পাচারের ঘাটে ঘাটে ধর্ষণ, বিক্রি হচ্ছে সন্তানও

পাচারের ঘাটে ঘাটে ধর্ষণ, বিক্রি হচ্ছে সন্তানও

প্রতীকী ছবি

‘একপর্যায়ে সেই সন্তানের জন্ম ওই সব গোপন বাসায়ই হয়। যখন পুলিশ রেড দেয়, তখন বাচ্চাগুলোকে ওখানে রেখেই বাংলাদেশে চলে আসে। ওই সব বাচ্চার যে কী হয়, আল্লাই ভালো জানে। শুনছি, ওসব বাচ্চা নাকি ওই দেশে যাদের বাচ্চা হয় না, তাদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়।’

সুইটি ইসলাম (ছদ্মনাম)। বয়স ১৭ বছর। বাড়ি শরীয়তপুর জেলার চন্দনকর এলাকায়। বছর খানেক আগে ফেসবুকে টিকটক গ্রুপের মাধ্যমে শিহাব নামে যশোরের এক তরুণের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। একপর্যায়ে প্রেমের সম্পর্ক হয় তাদের। কিন্তু শিহাব যে তাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলেছেন, তা বুঝতে পারেনি সে।

এরই একপর্যায়ে গত সোমবার সুইটি শরীয়তপুর থেকে তিন হাজার টাকায় মোটরসাইকেল ভাড়া করে একাই চলে যায় যশোরে শিহাবের কাছে।

সুইটির ভাষ্যমতে, যশোরে পৌঁছানোর পর প্রথমে একটি হোটেলে ওঠানো হয় তাকে। সেখানে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। এরপর ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় একটি নির্জন গ্রামে। সেখানেও চলে ধর্ষণচেষ্টা। তবে যশোরে পরিচিত কেউ না থাকায় এসবের প্রতিবাদ করার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিল না মেয়েটি।

এরই মাঝে তাকে ভারতে পাচারের জন্য সেখান থেকে নেয়া হয় বেনাপোল বাসস্ট্যান্ডে। সেখানে সুযোগ বুঝে মেয়েটি আশপাশের লোকজনকে জানিয়ে দেয় যে, সে পাচারকারীদের খপ্পরে পড়েছে। এ সময় কৌশলে পালিয়ে যান শিহাব।

এ ঘটনার পর সুইটিকে নিরাপদে পৌঁছে দিতে যশোর জেলা প্রশাসন যোগাযোগ করে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের সঙ্গে। এ যাত্রায় বেঁচে যায় মেয়েটি। কিন্তু টিকটক গ্রুপের মাধ্যমে পাচারকারীদের হাতে পড়ে আরও কত মেয়ে যে ভারতের অন্ধকার জগতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তার কোনো হিসাব নেই।

পাচারের ঘাটে ঘাটে ধর্ষণ, বিক্রি হচ্ছে সন্তানও

যেভাবে পাচার হয়

একটা সময় পর্যন্ত সাধারণত আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের মেয়ে, গার্মেন্টসকর্মী এমনকি বিধবা নারীদের টার্গেট করে অনেক টাকার স্বপ্ন দেখিয়ে বিদেশে পাচার করা হতো। এ জন্য দালালের মাধ্যমে টার্গেট নারী বা তাদের পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হতো।

বছর দুয়েক আগে দেশে ‘টিকটক কালচার’ জনপ্রিয় হতে শুরু করে। এই অনলাইন সামাজিকমাধ্যমের মোহে পড়তে শুরু করে উঠতি বয়সী মেয়েরা। আর এ সুযোগ নেয় নারী পাচারে সক্রিয় পুরোনো এই চক্র। কারণ, টিকটক গ্রুপের অ্যাডমিনদের মাধ্যমে অনলাইনে সহজেই হ্যাং আউট বা পুল পার্টির সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়।

দুই বছর ধরে এভাবে তারা টিকটক গ্রুপের নারী সদস্যদের ছলেবলে বিদেশে শুটিং-অডিশনের কথা বলে পাচার করছে। বিশেষ করে ভারতে। প্রতিবেশী এই দেশটিতে নেয়ার সময় পথে পথে তাদের করা হয় ধর্ষণ। কিছু ক্ষেত্রে এসব ঘটনায় ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেয়া হয়। একপর্যায়ে বাধ্য করা হয় যৌন পেশায়।

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, পুরোনো এই চক্রটি আগের মতোই পুরোনো গার্মন্টসকর্মী দিয়ে নতুন গার্মেন্টসকর্মীকে প্রলোভনের মাধ্যমেও পাচার করছে। এ ছাড়া স্বর্ণ চোরাকারবারিদের একটি চক্র নারী পাচারে জড়িয়েছে। এই চক্রের কেউ কেউ স্থানীয় দালালের মাধ্যমে বিদেশে নেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নারী পাচার করছে।

পাচারের ঘাটে ঘাটে ধর্ষণ, বিক্রি হচ্ছে সন্তানও

বেশির ভাগই থেকে যায় ‘অন্ধকার জগতে’

পাচার হওয়ার পর যৌন নির্যাতনের শিকার এসব ভুক্তভোগীর কিছু অংশকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বেশির ভাগই থেকে যায় অন্ধকার জগতে।

পাচার হওয়া মানুষ নিয়ে কাজ করে ‘রাইটস যশোর’ নামের একটি বেসরকারি সংগঠন। তাদের তথ্য বলছে, শুধু যশোরের বেনাপোল সীমান্ত দিয়েই ২০১৯ সালে ফেরত আনা হয়েছে পাচার হওয়া ৩৫ নারীকে, যাদের মধ্যে ছিল ৯টি মেয়েশিশুও।

২০২০ সালে একই সীমান্ত দিয়ে ফেরত আনা হয়ে ২৫ নারী ও ১৯ মেয়েশিশুকে। আর চলতি বছরের গত পাঁচ মাসে বেনাপোল দিয়ে ফেরত আনা হয়েছে চার মেয়েশিশু ও ১৩ নারীকে।

রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, গত ‌১৭-১৮ মাসে টিকটকের ফাঁদে ফেলে পাচার করা হয়েছে বহু মেয়েকে। কয়েকটি ঘটনার মাধ্যমে তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজনকে উদ্ধার করা গেলেও বেশির ভাগই এখনো ভারতে রয়ে গেছে। করোনার বিধিনিষেধের কারণে তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

যেভাবে ফিরিয়ে আনা হয় পাচার হওয়া নারীদের

এ প্রসঙ্গে রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক নিউজবাংলাকে বলেন, ভারতে বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন কারণে রেড দেয় পুলিশ। তখন পাচার হওয়া যেসব মেয়েকে জোরপূর্বক যৌন পেশায় লিপ্ত করা হয়, তাদের অনেকে পুলিশের কাছে ধরা পড়েন। তারপর তাদের বেসরকারি সেফ হোমে রাখা হয়।

তিনি বলেন, ‘সেফ হোম থেকে আমরা তথ্য পাই। তারপর একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায় ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনকে। তারা বিষয়টা ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানায়।

‘এরপর ভুক্তভোগীদের ট্রাভেল পাস মেলে। ওই ট্রাভেল পাস নিয়েই দেশে ফিরতে পারেন তারা। এভাবে বেনাপোল বন্দর দিয়ে পাচারের শিকার নারীরা যখন দেশে আসেন, তখন আমরা তাদের সংখ্যা হিসাব করি।’

পাচারের ঘাটে ঘাটে ধর্ষণ, বিক্রি হচ্ছে সন্তানও

‘স্বপ্ন দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে ইজ্জতের ওপর হাত দেয় ওরা’

সম্প্রতি বাংলাদেশে ফিরে আসা এক নারী নিউজবাংলাকে জানিয়েছেন তার নির্মম অভিজ্ঞতার কথা।

তিনি বলেন, ‘একেকজন একেক কারণে পাচার হয়। অনেকজনকে একসঙ্গে নিয়ে যায় না পাচারকারীরা। কাউকে ভালো ইনকামের কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয়। কাউকে নেয় মডেল বানানোর প্রলোভন দিয়ে। কাউকে কাউকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে নিয়ে যাওয়া হয়।’

ওই নারী বলেন, ‘ইন্ডিয়া যাওয়ার আগে এসব জানতাম না। কারণ আমাদের তিনজনকে ভালো কাজের কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ওখানে গিয়ে দেখি সবই গল্প। একেকজনকে একেক কথা বলে পাচার করা হয়েছে।

‘স্বপ্ন দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে ইজ্জতের ওপর হাত দেয় ওরা। একটা মেয়ে যখন পাচার হয়, তখন ঘাটে ঘাটে ধর্ষণের শিকার হয়। ওটা যে কী আজাব, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।’

‘ওই সব বাচ্চার যে কী হয় আল্লাই ভালো জানে’

পাচারের পর নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে আসা আরও এক নারীর সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা।

তিনি বলেন, ‘এক অমানুষ নিয়ে যায় আরেক অমানুষের কাছে। এভাবে কত অমানুষের হাতে যে আমাদের পড়তে হয়, তা বলে বোঝাতে পারব না। তারপর বিক্রি করে দেয় ভারতীয় দালালদের কাছে।

‘তারা আবার বিক্রি করে দেয় হোটেলে, গোপন বাসাবাড়িতে বা পতিতালয়ে। এসব জায়গায় থাকতে থাকতে অনেক মেয়ের পেটে বাচ্চা চলে আসে। মেয়েটি দেখতে সুন্দর হলে বাচ্চার ভ্রূণ নষ্ট করে দেয়া হয়।’

‘গোপন বাসাবাড়িতে’ যেসব মেয়েকে রাখা হয়, তাদের মধ্যে কারও কারও পেটে বাচ্চা এলে নষ্ট করা হয় না বলে জানান তিনি।

এর কারণ ব্যাখ্যা করে মেয়েটি বলেন, ‘যারা গোপন বাসায় পড়ে, অনেক সময় তারা বাচ্চা নষ্ট না করলেও কিছু বলা হয় না, বিশেষ করে যারা দেখতে তেমন আকর্ষণীয় না, বয়স ত্রিশের ওপরে তাদের।

‘একপর্যায়ে সেই সন্তানের জন্ম ওই সব গোপন বাসায়ই হয়। যখন পুলিশ রেড দেয়, তখন বাচ্চাগুলোকে ওখানে রেখেই বাংলাদেশে চলে আসে। ওই সব বাচ্চার যে কী হয় আল্লাই ভালো জানে। শুনছি, ওসব বাচ্চা নাকি ওই দেশে যাদের বাচ্চা হয় না, তাদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়।’

আরও পড়ুন:
ভারতে তরুণীকে নির্যাতন: দুই আসামির দোষ স্বীকার
ভারতে তরুণীকে নির্যাতন: আরও দুজন রিমান্ডে

