ঢাকার কলাবাগান।
ফার্স্ট লেনের ৫০/১ নম্বর বাড়ি। পাঁচ তলা এই ভবনের প্রতিটি তলায় দুটি করে ফ্ল্যাট। তিন তলায় সিঁড়ির বাম পাশের ফ্ল্যাটে মাস পাঁচেক হলো ভাড়া থাকেন কাজী সাবিরা রহমান লিপি।
২০২১ সালের শুরুতে ওই ফ্ল্যাট ভাড়া নেন গ্রিন লাইফ হাসপাতালের কনসালট্যান্ট চিকিৎসক সাবিরা। ৪৭ বছর বয়সী ডা. সাবিরার স্বামী-সন্তান থাকেন অন্য বাসায়।
বাসা ভাড়া নেয়ার মাসখানেক পর বাসার একটি কক্ষ সাবলেট দেন তিনি। প্রথম সাবলেট নেয়া তরুণী ছিলেন এক মাস। এরপর মাস চারেক আগে ওঠেন কানিজ সুবর্ণা নামের আরেক তরুণী।
৩১ মে ২০২১। সকালবেলা আচমকা বদলে যায় গোটা ভবনের দৃশ্য। তিন তলার ফ্ল্যাটে নিজ কক্ষের দরজা ভেঙে ডা. সাবিরার নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কক্ষের বিছানার ওপর উপুড় হয়ে পড়ে ছিল রক্তাক্ত মরদেহ। গলা ও পিঠে ছুরির আঘাত।
সারা ঘরে তখন আগুনের ধোঁয়া। মরদেহের সালোয়ার-কামিজ পুড়ে গেছে, বিছানার চাদরও পুড়েছে অনেকটা। তবে দরজা ভেঙে পুলিশ যখন ভেতরে ঢোকে, ততক্ষণে আগুন নিভে গেছে, কেবল ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারদিক।
সাবিরার পাশের কক্ষে সাবলেট থাকা তরুণী সুবর্ণার ভাষ্য, সেদিন ভোর ৬টার দিকে তিনি ধানমন্ডি লেকে হাঁটতে বের হন। এ সময় সবকিছু ছিল স্বাভাবিক। সাবিরার কক্ষ ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় তিনি স্বাভাবিকভাবে অন্য দিনের মতোই সকালে বেরিয়ে যান। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এটাই ছিল সুবর্ণার ভোরের রুটিন।
সুবর্ণা ফ্ল্যাটের প্রধান দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে যান। বাড়ি ছাড়ার সময় প্রধান ফটক খুলে দেন দারোয়ান রমজান। এর তিন ঘণ্টা পর সকাল ৯টার দিকে বাসায় ফেরেন সুবর্ণা। নিজের কাছে থাকা চাবি দিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকেই দেখতে পান ধোঁয়া। সাবিরার কক্ষের বন্ধ দরজার নিচ দিয়ে আসা ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে ড্রয়িংরুমেও।
তখন সকাল প্রায় সাড়ে ৯টা। হতভম্ব সুবর্ণা ফোন করে ডেকে আনেন দারোয়ান রমজানকে। ছুটে আসেন ভবনটি তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা সামিয়া রহমানসহ আশপাশের অনেকে।
এই ভবনের মালিক মাহবুবুল ইসলাম একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, থাকেন মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায়। আর ভবন দেখভালের দায়িত্বে থাকা সামিয়া থাকেন পাশের আরেকটি ভবনে।
ডা. সাবিরার কক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে সকাল ১০টার দিকে খবর দেয়া হয় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে। তারা এসে দরজা ভেঙে উদ্ধার করে সাবিরার নিথর দেহ।
কীভাবে এই মৃত্যু? ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে কী ঘটেছিল ওই কক্ষে? খুনি কীভাবে ঢুকল, কীভাবেইবা বেরিয়ে গেল সবার অগোচরে? হত্যার মোটিভ কী? সাবিরার গলায় ও পিঠে ছুরির আঘাত থাকলেও সেই ছুরিটি কোথায়?
ঘটনার প্রায় আট মাস পরেও এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ বদল হয়েছে তিনবার, কিন্তু রহস্যের জাল ছিন্ন হয়নি এখনও।
ঘটনার দুদিন পর অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন ডা. সাবিরার মামাতো ভাই রেজাউল হাসান মজুমদার জুয়েল। মামলা নম্বর ১/৯৪। এর পরেই প্রথম তদন্ত শুরু করে কলাবাগান থানা পুলিশ। পাশাপাশি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশও নামে তদন্তে।
তবে রহস্যের জট না খোলায় মামলাটি এরপর চলে যায় পিবিআইয়ের কাছে।
ডা. সাবিরা হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনে কেন এই দীর্ঘসূত্রতা, তা অনুসন্ধান করেছে নিউজবাংলা। আমাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদক বনি আমিন বিশ্লেষণ করেছেন ঘটনার আগে-পরের বিভিন্ন দিক।
ঘটনার দিন পুলিশের বিশেষ ইউনিট ক্রাইম সিনের ধারণা ছিল, ডা. সাবিরার মৃত্যু হয় মরদেহ পাওয়ার বেশ কয়েক ঘণ্টা আগে, মধ্যরাতে। তাহলে প্রশ্ন হলো, সাবলেট থাকা সুবর্ণা কেন তা জানতে পারেননি, না কি তিনি জানতেন?
