এক দিল আফরোজের দাপটে ধরা শিক্ষা ক্যাডারের ৩৩০৮ জন

এক দিল আফরোজের দাপটে ধরা শিক্ষা ক্যাডারের ৩৩০৮ জন

দিল আফরোজ বিনতে আছির ২০০৬ সাল থেকে কর্মরত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রধান কার্যালয়ে শিক্ষা ভবনে। এই ১৫ বছরে নানা অনিয়মে দিল আফরোজের নাম এসেছে। তারপরও মাউশির সর্বশেষ পদোন্নতির তালিকায় নাম এসেছে তার। এ কারণে বিতর্ক দেখা দেয়ায় আটকে গেছে যোগ্যদের পদোন্নতির প্রক্রিয়াও।

দিল আফরোজ বিনতে আছির। বর্তমানে শিক্ষা ভবনের সবচেয়ে আলোচিত এই কর্মকর্তা ২৪তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগ পান। সমাজবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর একটি কলেজে মাত্র ছয় মাস শিক্ষকতা করেছেন এই নারী। তারপর ২০০৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কর্মরত আছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রধান কার্যালয়ে শিক্ষা ভবনে।

এই ১৫ বছরে নানা অনিয়মে দিল আফরোজের নাম এসেছে। তারপরও মাউশির সর্বশেষ পদোন্নতির তালিকায় নাম এসেছে তার। এ কারণে বিতর্ক দেখা দেয়ায় আটকে গেছে যোগ্যদের পদোন্নতির প্রক্রিয়াও।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের চাকরির ক্ষেত্রে একই স্থানে তিন বছরের বেশি সময় থাকার নিয়ম নেই। অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়ম মানা হচ্ছে না শিক্ষা ভবনের কারও কারও ক্ষেত্রে, বিশেষ করে মাউশির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন উইংয়ের সহকারী পরিচালক দিল আফরোজ বিনতে আছিরের ক্ষেত্রে।

তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে শিক্ষা ভবনে থেকে গেছেন। পদোন্নতিও পেয়েছেন একাধিকবার। সর্বশেষ ২০১২ সালে পদোন্নতি পেয়ে তিনি হন মাউশির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন উইংয়ের সহকারী পরিচালক। সেই থেকে তিনি এই ‘লাভজনক’ পদেই আছেন।

সব মিলিয়ে এখন পুরো শিক্ষা ভবনই যেন দিল আফরোজ বিনতে আছিরের কবজায়। এই সুযোগে নানা ধরনের অনিয়মে জড়িয়েছেন তিনি, সে জন্য তার বিরুদ্ধে হয়েছে একাধিক মামলাও।

এক দিল আফরোজের দাপটে ধরা শিক্ষা ক্যাডারের ৩৩০৮ জন

এসব অভিযোগ এবং মামলা থাকা সত্ত্বেও দিল আফরোজ বিনতে আছিরের পদোন্নতির জন্য তার নামও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে মাউশি থেকে। এ খবরে ক্ষুব্ধ পদোন্নতিবঞ্চিত হাজার হাজার শিক্ষক; সমালোচনা চলছে খোদ মাউশিতেও।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, ঢাকা শহরের মধ্যবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে বিভাগীয় মামলা চলছে দিল আফরোজ বিনতে আছিরের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে একটি সিআর মামলা চলছে ঢাকার সিএমএম কোর্টে সহকর্মীর বেতন অন্য হিসাবে পাঠানোর এবং ওই প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে। এ ছাড়া ১০ স্কুল প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পে তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

আইন-বিধান মোতাবেক কারও বিরুদ্ধে সিআর মামলা বা বিভাগীয় মামলা চললে তিনি পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হবেন না। কিন্তু দিল আফরোজ বিনতে আছিরের নাম পদোন্নতির তালিকায় কীভাবে গেল, সে বিষয়েও মাউশির দায়িত্বরত কেউ মুখ খুলছেন না।

এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও পদোন্নতি কমিটির সদস্য ফজলুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘পদোন্নতির তো একটা বিধান আছে। তবে এ বিষয়টি এখন আমার নলেজে নেই। আপনি মাউশির মহাপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি ভালো বলতে পারবেন।’

নিউজবাংলা এরপর যোগাযোগের চেষ্টা করে পদোন্নতি কমিটির সদস্যসচিব ও মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুকের সঙ্গে। গত দুই দিনে তার মোবাইল ফোনে ১৫ বার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। প্রতিবারই সংযোগ কেটে দেন পদোন্নতি কমিটির সদস্যসচিব ও মাউশির মহাপরিচালক সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এবার যোগ্যদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে শিক্ষা ক্যাডারের ১ হাজার ৮০ জনকে সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এর বড় একটি অংশ সহকারী অধ্যাপক হওয়ার পর এক দিনের জন্যও শ্রেণিকক্ষে ক্লাস নেননি। কিন্তু তাদের নাম এসেছে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির তালিকায়।

প্রায় ৯ বছর ধরে মাউশির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন উইংয়ের সহকারী পরিচালক পদে থাকা দিল আফরোজ বিনতে আছিরের বিরুদ্ধে দুটি মামলা চলার পরও পদোন্নতির জন্য তাকে ‘ফ্রেশ প্রার্থী’ হিসেবে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোয় যোগ্য সবার পদোন্নতি আটকে আছে। এ-সংক্রান্ত জিও জারি করতে দেরি হচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, দিল আফরোজ বিনতে আছিরের পদোন্নতির জন্য ‘বড় স্যাররা তদবির করেছেন’।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাউশির এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে জানান, প্রথমে দিল আফরোজ বিনতে আছিরের কারণে পদোন্নতির রেজল্যুশনে সই করতে অস্বীকার করেন মহাপরিচালক স্যার নিজেই। পরবর্তী সমযে কোনো না কোনো কারণে তিনি সই করেছেন।

গত ৯ মে শিক্ষা ক্যাডারের ৩ হাজার ৩০৮ জন কর্মকর্তার পদোন্নতিসংক্রান্ত সভা শুরু হয়, যা চলে সাত কর্মদিবস।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষা ক্যাডারের ২২তম বিসিএসের ৫৫০ জন ১২ বছর ধরে পদোন্নতি পাননি। এভাবে ২৩ ব্যাচের ১৭ জন প্রায় এক যুগ এবং ২৪ ব্যাচের ১ হাজার ৮৪৮ জন প্রায় ১০ বছর এক পদে আছেন। এ ছাড়া ২৫ ব্যাচের ১১২ জনের ও ২৬ ব্যাচের ৬৪৬ জনের পদোন্নতির যোগ্যতা থাকলেও একটি সিন্ডিকেটের বাধায় তারা বঞ্চিত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পদোন্নতিসংক্রান্ত ওই সভায় যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হবে- এমন আশায় ছিলেন শিক্ষা ক্যাডারের বঞ্চিত এসব কর্মকর্তা, যা শুধু হতাশায় পরিণত হয়েছে।

একাধিক শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে নিউজবাংলাকে বলেন, এক দিল আফরোজ বিনতে আছিরের কারণে দিনের পর দিন যোগ্যদের বঞ্চিত করার কোনো অর্থ হয় না। বিষয়টি নিয়ে সরকারের শীর্ষ মহলের হস্তক্ষেপ আশা করছেন তারা।

এ সব অভিযোগের ব্যাপারে দিল আফরোজ বিনতে আছিরের বক্তব্য জানতে তার মোবাইলে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন:
মাধ্যমিকের সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচি প্রকাশ
ডিজিটাল হলো মাউশির ১৩০ সেবা

শেয়ার করুন

মন্তব্য

ভিকারুননিসায় ‘ব্যয় মানেই অনিয়ম’

ভিকারুননিসায় ‘ব্যয় মানেই অনিয়ম’

ছোট ছোট ব্যয় হলেও সবই নিয়মের বাইরে। খরচ হলেও নথিপত্র নেই। মালামাল কেনার দাবি করা হলেও আদৌ পণ্য এসেছে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত রাজধানীর স্বনামধন্য স্কুলটিতে কী কী অনিয়ম হয়েছে, তা উঠে এসেছে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।

ফেসবুকে ফাঁস হওয়া একটি ফোনালাপকে কেন্দ্রকে ফের আলোচনায় রাজধানীর নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এর মধ্যে নিউজবাংলার হাতে এলো নানা কাজের অজুহাতে প্রতিষ্ঠানটির যাচ্ছেতাই অর্থ খরচের নথি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির খরচের ৫ কোটি টাকা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।

অনিয়মগুলো একেকটি টাকার অঙ্কে খুব বেশি নয়। তবে ছোট ছোট বেশ কিছু অনিয়ম এক হয়ে টাকার পরিমাণ বেশ বড় হয়ে দাঁড়ায়।

অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, আসবাবপত্র না পেয়েই বিল পরিশোধ, দরপত্রের বাইরে বিল পরিশোধ, বিল ভাউচার ছাড়াই টাকা খরচ, সরকারি কোষাগারে করের টাকা জমা না দেয়াসহ নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে স্কুলটিতে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত পাঁচ বছরে ভিকারুননিসার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, অধ্যক্ষ ও শিক্ষক-কর্মচারীরা আয়কর বাবদ ২ কোটি ১৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেননি।