শেয়ার করুন

মন্তব্য

আ.লীগের নাম ভাঙানো আরেক ভুঁইফোঁড় নেতা মনিরের ফটোশপকাণ্ড

আ.লীগের নাম ভাঙানো আরেক ভুঁইফোঁড় নেতা মনিরের ফটোশপকাণ্ড

বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদ নামে ভুঁইফোঁড় সংগঠনটি খুলে বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের অনেক নেতাকে টাকার বিনিময়ে পদ দিয়েছেন মনির খান। জমির দালালি এবং তদবির-বাণিজ্য করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এখন চাইছেন কেরানীগঞ্জ ও সাভারের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ঢাকা-২ আসনের এমপি হতে।

হেলেনা জাহাঙ্গীরকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শেষ না হতেই আলোচনায় এসেছেন মো. মনির খান, যিনি বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদ নামে আরেকটি ভুঁইফোঁড় সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ ক্ষমতাসীন দলটির অনেক নেতার সঙ্গেই তার ‘ওঠা-বসার ছবি’ আছে। অভিযোগ আছে, এর সব ছবিই ফটোশপে কারসাজি করা। তিনি ভুঁইফোঁড় সংগঠনটি খুলে বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের অনেক নেতাকে টাকার বিনিময়ে পদ দিয়েছেন। এ ছাড়া জমির দালালি এবং তদবির-বাণিজ্য করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এখন চাইছেন কেরানীগঞ্জ ও সাভারের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ঢাকা-২ আসনের এমপি হতে।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদের মতো সংগঠনের সঙ্গে সঙ্গে দলটির কোনো সম্পৃক্ততা নেই। যারা এ ধরনের ভুঁইফোঁড় সংগঠন চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মনির খান প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ছবি কারসাজি করেছেন। তাকে যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করা হবে।

তবে মনির খান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, তিনি অপপ্রচারের শিকার।

আওয়ামী লীগ এবং দলটির সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতারা জানান, বছর ১৫ আগে রাজধানীর গুলিস্তানে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ের উল্টো পাশের একটি কাপড়ের দোকানে দরজির কাজ করতেন এই মনির খান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলটির রাজনীতিতে সক্রিয় হতে শুরু করেন তিনি। মুজিব কোট পরে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যোগ দিতে থাকেন। তবে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ের চেয়ে তাকে বেশি দেখা যেত ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে। কারণ, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়েই একসময় দরজির কাজ করতেন মনির খান।

চাকরিজীবী লীগ নামে একটি ভুঁইফোঁড় সংগঠনের জন্ম দিয়ে আলোচনায় আসা হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গত ২৯ জুলাই রাতে আটকের পরপরই আলোচনা শুরু হয় এই মনির খানকে নিয়ে। আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সরব হন তার বিরুদ্ধে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে তার বিরুদ্ধে আইনি ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।

ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী ইয়াসির আরাফত রুবেল ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে ফটো এডিট করে শেখ হাসিনা পরিষদ নামে নামে ভুঁইফোঁড় সংঘঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মনির খান ওরফে দরজি মনিরকে কেন এখনো গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না, মাননীয়রা কি উত্তর দিবেন?”

যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ছাত্রলীগের সাবেক নেতা গোলাম ইরতেজা মনি প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে মনির খানের একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পাশের চেয়ারে বসা এই ভদ্রলোক কি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার?’

ইয়াসির আরাফত রুবেল ও গোলাম ইরতেজা মনির মতো ছাত্রলীগ-যুবলীগের আরও অনেক সাবেক ও বর্তমান নেতা মনির খানকে নিয়ে ফেসবুকে এ ধরনের পোস্ট দিয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন। একই দাবি জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

আ.লীগের নাম ভাঙানো আরেক ভুঁইফোঁড় নেতা মনিরের ফটোশপকাণ্ড


নাম না প্রকাশের শর্তে আওয়ামী লীগের উপকমিটি ও যুবলীগের একাধিক নেতা নিউজবাংলাকে জানিয়েছেন, ২০০৪-০৫ সালের দিকে তারা যখন ছাত্রলীগ করতেন, তখন নিয়মিতই বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের পার্টি অফিসে যেতেন। পার্টি অফিসের ঠিক বিপরীত পাশের একটি কাপড়ের দোকানে দরজির কাজ করতেন এই মনির খান।

‘আমরা ওই দোকানের সামনে যখন চা খেতাম, তখন মাঝে মাঝে মনির খানও আমাদের সঙ্গে এসে আড্ডা দিত। তখন তার ঘাড়ে কাপড় মাপা ফিতা থাকত’, বলেন তাদের একজন।

তিনি আরও বলেন, ‘এরপর হঠাৎ একদিন দেখি ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ অফিসে মুজিব কোট গায়ে দিয়ে মনির খান ঘুরে বেড়াচ্ছে। কথা বলে জানতে পারলাম, সে বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদ নামে একটি সংগঠনের সভাপতি হয়েছে।’

তীব্র হতাশা প্রকাশ করে ছাত্রলীগের সাবেক এই নেতা বলেন, ‘এরপর মনির খানকে আমি মাঝে মাঝেই পার্টি অফিসে বড় বড় নেতার সঙ্গে দেখতাম। নেতারাও আমাদের থেকে তাকেই বেশি মূল্যায়ন করত। মনিরের বেশভূষা দেখেই বোঝা যেত, সে অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছে।

‘পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, মনির খান কেরানীগঞ্জ এলাকায় জমির দালালি করে প্রচুর টাকা বানিয়ে ফেলেছে। তা ছাড়া সে সারা দেশে তার ভুঁইফোঁড় সংগঠনের কমিটি দেয়ার নামে বাণিজ্য করে প্রচুর টাকা কামিয়েছে। বিএনপি-জামায়াত, ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের নেতাদেরও টাকার বিনিময়ে তার বানোনো দলে পদ দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘শুধু তাই না, এই মনির তার ভুঁইফোঁড় সংঘঠনের নামে জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক প্রোগ্রাম করে। সেখানে সে আওয়ামী লীগের বড় নেতা ও মন্ত্রীদের প্রধান অতিথি হিসেবে রাখে।

আ.লীগের নাম ভাঙানো আরেক ভুঁইফোঁড় নেতা মনিরের ফটোশপকাণ্ড


‘এভাবে সে বড় বড় নেতা ও মন্ত্রীর কাছের লোক হয়ে যায়। পরে তাদের কাছে বিভিন্ন তদবির-বাণিজ্য করে। এভাবেই মনির কয়েক বছরে অঢেল অর্থসম্পত্তি বানিয়ে ফেলে এখন ঢাকা-২ আসনের এমপি হতে চাইছে।’

এসব অভিযোগের সত্যতা জানতে নিউজবাংলা রোববার খোঁজ নেয় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের সামনের কাপড়ের দোকানগুলোয়। করোনার কারণে লকডাউন চলায় সব দোকান বন্ধ ছিল; তাই দোকানমালিকদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। পরে মোবাইল ফোনে কথা হয় আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ের বিপরীত পাশের মাদারীপুর বস্ত্র বিতানের মালিক মো. হিরনের সঙ্গে।

হোয়াটসঅ্যাপে মনির খানের ছবি দিয়ে তার সম্পর্কে জানতে চাইলে হিরন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘না, আমি এই মনির খানকে চিনি না। সে আমার দোকানে কোনো দিন কাজ করেনি। তবে আমাদের আশপাশে এই রকম আরও অনেক টেইলার্সের দোকান আছে, সেখানে কাজ করতো কিনা জানি না।’

মনির খানের ফেসবুক ঘেঁটে দেখা গেছে, ১০ হাজারের বেশি ফলোয়ার রয়েছে তার। প্রোফাইল পিকচারে মুজিব কোট ও চাদর পরা একটি ছবি আছে মনির খানের। ওই চাদরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রতীক নৌকা এবং সেই নৌকায় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাসংবলিত একটি ব্যাচ রয়েছে। মনির খানের কাভার ফটোতে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে তার একটি ছবি আছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আরও কিছু ছবি আছে তার ফেসবুকে। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও তার তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সঙ্গেও ছবি দিয়েছেন তিনি।

এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার সঙ্গে তার ‘ওঠা-বসার ছবি’ দেখা যায় ফেসকুকে। ছবিগুলো ভালো করে লক্ষ করলে বোঝা যায়, খুব সূক্ষ্মভাবে সম্পাদনার মধ্যমে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ছবির জায়গায় নিজের ছবি বসিয়ে সেগুলো প্রচার করছেন মনির খান। ফটোশপে কারসাজি করা এসব ছবির বেশির ভাগেই তার চেহারা অন্যদের তুলনায় বড় দেখাচ্ছে।

নিউজবাংলা এ ধরনের কয়েকটি ছবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেনকে দেখিয়ে মন্তব্য জানতে চায়।

তিনি বলেন, ‘অফিশিয়ালভাবে আসলে ছবির ফরেনসিক অ্যানালাইসিস না করে আমরা মন্তব্য করি না। তবে আন-অফিশিয়ালি যদি বলি, তাহলে ছবিগুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এগুলো প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা। এটা শুধু আমি না, যেকোনো মানুষই এই ছবি দেখলেই বলবে, এগুলো এডিট করে করা।’

ফেসবুক আইডিতে মনির খানের পরিচয় অংশে লেখা আছে, ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটিতে সহ-সম্পাদক ছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য হন। তিনি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলার রূপসী গার্মেন্টস লিমিটেড, যার ব্যবস্থাপক পরিচালক তিনি। বাংলাদেশ সময় প্রতিদিন নামে একটি পত্রিকার প্রধান উপদেষ্টা তিনি।

আ.লীগের নাম ভাঙানো আরেক ভুঁইফোঁড় নেতা মনিরের ফটোশপকাণ্ড


এ ছাড়া গ্লোবাল ৪১ ইঞ্জিনিরিং অ্যান্ড কনসালটেন্ট লিমিটেড, পোশাক মেলা ফ্যাশন হাউস প্রাইভেট লিমিটেড এবং অটিজম বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল ভয়েস সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ফেসবুকে তিনি তার প্রায় সব পোস্টেই নিজেকে বঙ্গবন্ধুকে কটূক্তিকারী তারেক জিয়ার মামলার বাদী দাবি করেছেন।

মনির খান তার ফেসবুকে লিখেছেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ঢাকা-২ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র কিনেছিলেন। আরেক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘এমপি পদপ্রার্থী ঢাকা-২ আসন, আওয়ামী লীগ।’

তার এমন পরিচিতি ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে নিউজবাংলা কথা বলেছে ঢাকা-২ আসানের সাবেক আরেক এমপি প্রার্থী বর্তমানে কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শহীন আহম্মেদের সঙ্গে। মো. মনির খান নাম শুনেই তিনি বলেন, ‘মনির খান নামে আমি কাউকে চিনি না। আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন যেমন যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ করলে হয়তো তাকে চিনতাম। ভুঁইফোঁড় কোনো সংগঠনের কাউকেই আমি চিনি না।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মনির খান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রাজনীতি করলে পতিপক্ষ থাকবেই। আমার পতিপক্ষরাই আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। একটা মানুষ তো সবার কাছে ভালো থাকতে পারে না।’

