× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ প্রাইভেসি পলিসি

জীবনযাপন
Lokayat Shak Laukik diet
hear-news
player
print-icon

লোকায়ত শাক, লৌকিক খাদ্যাভ্যাস

লোকায়ত-শাক-লৌকিক-খাদ্যাভ্যাস-
বাংলাদেশে খাদ্যসংস্কৃতির অন্যতম উপাদান শাক। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
প্রাচীনকালে গ্রামের বাঙালির অন্যতম প্রধান খাবার ছিল শাক-সবজি। চতুর্দশ শতকের ‘প্রাকৃত-পৈঙ্গল’-এ আছে, ‘কলাপাতায় গরম ভাত, গাওয়া ঘি, মৌরলা মাছের ঝোল আর নালিতা শাক (পাট শাক) যে স্ত্রী নিত্য পরিবেশন করিতে পারেন তাঁহার স্বামী পুণ্যবান।‘

আমাদের খাদ্যাভ্যাস সংস্কৃতির শিকড় থেকে আসা। এটি প্রধানত হাজার বছর ধরে পুরাণ, ধর্ম, মিথ ও লোকাচারের ভিত্তিতে নির্মিত, আর অংশত এসেছে অন্নাভাব বা দারিদ্র্য থেকে। খাদ্যে শাকের সংযোজনও সেভাবে।

নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ী এক সাক্ষাৎকারে বৈষ্ণব সাহিত্যিক হরিদাস দাসের ভাই মুকুন্দ দাসের আতিথেয়তার স্মৃতিচারণা করে বলেছেন, সেদিন অন্য কিছু আয়োজন করতে না পেরে মাথার ওপর সুবিস্তারি তমালগাছের পাতা বেটে ভর্তা করে তিনি অতিথিদের ‘মধ্যাহ্নের’ (বৈষ্ণবরা দুপুরের আহারকে মধ্যাহ্ন বলে) আয়োজন করেছিলেন।

রাজা দশরথ মারা গেছেন এই সংবাদ পেয়ে বনবাসে থাকা রাম ইঙ্গুদি ফল বেঁটে তার সঙ্গে বদরি (কুল) মিশিয়ে কুশগাছের পাতায় বিছিয়ে ‘পিন্যাক’ তৈরি করে পিতার উদ্দেশে পিণ্ডদান করেছিলেন।

বলা বাহুল্য, বনবাসে না থাকলে নিশ্চয় উপাচারের আয়োজন অন্যরকম হতো। তাই ভাদুড়ি বলছেন, ‘আমরা যা খেতে চাই (বা পাই), দেবতাকে আমরা তাই দিই।‘

সুতরাং সারাংশ টানা যায়, আমাদের আশপাশে যা পাওয়া যায়, তা-ই নিজেরা খাই এবং এভাবে আমাদের খাদ্যাভ্যাস বা খাদ্যসংস্কৃতি গড়ে ওঠে। শাক সেই অভ্যাসের অন্যতম উপাদান।

নীহাররঞ্জন রায়ের লেখা ‘বাঙালীর ইতিহাস আদিপর্ব’ গ্রন্থে আছে, ‘নানা প্রকারের শাক খাওয়া বাঙালির এক প্রাচীনতম অভ্যাস।‘

প্রাচীনকালে গ্রামের বাঙালির অন্যতম প্রধান খাবার ছিল শাক-সবজি। চতুর্দশ শতকের ‘প্রাকৃত-পৈঙ্গল’-এ আছে, ‘কলাপাতায় গরম ভাত, গাওয়া ঘি, মৌরলা মাছের ঝোল আর নালিতা শাক (পাট শাক) যে স্ত্রী নিত্য পরিবেশন করিতে পারেন তাঁহার স্বামী পুণ্যবান।‘

পল্লীবাসী কৃষিনির্ভর বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের পরিচয় প্রাকৃত পৈঙ্গলের আরেকটি পদে পাওয়া যায়, ‘পুত্র পবিত্রমনা, প্রচুর ধন, শুদ্ধচিত্তা স্ত্রী ও কুটুম্বিনী, হাঁক দিলেই ত্রস্ত ভৃত্যগণ- এসব ছেড়ে কোন বর্বর স্বর্গে যেতে চায়?’

পঞ্চদশ শতকের চৈতন্যচরিতামৃতে চৈতন্য দেবের খাদ্যতালিকায় ‘১০ প্রকার’ শাকের উল্লেখ দেখা যাচ্ছে-

পীত সুগন্ধী ঘৃতে অন্ন সিক্ত কৈল

চারিদিকে পাতে ঘৃত বাহিয়া চলিল।

কেয়াপত্র কলার খোলা ডোঙ্গা সারি সারি

চারিদিকে ধরিয়াছে নানা ব্যঞ্জন ভরি।

দশ প্রকার শাক নিম্ব সুকতার ঝোল

মরিচের ঝাল ছানাবড়া, বড়ি, ঘোল।

ষোড়শ শতকের চৈতন্যকাব্যগুলোতেও বাঙালির খাবার হিসেবে শাকের উল্লেখ রয়েছে। চণ্ডীমণ্ডলে অতি সাধারণ খাদ্য বর্ণনায় আছে ‘দুই তিন হাঁড়ি’ শাকের কথা!

খুদ কিছু ধার লহ সখীর ভবনে

কাঁচড়া খুদের জাউ রান্ধিও যতনে।

রান্ধিও নালিতা শাক হাঁড়ি দুই তিন

লবণের তরে চারি কড়া কর ঋণ।

অধ্যাপক যতীন সরকার একবার আমাকে গীতার (?) একটি শ্লোক শুনিয়েছিলেন, যার মর্মার্থ হচ্ছে, ‘ঘরের আশপাশেই যখন স্বাস্থ্যরক্ষা আর উদরপূর্তির ব্যবস্থা ছড়িয়ে আছে, তখন পোড়া পেটের জন্যে পাপকার্য কেন?'