এ অনিয়মগুলো যখন হয়েছে, তখন অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বেশ কয়েকজন। তারা হলেন ফেরদৌসী বেগম, কেকা রায় চৌধুরী, নাজনীন ফেরদৌস, হাসিনা বেগম, সুফিয়া বেগম ও ফৌজিয়া রেজওয়ান।

এদের মধ্যে কয়েকজন দুই থেকে ৬ মাস আর সবচেয়ে বেশি সোয়া এক বছর দায়িত্ব পালন করেছেন ফৌজিয়া। তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত।

অডিট আপত্তিতে উঠে আসা অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ফৌজিয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাকে অফিশিয়ালি বিষয়টি জানানো হয়নি। যদি জানানো হয়, তাহলে আমি জবাব দেব।’

অন্য দুই সাবেক অধ্যক্ষ ফেরদৌসী বেগম ও কেকা রায় চৌধুরীও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ফেরদৌসী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব ছেড়েছি অনেক আগে। এসব বিষয়ে কথা বলতে চাই না।’

কেকা বলেন, ‘এখন এসব বিষয়ে কথা বলার সময় না।’

বর্তমান অধ্যক্ষ যা বলছেন

বর্তমান অধ্যক্ষ কামরুন নাহার জানালেন, এসব অনিয়মগুলো তার জানা আছে। তিনি বলেন, এগুলো হয়েছে তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণের আগে। আর তিনি এগুলোর সমাধান চান।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের স্কুলের গভর্নিং বডির (পরিচালনা পর্ষদ) সভাপতির হাতে তারা প্রতিবেদনটি দিয়েছেন। আমি এখনও প্রতিবেদনটি দেখিনি। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে নিয়ম-নীতি মেনে কাজ করার জন্য চেষ্টা করছি।

‘প্রতিবেদনটি দেখে খুব সহসাই এর জবাব দেয়া হবে এবং নিয়ম অনুযায়ী আপত্তিগুলো নিষ্পত্তি করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যত টাকার আপত্তি জানানো হয়েছে, তার সবগুলো সে সময়ের দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অধ্যক্ষ কামরুন নাহার বলেন, ‘সরকারের যদি পাওনা থাকে, অবশ্যই তা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।’

কবে নিরীক্ষা

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর গত ১৮ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ভিকারুননিসার আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে নিরীক্ষা চালায়। দলটি ২০১৫-২০১৬ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০২০ অর্থবছর পর্যন্ত ৫ বছরের আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করে।

তাদের প্রতিবেদন গত মাসের শেষে জমা দেয়া হয় পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে। এর একটি কপি স্কুল পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিকেও দেয়া হয়েছে।

নিরীক্ষা দলের এক সদস্য নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভিকারুননিসায় গত পাঁচ বছরের আর্থিক লেনদেন নিরীক্ষা করে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম পাওয়া গেছে, যা আমাদের অডিট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এই প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। স্কুলের গভর্নিং বডিকেও দিয়েছি জবাব দেয়ার জন্য।’

ভিকারুননিসায় ‘ব্যয় মানেই অনিয়ম’

প্রতিবেদনটি জমা দেয়া হয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেও। এখন কী ব্যবস্থা নেয়া হবে জানতে চাইলে বোর্ডের চেয়ারম্যান নেহাল আহমেদ কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

তিনি বলেন, ‘অডিট আপত্তির বিষয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ জবাব দেবে।’

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যত আপত্তি

ভ্যাট জমা না দেয়া

২০১৫-২০১৬ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০২০ অর্থবছর পর্যন্ত ভ্যাট বাবদ মোট ১ কোটি ৩৯ লাখ ৯৪ হাজার ১৬২ টাকা আদায় করে ভিকারুননিসা স্কুল কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয় ১ কোটি ৭১ হাজার ৬১৫ টাকা। আর বাকি ৩৯ লাখ ২২ হাজার ৫৪৭ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে চালানের কপি মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির সম্পত্তি থেকে ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত আয়ের ওপর ৪৫ লাখ ২৮ হাজার ৩০০ টাকার ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা পড়েনি। এ অর্থ ফেরত দেয়ার দিতে নির্দেশ দেয়া হয় প্রতিবেদনে।

আয়কর ফাঁকি

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত পাঁচ অর্থবছরে ভিকারুননিসার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, অধ্যক্ষ ও শিক্ষক-কর্মচারীরা মোট ২১ কোটি ৮৭ লাখ ৩৮ হাজার ২৩২ টাকা সম্মানি বাবদ নিয়েছেন। এর বিপরীতে আয়কর বাবদ ২ কোটি ১৮ লাখ ৭৩ হাজার ৮২২ টাকা পরিশোধ করা হয়নি।

প্রতিবেদনে এটি রাজস্ব ফাঁকি হিসেবে উল্লেখ করে তা শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করতে বলা হয়।

দরপত্র ছাড়াই নির্মাণকাজ

ভিকারুননিসার বসুন্ধরা শাখার সিভিল, স্যানিটারি, বৈদ্যুতিক কাজের ১ কোটি ৫৯ লাখ ১১ হাজার ৬৩৯ টাকার কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনএইচ-কেটিএ (জেভি)। এ কাজ দেয়ার ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বান করার কথা থাকলে তা করা হয়নি।

নিরীক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ কাজের বিল পরিশোধে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্যাডে কোনো বিল পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া পাওয়া যায়নি কাজের গুণগত মানের কোনো সনদ।

আসবাবপত্র না পেয়েও বিল পরিশোধ

আসবাব প্রতিষ্ঠান জুটো ফাইবার গ্লাসকে (তারাবো, নারায়ণগঞ্জ) ১৯০ জোড়া ফাইবার গ্লাস (হাই-লো বেঞ্চ) সরবরাহের জন্য বলা হয়। তবে ১৩০ জোড়া হাই লো বেঞ্চ সরবরাহের চালান পাওয়া যায়। আর বাকি ৬০ জোড়ার কোনো চালান পায়নি নিরীক্ষা দল। অথচ ১৯০ জোড়ার বেঞ্চেরই বিল সররবাহ করা হয়। এতে মোট ৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জুটো ফাইবার গ্লাসকে বেইলি রোড শাখায় লো বেঞ্চ এবং হাই বেঞ্চ কিনতে ১২ লাখ ৫৮ হাজার এবং বসুন্ধরা কলেজ শাখার জন্য ১১ লাখ ১৬ হাজার টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে বলেও মনে করে নিরীক্ষা দল।

এসব মালামাল আদৌ কেনা হয়েছে কি না, তাও নিশ্চিত করা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এ টাকা যিনি বা যারা দিয়েছেন, তার বা তাদের কাছ থেকে আদায় করার সুপারিশও করা হয়েছে।

দরপত্রের বাইরেও কাজ, টাকা পরিশোধ নিয়ে আপত্তি

গত বছর বেইলি রোডের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে স্কুল শাখার সীমানা প্রাচীর সংস্কারে ৪ লাখ ৬৫ হাজার ৬৭৮ টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। কাজ পায় মেসার্স আদিবা কনস্ট্রাকশন। তবে দরপত্রের বাইরেও তাদের দিয়ে কাজ করানো হয়। আর সেই কাজে অতিরিক্ত বিল দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

ভিকারুননিসায় ‘ব্যয় মানেই অনিয়ম’

ঠিকাদারকে অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয় ১ লাখ ৭১ হাজার ৭২৭ টাকা। কিন্তু বিল পরিশোধের স্বপক্ষে কোনো নথি পায়নি নিরীক্ষা দল।

প্রাচীর নির্মাণের কাজটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৩০ টাকা বর্গমিটার দরে করবে বলে দরপত্র দাখিল করলেও অতিরিক্ত কাজের বিল পরিশোধের সময় ২২৮ টাকা দরে বিল পরিশোধ করে কলেজ কর্তৃপক্ষ।

বিল ছাড়াই টাকা পরিশোধ

প্রতিবেদনে বলা হয়, খেলাধুলার জন্য বিভিন্ন সরঞ্জাম বিভিন্ন দোকান থেকে কেরা হয়েছে। অথচ একটি প্রতিষ্ঠানের নামে চেক ইস্যু করা হয়েছে। এর পরিমাণ ২ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে মনে করছে নিরীক্ষা দল।

পুরস্কারেও অনিয়ম

২০১৯ সালের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় (যা অনুষ্ঠিত হয় ২০২০ সালে) নিয়ম না মেনেই ৪৭ জন শিক্ষককে সাধারণ পুরস্কার হিসেবে ফ্রাইপ্যান দেয়া হয়। সেখানে খরচ করা হয় ৩২ হাজার ৭০০ টাকা, যা প্রতিবেদনে অপচয় হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন:
মাধ্যমিকের সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচি প্রকাশ
ডিজিটাল হলো মাউশির ১৩০ সেবা

শেয়ার করুন

ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের ডিগ্রির ‘অনুমোদন নেই’

ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের ডিগ্রির ‘অনুমোদন নেই’

