ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি চুক্তির অনানুষ্ঠানিক খসড়া প্রকাশ করেছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, প্রস্তাবিত এই চুক্তি কার্যকর হলে হরমুজ প্রণালীর নৌচলাচলের ওপর ইরান ব্যাপক কর্তৃত্ব পাবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের অবরুদ্ধ ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে।
সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, খসড়াটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত বিধিমালার পুনর্নির্ধারণ। এতে চলাচলকারী জাহাজগুলোর প্রকৃতি ও ঝুঁকি নির্ধারণে ইরানকে একক কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
প্রকাশিত খসড়া অনুযায়ী, কোনো জাহাজের বহন করা পণ্যকে হুমকিস্বরূপ মনে হলে অথবা জাহাজটির চূড়ান্ত সুবিধাভোগীকে ইরানের প্রতি বৈরী হিসেবে বিবেচনা করা হলে সেটিকে বাণিজ্যিক জাহাজ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না। সেক্ষেত্রে জাহাজটিকে নির্ধারিত জলপথ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া নাও হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নৌপথ, নৌচলাচল–সংক্রান্ত সেবার ফি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবিলার ব্যয় নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ইরানকে কর্তৃত্ব দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী অতিক্রমকারী প্রতিটি জাহাজকে নির্ধারিত নৌকেন্দ্রে তথ্য জমা দিতে হবে। এতে জাহাজের পণ্য, মালিকানা ও গন্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে জাহাজটি কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে কি না, তা মূল্যায়ন করা হবে। প্রয়োজনে সরেজমিনে পরিদর্শনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
চুক্তির খসড়ায় একটি আর্থিক ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের অবরুদ্ধ ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্যমতে, এই অর্থ তেহরানের নির্বাচিত ব্যাংকগুলোতে কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই স্থানান্তর ও ব্যয় করা যাবে। তবে দেশটির সম্প্রচারমাধ্যমটি জানিয়েছে, এটি এখনো একটি ‘অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা’ পর্যায়ের খসড়া। বিষয়টি নিয়ে আরও পর্যালোচনা, আলোচনা ও সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে আক্রমণ চালালে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। রণকৌশল হিসেবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ও বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টির জন্য কৌশলগত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় তেহরান। এরপর থেকে যেন ‘দাবার গুটি’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইরান।
পাল্টা নৌ অবরোধ আরোপ করলেও ইরানকে দুর্বল করতে ব্যর্থ হয়েছে ওয়াশিংটন। নিজেদের শোচনীয় ‘পরাজয়’ লুকাতে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা, পরবর্তীতে তার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং আলোচনা-প্রস্তাবনার পালা জারি রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
‘হরমুজের ওপর অধিকার শুধু ইরান এবং ওমানেরই আছে’
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে ‘সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের’ অধিকার শুধু ইরান এবং ওমানেরই রয়েছে। ইরানের আইআরআইবি সম্প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত এক মন্তব্যে গরিবাবাদি বলেন, ‘ইরান এই জলপথে যানবাহন চলাচল ও নৌচলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি নতুন প্রক্রিয়া চালু করেছে। তবে এই ব্যবস্থা ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এই প্রণালীর বিষয়ে ওমান যদি অন্য সবার মতো আচরণ না করে, তবে ট্রাম্প দেশটিকে ‘উড়িয়ে দেওয়ার’ হুমকি দেওয়ার পর ইরান ওমানকে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির কাছে ‘নতি স্বীকার না করার’ আহ্বান জানিয়েছে।’
ইরানকে আরও কঠোর শর্ত দিলেন ট্রাম্প
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যে চুক্তির আলোচনা চলছে, সেখানে আরও কঠোর শর্ত যোগ করতে বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এমনটাই জানানো হয়েছে বলে এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়।
নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তির খসড়ায় আরও কিছু কঠোর শর্ত যুক্ত করে তা পুনরায় তেহরানের কাছে পাঠিয়েছেন। তবে ঠিক কোন কোন বিষয় বদলানো হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
শান্তিচুক্তি সম্পর্কে অবগত তিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের জব্দকৃত সম্পদ অবমুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে এমন কিছু ধারার বিষয়ে ট্রাম্প আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি এর আগে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমালোচনা করেছিলেন এবং এবারও তিনি সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি চান না।
এর আগে মার্কিন সূত্রগুলো এএফপিকে জানিয়েছিল, চুক্তির খসড়া শুধু ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে বৈঠকের পরও তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি।
ট্রাম্প বলেছেন, যেকোনো চুক্তির মূল শর্ত হলো—ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী আবার পুরোপুরি খুলে দেওয়াও তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। সব মিলিয়ে চুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, এই দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় তেহরানের পক্ষ থেকে জবাব পেতে দীর্ঘ সময় লাগায় মার্কিন প্রশাসন কিছুটা উদ্বিগ্ন। এই সমঝোতা প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। বর্তমানে এই চুক্তির সংশোধিত কাঠামোটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে নথিতে নতুন কোনো বড় পরিবর্তন আনা হলে সামগ্রিক চুক্তি সম্পন্ন হতে আরও দীর্ঘ বিলম্বের আশঙ্কা রয়েছে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যকে বদলে দিতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহু
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে জয়লাভ করলেই পুরো মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নিজেদের মতো করে বদলে ফেলা যাবে। সেই মানচিত্র আসলেই বদলাচ্ছে, তবে তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়। ইরানকে পরাজিত করা যায়নি। বরং বর্তমান পরিস্থিতি এক দীর্ঘমেয়াদি ও ক্ষয়িষ্ণু সংকটের ঝুঁকি তৈরি করেছে। পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে পুরোদস্তুর যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।
তেহরানের শাসনব্যবস্থা যে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর ধারণার চেয়েও অনেক বেশি শক্তশালী তা এখন প্রমাণিত। তাদের হিসেব-নিকেশ ভুল ছিল এবং এর ফলাফলের ওপর থেকে তারা নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। এর সর্বশেষ প্রমাণ হলো হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন অ্যাপাচে হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা। এটি ওয়াশিংটনের জন্য আরও একটি কড়া বার্তা যে, তেহরানের শাসকরা এখনো আমেরিকাকে আঘাত করার ক্ষমতা রাখেন।
একই সঙ্গে এই যুদ্ধে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে তারা যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত। ইরানের কাছে বিজয়ের অর্থ হলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা এবং পারস্য উপসাগরের সবচেয়ে কৌশলগত নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালী’র ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে শত্রুকে চাপে রাখা। গত ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌপথের বাণিজ্য পুরোপুরি স্থবির হয়ে আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং তার জেনারেলরা এখন যুদ্ধের সর্বশেষ সংযোজন হরমুজ প্রণালীতে এই হেলিকপ্টার হারানোর ধকল সামলে এমন একটি জবাব খোঁজার চেষ্টা করছেন, যা একই সঙ্গে আমেরিকার শক্তিও প্রদর্শন করবে আবার ধীরগতির নিষ্ফলা কূটনৈতিক পথকেও বাঁচিয়ে রাখবে। এই ঘটনায় কপ্টারের ক্রু সদস্যরা কোনোক্রমে বেঁচে গেছেন। তারা নিহত হলে মার্কিন প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি কঠোর হতো।
