জুন প্রকাশ হওয়া ভিডিওতে দেখা যায় মিন্নি তার স্বামীকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তিনি খুনিদের টেনে ধরছেন, স্বামীকে ঘিরে রেখেছেন, কিন্তু পারেননি।

সে সময় মিন্নি তার ভূমিকার কারণে প্রশংসা হন। রিফাত শরীফের বাবার করা মামলায় তাকে প্রধান সাক্ষী করা হয়। পরে পুলিশ এই তদন্তে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে তাকেও আসামি করে। 

হত্যার ভিডিওতে মিন্নির দৃশ্যমান ভূমিকা আর পরে তার সম্পৃক্ততার তথ্যের কারণে এই মামলাটি আরও আলোচিত হয়। রায় কী হয়, এ নিয়ে তৈরি হয় বাড়তি আগ্রহ।

দণ্ড পাওয়া আসামিদের মধ্যে মিন্নিই একমাত্র জামিনে ছিলেন। তার আদালতে আসা, তার বক্তব্য নিয়েও ছিল বাড়তি নজর।

মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কারণ হিসেবে বিচারক বলেন, ‘রিফাত হত্যা মামলার আসামিদের নির্মম বর্বরতা ও নির্মমতা মধ্যযুগীয় কায়দায়কেও হার মানিয়েছে। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে তাদের অনুসরণ করে অন্য যুবকরাও ধ্বংসের পথে যাবে। এসব আসামি সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।’

সাক্ষ্য প্রমাণ ‍উল্লেখ করে বিচারক বলেন, পাঁচজনের সহযোগী হিসেবে রিফাত হত্যায় অংশ নেন স্ত্রী মিন্নি। এ জন্য কলেজগেটের সামনে তিনি সময়ক্ষেপণও করেন।

পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, রিফাতকে বিয়ের আগে মিন্নি গোপনে বিয়ে করেন নয়ন বন্ড নামে এক তরুণকে। দুই জনের গোপন সম্পর্ক নিয়ে রিফাতের সঙ্গে বিরোধও তৈরি হয়। আর এর জেরে স্বামীকে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে নয়ন বন্ডদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। আর হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় আগের দিন। 

বিচারক বলেন, ‘পাঁচজনের সহযোগী হিসেবে হত্যায় অংশ নিয়েছেন স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। একই সঙ্গে তারা ছয়জন রিফাতের মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন। এজন্য কলেজগেটের সামনে সময়ক্ষেপণ করেন মিন্নি।’

‘রিফাতকে যখন মারার জন্য আসামিরা নিয়ে যাচ্ছিল তখন স্বাভাবিক ছিলেন মিন্নি। এতেই প্রমাণিত হয়, মিন্নি হত্যা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। তারই পরিকল্পনায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এজন্য তাকেও ফাঁসি দেয়া হয়েছে।’

এই মামলার একমাত্র আসামি হিসেবে মিন্নি জামিনে ছিলেন। সকালে বাবার সঙ্গে মোটর সাইকেলে করে আদালতে আসেনি তিনি। রায়ের পর প্রিজন ভ্যানে করে তাকে নেয়া হয় কারাগারে।

শেয়ার করুন