ডা. জাহাঙ্গীর কবির। ছবি: ফেসবুক থেকে নেয়া

বিএমডিসিতে আবেদন ও অনুমোদন ছাড়াই চারটি ডিগ্রি ব্যবহার করছেন ডা. জাহাঙ্গীর। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে তাকে চিঠি দিয়েছে বিএমডিসি। ডিগ্রি ব্যবহারের অনুমোদন পেতে আবেদন না করার কথা স্বীকার করেছেন ডা. জাহাঙ্গীরও।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন ২০১০ অনুযায়ী, দেশের চিকিৎসকরা তাদের সাইনবোর্ড, প্রেসক্রিপশন বা ভিজিটিং কার্ডে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি উল্লেখ করতে গেলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) অনুমোদন নিতে হয়।

তবে এই আইন মানেননি কিটো ডায়েটের পরামর্শ দিয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়া ডা. জাহাঙ্গীর কবির। বিএমডিসিতে আবেদন ও অনুমোদন ছাড়াই চারটি ডিগ্রি তিনি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করছেন। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে ডা. জাহাঙ্গীরকে চিঠি দিয়েছে বিএমডিসি। ডিগ্রি ব্যবহারের অনুমোদন পেতে বিএমডিসিতে আবেদন না করার কথা স্বীকার করেছেন ডা. জাহাঙ্গীরও।

আইন অনুযায়ী, প্র্যাকটিস করা যে কোনো চিকিৎসককে তাদের অর্জিত ডিগ্রির সদনের কপি বিএমডিসিতে জমা দিয়ে ব্যবহারের অনুমোদন নিতে হয়। বিএমডিসি সেগুলো যাচাই করে একটি নিবন্ধন নম্বর দেয়। এরপর ডিগ্রির তথ্য বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করার অনুমতি মেলে। তবে ডা. জাহাঙ্গীর কবির তার সাইনবোর্ডে, প্রেসক্রিপশনে যেসব ডিগ্রি উল্লেখ করেছেন সেগুলোর বিষয়ে কোনো আবেদনই করেননি।

ডা. জাহাঙ্গীর এমবিবিএস ছাড়াও চারটি ডিপ্লোমা ডিগ্রি ব্যবহার করছেন। এগুলো হলো ডিপ্লোমা মডিউল ইন ডায়াবেটিস (এডুকেশন ফর হেলথ), ডিপ্লোমা মডিউল ইন অ্যাস্থামা (এডুকেশন ফর হেলথ), ডিপ্লোমা মডিউল ইন সিওপিডি (এডুকেশন ফর হেলথ), স্পিরো ৩৬০ স্পাইরোমেট্রি কোর্স (ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি)। এর কোনোটিই ব্যবহারের অনুমোদন দেয়নি বিএমডিসি।

চিকিৎসকদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি রাইটস অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটিজের (এফডিএসআর) মহাসচিব চিকিৎসক ডা. শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের ব্যবহার করা ডিগ্রিগুলোর অনুমোদন বিএমডিসি দেয়নি। এগুলো আসলে মানুষকে প্রলুব্ধ করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। এটা এক ধরনের প্রতারণার শামিল এবং অবশ্যই নিয়ম লঙ্ঘন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএমডিসির ডেপুটি রেজিস্ট্রার ডা. মো. লিয়াকত হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ডা. জাহাঙ্গীর কবির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে ভিডিও তৈরি করছেন। এই ভিডিওগুলোতে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। এ ছাড়া সাইনবোর্ড, প্রেসক্রিপশন প্যাডে বিভিন্ন ডিগ্রি ব্যবহার করছেন। এর মধ্যে এমবিবিএস-এর পর বাকিগুলো বিএমডিসি থেকে অনুমোদিত নয়। এমন একটি নমুনা প্রেসক্রিপশন প্যাড আমাদের হাতে এসেছে।’

এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই চিঠি হয়তো আজকালের মধ্যে উনার কাছে পৌঁছাবে। ওই চিঠিতে জানতে চাওয়া হয়েছে, তিনি কেন অনুমোদন ছাড়াই ডিগ্রিগুলো ব্যবহার করছেন। আমাদের আইন অনুযায়ী, এটা কী ধরনের শাস্তিযোগ্য অপরাধ সেটাও উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাখ্যা দিতে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে।’

বিএমডিসির পরবর্তী পদক্ষেপ জানতে চাইলে মো. লিয়াকত হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘১৫ দিনে জবাব না এলে ধারাবাহিকভাবে তিনটা চিঠি তার কাছে পাঠানো হবে। এরপরেও জবাব না দিলে ডিগ্রিগুলো নকল ধরে নিয়ে র‌্যাবের সহায়তায় অভিযান পরিচালনা করা হবে। আমাদের সংস্থার কর্মকর্তারা সেই অভিযানে থাকবেন।’

ডিগ্রির অনুমোদনের বিষয়ে বিএমডিসিতে আবেদন না করার কথা স্বীকার করেছেন ডা. জাহাঙ্গীর কবির। তিনি মঙ্গলবার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বিএমডিসি থেকে কোনো চিঠি আমি এখনও পাইনি। যখন চিঠি আসবে তখন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারব। চিঠিতে কী জানতে চাওয়া হয়েছে, তা দেখে করণীয় নির্ধারণ করব।’

এর আগে ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের বিরুদ্ধে ‘অপচিকিৎসার’ অভিযোগ তোলে চিকিৎসকদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি রাইটস অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটিজ (এফডিএসআর)।

এ অভিযোগের পর দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চেয়ে নিজের ফেসবুক পেজ থেকে বিতর্কিত ভিডিওসহ মোট তিনটি পোস্ট সরিয়ে নেয়ার কথা জানান ডা. জাহাঙ্গীর।

তবে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া এফডিএসআর নেতারা বলছেন, ডা. জাহাঙ্গীরকে কিটো ডায়েট সংক্রান্ত সব ভিডিও সরাতে হবে। তা না হলে ‘অপচিকিৎসার’ অভিযোগে মামলা করা হবে তার বিরুদ্ধে। এসব ভিডিও সরিয়ে নিতে ডা. জাহাঙ্গীরকে সাত দিনের সময় দিয়েছে এফডিএসআর।

আরও পড়ুন:
মাধ্যমিকের সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচি প্রকাশ
ডিজিটাল হলো মাউশির ১৩০ সেবা

শেয়ার করুন

পিয়াসার বিলাসী জীবন কীভাবে?

পিয়াসার বিলাসী জীবন কীভাবে?

গ্রেপ্তার মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা। ছবি: সংগৃহীত

আয়ের কোনো নির্দিষ্ট উৎস না পাওয়ায় গ্রেপ্তারের পর পিয়াসার বিলাসী জীবন নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। পুলিশ বলছে, বিত্তবানদের ব্ল্যাকমেইল করে বিপুল পরিমাণ অর্থ দাবি করতেন পিয়াসা ও তার সঙ্গীরা।

মডেল ও অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি থাকলেও কয়েকটি ছাড়া আর কোনো বিজ্ঞাপন চিত্রে দেখা মেলেনি মাদকসহ গ্রেপ্তার ফারিয়া মাহবুব পিয়াসাকে। এমনকি কোনো টিভি নাটক বা সিনেমাতেও দেখা যায়নি তাকে।

পিয়াসা কখনও নিজেকে বেসরকারি টেলিভিশনের পরিচালক, কখনওবা রিসোর্টের মালিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তবে সেই পরিচয়ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আয়ের কোনো নির্দিষ্ট উৎস না পাওয়ায় গ্রেপ্তারের পর পিয়াসার বিলাসী জীবন নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।

বারিধারার যে ফ্ল্যাটটিতে তিনি থাকতেন, সেটি দেখলেও তার বিলাসী জীবন সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। রোববার রাত ১১টার দিকে তাকে গ্রেপ্তারের সময় ওই বাসা থেকে ইয়াবা, মদ ও সিসার সরঞ্জাম জব্দ করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের অভিযানের সময় ওই বাসায় দেখা যায়, ফটক দিয়ে প্রবেশ করলেই বিশাল একটি বসার ঘর। এতে যে আসবাব রয়েছে সেগুলোও অনেক দামি।

পুলিশ বলছে, বিত্তবানদের ব্ল্যাকমেইল করে বিপুল পরিমাণ অর্থ দাবি করতেন পিয়াসা ও তার সঙ্গীরা।

পিয়াসার বিলাসী জীবন কীভাবে?
সোমবার পিয়াসাকে আদালতে হাজির করা হয়। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস

শোবিজে পিয়াসাকে প্রথম দেখা যায় ২০০৮ সালে, টিভি রিয়েলিটি শো সুপার হিরো-হিরোইনের প্রতিযোগী হিসেবে। বেসরকারি টেলিভিশন এনটিভি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন এবং মার্কেট একসেস গ্রুপ যৌথভাবে এই রিয়েলিটি শোর আয়োজন করেছিল।

এটি প্রচারও হতো এনটিভির পর্দায়। ওই সময় প্রতিযোগিতায় পরীক্ষার অংশ হিসেবে ছোট ছোট কিছু কাহিনি চিত্রে তাকে দেখা যায়।

