লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে গত এক সপ্তাহে নারীসহ অন্তত ১৫ জন অভিবাসীর মরদেহ ভেসে উঠেছে। ধারণা করা হচ্ছে, নৌকা উল্টে গিয়ে সাগরে ডুবে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার (২০ জুন) নিরাপত্তা বাহিনী, নৌবাহিনী এবং চিকিৎসক সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
নৌবাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, উপকূল থেকে অন্তত ১০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তারা বলছেন, নৌকাটিতে প্রায় ৬১ জন আরোহী ছিলেন।
সূত্রগুলো জানায়, মিসর সীমান্তের কাছে তোব্রুক শহরের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার হয়েছে। দুজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছেন, উদ্ধার করা মরদেহগুলোতে পচন ধরতে শুরু করেছে। এলাকায় আরও মরদেহ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
তোব্রুক রেড ক্রিসেন্টের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, সাদা প্রতিরক্ষামূলক পোশাক পরা স্বেচ্ছাসেবকরা পাথুরে উপকূল থেকে মরদেহগুলো সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরছেন।
২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকেই লিবিয়া উপকূল হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার অন্যতম প্রধান রুটে পরিণত হয়েছে। সংঘাত, দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের আশায় হাজারো অভিবাসী মরুভূমি ও সাগরের ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন। তেলসমৃদ্ধ লিবিয়ার অর্থনীতিও অনেক দরিদ্র অভিবাসীকে আকৃষ্ট করে।
এদিকে আলাদা একটি ঘটনায় রাজধানী ত্রিপোলির ইমার্জেন্সি মেডিসিন অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার জানিয়েছে, উপকূলে নৌকাডুবির পর ১৩ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
লেবানন-ইসরায়েলের আলোচনা। ফাইল ছবি: সংগৃহীত
আসন্ন সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রর ওয়াশিংটন ডিসিতে ইসরায়েল ও লেবাননের শীর্ষ প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে একটি নতুন দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই কূটনৈতিক আলোচনার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের এই ঘোষণার ঠিক কিছুক্ষণ আগেই ইসরায়েল ও সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ লেবানন সীমান্তে পুনরায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার কথা জানায়। এর আগে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর অবিরাম বিমান হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক শান্তি সমঝোতা স্মারকটি সম্পূর্ণ ভেস্তে যাওয়ার মারাত্মক আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী লেবাননের অবরুদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের চালানো সাম্প্রতিকতম হামলায় অন্তত ৪৭ জন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সঙ্গে টেলিফোনে দীর্ঘ আলাপ করেন। ফোনালাপে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান এই দ্বিপক্ষীয় আলোচনাটিই মূলত লেবাননের জাতীয় পুনর্গঠন, ধসেপড়া অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘদিনের সংঘাত অবসানের একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ। দুই দেশের শীর্ষ নেতা আগামী ২৩ ও ২৫ জুন ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠেয় এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোর এজেন্ডা নিয়েও বিস্তারিত কথা বলেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মতে এই নির্ধারিত বৈঠকগুলোতে দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম সরকার একটি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একযোগে কাজ করবে। এর আগে গত এপ্রিল মাসে ১৯৯৩ সালের পর প্রথমবারের মতো দুই দেশের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি সরাসরি আলোচনায় বসেছিলেন। পরবর্তীতে জুন মাসের দ্বিতীয় দফার বৈঠকের পর উভয় পক্ষ সাময়িক সংঘর্ষ বিরতির ঘোষণা দিলেও ওই আলোচনাগুলোতে শক্তিশালী হিজবুল্লাহকে সম্পৃক্ত না করায় মাঠপর্যায়ে কোনো অর্থবহ অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
বিগত ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকেই লেবাননের বর্তমান সরকার মার্কিন-সমর্থিত একটি বিশেষ রোডম্যাপের অংশ হিসেবে হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি নিরস্ত্র করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর বিপরীতে লেবানন সরকারও দেশটির দক্ষিণ সীমান্ত থেকে সব ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে গত জুন মাসে সম্পাদিত একটি চুক্তিতে হিজবুল্লাহকে দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদীর উত্তরাঞ্চলে সরে যাওয়ার শর্ত দেওয়া হলেও সেখানে ইসরায়েলি সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহারের বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