আবার সুবর্ণার দাবি ধানমন্ডি লেকে হেঁটে বাসায় ফিরে আগুনের ধোঁয়া দেখতে পান। তাহলে ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে আগুন লাগাল কে? মৃত মানুষের পক্ষে তো আর আগুন লাগানো সম্ভব নয়!
ডাক্তার সাবেরার মরদেহের গলায় ও পিঠে ছিল ছুরির আঘাতের চিহ্ন। তার মানে, এটি আত্মহত্যা নয়। ছুরিটি না পাওয়ায় হত্যার বিষয়টি নিয়ে মোটামুটি নিশ্চিত তদন্তকারীরা। কিন্তু খুনি কে?
সাবিরা রহমান দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন, সেদিক থেকে কোনো ঝামেলা ছিল কি না, খুঁজেছে নিউজবাংলা।
মাস চারেক সাবলেট থাকা সুবর্ণাকে বাসার তত্ত্বাবধায়ক ও দারোয়ানের কাছে নিজের বোনের মেয়ে হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সাবিরা। ঘটনার পর জানা যায়, তাদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। আবার বাসার তত্ত্বাবধায়ক থেকে শুরু করে সবাই জানত কানিজ সুবর্ণা একজন মডেল। কিন্তু কানিজ সুবর্ণার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তিনি মডেলিংয়ের সঙ্গে জড়িত নন। প্রশ্ন হলো, তারা দুজনেই কেন মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করলেন?
ডাক্তার সাবিরা ওই ফ্ল্যাটে ওঠেন গত বছরের জানুয়ারিতে। পরের মাসেই সাবলেট হিসেবে উঠেছিলেন আরেক তরুণী। স্কুলশিক্ষক পরিচয় দেয়া সেই তরুণী সাবলেট ছিলেন এক মাস। পরের মাসে ওই ফ্ল্যাটে আসেন সুবর্ণা।
কলাবাগানের বাসাটি ভাড়া নেয়ার আগে ডা. সাবিরা থাকতেন একই এলাকার বশিরউদ্দীন রোডের আরেকটি ফ্ল্যাটে। ৭/২ নম্বর ভবনের বাড়িওয়ালা ফজলুল হকের ফ্ল্যাটে এক কক্ষ ভাড়া নিয়ে একাকী থাকতেন এই চিকিৎসক।
ডা. সাবিরার দ্বিতীয় স্বামী সাবেক ব্যাংকার শামসুদ্দিন আজাদ। তিনি তার প্রথম স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে থাকেন শান্তিনগরের বাসায়।
ডা. সাবিরার প্রথম স্বামীর নাম ডা. ওবায়দুল্লাহ। ২০০৩ সালে ওবায়দুল্লাহ মারা যাওয়ার পর ২০০৬ সালে তিনি বিয়ে করেন শামসুদ্দিন আজাদকে।
সাবিরা কলাবাগানের বশিরউদ্দীন রোডে একাকী বাসা ভাড়া নেয়ার আগে থাকতেন গ্রিন রোডে মায়ের বাসায়। সেখানে তার প্রথম পক্ষের সন্তান আহমেদ তাজওয়ার এবং দ্বিতীয় পক্ষের মেয়েও থাকেন।
স্বামী-সন্তান এমনকি মায়ের বাসা ছেড়ে ডা. সাবিরা কেন একাকী বাসা ভাড়া নিলেন- সেই প্রশ্নের জবাবও খুঁজেছে নিউজবাংলা।
তার আগে চলুন একবার ঘুরে আসি কলাবাগানের যে ফ্ল্যাটে ডা. সাবিরা খুন হন, সেখানে।
রাজধানীর কলাবাগান বাসস্ট্যান্ড। কলাবাগান ফার্স্ট লেনের পাকা সড়কটি ধরে ৩৩৫ কদম হাঁটলে বাঁ পাশে চোখে পড়ে ৫০ নম্বর বাসা। এই বাসার পাশ দিয়ে একটি গলি। সেই গলি দিয়ে ঢুকতেই দ্বিতীয় বাসাটির নম্বর ৫০/১। এই ভবনের তৃতীয় তলায় থাকতেন ডা. সাবিরা রহমান।
প্রধান ফটকে নক করতেই বেরিয়ে আসেন দারোয়ান রমজান। ডা. সাবিরার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলে যান ঘটনাপ্রবাহ।
ঘটনার আগের দিন ৩০ মে ২০২১। রাত ১০টায় বাসায় ঢোকেন ডা. সাবিরা। সাবলেট থাকা সুবর্ণা বাসায় ফেরেন আরও আগে।
বাসার নিয়ম অনুযায়ী, রাত ১১টায় প্রধান গেট বন্ধ হয়। তবে সেদিন রাত ১১টায় গেট বন্ধ হয়নি। কারণ পাশের বাসার তত্ত্বাবধায়ক সামিয়া দারোয়ান রমজানকে পাঠিয়েছিলেন ধানমন্ডিতে তার ব্যক্তিগত কাজে। রমজান কাজ শেষ করে কলাবাগানে ফিরতে রাত প্রায় সাড়ে ১২টা বেজে যায়।
মধ্যরাতে ফিরে প্রধান ফটকসহ ছাদের গেট বন্ধ করেন রমজান। এরপর ঘুমিয়ে যান তিনি।
৩১ মে সকাল ৬টা। ঘুম থেকে উঠে সুবর্ণার জন্য গেট খুলে দেন রমজান।
এরপর নিজের কিছু কাজ সেরে রমজান বাজারে যান, সেখান থেকে বাসায় ফেরেন সকাল ৯টার দিকে। এর কিছু আগেই বাসায় ফেরেন সুবর্ণা।
