ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুরে ১১ বছরের এক মুসলিম শিশুকে অপহরণ করে ধর্ষণের পর চোখ উপড়ে বিভৎসভাবে হত্যা করেছে ৪ হিন্দু যুবক। শিশুটি গত ৪ জুলাই বিকেলে বান্ধবীর জন্মদিনের উপহার কিনতে গিয়ে নিখোঁজের পর তার পরিবারের সদস্যরা পুলিশের কাছে এ ব্যাপারে এফআইআর করতে গেলে তাদের থানা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এলাকার লোকজন স্থানীয়দের সিসিটিভি ফুটেজে দেখতে পায় প্রভাস মণ্ডলসহ ৪ হিন্দু যুবক মেয়েটিকে জোর করে একটি গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
পরে ওই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে থানায় অপহরণ ও হত্যা মামলা দিতে গেলেও পুলিশ নেয়নি বলে ভিকটিমের পরিবারের অভিযোগ। অভিযুক্তদের ধরে এলাকাবাসী থানায় সোপর্দ করে আসলেও বিজেপি নেতারা ধর্ষকদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। এ ঘটনা পর অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠে কলকাতা। মুসলিম শিশুটির ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডটি পশ্চিমবঙ্গে গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আর এ আন্দোলন দমতে তড়িঘড়ি করে মঙ্গলবার রাতে মূল আসামিকে এনকাউন্টারে হত্যা করে শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসন।
এই ইস্যুতে কলকাতায় আন্দোলন তুঙ্গে, তৃণমূল নেত্রী মমতাসহ বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সব শ্রেণিপেশার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, তখনই গদি বাঁচাতে রাতারাতি ধর্ষককে ধরে এনে এনকাউন্টারের নাটক সাজালো শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসন।
বারুইপুর ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনায় একটি ভিডিও ভাইরাল হয়ে গিয়েছে। সেখানে দেখা গিয়েছে, এক ব্যক্তি আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন, মরদেহটি কোথায় রয়েছে। তার দেখানো জায়গা থেকে বস্তাবন্দি নাবালিকার মরদেহ উদ্ধার হতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এলাকাবাসী। মারধর শুরু হয় ওই ব্যক্তিকে। ঘটনাচক্রে দেখা গিয়েছে, ওই ব্যক্তিই এই ধর্ষণ এবং খুন কাণ্ডের অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডল।
মঙ্গলবার রাতেই পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় প্রভাসের। মঙ্গলবার রাতে তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। পুলিশ জানায়, সেই সময় পুলিশের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন তিনি। পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালান প্রভাস। পুলিশের পাল্টা গুলিতে গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। বারুইপুর কাণ্ডে প্রথম গ্রেপ্তার হয়েছিলেন প্রভাসই।
গত শনিবার বন্ধুর জন্মদিনে যাবে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ওই নাবালিকা। তারপর থেকে তার আর খোঁজ মেলেনি। তার খোঁজ করার সময় এলাকার কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে পুলিশ। সেই সময় ওই নাবালিকাকে এক যুবকের সঙ্গে দেখতে পাওয়া যায়।
নীল টি-শার্ট এবং লাল টুপি পরা ওই যুবকের খোঁজ শুরু হয়। সেই সূত্র ধরে পুলিশ ওই যুবককে শনাক্ত করে। তার পরই গ্রেপ্তার হন প্রভাস। তাকে জেরা করে আরও তিন অভিযুক্ত আনন্দ সর্দার, দিবাকর সর্দারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মঙ্গলবার গ্রেপ্তার করা হয় আরও এক যুবককে।
প্রভাসের বাড়ি সূর্যপুর এলাকাতেই। স্থানীয় সূত্রে খবর, পরিবারে মা, বাবা, স্ত্রী এবং এক পুত্রসন্তান রয়েছে। প্রভাসের বাবা অসুস্থ। মা গৃহবধূ। স্ত্রী পরিচারিকার কাজ করেন। তবে ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনায় প্রভাসের নাম জড়ানোর পর শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যান প্রভাসের স্ত্রী। বাড়িতে প্রভাসের মা এবং বাবা রয়েছেন।
পুলিশ জানায়, কোনো স্থায়ী কাজ করতেন না প্রভাস। যাখন যা পেতেন তাই করতেন। কখনো ভ্যান চালাতেন। তবে নেশা করতেন তিনি। প্রভাসের মা সন্ধ্যা মণ্ডল বলেন, ‘আমাদের কথা শুনত না। নেশা করত।’ জানা গিয়েছে, এই ঘটনায় বাকি অভিযুক্তরাও প্রভাসের নেশার সঙ্গী ছিলেন।