অবশ্য ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্পাদিত মূল যুদ্ধ অবসান চুক্তি বা এমওইউ-তে লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমান দুই উগ্রপন্থি ইসরায়েলি মন্ত্রী বেন-গভির ও স্মোট্রিচ কর্তৃক লেবাননকে পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি এবং চলমান সীমান্ত সংঘর্ষ এই শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের পথে বারবার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর জেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত বিরলভাবে ইসরায়েলি আগ্রাসনের তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অভিযোগ করেছেন যে ইসরায়েল মূলত ওই অঞ্চলে একটি স্থায়ী যুদ্ধের পরিবেশ বজায় রাখতে চায়।
বারাক ওবামা। ছবি: সংগৃহীত
১৫ সপ্তাহের ইরান যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতি সংঘাত শুরুর আগের চেয়েও শোচনীয় বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। শুক্রবার (২০ জুন) এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
শিকাগোতে ওবামা প্রেসিডেনশিয়াল সেন্টার উদ্বোধনের প্রাক্কালে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওবামা বলেন, যুদ্ধের পেছনে শত শত কোটি ডলার ব্যয় করা হয়েছে, সামরিক বাহিনীর ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। অথচ এর বিনিময়ে প্রাপ্তি শূন্য। তিনি বলেন, “আমরা যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থানেই ফিরে এসেছি, বরং বলা যায় অবস্থা এখন আরও খারাপ।”
ইরানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের স্বাক্ষরিত নতুন সমঝোতা স্মারক নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ওবামা ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) বাতিলের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার শর্তে চুক্তিবদ্ধ ছিল, কিন্তু ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসায় ইরান উল্টো আরও বেশি পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শান্তি পরিকল্পনার সুফল পাওয়ার দাবি করেছেন। তিনি দাবি করেন, ইরানের প্রচলিত সামরিক শক্তি ভেঙে পড়েছে এবং জ্বালানির দাম কমছে। তবে ভ্যান্সের সুইজারল্যান্ড সফর স্থগিত হওয়ায় নতুন আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ওদিকে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ভবিষ্যতে যেকোনো আলোচনায় তেহরানের নির্ধারিত ‘রেড লাইন’ বা শর্ত মানতে হবে। অন্যথায় কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালীতে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এক্সন মবিলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নিল চ্যাপম্যান সতর্ক করে বলেছেন, কৌশলগত মজুত সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছালে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ থেকে ১৬০ ডলারে উঠতে পারে।
সাক্ষাৎকারের শেষভাগে ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন ও অস্থিরতা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী রাখতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় আনার দায়িত্ব নাগরিকদেরই নিতে হবে এবং অস্থির এই সময় পার করতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা জরুরি।
লেবাননে ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী। ছবি: সংগৃহীত
লেবাননে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতির পরও পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দেশটিতে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে লেবানন ইস্যুতে (লেবাননে ইসরায়েলি হামলা) যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির ভবিষ্যৎ ঘিরে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান ও ড্রোন হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—আঞ্চলিক সংঘাত কি সত্যিই প্রশমনের পথে, নাকি এই যুদ্ধবিরতি কেবল আরও বড় সংকটের আগে একটি সাময়িক বিরতি? রয়টার্স বলছে, এমন এক সময় এই হামলা হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সুইজারল্যান্ডে নতুন দফা আলোচনার জন্য রওনা হয়েছেন।
ওয়াশিংটন ও তেহরান আশা করছে, সাম্প্রতিক ১৪ দফা সমঝোতার ভিত্তিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক চুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু লেবাননে চলমান উত্তেজনা এবং ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ সেই প্রচেষ্টাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ অঞ্চলে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ও ড্রোন একাধিক হামলা চালায়। এতে আবাসিক ভবন ও বাড়িঘর ধ্বংস হয়। একইসঙ্গে ভোরের আগে ইসরায়েলি গোলন্দাজ বাহিনী নাবাতিয়েহ ও আশপাশের এলাকায় গোলাবর্ষণ করে। এসব হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হন।
যদিও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ উভয় পক্ষই শুক্রবার যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় বিকেল ৪টা থেকে তা কার্যকর হয়, তবু যুদ্ধবিরতির শর্ত বাস্তবায়ন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, ‘হিজবুল্লাহ যদি আমাদের আক্রমণ না করে, তাহলে আমাদের জন্য এটি যুদ্ধের সময় নয়।’ তবে একইসঙ্গে তিনি জানান, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের অবস্থান বজায় রাখবে।