প্রধানমন্ত্রী ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে ছবির বিষয়ে প্রশ্ন করতেই ‘মিটিংয়ে আছি’ বলে সংযোগ কেটে দেন মনির খান।

আ.লীগের নাম ভাঙানো আরেক ভুঁইফোঁড় নেতা মনিরের ফটোশপকাণ্ড

তার বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের বিধিবদ্ধ সংগঠন করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু প্রতারণা করার অধিকার কারও নেই।

‘কতিপয় সুযোগসন্ধানী দুষ্ট ব্যক্তি জাতির পিতা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের নামের অপব্যবহার করে ফায়দা হাসিল করছে। এদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে, আরও জোরদার হবে।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার যুগ্ম কমিশনার হারুন-অর-রশীদ রোববার সন্ধ্যায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মনির খান প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ব্যক্তির ছবির সঙ্গে নিজের ছবি জুড়ে দিয়েছেন। তিনি অসৎ উদ্দেশ্যে এসব ছবি ব্যবহার করেছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। তাকে নজরদারিতে রেখেছি, যে কোনো সময় গ্রেপ্তার করা হবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা নিউজবাংলাকে জানান, মনিরের গ্রামের বাড়ি মাদরীপুরের কালকিনি উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নে। তার বাবা অনেক আগেই ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকায় চলে আসেন। সেখানে তিনি মাটি কাটার কাজ করতেন। মনির এখন পরিবারসহ কেরানীগঞ্জ এলাকায় বাসবাস করেন। এই করণেই ওই এলাকার (ঢাকা-২ আসন) এমপি হতে চান। মনিরের বর্তমানে একাধিক স্ত্রী আছেন।

আওয়ামী লীগ নেতারা যা বলছেন, বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদের মতো ৭২টি ভুঁইফোঁড় সংগঠনের সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন হচ্ছে যুবলীগ, মহিলা লীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুব মহিলা লীগ, তাঁতী লীগ, আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ ও মৎস্যজীবী লীগ। জাতীয় শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগ হলো দলটির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন। আর মহিলা শ্রমিক লীগ ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ আওয়ামী লীগের ‘নীতিগত’ অনুমোদিত সংগঠন।

ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলোকে সতর্ক করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা আগেও বলেছি। আমাদের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি সহযোগী সংগঠন ছাড়া বাকি যেগুলো আছে, আওয়ামী লীগের নামে বিভিন্নজন করেছে, এগুলোর কোনো সাংগঠনিক ভিত্তি নেই।

‘এরা বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের নামটা ব্যবহার করে তাদের সুবিধা ভোগ করার জন্য অবৈধ এ পন্থা অবলম্বন করেছে। এদের বিরুদ্ধে আগেও আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। প্রশাসনকে সে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। সে সময় অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছিল এবং তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার এ রকম কয়েকটি সংগঠনের নাম শোনা যাচ্ছে।’

আরও পড়ুন:
ভারতে তরুণীকে নির্যাতন: দুই আসামির দোষ স্বীকার
ভারতে তরুণীকে নির্যাতন: আরও দুজন রিমান্ডে

শেয়ার করুন

বোমার ‘মাস্টার’ নব্য জেএমবির ২৪ জন!

বোমার ‘মাস্টার’ নব্য জেএমবির ২৪ জন!

জাহিদ হাসান ওরফে ফোরকান। ছবি: সংগৃহীত

সিটিটিসি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীর তথ্য মিলেছে, যারা নব্য জেএমবির সদস্যদের বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে একজনকে (জাহিদ হাসান ওরফে ফোরকান) শনাক্ত করা গেলেও তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। বাকিদের এখনও শনাক্ত করা যায়নি।

‘তরবারির যুগ শেষ। এখন লড়াই হবে গোলাবারুদে। কাজেই হাতের কাছে যা পাওয়া যায়, তাই দিয়ে বোমা বানাও। এ ক্ষেত্রে রান্নাঘরকে ব্যবহার করো।’

নব্য জেএমবির বোমা তৈরিতে পারদর্শী নেতারা নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠনটির সক্রিয় সদস্যদের অনলাইনে বোমা তৈরিতে এমন নির্দেশনা দিচ্ছেন, যাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

জঙ্গি কর্মকাণ্ড অনুসরণকারী পুলিশ কর্মকর্তারা নিউজবাংলাকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

তারা বলছেন, নব্য জেএমবির পাঁচ-ছয়জন নেতা রয়েছেন, যারা বোমা তৈরির প্রশিক্ষক। এই জঙ্গি নেতারা অনলাইনে বিভিন্ন সেল (চারজন) করে বোমা তৈরির নির্দেশনা দেন সক্রিয় সদস্যদের। গত এপ্রিল থেকে তিন মাসেই অন্তত ২৪ জন সক্রিয় সদস্যকে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, যারা এখন খুব সহজেই বোমা বানাতে পারেন। তারাসহ সব প্রশিক্ষককে শনাক্তের পাশাপাশি গ্রেপ্তারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আরও পড়ুন: নিখোঁজ জাবি শিক্ষার্থীর জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) উপকমিশনার (ডিসি) আবদুল মান্নান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নব্য জেএমবির যারা বম্ব-টেক ব্যবহার করে বিভিন্ন সেলের মাধ্যমে সক্রিয় সদস্যদের বোমা তৈরির ধারণা দিচ্ছেন, আমরা তাদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করছি।’

বোমার ‘মাস্টার’ নব্য জেএমবির ২৪ জন!
সাব্বির আহম্মেদ। ছবি: সংগৃহীত

সিটিটিসির একাধিক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে জানান, গত ১৭ মে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ডসংলগ্ন পুলিশ বক্সে বোমা ফেলে রাখে জঙ্গিরা। সেই ঘটনার তদন্তে নেমে নব্য জেএমবির সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পান তদন্তকারী কর্মকর্তারা। তদন্তকালে ৭ জুলাই রাজধানীর পল্লবী এলাকা থেকে সাব্বির আহম্মেদ ওরফে বামছি ব্যারেক ওরফে মেজর বামছি ওরফে আবু হাফস আল বাঙ্গালি ওরফে জন ডেভিড এবং নাঈম মিয়া ও রবিউল ইসলাম ওরফে উসমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

১১ জুলাই যাত্রাবাড়ী থেকে আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে ডেভিড কিলার ও কেরানীগঞ্জ থেকে কাউসার হোসেন ওরফে মেজর ওসামাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে জামালপুর ও নারায়ণগঞ্জের তিনটি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) ও আইইডি তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

আরও পড়ুন: জঙ্গি সাব্বিরের ‘আস্তানা’ থেকে আইইডি উদ্ধার

সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রীয়করণ দলের কর্মকর্তারা জানান, জুলাই মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নব্য জেএমবির যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, তারা সবাই বোমা বানাতে পারেন। এদের মধ্যে সাব্বির আহম্মেদ আইইডি তৈরির অন্যতম কারিগর। দীর্ঘদিন ধরে নব্য জেএমবির ময়মনসিংহ অঞ্চলের সামরিক শাখার কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তার অধীনেই ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল ও কুড়িগ্রামে অন্তত ২০ জন সক্রিয় সামরিক সদস্য রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

কর্মকর্তারা জানান, নব্য জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতা জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজান ছিলেন সংগঠনটির বোমা তৈরির মূল কারিগর। তিনি এখন কারাবন্দি। তবে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল সাব্বির আহম্মেদের। গত ৭ জুলাই গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত ওই জঙ্গি নেতার পরিবারের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ছিল তার।

বোমার ‘মাস্টার’ নব্য জেএমবির ২৪ জন!
নব্য জেএমবির দুই সদস্য আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে ডেভিড কিলার (বাঁয়ে) ও কাওসার হোসেন ওরফে মেজর ওসামা। ছবি: সংগৃহীত

সংগঠনটির সদস্যদের বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ যারা দিচ্ছেন তাদের মধ্যে কেউ একজন রয়েছেন, যিনি রসায়নবিদ- এমন ধারণা থেকে তদন্তে নামে সিটিটিসি। দীর্ঘ তদন্তের পর জাহিদ হাসান ওরফে ফোরকানসহ একাধিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করে সিটিটিসি, যারা সংগঠনটির সদস্যদের অনলাইনে ও অফলাইনে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন।

সিটিটিসি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীর তথ্য মিলেছে, যারা নব্য জেএমবির সদস্যদের বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে একজনকে (জাহিদ হাসান ওরফে ফোরকান) শনাক্ত করা গেলেও তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। বাকিদের এখনও শনাক্ত করা যায়নি।

সিটিটিসি কর্মকর্তারা জানান, জাহিদ হাসান ওরফে ফোরকান আত্মগোপনে রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, কোথাও ‘হিযরতে’ গেছেন তিনি। জঙ্গি কর্মকাণ্ডে তার জড়িত থাকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। গুলশানের হোলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলায় জড়িত শরিফুল ইসলাম রিপনের কাছ থেকেই তার বিষয়ে প্রথম তথ্য পাওয়া যায়। তারপর থেকেই তাকে খোঁজা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: পুলিশ বক্সে বোমার তদন্তে মিলল দুই জঙ্গি আস্তানা

সিটিটিসি অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. রহমত উল্যাহ চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নব্য জেএমবির বোমা তৈরির প্রধান কারিগর জাহিদ হাসান ওরফে ফোরকান ভাই ওরফে ইসমাইল ভাইকে শনাক্ত করা হয়েছে, যাকে আমরা ২০১৪ সাল থেকে খুঁজছি। ওই সময়েই আমাদের ধারণা ছিল, আইইডি বানানোর পেছনে একজন কেমিস্ট্রির ছাত্র থাকতে পারেন, যার বিষয়ে জঙ্গি নেতা শরিফুল ইসলাম রিপনের কাছ থেকেই প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যায়। এরপর থেকেই তাকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া নব্য জেএমবির নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে, সংগঠনটির অনেক বোমা কারিগর সক্রিয় সদস্যদের বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

বোমার ‘মাস্টার’ নব্য জেএমবির ২৪ জন!
নাঈম ও রবিউল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

নব্য জেএমবিতে কতজন বোমা তৈরির প্রশিক্ষক আছেন এবং এ পর্যন্ত তারা কতজনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানতে পারেনি নিউজবাংলা।

সিটিটিসি কর্মকর্তারা জানান, কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা ঘিরে তৎপরতা চালানোর পাশাপাশি অনলাইনে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন জাহিদ হাসান ওরফে ফোরকান। তার বেশ কয়েকটি কুনিয়া বা সাংকেতিক নাম রয়েছে। সেসব নাম ব্যবহার করে অনলাইনে বোমা তৈরির একাধিক সেল গঠন করেছেন তিনি। জাহিদ হাসান ওরফে ফোরকানসহ চার-পাঁচজন জঙ্গি নেতা পরিচালিত পাঁচ-ছয়টি সেলের সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের মাধ্যমে গত তিন মাসে ২০-২৪ জনকে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিউজবাংলাকে জানান, রসায়ন বিভাগের ছাত্র জাহিদ হাসান অনেক দিন ধরেই নিখোঁজ। সম্প্রতি তার পরিবারের সদস্যরা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণও করেন।

জাহিদের বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটায়। সেখানকার রায়হানপুরে সৈয়দ ফজলুল হক ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০০৯ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করেন তিনি। পরে ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। তবে স্নাতক শেষে আর ভর্তি হননি তিনি।

আরও পড়ুন:
ভারতে তরুণীকে নির্যাতন: দুই আসামির দোষ স্বীকার
ভারতে তরুণীকে নির্যাতন: আরও দুজন রিমান্ডে

শেয়ার করুন

কমলাপুর, মতিঝিলে গাড়িতে আগুন কেন?