ট্রাম্প মূলত ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করার জন্য মুখিয়ে আছেন। যাতে হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়া যায় এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার পথ তৈরি হয়। এই যুদ্ধ খোদ আমেরিকার মাটিতেই জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। এখন ট্রাম্প এমন একটি উপায় খুঁজছেন যা তিনি নিজ দেশে ‘বিজয়’ হিসেবে প্রদর্শন করতে পারেন। তবে কাজটি মোটেও সহজ হচ্ছে না। ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু এখন যুদ্ধের সেই পুরোনো ঐতিহাসিক সত্যেরই মুখোমুখি হয়েছেন, যেকোনো যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ, একটি সুনির্দিষ্ট বিজয়ের মাধ্যমে তা শেষ করা ঠিক ততটাই কঠিন। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে যখন তারা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, তখন উভয়ের ভিডিও বার্তাতেই এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছিল। ১৯৭৯ সাল থেকে চলে আসা ইরানের শাসনব্যবস্থা এবার ক্ষমতাচ্যুত হতে যাচ্ছে এমনটাই ধরে নিয়েছিলেন তারা। ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে বসে ট্রাম্প ইরানি জনগণকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, তাদের মুক্তির সময় সমাগত।
পরদিন সকালে তেল আবিবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ছাদ থেকে নেতানিয়াহুও ঘোষণা করেন, যে স্বপ্ন তিনি ৪০ বছর ধরে দেখছেন, এবার তা পূরণ হতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই নেতানিয়াহু যুক্তি দিয়ে এসেছেন যে, ইসরায়েলের আসল শত্রু ফিলিস্তিন বা আরবরা নয়, বরং ইরান। তিনি পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টদের রাজি করাতে না পারলেও ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সফল হন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে নেতানিয়াহু ইসরায়েলিদের বলেন যে, আমেরিকার সমর্থনে তাদের সামরিক শক্তি শত্রুদের নিশ্চিহ্ন করবে এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ এনে দেবে। কূটনীতি নয়, সামরিক শক্তিই ছিল তার একমাত্র সমাধান। কিন্তু বাস্তবতা আজ ভিন্ন। গত সোমবার ট্রাম্প যখন তাকে বৈরুতে আক্রমণের পরিকল্পনা বাতিলের নির্দেশ দেন, তখন ইসরায়েলি কলামিস্ট বেন কাস্পিতের ভাষায়, নেতানিয়াহুকে দেখতে একটি ‘হাওয়া বের হওয়া ফুসকো বেলুনের’ মতো লাগছিল। সামরিক শক্তি দিয়ে পুরো অঞ্চলকে নিজের ইচ্ছাধীন করার যে কৌশল নেতানিয়াহু নিয়েছিলেন, তা স্পষ্টতই ব্যর্থ হয়েছে।
ট্রাম্প একটি দ্রুত বিজয় আশা করেছিলেন। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যেভাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী বন্দি করে নিউইয়র্কের জেলে ভরেছে এবং কারাকাসে নিজেদের পছন্দের উত্তরসূরি বসিয়েছে, ট্রাম্প ভেবেছিলেন ইরানের ক্ষেত্রেও সেই একই ফর্মুলা খাটবে। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও আমেরিকা ও ইসরায়েল আজ ভাবছে কোথায় ভুল হলো? তারা ভেবেছিলেন নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ইরান হয়তো ভেতর থেকে ভেঙে পড়বে। বিশেষ করে যখন তাদের মিত্র হামাস, হিজবুল্লাহ এবং সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন হয়েছে, তখন ইরানকে একা ভেবেছিলেন তারা। কিন্তু তারা এই ইসলামিক শাসনের সহনশীলতা ও নিষ্ঠুরতাকে অবমূল্যায়ন করেছিলেন।
ছবি: সংগৃহীত
ইরানের ওপর মার্কিন বিমান বাহিনীর নতুন করে চালানো বোমাবর্ষণের পর মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র আকার ধারণ করা সামরিক উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ।
বুধবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে অস্ট্রেলিয়ার সরকারপ্রধানের এই আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
গণমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে অ্যালবানিজ চলমান এই যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে নিজের তীব্র শঙ্কার কথা জানান। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত আরও বৃদ্ধি পেলে তার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি সমগ্র বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর আছড়ে পড়বে।’
অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের অনুলিপি অনুযায়ী তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট মানবিক সংকটের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর যে বিশাল ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে, তা পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও বেশি অবনতির দিকে নিয়ে যাবে।
অ্যালবানিজ এই অঞ্চলের চলমান বৈরিতা হ্রাস করার লক্ষ্যে তার সরকারের পক্ষ থেকে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ক্যানবেরা সর্বদা এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের একটি স্থায়ী প্রশমন দেখতে চায়।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভৌগোলিক দিক থেকে অস্ট্রেলিয়া মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করলেও এই যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাব, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে অনুভূত হতে শুরু করেছে।
