সীমান্ত থেকে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার দূরে রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শহর সেন্ট পিটার্সবার্গে কয়েকশ ড্রোন ব্যবহার করে নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। চলমান যুদ্ধবিরতির আলোচনার আবহের মধ্যেই এই বিশাল সামরিক পদক্ষেপ নিল কিয়েভ। রুশ কর্তৃপক্ষের মতে, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ইউক্রেনের এই আক্রমণ ছিল ‘নজিরবিহীন’। বিশেষ করে শহরটিতে রাশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক ফোরামের সমাপনী দিনে এই হামলা হওয়ায় তা বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে।
লেনিনগ্রাদ অঞ্চলের গভর্নর আলেক্সান্দর দ্রোজদেঙ্কো জানিয়েছেন, ওই এলাকার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় ১৪০টিরও বেশি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথমবার সেন্ট পিটার্সবার্গের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার স্বার্থে বাড়ির ভেতরে থাকার জরুরি নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়ার পূর্ববর্তী হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে ইউক্রেনীয় বাহিনী দেশটির বিভিন্ন অস্ত্রাগার ও একটি নৌ-ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করে এই আক্রমণ পরিচালনা করেছে।
সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার প্রস্তাব নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নেতিবাচক মন্তব্য করার পরপরই এই হামলার ঘটনা ঘটল। পুতিন বলেছিলেন, জেলেনস্কির সঙ্গে দেখা করার কোনো অর্থ নেই। এর প্রতিক্রিয়ায় গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, ‘চলমান যুদ্ধ শেষ করার সময় এসেছে।’ তবে একই সাথে তিনি রুশ প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাওয়ার’ অভিযোগও উত্থাপন করেন।
যদিও এই বিশাল ড্রোন হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানি বা সুনির্দিষ্ট বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের এত গভীরে ইউক্রেনের এই তৎপরতা ক্রেমলিনকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। এক গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, অর্থনৈতিক ফোরাম চলাকালীন এই হামলা রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্ব রাজনীতিতে এই হামলার প্রভাব এবং রাশিয়ার সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপ নিয়ে বর্তমানে ব্যাপক জল্পনা চলছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাথে সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। সম্প্রতি জেলেনস্কি এক খোলা চিঠিতে পুতিনের সাথে মুখোমুখি বৈঠকে বসার এবং অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে পুতিন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, আগে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো জরুরি এবং বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে সমাধান খুঁজে বের না করা পর্যন্ত এমন বৈঠকের কোনো বাস্তব কার্যকারিতা নেই। সেন্ট পিটার্সবার্গে আয়োজিত রাশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক ফোরামে তিনি এই কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন।
পুতিন আরও যুক্তি দেখিয়েছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হলে ইউক্রেন তার সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের সুযোগ পাবে। রাশিয়ার লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন। রাশিয়ার প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনের ডোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং ন্যাটোর সদস্য হওয়ার পরিকল্পনা স্থায়ীভাবে ত্যাগ করা। অন্যদিকে ইউক্রেন সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো প্রকার ভূখণ্ড ছাড় দেওয়া হবে না, কারণ এটি ভবিষ্যতে আরও বড় আগ্রাসনের সুযোগ তৈরি করে দেবে।
জেলেনস্কির চিঠির বিষয়ে পুতিনের মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, ক্রেমলিন চিঠিটি সম্পর্কে অবগত থাকলেও এর বিষয়বস্তু বিস্তারিত পর্যালোচনা করার সুযোগ পায়নি। তবে পুতিন চিঠিতে রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলার বিষয়টিকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিশ্বনেতারা দুই পক্ষের বৈঠকের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন, বর্তমান বাস্তবতায় দুই দেশের মধ্যকার দূরত্ব আরও বেড়েছে। যুদ্ধের ময়দানে উভয় পক্ষই হামলা জোরদার করায় পরিস্থিতি এখন চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
ছবি: সংগৃহীত
পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সংলগ্ন এলাকায় ইরানের বেশ কয়েকটি রাডার স্থাপনায় শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী এই অভিযানকে একটি ‘প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে দাবি করেছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে জানানো হয়, হরমুজ প্রণালী এলাকায় সাম্প্রতিক নিরাপত্তা হুমকি এবং ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতার জট কাটাতে এই হামলা চালানো হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের নজরদারি সক্ষমতা দুর্বল করে দিয়ে ওই অঞ্চলে মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। মার্কিন কর্মকর্তারা একে কোনো বৃহৎ যুদ্ধের সূচনা নয়, বরং একটি সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক সামরিক পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার তীব্র পাল্টা জবাব দিয়েছে ইরানের বিশেষ বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের সিরিক শহর ও কেশম দ্বীপে মার্কিন আগ্রাসনের প্রতিবাদে তারা কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ‘অ্যারোস্পেস মিসাইল’ বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এই বিবৃতিতে দাবি করা হয়, আঞ্চলিক শত্রুপক্ষের ঘাঁটিগুলোতে নিখুঁতভাবে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে এই হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরিতা এখন এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক বিশাল অংশ এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয়। ফলে এই অঞ্চলে সংঘাতের বিস্তার ঘটলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আল-জাজিরা সূত্রে জানা গেছে যে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে একাধিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করেছেন যে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় ধরণের ও বিস্তৃত সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর ঘাঁটিগুলোতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উভয় পক্ষকে চরম সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে এবং যুদ্ধের বদলে কূটনৈতিক সমাধানের পথে ফিরে আসার অনুরোধ করেছে। ওয়াশিংটনের এই অভিযানের পর তেহরান থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া না গেলেও, ইরান বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে যে তাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানলে তার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে।
চলতি বছরের শুরুতে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনায় ছিল প্রায় ৩২ কোটি মানুষ। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর গত মার্চ মাসে ডব্লিউএফপি সতর্ক করে বলেছিল, তেলের দাম যদি জুনের শেষ পর্যন্ত ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি বজায় থাকে, তবে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হবে।
শুক্রবার (৫ জুন) জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বলছে, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাব নিয়ে তাদের দেওয়া পূর্বাভাস ইতোমধ্যে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চাল ও গমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। যা খাদ্য সংকটের উদ্বেগকে আরও জোরালো করছে।
জাতিসংঘের এ সংস্থাটি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা ও জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দাম কয়েক কোটি মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সময় যত গড়াচ্ছে, সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
সংস্থাটির খাদ্য ও পুষ্টি বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জ্যঁ-মার্টিন বাউ শুক্রবার এএফপিকে বলেন, প্রায় তিন মাস ধরে যুদ্ধ পরিস্থিতির পরিবর্তন না হওয়ায় তাদের দেওয়া পূর্বাভাস এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
বাস্তব চিত্র বুঝতে ডব্লিউএফপি সংকটের ঝুঁকিতে থাকা বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে। এর মধ্যে সোমালিয়াকে নিয়ে দেওয়া একটি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বছরের শেষ নাগাদ অতিরিক্ত ২৫ লাখ মানুষ মৌলিক খাদ্যসামগ্রী কেনার সামর্থ্য হারাবে। গত বছর দেশটিতে অপরিহার্য চাহিদা মেটাতে অক্ষম পরিবারের সংখ্যা ছিল ৪৭ শতাংশ। চলতি বছর তা ৬০ শতাংশে ঠেকতে পারে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুর নতুন করে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। শুক্রবার (৫ জুন) রাজ্যটিতে নতুন করে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় অজ্ঞাত হামলাকারীদের গুলিতে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া গ্রামের অসংখ্য ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শীরা বরাতে জানানো হয়, মণিপুরের কাংপোকপি বিভাগের নিউ কেথিলেমানবির লোইবোল গ্রামে আজ ভোরে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। ভোর ৪টা ১০ মিনিটের দিকে ভারী অস্ত্র নিয়ে একদল হামলাকারী ওই গ্রামে প্রবেশ করে। তারা গ্রামে ঢুকেই নির্বিচারে গুলি ছুড়তে শুরু করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