আমার স্কুলের ‘পণ্ডিত স্যার’ বৈষ্ণব ছিলেন, তিনি পুঁই শাক খেতেন না, বলতেন ওটা ‘আমিষ’।

শাক কিভাবে সংস্কৃতির অংশ হলো তা বাঙালির ১৪ শাকের আচারের উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে। দেওয়ালি বা ভূত চতুর্দশীর দিনদুপুরে খেতে হয় ১৪ শাকের ব্যঞ্জন আর সন্ধ্যায় জ্বালাতে হয় ১৪ প্রদীপ। ১৪ শাক* খেতে হয় কারণ এটাই ছিল এককালের কৃষিজীবী বঙ্গবাসীর নিয়ম।

কারোর জন্যে ছিল ধর্মীয় আচার। আর ১৪ প্রদীপ জ্বালিয়ে ১৪ পুরুষের** আত্মাকে তুষ্ট করতে হয়। পুরাণ মতে, মৃত্যুর পর মানব শরীর পঞ্চভূতে (আকাশ, মাটি, জল, হাওয়া, অগ্নি) বিলীন হয়। তাই মাটি থেকে তুলে আনা শাক খেলে অতৃপ্ত আত্মার রোষানল থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। লোকধর্মের এই আচারের মধ্যে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার এক অদ্ভুত সৌন্দর্য আছে।

কেউ যদি এই আচার প্রতিপালন করতে চান তাহলে তাকে ১৪ রকম শাকের (বেশির ভাগই অ-চাষকৃত বনজ উদ্ভিদ) প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে, অর্থাৎ যথেচ্ছাচারের মাধ্যমে কোনো একটি প্রজাতি যেন বিলীন হয়ে না যায়, সেদিকে মনোযোগী হতে হবে।

একসঙ্গে অনেক প্রদীপ জ্বালানো ক্ষতিকারক কীটের হাত থেকে হৈমন্তিক ফসল রক্ষা করারও প্রাকৃতিক উপায়। দেওয়ালির অমাবস্যা রাতে উন্মুক্ত জ্বলন্ত প্রদীপে আত্মাহুতি দিয়ে পোকামাকড় মরে যায়। কীটনাশক ছাড়াই ফসল রক্ষা পায়। আবার এই সময় আবহাওয়ার পরিবর্তন হয়। উত্তরের ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে শুরু করে।

ঋতু পরিবর্তনের সময় ১৪ শাকের মিলিত পুষ্টি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ায়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সামাজিক ও লোকধর্মীয় আচারাদি আসলে প্রয়োজন ও প্রাপ্যতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে।

জমির বৈশিষ্ট্যের কারণেই বিনা যত্নে জলা-জঙ্গল, পতিত জমি, পুকুর পাড়, জমির আইলে অনেক ধরনের শাক জন্মায়। মানুষ এদের পরিবর্তন ঘটাবার কোনো আয়োজন করেনি কখনও। সার বা পানি দিয়ে যত্নে পালন হয় না, ফলে অনেকটাই অবিকৃত থেকে গেছে এদের অবয়ব, স্বাদ ও গন্ধ।

তবে স্থানাভাবের কারণে একসময়ের শতাধিক অনাবাদি শাকের সংখ্যা এখন দ্রুত কমে আসছে। যেমন নটে শাক। তিন ধরনের নটের মধ্যে রাঙ্গানটে আর পাওয়া যায় না। সবুজনটে পাওয়া যায় আর কাঁটানটে বিলীন হওয়ার পথে।

মাথা ধরলে কাঁটানটের মূল এবং গোলমরিচ সামান্য পানি দিয়ে বেটে কপালে লাগাতে দেখা যায় গ্রামে। গর্ভাবস্থায় এবং আঁতুড়ঘরের খাবারের তালিকায় নটে শাক থাকত। এ ছাড়া অনেক অপ্রচলিত শাকও খাওয়ার চল আছে। যেমন: সজিনা, পিপুল, তেলাকুচা, নুনিয়া, ঢেঁকি, কলমি, গন্ধভাদালি, পুনর্নভা ইত্যাদি।

লোকায়ত শাক, লৌকিক খাদ্যাভ্যাস
কাঁটানটে। ছবি: জাহিদ হোসেন

পিপুল সুগন্ধিযুক্ত একটি লতানো গাছ। পাতা দেখতে অনেকটা পানের মতো। খোলা জংলা অথবা বদ্ধ জায়গায় জন্মায়। অ-চাষকৃত লতাজাতীয় উদ্ভিদ, তাই পরনির্ভরশীল। বর্ষা মৌসুমে দ্রুত বাড়ে। কাশিতে ও হাঁপানিতে পিপুলের ঝোল করে খাওয়া হতো। এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ।

লোকায়ত শাক, লৌকিক খাদ্যাভ্যাস
পিপুল শাক। ছবি: জাহিদ হোসেন

সজিনা শাককে বলা হয় ‘অলৌকিক শাক’, পৃথিবীর সবচেয়ে পুষ্টিকর হার্ব। একে বলা হয় নিউট্রিশনস সুপার ফুড এবং এর গাছকে বলা হয় মিরাকল ট্রি। ডাল ও বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার করলেও আমাদের দেশে সাধারণত ডালের মাধ্যমে বা অঙ্গজ জননের মাধ্যমে বংশবিস্তার করানো হয়। এই গাছ বাড়েও খুব দ্রুত। দুই-তিন বছরে ফুল দেয়। এর ফুল, পাতা, ফল (যাকে বলি শজনে ডাঁটা) সব কিছুই সুস্বাদু।

লোকায়ত শাক, লৌকিক খাদ্যাভ্যাস
সজিনা শাক। ছবি: সংগৃহীত

নুনিয়া শাকের স্বাদ একটু নোনতা। পতিত জমি, জমির আইল, রৌদ্রোজ্জ্বল মাটিতে জন্মায়। বলা হয় ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ এই শাকে অন্যান্য সব শাক-সবজির চেয়ে বেশি।

লোকায়ত শাক, লৌকিক খাদ্যাভ্যাস
নুনিয়া শাক। ছবি: জাহিদ হোসেন

ঢেঁকি শাকের আরেক নাম বউ শাক। বর্ষাকালে স্যাঁতসেঁতে ছায়াময় এলাকার উপযোগী। সারা বছর চুপসে থাকলেও বর্ষার মৌসুমে বেশ তরতাজা হয়ে ওঠে। গ্রামাঞ্চলে জনপ্রিয়। ঢাকায় পাওয়া যায়, তবে কম।

লোকায়ত শাক, লৌকিক খাদ্যাভ্যাস
ঢেঁকি শাক। ছবি: জাহিদ হোসেন

কলমি শাক মূলত জলের আর ভেজা মাটির শাক। জন্মের পর শিশু মায়ের বুকের দুধ না পেলে মাকে কলমি শাক রান্না করে খাওয়াতে দেখা যায়। এই শাক পুরুষের যৌন স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী বলে শোনা যায়। আজকাল কলমি বলতে বাজারে যেটা দেখা যায় তা চাষ করা হাইব্রিড কোনো পরিবর্তিত প্রজাতি। জীবনানন্দের সেই 'সারা দিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধভরা জলে ভেসে ভেসে' দোল দোলানো, গ্রীবা বাঁকানো কলমি এগুলো নয়।

লোকায়ত শাক, লৌকিক খাদ্যাভ্যাস
কলমি শাক। ছবি: জাহিদ হোসেন

আমাদের শৈশব ছিল মূলত শাকময়। সব যে ভাতের সঙ্গে তরকারি হিসেবে খাওয়া হতো তা নয়। কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ হিসেবেও খাওয়া হতো। যেমন: আমাশয় হলে থানকুনি শাক বেঁটে তার রস, পেট ফাঁপলে বা বদহজম হলে গন্ধভাদালির পাতা সামান্য লবণ দিয়ে সিদ্ধ করে সেই সিদ্ধ পানি এক গ্লাস, কৃমি হলে পটোলের শাক (পটোলের লতি) ভাজা গরম ভাতের সঙ্গে খাওয়ানো হতো।