কিছুক্ষণ পর সুবর্ণা রমজানকে ফোন করে তিন তলায় ডাকেন। রমজান গিয়ে দেখতে পান ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে সুবর্ণা পায়চারি করছেন আর মোবাইলের বাটন টিপছেন। এ সময় সাবিরার রুম থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়।
রমজান নেমে পাশের বাসায় গিয়ে ভবনের তত্ত্বাবধায়ক সামিয়াকে ডেকে আনেন। এরপর খবর দেয়া হয় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে। পরে দরজা ভেঙে উদ্ধার করা হয় ডা. সাবিরার মরদেহ।
ডা. সাবিরা হত্যার আগে ওই ভবনে কোনো সিসিটিভি ছিল না। তবে এখন বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। ভবনের আশপাশে কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ জব্দ করেছে পুলিশ।
ভবনের প্রধান ফটকের পরেই গ্যারেজ। গ্যারেজটির দুই পাশের ওয়াল ডিঙিয়ে কেউ যাতে ভেতরে ঢুকতে না পারে সে জন্য রয়েছে রডের তৈরি বেড়া। তাই এদিক দিয়ে কারও ভেতরে ঢোকার সুযোগ নেই।
ভবনের পাশ দিয়ে বেয়ে তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে ঢুকতে গেলে জানালার গ্রিল ভাঙতে হবে। সে ধরনের কোনো আলামত পায়নি পুলিশ। এর অর্থ, খুনি ঢুকেছে এবং বেরিয়েছে ভবনের প্রধান ফটক দিয়েই।
তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায় সাবিরার ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ। অনুসন্ধানের স্বার্থে চাবি পুলিশের কাছে।
তবে এই বাসার সব ফ্ল্যাট একই ধরনের। সাবিরা হত্যার পর ভবনের তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়ারা একে একে চলে গেছেন। ভবনের এসব ফ্ল্যাটের সবগুলো এখনও ফাঁকা।
ডা. সাবিরার ফ্ল্যাটের ঠিক ওপরের চতুর্থ তলার ফ্ল্যাটে গিয়ে এর নকশা পর্যবেক্ষণ করেছেন নিউজবাংলার বনি আমিন।
দেখা গেছে, দুই রুম, এক ড্রইং আর এক কিচেনের ফ্ল্যাটে থাকতেন ডা. সাবিরা রহমান। ফ্ল্যাটে ঢুকতেই সোজাসুজি রুমে থাকতেন সুবর্ণা আর ডান পাশেরটিতে থাকতেন সাবিরা।
প্রতিটি কক্ষের দরজার লক ভেতর থেকে বন্ধ করা যায়। তবে বাইরে থেকে চাবি ঘুরিয়ে খোলা সম্ভব। ফ্ল্যাটের প্রধান দরজার লকেও একই ব্যবস্থা। ফলে এমন হতে পারে সাবিরাকে হত্যার পর ভেতর থেকে লক করে দরজা টেনে বেরিয়ে গেছে খুনি।
সাবিরা হত্যার পর থেকে পুলিশের বিধিনিষেধের মধ্যে আছেন ওই ফ্ল্যাটে সাবলেট থাকা সুবর্ণা। সাবিরা সুবর্ণাকে আত্মীয় পরিচয় দিলেও তিনি বলছেন, সাবিরা তার পূর্বপরিচিত নন। সুবর্ণা ওই বাসায় উঠেছিলেন টুলেট বিজ্ঞাপন দেখে।
সুবর্ণা গ্রিন রোড এলাকায় ছিলেন চার বছর। পড়াশোনা করছিলেন সেখানকারই একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সুবর্ণা বলছেন, তিনি সাবিরার কাছে শিক্ষার্থী পরিচয়ই দিয়েছিলেন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সুবর্ণাকে মডেল হিসেবে বলা হলেও তার দাবি, ওইভাবে তিনি মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত নন। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দারাজে পার্টটাইম কাজ করতেন।
টুলেট দেয়ার সময় সুবর্ণাকে ডা. সাবিরা বলেছিলেন, তার স্বামী বিদেশ থাকেন। তবে পরে সুবর্ণা জানতে পারেন, ডা. সাবিরার স্বামী থাকেন ঢাকার শান্তিনগরে। সাবিরা কোনো ধরনের মানসিক চাপ বা ব্যক্তিগত জটিলতার মধ্যে ছিলেন কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানেন না বলে দাবি করছেন সুবর্ণা।
সাবিরা রহমান কলাবাগানের ৫০/১ নম্বর বাসায় ওঠার আগে থাকতেন একই এলাকার বশিরউদ্দীন রোডের একটি ভবনে। সেই ভবনের মালিক ফজলুল হক জানান, সাবিরার সঙ্গে তার মায়ের সম্পর্ক ভালো ছিল না। দুই সন্তান নানির ভক্ত হওয়ায় মায়ের সঙ্গে দূরত্ব ছিল।
