বঙ্গবন্ধুর পুনর্জন্ম

সেদিন জগা সাধুর যে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি, বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার ৪৫ বছর পর, আজ বলতে পারি- বঙ্গবন্ধুর পুনর্জন্ম সাধিত হয়েছে তার কন্যা বিশ্বনেত্রী শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাত্রি আমার জীবনকে একেবারে তছনছ করে দেয়। বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নিহত হওয়ার ঘটনাটি আমার বুকের ভিতরে একটি গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে স্তূপ করে রাখা শেখ পরিবারের সদস্যদের মৃতদেহগুলি দেখার পর আমি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি। ডোমদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি যে, মর্গে বঙ্গবন্ধুর লাশটি আনা হয়নি। তার লাশ বত্রিশ নম্বরের বাড়িতেই পড়েছিল। সেখানে যাবার উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হই। ঐ বাড়িটি তখন সৈনিকরা পাহারা দিচ্ছিল। পরিবর্তিত ঢাকার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আমি ব্যর্থ হই। তিন দিন তিন রাত্রি স্থান বদল করে (মহাদেব সাহা, আসাদ চৌধুরী ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ) লুকিয়ে থাকার পর আমি ঢাকা ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নেই। আমি বুঝতে পারি, এই নগরীতে আমার পক্ষে আর ঘুমানো সম্ভব হবে না। আমার ঘুম আসে না। চোখ বুজলেই টিভিতে দেখা খন্দকার মোশতাক, জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী ও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের উল্লসিত মুখ ভেসে ওঠে।

১৮ আগস্ট রাতের ট্রেনে আমার ‘হুলিয়া’ কবিতার নায়কের মতো লুকিয়ে আমি আমার জন্মগ্রাম কাশবনে ফিরে যাই। আবার কখনও ঢাকায় ফিরে আসবো বা ফিরে আসতে পারবো- এমন ধারণা বা বিশ্বাস তখন আমার ছিল না। মনে হচ্ছিল, আমি চিরদিনের জন্য আমার এই প্রিয় নগরী ছেড়ে চলে যাচ্ছি, যে নগরী আমাকে কবি বানিয়ে ভালবেসে তার বুকে তুলে নিয়েছিল। আমার চারপাশে আমি একদল আততায়ীর অস্তিত্ব অনুভব করতে থাকি। অচেনা মানুষদের তো বটেই, আমার খুব চেনা-জানা মানুষদেরকেও সন্দেহ হতে থাকে। আমার মনে হচ্ছিল, বঙ্গবন্ধুর আততায়ীরা আমাকে গোপনে অনুসরণ করছে। আমার মনে হচ্ছিল, আমি যে বঙ্গবন্ধুর রুহুকে আমার বুকের ভিতরে গোপনে বহন করে নিয়ে চলেছি, বঙ্গবন্ধুর খুনিরা তা জেনে গিয়েছে। আমি একটু অসতর্ক হলেই, ওরা আমাকে হত্যা করবে। গ্রামের বাড়িতে মা-বাবা ও আমার ভাই-বোনদের কাছে ফিরে গেলে হয়তো আমার স্বস্তি আসবে, ভয় কেটে যাবে, আমি হয়তো ঘুমাতে পারবো।

কিন্তু না, গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাবার পরও আমার মানসিক অবস্থার উন্নতি হলো না। বরং আমার সন্দেহ-তালিকায় এবার আমার আপনজনরাও যুক্ত হলো। আমি নিজে রান্না করে খেতে শুরু করলাম। অপরের দেওয়া খাদ্য গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকলাম। আমার মনে হতে থাকলো রাজপুটিনের মতো আমাকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হতে পারে। মনে পড়লো, ঔপন্যাসিক সরদার জয়েনুদ্দিন, কবি আবদুল গনি হাজারী এবং শিল্পী কামরুল হাসান- এই তিন বন্ধু আমাকে রাজপুটিন বলে ডাকতেন-। কেন ডাকতেন? তবে কি আমার জীবনের পরিণতিও রাজপুটিনের মতো হবে? আমার সন্দেহ রোগটা এমনই বেড়ে গেল যে, আমার মা-বাবা ও ভাই-বোনরা কেউ প্রকাশ্যে, কেউ গোপনে আমার জন্য অশ্রু বিসর্জন করতে লাগলেন।


আমি দিনরাত আমাদের গ্রামের শ্মশানে, জটাচুল ও দীর্ঘ শুভ্রশ্মশ্রুমণ্ডিত জগা সাধুর আশ্রমে পড়ে থাকি। সংসারত্যাগী সদাহাস্যময় এই মানুষটাকে আমার ভালো লাগে। আমার মনে হয় এই মানুষটির দ্বারা এই সংসারের কারও কোনো ক্ষতি সাধিত হবে না। বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার খবরটি সবাই জেনেছিল, কিন্তু ঐ কালরাতে বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র এবং শেখ মনির অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকেও যে হত্যা করা হয়, সেই খবরটা অনেকেই জানতো না। আমার কাছে মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর, সবচেয়ে বর্বর ও অবিশ্বাস্য হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা শুনে অনেকের চোখই অশ্রুসজল হয়। বিশেষ করে জগা সাধু বেশি কষ্ট পান। মনে হয়, আমার কষ্টের কথা ভেবে তিনি আমার চেয়েও বেশি কষ্ট পাচ্ছেন।

একদিন এক নির্জন সন্ধ্যায়, জগা সাধুর আশ্রমে শুধুই আমরা দু’জন মুখোমুখি বসে ছিলাম। যেন কতকাল ধরে, আমরা পরস্পরের চোখে চোখ রেখে বসে আছি, কোনো এক অজানা প্রশ্নের উত্তর জানতে। বুঝলাম জগা সাধু আমাকে একা পেয়ে খুশি হয়েছেন। চারদিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি তার বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখা গোপন প্রশ্নভার থেকে নিজেকে মুক্ত করে, আমার দিকে একটু এগিয়ে এসে ক্ষীণকণ্ঠে বললেন, ‘এরা তো বঙ্গবন্ধুরে মাইরা ফেলাইলো, অহন বঙ্গবন্ধু অইবো কেডা? দেশ চালাইবো কেডা?’

জগা সাধুর চোখে জল। অনেকদিন পর আমার এ-ক-টু ভালো লাগলো। আমি জগা সাধুকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। তার সিদ্ধির নেশায় বুঁদ লাল চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জল মুছে দিয়ে বললাম, এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই, জগাদা। ভবিষ্যতই বলবে, বঙ্গবন্ধুর শূন্যস্থান কোনোদিন আদৌ পূরণ হবে কিনা। বা পূরণ করবে কে? তবে, যা বলতে পারি, তা হলো বঙ্গবন্ধুর খুনিচক্রের শাসন বাংলাদেশে কখনই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। হতে পারে না।
‘মুজিব হত্যার দণ্ড এড়াবে-,
খুনিদের এতো সাধ্য কী?
আমি কবি, জানি
বাঙালির আরাধ্য কী।’

‘ইতিহাস কী লিখবো মাগো, আমি তো আর শেষ জানি না।’ রামপ্রসাদের সুরে রচিত আমার ঐ গানটিও আমাদের গ্রামের শ্মশানে, জগা সাধুর আশ্রমে বসেই লিখেছিলাম।

সেদিন জগা সাধুর যে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি, বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার ৪৫ বছর পর, আজ বলতে পারি- বঙ্গবন্ধুর পুনর্জন্ম সাধিত হয়েছে তার কন্যা বিশ্বনেত্রী শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে।

আজ জগা সাধু বেঁচে থাকলে খুশি হতেন। শেখ হাসিনা, আপনি আমার অভিনন্দন গ্রহণ করুন।

নির্মলেন্দু গুণ: কবি

শেয়ার করুন

মুজিববর্ষে ঘর পাচ্ছে দেশের সব গৃহহীন

মুজিববর্ষে ঘর পাচ্ছে দেশের সব গৃহহীন

কান্দুনী বালা। ৬০ বছরের এই বৃদ্ধা থাকেন দিনাজপুরের নাগোরপাড়ার সোনারকুড়িতে। নামের মতোই বেদনার্ত তার জীবনে। সরকারি খাস জমিতে কোনো রকম বসতি গড়ে কাটছে জীবন। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। তার ওপর উচ্ছেদের ভয়। এভাবেই পার করেছেন জীবনের ছয় দশক।