কমলাপুর, মতিঝিলে গাড়িতে আগুন কেন?

আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত রাজধানীর কমলাপুরে বিআরটিসির বাস ডিপোর দুটি বাস। ছবি: সাইফুল ইসলাম/নিউজবাংলা

মাত্র একদিনের ব্যবধানে রাজধানীর প্রায় একই এলাকায় বাসে আগুন লাগা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মতিঝিলে আগুনের কারণ গ্যারাজের কর্মীদের অসাবধানতা। তবে কমলাপুর বিআরটিসির ডিপোতে বাসে আগুন নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা।

রাজধানীর কমলাপুর বিআরটিসির ডিপোতে ২৪ জুলাই আগুন লেগে পুড়ে যায় একটি বাস, ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরেকটি। একদিন পরেই মতিঝিলের মধুমতি সিনেমা হলের পেছনে গাড়ির গ্যারেজে আগুনে পুড়ে যায় দুটি বাস ও একটি প্রাইভেট কার।

মাত্র একদিনের ব্যবধানে রাজধানীর প্রায় একই এলাকায় বাসে আগুন লাগা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। এ ঘটনার পর নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মতিঝিলে আগুনের কারণ গ্যারাজের কর্মীদের অসাবধানতা। তবে শাটটাউনে বন্ধ কমলাপুর বিআরটিসির ডিপোতে বাসে আগুন কীভাবে লাগল, তা নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, মতিঝিলের মধুমতি সিনেমা হলের পেছনে আলাউদ্দিন অটো মোবাইলসে প্রাইভেট কারে ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করার সময় প্রথমে থিনারের বোতলে আগুন লাগে। গ্যারেজ কর্মী সেটা লাথি মেরে সারানোর চেষ্টা করলে ছড়িয়ে যায় আগুন।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, এই গ্যারাজের আশেপাশে উঁচু ভবন। জমি দুই ভাগ করে ভাড়া দেয়া হয়েছে। এক অংশে সাতটি গাড়ির ওয়ার্কশপ। বাকি অংশে সিল্ক লাইনের বাস রাখার গ্যারেজ। দুই পাশে দুটি গেট। একটা গেট সাতটি ওয়ার্কশপের, অন্য পাশের গেট দিয়ে সিল্ক লাইনের বাস ঢোকে-বের হয়।

ফায়ার সার্ভিস বলছে, জায়গাটি সরকারি প্লট। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনে এমন গ্যারাজ আছে ১০০-১৫০টি। টিন বাঁশ দিয়ে গ্যারেজ বানিয়ে দিনে গাড়ি সারানো হয়, রাতে গাড়ি রাখার জন্য গ্যারেজ ভাড়া দেয়।

দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সিল্ক লাইন বাসের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বরত আইয়ুব আলী নিউজবাংলাকে জানান, সেদিন আগুন লাগে আলাউদ্দিন অটো মোবাইলস থেকে। সেখানে একটি প্রাইভেটকারের সার্ভিসিং চলছিল। গ্যারেজের একজন কর্মী ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করছিলেন। তার পাশে রাখা ছিল থিনারের একটি বোতল। ওয়েল্ডিংয়ের সময় এই থিনারের বোতলে আগুন লেগে যায়।

তিনি বলেন, ‘সে সময় একজন কর্মী পা দিয়ে লাথি মেরে থিনারের বোতলটি সরাতে গিয়েছিল। আর এতেই আগুন ছড়িয়ে যায়। আগুন পাশে থাকা একটি গ্যাস সিলিন্ডারে লাগলে সেটি সম্ভবত বিস্ফোরিত হয়। এ সময় আশেপাশে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। আগুনের ব্যাপকতা দেখে গ্যারেজকর্মীরা বেরিয়ে যায়।

‘আমি প্রথমে ড্রামের পানি দিয়ে আগুন নেভাতে চেষ্টা করি। পরে বাস বের করা শুরু করি। গ্যারেজে থাকা দুটি বড় ও একটি ছোট বাস সরিয়ে নেয়া গেলেও রয়ে যায় দুটি বাস ও ওই প্রাইভেটকার। সেগুলো আগুনে পুড়ে যায়।’

কমলাপুর, মতিঝিলে গাড়িতে আগুন কেন?
মতিঝিলের আলাউদ্দিন অটো মোবাইলসে এই গাড়িটি মেরামত করার সময় আগুন ধরে যায়। এই আগুনে পুড়ে আরও দুটি বাস

স্থানীয়রা জানান, গ্যারেজের জায়গাটি রোকসানা পারভিন নামে একজন ১০০ বছরের জন্য লিজ নিয়েছেন। রোকসানার স্বামী রাকিব গ্যারেজ ভাড়া দিয়ে তা দেখভাল করেন।

রাকিবের মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল করার পর তিনি রিসিভ করেন। তবে সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুল নম্বর বলে কেটে দেন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) দেবাশীষ বর্ধন নিউজবাংলাকে জানান, গাড়ির ওয়ার্কশপ বা গ্যারেজগুলো খুব অবহেলিত ও অপরিকল্পিতভাবে তৈরি। এগুলোর বেশির ভাগ রাতে গাড়ি রাখার জন্য ভাড়া দেয়া হয়। সাধারণত সহজ দাহ্যবস্তু টিন, কাঠ, বাঁশ দিয়ে গ্যারেজগুলো তৈরি হয়।

তিনি বলেন, ‘এই গ্যারেজগুলোর ট্রেড লাইসেন্স আছে কি না সন্দেহ। আমাদের কাছ থেকে তারা কোনো ছাড়পত্র, ফায়ার সেফটি প্ল্যান নেয় না। গ্যারেজে কোনো ফায়ার সেফটিও থাকে না। মালিকদের অবহেলার কারণেই এই ধরনের দুর্ঘটনা বার বার ঘটছে। তাদেরকে একটি আইনের আওতায় আনতে হবে।’

দেবাশীষ বর্ধন বলেন, ‘গ্যারেজে প্রচুর দাহ্য পদার্থ থাকে। এর ভেতরে বসেই কর্মীরা সিগারেট খান। তারা প্রচুর বিদ্যুতের ব্যবহার করেন। এ কারণে বিদ্যুতের শর্টসার্কিট থেকেও অনেক সময় আগুন লাগে। এ ছাড়া, গ্যাসের ব্যবহারও হয় এখানে। গ্যারেজে বাস, কাঠ, টিন থাকতে পারবে না। সেটা নিশ্চিত করা গেলে আগুন লাগলেও ক্ষতি কম হবে।’

কমলাপুর, মতিঝিলে গাড়িতে আগুন কেন?
মতিঝিলের গ্যারেজে আগুনে পুড়ে যাওয়া দুটি বাস- নিউজবাংলা

গ্যারেজের বৈধতার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসের নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এগুলোর বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।’

বিআরটিসির ডিপোতে আগুনের কারণ অস্পষ্ট

মতিঝিলের মধুমতি সিনেমা হলের পেছন গাড়ির গ্যারেজের আগুন লাগার আগের দিন ২৪ জুলাই কমলাপুর বিআরটিসির ডিপোতে আগুনে একটি বাস পুড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরেকটি বাস।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমলাপুর বিআরটিসির ডিপোর ভারপ্রাপ্ত গার্ড কমান্ডার গোলাম মোহাম্মদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আগুনের সূত্রপাত নিয়ে তদন্ত চলছে। এখানে আনসারের লোক ছিল তারা ধোঁয়া দেখছে প্রথমে। ঘটনাস্থলে কেউ ছিল না। এখানে বাস আছে ১৫০-২০০। যে বাসটা পুড়ছে সেটা ২০১২ সালের। এক মাসের মতো পড়ে ছিল এখানে।’

কমলাপুর, মতিঝিলে গাড়িতে আগুন কেন?

পরিকল্পিত আগুন কি না, প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘এখনও সেটা বোঝা যাচ্ছে না।’

ঘটনার সময় ডিপোর গেটে দায়িত্বপালন করা আনসার সদস্য মাজহারুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের মতো বাজে তখন। হঠাৎ করে পেছনের দিক থেকে একটা আওয়াজ আসে। ঘুরে দেখি কালো ধোঁয়া উড়ছে। সে সময় আনসার ছিল ৮-৯ জন। এখানের লোক ছিল ৪-৫ জন। গেট ছাড়া এখানে বাইরে কোনো লোকের ভেতরে ঢোকার সিস্টেম নেই।’

তিনি বলেন, ‘বিআরটিসির গাড়ি রাস্তায় থাকে থাকে হাজার হাজার। পরিকল্পিতভাবে কেউ আগুন দিতে গেলে এত রিস্ক নিয়ে ভেতরে কেন আসবে? দেয়াল টপকিয়েও কারও এখানে আসা সম্ভব না। কীভাবে যে আগুন লাগছে বুঝতে পারছি না।’

বিআরটিসির মতিঝিল বাস ডিপো ম্যানেজার মাসুদ তালুকদার নিউজবাংলাকে বলেন, বাস পোড়ার বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছে।

তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে খিলগাঁও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন ম্যানেজার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘বিআরটিএ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ফায়ার সার্ভিসের কোনো আলাদা কমিটি হয়নি।’

আরও পড়ুন:
ভারতে তরুণীকে নির্যাতন: দুই আসামির দোষ স্বীকার
ভারতে তরুণীকে নির্যাতন: আরও দুজন রিমান্ডে

শেয়ার করুন

ওমর ফারুক হাসপাতালে র‌্যাবের সহায়তায়

ওমর ফারুক হাসপাতালে র‌্যাবের সহায়তায়

ফারুককে বুধবার কখন বিএসএমএমইউ হাসপাতালে আনা হয়, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং র‌্যাবের বক্তব্যে দূরত্ব রয়েছে। ফারুককে বুধবার রাতে পাওয়ার দাবি করছে বিএসএমএমইউ, তবে র‌্যাব বলছে, দুপুরের দিকেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

করোনার তিন ডোজ টিকা নেয়ার অভিযোগ তোলা ওমর ফারুককে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কর্তৃপক্ষের অনুরোধে র‌্যাবের একটি টিম নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে ঢাকায় এনে হাসপাতালে ভর্তি করে।