জ্বরে বা মাথা ধরলে সামান্য লবণ দিয়ে আমরুল শাক বেঁটে কপালে প্রলেপ দেয়া হতো। আমাদের বাড়ির পাশে মতলেব নামের এক বাউল সাধুর আখড়া ছিল। পাশেই রাস্তা। একবার এক মাতাল খুব উপদ্রব করছিল রাস্তায়, সাধুর কাছে গাঁজা চাচ্ছিল। সাধু বলছিলেন, তিনি গাঁজার ব্যবসা করেন না, কিন্তু মাতাল শুনবে না। শেষে আমার নানি বাড়ির পাশ থেকে পুনর্নভা শাক তুলে বেঁটে তার রস খাওয়াতে দেখেছিলাম। কিছুক্ষণ পর মাতালের হুঁশ ফিরে এলো। অনেক বছর পর সেদিন চন্দ্রিমা উদ্যানে হাঁটতে যেয়ে পুনর্নভা দেখতে পেয়ে সেই পুরোনো কথা মনে পড়ছিল।

একটা কথা বলা দরকার। বাংলার গ্রামে অনাবাদি শাক সব সময়ে পাবলিক প্রপার্টি হিসাবে গণ্য হয়। অর্থাৎ জলা জঙ্গলে তো বটেই, এমনকি কৃষকের আবাদি জমিতেও যখন সাথি ফসল হিসেবে বথুয়া, দণ্ডকলস, জমির আইলে হেলেঞ্চা, থানকুনি ইত্যাদি জন্মায়, সেটা আর কৃষকের নিজের থাকে না। তার ওপর অধিকার বর্তায় গ্রামের সবার।

যে কেউ (সাধারণত নারীরা) জমির মালিকের অনুমতি ছাড়াই অনাবাদি এসব শাক তুলতে পারেন। এমনকি পথচলতি ভিনগায়ের নারীও কোনো সংকোচ ছাড়াই খেতে নেমে আঁচল ভরে এই শাক তুলে নিয়ে যেতে পারেন। কারণ এ শাক তো কোনো মালিক লাগায়নি, এটা নিজ থেকেই জন্মেছে। তাই এই শাক তোলার অধিকার সবার।

গ্রামীণ এই সংস্কৃতির সঙ্গে নারী-অধিকারের আদিম সংযোগ পাওয়া যায়। যে নারী এই শাক তোলেন তিনি আবাদি ফসলের কোনো ক্ষতি করেন না। অনাবাদি শাক তুলতে গিয়ে কখনও গাছসহ উপড়ে ফেলেন না। শুধু যে অংশটুকু রান্নার জন্য দরকার সে অংশটুকু তারা অতি যত্নের সঙ্গে তোলেন। এ কাজটি তারা খুব ভালোভাবেই করতে পারেন। এটা তাদের ইনডিজিনাস নলেজ।

শৈশবে দেখেছি, গ্রামীণ নারীরা ঘরে একটু চাল থাকলেই নিশ্চিন্ত থাকতেন। তাদের এই স্বস্তির একমাত্র কারণ ছিল শাক। একটু শাকভাত হলেই চলে যেত তাদের সংসার। এমনকি আষাঢ় মাসের অভাবের সময় কেবল কলমি শাক সিদ্ধ খেতেও দেখেছি তাদের। তবু তাদের কণ্ঠে শাক তোলার গান থাকত।

গানগুলোতে নারীর বিষাদ, বঞ্চনা, প্রেম আর পরিচর্যার সব গল্প মিশে থাকত। মনে আছে, একটা গান শুনেছিলাম বথুয়ার শাক নিয়ে (কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর অঞ্চলের উচ্চারণ ‘বাইতো শাক’)। গানে বলা হচ্ছে, এপারে ওপারে অনেক বথুয়ার শাক, কিন্তু শাক তুলতে যেয়ে সাপ দেখে বউ ফিরে এসেছে ফলে সবাই তাকে তিরস্কার করছে। ঘরে স্বামীর কটূ কথায় একে একে সে যায় রান্নাঘরে, উঠোনে, গোয়ালে… যেখানেই যায় সবাই একই গঞ্জনা দেয়। বোঝা যায় শ্বশুরবাড়িতে তার নিজস্ব কোনো জায়গাই নেই। মনের কথা বলা বা শোনার মতো কোনও মানুষও নেই।

বথুয়া শাকের গান এভাবেই কিছু অমোঘ সত্যকে ধরে রাখে সুরের বাঁধনে। পুরো গানটা মনে নেই কিন্তু সাপের ফণা তোলায় ভয় পেয়ে শাক তোলা ফেলে ফিরে আসা নতুন বউটির জন্য এখনও মায়া জেগে আছে মনে…

ইপার বাইতো উপার বাইতো, বাইতো দুমদুম করে

বাইতো শাক তুলতি গেলি সাপে পট করে

আরেকটা গানে পাট শাক তুলতে গিয়ে আনাড়ি বউ পাটের ডগা ভেঙে ফেলেছে দেখে স্বামী মেরেছেন। বউ তাই স্বামীকে রাগ করে ‘বুড়ো’ বলছেন-

পাটশাক তুলতি পাটের ডুগা ভাইঙ্গেছে

তাই দেখে বুড়া আমাক বড্ড মাইরেছে

বুড়ার মারে আমার কপাল ফাইটেছে…

অনেক অভিযোগ আপত্তির পর বউয়ের মান ভাঙে। একটু আগে গ্রামের মানুষকে তিনি সাক্ষী মানতে ডাকছিলেন, অবশেষে তাদেরকেই জানিয়ে দেন, ‘কিছুই করেনি বুড়া সুহাগ কইরেছে…।‘

এই লেখা পড়ে যদি নতুন করে শাক খেতে ইচ্ছা করে, তাহলে মনে রাখবেন, রান্নার সময় মাথায় রাখতে হয়- অল্প সময়, বেশি তাপ, রঙ বজায় রাখা, রান্নার প্রথম দিকে ঢাকনা না দেয়া, আলাদা পানি না দেয়া খুব জরুরি। বড়জোর পাঁচ মিনিটে শেষ করলেই ভালো।

আর হ্যাঁ, ফেলতে না জানলে শাক খেয়ে মজা নেই। কচি পাতার স্বাদই আসল শাকের স্বাদ।

* প্রধানত, ওল, বেতো, সরষে, পুঁই, শুশনি, নিম, মেথি, হিলঞ্চ, পলতা, শৌলফ, গুলঞ্চ, শুষণী, লাউ এবং স্থান ও প্রাপ্যতা ভেদে অন্য কোনো শাক।

** পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, মাতা, পিতামহী, প্রপিতামহী, মাতামহ, প্রমাতামহ, বৃদ্ধপ্রমাতামহ, মাতামহী, প্রমাতামহী, বৃদ্ধপ্রমাতামহী, শ্বশুর, শাশুড়ি।

লেখক: মানবাধিকারকর্মী

মন্তব্য

জীবনযাপন
Sarada Hall is opening by November

সারদা হল উন্মুক্ত হচ্ছে নভেম্বরের মধ্যে

সারদা হল উন্মুক্ত হচ্ছে নভেম্বরের মধ্যে মঙ্গলবার সম্মিলিত নাট্য পরিষদের কর্মসূচিতে সারদা হল উন্মুক্ত করার আশ্বাস দেন সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। ছবি: নিউজবাংলা
মেয়র আরিফুল হক বলেন, ‘আমরা এই ঐতিহ্য রক্ষা করব। আগামী নভেম্বরের মধ্যে সারদা স্মৃতি ভবন এবং পীর হবিবুর রহমান পাঠাগার খুলে দেয়া হবে।’

নভেম্বরের মধ্যে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সারদা হল সংস্কৃতি চর্চার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। পাঠকদের জন্য পীর হবিবুর রহমান পাঠাগারও খুলে দেয়া হচ্ছে।

মঙ্গলবার সারদা হল উন্মুক্ত করে দেয়ার দাবিতে সম্মিলিত নাট্য পরিষদের কর্মসূচিতে হাজির হয়ে এমন আশ্বাস দেন মেয়র আরিফ।

১৯৩৬ সালে সিলেট শহরের সুরমা নদীর তীরে চাঁদনীঘাট এলাকায় নির্মাণ করা হয় ‘সারদা স্মৃতি ভবন’। সংস্কৃতি চর্চার বিকাশে সিলেটের একটি ব্যবসায়ী পরিবার ৩৯ শতক জমিতে কলকাতা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের আদলে সারদা হল নামে মিলনায়তনটি নির্মাণ করে। এরপর থেকে সেখানে গান, নাটকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো।

২০১২ সালে সিলেট সিটি করপোরেশনের নতুন ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তখন সারদা হল ও পাশের পীর হবিবুর রহমান পাঠাগারকে সিটি করপোরেশন অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করে। পরে নতুন ভবনে কার্যক্রম শুরুর পরও এই দুই ভবনের দখল ছাড়েনি তারা। এক পর্যায় সিটি করপোরেশন এগুলো ভাগাড় হিসেবে ব্যবহার শুরু করে।

সারদা হল সংস্কৃতি চর্চার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন সংস্কৃতিকর্মীরা। মঙ্গলবার তারা আন্দোলনে নামেন।

বিকেলে সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সারদা হলের সামনে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশের আয়োজন করে।

নাট্য পরিষদের সভাপতি মিশফাক আহমদ মিশুর সভাপতিত্বে প্রতিবাদী সমাবেশ পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক রজত কান্তি গুপ্ত।

মিশু বলেন, ‘সারদা হল সিলেটের সংস্কৃতি চর্চার স্থান, দীর্ঘদিন ধরে সিলেট সিটি করপোরেশন হলটি ভাগাড়ে পরিনত করে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।’

প্রতিবাদী কর্মসূচিতে হাজির হন মেয়র আরিফুল হক। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমরা এই ঐতিহ্য রক্ষা করব। আগামী নভেম্বরের মধ্যে সারদা স্মৃতি ভবন এবং পীর হবিবুর রহমান পাঠাগার খুলে দেয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘কোনো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ধ্বংস বা মুছে ফেলা কারোরই কাম্য নয়। সারদা স্মৃতি ভবনের সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে এটি চালু করা হবে।’

সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা ব্যারিস্টার আরশ আলী, সিলেট জেলা প্রেসক্লাব সভাপতি আল-আজাদ, সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকরামুল কবির, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর তৌফিক বক্স লিপন, রকিবুল ইসলাম ঝলক, সৈয়দ তৌফিকুল হাদি, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মোকাদ্দেছ বাবুল।

আরও পড়ুন:
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সম্পাদককে অব্যাহতি
টিএসসির অনুষ্ঠানে হামলা ও সাংস্কৃতিক দায়
জাতীয় সংগীত পুরস্কার প্রবর্তনের ভাবনা
প্রস্তাবিত বাজেটে অসন্তুষ্ট সংস্কৃতিকর্মীরা
সংস্কৃতিতে ৬৫, তথ্যে বেড়েছে ১৫ কোটি টাকা

মন্তব্য

জীবনযাপন
Hidden Heritage Homes in Dhaka project unveiled

‘হিডেন হেরিটেজ: হোমস ইন ঢাকা’ প্রকল্প উন্মোচন

‘হিডেন হেরিটেজ: হোমস ইন ঢাকা’ প্রকল্প উন্মোচন রাজধানীর বংশালে হাটুরিয়া হাউজে ‘হিডেন হেরিটেজ: হোমস ইন ঢাকা’ শীর্ষক এক প্রকল্প উন্মোচন। ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে এ ধরণের উপস্থাপনা এবারই প্রথম। ওয়েব-ভিত্তিক উপস্থাপনার ক্ষেত্রে মাল্টিমিডিয়া প্ল্যাটফর্মের সাথে আরও থাকছে- ৩৬০ ডিগ্রি ফটোগ্রাফি সহ ভার্চ্যুয়াল ট্যুর, ভিডিও, স্থিরচিত্র, ড্রয়িং সহ আরও অনেক কিছু।

রাজধানীতে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ের সাক্ষী ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সৌন্দর্য তুলে ধরতে দ্য বেঙ্গল ইনস্টিটিউট ফর আর্কিটেকচারের ল্যান্ডস্কেপস অ্যান্ড সেটেলমেন্টস, ইইউএনআইসি (ইউরোপিয়ান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস ফর কালচার) ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের অংশীদারিত্বে সম্প্রতি রাজধানীর বংশাল এলাকার হাটুরিয়া হাউজে ‘হিডেন হেরিটেজ: হোমস ইন ঢাকা’ শীর্ষক এক প্রকল্প উন্মোচন করা হয়েছে।

রাজধানীর ঐতিহাসিক দালানগুলোর দীর্ঘ ইতিহাস এবং এর পেছনের গল্পগুলো সংরক্ষণ করাই ‘হিডেন হেরিটেজ’ প্রকল্পের উদ্দেশ্য। ঢাকার বেশ কিছু ঐতিহাসিক দালান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে আকর্ষণ ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। তবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সেসব ঐতিহাসিক দালানের জায়গায় নির্মিত হচ্ছে নতুন ভবন।