বয়সের ভারে ন্যুব্জ কান্দুনীর স্বামী। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র সন্তান মাঠে-ঘাটে কাজ করে যা পায়, তাই দিয়ে টেনেটুনে চলছে জোড়াতালির সংসার।

তবে জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে অনেকটাই দূর হচ্ছে কান্দুনী বালার জীবনের আক্ষেপ। কারণ আর কয়েক দিন গেলেই মিলবে বাড়ি, সঙ্গে পাবেন দুই শতাংশ ভূমির মালিকানা। এমন প্রাপ্তির আনন্দ ঝরে পড়ে কান্দুনী বালার কণ্ঠে।

‘বাহে সরকারে হামাক একনা ঘর দেছে। যাক আপনারা (সরকার) খুব উপকার করেছেন। হামরা উপকার পাইছি। এখন হামাদের ঘর-বাড়ি ভালো হওছে। নাইলে ওইখানকার পাথারত আছি, এখন তাড়াতাড়ি ঘরগুলা চেষ্টা করেন বাবা। হামরা তো জারত (ঠান্ডায়) আছি। সরকার হামাক একখান বাড়ি দেছে এতেই হামরা অনেক খুশি।’

কান্দুনী বালার মতো আনন্দ ছড়িয়েছে সোনারকুড়িতে কোনো রকম জীবন কাটানো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আরও অনেকের মাঝে। সেখানকার ৩১টি পরিবারের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে পাকাঘর। ১১ ডিসেম্বর শুরু হয়েছে এসব ঘর নির্মাণ।

বিনা মূল্যে এসব ঘরের মালিকানা পাবে ৩১ পরিবার। এই পুরো আয়োজনটি চলছে মুজিববর্ষকে ঘিরে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন মুজিববর্ষে ঘরহীন থাকবে না দেশের কোনো মানুষ।

সোনারকুড়ি পাড়ার ৫২ বছরের ভবেশ গুনজার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই জায়গায় ৩৫ থেকে ৪০ বছর বসবাস করছি। এবার সরকার আমাদের উচ্ছেদ না করে পাকা বাড়ি করে দিচ্ছে। আমরা অনেক খুশি।’

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আক্‌চায় থাকেন এসিও দাস। কোনো রকমের ভাঙাচোরা ঘর তার। দুই ছেলে আর এক মেয়ের বাবা এসিও দাস ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। সব মিলিয়ে পরিবারে সদস্য এখন আট। দুই কামরায় দুই ছেলে তাদের স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঘুমায়। এসিও দম্পতির থাকার জায়গা বারান্দায়।

সারা জীবন দারিদ্র্য তাড়া করে বেড়ানো এসিও দাসের সামনেও এখন নতুন বাড়ি পাওয়ার স্বপ্ন।

‘মেম্বার সাবের কাছত নাম দিয়া আসছি। এই শীতত ধাপত আর ঘুমাবা হুবেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীক ধন্যবাদ হামার মতো অসহায় লোকক বাড়ি করে দিবার তানে।’

মুজিববর্ষে দেশের সব গৃহহীনকে ঘর করে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আর এটি বাস্তবায়ন করছে আশ্রয়ণ প্রকল্প ২। প্রায় ৭০ হাজার ঘর তৈরির জন্য এরই মধ্যে অর্থ ছাড় করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুব হোসেন।

বরাদ্দ করা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে দাবি করছেন তিনি।

‘মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে দেশের সকল ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য গৃহ প্রদান নীতিমালা’টি ২০২০ সালের ১৩ মে প্রণয়ন করে সরকার। এতে বলা হয়, ক্ষুধামুক্ত ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গঠনের লক্ষ্যে সব ভূমিহীন ও গৃহহীনকে পুনর্বাসন করা হবে।

নতুন বছরে শুরুতে প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তত ৫০ হাজার পরিবারের কাছে জমির মালিকানাসহ ঘর হস্তান্তর করবেন প্রকল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুব হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আগামী জানুয়ারি মাসের কোনো এক শুভ দিনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গৃহহীন মানুষের হাতে এই ঘর তুলে দেবেন।’

তিনি জানান, ঘর তৈরির অর্থ জোগাড় করা হয়েছে আশ্রয়ন প্রকল্প, গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান নিউজবাংলাকে জানালেন, প্রতিটি পরিবারই পাচ্ছে একক ঘর, আর দুই শতাংশ জমির মালিকানা।

‘প্রতিটি ঘরে দুইটা বেডরুম, একটা কিচেন, একটা ইউটিলিটি রুম, একটা টয়লেট, একটা বারান্দা থাকবে।

‘এটা কোনো টেন্ডারের মাধ্যমে হচ্ছে না। এই কমিটিকে বলা হয় প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি (পিআইসি)। এদের মাধ্যমে কাজটা হচ্ছে, যার ফলে পুরো টাকাটাই নির্মাণকাজে ব্যয় হচ্ছে। এ কাজে কারও কোনোভাবে লাভ করার সুযোগ নেই।’

ঘর তৈরির হিসাব দিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব মো. মহসীন। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এক লাখ ৭১ হাজার টাকা ঘর, পরিবহনের জন্য চার হাজার, আর কাজটা যারা ইনস্পেকশন করবে তার জন্য কিছু অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।’

সারা দেশে এখন পর্যন্ত প্রায় নয় লাখ গৃহহীন পরিবারের তালিকা হয়েছে বলেও জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব।

‘নয় লাখ পরিবারকে আইডেন্টিফাই করা হয়েছে। আরও আবেদন পড়ছে। সেগুলো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

তৃণমূল পর্যায় থেকে তালিকা নিয়ে সমন্বয়ের কাজটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে করা হচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে থেকে জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে তালিকা তৈরি করে কেন্দ্রীয়ভাবে বারবার যাচাই-বাছাই করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে সেটি চূড়ান্ত হয়েছে।’

নীতিমালা অনুযায়ী, গৃহহীনদের দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। যারা ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল, অসহায়, দরিদ্র, তাদের জন্য সরকারি খাস জমিতে পাকা বা সেমিপাকা ব্যারাক তৈরি করা হচ্ছে।

খাস জমির প্রাপ্যতার ভিত্তিতে দুই শতাংশ জমির মালিকানা দিয়ে একক ঘর তৈরি করে দেয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে। আর যাদের এক থেকে ১০ শতাংশ জমি আছে, কিন্তু ঘর নেই, তাদের নিজ জমিতে ঘর তৈরি করে দেবে সরকার।

প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুব হোসেন জানান, এখন পর্যন্ত তালিকায় আসা গৃহহীন পরিবারের সংখ্যা প্রায় নয় লাখ হলেও এর মধ্যে ভূমি ও গৃহহীন পরিবারের সংখ্যা দুই লাখ ৯৩ হাজার ৩৬১। পর্যায়ক্রমে প্রত্যেককে ঘর করে দেবে সরকার।

প্রকল্প পরিচালক জানান, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, বিধবা, এতিম, অসহায়দের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। দেশ ভূমিহীন, গৃহহীন মুক্ত ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্প চলমান থাকবে।

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি রহিম শুভ ও দিনাজপুর প্রতিনিধি কুরবান আলী)

শেয়ার করুন

বিজয় অর্জন ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব

বিজয়ের মাস পার করছি আমরা। বাংলাদেশের এই বিজয় খুব সহজে অর্জিত হয়নি। প্রায় ত্রিশ লাখ শহিদের এক সাগর রক্ত এবং প্রায় তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই মহান বিজয়। স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে ২৩ বছরের বহু ত্যাগ, দীর্ঘ সংগ্রাম ও অনেক কান্না এবং বেদনার ইতিহাস জড়িয়ে আছে।

রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির লোভে আবদ্ধ হয়ে দীর্ঘদিন যাবত দিবালোকের মতো স্পষ্ট ঘটনা ও প্রকৃত ইতিহাসকে বিতর্কিত, বিকৃত, অস্পষ্ট ও ঘোলাটে করা হয়েছে। এতে এদেশের তরুণ সমাজের একটা বড় অংশ স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাসের সঠিক জ্ঞান ও ধারণা থেকে বঞ্চিত হয়েছে দীর্ঘদিন।

যেভাবে ১৯৪৭ সালে ১৪ ও ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে পাকিস্তান ও ভারত মুক্তি লাভ করেছিল কিংবা আলাদা হয়েছিল সেভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে স্বাধীনতা ও ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের সংগ্রাম শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে উপমহাদেশের দুই প্রান্তে অবস্থিত দেড় হাজার মাইল ব্যবধানের দুই অঞ্চলের জোড়া লাগানো পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ কায়েমী স্বার্থবাদী আমলা চক্র ও উচ্চাভিলাসী সামরিক জান্তার অগণতান্ত্রিক শাসন ও শোষণের প্রথম ও প্রত্যক্ষ আক্রমণ আসে বাংলা ভাষার ওপর। তখন থেকেই অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলন শুরু।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি শাসনের প্রথম প্রাণ হারান ভাষা শহিদ রফিক, জব্বার, সালাম ও বরকতসহ আরো অনেকে। ১৯৫৪ সালের মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার জয়লাভ, ১৯৫৮ সালের আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১১ দফা দাবিতে ১৯৬৯ সালের ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণআন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ও অবদান সূর্যালোকের মতো স্পষ্ট।

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ নির্বাচন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ও তার দল ১৬৭টি এবং ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ৩১০টি আসনের মধ্যে ২৯৮টিতে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। নির্বাচনে জয়লাভ করা সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তরে ইয়াহিয়ার গড়িমসি, ভুট্টোর ভেটো। অবশেষে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন। লাখ লাখ জনতার উপস্থিতিতে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন।

বঙ্গবন্ধু কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছেন তার পটভূমি তিনি ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে সুনিপুণভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি হঠাৎ হুইসেল বাজিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। তিনি ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে পাকিস্তানের ২৩ বছরের জেল, জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন, শোষণ ও নির্যাতনের ইতিহাস বর্ণনা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ঘোষণা করেন- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তিনি দেশবাসীকে বলেছিলেন, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। তিনি বলেছিলেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।’

এরপর এলো ২৫ মার্চ। ভয়াবহ কালরাত্রি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার লক্ষ্যে পাকিস্তানি সামরিক শাসক তার বর্বর বাহিনী নিয়ে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কাল রাত্রিতে পাকিস্তানের সামরিকজান্তা ঢাকাসহ সারাদেশে গণহত্যা শুরু করলে বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ দিবাগত রাত ১২টা ২০মিনিটে অর্থাৎ ২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

ঘোষণাটি:

‘This may be my last message, from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of Pakistan occupation army is expelled from soil of Bangladesh and final victory is achieved. Khoda Hafez, Joy Bangla.’ ‘(এই হয়ত আপনাদের জন্য আমার শেষ বাণী। আজ থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। যে যেখানে থাকুন, যে অবস্থায় থাকুন, হাতে যার যা আছে তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। ততদিন পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন যতদিন পর্যন্ত না দখলদার পাকিস্তানিদের শেষ সৈনিকটি বাংলাদেশের মাটি থেকে বহিস্কৃত হচ্ছে। খোদা হাফেজ, জয় বাংলা।)’

চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রটি বাঙালি কর্মীদের দখলে থাকায় ২৬ মার্চ, প্রায় ১.৩০মিনিটে প্রথম অধিবেশনেই চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি পাঠ করেন এবং সন্ধ্যায় দ্বিতীয়বার পাঠ করেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংগঠক আবুল কাশেম সন্দ্বীপ ২৬ মার্চ রাত ৮টার দিকে সংবাদ বুলেটিনে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত স্বাধীনতার বাণী প্রচার করেছিলেন। পোস্টার, লিফলেট এবং স্থানীয় পত্রিকাগুলোও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ফলাও করে প্রকাশ করে। ২৬ মার্চ ওয়ারলেস স্টেশনের কর্মচারীরা বঙ্গবন্ধুর বাণী কলকাতা বেতার কেন্দ্র এবং সমুদ্রগামী জাহাজে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। ২৬ মার্চ রাতে বিবিসি সংবাদে উল্লেখ করা হয় যে, ‘শেখ মুজিব তার প্রদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।’

অপরদিকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে এক বেতার ভাষণ দেন। যার কিছু অংশ- ‘শেখ মুজিব পাকিস্তানের সংহতি এবং অখণ্ডতার প্রতি আঘাত হেনেছেন। এই লোকটি এবং তার দল পূর্ব পাকিস্তানকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা করতে চায়। বিগত তিন সপ্তাহ কাল অসহযোগ আন্দোলন করে দেশদ্রোহিতা করেছে, পাকিস্তানের পতাকার অবমাননা করেছে এবং বিকল্প সমান্তরাল সরকার চালানোর চেষ্টা করেছে। এই দেশদ্রোহিতার জন্য তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।’

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ভাষণে আর কারো বুঝতে বাকি থাকল না যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ হিসেবে পৃথক রাষ্ট্রের ঘোষণা দিয়েছেন এবং রক্তাক্ত স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। শুরু হয়ে যায় অবিরাম মুক্তিযুদ্ধ। তার নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ চলতে থাকে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে এলো একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর। ঢাকায় বর্বব পাকিস্তানি বাহিনী নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে। বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়। অর্জিত হয় মহান বিজয়।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা, প্রতিরোধ যুদ্ধ, সরকার গঠন, ছোট ছোট যুদ্ধ, বড় বড় যুদ্ধ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস এবং বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতন ও গণহত্যাসহ নানাবিধ ঘটনা নিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ অসীম যা পরিমেয় নয়। তাদের এ ঋণ শোধ হবে না।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর বহু বছর নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার ভুল ইতিহাস হাজির করা হয়েছে। সেদিকে নজর রেখে বাংলাদেশের শেকড়ের সন্ধান করে জানতে হবে স্বাধীনতার ইতিহাসের ইতিকথা ও বিস্তারিত পটভূমি। জানতে হবে তাদের কথা, যাদের আন্দোলন-সংগ্রামের ফল হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে একদিন লাল-সবুজের পতাকা জয়যুক্ত হয়েছিল। আজকের তরুণ প্রজন্ম স্বাধীনচেতা হয়ে যেভাবে এগিয়ে এসেছে এবং যেভাবে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছে, সেজন্য তাদের আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জানাই। তাদের মনে রাখতে হবে, এখানেই শেষ নয়।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এ চেতনা সজাগ থাকে সে রকম দৃষ্টান্তমূলক কর্ম সম্পন্ন করতে হবে। ঘুরে দাঁড়াতে হবে সব পাপাচার, অনাচার, সব অপকর্ম ও সব দুরাচারের বিরুদ্ধে। মেধা-মনন, সাহস ও সত্যনিষ্ঠায় নিজেকে সোনার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। সেইসঙ্গে স্বার্থক হবে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের আত্মদান আর অগণিত মানুষের অবর্ণনীয় ত্যাগ-তিতিক্ষা।

বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা তথা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সমার্থক হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। স্বাধীনতার অগ্রদূত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস। যে মহানায়কের জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো কিনা সন্দেহ আছে। বাঙালি জাতির স্বাধীনতার সঙ্গে তিনি ধাপে ধাপে জড়িয়ে ছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের ইতিহাস। এই ইতিহাস যাতে বিকৃত না হয়ে বস্তুনিষ্ঠ হয় সে দায়িত্ব আমাদেরই।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন

মুজিববর্ষ আগামী ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত

মুজিববর্ষ আগামী ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে মুজিববর্ষের মেয়াদ ৯ মাস বাড়িয়ে ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত করেছে সরকার।

১৪ ডিসেম্বর সোমবার এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

গেজেটে বলা হয়েছে, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপনের লক্ষ্যে সরকার ১৭ই মার্চ ২০২০ থেকে ২৬ মার্চ ২০২১ সময়কে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে।

‘মুজিববর্ষ উদ্‌যাপনের লক্ষ্যে গৃহীত কর্মসূচি কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারির কারণে নির্ধারিত সময়ে যথাযথভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। সে কারণে সরকার মুজিবর্ষের সময়কাল ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত বর্ধিত ঘোষণা করল।’

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ১০ জানুয়ারি শুরু হয় মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা। সেদিন রাজধানীর তেজগাঁওয়ের পুরাতন বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনা অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই দিন উন্মোচন করা হয় মুজিববর্ষের লোগো।

কথা ছিল ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে মুজিববর্ষ। জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে হবে মূল আয়োজন। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেদিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা ছিল। অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসার কথা ছিল বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের।

ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে করোনা না এলেও এই ভাইরাসের প্রকোপে ধুঁকতে থাকে বিশ্ব। ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম শনাক্ত হয় করোনাভাইরাস। জনস্বাস্থ্যের কথা ভেবে বর্ণাঢ্য আয়োজন থেকে সরে আসে সরকার।

ফলে জাতির পিতার জন্মদিন ১৭ মার্চ রাত ৮টায় দেশের সব টেলিভিশন, অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়ার একযোগে সম্প্রচার করা হয় ‘মুক্তির মহানায়ক’ নামের একটি অনুষ্ঠান। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত মুজিববর্ষের সব আয়োজন ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে হচ্ছে। এর মধ্যেই মুজিববর্ষের মেয়াদ ৯ মাস বাড়িয়ে ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হলো।

শেয়ার করুন

ঢাকায় যেসব বাড়িতে থেকেছেন বঙ্গবন্ধু

কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করে ঢাকায় এসে রাজনৈতিক জীবন শুরু করার পর বসবাসের জন্য বঙ্গবন্ধুর কোনো বাসস্থান ছিল না। ট্রেন থেকে ফুলবাড়িয়া নেমে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে সোজা চলে গিয়েছিলেন ১৫০ মোগলটুলীর দলীয় কার্যালয়ে। সেখানে আবুল হাশিম ও সোহরাওয়ার্দী সমর্থিত মুসলিম লীগের একটি ক্যাম্প অফিস ছিল। দূর-দুরান্ত থেকে আসা কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা ছিল সেখানে। অফিস সচিব শওকত আলী এ দিকটা সামলাতেন। শেখ মুজিবুর রহমানও তার কল্যাণে ক্যাম্প অফিসে থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা পেলেন। এভাবেই মুজিবের ঢাকাই জীবন শুরু।

১৫০ মোগলটুলির এই ভবনে ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগের ক্যাম্প অফিস।
ঢাকায় এসে সবার আগে এখানেই উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস

ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর মেস জীবন

এরপর শুরু হয় তার মেস জীবন। সেটাও নিজের ভাড়া করা মেসে নয়, ফুফাত ভাই মমিনুল হক খোকার মেসে। খোকা পুরান ঢাকার আরমানীটোলার রজনী বোস লেনের একটি মেসবাড়িতে বসবাস করতেন। একদিন সেখানে উঠে যান বঙ্গবন্ধু। একটি চৌকিকে ভাগাভাগি করে থাকতে শুরু করেন। কাঁথা-বালিশ-চাদর সবকিছুই ফুফাত ফাইয়ের কেনা।

৮/৩ নম্বর রজনী বোস লেনের এ ভবনের মেসে মমিনুল হক খোকার সঙ্গে উঠেছিলেন শেখ মুজিব। এই মেসের সঙ্গে তার অনেক রাজনৈতিক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস

শেখ মুজিব ভাবলেন, ক্যাম্প অফিস কর্মীতে ঠাসাঠাসি। তাই জায়গা ছেড়ে দেওয়ার জন্যে তার মেসে থাকার সিদ্ধান্ত। তাদের দলে এমন অনেক কর্মী রয়েছেন, যাদের সামর্থ্য নেই মেসে থাকার, আবার এমন কোনো আত্মীয়-স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধবও নেই, যাদের কাছে তারা থাকতে পারেন।

মমিনুল হক খোকার স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ১৯৫৩ সালের দিকে শেখ মুজিব তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও রাজনৈতিক সহচর জালাল উদ্দিন মোল্লা এবং আবদুল হামিদ চৌধুরীকে নিয়ে আরমানীটোলার ৮/৩ নম্বর রজনী বোস লেসের মেসে চলে আসেন।

টুঙ্গিপাড়া থেকে মাঝেমধ্যে স্ত্রী ফজিলাতুনন্নেসা ওরফে রেনুও সেখানে এসে সবাইকে অবাক করে দিতেন। শেখ মুজিব যা যা পছন্দ করতেন, সবকিছুই ব্যাগভর্তি করে নিয়ে আসতেন রেনু।

রজনী বোস লেনের ছোট বাসাটি এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক ঘটনাবহুল দিনের সাক্ষী হয়ে আছে। কেউ কেউ মনে করেন, রজনী বোস লেনের আগে বঙ্গবন্ধু কোর্ট হাউজ স্ট্রিটের এক মেসে কিছুদিন বসবাস করেছিলেন। ফলে ঢাকায় ওটাই মুজিবের প্রথম ঠিকানা।

মমিনুল হক খোকা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের মেঝ ফুফুর ছেলে। ফরিদপুরের ভাঙ্গা ছিল তার পৈত্রিক বাড়ি। মুজিবের পরিবারের সঙ্গে তিনি আজীবন ছায়ার মতো থেকেছেন। নিঃস্বার্থভাবে পরিবারটিকে আগলে রেখেছিলেন। শেখ মুজিব রাজনৈতিক কারণে জীবনের বড় একটা অংশ জেলে কাটিয়েছেন। এ দুঃসময়ে তিনি পুরো পরিবারের অভিভাবক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শেখ হাসিনা, শেখ কামাল ও শেখ রেহানাকে স্কুল-কলেজে ভর্তি করিয়েছিলেন স্থানীয় অভিভাবক হিসাবে।

অস্তরাগের স্মৃতি সমুজ্জ্বল: বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার ও আমি শিরোনামের বইতে মমিনুল হক খোকা স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে: ‘রজনী বোস লেনের মেসবাড়িটি ছিল শেখ মুজিবের মিনি অফিস। তখনকার সময় তাঁর অনেক রাজনৈতিক সহকর্মী সেখানে যেতেন। তারা গোপন সভায় মিলিত হয়ে সাম্প্রদায়িক পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক ও এ দেশীয় এজেন্টদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার পথ খুঁজতেন।’

রজনী বোস লেনের এই ছোট কক্ষটি এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বড় সাক্ষী। বঙ্গবন্ধুর ঢাকার রাজনৈতিক জীবনের অনেক ঐতিহাসিক উপাদান ওই কক্ষ ও তার আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

তেমন একটি উপাদান ‘অবনী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। মেস বাড়ির অদূরে আরমানীটোলা বটতলায় ছিল এটির অবস্থান। সেখানে শেখ মুজিব নিয়মিত আড্ডা দিতেন। সেই আড্ডায় মিলিত হতেন তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী হাফেজ মুসা, শওকত আলী, ইয়ার মোহাম্মদ খান, মোল্লা জালাল উদ্দিন, আতাউর রহমান খানসহ আরো অনেকে। চলত বিভিন্ন আলোচনার পাশাপাশি চা-নাস্তা খাওয়া। সেখানকার হালুয়া, লুচি, রসগোল্লা ও গরম ডালপুরি ছিল বঙ্গবন্ধুর খুবই প্রিয়।