ফারুককে নিয়ে আসতে র‌্যাবের সহায়তা চাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ। অন্যদিকে, র‌্যাবের কর্মকর্তারাও নিউজবাংলাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তবে ফারুককে বুধবার কখন বিএসএমএমইউ হাসপাতালে আনা হয়, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং র‌্যাবের বক্তব্যের দূরত্ব রয়েছে। ফারুককে বুধবার রাতে পাওয়ার দাবি করছে বিএসএমএমইউ, তবে র‌্যাব বলছে, দুপুরের দিকেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

প্রবাসী অ্যাপ থেকে অনলাইনে নিবন্ধন করে ২৬ জুলাই সকালে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে টিকা নেয়ার জন্য যান ফারুক। সেখানে প্রথমে একটি বুথে তাকে এক ডোজ টিকা দেয়া হয়। ফারুক ওই বুথের স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে পরবর্তী করণীয় জানতে চাইলে তাকে সামনের বুথের দিকে যেতে বলা হয়।

পরের বুথে গেলে তাকে আবার টিকা দেয়া হয়, এরপর সামনের আরেকটি বুথ থেকে দেয়া হয় টিকার আরেকটি ডোজ।

ওমর ফারুক হাসপাতালে র‌্যাবের সহায়তায়

এ ঘটনা নিয়ে বেসরকারি একটি টেলিভিশনে প্রতিবেদন প্রচারের পর ব্যাপক আলোচনা শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

এই আলোচনার মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ মঙ্গলবার বিকেলে নিউজবাংলা বলেন, ‘ওমর ফারুক সুস্থ আছেন এবং তিনি সাত দিন পর্যবেক্ষণে থাকবেন।’

তবে এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উপাচার্য তার বক্তব্য পরিবর্তন করে কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমের কাছে দাবি করেন, একজনকে তিনবার টিকা দেয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। ওমর ফারুক নামে কেউ তাদের পর্যবেক্ষণেও নেই।

পরের দিনও বিষয়টিকে অস্বীকার করে বিএসএমএমইউ। তবে ওমর ফারুকের পরিবার দাবি করে, বুধবার দুপুরে ফারুককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

ওমর ফারুককে নিজেদের জিম্মায় পাওয়ার বিষয়টি বৃহস্পতিবার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ।

এরপর বিকেলে ওমর ফারুকের সার্বিক অবস্থা নিয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গত রাতেই (বুধবার রাত) পর্যবেক্ষণের জন্য ওমর ফারুককে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে সুস্থ আছের। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। আপনাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।’

ফারুককে পর্যবেক্ষণে রাখার বিষয়টি বুধবার অস্বীকার করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। কাল র‌্যাবে নিয়ে আসছে। রাতে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। আমিই নির্দেশ দিয়েছিলাম, বলেছিলাম তাকে নিয়ে আসেন এখানে, অবজার্ভ করি।’

উপাচার্য বলেন, ‘হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নজরুল ইসলামকে প্রধানের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আগামী শনিবার কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে। এরপর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারবো।’

ফারুককে বুধবার দুপুরে বাড়ি থেকে নিয়ে আসার বিষয়ে তার পরিবারের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, ‘আমাদের এখানে রাতে এনে ভর্তি করা হয়েছে। এর আগে তিনি কোথায় ছিলেন সেটা কীভাবে বলবো।’

ওমর ফারুক হাসপাতালে র‌্যাবের সহায়তায়
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ওমর ফারুকের বাড়ি

এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নজরুল ইসলাম প্রধান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কাল রাতে র‌্যাব আমাদের এখানে ওমর ফারুককে ভর্তি করেছে। আমাদের মেডিসিন ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা তাকে পর্যবেক্ষণ করবে। এরপর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলতে পারবো কী হয়েছিল সেদিন।’

তবে র‌্যাবের দাবি, ফারুককে নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে এনে দুপুরেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুরোধে র‌্যাব বুধবার সকালে নারায়ণগঞ্জ থেকে ওমর ফারুকে নিয়ে আসে। র‌্যাবের সঙ্গে হাসপাতালের চিকিৎসক ও অন্যান্য কর্মীরাও ছিলেন। ওমর ফারুককে এনে দুপুর নাগাদ বিএসএমএমইউ হাসপাতালে হস্তান্তর করে র‌্যাব।’

র‌্যাবের এ বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে, বিএসএমএমইউর মিডিয়া কো-অর্ডিনেটর সুব্রত বিশ্বাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এ বিষয়ে হাসপাতাল পরিচালক ও ভিসি ভালো বলতে পারবেন।’

এদিকে, ওমর ফারুককে দেখতে নারায়ণগঞ্জ থেকে বিএসএমএমইউতে আসা তার মা রহিমা বেগম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ছেলেকে দেখে আসছি। সে বর্তমানে সুস্থ আছে। ছেলেকে দেখে এখন একটু স্বস্তি লাগছে। তাকে শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি-ব্লকে রাখা হয়েছে।’

ওমর ফারুকের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ভূঁইঘরে। তার চার বছর বয়সী এক ছেলে রয়েছে। বাবা জামাল হোসেন প্রধান পেশায় অটোরিকশাচালক। ফারুকরা তার চাচা আলাউদ্দিনের তিনতলা বাড়ির নিচতলায় ভাড়া থাকেন। চার বছর আগে তিনি ভুঁইঘর মিছির আলী মাদ্রাসা থেকে হেফজ বিভাগে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর থেকে বেকার ছিলেন ওমর ফারুক। সম্প্রতি তার সৌদি আরব যাওয়ার ভিসা হয়। এজন্যই তিনি টিকা নিতে আসেন বিএসএমএমইউতে।

আরও পড়ুন:
ভারতে তরুণীকে নির্যাতন: দুই আসামির দোষ স্বীকার
ভারতে তরুণীকে নির্যাতন: আরও দুজন রিমান্ডে

শেয়ার করুন

হেলেনা জাহাঙ্গীরের উত্থান যেভাবে

হেলেনা জাহাঙ্গীরের উত্থান যেভাবে

ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে হেলেনা জাহাঙ্গীরের উত্থান হয়েছে অল্প সময়ের মধ্যে। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি নানা কারণে তিনি বেশ কিছুদিন ধরে আলোচনায়।

ফেসবুকে ২০ লাখের বেশি ফলোয়ার হেলেনা জাহাঙ্গীরের। বেশ কয়েক বছর ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এই ব্যবসায়ী ও নারী উদ্যোক্তা, যিনি যুক্ত রাজনীতির সঙ্গেও।

সম্প্রতি ‘চাকরিজীবী লীগ’ নামে একটি সংগঠনের সূত্র ধরে তিনি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন। ভুঁইফোড় এ সংগঠনের সভাপতি হিসেবে তার নাম এসেছে। যদিও তিনি বলেছেন, তিনি ওই পদ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেননি।

ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে হেলেনা জাহাঙ্গীরের উত্থান হয়েছে অল্প সময়ের মধ্যে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়ে যায় তার। হেলেনার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় জাহাঙ্গীর।

স্বামীর সংসারে হেলেনা জাহাঙ্গীর পড়াশোনা অব্যাহত রাখেন; শেষ করেন স্নাতকোত্তর। এরপর শুরু করেন তার উদ্যোক্তা জীবন।

তিনি একাধারে প্রিন্টিং, অ্যামব্রয়ডারি, প্যাকেজিং, স্টিকার এবং ওভেন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। জয়যাত্রা গ্রুপের আওতায় এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। সব মিলিয়ে ১২ হাজার কর্মী কাজ করছে এসব প্রতিষ্ঠানে।

হেলেনা জাহাঙ্গীর ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সদস্য ও নির্বাচিত পরিচালক। এ ছাড়া তৈরি পোশাক শিল্পমালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএরও সক্রিয় সদস্য তিনি।

এফবিসিসিআইয়ের সদস্যপদ পাওয়ার এক মাসের মাথায় নির্বাচনে নেমে ও পরিচালক নির্বাচিত হয়ে আলোচনার জন্ম দেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। জয়যাত্রা নামে একটি স্যাটেলাইট টেলিভিশনেরও মালিক তিনি। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পুরস্কৃতও হয়েছেন রোটারি ক্লাবের একজন ডোনার হিসেবে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে তার দাপুটে উত্থান ও পদচারণ। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন। সাম্প্রতিক ঘটনার পর তাকে ওই কমিটি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে হেলেনা জাহাঙ্গীর বলেছেন, তাকে এ ব্যাপারে কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি বা নোটিশ দেয়া হয়নি। এ ছাড়া তিনি কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ছিলেন; হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েকটি বিদেশযাত্রার সফরসঙ্গীও।

এখন আওয়ামী রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হলেও এর আগে তার জাতীয় পার্টিতে এবং তারও আগে বিএনপির রাজনীতিতে সংশ্লিষ্টতার খবর পাওয়া যায়। গণমাধ্যমে ওই দুটি দলের প্রধান খালেদা জিয়া ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে ছবিও প্রকাশ পেয়েছে।

প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। তখন দাবি করতেন, তার কোনো রাজনৈতিক দল নেই। তিনি স্বতন্ত্র রাজনীতি করতে চান। যদিও পরে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

হেলেনা জাহাঙ্গীরের উত্থান যেভাবে
বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ গঠনের ঘোষণা দিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন হেলেনা জাহাঙ্গীর

শুধু রাজনৈতিকভাবেই নয়, বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমুলক সংগঠনগুলোর সঙ্গেও হেলেনা জাহাঙ্গীরের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি প্রায় এক ডজন সামাজিক সংগঠনের নেতৃস্থানীয় দায়িত্বে রয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব সেফায়েতুল্লাহ সেফুর (সেফুদা) সঙ্গে তার বিতর্কিত কথোপকথন-সম্পর্কিত একাধিক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। একটি গণমাধ্যমের মালিকের সঙ্গে তিনি গান গাওয়ার প্রস্তাব পেয়েছেন এমন দাবি সম্পর্কিত ফেসবুক স্ট্যাটাস এবং এ বিষয়ে ওই গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের পাল্টা কঠোর প্রতিবাদ ফলোয়ারদের মধ্যে তুমুল আলোচনার খোরাক জোগায়। ফেসবুকেও প্রায়ই তার নানা ধরনের পোস্ট ও লাইভ নানাভাবে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে।

হেলেনা জাহাঙ্গীরের জন্ম ১৯৭৪ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার তেজগাঁওয়ে। উইকি ফ্যাক্টসাইডার নামের একটি ওয়েবসাইটে তার পেশা হিসেবে অ্যাংকর বা উপস্থাপক উল্লেখ করা হয়েছে।

হেলেনার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম একজন ব্যবসায়ী। ১৯৯০ সালে তারা বিয়ে করেন। তিনি তিন সন্তানের জননী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাবা মরহুম আবদুল হক শরীফ ছিলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। সেই সূত্রে জন্ম কুমিল্লায় হলেও হেলেনা জাহাঙ্গীরের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামের হালিশহরের মাদারবাড়ী, সদরঘাট এলাকায়। পড়াশোনা স্থানীয় কৃষ্ণচূড়া স্কুলে।

