অস্বাস্থ্যকর কোনো খাবার খাওয়ার পর খাদ্যবাহিত রোগ যে শুধু একটি বিরক্তিকর সমস্যা তা নয়। এটি অনেক সময় গুরুতর রোগ থেকে শুরু করে মৃত্যুর কারণ পর্যন্ত হতে পারে। দ্য ল্যানসেট সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন দেখা গেছে, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যু খাদ্যবাহিত রোগের কারণে হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘দূষিত খাবার থেকে সৃষ্ট এই বিশাল রোগের বোঝা কমাতে খাদ্যনিরাপত্তা উন্নয়নের জন্য দেশগুলোর কৌশলগুলো বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।’
সংখ্যাটি উদ্বেগজনক হলেও বিশেষজ্ঞদের কাছে এটি বিস্ময়কর নয় বলে জানান নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় আরভিং মেডিকেল সেন্টারের সিস্টেমস বায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ডা. হ্যারিস ওয়াং। তিনি এই গবেষণার সাথে যুক্ত ছিলেন না।
কানাডার কুইবেকে লাভাল বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. জুলি জিন বলেন, বিশ্বের একটি বড় অংশ হয়তো এই মৃত্যুর হার এবং এর সামগ্রিক বোঝা-যার অর্থ মৃত্যু এবং সেইসাথে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ও প্রতিবন্ধকতা-সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনকাল বা ডিঅ্যাবিলিটি-অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ার্স দেখে অবাক হতে পারে।
হ্যারিস ওয়াংয়ের মতো জিনও এ গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না। তার মতেও, এর প্রভাব এইচআইভি বা ম্যালেরিয়ার মতো অন্যান্য বড় সংক্রামক রোগের প্রভাবের সঙ্গে তুলনীয়।
তিনি আরও বলেন, অনেক ঘটনা মৃদু হওয়ায় বা রিপোর্ট না হওয়ায় খাদ্যবাহিত রোগের প্রকৃত প্রভাব প্রায়ই অবমূল্যায়িত হয়। কিন্তু এই তথ্যগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে খাদ্যবাহিত রোগ শুধু একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি একটি সামষ্টিক ও কাঠামোগত সমস্যাও। তবে এই ধরনের অসুস্থতা প্রতিরোধে ঘরেই কিছু পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
খাদ্যবাহিত অসুস্থতার কারণ
জিন বলেন, খাবার যখন বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান দ্বারা দূষিত হয়, তখন মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে পরজীবী, রাসায়নিক পদার্থ এবং অণুজীব। সাধারণ উদাহরণ হিসেবে সালমোনেলা, ইশেরিশিয়া কোলাই, নোরোভাইরাস এবং লিস্টেরিয়ার কথা উল্লেখ করা যায়।
ওয়াং বলেন, এসব রোগজীবাণু গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস ও ডায়রিয়ার মতো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তবে এগুলো আরও গুরুতর জটিলতায় রূপ নিতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে সেপসিস এবং ব্যাকটেরেমিয়া—যে অবস্থায় ব্যাকটেরিয়া রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে।
কিছু খাদ্যবাহিত রোগের ক্ষেত্রে সমস্যার মূল কারণ হলো তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা। অর্থাৎ খাবার যথেষ্ট পরিমাণে রান্না না করা বা এমন তাপমাত্রায় রেখে দেওয়া, যা ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল। অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের সময় স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে বলে জানান জিন।
বিশ্বব্যাপী খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসার সুযোগ সমান নয়। জিন বলেন, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে মৃত্যু ও গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। বিভিন্ন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিয়মকানুন এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতার পার্থক্য এসব রোগের বিস্তারে প্রভাব ফেলে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
ঝুঁকি ব্যক্তিভেদেও ভিন্ন হতে পারে। ওয়াং বলেন, ‘যেসব ছোট শিশুর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিকশিত হয়নি, যেসব বয়স্ক মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে এবং যাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল, তারা খাদ্যবাহিত রোগে বিশেষভাবে বেশি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।’
জিন আরও বলেন, গর্ভাবস্থা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে, ফলে গর্ভবতী নারীরাও গুরুতর খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
ওয়াং বলেন, কিছু ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অন্ত্রের অণুজীবের স্বাভাবিক ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এতে খাবারে থাকা রোগজীবাণুর কারণে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। খাদ্যবাহিত রোগের লক্ষণগুলোর মধ্যে থাকতে পারে বমি বমি ভাব, বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা এবং জ্বর।
টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুষদের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত দুই থেকে সাত দিনের মধ্যে এসব উপসর্গ সেরে যায়। তবে তিন দিনের বেশি স্থায়ী ডায়রিয়া, উচ্চমাত্রার জ্বর বা মলে রক্ত দেখা গেলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য পর্যাপ্ত পানি ও তরল গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান ওয়াং। তিনি বলেন, ‘শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে উপসর্গ ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এটি সারা শরীরে ধাক্কার মতো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে এবং একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যেতে পারে।’
রান্নাঘরে প্রতিরক্ষা
খাবার প্রস্তুত ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনই হলো প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বলে জানান জিন। সাধারণভাবে আধা-সেদ্ধ বা অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা মাংস ও ডিম, কাঁচা ময়দা এবং অপরিশোধিত দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। পাশাপাশি শাকসবজি ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। যাদের ঝুঁকি বেশি, তাদের কাঁচা মাছ, বাজারে প্রস্তুত বিক্রয়যোগ্য পাতলা কাটা মাংসজাত খাবার (পুনরায় গরম না করলে) এবং আগে থেকে প্যাকেটজাত সালাদও এড়িয়ে চলা ভালো বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন।
টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কিছু খাবার দীর্ঘ সময় কক্ষ তাপমাত্রায় রেখে দেওয়া নিরাপদ নয়—পরে গরম করে জীবাণু ধ্বংস করার চেষ্টা করা হলেও। কোনো খাবার কাটা, খোসা ছাড়ানো বা রান্না করার পর সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার না করলে দুই ঘণ্টার মধ্যে তা হিমায়িত সংরক্ষণে রাখতে হবে।
ওয়াং বলেন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে খাদ্যবাহিত রোগের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধক্ষমতাও শক্তিশালী করা সম্ভব। অন্ত্রের অণুজীবের সুস্থ ভারসাম্য এবং শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য কোনো একক ‘অলৌকিক খাদ্য’ নেই। এর মূল চাবিকাঠি হলো ভারসাম্য, বৈচিত্র্য এবং ধারাবাহিকতা।
খাদ্যতালিকায় এমন বিভিন্ন ধরনের খাবার রাখা উচিত, যা শরীরকে প্রয়োজনীয় ক্ষুদ্র পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করবে এবং রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে বলে পূর্বের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুষদের পুষ্টিবিজ্ঞানী ক্রিস্টোফার গার্ডনার।
এসব পুষ্টি সাধারণত তাজা ও বৈচিত্র্যময় ফল ও শাকসবজি, পূর্ণ শস্যজাত খাবার, চর্বিহীন আমিষ এবং স্বাস্থ্যকর তেল থেকে পাওয়া যায়। ওয়াং আরও বলেন, ‘যথাযথ পুষ্টি গ্রহণ, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত ঘুম—এসব সাধারণ অভ্যাসই ভালো স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত কার্যকর।’
ছবি: সংগৃহীত
চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইরানের কয়েকটি শহরে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। আল জাজিরা ও বিবিসির খবরে এমনটি বলা হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইরানে হামলা চালানোর পর দেশটির রাজধানী তেহরানসহ তাবরিজ ও ইস্পাহান শহরে শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইসরায়েল লেবাননে হামলার মাধ্যমে বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে—এমন অভিযোগ তুলে এর আগে উত্তর ইসরায়েলে একঝাঁক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান।
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) জানায়, এই হামলা টানা সপ্তাহব্যাপী আক্রমণের সূচনা মাত্র। অন্যদিকে ইসরায়েলের দাবি, তারা উত্তর ইসরায়েলে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আকাশেই প্রতিহত করেছে এবং এই ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
হামলার পর আইআরজিসির অ্যারোস্পেস কমান্ডার মজিদ মুসাভি বলেন, প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে। ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) মুখপাত্র এফি ডেফরিন একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলেন, ইরানি শাসকগোষ্ঠী মারাত্মক ভুল করেছে।
ইসরায়েলে হামলার পর তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সব ফ্লাইট স্থগিত করে ইরান। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে।
ইসরায়েল জানায়, দেশের উত্তরাঞ্চলে ইরানের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে তারা গাজা উপত্যকায় প্রবেশের সীমান্ত পথগুলো আবারও বন্ধ করে দিচ্ছে। এর মধ্যে রাফাহ ও কেরেম শালম ক্রসিং অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এদিকে সোমবার জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দূতাবাসের বিবৃতিতে সব কর্মচারীকে নিরাপদ স্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক ফোনালাপে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।
যুদ্ধ ফের তীব্র হওয়ার শঙ্কা
ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে তীব্র হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া এই হামলায় কেঁপে উঠেছে তেহরান, তাবরিজ ও ইসফাহান শহর। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এই হামলার খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দুই চিরবৈরী দেশের মধ্যে এই নতুন সংঘাতে যুদ্ধ আবারও চরম মাত্রায় পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, রাজধানী তেহরান, তাবরিজ এবং ইসফাহানে একাদিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, তেহরানে অন্তত দুটি এবং ইসফাহান শহরে অন্তত তিনটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে।
হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তারা পশ্চিম ও মধ্য ইরানে সুনির্দিষ্ট ‘সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে’ এই হামলা চালিয়েছে। তবে কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানি হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গত কয়েক দিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত ছিল। লেবাননে ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে সম্প্রতি উত্তর ইসরায়েল অভিমুখে একঝাঁক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান। এর জবাব দিতেই ইসরায়েল নতুন করে হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত দুজন নিহত এবং ২০ জন আহত হন, যা পরিস্থিতিকে আরও উসকে দেয়।
নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের ফোন
এদিকে ইরান-ইসরায়েল এই সংঘাত যেন আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ না নেয়, সে জন্য আন্তর্জাতিক মহলে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ফোন করে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, পুরো পরিস্থিতি তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং তিনিই সব চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
সৌদি ও কাতারের উদ্বেগ
ইরানে ইসরায়েলি হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি আলোচনা করেছেন সৌদি আরব ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জসিম আল থানির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।
ফোনালাপে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অঞ্চলের সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং এর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দুই দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হয়।
ইসরায়েলের পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় ইরানের হামলা
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, প্রতিশোধ হিসেবে তারা ইসরায়েলের হাইফায় রাসায়নিক কারখানায় হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, ইরানের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি’ হামলার জবাবে তারা ইসরায়েলের হাইফা শহরের একটি অনুরূপ কারখানায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী সতর্ক করে বলেছে, এই অঞ্চলে বেসামরিক এবং জ্বালানি লক্ষ্যবস্তুতে আরও হামলা হলে তার প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পড়বে।
আইআরজিসি এক বিবৃতিতে বলেছে, বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়ে এবং তেল শিল্পকে নিশানা করে জায়নবাদী শত্রুরা একটি বিপজ্জনক খেলা শুরু করেছে। এর পরিধি এই অঞ্চলের সব জ্বালানি লক্ষ্যবস্তুকে অন্তর্ভুক্ত করবে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এর পরিণতির দায় যুক্তরাষ্ট্রের।
ইসরায়েলে বাজছে সতর্কতা সাইরেন, আকাশসীমা বন্ধ
ইরানি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বিমান হামলার কয়েক ঘণ্টার মাথায় পাল্টা আঘাত হেনেছে ইরান ও তার মিত্ররা। এবার ইসরায়েলের রাজধানী জেরুজালেমসহ মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় অনবরত বাজছে যুদ্ধকালীন সতর্কতা সাইরেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের আকাশসীমা সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।
এদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, ইয়েমেনের দিক থেকেও ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, জেরুজালেম এবং গুশ দানসহ মধ্য ইসরায়েলের প্রায় প্রতিটি প্রান্তে সতর্কতা সাইরেন বাজানো হচ্ছে। একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম ফারস নিউজের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় নতুন করে কোনো আঘাত হানা হলে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা তার মিত্রদের তেল, গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলার হুমকি দিয়েছে তেহরান। সোমবার (৮ জুন) নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে প্রকাশিত এই সংবাদে জানানো হয়েছে, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট যেকোনো জ্বালানি কোম্পানিকে এখন থেকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী। মূলত ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার প্রচেষ্টার জবাবেই এমন কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটি, যা পুরো অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক বড় উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এই চরম উত্তেজনার নেপথ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক কয়েক দিনের পাল্টাপাল্টি হামলা। সম্প্রতি ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মাহশাহর এলাকায় অবস্থিত একটি বড় পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানিতে আক্রমণ চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানও চুপ থাকেনি; তারা ইসরায়েলের বন্দর নগরী হাইফার একটি পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিচালনা করে। উল্লেখ্য যে, এর আগে গত এপ্রিলেও হাইফার ওই একই স্থাপনায় একবার হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। দুই দেশের এই বাণিজ্যিক ও শিল্প অবকাঠামো লক্ষ্য করে আক্রমণের ধারা এখন সরাসরি সামরিক সংঘাতের দিকে মোড় নিয়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন গত রবিবার ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে বড় ধরনের অভিযান চালায়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান উত্তর ইসরায়েল লক্ষ্য করে অন্তত ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়ে সোমবার সকালে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ইরানের রাজধানী তেহরান ও ইস্ফাহানসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে পুনরায় পাল্টা হামলা চালায়। ইসরায়েলের এই সাম্প্রতিক আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের জ্বালানি ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস করা, যার প্রেক্ষিতেই ইরান এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পশ্চিমা মিত্রদের তেল ও গ্যাসক্ষেত্রে আঘাতের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।
এই সামরিক লড়াই এখন আর কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এতে জড়িয়ে পড়েছে ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিরাও। সোমবার ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে ইয়েমেন থেকে হুথিরা ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। হুথিদের এই আক্রমণের এক ঘণ্টার ব্যবধানে ইরান থেকেও দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টির খবর পাওয়া গেছে। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, তাদের জ্বালানি খাতের ওপর আক্রমণ অব্যাহত থাকলে তারা মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো স্থানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের অংশীদারত্ব রয়েছে এমন তেল স্থাপনাকে গুড়িয়ে দেবে। এমন পাল্টাপাল্টি হুমকির ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার এবং মধ্যপ্রাচ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের শঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর শুরু হতে মাত্র কয়েক দিন বাকি, ঠিক সেই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরিতে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের জন্য নির্ধারিত বেস ক্যাম্পের কাছে এক ভয়াবহ গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। শনিবার ভোররাতে কানসাস সিটির ট্রুস্ট অ্যাভিনিউ এলাকায় এই বন্দুক হামলায় অন্তত নয়জন আহত হয়েছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ক্রীড়াঙ্গনে বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে এবং টুর্নামেন্ট চলাকালীন অংশগ্রহণকারী দলগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
কানসাস সিটি পুলিশ বিভাগ জানিয়েছে, শনিবার ভোর চারটার দিকে তারা গোলাগুলির খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা বিবেচনায় তাদের তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, বর্তমানে আহতদের সবাই আশঙ্কামুক্ত রয়েছেন। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধীকে শনাক্ত বা আটক করা সম্ভব হয়নি, যদিও তদন্তকারী কর্মকর্তারা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আক্রমণকারীদের খুঁজে বের করতে অভিযান অব্যাহত রেখেছেন।
এই সহিংসতাটি ইংল্যান্ড ফুটবল দলের মূল ঘাঁটি ‘সোয়াপ সকার ভিলেজ’ থেকে মাত্র চার মাইল দূরত্বে ঘটেছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, হ্যারি কেইনদের দল এখনও কানসাস সিটিতে তাদের নির্ধারিত বেস ক্যাম্পে এসে পৌঁছায়নি। বর্তমানে ইংল্যান্ড দল ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে অবস্থান করছে, যেখানে আগামী বুধবার কোস্টারিকার বিপক্ষে তাদের একটি প্রীতি ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগমুহূর্তে এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সহিংসতার ক্রমবর্ধমান ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘গান ভায়োলেন্স আর্কাইভ’-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০২৫ সালেই দেশটিতে ৪০০টিরও বেশি বড় ধরনের গোলাগুলির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। বিশ্বকাপের