প্রকল্পটির আওতায় রাজধানীর শহরে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর সাথে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক, সামাজিক ও পরিবেশগত বিষয় সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেগুলো তুলে ধরা হয়েছে অনলাইন উপস্থাপনার মাধ্যমে। ঢাকার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে এ ধরণের উপস্থাপনা এবারই প্রথম। ওয়েব-ভিত্তিক উপস্থাপনার ক্ষেত্রে মাল্টিমিডিয়া প্ল্যাটফর্মের সাথে আরও থাকছে- ৩৬০ ডিগ্রি ফটোগ্রাফি সহ ভার্চ্যুয়াল ট্যুর, ভিডিও, স্থিরচিত্র, ড্রয়িং সহ আরও অনেক কিছু।

প্রকল্পটির জন্য প্রাথমিকভাবে পাঁচটি দালানকে নির্ধারিত করা হয়েছে। সেগুলো হলো- বংশালের হাটুরিয়া হাউজ, ইস্কাটনের কবির হাউজ, মগবাজারের রাজশাহী হাউজ, ধানমন্ডির আসাফ খানের বাসভবন এবং সূত্রাপুরের রেবতী মোহন দাস হাউজ। এ সময় আরও চারটি দালানের মালিক ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে ঐতিহাসিক এ স্থাপনাগুলোর ইতিহাস তুলে ধরেন।

গ্যেটে ইনস্টিটিউটের পরিচালক ক্রিস্টেন হ্যাকেনব্রোশ এবং আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা এর পরিচালক ফ্রাসোয়াঁ গ্রজিয়াঁর বক্তব্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এ প্রকল্প কীভাবে শুরু হয় এ নিয়ে তারা আলোকপাত করেন। পরবর্তীতে, পাঁচটি স্থাপনার মধ্যে চারটি স্থাপনার মালিক ও প্রতিনিধিরা স্থাপনাগুলোর ইতিহাস ও এর পেছনের গল্প বলেন।

সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন ইতিহাস সংরক্ষণের গুরুত্বের ব্যাপারে আলোকপাত করেন।

মন্তব্য

জীবনযাপন
Today is the death anniversary of Shah Abdul Karim

‘কেমনে চিনিব তোমারে...’

‘কেমনে চিনিব তোমারে...’ বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম। ছবি: সংগৃহীত
বাড়ির পাশেই নদীর ঘাটে বাধা রঙিন নৌকা, নাম- করিম তরী। করিমের ছবি আর গানের কথায় সাজানো নৌকাটি। আরেকটু এগোলেই একটি ভবন- ‘শাহ আবদুল করিম স্মৃতি জাদুঘর’। ভবনের সামনে করিমের আবক্ষ ভাস্কর্য আর ঘরের ভেতর ঠাসা বাধ্যযন্ত্র, সনদ, ছবি ও তার ব্যবহার্য জিনিসপত্রে। এর পাশেই দুটি সমাধি। পাশপাশি শুয়ে আছেন দুজন। আবদুল করিম আর তার স্ত্রী সরলা। মৃত্যুও যাদের আলাদা করতে পারেনি।

বাজারের চায়ের দোকানগুলো থেকে যদিও হিন্দি সিনেমার সংলাপ আর ওয়াজের সুর ভেসে আসছে, এর মধ্যেই মাঝির কণ্ঠে শাহ আবদুল করিমের গান- ‘কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু ছেড়ে যাইবা যদি...’। ধল বাজারে এসে নৌকা থামতেই কানে ভেসে আসল এমন সুর।

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার এই বাজার ঘেঁষে উজান ধল গ্রাম। এই গ্রামেই ১৯১৬ সালে জন্ম নেন শাহ আবদুল করিম। যিনি পরবর্তীতে হয়ে উঠেন ভাটির মানুষের দুঃখ-বঞ্চনা, প্রেম-বিরহ, ভালোবাসা ও ক্ষোভের সুরেলা কথক। মাটি আর মানুষের কথা ও সুরে গান গেয়ে হয়ে উঠেন বাউল সম্রাট। ১২ সেপ্টেম্বর তাকে হারানোর দিন; ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী।

বাউল সম্রাটের বাড়িতে যাওয়ার পথেই দেখা রশিদ উদ্দিনের সঙ্গে। তিনিও বাউল। করিমেরই শিষ্য। আবদুল করিমকে ‘বাবা’ সম্বোধন করেন।

বাজারের রেস্টুরেন্টগুলো থেকে কানে আসা সুর ও স্বর নিয়ে কথা উঠতেই আক্ষেপ তার কণ্ঠে। রশিদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভাটির আগের দিন আর নাই। ঘরে ঘরে ডিশলাইন এসে গেছে। মোবাইলও আছে সবার। এসবে এখন খালি ভিনদেশি গান বাজে। ভাটির সুর, বাউল সুর আর তেমন কানে আসে না।’

বলতে থাকেন রশিদ উদ্দিন- ‘ধর্মের কথা বলে তো এখন আমাদেরও গানে বাধা দেয়া হয়। অথচ আগে এমন ছিল না। আগে বর্ষা মৌসুমে প্রতি ঘরেই বাউল গানের আসর বসত। আমরা দিনরাত গান করতাম। কিছু বাধা ছিল, তবে বেশিরভাগ মানুষ গানে উৎসাহ দিত।’

‘কেমনে চিনিব তোমারে...’

আব্দুল রশিদের কাছে বদলে যাওয়া দিনের আফসোস শুনতে শুনতেই পৌঁছে যাওয়া আবদুল করিমের বাড়িতে। করিম গত হয়েছেন ১৪ বছর। তবু এখনো পুরো বাড়িটিই যেনো করিমময়।

বাড়ির পাশেই নদীর ঘাটে বাধা রঙিন নৌকা, নাম- করিম তরী। করিমের ছবি আর গানের কথায় সাজানো নৌকাটি। আরেকটু এগোলেই একটি ভবন- ‘শাহ আবদুল করিম স্মৃতি জাদুঘর’। ভবনের সামনে করিমের আবক্ষ ভাস্কর্য আর ঘরের ভেতর ঠাসা বাধ্যযন্ত্র, সনদ, ছবি ও তার ব্যবহার্য জিনিসপত্রে। এর পাশেই দুটি সমাধি। পাশপাশি শুয়ে আছেন দুজন। আবদুল করিম আর তার স্ত্রী সরলা। মৃত্যুও যাদের আলাদা করতে পারেনি।

এসব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়েও পুরনো আফসোস আবারও প্রকাশ করেন আব্দুল রশিদ। বলেন, ‘সবই আছে কিন্তু আগের পরিবেশটা নাই। ভাটি এলাকা কিছুটা উন্নত হচ্ছে, তবে মানুষগুলো বদলে যাচ্ছে। আগের মতো গানের আসর নেই।’

