সুন্দরবনে বিলীন হতে পারে সুন্দরীগাছ: গবেষণা

সুন্দরবনে বিলীন হতে পারে সুন্দরীগাছ: গবেষণা

২০৫০ সালের মধ্যে লবণসহিষ্ণু ছোট গাছ (যেমন: গেওয়া, গরান) সুন্দরীগাছের জায়গা দখল করে নেবে। ফলে সুন্দরবনের ভারত অংশের মতো বাংলাদেশ অংশেও বিলীন হয়ে যেতে পারে সবচেয়ে বেশি কার্বন ধারণক্ষমতার সুন্দরীগাছ।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। সাগরের পানির লবণাক্ততা সহিষ্ণু গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ এই বনের সামনে এখন অতিরিক্ত লবণাক্ততাই বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া এ বনে অব্যাহতভাবে বাড়ছে লবণাক্ততা। বনের ভেতরে জমছে পলিও। এ অবস্থা চললে ২০৫০ সালের মধ্যে সুন্দরবনের পরিবেশে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটবে; বিলীন হতে পারে সুন্দরীগাছ।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার সরকারের নেতৃত্বে চলেছে গবেষণাটি। তার সহযোগী ছিলেন যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জেসন ম্যাথিউপউলস ও ড. রিচার্ড রিভ।

২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পরিচালিত গবেষণার ফল গত ১০ এপ্রিল ইকোলজিক্যাল সোসাইটি অফ আমেরিকা প্রকাশিত ইকোলজিক্যাল মনোগ্রাফস জার্নালে প্রকাশ হয়।

‘সলভিং দ্য ফোর্থ-কর্নার প্রবলেম: ফোরকাস্টিং ইকোসিস্টেম প্রাইমারি প্রোডাকশন ফ্রম স্পেশিয়াল মাল্টিস্পেসিস ট্রেইট-বেজড মডেলস’ শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়, সুন্দরবনের লবণাক্ততা ও পলি জমার পরিমাণ বর্তমানের তুলনায় ৫০ শতাংশ বাড়লে বনের কার্যক্ষমতা ২৯ শতাংশ কমে যাবে।

এতে গাছের গড় উচ্চতা প্রায় ৩৬ শতাংশ কমে যেতে পারে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়বে সুন্দরবনের প্রধান সুন্দরীগাছ। অতিরিক্ত লবণ ও পলির কারণে সুন্দরীগাছের উচ্চতা ও পাতায় খাদ্য উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমবে।

সুন্দরবনে বিলীন হতে পারে সুন্দরীগাছ: গবেষণা


এর পাশাপাশি অন্যান্য লবণসহিষ্ণু ছোট গাছ (যেমন: গেওয়া, গরান) সুন্দরীগাছের জায়গা দখল করে নেবে। ফলে সুন্দরবনের ভারত অংশের মতো বাংলাদেশ অংশেও বিলীন হয়ে যেতে পারে সবচেয়ে বেশি কার্বন ধারণক্ষমতার সুন্দরীগাছ।

বাংলাদেশ ও ভারতের অংশে থাকা সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশে বনের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের এই বনকে ১৯৯৭ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেসকো।

অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার সরকার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গত চার দশকে সুন্দরবনের লবণাক্ততা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। আর প্রতি বছর সুন্দরবনে ৯৬ হাজার টন পলি জমছে।’

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে লবণাক্ততা বাড়ছে এবং পলি জমছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে মিঠা পানির অসম বণ্টনের ফলেও সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।’

সংকট কাটাতে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমিয়ে সমুদ্রের পানি বৃদ্ধির হার সীমিত রাখার ওপর জোর দেন এ গবেষক। একই সঙ্গে তিনি নদীশাসন করে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে পানির সুষম বণ্টনের তাগিদ দেন।

সুন্দরবনে বিলীন হতে পারে সুন্দরীগাছ: গবেষণা


নিজেদের গবেষণা সম্পর্কে অধ্যাপক স্বপন কুমার বলেন, ‘বন বিভাগের উদ্যোগে সুন্দরবনের ভেতরে ১৯৮৬ সালে ১২০টি স্থায়ী স্যাম্পল প্লট স্থাপন করা হয়। আমরা ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এসব প্লট থেকে ২০ প্রজাতির ৪৯ হাজার ৪০৯টি উদ্ভিদের তথ্য সংগ্রহ করি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সুন্দরী, গেওয়া, গরান, পশুর, বাইন, সিংড়া ও কেওড়া। এই গাছগুলোর সঙ্গে পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্ক কেমন বা গাছগুলো কীভাবে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ায়, তা নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে।’

তিনি জানান, গবেষণার সময় গাছের চারটি বৈশিষ্ট্যের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে গাছের উচ্চতা বৃদ্ধি ও সালোকসংশ্লেষণ ক্ষমতা থেকে জানা গেছে, গাছের বেড়ে ওঠা বা পরিবেশ থেকে পুষ্টি সংগ্রহের ক্ষমতার বিষয়টি। এর বাইরে কাঠের ঘনত্ব ও পাতার পানি ধারণক্ষমতা থেকে জানা যায়, গাছগুলো প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য কতটা সহন ক্ষমতাসম্পন্ন।

অধ্যাপক স্বপন কুমার জানান, গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বনের অবস্থা তুলনামূলকভাবে অন্য অংশের চেয়ে ভালো ও অপেক্ষাকৃত বেশি কার্যক্ষম।

তিনি বলেন, ‘গত কয়েক দশকের ধারাবাহিকতায় যদি সুন্দরবনের মাটির লবণাক্ততা ও পলিস্তর বাড়তে থাকে, তাহলে ২০৫০ সাল নাগাদ এই বনের প্রতিবেশ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হবে। লবণাক্ততা ও পলি জমার পরিমাণ এই সময়ের চেয়ে ৫০ শতাংশ বাড়লে সুন্দরবনের মোট কার্যক্ষমতা ২৯ শতাংশ কমে যাবে।’

সুন্দরবনে বিলীন হতে পারে সুন্দরীগাছ: গবেষণা

গবেষণায় সুন্দরবনের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সবচেয়ে লম্বা গাছ পাওয়া গেছে। লবণাক্ততা ও পলি বাড়লে এ গাছগুলো টিকে থাকার জন্য উচ্চতা কমিয়ে আনবে। এতে করে গাছের গড় উচ্চতা প্রায় ৩৬ শতাংশ কমে যেতে পারে। এ সময়ে গাছগুলোর কাঠের ঘনত্ব এবং পাতার পানি ধারণক্ষমতার মাত্রা বেড়ে যাবে।

সুন্দরবনের গাছের প্রজাতিগুলোর মধ্যে সুন্দরীগাছ সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, ‘অন্যান্য গাছের তুলনায় সুন্দরীর লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা কম। ফলে এই প্রজাতি সবচেয়ে সংকটে পড়বে।’

অধ্যাপক স্বপন কুমার সরকার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গবেষণায় সম্পূর্ণ নতুন সমন্বিত বৈজ্ঞানিক এবং গাণিতিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। এতে সুন্দরবনের উদ্ভিদের সংখ্যা, অবস্থান ও শরীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের (যেমন: লবণাক্ততা, পলির মাত্রা, পুষ্টির উপাদান) সঙ্গে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, অভিযোজিত হয়, সেটি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।’

আরও পড়ুন:
অনন্ত যৌবনের অচিন বৃক্ষ
হাত খরচের টাকায় বৃক্ষরোপণ
পর্যটক ফিরবে তো?
নারকেল গাছ থেকে দিনমজুরের মরদেহ উদ্ধার
নবজাতকের আগমনে চারা উপহার

শেয়ার করুন

মন্তব্য

দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম দেশনায়ক

দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম দেশনায়ক

২০১৯ সালে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি

বাংলাদেশের ১৩ জন প্রধানমন্ত্রীর আর কেউ এত দীর্ঘ সময় দেশকে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ পাননি। এমনকি দক্ষিণ এশিয়াতেও আর কোনো রাজনীতিবিদের জীবনে এ সুযোগ আসেনি। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৭ বছর দেশ শাসন করেছেন। হিসেবের খাতা বলছে, প্রায় ১৮ বছর দেশ পরিচালনা করছেন শেখ হাসিনা। 

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা যখন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, তখন তার বয়স ৪৯ বছর। আর ২০১৯ সালে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেয়ার সময় তিনি ৭২ বছরের এক অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক।

বাংলাদেশের ১৩ জন প্রধানমন্ত্রীর আর কেউ এত দীর্ঘ সময় দেশকে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ পাননি। এমনকি দক্ষিণ এশিয়াতেও আর কোনো রাজনীতিবিদের জীবনে এ সুযোগ আসেনি। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৭ বছর দেশ শাসন করেছেন। হিসেবের খাতা বলছে, প্রায় ১৮ বছর দেশ পরিচালনা করছেন শেখ হাসিনা।

বিশ্লেষকরা বলেন, দীর্ঘ সময় ও টানা নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো, একটি ভিশন বা স্বপ্নের পথে দেশকে পরিচালিত করতে পারা। দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং মানব সম্পদের যে অগ্রগতি হয়েছে, তা সারা বিশ্বে স্বীকৃত।

অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়নচিন্তক কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ এ বিষয়ে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে যে চেতনায়, সেই চেতনাটা হচ্ছে, সবাইকে নিয়ে দেশটা এগিয়ে যাবে। এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত চিন্তা। সেটি শেখ হাসিনা ধারণ করেন। সেটা ২০০৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, এই দেশে একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র তৈরি করা হবে। কল্যাণ রাষ্ট্র মানে সবাইকে নিয়ে।’

বৈশ্বিক মহামারি করোনার মধ্যেও যে কটা দেশ এগিয়ে আছে, তার একটা বাংলাদেশ বলে জানান তিনি। বলেন, ‘এসডিজির কিছু কিছু লক্ষ্য অর্জনেও আমরা সেরার মধ্যে আছি। সে জন্য প্রধানমন্ত্রীকে এসডিজি সলিউশন নেটওয়ার্ক অগ্রগতি সম্মাননা দেয়া হয়েছে।’

কাজী খলীকুজ্জমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্বে অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক অনেক সূচকেও অগ্রগতি এসেছে।

করোনা শুরুর আগে দেশে দরিদ্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, প্রত্যাশিত যে জীবন একজন মানুষের, সেটার মান বেড়েছে, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। করোনা শুরু হওয়ার আগের বছর আমরা ৮ দশমিক ২ শতাংশ অর্জন করেছি। দক্ষিণ এশিয়ায় এসব ক্ষেত্রে আমার সবার চেয়ে এগিয়ে আছি।’

২০১৬ থেকে টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘এর মূল কথাটা হচ্ছে কাউকে বাদ দেয়া যাবে না। তার মানে বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে, দুর্নীতি হবে না, বাস্তবায়ন স্বচ্ছ হবে।’

দুর্নীতি, বৈষম্য কিংবা বাস্তবায়নের গাফিলতি, গ্রামের উন্নয়ন-এই বিষয়গুলো আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে চিহ্নিত করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করেন তিনি।

বলেন, ‘তার মানে হচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছি। তার সঙ্গে কিছু সমস্যা থাকবে এবং সেই সমস্যা নতুন করে আবার সৃষ্টি হতে পারে, কিন্তু সাধারণত সরকারের লোকজন এসব স্বীকার করে না। এটা তার দূরদর্শী চিন্তার একটা দিক। যে সমস্যাগুলো আছে, যে সমস্যাগুলো আসতে পারে, সেগুলো ২০১৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে চিহ্নিত করা হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশকে অন্য উচ্চতায়’ দেখতে পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার যে জাতিসংঘের স্বীকৃতি, সেটা আমরা পেয়েছি। আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, জিডিপির পরিমাণ বেড়েছে, আকার বেড়েছে। বাংলাদেশের ভেতরে যে উন্নয়ন, মেগাপ্রজেক্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে, বলা যায় বর্তমান যে বাংলাদেশ- এটির রূপকার বা এটি বাস্তবায়ন করা সবই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান।’

দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম দেশনায়ক

শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ ভাবমূর্তি বদলে গেছে বলেও মনে করেন এই অধ্যাপক।

তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের যে পরিচয়টা ছিল, বিশেষ করে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি অথবা ক্ষুধা দারিদ্র্যপীড়িত একটি রাষ্ট্র মনে করা হতো, সেই ভাবমূর্তি উনি পুরোপুরি মুছে দিতে পেরেছেন।’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ ‍মজিবুর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’- এটাকে অনুসরণ করেছেন বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কূটনৈতিক সাফল্য পেয়েছেন বলে মনে করেন এ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

তিনি বলেন, ‘গত ২০ বছর ধরে বা স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বায়নের যে ব্যাপক প্রসার ঘটেছে, সেখানে একটি দেশকে শক্তিশালী করার জন্য যে ধরনের বিনিয়োগ, যে ধরনের বাণিজ্য, যে ধরনের রেমিট্যান্স অপরচুনিটি তৈরি করা দরকার ছিল, সেগুলো তিনি করেছেন। এবং তার নেতৃত্বেই এসব হয়েছে।’

বহির্বিশ্বের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি’কেও বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন।

তিনি বলেন, ‘শক্তিশালী রাষ্ট্র বলি বা মধ্য পর্যায়ের শক্তি, সব দেশের সঙ্গে একটা ভারসাম্যপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে বাংলাদেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা যে দেশগুলো আছে, আমরা যদি পশ্চিমা দেশগুলোর কথা বলি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা যুক্তরাজ্য এবং তাদের সঙ্গে ভীষণভাবে ঘনিষ্ঠ ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ-এর সহযোগিতা নিয়ে একদিকে বাংলাদেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা।

‘অন্যদিকে, ভারত এবং চীনের সহায়তা নেয়া, বাংলাদেশের অনেকগুলো মেগা প্রজেক্টে চীন এবং ভারতের যুক্ততা আছে, সেটাও একটা সুযোগ। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের উন্নয়নের সঙ্গে জাপান যুক্ত আছে। তারা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বিপাক্ষিক দাতা রাষ্ট্র। ফলে জাপানের ইনভলবমেন্ট এবং রাশার মতো একটা দেশকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টে ইনভলব করা– এগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং কার্যকর ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক।’

সরকারের ধারাবাহিকতার কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুযোগ পেয়েছেন দেশকে এগিয়ে নেয়ার। আর এ কারণেই বিশ্বসভায় বাংলাদেশকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয় বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক দেলোয়ার হোসেন।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে এখন বহির্বিশ্বে কাউন্ট করা হয়, হিসেব করা হয়। বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ প্লেয়ার, দক্ষিণ এশিয়ার ভেতরে বা উন্নয়নশীল বিশ্বে। শেখ হাসিনা অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন। ভারতের সঙ্গে সমুদ্র জলসীমা বিরোধ তিনি নিষ্পত্তি করেছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে জলসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি করেছেন, ভারতের সঙ্গে স্থলসীমা বিরোধ, সেটি নিষ্পত্তি হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিকে তিনি শক্তিশালী করেছেন। উনি জলবায়ু কূটনীতিকে শক্তিশালী করেছেন।’

মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বের একটি বড় দিক বলে মনে করেন তিনি।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘তিনি তাদের শুধু আশ্রয়ই দেননি, তাদের প্রত্যাবাসনে কাজ করছেন। এ নিয়ে সারা বিশ্বে কথা বলছেন, এবারও জাতিসংঘের ভাষণে বিষয়টি তুলে ধরেছেন সংকট মোকাবিলায়।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শাসনামলের ১৮ বছরে বড় ধরনের কোনো ক্ষোভ, জনরোষ দেখা যায়নি। রাজনৈতিক সভা, সেমিনার, সরকারের সমালোচনা থাকলেও বড় কোনো কর্মসূচি চোখে পড়েনি।

দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম দেশনায়ক
১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মানুষ কখন বিক্ষোভ করে, মানুষ কখন গণরোষে উদ্বুদ্ধ হয়? যখন আপনার চাহিদা পূরণ হবে না, যখন আপনি খেতে পাবেন না, যখন আপনার মাথার ওপর ছাদ থাকবে না, যখন আপনার সন্তানদের লেখাপড়া হবে না, যখন মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাচ্ছে, জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে যাচ্ছে, তখনই মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে আনরেস্ট তৈরি করে।’

তিনি বলেন, মানুষের যখন মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়, তখন সে আসলে কোনো প্রকার বিক্ষোভে যায় না।

বঙ্গবন্ধুর অধরা স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথেই তার কন্যা শেখ হাসিনা হাঁটছেন বলে মন্তব্য এই শিক্ষকের। তিনি বলেন, ‘টানা তিন দফায় ক্ষমতায় আছেন প্রধানমন্ত্রী, আমার মনে হয়েছে বঙ্গবন্ধুর যে পরিকল্পনা ছিল বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ক্ষুধাহীন, দারিদ্র্যহীন একটা রাষ্ট্র তৈরি করা, যেখানে সবাই মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে – মূলত এটাই তিনি ধারণ করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা হিসেবে। আসলে তো তার শরীরে বঙ্গবন্ধুর রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। সেটিকে তিনি ধারণ করেছেন।’

প্রধানমন্ত্রীর ‘ভারসাম্যপূর্ণ রাজনীতি’কে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার একটি বিশেষ দিক বলে মনে করেন গোবিন্দ চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘আমাদের পার্শ্ববর্তী দুটো দেশ, ভারত ও চীন, আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাদের যে প্রভাব, এ প্রভাবের মধ্যেও ব্যালেন্সড কন্টেইনমেন্টের মধ্য দিয়ে তিনি উভয়পক্ষকে ডিল করে সামনের দিকে এগুচ্ছেন।’

এ কারণেই শেখ হাসিনা দেশের গণ্ডি ছাপিয়ে বিশ্বনেতা হয়ে উঠছেন বলেও মন্তব্য তার।

গোবিন্দ চক্রবর্তী বলেন, ‘পররাষ্ট্রনীতিতে তার যে দক্ষতা এবং তিনি যেভাবে এ জায়গাটা নিয়ন্ত্রণ করছেন বা সামাল দিচ্ছেন, আমার ধারণা এই কারণেই তিনি বৈশ্বিক পরিসরে একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আর্বিভূত হতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি এখন শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নন, সাউথ এশিয়ার দু-একজনের নাম যদি বলতে হয়, বিশ্বনেতৃত্বের মধ্যে যারা আছেন, শেখ হাসিনার নাম, কিন্তু কোনোভাবে পেছনে আসবে না।’