মতো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের সময় লাখ লাখ বিদেশি পর্যটক ও শত শত খেলোয়াড়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা মার্কিন প্রশাসনের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কানসাস সিটির এই সাম্প্রতিক হামলা সেই নিরাপত্তা ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইংল্যান্ড দলের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফদের এই এলাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল দলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থান নেবে বলে ফিফা এবং স্থানীয় প্রশাসন পূর্বেই আশ্বস্ত করেছিল। তবুও খোদ বেস ক্যাম্পের নিকটবর্তী স্থানে এমন সশস্ত্র হামলা খেলোয়াড়দের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমানে কানসাস সিটি কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে টহল বাড়িয়েছে এবং টুর্নামেন্ট চলাকালীন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরির নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।
সৌদি আরবে আবাসন, শ্রম ও সীমান্ত সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে গত এক সপ্তাহে সাত হাজার সাতশো ষাট জন প্রবাসীকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত ২৮ মে থেকে ৩ জুন পর্যন্ত দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে পরিচালিত বিশেষ নিরাপত্তা অভিযানের মাধ্যমে এই বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ রোববার সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিবৃতির বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ৪ হাজার ৬৯০ জনকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে ইতোমধ্যে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
আটককৃতদের অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ করে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবাসন আইন লঙ্ঘনের দায়ে ৪ হাজার ৬০ জন, সীমান্ত নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের দায়ে ২ হাজার ৫৭৪ জন এবং শ্রম আইন লঙ্ঘনের কারণে ১ হাজার ১২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর পাশাপাশি অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে দেশটিতে প্রবেশের সময় আরও ১ হাজার ১৮৪ জনকে আটক করে নিরাপত্তা বাহিনী। এই অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে ৭০ শতাংশই ইথিওপিয়ার নাগরিক, ২৮ শতাংশ ইয়েমেনি এবং বাকিরা অন্যান্য দেশের নাগরিক বলে জানা গেছে।
অভিযানে কেবল অনুপ্রবেশকারী বা আইন লঙ্ঘনকারী প্রবাসীরাই নন, বরং তাদের সহায়তা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অবৈধভাবে সৌদি আরব ত্যাগের চেষ্টা করায় ২৫ জন এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের আশ্রয় বা পরিবহন সুবিধা দেওয়ার অভিযোগে আরও ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে মোট ২১ হাজার ৭৭৪ জন প্রবাসী, যার মধ্যে ২০ হাজার ৪৫৫ জন পুরুষ এবং ১ হাজার ৩১৯ জন নারী রয়েছেন, বিভিন্ন অপরাধে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া আরও ১৪ হাজার ৪৯৫ জনকে প্রয়োজনীয় ট্রাভেল ডকুমেন্ট সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক মিশনে পাঠানো হয়েছে।
সৌদি আরবের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৪৮ লাখ, যার একটি বড় অংশই বিদেশি শ্রমিক। দেশটির সরকার দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে এবং নিয়মিত বিরতিতে এমন চিরুনি অভিযান পরিচালনা করছে। বিশেষ করে অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারে সহায়তা প্রদানকারীদের জন্য ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ সৌদি রিয়াল জরিমানার কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিনিয়ত প্রবাসী ও নাগরিকদের এই আইনগুলো মেনে চলার জন্য সতর্ক করে আসছে। জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এই ধরপাকড় অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ধনকুবের রবিন খুদা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে দেশটিতে বিশাল বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে রবিনের মালিকানাধীন ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এয়ারট্রাংক।
জানা গেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে তিন লাখ কোটি রুপি (প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিনিয়োগ করবে প্রতিষ্ঠানটি। এয়ারট্রাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় ধনকুবের রবিন খুদা।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতে এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির জোয়ারকে কাজে লাগাতেই এই মেগা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম ‘ব্ল্যাকস্টোন’ এই প্রকল্পে এয়ারট্রাংককে অর্থায়ন ও সহযোগিতা করছে।
মোদীর সঙ্গে বৈঠক ও বিপুল বিনিয়োগ