চাকরিসূত্রে তার বাবা প্রমোশনাল প্রস্তাব পেয়ে রাশিয়ায় চলে গেলে মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়ি ফিরে যান হেলেনা।

এফবিসিসিআই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একাধিক গণমাধ্যমকে হেলেনা জাহাঙ্গীরের দেয়া সাক্ষাৎকার সূত্রে জানা যায়, বিয়ের সময় স্বামী জাহাঙ্গীর আলম নারায়ণগঞ্জের একটি প্রতিষ্ঠিত পোশাক কারখানার জিএম পদে চাকরি করতেন। পাশাপাশি সিএন্ডএফ এজেন্ট ব্যবসার সঙ্গেও সংশ্লিষ্টতা ছিল।

হেলেনা জাহাঙ্গীরের উত্থান যেভাবে

তবে গৃহিণী হিসেবে বসে না থেকে পড়াশোনা শেষ করে হেলেনা জাহাঙ্গীর শুরুতে চাকরির চেষ্টা করেন। বিভিন্ন জায়গায় চাকরির জন্য ইন্টারভিউও দিয়েছেন তিনি। একদিন চাকরি খোঁজার সূত্র ধরে চলে যান স্বামী জাহাঙ্গীর আলমের অফিসে। সেখানে স্বামীর অফিসকক্ষ দেখে তিনি ঠিক করেন নিজেই উদ্যোক্তা হওয়ার। স্ত্রীর প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান স্বামী জাহাঙ্গীর আলম।

বিয়ের ছয় বছর পর ১৯৯৬ সালে রাজধানীর মিরপুর ১১-তে একটি ভবনের দুটি ফ্লোর নিয়ে তিনি শুরু করেন প্রিন্টিং ও অ্যামব্রয়ডারি ব্যবসা। পোশাকশিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে নানান ধরনের পণ্যের জন্য লোগো ও স্টিকার প্রিন্ট করে এ প্রতিষ্ঠান। নিট কনসার্ন প্রিন্টিং ইউনিট লিমিটেড দিয়ে শুরু করে জয়যাত্রা গ্রুপের আওতায় একে একে হেলেনা গড়ে তোলেন জয় অটো গার্মেন্টস লিমিটেড, জেসি এমব্রয়ডারি অ্যান্ড প্রিন্টিং এবং হুমায়রা স্টিকার লিমিটেড, যার সব কটিরই ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি।

হেলেনা জাহাঙ্গীর গুলশান ক্লাব, গুলশান নর্থ ক্লাব, বারিধারা ক্লাব, কুমিল্লা ক্লাব, গলফ ক্লাব, গুলশান অল কমিউনিটি ক্লাব, বিজিএমইএ অ্যাপারেল ক্লাব, বোট ক্লাব, গুলশান লেডিস ক্লাব, উত্তরা লেডিস ক্লাব, গুলশান ক্যাপিটাল ক্লাব, গুলশান সোসাইটি, বনানী সোসাইটি, গুলশান জগার্স সোসাইটি ও গুলশান হেলথ ক্লাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

যা বললেন হেলেনা জাহাঙ্গীর

তাকে নিয়ে আলোচনার কারণ জানতে চাইলে হেলেনা জাহাঙ্গীর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাকে ঘিরে রংচং মাখিয়ে যেসব কথাবার্তা বলা হচ্ছে, এর সবই অসত্য। এর কোনো ভিত্তি নেই। মূলত আমাকে ঘিরে স্বার্থান্বেষী মহল একধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। নানাভাবে তারা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়। আমি যেখানে যে কাজে সম্পৃক্ত নই, সেখানেও আমাকে জড়িয়ে দেয়।’

হেলেনা জাহাঙ্গীর বলেন, ‘স্বার্থান্বেষীরা করোনা পরীক্ষা ইস্যুতে সাহেদ-সাবরিনা কেলেঙ্কারিতেও আমাকে জড়িয়েছে। এফবিসিসিআইএ নির্বাচনেও আমাকে ঘিরে অপপ্রচার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে বিদেশযাত্রার আগে-পরেও আমাকে নিয়ে জল ঘোলা করা হয়েছে।’

‘আমি যা নই, আমাকে নিয়ে তা বলা হচ্ছে। আবার আমার সম্পর্কে ভাল কিছু উঠে আসলে তা নিয়ে তাদের গাত্রদাহ হয়।’

হেলেনা জাহাঙ্গীরের উত্থান যেভাবে

হেলেনা জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমার অবস্থানে আমি পরিষ্কার। আমি অন্যায় কোনো কিছু করি না, তাই আমাকে নিয়ে যা হচ্ছে, সেগুলোর পরোয়াও আমি করি না। আমার বুকে সৎ সাহস আছে। আজকের হেলেনা জাহাঙ্গীর এমনি এমনি তৈরি হয়নি। অদম্য সাহস, সংসারের লোকদের ত্যাগ-তিতিক্ষা আর স্বামীর নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন ও সহযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে আমি আজকের হেলেনা জাহাঙ্গীর।’

চাকরিজীবী লীগ করার উদ্যোগের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি জীবনে অনেক কিছু পেয়েছি। যা পেয়েছি, তাতে আমি অনেক অনেক তৃপ্ত। নতুন করে পাওয়ার কিছু নেই, দেয়া ছাড়া। আমি চাকরিজীবী লীগ করতে যাইনি। আমাকে জড়ানো হয়েছে। ফাঁসানো হয়েছে। যার কারণে আমার নাম এখানে জড়িয়েছে, আমি তার নামে মামলা করেছি। চলতি সপ্তার মধ্যে প্রেস ব্রিফ করার ইচ্ছা আছে।’

জাতীয় পার্টি ও বিএনপিতে সংশ্লিষ্টতার হেলেনা জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমার বয়সই বা কত। বায়োগ্রাফি দেখুন, এতো অল্প সময়ে তিনটি রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করা যায় কিনা বা এসব দলের প্রধানদের সংস্পর্শে যাওয়া সম্ভব হয় কিনা। আসলে দেশে একটা দল ছাড়া তো আর কোনো দল নেই। সেটা হচ্ছে আওয়ামী লীগ। আমি এই আওয়ামী লীগেই আছি। বেশ ভালভাবেই আছি। আগামীতেও থাকব।’

তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই দেশ ও সমাজের জন্য কিছু করব, সমাজে নিজের একটি অবস্থান তৈরি করব, এমন একটি স্বপ্ন মনের মধ্যে পুষে রাখতাম। আর এই স্বপ্নের অনুপ্রেরণা ছিলেন আমার বাবা। পরবর্তীতে আমার স্বপ্নের বাস্তব রূপায়নে কার্যকর সহায়তা করেছেন আমার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম।

‘তার অনুপ্রেরণা ও সান্নিধ্য আমাকে এতদূর নিয়ে এসেছে। জীবনে যা অর্জন করেছি, তা পেয়েছি কষ্টসাধ্য পরিশ্রম, ত্যাগ, স্বামীর সূত্রে পাওয়া বিনিয়োগ এবং স্থির পরিকল্পনায় মেধা খাটিয়ে। কারো দয়ায় নয়।’

আরও পড়ুন:
ভারতে তরুণীকে নির্যাতন: দুই আসামির দোষ স্বীকার
ভারতে তরুণীকে নির্যাতন: আরও দুজন রিমান্ডে

শেয়ার করুন

বনবিদ্যায় পড়ে বন বিভাগে চাকরি নেই নারীদের!

বনবিদ্যায় পড়ে বন বিভাগে চাকরি নেই নারীদের!

২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন ছাত্রী। ছবি: সংগৃহীত

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এফএসটিআইয়ের এক শিক্ষক নিউজবাংলাকে জানিয়েছেন, চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি কোর্সের প্রতিটি ব্যাচে আসনসংখ্যা ৫০। প্রতিবছরই ছাত্রীরা ভর্তি হন। তবে বন অধিদপ্তরের নিয়োগবিধির কারণে কোর্স শেষ করছেন না বেশির ভাগ। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাচে ছাত্রী রয়েছেন মাত্র ১২ জন।

চট্টগ্রামের ফরেস্ট্রি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট (এফএসটিআই) থেকে চার বছরের ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি কোর্স করেও বেকার বসে আছেন নারী শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, ফরেস্টার পদের নিয়োগবিধিতে থাকা উচ্চতা ও বুকের মাপের শর্তের কারণেই চাকরির আবেদন করতে পারছেন না তারা, যেখানে কোর্সে ভর্তির সময় শারীরিক যোগ্যতার কোনো শর্তই ছিল না।

এসব শিক্ষার্থী বলছেন, ২০১৯ সালে প্রকাশিত বন অধিদপ্তরের কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালায় নারীদের প্রসঙ্গই নেই। এতে শারীরিক যোগত্যার যেসব শর্ত দেয়া হয়েছে, তার সবই পুরুষ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অথচ নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি দেশের বনাঞ্চল রক্ষায় নারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্যই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে এখানে নারী শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে ফরেস্টার পদে নিয়োগের জন্য নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে শারীরিক যোগ্যতা শিথিল করতে বাংলাদেশের প্রধান বন সংরক্ষক বরাবর ২০২০ সালের নভেম্বরে একবার লিখিত আবেদন জানান। তারপর আরও একবার একই আবেদন জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি।

তাদের এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা। তারা বলছেন, এফএসটিআইয়ের নারী শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে নিয়োগবিধি পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে। বর্তমানে পুলিশের নারী কনস্টেবলদের যে শারীরিক যোগ্যতার কথা উল্লেখ আছে, সেভাবেই তাদের বিষয়ে উল্লেখ থাকবে। তবে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এতে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।

বন, পরিবেশ, বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য, বন ব্যবহার, সামাজিক বনায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম নগরীর পূর্ব নাছিরাবাদ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় এফএসটিআই। এখানে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি কোর্সে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি করা হয় মেধাতালিকার ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে শারীরিক উচ্চতা বা বুকের মাপ নিয়ে কোনো শর্ত নেই।

এফএসটিআইতে শিক্ষার্থীদের যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বন ও পরিবেশ-সম্পর্কিত জ্ঞানে পারদর্শী করা হয়। বনবিদ্যায় ডিপ্লোমাধারী এসব শিক্ষার্থীই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ফরেস্টার হিসেবে যোগদান করতে পারেন। বাংলাদেশে বর্তমানে ১০ হাজার ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি জ্ঞানলব্ধ মানবসম্পদের প্রয়োজন। সম্পূর্ণ আবাসিক এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন এবং বন অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এফএসটিআইতে ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি কোর্সে ২১তম ব্যাচ পর্যন্ত শুধু ছাত্ররাই ছিলেন। ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ছাত্রীরা এই কোর্স করতে পারছেন। প্রতিষ্ঠানের ২২তম ব্যাচের ওই শিক্ষার্থীদের মধ্যে আট ছাত্রী কোর্সটি সম্পন্ন করেছেন।