অবনী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের কাছেই ছিল হাফেজ মুসার বাড়ি। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার ছিল অগাধ ভালোবাসা। পরবর্তী জীবনে তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েছিলেন। যখনই শুনতেন মুজিব অবনী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে এসেছেন, তিনি দৌড়ে সেখানে হাজির হতেন। ‘আদি ঢাকাইয়া’ এ মানুষটির ছিল দরাজ আত্মা। তিন প্রয়াত মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ হানিফের আত্মীয় ছিলেন। ১৯৫৪ সালে বন্যার সময় বঙ্গবন্ধু স্ত্রী-সন্তানসহ তার বাড়িতে কিছুদিন বসবাস করেছিলেন।

আরমানীটোলায় হাফেজ মুসার বাড়িটি কিছুদিনের জন্যে ছিল বঙ্গবন্ধু পরিবারের আশ্রয়স্থল। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস

ঢাকার রাজনৈতিক ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, রজনী বোস লেনের মেসবাড়িটি ছিল শেখ মুজিবের জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক। এ মেসে থাকা অবস্থায় তিনি ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়ে মন্ত্রিত্ব লাভ করেছিলেন। এটা ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের ‘ইউ টার্ন’।

মেসের ছোট কক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানের আওয়ামী লীগপন্থি নেতা মোহাম্মদ খান লুন্দখোর কিছুদিন অতিথি হিসেবে থেকেছিলেন। মেসে থেকে তিনি অনুভব করেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ নেতারা কত দীনহীনভাবে জীবন যাপন করে মানুষের জন্য রাজনীতি করছেন। রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও লেখক আবুল মনসুর আহমেদ এই মেসে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ করতেন।

এ-বাড়ি ও-বাড়ি

যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী হওয়ায় বঙ্গবন্ধু সেগুনবাগিচায় সরকারি বাসভবনে ওঠেন। বেশিদিন থাকা হয়নি সে বাসায়। সরকার গঠনের ৫৬ দিনের মাথায় তা ভেঙ্গে দেওয়া হয়। গ্রেফতার হন শেখ মুজিব। তখন তার পরিবারকে সরকারি বাসভবন থেকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়।

তখন পরিবারটির মাথার উপর ছাদ তো দূরের কথা, কোনো খড়কুটোও নেই। তারা এখানে-সেখানে ঘুরতে থাকেন। অবশেষে ঠাঁই পান নাজিরাবাজারে মোহাম্মদ হানিফের বাসায়। মাত্র তিন দিনের নোটিশে তাদেরকে সরকারি বাসভবন ছাড়তে হয়েছিল। এরপর আওয়ামীলীগ নেত্রী আমেনা বেগমের সহযোগিতায় এক নির্মাণাধীন বাড়িতে তাদের উঠতে হয়। কিন্তু নির্মাণকাজের নানা ঝামেলা, লোহালক্কর ভাঙ্গার আওয়াজ ও হাতুড়িপেটার বিকট শব্দের কারণে তারা বেশিদিন সেখানে থাকতে পারেননি।

স্মৃতি বিজড়িত নাজিরাবাজারের প্রয়াত মেয়র হানিফের বাড়ি। এখানে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু পরিবার। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস

বঙ্গবন্ধু তখন জেলে থাকায় অনেক বাড়িওয়ালা তার পরিবারকে বাড়ি ভাড়া দিতেন না, মূলত পুলিশি হয়রানির কারণে। সেগুনবাগিচায় বাসা ভাড়া নিতে গেলে একজন জজ পর্যন্ত তাদেরকে ফিরিয়ে দেন। এমনকি তৎকালীন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম গ্যারান্টর হওয়ার পরও তারা বাসা ভাড়া পাননি।

গ্যারান্টর হয়ে জহুরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবের পরিবারকে বাসা ভাড়া দিলে কোনো অসুবিধা হবে না। তাদের সব দায়িত্ব আমার। তারা নিয়মিতভাবে ভাড়া পরিশোধ করবেন। না করলে তাদের ভাড়া আমি পরিশোধ করব।’

পরে মুসলিম লীগের নেতা ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের ভাগ্নে আজিজুল হক নান্না মিঞার অনুরোধে সেই জজ সাহেব সেগুনবাগিচার বাসা ভাড়া দিয়েছিলেন। নান্না মিঞা শেখ মুজিবের বিপরীতমুখি রাজনীতি করলেও তার পরিবারের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।

শুধু বাসা ভাড়া নয়, শেখ মুজিবের সন্তানদের পড়াশোনারও অনেক বিঘ্ন ঘটে তখন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে। পাকিস্তানের দোসররা বঙ্গবন্ধুর সন্তানদের পড়াশুনার পথ রুদ্ধ করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা-তদবির চালায়। এমনকি তাদেরকে কোনো স্কুলে পর্যন্ত ভর্তি নিত না।

তেমনি একটি ঘটনা ঘটেছিল বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনেও। পাকিস্তানি শাসকদের ভয়ে যখন কোনো স্কুল তাকে ভর্তি নিতে অপারগতা প্রকাশ করে, তখন এগিয়ে আসেন কবি সুফিয়া কামাল। তিনি থাকতেন টিকাটুলীতে। সেখানকার ‘নারী শিক্ষা মন্দির’ স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ছিলেন তিনি। প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি শেখ হাসিনাকে সেখানে ভর্তি করে দেন। বিপ্লবী নীলা নাগের প্রতিষ্ঠিত স্কুল নারী শিক্ষা মন্দির হয়ে শেখ হাসিনা কামরুননেসা গার্লস স্কুল, আজিমপুর গার্লস স্কুল হয়ে ইডেনে পড়াশুনা করেছিলেন। সে সময় শেখ কামাল ও জামাল ভর্তি হয়েছিলেন শাহীন স্কুলে।

পাকিস্তানের ২৫ বছরে শেখ মুজিবকে ১৪ বছরই জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটাতে হয়েছিল। এ সময় বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব এবং তার সন্তানদের কঠিন সময় পার করতে হয়েছিল। তার স্ত্রীর সংগ্রামী জীবন ছিল একটি অনুকরণীয় বিষয়। একজন বাঙালি নারী কতটা সহনশীল আর আদর্শ চরিত্রের হতে পারেন, এর জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ হলেন তিনি। তার জীবনের একটি ঘটনা উল্লেখ করলেই সেটা বুঝা যাবে।

বঙ্গবন্ধু তখন জেলে। সিদ্ধেশ্বরীতে বাসা ভাড়া নিতে গেলেন বেগম মুজিব। সেখানে গিয়ে তিনি এক অপ্রীতিকর ঘটনার শিকার হলেন। সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুল মাঠের পাশে এক পুলিশ অফিসারের বাসা ভাড়া নেন মাসিক ২০০ টাকায়। শেখ মুজিবের পরিবারকে বাসা ভাড়া দেওয়াতে পাকিস্তানি প্রশাসনের উপর মহল থেকে বাড়িওয়ালাকে নানাভাবে হয়রানি করা হয়। বাড়ির মালিক অনেকটা বাধ্য হয়েই সে বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। বেগম মুজিব তখন ঘটনাটি কবি সুফিয়া কামালকে জানান। তখন তিনি যে বাড়িতে থাকতেন সেই বাড়িওয়ালাকে শেখ মুজিবের পরিবারকে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়ার অনুরোধ করেন। কারণ সেখানে একটি বাসা তখন খালি ছিল। কিন্তু বাড়িওয়ালা তাদের পরিচয় জেনে আর বাসা ভাড়া দিতে রাজি হননি। অবশেষে প্রখ্যাত কংগ্রেসনেতা ও মন্ত্রী আশরাফ আলী চৌধুরীর সহযোগিতায় তাদের জন্য ৭৬ নম্বর সেগুন বাগিচায় ৩০০ টাকা ভাড়ায় একটি বাসা জোগাড় করা হয়।

৩২ নম্বরে এক বিঘার প্লট

মূলত এমন সীমাহীন হয়রানি আর দুর্দশার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের প্লটে বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা করেন বেগম মুজিব। ১৯৬০ সালের দিকে শেখ মুজিব জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বেগম মুজিব বলেন, পাকিস্তানি শাসক এবং এদেশীয় দোসর-দালালদের ভয়ে তাদেরকে কেউ বাসা ভাড়া দিতে চায় না। দিলেও পরে উঠে যেতে বলে। ফলে আশ্রয়ের জন্য এখানে-সেখানে ঘুড়ে বেড়াতে হয়। এতে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় বেশ বিঘ্ন ঘটছে।

এসব কথাবার্তা বলে বেগম মুজিব বরাদ্দ পাওয়া ধানমন্ডির প্লটে বাড়ি নির্মাণে রাজি করান স্বামীকে। কিন্তু অধিকাংশ সময় জেলে কাটানো স্বামীর হাতে বাড়ি বানানোর টাকা কোথায়?