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে রবিন খুদার একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর গত শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়। এয়ারট্রাংক জানিয়েছে, তারা পুরো ভারতজুড়ে প্রায় পাঁচ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ডেটা সেন্টার অবকাঠামো গড়ে তুলবে।
বিনিয়োগের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, এ ধরনের বিনিয়োগ ক্লাউড কম্পিউটিং এবং এআইয়ের গ্লোবাল হাব হিসেবে ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে এটি স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, অভ্যন্তরীণ সাপ্লাই চেইনকে সমৃদ্ধ করবে এবং উদ্ভাবন-নির্ভর প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে।
এই মেগা বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় অংশটি যাচ্ছে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্রে। রাজ্যের উপ-মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ জানিয়েছেন, মুম্বাইয়ের উপকণ্ঠে রায়গড়ে দুই লাখ কোটি রুপি ব্যয়ে একটি তিন গিগাওয়াটের ডেটা সেন্টার হাব তৈরি করবে এয়ারট্রাংক। সিডনিভিত্তিক এই কোম্পানিটি এরই মধ্যে প্রকল্পটির জন্য জমি কেনার সম্মতিপত্রে সই করেছে।
ফোর্বস এশিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রবিন খুদা বলেন, ভারত হলো বিশ্বের এমন কয়েকটি বাজারের একটি, যেখানে ভবিষ্যৎ চাহিদার পরিমাপ আমাদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। প্রতিটি বাজারেরই নিজস্ব শক্তি থাকে, তবে ভারতের প্রবৃদ্ধির গতিপথ অনন্য। এখানকার বিশাল জনসংখ্যা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং এআই নিয়ে তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার যে সংমিশ্রণ তৈরি হয়েছে, তা অন্য কোথাও সহজে পাওয়া সম্ভব নয়।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, হংকং, জাপান, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের পাশাপাশি ভারতেও নিজেদের নেটওয়ার্ক দ্রুত বাড়াচ্ছে এয়ারট্রাংক। চলতি বছরের এপ্রিলে তারা মুম্বাই-ভিত্তিক ডেটা সেন্টার ডেভেলপার লুমিনা ক্লাউডইনফ্রাকে অধিগ্রহণ করে। এই লুমিনা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ৬০০ মেগাওয়াটের ডেটা সেন্টার তৈরির কাজ করছে।
রবিন খুদা বলেন, লুমিনার মাধ্যমে ভারতের বাজারে প্রবেশের আগে থেকেই আমরা এখানকার সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী ছিলাম। চলতি সপ্তাহে সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার পর আমরা আমাদের সেই প্রতিশ্রুতিকে আরও দ্বিগুণ করতে চলেছি। ভারত সরকার আমাদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, তারা বিদেশি বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত।
কে এই রবিন খুদা?
ফোর্বসের রিয়েল-টাইম ডাটা অনুযায়ী, বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া রবিন খুদার বর্তমান নিট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২১০ কোটি (২ দশমিক ১ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। তিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যক্তি।
২০১৫ সালে রবিন এয়ারট্রাংক প্রতিষ্ঠা করেন এবং অত্যন্ত অল্প সময়ে এটিকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ ডেটা সেন্টার কোম্পানিতে রূপান্তর করেন। ২০২৪ সালে ব্ল্যাকস্টোন এবং কানাডা পেনশন প্ল্যান ইনভেস্টমেন্ট বোর্ডের একটি কনসোর্টিয়াম ১৬ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তির মাধ্যমে এয়ারট্রাংকের সিংহভাগ মালিকানা কিনে নেয়। তবে কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে রবিন খুদার কাছে এখনো এর একটি বড় অংশের শেয়ার রয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ যখন ক্রমশ গভীর হচ্ছে, তখন দলনেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধারে নতুন করে কৌশল সাজাচ্ছেন। দলীয় ভাঙন ও বিদ্রোহের আবহের মধ্যেই তিনি বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার (INDIA) আসন্ন বৈঠকে অংশ নিতে দিল্লি যাচ্ছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়েছে, টিএমসি সূত্রে জানা গেছে—আজ সোমবার দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকে অংশ নিতে মমতা ব্যানার্জি আজ রোববার রাজধানী দিল্লিতে পৌঁছাবেন এবং মঙ্গলবার পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করবেন। দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি ইতোমধ্যেই শনিবার দিল্লিতে পৌঁছেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, মমতা, অভিষেক এবং দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংসদ এই বৈঠকে একসঙ্গে অংশ নেবেন।
দলের ভেতরে চলমান অস্থিরতার মধ্যেই গত শুক্রবার মমতা ব্যানার্জি বড় ধরনের সাংগঠনিক রদবদল করেন। এতে মূলত তার অনুগত ও পুরনো নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা হয়। বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও তিনি অভিষেক ব্যানার্জিকে জাতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল রাখেন, যদিও সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে টিএমসির পরাজয়ের পর তার ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে।