ইউটিউবে থাকা একটি ভিডিওতে দেখা যায় ‘প্রেম ও যুদ্ধ’ নামের একটি প্রোডাকশনে মোহাম্মদ হোসেন জেমীর পরিচালনায় আসিফ ইমরোজের সঙ্গে অভিনয় করেছেন পিয়াসা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনটিভির এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২০০৮ সালে হওয়া সুপার হিরো-হিরোইনের আয়োজনে পিয়াসা হয়েছিলেন তৃতীয় অর্থাৎ সেকেন্ড রানারআপ। শোতে নানা রকম পরীক্ষা দিতে হতো। সেই পরীক্ষার অংশ হিসেবে তাকে কখনও নাচ করতে হয়েছে, কখনও অভিনয় করতে হয়েছে।

‘সেগুলো এনটিভিতে প্রচার হতো, কিন্তু সেটি টেলিভিশনের কোনো প্রোডাকশন না। পরবর্তীতে এনটিভি তাকে নিয়ে কোনো কাজ করেনি।’

ওই রিয়েলিটি শোতে পিয়াসাকে নিয়ে কাজ করা নির্মাতা মোহাম্মদ হোসেন জেমীর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

পরিচালক সমিতির সভাপতি সোহানুর রহমান জানান, পিয়াসা কোনো সিনেমাতে পরবর্তীতে অভিনয় করেননি।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সুপার হিরো-হিরোইনের অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে পরিচালকদের কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু পিয়াসাকে নিয়ে কাজ করা হয়নি। পরে তিনি কোনো সিনেমাতে অভিনয়ও করেননি।

‘আমার সঙ্গে তার দুই-একবার কথা হয়েছিল, কিন্তু সিনেমার কাজ আর আগায়নি। কারণ সে সময় তিনি সোহানা টিভি বা এই নামের মতো কোনো এক প্রতিষ্ঠানের পদে বসেছিলেন।’

পিয়াসাকে অবশ্য পরবর্তীতে ওয়ালটন ফ্রিজের কয়েকটি বিজ্ঞাপনে দেখা যায়। এটি ছাড়া আর কোনো বিজ্ঞাপনে তিনি অংশ নিয়েছেন, এমন কোনো তথ্য কেউ নিশ্চিত করতে পারেননি।

পিয়াসা একসময় এশিয়ান টেলিভিশনের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা যায়। তবে তিনি কবে দায়িত্ব পালন করেছেন বা কত দিন এ দায়িত্বে ছিলেন তা জানাতে রাজি হয়নি টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ।

এশিয়ান টিভির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পিয়াসা এশিয়ান টিভির এমডি মিজান সাহেবের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। তিনি কখনও এশিয়ান টিভির পরিচালক হিসেবে কাজ করেননি।’

বনানীতে ২০১৭ সালের আলোচিত ‘দ্য রেইন ট্রি’ হোটেলে ধর্ষণের ঘটনায় পিয়াসা আলোচনায় আসলে তখন নিজেকে এশিয়ান টিভির সাবেক পরিচালক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।

পিয়াসার বিলাসী জীবন কীভাবে?
পিয়াসা ও তার সহযোগী মৌ

এ ছাড়া পিয়াসা একটি ফেসবুক পোস্টে নিজেকে কক্সবাজারের বিলাসবহুল রিসোর্ট হোয়াইট স্যান্ড রিসোর্টের পরিচালক হিসেবে পরিচয় দেন।

রিসোর্টের ফেসবুক পেজে গিয়ে দেখা যায়, এতে সবশেষ পোস্ট করা হয়েছে ২০১৮ সালে। সেখান থেকে পাওয়া ওয়েবসাইট ঘেঁটে যোগাযোগের কয়েকটি নম্বর পাওয়া গেলেও সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়।

রিসোর্টের পেজে অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনকেও সেই রিসোর্টের একজন পরিচালক হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়েছে। অবশ্য এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে নিউজবাংলাকে জানিয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার পরিচালক পদ নিয়ে কিছুই জানি না।’

তিনি অস্বীকার করলেও রিসোর্টের ফেসবুক পেজে ২০১৮ সালের মার্চের একটি পোস্টে ইলিয়াস কাঞ্চনকে দেখা যায়।

রেইন ট্রি ধর্ষণে আলোচনায় পিয়াসা

২০১৭ সালের ২৮ মার্চ বনানীর ‘দ্য রেইন ট্রি’ হোটেলে জন্মদিনের পার্টির কথা বলে ডেকে নিয়ে দুই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনা সারা দেশেই বেশ আলোচিত হয়। ওই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত সাফাত আহমেদের সাবেক স্ত্রী পিয়াসাও সে সময় গণমাধ্যমের আলোচনায় আসেন।

সাফাত আহমেদ ছিলেন আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে। ওই ঘটনার দুই বছর পর সাবেক শ্বশুরের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক গর্ভপাতের চেষ্টা, নির্যাতন এবং হত্যার হুমকির অভিযোগ আনেন পিয়াসা।

২০১৯ সালের ১১ মার্চ ঢাকা মহানগর বিচারক তোফাজ্জল হোসেনের আদালতে একটি মামলাও করেন তিনি। এতে আপন রিয়েল স্টেটের উপদেষ্টা মোখলেছুর রহমানকেও আসামি করা হয়।

এজাহারে বলা হয়, ২০১৫ সালে বিয়ের পর শ্বশুরের গুলশান-২-এর বাসায় থাকতেন পিয়াসা। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই দিলদার আহমেদ শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন পিয়াসাকে।

এ ছাড়া সাফাতকে তালাক দেয়ার জন্য পিয়াসাকে মানসিকভাবে চাপ দিতেন বলে দিলদার আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।

পিয়াসা আরও অভিযোগ করেন, তিনি অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর তার গর্ভের সন্তান নষ্ট করার জন্য গোপনে খাবারের মধ্যে ওষুধ মেশানোর চেষ্টা করা হয়।

মুনিয়ার আত্মহত্যার ঘটনায়ও পিয়াসার নাম

গত ২৬ এপ্রিল রাজধানীর গুলশানের অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে মোসারাত জাহান মুনিয়া নামে এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধারের পর তা নিয়ে বেশ আলোড়ন তৈরি হয়।

ওই ঘটনায় মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান গুলশান থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার একটি মামলাও করেন। এ মামলার এজাহারেও আসে কথিত মডেল পিয়াসার নাম।

সবশেষ গ্রেপ্তার পিয়াসা

রাজধানীতে রোববার পৃথক অভিযানে আটক মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা এবং তার সহযোগী মরিয়ম আক্তার মৌয়ের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে। পিয়াসার বিরুদ্ধে গুলশান থানায় এবং মৌয়ের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) মামলা করে।

গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম রোববার রাত ১১টার দিকে বারিধারার নিজ বাসা থেকে ফারিয়া মাহাবুব পিয়াসাকে গ্রেপ্তার করে। ওই সময় তার বাসা থেকে ৭৮০ পিস ইয়াবা, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৮ লিটার মদ, সিসা লাউঞ্জের সরঞ্জাম ও সিম্বা ব্র্যান্ডের চারটি প্রিমিয়ার বিয়ার জব্দ করা হয়।

পিয়াসার বিলাসী জীবন কীভাবে?
মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে আটক হন মডেল মৌ

রাত ১২টার দিকে আরেক অভিযানে মোহাম্মদপুর বাবর রোড এলাকা থেকে মরিয়ম আক্তার মৌকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ওয়েব বেইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। তার বাসা জব্দ করা হয় ৭৫০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১২ লিটার মদ।

এ মামলায় সোমবার বিকেলে পিয়াসা ও মৌকে তিন দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয় আদালত।

আরও পড়ুন:
মাধ্যমিকের সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচি প্রকাশ
ডিজিটাল হলো মাউশির ১৩০ সেবা

শেয়ার করুন

আ.লীগের নাম ভাঙানো আরেক ভুঁইফোঁড় নেতা মনিরের ফটোশপকাণ্ড

আ.লীগের নাম ভাঙানো আরেক ভুঁইফোঁড় নেতা মনিরের ফটোশপকাণ্ড

বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদ নামে ভুঁইফোঁড় সংগঠনটি খুলে বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের অনেক নেতাকে টাকার বিনিময়ে পদ দিয়েছেন মনির খান। জমির দালালি এবং তদবির-বাণিজ্য করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এখন চাইছেন কেরানীগঞ্জ ও সাভারের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ঢাকা-২ আসনের এমপি হতে।

হেলেনা জাহাঙ্গীরকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শেষ না হতেই আলোচনায় এসেছেন মো. মনির খান, যিনি বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদ নামে আরেকটি ভুঁইফোঁড় সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ ক্ষমতাসীন দলটির অনেক নেতার সঙ্গেই তার ‘ওঠা-বসার ছবি’ আছে। অভিযোগ আছে, এর সব ছবিই ফটোশপে কারসাজি করা। তিনি ভুঁইফোঁড় সংগঠনটি খুলে বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের অনেক নেতাকে টাকার বিনিময়ে পদ দিয়েছেন। এ ছাড়া জমির দালালি এবং তদবির-বাণিজ্য করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এখন চাইছেন কেরানীগঞ্জ ও সাভারের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ঢাকা-২ আসনের এমপি হতে।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদের মতো সংগঠনের সঙ্গে সঙ্গে দলটির কোনো সম্পৃক্ততা নেই। যারা এ ধরনের ভুঁইফোঁড় সংগঠন চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মনির খান প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ছবি কারসাজি করেছেন। তাকে যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করা হবে।

তবে মনির খান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, তিনি অপপ্রচারের শিকার।

আওয়ামী লীগ এবং দলটির সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতারা জানান, বছর ১৫ আগে রাজধানীর গুলিস্তানে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ের উল্টো পাশের একটি কাপড়ের দোকানে দরজির কাজ করতেন এই মনির খান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলটির রাজনীতিতে সক্রিয় হতে শুরু করেন তিনি। মুজিব কোট পরে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যোগ দিতে থাকেন। তবে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ের চেয়ে তাকে বেশি দেখা যেত ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে। কারণ, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়েই একসময় দরজির কাজ করতেন মনির খান।

চাকরিজীবী লীগ নামে একটি ভুঁইফোঁড় সংগঠনের জন্ম দিয়ে আলোচনায় আসা হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গত ২৯ জুলাই রাতে আটকের পরপরই আলোচনা শুরু হয় এই মনির খানকে নিয়ে। আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সরব হন তার বিরুদ্ধে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে তার বিরুদ্ধে আইনি ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।

ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী ইয়াসির আরাফত রুবেল ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে ফটো এডিট করে শেখ হাসিনা পরিষদ নামে নামে ভুঁইফোঁড় সংঘঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মনির খান ওরফে দরজি মনিরকে কেন এখনো গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না, মাননীয়রা কি উত্তর দিবেন?”

যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ছাত্রলীগের সাবেক নেতা গোলাম ইরতেজা মনি প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে মনির খানের একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পাশের চেয়ারে বসা এই ভদ্রলোক কি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার?’

ইয়াসির আরাফত রুবেল ও গোলাম ইরতেজা মনির মতো ছাত্রলীগ-যুবলীগের আরও অনেক সাবেক ও বর্তমান নেতা মনির খানকে নিয়ে ফেসবুকে এ ধরনের পোস্ট দিয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন। একই দাবি জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

আ.লীগের নাম ভাঙানো আরেক ভুঁইফোঁড় নেতা মনিরের ফটোশপকাণ্ড


নাম না প্রকাশের শর্তে আওয়ামী লীগের উপকমিটি ও যুবলীগের একাধিক নেতা নিউজবাংলাকে জানিয়েছেন, ২০০৪-০৫ সালের দিকে তারা যখন ছাত্রলীগ করতেন, তখন নিয়মিতই বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের পার্টি অফিসে যেতেন। পার্টি অফিসের ঠিক বিপরীত পাশের একটি কাপড়ের দোকানে দরজির কাজ করতেন এই মনির খান।

‘আমরা ওই দোকানের সামনে যখন চা খেতাম, তখন মাঝে মাঝে মনির খানও আমাদের সঙ্গে এসে আড্ডা দিত। তখন তার ঘাড়ে কাপড় মাপা ফিতা থাকত’, বলেন তাদের একজন।

তিনি আরও বলেন, ‘এরপর হঠাৎ একদিন দেখি ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ অফিসে মুজিব কোট গায়ে দিয়ে মনির খান ঘুরে বেড়াচ্ছে। কথা বলে জানতে পারলাম, সে বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদ নামে একটি সংগঠনের সভাপতি হয়েছে।’

তীব্র হতাশা প্রকাশ করে ছাত্রলীগের সাবেক এই নেতা বলেন, ‘এরপর মনির খানকে আমি মাঝে মাঝেই পার্টি অফিসে বড় বড় নেতার সঙ্গে দেখতাম। নেতারাও আমাদের থেকে তাকেই বেশি মূল্যায়ন করত। মনিরের বেশভূষা দেখেই বোঝা যেত, সে অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছে।

‘পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, মনির খান কেরানীগঞ্জ এলাকায় জমির দালালি করে প্রচুর টাকা বানিয়ে ফেলেছে। তা ছাড়া সে সারা দেশে তার ভুঁইফোঁড় সংগঠনের কমিটি দেয়ার নামে বাণিজ্য করে প্রচুর টাকা কামিয়েছে। বিএনপি-জামায়াত, ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের নেতাদেরও টাকার বিনিময়ে তার বানোনো দলে পদ দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘শুধু তাই না, এই মনির তার ভুঁইফোঁড় সংঘঠনের নামে জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক প্রোগ্রাম করে। সেখানে সে আওয়ামী লীগের বড় নেতা ও মন্ত্রীদের প্রধান অতিথি হিসেবে রাখে।

আ.লীগের নাম ভাঙানো আরেক ভুঁইফোঁড় নেতা মনিরের ফটোশপকাণ্ড


‘এভাবে সে বড় বড় নেতা ও মন্ত্রীর কাছের লোক হয়ে যায়। পরে তাদের কাছে বিভিন্ন তদবির-বাণিজ্য করে। এভাবেই মনির কয়েক বছরে অঢেল অর্থসম্পত্তি বানিয়ে ফেলে এখন ঢাকা-২ আসনের এমপি হতে চাইছে।’

এসব অভিযোগের সত্যতা জানতে নিউজবাংলা রোববার খোঁজ নেয় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের সামনের কাপড়ের দোকানগুলোয়। করোনার কারণে লকডাউন চলায় সব দোকান বন্ধ ছিল; তাই দোকানমালিকদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। পরে মোবাইল ফোনে কথা হয় আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ের বিপরীত পাশের মাদারীপুর বস্ত্র বিতানের মালিক মো. হিরনের সঙ্গে।

হোয়াটসঅ্যাপে মনির খানের ছবি দিয়ে তার সম্পর্কে জানতে চাইলে হিরন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘না, আমি এই মনির খানকে চিনি না। সে আমার দোকানে কোনো দিন কাজ করেনি। তবে আমাদের আশপাশে এই রকম আরও অনেক টেইলার্সের দোকান আছে, সেখানে কাজ করতো কিনা জানি না।’

মনির খানের ফেসবুক ঘেঁটে দেখা গেছে, ১০ হাজারের বেশি ফলোয়ার রয়েছে তার। প্রোফাইল পিকচারে মুজিব কোট ও চাদর পরা একটি ছবি আছে মনির খানের। ওই চাদরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রতীক নৌকা এবং সেই নৌকায় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাসংবলিত একটি ব্যাচ রয়েছে। মনির খানের কাভার ফটোতে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে তার একটি ছবি আছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আরও কিছু ছবি আছে তার ফেসবুকে। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও তার তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সঙ্গেও ছবি দিয়েছেন তিনি।

এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার সঙ্গে তার ‘ওঠা-বসার ছবি’ দেখা যায় ফেসকুকে। ছবিগুলো ভালো করে লক্ষ করলে বোঝা যায়, খুব সূক্ষ্মভাবে সম্পাদনার মধ্যমে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ছবির জায়গায় নিজের ছবি বসিয়ে সেগুলো প্রচার করছেন মনির খান। ফটোশপে কারসাজি করা এসব ছবির বেশির ভাগেই তার চেহারা অন্যদের তুলনায় বড় দেখাচ্ছে।

নিউজবাংলা এ ধরনের কয়েকটি ছবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেনকে দেখিয়ে মন্তব্য জানতে চায়।

তিনি বলেন, ‘অফিশিয়ালভাবে আসলে ছবির ফরেনসিক অ্যানালাইসিস না করে আমরা মন্তব্য করি না। তবে আন-অফিশিয়ালি যদি বলি, তাহলে ছবিগুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এগুলো প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা। এটা শুধু আমি না, যেকোনো মানুষই এই ছবি দেখলেই বলবে, এগুলো এডিট করে করা।’

ফেসবুক আইডিতে মনির খানের পরিচয় অংশে লেখা আছে, ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটিতে সহ-সম্পাদক ছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য হন। তিনি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলার রূপসী গার্মেন্টস লিমিটেড, যার ব্যবস্থাপক পরিচালক তিনি। বাংলাদেশ সময় প্রতিদিন নামে একটি পত্রিকার প্রধান উপদেষ্টা তিনি।

আ.লীগের নাম ভাঙানো আরেক ভুঁইফোঁড় নেতা মনিরের ফটোশপকাণ্ড


এ ছাড়া গ্লোবাল ৪১ ইঞ্জিনিরিং অ্যান্ড কনসালটেন্ট লিমিটেড, পোশাক মেলা ফ্যাশন হাউস প্রাইভেট লিমিটেড এবং অটিজম বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল ভয়েস সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ফেসবুকে তিনি তার প্রায় সব পোস্টেই নিজেকে বঙ্গবন্ধুকে কটূক্তিকারী তারেক জিয়ার মামলার বাদী দাবি করেছেন।

মনির খান তার ফেসবুকে লিখেছেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ঢাকা-২ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র কিনেছিলেন। আরেক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘এমপি পদপ্রার্থী ঢাকা-২ আসন, আওয়ামী লীগ।’

তার এমন পরিচিতি ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে নিউজবাংলা কথা বলেছে ঢাকা-২ আসানের সাবেক আরেক এমপি প্রার্থী বর্তমানে কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শহীন আহম্মেদের সঙ্গে। মো. মনির খান নাম শুনেই তিনি বলেন, ‘মনির খান নামে আমি কাউকে চিনি না। আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন যেমন যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ করলে হয়তো তাকে চিনতাম। ভুঁইফোঁড় কোনো সংগঠনের কাউকেই আমি চিনি না।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মনির খান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রাজনীতি করলে পতিপক্ষ থাকবেই। আমার পতিপক্ষরাই আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। একটা মানুষ তো সবার কাছে ভালো থাকতে পারে না।’