বেগম মুজিব ছিলেন দৃঢ়চেতা বাঙালি নারী। তিনি প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন। নিজের কাছে ছিল সঞ্চয় করা কিছু টাকা। আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধার-দেনা করলেন দীর্ঘমেয়াদে। তার সঙ্গে যুক্ত হলো বঙ্গবন্ধুর বেতনের সামান্য আয়। বঙ্গবন্ধু তখন আলফা ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি করতেন।

১৯৬০-৬১ সালের দিকে বাড়ি নির্মাণ শুরুর এক পর্যায়ে হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন থেকে কিছু টাকা ঋণ নেওয়া হয়। বাড়ি বানানোর সময় কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষী মুজিব পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি জহুরুল ইসলাম, তৎকালীন পিডব্লিউডির নির্বাহী প্রকোশলী পরে পূর্তসচিব মাইনুল ইসলাম ও নুরুল ইসলাম ‘ওরফে পোস্টার নুরু’ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

মাইনুল ইসলাম বিনা পারিশ্রমিকে বাড়ির নকশা করে দিয়েছিলেন। নির্মাণ কাজেরও তদারকি করেছেন তিনি। কখনও নির্মাণসামগ্রী বা অন্যান্য জিনিস সরবরাহে এগিয়ে এসেছেন জহুরুল ইসলাম।

নির্মাণাধীন বাড়ির সার্বক্ষণিক কর্মী ছিলেন পোস্টার নুরু। তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলফা ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি করতেন। এমন বঙ্গবন্ধুপ্রেমিক এদেশে বিরল। বাড়ি নির্মাণের সময় পোস্টার নুরু যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হলে বঙ্গবন্ধু তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দেন। শত ব্যস্ততার মধ্যেও তাকে দেখতে বঙ্গবন্ধু সপ্তাহে একদিন হাসপাতালে যেতেন। এভাবে তিন মাসের মধ্যে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। তার চিকিৎসার ব্যয় বহন করেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু।

হাসপাতালের বেডে শুয়ে নুরুল ইসলাম প্রায়শ ক্রসওয়ার্ড লটারি খেলতেন। লটারিতে নামঠিকানা দেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়ায় তিনি একদিন সেখানে শেখ রেহানার নাম দেন। সেদিনই তিনি পেয়ে যান ছয় হাজার টাকা। তখনকার সময় সেটা ছিল বিশার অঙ্ক। সে টাকা নিয়ে তিনি সোজা চলে যান বেগম মুজিবের কাছে। ঘটনা খুলে বলে তিনি জানান, ‘টাকাটা তো আমি রেহানার ভাগ্যে পেয়েছি। তাই ভাবি এটা আপনার কাছে রেখে দেন। মুজিব ভাইয়ের বাড়ি নির্মাণে অনেক টাকা-পয়সা ব্যয় হচ্ছে বরং এ কাজে তা খরচ করবেন।’

তার এমন দরদভরা কথায় বেগম মুজিব টাকাটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজের কাছে রেখে দেন। বলা বাহুল্য তিনি টাকাটা বাড়ি নির্মাণে খরচ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে সেটা নুরুল ইসলামকে অনেকটা জোরপূর্বক ফেরত দিয়েছিলেন।

৩২ নম্বরের বাড়ি নির্মাণে বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক কর্মী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতা পেয়েছিলেন। সেসব তথ্য হয়তো গবেষক লেখকদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। রংপুরের আওয়ামী লীগ নেতা মতিউর রহমান রাজনীতির পাশাপাশি লোহা-লক্কড়ের ব্যবসা করতেন। তেজগাঁয়ে তার একটি গ্রিল তৈরির কারখানা ছিল। তিনি প্রিয় নেতার ৩২ নম্বরে বাড়ি নির্মাণের সময় জানালার গ্রিল সরবরাহ করেছিলেন। বাড়ির মধ্যে রোপনের জন্য নারিকেল ও সুপারি গাছ গ্রাম থেকে এনে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি শেখ মোহাম্মদ মুসা। বাড়ির সামনে ঝাউ গাছ লাগিয়েছিলেন নূরউদ্দিন আহমেদ।

৩২ নম্বরের এ বাড়ি ছিল ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর একমাত্র নিজস্ব ঠিকানা। ছবি: সংগৃহীত

দুইটি বেড রুম, একটি ড্রইং রুম এবং একটি গেস্টরুম দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পরিবার ৩২ নম্বরের জীবন শুরু করেছিলেন। বেডরুমের একটিতে সস্ত্রীক বঙ্গবন্ধু থাকতেন। একটিতে থাকতেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। গেস্টরুম শেখ কামাল ও শেখ জামাল ব্যবহার করতেন। ড্রয়িং রুমে সাজানো হয়েছিল কমদামি একটি বেতের সোফাসেট দিয়ে।

এ বাড়ির সঙ্গে বেগম মুজিব ও শেখ মুজিবের অনেক পরিশ্রম, ত্যাগ আর ভালোবাসা জড়িয়ে ছিল। রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও তিনি গণভবন ও বঙ্গভবনের জৌলুস আর রাষ্ট্রীয় চাকচিক্য, সুযোগ সুবিধা বাদ দিয়ে কার্পেটবিহীন, শীততাপ নিয়ন্ত্রণহীন সাধারণ একটি বাড়িতে থাকতে পছন্দ করতেন। ষাটের দশকের ছায়াসুনিবিড় ধানমন্ডিতে খরগোশ আর সজারু ঘুরে বেড়ানো পরিবেশ তাদের মনকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করত।

শেয়ার করুন

বঙ্গবন্ধুর সেই টেলিফোন

বিভিন্ন আলোকচিত্রে বঙ্গবন্ধুকে ৩২ নন্বরের বাড়িতে বসে ল্যান্ডফোনে কথা বলতে দেখা যায়। ওই টেলিফোনের নম্বর কত ছিল?