ফজলুল হক বলছেন, দ্বিতীয় স্বামী শামসুদ্দিন আজাদের সঙ্গে ডা. সাবিরার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। শামসুদ্দিন-সাবিরার ঘরে যে মেয়েসন্তান আছে তার খরচ দিতেন শামসুদ্দিন। তবে প্রথম পক্ষের স্ত্রী ও তার সন্তান পছন্দ করতেন না বলে সাবিরা আলাদা থাকতেন। এসব বিষয় নিয়ে মানসিক কষ্টে ভুগছিলেন সাবিরা। প্রায়ই কান্নাকাটি করতেন।
তবে সাবিরার প্রথম পক্ষের সন্তান আহমেদ তাজওয়ারের দাবি, মায়ের সঙ্গে তাদের কোনো টানাপোড়েন ছিল না। সাবিরার প্রথম ও দ্বিতীয় পক্ষের দুই সন্তান তার মায়ের কাছেই বড় হয়েছেন। এ জন্যই দুই সন্তান নানির কাছে আছেন।
তাজওয়ারের দাবি, করোনা সংক্রমণ শুরুর পর সন্তানদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই সাবিরা আলাদা বাসায় থাকতে শুরু করেন।
ডা. সাবিরা ছেলেকে কানাডা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এই খরচ জোগাড় করতে তিনি নিজের গহনা বিক্রি করেন বলে জানান তাজওয়ার। তবে তিনি এও বলছেন, একসঙ্গে থাকলে কিছু মনোমালিন্য হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সে ধরনের কিছু ঘটনা তাদের পরিবারেও ঘটেছে।
অর্থ হাতিয়ে নিতে ডা. সাবিরাকে খুন করা হতে পারে এমন ধারণার পক্ষে নন তাজওয়ার। তিনি বলছেন, ‘তেমন ঘটনা ঘটলে অন্য কারও তো টাকা পাওয়ার কথা নয়। সব টাকা তো আমারই থাকবে।‘
ডা. সাবিরার বাসায় সুবর্ণা চার মাস সাবলেট থাকলেও তাজওয়ার বলছেন, তিনি কখনও সুবর্ণার নামও শোনেননি, মায়ের বাসায় গেলেও কখনও তাদের কথা হয়নি।
সৎবাবার সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না বলেও দাবি করছেন তাজওয়ার।
ডা. সাবিরার বিষয়ে তথ্য জানতে তার দ্বিতীয় স্বামী শামসুদ্দিন আজাদের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পায়নি নিউজবাংলা।
ডা. সাবিরা ছিলেন গ্রিন লাইফ হাসপাতালের কনসালট্যান্ট চিকিৎসক। সহকর্মীরা বলছেন, কর্মক্ষেত্রে তার সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল না। তিনি নিয়মিত নামাজ-রোজা করতেন। ছিলেন যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী।
ডা. সাবিরার ফ্ল্যাটে গৃহকর্মীর কাজ করতেন শাপলা আক্তার। ভবনের দারোয়ান রমজান বলছেন, ২০২১ সালের শুরু থেকেই শাপলা ওই ফ্ল্যাটে কাজ করেন। শুরুতে সকাল-বিকেল কাজ করলেও মাস খানেক পর থেকে তিনি দুপুরের পর এক বেলা কাজে আসতেন।
রমজানের তথ্য বলছে, খুনের ঘটনার আগের দিন কাজে আসেননি শাপলা। এর কারণ নিউজবাংলা জানতে পারেনি।
ডা. সাবিরার মায়ের বাসার গাড়িচালকের নাম আামিন। ওই পরিবারে ৪ বছর চাকরির পর ২০১৮ সালে চাকরি ছাড়েন আমিন। তবে এরপরেও সাবিরার পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল।
প্রায়ই বাসার বাজার করে দিতেন আমিন। ডা. সাবিরার ভাড়া বাসাতেও মাঝেমধ্যে তার যাতায়াত ছিল। আমিন বলছেন, সবশেষ ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি সাবিরার বাসায় কিছু আসবাবপত্র দিতে যান।
শাপলা ও আমিনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।
মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব এখন পিবিআইয়ের কাছে। পিবিআই প্রধান (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার জানাচ্ছেন, বলার মতো অগ্রগতি এখনও আসেনি।
তিনি বলেন, ‘রহস্য উদ্ঘাটনে বিভিন্নমুখী কাজ আমাদের করতে হয়, সেগুলো করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত কিলারকে শনাক্ত করা না যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা বলব যে মামলার তেমন অগ্রগতি হয়নি।’
৮ মাস পেরিয়ে গেছে এই হত্যার। কিন্তু রহস্য ঘিরে আছে প্রতিটি অংশে। বহুবার তদন্তকারীরা ভেবেছেন এই বুঝি পাওয়া গেল খুনের মোটিভ, চিহ্নিত হতে যাচ্ছে ডা. সাবিরার খুনি!