বিশ্বে দীর্ঘ সময় ধরে অনেকেই ক্ষমতায় থাকলেও মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর যে কর্মপ্রয়াস সেটাই শেখ হাসিনাকে সবার চেয়ে আলাদা করেছে বলে মনে করেন তিনি।

এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র দূরীকরণ, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন – এই যে কতগুলো জায়গা, এই জায়গাগুলো চিন্তাই করা যায় না। আমরা তো লম্বা সময় ধরে অনেককেই ক্ষমতায় দেখেছি, কিন্তু মানুষের উন্নয়ন চিন্তাকে কেন্দ্রে নিয়ে, মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হবে, যে কথাটা তিনি বারবার বলেন, এটা তিনি শুধু বলেন না, আন্তরিকভাবে ধারণ করেন।’

আরও পড়ুন:
অনন্ত যৌবনের অচিন বৃক্ষ
হাত খরচের টাকায় বৃক্ষরোপণ
পর্যটক ফিরবে তো?
নারকেল গাছ থেকে দিনমজুরের মরদেহ উদ্ধার
নবজাতকের আগমনে চারা উপহার

শেয়ার করুন

জামায়াত ছাড়তে প্রস্তুত তারেক, খালেদার মতের অপেক্ষা

জামায়াত ছাড়তে প্রস্তুত তারেক, খালেদার মতের অপেক্ষা

জামায়াতের মানবতাবিরোধী অপরাধী নেতা প্রয়াত গোলাম আযমের সঙ্গে এক ইফতার মাহফিলে বেগম খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন নেতা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের বয়স তো কম হয়নি। অনেক কিছু চাইলেও বলতে পারি না। দলের সেই স্পিরিট এখন নেই। তার একটা মূল কারণ মা-ছেলের দ্বন্দ্ব। জামায়াতকে ছাড়তে না পারার জন্যও এটাই মূল কারণ। …ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (তারেক রহমান) জামায়াতকে ছাড়ার ব্যাপারে প্রস্তুত। তবে বেগম খালেদা জিয়ার থেকেই কোনো সংকেত পাওয়া যাচ্ছে না।’

২২ বছরের জোটসঙ্গী জামায়াতকে ছাড়ার ব্যাপারে বিএনপি এক ধাপ আগালে আরেক ধাপ পেছায়। জোট আর রাখা হবে না, এ বিষয়ে জামায়াতকে চিঠি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও আর আগায়নি বিএনপি।

তবে এবার বিষয়টি নিয়ে বিএনপিতে দাবি আরও জোরালো হচ্ছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে দলের কৌশল নির্ধারণে শীর্ষ থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে আবারও কথা হচ্ছে এ বিষয়ে। জোট থেকে স্বাধীনতাবিরোধী দলটিকে বের করে দিতে জোর দাবি তুলেছেন নেতারা।

ওই বৈঠকে উপস্থিত দলের একাধিক নেতা নিউজবাংলাকে জানিয়েছেন, নেতারা দাবি তোলার পরে যুক্তরাজ্য থেকে ভার্চুয়ালি যোগ দেয়া তারেক রহমান কোনো যুক্তি খণ্ডন করেননি; বরং এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে খালেদা জিয়ার কাছ থেকে সংকেত পাওয়া গেলেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবেন। তিনি এ বিষয়ে প্রস্তুত আছেন।

দলের কোনো পর্যায়েই জামায়াতের প্রতি সহানুভূতি নেই, তার পরও কেন জোট- এমন প্রশ্নে দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য নিউজবাংলাকে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে জানান, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান একক সিদ্ধান্তে আসতে না পারাই এর কারণ।

তিনি বলেন, ‘বিএনপির রাজনীতি করি, আমাদের বয়স তো কম হয়নি। অনেক কিছু চাইলেও বলতে পারি না। দলের সেই স্পিরিট এখন নেই। তার একটা মূল কারণ মা-ছেলের দ্বন্দ্ব। জামায়াতকে ছাড়তে না পারার জন্যও এটাই মূল কারণ।‘

তিনি বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (তারেক রহমান) জামায়াতকে ছাড়ার ব্যাপারে প্রস্তুত। তবে বেগম খালেদা জিয়ার থেকেই কোনো সংকেত পাওয়া যাচ্ছে না।‘

এই নেতার বক্তব্যের বিষয়ে স্থায়ী কমিটির আরেক নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা আমাদের নেতা-কর্মীদের নিয়ে হাইকমান্ডের সঙ্গে বসছি। বাতাসে খবর ওড়ে। উড়ো হোক আর সঠিক হোক, সময়মতো জানবেন।’

জামায়াত ত্যাগের তিন যুক্তি

বিএনপি নেতারা জানান, দলের শীর্ষপর্যায়ের বৈঠকে জামায়াত ত্যাগের পেছনে তিনটি যুক্তি তুলে ধরেছেন নেতারা।

প্রথমত, তারা মনে করছেন, জামায়াতকে ছাড়তে পারলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের পাশাপাশি প্রধান প্রতিবেশী ভারতকেও আস্থায় নেয়া যাবে।

দ্বিতীয়ত, বিএনপির সঙ্গে জামায়াত না থাকলে উদার ও বামপন্থি দলগুলোকে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গঠন করা যাবে; যাদের নিয়ে আগামী নির্বাচনের আগে আন্দোলনে যেতে চায় বিএনপি।

তৃতীয়ত, খালেদা-নিজামী বলে আওয়ামী লীগ নেতারা নেতিবাচক প্রচার চালায় তাও দূর করা যাবে।

দলটির নেতাদের মতে, বৈশ্বিক রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানের পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতি থেকেও বিএনপির ফায়দা নেয়ার সুযোগ আছে।

ওই ঘটনার পর ইসলামপন্থি শক্তির উত্থানের আশঙ্কায় এ অঞ্চলের দেশগুলো নতুন করে হিসাব-নিকাশ কষছে বলে মনে করছেন তারা।

ফলে ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার কূটনৈতিক কৌশল নিয়ে অগ্রসর হতে চাইছে বিএনপি। দলটির নেতাদের মতে, ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যমূলক সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলার কারণেই বর্তমান সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে। তাই জামায়াতকে এখনই দূরে রেখে বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তারা।

জানতে চাইলে বিএনপির ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি’-এর সদস্য শামা ওবায়েদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে জোট থাকা না থাকার বিষয়ে দলের হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নেবে। এটা নিয়ে নেতারা তাদের পারসেপশন জানিয়েছেন। মাঠপর্যায়ের নেতাদেরও একটা দাবি বারবার আসছে। তবে সেটার সিদ্ধান্ত এখনও নেয়া হয়নি।’

জামায়াতকে ছাড়লে বিএনপি লাভবান হচ্ছে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘লাভ-লোকসান ঠিক বলা যাচ্ছে না। তবে বৈশ্বিক রাজনীতির পাশাপাশি তালেবানের উত্থানের পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন রাজনীতির সঙ্গে অবশ্যই আমাদের সমন্বয় করতে হবে।’

জামায়াত ছাড়তে প্রস্তুত তারেক, খালেদার মতের অপেক্ষা

মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসি কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি

সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেও অপেক্ষায় বিএনপি

চলতি বছরের শুরুর দিকে বিএনপির বিষয়ে স্থায়ী কমিটির এক সভায় জামায়াত ছাড়ার প্রস্তাব রাখা হয়। সে সভায় ছিলেন তারেক রহমানও।

সেখানে জামায়াতকে জোটে রাখা নিয়ে বিএনপির লাভ-লোকসান নিয়ে রীতিমতো তর্ক-বিতর্কও হয়।

বৈঠকে তিন নেতা খন্দকার মোশারফ হোসেন, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জামায়াতকে বের করে দেয়ার পরামর্শ দেন। তাদের পরামর্শে তারেক রহমানের সমর্থন ছিল।

পরে স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে বিষয়টি সমন্বয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়।

দলের স্থায়ী কমিটির এক নেতা সে সময় নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে নিউজবাংলাকে জানান, তারা জামায়াতকে ত্যাগ করবেন। আর এই সিদ্ধান্ত কেন, তার কারণ উল্লেখ করে চিঠিও প্রস্তুত হচ্ছে।

তিনি তখন বলেন, ‘বারবার স্থায়ী কমিটি থেকে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদের প্রস্তাব করা হচ্ছিল। সেটা নিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছিল।… জামায়াতকে নিয়ে আমরা আর এগোচ্ছি না। তারা তো শুধু ব্যবসা বোঝে, মুনাফা খোঁজে।’

তবে পরে সেই সিদ্ধান্ত আগের মতোই ঝুলিয়ে রাখে বিএনপি।

এরপর গত ৪ সেপ্টেম্বর শনিবার দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জামায়াতকে দূরে রাখার কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা ওঠে।