প্রধানমন্ত্রী ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে ছবির বিষয়ে প্রশ্ন করতেই ‘মিটিংয়ে আছি’ বলে সংযোগ কেটে দেন মনির খান।

আ.লীগের নাম ভাঙানো আরেক ভুঁইফোঁড় নেতা মনিরের ফটোশপকাণ্ড

তার বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের বিধিবদ্ধ সংগঠন করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু প্রতারণা করার অধিকার কারও নেই।

‘কতিপয় সুযোগসন্ধানী দুষ্ট ব্যক্তি জাতির পিতা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের নামের অপব্যবহার করে ফায়দা হাসিল করছে। এদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে, আরও জোরদার হবে।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার যুগ্ম কমিশনার হারুন-অর-রশীদ রোববার সন্ধ্যায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মনির খান প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ব্যক্তির ছবির সঙ্গে নিজের ছবি জুড়ে দিয়েছেন। তিনি অসৎ উদ্দেশ্যে এসব ছবি ব্যবহার করেছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। তাকে নজরদারিতে রেখেছি, যে কোনো সময় গ্রেপ্তার করা হবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা নিউজবাংলাকে জানান, মনিরের গ্রামের বাড়ি মাদরীপুরের কালকিনি উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নে। তার বাবা অনেক আগেই ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকায় চলে আসেন। সেখানে তিনি মাটি কাটার কাজ করতেন। মনির এখন পরিবারসহ কেরানীগঞ্জ এলাকায় বাসবাস করেন। এই করণেই ওই এলাকার (ঢাকা-২ আসন) এমপি হতে চান। মনিরের বর্তমানে একাধিক স্ত্রী আছেন।

আওয়ামী লীগ নেতারা যা বলছেন, বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদের মতো ৭২টি ভুঁইফোঁড় সংগঠনের সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন হচ্ছে যুবলীগ, মহিলা লীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুব মহিলা লীগ, তাঁতী লীগ, আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ ও মৎস্যজীবী লীগ। জাতীয় শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগ হলো দলটির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন। আর মহিলা শ্রমিক লীগ ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ আওয়ামী লীগের ‘নীতিগত’ অনুমোদিত সংগঠন।

ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলোকে সতর্ক করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা আগেও বলেছি। আমাদের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি সহযোগী সংগঠন ছাড়া বাকি যেগুলো আছে, আওয়ামী লীগের নামে বিভিন্নজন করেছে, এগুলোর কোনো সাংগঠনিক ভিত্তি নেই।

‘এরা বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের নামটা ব্যবহার করে তাদের সুবিধা ভোগ করার জন্য অবৈধ এ পন্থা অবলম্বন করেছে। এদের বিরুদ্ধে আগেও আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। প্রশাসনকে সে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। সে সময় অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছিল এবং তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার এ রকম কয়েকটি সংগঠনের নাম শোনা যাচ্ছে।’

আরও পড়ুন:
মাধ্যমিকের সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচি প্রকাশ
ডিজিটাল হলো মাউশির ১৩০ সেবা

শেয়ার করুন

বোমার ‘মাস্টার’ নব্য জেএমবির ২৪ জন!

বোমার ‘মাস্টার’ নব্য জেএমবির ২৪ জন!

জাহিদ হাসান ওরফে ফোরকান। ছবি: সংগৃহীত

সিটিটিসি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীর তথ্য মিলেছে, যারা নব্য জেএমবির সদস্যদের বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে একজনকে (জাহিদ হাসান ওরফে ফোরকান) শনাক্ত করা গেলেও তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। বাকিদের এখনও শনাক্ত করা যায়নি।

‘তরবারির যুগ শেষ। এখন লড়াই হবে গোলাবারুদে। কাজেই হাতের কাছে যা পাওয়া যায়, তাই দিয়ে বোমা বানাও। এ ক্ষেত্রে রান্নাঘরকে ব্যবহার করো।’

নব্য জেএমবির বোমা তৈরিতে পারদর্শী নেতারা নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠনটির সক্রিয় সদস্যদের অনলাইনে বোমা তৈরিতে এমন নির্দেশনা দিচ্ছেন, যাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

জঙ্গি কর্মকাণ্ড অনুসরণকারী পুলিশ কর্মকর্তারা নিউজবাংলাকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

তারা বলছেন, নব্য জেএমবির পাঁচ-ছয়জন নেতা রয়েছেন, যারা বোমা তৈরির প্রশিক্ষক। এই জঙ্গি নেতারা অনলাইনে বিভিন্ন সেল (চারজন) করে বোমা তৈরির নির্দেশনা দেন সক্রিয় সদস্যদের। গত এপ্রিল থেকে তিন মাসেই অন্তত ২৪ জন সক্রিয় সদস্যকে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, যারা এখন খুব সহজেই বোমা বানাতে পারেন। তারাসহ সব প্রশিক্ষককে শনাক্তের পাশাপাশি গ্রেপ্তারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আরও পড়ুন: নিখোঁজ জাবি শিক্ষার্থীর জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) উপকমিশনার (ডিসি) আবদুল মান্নান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নব্য জেএমবির যারা বম্ব-টেক ব্যবহার করে বিভিন্ন সেলের মাধ্যমে সক্রিয় সদস্যদের বোমা তৈরির ধারণা দিচ্ছেন, আমরা তাদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করছি।’

বোমার ‘মাস্টার’ নব্য জেএমবির ২৪ জন!
সাব্বির আহম্মেদ। ছবি: সংগৃহীত

সিটিটিসির একাধিক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে জানান, গত ১৭ মে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ডসংলগ্ন পুলিশ বক্সে বোমা ফেলে রাখে জঙ্গিরা। সেই ঘটনার তদন্তে নেমে নব্য জেএমবির সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পান তদন্তকারী কর্মকর্তারা। তদন্তকালে ৭ জুলাই রাজধানীর পল্লবী এলাকা থেকে সাব্বির আহম্মেদ ওরফে বামছি ব্যারেক ওরফে মেজর বামছি ওরফে আবু হাফস আল বাঙ্গালি ওরফে জন ডেভিড এবং নাঈম মিয়া ও রবিউল ইসলাম ওরফে উসমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

১১ জুলাই যাত্রাবাড়ী থেকে আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে ডেভিড কিলার ও কেরানীগঞ্জ থেকে কাউসার হোসেন ওরফে মেজর ওসামাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে জামালপুর ও নারায়ণগঞ্জের তিনটি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) ও আইইডি তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

আরও পড়ুন: জঙ্গি সাব্বিরের ‘আস্তানা’ থেকে আইইডি উদ্ধার

সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রীয়করণ দলের কর্মকর্তারা জানান, জুলাই মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নব্য জেএমবির যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, তারা সবাই বোমা বানাতে পারেন। এদের মধ্যে সাব্বির আহম্মেদ আইইডি তৈরির অন্যতম কারিগর। দীর্ঘদিন ধরে নব্য জেএমবির ময়মনসিংহ অঞ্চলের সামরিক শাখার কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তার অধীনেই ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল ও কুড়িগ্রামে অন্তত ২০ জন সক্রিয় সামরিক সদস্য রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

কর্মকর্তারা জানান, নব্য জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতা জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজান ছিলেন সংগঠনটির বোমা তৈরির মূল কারিগর। তিনি এখন কারাবন্দি। তবে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল সাব্বির আহম্মেদের। গত ৭ জুলাই গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত ওই জঙ্গি নেতার পরিবারের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ছিল তার।

বোমার ‘মাস্টার’ নব্য জেএমবির ২৪ জন!
নব্য জেএমবির দুই সদস্য আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে ডেভিড কিলার (বাঁয়ে) ও কাওসার হোসেন ওরফে মেজর ওসামা। ছবি: সংগৃহীত

সংগঠনটির সদস্যদের বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ যারা দিচ্ছেন তাদের মধ্যে কেউ একজন রয়েছেন, যিনি রসায়নবিদ- এমন ধারণা থেকে তদন্তে নামে সিটিটিসি। দীর্ঘ তদন্তের পর জাহিদ হাসান ওরফে ফোরকানসহ একাধিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করে সিটিটিসি, যারা সংগঠনটির সদস্যদের অনলাইনে ও অফলাইনে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন।

সিটিটিসি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীর তথ্য মিলেছে, যারা নব্য জেএমবির সদস্যদের বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে একজনকে (জাহিদ হাসান ওরফে ফোরকান) শনাক্ত করা গেলেও তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। বাকিদের এখনও শনাক্ত করা যায়নি।

সিটিটিসি কর্মকর্তারা জানান, জাহিদ হাসান ওরফে ফোরকান আত্মগোপনে রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, কোথাও ‘হিযরতে’ গেছেন তিনি। জঙ্গি কর্মকাণ্ডে তার জড়িত থাকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। গুলশানের হোলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলায় জড়িত শরিফুল ইসলাম রিপনের কাছ থেকেই তার বিষয়ে প্রথম তথ্য পাওয়া যায়। তারপর থেকেই তাকে খোঁজা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: পুলিশ বক্সে বোমার তদন্তে মিলল দুই জঙ্গি আস্তানা