সর্বশেষ মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত ইরানি হামলায় তাদের একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ধ্বংস হওয়ার ঘটনার জবাবেই এই আক্রমণটি পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন।’ তবে এই পরিস্থিতিতেও একটি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠাই বিশ্ববাসীর প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে তিনি জোর দিয়ে জানান। তিনি বলেন, ‘তারা এই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে শান্তি ফিরে আসুক সেটাই চান, কারণ এই যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের দুর্ভোগই বাড়াচ্ছে না, বরং বিশ্বজুড়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।’
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর এই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যটি মূলত দক্ষিণ ইরানে মার্কিন বিমান বাহিনীর সর্বাত্মক হামলার পরপরই সামনে এল। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা ‘সেন্টকম’ জানিয়েছে, তাদের যুদ্ধবিমানগুলো হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত ইরানের মূল আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও রাডার স্টেশনগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে এই হামলা চালায়। এর বিপরীতে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ‘আইআরজিসি’ বুধবার ভোরে দাবি করেছে, তারা পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পুরো অঞ্চলজুড়ে অবস্থিত মার্কিন বিমান ও নৌঘাঁটির মোট ২১টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে একযোগে শক্তিশালী প্রতিরোধ হামলা সম্পন্ন করেছে।
ছবি: সংগৃহীত
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা ছড়ানোর দায়ে এবার ইসরায়েলের বসতি স্থাপনকারীদের নেটওয়ার্কের ওপর চড়াও হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলো। এই সহিংসতায় অর্থায়ন, সহায়তা ও সরাসরি হামলা পরিচালনাকারী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে গত মঙ্গলবার একযোগে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স এবং নরওয়ে।
এর আগে গত সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেয়। ফলে মোট ছয়টি দেশ এখন পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত নেটওয়ার্ক, অর্থায়নকারী ও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চরম সহিংসতার জন্য দায়ী কট্টর বসতি স্থাপনকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনাই আমাদের লক্ষ্য।’ তারা ইসরায়েল সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন এই সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো জানিয়েছেন, তার দেশ ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ, কয়েকজন বসতি নেতা এবং ২১ জন সহিংস বসতি স্থাপনকারীকে ফ্রান্সে প্রবেশে নিষিদ্ধ করেছে।
যুক্তরাজ্য লক্ষ্য করেছে মূলত অর্থের প্রবাহ বন্ধ করতে। তারা এমন একটি নির্মাণ কোম্পানিকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে, যাদের সম্পদ ফিলিস্তিনি সম্পত্তি ধ্বংসে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কানাডা আলাদা একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও তার মালিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
কূটনীতিকরা সতর্ক করে বলেছেন, ‘পশ্চিম তীরে এই সহিংসতা আসলে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে দুর্বল করার একটি কৌশল। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে অধিকৃত এলাকায় লাখ লাখ ইসরায়েলি বসতি গড়ে উঠেছে, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে অবৈধ বলে বিবেচিত হয়।’
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই নিষেধাজ্ঞাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছেন, ‘যেসব দেশ এই পদক্ষেপ নিয়েছে তারা নিজ দেশে ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এই নিষেধাজ্ঞা সেই বিদ্বেষকে আরও উসকে দিচ্ছে।’