সূত্রের খবর, গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রাথমিকভাবে পুলিশকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। তবে তার সূত্র ধরে বাকি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের পর প্রত্যেককে আলাদা আলাদাভাবে জেরা করে পুলিশ। তখনই ঘটনার পুরো ছবি স্পষ্ট হয়।
ছবি: সংগৃহীত
সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে করাচি আসার পথে পাঁচজন ক্রুসহ পাকিস্তানের একটি মালবাহী বিমান নিখোঁজ হয়েছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাতে করাচির এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে কেটু এয়ারওয়েজের বোয়িং ৭৩৭-৪০০ মডেলের কার্গো বিমানটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
পাকিস্তান বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজ হওয়ার ঠিক আগে স্থানীয় সময় রাত ৯টা ১৮ মিনিটে বিমানটির পাইলট দিকনির্ণয় ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। এর জবাবে স্থানীয় এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল বিমানটিকে পথ দেখানোর চেষ্টা করলেও, মাত্র তিন মিনিট পরেই রাডার থেকে বিমানটি সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে বিমানটি করাচি উপকূল থেকে প্রায় ২৮৭ কিলোমিটার পশ্চিমে আরব সাগরের উপরে অবস্থান করছিল। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটরাডার ২৪’-এর প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, রাডার থেকে হারিয়ে যাওয়ার আগে বিমানটির উচ্চতায় চরম ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে।
শেষ মুহূর্তে বিমানটি মাত্র এক মিনিটেরও কম সময়ে প্রায় ৫০০০ ফুট নিচে নেমে যায়। এর ঠিক ৩০ সেকেন্ড পর এটি আবার ৬০০০ ফুট ওপরে উঠলেও শেষ পর্যন্ত ৩৬ হাজার ৫৫০ ফুট উচ্চতা থেকে একবারে খাড়া নিচের দিকে আছড়ে পড়তে শুরু করে।
রাডারে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, বিমানটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১১০০ ফুট ওপরে থাকা অবস্থায় প্রতি মিনিটে ২২৪০০ ফুট (ঘণ্টায় প্রায় ৪০০ কিলোমিটার) গতিতে নিচে নামছিল।
পাকিস্তান বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ (পিএএ) জানিয়েছে, উড়োজাহাজে পাঁচজন ক্রু ছিলেন। শারজাহ থেকে করাচিগামী কে-২ এয়ারওয়েজের বোয়িং ৭৩৭ পাকিস্তান কার্গো ফ্লাইটটি রাত ৯টা ১৮ মিনিটে নেভিগেশনাল সিস্টেমে সমস্যার কথা জানিয়েছিল। এরপরই করাচি এরিয়া কন্ট্রোল সেন্টার (এসিসি) তাৎক্ষণিকভাবে তাদের নির্দেশনা দেয়।
নিখোঁজ বিমান ও ক্রুদের সন্ধানে সাগরে সমন্বিত তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে পাকিস্তানের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ফ্লাইটরাডারের তথ্যানুযায়ী, এপি-বিওআই নিবন্ধিত উড়োজাহাজটি হচ্ছে বোয়িং ৭৩৭-৪এম০ (বিডিএসএফ), যা ২০২৪ সালে কে-২ এয়ারওয়েজের বহরে যুক্ত হয়েছিল।
এই উড়োজাহাজ মূলত ১৯৯৯ সালে একটি যাত্রীবাহী বিমান হিসেবে অ্যারোফ্লটে যুক্ত হয়েছিল। এরপর ২০০৪ সালে গারুডা ইন্দোনেশিয়ার বহরে যুক্ত হয়। এটিকে ২০১২ সালে মালবাহী উড়োজাহাজে রূপান্তর করা হয়। পরবর্তী সময়ে এটি টিএনটি এয়ারওয়েজ ও এএসএল এয়ারলাইসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল।
ছবি: সংগৃহীত
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১১ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ১৯ জন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য রয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে এই সংবাদ প্রকাশ করেছে আনাদোলু এজেন্সি।
বুধবার (৮ জুলাই) সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক অবরোধ ঘিরে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এরপর নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালালে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র গোলাগুলি শুরু হয়। নিরাপত্তা সূত্র জানায়, অভিযানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর আরও কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী বেলুচিস্তানে সহিংসতা বেড়েছে। এর ধারাবাহিকতায় এটি সর্বশেষ সংঘর্ষের ঘটনা। এর একদিন আগে জিয়ারাত জেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে পৃথক এক সংঘর্ষে নয়জন পুলিশ সদস্য নিহত হন।
খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ বেলুচিস্তান প্রদেশটি বহু বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC)-এর গুরুত্বপূর্ণ রুট। দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতার কারণে প্রদেশটিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল রয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের মিনাবের শাজারেহ তাইয়িবা স্কুলে বিমান হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক ইতিহাসে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ বেসামরিক হতাহতের ঘটনাগুলোর একটি। এই হামলায় ১৬৮ ইরানি শিশু মারা যায় যার নেপথ্যে ছিল ভুল গোয়েন্দা তথ্য।
মার্কিন সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, ইরানে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য গুরুতরভাবে পুরোনো হয়ে গেছে বলে সতর্কবার্তা ছিল। কিন্তু এ তথ্য পেন্টাগনের ডেটাবেসে থাকা সত্ত্বেও মার্কিন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডাররা তা উপেক্ষা করে কয়েকটি হামলার অনুমোদন দেন। এর মধ্যে একটি হামলায় একটি স্কুলে আঘাত হানে, যাতে প্রায় ২০০ শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক নিহত হন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাবের শাজারেহ তাইয়িবা স্কুলে ওই হামলায় অন্তত ১৬৮ শিশু ও ১৪ জন শিক্ষক নিহত হন। হামলার আগে কীভাবে মার্কিন কর্মকর্তারা গোয়েন্দা তথ্য উপেক্ষা করেছিলেন, তা নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
সূত্রগুলো জানায়, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ব্যবহৃত ডেটাবেসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে গোয়েন্দা তথ্য বহু বছর আগের এবং তা পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো স্থানকে হামলার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার অনুমোদনও প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দুটি সূত্রের ভাষ্য, যুদ্ধের শুরুতে দ্রুত লক্ষ্যবস্তুর তালিকা প্রস্তুত করার তাগিদে জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররা ‘দ্রুততার স্বার্থে’ সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্তই স্কুলটিতে সরাসরি হামলার কারণ হয়।
২০১৩ সালের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, স্কুলটি এবং পাশের আইআরজিসি ঘাঁটি একসময় একই কমপাউন্ডের অংশ ছিল। তবে ২০১৬ সালের ছবিতে দেখা যায়, স্কুলটিকে ঘাঁটির বাকি অংশ থেকে আলাদা করতে একটি বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে এবং স্কুলের জন্য পৃথক প্রবেশপথও তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের স্যাটেলাইট চিত্রে স্কুলের আঙিনায় কয়েক ডজন মানুষকে খেলাধুলা করতেও দেখা যায়।
একটি সূত্র জানায়, একজন বিশ্লেষক আগেই একটি গোয়েন্দা বিশ্লেষণ টুলে ওই স্থানের পরিবর্তনের বিষয়টি নথিভুক্ত করেছিলেন। কিন্তু সেই টুলের সঙ্গে সামরিক লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের ডেটাবেসের কোনো সংযোগ ছিল না। ফলে সেই সতর্কবার্তা কখনোই কমান্ডারদের কাছে পৌঁছায়নি।
একটি সূত্র বলেছে, ‘স্কুলে হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বোঝে গিয়েছিলেন ভুলটি কীভাবে ঘটেছে। স্পষ্টতই এটি ছিল পুরোনো তথ্যের ফল।’
সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা হাজারো লক্ষ্যবস্তুর তথ্য হালনাগাদ করতে তড়িঘড়ি শুরু করেন। তবে হামলা শুরুর আগে সব তথ্য হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক লক্ষ্যবস্তুর তথ্য ১০ বছরেরও বেশি পুরোনো ছিল।
দুটি সূত্র জানায়, বিশ্লেষকরা প্রথমে ‘উচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত’ লক্ষ্যবস্তুর তথ্য হালনাগাদে মনোযোগ দেন। এর মধ্যে ছিল ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও বিমানের মতো চলমান লক্ষ্যবস্তু, যেগুলো মার্কিন বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতো। স্কুলে পরিণত হওয়া সামরিক স্থাপনার মতো স্থায়ী লক্ষ্যবস্তুগুলো সাধারণত নিম্ন অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ছিল। কারণ এগুলো স্থান পরিবর্তন করে না। ফলে এসব স্থাপনার তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই হালনাগাদ হয়নি।