এই অবস্থানই মূলত যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। কারণ, হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতিকে ‘দখল’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছে।
লেবানন: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির সবচেয়ে দুর্বল কড়ি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করবে। এর মধ্যে লেবাননও রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, ইসরায়েল এই চুক্তির পক্ষভুক্ত নয়। তেলআবিব শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অংশ নয় এবং নিজেদের নিরাপত্তা স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার স্বাধীনতা তাদের রয়েছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যতই রাজনৈতিক সমঝোতার দিকে এগোতে ইচ্ছুক, লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘর্ষ যেকোনো মুহূর্তে পুরো প্রক্রিয়াকে বিপর্যস্ত করতে পারে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি ইতিমধ্যে সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হলে তার দায় যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।
সামনে কঠিন পথ
যুদ্ধ বন্ধে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতাকে স্থায়ী রূপ দিতে সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে প্রযুক্তিগত পর্যায়ের আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু লেবাননে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় তিনি সফর বাতিল করেন। পরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার খবর প্রকাশ পায়।
এতে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন এখনো আলোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মূল জটিলতা এখন আর শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নয়; বরং ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের ভূমিকা, বিশেষ করে হিজবুল্লাহকে ঘিরে।
কেন সম্পর্কের টানাপড়েন?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান উত্তেজনার মূল কারণ লক্ষ্যগত পার্থক্য। ইসরায়েলের কাছে এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য হলো ইরান ও তার মিত্রদের দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করা। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য যুদ্ধ বন্ধ করা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
যুদ্ধের কারণে তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যদিও লেবানন যুদ্ধবিরতির পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমতে শুরু করেছে এবং হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহনও আংশিক স্বাভাবিক হয়েছে, তবু সংঘাত পুনরায় শুরু হলে বাজার আবারও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
এছাড়া, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প এমন একটি যুদ্ধের বোঝা টানতে চান না, যা অধিকাংশ মার্কিন ভোটারের কাছে জনপ্রিয় নয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে ১৭ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি চুক্তিতে সই করেন।
চুক্তি কি ভেস্তে যেতে পারে?
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—লেবাননের পরিস্থিতি কি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাকে ব্যর্থ করে দেবে? এর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে কয়েকটি বিষয় উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। প্রথমত, ইসরায়েল চুক্তির অংশ নয় এবং নিজেদের সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা ধরে রাখতে চাইছে। দ্বিতীয়ত, হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও লেবাননের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
তৃতীয়ত, ইরান মনে করে লেবাননে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার দায় যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে সেখানে সংঘাত অব্যাহত থাকলে তেহরান ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। তবে একইসঙ্গে উভয় পক্ষেরই আলোচনায় ফিরে যাওয়ার প্রবল প্রণোদনা রয়েছে। ইরান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ ও সম্পদ মুক্ত করার সুবিধা চায়, আর যুক্তরাষ্ট্র চায় যুদ্ধের অবসান ও জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা।
ফাইল ছবি
সংযুক্ত আরব আমিরাত ভ্রমণে আগ্রহী পর্যটকদের জন্য এসেছে নতুন সুযোগ। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশটি এখন ট্যুরিস্ট ভিসা ইস্যুর বিশেষ সুবিধা চালু করেছে, যা সাধারণ মানুষের ভ্রমণ প্রক্রিয়াকে আগের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত, সাশ্রয়ী ও সহজ করে তুলেছে।
