বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থে ছেলেকে দেড় কোটি টাকার পাজেরো ভিসির

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থে ছেলেকে দেড় কোটি টাকার পাজেরো ভিসির

বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে কেনা গাড়ি। ছবি: নিউজবাংলা

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার এই গাড়ি উপাচার্য রোস্তম আলী নিজে ব্যবহার করছেন না। সেটা ব্যবহার করছেন রাজশাহীর পৈতৃক বাড়িতে থাকা তার ছেলেসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। শুধু তাই না, গাড়ির চালকের বেতন এবং জ্বালানি খরচও বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে নেয়া হচ্ছে।

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রামে বলা আছে, মাননীয় উপাচার্য নিজের ব্যবহারের জন্য একটি জিপগাড়ি পাবেন। এর অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের ৭ মার্চ উপাচার্য হিসেবে যোগদানের পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন থেকে একটি পাজেরো গাড়ি পান অধ্যাপক ড. এম রোস্তম আলী।

গাড়িটির (পাবনা-ঘ-১১০০৪৬) মূল্য এক কোটি টাকা। তারপরও নিয়ম লঙ্ঘন করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা নিয়ে আরেকটি গাড়ি (পাবনা-ঘ-১১০০৬১) কিনেছেন ড. রোস্তম আলী।

উপাচার্যের জন্য দুটি গাড়িই প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মিতসুবিসি ব্র্যান্ডের এবং দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে কেনা হয়। এর মধ্যে মঞ্জুরী কমিশনেরটা মিতসুবিসি পাজেরো স্পোর্টস মডেলের। আর বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে কেনা গাড়িটি আরও আধুনিক পাজেরো (ভি-৬) জিপ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা দিয়ে এই গাড়ি কিনতে উপাচার্য চাহিদাপত্র পাঠান। ২০১৮ সালের ২২ অক্টোবর দরপত্র জমা দেয় প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ। গাড়িটির দরপত্র মূল্য ও রেজিস্ট্রেশনসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ মোট ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ধরা হয়।

পরদিন ২৩ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ কমিটির ৪৬তম সভায় গাড়ি ক্রয়ের দরপত্রের সুপারিশ নিয়ে আলোচনা হয়। ওই ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার মধ্যে ৯৫ লাখ টাকা রাজস্ব বাজেট ও ৪৫ লাখ টাকা সান্ধ্যকালীন তহবিল থেকে দেয়ার সুপারিশ বিবেচনা করা হয়। যে সুপারিশ চূড়ান্ত অনুমোদন পায় ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থে ছেলেকে দেড় কোটি টাকার পাজেরো ভিসির
ইউজিসি থেকে ভিসিকে দেয়া গাড়ি

নিউজবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেনা বিলাসবহুল এই গাড়ি উপাচার্য রোস্তম আলী নিজে ব্যবহার করছেন না। সেটা ব্যবহার করছেন রাজশাহীর পৈতৃক বাড়িতে থাকা তার ছেলেসহ পরিবারের অন্য সদস্যারা। শুধু তাই না, গাড়ির চালকের বেতন এবং জ্বালানি খরচও বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে নেয়া হচ্ছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড কেমেস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক রোস্তম আলী ২০০৮ সালের জুনে যাত্রা করা পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ উপাচার্য।

তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে রাজশাহীর পৈতৃক বাড়ির বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বিলের পাশাপাশি গৃহকর্মীর বেতনের টাকাও তোলার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গাড়ি কেনার আগেই ২৫ লাখের বেশি টাকা খরচ দেখানোর।

এ সংক্রান্ত কাগজপত্র পেয়েছে নিউজবাংলা। সেগুলো ঘেঁটে উপাচার্য রোস্তম আলীর বিরুদ্ধে গাড়ির নম্বর উল্লেখ না করে গাড়ি মেরামত ও জ্বালানি ক্রয়ের নামে ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৬২৬ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ পাওয়া গেছে রাজস্ব খাত থেকে প্রকল্পের গাড়ি ক্রয়ে ৭৪ লাখ ৭৩ হাজার টাকার আর্থিক অনিয়মের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, উপাচার্যের চেয়ারে বসে নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছেন না রোস্তম আলী। যা ইচ্ছা তাই করে যাচ্ছেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থে ছেলেকে দেড় কোটি টাকার পাজেরো ভিসির