এখন কেউ বলতে না পারলেও চার অংকের এই ফোন নম্বর সেই সময়কার রাজনৈতিক নেতাকর্মী, পুলিশ, সাংবাদিক এবং প্রশাসনের মুখস্ত ছিল। নম্বরটি ২৫৬১। কথায় বললে বলা হতো: পঁচিশ একষট্টি। এই নম্বরে ফোন করে যে কেউ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে পারতেন।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং আওয়ামী লীগ নেতা মগবাজারের আকতার সর্দার মৃত্যুর কয়েক বছর আগে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার বলেন, ‘তখন ঢাকায় এত রাস্তাঘাট ও গাড়িঘোড়া ছিল না। সবাই পায়ে হেঁটে ৩২ নম্বরে গিয়ে নেতার সঙ্গে দেখা করতেন। যেতে না পারলে পঁচিশ একষট্টি নম্বরে ডায়াল ঘুড়িয়ে কথা বলে নিতাম। বাসায় থাকলে বঙ্গবন্ধু নিজেই ফোন তুলতেন।’

এই একটিই ফোন ছিল বঙ্গবন্ধুর বাসায়। দেশের নির্বাহী প্রধান হওয়ার পরেও লাল টেলিফোন, সাদা টেলিফোন বা সবুজ টেলিফোনের চিন্তা করেননি। যদি তাই করতেন, তাহলে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় ঢাকা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ছেড়ে তিনি বট, ঝাউ, কাঁঠাল আর বাঁশঝাড়ে ঘেরা ধানমন্ডির বাড়িটি বেছে নিতেন না। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া সৌখিনতা করে বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্যরা কিছু করতেন না।

এ কারণে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিল একটিই ফোন। ড্রয়িংরুমে বেতের টি-টেবিলে রাখা থাকত ফোনটি। পরিবারের সদস্যরা সবাই মিলেমিশে সেটি ব্যবহার করতেন।

৩২ নম্বরের বাড়িতে আসার পর এই ফোন নেয়া হয়। তার আগে বঙ্গবন্ধুর নামে আর কোনো টেলিফোন বরাদ্দ ছিল না।

কারাগার যার ঘর-সংসার ছিল, বাইরে এমন সৌখিনতার চিন্তা কখনও তার মাথায় ঢোকেনি। ষাটের দশকে এ বাড়ি বানানোর পর নিতান্ত প্রয়োজনীয় বস্তু হিসাবে তিনি টেলিফোনের সংযোগ দিয়েছিলেন।

এতে যোগাযোগ সহজতর হলেও বঙ্গবন্ধুর জীবনে অনেক সময় তা বিড়ম্বনা ডেকে আনত। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনের মূল টার্গেট ছিল বঙ্গবন্ধুর ফোনটি। তারা ২৪ ঘণ্টাই আড়ি পাতত। শোনার চেষ্টা করত ফোনে তিনি কী কথা বলেন। তার কাছে কারা কারা ফোন করেন এবং কী কথা হয় সেটা গোয়েন্দারা রেকর্ড করত।

১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর এ বাড়িতে ওঠার পর থেকেই বঙ্গবন্ধুর সবকিছু গোয়েন্দা তদারকিতে চলে আসে। তবে বঙ্গবন্ধুর চৌকষ রাজনীতিও তাদের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। বিভিন্ন সহকর্মী, রাজনৈতিক নেতা এবং ছাত্রনেতাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার সময় তিনি ছদ্মনাম এবং সাংকেতিক (কোডেড) শব্দ ব্যবহার করতেন, যাতে গোয়েন্দারা কথাবার্তা বুঝতে না পারে।

ফজলুল হক মনি ফোনে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিজেকে ‘বালুওয়ালা’ বলে পরিচয় দিতেন। তারা বাড়িওয়ালা এবং বালুওয়ালা পরিচয়ে প্রথমে দেনা-পাওনা নিয়ে আলাপ জুড়ে দিতেন। এর মাঝে কোড বা সাংকেতিক শব্দে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সেরে নিতেন। অপরদিকে সিরাজুল আলম খান ফোনে বঙ্গবন্ধুকে ‘ইটাওয়ালা’ হিসাবে পরিচয় দিতেন। এ পরিচয় শুনতে পেয়ে গোয়েন্দারা আড়িপাতা বন্ধ করে দিত।

বঙ্গবন্ধুর ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনে ৩২ নম্বরের টিঅ্যান্ডটি ফোনটি অনেক কিছুর সাক্ষী। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরবেলায় একদল বিপথগামী সেনা অফিসার এ বাড়িতে আক্রমণ চালালে সেই ফোনটি হয়ে ওঠে শেষ ভরসাস্থল। বঙ্গবন্ধু তখন ফোনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করেছিলন।

এর সঠিক বর্ণনা পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর রেসিডেন্ট পিএ আ ফ ম মোহিতুল ইসলামের বর্ণনায়। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বাদীও। তার বর্ণনা অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট রাত ৮টা থেকে ১৫ আগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত তিনি ৩২ নম্বর বাড়িতে দায়িত্বরত ছিলেন। হঠাৎ করে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। এরপর টেলিফোন মিস্ত্রির ডাকে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। মিস্ত্রি বলেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব আপনাকে ডাকছেন। তখন সময় ভোর ৪টা কি ৫টা হবে। বঙ্গবন্ধু তাকে বলেন, সেরনিয়াবাতের বাসায় দুষ্কৃতকারীরা আক্রমণ করেছে। এ কথা শুনে তিনি (মোহিতুল) ওই ফোন থেকে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করেন। অনেক চেষ্টার পরও লাইন পাচ্ছিলেন না। এরপর গণভবন এক্সচেঞ্জে লাইন লাগানোর চেষ্টা করেন। ফোন ধরে ‘হ্যালো হ্যালো’ বলে চিৎকার করা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু নিচে এসে তার হাত থেকে রিসিভার নিয়ে বললেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট বলছি’।

ঠিক তখনই দক্ষিণ দিকের জানালা দিয়ে একঝাঁক গুলি এসে কক্ষের দেওয়ালে লাগে। গুলির শব্দে তারা শুয়ে পড়েন মেঝেতে। কিছুক্ষণের জন্য গুলির শব্দ বন্ধ হলে বঙ্গবন্ধু নিচ থেকে উপরে উঠে যান। এর মধ্যে আবার গোলাগুলি শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু তখন তার সেই ফোন নিয়ে ব্যস্ত। ফোনে তিনি তার সামরিক সচিব কর্নেল জামিলকে বলেন, ‘জামিল তুমি তাড়াতাড়ি আসো। আর্মির লোকজন আমার বাসা অ্যাটাক করেছে। সফিউল্ল্যাহকে ফোর্স পাঠাতে বলো।’

সেই ফোন থেকে এরপর সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকে ফোন করেন বঙ্গবন্ধু। বলেন ‘শফিউল্লহ, তোমার ফোর্স আমার বাড়ি অ্যাটাক করেছে। কামালকে বোধ হয় মেরে ফেলেছে। তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও।’

ফোনের ওপাশ থেকে শফিউল্লাহ বলেছিলেন ‘আই অ্যাম ডুয়িং সামথিং, ক্যান ইউ গেট আউট?’

বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে এসে প্রাণ দেন কর্নেল জামিল। জেনারেল সফিউল্লাহ ৩২ নম্বরমুখী হননি। পরদিন মোশতাকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার জন্য বঙ্গভবনে হাজির হয়েছিলেন।

খুনিচক্র সপরিবারে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুকে। বিশাল দেহের মানুষ শেখ মুজিবের রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকে সিঁড়ির উপর। সেই টেলিফোন থেকে খুব বেশি দূরে নয়।

শেয়ার করুন

মুজিববর্ষে বিশেষ অধিবেশনের স্মারক ডাক টিকিট উন্মোচন

মুজিববর্ষে বিশেষ অধিবেশনের স্মারক ডাক টিকিট উন্মোচন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’-এ জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত বিশেষ অধিবেশন উপলক্ষে স্মারক ডাক টিকিট উন্মোচন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী

বৃহস্পতিবার বিকালে প্রধানমন্ত্রী তার সংসদ ভবন কার্যালয়ে এ ডাক টিকিট উন্মোচন করেন বলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানিয়েছে।

এসময় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খান, ডাক অধিদফতরের পরিচালক মো. আলতাফুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন

সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের বঙ্গবন্ধু

১৭ মার্চ থেকে আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছি। ২০২০-২১ সালকে মুজিববর্ষ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল আগেই। এ বছর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে মুজিববর্ষ উদযাপনের ক্ষণগণনা ও মুজিববর্ষের লোগো উন্মোচন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যে বিজয়ের আলোকবর্তিকা জাতির পিতা আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন, সে মশাল নিয়েই আমরা আগামী দিনে চলতে চাই।’