শনিবার (২০ জুন) মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম খালিজ টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। নতুন এই দ্রুত ভিসা সুবিধার পাশাপাশি বর্তমানে দেশটিতে হোটেল বুকিং, ডেজার্ট সাফারি, জেট স্কি এবং বিভিন্ন জনপ্রিয় পর্যটন কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ছাড় দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে অত্যন্ত কম খরচে দুবাইসহ আরব আমিরাতের অন্যান্য আকর্ষণীয় গন্তব্য ভ্রমণের এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্টদের মতে, ভিসা প্রক্রিয়া রেকর্ড সময়ে সম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি হোটেল ও আউটডোর অ্যাক্টিভিটিতে বড় ধরনের ডিসকাউন্ট বা বিশেষ ছাড় থাকায় সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন পর্যটকদের জন্য আরও সাশ্রয়ী একটি গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। অনেক নামী হোটেলেই বর্তমান গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে রুম ভাড়া মাত্র প্রায় ১৩৯ দিরহাম থেকে শুরু হচ্ছে।
দুবাইয়ের অন্যতম প্রধান এবং জনপ্রিয় অভিজ্ঞতা হলো ডেজার্ট সাফারি, যা সাধারণত শীতকালে প্রায় ১৫০ দিরহামের কাছাকাছি থাকলেও এই অফারের কারণে গ্রীষ্মে মাত্র ৫০ দিরহামের মধ্যে উপভোগ করা যাচ্ছে। একইভাবে জেট স্কি ও বাগি রাইডসহ রোমাঞ্চকর সব আউটডোর অ্যাক্টিভিটিতে এখন প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছেন স্থানীয় অপারেটররা।
বিশেষ করে বুর্জ আল আরব এবং আটলান্টিসের মতো বিশ্ববিখ্যাত স্থাপনাগুলো কাছ থেকে দেখার জন্য জেট স্কি রাইডও এখন পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
দুবাইয়ের অন্যতম ট্রাভেল এজেন্সি প্লুটো ট্রাভেলসের ম্যানেজিং পার্টনার ভরত আইদাসানি এই প্রসঙ্গে বলেন, মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দ্রুত ভিসা পাওয়ার এই অনন্য সুবিধার কারণে সাধারণ পর্যটকদের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ভ্রমণের আগ্রহ আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং খুব দ্রুততম সময়ে ভিসা অনুমোদন পাওয়া গেলে যেকোনো শেষ মুহূর্তের ভ্রমণ পরিকল্পনা করাও অনেক সহজ হবে।
ট্রাভেল বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্রীষ্মকালে হোটেল ও পর্যটন সেবায় এই ধরনের আকর্ষনীয় ছাড় বেশি থাকায় এটি এখন বাজেট-বান্ধব বা স্বল্প খরচের একটি চমৎকার ভ্রমণ গন্তব্যে রূপান্তরিত হয়েছে।
তবে ভ্রমণের আগে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হচ্ছে, পর্যটকদের উচিত বিভিন্ন এজেন্সির অফারগুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে বুকিং করা এবং কোথায় কী ধরনের বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে তা নিশ্চিত হয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া। সব মিলিয়ে, কম খরচে বিলাসবহুল দুবাই ভ্রমণ এখন ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অনেক বেশি সহজ ও মোহনীয় হয়ে উঠছে।
ছবি: সংগৃহীত
সন্তান হারানোর অসহনীয় বেদনাকে জয় করে এক অনন্য মহানুভবতার পরিচয় দিলেন সৌদি আরবের নাগরিক শেখ ইয়াহিয়া বিন কানস আল-বুশরি। নিজের ছেলের খুনিকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে দিয়ে তিনি স্থাপন করেছেন মানবিকতার এক বিরল নজির। দণ্ড কার্যকরের মাত্র ১৫ ঘণ্টা বাকি থাকতে কোনো প্রকার আর্থিক সুবিধা ছাড়াই ঘাতককে নিঃশর্তভাবে ক্ষমা করে দেন তিনি। এই হৃদয়স্পর্শী ঘটনার একটি ভিডিও বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
জানা গেছে, নিহত যুবকের নাম বন্দর এবং সাজাপ্রাপ্ত আসামির নাম ইয়াসের। শেখ ইয়াহিয়া একসময় অত্যন্ত বিত্তশালী থাকলেও বর্তমানে বেশ সাধারণ জীবন অতিবাহিত করছেন। তা সত্ত্বেও পুত্রের জীবনের বিনিময়ে প্রস্তাবিত কয়েক মিলিয়ন রিয়ালের ‘ব্লাড মানি’ বা রক্তপণ নিতে তিনি সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। ইয়াহিয়া স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো পার্থিব লাভের আশায় নয়, বরং কেবল মহান সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই তিনি ঘাতককে ক্ষমা করেছেন। এই ক্ষমার সংবাদটি দিতে তিনি নিজেই উপস্থিত হন ঘাতক ইয়াসেরের মায়ের গৃহে।
সেখানে এক অবর্ণনীয় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নিজ সন্তানের জীবন ফিরে পাওয়ার সংবাদে বিচলিত ও কৃতজ্ঞ মা শ্রদ্ধাবনত হয়ে ইয়াহিয়ার পায়ে চুমু খেতে চাইলে তিনি তাকে বিনয়ের সঙ্গে বাধা দেন। পরিবর্তে তিনি নিজেই সেই শোকাতুর মায়ের কপালে পরম মমতায় চুম্বন করে তাকে শান্ত করেন। কিছুক্ষণ পর ঘাতকের ভাইয়েরাও সেখানে উপস্থিত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লে এই শোকাতুর পিতা তাদের বুকে টেনে নিয়ে সান্ত্বনা দেন। প্রিয় সন্তানকে হারানোর ক্ষত বয়ে নিয়েও একজন মানুষের এমন অকল্পনীয় ক্ষমাশীল আচরণে বিশ্বজুড়ে বইছে প্রশংসার জোয়ার।
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্য বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে যুদ্ধ, সংঘাত আর অনিশ্চয়তার এক চিরচেনা ছবি। কিন্তু এই অশান্তির দায় যতটা না ওখানকার সাধারণ মানুষের, তার চেয়ে অনেক বেশি ইতিহাসের পাতায় লুকিয়ে থাকা কিছু ভুল সিদ্ধান্ত এবং পরাশক্তিদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের। গত এক শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলে শান্তি ফেরানোর নামে যতগুলো বড় বড় চুক্তি হয়েছে, সেগুলোর প্রায় প্রতিটিই কোনো না কোনোভাবে নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে যা ছিল ‘শান্তির উদ্যোগ’, ভেতরের দিক থেকে তাই হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ভূখণ্ডকে চূর্ণবিচূর্ণ করার সুনিপুণ হাতিয়ার।