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের গাড়ি প্রাপ্যতার খতিয়ান ও কাগজপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, উপাচার্যের ব্যবহারের জন্য ইউজিসির একটি গাড়ি বরাদ্দ দেয়া আছে, যেটি ব্যবহার করছেন তিনি। তারপরও অধ্যাপক রোস্তম আলী উপাচার্য হিসেবে যোগদানের কিছুদিনের মধ্যে আরেকটি গাড়ি কিনতে রাজস্ব খাত থেকে ৯৫ লাখ এবং সান্ধ্যকালীন কোর্স থেকে ৪৫ লাখসহ মোট ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা তোলেন। যে তথ্য ২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর অর্থ কমিটির ৪৬তম কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভিসি স্যার এই অনিয়মকে এই বলে জায়েজ করেন যে, আগের ভিসিরা ব্যবহার করতেন, তাই তিনিও করেন। এই জায়গায়ও তিনি ভুল ব্যাখ্যা দেন। কারণ প্রথম ভিসি একই সঙ্গে উপাচার্য ও প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

‘তিনি একটি জিপ ও একটি কার ব্যবহার করতে পারতেন দুটি পদের জন্য। কিন্তু অধ্যাপক রোস্তম আলী শুধুই ভিসি; প্রকল্প পরিচালক আরেকজন। যিনি তার জন্য বরাদ্দ করা গাড়ি ব্যবহার করেন। তারপরও ভিসি ক্ষমতার জোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকার যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্ষতির মুখোমুখি করছেন। ভিসির চেয়ারে বসে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে উনি যা ইচ্ছা তাই করে যাচ্ছেন। বিষয়গুলো নজরে না আসলে অচিরেই বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থা শোচনীয়তার শেষ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে।’

এ প্রসঙ্গে নিউজবাংলা কথা বলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আজিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এভাবে গাড়ি কেনার তো প্রশ্নই আসে না। ওনার বরাদ্দের গাড়ি আছে। বিষয়টি কী ঘটেছে আমি জানি না। তবে ওনার নামে বেশ কিছু অভিযোগ আছে বলে আমি ক্যাম্পাস থেকেই শুনেছি।’

এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে উপাচার্য রোস্তম আলী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আপনি যা বলছেন এ ধরনের কোনো অডিট এখানে হয়নি। এগুলো সত্য না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থে ছেলেকে দেড় কোটি টাকার পাজেরো ভিসির


অডিটের কাগজপত্র নিউজবাংলার কাছে আছে বলার পর সুর পাল্টান তিনি। বলেন, ‘হ্যাঁ। বিষয়টি হলো আমি নিজেই চিঠি দিয়ে অডিট করিয়েছি। কিন্তু সেখানে এ ধরনের কোনোকিছু আছে কিনা আমার জানা নেই।’

নম্বর ছাড়া গাড়ির নামে সাড়ে ১২ লাখ টাকা তুলতে ৪৬ ভাউচার

বিলে গাড়ির নম্বর উল্লেখ না করে গাড়ি মেরামত ও জ্বালানি ক্রয়ের নামে ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৬২৬ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে ভিসি রোস্তম আলীর বিরুদ্ধে।

একই অডিটের কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৭-১৮ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে গাড়ি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ৪৬টি ভাউচারে মোট ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৬২৬ টাকা দেয়া হয়েছে। যেসব গাড়ি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এই টাকা খরচ করা হয়েছে বিলে সেসব গাড়ির নম্বর নেই।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই অর্থ ব্যবহারে অস্বচ্ছতা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০০১ অনুযায়ী এই আর্থিক অনিয়মের জন্য উপাচার্য দায়ী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থে ছেলেকে দেড় কোটি টাকার পাজেরো ভিসির


রাজস্ব খাতের ৭৪ লাখ ৭৩ হাজার টাকায় প্রকল্পের গাড়ি

রাজস্ব খাত থেকে প্রকল্পের গাড়ি ক্রয়ে ৭৪ লাখ ৭৩ হাজার টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে উপাচার্য রোস্তম আলীর বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ২০১৯ সালের ৩০ জুন একটি ভাউচারের মাধ্যমে ১ কোটি ৭৪ লাখ ৭৩ হাজার টাকা ব্যয়ে চারটি গাড়ি কেনা হয়। এর মধ্যে ৭৪ লাখ ৭৩ হাজার টাকা রাজস্ব খাত থেকে নিয়ে মূলধন খাতে ব্যয় করা হয়েছে, যা বিধিসম্মত না। বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০০১ অনুযায়ী এই অনিয়মের জন্যও উপাচার্য দায়ী।

এ ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজস্ব খাতের বরাদ্দ দ্বারা গাড়ি ক্রয়ে মূলধন খাতে ব্যয় বিধিসম্মত হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ জরুরি বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষকরা।

আরও পড়ুন:
গাড়ি কেনার আগেই তেলে গেল ২৫ লাখ ২৭ হাজার টাকা!
ভিসির বাবার বাড়ির বিল বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকায়!

শেয়ার করুন

মন্তব্য