একইসঙ্গে মমতা দুইজন যৌথ জাতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাজ্যসভা সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন ও ডোলা সেনকে নিয়োগ দেন। দলীয় সূত্রের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে ভবিষ্যতে সংগঠনের সিদ্ধান্ত এককভাবে নয়, বরং যৌথভাবে নেওয়া হবে। এক জ্যেষ্ঠ টিএমসি সাংসদ জানান, দলের ভেতরে মূল অসন্তোষ অভিষেক ব্যানার্জিকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে। তার মতে, ‘মমতা ব্যানার্জি এখন পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং দলের ভেতরের আস্থা ফিরিয়ে আনতে মরিয়া চেষ্টা করছেন।’
এদিকে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকের আগে কংগ্রেসও টিএমসির পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। টিএমসি সূত্রে জানা গেছে, মমতা ব্যানার্জি দিল্লি সফরের সময় সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করছেন, তবে এখনো পর্যন্ত সেই বৈঠক নিশ্চিত হয়নি। কংগ্রেসের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, অতীতে মমতা ব্যানার্জির কংগ্রেসবিরোধী অবস্থান এবং ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্ব নিয়ে তাঁর ভূমিকার সমালোচনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে জানান, ‘এখন সংকটের সময় কংগ্রেস আলাদা থাকবে না, তবে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতাও দেখাবে না।’
টিএমসির অভ্যন্তরে বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও মূল নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিধানসভায় প্রায় ৬০ জন বিদ্রোহী বিধায়কের সমর্থনে বিরোধী দলনেতা হিসেবে উঠে আসা ঋতব্রত ব্যানার্জি প্রস্তাব দিয়েছেন যে মমতা ব্যানার্জি দলে ‘প্রধান পরামর্শদাতা’ হিসেবে থাকতে পারেন। তবে এই প্রস্তাব ঘিরে বিদ্রোহী শিবিরেই মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
বিদ্রোহী বিধায়ক গুলশান মল্লিক বলেন, ‘মমতা ব্যানার্জি যদি সর্বোচ্চ নেতা না থাকেন, তাহলে পুরো বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।’ অন্যদিকে আরেক বিদ্রোহী বিধায়ক সঙ্গীতা রায় বসুনিয়া স্পষ্টভাবে বলেন, ‘মমতা ব্যানার্জি আমাদের সর্বোচ্চ নেতা এবং থাকবেন।’
দলের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, মমতা ব্যানার্জি এখন মুসলিম বিধায়কদের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। মোট ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৩১ জন মুসলিম হওয়ায় এই গোষ্ঠীর অবস্থান রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিদ্রোহী শিবিরে ইতিমধ্যেই কিছু মুসলিম বিধায়ক যোগ দিলেও, অন্যরা এখনো মূল নেতৃত্বের সঙ্গে রয়েছেন।
একই সঙ্গে লোকসভায় টিএমসির ২৮ জন সাংসদের মধ্যেও বিদ্রোহের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে, দিল্লিতে মমতার অবস্থানকালেই কিছু সাংসদ লোকসভার স্পিকারের কাছে অভিষেক ব্যানার্জিকে দলীয় সংসদীয় নেতা পদ থেকে সরানোর দাবি জানাতে পারেন। দলের এক জ্যেষ্ঠ সাংসদের দাবি, বিধানসভায় যেমন বিদ্রোহে বড় ধরনের ভাঙন দেখা গেছে, তেমনি লোকসভাতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তার ভাষায়, ‘সমর্থন ১৯ জন হলে অভিষেক ব্যানার্জিকে সরানো সম্ভব, এবং সেই সংখ্যা আরও বাড়তেও পারে।’
ইসরায়েলের গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তিতে যুক্ত আমেরিকার মধ্যস্থতাকারীদের ওপর আড়ি পাতছে ইসরায়েলি গুপ্তচর সংস্থাগুলো।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একে অপরের ওপর নজরদারি চালায়—এ কথা দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের জানা। তা এত দিন মেনেও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইরানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে আমেরিকার অবস্থান জানতে ইসরায়েলের এই তৎপরতা এবার মাত্রা ছাড়িয়েছে।
ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর আড়ি পাতার চেষ্টা বাড়িয়েছে ইসরায়েল। এ তালিকায় রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান মধ্যস্থতাকারী স্টিভ উইটকফ, পেন্টাগনের শীর্ষ নীতিনির্ধারক এলব্রিজ এ কোলবি এবং তার অন্যতম প্রধান সহকারী মাইকেল পি ডিমিনো দ্য ফোর্থ।
ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি ও অন্যান্য সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি আরও এক রিপোর্টে বিগত কয়েক বছরের ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের এই পাল্টা নজরদারির হুমকি সম্প্রতি ‘উচ্চ’ পর্যায় থেকে ‘সংকটজনক’ মাত্রায় পৌঁছেছে। ডিফেন্স কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি এজেন্সির সাহায্য নিয়ে তৈরি এই রিপোর্টে মার্কিন সামরিক কর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর ইসরায়েলের নজরদারির বিভিন্ন চেষ্টার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