সিটিটিসি অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. রহমত উল্যাহ চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নব্য জেএমবির বোমা তৈরির প্রধান কারিগর জাহিদ হাসান ওরফে ফোরকান ভাই ওরফে ইসমাইল ভাইকে শনাক্ত করা হয়েছে, যাকে আমরা ২০১৪ সাল থেকে খুঁজছি। ওই সময়েই আমাদের ধারণা ছিল, আইইডি বানানোর পেছনে একজন কেমিস্ট্রির ছাত্র থাকতে পারেন, যার বিষয়ে জঙ্গি নেতা শরিফুল ইসলাম রিপনের কাছ থেকেই প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যায়। এরপর থেকেই তাকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া নব্য জেএমবির নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে, সংগঠনটির অনেক বোমা কারিগর সক্রিয় সদস্যদের বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

বোমার ‘মাস্টার’ নব্য জেএমবির ২৪ জন!
নাঈম ও রবিউল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

নব্য জেএমবিতে কতজন বোমা তৈরির প্রশিক্ষক আছেন এবং এ পর্যন্ত তারা কতজনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানতে পারেনি নিউজবাংলা।

সিটিটিসি কর্মকর্তারা জানান, কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা ঘিরে তৎপরতা চালানোর পাশাপাশি অনলাইনে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন জাহিদ হাসান ওরফে ফোরকান। তার বেশ কয়েকটি কুনিয়া বা সাংকেতিক নাম রয়েছে। সেসব নাম ব্যবহার করে অনলাইনে বোমা তৈরির একাধিক সেল গঠন করেছেন তিনি। জাহিদ হাসান ওরফে ফোরকানসহ চার-পাঁচজন জঙ্গি নেতা পরিচালিত পাঁচ-ছয়টি সেলের সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের মাধ্যমে গত তিন মাসে ২০-২৪ জনকে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিউজবাংলাকে জানান, রসায়ন বিভাগের ছাত্র জাহিদ হাসান অনেক দিন ধরেই নিখোঁজ। সম্প্রতি তার পরিবারের সদস্যরা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণও করেন।

জাহিদের বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটায়। সেখানকার রায়হানপুরে সৈয়দ ফজলুল হক ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০০৯ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করেন তিনি। পরে ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। তবে স্নাতক শেষে আর ভর্তি হননি তিনি।

আরও পড়ুন:
মাধ্যমিকের সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচি প্রকাশ
ডিজিটাল হলো মাউশির ১৩০ সেবা

শেয়ার করুন

কমলাপুর, মতিঝিলে গাড়িতে আগুন কেন?

কমলাপুর, মতিঝিলে গাড়িতে আগুন কেন?

আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত রাজধানীর কমলাপুরে বিআরটিসির বাস ডিপোর দুটি বাস। ছবি: সাইফুল ইসলাম/নিউজবাংলা

মাত্র একদিনের ব্যবধানে রাজধানীর প্রায় একই এলাকায় বাসে আগুন লাগা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মতিঝিলে আগুনের কারণ গ্যারাজের কর্মীদের অসাবধানতা। তবে কমলাপুর বিআরটিসির ডিপোতে বাসে আগুন নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা।

রাজধানীর কমলাপুর বিআরটিসির ডিপোতে ২৪ জুলাই আগুন লেগে পুড়ে যায় একটি বাস, ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরেকটি। একদিন পরেই মতিঝিলের মধুমতি সিনেমা হলের পেছনে গাড়ির গ্যারেজে আগুনে পুড়ে যায় দুটি বাস ও একটি প্রাইভেট কার।

মাত্র একদিনের ব্যবধানে রাজধানীর প্রায় একই এলাকায় বাসে আগুন লাগা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। এ ঘটনার পর নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মতিঝিলে আগুনের কারণ গ্যারাজের কর্মীদের অসাবধানতা। তবে শাটটাউনে বন্ধ কমলাপুর বিআরটিসির ডিপোতে বাসে আগুন কীভাবে লাগল, তা নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, মতিঝিলের মধুমতি সিনেমা হলের পেছনে আলাউদ্দিন অটো মোবাইলসে প্রাইভেট কারে ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করার সময় প্রথমে থিনারের বোতলে আগুন লাগে। গ্যারেজ কর্মী সেটা লাথি মেরে সারানোর চেষ্টা করলে ছড়িয়ে যায় আগুন।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, এই গ্যারাজের আশেপাশে উঁচু ভবন। জমি দুই ভাগ করে ভাড়া দেয়া হয়েছে। এক অংশে সাতটি গাড়ির ওয়ার্কশপ। বাকি অংশে সিল্ক লাইনের বাস রাখার গ্যারেজ। দুই পাশে দুটি গেট। একটা গেট সাতটি ওয়ার্কশপের, অন্য পাশের গেট দিয়ে সিল্ক লাইনের বাস ঢোকে-বের হয়।

ফায়ার সার্ভিস বলছে, জায়গাটি সরকারি প্লট। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনে এমন গ্যারাজ আছে ১০০-১৫০টি। টিন বাঁশ দিয়ে গ্যারেজ বানিয়ে দিনে গাড়ি সারানো হয়, রাতে গাড়ি রাখার জন্য গ্যারেজ ভাড়া দেয়।

দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সিল্ক লাইন বাসের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বরত আইয়ুব আলী নিউজবাংলাকে জানান, সেদিন আগুন লাগে আলাউদ্দিন অটো মোবাইলস থেকে। সেখানে একটি প্রাইভেটকারের সার্ভিসিং চলছিল। গ্যারেজের একজন কর্মী ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করছিলেন। তার পাশে রাখা ছিল থিনারের একটি বোতল। ওয়েল্ডিংয়ের সময় এই থিনারের বোতলে আগুন লেগে যায়।

তিনি বলেন, ‘সে সময় একজন কর্মী পা দিয়ে লাথি মেরে থিনারের বোতলটি সরাতে গিয়েছিল। আর এতেই আগুন ছড়িয়ে যায়। আগুন পাশে থাকা একটি গ্যাস সিলিন্ডারে লাগলে সেটি সম্ভবত বিস্ফোরিত হয়। এ সময় আশেপাশে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। আগুনের ব্যাপকতা দেখে গ্যারেজকর্মীরা বেরিয়ে যায়।

‘আমি প্রথমে ড্রামের পানি দিয়ে আগুন নেভাতে চেষ্টা করি। পরে বাস বের করা শুরু করি। গ্যারেজে থাকা দুটি বড় ও একটি ছোট বাস সরিয়ে নেয়া গেলেও রয়ে যায় দুটি বাস ও ওই প্রাইভেটকার। সেগুলো আগুনে পুড়ে যায়।’

কমলাপুর, মতিঝিলে গাড়িতে আগুন কেন?
মতিঝিলের আলাউদ্দিন অটো মোবাইলসে এই গাড়িটি মেরামত করার সময় আগুন ধরে যায়। এই আগুনে পুড়ে আরও দুটি বাস

স্থানীয়রা জানান, গ্যারেজের জায়গাটি রোকসানা পারভিন নামে একজন ১০০ বছরের জন্য লিজ নিয়েছেন। রোকসানার স্বামী রাকিব গ্যারেজ ভাড়া দিয়ে তা দেখভাল করেন।

রাকিবের মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল করার পর তিনি রিসিভ করেন। তবে সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুল নম্বর বলে কেটে দেন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) দেবাশীষ বর্ধন নিউজবাংলাকে জানান, গাড়ির ওয়ার্কশপ বা গ্যারেজগুলো খুব অবহেলিত ও অপরিকল্পিতভাবে তৈরি। এগুলোর বেশির ভাগ রাতে গাড়ি রাখার জন্য ভাড়া দেয়া হয়। সাধারণত সহজ দাহ্যবস্তু টিন, কাঠ, বাঁশ দিয়ে গ্যারেজগুলো তৈরি হয়।

তিনি বলেন, ‘এই গ্যারেজগুলোর ট্রেড লাইসেন্স আছে কি না সন্দেহ। আমাদের কাছ থেকে তারা কোনো ছাড়পত্র, ফায়ার সেফটি প্ল্যান নেয় না। গ্যারেজে কোনো ফায়ার সেফটিও থাকে না। মালিকদের অবহেলার কারণেই এই ধরনের দুর্ঘটনা বার বার ঘটছে। তাদেরকে একটি আইনের আওতায় আনতে হবে।’

দেবাশীষ বর্ধন বলেন, ‘গ্যারেজে প্রচুর দাহ্য পদার্থ থাকে। এর ভেতরে বসেই কর্মীরা সিগারেট খান। তারা প্রচুর বিদ্যুতের ব্যবহার করেন। এ কারণে বিদ্যুতের শর্টসার্কিট থেকেও অনেক সময় আগুন লাগে। এ ছাড়া, গ্যাসের ব্যবহারও হয় এখানে। গ্যারেজে বাস, কাঠ, টিন থাকতে পারবে না। সেটা নিশ্চিত করা গেলে আগুন লাগলেও ক্ষতি কম হবে।’

কমলাপুর, মতিঝিলে গাড়িতে আগুন কেন?
মতিঝিলের গ্যারেজে আগুনে পুড়ে যাওয়া দুটি বাস- নিউজবাংলা

গ্যারেজের বৈধতার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসের নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এগুলোর বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।’

বিআরটিসির ডিপোতে আগুনের কারণ অস্পষ্ট

মতিঝিলের মধুমতি সিনেমা হলের পেছন গাড়ির গ্যারেজের আগুন লাগার আগের দিন ২৪ জুলাই কমলাপুর বিআরটিসির ডিপোতে আগুনে একটি বাস পুড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরেকটি বাস।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমলাপুর বিআরটিসির ডিপোর ভারপ্রাপ্ত গার্ড কমান্ডার গোলাম মোহাম্মদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আগুনের সূত্রপাত নিয়ে তদন্ত চলছে। এখানে আনসারের লোক ছিল তারা ধোঁয়া দেখছে প্রথমে। ঘটনাস্থলে কেউ ছিল না। এখানে বাস আছে ১৫০-২০০। যে বাসটা পুড়ছে সেটা ২০১২ সালের। এক মাসের মতো পড়ে ছিল এখানে।’

কমলাপুর, মতিঝিলে গাড়িতে আগুন কেন?