ইতিহাসের সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০২৬ সালের জুনে এসে আজও এক চরম নাটকীয়তার সাক্ষী হলো বিশ্ব। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে শুক্রবার (১৯ জুন)যে বহুল প্রতীক্ষিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, তা শেষ মুহূর্তে আকস্মিকভাবে স্থগিত হয়ে গেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সফর বাতিলের পর এই অচলাবস্থা তৈরি হয়, যা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ শান্তিকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে চার মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে এই ‘শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎ’ কোন দিকে যাবে তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে পুরো লেবানন ছারখার করে দেওয়ার উগ্র হুংকার—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য আবার এক নতুন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবসানে গত বুধবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্বারক সই হলেও লেবাননে ইসরায়েলের হামলা হয়েছে।
শুক্রবার (১৯ জুন)লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া কয়েকজন আহত ও নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা (এনএনএ)। খবর-আলজাজিরার।
এনএনএ জানায়, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর শুরু হওয়া এই হামলা সাম্প্রতিক সময়ে এলাকাটিতে চালানো সবচেয়ে তীব্র ইসরায়েলি আক্রমণগুলোর একটি। একাধিক আবাসিক বাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
অন্যদিকে, গত অক্টোবরে ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তি সই হলেও গাজায় থামেনি ইসরায়েলি নৃশংসতা। হামলায় নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টাইনসের গাজা পরিচালক ফিকর শালতুত বলেন, গাজা আরও একটি মর্মান্তিক মাইলফলকে পৌঁছানোয় আমরা শোকাহত। যে হাজার হাজার মানুষকে বলা হয়েছিল সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি শেষ হয়ে গেছে, তারা এখনো তাদের প্রিয়জনকে দাফন করছেন। এই ‘যুদ্ধবিরতি’ বড় ধরনের যুদ্ধ বন্ধ করলেও, চুক্তির দ্বিতীয় ও অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়টি বাস্তবায়নের জন্য কোনো সমঝোতা হয়নি। এই পর্যায়ে গাজা থেকে ইসরায়েলি সৈন্যদের প্রত্যাহার এবং হামাসের অস্ত্র সমর্পণের কথা ছিল।
অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে তাদের উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে। চুক্তির আওতায় গাজা উপত্যকার ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা থাকলেও, বর্তমানে তারা ৬৪ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
জাতিসংঘ মানবিক বিষয়ক সমন্বয়কারী অফিস (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, পূর্ব গাজা সিটির ডজনখানেক পরিবারকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। কারণ, ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে হলুদ রঙের সিমেন্টের ব্লক স্থাপন করেছে, যা তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখাকে পশ্চিম দিকে আরও সম্প্রসারিত করার ইঙ্গিত দেয়।
এদিকে, ইসরায়েল ও ইরান সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা আলোচনার মাধ্যমে এই চুক্তি চূড়ান্ত করেছে, যেখানে সহযোগিতা করেছে ইরান।
এসব আলোচনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সই করা ইরান চুক্তি (সমঝোতা স্মারক) মেনে নেওয়ার জন্য ইসরায়েল সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স।
একই সঙ্গে জে ডি ভ্যান্স মনে করিয়ে দিয়েছেন যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রই তাদের একমাত্র শক্তিশালী মিত্র হিসেবে অবশিষ্ট আছে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এক ব্রিফিংয়ের শেষভাগে ভ্যান্স বলেন, ‘আমি যদি ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার সদস্য হতাম, তবে পুরো বিশ্বে আমার একমাত্র যে শক্তিশালী মিত্রটি টিকে আছে, অন্তত তাকে আক্রমণ করতাম না।’
জে ডি ভ্যান্স মনে করিয়ে দেন যে ইসরায়েলের ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা অস্ত্রের তিন-চতুর্থাংশই যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এবং এর খরচও তারাই জুগিয়েছে। ফলে ইসরায়েলের সমস্যাটি ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প নন’।
কলমের খোঁচায় কৃত্রিম ক্ষত, ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তি: মধ্যপ্রাচ্যের আজকের যত সীমান্ত বিরোধ ও জাতিগত সংঘাত, তার সিংহভাগের শুরু হয়েছিল মূলত পশ্চিমা পরাশক্তিদের নিজেদের স্বার্থ, আধিপত্য এবং তেলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার আদিম খেলায়।