নিউজবাংলাকে এসব নারী শিক্ষার্থী অভিযোগ করে জানিয়েছেন, কোর্স শেষে চাকরির দরখাস্ত করতে গিয়ে দেখা যায়, তাদের কোনো কথাই নেই নিয়োগবিধিতে। শারীরিক যে যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে, তা আসলে পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যে কারণে শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেও ফরেস্টার পদে চাকরির আবেদনই করতে পারছেন না তারা। ভবিষ্যৎ নিয়ে আছেন চরম অনিশ্চয়তায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এফএসটিআইয়ের এক শিক্ষক নিউজবাংলাকে জানিয়েছেন, চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি কোর্সের প্রতিটি ব্যাচে আসনসংখ্যা ৫০। প্রতিবছরই ছাত্রীরা ভর্তি হন। তবে বন অধিদপ্তরের নিয়োগবিধির কারণে কোর্স শেষ করছেন না বেশির ভাগ। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাচে ছাত্রী রয়েছেন মাত্র ১২ জন।

তিনি বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষার্থী ভর্তি শুরুর পর থেকেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বন অধিদপ্তরের নিয়োগবিধি পরিবর্তনের কথা বলে আসছি। কিন্তু তারা আমলে নেয়নি। তবে সম্প্রতি জানতে পেরেছি, মেয়েদের কথা চিন্তা করে নিয়োগবিধি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

‘কিন্তু সেখানেও পুলিশের নারী কনস্টেবলের শারীরিক যোগ্যতার মতো শর্ত আরোপ করা হচ্ছে। এটা সত্য হলে পাস করে যাওয়া একটি মেয়েও চাকরি পাবেন না। তাই পুলিশের নারী কনস্টেবলের সঙ্গে নারী ফরেস্টারদের শারীরিক যোগ্যতার মাপকাঠি কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

এফএসটিআইয়ের এসব নারী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা নিউজবাংলাকে অভিযোগ করে জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে নারী শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিয়ে ফরেস্টার পদে তাদের নিয়োগ সহজ করার আশা দিয়েছে। তবে তারা ডিপ্লোমা শেষ করার পর যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়, তাতে নারীদের বিষয় উল্লেখই করা হয়নি।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, নিয়োগ বিধিমালায় ফরেস্টার পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু পুরুষ প্রার্থীদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা ও শারীরিক যোগ্যতা (উচ্চতা ১৬৩ সেন্টিমিটার ও বুকের মাপ ৭৬ সেন্টিমিটার) নির্ধারণ করা হয়েছে। উচ্চতা ও বুকের মাপের এ শর্তের কারণে আদিবাসী নারীসহ কোনো নারীই আবেদন করতে পারবেন না।

কোর্স সম্পন্ন করা এক নারী শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা চার বছর ধরে বনবিদ্যায় ডিপ্লোমা করেছি কি পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগের মতো শর্তে চাকরি করার জন্য? আমি যখন ভর্তি হয়, তখন তো শারীরিক যোগত্যার কোনো কথা বলা হয়নি।

‘কোর্স শেষে এখন দেখছি চাকরির জন্য পুলিশের মতো শারীরিক গঠন লাগবে। কৃষি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেও ডিপ্লোমাধারী নারীরা মেধার ভিত্তিতে চাকরি করছেন। তাদের ক্ষেত্রে তো পুলিশের মতো শারীরিক যোগ্যতা লাগছে না। আমাদের ক্ষেত্রে কেন লাগবে?’

তিনি বলেন, ‘অনেক স্বপ্ন নিয়ে বাবা-মা আমাকে এখানে পড়িয়েছে। সবাই জানে আমি ফরেস্টার হব। কিন্তু পড়ালেখা শেষে দেখছি মেয়েদের ফরেস্টার হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। এখন মনে হচ্ছে, পুরোটা সময়ই নষ্ট হয়েছে। এ নিয়ে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছি।’

এফএসটিআইয়ের এসব নারী শিক্ষার্থী যে শারীরিক যোগ্যতার ঘাটতির কারণে ফরেস্টার পদে চাকরির আবেদন করতে পারছেন না, তা নিউজবাংলার কাছে স্বীকার করেছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মোহাম্মদ আলীও।

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দেশের একমাত্র বনবিদ্যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটে নারী শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। এই শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া অনেক ছাত্রী তাদের ডিপ্লোমা শেষ করেননি। যারা ছিলেন সবার রেজাল্টই ভালো।

‘যে মেয়েটি সবচেয়ে ভালো করেছেন, তার শারীরিক উচ্চতা সবচেয়ে কম। বাকি ছাত্রীদের উচ্চতাও নিয়োগবিধির উচ্চতার চেয়ে কম। এ কারণে তারা কেউই চাকরির আবেদন করতে পারছেন না।’

ফরেস্টার পদে চাকরিতে নারীদের শারীরিক যোগ্যতা কেন গুরুত্বপূর্ণ- এমন প্রশ্নে এফএসটিআইয়ের পরিচালক বলেন, ‘আগে তো এ বিষয়ে মেয়েদের অধ্যয়নের সুযোগই ছিল না। তাই পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়োগবিধি করা হয়। বিষয়টি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পুলিশের নারী কনস্টেবলদের ক্ষেত্রে যেসব শর্ত আছে, এখানকার নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও তাই করার প্রক্রিয়া চলছে।’

চাকরির নিয়োগবিধিতে শারীরিক যোগ্যতা উল্লেখ করা হলে ভর্তির সময় কেন শারীরিক যোগ্যতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি- জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেননি তিনি।

এ প্রসঙ্গে জানতে বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

বন অধিদপ্তরের উপপ্রধান বন সংরক্ষক ড. মো. জগলুল হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নারীদের কথা চিন্তা করে নিয়োগবিধি পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আগের নিয়োগবিধিতে নারীদের বিষয়টি উল্লেখ না থাকলেও বর্তমানে নারী কনস্টেবলদের যে শারীরিক যোগ্যতার কথা উল্লেখ আছে, সেভাবেই তাদের বিষয়ে উল্লেখ থাকবে।’

প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে এমন কোনো শারীরিক যোগ্যতার কথা বলা আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করছে সরকার। তাই বলে কারও চাকরি তো নিশ্চিত করতে পারব না। ফরেস্ট্রিতে ডিপ্লোমা করে বন বিভাগেই চাকরি করতে হবে, এ কথা তো কাউকে বলা হয়নি।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিচালক (কারিকুলাম) প্রকৌশলী ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা শুধু কারিকুলাম দেখি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি বিভাগের সিলেবাস ফলো করা হয় এফএসটিআইতে। এখান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের বন বিভাগে চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে সেটা কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের দেখার কথা।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হেলাল উদ্দিনের অফিসের নম্বরে ফোন করলে তার ব্যক্তিগত সহকারী সাজ্জাদ হোসেন রিসিভ করেন। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘স্যার জুম মিটিংয়ে আছেন। আধা ঘণ্টা পর ফোন দেন।’

এর আধা ঘণ্টা পর একই নম্বরে ফোন করে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে বিষয়টি জানিয়ে হেলাল উদ্দিনের হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি নিয়ে নিউজবাংলা কথা বলেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক (প্রোগ্রাম) নীনা গোস্বামীর সঙ্গে। সংস্থাটি মানবাধিকার রক্ষা, লিঙ্গসমতা, সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি আইনগত সহায়তা দিয়ে থাকে।

নিউজবাংলাকে নীনা গোস্বামী বলেন, ‘নারীরা এই প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে যাতে কাঙ্ক্ষিত চাকরি পান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সে বিষয়টি মাথায় রেখে নিয়োগবিধি প্রণয়ন করা উচিত। যাতে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত না হয়।’

আরও পড়ুন:
ভারতে তরুণীকে নির্যাতন: দুই আসামির দোষ স্বীকার
ভারতে তরুণীকে নির্যাতন: আরও দুজন রিমান্ডে

শেয়ার করুন

‘৩ ডোজ টিকা’ নেয়া সেই ওমর ফারুক কোথায়?

‘৩ ডোজ টিকা’ নেয়া সেই ওমর ফারুক কোথায়?

একদিনে তিন ডোজ টিকা পাওয়া ওমর ফারুক। ছবি: সংগৃহীত

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ মঙ্গলবার বিকেলে নিউজবাংলার কাছে ওমর ফারুককে তিন ডোজ টিকা দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে রাতেই তিনি বক্তব্য পরিবর্তন করেন। অন্যদিকে ফারুককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছে তার পরিবার।

করোনার তিন ডোজ টিকা নেয়ার অভিযোগ তোলা ওমর ফারুককে নিয়ে লুকোচুরি করছে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কর্তৃপক্ষ। ফারুককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছে তার পরিবার। তবে তা অস্বীকার করছে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ মঙ্গলবার বিকেলে নিউজবাংলার কাছে ওমর ফারুককে তিন ডোজ টিকা দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, এরপরও ফারুক সুস্থ আছেন এবং তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তার বক্তব্যের অডিও রেকর্ড নিউজবাংলার কাছে আছে।

তবে উপাচার্য মঙ্গলবার রাতেই তার বক্তব্য পরিবর্তন করে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে কাউকে একসঙ্গে তিন ডোজ টিকা দেয়া হয়নি।

সৌদি আরবে যাওয়ার আগে করোনা প্রতিরোধী টিকা নিতে সোমবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা ওমর ফারুক। তবে না বুঝেই তিনটি বুথ থেকে তিন ডোজ টিকা নেন তিনি।

টিকা নেয়ার পর ওমর ফারুক একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে বলেন, ‘আমি যখন প্রথমে টিকাকেন্দ্র ঢুকলাম, তখন একজন ইশারা দিয়ে ডান সাইটে যেতে বললেন। ওখানে গিয়ে এক ডোজ টিকা নিলাম। টিকা দিয়ে উনি সামনের দিকে যেতে বললেন।

‘সামনের ব্যক্তি দ্বিতীয়বার টিকা দিয়ে বললেন, আপনি সামনে যান। আরও সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটি চেয়ারে বসলাম। উনি কিছু জিজ্ঞেস না করে আরও এক ডোজ টিকা আমাকে দিয়েছেন। পরে বাইরে এসে লোকদের জিজ্ঞেস করলাম আপনারা কয়বার টিকা দিয়েছেন, তারা বললেন, একবার।’

বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ মঙ্গলবার বিকেলে নিউজবাংলা বলেন, ‘ওমর ফারুক সুস্থ আছেন এবং তিনি সাত দিন পর্যবেক্ষণে থাকবেন।’

আরও পড়ুন: একসঙ্গে তিন ডোজ টিকা নেয়া ওমর ফারুক পর্যবেক্ষণে

তবে এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উপাচার্য তার বক্তব্য পরিবর্তন করে দাবি করেন, একজনকে তিনবার টিকা দেয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি।