তবে তারপরই আবার ঘিরে ধরেছে অন্ধকার। আর এভাবেই রহস্যের জালে আটকে আছে ডা. সাবিরা লিপির হত্যাকাণ্ড।
সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়ে দোয়া মোনাজাতের মধ্য দিয়ে নিজ কার্যালয়ে কাজ শুরু করেন নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল
নবনিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের কিছু আইন কর্মকর্তার অনিয়ম, নোট বাণিজ্য ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আজ দেশের ১৮তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিজের কার্যালয়ে প্রথম কর্মদিবসে এসে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
এর আগে সকাল ১১টার দিকে সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়ে দোয়া মোনাজাতের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করেন নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল। এসময় সিনিয়র আইনজীবীরা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
এ সময় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহফুজুর রহমান মিলন, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ফিদা এম কামাল, সিনিয়র আইনজীবী ও সংসদ সদস্য ফজলুল রহমান, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরশাদুর রউফ, মুহাম্মদ আবদুল জব্বার ভুঞা ও মোহাম্মদ অনীক আর হক প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।
গত বুধবার ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলকে দেশের ১৮তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিল না করা এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মাদারীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শাজাহান খানের মেয়ে ঐশী খানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুন বাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন এক নিয়মিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান। কমিশনের সহকারী পরিচালক এস. এম. রাশেদুল হাসান বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ঐশী খানের নামে অনুসন্ধানে ১ কোটি ৭০ লাখ ২২ হাজার ৭৫০ টাকার সম্পদ এবং ১১ লাখ ৪৯ হাজার ২৬৪ টাকার পারিবারিক ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়। মোট ১ কোটি ৮১ লাখ ৭১ হাজার ৯০৪ টাকার সম্পদের বিপরীতে তার বৈধ আয় পাওয়া যায় মাত্র ১০ লাখ ৫৩ হাজার ৮৯২ টাকা। তার নামে ১ কোটি ৭১ লাখ ১৮ হাজার ৯২ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক।
এছাড়া তার নামে বা বেনামে আরও সম্পদ থাকার সম্ভাবনার কথাও অনুসন্ধান টিম প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।
দুদক জানায়, অনুসন্ধানের ভিত্তিতে কমিশন তাকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ জারি করে। নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়েও নোটিশ প্রদান সম্ভব না হওয়ায় গত ১০ জুলাই সম্পদ বিবরণী ফরম লটকিয়ে জারি করা হয়। পরে তিনি এক মাস সময় বৃদ্ধির আবেদন করলে নির্ধারিত ২১ কার্যদিবসের পাশাপাশি, আরও ১৫ কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়। তবে বাড়তি সময় পেলেও তিনি সম্পদ বিবরণী দাখিল করেননি।
দুদক উল্লেখ করে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিল না করা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬ (২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পাশাপাশি তার নামে বিপুল অপ্রদর্শিত ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ পাওয়ায় ২৭ (১) ধারার অভিযোগও প্রযোজ্য বলে কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়।
ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্লট দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা পৃথক ৩ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন মামলার রায় ঘোষণা করেন।
এর আগে ২৩ নভেম্বর যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আদালত রায়ের তারিখ ধার্য করেন। এই তিন মামলায় কেবল রাজউকের সাবেক সদস্য (ভূমি ও স্থাপনা) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম আত্মসমর্পণের পর কারাগারে রয়েছেন।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে শেখ হাসিনা, তাঁর দুই ছেলে-মেয়ে, ছোট বোন শেখ রেহানা ও তাঁর দুই ছেলে-মেয়ের নামে প্রতিটি ১০ কাঠা করে ছয়টি প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির অভিযোগে করা ছয়টি মামলার মধ্যে এই তিনটির রায় হয়েছে আজ।
এ ছাড়া শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও রেহানার বড় মেয়ে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে করা অপর একটি মামলার রায়ের দিন ধার্য রয়েছে আগামী ১ ডিসেম্বর। আজ যে তিন মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলোর যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে হয় ২৩ নভেম্বর। সেদিনই রায়ের এই তারিখ ধার্য করা হয়।
চলতি বছরের ১২,১৩ ও ১৪ জানুয়ারি এই তিন মামলাসহ ছয়টি মামলা করে দুদক। ২৫ মার্চ প্রতিটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ৩১ জুলাই আদালত এই তিন মামলায় শেখ হাসিনাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
অভিযোগপত্রে শেখ হাসিনার নামে প্লট বরাদ্দের মামলায় তিনিসহ ১২ জন আসামি। আরেক মামলায় জয়সহ ১৭ জন এবং অন্য মামলায় পুতুলসহ ১৮ জন আসামি। প্রতিটি মামলায়ই শেখ হাসিনা এবং রাজউক ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা আসামি। ছয় মামলার মধ্যে বাকি তিনটি মামলা ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এ বিচারাধীন। এর মধ্যে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, টিউলিপ ও অন্যদের বিরুদ্ধে করা মামলার রায়ের জন্য ১ ডিসেম্বর রায়ের দিন ধার্য রয়েছে।