জামায়াত-বিএনপির রসায়ন

জামায়াতের সঙ্গে বিএনপি জোটের আলোচনা হয়েছিল ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগেই। জামায়াত নেতা মুজিবুর রহমানের লেখা একটি বইয়ে উল্লেখ আছে, তারা সে সময় ১০০টি আসন চেয়েছিলেন বিএনপির কাছে, কিন্তু খালেদা জিয়া রাজি না হওয়ায় জোট আর হয়নি। পরে অঘোষিতভাবে ৩৫টি আসনে জামায়াতকে সমর্থন দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বিনিময়ে তারাও দেশের বাকি আসনগুলোতে বিএনপির হয়ে কাজ করেছে।

১৯৯৬ সালে বিএনপি ও জামায়াত পুরোপুরি আলাদা নির্বাচন করে। তখন ভরাডুবি হয় জামায়াতের। তারা জেতে মাত্র তিনটি আসনে। এরপর বিএনপি ও জামায়াত একে অপরের গুরুত্ব বুঝতে পারে।

তবে ২০০১ সালে এই জোট কার্যকর প্রমাণ হলেও পরে তা বিএনপির জন্য বোঝা হিসেবেই দেখা হয় নানা কারণে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় খুনি বাহিনী আলবদরের দুই শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদকে মন্ত্রিত্ব দিয়ে সমালোচিত হয় বিএনপি।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি দেশে জোরালো হয়ে ওঠে আর স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি ভোটের ময়দানে নেমে প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ভোট শেষে ভরাডুবির পর কারণ অনুসন্ধানে বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতাদের দিয়ে ১০টি কমিটি গঠন করে। তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে এর মধ্যে ৯টি কমিটি জামায়াত ত্যাগের সুপারিশ করে, কিন্তু ১২ বছরেও সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি বিএনপি।

২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিএনপির নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ও সরকার পতনের দাবিতে আন্দোলনে যে নজিরবিহীন সহিংসতা হয়, তার পেছনেও জামায়াতকে দায়ী করা হয়। সে সময় জামায়াতের সহিংস হয়ে ওঠার পেছনে আরও একটি কারণ ছিল।

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দলের শীর্ষ বেশ কয়েকজন নেতার বিচার ঠেকাতেও মরিয়া ছিল দলটি। সেটি বিএনপির দাবি না থাকলেও সে সময় দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নিজামী, মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তিও চান।

তবে সে সময় তো বটেই, এখনও নানা ঘরোয়া আলোচনায় সুযোগ পেলেই বিএনপির প্রায় সব পর্যায়ের নেতারাই জামায়াতকে পরিত্যাগের দাবি তোলেন।

দশম সংসদ নির্বাচনের পর একটি বিদেশি সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়া বলেন, জামায়াতের সঙ্গে তাদের জোট কৌশলগত। সময় এলেই তিনি জামায়াতকে ত্যাগ করবেন।

এসব ঘটনায় আবার জামায়াত মনঃক্ষুণ্ন হয় বিএনপির প্রতি। যদিও তাদের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য আসেনি।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি ঐক্যফ্রন্ট নামে নতুন জোট গড়ে তোলার পরও জামায়াতের সঙ্গে জোট আর থাকবে কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। খালেদা জিয়া কারাগারে থাকা অবস্থায় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা হয়ে ওঠা ড. কামাল হোসেন প্রকাশ্যেই বলেন, জামায়াত আছে জানলে তারা জোটেই যেতেন না।

আরও পড়ুন:
অনন্ত যৌবনের অচিন বৃক্ষ
হাত খরচের টাকায় বৃক্ষরোপণ
পর্যটক ফিরবে তো?
নারকেল গাছ থেকে দিনমজুরের মরদেহ উদ্ধার
নবজাতকের আগমনে চারা উপহার

শেয়ার করুন

দেশে জলাতঙ্কে মৃত্যু কমেছে ৭০ শতাংশ

দেশে জলাতঙ্কে মৃত্যু কমেছে ৭০ শতাংশ

জলাতঙ্ক রোগ নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা অনেক বেড়েছে। ছবি: নিউজবাংলা

জলাতঙ্ক রোগে মৃত্যু অনিবার্য হলেও এ রোগ শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে ভালো সমাধান কুকুরে নিয়মিত জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকাদান। সেই টিকা কার্যক্রমে গতি বাড়িয়েছে সরকার।

যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা রিজিয়া বেগম এক মাস আগে বাড়ির পোষা বিড়ালের আঁচড় খেয়েছিলেন। জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে দেশের সবচেয়ে বড় জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল কেন্দ্র মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে যান তিনি। চিকিৎসকের পরার্মশে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে টিকাও নেন।

রিজিয়া বেগম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘খাবার দিতে গিয়ে পোষা বিড়াল আঁচড়ে দেয়। হাসপাতালের চিকিৎসক এক ডোজ টিকা দিয়েছেন। আরও তিন ডোজ টিকা দিতে হবে।’

জলাতঙ্ক রোগ নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা অনেক বেড়েছে। কুকুর ও বিড়ালে কামড় দিলে আগে গ্রামের মানুষ চিকিৎসকের কাছে আসত না। যেত ঝাড়ফুঁক করা কবিরাজের কাছে। এখন সেই চিত্রের পরিবর্তন এসেছে। সেই সঙ্গে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে সরকারের টিকা কার্যক্রমের গতি বেড়েছে। ১০ বছরে জলাতঙ্কে মৃত্যুর হার কমেছে ৭০ শতাংশ।

জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচির তথ্য বলছে, ২০১১ সালে সারা দেশে কুকুরের আঁচড় বা কামড়ের শিকার হন ১ লাখ ২৯ হাজার ৪৪৪ জন মানুষ। এর মধ্যে জলাতঙ্কে মারা যান ৮২ জন। একই সময়ে ৪৫ হাজার ৬৫৫টি কুকুরকে টিকা দেয়া হয়।

এরপর থেকে কুকুরের জলাতঙ্ক টিকাদান বাড়ানোর ওপর জোর দেয়ায় কমতে থাকে মৃত্যু। গত বছর ২০২০ সালে ২৬ জন মারা যায় জলাতঙ্কে। সে হিসেবে ১০ বছরে জলাতঙ্কে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৭০ শতাংশ কেমেছে।

এ বছরের শুরু থেকে জুন পর্যন্ত জলাতঙ্কে প্রাণ গেছে ১১ জনের।

এই কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলাতঙ্ক রোগে মৃত্যু অনিবার্য হলেও এ রোগ শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে ভালো সমাধান কুকুরে নিয়মিত জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকাদান। সেই টিকা কার্যক্রমে গতি বাড়িয়েছে সরকার।

গবেষণা বলছে, জলাতঙ্ক আক্রান্তদের ৭০ ভাগই পুরুষ। আবার আক্রান্তদের ৪৭ ভাগ শিশু, যাদের বয়স ১৫ বছরের কম। আক্রান্তদের ৮২ ভাগই গ্রামে থাকেন এবং ৯০ ভাগ কুকুরের কামড়ে সংক্রমিত। বিড়াল, শেয়াল ও বেজি দ্বারা সংক্রমিত জলাতঙ্কের হার যথাক্রমে ৬ শতাংশ, ৩ শতাংশ ও ও ১ শতাংশ। প্রাণীর কামড়ে আক্রান্তের হার ৯৫ শতাংশ এবং আঁচড়ে ৫ শতাংশ।

দেখা গেছে, আক্রান্তদের ৭৮ ভাগই আধুনিক চিকিৎসা নেন না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ৯৬ শতাংশ জলাতঙ্ক সংক্রমণের জন্য কুকুর দায়ী। কুকুর নিধন নয়, তাদের গণহারে টিকা প্রদান, অভিভাবকত্ব প্রসারণ, জন্ম নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণের প্রধান সমাধান।

মহাখালীতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুকুর-বিড়ালের আঁচড় ও কামড় খেয়ে অনেক রোগী ভিড় করছেন এই হাসপাতালে। আগের তুলনায় চাপ কমলেও রোগী সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। বর্তমানে দৈনিক ৫০০ এর বেশি রোগী আসছেন সেবা নিতে। জরুরি বিভাগের পাশেই জলাতঙ্কের টিকা নিতে আসা মানুষের দীর্ঘ লাইন। অনেকে প্রাণীর আক্রমণের শিকার হয়ে, আবার অনেকে বিভিন্ন ল্যাবে কাজ করায় সচেতনভাবে টিকা নিতে এসেছেন।

হাসপাতালের দেওয়া তথ্য মতে, ২০১১ সাল থেকে এ বছরের মে পর্যন্ত এই হাসপাতালে ৬ লাখ ২১ হাজার ৬৪৭ জন জলাতঙ্কের চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে চলতি বছরের মে পর্যন্ত সেবা নিয়েছেন ২৬ হাজারের বেশি। অন্যদিকে, গত দশ বছরে এই হাসপাতালে জলাতঙ্কে মৃত্যু কমেছে ৮১ শতাংশ। ২০০৯ সালে সর্বোচ্চ ১০৯ জনের মৃত্যু হয়। গত বছর মারা যায় ২০ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১০ সালের আগে প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার মানুষ জলাতঙ্ক রোগে হয়ে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতেন। দশ বছর পর সেই সংখ্যা ৭০ শতাংশ কমে এসেছে। এ বছর জলাতঙ্কে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩০, গত বছরে ছিল ২৬ এবং তার আগের বছর ২০১৯ সালে ছিল ৫৭ জন।