সাইকস-পিকট চুক্তি (১৯১৬): প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেন ও ফ্রান্স অত্যন্ত গোপনে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে আরবের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি বা জাতিগত পরিচয়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শিয়া, সুন্নি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়গুলোকে জোর করে কৃত্রিম সীমান্তের ভেতর আটকে দেওয়া হয়। ফলে সিরিয়া ও ইরাকে স্থায়ী অভ্যন্তরীণ কোন্দল তৈরি হয়। অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম বড় জাতিগোষ্ঠী ‘কুর্দি’দের কোনো নিজস্ব রাষ্ট্র না দিয়ে তাদের সীমানা ভেঙে চার টুকরো করে দেওয়া হয়।
বেলফোর ঘোষণা (১৯১৭): ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূমিতে ইহুদিদের জন্য ‘জাতীয় আবাসভূমি’ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন। শতভাগ ফিলিস্তিনি আরবদের মতামত না নিয়ে চাপিয়ে দেওয়া এই সিদ্ধান্তের সূত্র ধরেই ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হয় এবং লাখ লাখ ফিলিস্তিনি নিজ ভূখণ্ড হারিয়ে শরণার্থী হন।
ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি (১৯৭৮) ও আব্রাহাম অ্যাকর্ডস (২০২০): ১৯৭৮ সালে মিসর এবং ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মরক্কোর মতো দেশগুলো ফিলিস্তিন সংকটকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। পশ্চিমা বিশ্বের চোখে এটি সাফল্য হলেও, এর ফলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরব বিশ্বের সম্মিলিত ঐক্য ভেঙে যায় এবং ফিলিস্তিনিরা চরমভাবে একাকী ও অসহায় হয়ে পড়ে।
অসলো চুক্তি (১৯৯৩): ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আইজাক রাবিনের ঐতিহাসিক চুক্তি বিশ্বকে ‘দুই-রাষ্ট্র সমাধান’-এর স্বপ্ন দেখালেও বাস্তবে তা ফিলিস্তিনকে প্রকৃত স্বাধীনতা দেয়নি। উল্টো ফিলিস্তিনকে অঞ্চল ‘এ’ (ইসরায়েলি সামরিক বেষ্টনীতে ঘেরা মূল শহর), অঞ্চল ‘বি’ (যৌথ নিয়ন্ত্রণ) এবং অঞ্চল ‘সি’ (পশ্চিম তীরের ৬০ শতাংশ এলাকা যা সম্পূর্ণ ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে এবং যেখানে অবৈধ ইহুদি বসতি গড়া হচ্ছে)—এই তিন ভাগে ভাগ করে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।
শেষ মুহূর্তে থমকে গেল আলোচনা: ইতিহাসের সেই কৃত্রিম সংকটের জের ধরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে এক বিধ্বংসী সংঘাত শুরু হয়। চার মাসের এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে অন্তত ৭ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
এই যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে আয়োজিত বৈঠকটি স্থগিত হওয়ার পর হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ‘এ আলোচনার সার্বিক প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা কখনোই সহজ ছিল না।’ সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ না জানালেও, ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, ইরান কঠোর শর্ত দিয়েছিল যে আলোচনার টেবিলে বসার আগে অন্তর্বর্তী চুক্তি তথা ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও স্পষ্ট পদক্ষেপ দেখতে হবে।
‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ বনাম ট্রাম্পের হতাশা ও কৌশলগত পিছুটান: ইরান যুদ্ধ শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত কঠোর অবস্থান এবং তেহরানের ‘ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার’ হুংকার থেকে তিনি নাটকীয়ভাবে পিছু হটেছেন বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। সম্প্রতি তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পাদিত ১৪ দফার প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যগুলোর প্রায় সব কটিই তিনি শিথিল করেছেন অথবা পুরোপুরি বাদ দিয়েছেন।
গত ৬ মার্চ ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত কড়া ভাষায় লিখেছিলেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে আর কোনো চুক্তি হবে না।’ কিন্তু বর্তমান চুক্তির বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। চুক্তিতে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তোলা, প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি আটকে থাকা বৈশ্বিক সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং ৩ হাজার কোটি ডলারের পুনর্গঠন তহবিলের কথা বলা হয়েছে।
এই কারণে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ থামাতে ট্রাম্প ইরানকে অনেক বেশি ছাড় দিয়ে ফেলেছেন। অন্যদিকে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা আলী খামেনি বলেছেন, ট্রাম্প চরম ‘হতাশা’ থেকে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন।