বিএসএমএমইউর লুকোচুরি

ঘটনাটি নিয়ে বুধবারও দিনভর অনুসন্ধান চালায় নিউজবাংলা। দুপুরে বিএসএমএমইউর উপাচার্যের কার্যালয়ে গিয়ে ওমর ফারুকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। এ বিষয়ে সকালে একটি মিটিং হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনা ভাইরাল হয়েছে, যে কারণে অনেক সাংবাদিক আমাকে প্রশ্ন করছে। আমি তাদের বলেছি, এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে না। বাংলাদেশে এমন কোনো ব্যক্তি নেই, যিনি জানেন না এক দিনে একটার বেশি টিকা নেয়া যায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওই ব্যক্তিটি (টেলিভিশনের প্রতিবেদনে দেখানো ওমর ফারুক) পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা ছিল। তিনবার টিকা নিলে পাঞ্জাবির হাতা তিনবার ওঠানো লাগছে, কত সময় লাগছে। এ ছাড়া টিকা যারা দিচ্ছেন সেই নার্সরাও অনেক দক্ষ। একবার দেয়ার পর দ্বিতীয়বার দিলে টিকাদানের স্থান দেখলেই নার্সরা বুঝতে পারতেন। টিকা নেয়ার স্থান লাল হয়ে থাকত।’

তাহলে আগের দিন নিউজবাংলাকে তিনি কেন ওমর ফারুককে পর্যবেক্ষণে রাখার কথা বলেছিলেন, এমন প্রশ্ন করলে উপাচার্য শুরুতে বিষয়টি অস্বীকার করেন। তবে ফোন রেকর্ড থাকার কথা জানানোর পর তিনি বলেন, ‘আমরা ওই লোকটিকে পাইনি। আর ওই লোকটির যদি কিছু হতো তাহলে তো জানতেই পারতাম। আপনারাও জানতেন। তার মানে এই লোকটি এখনও বেঁচে আছেন। তিন ডোজ টিকা তিনি কীভাবে নিলেন, সেটি খোঁজার দায়িত্ব সহকারী পরিচালককে দিয়েছি।’

টিকাদানে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ

ওমর ফারুকের ক্ষেত্রে তিনবার টিকা নেয়ার বিষয়টি কীভাবে ঘটতে পারে, সেটি বোঝার জন্য বিএসএমএমইউর টিকাদান কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা অনুসন্ধান করেছে নিউজবাংলা। তবে তথ্য দিতে অসহযোগিতামূলক আচরণ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

টিকাদান কেন্দ্রে গেলে গেটেই নিউজবাংলার প্রতিবেদককে আটকে দেন আনসার সদস্যরা। এরপর মোবাইল ফোনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের করোনা টিকাদান কার্যক্রমের সমন্বয়ক খোরশীদ আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সাংবাদিকদের টিকাকেন্দ্রের ভেতরে যেতে না দিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মানা রয়েছে।’

এরপর টিকাকেন্দ্রের বাইরে এসে কথা বলেন খোরশীদ আলম। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করিনি এমন একটা অপপ্রচার সাংবাদিক ভাইয়েরা ছড়াবেন। আমাদের এখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটে নাই।’

ওই কেন্দ্রে টিকা নেয়া বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা। তাদের অনেকেই অব্যবস্থাপনার অভিযোগ করেছেন।

ওই কেন্দ্র থেকে টিকা নেয়া বেশ কয়েকজন নিউজবাংলাকে জানান, টিকা নেয়ার কক্ষে ঢোকার আগেই সবার কাছ থেকে কার্ড নিয়ে তাতে সিল-স্বাক্ষর দিয়ে দেয়া হয়। ফলে টিকা পাওয়ার আগেই সার্ভারে যুক্ত হয়ে যায় গ্রহীতার তথ্য। এরপর একসঙ্গে ১০-১৫ জনকে কক্ষে ডেকে নিয়ে টিকা দেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। ওই কক্ষে যে যার ইচ্ছামতো যেকোনো টেবিলের সামনের চেয়ারে বসে টিকা নেন। ওই কক্ষে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে টিকাদান এবং নজরদারির বিষয়টি খুব দুর্বল বলে জানিয়েছেন কয়েকজন টিকা গ্রহীতা।

বিএসএমএমইউর ওই কেন্দ্র থেকে টিকা নিয়েছেন বেসরকারি একটি টেলিভিশনের কর্মী ফারহানা ফারাহ। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা টিকা পাওয়ার আগেই সার্ভারে আপডেট করে দিয়েছিল যে, প্রথম ডোজ সম্পন্ন হয়েছে। তারপর নাম ডেকে ডেকে একসঙ্গে বেশ কয়েকজনকে রুমে ঢুকিয়ে টেবিল দেখিয়ে দেয়।’

ফারহানা বলেন, “আমার সঙ্গে এক নারী ছিলেন, তিনি রুমে ঢোকার পর বলছিলেন, ‘আমি একটু পরামর্শ করতে যাব, বাইরে আমার লোক আছে।’ তখন স্বেচ্ছাসেবক ওনাকে বলেছেন, ‘আপনি চাইলে যেতে পারেন, কিন্তু টিকা আর পাবেন না, কারণ আপনার ডেটা সার্ভারে অলরেডি আপডেট করা হয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে বিকেলে নিউজবাংলা ফোনে যোগাযোগ করে টিকাদান কার্যক্রমের সমন্বয়ক খোরশীদ আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘টিকার তাপমাত্রা জটিলতা ও প্রতিটি ভায়ালে ১০ ডোজ টিকা থাকার কারণে আগেই আমরা টিকা কার্ড সংগ্রহ করে তারপর টিকা দিই।’

এভাবে টিকা দিলে একাধিক ডোজ নেয়ার শঙ্কা থাকে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার এখনে নার্স, চিকিৎসক ছাড়াও কিছু স্বেচ্ছাসেবী আছেন। তাদের সামনে কীভাবে একাধিকবার টিকা নেয়া সম্ভব।’

এরপর ব্যস্ততার কথা জানিয়ে ফোন কেটে দেন খোরশীদ আলম।

অন্য ওমর ফারুকের ফোন নম্বর দিল কর্তৃপক্ষ

বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গত সোমবার টিকা নেয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য চাইলে তারা জানায়, সেদিন যারা টিকা নিয়েছেন তাদের মধ্যে চারজনের নাম ওমর ফারুক।

এর মধ্যে একজনের মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শও দেন তারা। তবে ওই নম্বরে যোগাযোগ করা হলে ফোন রিসিভ করে একজন দাবি করেন, টিভিতে যিনি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তিনি ওই ওমর ফারুক নন। তার নামের আরও মানুষ থাকতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আপনাদের হয়তো ভুল হচ্ছে, ওই ব্যক্তি আমি নই। আমি এ বিষয়ে নিয়ে কিছুই জানি না। আমি সৌদিতে ছিলাম, এখন বাসায় আছি। আপনারা যার ভিডিও দেখছেন, তার মুখে দাড়ি ছিল। আমার মুখে দাড়ি নেই। আমি এক ডোজ টিকা দিয়েছি। আমার সঙ্গে কোনো সাংবাদিকের যোগাযোগ হয় নাই।’

টেলিভিশনে কথা বলা ওমর ফারুক তার বাড়ি নারায়ণগঞ্জে জানালেও বিএসএমএমইউর সরবরাহ করা ফোন নম্বরের ওমর ফারুকের বাসা ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে। তবে তার টিকা কার্ডে ঠিকানা পল্টন উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে আবারও বিএসএমএমইউতে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েই ফোন কেটে দেয়।

নারায়ণগঞ্জের ওমর ফারুককে তুলে আনার অভিযোগ

নিউজবাংলার অনুসন্ধানের একপর্যায়ে জানা যায়, টেলিভিশনে কথা বলেছেন যে ওমর ফারুক, তার বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ভূঁইঘরে।

ওই ঠিকানায় যোগাযোগ করা হলে ফারুকের বাবা জামাল হোসেন প্রধান অভিযোগ করেন, তার ছেলেকে বুধবার সকালের দিকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়েছে।

‘৩ ডোজ টিকা’ নেয়া সেই ওমর ফারুক কোথায়?
ওমর ফারুক নিখোঁজের খবরে তার বাড়িতে ভিড় করেন প্রতিবেশীরা

তিনি সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার ছেলে ওমর ফরুক সোমবার টিকার ডোজ দিয়ে আসছে। আজ বেলা সাড়ে ১১টার সময় দুইটা গাড়ি আমার বাড়িতে আসে। তাতে ১০ থেকে ১৫ জন লোক ছিল। তাদের কাছে আমার ছেলেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন জানতে চাইলে তারা বলেন, আমরা পিজি হাসপাতাল থেকে এসেছি। ওনাকে পিজিতে নিয়ে যেতে হবে। এরপর নিয়ে চলে যায়।’

তিনি ক্ষোভের স্বরে বলেন, ‘আপনি সাংবাদিক হয়ে থাকলে পিজি হাসপাতালের ভিসিকে ফোন করেন। আমার ছেলে ৭টার সময় ফোন করে আমার সঙ্গে কথা বলেছে। সে বলছে, আমি পিজি হাসপাতালে আছি। এখানে আমার একটা টেস্ট করা হবে। তাই আমাকে পিজি হাসপাতালে থাকতে হবে। তুমি চিন্তা করো না।’

তবে জামাল হোসেনের দাবি অস্বীকার করেছে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ। ওমর ফারুক কোথায় আছেন, জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া কো-অর্ডিনেটর সুব্রত বিশ্বাস নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আপনি এমনভাবে বলছেন যেন আপনি জানেন, তিনি আমাদের হাসপাতালেই আছেন। সাংবাদিকদের মতো আমরাও ওমর ফারুককে খুঁজছি। আপনার কাছে যদি ওনার বাবার নম্বর থাকে, তাহলে আমাদের দেন, আমরা ওনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করব।’

তিনি বলেন, ‘এই নিউজটা ভুয়া। আমরা সোমবার যাদের টিকা দিয়েছি তার মধ্যে চারজন ওমর ফারুক রয়েছেন। তাদের সবার সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছি। তাদের কেউই তিন ডোজ টিকা দেননি। আর কাউকে বাড়ি থেকে তুলে আনা হয়নি।’

যা বলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস পরিচালক মিজানুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ ঘটনা যেখানে ঘটেছে তারা বিষয়টি তদন্ত করবে।’

এমআইএসের পক্ষ থেকে কোনো তদন্ত করা হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক যদি এ বিষয়ে তদন্ত করতে বলে অবশ্যই করব। কারণ এটা না করলে টিকাদান কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’

বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলমের বক্তব্যও জানার চেষ্টা করেছে নিউজবাংলা। তবে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

আরও পড়ুন:
ভারতে তরুণীকে নির্যাতন: দুই আসামির দোষ স্বীকার
ভারতে তরুণীকে নির্যাতন: আরও দুজন রিমান্ডে

শেয়ার করুন