দেশে জলাতঙ্কে মৃত্যু কমেছে ৭০ শতাংশ

অসচেতনতা, দারিদ্র্য, রাস্তায় উদ্বাস্তু কুকুরের সংখ্যাধিক্য এবং পোষা কুকুরের টিকা নিশ্চিতকরণে অবহেলার কারণে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে এখনও বেশি। অর্থনৈতিক ক্ষতি, উচ্চমাত্রার স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং মৃত্যুহার বিবেচনায় জলাতঙ্কে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বছরে ৪ লাখের বেশি মানুষ কুকুর, বিড়াল, শেয়াল ও বানরের কামড় বা আঁচড়ের শিকার হয়, যাদের বেশির ভাগই ১৫ বছর বয়সের নিচের শিশু।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, ২০১০ সালের আগে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় আড়াই হাজার মানুষ জলাতঙ্কে প্রাণ হারাত। গবাদি প্রাণীর মৃত্যুর সঠিক পরিসংখ্যান এখনও অজানা। আনুমানিক সংখ্যা ২৫ হাজার, যার অর্থনৈতিক মূল্য অপরিসীম।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার জুনোটিক ডিজিজ কন্ট্রোল অপারেশন প্ল্যানের অধীনে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে জলাতঙ্কমুক্ত করার লক্ষ্যে ২০২০ সাল থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল কর্মসূচি বাস্তবায়ন চলছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ কার্যক্রমের আওতায় সারা দেশে এক রাউন্ড ব্যাপক হারে কুকুর টিকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দেশের ছয়টি জেলার সকল উপজেলায় তিন রাউন্ড এবং ১৬টি জেলায় দুই রাউন্ড টিকার কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে। এভাবে টিকাপ্রাপ্ত মোট কুকুরের সংখ্যা ২১ লখ ৩৮ হাজারেরও বেশি। এ ছাড়া জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল কেন্দ্র রয়েছে ৬৭টি। এসব কেন্দ্রে প্রতিবছর বিনা মূল্যে ৪ লাখের বেশি রোগীকে টিকা দেয়া হচ্ছে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, ব্যাপক হারে টিকাদান নিশ্চিত করলে মানুষ ও কুকুর উভয়ই নিরাপদ থাকবে। তবে প্রাথমিক লক্ষণ দেখে কুকুরে জলাতঙ্ক সংক্রমিত হয়েছে কি না বোঝা অনেক কঠিন। এ জন্য সচেতনতার বিকল্প নেই।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পরিচালক ডা. মিজানুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, জলাতঙ্ক রোগে মৃত্যু অনিবার্য হলেও এ রোগ শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। এই রোগ প্রতিরোধের সর্বোৎকৃষ্ট সমাধান কুকুরে নিয়মিত জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকাদান। জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে ৭০ ভাগকে কুকুরকে টিকার আওতায় আনা গেল সব কুকুরের শরীরে সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ফলে জলাতঙ্ক ভাইরাস কুকুর থেকে কুকুরে কিংবা মানুষে সংক্রমিত হতে পারে না।

আরও পড়ুন:
অনন্ত যৌবনের অচিন বৃক্ষ
হাত খরচের টাকায় বৃক্ষরোপণ
পর্যটক ফিরবে তো?
নারকেল গাছ থেকে দিনমজুরের মরদেহ উদ্ধার
নবজাতকের আগমনে চারা উপহার

শেয়ার করুন

মরেও গিনেস রেকর্ডে ঠাঁই হলো রানির

মরেও গিনেস রেকর্ডে ঠাঁই হলো রানির

বিশ্বের সবচেয়ে ছোট গরু রানি

সোমবার রাত ১১টার দিকে সাভারে চারিগ্রাম এলাকার শেকড় অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী কাজী মো. আবু সুফিয়ান নিউজবাংলাকে এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

কিছুদিন আগেই ক্ষুদ্রাকৃতি দিয়ে সারা বিশ্বের নজর কেড়েছিল রানি নামের একটি গরু। ঢাকার সাভারে খর্বাকৃতির এই গরুকে নিয়ে সরব ছিল বিশ্ব মিডিয়াও। কিন্তু গত ১৯ আগস্ট হঠাৎ করেই তার মৃত্যুতে শোক নেমে আসে নেটিজেনদের মাঝে। এই মৃত্যু যেন মেনে নিতে পারছিলেন না অনেকেই।

এবার রানির বিশ্ব রেকর্ডের খবর দিয়ে সেই আক্ষেপ আরও বাড়াল গিনেস বুক কর্তৃপক্ষ। রানিকে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট গরুর স্বীকৃতি দিয়েছে সংস্থাটি।

সোমবার রাত ১১টার দিকে সাভারে চারিগ্রাম এলাকার শেকড় এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী কাজী মো. আবু সুফিয়ান নিউজবাংলাকে এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

এর আগে বিকেল ৪টার দিকে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড কর্তৃপক্ষ তাকে ই-মেইলের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে জানান।

মরেও গিনেস রেকর্ডে ঠাঁই হলো রানির
গিনেস বুক থেকে পাঠানো রানির রেকর্ডের স্বীকৃতিপত্র

আবু সুফিয়ান বলেন, ‘রানি আমাদের সবার অনেক আদরের ছিল। প্রাণী হলেও রানিকে আমরা পরিবারের একজন করে নিয়েছিলাম। কিন্তু গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে যখন রানির নাম উঠতে আর কিছুদিন বাকি তখনই আমরা তাকে হারিয়েছি। রানির মৃত্যু কোনোভাবেই ওই সময় মেনে নিতে পারিনি আমরা।

‘তবে অবশেষে গিনেস বুক কর্তৃপক্ষ তাদের নিয়ম-কানুন মেনেই রানিকে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট গরুর স্বীকৃতি দিয়েছে। আমরা সত্যিই অনেক আনন্দিত। তবে রানি বেঁচে থাকলে এই আনন্দের মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যেত। আমাদের শেকড় ফার্মে রানিকে দেখতে ভিড় জমাতেন সাধারণ মানুষ ও সংবাদকর্মীরা। আমরা রানিকে কোলে নিয়ে ছবি তুলেই এই মুহূর্তটা উদযাপন করতে পারতাম।’

মরে যাওয়ার পরও গিনেস বুক কিভাবে রানিকে রেকর্ডের স্বীকৃতি দিয়েছে, জানতে চাইলে আবু সুফিয়ান বলেন, ‘ওদের কাছে আমরা রানির পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাঠিয়েছিলাম। ওরা মূলত দেখেছে, আমরা হরমোন জাতীয় ইনজেকশন পুশ করে রানিকে বামন করেছিলাম কি না? কিন্তু এ ধরনের কোনো কিছু তারা রিপোর্টে পায়নি। তিন দিন আগে ওরা রানিকে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট গরুর স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু ই-মেইল করেছে আজ।’

আরও পড়ুন:
অনন্ত যৌবনের অচিন বৃক্ষ
হাত খরচের টাকায় বৃক্ষরোপণ
পর্যটক ফিরবে তো?
নারকেল গাছ থেকে দিনমজুরের মরদেহ উদ্ধার
নবজাতকের আগমনে চারা উপহার

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের রূপান্তরের রূপকার

বাংলাদেশের রূপান্তরের রূপকার

প্রায় দেড় যুগ ধরে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে উন্নয়নের একটি রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। এ সময়ে শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশ অনেকগুলো পুরস্কার ও স্বীকৃতি পেয়েছে। গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই অর্জন পুরো বাংলাদেশের রূপান্তরের রূপকার হিসেবে শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

গত ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) দারিদ্র্য দূরীকরণ, পৃথিবীর সুরক্ষা এবং সবার জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণের সার্বজনীন আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের সঠিক পথে অগ্রসরের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কার’ দেয়।

এর আগে জাতিসংঘ ঘোষিত মিলেনিয়াম গোল (এমডিজি) অর্জনে শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশ অনেকগুলো পুরস্কার বা স্বীকৃতি পেয়েছে।

গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা প্রধানমন্ত্রীর এই অর্জনকে দেখছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। তারা বলছেন, এই অর্জন পুরো বাংলাদেশের রূপান্তরের রূপকার হিসেবে শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে প্রধানমন্ত্রী মানবসম্পদকে গুরুত্ব দিয়েই মূলত বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, মানুষের সামগ্রিক দক্ষতা উন্নয়নের উপর সরকারের সফলতা নির্ভর করছে। সামগ্রিকভাবে মানবসম্পদ বিকশিত না হলে কোনো উন্নয়ন প্রক্রিয়া স্থায়িত্ব পায় না।’

তিনি বলেন, ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের যে ধারণা, তা মূলত দেশের প্রতিটি পরিবারের বুনিয়াদি উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত। এই বিষয়গুলো গত একযুগ ধরে পুরো বাংলাদেশকেই পাল্টে দিয়েছে। মানব উন্নয়ন খাতে দেয়া গুরুত্ব পাল্টে দিয়েছে উন্নয়নের অন্যান্য সূচকও। এরই সূফল পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ।’

অন্য দিকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন, বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির গুরুত্ব যে অপরিসীম, তা প্রধানমন্ত্রী বুঝতে পেরেছিলেন। যে কারণে শুরুতেই তিনি কৃষিতে অসামান্য সমর্থন দিয়ে গেছেন। ফলে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এতে ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান শতকরা হারের হিসেবে আগের তুলনায় কমলেও, এর গুরুত্ব কমেনি। সকলের জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দারিদ্র্য বিমোচনে আজও কৃষি হলো মূল চালিকাশক্তি। পাশাপাশি দেশে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে কৃষিখাত সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে।