ইসরায়েলের দাবি, এসব নিষেধাজ্ঞার আসল উদ্দেশ্য রাজনৈতিকভাবে ইসরায়েলেরে বসতি স্থাপনের অধিকার নিয়ে চাপ সৃষ্টি করা। পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতি পরিষদের প্রধান ইসরায়েল গান্জ আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘ইসরায়েলের পার্লামেন্টের উচিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে বিলুপ্ত করা এবং পুরো পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা।’
যদিও ইসরায়েল সরকার মাঝে মধ্যে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার নিন্দা করে, তবে বিদেশি নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে তারা সবসময়ই তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। যৌথ বিবৃতিতে ছয় দেশ স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইসরায়েল যদি মাঠপর্যায়ে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
ভারত স্বাধীনতার পর থেকে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পুনর্গঠন শুরু করার আরও কাছাকাছি পৌঁছেছে, কারণ নয়াদিল্লি চীন ও পাকিস্তানকে জড়িয়ে সম্ভাব্য দুইমুখী চ্যালেঞ্জ নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে তার সশস্ত্র বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় উন্নত করতে চাইছে। এই সংক্রান্ত ‘ইন্টিগ্রেটেড থিয়েটার কমান্ডস (আইটিসি)’ প্রস্তাবটি গত মাসে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে এবং এটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এই সংস্কারের মাধ্যমে ভারতের বিদ্যমান ১৭টি মূলত পরিষেবাভিত্তিক সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর কমান্ডগুলোকে প্রতিস্থাপন করে ভৌগোলিক অবস্থান এবং কৌশলগত হুমকির ওপর ভিত্তি করে যৌথ কমান্ড গঠন করা হবে। ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউশন অব ইন্ডিয়ার গবেষক গৌরব কুমারের মতে, ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন ইসলামাবাদ ও বেইজিংয়ের মধ্যে দৃশ্যমান সমন্বয় এই পরিকল্পনার পেছনে নতুন গতি সঞ্চার করেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, চীনের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধকারী একটি নর্দান থিয়েটার কমান্ডের সদর দপ্তর হবে লখনৌয়ে, অন্যদিকে পাকিস্তানের দায়িত্বে থাকা একটি ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড জয়পুর থেকে পরিচালিত হবে। তিরুবনন্তপুরমে অবস্থিত একটি মেরিটাইম থিয়েটার কমান্ড ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ভারতের স্বার্থ তদারকি করবে।
কুমার বলেন, ‘আগে চীন ও পাকিস্তানকে মূলত দুটি পৃথক নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু ক্রমশই এমন একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে, ভবিষ্যতের যেকোনো সংকটে উভয় দিক থেকেই চাপ আসতে পারে, যা একই সাথে অথবা পরস্পর-সংযুক্ত উপায়ে হতে পারে।’
কুমার আরও বলেন, ‘চীনকে এখন আর শুধু হিমালয় সীমান্ত বিরোধের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয় না। ভারত মহাসাগরে তাদের নৌ-উপস্থিতি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং এটি ভারতীয় পরিকল্পনাকারীদের সামুদ্রিক এলাকা এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক সম্পর্কে আরও গুরুত্ব সহকারে ভাবতে বাধ্য করেছে। থিয়েটার কমান্ড সংস্কারের পাশাপাশি ভারত একটি ত্রি-বাহিনী যৌথ অভিযান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজও এগিয়ে নিচ্ছে, যাতে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, ড্রোন পরিচালনা এবং তাৎক্ষণিক যুদ্ধক্ষেত্র সচেতনতা উন্নত করা যায়।’
কুমার বলেন, ‘ভারত চীনসহ বিভিন্ন বিদেশি সামরিক বাহিনী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করছে, যাদের ২০১৬ সালের ব্যাপক সামরিক সংস্কারে সমন্বিত থিয়েটার কমান্ড তৈরি করা হয়েছিল। চীনের ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড সমগ্র চীন-ভারত সীমান্তের তত্ত্বাবধান করে এবং এটিকে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির আধুনিক যৌথ-অপারেশন কাঠামোর একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে ব্যাপকভাবে গণ্য করা হয়।’
যদিও ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর সংস্কারের এই ধারণাটি ১৯৯৯ সালের কারগিল সংঘাতের পর গঠিত কারগিল রিভিউ কমিটির সময় থেকে চলে আসছে, বিশ্লেষকরা বলছেন যে ২০১৯ সালে চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ পদ তৈরির পর এই অগ্রগতি ত্বরান্বিত হয়েছে।