ট্রাম্পের যুদ্ধকালীন লক্ষ্য বনাম চুক্তির বাস্তবতার ব্যবচ্ছেদ: কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ এড়াতে মার্কিন প্রশাসন তেহরনাকে ব্যাপক নীতিগত ও কৌশলগত ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংসের হুমকি: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর দিন ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করব এবং ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেব। এটি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’ তবে গত বুধবার ফ্রান্সে জি৭ শীর্ষ সম্মেলন শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পকে একেবারে ভিন্ন সুরে কথা বলতে দেখা যায়। তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানের কাছে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র থাকা স্বাভাবিক। ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের কাছে কিছু থাকতেই হবে। কারণ, অন্যদের কাছেও তা রয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র কোনো সমস্যা নয়। কারণ, এগুলো পুরো পৃথিবী ধ্বংস করে দেয় না।’ বর্তমান সমঝোতা স্মারকে ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়ে কোনো উল্লেখই নেই, যা ইরানের একটি বড় কৌশলগত বিজয়।
রেজিম পরিবর্তন বা শাসনব্যবস্থা বদল: যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনগুলোতে ট্রাম্প ইরানের জনগণকে তাদের সরকার পতনের ডাক দিয়েছিলেন। পরে ইরানিদের পক্ষ থেকে এমন কোনো গণঅভ্যুত্থানের লক্ষণ না পাওয়ায় হোয়াইট হাউস এই অবস্থান থেকে সরে আসে। যদিও মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার ঘটনাকে ট্রাম্প প্রশাসন একধরনের ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ হিসেবে দাবি করতে চেয়েছিল, কিন্তু ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন সাবেক নেতার ছেলে মোজতবা খামেনি, যা তেহরানের শাসনকাঠামোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে। গত বুধবার ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ‘আমি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য এটি করিনি।’
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও মজুত জব্দ: গত এপ্রিল মাসেও ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ‘ইরানের কোনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সহ্য করা হবে না।’ তবে বর্তমানে ট্রাম্প বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো কাজের জন্য ইরানকে স্বল্পমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দিতে সম্মতি জানিয়েছেন। একইভাবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত প্রসঙ্গে মার্কিন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও, সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী সেই মজুত আইএইএর (IAEA) তত্ত্বাবধানে ইরানের মাটিতেই নিষ্ক্রিয় বা মিশ্রিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রক্সি গোষ্ঠী ও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ: মার্কিন প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ফিলিস্তিনের হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোতে ইরানের অর্থায়ন চিরতরে বন্ধ করা। কিন্তু বর্তমান সমঝোতা স্মারকে ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন বন্ধের বিষয়ে সরাসরি কোনো আইনি বাধ্যবাকতা রাখা হয়নি। অন্যদিকে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ‘স্থায়ীভাবে টোলমুক্ত’ রাখার দাবি জানালেও, চুক্তিতে মাত্র ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবেই আমরা পরিষেবার জন্য ফি আদায় করব।’
লেবাননে ইসরায়েলের উগ্র অবস্থান ও মার্কিন-ইসরায়েল ফাটল: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এই শান্তি আলোচনা ও চুক্তি নিয়ে যখন তীব্র টানাপোড়েন চলছে, তখন এই প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ বাদ পড়া ইসরায়েল নিজেদের এই চুক্তি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। তারা লেবাননে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এবং বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। লেবাননে ইসরায়েলের নতুন বিমান হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন এবং যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাষ্টুচ্যুত হয়েছেন। চুক্তিতে লেবাননে যুদ্ধের ‘স্থায়ী অবসান’–এর কথা বলা হলেও ইসরায়েল সাফ জানিয়েছে, সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই; উল্টো তারা দখলকৃত অঞ্চলের পরিধি বাড়াতে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে। এই নিয়ে ট্রাম্প এখন প্রকাশ্যেই ইসরায়েলের সমালোচনা শুরু করায় গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশ দুটির সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ফাটল তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর হামলায় ৪ ইসরায়েলি সেনা নিহত হন, যার মধ্যে ছিলেন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ৪১ নম্বর ব্রিগেডের অধীনস্থ ৫২ নম্বর ব্যাটালিয়নের কমান্ডার ৩২ বছর বয়সি লেফটেন্যান্ট ডর গেদালিয়া বেন সিমহন। এই ঘটনার পরপরই চরম ক্ষোভে ফেটে পড়েন ইসরায়েলের অতি ডানপন্থী নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গাভির। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি পুরো লেবানন পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বলেন, আমেরিকানদের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই বলছি, ইসরায়েলকে পুরো বিশ্বের কাছে এটি স্পষ্ট করে দিতে হবে—আমাদের সন্তানদের রক্ত এবং আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা কোনো হেলাফেলার বস্তু নয়। পুরো লেবানন পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। একজন ইসরায়েলি মায়ের প্রতি ফোঁটা চোখের জলের বদলে এক হাজার লেবাননি মাকে কাঁদতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলে টিকে থাকতে হলে ‘উন্মাদের মতো আচরণ করতে হবে, সবকিছু নিশ্চিহ্ন ও গুঁড়িয়ে দিতে হবে’।