দুটি সূত্র জানায়, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ব্যবহৃত ‘মডার্নাইজড ইন্টিগ্রেটেড ডেটাবেস’ বা এমআইডিবি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘মার্স’-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে ইরানসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহারের আগে অবশ্যই হালনাগাদ করতে হবে। তবে নতুন প্ল্যাটফর্ম মাসে রূপান্তরের কাজ নির্ধারিত সময়সূচির তুলনায় কয়েক বছর পিছিয়ে রয়েছে এবং এখনো এমআইডিবিই প্রধান তথ্যভাণ্ডার।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত দুটি সূত্র জানায়, পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছিল, কারণ প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দায়িত্ব নেওয়ার পর বেসামরিক হতাহত কমানোর কর্মসূচিতে বড় কাটছাঁট করেন। সামরিক কমান্ডগুলোতে এই কর্মসূচির জনবল ৯০ শতাংশেরও বেশি কমিয়ে দেওয়া হয়। সেন্ট্রাল কমান্ডের ১০ সদস্যের দলকে কমিয়ে মাত্র একজন পূর্ণকালীন কর্মীতে নামিয়ে আনা হয় এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণকারী হামলা-পরিকল্পনা দল থেকে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি বিশেষজ্ঞদেরও সরিয়ে দেওয়া হয়।
একটি সূত্র বলেছে, ‘সেন্টকমের দল তখনো সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিল। কিন্তু হেগসেথের সিদ্ধান্তের কারণে তাদের প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদ ছিল না।’ আরেকটি সূত্র বলেছে, ‘পেন্টাগন সবাইকে আরও দ্রুত কাজ করতে চাপ দিচ্ছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সাবেক হেজ ফান্ড কর্মকর্তা ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্বদেরও প্রভাব ছিল। তবে সেন্টকমের নেতৃত্বও এর বিরোধিতা করেনি।’
হামলার পরপরই ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন এর জন্য ইরান দায়ী হতে পারে। পরে তিনি বলেন, ‘এ ঘটনার দায় কার তা হয়তো কখনোই নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না।’ প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ বলেন, ‘এ হামলার ‘‘পূর্ণাঙ্গ’’ তদন্ত করা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক হতাহত এড়াতে সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা করেছে।’ হেগসেথের বেসামরিক হতাহত কমানোর কর্মসূচিতে আনা পরিবর্তন নিয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দপ্তর কোনো জবাব দেয়নি।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘এই তদন্ত এখনো চলছে। যুক্তরাষ্ট্র কখনোই বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানায় না।’ লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ প্রক্রিয়া সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাব দিতে পেন্টাগন বিষয়টি সেন্টকমের কাছে পাঠায়। তবে চলমান তদন্তের কথা উল্লেখ করে সেন্টকম মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও পেন্টাগন এখনো এ ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।
ছবি: সংগৃহীত
কানাডায় শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হরদীপ সিং নিজ্জার হত্যাকাণ্ডে ভারতে কারাবন্দি কুখ্যাত গ্যাংস্টার লরেন্স বিশনয় এবং তার উত্তর আমেরিকা অঞ্চলের প্রধান সহযোগী সতিন্দরজিৎ সিং ওরফে ‘গোল্ডি ব্রার’-এর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৩ সালের ওই হত্যাকাণ্ডের পর কানাডা ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে নজিরবিহীন উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।
লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি ফেডারেল আদালতে উন্মোচিত অভিযোগপত্রে (ইন্ডাইটমেন্ট) বলা হয়েছে, বিশনয় এবং গোল্ডি ব্রার ২০২৩ সালের ১৮ জুন ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সারে শহরের একটি শিখ মন্দিরের বাইরে হরদীপ সিং নিজ্জারকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
মার্কিন কৌঁসুলিদের অভিযোগ, লরেন্স বিশনয় ভারতের কারাগার থেকে চোরাই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে এই অভিযানের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি নিজ্জারকে হত্যার সুবিধার্থে একজন সহযোগীকে তার ছবি এবং একাধিক ঠিকানা সরবরাহ করেছিলেন। অন্যদিকে বিশনয়ের শৈশবের বন্ধু গোল্ডি ব্রার উত্তর আমেরিকায় তাদের এই অপরাধী চক্রের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন, যা ‘লরেন্স বিশনয় অর্গানাইজড ক্রাইম গ্রুপ’ নামে পরিচিত।