ভারতের সাবেক এয়ার ভাইস-মার্শাল কপিল কাক বলেছেন, ‘অপারেশন সিঁদুরের মতো চীন ও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আসা একটি সাধারণ হুমকির বিরুদ্ধে ভারতের আজকের প্রস্তুতি প্রয়োজন। যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো যৌথ পরিকল্পনা এবং সমন্বিত ত্রি-বাহিনী অভিযান।’
তবে, এই সংস্কার নিয়ে ভারতের সামরিক বাহিনীতে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। কুমার বলেছেন, ‘ভারতীয় বিমান বাহিনী উদ্বিগ্ন যে থিয়েটার কমান্ডগুলো বিমান শক্তির নমনীয়তাকে সীমিত করতে পারে, বিশেষ করে যদি ভারত একই সাথে চীন এবং পাকিস্তান উভয়ের কাছ থেকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।’
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে আবার এক সপ্তাহের মধ্যেও সমঝোতা হতে পারে। বুধবার এমন মন্তব্য করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, ‘আমার মনে হয় আমরা এমন একটি চুক্তির কাছাকাছি অবস্থানে আছি যা অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো হবে এবং একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু এখন নয়, শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ের জন্য নয় বরং দীর্ঘমেয়াদে এমনভাবে যাতে আমার সন্তানরা বড় হয়ে বলতে পারে-ইরান পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না। এটাই আমাদের নীতির লক্ষ্য এবং আমরা সেই লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। তবে, এখনো কিছু কাজ বাকি রয়েছে এবং আমরা তা চালিয়ে যাব।’
তিনি আরও বলেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন (মিডটার্ম) হওয়ার আগেই আমরা অনেক কিছু জানতে পারব। চুক্তি আগামী সপ্তাহেই হতে পারে, আবার কয়েক মাস পরেও হতে পারে।’
ভ্যান্সের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধানের দিকে নজর দিচ্ছে। তবে, আলোচনার অগ্রগতি সত্ত্বেও এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চূড়ান্ত হওয়া বাকি রয়েছে।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সংঘাতে মোট ৩ হাজার ৩৭৫ জন নিহত হন, যার মধ্যে ২ হাজার ৮৭৫ জন পুরুষ এবং ৪৯৬ জন নারী। এ ছাড়া জরুরি চিকিৎসা বিভাগের তথ্যানুযায়ী, এই যুদ্ধে ১১৮ জন চিকিৎসাকর্মী আহত হন এবং ২৬ জন নিহত হন।
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ হামলার জবাব দিতে বাহরাইন এবং জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানায়, ‘যুক্তরাষ্ট্র ফের হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আরও ব্যাপক ও তীব্র আঘাত হামলা শুরু হবে।’
বুধবার বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটারে) দেওয়া বার্তায় জানায়, ‘সাইরেন বাজানো হয়েছে। নাগরিক ও বাসিন্দাদের শান্ত থাকতে বলা হচ্ছে। সবাইকে কাছাকাছি আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।’
এর আগে, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে দক্ষিণ ইরানের জাস্ক, সিরিক ও কেশম দ্বীপে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এর পরপরই পাল্টা জবাব দিতে বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দাবি জানায় আইআরজিসি।
এদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, ‘মার্কিন হামলায় সিরিকের বেমানি এলাকায় একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুটি পানির ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে।’ যুক্তরাষ্ট্র জানায়, হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছে ইরান। এর জবাবে তারা ইরানের কয়েকটি স্থানে হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ‘হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার জবাবে এই হামলা চালানো হয়।’
আইআরজিসি ও ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া পৃথক বিবৃতিতে জানায়, ‘এই অঞ্চলে অবস্থিত কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।’ তবে বিবৃতিতে শুধু বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘শত্রুর কূটচালের জবাবে বাহরাইনেরে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।’
তবে ওই হামলায় কতটি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে বা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কেও তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