হামলাকারীরা শুধু গুলি চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তারা গ্রামের অনেক ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। আগুনে বেশ কিছু বাড়িঘর পুরোপুরি ভস্মীভূত হয়ে গেছে।
ভয়াবহ এই গোলাগুলি ও অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা পৌঁছান। তবে তার আগেই হামলাকারীরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক বা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। কে বা কারা এই বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে, তা উদ্ঘাটনে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। এখন পর্যন্ত কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার দায় স্বীকার করেনি।
স্থানীয় পুলিশ নিহত তিন ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করেছে। তারা হলেন—লেটখোঙ্গাম হাওকিপ, টিনমারী হাওকিপ এবং জংমিনলাল হাওকিপ। হামলার সময় ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়।
এমন ভয়াবহ হামলার পর গ্রামবাসী প্রচণ্ড ভীত হয়ে পড়েছেন এবং রাজ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে গ্রামটিতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সাল থেকে মণিপুরে শুরু হওয়া জাতিগত দ্বন্দ্বের রেশ এখনো কাটেনি। মাঝে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত মনে হলেও আজকের এই ঘটনা নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী খুব শীঘ্রই ঢাকায় তাঁর নতুন দায়িত্বভার গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। শুক্রবার (৫ জুন) তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নিয়োগপত্র (লেটারস্ অব ক্রিডেন্স) গ্রহণ করেছেন। ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন এক বার্তার মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে গত এপ্রিল মাসের শেষের দিকে দেশটির সাবেক রেলমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদীকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
৭৫ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিক ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের একজন অত্যন্ত পরিচিত মুখ। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মন্ত্রিসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে ২০১২ সালে রেল বাজেট পেশ করার সময় যাত্রী ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ায় দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ তৈরি হয় এবং তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। রেল মন্ত্রণালয় ছাড়াও তিনি দেশটির স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
দীনেশ ত্রিবেদী ভারতের সংসদীয় রাজনীতির উভয় কক্ষেই প্রতিনিধিত্ব করার এক দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। তিনি পশ্চিমবঙ্গ থেকে লোকসভার সদস্য এবং গুজরাট থেকে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একপর্যায়ে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন এবং এর পরের মাসেই ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দেন।
অভিজ্ঞ এই কূটনীতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আগমন বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও গতিশীল করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিদ্যমান চরম উত্তেজনা নিরসনে এক নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান যদি কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়, তবেই কেবল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সঙ্গে বৈঠকে বসতে তিনি আগ্রহী। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স সূত্রে জানা গেছে যে, ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প দ্বিপাক্ষিক নানাবিধ মতপার্থক্য সত্ত্বেও এই আলোচনার জন্য তার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, “খামেনির সঙ্গে বৈঠক করতে পারলে আমি সম্মানিত বোধ করব।”
যদিও ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর ক্রমাগত মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক চাপ অব্যাহত রেখেছে, তবুও মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন যে এমন কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে তিনি পূর্ণ ‘শ্রদ্ধাশীল’ থাকবেন। অবশ্য তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কাছে তিনি খুব একটা ‘প্রিয় ব্যক্তি নন’। ধারণা করা হচ্ছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে শুরু হওয়া মার্কিন সামরিক অভিযানে মোজতবার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ক্ষয়ক্ষতির কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাসত্ত্বেও ইরানের শীর্ষ নেতার প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, “আমি শুনেছি উনি একজন পেশাদার ব্যক্তি।”