করিম সঙ্গীতালয়ের ভগ্নদশা নিয়েও আক্ষেপ তার কণ্ঠে।

হাওরে তখন বন্যা। চারদিকে থৈ থৈ পানি। পানিতে ডুবছে হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান। চারদিকে ফসল হানির হাহাকার। কৃষকের আর্তনাদ। শাহ আবদুল করিমের গানেও পাওয়া যায় হাওরের এই অকালবন্যার চিত্র। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত ভাটির চিঠি গ্রন্থে করিম লিখেছেন- ‘জল নামে রাস্তায় কোনো বাধাবিঘ্ন নাই।/ প্রচুর মাটি নেমে আসে চোখে দেখতে পাই।/ পাহাড়ি জল নিচে নেমে নদীপথে চলে/ এলাকা প্লাবিত হয় অকালবন্যার জলে।’

এই গানটির প্রসঙ্গ টেনে করিমপুত্র শাহ নুর জালাল বলেন, ‘গানে তো বাবা মানুষ, হাওর আর ভাটির কথাই বলে গেছেন। কিন্তু ভাটির মানুষের দুর্দশা গোছাতে তো কেউ উদ্যোগ নেয় না। ঢলে পানির সঙ্গে মাটি আসায় নদী ভরাট হচ্ছে। এতে বন্যা বেশি হচ্ছে। এটা বাবা অনেক আগে গানে বলে গেছেন। কিন্তু নদী খনন তো আর হয়নি। ফলে প্রতি বছরই দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’

গানে গানে এভাবেই মানুষের কথা, ভাটির দুর্দশার কথা তুলে ধরেছিলেন আবদুল করিম। ফলে বাউল হয়েও তিনি হয়ে গেয়ে ছেন গণসঙ্গীত শিল্পী। হয়ে উঠেছেন গণমানুষের শিল্পী।

পাঁচ বছর পর পর দেশে ভোট আসে। গরীবের উন্নয়নের আশ্বাস আর ধর্মের বাণী নিয়ে ভোটারদের কাছে আসেন প্রার্থীরা। ভোটের লোকজনও দাঁড়ায় ভোটের লাইনে। কিন্তু তদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। গরিব আরও গরিব হয়ে ওঠে।

করিমের উপলব্দি তাই গরীবের কেউ নেই। তিনি লিখেছেন- ‘ভোট দিবায় আজ কারে?/ ভোট শিকারী দল এসেছে নানা রঙ্গ ধরে/... কেউ দিতাছে ধর্মের দোহাই, কেউ বলে গরিবের ভাই/ আসলে গরিবের কেউ নাই, গরিব ঠেকছে ফেরে।’

রাজনীতিবিদদের এই শঠতা আর সাধারণ মানুষের বঞ্চনা নিয়ে আরেক গানে করিম গেয়েছেন- ‘ভাইরে ভাই/ভোট নেওয়ার সময় আইলে/ নেতা সাহেব এসে বলে/ এবার আমি পাশ করিলে/ কাজ করবো গরিবের দায়,/ শেষে দেখা যায় ধনির বাড়ি খাসী খাওয়া/ লাইসেন্স পারমিট দেওয়া,/ নৌকা বাওয়া আর সালাম দেওয়া/ এই দুইটাই গরিবে পায়,/ গরিবের কি মান অপমান দুনিয়ায়।’

করিমপুত্রের সঙ্গে আলাপকালেই চার তরুণ এসে ঢুকেন বাড়িতে। ঢাকা থেকে হাওরে ঘুরতে এসেছেন তারা। এই ফাঁকে আবদুল করিমের বাড়িও দেখে যাওয়া। দেখে যাওয়া যাওয়া যে পরিবেশ থেকে করিম হয়ে উঠেছেন বাউল গানের সম্রাট।

তাদেরই একজন নিয়াজ আহমদ। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। লোকগান করেন। বললেন, ‘করিমের গান আমার খুব পছন্দ। তার জীবনচারণও পছন্দ। তাকে মুর্শিদ হিসেবে গণ্য করি। মুর্শিদ যেখানে শুয়ে আছেন, সেই মাটি দেখতে এসেছি। তার স্পর্শ পেতে এসেছি।’

‘কেমনে চিনিব তোমারে...’

মাঝেমাঝেই দূরদুরান্ত এমন অনেকে করিমের স্মৃতির খোঁজে ভাটির এই দুর্গম জনপদে আসেন জানিয়ে শাহ নুর জালাল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যারা আসে তাদের বেশিরভাগই তরুণ। তারা ব্যান্ড, রক, হিন্দি ইংরেজি গান শুনে। আবার বাউল গানও শুনে। কেবল শুনে না বাউলদের সম্পর্কে তারা জানতে চায়। তাই দূরের পথ পাড়ি দিয়ে করিমের ভিটায় আসে।

‘এদের মধ্যেই বাউল আবদুল করিম বেঁচে থাকবেন। ডিশ আর ইন্টারনেট এসে করিমকে ভুলিয়ে দিতে পারবে না। বরং এসবকে ব্যবহার করে করিমের গান আরও বেশি মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ছে।’

তবে করিমের গানের চর্চা ও প্রসারে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় ক্ষোভ লোকসংস্কৃতি গবেষক সুমনকুমার দাশের কণ্ঠে। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দিরাইয়ে একটি আবদুল করিম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার কাজ শুরু হয়নি।

‘জীবিত থাকতেই করিম নিজ বাড়িতে গড়ে তুলেছিলেন ‘করিম সঙ্গীতালয়’। পৃষ্টপোষকতার অভাবে এটিরও কার্যক্রম থেমে আছে। ফলে লোকের মুখে মুখে করিমের গান ছড়িয়ে পরলেও তার গান শেখা বা শুদ্ধভাবে চর্চার কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে অনেকক্ষেত্রে গানের কথা ও সুর বিকৃত হয়ে যাচ্ছে।’

করিমের বাড়ির পাশেই হাওর। তখন হাওরে ডুবে যাওয়া ধান নৌকায় করে কেটে নিয়ে আসছেন কৃষকরা। কণ্ঠে তাদের করিমের গান- ‘বন্দে মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে...’। হাওর ছেড়ে শহরে ফিরেও সেই একই সুর কানে এল, মাইক্রোবাসের ক্যাসেট প্লেয়ার থেকে ভেসে আসছে- ‘কেমনে চিনিবো তোমারে...’।

ক্যাবল-ইন্টারেন্টের প্রভাব, বহুবিদ সংস্কৃতির প্রবেশ ও আধিপত্যসহ সত্ত্বেও গ্রাম থেকে শহরে এখনো বেজে চলছে আবদুল করিম।

আরও পড়ুন:
‘কেমনে চিনিব তোমারে...’
শফির কণ্ঠে দেওয়ানের লেখা নতুন গান
বাউলদের প্রাণের মেলা
শাহ আবদুল করিমের দুঃখবোধ
আর গাইবেন না বাউল ইসলাম উদ্দিন

মন্তব্য

জীবনযাপন
Whose burden is Alexander Castle?