খাতাম আল-আম্বিয়ার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘মার্কিন বাহিনী হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে আগ্রাসন চালিয়েছে। এর জবাবে ইরানের সেনাবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী যৌথভাবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটিতে শক্তিশালী হামলা চালিয়েছে।’
বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, ‘মার্কিন বাহিনীর জানা উচিত, তারা যদি ইরানের বিরুদ্ধে আবারও আগ্রাসন চালায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আরও তীব্র হামলা চালানো হবে।’ আইআরজিসি জানিয়েছে, ‘সংঘর্ষ এখনো চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন বন্ধ না করলে আরও কঠোর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাদের ভূখণ্ডে কোনো হামলা হলে তার জবাব দেওয়া হবে। তেহরানের মতে, হামলার প্রতিক্রিয়া না দেখালে তা শত্রুদের কাছে দুর্বলতার বার্তা হিসেবে যাবে। এতে ইরানের বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘কোনো হামলা বা হুমকির জবাব দিতে পিছ পা হবে না ইরান।’ তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘নিরাপদ থাকতে চাইলে আমাদের অঞ্চল ছেড়ে যান।’
জর্ডানে মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলা
জর্ডানের আল-আজরাকে অবস্থিত মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। এই হামলায় এফ-৩৫ ফাইটার জেটের হ্যাঙ্গার (বিমান রাখার জায়গা) এবং মার্কিন বাহিনীর কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারসহ চারটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা।
গতকাল বুধবার সকালে আইআরজিসির জনসংযোগ বিভাগ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই দাবি করা হয়। বিবৃতিতে মার্কিন বাহিনীকে ‘শিশু হত্যাকারী’ বলেও আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, শত্রুদের অপতৎপরতার প্রতিশোধ নিতেই এই হামলা চালানো হয়।
বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, ‘অ্যারোস্পেস ফোর্সের সাহসী যোদ্ধারা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে এই হামলা চালিয়েছে। জর্ডানের আল-আজরাকে মার্কিন বিমানঘাঁটির এফ-৩৫ ফাইটার জেটের হ্যাঙ্গার এবং শিশু হত্যাকারী মার্কিন বাহিনীর কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারসহ চারটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু এই হামলায় ধ্বংস করা হয়েছে।’
আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘শত্রুদের যেকোনো নতুন আগ্রাসনের কঠোর ও চূড়ান্ত জবাব দিতে আমাদের বাহিনী প্রস্তুত। আর এই নতুন কোনো আগ্রাসনের পরিণতির দায়ভার আমেরিকান শত্রুদেরই নিতে হবে।’
এর আগে বুধবার সকালে এই অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। দক্ষিণ ইরানে মার্কিন বাহিনীর হামলার জবাব দিতেই এই পাল্টা হামলাগুলো চালানো হয়েছে বলে দাবি তেহরানের। হরমুজ প্রণালীতে একটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার অভিযোগে বুধবার ভোরে দক্ষিণ ইরানের কেশম, জাস্ক, সিরিক এবং বন্দর আব্বাসসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কয়েকটি হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত ইরানের
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া পাল্টাপাল্টি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দিয়েছেন।
মঙ্গলবার রাতের আকস্মিক সামরিক হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতির পর ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক পথে হাঁটার বিষয়টি তেহরানকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। কারণ যেকোনো ফলপ্রসূ কূটনৈতিক প্রক্রিয়া বা সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অন্তত একটি ন্যূনতম স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশের প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পরিবেশ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
টানা ৪ হাজার ৩৯৯ দিন পদে থেকে স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রেকর্ড গড়েছেন নরেন্দ্র মোদি। এর আগে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জওহরলাল নেহেরুর টানা ৪ হাজার ৩৯৮ দিন দায়িত্ব পালনের রেকর্ডটি ছিল দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি পুরোনো।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২৬ মে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন মোদি। এরপর ২০১৯ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পরপর জয়ী হয়ে টানা তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