‘করোনার মধ্যেও বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়নি। করোনা পরিস্থিতির মাঝেও বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় ভাল অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ সমৃদ্ধশালী উন্নত দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি সম্ভব হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্ব, সাহস, দৃঢ়তা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতায়। এ কারণেই তিনি বারবার এ ধরনের পুরস্কার পাচ্ছেন।’

লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ় অঙ্গীকার

অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শেখ হাসিনা নিজেই বিভিন্ন সময় দাবি করেন, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রেও এ দেশ অগ্রণী ভূমিকা পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ।

‘আমরা অতি-দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নামিয়ে এনেছি। শহর এবং গ্রামীণ উভয় অঞ্চলেই শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পানি সরবরাহ এবং পয়ঃসেবার মতো মৌলিক বিষয়ে অধিকতর সুবিধা নিশ্চিত করেছি। বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও গত সাত বছর ধরে আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের ওপর ছিল। গত এক দশকে রপ্তানি আয় তিন গুণের বেশি বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৮ গুণের কাছাকাছি।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের মান অনুযায়ী গত বছর বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। আমরা এখন ২০৩০ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা জাতিসংঘের উচ্চাভিলাসী ২০৩০ এজেন্ডা গ্রহণ করেছি। বাংলাদেশে এমডিজি বাস্তবায়নের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এবং এমডিজির সাফল্যের ওপর ভর করে এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। এ জন্য দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের প্রয়োজন।

‘আমি মনে করি, ২০৩০ এজেন্ডা হচ্ছে একটি সম্মিলিত পথপরিক্রমা। এর বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সরকারি এবং বেসরকারি, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক – সব উৎস থেকে অধিক পরিমাণে সম্পদের সরবরাহ প্রয়োজন। সুতরাং, শুরু থেকেই বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা বা ওডিএর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এসডিজির ১৭টি উদ্দেশ্য এবং ১৬৯টি লক্ষ্য পূরণই হবে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পূর্বশর্ত।’

তিনি বলেন, ‘সরকার প্রথমে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম-আয়ের জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল অর্থনীতির দেশে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এ লক্ষ্য অর্জনের পর প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য হচ্ছে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা।’

তামাক ব্যবহারে অনীহা

এসডিজি লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে এক সময় তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি কেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য মতে, দেশে তামাকসেবীদের মধ্যে অসুস্থ হওয়াদের মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। দেশকে রোগমুক্ত করতে তামাকের ব্যবহার শূন্যে নামানোর ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান, মিয়ানমার এবং শ্রীলংকায় তামাক গ্রহণকারীর মোট সংখ্যা প্রায় ৩৮৩ মিলিয়ন। এটা বিশ্বের মোট ১.১ বিলিয়ন তামাক গ্রহণকারীর সংখ্যার প্রায় ৩৪.৮% অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এসব দেশে তামাকজনিত আর্থিক এবং স্বাস্থ্যগত ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। শুধু ভারত এবং বাংলাদেশে তামাক গ্রহণজনিত কারণে প্রতি বছর কমপক্ষে ১.১ মিলিয়ন (১১ লাখ) মানুষ মারা যায়।

মন্ত্রণালয় জানায়, ২০১৩ সালের তামাক জাতীয় পণ্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন এবং ২০১৫ সালের বিধি অনুসরণ করে আগামী মার্চ থেকে তামাকজাত পণ্যের মোড়কে ছবি সংবলিত সতর্কবার্তা সংযোজন করা হচ্ছে। তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মকাণ্ড সমন্বিতভাবে পরিচালনার জন্য সরকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল গঠন করেছে।

২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে তামাকের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে চায়।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক স্বতন্ত্র চরিত্র দাঁড় করিয়েছে বলে মনে করেন অ্যাম্বাসেডর ওয়ালিউর রহমান। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘কোনো দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেয়া হবে না – প্রধানমন্ত্রীর এই হুঙ্কার এ অঞ্চলের ভূরাজনীতির চিত্র পরিবর্তন করে দিয়েছে।

‘শেখ হাসিনার দর্শন হলো বর্তমান বিশ্ব একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এ জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই।’

অন্যদিকে মানবিক বিবেচনায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শেখ হাসিনা। ২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যের টেলিভিশন ‘চ্যানেল ফোর’ এ জন্য তাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ নামে আখ্যায়িত করে।

কেবল নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো নয়, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তি করে ইতিহাস রচনা করেন তিনি। এর জন্য ১৯৯৮ সালে ইউনেসকো তাকে ‘হুপে-বোয়ানি’ শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করে।

আবার ভারতের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি বাস্তবায়ন করে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ২০১০ সালে টাইম সাময়িকীর অনলাইন জরিপে তিনি বিশ্বের সেরা ১০ ক্ষমতাধর নারীর মধ্যে ষষ্ঠ স্থানের অধিকারী ছিলেন।

২০১৫ সালে বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় শেখ হাসিনার অবস্থান ৫৯তম। ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি ৩০টির বেশি পুরস্কার ও পদক অর্জন করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি, ব্রিজপোর্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানের ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়, স্কটল্যান্ডের অ্যাবারটে বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের বিশ্বভারতী এবং ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ব্রাসেলসের বিশ্ববিখ্যাত ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়, রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্টেট ইউনিভার্সিটি অব পিটার্সবার্গ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে।

শান্তি প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য সর্বভারতীয় শান্তিসংঘ শেখ হাসিনাকে ১৯৯৮ সালে ‘মাদার তেরেসা’ পদক প্রদান করে। ২০০৯ সালে ভারতের ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল ট্রাস্ট শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অসামান্য ভূমিকা পালনের জন্য শেখ হাসিনাকে ইন্দিরা গান্ধী পুরস্কারে ভূষিত করে। এ ছাড়া ২০১৪ সালে ইউনেসকো কর্তৃক তিনি ‘শান্তির বৃক্ষ’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। জাতিসংঘ পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচি দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে শেখ হাসিনাকে তাদের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ-২০১৫’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে।

রূপান্তরের কারিগর

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল কারিগর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর সে জন্যই জাতিসংঘের নানা সংগঠন থেকে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। তার সরকারের গত ১২ বছরের উন্নয়ন চিত্রে রয়েছে নানান বৈচিত্র্য এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণের সাফল্য।

‘শিক্ষা খাতে জোট সরকারের আমলের চেয়ে ১৩ গুণ বেশি বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ, সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতায়নে নারীরা এগিয়ে গেছে। অন্যদিকে জাতীয় বাজেটের আকার ও জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘রিকশাচালক, দিনমজুর, পোশাক শ্রমিকের ন্যূনতম মাসিক বেতন বেড়েছে, সামরিক-বেসামরিক বেতন-ভাতা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, মাথাপিছু আয়, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনৈতিক সূচকে যেমন উন্নতি হয়েছে, তেমনি সমুদ্র বিজয় ও ব্লু-ইকোনমি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

‘এ ছাড়া রয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরিতে এবং স্যাটেলাইট যুগে বাংলাদেশের প্রবেশের সাফল্য। আরও রয়েছে দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী মজবুত করতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ। মূলত স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি খাত, যোগাযোগব্যবস্থা, আলেম-ওলামাদের কর্মসংস্থান ও মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়ন, শিল্প খাতে উন্নয়ন, সন্ত্রাস দমন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং পরিবেশ রক্ষায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে উন্নয়নশীল দেশের এসডিজির সূচকগুলো অর্জন ত্বরান্বিত হয়েছে।’

এসডিজিতে বাংলাদেশ

জাতিসংঘ ২০১৫ সালে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) গ্রহণ করে। এটি ১৫ বছর মেয়াদি। এর উদ্দেশ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্যে ১৭টি অভীষ্ট নির্ধারণ করা হয়। আর ১৬৯টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

জাতিসংঘ এর আগে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) গ্রহণ করেছিল। এরপরই এসডিজি আসে। এসডিজির লক্ষ্যগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য দূর করা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুস্বাস্থ্য, উন্নত শিক্ষা নিশ্চিত ও লিঙ্গবৈষম্য প্রতিরোধ অন্যতম।

বাংলাদেশের রূপান্তরের রূপকার
এসডিজির নবম বার্ষিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ‘এসডিজি প্রগ্রেস অ্যাওয়ার্ড’ গ্রহণ করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত

এসডিজির এবারের সূচকে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। গত বছর এ স্কোর ছিল ৬৩ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০১৫ সালে যখন এসডিজি গৃহীত হয়, তখন বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৫৯ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। বিশ্বের ১৬৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে।

এবারের তালিকায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে ফিনল্যান্ড। দেশটির স্কোর ৮৫ দশমিক ৯ শতাংশ। এর পরের চার দেশ হলো সুইডেন (৮৫.৬ শতাংশ), ডেনমার্ক (৮৪.৯ শতাংশ), জার্মানি (৮২.৫ শতাংশ) ও বেলজিয়াম (৮২.২ শতাংশ)। আর সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের স্কোর ৩৮ দশমিক ২৭ শতাংশ। এর আগে আছে দক্ষিণ সুদান ও চাদ।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে ৭০তম স্থানে আছে ভুটান। এরপর আছে মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল। এদের অবস্থান যথাক্রমে ৭৯, ৮৭ ও ৯৬তম।