অপর দুটি মামলা করা হয়েছে শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক, মেয়ে আজমির সিদ্দিকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে। এ দুই মামলায়ও শেখ হাসিনা ও রাজউকের কর্মকর্তারা আসামি। এ দুটি মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ৩০ নভেম্বর ও ১ ডিসেম্বর দিন ধার্য আছে।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সরকারের সর্বোচ্চ পদে থাকাকালে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের ওপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তাঁরা বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও অসৎ উদ্দেশ্যে পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরের ২০৩ নম্বর সড়কের ৬টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বহুল আলোচিত সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। রায়ে ৬ আসামির যাবজ্জীবন দণ্ডও বহাল রেখেছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় প্রকাশ করেছেন। এখন ৩০ দিনের মধ্যে আসামিরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন।
এর আগে এ বছরের ২ জুন মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় প্রদীপ কুমার দাশ ও লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ৬ আসামির যাবজ্জীবন দণ্ড বহাল রাখেন আদালত। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামির ৫০ হাজার টাকার জরিমানার আদেশও বহাল রাখা হয় রায়ে। যাবজ্জীবন বহাল থাকা আসামিরা হলেন— টেকনাফ থানার সাবেক এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল রুবেল শর্মা, সাগর দেব, কক্সবাজারের বাহারছড়ার মারিশবুনিয়া গ্রামের মো. নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আইয়াজ ও মো. নিজাম উদ্দিন।
এই মামলায় গত ২৯ মে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানি শেষ হয়।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৯টায় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের তৎকালীন কর্মকর্তা পরিদর্শক লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান। ঘটনার পাঁচ দিন পর ২০২০ সালের ৫ আগস্ট নিহত সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেন। ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেয়ে র্যাব। অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল এই মামলায় রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড এবং টেকনাফ থানার এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত এবং কনস্টেবল রুবেল শর্মা ও সাগর দেবকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া কক্সবাজারের বাহারছড়ার মারিশবুনিয়া গ্রামের মো. নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আইয়াজ ও মো. নিজাম উদ্দিনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি সাত আসামি খালাস পান। পরে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। কারাগারে থাকা দণ্ডিত আসামিরা আপিল করেন।
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এ মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
সোমবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ঐতিহাসিক এ রায় ঘোষণা করেন। রায় প্রদানকারী এই ট্রাইব্যুনালে অপর দুই সদস্য বিচারক হলেন মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
বহুল আলোচিত এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ এনে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছিলেন প্রসিকিউশন।
অন্যদিকে, আসামিদের নির্দোষ দাবি করে খালাস চায় তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী। এছাড়া রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের খালাস চান তার আইনজীবী।
এই মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এস. এইচ. তামিম শুনানি করেন। এছাড়া শুনানিতে প্রসিকিউটর বি. এম. সুলতান মাহমুদ, শাইখ মাহদি, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্য প্রসিকিউটরা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। আর রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।
ঐতিহাসিক এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের পিতাসহ স্বজনহারা পরিবারের অনেকে। এছাড়া স্টার উইটনেস হিসেবে সাক্ষ্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী নাহিদ ইসলাম এবং দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। সর্বোমোট ৫৪ জন সাক্ষী এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
একপর্যায়ে দোষ স্বীকার করে ঘটনার সত্যতা উদ্ঘাটনে (অ্যাপ্রুভার) রাজসাক্ষী হন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে মামলার বৃত্তান্ত
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত থেকে শুরু করে বিচার—সব পর্যায়ের বৃত্তান্ত এভাবে এগিয়েছে।
মামটির নম্বর আইসিটি বিডি কেস নম্বর ২/২০২৫। চিফ প্রসিকিউটর বনাম শেখ হাসিনা ও অন্যান্য শিরোনামে দায়ের হওয়া এই মামলায় আসামি করা হয়েছে ক্ষমতাচ্যূত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে।
অভিযোগ প্রাপ্তি ও তদন্ত শুরু
২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট এবং ২৯ অক্টোবর অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত শুরু হয়। মিস কেস নং ০২/২০২৪ করা হয় ১৬ অক্টোবর। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় ১৬ অক্টোবর এবং অন্যদের বিরুদ্ধে ১৭ অক্টোবর। গ্রেপ্তার আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে গত ১৬ মার্চ গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
তদন্ত প্রতিবেদন ও চার্জ
তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয় ১২ মে। ১ জুন দাখিল হয় ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ। এতে ১৪ খণ্ডে প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার দালিলিক সাক্ষ্য জমা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল পত্রুপত্রিকা, দেশি-বিদেশি অনুসন্ধান প্রতিবেদন, শহীদ ও আহতদের তালিকাসহ গেজেট, বই, স্মারকগ্রন্থ, ঘটনাভিত্তিক তালিকা, গ্রাফিতির বই, অভ্যুত্থানকালীন প্রকাশিত পত্রিকার প্রথমপাতার সংকলন, আহতদের চিকিৎসা সনদ, পোস্টমর্টেম ও সুরতহাল প্রতিবেদন, অস্ত্র ও বুলেট ব্যবহারের জিডি, হেলিকপ্টারের ফ্লাইট শিডিউলসহ নানান নথি। ৯৩টি প্রদর্শনীর মাধ্যমে এসব দালিলিক সাক্ষ্য ও ৩২টি বস্তু প্রদর্শনীর মাধ্যমে বুলেট, পিলেট, রক্তমাখা কাপড়, ভিডিও, অডিও, ডিভিডি, পেনড্রাইভ ও বই ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়।