পরিকল্পিত আগুন কি না, প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘এখনও সেটা বোঝা যাচ্ছে না।’

ঘটনার সময় ডিপোর গেটে দায়িত্বপালন করা আনসার সদস্য মাজহারুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের মতো বাজে তখন। হঠাৎ করে পেছনের দিক থেকে একটা আওয়াজ আসে। ঘুরে দেখি কালো ধোঁয়া উড়ছে। সে সময় আনসার ছিল ৮-৯ জন। এখানের লোক ছিল ৪-৫ জন। গেট ছাড়া এখানে বাইরে কোনো লোকের ভেতরে ঢোকার সিস্টেম নেই।’

তিনি বলেন, ‘বিআরটিসির গাড়ি রাস্তায় থাকে থাকে হাজার হাজার। পরিকল্পিতভাবে কেউ আগুন দিতে গেলে এত রিস্ক নিয়ে ভেতরে কেন আসবে? দেয়াল টপকিয়েও কারও এখানে আসা সম্ভব না। কীভাবে যে আগুন লাগছে বুঝতে পারছি না।’

বিআরটিসির মতিঝিল বাস ডিপো ম্যানেজার মাসুদ তালুকদার নিউজবাংলাকে বলেন, বাস পোড়ার বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছে।

তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে খিলগাঁও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন ম্যানেজার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘বিআরটিএ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ফায়ার সার্ভিসের কোনো আলাদা কমিটি হয়নি।’

আরও পড়ুন:
মাধ্যমিকের সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচি প্রকাশ
ডিজিটাল হলো মাউশির ১৩০ সেবা

শেয়ার করুন

ওমর ফারুক হাসপাতালে র‌্যাবের সহায়তায়

ওমর ফারুক হাসপাতালে র‌্যাবের সহায়তায়

ফারুককে বুধবার কখন বিএসএমএমইউ হাসপাতালে আনা হয়, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং র‌্যাবের বক্তব্যে দূরত্ব রয়েছে। ফারুককে বুধবার রাতে পাওয়ার দাবি করছে বিএসএমএমইউ, তবে র‌্যাব বলছে, দুপুরের দিকেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

করোনার তিন ডোজ টিকা নেয়ার অভিযোগ তোলা ওমর ফারুককে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কর্তৃপক্ষের অনুরোধে র‌্যাবের একটি টিম নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে ঢাকায় এনে হাসপাতালে ভর্তি করে।

ফারুককে নিয়ে আসতে র‌্যাবের সহায়তা চাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ। অন্যদিকে, র‌্যাবের কর্মকর্তারাও নিউজবাংলাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তবে ফারুককে বুধবার কখন বিএসএমএমইউ হাসপাতালে আনা হয়, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং র‌্যাবের বক্তব্যের দূরত্ব রয়েছে। ফারুককে বুধবার রাতে পাওয়ার দাবি করছে বিএসএমএমইউ, তবে র‌্যাব বলছে, দুপুরের দিকেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

প্রবাসী অ্যাপ থেকে অনলাইনে নিবন্ধন করে ২৬ জুলাই সকালে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে টিকা নেয়ার জন্য যান ফারুক। সেখানে প্রথমে একটি বুথে তাকে এক ডোজ টিকা দেয়া হয়। ফারুক ওই বুথের স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে পরবর্তী করণীয় জানতে চাইলে তাকে সামনের বুথের দিকে যেতে বলা হয়।

পরের বুথে গেলে তাকে আবার টিকা দেয়া হয়, এরপর সামনের আরেকটি বুথ থেকে দেয়া হয় টিকার আরেকটি ডোজ।

ওমর ফারুক হাসপাতালে র‌্যাবের সহায়তায়

এ ঘটনা নিয়ে বেসরকারি একটি টেলিভিশনে প্রতিবেদন প্রচারের পর ব্যাপক আলোচনা শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

এই আলোচনার মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ মঙ্গলবার বিকেলে নিউজবাংলা বলেন, ‘ওমর ফারুক সুস্থ আছেন এবং তিনি সাত দিন পর্যবেক্ষণে থাকবেন।’

তবে এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উপাচার্য তার বক্তব্য পরিবর্তন করে কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমের কাছে দাবি করেন, একজনকে তিনবার টিকা দেয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। ওমর ফারুক নামে কেউ তাদের পর্যবেক্ষণেও নেই।

পরের দিনও বিষয়টিকে অস্বীকার করে বিএসএমএমইউ। তবে ওমর ফারুকের পরিবার দাবি করে, বুধবার দুপুরে ফারুককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

ওমর ফারুককে নিজেদের জিম্মায় পাওয়ার বিষয়টি বৃহস্পতিবার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ।

এরপর বিকেলে ওমর ফারুকের সার্বিক অবস্থা নিয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গত রাতেই (বুধবার রাত) পর্যবেক্ষণের জন্য ওমর ফারুককে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে সুস্থ আছের। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। আপনাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।’

ফারুককে পর্যবেক্ষণে রাখার বিষয়টি বুধবার অস্বীকার করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। কাল র‌্যাবে নিয়ে আসছে। রাতে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। আমিই নির্দেশ দিয়েছিলাম, বলেছিলাম তাকে নিয়ে আসেন এখানে, অবজার্ভ করি।’

উপাচার্য বলেন, ‘হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নজরুল ইসলামকে প্রধানের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আগামী শনিবার কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে। এরপর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারবো।’

ফারুককে বুধবার দুপুরে বাড়ি থেকে নিয়ে আসার বিষয়ে তার পরিবারের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, ‘আমাদের এখানে রাতে এনে ভর্তি করা হয়েছে। এর আগে তিনি কোথায় ছিলেন সেটা কীভাবে বলবো।’

ওমর ফারুক হাসপাতালে র‌্যাবের সহায়তায়
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ওমর ফারুকের বাড়ি

এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নজরুল ইসলাম প্রধান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কাল রাতে র‌্যাব আমাদের এখানে ওমর ফারুককে ভর্তি করেছে। আমাদের মেডিসিন ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা তাকে পর্যবেক্ষণ করবে। এরপর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলতে পারবো কী হয়েছিল সেদিন।’

তবে র‌্যাবের দাবি, ফারুককে নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে এনে দুপুরেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুরোধে র‌্যাব বুধবার সকালে নারায়ণগঞ্জ থেকে ওমর ফারুকে নিয়ে আসে। র‌্যাবের সঙ্গে হাসপাতালের চিকিৎসক ও অন্যান্য কর্মীরাও ছিলেন। ওমর ফারুককে এনে দুপুর নাগাদ বিএসএমএমইউ হাসপাতালে হস্তান্তর করে র‌্যাব।’

র‌্যাবের এ বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে, বিএসএমএমইউর মিডিয়া কো-অর্ডিনেটর সুব্রত বিশ্বাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এ বিষয়ে হাসপাতাল পরিচালক ও ভিসি ভালো বলতে পারবেন।’

এদিকে, ওমর ফারুককে দেখতে নারায়ণগঞ্জ থেকে বিএসএমএমইউতে আসা তার মা রহিমা বেগম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ছেলেকে দেখে আসছি। সে বর্তমানে সুস্থ আছে। ছেলেকে দেখে এখন একটু স্বস্তি লাগছে। তাকে শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি-ব্লকে রাখা হয়েছে।’

ওমর ফারুকের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ভূঁইঘরে। তার চার বছর বয়সী এক ছেলে রয়েছে। বাবা জামাল হোসেন প্রধান পেশায় অটোরিকশাচালক। ফারুকরা তার চাচা আলাউদ্দিনের তিনতলা বাড়ির নিচতলায় ভাড়া থাকেন। চার বছর আগে তিনি ভুঁইঘর মিছির আলী মাদ্রাসা থেকে হেফজ বিভাগে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর থেকে বেকার ছিলেন ওমর ফারুক। সম্প্রতি তার সৌদি আরব যাওয়ার ভিসা হয়। এজন্যই তিনি টিকা নিতে আসেন বিএসএমএমইউতে।

আরও পড়ুন:
মাধ্যমিকের সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচি প্রকাশ
ডিজিটাল হলো মাউশির ১৩০ সেবা

শেয়ার করুন