গত বছর ইন্দিরা গান্ধীর একটানা প্রধানমন্ত্রিত্বের রেকর্ডও অতিক্রম করেছিলেন মোদি। এবার তিনি নেহরুর দীর্ঘদিনের রেকর্ড ভেঙে দেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ধরে দায়িত্বে থাকা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নতুন নজির স্থাপন করলেন। এ ছাড়া মোদিই ভারতের একমাত্র অকংগ্রেসীয় নেতা যিনি টানা তিনবার নিরঙ্কুশ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ জোটের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে এই ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জনের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতারা নরেন্দ্র মোদিকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তার অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বিশ্ব মঞ্চে ভারতের অবস্থানের উন্নতির জন্য প্রশংসা করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদির এই অর্জনের প্রতিক্রিয়ায় শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমার দিসানায়েকের লেখা একটি চিঠিতে লঙ্কান সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেছেন, ‘এই মাইলফলক কেবল আপনার দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রমাণ নয়, বরং বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের জনগণের আপনার নেতৃত্বের প্রতি অগাধ আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন।’
ভারতের অসাধারণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের বিষয়টিও তুলে ধরে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট আরও উল্লেখ করেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মোদির দূরদর্শী চিন্তাধারা ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশকে অনুপ্রাণিত করেছে।
ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর বলেন, ‘এই অর্জন দেশের (ভারত) প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদির দীর্ঘ বছরের সেবা ও অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।’ মোদির নেতৃত্ব এবং ভারতের উন্নয়নে তার অবদানেরও প্রশংসা করেন করে তিনি আরও বলেন, ‘এই অর্জনটি তার (মোদির) কয়েক দশকের নিবেদিত জনসেবা এবং নেতৃত্বের এক শক্তিশালী প্রমাণ।’
মার্কিন সিনেটের ইন্ডিয়া ককাসের সহসভাপতি জন কর্নিনও প্রধানমন্ত্রী মোদিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং তার মেয়াদকে যুগান্তকারী বলে অভিহিত করেছেন।
এক্স পোস্টে করনিন লেখেছেন, ‘ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন। টানা তিনটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ম্যান্ডেটের মাধ্যমে ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের আস্থা অর্জন করে তিনি ৪ হাজার ৩৯৯ দিনের এই নেতৃত্বের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘২৫ কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা থেকে শুরু করে ভারতকে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত করা পর্যন্ত, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনামল ছিল সত্যিই রূপান্তরধর্মী। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত অংশীদারত্বও এর আগে কখনো এত শক্তিশালী ছিল না।’
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিও মোদির নেতৃত্বকে ‘দূরদর্শী ও প্রভাবশালী’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানিয়েছেন, ভারত-ইতালি কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে মোদির সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে তিনি আগ্রহী।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হওয়ার এই ঐতিহাসিক অর্জনের জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদিকে আন্তরিক অভিনন্দন। এই অর্জন ভারতের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি এবং বিশ্বমঞ্চে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে তার দীর্ঘদিনের নিবেদিত জনসেবা ও নেতৃত্বের প্রমাণ।’
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী তেশেরিং তোবগে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ‘বন্ধু ও দূরদর্শী নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করে শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, ‘ভারতের উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে মোদির অবদান অনস্বীকার্য।’
মন্তব্য