মোট ৮৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি জমা পড়ে, যার মধ্যে ৫৪ জন সরাসরি সাক্ষ্য দেন। ১৭ জুন পলাতক আসামিদের জন্য দুই জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ২৪ জুন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। ১ জুলাই চার্জ শুনানি শুরু হয় এবং ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করা হয়। এ সময় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দোষ স্বীকার করেন।
প্রসিকিউশনের ওপেনিং স্টেটমেন্ট উপস্থাপন করা হয় ৩ আগস্ট; একই দিন সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্রথম সাক্ষী ছিলেন গুরুতর আহত খোকন চন্দ্র বর্মন। ৮ অক্টোবর শেষ সাক্ষ্য দেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর। মোট ৫৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ১২ অক্টোবর শুরু হয় যুক্তিতর্ক। ২৩ অক্টোবর এটর্নি জেনারেলের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তা শেষ হয় এবং রায়ের তারিখ ঘোষণার জন্য অপেক্ষায় রাখা হয়। ১৩ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল ১৭ নভেম্বরকে রায় ঘোষণার দিন ধার্য করে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগসমূহ
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগ ১: চব্বিশের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের রাজাকারের বাচ্চা রাজাকারের নাতিপুতি সম্মোধন করে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। এরপর ওবায়দুল কাদেরসহ কয়েকজন নেতা একই ধরনের মন্তব্য করেন। এসব বক্তব্যের পর ছাত্ররা আন্দোলনে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা আন্দোলনকারীদের উপর আক্রমণ করে ও নির্যাতন চালায়।
অভিযোগ ২: কাউন্ট-১, ১৪ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মাকসুদ কামালকে ফোন দিয়ে আসামি শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের রাজাকার ট্যাগ দিয়ে তাদের ফাঁসি অর্থাৎ হত্যার নির্দেশ দেন।
কাউন্ট-২, ১৮ জুলাই শেখ ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে কথোপকথনে লেথাল উইপন (মরণাস্ত্র) ব্যবহারের নির্দেশ, ড্রোন ব্যবহার করে অবস্থান শনাক্ত করা এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলি করার নির্দেশসহ সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পুড়িয়ে জনতার উপর দায় চাপানোর নির্দেশনা প্রদান করেন।
কাউন্ট-৩, হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে ফোনে ২ বার কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের ওপর হেলিকপ্টার থেকে বোমা নিক্ষেপ, আটক-নির্যাতন এবং বিএনপি, জামায়াত ও জঙ্গি ট্যাগ দেওয়ার নির্দেশ দেন।
অভিযোগ ৩: ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ।
সাক্ষ্যপ্রমাণ:
শেখ হাসিনার ১৪ জুলাইয়ের সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও, ঢাবি ভিসি মাকসুদ কামালের সঙ্গে কথোপকথনের রেকর্ড, আবু সাঈদকে পুলিশের গুলির সময় এনটিভির লাইভ ভিডিও ও মূল কপি, আবু সাইদের পাঁচটি পোস্টমর্টেম রিপোর্ট যা পুলিশের নির্দেশে চারবার পরিবর্তন করা হয়, ওই ঘটনায় সাজানো মামলার নথি, আবু সাঈদের পরিবারের সদস্য, সাংবাদিক, ডাক্তার, ছাত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য।
অভিযোগ ৪: চব্বিশের ৫ আগস্ট ঢাকার চানখারপুল এলাকায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ।
অভিযোগ ৫: চব্বিশের ৫ আগস্ট আশুলিয়া থানা এলাকায় ছয়জনকে হত্যা করে তাদের লাশ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ।
জনগণকে শান্ত, সংযত ও দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের
এদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রায় ঘোষণার পর এক বিবৃতিতে জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড একটি ঐতিহাসিক রায়। এই রায়ের গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করে সর্বস্তরের জনগণকে শান্ত, সংযত ও দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানানো হয়।
সোমবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এতে বলা হয়েছে, রায়-পরবর্তী সময়ে কোনো ধরনের উচ্ছৃঙ্খলতা, উত্তেজনাপ্রসূত আচরণ, সহিংসতা বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য সবাইকে বিশেষ অনুরোধ জানানো হচ্ছে। জনগণের, বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্বজনদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এই রায়কে ঘিরে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই আবেগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে সেই আবেগের বশবর্তী হয়ে যেন কেউ জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে এমন কোনো পদক্ষেপ না নেয়—সরকার এ বিষয়ে দৃঢ়ভাবে সবাইকে সতর্ক করছে।
জাতি ঐক্যবদ্ধ আর জনগণ যদি জেগে থাকে তাহলে দেশের ভাগ্য নিয়ে বা দেশে নৈরাজ্য করার শক্তি কারোরই কোনোদিন ছিল না কিংবা হবেও না বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
শেখ হাসিনার মামলার রায়ের দিন ধার্যের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) দুপুরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
রায় ঘোষণার দিন ধার্য ঘিরে দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, সরাসরি যদি কেউ বিচারপ্রক্রিয়াকে বানচালের জন্য কোনো হুমকি দেন কিংবা কোনো কার্যক্রম করেন, সেটা আদালতের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার শামিল হবে। আমরা আমাদের আইনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে চাই। তবে দেশে সরকার আছে, জনগণ আছেন তারা সবকিছু ভালো বোঝেন। এছাড়া যারা উসকানি দেবেন বা সন্ত্রাসের চেষ্টা করবেন সে ব্যাপারে আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতেও হবে। আমরা বাংলাদেশের জনগণের দেশপ্রেম ও ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। দেশের সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বাহিনীর প্রতি আমাদের আস্থা রয়েছে। আশা করি যা কিছু বিচ্ছিন্নভাবে ঘটছে সেগুলো কোনো জায়গায় প্রভাব পড়বে না। সবকিছু স্মুথলি হবে এবং বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাবে।
