20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
বঙ্গবন্ধুর পুনর্জন্ম

সেদিন জগা সাধুর যে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি, বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার ৪৫ বছর পর, আজ বলতে পারি- বঙ্গবন্ধুর পুনর্জন্ম সাধিত হয়েছে তার কন্যা বিশ্বনেত্রী শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাত্রি আমার জীবনকে একেবারে তছনছ করে দেয়। বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নিহত হওয়ার ঘটনাটি আমার বুকের ভিতরে একটি গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে স্তূপ করে রাখা শেখ পরিবারের সদস্যদের মৃতদেহগুলি দেখার পর আমি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি। ডোমদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি যে, মর্গে বঙ্গবন্ধুর লাশটি আনা হয়নি। তার লাশ বত্রিশ নম্বরের বাড়িতেই পড়েছিল। সেখানে যাবার উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হই। ঐ বাড়িটি তখন সৈনিকরা পাহারা দিচ্ছিল। পরিবর্তিত ঢাকার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আমি ব্যর্থ হই। তিন দিন তিন রাত্রি স্থান বদল করে (মহাদেব সাহা, আসাদ চৌধুরী ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ) লুকিয়ে থাকার পর আমি ঢাকা ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নেই। আমি বুঝতে পারি, এই নগরীতে আমার পক্ষে আর ঘুমানো সম্ভব হবে না। আমার ঘুম আসে না। চোখ বুজলেই টিভিতে দেখা খন্দকার মোশতাক, জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী ও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের উল্লসিত মুখ ভেসে ওঠে।

১৮ আগস্ট রাতের ট্রেনে আমার ‘হুলিয়া’ কবিতার নায়কের মতো লুকিয়ে আমি আমার জন্মগ্রাম কাশবনে ফিরে যাই। আবার কখনও ঢাকায় ফিরে আসবো বা ফিরে আসতে পারবো- এমন ধারণা বা বিশ্বাস তখন আমার ছিল না। মনে হচ্ছিল, আমি চিরদিনের জন্য আমার এই প্রিয় নগরী ছেড়ে চলে যাচ্ছি, যে নগরী আমাকে কবি বানিয়ে ভালবেসে তার বুকে তুলে নিয়েছিল। আমার চারপাশে আমি একদল আততায়ীর অস্তিত্ব অনুভব করতে থাকি। অচেনা মানুষদের তো বটেই, আমার খুব চেনা-জানা মানুষদেরকেও সন্দেহ হতে থাকে। আমার মনে হচ্ছিল, বঙ্গবন্ধুর আততায়ীরা আমাকে গোপনে অনুসরণ করছে। আমার মনে হচ্ছিল, আমি যে বঙ্গবন্ধুর রুহুকে আমার বুকের ভিতরে গোপনে বহন করে নিয়ে চলেছি, বঙ্গবন্ধুর খুনিরা তা জেনে গিয়েছে। আমি একটু অসতর্ক হলেই, ওরা আমাকে হত্যা করবে। গ্রামের বাড়িতে মা-বাবা ও আমার ভাই-বোনদের কাছে ফিরে গেলে হয়তো আমার স্বস্তি আসবে, ভয় কেটে যাবে, আমি হয়তো ঘুমাতে পারবো।

কিন্তু না, গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাবার পরও আমার মানসিক অবস্থার উন্নতি হলো না। বরং আমার সন্দেহ-তালিকায় এবার আমার আপনজনরাও যুক্ত হলো। আমি নিজে রান্না করে খেতে শুরু করলাম। অপরের দেওয়া খাদ্য গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকলাম। আমার মনে হতে থাকলো রাজপুটিনের মতো আমাকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হতে পারে। মনে পড়লো, ঔপন্যাসিক সরদার জয়েনুদ্দিন, কবি আবদুল গনি হাজারী এবং শিল্পী কামরুল হাসান- এই তিন বন্ধু আমাকে রাজপুটিন বলে ডাকতেন-। কেন ডাকতেন? তবে কি আমার জীবনের পরিণতিও রাজপুটিনের মতো হবে? আমার সন্দেহ রোগটা এমনই বেড়ে গেল যে, আমার মা-বাবা ও ভাই-বোনরা কেউ প্রকাশ্যে, কেউ গোপনে আমার জন্য অশ্রু বিসর্জন করতে লাগলেন।