সামাজিক বিভিন্ন অগ্রগতির সূচকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের নিবিড় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, ক্ষুদ্রঋণের ব্যবহার এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে তার ভূমিকা, বৃক্ষরোপণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের ইতিবাচক পরিবর্তন প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের করা মন্তব্য এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। তার মতে, কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বকে চমকে দেবার মতো সাফল্য আছে বাংলাদেশের। বিশেষত শিক্ষাসুবিধা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার ও জন্মহার কমানো, গরিব মানুষের জন্য শৌচাগার ও স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদান এবং শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম অন্যতম।

কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা

চলতি জাতিসংঘ অধিবেশনে এসডিজি অর্জনে বিশ্বনেতাদের কাছে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রথম প্রস্তাবে তিনি বলেন, ‘এই বৈশ্বিক মহামারি থেকে টেকসই উত্তরণের ওপরই এসডিজির সাফল্য নির্ভর করছে। এখন বিশ্বের সব জায়গায় ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা সময়ের দাবি এবং তা অতি জরুরি।’

দ্বিতীয় প্রস্তাবনায় তিনি বলেন, ‘২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নে আমাদের সম্পদের যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে, তা অবশ্যই কমাতে হবে।’

তৃতীয় প্রস্তাবনায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘চলমান বৈশ্বিক মহামারির অভিঘাতের কারণে ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য বাড়ছে, তার জন্য আমরা উদ্বিগ্ন।’

পরিস্থিতি উত্তরণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনীর ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী।

চতুর্থ প্রস্তাবনায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, কোভিড-১৯ পরিস্থিতি থেকে পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতে যে কোনো ধরনের বিপর্যয় বা দুর্যোগ মোকাবিলায় জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণকে পূর্ণতা দেবে।’

পঞ্চম ও সবশেষ প্রস্তাবনায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসডিজি বাস্তবায়নে অবশ্যই পর্যবেক্ষণ জোরদার করা ও যান্ত্রিক সহায়তার ওপর আরও গুরুত্ব দিতে হবে।’

এ বিষয়ে জাতিসংঘের সমন্বয় বাড়ানো উচিত জানিয়ে জরুরি পরিস্থিতি ও বিপর্যয় মোকাবিলায় যথাযথ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন শেখ হাসিনা।

২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জনকে ‘একটি বৈশ্বিক চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘সবার অন্তর্ভুক্তিতে টেকসই বৈশ্বিক উন্নয়নের একটি ব্লুপ্রিন্ট এটি। কোনো দেশ একা এই এজেন্ডা অর্জন করতে পারবে না। এই এজেন্ডা অর্জনে আমাদের বৈশ্বিক সহযোগিতা ও সংহতি বাড়াতে হবে।’

আরও পড়ুন:
অনন্ত যৌবনের অচিন বৃক্ষ
হাত খরচের টাকায় বৃক্ষরোপণ
পর্যটক ফিরবে তো?
নারকেল গাছ থেকে দিনমজুরের মরদেহ উদ্ধার
নবজাতকের আগমনে চারা উপহার

শেয়ার করুন

জলকেন্দ্রিক পর্যটনের সম্ভাবনা, উদ্যোগ নেই

জলকেন্দ্রিক পর্যটনের সম্ভাবনা, উদ্যোগ নেই

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস/নিউজবাংলা

হাওরকেন্দ্রিক পর্যটন দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটি পর্যটন কেন্দ্রে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা, তা এখনও গড়ে ওঠেনি। বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করার মতো যথেষ্ট কর্মকাণ্ড ও সুযোগ-সুবিধা নেই।

বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিতি রয়েছে নদীমাতৃক দেশ হিসেবে। নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এ দেশের বেশির ভাগ শহর-বন্দর।

সরকারি হিসাবে দেশে নদীর সংখ্যা ৩১০টি। এ ছাড়া রয়েছে অসংখ্য হাওর-বাঁওড়-বিল। আছে সুবিশাল সমুদ্রতট।

এসব কারণে জলভিত্তিক পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু তা কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের জলাশয়কেন্দ্রিক ভূ-প্রকৃতির নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, যা অনন্য। বিশ্বের কোথাও এর তুলনা পাওয়া যাবে না।

সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, সিলেট, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ৭ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর জলাভূমিতে রয়েছে ৪২৩টি হাওর। সুনামগঞ্জে আছে ১৩৩টি, কিশোরগঞ্জে ১২২টি, নেত্রকোণায় ৮০টি, সিলেটে ৪৩টি, হবিগঞ্জে ৩৮টি, মৌলভীবাজারে ৪টি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আছে তিনটি হাওর। বিপুল এ সম্ভাবনার খুব অল্পই কাজে লাগানো হয়েছে।

সম্প্রতি হাওরকেন্দ্রিক পর্যটন দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটি পর্যটন কেন্দ্রে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা, তা এখনও গড়ে ওঠেনি। যতটুকু আছে, তাও মানসম্মত নয়।

জলকেন্দ্রিক পর্যটনের সম্ভাবনা, উদ্যোগ নেই

পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে তা দেশের পর্যটনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় ট্যুর অপারেটরদের সংগঠন প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনের (পাটা) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব তৌফিক রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখন হাওরে যা চলছে, সেটা কোনোক্রমে গ্রহণযোগ্য না। যে বোটগুলো রয়েছে, সেগুলো খুব একটা ভালো না। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছেলেপেলেরা যায়, তাদের জন্য হয়তো ঠিক আছে, কিন্তু কোনো পর্যটকই পরিবার নিয়ে এখানে থাকতে পারবে না। বিদেশি পর্যটকরা তো পারবেই না।

‘তারপর এখানে কোনো অ্যাক্টিভিটি নাই। বোটে করে যাচ্ছেন তো যাচ্ছেনই। বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে হলে এখানে কিছু সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এখানে হাজংপাড়া আছে, গারোপাড়া আছে, খাসিয়াপাড়া আছে। তাদের সাথে নিয়ে হোম স্টে করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কালচারাল অ্যাক্টিভিটি আছে। সেখানে মন্দির আছে, গির্জা আছে, মসজিদ আছে, মানে একটি রিলিজিয়াস হারমনি আছে। এটাকে কাজে লাগানো যেতে পারে।

‘যাদুকাটা নদের এপাশে একদিকে পাহাড়, একদিকে নদী। কিন্তু এখানে কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। যেহেতু কিছু এখনও গড়ে ওঠেনি, তাই পরিকল্পনা করে এখানে কিছু একটা করা সম্ভব। সম্ভাবনা আছে, কিন্তু পর্যটনের দিক দিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা অনেক নাজুক অবস্থায় রয়েছে।’

দেশি ট্যুর অপারেটরদের সংগঠন টোয়াব বলছে, হাওর বা জলকেন্দ্রিক পর্যটন তখনই জনপ্রিয় হবে, যখন এখানে পর্যটকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হবে।

টোয়াব সভাপতি রাফেউজ্জামান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যদি টাঙ্গুয়ার হাওরের কথা বলি, এর একদিকে পাহাড়, অন্য দিকে জলাভূমি, যেটি স্বচ্ছ। এটা শীতকালে একরকম, বর্ষায় একরকম, আর গ্রীষ্মে আরেক রকম। কিন্তু পর্যটকদের জন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা এখানে এখনও গড়ে ওঠেনি। যেমন: থাকার কোনো সুবিধা এখানে নেই। দুই-একটি অবকাঠামো থাকলেও সেগুলো মানসম্মত না।

‘আর রেস্টুরেন্টেও তেমন সুযোগ-সুবিধা নেই। যে কয়েকটি আছে, সেগুলো ঘরোয়া পর্যটনের জন্যই মানসম্মত নয়; বিদেশিদের জন্য তো নয়ই। কমিউনিকেশনটাও আরও সহজ হতে হবে। সুনামগঞ্জ থেকে ট্রলারে বা মোটরবাইকে এখানে যাওয়া এটা সাধারণত যথেষ্ট না। এসব ক্ষেত্রে গণপরিবহন থাকতে হয়। তাহলেই জনপ্রিয় হয়।’

এ ধরনের পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে তুলে ধরতে ব্র্যান্ডিং ও সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি।

টোয়াব সভাপতি বলেন, ‘আমরা যদি চলনবিলের কথা বলি, আমরা কিন্তু মার্কেটে সাড়া জাগাতে পারিনি। আমরা হাকালুকির কথা বলি, ঘরোয়া বা আন্তর্জাতিক কোনো ক্ষেত্রেই কিন্তু এগুলোকে পণ্য হিসেবে তৈরি করতে পারিনি। এটার জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।

‘ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রচার চালালেও সরকারের সমর্থন না থাকলে এটি আগাতে পারবে না। সরকারকেই ব্র্যান্ডিংয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’

সরকার বলছে, দেশের পর্যটন খাতের উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে। সব ঠিক থাকলে আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই তা চূড়ান্ত হবে। এ মহাপরিকল্পনায় পর্যটনসংশ্লিষ্ট সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

পর্যটনসচিব মো. মোকাম্মেল হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পর্যটনের উন্নয়নে যে মহাপরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে, তার মধ্যে সবকিছু থাকবে। আমরা সব জেলাকে এই মহাপরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসছি। হাওর বা জলকেন্দ্রিক পর্যটনও এর মধ্যে থাকবে।’

আরও পড়ুন:
অনন্ত যৌবনের অচিন বৃক্ষ
হাত খরচের টাকায় বৃক্ষরোপণ
পর্যটক ফিরবে তো?
নারকেল গাছ থেকে দিনমজুরের মরদেহ উদ্ধার
নবজাতকের আগমনে চারা উপহার

শেয়ার করুন

সাত হাজার মানুষের ভাতার টাকা যাচ্ছে কই?

