বিজয় অর্জন ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব

রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির লোভে আবদ্ধ হয়ে দীর্ঘদিন যাবত দিবালোকের মতো স্পষ্ট ঘটনা ও প্রকৃত ইতিহাসকে বিতর্কিত, বিকৃত, অস্পষ্ট ও ঘোলাটে করা হয়েছে। এতে এদেশের তরুণ সমাজের একটা বড় অংশ স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাসের সঠিক জ্ঞান ও ধারণা থেকে বঞ্চিত হয়েছে দীর্ঘদিন।

বিজয়ের মাস পার করছি আমরা। বাংলাদেশের এই বিজয় খুব সহজে অর্জিত হয়নি। প্রায় ত্রিশ লাখ শহিদের এক সাগর রক্ত এবং প্রায় তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই মহান বিজয়। স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে ২৩ বছরের বহু ত্যাগ, দীর্ঘ সংগ্রাম ও অনেক কান্না এবং বেদনার ইতিহাস জড়িয়ে আছে।

রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির লোভে আবদ্ধ হয়ে দীর্ঘদিন যাবত দিবালোকের মতো স্পষ্ট ঘটনা ও প্রকৃত ইতিহাসকে বিতর্কিত, বিকৃত, অস্পষ্ট ও ঘোলাটে করা হয়েছে। এতে এদেশের তরুণ সমাজের একটা বড় অংশ স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাসের সঠিক জ্ঞান ও ধারণা থেকে বঞ্চিত হয়েছে দীর্ঘদিন।

যেভাবে ১৯৪৭ সালে ১৪ ও ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে পাকিস্তান ও ভারত মুক্তি লাভ করেছিল কিংবা আলাদা হয়েছিল সেভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে স্বাধীনতা ও ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের সংগ্রাম শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে উপমহাদেশের দুই প্রান্তে অবস্থিত দেড় হাজার মাইল ব্যবধানের দুই অঞ্চলের জোড়া লাগানো পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ কায়েমী স্বার্থবাদী আমলা চক্র ও উচ্চাভিলাসী সামরিক জান্তার অগণতান্ত্রিক শাসন ও শোষণের প্রথম ও প্রত্যক্ষ আক্রমণ আসে বাংলা ভাষার ওপর। তখন থেকেই অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলন শুরু।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি শাসনের প্রথম প্রাণ হারান ভাষা শহিদ রফিক, জব্বার, সালাম ও বরকতসহ আরো অনেকে। ১৯৫৪ সালের মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার জয়লাভ, ১৯৫৮ সালের আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১১ দফা দাবিতে ১৯৬৯ সালের ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণআন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ও অবদান সূর্যালোকের মতো স্পষ্ট।

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ নির্বাচন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ও তার দল ১৬৭টি এবং ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ৩১০টি আসনের মধ্যে ২৯৮টিতে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। নির্বাচনে জয়লাভ করা সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তরে ইয়াহিয়ার গড়িমসি, ভুট্টোর ভেটো। অবশেষে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন। লাখ লাখ জনতার উপস্থিতিতে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন।

বঙ্গবন্ধু কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছেন তার পটভূমি তিনি ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে সুনিপুণভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি হঠাৎ হুইসেল বাজিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। তিনি ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে পাকিস্তানের ২৩ বছরের জেল, জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন, শোষণ ও নির্যাতনের ইতিহাস বর্ণনা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ঘোষণা করেন- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তিনি দেশবাসীকে বলেছিলেন, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। তিনি বলেছিলেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।’

এরপর এলো ২৫ মার্চ। ভয়াবহ কালরাত্রি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার লক্ষ্যে পাকিস্তানি সামরিক শাসক তার বর্বর বাহিনী নিয়ে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কাল রাত্রিতে পাকিস্তানের সামরিকজান্তা ঢাকাসহ সারাদেশে গণহত্যা শুরু করলে বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ দিবাগত রাত ১২টা ২০মিনিটে অর্থাৎ ২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

ঘোষণাটি:

‘This may be my last message, from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of Pakistan occupation army is expelled from soil of Bangladesh and final victory is achieved. Khoda Hafez, Joy Bangla.’ ‘(এই হয়ত আপনাদের জন্য আমার শেষ বাণী। আজ থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। যে যেখানে থাকুন, যে অবস্থায় থাকুন, হাতে যার যা আছে তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। ততদিন পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন যতদিন পর্যন্ত না দখলদার পাকিস্তানিদের শেষ সৈনিকটি বাংলাদেশের মাটি থেকে বহিস্কৃত হচ্ছে। খোদা হাফেজ, জয় বাংলা।)’

চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রটি বাঙালি কর্মীদের দখলে থাকায় ২৬ মার্চ, প্রায় ১.৩০মিনিটে প্রথম অধিবেশনেই চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি পাঠ করেন এবং সন্ধ্যায় দ্বিতীয়বার পাঠ করেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংগঠক আবুল কাশেম সন্দ্বীপ ২৬ মার্চ রাত ৮টার দিকে সংবাদ বুলেটিনে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত স্বাধীনতার বাণী প্রচার করেছিলেন। পোস্টার, লিফলেট এবং স্থানীয় পত্রিকাগুলোও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ফলাও করে প্রকাশ করে। ২৬ মার্চ ওয়ারলেস স্টেশনের কর্মচারীরা বঙ্গবন্ধুর বাণী কলকাতা বেতার কেন্দ্র এবং সমুদ্রগামী জাহাজে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। ২৬ মার্চ রাতে বিবিসি সংবাদে উল্লেখ করা হয় যে, ‘শেখ মুজিব তার প্রদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।’

অপরদিকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে এক বেতার ভাষণ দেন। যার কিছু অংশ- ‘শেখ মুজিব পাকিস্তানের সংহতি এবং অখণ্ডতার প্রতি আঘাত হেনেছেন। এই লোকটি এবং তার দল পূর্ব পাকিস্তানকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা করতে চায়। বিগত তিন সপ্তাহ কাল অসহযোগ আন্দোলন করে দেশদ্রোহিতা করেছে, পাকিস্তানের পতাকার অবমাননা করেছে এবং বিকল্প সমান্তরাল সরকার চালানোর চেষ্টা করেছে। এই দেশদ্রোহিতার জন্য তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।’

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ভাষণে আর কারো বুঝতে বাকি থাকল না যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ হিসেবে পৃথক রাষ্ট্রের ঘোষণা দিয়েছেন এবং রক্তাক্ত স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। শুরু হয়ে যায় অবিরাম মুক্তিযুদ্ধ। তার নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ চলতে থাকে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে এলো একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর। ঢাকায় বর্বব পাকিস্তানি বাহিনী নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে। বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়। অর্জিত হয় মহান বিজয়।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা, প্রতিরোধ যুদ্ধ, সরকার গঠন, ছোট ছোট যুদ্ধ, বড় বড় যুদ্ধ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস এবং বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতন ও গণহত্যাসহ নানাবিধ ঘটনা নিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ অসীম যা পরিমেয় নয়। তাদের এ ঋণ শোধ হবে না।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর বহু বছর নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার ভুল ইতিহাস হাজির করা হয়েছে। সেদিকে নজর রেখে বাংলাদেশের শেকড়ের সন্ধান করে জানতে হবে স্বাধীনতার ইতিহাসের ইতিকথা ও বিস্তারিত পটভূমি। জানতে হবে তাদের কথা, যাদের আন্দোলন-সংগ্রামের ফল হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে একদিন লাল-সবুজের পতাকা জয়যুক্ত হয়েছিল। আজকের তরুণ প্রজন্ম স্বাধীনচেতা হয়ে যেভাবে এগিয়ে এসেছে এবং যেভাবে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছে, সেজন্য তাদের আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জানাই। তাদের মনে রাখতে হবে, এখানেই শেষ নয়।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এ চেতনা সজাগ থাকে সে রকম দৃষ্টান্তমূলক কর্ম সম্পন্ন করতে হবে। ঘুরে দাঁড়াতে হবে সব পাপাচার, অনাচার, সব অপকর্ম ও সব দুরাচারের বিরুদ্ধে। মেধা-মনন, সাহস ও সত্যনিষ্ঠায় নিজেকে সোনার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। সেইসঙ্গে স্বার্থক হবে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের আত্মদান আর অগণিত মানুষের অবর্ণনীয় ত্যাগ-তিতিক্ষা।

বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা তথা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সমার্থক হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। স্বাধীনতার অগ্রদূত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস। যে মহানায়কের জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো কিনা সন্দেহ আছে। বাঙালি জাতির স্বাধীনতার সঙ্গে তিনি ধাপে ধাপে জড়িয়ে ছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের ইতিহাস। এই ইতিহাস যাতে বিকৃত না হয়ে বস্তুনিষ্ঠ হয় সে দায়িত্ব আমাদেরই।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন

মন্তব্য