আলেকজান্ডার ক্যাসেল কার বোঝা?

আলেকজান্ডার ক্যাসেল কার বোঝা? বছরের পর বছর দাবির মুখেও সংস্কার হয়নি ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী আলেকজান্ডার ক্যাসেল। ছবি: নিউজবাংলা
ময়মনসিংহ শহরের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি আলেকজান্ডার ক্যাসেলের সামনের মাঠের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু করেছে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল। নাগরিক নেতারা এর প্রতিবাদে আন্দোলন করছেন।

বছরের পর বছর দাবির মুখেও সংস্কার হয়নি ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী আলেকজান্ডার ক্যাসেল বা লোহার কুঠি। কিন্তু এর চারপাশে শুরু হয়েছে দেয়াল নির্মাণের কাজ। এমন অবস্থায় সংস্কৃতিকর্মী, পরিবেশবাদী নেতা ও নাগরিকরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

সোমবার বিকেলে সরেজমিনে আলেকজান্ডার ক্যাসেলের সামনে গিয়ে দেখা যায়, গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল কর্তৃপক্ষ ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটির সামনের মাঠে নিজেদের স্কুলের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। অনেক মানুষ আলেকজান্ডার ক্যাসেল দেখতে এখানে এসে ইটের প্রাচীর দেখে মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছেন। নাগরিক নেতারা প্রাচীর নির্মাণ বন্ধ করার দাবি তুলেছেন।

স্কুলের প্রাচীর নির্মাণের বিষয়টি জানতে পেরে ‘আমরা ময়মনসিংহবাসী’র ব্যানারে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনের আয়োজন করে নাগরিকরা। এই নির্মাণকাজ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন তারা।

তাদের দাবি, এই মাঠটি খেলাধুলার জন্য ব্যবহার করে শিশু কানন কিন্ডার গার্টেন, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ও গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের শিক্ষার্থীরা। একই মাঠে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। বিকেল হলে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আলেকজান্ডার ক্যাসেল দেখার জন্য ভিড় জমান। এ ছাড়া স্থানীয় কিশোররাও মাঠটি খেলাধুলার কাজে ব্যবহার করে। সীমানা দেয়াল নির্মাণ করে ঐতিহ্যবাহী আলেকজান্ডার ক্যাসেলের সৌন্দর্য নষ্ট করা যাবে না। সীমানা দেয়াল নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে স্কুল কর্তৃপক্ষকে সরে আসতে হবে।

১৮৭৯ সালে ময়মনসিংহ জেলার শতবর্ষ উপলক্ষে আমন্ত্রণ জানানো হয় ব্রিটেনের তখনকার রাজা সপ্তম অ্যাডওয়ার্ডের স্ত্রী আলেকজান্ডাকে। তার নামেই এর নামকরণ হয় ‘আলেকজান্ডার ক্যাসেল’।

এর নির্মাতা মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সুকান্ত সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী। তিনি ব্রহ্মপুত্র নদের পারে শহরের আদালত এলাকায় প্রায় ২৭ একর জমির বাগানবাড়িতে সুরম্য এ অট্টালিকাটি নির্মাণ করেন।

আলেকজান্ডার ক্যাসেল কার বোঝা?

এটি তৈরিতে লোহার ব্যবহার বেশি হওয়ায় স্থানীয় লোকজনের কাছে এটি ‘লোহার কুঠি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে বর্তমানে এটি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

দ্বিতল ভবনের ছাদে অভ্র ও চুমকি ব্যবহার করে ভেতরটা ঠাণ্ডা রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। বহু গুণীজন ময়মনসিংহ সফরকালে এখানে এসে থেকেছেন। ১৯২৬ সালে সফরে এসে ভবনটিতে থেকেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একই বছর আসেন মহাত্মা গান্ধী। আরও এসেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ, কামাল পাশা, লর্ড কার্জন, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, ওয়াজেদ আলী খান পন্নীসহ অনেক গুণী ব্যক্তিত্ব।

বর্তমানে এ সীমানার ভেতর রয়েছে শিশু কানন কিন্ডার গার্টেন, ময়মনসিংহ গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটসহ মোট সাতটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। একটি সীমানা প্রাচীরের ভেতর সাতটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও এই জমিটি এখনও খাসজমি হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, ঐতিহ্যবাহী এ ভবনটি ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে জরাজীর্ণ অবস্থায় এখনও টিকে আছে। অযত্ন আর অবহেলায় ভেঙে গেছে মার্বেল পাথরের দুটি ভাস্কর্যের হাত। বাকি অংশে ময়লা জমেছে। দুর্ঘটনা এড়াতে ফটকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ লিখে একটি সাইনবোর্ড টানিয়েই ক্ষান্ত কর্তৃপক্ষ। বছরের পর বছর সংস্কারের আশ্বাস দিয়েও বাস্তবায়ন করা হয়নি। এর মধ্যে স্থাপনাটির সামনে দেয়াল নির্মাণ শুরু করে সৌন্দর্য পুরোপুরি নষ্টের পাঁয়তারা চলছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ নিউজবাংলাকে বলেন, কারো সঙ্গে কোনো সমন্বয় না করে ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি মেনে নেয়া যায় না। এর দায় জেলা প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। এই স্থাপনা বন্ধ করতে লাগাতার আন্দোলনের ডাক দেয়া হবে।

পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শিব্বির আহম্মেদ লিটন বলেন, ‘যারা প্রাচীর নির্মাণ করে পরিবেশ বিনষ্টের পাশাপাশি অর্থ হাতানোর চিন্তাভাবনা করছেন, তাদের উদ্দেশ্য কখনই সফল হবে না। দ্রুত নির্মাণাধীন দেয়াল ভেঙে ইট-বালু সরাতে হবে। ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক এই নিদর্শনকে কোনোভাবেই বিনষ্ট হতে আমরা দেব না।’আলেকজান্ডার ক্যাসেল কার বোঝা?ল্যাবরেটরি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আঞ্জুমান আরা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের স্কুলের মাঠের পাশের রাস্তা দিয়ে বহিরাগতরা দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করে। বেপরোয়া চলাচলে বিভিন্ন সময় স্কুল শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক আহত হয়েছেন। এ ছাড়া কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় স্কুলের ছাত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে মাঠের পাশে দেয়াল নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পরে তার ওপর গ্রিল দিয়ে বেষ্টনী দেয়া হবে।

তিনি বলেন, নাগরিকদের দাবির মুখে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসক শিগগিরই বিষয়টি সমাধানে আলোচনায় বসে সিদ্ধান্ত দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. জয়নাল আবেদীন খান বলেন, ‘সাতটি প্রতিষ্ঠানের সীমানাপ্রাচীর দিয়ে মাঠটিকে ভাগ করে নেয়া ঠিক নয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোটরসাইকেল চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাচীর নির্মাণ না করে সড়কটিতে গতিরোধকের ব্যবস্থা করা যেত।’