সাত হাজার মানুষের ভাতার টাকা যাচ্ছে কই?

কুড়িগ্রামে ছয় মাস থেকে শুরু করে অনেকে ১৯ মাস পর্যন্ত কোনো ভাতার টাকা পাননি। ফাইল ছবি/নিউজবাংলা

হলোখানা গ্রামের জাহেরা বেগম বলেন, ‘আমার বিধবা ভাতা হইছে। আইডি কার্ড, মোবাইল নম্বর স্পষ্ট করে লিখে দিছি। এলা টাকা পাই না। অফিসত খোঁজ নিয়া দেখি, আমি দিছি গ্রামীণ নম্বর বিকাশ করার জন্য, আর টাকা যায় রবি নম্বরে। সেই নম্বর বন্ধ থাকে, ফোন দিলেও যায় না। এলা হামার এত দিনের টাকা অন্য মানুষ খাইল, তার বিচার কাই করবে?’

কুড়িগ্রামের ৯ উপজেলায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতার টাকা পাচ্ছেন না ৭ হাজারের বেশি সুবিধাভোগী। বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতাভোগী এসব মানুষ মোবাইল ব্যাংকিং সেবা নগদ কিংবা বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলার পর থেকে তাদের অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা যায়নি। ছয় মাস থেকে শুরু করে অনেকে ১৯ মাস পর্যন্ত ভাতার টাকা পাননি।

অভিযোগ উঠেছে, মাঠকর্মীদের অবহেলায় অনেকের বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্ট নম্বর ভুল হয়েছে। অনেকে সঠিক নম্বর দেয়ার পরও মোবাইল ব্যাংকিং সেবার কর্মীরা ভুল নম্বর তুলেছেন।

আবার অসাধু একটি চক্র অন্য নম্বর দিয়ে টাকা তুলে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে আসছে সমাজসেবা কর্তৃপক্ষ। তবে এত দিনেও নম্বর ঠিক করা যায়নি কেন এবং পাঠানো ভাতার টাকা কাদের কাছে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক সুবিধাভোগী।

কুড়িগ্রাম সমাজসেবা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জেলার ৯ উপজেলায় বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতাগ্রহীতার সংখ্যা ২ লাখ ৩ হাজার ৬০৫ জন। তাদের মধ্যে মোবাইল নম্বরে ত্রুটিজনিত কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা পাচ্ছেন না ৭ হাজার ১০৭ জন।

এর মধ্যে সদরে ৩৬৬ জন, নাগেশ্বরীতে ২৯, ভূরুঙ্গামারীতে ১ হাজার ১৭৩, ফুলবাড়ীতে ২ হাজার ৩৮২, রাজারহাটে ৩৫২, উলিপুরে ৭২৯, চিলমারীতে ১১৯, রৌমারীতে ১ হাজার ৪২৩ এবং রাজিবপুরে ৫৩৪ জন রয়েছেন।

সরকার প্রতি মাসে এসব ভাতাভোগীর মধ্যে বয়স্ক ও বিধবাদের ৫০০ টাকা এবং প্রতিবন্ধীদের ৭৫০ টাকা করে দেয়।

সুবিধাভোগীরা জানান, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতার টাকা এখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরাসরি সুবিধাভোগীর বিকাশ বা নগদ নম্বরে পাঠায় সরকার। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদাসীনতায় ভাতাভোগীদের মোবাইল নম্বর ভুল এন্ট্রি করায় তাদের অনেকে দীর্ঘদিন ধরে টাকা পাচ্ছেন না।

উপজেলা সমাজসেবা অফিসে গিয়ে অনেকে জানতে পারেন, তাদের ভাতার টাকা চলে গেছে অন্যের মোবাইল নম্বরে। তবে সেই মোবাইল নম্বরে ফোন দিলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

অনলাইন পদ্ধতি চালুর পর একটি অসাধুচক্র নানা কৌশলে দরিদ্র মানুষের ভাতার টাকা আত্মসাৎ করছে বলে অভিযোগ তাদের।

ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা গ্রামের বাসিন্দা অটোচালক সুশীল চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমার মা সুশিলা রাণীর বয়স্ক ভাতা হয়েছে। তবে দুইবারের ৬ হাজার টাকা আমার মা পায়নি। উপজেলা সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করে দেখি, আমার মায়ের দেয়া নম্বরের জায়গায় অন্যজনের মোবাইল নম্বর দেয়া। অফিস থেকে আমাকে বলল, থানায় জিডি করেন। আমি আর সে ঝামেলায় যাইনি।’

সাত হাজার মানুষের ভাতার টাকা যাচ্ছে কই?
কুড়িগ্রামে অনেকের ভাতার টাকা ভুল নম্বরে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ছবি: নিউজবাংলা

একই এলাকার গঙ্গা রাণী বলেন, ‘অফিস মোবাইল নম্বর-টম্বর ঠিক করলং, এলাও টাকা পাই নাই। ওমরা কয় পাইবেন- এই পর্যন্ত।’

একই ইউনিয়নের শরলিধরা গ্রামের সামেদুল হক বলেন, ‘মোবাইলত টাকা দেয়া শুরু করছে থাকি মেলা মাইসে সেই টাকা পায় নাই। এই যে করোনার মধ্যে বয়স্ক, বিধবা ভাতা না পাইয়া অভাব-অটনের মধ্যে দিন কাটাইলেও এলাও টাকা পাই নাই।’

সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের চর সাবডোব বাসিন্দা আহম্মদ আলী জানান, তার মায়ের বয়স্ক ভাতার জন্য জাতীয় পরিচয় নম্বর ও মোবাইল নম্বর নির্ভুল দিয়েছেন। সেখানে কর্মকর্তার স্বাক্ষরও আছে।

অথচ বয়স্ক ভাতার টাকা দুবার না পাওয়ায় তিনি অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখেন অন্য নম্বরে টাকা গেছে। সেই নম্বরে ফোন দিলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

সব তথ্য ঠিকমতো দেয়া হলেও অসাধুচক্রের কারণে তার মা ভাতার টাকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন আহম্মদ আলী।

হলোখানা গ্রামের জাহেরা বেগম বলেন, ‘আমার বিধবা ভাতা হইছে। আইডি কার্ড, মোবাইল নম্বর স্পষ্ট করে লিখে দিছি। এলা টাকা পাই না।

‘অফিসত খোঁজ নিয়া দেখি, আমি দিছি গ্রামীণ নম্বর বিকাশ করার জন্য আর টাকা যায় রবি নম্বরে। সেই নম্বর বন্ধ থাকে, ফোন দিলেও যায় না। এলা হামার এত দিনের টাকা অন্য মানুষ খাইল, তার বিচার কাই করবে?’

বলদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘একটি কুচক্রী মহলের কারণে আমার ইউনিয়নে ছয় শর ওপর মানুষ বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা ১৯ মাস থেকে পাচ্ছে না। এত দিন থেকে এই কুচক্রী মহল টাকাগুলো তুললেও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।'

আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে টাকা ফেরতের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভাতার কাজ ৪-৫ ধাপে সম্পন্ন হয়েছে। কেউ একটু ভুল করলেই সেই ভাতাভোগী বঞ্চিত হচ্ছেন। এ জন্য সুবিধাভোগীর আঙুলের ছাপ বা চোখের ছাপ নিলে এই সমস্যা আর হবে না।’

প্রকৃত ভাতাভোগীরা টাকা না পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক রোকোনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘কিছু অসাধু এজেন্টের কারণে টাকা ভুল নম্বরে গেলেও এর সঙ্গে সমাজসেবার কেউ জড়িত নয়। গ্রামের মানুষের মোবাইল সম্পর্কে ততটা জ্ঞান না থাকায় মোবাইল এজেন্টের কাছে বা অন্য কারও কাছে গিয়ে নিজেদের পিন কোড বলে দেয়। ফলে অসাধুচক্রটি কৌশলে সেই টাকা উত্তোলন করে থাকে।’

ভাতাভোগীদের এনআইডি ও মোবাইল নম্বরের পাশাপাশি তাদের আঙুল কিংবা চোখের কর্নিয়ার স্ক্যান নিয়ে টাকা বিতরণ করা হলে এই জটিলতা হতো না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আরও পড়ুন:
অনন্ত যৌবনের অচিন বৃক্ষ
হাত খরচের টাকায় বৃক্ষরোপণ
পর্যটক ফিরবে তো?
নারকেল গাছ থেকে দিনমজুরের মরদেহ উদ্ধার
নবজাতকের আগমনে চারা উপহার

শেয়ার করুন