কিন্তু কী সেই মশাল, যা বঙ্গবন্ধু আমাদের দিয়ে গেছেন? সেই মশালের নাম মানুষ। বঙ্গবন্ধুর হৃদয়জুড়ে ছিল মানুষ। সারা জীবনের রাজনীতিতে তিনি চেয়েছিলেন মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির বিকাশ। যে শক্তির জাগরণে মানুষ উত্তীর্ণ হয় পূর্ণতার দিকে। সুপ্ত-নিদ্রিত মানুষকে জাগিয়ে, আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করে তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন। মানবজীবনের সবচেয়ে বড় অলঙ্কার আত্মবিশ্বাস। বঙ্গবন্ধু নিজে যেমন প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, তেমনি উদ্যমহীন মানুষকে আত্মশক্তিতে ভরপুর করে তুলতে চেয়েছিলেন। দুর্বলকেও দিয়েছিলেন প্রেরণা ও উজ্জীবনের স্বপ্ন।

মুজিববর্ষ পালন করতে গিয়ে আমরা এমন অসাধারণ এক মানুষকে দেখি, যার কোনো দ্বিতীয় নেই, যার পাশে কাউকে দাঁড় করানো যায় না। আর্ত-অবহেলিত অসহায় মানুষের দুঃখমোচন করার রাজনীতি করেছেন তিনি। তাদের মর্যাদাদানে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন আজীবন। সত্যি বলতে কী, আমরা বাঙালিরা বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কোনো নেতা পাইনি।

পুরো বছরটি নানা আয়োজনে পালিত হবে, আমরা বারবার ফিরে যাব ১৯৭১-এ। কিন্তু যা বাংলাদেশে আর ফেরে না, তা হলো বঙ্গবন্ধুর মতো সততা, সাহস আর মানুষের প্রতি ভালবাসার রাজনীতি। আমাদের নেতাদের চরিত্র হলো পলায়নের। বাস্তবের নির্মম আঘাত থেকে পলায়ন, নিজস্ব ব্যর্থতার কর্কশ প্রমাণ থেকে পলায়ন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বুক টান করে সব সময় সবকিছু মোকাবিলা করেছেন। যেমন করে পালিয়ে যাননি ১৯৭১-এর ২৫ মার্চে, তেমনই বুক পেতে দিয়েছিলেন ঘাতকের বুলেটের সামনে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট।

আজ কত বঙ্গবন্ধুপ্রেমী দেশজুড়ে! কিন্তু সেই রাজনীতি কোথায়, যা বঙ্গবন্ধু করতেন? যদি প্রশ্ন করা হয় কেমন রাজনীতি করতেন জাতির জনক, তাহলে এক কথায় উত্তর হবে, ‘তিনি বড় রাজনীতি করতেন’।

তিনি সেই রাজনীতি করতেন, যে রাজনীতি ভাগাভাগির হিসাব করেনি কখনো, যে রাজনীতিতে ছিল না কেবল ক্ষমতা দখলের কৌশল। তিনি এমন রাজনীতি করেছেন, যে রাজনীতি সমাজের নানা অংশের মধ্যে, এমনকি যারা সাংঘাতিকভাবে প্রতিহিংসাপরায়ণ, তাদের প্রতিও কখনো বিরূপ আচরণ করে না। তার রাজনীতি ছিল বিপরীত পথের মানুষকেও এক জায়গায় আনার, একসঙ্গে পথ চলার। জাতি হিসেবে এই বড় রাজনীতিককে গ্রহণের যোগ্যতা ছিল না আমাদের। আমরা এতটাই ক্ষুদ্র যে এমন মানুষকেও সপরিবারে খুন করতে পেরেছি।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ছিলেন অনুপস্থিত। সে সময় দুই অসম শক্তি এক ভয়াবহ নিষ্ঠুর সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। বাঙালির জীবনে একমাত্র বঙ্গবন্ধুই ছিলেন সেই প্রতীক, যার চারদিকে নিঃসহায় এক-উদ্দেশের মানুষেরা জড়ো হয়েছিল। কিন্তু এটা কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছিল না।

সেই অন্ধকার দিনগুলোতে, অগ্নিপরীক্ষার দিনগুলোতে, যে কোটি কোটি মানুষ, যারা ভবিষ্যতের জাতিকে সৃষ্টি করবে তাদের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা দ্বিধা ছিল না। বঙ্গবন্ধু একাই ছিলেন প্রতীক- কথাগুলো বলেছিলেন জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ‘মোজাফফর আহমদ চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা ১৯৮০, বাংলাদেশ জাতির অবস্থা’ শীর্ষক প্রবন্ধে।

বঙ্গবন্ধু একজন সাধারণ কর্মী থেকে নেতা হয়েছিলেন। দলের নির্দেশনা মেনেছেন, রাজপথে থেকেছেন, জেল-জুলুম সয়েছেন এবং তার জীবনের প্রতিটি স্তরে তিনি সততা, নিষ্ঠা আর মানুষের জন্য ভালবাসার প্রমাণ রেখেছেন। আর এ কারণেই কতিপয় উগ্রবাদী ছাড়া তার রাজনীতির সমর্থক নয়, তারাও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সমীহ করে কথা বলতেন।

এমন মানুষের মৃত্যুতে তাই বাঙালির হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আজও থামেনি। কারণ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গেই ভিন্ন পথচলা শুরু হয় সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের। মুখ থুবড়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। বাংলাদেশ হাঁটতে শুরু করে প্রত্যাখ্যাত পাকিস্তানি ভাবধারায়। প্রশাসন থেকে রাজনীতি, সব জায়গায় জেঁকে বসে পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা। জাতির জনককে হত্যার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশ বেতার হয়ে গিয়েছিল রেডিও বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ‘জয় বাংলা’র বদলে পাকিস্তান জিন্দাবাদের আদলে হয়ে যায় বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

বছর না ঘুরতেই জেলখানা থেকে সদম্ভে বেরিয়ে আসে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত প্রায় ১১ হাজার যুদ্ধাপরাধী। যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, যারা বিশ্বাস করতেন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, তাদের জন্য শুরু হয় অন্ধকার কাল। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা ছিলেন, তাদের কাছে মৃত মুজিবও ছিলেন ভয়াবহ আতঙ্কের।

বিভিন্নভাবে তারা চেষ্টা করেছেন বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে। ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই একটানা চেষ্টা চলে বঙ্গবন্ধুকে ভুলিয়ে দেয়ার। পাঠ্যপুস্তক থেকে মুছে ফেলা হয় বঙ্গবন্ধুর নাম। খুন করা হয় জাতীয় চার নেতাকে, নির্বাসনে পাঠানো হয় বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধকে, ছুঁড়ে ফেলা হয় উদারতার সব আয়োজন, ফিরিয়ে আনা হয় পাকিস্তানি ধর্মীয় উগ্রবাদকে। আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চলে ধারাবাহিক নির্যাতন।

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রক্ষায় বাংলাদেশের সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছিল ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এই কালো অধ্যাদেশটি জারি করা হয়। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফিরে আসার আগ পর্যন্ত প্রতিটি সরকার বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুরস্কৃত করেছে, লালন করেছে।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একে অপরের পরিপূরক। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমানের পুরো জীবনই সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের রাজনীতি। কিশোর বয়স থেকেই সাহসী মুজিব শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির মতো তার রাজনৈতিক গুরুদের জানান দিয়েছিলেন যে, এই মাটিতে শুধু নন, বিশ্বদরবারে তিনি হয়ে উঠছেন বড় রাজনীতির প্রতীক।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড ছিল বাঙালির নিজের পরাজয়। এক শ্রেণির বাঙালি এই পরাজয় নিয়ে আবার গর্বও করে। বড় নেতা হিসেবে বাঙালির এই ক্ষুদ্রতা নিয়ে আসলে বঙ্গবন্ধুর থাকাই হতো না এই দেশে। বঙ্গবন্ধু এই জাতির কাছে কিছু চাননি কখনো। দুঃখজনক হলো, আজ বাঙালির অনেকেই তার প্রতি ভক্তির প্রাবল্য দেখান, কিন্তু তারা কেউই তার মতো বড় রাজনীতির চেষ্টা করেন না।


সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি

শেয়ার করুন

ad-close 103.jpg