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ময়মনসিংহের কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আলেকজান্ডার ক্যাসেলটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমরা আবেদন করেছি এটি সংস্কারের জন্য। অধিদপ্তর থেকে নির্দেশনা পেলে সংস্কার করা হবে।’

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের বিষয়টি প্রথমে আমি অবগত ছিলাম না। বিষয়টি শুনে তা বন্ধ রাখতে বলেছি। পরবর্তী সময়ে এ সীমানায় অবস্থিত সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

মন্তব্য

জীবনযাপন
Fifty years later the monument got a mass grave

পঞ্চাশ বছর পর স্মৃতিস্তম্ভ পেল গণকবর

পঞ্চাশ বছর পর স্মৃতিস্তম্ভ পেল গণকবর
এসপি ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘দেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবর সংরক্ষণ এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে এ স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে।’

সিলেট নগরের রিকাবীবাজার এলাকার পুলিশ লাইনসের ভেতরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া অনেককে কবর দেয়া হয়েছিল। এতদিন অরক্ষিত অবস্থায় পড়েছিল গণকবরটি। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ।

‘স্মৃতি ৭১’ নামের এ স্মৃতিস্তম্ভটি রোববার উদ্বোধন করেন সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি (উপমহাপরিদর্শক) মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ ও জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন। জেলা পুলিশের উদ্যোগে এটি স্থাপন করা হয়।

এর নকশা করেছেন স্থপতি রাজন দাশ। তিনি বলেন, ‘আবহমানকাল ধরে এ বাংলার মৃত্যুপরবর্তী যে লৌকিকতা চর্চিত হয়ে আসছে, অর্থাৎ মাটির মানুষ মাটিতেই ফিরে যাবে, মাটিতেই রচিত হবে তার কবর, গোর বা সমাধি; সেই সমাধি বা কবরের একটি লোকস্থাপত্যধারা লক্ষ করা যায়। এই গণকবরের ওপর নির্মিত স্থাপত্যধারাটি সেই ধারাতেই অনুপ্রাণিত।’

এসপি ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘দেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবর সংরক্ষণ এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে এ স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে।’

বীর মুক্তিযােদ্ধা ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধে সিলেটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ বীর মুক্তিযােদ্ধাসহ অসংখ্য মানুষকে গণকবর দেয়া হয় এখানে।

রিকাবীবাজারের পাশের মুন্সিপাড়াসহ শহরের বিভিন্ন এলাকার বীর মুক্তিযােদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হত্যা করে ফেলে রাখে। তাদের মরদেহ এনে স্বজন ও পরিচিতজনরা পুলিশ লাইনসের ভেতর একটি ডোবায় গণকবর দেন। মুক্তিযুদ্ধের পর পরই গণকবরটি চিহ্নিত করা হয়। কতজনকে এখানে কবর দেয়া হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান কোথাও সংরক্ষিত নেই।

তবে কবর দেয়া আট শহীদের নাম-তথ্য জানিয়েছেন এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা। তারা হলেন সহকারী উপপরিদর্শক আবদুল লতিফ, হাবিলদার আবদুর রাজ্জাক, কনস্টেবল মােক্তার আলী, শহর আলী, আবদুস ছালাম, মাে. হানিফ ব্যাপারী, মনিরুজ্জামান ও পরিতােষ কুমার। তারা কোন থানায় ছিলেন তা জানা যায়নি।

এসব পুলিশ সদস্য ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল জিন্দাবাজার এলাকার তৎকালীন ন্যাশনাল ব্যাংকে (বর্তমানে সােনালী ব্যাংক) দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ব্যাংকের টাকা লুটের উদ্দেশ্যে পুলিশ সদস্যদের হত্যা করে। দুদিন পর তাদের পুলিশ লাইনসে কবর দেয়া হয়।

আরও পড়ুন:
বধ্যভূমি থেকে উদ্ধার দেহাবশেষ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন
দীপু মনির জবাবের ‘যোগ্য’ নয় বিএনপি
‘ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ না হলে মুক্তি মিলবে না’
ঢাবিতে ‘১৯৭১: অজানা গণহত্যা’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন
‘দেশকে চেনা যায়, এমন আইকনিক স্থাপনা তৈরি হবে’

মন্তব্য

জীবনযাপন
Big plans around Paharpur

পাহাড়পুর ঘিরে বিস্তর পরিকল্পনা

পাহাড়পুর ঘিরে বিস্তর পরিকল্পনা নওগাঁর ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার। ছবি: নিউজবাংলা
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য পাহাড়পুর এলাকায় ভালো যোগাযোগ ও আবাসিক ব্যবস্থাসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেয়া হবে।

নওগাঁর বদলগাছিতে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার পর্যটনবান্ধব করতে বিস্তর পরিকল্পনা নিয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

শুক্রবার দুপুরে পাহাড়পুর জাদুঘর মিলনায়তনে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারকে দর্শকবান্ধব করার লক্ষ্যে অংশীজনদের নিয়ে সভায় সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এ পরিকল্পনার কথা জানান।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর রাজশাহী ও রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় বগুড়া এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার পর্যটনবান্ধব করতে নানাবিদ পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। পাহাড়পুর ঘিরে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে মজবুত করারও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এই বিহার যথাযথ সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছে। পর্যটকদের বিহার সম্পর্কে ধারণা দেয়ার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। বিহার এলাকায় সুপেয় পানির অভাব ও উন্নত মানের হোটেল না থাকায় পর্যটকরা সমস্যায় পড়েন। এই সমস্যাও দ্রুত সমাধান করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য পাহাড়পুর এলাকায় ভালো যোগাযোগ ও আবাসিক ব্যবস্থাসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেয়া হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব রতন চন্দ্র পণ্ডিত।

বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য শহিদুজ্জামান সরকার ও ছলিম উদ্দিন তরফদার সেলিম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব মিল্টন কুমার রায়, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাঈনুল ইসলাম, বদলগাছির ইউএনও আল্পনা ইয়াসমিন, থানার ওসি আতিয়ার রহমান, পর্যটন পুলিশের পরিদর্শক সাজেদুর রহমান।

সভা শেষে প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ পাহাড়পুরে নবনির্মিত দি হেরিটেজ ক্যাফে নামের একটি আধুনিক হোটেলের উদ্বোধন করেন।

আরও পড়ুন:
পর্যটন মেলা ২ জুন থেকে
পর্যটনের জন্য জনগণকে ‘উদার হতে হবে’
বনজীবীদের সঙ্গে সুন্দরবনে হানি ট্যুরিজমের সুযোগ
ঈদে ৪৪৮৬ পর্যটক পেল সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ
শঙ্কা কাটিয়ে জাফলংয়ে আবারও পর্যটকের ঢল

মন্তব্য

p
উপরে