কানাডার নাগরিক হরদীপ সিং নিজ্জার ভারতে স্বাধীন শিখ রাষ্ট্র ‘খালিস্থান’ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। নয়াদিল্লি তাকে আগেই ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। ২০২৩ সালে নিজ্জার হত্যাকাণ্ডের পর কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো অভিযোগ করেছিলেন, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভারত সরকারের এজেন্টদের সরাসরি সম্পৃক্ততার ‘বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ’ রয়েছে। নয়াদিল্লি ট্রুডোর সেই অভিযোগকে ‘হাস্যকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
তবে লরেন্স বিশনয় ও গোল্ডি ব্রারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দায়ের করা এই সাম্প্রতিক অভিযোগপত্রে ভারত সরকারের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়নি। লস অ্যাঞ্জেলেসে এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি বিল এসেয়ালি বা অন্য কোনো কর্মকর্তা এই হত্যাকাণ্ডে ভারত সরকারের জড়িত থাকা বা তাদের আগে থেকে জানার বিষয়ে কোনো অভিযোগ তোলেননি।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিশনয় এবং ব্রারের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ গঠন মূলত মার্কিন ও কানাডীয় কর্তৃপক্ষের একটি বৃহত্তর যৌথ তদন্তের অংশ। এই তদন্তে ভারতভিত্তিক তিনটি অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িত ৩৭ জন আসামির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদকপাচার এবং চোরাচালানের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৪ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বা হেফাজতে রয়েছেন।
এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসে কানাডীয় পুলিশ নিজ্জার হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে চার ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছিল এবং তাদের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সংযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছিল। তবে মার্কিন অভিযোগপত্রে ওই শ্যুটারদের সরাসরি আসামি না করে কেবল ‘সহ-ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হরদীপ সিং নিজ্জারের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অটোয়া ও নয়াদিল্লির সম্পর্কের যে চরম অবনতি ঘটেছিল, কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির অধীনে তা কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে কার্নি তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সফরে ভারতে যান এবং দুই দেশের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু করেন, যা চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে কানাডার বর্তমান সরকারের এই আপসকামিতা ও নরম মনোভাবের সমালোচনা করছে দেশটির বেশ কয়েকটি শিখ সংগঠন। তাদের অভিযোগ, অটোয়া প্রশাসন ভারতকে যথাযথভাবে জবাবদিহির আওতায় আনতে এবং কানাডীয় শিখদের বিদেশি হস্তক্ষেপ ও দমন-পীড়ন থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালীর আশপাশে ইরানের ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজে সাম্প্রতিক হামলার জন্য তেহরান দায়ী। এর জবাবে এই সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ হামলার ফলে দুদেশের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা আরও বেড়ে গেল। নিরাপদ নৌ চলাচল পুনঃস্থাপন এবং পারমাণবিক আলোচনা এগিয়ে নিতে তিন সপ্তাহেরও কম সময় আগে যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) হয়েছিল, তার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ইরাক সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে গেছেন বলে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক বাণিজ্যিক বন্দরে শত্রুপক্ষের নিক্ষিপ্ত গোলার খণ্ডে কয়েকজন আহত হয়েছেন। আহতদের মিনাবের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তবে হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