বিচারকাজ নিয়ে জাতিসংঘে আওয়ামী লীগের অভিযোগ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, যারা যা খুশি প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করতে পারেন। এই বিচার আমরা যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসেছি সেটা ট্রান্সপারেন্ট (স্বচ্ছ) ছিল। এখানে অকাট্য ও শক্তিশালী সাক্ষ্যপ্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। জাতির সামনে এই বিচার হয়েছে। আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দুনিয়ার সামনে ক্রিস্টাল ক্লিয়ারভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সুতরাং তারা যত খুশি প্রশ্ন করতে পারেন। আইন নিজস্ব গতিতে চলবে। ন্যায়বিচার নিজস্ব গতিতেই চলবে।
এদিন দুপুর ১২টা ৯ মিনিটে জুলাই গণহত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিনজনের রায়ের দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন নির্ধারণ করেন। ট্রাইব্যুনালের বাকি সদস্যরা হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদসহ অন্যরা। শেখ হাসিনা ও কামালের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। এছাড়া মামুনের আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদও ছিলেন।
গত ২৩ অক্টোবর এ মামলায় সমাপনী বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রধানমন্ত্রীসহ হেভিওয়েট নেতাদের যেভাবে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল; সেসব বর্ণনা ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন তিনি। একইসঙ্গে শেখ হাসিনা ও কামালের সর্বোচ্চ সাজা দাবি করেন। পরে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর যুক্তি উপস্থাপনের কয়েকটি বিষয়ে জবাব দেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এরপর তাদের কিছু কথার পাল্টা উত্তর দেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী আমির হোসেন। পরে রায়ের তারিখ ঘোষণার জন্য আজকের দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। এর সপ্তাহখানেকের মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার রায় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে জুলাই গণহত্যার প্রথম কোনো রায় শুনবে এ জাতি।
এ মামলায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের নামও রয়েছে। তবে রাজসাক্ষী হয়ে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি। এজন্য যুক্তিতর্কে শেখ হাসিনা-কামালের চরম দণ্ড বা সর্বোচ্চ সাজা চাইলেও তার ব্যাপারে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছে প্রসিকিউশন। মামুনের আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদও তার অ্যাকুইটাল (খালাস) চেয়েছেন। সবমিলিয়ে সাবেক এই আইজিপির মুখে হাসি ফুটবে নাকি অন্য কিছু; তা জানা যাবে রায় ঘোষণার দিন।
শেখ হাসিনার এ মামলায় ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন ৫৪ জন। তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় চলতি বছরের ৩ আগস্ট। প্রথম সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বীভৎসতার চিত্র তুলে ধরেন খোকন চন্দ্র বর্মণ। ৮ অক্টোবর মূল তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীরের জেরার মাধ্যমে শেষ হয় সাক্ষ্যগ্রহণের ধাপ। এরপর প্রসিকিউশন ও স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীর যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয় ২৩ অক্টোবর।
এ মামলায় তিন আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে রয়েছে উসকানি, মারণাস্ত্র ব্যবহার, আবু সাঈদ হত্যা, চানখারপুলে হত্যা ও আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ মোট আট হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার। এর মধ্যে তথ্যসূত্র দুই হাজার ১৮ পৃষ্ঠার, জব্দতালিকা ও দালিলিক প্রমাণাদি চার হাজার পাঁচ পৃষ্ঠার ও শহীদদের তালিকার বিবরণ দুই হাজার ৭২৪ পৃষ্ঠার। সাক্ষী করা হয়েছে ৮৪ জনকে। গত ১২ মে চিফ প্রসিকিউটরের কাছে এ মামলার প্রতিবেদন জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম কার্যালয়ে দায়ের হওয়া একটি মামলায় বন বিভাগের ফরেস্টার সুলতানুল আলম চৌধুরীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (১২ নভেম্বর) চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালত এ আদেশ দেন।
এদিন আসামি সুলতানুল আলম আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন। আদালত শুনানি শেষে তা নামঞ্জুর করেন এবং আসামিকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, বন বিভাগের দাগনভূঞা সামাজিক বন বিভাগের ফরেস্টার সুলতানুল আলম চৌধুরী ১৯৯০ সালে বন বিভাগের নার্সারি প্রকল্পে প্ল্যান্টেশন সহকারী হিসেবে অস্থায়ীভাবে যোগ দেন। ২০০০ সালে তাঁর চাকরি স্থায়ী হয় এবং পরে পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে ফেনীর দাগনভূঞায় কর্মরত আছেন।
২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিল দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের তৎকালীন সহকারী পরিচালক বাদী হয়ে সুলতানুল আসামি করে মামলাটি করেছিলেন। তদন্ত শেষে গত ১২ মার্চ চট্টগ্রাম দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. সালাহউদ্দিন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, সুলতানুল আলম চৌধুরীর দাখিল করা সম্পদ বিবরণীর বাইরে তার নামে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ৪৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য পায় দুদক। এছাড়া, দুদকে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে তিনি আরও ১ লাখ ৬১ হাজার টাকার সম্পদ গোপন করেন।
দুদক চট্টগ্রামের আইনজীবী মো. রেজাউল করিম রনি বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চেয়েছিলেন। কিন্তু আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মন্তব্য