আমি দিনরাত আমাদের গ্রামের শ্মশানে, জটাচুল ও দীর্ঘ শুভ্রশ্মশ্রুমণ্ডিত জগা সাধুর আশ্রমে পড়ে থাকি। সংসারত্যাগী সদাহাস্যময় এই মানুষটাকে আমার ভালো লাগে। আমার মনে হয় এই মানুষটির দ্বারা এই সংসারের কারও কোনো ক্ষতি সাধিত হবে না। বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার খবরটি সবাই জেনেছিল, কিন্তু ঐ কালরাতে বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র এবং শেখ মনির অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকেও যে হত্যা করা হয়, সেই খবরটা অনেকেই জানতো না। আমার কাছে মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর, সবচেয়ে বর্বর ও অবিশ্বাস্য হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা শুনে অনেকের চোখই অশ্রুসজল হয়। বিশেষ করে জগা সাধু বেশি কষ্ট পান। মনে হয়, আমার কষ্টের কথা ভেবে তিনি আমার চেয়েও বেশি কষ্ট পাচ্ছেন।

একদিন এক নির্জন সন্ধ্যায়, জগা সাধুর আশ্রমে শুধুই আমরা দু’জন মুখোমুখি বসে ছিলাম। যেন কতকাল ধরে, আমরা পরস্পরের চোখে চোখ রেখে বসে আছি, কোনো এক অজানা প্রশ্নের উত্তর জানতে। বুঝলাম জগা সাধু আমাকে একা পেয়ে খুশি হয়েছেন। চারদিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি তার বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখা গোপন প্রশ্নভার থেকে নিজেকে মুক্ত করে, আমার দিকে একটু এগিয়ে এসে ক্ষীণকণ্ঠে বললেন, ‘এরা তো বঙ্গবন্ধুরে মাইরা ফেলাইলো, অহন বঙ্গবন্ধু অইবো কেডা? দেশ চালাইবো কেডা?’

জগা সাধুর চোখে জল। অনেকদিন পর আমার এ-ক-টু ভালো লাগলো। আমি জগা সাধুকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। তার সিদ্ধির নেশায় বুঁদ লাল চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জল মুছে দিয়ে বললাম, এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই, জগাদা। ভবিষ্যতই বলবে, বঙ্গবন্ধুর শূন্যস্থান কোনোদিন আদৌ পূরণ হবে কিনা। বা পূরণ করবে কে? তবে, যা বলতে পারি, তা হলো বঙ্গবন্ধুর খুনিচক্রের শাসন বাংলাদেশে কখনই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। হতে পারে না।
‘মুজিব হত্যার দণ্ড এড়াবে-,
খুনিদের এতো সাধ্য কী?
আমি কবি, জানি
বাঙালির আরাধ্য কী।’

‘ইতিহাস কী লিখবো মাগো, আমি তো আর শেষ জানি না।’ রামপ্রসাদের সুরে রচিত আমার ঐ গানটিও আমাদের গ্রামের শ্মশানে, জগা সাধুর আশ্রমে বসেই লিখেছিলাম।

সেদিন জগা সাধুর যে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি, বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার ৪৫ বছর পর, আজ বলতে পারি- বঙ্গবন্ধুর পুনর্জন্ম সাধিত হয়েছে তার কন্যা বিশ্বনেত্রী শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে।

আজ জগা সাধু বেঁচে থাকলে খুশি হতেন। শেখ হাসিনা, আপনি আমার অভিনন্দন গ্রহণ করুন।

নির্মলেন্দু গুণ: কবি

শেয়ার করুন