এ ছাড়া বন্দর আব্বাসের একটি মাছ ধরার জেটিতে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে। এতে কয়েকটি নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, শত্রুপক্ষের হামলার কারণেই ওই এলাকায় কালো ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে ইরানের প্রেস টিভি জানায়, দক্ষিণাঞ্চলের বন্দরনগরী সিরিকে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পরে জানানো হয়, সিরিকে অন্তত পাঁচটি বিস্ফোরণ হয়েছে এবং বাণিজ্যিক ও মাছ ধরার জেটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও জানায়, বন্দর আব্বাসের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পরে কেশম দ্বীপ এবং জ্বালানি রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র খার্গ দ্বীপেও বিস্ফোরণের খবর আসে। তবে এসব ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন স্থানীয় এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করে ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের সাম্প্রতিক হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক, উপকূলীয় রাডার, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং প্রণালীর আশপাশে থাকা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর-এর ৬০টির বেশি ছোট নৌযান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে ইরানের হামলার সক্ষমতা দুর্বল করাই এই অভিযানের উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছে, সমঝোতা লঙ্ঘিত হলে প্রয়োজনে আবারও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত হয় হরমুজ প্রণালী ও এর আশপাশে তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে অজ্ঞাত হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ব্রিটিশ নৌবাহিনী সংশ্লিষ্ট সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে অজ্ঞাত উৎস থেকে নিক্ষিপ্ত বস্তু আঘাত হানে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সূত্র জানায়, একটি কাতারি এলএনজি ট্যাংকার বিস্ফোরণের ঝুঁকিতে পড়ে এবং সৌদি পতাকাবাহী একটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলার দায় কেউ স্বীকার না করলেও যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরান হামলা চালিয়েছিল।
সামরিক অভিযানের পাশাপাশি ওয়াশিংটন ইরানের তেল বিক্রির জন্য দেওয়া একটি বিশেষ লাইসেন্সও বাতিল করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটি দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এদিকে অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনে অবস্থানকালে এই হামলার পরিকল্পনায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। ওই বৈঠকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ইরানের সর্বোচ্চ যৌথ সামরিক কমান্ড যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলাকে ‘স্পষ্ট আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে ‘চূর্ণবিচূর্ণ জবাব’ দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। তারা বলেছে, হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনায় কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপদ পথ ইরানই নির্ধারণ করবে।
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা সময়ের অপচয়। আমরা গত (মঙ্গলবার) রাতে ইরানের অত্যন্ত বিপজ্জনক লোকদের ওপর খুব শক্তিশালী হামলা চালিয়েছি। ওরা দুষ্ট, অসুস্থ লোক। ওদের কিছু একটা সমস্যা হয়েছে।
বুধবার তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ৩৬তম ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন ট্রাম্প। এ সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, “ইরান সরকার একটি ‘ক্যান্সার’, যা শুরুতেই ছেঁটে ফেলতে হবে। ওরা দুষ্ট, অসুস্থ লোক। আমাদের এই ক্যান্সার থেকে মুক্তি পেতে হবে... ক্যান্সার শুরু ছেঁটে ফেলতে হবে।”
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সমঝোতা স্মারক বা অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটি শেষ হয়ে গেছে। অর্থাৎ তেহরানের সঙ্গে হওয়া চুক্তিটি ভেস্তে গেছে এবং যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে।’ ইরানিদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চান না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