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা বর্তমানে তলানিতে। তার ভাষায়, “সেখানে কোনও নৌবাহিনী নেই, কোনও বিমান বাহিনীও নেই। আমরা তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি।” তিনি উল্লেখ করেন যে তেহরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিমান বাহিনীসহ সামরিক কাঠামোর প্রায় সবটুকুই যুক্তরাষ্ট্র গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থানের মূল কারণ ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি। জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইএইএ-এর প্রতিবেদন বলছে, ইরানের কাছে বর্তমানে ৪০০ কেজি ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে, যা ৯০ শতাংশে উন্নীত করলেই পারমাণবিক বোমা তৈরি সম্ভব হবে।
ইরান অবশ্য শুরু থেকেই তাদের পরমাণু কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করে আসছে। তবে ইরানের এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থান এখনও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এক বড় রহস্য। মূলত এই ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার হস্তগত করা ও তেহরানকে নিরস্ত্র করাই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন অভিযানের প্রধান লক্ষ্য। এ প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প পুনরায় তার অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, “আমি নিজে যেচে দেখা করতে আগ্রহী নই, কিন্তু কখনও সাক্ষাৎ ঘটে— আমি সম্মানিত বোধ করব।” তিনি আরও যোগ করেন, “যদি আমরা ইরানের সঙ্গে আমরা একটি শান্তি চুক্তিতে আসতে পারি, তাহলে তার সঙ্গে আমার সাক্ষাতের সম্ভাবনা আছে। সেক্ষেত্রে আমি রাজি আছি, অন্তত আমার তরফ থেকে কোনো আপত্তি নেই।” সামগ্রিকভাবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যগুলো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নতুন কোনো মোড় নিয়ে আসে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মহলে ব্যাপক জল্পনা চলছে।
ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান বন্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বাধ্য করতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে একটি রেজল্যুশন পাস হয়েছে। এই ঘটনায় ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি এই রেজল্যুশনটিকে ‘নিরর্থক’ এবং ‘দেশপ্রেমহীন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। বিশেষ করে নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির যে চারজন সদস্য এই বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তাদের কঠোর সমালোচনা করেছেন তিনি।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, “গতকাল হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে একটি নিরর্থক রেজল্যুশন পাস হয়েছে। ৪ জন বাজে রিপাবলিকান এমপিও তাতে ভোট দিয়েছেন। এমন এক সময়ে আমার যুদ্ধ সংক্রান্ত ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যখন আমরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধাবসান সংক্রান্ত আলোচনার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছি।” ডেমোক্রেটিক পার্টির উত্থাপিত এই বিলে বলা হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন সেনাদের অবস্থান অব্যাহত রাখতে হলে ট্রাম্প প্রশাসনকে অবশ্যই কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে। অনুমোদনের আগ পর্যন্ত সেনাদের প্রত্যাহার করার আহ্বান জানানো হয়েছে এই বিলে। ভোটাভুটিতে বিলটি ২১৫-২০৮ ভোটে পাস হয়।
কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য গ্রেগরি মিকস এ প্রসঙ্গে রয়টার্সকে জানান, মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট এককভাবে কোনো যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন না। কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্প কংগ্রেসের সাথে কোনো আলোচনা করেননি। এর প্রতিবাদে ট্রাম্প তার পোস্টে ডেমোক্র্যাটদের ‘ট্রাম্প-বিদ্বেষী’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তারা দেশের সফলতার চেয়ে ব্যর্থতাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, রিপাবলিকান পার্টির ওই চার সদস্য লোক দেখানো কাজ করছেন এবং তাদের লজ্জিত হওয়া উচিত।
উল্লেখ্য, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের জেরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে মার্কিন বাহিনী। ৪০ দিনের যুদ্ধের পর ৮ এপ্রিল ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। যদিও দুই মাস পার হয়ে গেলেও স্থায়ী শান্তি চুক্তির বিষয়ে এখনও কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তবে বর্তমানে পাস হওয়া এই রেজল্যুশনটি এখনই কার্যকর হচ্ছে না। এটি এখন উচ্চকক্ষ সিনেটে যাবে এবং সেখানে ভোটাভুটির পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মন্তব্য