ইতিহাস এবং বর্তমানের এই দুই চিত্র মেলালে একটি সত্যই বারবার সামনে আসে—মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনার নামে যতবার স্থানীয় মানুষের আবেগ, অধিকার ও ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারকে পাশ কাটিয়ে পরাশক্তিদের স্বার্থে কোনো চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, ততবারই তা নতুন কোনো যুদ্ধের জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে।
আজ ২০২৬ সালের জুনে দাঁড়িয়ে ফিলিস্তিন ও লেবাননের মূল সংকটকে আড়ালে রেখে এবং ইসরায়েলকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে মার্কিন-ইরান যে শান্তিপ্রক্রিয়া সাজানো হয়েছিল, তা শুরুতেই থমকে যাওয়া প্রমাণ করে এর ভবিষ্যৎ কতটা অন্ধকার। কারণ, যতক্ষণ না বাহ্যিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এই অঞ্চলের মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা ও ভূখণ্ড নিশ্চিত করা হচ্ছে, ততক্ষণ শান্তির মোড়কে তৈরি এই ভঙ্গুর চুক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যকে আরও দীর্ঘকাল ধরে চূর্ণবিচূর্ণ করতেই থাকবে। পরাশক্তিদের পিছুটান এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অনড় অবস্থান এটাই স্পষ্ট করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে শান্তির সূর্য এখনো বহু দূরে।
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) রেলওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগে নতুন গতি এসেছে। এ লক্ষ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর পরিবহন ও যোগাযোগমন্ত্রীদের সাম্প্রতিক বৈঠকে প্রকল্পটির অগ্রগতি দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, গালফ রেলওয়ে শুধু একটি পরিবহন প্রকল্প নয়; এটি উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও লজিস্টিক সংযোগের নতুন যুগের সূচনা করবে।
জিসিসি রেলওয়ে নেটওয়ার্ক সম্পন্ন হলে কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং ওমান একক রেলপথে যুক্ত হবে। প্রায় ২ হাজার ১১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নেটওয়ার্ক কুয়েত সিটি থেকে শুরু হয়ে সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার ও ইউএই হয়ে ওমানের রাজধানী মাসকাট পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
জিসিসি পরিবহন মন্ত্রীদের বৈঠকে বলা হয়, রেলপথ চালু হলে সড়কপথে পণ্য পরিবহনের ওপর নির্ভরতা কমবে, পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে পুরো নেটওয়ার্ক চালু করা।
কুয়েত এ প্রকল্প বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশটি শাদাদিয়া থেকে সৌদি সীমান্তবর্তী নুয়াইসিব পর্যন্ত ১১১ কিলোমিটার রেলপথের নকশা প্রণয়নের জন্য একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। এছাড়া কুয়েত পৌর কাউন্সিল সৌদি আরবের সঙ্গে রেল সংযোগের রুট ও করিডর অনুমোদন করেছে।
অন্যদিকে, সৌদি আরবও কুয়েত-সৌদি রেল সংযোগ প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপ এগিয়ে নিচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুয়েত সীমান্ত থেকে ইউএই সীমান্ত পর্যন্ত সৌদি অংশের রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হবে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তা সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যাত্রীবাহী ট্রেন ঘণ্টায় ২০০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারবে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কুয়েত সিটি থেকে সৌদি রাজধানী রিয়াদ পর্যন্ত যাত্রা দুই ঘণ্টারও কম সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এছাড়া পণ্যবাহী ট্রেনের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলে দ্রুত ও কম খরচে পণ্য পরিবহন করা যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গালফ রেলওয়ে প্রকল্প চালু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক একীকরণ আরও শক্তিশালী হবে। এটি শুধু বাণিজ্য নয়, পর্যটন, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার এবং আন্তঃদেশীয় যোগাযোগেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একইসঙ্গে সমুদ্রপথে সম্ভাব্য বিঘ্ন বা সংকটের সময় বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবেও রেল নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বহু বছর ধরে পরিকল্পনাধীন গালফ রেলওয়ে প্রকল্প এখন বাস্তবায়নের পথে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, সময়মতো কাজ শেষ হলে এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ আন্তঃদেশীয় অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন মাইলফলক গড়বে।
মন্তব্য