এর আগে, গত মঙ্গলবার রাতে ইরানের অন্তত ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে ‘শক্তিশালী’ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, গত মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে চাওয়া তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরান হামলা করেছে। যদিও এই হামলার দায় স্বীকার করেনি ইরান। পরে মধ্যপ্রাচ্যে কুয়েত ও বাহরাইনের অন্তত ৮৫টি মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় ইরানের আইআরজিসি।
এসব হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা এমন সময় ঘটল, যখন ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শোক শোভাযাত্রা প্রায় শেষের দিকে এবং আজ বৃহস্পতিবার মাশহাদে তার জন্মভূমিতে দাফন করা হবে।
ইরানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বাতিল হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আঙ্কারায় ন্যাটো নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনে দেওয়া এক বক্তৃতায় ট্রাম্প আরও জানান, তিনি তার ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টকে স্পেনের সঙ্গে সকল বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে মাদ্রিদকে ন্যাটোর একটি ‘ভয়াবহ অংশীদার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন ট্রাম্প।
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালীতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে (তেলবাহী ট্যাংকার) হামলার জবাবে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে শক্তিশালী সামরিক হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ইরানের তেল বিক্রির সাময়িক ছাড়ও প্রত্যাহার করেছে।
ছবি: সংগৃহীত
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মরদেহ ইরাকে পৌঁছেছে। দেশটির পবিত্র নগরী নাজাফের সড়কে লাখো মানুষ খামেনির কফিনসহ শোকযাত্রায় অংশ নেয়। বুধবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
গত শনিবার থেকে প্রয়াত খামেনির রাষ্ট্রীয় শোক ও জানাজার আনুষ্ঠানিকতা চলছে। বুধবার ওই আনুষ্ঠানিকতার পঞ্চম দিনটি শিয়া অধ্যুষিত ইরাকবাসীদের জন্য নিবেদন করা হয়েছে।
ইরানের প্রত্যাশা, প্রয়াত নেতার জানাজাকে ঘিরে এই বিপুল আয়োজন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পর ঐক্য ও শক্তিমত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুগপৎ হামলা চালিয়ে এই যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায় ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র। সেদিনই খামেনি ও তার পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হন।
এমন সময় নাজাফের এই শোকযাত্রা শুরু হলো, যখন আবারও নতুন করে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনায় শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর ও দ্রুত যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালীতে তিনটি জাহাজে তেহরান হামলা চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের কয়েক ডজন সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলা চালানোর দাবি করেছে।
পরবর্তীতে ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সেনাবাহিনীর অধীনে থাকা অন্তত ৮৫টি লক্ষ্যে পাল্টা হামলা চালানোর দাবি করে। ইরানের পবিত্র শহর কোমে জনাকীর্ণ শোকযাত্রার শেষে গত মঙ্গলবার রাতে ইরাকের কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদরা নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে খামেনির মরদেহ গ্রহণ করেন।
এ সময় সেখানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও প্রয়াত নেতার একজন সন্তান উপস্থিত ছিলেন। ইরাক কর্তৃপক্ষ আজকের দিনটিকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। সকাল ৬টা থেকে নাজাফে শোকযাত্রা শুরু হয়।
কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাঝে একটি ট্রাকে করে খামেনির মরদেহ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জামাতা হযরত আলী (রা.)-এর মাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। উল্লেখ্য, শিয়া মুসলিমদের কাছে শ্রদ্ধাভাজন হিসেবে বিবেচিত ১২ ইমামের মধ্যে প্রথম ইমাম হযরত আলী (রা.)।