ইসরায়েলের এই গুপ্তচরবৃত্তির রিপোর্ট এবং তা নিয়ে উদ্বেগ এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে এল, যখন দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। আমেরিকা ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। দুই দেশের সামরিক সমন্বয় এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এমনকি ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডে মার্কিন সেনাকর্তাদের সঙ্গে কাজ করছেন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারাও।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কৌশলগত ও অভিযানের তথ্য আদানপ্রদান করছে মার্কিন সেনাবাহিনী। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, শান্তি আলোচনায় ট্রাম্পের কৌশল ও তার পরিবর্তনশীল অবস্থান সম্পর্কে আগাম ধারণা পেতে নজরদারি চালাচ্ছে ইসরায়েল।
গোয়েন্দাদের এই নতুন সতর্কবার্তার ফলে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক ও যুদ্ধ পরিকল্পনার সমন্বয় ধাক্কা খেতে পারে। বিশেষ করে পেন্টাগন যদি ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তথ্য আদানপ্রদানের ক্ষেত্রে নতুন কোনো বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
দুই দেশের সম্পর্কে ইতোমধ্যেই কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। কারণ ট্রাম্প যখন শান্তি চুক্তি করতে চাইছেন, তখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চাইছেন ইরানের ক্ষমতা খর্ব করতে। একই সঙ্গে ইরান সরকারকে দুর্বল বা উৎখাত করা এবং লেবাননে তেহরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালানোও নেতানিয়াহুর অন্যতম উদ্দেশ্য।
ইসরায়েলে কর্মরত আমেরিকার প্রতিরক্ষা কর্মীদের মুঠোফোনে গোপনে আড়ি পাতার সফটওয়্যার ইনস্টল করার বেশ কিছু ঘটনা সামনে আসার পরেই ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি এই রিপোর্ট প্রস্তুত করেছে। এনবিসি নিউজ এই রিপোর্টের অস্তিত্ব এবং বিপদের মাত্রা বাড়ানোর খবরটি প্রথমে প্রকাশ করে।
এ বিষয়ে আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এই দাবিকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাসের এক মুখপাত্রও এই নজরদারির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, আমেরিকা বা দেশটির কোনো কর্মকর্তা ও সংস্থার ওপর ইসরায়েল কোনো রকম গুপ্তচরবৃত্তি চালায় না।
সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে আলোচনার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা এ পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। তারা বলেন, ‘এই সতর্কবার্তা অবশ্য পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতোই ইসরায়েলও দীর্ঘ দিন ধরে তার শত্রু ও মিত্র—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই আগ্রাসীভাবে তথ্য জোগাড়ের কাজ চালিয়ে আসছে।’
তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য সব বন্ধু দেশের তুলনায় বর্তমানে ইসরায়েলের দিক থেকে নজরদারির আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। কয়েকটি শত্রু দেশের চেয়েও তা অনেক ওপরে। কর্মকর্তারা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে কিছু কিছু পরিস্থিতিতে এই আশঙ্কার মাত্রা ‘উচ্চ’ থাকে, যা ইসরায়েলের এই গুপ্তচরবৃত্তির কাছাকাছি পৌঁছায়।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আমেরিকার কর্মকর্তাদের ওপর ইসরায়েলের তথ্য সংগ্রহের এই আগ্রাসী মনোভাব ‘সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে’। দুজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা জানান, ইসরায়েলে বা ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কর্মরত মার্কিন কর্মীরা এই নতুন রিপোর্টের আগেই নজরদারির ঝুঁকি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন।
অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন নিয়ে কথা বলার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তারা জানান, বিশেষত ইসরায়েল সফরের সময় নিজেদের মুঠোফোন এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র সুরক্ষিত রাখতে মার্কিন কর্মীরা বিভিন্ন নিরাপত্তা বিধি ও প্রোটোকল মেনে চলেন। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে সেই পদক্ষেপগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দিতে তারা রাজি হননি।
কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তারা ইসরায়েল সফরে গেলে প্রায়ই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করেন। অনেক সময়ে তারা ‘বার্নার ফোন’ (অস্থায়ী ফোন) ও আলাদা কম্পিউটার ব্যবহার করেন। সরকারি সফরের সময় হোটেল রুমে কথা বলার ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত সাবধানতা অবলম্বন করা হয়।
দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা থাকলেও নিজেদের সবচেয়ে সংবেদনশীল তথ্য গোপন রাখার প্রয়োজন উভয় পক্ষেরই রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ইসরায়েলের কিরিয়াত গাত-এ মার্কিন নেতৃত্বাধীন সিভিল-মিলিটারি কোঅর্ডিনেশন সেন্টারের কথা।
মন্তব্য