হযরত আলী (রা.)-এর মাজারে খামেনির জন্য দোয়া পড়ানো হয়। তারপর সেখান থেকে তার মরদেহ কারবালা শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। আজ বৃহস্পতিবার নিজের জন্মস্থান মাশহাদ শহরে খামেনিকে কবর দেওয়া হবে। শহরটি ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। গত মঙ্গলবার বিমানবন্দরে খামেনির বড় ছেলে মোস্তাফা খামেনি উপস্থিত ছিলেন।
খামেনির মৃত্যুর অল্প সময় পর তার উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচিত হন দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনি। খামেনির ওপর হামলার দিনে তিনিও আহত হন। নিরাপত্তাজনিত কারণে মোজতবা খামেনি এখনও জনসম্মুখে আসেননি। তবে লিখিত বার্তার মাধ্যমে তিনি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
ওই শহরে অসংখ্য শিয়া ধর্মগুরু পড়ালেখা করেছেন, শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন এবং বসবাস করেছেন। তাদের মধ্যে খামেনির পূর্বসূরী আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি অন্যতম। নাজাফ থেকে উড়োজাহাজে করে খামেনির মরদেহ ৬০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত কারবালায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে আরেকটি শোকযাত্রার মাধ্যমে তার মরদেহ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন ও তার ভাই আব্বাসের মাজারে নেওয়া হবে।
নাজাফ ও কারবালায় শোকযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের বিনামূল্যে খাবার ও পানীয় দেওয়ার জন্য সড়কের দুই পাশেই স্বেচ্ছাসেবকরা অসংখ্য স্টল বসিয়েছেন। শিয়া অধ্যুষিত ইরান ও ইরাকের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে বলিষ্ঠ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে দেশটির ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক আয়োজন সফল করতে ইরাকের সরকার ও জনগণের ব্যাপক প্রস্তুতি গোটা বিশ্বের সামনে ইরাক ও ইরান—এই দুই মহান জাতির গভীর আধ্যাত্মিক বন্ধনের পরিচয় তুলে ধরেছে।’
আশির দশকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন ইরাকের প্রয়াত নেতা সাদ্দাম হুসেইন। তিনি শিয়াদের ওপর দমন-পীড়নও চালান। তবে ২০০৩ সালে সাদ্দামের পতনের পর দুই দেশ ঘনিষ্ঠ মিত্রে রূপান্তরিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় আইআরজিসি সদস্য নিহত
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে হামলায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) এক সদস্য নিহত হয়েছে। দেশটির বন্দর মাহশাহরে চালানো মার্কিন ড্রোন হামলায় তার মৃত্যু হয়। নিহত ওই ব্যক্তি আইআরজিসির নৌবাহিনীর সদস্য ছিলেন। তবে তার পরিচয় প্রকাশ করেনি তেহরান। এ তথ্য জানিয়েছে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম।
বুধবার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ বুশেহরের গর্ভনরের একজন নিরাপত্তাবিষয়ক উপমন্ত্রী জানিয়েছেন, বুশেহর প্রদেশের দুটি সামরিক ঘাঁটি শত্রুপক্ষের ছোড়া গোলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রদেশের দাশতি কাউন্টিতে একটি ও চোগাদাক শহরের কাছে আরেকটি ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির তেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি বন্দর আব্বাস, সিরিক বন্দরনগরী ও কেশম দ্বীপেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এসব হামলা এমন সময় হয়েছে, যখন দেশটিতে সদ্য প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার রাষ্ট্রীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার রাতে এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, মার্কিন বাহিনী ইরানে ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাবে ইরানের তেল বিক্রির ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন।
এর জবাবে কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। একই সময়ে কুয়েত ও বাহরাইনের ৮৫ স্থানে হামলার কথা জানিয়েছে আইআরজিসি। ইরান সতর্ক করে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব দেওয়া হবে। আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহবি তাসনিম নিউজকে বলেন, ‘বুশেহর প্রদেশের খোরমুজ এলাকার আকাশে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি এমকিউ-৯ ড্রোন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে।’
মন্তব্য